ঢাকাই খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতি – সাদ উর রহমান
ঢাকাই খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতি – সাদ উর রহমান
প্রকাশকাল – অগ্রহায়ণ ১৪২৩, ডিসেম্বর ২০১৬
প্রচ্ছদ – ধ্রুব এষ
DHAKAI KHABAR O KHADDO SANGSKRITI by Sad ur Rahman
.
উৎসর্গ
দাদা মরহুম হাকিম হাবিবুর রহমান
ও
বাবা মরহুম ইস্তেফাউর রহমান খান
এর স্মৃতির প্রতি।
.
ভূমিকা
খাবার মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খাবার ও খাদ্যাভ্যাস মানুষের শুধু পেটই ভরায় না, করে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আর পালন করে তার সংস্কৃতি বিকাশে অন্যতম ভূমিকা। তাই ঢাকার সংস্কৃতিক ইতিহাস অন্বেষণে ও অধ্যায়নের জন্য এই জনপদে ঢাকাবাসীর খাবার ও তাদের খাদ্য অভ্যাস জানা অত্যন্ত জরুরি। খাবার যদি হয় বেঁচে থাকার অনুসঙ্গ ও রসনা তবে রান্না একটি শিল্প। ছবি আঁকতে শিল্পীকে যেমন জানতে হয় তাঁর ক্যানভাস, ফ্রেমিং, কালার মিক্সিং তেমনি একজন রাধুনিকে জানতে হয় খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া, মসলার গুণাগুণ ও পরিমাপের সাথে সঠিক খাদ্য উপাদান বাছাই সর্বোপরি প্রয়োজন সৃজনশীলতা ও নিজস্বতা। আমাদের মায়ের হাতের রান্না মায়ের ভাষার মতোই প্রিয়। আমাদের যেমন রয়েছে ঐতিহ্যবাহী জারি, সারি, লালন, বাউলের গান তেমনি আদি ঢাকাবাসীর সংস্কৃতিতে মিশে আছে তাদের খাদ্য বিলাস ও রসনার ঐতিহ্যের ধারবাহিকতা। যা তারা লালন করে আসছে যুগ যুগ ধরে।
খাদ্য বলতে আমিষ, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন ও পানি সকল বস্তুকে বোঝানো হয়। যা মানুষসহ প্রাণীকুল তাদের খাদ্যের পুষ্টি বর্ধন ও আনন্দের জন্য গ্রহণ করে থাকে। আবার খাদ্যের স্বাদ ভেদে ছয়টি ষড়রস যথা- অম্ল, তিক্ত, কসা, কটু, মধুর ও লবণ এর কথা পণ্ডিতেরা বলেছেন। যা আমাদের স্বাদ আস্বাদনের ভিন্ন ভিন্ন গুণ প্রকাশ করে। জিহ্বা হচ্ছে সেই গুণ বিশেষ যা খাদ্য রসনার বিশেষ মানব অঙ্গ। তবে দৃষ্টিকোণ ও নাসিকা খাদ্য গ্রহণের ইচ্ছায় ভূমিকা রাখে। আলোচ্য প্রবন্ধে খাবার বলতে সেই সকল খাবারগুলোই বিবেচনা করা হয়েছে যা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে মানুষের গ্রহণ উপযোগী করা হয়।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এক বৈচিত্র্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক শহর। এই শহর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়ে আজকের ঢাকা নগরী। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৪ লক্ষের কম। শহরের বিস্তৃতিও ছিল কম। জনসংখ্যা- কম থাকায় লোকালয় বেশি ছিল না। ছিল পর্যাপ্ত গাছপালা, পুকুর, জলাশয়, চাষের জমি। যে কারণে খাদ্যদ্রব্যের প্রাচুর্য ছিল। উদ্বৃত্ত খাদ্য তাঁরা কোনরকম যন্ত্রপাতি বা রাসায়নিক দ্রব্য ছাড়াই প্রাকৃতিক উপায়ে সংরক্ষণ করতেন। ১৯ শতকের শেষ দশক থেকে ঢাকার বিস্তৃতি বাড়তে থাকে। গড়ে উঠতে থাকে দালান কোঠা, ভবন, প্রশাসনিক বিভিন্ন অবকাঠামো সাথে বাড়তে থাকে জনসংখ্যা। বর্ধিত এই শহরের জনসংখ্যা- বিশ শতকের ৫০ দশকে প্রায় ১৫ লক্ষে পৌঁছে। আর স্বাধীনতা পরবর্তী রাজধানীর সুবাদে বর্তমানে দেড় কোটির উপরে লোকের বাস এই শহরে। ঢাকার পরিচিত পায় পুরান ঢাকা আর নতুন ঢাকা নামে। পুরান ঢাকার এই আদিবাসীরাই ঢাকাই খাবারের একমাত্র ধারক ও বাহক।
