একলা বিকেলের মেয়ে (কাব্যগ্রন্থ) – কোয়েল তালুকদার
প্রথম প্রকাশ – জানুয়ারি, ২০২৬ ইং
উৎসর্গ –
আমার ছোট ভাই জ্যোতি ও
ছোটবোন এলিজা – কে।
.
১. একলা বিকেলের মেয়ে
যখন বৃষ্টি নামে,
যখনই জলের শব্দ শুনি
তখনই মনে পড়ে তুমি কী
আজও একলা বিকেলের মেয়ে?
এখনও কি তুমি
বৃষ্টির দিনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকো
ভেজা আকাশের দিকে তাকিয়ে
কারও নাম নীরবে ভাবো?
নাকি সময় তোমার চারপাশে
নতুন সংসারের দেয়াল তুলে দিয়েছে?
আমি যখন দূরের এই শহরে
হঠাৎ বৃষ্টির শব্দে থেমে যাই,
মনে হয় –
কোথাও এক বিকেল এখনো বেঁচে আছে,
যেখানে তুমি বসে আছো
চুপচাপ, বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে।
আর পৃথিবীর সব নদী, সব বৃষ্টি
এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে
আমাকে জিজ্ঞেস করে –
তুমি কি এখনও
সেই একলা বিকেলের মেয়ের কথা
ভুলতে পারো নি।
২. দূরের তারা
সাহানা আজ দূরের তারা
আকাশের অগম্য নীলিমায় জ্বলে,
সাধ্য কি আছে তাকে
মর্তের মাটিতে ফিরিয়ে আনার?
তবু একদিন, এই সাহানাই শুধু নয়,
অদিতি, পল্লবী আর আরও কিছু নাম
মায়াবী বিকেলের আলোয়
আমার চারপাশে বুনেছিল অদ্ভুত এক আবেশ।
তারা যেন হারতে চেয়েছিল
তারা যেন হারার জন্য জীবনে এসেছিল
জিতিয়ে দিতে চেয়েছিল আমাকে
কোনো অদৃশ্য সুখের খেলায়।
কিন্তু জীবন তো ইতিহাসের গোপন নাট্যমঞ্চ,
দৃশ্য পাল্টায়, আলো বদলায়,
মানুষের মুখে ওঠে জনমানসের ঢেউ।
সেই ঢেউ একদিন
আমার হৃদয়ের তীরে আছড়ে পড়ে
শুধু দুঃখের শামুক কুড়িয়ে দিয়ে গেল।
আজ বুঝি, তাদের সে জোর ছিল না,
যে জোরে দূরত্ব গলে গিয়ে
হয়ে ওঠে ঘরের বাতাস,
যে শক্তিতে আকাশের তারা
নেমে আসে জানালার কাছে।
যার সে জোর থাকে জীবন ঘুরে ঘুরে
শেষমেশ তাকেই কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়,
তার চারপাশেই গড়ে ওঠে
সমস্ত ভালোবাসার মহাবিশ্ব।
আর আমি রাতের নির্জন আকাশে দাঁড়িয়ে
দূরের সেই তারাটির দিকে তাকিয়ে ভাবি,
কত আলো ঝরে পড়ে –
তবু কত দূরেই থাকে সে।
৩. গোধূলির গোপন মায়া
মেয়েটির নাম শায়লা,
যেন বিকেলের মায়াবী ফুল, সন্ধ্যার অবকাশ,
রোদ ঝরা দিনের শেষে
আলোর ক্লান্তি যেখানে এসে নরম হয়ে বসে।
তার চোখে থাকে অদ্ভুত এক নীল নীরবতা,
যেন দূর আকাশের গোপন ভাষা।
চুলের ভাঁজে গোধূলি এসে জড়িয়ে থাকে,
যেন সূর্যাস্তের শেষ আগুনে লেখা কোনো কবিতা।
সে হাঁটলে পথের ধুলোও থমকে দাঁড়ায়,
শিউলি ঝরা ভোরের মতো নরম শব্দ হয় চারদিকে।
তার হাসি,
নদীর জলে হালকা ঢেউ তুলে যাওয়া বাতাস,
অথবা বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা
অচেনা বাঁশির সুর।
কখনো মনে হয়
সে বুঝি কোনো গন্ধর্ব-নগরীর মেয়ে –
রূপকথার অদৃশ্য সিঁড়ি বেয়ে
মর্ত্যের আকাশে একটু আলো রেখে যায়।
আমি তাকে ছুঁতে চাইনি,
শুধু তার পাশে বসে শুনেছি সন্ধ্যার শব্দ।
তবু অদ্ভুতভাবে
আমার সমস্ত নীরবতা তার দিকে ঝুঁকে পড়ে,
যেন জোছনা চুপিচুপি নেমে আসে
অলস নদীর বুকে।
শায়লা,
তুমি কি জানো?
