ডন কুইকজোট – মিগেল সার্ভেন্টিস
(দোন কিহোতে – মিগেল দে সের্ভান্তেস
(দোন কিহোতে এবং মিগেল দে সের্ভান্তেস হলো এই নাম দুটির আসল এবং সঠিক উচ্চারণ। ইংরেজি ও বাংলাসহ বিশ্বের বহু ভাষায় এদের অপভ্রংশ বা পরিবর্তিত রূপ (যেমন: মিগেল সার্ভেন্টিস এবং ডন কুইকজোট) বহুল প্রচলিত হলেও মূল স্প্যানিশ উচ্চারণের সাথে তার বেশ অমিল রয়েছে।)
অসম্পূর্ণ বই
মূল – মিগেল সার্ভেন্টিস
অনুবাদ – জুলফিকার নিউটন
প্রকাশকাল : একুশ বইমেলা ২০০৯
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
.
উৎসর্গ
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী শ্রদ্ধাস্পদে
গণতন্ত্রে এটাই মজা
আজ যে রাজা, কাল সে প্রজা।
.
ভূমিকা
বিশ্ব সাহিত্যের কালজয়ী প্রতিভা মিগেল সার্ভেন্টিস (১৫৪৭-১৬১৬) ১৫৪৭ সালের ৫ অক্টোবর স্পেনের আলকালা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছিপছিপে গড়ন, একমাথা লালচে চুল, সর্বদাই চঞ্চল, দুষ্টুমিভরা বড় বড় চোখ। মিগেল একটু বড় হবার পর থেকেই পথে পথে ঘুড়ে বেড়ান। ছোট ঘরে জায়গা নেই, ভাই-বোনের সংখ্যা সাতজন। তাছাড়া দরিদ্র পরিবারের পরিবেশে শিশুর মন অস্বস্তিবোধ করে। এর চেয়ে ভালো পথে পথে ঘোরা। বাজারে বা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে চারণদের মুখে নাইটদের বিরত্বগাথা শোনা যায় তন্ময় হয়ে। আর বড় হলেই পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরতে যেতেন সুযোগ পেলেই। তাছাড়া বড়দের কাছে বসে দেশবাসীর শৌর্যবীর্যের কাহিনী শোনার আকর্ষণও কম ছিল না। ষোড়শ শতাব্দী ছিল স্পেনের ইতিহাসের গৌরবময় যুগ। ইহুদিদের বিতাড়িত করা হয়েছে; মূরদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আফ্রিকায়। স্পেনের পৃথক বিভাগগুলি মিলিত হয়ে এক শক্তিশালী রাষ্ট্রের পত্তন করেছে। আমেরিকা আবিস্কার ও জয় স্পেনের আর একটি কৃতিত্ব। তার দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনীকে ভয় করে না এমন রাষ্ট্র তখন ইউরোপে ছিল না।
স্পেনের সেনাবাহিনীতে দেশ-বিদেশে নানা অভিযানে বীরত্বের কথা শুনতে শুনতে কিশোর মিগেলের কল্পনা উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল। বড় হয়ে এমনি অভিযানে বেড়িয়ে পড়বেন স্বপ্ন দেখতেন তিনি। এই স্বপ্ন তাকে রক্ষা করত কঠোর দারিদ্র্যের প্রতিদিনের নিপীড়ন থেকে।
মিগেলের স্কুলের পড়া আরম্ভ হলো আলকালায়। কিন্তু বেশিদিন চলল না। কারণ বাবা সপরিবারে আলকালা ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লেন ভাগ্যান্বেষণে। এক শহর থেকে আর এক শহরে। অদম্য তার আশা। সুদিন আসবে। কিশোর মিগেলের খুব ভালো লাগত এই নতুন নতুন জায়গা দেখে। দেশের লোকদের চিনলেন, আর পরিচিত হলেন স্পেনের প্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গে।
মিগেল যখন বাবার সঙ্গে মাদ্রিদ এসে পৌঁছলেন তখন তার বয়স উনিশ। সম্রাট দ্বিতীয় ফিলিপ রাজধানী সাজাবার জন্য ব্যগ্র। তার নতুন প্রাসাদ শিল্পমণ্ডিত করবার জন্য আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন দেশ-বিদেশের কত শিল্পী। আর রাজানুগ্রহ লাভের আশায় লেখকরাও আছেন রাজনীতিতে। সুতরাং মিগেল শিল্প-সাহিত্যের পরিবেশে এসে পড়লেন। কবিতার ভক্ত ছিলেন তিনি। খুঁজে খুঁজে তরুণ কবিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করলেন।
যে বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন সেখানকার অধ্যক্ষ খুবই স্নেহ করতেন মিগেলকে। সেটা তার ছাত্র হিসাবে কৃতিত্বের জন্য নয়। কারণ পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সকল শক্তি নিঃশেষিত করবার কথা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। বইয়ের পৃষ্ঠার বাইরে যে জগৎ, সেই জগৎ থেকে সরাসরি পাঠ নিতে তিনি আগ্রহী ছিলেন। ছাত্রবয়সেই এক বয়স্কা রমণীর প্রণয়ী হয়েছিলেন বলে শোনা যায়। তবে তার জীবনের অনেক কিছুই জানা যায় না। এই প্রথম প্রেম সম্বন্ধে কিছু নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ তাকে ভালোবাসতেন অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও মধুর ব্যবহারের জন্য। সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ দেখে তিনি মিগেলকে কবিতা লিখতে উৎসাহিত করতেন। কবিতা লিখে নাম করবার একটা সুযোগও এসে গেল।
যুবরাজ ডন কার্লোর শোচনীয় অকাল মৃত্যুতে সমগ্র দেশ শোকে মগ্ন। শোকগাথার একটি সংকলন সম্পাদনা করবার দায়িত্ব পড়ল অধ্যক্ষের উপর। মিগেলের শোকগাথাটি সহপাঠী, শিক্ষক এবং অন্যান্য সকলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা লাভ করল। হঠাৎ এক নগণ্য ছাত্রের উপর চোখ পড়ল রাজধানীর অভিজাত সম্প্রদায়ের। তরুণ কবিকে অভিনন্দন জানাল সবাই।
মিগেল এই সাফল্যে কিছুদিন নিজেকে গৌরবান্বিত বোধ করলেন; তিনি সাধারণ নন, অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা, একথা ভাবতেও মন ভরে ওঠে। কিন্তু দারিদ্র্যের পীড়ন কিছুদিনের মধ্যেই আবার তাকে বাস্তব পরিবেশের নিষ্ঠুর পরিবেশে ফিরিয়ে আনল। মিগেলের পুথিগত বিদ্যার প্রতি কোনো আকর্ষণ ছিল না। সুতরাং বিদ্যালয় ত্যাগ করে এবার অর্থোপার্জন শুরু করা স্থির করলেন। কিন্তু কোন পথে উপার্জন? রাজসভার অনুগ্রহ না পেলে কোনো ভদ্র রকমের চাকরি পাওয়া সম্ভব নয়। হয়তো সাধারণ সৈন্যদলে নাম লেখানো যেতে পারে ছোট ভাইয়ের মতো। কিন্তু এত কষ্টের জীবন বরণ করে, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে উপার্জন যা হবে তা দিয়ে দারিদ্র্য ঠেকানো যাবে না। তাছাড়া কাব্যের সঙ্গে সেনানি জীবনের যোগাযোগইবা কতটুকু থাকবে?
এমন সময় মাদ্রিদে এলেন পোপের দূত জুলিয়া অ্যাকোয়াভাইভা। নানা দেশের শিল্পী এবং লেখকরা তার দরবারে ভিড় করবে, এই ছিল জুলিয়ার আকাঙ্ক্ষা। মাদ্রিদে পৌঁছে তিনি পারিষদ সংগ্রহে মন দিলেন। কবি হিসাবে মিগেলের নাম তখন অনেকেরই জানা। জুলিয়ার পারিষাদ হিসাবে নাম লেখালেন তিনি।
স্বদেশ ও স্বজন ত্যাগ করে মিগেল ইতালির পথে বেরিয়ে পড়লেন অনিশ্চিতের সন্ধানে। আশা ছিল, বড়লোকের দরবারে খাওয়া-পরার চিন্তা থাকবে না, সব সময় লিখবেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝতে পারলেন, দরবারের পরিবেশ সৃষ্টিকর্মের সহায়ক নয়। এখানে অর্বাচীন তরুণদের ভিড়, তোষামোদই তাদের একমাত্র কাজ। শিল্প-সাহিত্যের পরিবেশ নেই।
কিছুদিনের মধ্যেই দরবারের ছকে বাঁধা কৃত্রিম জীবনে মিগেলের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠল। এর চেয়ে ভালো সৈনিকের জীবন। অ্যাডভেঞ্চার আছে, প্রতিমুহূর্ত জীবন্ত করে তোলার মতো উপাদান আছে।
স্পেনের কয়েকটি সেনাদলে ইটালিতে ছিল অধিকৃত অঞ্চল রক্ষণাবেক্ষনের জন্য। তারই একটিতে নাম লেখালেন মিগেল। তুর্কী আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে তার প্রথম অভিযান। তুর্কী বাহিনী ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে আক্রমণ করে নগর গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দিত। এদের নিষ্ঠুরতার সীমা ছিল না। মহামান্য পোপের নেতৃত্বে ইউরোপে দেশগুলি মিলিতভাবে তুর্কী আক্রমণ প্রতিহত করবার জন্য সংঘবদ্ধ হলো। এই মিলিত সেনাবাহিনীর অধিনায়ক হলেন ডন জুয়ান অব অস্টেয়া। স্পেনের সম্রাট পঞ্চম চার্লসের জারজ পুত্র ছিলেন ডন জুয়ান। মিগেল এবং ডন জুয়ান সমবয়সী, দু’জনেরই বয়স চব্বিশ। ডন জুয়ান নানা যুদ্ধে অধিনায়কত্ব করে এর মধ্যেই খ্যাতি লাভ করেছেন। তার শৌর্যের কাহিনী লোকের মুখে মুখে, অ্যাডভেঞ্চার প্রয়াসী তরুণদের আদর্শ তিনি।
মিগেল প্রথম প্রকৃত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করলেন লেপান্তোর নৌ-যুদ্ধে। ১৫৭১ সালের ৭ই অক্টোবর। লেপান্ত উপসাগরে খ্রিস্টান ও তুর্কীবাহিনীর জাহাজ পরস্পরের সম্মুখীন হলো। ডন জুয়ান খ্রিস্টান বাহিনীর অধিনায়ক। মিগেল সেদিন জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে ছিলেন। কামানের শব্দে নিচে থেকে নেমে এলেন উপরে। ক্যাপ্টেন তাকে শুয়ে থাকতে বললেন। কিন্তু জীবনের এমন একটি সুযোগ হারালে চলবে না। তিনি হাতিয়ার তুলে নিলেন। সারাদিন যুদ্ধ চলল। মিগেলের দেহে কয়েক জায়গায় গুলি লেগেছে, কিন্তু মোহগ্রস্তের মতো তিনি বন্দুক চালিয়ে যাচ্ছেন। বিকেলের দিকে একটা গুলি এসে লাগল বাঁ হাতে। রক্ত ঝরছে, অবশ হয়ে আসছে হাত। তবু ব্যাণ্ডেজ বেঁধে আবার বন্দুক হাতে তুলে নিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হবার আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন ডেকের উপরে। সন্ধ্যার সময়ে খ্রিস্টান বাহিনীর জয়োল্লাসে সমুদ্রবন্ধ যখন মুখর হয়ে উঠল তখন মিগেল অচেতন।
লেপান্তোর বিজয়ে-গৌরব বহুলাংশে ডন জুয়ানের প্রাপ্য। তবু মিগেলের মতো আর দু’একজন তাদের বীরত্বের জন্য স্বীকৃতি পেলেন। কিন্তু এ স্বীকৃতি প্রধানত মৌখিক। দীর্ঘ সময়ে মিগেলকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। তখন ডন জুয়ান তাকে দেখতে এসেছেন। হাসপাতাল থেকে যখন মুক্তি পেলেন তখন দেখা গেল বাঁ হাতটি প্রায় অকর্মণ্য হয়ে গেছে। এর জন্য অবশ্য মিগেন্ত্রের তেমন দুঃখ নেই। কারণ এই অকর্মণ্য হাতই হবে বীরত্বের সাক্ষী, খ্রিস্টানুগত্যের সার্টিফিকেট।
ডন জুয়ানের সঙ্গে তুর্কীদের বিরুদ্ধে আরো দুটি অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন মিগেল। কিন্তু সাফল্যমণ্ডিত হয়নি এ দুটি অভিযান। মিগেল শ্রান্ত; অনেকদিন দেশের বাইরে আছেন। এবার দেশে ফিরে রাজসভায় আবেদন করবে হয় ভদ্রগোছের চাকরীর জন্য। তার বীরত্বের প্রমাণ তো রয়েছেই। তার উপর ডন জুয়ানের কাছ থেকে নিলেন সুপারিশপত্র। ছোট ভাই তখন রোদ্রিগো তখন ইতালীতে। দু’জনে একই সঙ্গে যাত্রা করলেন দেশের উদ্দেশ্যে।
জাহাজ ছেড়ে দিল পাল তুলে। এতদিন দেশের কথা, মা-বাবা এবং ভাই বোনদের কথা বেশি মনে পড়েনি। কিন্তু এখন দেশের দিকে যাত্রায় মন ব্যাকুল হয়ে উঠল। কতদিনে পরিচিত পরিবেশে আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হবেন।