ঢাকার খাদ্যাভ্যাসে উত্তর ভারতীয় ও বহিঃভারতীয় প্রভাব মোগল আমলেই প্রথম ঘটেনি। ধারাটির সৃষ্টি হয়েছিল আরও আগে সুলতানি আমলে স্থানীয় এবং আফগান অধ্যুষিত এই জনপদে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। যা পরবর্তীতে মোগল আমলে সম্পূর্ণতা পায়। খাদ্যাভ্যাসের এই বিবর্তন স্থানীয় খাদ্য সংস্কৃতিতে নানা যোগ বিয়োগ সৃষ্টি হয়েছে মোগল রীতি স্থানীয় ধারা। প্রাথমিককালে মোগল কৃষ্টিকে অনুসরণ করলেও কালক্রমে স্থানীয় প্রচেষ্টা খাদ্যাভ্যাসকে ঢাকাই রীতিতে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করতে সাহায্য করেছে।
ঢাকার লোকেরা স্বভাবগত ও বংশানুক্রমিকভাবে খেতে ভালোবাসেন এবং খাওয়াতে ভালোবাসেন। পেটুক না হলেও খাবারের স্বাদ, গুণাগুণ বিচারে সঠিক প্রক্রিয়ায় রান্না খাবারকেই তারা বেছে নেন। পিতৃকুলের ঐতিহ্য হিসেবে সেই সব খাবারকেই ধারণ করেন। তাদের উৎসব অনুষ্ঠানে সামাজিক প্রথা হিসেবে সেই খাবারগুলোই পরিবেশিত হয়। ঢাকার কিছু খাবার রয়েছে আদি স্বাদে আর কোনোটি যোগ বিয়োগে সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক খাবার। বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে পশ্চিমাসহ নানা দেশের খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। কিন্ত ঢাকা তার খাবারের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য স্ব নামেই খ্যাতি অর্জন করছে। ঢাকাই খাবার এখন শুধু ঢাকার নয় বিশ্বায়নেও হাত বাড়াচ্ছে দেশে বিদেশের নানা মানুষের খাদ্য অভ্যাসে। ঢাকাকে বলা হয় জাদুর শহর প্রাণের শহর— কেননা এই শহরে প্রবেশ তো হয় নির্বিঘ্নেই কিন্তু ভালোবাসার টানে এই শহর থেকে বের হবার পথ খুঁজে পাওয়া সত্যি দুষ্কর।
.
মুখবন্ধ
ঢাকা নগরীর বিকাশ ইসলাম খান আগমনের সময় থেকে ঢাকার প্রশাসনিক গুরুত্ব বেড়ে যাবার সাথে সাথে সাধারণ জীবনে খাদ্য ও খাদ্যবিলাসে লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যায়। মোগল বিভিন্ন শাসকদের বিচিত্র ধরনের খাদ্য অভিলাষ ঢাকার সাধারণ জীবনে অসম্ভব প্রভাবিত করে গেছে। প্রথমে অভিজাত শ্রেণি পরে প্রকরণে জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় হয় বিলাসী খাবার হিসেবে। এই খাদ্য অভ্যাস কালক্রমে ঢাকার খাদ্য বিলাসে একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করে। ধারাবাহিকভাবে ফরাসি, পর্তুগিজ, ইংরেজদের প্রচলিত খাবারের প্রয়োজনের তাগিদে ঢাকায় একসময় তা জনপ্রিয়তা অর্জন করে যাকে আমরা ঢাকাই খাবার বলি।
ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি কৃষিপ্ৰধান সমাজে প্রাচীনকাল থেকে খাদ্য অভ্যাস হিসেবে ভাত, মাছ এবং শাক-সবজিই প্রধান। নগর সভ্যতার প্রভাব প্রশাসনিক শাসন ও প্রয়োজনে ঢাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এই পূর্ব বাংলার গুরুত্ব। পেশা, বাণিজ্য ও জীবিকার প্রয়োজনে শহরে আগমন ঘটে নানা অঞ্চল ও দেশ-বিদেশিদের উপস্থিতি। তাদের খাদ্য সংস্কৃতি, খাদ্য অভ্যাসের প্রভাব পড়ে এই শহরের উপর। সাথে মানুষের খাদ্য আচরণেরও ঘটে পরিবর্তন।