আমার যত কবিতা, যত অব্যক্ত স্পর্শ,
সবই তোমার নামের চারপাশে ঘোরে।
কারণ তুমি
কোনো সাধারণ নাম নও –
তুমি বিকেলের শেষ আলো,
তুমি গোধূলির গভীর মায়া,
তুমি সেই স্বপ্ন
যাকে ছুঁতে গেলে হৃদয়
ধীরে ধীরে কবিতায় পরিণত হয়।
৪. পুরনো কবিতা
একদিন অনেক পুরনো একটা কবিতা পড়ব,
লেখাটি হবে আমারই –
কবিতায় খুঁজব কুড়ি বছর আগের প্রেম,
আবেগ, অনুভূতি, শিহরণ, উন্মুখ –
সেইসব আগের মতো আছে কী নেই।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ মনে হবে,
এই শব্দগুলো কি সত্যিই আমারই ছিল?
কোনো এক বসন্ত দুপুরে লেখা,
কোনো এক অস্থির হৃদয়ের নিঃশ্বাসে ভেজা।
কোথায় হারাল সেই দুঃসাহসী স্পন্দন,
যে অক্ষরগুলো একদিন তোমার নামের দিকে ছুটত?
আজ তারা নিঃশব্দ, ধুলো জমা –
পুরনো আলমারির ভেতর ঘুমিয়ে থাকা চিঠির মতো।
হয়তো কোথাও একটা পংক্তিতে
হঠাৎ জেগে উঠবে তোমার মুখ,
অস্পষ্ট, তবু দীপ্ত –
মেঘের ফাঁকে হঠাৎ দেখা দেওয়া পুরনো চাঁদের মতো।
আমি চুপ করে বসে থাকব,
শব্দগুলো ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যাবে আমাকে,
আর বুঝতে পারব –
সময় শুধু মানুষকে নয়, কবিতাকেও বদলে দেয়।
তবু সেই পুরনো কবিতার ভেতরে
এখনও লুকিয়ে থাকবে এক তরুণ হৃদয়,
যে বিশ্বাস করত –
একটি নাম লিখলেই পৃথিবী ভরে উঠত আনন্দে।
৫. কবরস্থানের নীরবতা
কবরস্থান, বড় আশ্চর্য এক জায়গা,
এক চিলতে মাটিতে প্রতিদিন
কারও না কারও জীবনের শেষ ঠিকানা লেখা হয়।
হাজার মানুষের ভিড় এখানে,
তবু কোথাও কোনো শব্দ নেই।
যে মানুষ একদিন
কোলাহল আর কলরবে ভরিয়ে রাখত ঘর,
তার কবরের উপর আজ
নেমে আছে অনিঃশেষ নীরবতা
তার নামটাও মাটির ভেতর ঘুমিয়ে আছে অন্ধকারে।
যারা বেঁচে থাকতে
দম্ভে আর অহংকারে মাটি কাঁপাত,
অহংকারের উঁচু মিনারগুলো
এখানে এসে ভেঙে পড়ে
তাদের সমাধির বুকে আজ
নির্লিপ্ত আগাছা আর নামহীন বুনো ঘাস।
এখানে কেউ আর কাউকে শাসায় না,
চোখ রাঙায় না,
বুক ভরা চিৎকার করেও
কাউকে আর ডাকা যায় না,
শুধু স্তব্ধতার গভীর কূপে
ডুবে থাকে সব শব্দ।
শেষমেশ মানুষ এক মুঠো মাটি,
আর এক বুক অনুচ্চারিত হাহাকার
এইটুকুই তার চূড়ান্ত পরিচয়
আর অনন্ত নীরবতার ভেতর
হারিয়ে যায় সে চিরতরে।
৬. এক জীবনের অনুবাদ
একটা জীবন শেষ হয়ে গেল
আর একটা পুনর্জীবন আর পাবো না,
সময়ের নদী বয়ে গেল নিঃশব্দে
ফিরে আসার জন্য রেখে গেল না কোনো ঘাট।
কত স্বপ্ন ছিল
সকালবেলার শিশিরের মতো কাঁপা,