হঠাৎ করে কয়েকদিন পরে বিপদসূচক ধ্বনি উঠল। তুর্কীরা আক্রমণ করেছে। শুক্ররা আদেশ করল, আত্মসমর্পণ করো। স্প্যানিশ নৌ-বাহিনীর অধ্যক্ষ উত্তর দিলেন, মরব, তবু হার স্বীকার করব না। সারাদিন প্রচণ্ড লড়াই চলল, যুদ্ধ করতে করতে প্রান দিলো অর্ধেকেরও বেশি। যারা বেঁচে রইল তারা সব বন্দি হলো রাত্রির অন্ধকারে। এই বন্দিদের মধ্যে ছিলেন মিগেল ও তার ছোট ভাই। এতদিনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। পায়ে পড়ল শিকল। তুর্কী দলপতির ক্রীতদাস। মিগেলের পকেটে পাওয়া গেছে ডন জুয়ানের পরিচয়ের পত্র। তাতে ওর মূল্য বেড়েছে শত্রুর কাছে। ভেবেছে, অভিজাত সমাজের লোক, মোটা মুক্তিপণ আদায় করা যাবে। বন্দিদের নিয়ে তুর্কী জাহাজগুলি এসে ভিড়ল আলজিয়ার্সের বন্দরে। বন্দর থেকে মিগেল এবং আরও একদল বন্দিকে নিয়ে আসা হলো দলপতি দালি মামির প্রাসাদে। বাকি বন্দিদের পাঠানো হলো বিভিন্ন তুর্কী নেতাদের বাড়ি। দালি মামি কয়েক হাজার স্প্যানিশ কৃতদাসের মালিক। নতুন বন্দিদের শিক্ষা দেবার পাকা ব্যবস্থা আছে। মিগেলের পায়ে বেড়ি পরানো হলো, কোমরে মোটা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হলো অন্ধকার নির্জন ঘরে। কতদিন রাখা হয়েছিল জানা যায় না। নিশ্চয়ই অবশ্য ততদিন, যতদিন না তিনি মৃত্যুর কাছাকাছি এসে পৌঁছেছিলেন। বন্দিদের এটা প্রথম পাঠ; প্রথমেই বুঝিয়ে দিতে হবে পালাবার চেষ্টা করলে কী সাংঘাতিক শাস্তির আশঙ্কা। অর্ধচেতন হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে মিগেলের প্রায়ই মনে হতো একটু খোলা হাওয়া গায়ে না লাগলে কিংবা নীল আকাশের উপর খানিকক্ষণ চোখ রাখতে না পারলে পাগল হয়ে যাবেন বুঝি। কর্তা যখন বুঝল বন্দির আর পালাবার ক্ষমতা নেই, ষড়যন্ত্র করবার মতো উদ্যম নেই, মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেছে-তখন তাকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হলো। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পরিবর্তে বেঁচে থাকবার মতো সামান্য খাবার পাওয়া যায়। মিগেল শহরে বেরোবার সুযোগও পেলেন। কর্তার তাতে কোনো ভয়ের কারণ ছিল না। কারণ আলজিয়ার্স একটি বৃহত্তর জেলমাত্র। শহরের বাইরে যাওয়া-আসার পথ সুরক্ষিত। পালিয়ে যাবার উপায় নেই।
শহরে বেড়াবার সুযোগ মিগেলের মন কিন্তু আর খারাপ হয়ে গেল। শহরে বিভিন্ন অঞ্চলে দেখতে পেলেন তার স্বদেশবাসী কত হাজার হাজার লোক বন্দিদশায় পশুর মতো জীবনযাপন করছে। স্পেনের অনেক খ্যাতনামা পরিবারের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি রয়েছেন তাঁদের মধ্যে।
Done page 12
মিগেল সংকল্প করলেন, এখান থেকে পালাতে হবে, দেশে গিয়ে এই বন্দিদের শোচনীয় অবস্থার কথা জানিয়ে সকলের মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এখন মাঝে মাঝে দু’একজন খ্রিস্টান সন্ন্যাসী স্পেন থেকে আসে আলজিয়ার্সের বন্দিদের মুক্তিপতন কথাবার্তা চালাতে। তাদের পক্ষে সকলের সংবাদ নেওয়া সম্ভব নয়। মুক্তিপণ দেবার মতো সামর্থ্য আছে কজনেরই বা? কিন্তু স্পেনের নাগরিক হিসাবে এদের প্রত্যেকের মুক্তি সম্বন্ধেই স্পেন সরকারের দায়িত্ব আছে।
মিগেলের মনে দিন-রাত কেবল এক চিন্তা,- কি করে এখান থেকে পালানো যায়। যদি সব বন্দিরা বিদ্রোহ করে? প্রহরীদের হত্যা করে পালানো কি অসম্ভব? তার আগে অবশ্য বন্দরে একটা জাহাজের ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। কিন্তু এ সব তো আর সম্ভব নয়! শুধু স্বপ্ন দেখা। এর চেয়ে বাস্তব প্রস্তাব স্পেন অধিকৃত ওরানে পালিয়ে যাওয়া। আলজিয়ার্স থেকে বেশি দূরে নয়। কিন্তু মাঝখানে গভীর বনে সমাচ্ছন্ন পাহাড়শ্রেণী। হিংস্র সিংহের জন্য সে বন কুখ্যাত। সেই বনের মধ্য দিয়ে পথ চিনে যাওয়া দুঃসাধ্য অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শন না থাকলে। তবু এই বন্দিদশার চেয়ে মুক্তির জন্য মৃত্যুবরণ করাও ভালো। মিগেল একান্ত গোপনে কয়েকজন বন্দির সঙ্গে ওরানে পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে ফেললেন। একজন বিশ্বস্ত মুরকে পাওয়া গেল পথপ্ৰদৰ্শক হিসাবে। বসন্তকালে এক রাত্রিতে মিগেল সদলে বেরিয়ে পড়লেন ওরানের পথে। সারারাত পথ চলে বনের মধ্য প্রবেশ করলেন সকালের দিকে। এদিক-ওদিক ঘুরলেন; কিন্তু সঠিক পথের হদিস নেই। সকলের পা কেটে রক্ত পড়ছে। পথপ্রদর্শন শেষ পর্যন্ত জানালো পথ ভুল হয়েছে সে ওরান যেতে পারবে না। কি করা যায় এখন? সারাদিন ঘোরাঘুরি করেও যখন পথের নিশানা পাওয়া গেল না তখন স্থির হলো আবার ফিরে যাবেন আলজিয়ার্স। সেখানে ফিরে যাওয়ার অর্থ সবারই জানা। তবু এখানে মরবার চেয়ে তুর্কির হাতে মৃত্যু ভালো। তাহলে অন্তত একদিন মৃত্যু-সংবাদটা দেশে পৌঁছাবে। রাত্রির অন্ধকারে আবার সবাই ফিরে এলো আলজিয়ার্স। সকলকেই কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হলো। তবু যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল ততটা নয়। কারণ আজিয়ার্সের শাসনকর্তা তখন বদল হচ্ছে। এ ব্যাপার নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবার মতো সময় ছিল না। মিগেল বাড়িতে চিঠি পাঠিয়েছেন। টাকা সংগ্রহ করে মুক্তিপণ পাঠাতে পারলে দেশে ফেরা সম্ভব হবে। বাবা নিঃস্ব, মুক্তিপণের টাকা কোথায় পাবেন? বোনরা যা পারল দিল। ছেলের কথা ভেবে মা বড়লোকদের বাড়ি বাড়ি টাকার জন্য ঘুরতে লাগল। স্বামী বেঁচে; তবু নিজের পরিচয় দিলেন বিধবা হিসাবে। তাতে হয়তো দানের পরিমান বাড়বে, এই আশা। ছেলের জন্য সবই করা যায়। কিন্তু তাতেও যা দরকার তার সামান্য অংশ মাত্র পাওয়া গেল।
মিগেলের আশা ছিল ডন জুয়ানের উপর। চিঠিও দিয়েছিলেন তাঁকে। লেপান্তোর যুদ্ধের কথা নিশ্চয়ই তার মনে আছে। মিগেলের বিপদের কথা জানলে নিশ্চয়ই তিনি সাহায্য করতে এগিয়ে আসবেন। মুক্তিপণের টাকা দেবেন, অথবা আলজিয়ার্স আক্রমণ করে বন্দিদের যুক্ত করবেন। কিন্তু মিগেল জানতেন না ডন জুয়ান নিজেই রাজদরবারের চক্রান্তে পড়ে বিপদাপন্ন। অন্যের কথা ভাববার সময় নেই; থাকলেও, কিছু করবার সামর্থ্য নেই।
এর পরের বার যখন স্পেন থেকে লোক এলো আলজিয়ার্সের শাসকের সঙ্গে মুক্তিপণ নিয়ে আলোচনা করতে তখন মিগেল রোদ্রিগোকে দেশে যাবার কথা বললেন। মা মুক্তিপণ হিসেবে যে টাকা সংগ্রহ করে পাঠিয়েছেন তাতে ভাইয়ের মুক্তি কেনা যাবে। তাঁর নিজের জন্য আরো বেশি টাকা দরকার। ভাইয়ের হাতে গোপনে চিঠি দিলেন বন্ধুদের নামে তারা যেন ছোট একটা জাহাজ পাঠায়। সেই জাহাজে করে যত জন সম্ভব পালাবে আলজিয়ার্স থেকে। বন্ধুরা অনুরোধ রাখল। কয়েকমাস পরে রাত্রির অন্ধকারে চুপি চুপি একটি জাহাজ এসে প্রবেশ করল শহরের প্রান্তে খাঁড়ির মধ্য। মিগেল সংবাদ পেয়েছিলেন কিছুদিন আগেই। সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন। সদলে মিগেল এসেছেন সমুদ্রতীরে। জাহাজের সিঁড়ি নামানো হয়েছে। এবার কয়েক মিনিটের মধ্যে জাহাজে উঠে সিঁড়ি টেনে নেওয়া। তারপর একবার সমুদ্রে ভেসে পড়তে পারলে আর কে পায়। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস ঠিক সেই মুহূর্তে কয়েকজন জেলে এসে পড়ল সেখানে। রাত্রির অন্ধকারে স্প্যানিশ বন্দিদের দেখে সন্দেহ হলো তার চিৎকার শুরু করে দিল। ছুটে এলো নগররক্ষীরা। এদিকে জাহাজের নাবিকরা ভয় পেয়ে সিঁড়ি তুলে নিয়ে জাহাজ ছেড়ে দিল। স্বাধীনতাপ্রয়াসী নিরুপায় নির্বাসিতের দল নতুন করে বন্দি হলো রক্ষীদের হাতে। মিগেল অপূর্ব দৃঢ়তার সঙ্গে জানালেন তিনিই সব কিছুর জন্য দায়ী। তাঁর সঙ্গীরা নিরপরাধ। আবার কারাবাস। অত্যাচার। কিন্তু জুয়ানের উপর যে নিষ্ঠুর আচরণ করা হলো সে তুলনায় তা কিছুই নয়। মিগেলের প্রধান সহায়ক ছিল সদা হাস্যময় তরুণ জুয়ান। পরদিন দলের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো জুয়ানের শাস্তি দেখতে। জুয়ানের দুই পা মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া গাছের উঁচু ডাল থেকে। সমস্ত দেহ ঝুলে আছে নিচের দিকে। কপিকলের মতো দড়ি টেনে একবার তাকে উপড়ে তুলছে, আবার দড়িতে ঢিল দিয়ে নামিয়ে দিচ্ছে নিচে। কিছুক্ষণ পরে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরুতে লাগল। আরও কিছু পরে মাটিতে নেমে এলো জুয়ানের মৃতদেহ।
এত অত্যাচারেও মিগেলের মুক্তিপ্রচেষ্টা বন্ধ হয়নি। এবার তিনি ওরানের গভর্নরকে চিঠি লিখলেন। তাকে আহ্বান জানালেন আলজিয়ার্স আক্রমণ করে স্প্যানিশ বন্দিদের মুক্ত করতে। চিঠি নিয়ে চলল এক বিশ্বস্ত মূর। সীমান্ত অতিক্রম করবার সময় রক্ষীরা তল্লাসি করে চিঠি আবিষ্কার করল। বিচারে মুরের শূলদণ্ড হলো। শূলে চরেও মূর কিন্তু কে তাকে চিঠি দিয়েছে তা প্রকাশ করল না।
স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কিছুতেই দমন করা যায় না। মিগেল আর একবার পালাবার পরিকল্পনা করলেন। এবারেও জাহাজে করে। সব আয়োজন প্রায় সম্পূর্ণ। শেষ মুহূর্তে একজন বিশ্বাসঘাতকতা করল। ব্যর্থ হয়ে গেল সব। আর এক প্রস্থ অমানুষিক অত্যাচার চলল তার উপরে।
দীর্ঘ চার বছর হয়ে গেল আলজিয়ার্সে। আর মুক্তির আশা নেই। বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে হয়েছে। এখন পায়ে বেড়ি আর কোমরে শিকল নিয়ে জেলের অন্ধকারে ঘরে পড়ে আছেন মিগেল। ক্রমাগত ব্যর্থতার ফলে দেহে ও মনে অবসাদ নেমে এসেছে।
এমন সময় একদিন জেলের অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করলেন ফাদার জুয়ান গিল। বন্দিদের জন্য মুক্তিপণের ব্যবস্থা করতে তিনি এসেছেন। ১০৮ জন বন্দির মুক্তির ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ফাদার মিগেলের নাম স্পেনে এবং এখানকার বন্দিদের মুখে শুনেছেন অনেকবার। তাই তাঁর ইচ্ছা ওঁকেও টাকা দিয়ে মুক্ত করে নিয়ে যাবেন সঙ্গে করে কিন্তু মিগেলের পরিবার যে টাকা সংগ্রহ করেছিল তা তো ভাইকে দেশে পাঠাতেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া তার জন্য মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে অন্যান্য বন্দিদের তুলনায় তিন-চার গুণ বেশি। ফাদার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে পণের পরিমাণ কিছু কমালেন। সম্পূর্ণ টাকাটা তুললেন নানা সূত্র থেকে। তারপর মিগেল মুক্ত।
দশ বছর পরে ফিরে এলেন মাদ্রিদ, নিজের পরিবারের মধ্যে। তার জন্য মা-বাবা এবং ভাই-বোনের মনে অপরীসিম স্নেহ ও ভালোবাসা সঞ্চিত ছিল। কিন্তু কঠোর দারিদ্র্য পারিবারিক পরিবেশ করে তুলেছে রুক্ষ আর নির্মম। এতদিন পরে বাড়ি এসে যে ক’দিন বিশ্রাম করবেন নিশ্চিন্তে, তার জো নেই। এই মুহূর্তে উপার্জন দরকার। মিগেলের নিশ্চিত ভরসা ছিল দেশসেবার প্রতিদান হিসাবে রাজদরবারে তিনি সমাদর পাবেন। ডন জুয়ান আছেন সাক্ষ্য দিতে। আর আছে তার অকর্মণ্য বাঁ হাত। কিন্তু মাদ্রিদ কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করে বুঝতে পারলেন তার আশা ভিত্তিহীন। ডন জুয়ান নিজেই রাজদরবারের চক্রান্তের শিকার হয়ে পড়েছেন। স্পেন সাম্রাজ্য ফাটল ধরেছে। বয়স ও শোকের ভারে সম্রাট জর্জরিত, প্রশাসনের উপর তার নিয়ন্ত্রণ হয়েছে শিথিল 1 কয়েকজন ক্ষমতাশালী কর্মচারী এবং সভাসদ তাদের পেটোয়া লোকের মধ্যে অনুগ্রহ বিতরণ করে। যোগ্যতা কিংবা দেশসেবা চাকরির মাপকাঠি নয়। কত বন্ধু এবং সহকর্মী এখন বড় পদে অধিষ্ঠিত। কিন্তু তাকে কেউ আমল দিল না। হয়তো এই অভিজ্ঞতাই ডন কুইকজোটের মুখ দিয়ে আমাদের শুনিয়েছে : “স্যাঙ্কো, মনে রেখো উচ্চ পদ পেলে মানুষের চরিত্র বদলে যায়। যদি গভর্নর হও তবে নিজের মাকেই আর চিনতে পারবে না।”
পর্তুগালে স্পেনের আধিপত্যি কিছুদিন আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কেউ কেউ পরামর্শ দিল, সেখানে হয়তো চাকরি পাওয়া যেতে পারে। সেই আশায় বৃথা ঘুরে এলেন পর্তুগাল। মা-বাবার বয়স হয়েছে। বড় ছেলের উপর তাদের কত আশা-ভরসা। তারা মুখে কোনো অভিযোগ করেন না। শুধু নীরবে অসহায়ভাবে চেয়ে থাকেন।