ঢাকা প্রচলিত খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত রূপ সময় বিচারে প্রায় ৩৫০ বছরের বেশি নয়। ঢাকার অতীত প্রাচুর্য ও খাদ্য সম্ভারের স্মৃতিকথা ঢাকার নতুন প্রজন্মের কাছে আজও রূপকথার গল্পের মতো শোনাবে।
আমি পেশাদার লেখক বা গবেষক নই। কিন্তু ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা যা কিছু প্রথম, যা কিছু মানব সভ্যতার আশীর্বাদ বা অভিশাপ সব কিছুই আমাকে তাড়িত করে। আজ থেকে দেড় দুইশো বছর পরে আমি আপনি থাকব না। কিন্তু আমাদেরই কোনো উত্তরাধিকারী ততদিনে এই দেশের আলো হাওয়ায় বেড়ে উঠবে। যেমনটা আজকে আমি ও আপনি। তারা যেন বলতে পারে “দেখ কী সুন্দর ছিল আমাদের দেশটা”। আমাদের এই দেশটার অতীত যতটা গৌরবময় ছিল ভবিষ্যৎ যেন তার চেয়েও সুন্দর হয়। সেই স্বপ্নই লালন করি। সেই ভাবনা থেকেই ঢাকাই খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতি বইটা দিয়ে ইতিহাস অন্বেষণের ক্ষীণ প্রচেষ্টা গ্রহণ করলাম। আমাদের বর্তমান প্রচলিত ও হারিয়ে যাওয়া প্রসিদ্ধ খাবারগুলো এখানে একত্রিত করার চেষ্টা করেছি। ঢাকাবাসীর দীর্ঘদিনের খাদ্য অভ্যাস, সংস্কার, খাদ্য গ্রহণ রীতি, খাদ্যের প্রচলিত ধারা মাথায় রেখে বিশ্লেষণে খাদ্যের উৎসে, তার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি, কালের সাক্ষী ঢাকার প্রবীণ বয়োজ্যেষ্ঠদের সাক্ষাৎকার এবং রেফারেন্স হিসেবে কিছু বইপত্র, জার্নালের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।
বইটি বিন্যাসকালে, খাবার নির্বাচনে শুধু ঢাকার সাথে সংশ্লিষ্ট, অধিক ঘর-বাড়িতে ব্যবহৃত ও জনপ্রিয়তা বিচারে নির্বাচন করা হয়েছে। ৪০ দশক পরবর্তী জনপ্রিয় খাবারের দোকান নির্বাচনে তাদের দীর্ঘ অবস্থানগত সময়, সুনাম এবং বিশেষ বিশেষ খাবারের বিশেষত্ব ও লোকপ্রিয়তার বিষয়টি খেয়াল রাখা হয়েছে। সর্বোপরি বইটি রচনায় ঢাকা ফোরামের তরুণ সদস্যদের একনিষ্ঠ পরিশ্রম ও সহযোগিতা বিশেষভাবে অভিনন্দনের দাবি রাখে। শব্দের উৎস, তথ্য ও তা প্রদানে রাতবিরাতে বিরক্ত করা ক্যালিওগ্রাফার আব্দুর রহিম ভাইয়ের আন্তরিকতা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি। এছাড়া ঢাকা কেন্দ্রের আজিম বক্স ভাই, হারুনুর রশিদ, আমিনুল হক ভাই যারা উৎসাহ যুগিয়েছেন তাদের কথা অল্প পরিসরে বলে শেষ হবার নয়। বইটিতে অনিচ্ছাকৃত বা ভুলে কোনো খাবারের নাম বাদ পড়লে, বিদগ্ধ পাঠক বিষয়টি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন বলেই আশা রাখি। খাদ্য রসিক ইতিহাস অনুরাগী পাঠকদের যদি এই বিষয়ক নতুন কোনো তথ্য বা অভিজ্ঞতা সুনির্দিষ্ট বর্ণনা সঞ্চিত থাকে তবে জানতে পারলে ভবিষ্যতে আরও তথ্য সমৃদ্ধ সংযোজন বইটির কলেবরে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আমার বিশ্বাস।
বইটি পাঠে যদি পাঠকের সামান্যতম উপকার ও আনন্দলাভ ঘটে তবে দীর্ঘ পরিশ্রমে এই বইটি রচনায় নিজেকে সার্থক মনে করে প্রশান্তি লাভ করবো। তবে সব অপারগতার দায়ভার শুধু আমারই।
ধন্যবাদ।





ভাই একটা অনুরোধ
ইবনে খালদুনের “আল মুকাদ্দিমা” বাংলা অনুবাদ দিতে পারবেন
কেননা এটা গুরুত্বপূর্ণ এবং উপকারী বই
ভাই একটা অনুরোধ
ইবনে খালদুনের”আল মুকাদ্দিমা”এর বাংলা অনুবাদ কি দেয়া যাবে
কেননা এটা গুরুত্বপূর্ণ এবং উপকারী