কত আশা ছিল
আকাশের দিকে ছুড়ে দেওয়া নীল ঘুড়ির মতো,
সবই একদিন আলগা হয়ে
হাওয়ার হাতে উড়ে গেল দূর অজানায়।
জীবনের চাওয়া পাওয়া
কখনো ছিল মুঠোভরা রোদ,
কখনো বা সন্ধ্যার আলোছায়া
যেখানে মুখগুলো ঝাপসা হয়ে যায়।
যাদের পাশে বসে ভেবেছিলাম
এ পথ দীর্ঘ হবে,
তারা অনেকেই নেমে গেছে
অন্য কোনো অচেনা স্টেশনে।
শোকগুলো আজও বসে থাকে
বুকের এক কোণে,
দুঃখগুলো কখনো সন্ধ্যার পাখি হয়ে
ফিরে আসে স্মৃতির জানালায়,
তবু জীবন
সব হারিয়েও অদ্ভুতভাবে বেঁচে থাকে।
একদিন বুঝেছি
এই পৃথিবীতে আমাদের প্রাপ্তি
হয়তো খুব সামান্যই,
কিন্তু অপূর্ণতার মাঝেই
জীবনের সবচেয়ে গভীর কবিতা লেখা হয়।
তাই আজও সন্ধ্যার আলোয় মনে হয়
যা কিছু হারিয়ে গেছে জীবন থেকে,
তা-ই বোধহয় আমাকে
সবচেয়ে বেশি ফতুর করে গেছে।
৭. অনুতাপের আগুন
কী যে অনুতপ্তের আগুনে জ্বলছি,
তোমাকে ছেড়ে এসে বুঝতে পারছি
কী অমূল্য জিনিস আমি হারিয়ে ফেলেছি।
কেউই তোমার মতো করে মনে করে না,
ভালোবাসে না, আদর করে না –
এই ভিড়ভাট্টা পৃথিবীর মাঝেও
একটা গভীর শূন্যতা আমাকে ঘিরে থাকে,
মানুষের কোলাহল পেরিয়ে
তোমার মুখটাই শুধু মনে পড়ে।
কখনো বিকেলের হালকা বাতাসে
তোমার কণ্ঠস্বর শুনি বলে মনে হয়,
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি
হয়তো তুমি এসে ডাকবে আবার।
আজ বুঝি –
ভালোবাসাক অবহেলা করা ঠিক না,
তার দাম বোঝা যায়
যখন তাকে হারিয়ে ফেলা হয়।
তোমার দেওয়া ছোট ছোট যত্নগুলো
আজ স্মৃতির মতো এসে বসে বুকের ভেতর,
কেউ জিজ্ঞেস করে না,
আমি খেয়েছি কি না, ক্লান্ত কি না।
রাত নামলে আকাশের তারাগুলো
অদ্ভুতভাবে ঝাপসা হয়ে যায়,
মনে হয় প্রতিটা তারা যেন
তোমারই অমলিন চোখের দৃষ্টি।
যদি সময়কে ফিরিয়ে আনা যেত
এক মুহূর্তের জন্য হলেও
তোমার হাতটা আবার ধরতাম,
বলতাম- “ভুল করেছিলাম,
তোমাকে হারানোর মতো বড় ভুল আর নেই।”
এখন শুধু অনুতাপের দীর্ঘ রাত
আর স্মৃতির নীল আগুনে পুড়ে পুড়ে
আমি বুঝে যাচ্ছি ধীরে ধীরে –
তোমার মতো মানুষ জীবনে একবারই
আসে।
৮. অতৃপ্তির তুমি
তোমার সাথে কত সময় কাটিয়েছি,
তোমাকে দেখেছি সারা দিন, সারা বছর –
তবুও অতৃপ্তি রয়ে গেছে জীবনে।
সেই তুমি চলে গেছ
কীভাবে বেঁচে আছি, কীভাবে সময় কাটে,
সে তুমি জানো না…
কখনো সন্ধ্যার নির্জনতায় হঠাৎ মনে হয়,
এই বুঝি তুমি এসে দাঁড়াবে দরজার পাশে,
মৃদু হাসিতে বলবে –
“এতদিন পরেও কি আমাকে ভুলতে পারোনি?”
