কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র – মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক
প্রকাশক – রেদওয়ানুর রহমান জুয়েল
নালন্দা
প্রচ্ছদ – ধ্রুব এষ
প্রথম প্রকাশ – ফেব্রুয়ারি ২০১৫
উৎসর্গ
প্রিয় বন্ধু, বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী
অধ্যাপক ডঃ সাদেকা হালিম চৌধুরী
কৈফিয়ত
আমাদের জ্ঞানজগতে কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এখনো জ্ঞানপিপাসুদের মধ্যে এই গ্রন্থ সম্পর্কিত কৌতূহলে ভাটা পড়েনি। প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে রচিত এ গ্রন্থের কোনো কোনো বিষয় এখনো এই আধুনিক সমাজের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। সেসময় সামাজিক সেবা খাতের যে বিচ্যুতিগুলো (উৎপীড়ন- শোষণ) কৌটিল্য কর্তৃক চিহ্নিত হয়েছিল, আজকের আধুনিক প্রযুক্তি প্রভাবিত সমাজে বাস করেও আমরা তা থেকে কতটুকু মুক্ত হতে পেরেছি, সে প্রশ্ন আমাদের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সেকালে মৌর্যদের রাজত্বে ব্যবসায়ীরা যেমন জোটবদ্ধভাবে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মুনাফা হাতিয়ে নিত, আজকের আধুনিক সমাজেও তারা তেমনিভাবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অধিকমুনাফা অর্জনের অপকৌল গ্রহণ করে থাকে। তখনও যেমন শকট ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুনীতি চালু ছিল, আজকের সমাজেও তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে এ ধরনের দুর্নীতি হয় না, তা হলফ করে বলার উপায় নেই। তখন যেমন অপ্রশিক্ষিত নাবালক চালক দিয়ে রথ চালানো হত, আজকেও তেমনি নকল লাইসেন্সধারী অপ্রশিক্ষিত চালক দিয়ে যে মোটরগাড়ি চালানো হয় না, তা কি নিশ্চিত করে বলবার উপায় আছে? তখন যেমন পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে অধিক ওজনসম্পন্ন বাটখারা এবং পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কম ওজনযুক্ত বাটখারা ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রেতা বিক্রেতাদের প্রতারিত করা হত। আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা কি এসব প্রবণতা হতে মুক্ত হতে পেরেছি? এখনো ঢাকার ইমামগঞ্জে এ ধরনের প্রতারণাপূর্ণ বাটখারা হরদম বিক্রি হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আদিকালের এ সমস্ত নেতিবাচক অনুষঙ্গ আমাদের সমাজে দাপটের সাথে বিরাজ করছে। কৌটিল্য শত্রুকে বিপর্যস্ত করার জন্য প্রয়োজনে জলাধারে বিষ প্রয়োগের যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তার নমুনা আমাদের সমাজজীবনে প্রায়শ পরিদৃষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু সামাজিক জীবনের সমৃদ্ধির জন্য জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কর্মসম্পাদনের যে নির্দেশনা তিনি দিয়েছিলেন, কি কারণে তা যেন সমাজ থেকে উধাও হয়েছে। তাঁর গণমুখী তথা প্ৰজা হিতকর কার্যাবলি এখন আধুনিক রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের মাধ্যমে সম্পাদন করা হয়ে থাকলেও সেই জমানার তুলনায় তা কতটুকু কার্যকর সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ক্ষেত্রবিশেষে মনে হয় অনেক ক্ষেত্রেই আমরা স্থবির হয়ে আছি অথবা আগের চেয়ে পিছিয়ে আছি। কৌটিল্য বলেছেন, ‘যেখানে দণ্ড নেই সেখানে রাজ্য নেই।’ এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণের কোনো অবকাশ নেই। এটি একটি সর্বজনীন উক্তি, সকল সমাজের ক্ষেত্রে এই বক্তব্য আগেও যেমন প্রযোজ্য ছিল, বর্তমানেও তার অপরিহার্যতা বাতিল হয়ে যায়নি। ভবিষ্যতেও হয়তো তা সমভাবেই প্রযোজ্য হবে।