বেকার মিগেল সময় কাটাবার জন্য কবি এবং নাট্যকারদের আড্ডায় যাতায়াত শুরু করলেন। সেই সময় বই ছাপানো সহজ হয়নি। লেখকরা নিজেদের লেখা আড্ডায় আবৃত্তি করে শোনাতেন। মিগেল নিজের লেখা আবৃতি করতেন, শুনতেন অন্যের লেখা। এই সব আড্ডায় যাতায়াত করে লেখার অভ্যাস ফিরে এলো। কবিতা ছড়া লিখতে আরম্ভ করলেন ইটালিয়ান স্টাইলের প্যাস্টোরাল উপন্যাস লা গ্যালাটিয়া। গ্যালাটিয়া রচনা হিসাবে সার্থক নয়। তবু এই বই সম্পূর্ণ করতে পেরে মিগেল আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেন। প্রেরণা পেলেন আরো লেখবার।
১৫৮৪ সালে গ্যালাটিয়া ছাপা হলো। সে বছর ডিসেম্বরে আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটল মিগেলের জীবনে। তিনি মাঝে মাঝে বেড়াতে যেতেন ছোট বোন আন্দ্রিয়ার বাড়ি। সেখানে আলাপ হলো ক্যাটালিনার সঙ্গে অবস্থা খুব ভালো, অনেক খামারের মালিক। গ্রামের বাড়ি, সম্পত্তি, চাষাবাদের প্রতি গভীর আকর্ষণ। মিগেলের মুখ থেকে যখন যুদ্ধের বিবরণ, আলজিয়ার্সের বন্দিজীবনের কাহিনী ইত্যাদি শুনলেন তখন ক্যাটলিনা ওফেলিয়ার মতোই মুগ্ধ হলেন। আন্দ্রিয়ার ঘটকালিতে দু’জনের বিয়ে হলো।
ক্যাটালিনার বাড়ি ও খামারের ছোট জগতের মধ্যে জীবন কাটাতে পারলে মিগেলের হয়তো কোনো সমস্যাই থাকত না। কিন্তু যার অভিজ্ঞতা এত বিস্তৃত তার পক্ষে সঙ্কীর্ণ গৃহকোণে আবদ্ধ থাকা সম্ভব নয়। ক্রমশ দেখা গেল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্বভাবের পার্থক্য গভীর। ক্যাটলিনা অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শুনতে ভালোবাসেন, জীবনে কোনো অ্যাডভেঞ্চার বা অনিশ্চয়তা চান না। হাতের মুঠোর মধ্যে যা পাওয়া যায়, যা ছোঁয়া যায়, তা নিয়েই তিনি সন্তুষ্ট। অল্পদিনের মধ্যেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিল। মিগেল ফিরে এলেন মাদ্রিদে।
সব দিকে কেবল ব্যর্থতা। চাকরির কোনো সুবিধা হলো না। দাম্পত্য জীবনে সুখের আশাও গেল মিথ্যা হয়ে। বাস্তব জীবনে ব্যর্থতার শোধ তুলতে চাইলেন রঙ্গমঞ্চে। থিয়েটারের মালিকদের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ হয়েছিল। স্প্যানিশ থিয়েটারের মান উঁচু করলেন তিনি। গ্রীক নাট্যকাররা ক্লাসিক্যাল যুগে যেমন নাটক দিয়ে দেশের জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিলেন, তিনিও তেমনি করলেন স্পেনের শৌর্য-বীর্য নাটকে রূপায়িত করে। লেপান্তোর যুদ্ধ এর মধ্যে প্রধান স্থান অধিকার করল।
১৫৮৫ সালে তার কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ হলো। উৎসাহ বেড়ে গেল। পরপর কতকগুলি নাটক লিখে ফেললেন। লা গ্যালাটিয়া কিছু খ্যাতি দিয়েছিল। নাট্যকার হিসাবে সে খ্যাতি আরও ছড়িয়ে পড়ল। এতদিন তিনি বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে আদ্য নামেই পরিচিত ছিলেন। লেখক হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করায় সার্ভেন্টিস নামই প্রচার হতে লাগল।
কিন্তু দুর্ভাগ্য সর্বদা পেছনে লেগেই আছে। আর একজন নাট্যকার দেখা দিলেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে। তিনি লোপ দ্য ভেগা। কবি হিসাবে তিনি আগেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। এবার নাটক রচনায় হাত দিয়ে অকস্মাৎ খ্যাতির শিখরে উঠে গেলেন। তার সব নাটকের প্লটই মেলড্রিমাটিক, যা অতি সহজেই জনতার চিত্ত জয় করে নিল। সার্ভেন্টিসের আদর্শমূলক নাটকের আর চাহিদা রইল না। এত দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে যে আশার আলোটুকু দেখা দিয়েছিল হঠাৎ তা অদৃশ্য হয়ে গেল। সার্ভেন্টিস নিজেই বুঝতে পারলেন দ্য ভেগার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি পারবেন না। চমৎকার তার চেহারা, খুব মিশুক, বলতে চলতে তার জুড়ি নেই; দ্য ভেগার খ্যাতি যেন খড়ের আগুনের মতো হঠাৎ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে অন্য সবাইকে ম্লান করে দিল।
সার্ভেন্টিস নীরবে সরে দাঁড়ালেন সাহিত্যের প্রতিযোগিতা থেকে। কিন্তু বাঁচতে তো হবে। ভালো চাকরির আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। সামান্য বেতনের নগণ্য একটা কাজ পেলেন নৌ-বাহিনীর খাদ্য সরবরাহ বিভাগে। ১৫৮৬ সালে স্পেন আয়োজন করছিল নতুন অভিযানের। তার জন্য অধিক খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা দরকার। সার্ভেন্টিস গ্রামে গ্রামে ঘুরে খাদ্য সংগ্রহ করবার চাকরি পেলেন। প্রত্যেক চাষির কত পরিমাণ খাদ্যশস্য দিতে হবে তা নির্দিষ্ট করা থাকত। সার্ভেন্টিসের কাজ ছিল সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যশস্য আদায় করে মজুত করা, টাকার হিসাব রাখা ইত্যাদি। প্রতিদিন তাকে কলহের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে হতো। চাষীরা নির্দিষ্ট মূল্যে শস্য গভর্নমেন্টকে দিতে চাইত না; তারা অভিযোগ করত, অন্যায়ভাবে বেশি পরিমাণ শস্য আদায় করে নেওয়া হচ্ছে। আবার সরকার পক্ষের মনে সর্বদা সন্দেহ-কর্মচারীরা বেশি আদায় করে বাজারে একটা অংশ বিক্রি করে দিচ্ছে। দুর্নীতি দমনের জন্য রয়েছেন বিচারকের দল। এর উপর রয়েছে সরকারি হিসাব পরীক্ষকের দপ্তর। খাদ্যশস্যের হিসাব এবং তার জন্য দেওয়া টাকার হিসাব রাখা চাই নির্ভুলভাবে। অথচ যাদের এত দায়িত্ব তাদের মাইনে বছরের পর বছর বাকি পরে থাকে। কর্তৃপক্ষের ধারণা উপরি পাওনাতেই এদের চলে। মাইনেটা তো ফাও, সেটা না পেলেও বড় একটা যায় আসে না।
বেশি করে খাদ্যশস্য আদায় করবার মিথ্যা অভিযোগে একবার বিচারক তাকে জেলে পাঠালেন। ভালো করে তদন্ত না করেই।। মফস্বলের জেল, নরক-কল্পনার মূর্তরূপ। আলজিয়ার্সের বন্দিদশায় যে মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেননি এখানে স্বদেশবাসীর হাতে নিগৃহীত হয়ে সেই যন্ত্রণা তাকে বিদ্ধ করতে লাগল অনুক্ষণ। অবশ্য বেশিদিন তাকে জেলে থাকতে হয়নি। কারণ তিনি যে সত্যিই নিরপরাধ তা প্রমাণিত হতে দেরি হয়নি।
এদিকে যে জন্য খাদ্য সংগ্রহের প্রয়োজন ছিল তা শেষ হয়ে গেল। যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর নিকট আর্মাডার হার হলো। অনিয়মিত বেতনের সামান্য চাকরিও আর রইল না। সম্রাট দ্বিতীয় ফিলিপের কাছে সরকারি আবেদন জানালেন দেশসেবার পুরস্কার হিসাবে তাকে যেন চাকরি দিয়ে আমেরিকায় পাঠানো হয়। সার্ভেন্টিসের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল নিশ্চয়ই ফল হবে। তার আবেদনপত্র যে একটা মামুলি মন্তব্যের পর ফাইল বন্দি করে রাখা হয়েছে সে খবর সার্বেন্টিসের কাছে পৌঁছায়নি। তিনি শুভ সংবাদের জন্য প্রতীক্ষা করে আছেন। কিছুদিন পরেই আবার খাদ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হলো। পুরনো চাকরিতে ফিরে যাবার সুযোগ পেলেন সার্ভেন্টিস। চাকরি তো শুধু নামে, ঝামেলার শেষ নেই; যে মাইনে, তা দিয়ে নিজর খরচই চলে না। কিন্তু একটা আকর্ষণ আছে। তা হলো দেশ ও দেশের মানুষদের দেখার সুযোগ। মাদ্রিদে বসে এমন করে দেখা হয়নি।
এক পরিচিত ব্যক্তির অনুগ্রহে আর একটি চাকরি পাওয়া গেল। মাইনে সামান্য একটু বেশি। ঝঞ্ঝাট আগের চেয়ে বেশি ছাড়া কম নয়। ঘুরে ঘুরে বিক্রয়-কর আদায়ের কাজ। শুধু আদায় নয়। হিসাব রাখতে হবে ঠিক মতো, তারপর নিয়মিত টাকা জমা দিতে হবে। একবার সামান্য কিছু টাকা জমা দিতে দেরি হওয়ায় সার্ভেন্টিসের জেল হলো। অনেকবার তাকে জেলে যেতে হয়েছে তুচ্ছ কারণে। সেসব ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এখন পাওয়া যায় না। মফস্বলের জেলে ট্যাক্স দারোগার মতো সামান্য এক কর্মচারীর খবর রাখবার আগ্রহ কারও ছিল না।
অনেকদিন কারাবাসের ফলে একটা লাভ হয়েছিল। সময় কাটাবার জন্য সার্ভেন্টিস লিখতে আরম্ভ করলেন। কবিতা নয়, নাটক নয়, উপন্যাস। তবে লা গ্যালাটিয়ার মতো নয়। সম্পূর্ণ আলাদা জাতের। একেবারে অনন্য। আট-নয় বছরের অজ্ঞাত জীবনের যবনিকা যখন উঠল তখন, ১৬০৩ সালে, সার্ভেন্টিস মাদ্রিদে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তার সঙ্গে ডন কুইকজোটের বিরাট পাণ্ডুলিপি। প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।
১৬০৫ সালে জানুয়ারি মাসে “অ্যাডভেঞ্চার অব দি ইনজিনিয়াস নাইট ডন কুইকজোট দ্য লা মাঞ্চা” প্রকাশিত হলো। প্রকাশক কিছু টাকা দিয়ে স্বত্ব কিনে নিয়েছে। যদিও ছাপাবার পূর্বেই বিভিন্ন সাহিত্যিক আড্ডায় এ বইয়ের কিছু কিছু অংশ পাঠ করায় লোকের মুখে মুখে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল, তবু প্রকাশক এত বড় বই প্রকাশের ঝুঁকি নিতে প্রথমে রাজি হয়নি। কপি রাইট লিখে দিয়ে তাকে সম্মত করাতে হয়েছে।
সামান্য কয়েকটি টাকা পাওয়াতেই ছেলেমানুষের মতো খুশি। মা-বাবার মৃত্যু হয়েছে। শুধু দু’বোন আছে। এই ক’টা টাকা হাতে নিয়ে যে তাদের সামানে দাঁড়াতে পারবেন তাতেই আনন্দ!
বই খুব বিক্রি হচ্ছে। কয়েক মাসের মধ্যে ছাপা হলো নতুন সংস্করণ। লোকের মুখে মুখে ডন কুইজোটের নাম। এই সাফল্যে কিন্তু সার্ভেন্টিস পুরোপুরি তৃপ্ত নন। আশা ছিল রাজসভায় ডাক পড়বে, রাজকবির সম্মান তাকে দেওয়া হবে জাতীয় উৎসবে। কিছুই হলো না। রাজসভায়, কিন্তু জনসাধারণের ঘরে ঘরে পেলেন তিনি রাজসম্মান। শুধু রাজানুগ্রহ পেলে, যেমন পেয়েছিলেন লোপ দ্য ভেগা আজ তাকে কেন মনে রাখত? তবু লোভী ছেলের মতো নগদ পাওনার জন্য ছিল তার আকাঙ্ক্ষা। তাই ডন কুইকজোটের লেখকও কবিতা প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছিলেন পুরস্কারের লোভে। এই প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন তার পুরাতন প্রতিদ্বন্দী লোপ দ্য ভেগা। অনুকম্পা করে দ্য ভেগা পুরস্কার ‘সার্ভেন্টিসকেই দিয়েছিলেন।
সরকারের কাছ থেকে সম্মান পাননি। পেলেন চরম অপমান। ডন কুইকজোট বের হবার মাস ছয়েক পরের ঘটনা। সন্ধ্যার পর সার্ভেন্টিসের বাড়ির দরজায় এক যুবক (আততায়ীর) হাতে সাংঘাতিক রূপে আহত হলো। সার্ভেন্টিস তাকে ঘরে এনে পরিচর্যার ব্যবস্থা করলেন কিন্তু বাঁচল না সে। এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এক ষড়যন্ত্র দেখা দিল। এর ফলে সার্ভেন্টিস এবং তার দুই বোন কারারুদ্ধ হলেন। মানুষ হত্যার অভিযোগে পুলিশ তাদের বাড়ি থেকে জেল পর্যন্ত শহরের রাস্তা দিয়ে কৌতূহলী জনতার চোখের উপর দিয়ে নিয়ে গেল। কেউ বাধা দিল না। এগিয়ে এসে বলল না, ডন কুইকজোটের লেখক কখনো এমন কাজ করতে পারে না।
আর অর্থ পাননি সার্ভেন্টিস ডন কুইকজোটের লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হলেও। বোন মাগদালানের মৃত্যু হলো। কবর দেবার জন্য যে টাকার দরকার তা ছিল না সার্ভেন্টিসের। মঠের সন্ন্যাসিনীরা চাঁদা তুলে টাকার ব্যবস্থা করেছিল।
দেশে যোগ্য স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু তার বইয়ের মধ্যেই ফরাসি, জার্মান, ইতালিয়ান, প্রভৃতি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। ইংরেজিতে আরম্ভ হয়ে তর্জমা। অনুমতিহীন চোরাই সংস্করণও হয়েছে কয়েকটি। কিন্তু লেখকের কোনো লাভ নেই। কপি রাইট বিক্রি করে দিতে হয়েছে!