তোমার রেখে যাওয়া কিছু কথা
এখনও বাতাসে ভেসে আসে,
রাতের তারাদের দিকে তাকালে মনে হয়
ওদের ভিড়েই তুমি লুকিয়ে আছো কোথাও।
যে পথ ধরে একদিন পাশাপাশি হেঁটেছিলাম,
আজও সে পথ চেনে তোমার পায়ের শব্দ;
আমি শুধু একা দাঁড়িয়ে শুনি
স্মৃতির ভাঙা প্রতিধ্বনি।
তোমাকে আর ছুঁতে পারি না –
তবু তোমার ছায়া লেগে আছে জীবনের প্রতিটি কোণে,
ঘুমের ভিতর, জাগরণের ভেতর,
নিঃশব্দে তুমি রয়ে গেছো।
হয়তো এভাবেই কাটবে বাকি জীবন
অপূরণ আর অপেক্ষার মাঝখানে;
তোমাকে কাছে পেয়েও যে ভালোবাসা
কখনো পূর্ণ হলো না।
তবু জানো,
যদি আরেকটি জন্ম সত্যি কোথাও থাকে,
আমি আবারও খুঁজে নেব তোমাকে,
শুধু একবার তৃপ্তির মতো করে
তোমাকে ভালোবাসার জন্য।
৯. বদলে যাওয়া পৃথিবী
যে-পৃথিবীতে আমি এসেছিলাম
সেই পৃথিবী ছিল ভোরের শিশিরের মতো নির্মল,
মানুষের চোখে ছিল বিশ্বাসের আলো,
বাতাসে ভাসত অদেখা এক মমতার গন্ধ।
গাছের ছায়ায় বসে মানুষ গল্প বলত,
একটি হাসি অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যেত,
আকাশ ছিল নীল –
আর মন ছিল তার চেয়েও স্বচ্ছ।
কিন্তু আজ চারদিকে তাকিয়ে দেখি –
সেই পৃথিবী আর নেই।
রাস্তার ভিড়ে মানুষ আছে,
কিন্তু মানুষের ভেতর মানুষ যেন নেই।
শব্দ আছে, কোলাহল আছে,
তবু কোথাও এক অদ্ভুত নীরবতা জমে থাকে;
মুখে হাসি থাকে,
কিন্তু চোখের ভেতর ভাঙা আয়নার মতো ক্লান্তি।
যে পৃথিবীতে আমি এসেছিলাম,
আর যে পৃথিবী ছেড়ে যাব,
তারা আর এক নয় কোনোভাবেই।
সময়ের অদৃশ্য হাত
সবকিছু একটু একটু করে বদলে দিয়েছে।
স্বপ্নগুলো ছেঁড়া কাগজের মতো উড়ে গেছে,
বিশ্বাসগুলো ধুলোর মতো ঝরে পড়েছে,
আর ভালোবাসা –
সে যেন আজকাল খুব লাজুক, খুব দুর্লভ।
তবু কখনো কখনো সন্ধ্যার আকাশে
একটা তারা জ্বলে ওঠে,
আমি তখন ভাবি,
সবকিছু কি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে?
হয়তো না, হয়তো এখনো কোথাও
একটি শিশুর হাসি, একটি মানুষের মমতা,
এই ক্লান্ত পৃথিবীকে
নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে।
১০. খোঁজ
কত পথ, কত প্রান্তর, কত বন্দর কত লোকালয় ঘুরেছি,
ধুলোমাখা রেলপথ, নদীর ঘাট, অচেনা শহরের ভিড়ে
কত অন্ধকারে চোখ রেখে এতকাল যাকে খুঁজে ফিরেছি,
তারই ছায়া যেন ভেসে উঠেছে বারবার অদৃশ্য নীড়ে।
বহু সন্ধ্যা কেটেছে একাকী, বহু ভোর জেগেছে অপেক্ষায়,
নিস্তব্ধ রাতের জানালায় কেবল বাতাস এসে বলেছে কথা।
অপরিচিত মুখের ভিড়ে, হারিয়ে যাওয়া পদচিহ্নের রেখায়
আমি শুধু তারই স্পর্শ খুঁজেছি, তারই মায়ার ব্যথা।
কখনো দূরের কোনো ট্রেনের বাঁশি শুনে মনে হয়েছে –
সে বুঝি এইমাত্র নামল কোনো অচেনা প্ল্যাটফর্মে,
কখনো সন্ধ্যার ম্লান আলোয় মনে হয়েছে,
সে দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে আমার পথের ধারে।
কিন্তু এতদিনে বুঝি নিয়তি হেসে দিয়েছে গোপন ইশারা,
যাকে খুঁজে ফিরেছি শহর থেকে শহরে, প্রান্তর থেকে প্রান্তরে,
তারই কী-না দেখা পেয়ে গেলাম হঠাৎ একদিন
সিরাজগঞ্জের জামতৈল স্টেশনের কাছে