কৌটিল্যের নির্দেশিত সমাজ ছিল বর্ণভিত্তিক সমাজ, সে-সমাজে রাজা ও প্রজার জন্য সমভাবে আইন প্রয়োগের তাগিদ দেওয়া হলেও উপরি কাঠামোর লোকেরা তথা ব্রাহ্মণরা ছিলেন অনেক ক্ষেত্রে আইনের উর্ধ্বে তাদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি রহিত করা ছিল। এমনকি রাজদ্রোহের মতো অপরাধের জন্যও তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি প্রযোজ্য ছিল না। এ ধরনের বিভেদমূলক ব্যবস্থার প্রভাবেই হয়তো বা এ অঞ্চলে বিকশিত হয়েছিল এক বিশেষ ধরনের পরজীবী সুবিধাভোগী শ্রেণি, কালক্রমে যার পরিধি বিস্তৃত হয়ে শ্রমজীবী শ্রেণিকে অচ্যুত শ্রেণিতে পরিণত করেছে। এ ধরনের বহুবিদ দ্বান্দ্বিক ব্যবস্থার নিরিখে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার স্বরূপ উন্মোচনের ক্ষেত্রে, সামাজিক গবেষণার প্রয়োজনে, আর্থসামাজিক রাজনৈতিক কাঠামো এবং তৎসম্পৃক্ত সংস্কৃতিরস্বরূপ সন্ধানের প্রয়োজনে আমাদের জন্য অর্থশাস্ত্রের পাঠ অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। সে তাগিদ থেকেই এ গ্রন্থ রচনার প্রয়াস গ্রহণ করেছি। গ্রন্থটি পনেরোটি বিভাগ বা অধিকরণে বিভাজিত, এর প্রথম পাঁচটি অধিকরণ স্বরাষ্ট্র তথা রাজ্য পরিচালনাবিষয়ক এবং পরবর্তী আটটি অধিকরণই আবাপ বা পররাষ্ট্র ও যুদ্ধবিষয়ক আলোচনায় সমৃদ্ধ। চতুর্দশ অধিকরণটি ঔপনিষধিক তথা বিভিন্ন প্রকার ভেষজ ও ঐন্দ্রজালিক বিদ্যা সম্পর্কিত। যা আজকের সমাজে অনেকটা বাস্তবতা বর্জিত বলে প্রতিভাত। এই অধিকরণটি ব্যতিরেকে অন্যান্য অধিকরণ এখনো বাস্তবতার নিরিখে অনেক ক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য। এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহের আলোকে, যুক্তির আলোকে বা বিতর্কের মাধ্যমে অনেক বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে। বিষয় ভিত্তিক এসব বিতর্ক একদিকে যেমন সুখপাঠ্য, অন্যদিকে তেমনি তর্ক-বিতর্ক-যুক্তিতে সমৃদ্ধ।
বস্তুত গ্রন্থটিকে রচিত না বলে অনুদিত, সংকলিত এবং সম্পাদিত বলাটাই সঙ্গত। কারণ, এতে আমার কোনো সৃষ্টিশীলতা নেই। বিভিন্ন গ্ৰন্থ হতে গৃহীত তথ্যের আলোকে এটি প্রণীত। এছাড়াও গ্রন্থটি সংক্ষেপিত আকারে সংকলিত হয়েছে। এক্ষেত্রে ১৯১৫ সালে প্রকাশিত আর শামাশাস্ত্রী কর্তৃক অনুদিত Kautilya. Arthashastra. গ্রন্থটির আলোকেই এই গ্রন্থটি রচিত হয়েছে। সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে ডঃ মানবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় শাস্ত্রী-এর ‘কৌটিলীয়ম্ অর্থশাস্ত্রম্’ হতে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত-ধারণা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে উত্থিত সন্দেহ, সংশয় বা অর্থের দুর্বোধ্যতা দূরীকরণার্থে L. N. RANGARAJAN-এর KAUTILYA The Arthashastra. এবং রাধাগোবিন্দ বসাক-এর ‘কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থ থেকেও পাঠগ্রহণ করতে হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে এটি একটি দুর্বোধ্য গ্রন্থ হিসেবে প্রতিভাত হলেও বোধগম্য প্রাঞ্জল ভাষায় তা প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে অর্থের বিচ্যুতি না থাকলেও ক্ষেত্রেবিশেষে অর্থের পরিপূর্ণতা হয়তো বা বিঘ্নিত হয়েছে। যেমন, কৌটিল্য যে রাজাকে উদ্দেশ্য করে তাঁর বয়ান পেশ করেছেন, বাংলায় প্রণীত গ্রন্থে তাকে বলা হয়েছে বিজিগীষু, এর মাধ্যমে আত্মগুণসম্পন্ন ও পঞ্চইন্দ্রিয়ের গুণসম্পন্ন শত্রুবিনাশী রাজ্যাভিলাষী রাজাকে বোঝানো হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় প্রণীত গ্রন্থে এই রাজাকে বলা হয়েছে Conqueror. অথবা King. এক্ষেত্রে আমি রাজাকে ক্ষেত্রবিশেষে বিজয়াকাঙ্ক্ষী রাজা হিসেবে অভিহিত করেছি। কখনো বা শুধু রাজা হিসেবে উদ্ধৃত করেছি। দায়িত্বে নিয়োজিত পদস্থ রাজকর্তাদের কখনো অধীক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক বা প্রশাসক হিসেবে অভিহিত করেছি। আর শামাশাস্ত্রী কর্তৃক অনুদিত অর্থশাস্ত্রটি ডাইরেক্ট স্পীসে লিখিত হলেও আমি আমার মতো করে এর ভাষ্য প্রণয়ন করেছি। এছাড়াও গ্রন্থের বিন্যাসের ক্ষেত্রে ডঃ মানবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুসৃত আদল পুরোমাত্রায় অনুসরণ করেছি। তদুপরি অজ্ঞাতসারে কোনো বিচ্যুতি বা অর্থের ঘাটতি পরিদৃষ্ট হলে তার দায় আমার উপরই বর্তাবে, এ বিষয়ক যে কোনো সমালোচনা এবং পরামর্শও সাদরে গৃহীত হবে।