তবে রয়েলটির পরিমাণ দিয়ে তো বাইয়ের বিচার হয় না। ডন কুইকজোট লেখককে টাকা দেননি, দিয়েছে অবিস্মরণীয় খ্যাতি। আধুনিক যুগের এটি প্রথম উপন্যাস এবং সর্বাধিক পঠিত উপন্যাস। বালক-বৃদ্ধ সকলের নিকট সমান প্রিয়। বালক হেনরিক হাইনে ডন কুইকজোটের দুঃখে কেঁদেছিল। যুগের পরিবর্তন ঘটেছে কিন্তু ডন কুইকজোটের সমাদর কমেনি। সমসাময়িক স্পেনের জীবনযাত্রার মিছিল। সমাজের সকল স্তরের কত বিচিত্র নরনারীর ভিড়। সেই সমসাময়িকতার বহু ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেছে ডন কুইকজোট। মধ্যযুগীয় নাইটদের শিভালোরি প্রতীকে বিদ্রূপ করবার জন্যই সার্ভেন্টিস কলম ধরেছিলেন, সন্দেহ নেই। কিন্তু কাহিনী অগ্রসর হবার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রূপ কোমল হয়ে এসেছে। কৌতুক ও পরিহাস এবং মমত্ববোধে ডন কুইকজোটের অ্যাডভেঞ্চারের বিবরণ উজ্জ্বল। সার্ভেন্টিস সারা জীবন কত অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছেন। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে রচিত এই মহৎ উপন্যাসে সেই অভিজ্ঞতার তিক্ততা এতটুকু ছায়া ফেলতে পারেননি। তার জীবনের সকল আকাঙ্ক্ষার নায়ক কুইকজোট। তিনি রাজানুগ্রহ পাননি, নারীর প্রেম পাননি, অর্থভাগ্য তার ছিল না, দেশের লোকের কাছ থেকে লেখক হিসাবে যথাযোগ্য মর্যাদা পাননি জীবিতকালে। এই সব অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা জয় করবার জন্য অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছে মাঞ্চা গ্রামের নাইট ডন কুইকজোট। নাইটের সহকারী সাঙ্কো পাঞ্চার স্বপ্নবিলাস নেই, তার আছে রূঢ় বাস্তববুদ্ধি। এই দুজনেই মিলে জীবনের পূর্ণরূপ-স্বপ্ন আর বাস্তব। বাস্তবের আঘাতে স্বপ্ন যখন ভেঙ্গে গেল, তখনই এলো ডন কুইকজোটের মৃত্যু। একি শুধু সার্ভেন্টিস এবং কুইকজোটের কথা? না, এটা আমাদের সকলের কথা। এই পৃথিবীতে আমরা সবাই স্বপ্নের হাতে বন্দি। মুক্তি বাস্তবে জেগে ওঠার আঘাতে মৃত্যু হয় আমাদের।
সার্ভেন্টস তার পাঠকদের উদ্দেশ্য করে কয়েকবার বলেছেন, “খোদা তোমাদের সুখ দিন, আমি তার কাছে চাই দুঃখ সইবার শক্তি”। শেষ জীবনে সুখ চাইবার মতো সাহস তার আর ছিল না। সহ্য করবার শক্তি আছে কিনা সে পরীক্ষা শিগগিরই দিতে হলো তাকে।
দেশে লেখক হিসাবে সার্ভেন্টিস তেমন স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু বিদেশি পাঠকদের হৃদয়ে স্থান লাভ করেছেন এর মধ্যেই। ডন কুইকজোটের দ্বিতীয় খণ্ড তখনও বের হয়নি। ফ্রান্স থেকে দূত এসেছেন সরকারি কাজে। দূত তার প্রিয় লেখক সার্ভেন্টিসের খবর জানতে চাইলেন। লা গ্যালাটিয়া ও ডন কুইকজোটের অনেক পৃষ্ঠা তার মুখস্ত। শুধু তার নয়, ফ্রান্সের অনেকের। মাদ্রিদ যখন এসেছেন, দেখা করে যেতে হবে প্রিয় লেখকের সঙ্গে। রাজকর্মচারীরা নিবৃত্ত করতে চাইল। বুড়ো-হাবড়া মানুষ, দরিদ্র, বাড়ি গেলে বসতে দেবার মতো জায়গা নেই, বিদেশি রাজদূতের সেখানে যাবার দরকার নেই। কিন্তু দূত শুনলেন না তাদের কথা। স্পেনের শ্রেষ্ঠ লেখককে শ্রদ্ধা জানাতে একদিন গিয়ে উপস্থিত হলেন সার্ভেন্টিসের নিরলঙ্কার ছোট ঘরে। জীবিতকালে এই একবার তিনি আন্তরিক শ্রদ্ধার অর্ঘ্য পেয়ে গেলেন।
দূত যখন ঘরে প্রবেশ করলেন তখন সার্ভেন্টিস মাথা নিচু করে লিখছিলেন। লিখে টাকা না পেলে খাওয়া চলবে না। বৃদ্ধ বয়সেও অনিশ্চয়তার প্রাত্যহিক যন্ত্রণা। দূত শুনে বললেন, দারিদ্র্যের জন্যই যদি আপনাকে লিখতে হয় তাহলে খোদার নিকট প্রার্থনা করব তিনি যেন আপনাকে কখনো ধনী না করেন। আপনার দারিদ্র্যে বিশ্ব-সাহিত্যের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হোক।
ডন কুইকজোটের কাহিনী যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন, মধ্যযুগের নাইটদের গল্প পড়ে পড়ে সেসব গল্পের খুঁটিনাটি মিগেলের ঠোঁটস্থ হয় গিয়েছিল। নিজেকে শেষ পর্যন্ত একজন নাইট ভাবতেই শুরু করেন তিনি এবং মধ্যযুগের নাইটদের মতো তাঁর আশেপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তার ভার তিনি নিজেই নেবেন বলে ঠিক করে ফেলেন। নাইটদের যুগ যে শেষ হয়ে গেছে এই কথাটা তাঁর মাথা থেকে চলে যায়। মনে হয়, চারপাশের শান্তি-শৃঙ্খলা যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার কারণ নাইটদের স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে গেছে বলেই। কাজেই নিজের নাম আলোনজো কুইকজোনা পালটে রাখেন ডন কুইকজোট, কুইকজোট নামটা তাঁর বেশ পচ্ছন্দ। আর সম্ভ্রান্ত বংশের নাম ‘ডন’ না থাকলে তো মানায় না। তিনি যে হাড় জিরজিরে ঘোড়াটা চরে বেড়ান তার নাম দেন রোজিনান্তে, মানে হলো, আগেকার ভারবাহী পশু। সাজে যাই হোক, শুনতে ভালো। দুঃসাহসিক কাজে ওই ঘোড়াই হবে উপযুক্ত। আর নিজের নামের সঙ্গে গল দেশের নাইটদের মতো নিজের দেশের নামটাও জুড়ে দিয়ে করলেন ডন কুইকজোট -লা- মাংচা। নিজের নাম পালটালেন। ঘোড়ার নাম দিলেন। এবার নাইটদের মতো একটি প্রেমিকাও চাই। তাই পাশের গ্রামের একটি হৃষ্টপুষ্ট মেয়েকে দেখে খুশি হয়ে নাম দিলেন দালসিনিয়া-দেল-তোরাসো। তোরোসোর অধিবাসিনী দালসিনিয়া। প্ৰথম শ্রেণীর অভিজাত এক মহিলার নাম বলে মনে হয় তাঁর। মেয়েটির সঙ্গে তাঁর পরিচয়ই ছিল না। কিন্তু তাতে কী আসে যায়। বাড়ির বনেদি পোশাকগুলো পরে নিলেন। গায়ের বর্ম, হাত-পায়ের কভারগুলোর অবস্থা ভালোই ছিল (পূর্বপুরুষদের কেউ সৈনিক কিংবা ডাকাত ছিলেন)। কিন্তু যাকে বলে শিরস্ত্রাণ তার মুখের দিকটা ভাঙা ছিল। ডন সেই ফাঁকটা পিজবোর্ড দিয়ে ঢেকে দিলেন। পেজবোর্ডের রংটা কালো করে দিলেন, যাতে লোহার ঢাকনা বলে মনে হয় তারপর বেরিয়ে পড়লেন দিগ্বজয়ে।
কিন্তু নাইটদের অভিষেক হয় নাইটদের হাতে, মন্ত্র পড়ে। একটি সরাইখানায় গিয়ে মালিককে দিয়ে কাজটা সেরে নিলেন। সরাইখানাটি মধ্যযুগের দুর্গ, আর সরাইখানার মালিক যে দুর্গের অধিপতি এটা তিনি মালিককে বুঝিয়ে দিলেন। মালিক চালাক লোক, বুঝেছিল, খ্যাপাটে আধড়ো লোকটার ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ করলে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে তাড়াতাড়ি। যাই হোক অভিষিক্ত হয়ে প্রথম অভিযানে একদল বণিকদের সামনে ঘোড়া ছুটিয়ে বর্শা উঁচিয়ে যখন বীরত্ব দেখাচ্ছেন তখন বণিকরা মজা পাচ্ছিল। কিন্তু বণিকদের গোয়ার চাকরটি হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে কুইকজোটকে মারধোর করে ফেলে দিয়ে চলে যায়। একটু সুস্থ হলে পরের অভিযানে তাঁর সঙ্গী হলো এক চাষি। নাইটদের অনুচর থাকে। এক গরিব ভালো মানুষ চাষি-সাংকো পাজা হলো তার অনুচর। প্রথমটা সে মাইনে চেয়েছিল। ডন তাকে একটা পুরো দ্বীপের জমিদারি দেবার লোভ দেখিয়ে সঙ্গী করেছিলেন।
তারপর সারাজীবন অভিযানে সাংকোকে নিয়ে ডন লড়াই করে গেছেন বিপদ- আপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্যে। বার বার হেরেছেন, ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। কিন্তু দমেননি কখনো। কিন্তু তাঁর দুর্দশা বুঝে অবশেষে এক হিতৈষী প্রতিবেশী নাইট সেজে এসে দ্বন্দ্বযুদ্ধে ডনকে পরাস্ত করে তাঁকে দিয়ে বলিয়ে নেয়, তাঁকে গ্রামে ফিরতে হবে। প্রকৃত নাইটদের মতোই ডন কথা রাখলেন। সাংকোকে নিয়ে নিজের গ্রামে ফিরলেন। ভাবলেন, অনেক হয়েছে। এবার ভেড়া চরাবেন দুজনে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়লেন কুইকজোট। পাদরি ও অন্যান্যদের সামনে স্বীকার করলেন, নাইটদের সম্পর্কে বই পড়ে তাঁর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। খোদাকে ধন্যবাদ, তিনি তাঁর বোধশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।
পাদরির কাছে স্বীকারোক্তি করে তিনি উইল করে সাংকোকে বেশ কিছু অর্থ দিলেন। আর একটি মাত্র ভাগ্নীকে সম্পত্তি দিয়ে গেলেন। কিন্তু শর্ত ছিল, ভাগ্নী এমন লোককে বিয়ে করবে যে জীবনে নাইটদের সম্পর্কে বই পড়েনি। না মানলে সে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে।
বিশাল কাহিনীর এই ছোট্ট গল্পসূত্র থেকে ডনের চরিত্রের প্রতীকি তাৎপর্য হয়তো সবটা স্পষ্ট হবে না। কিন্তু এটা তো ঠিক, কুইকজোট এই শব্দটি ইংরেজিতে তো বটেই, ইউরোপের সব প্রধান ভাষাতেই প্রবেশ করে গেছে। বিশেষত প্রবেশ করেছে এই শব্দটির বিশ্লেষণ : quixotic। ডনের কল্পনাশক্তি ও তাঁর আচার-আচরণ, সংসারের সমস্তরকম অন্যায় দূর করার সৎ সংকল্প, বিপদের ঝুঁকি নিয়ে পরোপকারে ঝাঁপিয়ে পড়া, ব্যর্থ হয়েও অনমনীয় দৃঢ়তায় নিজের আদর্শ বজায় রাখার অবস্থান চেষ্টা ইত্যাদি সব দেশের প্রায় সব বয়সের মানুষকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তিনি প্রবল কল্পনা শক্তির বলে বিপদ ডেকে আনতেন। বিপদ না এলেও বিপদ এসেছে বলে ধরে নিতেন তিনি, এবং তাতেই গণ্ডগোলে পড়ে যেতেন। তাঁর মুখে চোখে একটু বিষণ্ণতা লেগেই থাকত। সেটা হয়তো স্বপ্ন ভঙ্গের বিষণ্ণতা। কিন্তু যতদিন শারীরিকভাবে সক্ষম ছিলেন ততদিনই তিনি আদর্শের জন্যে লড়াই করে গেছেন। তাঁর আচার-আচরণে কাণ্ডজ্ঞানহীনতার যত প্রমাণই থাক, পরিস্থিতি যতই কৌতুকময় হয়ে উঠুক, তাঁর অক্ষুণ্ণ সততার জন্যেই চিরকাল তিনি পাঠকের সহানুভূতি পেয়ে গেছেন। এমনই একটি রোমান্টিক নায়ক হয়ে গেছেন তিনি যিনি কল্পনাশক্তিতে যে বিপদ ঘটেনি তাকে বাস্তব বলে মেনে নেন এবং তা দূর করার জন্যে সম্ভব-অসম্ভব চিন্তা না করে উঠে-পড়ে লাগেন। তাই ‘কুইকজোটের মতো’ অর্থাৎ quixotic শব্দটি বহু প্রধান ভাষাতেই প্রবাদের মতো প্রয়োগ করা হয়।
সার্ভেন্টিস ডন কুইকজোটের কাহিনীর মধ্যে দেদার মজা ও কল্প-কথার আয়োজন করেছেন; ফলে বিভিন্ন ধরনের পাঠকের রুচি ও চাহিদার যোগান দিতে পারে এই বই। দিয়ে যাচ্ছেও শতাব্দীর পরে শতাব্দী ধরে। তবে মানুষের সব চাহিদা তো বাইরের নয়, সত্তার গভীরেও জাগে কত নিগূঢ় তৃষ্ণা। কালে-কালান্তরে যে-বই বহু প্রজন্ম ধরে পাঠকদের আকর্ষণ করে চলেছে, তার কাছে দাবিরও বুঝি শেষ নেই। ফলে বাহির ও ভেতরের সংজ্ঞাতেও ঘটে গেছে কত পরিবর্তন, যাদের নিরিখে তাৎপর্য নির্ণয়ের পদ্ধতিও অনবরত বদলে গেছে।
ডন কুইকজোট ও সানচো পানসার সঙ্গে আমরাও কি অভিযাত্রী হতে পারি না; নিশ্চয় পারি। তবে তাতে মধ্যযুগীয় পশ্চিম ইউরোপের পরিবেশ হয়তো আমাদের সাহচর্য দেবে না। এর পরিবর্তে আমাদের সাংস্কৃতিক ভূগোলের অনুপুঙ্খ দিয়ে তৈরি করে নিতে হবে। পরিবেশের এই রূপান্তর মানে চেতনারও রূপান্তর; অবস্থান ও বীক্ষণ পদ্ধতিরও পরিবর্তন। কল্পনা ও বাস্তবের নতুন দ্বিবাচনিকতায় আমরা যে ধরনের প্রকল্পনায় আশ্রয় নিতে পারি, তাতে পনেরো শতক বা তার আগেকার রোমাঞ্চকর পৃথিবীকে হয়তো খুঁজে পাব না। কিন্তু সম্ভ্রম-বিশ্রম-আকাঙ্ক্ষা-শ্লেষগর্ভ জগৎ নির্মাণের জন্যও আমাদের মূলত নিজস্ব যৌথ নিশ্চেতনার উপর নির্ভর করতে হবে। অর্থাৎ ডন কুইকজোট ও সানচো পানসার অভিযাত্রার নিষ্কর্য থেকেই পুনর্নির্মাণের যাবতীয় উপকরণ সংগ্রহ করে নিতে হবে আমাদের। কাহিনীর সমস্ত অনুপুঙ্খভাবে নিশ্চয়ই আমাদের সময়ে ও পরিসরে পুনর্বিন্যস্ত করে নেওয়া সম্ভব নয়। সম্ভবত তার প্রয়োজনও নেই। বরং টমাস মান বা ফ্রানৎস কাফকা যেভাবে ডন কুইকজোট অভিযাত্রায় নিজস্ব ধরনে সঙ্গী হয়েছিলেন, আমরাও তা অনুসরণ করতে পারি এবং নিজেদের বহুমাত্রিক অবস্থান অনুযায়ী নিজস্ব কিছু জিজ্ঞাসা ও তাদের সম্ভাব্য সমাধানে পৌঁছাতে পারি।
ডন কুইকজোটের পুনঃপাঠ মানে তাই কার্যত পুনর্লিখন। বিখ্যাত দার্শনিক মিগুয়েল দ্য উনামুনো তাই ডন কুইকজোটের আখ্যানে লক্ষ করেছেন উন্মাদনার অভিব্যক্তি। দীর্ঘ বিশ্লেষণে উনামুনো দেখিয়েছেন যে সার্ভেন্টিস তাঁর কাহিনীর বিভিন্ন চরিত্রগুলিকে হয়তোবা প্রতীকায়িত করতে চাননি; কিন্তু পাঠকেরা এদের মধ্যে নিজস্ব প্রত্যয় ও অনুভব অনুযায়ী প্রতীক নিশ্চয় খুঁজে নিতে পারেন। কেউ কেউ এমনও ভাবতে পারেন যে কুইকজোট ও পানসা আলস্য-মন্থর আমোদ-প্রমোদের জীবনকেই মহিমান্বিত করেছে। কিন্তু তা প্রকৃতপক্ষে কাহিনীর বহির্ভূত স্তর মাত্র। মধ্যযুগের পরিবেশে আমোদ-প্রমোদ কিংবা শৌর্য-আবেগ ইত্যাদির নায়কোচিত অভিব্যক্তি যেভাবে স্বতশ্চলভাবে স্বীকৃত হতো, সেই পরিপ্রেক্ষিতকে মান্যতা দিয়েও লেখক নিশ্চয় সেই গণ্ডিকে পেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন। নইলে পরবর্তী প্রজন্মগুলিতে সৃষ্টিশীল লেখকও দার্শনিকেরা নতুন নতুন অর্থের খোঁজে বেরিয়ে পড়তেন না। উনামুনোর নিম্নোক্ত মন্তব্য এই নিরিখেই আমাদের অভিনিবেশ আকর্ষণ করে : “The passion to survive stifled in Don Quixote the enjoyment of life, a capacity for enjoyment that is characteristic of Sancho. Sancho’s wisdom was the result of his holding on the this life and this world in the measure that he could personally enjoy them, and the Sancho Panzesque heroismÑfor Panza is heroic consisted in his following a madman, being himself sound of mind, an action more filled with faith than that of a madman following his own madness. Great was Don Quixot’s madness, and it was great because the root from which it grew was great: the inextinguishable longing to survive a source of the most extravagant follies as well as of most heroic acts.”