এক নির্জন, শ্রান্ত, শান্ত কুটীরে।
সেখানে বাতাসে ছিল ধানের গন্ধ,
দূরে শোনা যাচ্ছিল সন্ধ্যার আজানের সুর,
আর সে বসে ছিল জানালার পাশে,
মুখে নীরবতার আলো, চোখে বহুদিনের অপেক্ষার নীল নূর।
চোখে যেন বহুদিনের না বলা গল্প,
মুখে নিঃশব্দ এক মায়াময় ক্লান্তি।
তখন মনে হলো –
এতদিনের পথচলা, এত ক্লান্তি, এত দীর্ঘ প্রতীক্ষা
হয়তো বৃথা ছিল না।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ তার প্রিয় মুখটি
খুঁজে পায়ই
কোনো না কোনো নিভৃত কুটিরে,
কোনো এক অচেনা স্টেশনের পাশে,
যেখানে অপেক্ষা নিঃশব্দে বসে থাকে।
১১. অসম্পূর্ণ গল্প
একদিন চলে যাব গল্পটা অসম্পূর্ণ রেখে,
একদিন আর গল্প বলা হবে না,
একদিন দূর ছায়াপথে তারাদের গল্প শোনাবো,
এই পৃথিবীর আকাশ তখন নীরব হয়ে রবে না।
একদিন সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে যাবে আমার নাম,
কোনো পুরোনো গাছের পাতায় কাঁপবে স্মৃতির অবসান,
তুমি হয়তো জানালার ধারে বসে ভাববে –
কেন হঠাৎ থেমে গেল সেই চেনা কণ্ঠের গান।
একদিন আমার পথ হারিয়ে যাবে কুয়াশার ভিতর,
চেনা পথগুলোও চিনবে না আমার পায়ের ধ্বনি,
শুধু কোনো নিঃসঙ্গ রাত্রির গহীন প্রহরে
মনে হবে আমি যেন এখনও আছি তোমার সঙ্গেই কোথাও গোপনে জ্বলি।
একদিন পুরোনো খাতার ভাঁজে খুঁজে পাবে কিছু শব্দ,
যেখানে লেখা ছিল অর্ধেক স্বপ্ন, অর্ধেক ভালোবাসা,
পড়তে পড়তে হঠাৎ বুঝবে –
সেই গল্পের শেষ পাতা আর লেখা হলো না ভাষা।
একদিন নক্ষত্রের কাছে বসে বলব পৃথিবীর কথা,
এই মাটির সুখ দুঃখ, হাসি আর অশ্রুর ইতিহাস,
আর দূর থেকে দেখব –
তুমি কি এখনও সেই অসম্পূর্ণ গল্পের অপেক্ষায় উদাস।
কারণ মানুষ একদিন চলে যায় নীরবে
কিছু কথা না বলেই, কিছু স্বপ্ন অপূর্ণ রেখে,
তবু তার মায়া রয়ে যায় বাতাসের মতো –
নিভে যাওয়া প্রদীপের আলো হয়ে হৃদয়ের গভীর এক কোণে থেকে।
১২. কারও কারও থাকা
গল্পে কেউ থাকে, কেউ থাকে কবিতায়,
কেউ থাকে জনম জনম, কেউ ক্ষণিকা হয়।
কেউ থাকে মেঘের আড়ালে নীরব আবেশে,
কেউ নদী হয়ে অকূলে ভেসে যায় অনায়াসে।
কেউ থাকে চোখের কোণে নিভৃত আলোর মতো,
কেউ থাকে নীরব রাতে স্বপ্ন দেখায় সে অবিরত
কেউ আসে বসন্ত হয়ে গোপন বাগানে,
কেউ ঝরে যায় শরতের হলুদ পাতার টানে।
কেউ থাকে স্মৃতির ভাঁজে শুকনো ফুলের গন্ধে,
কেউ হারায় সময়ের স্রোতে অজানা কোন দ্বন্দ্বে
কেউ থাকে নীরবতায় অচেনা প্রতীক্ষায়,
কেউ হাওয়ার মতো এসে হাওয়াতেই মিলায়।
কেউ থাকে দূর নক্ষত্র হয়ে ছোঁয়া যায় না কখনো,
তবু সে নিভৃতে অন্ধকারে জ্বেলে রাখে আলো।
কেউ থাকে স্বপ্ন হয়ে গভীর রাত জুড়ে,
ভোর হলেই মিলিয়ে যায় শিশিরভেজা ঘাসের ঘোরে।
কেউ আসে ক্ষণিকের মতো, তবু থেকে যায় মনে,
পুরনো চিঠির গন্ধ হয়ে রয় দীর্ঘ জীবনের কোণে-
কেউ থাকে অশ্রুজলে অদৃশ্য নীল ছায়ায়,
কেউ আবার ভালোবেসে নীরবেই হারায়।
কেউ থাকে স্মৃতির মতো ধরা দেয় না স্বরূপ
হৃদয়ের গোপন কোণে রেখে যায় ব্যথার ধূপ,
গল্পে কেউ থাকে, কেউ থাকে কবিতায় –
আর কেউ রয়ে যায় শুধু অপূর্ণ ভালোবাসায়।