গ্রন্থটি রচনার ক্ষেত্রে অনুজ কবি ফিরোজ মাহমুদ খান (পাভেল) সব সময়ই অনুপ্রাণীত করেছে, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তাঁর ধারাবাহিক তাগিদ ব্যতিরেকে হয়তো আমার পক্ষে এ গ্রন্থটি রচনা করাই সম্ভব হত না। ফিরোজ শুধু তাগিদ দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, কৌটিল্য, মগধ এবং মৌর্য সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি পুস্তক প্রদান করে এ সম্পর্কিত ধারণার্জনের ক্ষেত্রেও সহায়তা করেছে। তাঁর কাছে গচ্ছিত রইল আমার অশেষ ঋণ। পরোক্ষভাবে সহায়তা এবং অনুপ্রাণীত করেছে প্রিয় অনুজ সাদাত উল্লাহ খান, আড্ডার সংগী কবি সৈকত হাবিব এবং একান্ত সজ্জন শ্রোতা সাজ্জাদ কবীর। এঁদের সকলের প্রতি রইল অশেষ কৃতজ্ঞতা। এছাড়াও ‘নালন্দা’র প্রকাশক রেদওয়ানুর রহমান জুয়েল গ্রন্থটি প্রকাশের আগাম দায়িত্ব নিয়ে আমাকে যথার্থভাবে অনুপ্রাণীত করেছেন, লিখতে বাধ্য করেছেন, তাঁর প্রতিও রইল অশেষ কৃতজ্ঞতা।
মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক
শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরী সড়ক। ঢাকা।
২৫ অক্টোবর, ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ।
.
সহায়ক গ্রন্থ, তথ্যঋণ এবং কৃতজ্ঞতা স্বীকার
অমর্ত্য সেন। তর্কপ্রিয় ভারতীয়। কলকাতা। আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ। ২০১২ (৪র্থ মুদ্রণ)
ইরফান হাবিব ও বিবেকানন্দ ঝা। মৌর্য যুগের ভারতবর্ষ। (অনুবাদ— কাবেরী বসু)। কলকাতা। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড। ২০০৬
উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল। হোয়াইট মোগল। (অনুবাদ: আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু)। ঢাকা। ঐতিহ্য। ২০০৩
এবিএম শামসুদ্দীন আহমদ। আধুনিক ইংল্যাণ্ডের ইতিহাস। ঢাকা। প্রগেসিভ বুক কর্ণার। ১৯৭৮
করিম, সরদার ফজলুল। সেইসব দার্শনিক। ঢাকা। কথা প্রকাশ। ২০১০ করিম, সরদার ফজলুল। দর্শন কোষ। ঢাকা। প্যাপিরাস। ২০১২ (পুনর্মুদ্রণ)
কার্ল মার্কস। ভারতীয় ইতিহাসের কালপঞ্জী। মস্কো। প্রগতি প্ৰকাশন। ১৯৭১
গোলাম মুরশিদ। কালাপানির হাতছানি—বিলেতে বাঙালির ইতিহাস। ঢাকা। অবসর। ২০০৮
জওহরলাল নেহেরু। দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া। ঢাকা। চারদিক। ২০১১ নিকোলো ম্যাকায়াভেলি। দ্য প্রিন্স। (অনুবাদ—বশীর বারহান)। ঢাকা। প্যাপিরাস। ২০১৩ (পুর্নমুদ্রণ)
প্লেটো। রিপাবলিক। (অনুবাদঃ সৈয়দ মকসুদ আলী। ঢাকা। বাংলা একাডেমি। ২০০৩ (পুনর্মুদ্রণ)
বন্দ্যোপাধ্যায়, মানবেন্দু। কৌটিলীয়ম্ অর্থশাস্ত্রম্। কোলকাতা। সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার। ২০০১
মার্কস এঙ্গেলস। উপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে। মস্কো। প্রগতি প্রকাশন। ১৯৭১ রাধাগোবিন্দ বসাক। কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্র। কলকাতা। জেনারেল প্রিন্টার্স য়্যান্ড পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ। ১৯৯৬ (ষষ্ঠ মুদ্রণ)
সাংকৃত্যায়ন, রাহুল। বৌদ্ধ দর্শন। ঢাকা। সাহিত্য প্রকাশনালয়। ২০০৭ হাই, সাইয়েদ আব্দুল। ভারতীয় দর্শন। ঢাকা। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। ২০০৭
L. N. RANGARAJAN. (Edited, Rearranged, Translated & Introduced). KAUTILY The Arthashastra. India. 1992
R. Shamasastry. (Translated). Kautilya. Arthashastra. Bangalore. Government Press. 1915
ইন্টারনেট’র সংশ্লিষ্ট ফ্রি উইকিপিডিয়া।






Leave a Reply