বেঁচে থাকার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা কি আমাদের জীবন উপভোগের ক্ষমতাকে অনেকটা দুর্বল করে দেয়? পার্থিব জীবনের প্রতি নিবিড় সংলগ্নতা বোধই যদি সানচোর জ্ঞান ও বীরত্বের উৎস হয়ে থাকে, সাধারণ মানুষের পরিধি-বহির্ভূত কুইকজোটকে বিশ্বস্তভাবে অনুসরণ করে যাওয়ার মধ্যে কোনো সংকেত দ্যোতিত হচ্ছে? এই জিজ্ঞাসা সম্ভবত মধ্যযুগে উত্থাপিত হতে পারত না কিন্তু সাম্প্রতিককালে উত্থাপিত হয়েও কি তার সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান হয়েছে? ডন কুইকজোটের মধ্যে বেঁচে থাকার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা কখনও নির্বাপিত হয়নি। আকাঙ্ক্ষার এই অতিরেকই কি তাকে বিপুল উন্মাদনার দিকে সঞ্চালিত করেছে? আপাতদৃষ্টিতে সামন্তযুগের নায়কের মতো শৌর্যসূচক সক্রিয়তা দেখিয়েও কেন সে উৎকট নির্বোধ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়? এর কি তবে প্রসঙ্গাতিযায়ী তাৎপর্য রয়েছে কিছু? উনামুনোর বিশ্লেষণ থেকেই এইসব প্রশ্ন আমাদের মনে জাগে এবং ফলে সার্ভেন্টিসের গ্রন্থপাঠও বার বার বাচনের উদ্বৃত্তের দিকে ঝুঁকে পড়ে। জীবন যখন অপরিমেয়ভাবে জটিল হয়ে পড়েছে, আমরাও তো সমসাময়িক পৃথিবীতে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের বিচিত্র মিছিল দেখতে পাই। উনামুনোর দেওয়া সংকেত অনুযায়ী এদের প্রধানত দুটি বর্গে বিন্যস্ত করা যায় : যাদের নিজেদের ওপর বিশ্বাস আছে এবং যাদের একেবারেই আত্মবিশ্বাস নেই। আত্মপ্রত্যয়ের অভাব থাকলেই দুষ্কর্ম করেও ‘খ্যাতি’ অর্জনের তৃষ্ণা দুর্বার হয়ে ওঠে। এতে বিঘ্ন তৈরি হলেই হতাশা-ক্লিষ্ট অপব্যক্তিত্ব তৈরি হয়।
কিন্তু এই যুক্তিশৃঙ্খলা অনুযায়ী কুইকজোট কি পুড়ুয়ার মনে নিছক আক্ষেপ জাগিয়ে দেয় শুধু? কিংবা, চূড়ান্ত হাস্যকর ছদ্ম-শৌর্যের প্রতিনিধি হওয়া ছাড়া অন্য কোনো সার্থকতা নেই তার : এমনও কি ভাবতে পারি। এ ধরনের একদেশদর্শী ভাবনাকে প্রশ্রয় না দিয়ে বরং উনামুনোর মতো বিবেচনা করতে পারি যে ‘powerful expression of the rootÑquality of Quixotism’ at ‘absurd anxiety for eternal renown.’ যশের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আসে অমরতার তৃষ্ণা যা প্রতাপের চূড়ো হয়ে ওঠার লোলুপতায় সম্পৃক্ত হলে জন্ম নেয় ফাউস্ট। মেফিস্টোফেলিসের কাছে আত্মবিক্রয়ের চেয়ে সানচো পানসার দ্বারা সঞ্চালিত হওয়া নিশ্চয় কাম্য। তাহলে কি ফাউস্টের বিপরীত মেরুতে ডন কুইকজোট ভাবা যেতে পারে? হোরেশিও তো হ্যামলেটের নিঃসঙ্গতা দূর করতে পারে নি; ফলস্টাফের মতো জ্ঞানী বা প্রস্পেরোর মতো ঐন্দ্রজালিকের পরিণতিতে ও সাহচর্যের ভূমিকা ছিল না কোনো। কিন্তু ডন কুইকজোটের জন্যে ছিল সানচো পানসার বহুমাত্রিক সংলগ্নতা। সার্ভেন্টিস স্পেনীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অতলান্ত সঞ্চয়কে মন্থন করে নিজের প্রতিকল্প সত্তা কুইকজোটকে সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর প্রতিবেদনের উপসংহারে তাই নিজের কলমকে সম্বোধন করে লিখেছিলেন সার্ভেন্টিস : Here you shall rest hanging from the rack by this bit of copper wire whether wellÑor illÑcut, my goose quill, I do not know. And there you shall stay for long centuries… For me alone was Don Quixote born, and I for him; he knew how to act, and I to write.’ আপন চেতনার অবগাহন করে শুধু কি আপন সত্তার প্রতিকল্প নির্মাণ করেছিলেন তিনি? বাকি এর মধ্যে নিহিত ছিল গভীরতর তাৎপর্য!
স্পেনীয় যৌথ নিশ্চেতনা ও বিশ্ববীক্ষার স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে সংবেদনশীল দার্শনিক উনামুনো তাই ভেবেছেন দুরূহ জীবন-পথে কঠোর সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে এগিয়ে স্পেনীয়রা অস্তিত্বের রুদ্রভীষণ রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই তাদের ভাবনায় মৃত্যুৰোধ ও বিনাশের শঙ্কা বিশেষভাবে সক্রিয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তাঁরা জীবন সম্পর্কে নিস্পৃহ। বরং ঠিক তার উল্টো।
উনামুনো মনে করেন, স্পেনীয়রা জীবনের প্রতি নিবিড় সংলগ্নতা বোধ করেন ‘Precisely because it is hard on him, and that from his intense attachment to life springs what we call his cult of death. Our love of life is so great that we want it to last for ever, without end, and we cannot resign ourselves to losing it so that the hope of living on, or the fear of not surviving stifles in us the enjoyment of life, that joie de vivreÑÑ which so thoroughly characterizes the French’.
এই কেন্দ্রনীয় উপলব্ধির উদ্দীপনায় সার্ভেন্টিস হয়ে ওঠেন ডন কুইকজোট কেনানা তিনিও চাইছিলেন, তাঁর নাম ও খ্যাতি চিরজীবী হোক। বলা যেতে পারে, ‘He is Cervantes in the measure that the latter was a man of his time and people, he is the Spanish soul incarnated in Cervantes. And in this soul he represents the longing to leqave behind a name. This longing to leave behind eternal name and fame is no more than one form of the thirst for immortality that animates all those who are in love with life’.
এই যুক্তিশৃঙ্খলা অনুযায়ী জীবনকে প্রগাঢ় ভালোবেসেই কায়িক অবসানের পরেও জীবনের বিস্তার চায় অনুভবপরায়ণ মানুষ। এরই অন্য নাম অমরতার তৃষ্ণা।
প্রতিটি প্রজন্ম নিজস্ব পুনঃপাঠের মধ্য দিয়ে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে: সার্ভেন্টিস ও তার অনন্য সৃষ্টি অনতিক্রম্য। আখ্যানের তুমুল বিনির্মাণ যখন ঘটে চলেছে, তখনও কাহিনী-প্রধান একটি রম্যন্যাস সম্পর্কে কেন এত বিস্ময়? শুধু পাঠক-সমালোচকদের কথা লিখছি না; হোর্হে লুই বোর্হেস ও কার্লোস ফুয়েন্তেসের মতো ব্যতিক্রমী লিখিয়েরাও ডন কুইকজোটের বয়ানে লক্ষ করেছেন বিরল অন্তর্দীপ্তি কিংবা বহির্বাস্তবের অন্তরালে প্রচ্ছন্ন অন্তর্বাস্তব। যথাপ্রাপ্ত জগৎ ও ঘটনা-সংস্থানকে কত বিচিত্রভাবে উপস্থাপিত করা যায় এবং তাদের মধ্যে আবহকালের সম্ভাব্য পাঠকদের জন্যে সঞ্চিত রাখা যায় কত ধরনের উদভাসন-এইসব ভাষ্য-ভাষ্যান্তরে তার আভাস পাই। বিশ্বসাহিত্যের বেশ কিছু অমর চরিত্রের সঙ্গে তুলনা-প্রতিতুলনার পরেও যেন ডন কুইকজোট আর স্যাঙ্কো পাঞ্জার থই পাওয়া যায় না। মনে-মনে ভাবি এই কুইকজোট কে? কে এই স্যাঙ্কো! প্রতিবেদনের ভেতর থেকে ডনের জবাব ভেসে আসে : ‘I know who I am, and who I may be, if I choose; not only thos I have mentioned but all the Twelve peers of France and the Nine Worthies as well; for the exploits of all of them together or separately, cannot compare with mine. বিশ্বসাহিত্যের যেসব চরিত্র অমরতার শিরোপা অর্জন করেছে, সচেতনভাবে মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার জন্যে তাদের মধ্যে ক’জন চেষ্টা করেছিল? ডন কুইকজোট কিন্তু জীবনাতিযায়ী জীবন চেয়েছিল এবং ভেবেছিল, ‘আমি যা হতে চাই তা-ই আমি হাতে পারি; আমি তো জানি আমি কী?’ তাহলে তার কি আত্ম-অভিজ্ঞান নির্ণয়ের সমস্যা ছিল না কোনো। সামন্ততান্ত্রিক স্পেনীয় আবহের নির্যাস আত্মীকরণ করেও যে সুদূর ভবিষ্যতের বীক্ষণপ্রণালীর পক্ষে প্রাসঙ্গিক থাকতে পারল কুইকজোটের অভিজ্ঞান-নির্মাণ, এর চেয়ে আশ্চর্যের কথা কী আছে আর।
তবু ডনকে আমরা কখনও সানচোকে ছাড়া ভাবতেই পারি না। তাদের সাহচর্য যেমন চিহ্নায়িত, তেমনই আলাদা আলাদাভাবে দু’জনই প্রতীকী অস্তিত্ব। অবশ্য সেই সঙ্গে স্পেনীয় সময় ও পরিসর মন্থন-জাত বাস্তবের ওরা প্রতিনিধি এবং বাস্তবাতিযায়ী সমান্তরাল বাস্তবের নির্মাতাও। তাছাড়া বিশ্বসাহিত্যে ডন-স্যাঙ্কের যুগ্মক আসলে পরবর্তী অজস্র যুগলবন্দি-অস্তিত্বের উৎসভূমি। শুধু সাহিত্যই নয়, জনপ্রিয় লঘু আখ্যানসহ জনসংস্কৃতির নানা অভিব্যক্তিতে এই যুগ্ম-প্রকল্পের অন্তর্বর্তী আততি- ইচ্ছাপূরণ-বৈপরীত্যসহ নানা ধূপছায়া লক্ষ করা যায়। জাদুকর ম্যানড্রেক-বলশালী লোথার কিংবা মজাদার লরেল-হার্ডি হোক অথবা আমাদের বাংলা সাহিত্যে গোরা- বিনয় বা নিখিলেশ-সন্দীপ বা শচীশ-শ্রীবিলাস হোক, ডন-সানচোর যুগলবন্দির দূরবর্তী প্রচ্ছায়া বুঝিবা আখ্যানকারদের যৌথ নিশ্চেতনায় ভাবনার বীজগুলি হিসেবে সক্রিয়। সার্ভেন্টিস এদের কেবল পরস্পরের পরিপূরক ভাবেননি; কেননা এদের সত্তা নিছক অন্যান্য সম্পৃক্ত নয়, অন্যোন্য-নিবিষ্টও। তাছাড়া, আগেই লক্ষ করেছি, কথাকার খেলাচ্ছলে নিজেকে বিভাজিত করে নিয়েছেন এবং এই বিভাজনকে বহুরৈখিক করে নিয়ে নির্মিত সমালোচকের মতো উত্তরসূরি কথাকারেরাও ডন ও স্যাঙ্কোর মধ্যে একজনের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছেন। কোনো কোনো সাহিত্যিক আবার পছন্দসই চরিত্রের মধ্যে ঐ যুগ্মককে একীভূত করে নিয়েছেন।
বিখ্যাত সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম চমৎকার মন্তব্য করেছেন : ‘Perhaps the Don was the writer in Cervantes and Sancho the reader in Cervantes; perhaps they are the writer and the reader in each of us. এই নিরিখে ভাবা যায় যে যথাপ্রাপ্ত বাস্তবকে অগ্রাহ্য না করেও আমরা যখন তা পেরিয়ে যেতে চাই, যুগ্মকের ঐ মৌল আদিকল্প থেকে প্রেরণা ও পদ্ধতি বিচ্ছুরিত হতে থাকে যেন। আবার ওদের বিচিত্র কার্যকলাপে যে কার্নিভালের সমারোহ ব্যক্ত হয়, তা-ই সম্ভবত উত্তরসূরি রাবেলেকেও আখ্যানের লোকায়ত চালনকে বিশেষ তাৎপর্য দিতে প্রেরণা দিয়েছিল। কুইকজোট মৃত্যুর পরেও যে স্যাঙ্কোর ভূমিকা ফুরিয়ে যায় না, এতে বেশ কিছু পাঠকই তাকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বস্তুত সার্ভেন্টিস তো শুধুমাত্র ডনের কীর্তিকলাপ বিবৃত করেন নি, তা একই সঙ্গে সানচো পানসার চিত্তাকর্ষক কার্যকলাপও বিশদ করেছে। এইজন্যে ফ্রানৎস কাফকার মতো সংবেদশীল কথাকারও তাঁর একটি বিখ্যান প্যারাবলে ‘সানচো পানসার সত্য’ শিরোনামে লিখেছেন : ‘without making any boast of it Sancho Panza succeeded in the course of years, by devouring a great number of romances of chivalry an adventure in the evening and night hours, in so diverting from him is demon, whom he later called Don Quixote, that his demon there upon set out in perfect freedom on the maddest exploits, which, however, for the lack of a preordained object, which sould have been Sancho Panza himself, harm nobody. A freeman, Sancho Panza pholosophically followed Don Quixote on his crusades, perhaps out of a sense of responsibility, and had of them a great and edifying entertainmnt to the end of his days. ‘