১৩. বিষনাগমণির রাত
কালরাতে ঝাউঝোপের অন্ধকারের ভেতর থেকে
উন্মুখ বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছিল তোমার দেহ –
তোমার বাজুবন্ধ তখন ঝুমঝুম করে বাজছিল
যেন কোনো প্রাচীন দেবালয়ের গোপন ঘণ্টাধ্বনি।
চাঁদের ধবধবে আলো নেমে এসেছিল কটিতে,
রূপার বিছা হয়ে জড়িয়ে ছিল তোমার সরু নিতম্বে –
তোমার দেহরেখা তখন জ্যোৎস্নায় ভেজা
অপরূপ এক লাবণ্যময় তরঙ্গ।
কালো কেশের খোঁপায় হঠাৎ ফুটে উঠল
কুন্দফুলের শুভ্র নেশা,
কণ্ঠে পদ্মকুসুম খচিত মণিহার
তোমার নিঃশ্বাসের ছন্দে দুলছিল ধীরে ধীরে।
বসন্তবাতাসে উড়ে যাচ্ছিল তোমার চুল –
যেন স্বর্গের অপ্সরারা
রাত্রির আকাশে খুলে দিয়েছে তাদের গোপন কেশরাশি।
চোখের কোণে এসে পড়ছিল
শত নক্ষত্রের দীপ্ত অস্থির আলো,
তুমি যেন তখন
মানুষ নও, কোনো পৌরাণিক উর্বশী।
জ্যোৎস্নার দ্যুতিতে তোমার শরীর কাঁপছিল মৃদু,
সেই কম্পন ছড়িয়ে পড়ছিল
রাত্রির নিস্তব্ধতা জুড়ে।
নাভির ঠিক উপরে জ্বলছিল
এক অলৌকিক বিষনাগমণি –
গাঢ় নীল আগুনে দীপ্ত সেই মণি
ডেকে নিচ্ছিল আমার সমস্ত প্রাণ।
তুমি তখন ফিসফিস করে বললে,
এসো… স্পর্শ করো…
তোমার কণ্ঠে ছিল
অরণ্যের গভীর কোনো মোহিনী সুর।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে যাই,
আঙুল ছুঁই সেই নীল মণিখণ্ডে।
মুহূর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে দহন –
অস্থিচর্ম ভেদ করে
নীল আগুন ছড়িয়ে পড়ে রক্তের ভিতরে,
আমার শরীর হয়ে ওঠে এক জ্বলন্ত নক্ষত্র।
চারদিক লেলিহান শিখায় কাঁপতে থাকে,
রাত্রির আকাশ নীল বিষে দগ্ধ হয়ে ওঠে।
আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠি –
এ কী দহন!
আমাকে তুমি এ কী করলে?
তুমি তখনও দাঁড়িয়ে আছো –
নিরুত্তর, স্তব্ধ, অলৌকিক হেম,
চোখে তোমার গাঢ় কোনো অনন্ত রাত।
তোমার ঠোঁটে ছিল অদ্ভুত এক অর্ধেক হাসি
যেন তুমি জানো
এই দহনই প্রেমের শেষ পরিণতি।
আর আমি ধীরে ধীরে
জ্যোৎস্নার ভিতর ঢলে পড়তে থাকি –
এক অদ্ভুত নীল মৃত্যুর কোলে,
যেন বিষনাগমণির আগুনে
পুড়ে নিভে যাচ্ছে
এক দগ্ধ নক্ষত্রের শেষ আলো।
১৪. জেসমীন
মেয়েটির নাম জেসমীন, সাদা ফুলের মতো
নির্মল কোমল প্রাণের এক মেয়ে,
প্রাণোচ্ছল তার হৃদয়মন –
সুদূর বোস্টন শহর থেকে সাহিত্য–সংস্কৃতির
সুবাস ছড়িয়ে দেয় অদৃশ্য বাতাসের মতো
পৃথিবীর নানা প্রান্তে।
জেসমীনের জন্ম বাংলাদেশের কালীগঙ্গার পারে,
সবুজ গ্রাম আর নদীর নরম স্রোতের পাশে,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের আলোয়
সে গড়ে তোলে স্বপ্নের ভিত –
তারপর একদিন স্বপ্নের ডানায় ভর করে
পাড়ি জমায় সুদূর মার্কিন মুলুকে।
দূর সমুদ্রের ওপারেও
তার কণ্ঠে ভেসে থাকে দেশের সুর,
শিউলি-ভেজা ভোরের মতো নির্মল
তার অন্তরের নিলয়।
কখনো সে লেখে কবিতার পঙ্ক্তি –
শরতের মেঘের মতো শুভ্র, শান্ত ও স্বচ্ছ;
কখনো তার কথার ফাঁকে
নীরবে ঝরে পড়ে বাংলার মাটির অমল গন্ধ।
অচেনা শহরের ঝলমলে আলোয় দাঁড়িয়ে
সে ভুলে না গ্রামের আকাশ,
ভুলে না নদীর ধারে কাশফুল দোলার দিন,
কালীগঙ্গার জলে এখনও ভাসে
তার শৈশবের স্বপ্নের ছায়া,
সেই স্বপ্ন আজও তাকে ডাকে
নির্মল কোনো বিকেলের মতো।
জেসমীন যেন দুই তীরের মাঝখানে
জেগে থাকা এক অলৌকিক সেতু –
এক পাশে বাংলাদেশ,
অন্য পাশে দূর আমেরিকার বোস্টন নগরী।
তবু হৃদয়ের গভীরে
সে রয়ে গেছে মাটির কাছাকাছি,
সাদা ফুলের মতো কোমল
আলো ছড়ানো এক মানবী।
ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের বন্ধনটিও বড়ো আশ্চর্যের,
কবে থেকে, কীভাবে জন্ম নিয়েছে
তা ঠিক জানা নেই।
কেবল দিনশেষে জানি, সে আমার বন্ধু,
শুধু বন্ধুই একজন,
যে নীরবে আমার জন্য মঙ্গল প্রার্থনা করে প্রতিদিন,
যেখানে দূরত্বও হার মানে
একটুখানি আন্তরিক শুভেচ্ছার কাছে।
জেসমীন, তুমি পৃথিবীর যেখানেই যে
ছায়ালোকে থাকো, তোমার এই নির্মল, মঙ্গলময়
হৃদয়ই আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর কবিতা।
১৫. বৃষ্টিতে একাই ভিজতে হবে
বৃষ্টিতে একাই ভিজতে হবে,
সবসময় কেউ একজন মাথার উপর ছাতা
ধরবে না,
জীবনের পথে অনেক দূর
নিজেকেই হাঁটতে হবে নীরবতা জড়িয়ে।
যে হাত একদিন ছায়া হয়ে ছিল মাথার উপর,
সে হাতও কোনো এক বিকেলে
অচেনা ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে যায়।
আকাশ তখনও ঝরে,
কিন্তু পাশে থাকে না কারও উষ্ণতা,
মেঘের নিচে দাঁড়িয়ে তখন বুঝি –
সব পথ একসাথে হাঁটার নয়,
কিছু পথ শুধু নিজেরই জন্য
একাকী লিখে রাখা নিয়তি।
তাই বৃষ্টি নামলে আজ আর ভয় পাই না,
ভেজা শরীরেই শিখে নিয়েছি দাঁড়িয়ে থাকতে –
কারণ জীবন শেখায়
ছাতা হারালে আকাশকে দোষ দিতে নেই,
বরং ভিজে ভিজেই
নিজের ভেতর জন্ম দিতে হয় নতুন সাহস।
বৃষ্টিতে একাই ভিজতে হবে –
এই সত্যটা মেনে নিলেই দেখা যায়,
মেঘের আড়াল পেরিয়ে
একদিন রোদও ঠিক নিজেরই হয়ে ওঠে।
১৬. প্রেম মানে
প্রেম মানে তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে
লক্ষ বার মরে যাওয়া যায়,
তোমার দৃষ্টির গভীরে ডুবে গিয়ে
আবার নতুন করে বেঁচে ওঠা যায়।
প্রেম মানে তুমি ঘুমাও
আমি একটা আস্ত রাত জেগে থেকে তোমাকে দেখি,
চাঁদের আলোয় তোমার নিঃশ্বাস গুনি
আর নীরবে স্বপ্নের পাহারায় থাকি।
প্রেম মানে তোমার কপালের পাশে
চুলের এলোমেলো ছায়া সরিয়ে দেওয়া,
তোমার নিদ্রিত মুখের দিকে তাকিয়ে
হৃদয়ের সব ক্লান্তি ভুলে যাওয়া।
প্রেম মানে কোনো শব্দ নয়,
তবু হাজার গল্প বলা হয় নীরবে;
তোমার হাতের উষ্ণতায়
আমার সমস্ত শীত গলে যায় ধীরে ধীরে।
প্রেম মানে পৃথিবী থেমে যাক তবু
তোমার পাশেই সময় কাটুক,
তোমার একটুখানি হাসির জন্য
জীবনটাও নিঃসংকোচে হারিয়ে যাক।
প্রেম মানে
তুমি আছো বলেই আকাশ এত নীল,
তুমি আছো বলেই রাত এত মায়াময়,
আর তোমার চোখের ভেতরেই
আমার সমস্ত জীবন শান্ত হয়ে রয়।
১৭. শিমুলের মধুবেলা
এবারও শিমুলের রক্তগন্ধ নেওয়া হলো না,
লাল পাপড়ির ভেতর জমে থাকা উষ্ণ অমৃত ঠোঁটে ছুঁয়ে দেখার আগে
সন্ধ্যার হাওয়ায় ভেসে গেল অচেনা কোনো নেশা হয়ে।
এবারও রোদ্রগন্ধী দেহখানি