সত্যিই তো, ডনের প্রাণপ্রাবল্য যাতে জগৎ-বিধি বা পার্থিবতার প্রবাহকে বিঘ্নিত করতে না পারে, সেইজন্যেই স্যাঙ্কোর উপস্থিতি। সামঞ্জস্য বিধানের এই প্রক্রিয়াতেই প্রশমিত হয় সম্ভাব অতিরেকের শঙ্কা। আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের যৌথ চর্যায় এই সত্যের নিরন্তর বিচ্ছুরণ লক্ষ করা যায়। বিনোদনের আয়োজনকে কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ না-করে সার্ভেন্টিস যে দার্শনিক অন্তঃসারের উদভাসনও উপস্থাপিত করেছেন, তা তাঁর ম্যাগনাম ওপাসকে বহুস্বরিক করে তুলেছে। তাঁর রচনার মহত্ত্ব সম্পর্কে তিনি নিজে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন; তবে এই আক্ষেপও ছিল যে প্রাপ্য মর্যাদা তিনি পুরোপুরি পাননি। সার্ভেন্টিস তাঁর ‘Journey to Parnassus’-এ লিখেছেন ( ১৬১৩ সালে) ‘I have given in Don Quixote, to assuage the melancholy and the moping breast, Pastime for every mood, in every age, I’ve in my Novels opened, for the rest A way whereby the language of castitle May season fiction with becoming zest; I’m he sho soareth, in creative skill, Bove many men:’
যেহেতু সার্ভেন্টিস স্বয়ং ডন কুইকজোট ও সানচো পানসার যুগলবন্দি-অস্তিত্বের প্রকৃত উৎস, তাঁর উল্লাস-বিষাদ সঙ্গ-নিঃসঙ্গতা প্রাচুর্য-রিক্ততা সক্রিয়তা-নিষ্ক্রিয়তা উদ্দীপনা-শূন্যতা ব্যক্ত হয়েছে আখ্যানের নানা অনুষঙ্গে। আর, এই সব দ্বৈততা প্রকৃতপক্ষে ষোল শতকের স্পেনীয় জীবনেরই বহুস্বরিক অভিজ্ঞতা। বৈচিত্র্য ও বৈপরীত্যের আততি যেন ব্যক্তির প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে নিয়ে উদ্ভট খেলায় মেতে উঠেছে, এরকম মনে হয়। আসলে লেখক তাঁর জীবনে এত বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার ঘুর্ণাবর্তের মুখোমুখি হয়েছিলেন যে কল্পনা ও প্রকল্পনার সংশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ডন কুইকজোট ও স্যাঙ্কো পাঞ্জার যুগলবন্দি নির্মাণ তাঁর পক্ষেই বুঝিবা স্বাভাবিক ছিল। স্পেনীয় জাতির অন্তর্ভূত স্বপ্ন ও বহির্ভূত সক্রিয়তা নানা বিভঙ্গ নিয়ে এই প্রকল্পে সমন্বিত হয়েছিল। এমন ঘটনা যে সচরাচর ঘটে না, তা না লিখলেও চলে।
ডন কুইকজোট পড়তে গিয়ে একই কারণে খুব বড়ো মাপের সমস্যাও তৈরি হয়। ঘটনাক্রম ও চরিত্র-নির্মাণ যেন নিজেরই অজ্ঞাতসারে গৌণ হয়ে পড়ে; পাঠকৃতির ছায়াঞ্চলের দিকে মনোযোগ বেশি হয়ে পড়ে। ঘটনার চেয়ে বড়ো হয়ে ওঠে অন্তর্নিহিত সম্ভাব্য প্রতীকিত্য কাহিনীর চেয়ে মন বেশি প্রাধান্য দেয় চিহ্নায়ান প্রকরণকে। বিশ্বসাহিত্যের সম্ভাব্য কালজয়ী রচনার সঙ্গে স্বতশ্চলভাবে প্রতিতুলনা করতে ইচ্ছে করে। সেই সঙ্গে স্বয়ং সার্ভেন্টিস আমাদের পাঠ-ক্রিয়াকে আরও খানিকটা অনিশ্চিত করে দেন। তাঁর মধ্যে লেখক-কথকের আততি প্রচ্ছন্ন নয় মোটেই, বরং প্রকট। তাছাড়া তিনি যেহেতু স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন- ‘Don Quixote was born, and I for him. He knew hos to act, and I knew how to write. স্রষ্টা যখন বলেন যে তিনিও তাঁর সৃষ্টি এক ও অভিন্ন, তাকে কতখানি আক্ষরিক অর্থে নেওয়া যায়-এ বিষয়ে তর্ক কিছুতেই এড়ানো যায় না। সার্ভেন্টিস কখন ডন কুইকজোটের হয়ে কথা বলতে বলতে কখন আলগোছে নিজেকে সরিয়ে নেন আবার সাবলীলভাবে ফিরেও আসেন : তা অসতর্ক পাঠে বোঝা মুশকিল। মধ্যযুগীয় কোনো-একটি আখ্যানে কীভাবে আধুনিকোত্তর পর্যায়ের উপযোগী লিখন প্রণালীর পূর্বাভাস পাচ্ছি, এই প্রশ্নের মীমাংসা মোটেই সহজ নয়। আখ্যানের আকর্ষণ সম্পূর্ণ বজায় রেখেও লেখক যেভাবে বয়ানে আখ্যানের উদ্বৃত্ত অনায়াসে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন, তার কোনো তুলনা নেই। সাধারণভাবে আখ্যানের বৈচিত্র্য খুবই মনোগ্রাহী; তবে মূল দুটি চরিত্রের অটুট গ্রন্থির নির্মাণই সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়। তাই মোটামুটিভাবে সমস্ত বর্গের পাঠকই ডন কুইকজোট ও সানচো পানসার প্রতি অভিনিবেশ কেন্দ্রীভূত করেছেন আর এই সূত্রে লক্ষ করেছেন আকাঙ্ক্ষার আশ্চর্য সমারোহ।
তাই দূরবর্তী কালের বাঙালি পাঠকও ডন কুইকজোটের সঙ্গী হয়ে তার লা মাঞ্চার সাধারণ ঘরদোরের মতো নিজের দৈনন্দিন অভ্যস্ততা থেকে বেরিয়ে পড়েন। তখন ধীরে ধীরে আধুনিক কিংবা আধুনিকোত্তর কালের অভিজ্ঞানগুলি ভোজবাজির মতো মিলিয়ে যেতে থাকে। পাঠকও অ্যাডভেঞ্চারের শরিক হয়ে বাস্তবের বন্দিশালা থেকে মুক্তি খুঁজে নেন এবং তাঁর জন্যেও তৈরি হয়ে যায় কোনো-এক সানচো পানসা। ফলে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর মেহের আলীর বিপ্রতীপে গিয়ে সানচো বাস্তবেই মায়া নির্মাণ করে এবং নিজেই আবার সেই কুহক ভেঙে দেয়। সৌজন্য-বীরত্ব-প্রেম-কীর্তি ইত্যাদির চিরাচরিত প্রতীতিকে অস্বীকার না-করেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিটির নতুন ভাষ্য রচিত হয় যেন। এ সময়ের যে পাঠক আকরণোত্তরবাদী ভাবনা অনুযায়ী পাঠকৃতির মধ্যেই স্বতঃপ্রবৃত্ত আত্ম-নিরাকরণের প্রক্রিয়া লক্ষ করেন, তাঁকে বিপুল বিস্ময়ে আবিষ্কার করতে হয়, মধ্যযুগের নির্মিতি হয়েও ডন কুইকজোট নিজেই নিজেকে অনবরত পুনর্লিখন করে গেছে। যেন প্রকৃত লেখক সার্ভেন্টিস প্রয়োজনীয় সূত্রধারের চেয়ে বিশ কিছু নন। চিত্তবিশ্বে নিহিত সম্ভাবনাই সানচো পানসাসহ অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে। নিজের সঙ্গে নিজেরই খেলা চলেছে নানাভাবে নানা আঙ্গিকে। আকাঙ্ক্ষার বিস্তার ঘটছে, কল্পিত বাস্তবের কৌতুক-ভরা উপস্থাপনা হচ্ছে; তারপর অবধারিতভাবে আসছে সেই অবরোহণের মুহূর্ত। কুইকুজোট উন্মাদনা ও মিথ্যার ঊর্ণাতন্ত্র রচনা : এই সবই কি পাঠকের বিনোদনের জন্যে?
যখন কল্পনার শক্তি অবসিত হয়ে যায়, কী অবশিষ্ট থাকে! মন্তেসিনোসের গুহা এই সূত্রে প্রতীকমূল্যে অনবদ্য হয়ে ওঠে। ডন কুইকজোটের এলনসো কিজানোতে রূপান্তর আর ঘরে ফিরে আসাও বিপুলভাবে চিহ্নায়িত। সাম্প্রতিক পাঠক নিঃসন্দেহে কাহিনী – অভিযায়ী এইসব চিহ্নায়কগুলি লক্ষ করবেন। স্যাঙ্কোর প্রতি কুইকজোটের নিম্নোধৃত উক্তিও আলাদা মনোযোগ দাবি করে : ‘There are some who exhaust themselves learning and investigating things that once learned and investigated, do not matter in the slightest to the understanding or the memory.’
না-লিখলেও চলে, বিশেষ প্রসঙ্গ-সম্পৃক্ত উচ্চারণ হলেও এর প্রসঙ্গাতিযায়ী তাৎপর্য আছে বলেই কালান্তরের পাঠক এতে স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যতের সংকেত খুঁজে পান। মনে পড়ে, প্রখ্যাত কবি অক্টাভিয়ো পাজ আধুনিক উপন্যাসকে ভেবেছিলেন নিজেরই বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সমাজের মহাকাব্য। কিন্তু প্রাক্-আধুনিক যুগের আখ্যান হয়েও ‘ডন কুইকজোট’ একইভাবে আপন সময় ও পরিসরের পিঞ্জরকে অস্বীকার করতে চেয়েছে। পার্থিব উপকরণের সঙ্গে রম্যন্যাসের অনুষঙ্গের সংশ্লেষণও ঐ অস্বীকৃতির অভিব্যক্তি। এ প্রসঙ্গে জরুরি হলো এই অবিসম্বাদী সত্য যে ধর্মতন্ত্র- শাসিত মধ্যযুগকে বিমূর্তায়িত বা আদর্শায়িত করা ঠিক নয়। গ্যালিলিও-জিওর্দানো ব্রুনো যখন নিরেট ও সংগঠিত কুসংস্কার-গতিহীনতার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন, এক পা এগিয়ে পা পিছিয়ে যাচ্ছে কিংবা পর্যুদস্ত হচ্ছেন-সেই পর্যায়ে সাহিত্যের কোনো মহাগ্রন্থ কীভাবে বিকল্প সত্যের সন্ধানে কৌশলে আপন প্রতিবাদের স্বর সন্নিবিষ্ট করছে বয়ানে? করছে কিনা আদৌ এই সংশয় প্রকাশ করব না। কেননা আখ্যানের গভীরে ঐ প্রতিবাদ যদি প্রচ্ছন্ন না থাকত, তাহলে তা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত মানব-পরিস্থিতিগুলিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিগৃহীত ও বিশ্লেষিত হতো না। অভিজ্ঞতা এবং আদর্শগত ধারণা (Experience and ideology) দ্বৈততা (dialectic) কাল্পনিক রহস্যপূর্ণতাময় ডন কুইকজোট উপন্যাসে পরিলক্ষিত হয়, যেমনটি দেখা যায় ডিফো (Defoe )র রবিনসন ক্রুসোর মধ্যে। সমালোচকরা সার্ভেন্টিস কোনো পক্ষে ছিলেন-ডন এক ব্যঙ্গাত্মক পাত্র না সম্ভনায়ক (Saintly hero)-তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি। সার্ভেন্টিসের উপন্যাসকে পড়া যেতে পারে একটি ধারণা বা একটি সমস্যা হিসাবে সমস্যাটি হচ্ছে সচেতনতার সমস্যা (Problem of consciousness) এবং শ্লেষাত্মক কর্ম (irony of action) যা ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে স্পেনে দেখা দিয়েছিল। এটি উপন্যাসের এক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সমস্যা হিসাবেও দেখা যেতে পারে। নৈতিক এবং আদর্শগত অর্থগুলির সমস্যাগুলি তো ছিলই এবং তা বহুদিন ধরে আলোচিত হয়েছে। সার্ভেন্টিস অনুকরণীয় ঐতিহাসিক উপন্যাসের (mimetic historical fiction) একটি দিক নিয়ে উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন এবং তার সমস্যাগুলিকেও তুলে ধরেছিলেন।
ডন কুইকজোট উপন্যাসে অভিজ্ঞতা এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই প্রকৃত কথা। আমরা এর মধ্যে অবাস্তব, অসম্ভব বিলাস কল্পনাটাকে খুব বড় করে বিচার না করলেও পারি। তার মানে এই নয় যে কুইকজোটের পারিপার্শ্বিক অবস্থাগুলিকে অস্বীকার করা। বরং অনুকরণ (Mimesis) এবং ইতিহাস (History) এই দুই দিক আমরা বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি। এর আলোকে কল্পনামুক্ত অভিজ্ঞতার জগৎ এবং সংকীর্ণ বাস্তব জগতের প্রতিক্রিয়া আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়। কুইকজোট নিজেকে বীরত্বপূর্ণ দর্শন (Chivalric vision of himself) হিসাবে দেখা এবং পৃথিবী দেখা প্রায়ই একইরকম পর্যায়ে আসে। তার মধ্যে যে কাল্পনিক বীরত্বগুলি দেখা দিয়েছিল তা একদিক থেকে জটিল, সামাজিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর প্রক্রিয়া এবং তাকে দুর্বল একজন স্প্যানিশ করে তুলেছে যে শুধু রোমান্সগুলি পড়েছে; কিন্তু অন্যদিকে সেগুলি আবার তার ব্যক্তিগত কর্মকে ফলপ্রসূ করেছে এবং জীর্ণ সামাজিক জীবন থেকে মুক্ত হবার পথ দেখিয়েছে। স্প্যানিশ সাম্রাজ্যবাদ সবকিছু ঊষর, উত্তক্ত এবং বিষণ্ণ করে তুলেছিল, মানুষের অধিকার, স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল এবং বাস্তবের রূঢ়তা ডন কুইকজোটকে প্রায় পাগল করে তুলেছিল। সেই তীক্ষ্ণ রূঢ়তা, নৈতিক ক্ষীয়মানতা এবং চরম অর্থহীনতা (meaninglessness) তাকে বীরত্বের সোনালি স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কাল্পনিক চিন্তাগুলি কাজে রূপান্তরিত হয়েছে এবং কাজগুলি তার স্বাধীন এবং নিজস্বতার ছাপ রেখেছে। জোরপূর্বক কর্মজগৎ রূপান্তরিত হয়েছে স্বাধীনতায় এবং আত্মবলীয়ানতায়।
ডন কুইকজোটের একটি মডেল আছে, যেমন বিখ্যাত আমাদিস দ্য গল ( Amadis de Gaul) যিনি অবনমনের সমাজের থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন এবং আত্মগ্লানি থেকে মুক্ত হয়েছিলেন কাল্পনিক কাজের মধ্য দিয়ে। কুইকজোটের আমাদিস একজন বাহ্যিক নিয়ামক (Mediator), এক উপায়ের দিশারী যাঁর কাছ থেকে কুইকজোট শিখেছিলেন কিভাবে জড় জাগতিক পার্থিব জগৎ ব্যতীত টিকে থাকা যায়। কুইকজোট আমাদিসকে নকল করেছিল, রেনে জিরার্ড (Rene Girard ) বলেছেন, যেমন খ্রিস্টান যিশু খ্রিস্টকে অনুকরণ করে।
ডনের চরিত্র সপ্তদশ শতাব্দীতে হাস্যকর বলে পরিগণিত হয়েছিল এবং ঊনবিংশ শতকে মহান বলে ভাবা হয়েছিল। তাকে চেতনার যুগে (age of sensibility) জ্ঞানের এবং সূক্ষ্ম চিন্তার উৎস হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
ডন কুইকজোট একজন খামখেয়ালি ব্যক্তি যিনি ব্যালাড কবিতাগুলিতে বর্ণিত বীরত্বপূর্ণ কাজগুলোকে অনুকরণ করে একজন বীর হিসাবে প্রতিভাত হতে চেয়েছেন। নিজেকে বীর ভেবে তিনি তাঁর প্রতিবেশীকে সম্বোধন করেছেন এবং সেই প্রতিবেশী তাঁকে এক গাধা এনে দিয়েছিল তাঁর প্রথম অ্যাডভেঞ্চারের জন্য এবং সেটিই প্রথম ব্যর্থ অভিযান। যদি গোটা উপন্যাসটি নিছক উন্মাদপ্রসূত কাল্পনিক কাহিনী হতো, তবে পাঠকেরা সার্ভেন্টিসের খামখেয়ালিপনা একরোখা নায়ক সম্বন্ধে আগেই সাবধানতা অবলম্বন করে উপন্যাস পাঠে বিমুখ হতো।
হেনরি ফিল্ডিংয়ের উপন্যাস যোশেফ এ্যানড্রসের মতোই ডন কুইকজোটের বিষয়বস্তু রোমাঙ্গবিমুখিতা, কারণ এতে রোমান্সের অপর্যাপ্ত এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং মানব জীবনের বাস্তবতার উপর গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। রোমান্স যতই ডনকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করেছে এবং পরবর্তীকালে প্রতারিত করেছে, ততই বাস্তবতা এক নিষ্ঠুর কশাঘাত করে মনে করিয়ে দিয়েছে, যে জীবন কল্পনা নয়, বরং এটি বড় বেশি বাস্তবভিত্তিক। এ উপন্যাসের মধ্যে অনেক অসঙ্গতিপূর্ণ অনুকরণ রয়েছে যা হাস্যাস্পদ অনুকরণ বিষয়বস্তুর এবং বিষয়বস্তুর প্রয়োগ শৈলী তার, যাকে এম. এইচ. অ্যাব্রামস বার্লেক্স ( Burlesque) বলেছেন। আর্নল্ড কেটল মনে করেন, ডন কুইকজোট অনেক বেশি বার্লেস্কে ভরা। বার্লেস্কে অনুকরণ হয় হাস্যকর এবং বিষয়ের গঠনগত শৈলী উচ্চপর্যায়ে থেকে নিম্নস্তরের বিষয়ে অনুপ্রবেশ করে। এভাবে কমিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ঠিক এই রকম ধরনের কথাই সার্ভেন্টিস ডন কুইকজোট উপন্যাসের প্রে লোগে বলেছেন, “আমার অনুর্বর এবং অনুত্তম প্রতিভা জন্ম দিয়েছে একটি ক্ষীণকায়, সংকুচিত খামখেয়ালি ছেলের যে কিনা শৈশব থেকেই বীরত্বপূর্ণ সাহসিকতার কথা যা অন্যের অকল্পনীয় ভেবে এসেছে এবং ঐরকম দুঃসাহসিক কাজ করতে চেয়েছে।” তিনি আরো বলেছেন যে ডন কুইকজোটের কাজ অতি উচ্চ স্তরের কর্মকে নকল করতে গিয়ে কৌতুকপূর্ণ হাস্যকর হয়েছে। এতে পাঠকেরা যেন তাঁকে ক্ষমা করেন। পাঠকেরা যেন সেই প্রবাদটি তুলে না যান-‘রাজার জন্য ডুমুর এনেছি’। রাজার জন্য থাকবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও কাজ, তা না করে অতি তুচ্ছ প্রোলোগে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘মনে রেখো তোমার লক্ষ্য হবে শিভ্যালরি সম্পর্কিত বেঠিক গল্পগুলোকে দূরে ছুঁড়ে ফেলা…. যদি তুমি তা করতে পারো তবে তুমি কিছু কম অর্জন করবে না।”
ডন কুইকজোট শীর্ণকায় এক যুবক যার পথ্য বিফ মাটনের স্ট্যু বেশিরভাগ রাত্রিতে, সিদ্ধ হাড় শনিবারের পথ্য, শুক্রবার লিন্টিল জাতীয় শাক সিদ্ধ এবং রবিবার পায়রা সিদ্ধ। সে বীরোচিত কাজ করার জন্য উদ্গ্রীব, কারণ সে নাইটদের রোমান্টিক কাহিনী পড়ে ফেলেছে এবং প্রেমের সংলাপ পড়ে স্থির থাকতে পারছে না বলেই সে নাইটদের মতো দুঃসাহসিক কাজ করে রাতারাতি প্রশংসা এবং খ্যাতি অর্জন করতে চায়। বিশেষত প্রেমসম্পর্কিত একটি বাক্য তার মস্তিষ্ককে নাড়া দিয়েছে -‘অযুক্তির জন্য যে যুক্তি দিয়ে তুমি আমার যৌক্তিকভাবে বিচার কর, তা আমার যুক্তিকে এতই দুর্বল করে দিয়েছে যে যুক্তি দিয়েই আমি তোমার সৌন্দর্য সম্পর্কে অভিযোগ করব।’ সে আরো পড়েছে- ‘নক্ষত্রখচিত উচ্চ আকাশ স্বৰ্গীয়ভাবে তোমার স্বর্গীয়তাকে শক্তিশালী করে এবং মাহনতাকে দৃঢ় করে। এইরকম লেখা পড়ে সে তার বুদ্ধি হারিয়েছে এবং চেষ্টা করেছে সে সবের অর্থ খুঁজে বার করতে। যদিও অ্যারিস্টটল নিজে কখনই তা করতে যেতেন না। যা অ্যারিস্টটলের বোধগম্য বহির্ভূত, তাই সে করায়ত্ত করতে চায়। মোহময়তা, বিবাদ, যুদ্ধ, মোকাবিলা, শারীরিক ক্ষত, প্রেমানুসন্ধান, ভালোবাসা, ভালোবাসার যন্ত্রণা তার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল এবং সে বিশ্বাস করতে লাগল যা কিছু কাল্পনিক তাই সত্য, এমনকি পৃথিবীর ইতিহাসও এই সদ্য উদ্ঘাটন করতে পারে না। ক্রমাগত উদ্ভূত চিন্তার ফলে তার মনে অভিযানের আকাঙ্ক্ষা দানা বাঁধতে লাগল। বুদ্ধিকে সরিয়ে সে হতবুদ্ধির প্রতিজ্ঞা নিয়ে কাজ করবে স্থির করে ফেলল এবং জুতসই নাম দিয়ে ফেলল নিজের। নিজের দেশের নামের সঙ্গে তার ডাকনাম জুড়ে নিজেকে ডন কুইকজোট ডি লা মাঞ্চা বলে পরিচিত করল। অসম্ভব, অবাস্তব, কাল্পনিক ইত্যাদির সঙ্গে তাল মেলানো হলো তার কাজের লক্ষ্য। এসে প্রথমেই পূর্বপুরুষদের ব্যবহৃত অস্ত্র পরিষ্কার করে ফেলল, শিরস্ত্রাণ ও দেহবর্ম তৈরি করল, একটা ঘোড়াও জোগাড় করল। সে নিজেকে নাইট ভাবতে শুরু করল। “প্রেমিকা ছাড়া নাইট পাতা- ফলবিহীন গাছের মতো এবং আত্মাবিহীন দেহের মতো।”
সার্ভেন্টিস শুধুমাত্র আদর্শ নিয়ে কঠোর বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি। ডন কুইকুজোট ফাফ্ফার নায়কের মতো শুধুমাত্র নিজের ভাবকল্পনা নিয়ে বাস করেনি। তার প্রথম অ্যাডভেঞ্চারের পর সে সঙ্গী স্কোয়ার সানচো পানসার থেকে খুব কমই বিচ্ছিন্ন থেকেছে। সাঁকো পাঁচার কৃষকোচিত বুদ্ধি তার নাইট ডন কুইকজোটকে বাস্তব জগতে নিয়ে আসার পক্ষে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছে। বহু সমালোচক মতো প্রকাশ করেন যে ডন কুইকজোট এবং সানচো পানসার দুই বিপরীত আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে যে দুই বিপরীত আদর্শ স্পেনে খুবই সক্রিয় ছিল। কুইকজোট মানসিক জগতের বাসিন্দা, স্পেনের বহিঃশত্রুর দ্বারা পরাজয়ের গ্লানি সম্পর্কে উদাসীন, স্পেনের ভাঙ্গাচোরা সাম্রাজ্যের জন্য বহুলাংশে দায়ী, যার সম্পদ বহির্দেশে অযথা ব্যয়িত হচ্ছে, এক্ষেত্রে তিনি শুধু তাঁর নিজের মতামত সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু দেশের আভ্যন্তরীণ উন্নতি সম্পর্কে একেবারেই অন্যমনা; এদিকে সানচো পানসা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন কৃষক যার সরলতাকে নিষ্পেষিত করা হচ্ছে এবং যার দারিদ্র্য কখনোই কমছে না। সার্ভেন্টিস কখনো কখনো রোমান্সের প্রতি শ্লেষ (irony) থেকে সরে এসেছেন এবং এক্ষেত্রে তাঁর উপন্যাসের কাহিনী শুধুমাত্র রোমান্স ব্যালাডের অঙ্গ। কিন্তু এটি তা নয়। শিভ্যালরির রোমান্স হয়তো বহু আগে সবাই বিস্মৃত হতে পারত যদি না সার্ভেন্টিস এটিকে নির্দয়ভাবে আঘাত করতেন এবং উপন্যাসটি সবাই ভুলে যেত যদি তিনি শ্লেষ এবং ব্যঙ্গের ঊর্ধ্বে উঠতে পারতেন। বইটিকে তিনি উপস্থাপিত করেছেন ডনের অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী হিসাবে, যেখানে রোমাঙ্গ ও বাস্তবতা, আদর্শ ও বিফলতা, উচ্ছ্বাস ও গ্লানি ইত্যাদিগ সংমিশ্রণ দেখা যায়।
চরিত্র ও ঘটনা উভয়ই এই উপন্যাসে প্রতিপাদ্য হয়েছে। আবার সার্ভেন্টিস সমাজের কাঠামোগত স্তর সম্বন্ধে সূক্ষ্ম দৃষ্টিপাত করেছেন। আমাদের আধুনিক সমাজের মতোই দুটি শ্রেণী তখনকার সমাজে ছিল। একদিকে ডিউক এবং ডাচেস সামন্ততান্ত্রিক ভোগবিলাসে, আমোদ-প্রমোদে, নিমন্ত্রণ অনুষ্ঠানে, বিদেশগমনে অযথা অপব্যয় করে চলেছেন; অন্য দিকে আবার দেখি এক সম্ভ্রান্ত ব্র্যক্তি, ডন ফার্ডিন্যান্ডের পিতা যিনি এক গরিব ব্যক্তির ছেলেকে সাহায্য করেন তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি করার জন্য। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি কিভাবে ডরোথির বাবার মতো লোকেরা অন্য মানুষের সহায়তা করেছেন। মধ্যশ্রেণীর মানুষদের মধ্যে আছে ধনী চাষীরা, আছে ক্যাপটিভের ভাই যিনি বিচারক কলোনিতে ভালো চাকরি করেন; স্ত্রীলোকেরা রয়েছেন, যেমন বাস্ক স্কোয়ারের (Basque Squire) সঙ্গে চলেছেন সেভিল (Seville) দেশে কর্তব্যরত স্বামীর সঙ্গে মিলিত হতে। আবার ক্যাপটিভ (Captive) দেখিয়েছেন কিভাবে বাঁচতে হয় যেমনভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে দরিদ্র ভদ্র সম্প্রদায়, তিনি মিলিটারিতে কাজ নিয়েছেন 1 এভাবে বিবিধ চরিত্র উপন্যাসের অঙ্গটিকে বাস্তবতার প্রলেপ দিয়েছে। কিন্তু ডন কুইকজোট রোমান্সের কিছুমাত্র বিঘ্ন ঘটেনি। গ্রাম্য ভাবধারার অতিরঞ্জন, মেষ পালক জীবনের শান্ত স্নিগ্ধ সৌন্দর্য, সহজ সরল গ্রাম্য জীবনের নিষ্কলুষতা এসব ডনের মনকে এক সুদূর রাজ্যের অধিবাসী করেছে। এসব মেষপালক গাছের গুঁড়িতে তাদের নাম খচিত করেছে, আর ডনকে আলোড়িত করেছে। মেষপালকদের সুন্দর অবয়ব, গাত্রচর্ম, তাদের ভালোবাসা এবং তাদের মেষপালকদের সৌন্দর্য এ সমস্ত রোমান্সের ধাঁচে গঠিত হয়েছে। রোমান্টিক ভালোবাসার সঙ্গে বাস্তব ভালোবাসার সংঘাত ঘটেছে। ডন কুইকজোটের কাল্পনিক ভালোবাসা একদিকে পাঠকের মনকে রোমান্সমুখী করেছে। কিন্তু অন্যদিকে ডন ফার্ডিন্যান্ড ডরোথিকে বিয়ে করবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার কোমীর্য নষ্ট করে লুসিডাকে অপহরণ করার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়ে তখন ডরোথির কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই দ্বৈততা গোটা উপন্যাসে এক বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।
তবে এই দ্বৈততা বা দ্বিত্ব ব্যক্তিত্ব অতি সহজ চিন্তাভাবনা নয়। ‘কুইকজোট পাঠকের কাছে জীবন্ত ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হয় যেভাবে উপন্যাসে চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু হঠাৎ কষ্টকর অ্যাডভেঞ্চারের মাঝে সে যেন কোনো মুরিস লেখকের কাছে উপজীব্য হয় যার পাণ্ডুলিপি সার্ভেন্টিস উদ্ধার করেছিলেন। তারপর থেকেই ডন হয়ে ওঠে বৈপরীত্যের চলমান সংকর : একদিকে মানুষ, অন্যদিকে সাহিত্যিক আবিষ্কার, জীবন্ত চরিত্র, একজন পুস্তকে বর্ণিত চরিত্র ও মানুষরূপী গ্রন্থ।’ ১৬০৫ সালে প্রকাশিত অংশ অনেক ছোট উপন্যাসের সম্মিলন। যেমন মার্সেলার গল্প গ্রাম্য প্রেমের কাব্যিক গল্প-এর পটভূমি এবং সমস্যা আদর্শপূর্ণ; গল্প বলার ভঙ্গিমা দার্শনিকতা পূর্ণ। কার্ডেনিওর গল্প এক আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক অন্ধকারময় বিষাদ, এর জটিল জাল তৈরি হয়েছে এক নিঃসঙ্গ ব্যক্তির বিবেকের দ্বারা। আবার ডরোথির গল্প সামাজিক সেক্সুয়াল সমস্যাপূর্ণ। আবার কিউরিয়াস ইমপার্টমেন্টের গল্প ( Curious Impertiment ) এক আধুনিক কর্মের কাহিনী যা আমরা আঁদ্রে জিদের উপন্যাসগুলিতে পাই: এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর গুণগুলিকে পরীক্ষা করেছিল শুধুমাত্র এক্সপেরিমেন্টের জন্য। এভাবে সমগ্র উপন্যাসে আমরা সাহিত্যিক বৈপরীত্য দেখি: দার্শনিকতার সংঘাত মনস্তত্ত্বের সঙ্গে, ব্যক্তিগত নৈতিকতার সংঘাত সামাজিক সমস্যাগুলির সঙ্গে, আভ্যন্তরীণ চিন্তার বিরুদ্ধে বাহ্যিক কর্মের, নিঃসঙ্গতার অবনমনের বিরুদ্ধে সামাজিক রীতি ও সন্তুষ্টির সঙ্গে। এরকম অনেক গল্প উপন্যাসের মধ্যে আছে যেগুলি হয়তো অনেক আগে ঘটে গিয়েছে, কিন্তু সেগুলি ডন কুইকজোট ও সানচো পানসার অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে বর্তমান বা প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে আরও একটি বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়েছে, যাকে বলতে পারা যায় গল্পের সময় এবং বাস্তব সময়। ১৬০৫ খণ্ডের শেষে কুইকজোট বন্য পশুর মতো অবমাননা ও লাঞ্ছনার মধ্যে দিয়ে ফিরে এসেছে, আবার ১৬১৫ খণ্ডের শেষে সে সম্মানে ও মেষপালকদের সঙ্গে ভালোবাসার ত শুনতে শুনতে সু-আহার করেছে। অন্যদিকে ১৬১৫ খণ্ডে গ্রাম্য অ্যাডভেঞ্চার এক একটি বাস্তব ও মূল্যবোধের সৃষ্টি করেছে যেগুলি অন্য বাস্তব ও অন্যান্য মুল্যবোধগুলির সঙ্গে বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে।
কুইকজোট ও সানচো দুজন দুই মেরুর লোক-একজন আদর্শবাদী অন্যজন বাস্তববাদী। তবে যদি দুজনে দুই ধরনের চরমে থাকে এবং মাঝে মাঝে অদ্ভুত ঠেকে আমাদের কাছে। তারা আমাদের কল্পনাকে স্পর্শ করে এবং এই স্পর্শ করার ক্ষমতা যেন জীবনের এক সত্যতার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এই দুজনের চরিত্র থেকে কিছু কিছু গুণের মিশ্রণ সাধারণ মানুষের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। রূঢ় বাস্ত বতার চাপে এইসব গুণগুলি চাপা পড়ে যায় বলে আমরা ভাবি এইসব গুণগুলি হয়তো অবাস্তব, ধোঁয়াশা, কিন্তু সেগুলির যথেষ্ট তাৎপর্য আমাদের জীবনে আছে। ডিন কুইকজোটের মধ্যে এসবগুলির আবিষ্কার করার অর্থ হলো আমাদের মধ্যে সেগুলির পুনরাবিষ্কার করা ও আমাদের জগৎকে খুঁজে পাওয়া, এবং এই কারণে আমরা অনুভব করতে পারি এই উপন্যাসের অতিরঞ্জন এও অদ্ভূত কাণ্ডকলাপ জীবনের ক্ষেত্রে সত্য। জীবনের উচ্চ আদর্শ তো থাকা দরকার, তা না হলে জীবন শুধু বাস্তবময় হয়ে গেলে সবকিছু হবে নিস্তরঙ্গ, অন্তঃসারশূন্য। মানুষের অনন্ত আশা কখনোই বাস্তব জগতের উপযোগী হবে না যেহেতু পৃথিবী যেরকম ও মানুষ যেমন নির্দিষ্ট এবং এ কারণে এক বিশাল শূন্যতা থেকে যায় মানুষের উচ্চাশা ও তার ক্ষুদ্র অস্তিত্বে।
এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসটিকে অর্থবহ করে তোলে। কুইকজোট কখনই তার কল্পনাবিলাসী মন নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সে সানচো পানসার সংস্পর্শে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্যাঙ্কো পাঞ্জাও ডনের মধ্যে হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ। একে অপরকে নিয়ে বিশেষ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি। উভয়কে আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করেছে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলি। ডন কুইকজোট উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডে বর্ণিত বার্সেলোনার জনাকীর্ণ রাস্তাগুলি প্রথম খণ্ডে লা মঞ্চ বর্ণিত নির্জন রাস্তাগুলির মধ্য দিয়ে এক বৈপরীত্য শুধু নয়, এক বিশেষ চিন্তাভাবনার সৃষ্টি করেছে, কুইকজোটের মধ্যে আধুনিক মনস্কতা যা আমরা অনুভব করতে পারি পরিপূর্ণরূপ পেয়েছে প্রাচীন ব্যালাডগুলি এবং গথিক রোমান্সগুলির মধ্যে যেগুলি কুইকজোটের কাজে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরস্পর বিরোধী ও বৈপরীত্য ঘটনা ও দৃষ্টিভঙ্গিগুলিকে বিভিন্নভাবে পরিমার্জিত করে দেখার সম্ভাবনার বীজ নিহিত আছে। মনস্তাত্ত্বিকেরা বহুঘটনাকে বিভিন্ন আলোকে তুলে ধরতে পারেন। উপন্যাসের মধ্যে এক স্বচ্ছন্দ গতি লক্ষ করা যায়- প্রাচীন রোমান্সকাল, ক্লাসিক্যাল শান্ত প্রগাঢ় গ্রাম্য শীতলতা থেকে আধুনিক সমস্যাসংকুল জীবনের জটিলতা আমাদের মনকে ভাবিয়ে তোলে। ‘এভাবেই মানুষের অদৃষ্ট সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসে দেখানো হয়েছে যা শুধুমাত্র এক বিশেষ কৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, কিন্তু এক বিশাল পশ্চাদমুখীও অগ্রাভিমূখী উন্মোচন—গথিক সময়ে একবার পশ্চাদমুখিতা এবং আধুনিকতাভিমুখিনতা-এবং বহুবিধ বাহ্যিক ঘটনাবলী থেকে আত্মানুশ্লেষণ এই উপন্যাসই সর্বজনীনতা আরোপ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, কুইকজোট এবং সানচো পানসা ডানসিনিয়ার খোঁজে রাত্রির অন্ধকারে টোবোসেতে প্রবেশ করেছে। এই প্রবেশ অন্ধকারের আবর্তে আত্মার সত্যতাকে পরীক্ষা করেছে এবং এই অন্ধকার কুইকজোটের ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতার প্রতীক যা বর্তমান আধুনিক জীবনের অঙ্গ। এই নিঃসঙ্গতা আরো ঘনীভূত হয়েছে তৎকালীন গাধার ডাক, শুকরের গর্জন এবং বিড়ালের স্বরে। দেখানো হচ্ছে বাহ্যিক পটভূমিকার শব্দগুলি কিভাবে আভ্যন্তরীণ নিঃসঙ্গতাকে আরো প্রকট করে তুলেছে। অন্ধকারের মধ্যে অনুসন্ধান কুইকজোট বাস্তবতার শক্ত ভূমিতে নিয়ে এসেছে যখন কুইকজোট বলে, ‘আমরা ভুল করেছি সানচো, আমি দেখছি এটি চার্চ’। অর্থাৎ সে ডালসিনিয়ার প্রাসাদে পৌঁছবার পরিবর্তে চলে গেছে চার্চের মধ্যে। সে সেখানে যেতে চেয়েছিল, সেখানে না পৌঁছে অন্য জায়গায় চলে গেছে। কুইকজোট ভুল করার মধ্য থেকে তার বুদ্ধিতে (rationality) পৌঁছতে পেরেছে। এ জায়গাতে দূরদৃষ্টি এবং বুদ্ধি প্রায় কাছাকাছি জায়গায় এসেছে, কারণ একটি অপরটিতে যাবার পথ সুগম করেছে।
ডন কুইকজোটের বিষয়বস্তু একটি মাত্র নয়। এটি যে শুধুমাত্র কোনো কাজের নৈতিক অথবা বাস্তব দিকটি দেখিয়েছে তা নয়। এ উপন্যাস চিন্তাভাবনা ও অলীক স্বপ্নের মাধ্যমে সে অনেক কিছু দিক-নৈতিক-অনৈতিক, বাস্তব- কাল্পনিক, সত্য-অলীক, আশা-দুর্ভাবনা, সুখ-দুঃখ, দৃঢ়তা-নমনীয়তা ইত্যাদি দেখিয়েছে। পাঠকেরা তাদের পচ্ছন্দমতো প্রধান দু-একটি দিক খুঁজে দেখতে চেয়েছে। স্প্যানিশ সাহিত্যের এক বিখ্যাত সমালোচক ডন কুইকজোট উপন্যাস সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন-”এই উপন্যাসকে সংক্ষিপ্তভাবে বাঁচবার সংকট হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যখন উপন্যাসটি দেহ, আত্মা এবং মনকে একত্রিত করতে চেয়েছে যেটি অন্য দুটির থেকে আর একটিকে গুরুত্ব দেওয়া থেকে পৃথক। তিনি আরো বলেছেন-”উপন্যাসটির বিপুল কর্মভাণ্ডার একটি বৃহৎ কর্মশালা যার মধ্যেই প্রত্যেকের জীবন পরিক্রমা তৈরি হয় এবং এটি কোনো উপদেশাত্মক অথবা যুক্তিসম্মত উচ্চ মহানতা নয় যা জীবনে আরোপ করা যেতে পারে। এটি বরং একটি প্রশ্ন তোলে যে বাস্তবকে আমরা দেখি তা হচ্ছে ব্যক্তির অভিজ্ঞতাই- যিনি বেঁচে থেকে বাস্তবকে দেখেন। নাইট অব দ্য হোয়াইট মুন ডন কুইকজোটকে বীরত্বে পরাস্ত করে এবং ডনের শেষ পরাজয় এনে দেয়। তারপরই ডনের বাস্তবিক জ্ঞান ফিরে আসে। সে বুঝতে পারে জীবনে ভাগ্য বলে কিছু নেই, যা কিছু জীবনে ঘটে তা দৈবনির্ধারিত নয় এবং মানুষই তার নিজের ভাগ্য নির্মাতা। সে এখন একজন সাধারণ স্কোয়্যার। ডনের কর্মকাণ্ডপ্রসূত পাগলামি আমাদের মধ্যেও আছে, যা দিয়ে আমরা মাঝে মাঝে বস্তুজগতের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি।
তবে বস্তুজগতের সীমাবদ্ধতা নিয়েই বাঁচতে হয়। তখন আদর্শের পথে জীবন চলে না। কুইকজোটের আদর্শ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে এবং সে বলে, ‘আমার বিচার এখন সুস্পষ্ট এবং অজ্ঞতার কুয়াশাময় ছায়া থেকে মুক্ত যা এতদিন আমার দুর্ভাগ্যযুক্ত এবং ক্রমাগত শিভালোরির ঘৃণ্য পুস্তকগুলির পাঠ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এখন আমি সেগুলির অবাস্তবতা ও প্রবঞ্চনাগুলি জানতে পেরেছি, এবং যেটি আমাকে দুঃখ দিয়েছে তা হচ্ছে এই আবিষ্কার অনেক দেরিতে হয়েছে, আর আমাকে অন্য বই পড়ে ভুলগুলি সংশোধন করার সুযোগ দিল না।
আদর্শ এবং অভিজ্ঞতার পারস্পরিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে জীবনের চরম উপলব্ধি এবং তা অভিনবভাবে প্রতিভাত হয়েছে ডন কুইকজোট উপন্যাসের মধ্য দিয়ে।
ডন কুইকজোটের দ্বিতীয় খণ্ড বের হবার থেকেই সার্ভেন্টিসের শরীর ভেঙে পড়ল। প্রধান হয়ে দেখা দিল সর্বাঙ্গের শোথ। স্ত্রী ক্যাটালিনা শেষের ক’দিন তার পাশে ছিলেন। সার্ভেন্টিস মৃত্যুবরণ করেন ২৩শে এপ্রিল ১৬১৬ সালে। ঠিক সেই দিন ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে আর একজন বিশ্বনন্দিত লেখকের মৃত্যু হলো শেক্সপিয়রের।
কোনো গির্জার চত্বরে সার্ভেন্টিসকে কবর দেওয়া হয়েছিল শুধু সেইটুকু এখন জানা যায়। কিন্তু ঠিক কোথায় তার কবর- তার হিসাব কেউ রাখেনি। তার দেশবাসী কিংবা পরিজন সামান্য একটি স্মৃতিফলক দিয়ে স্থানটিকে চিহ্নিত করে রাখা প্রয়োজন বোধ করেনি।
যে কালজয়ী লেখক ইউরোপে দ্বিতীয় শেক্সপিয়ার বলে গণ্য, সেই quixotic সার্ভেন্টিস জীবন বিষম দুঃখময় ছিল, অথচ তাঁর হাসিতে সাহিত্য জগৎ চির-আলোকিত। এই হাসিকে ইউরোপীয় বলে বীরের হাসি। এ-জাতীয় হাসির ভিতর যে বীরত্ব আছে তা অবশ্য পলটনী বীরত্ব নয়, ব্যবহারিক জীবনের সুখ-দুঃখকে অতিক্রম করবার ভিতর যে বীরত্ব আছে, তাই।’ ব্যর্থ হলেও এই অতিক্রম করার বীরত্ব আসলে মানুষের গভীরতম সাদিচ্ছা। আর তাই দেশ-কাল পেরিয়েও ডন কুইকজোট আমাদের মনের মানুষ।
জুলফিকার নিউটন
উত্তরা, ঢাকা-১২৩০


Leave a Reply