চৈত্রের রৌদ্রে ধীরে ধীরে জ্বলতে থাকল,
তবু স্পর্শের ঢেউ এলো না,
কাঁপেনি হৃদয়ের গোপন অরণ্য,
জাগেনি শরীরের অগোচর বসন্ত।
মধুমাস এলো, কিন্তু মধুক্ষণগুলো রইল
অপরিণত ফুলের মতো নীরব,
অপেক্ষায় টলমল করা
অব্যক্ত এক উন্মাদনার ভিতর।
তুমি তখন এই শহরেই
হেমবতীর শাড়ি পরে হাঁটছিলে বসন্তের পথ ধরে,
তোমার কাঁধে ঝরে পড়ছিল পলাশের আগুনগন্ধ,
চুলের ফাঁকে ফাঁকে বসন্তের মাতাল রোদ।
চৈত্রের নরম বাতাসে
তোমার মখমল ওড়না উড়ে উঠছিল বারবার, মনে হচ্ছিল, আকাশের নীলের ভিতর একটি উন্মুক্ত পাখি ডানা মেলেছে।
শিমুলের মধুকুসুম তুলে
তুমি ঠোঁটে ছুঁয়েছিলে রক্তিম রস,
ধীরে ধীরে তোমার চোখে উঠেছিল
এক আদিম দীপ্তি –
মাটির গভীর উর্বরতার মতো
স্নিগ্ধ অথচ উন্মত্ত।
তুমি তখন হয়ে উঠেছিলে
বসন্তের উষ্ণ উর্বরতা,
এক পূর্ণ, দীপ্ত, দহনময় বীর্যাবতী।
জেনো, আবারও শিমুল ফুটবে এখানেই,
লাল অগ্নিশিখা হয়ে উঠবে বনভূমির বুকে।
আমরা তখন মধুবনের ছায়ায়
কুসুমের পাত্র থেকে মধু তুলে নেব ধীরে ধীরে,
আর শরীরভরা বসন্তের গন্ধে
মাতাল হয়ে উড়ব দু’জন
দিগঙ্গনার মতো উন্মুখ, অবাধ, উন্মত্ত
পাগল হাওয়ার উষ্ণ প্লাবনে
ভেসে যাব দূর, আরও দূর
অপরূপ কোনো নীল অজানায়।
১৮. অদৃশ্য মানচিত্র
তুমি আমায় খুঁজতে চেয়েছো
তবে খুঁজো, আমায় পড়ো –
আমার চোখের গভীরে জমে আছে
নক্ষত্রহীন বহু অনুচ্চারিত বাক্য,
আমার নীরবতাই তোমার জন্য লেখা
অদৃশ্য কোনো গানের মতো কবিতা।
তুমি জীবন জানতে চেয়েছো
আমায় ছুঁয়ে দেখো –
আমার শ্বাসের ভেতর বয়ে যায়
ঋতুর পালাবদলের দীর্ঘ পথ,
আমার চলার ধুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে
অজানা দিনের মানচিত্র।
তুমি ক্রন্দন শুনতে চেয়েছো
তবে আমায় শোনো –
আমার হৃদয়ের আঙিনায় জেগে থাকে
নিদ্রাহীন বহু তারার কম্পন,
আমার নাম উচ্চারণ করলেই
তোমার ভোরে বাজে অচেনা বাঁশির ধ্বনি।
তুমি সুখের খোঁজ করেছো
আমায় কাছে নাও –
আমার হাসির ভেতর গলে থাকে
সোনালি রোদে ধোয়া অলস দুপুর,
আমার হাত ধরলেই তোমার ক্লান্তি ঝরে পড়ে
পাতাঝরার মতো নীরবে।
তুমি পথের দিশা চেয়েছো
আমার পাশে বসো –
আমার দিন আর রাতের সীমানায় লুকিয়ে আছে
অনেক অচেনা পথের স্মৃতি,
তুমি এলেই সেই পথগুলো হঠাৎ
আলোর দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।
আর যদি কখনো আমায় ছেড়ে যেতে চাও
চলে যেও, পিছনে না তাকিয়ে –
আমি মেঘের ওপারে খুলে দেবো
আরেকটি নীল দরজা,
যেখানে হারিয়ে যাওয়া মানেই
নতুন করে ফিরে পাওয়া তোমার আর
আমার প্রেম।
১৯. মা’কে মনে পড়ে
ভাত খেয়ে হাত ধুয়ে
মায়ের আঁচলে হাত-মুখ মুছি –
সেই আঁচলেই লেগে থাকে
ভাতের গন্ধ, বিকেলের রোদ,
আর আমার হাতের ছোঁয়া।
ছুটি শেষে যখন ঢাকায় ফিরে আসি,
মা তখন সেই একই আঁচলে
গোপনে মুছে নেয় চোখের জল।
কী আশ্চর্য মায়া –
মায়ের আঁচলের এক পাশে আমার শৈশব,
আরেক পাশে মায়ের কান্না।
২০. তোমার নামে সব
তোমার নামে সব লিখে দিতে চাই –
আমার নদী, সাগর, পাহাড়, অরণ্য,
তোমাকে দিয়ে দিতে চাই
আমার গ্লানি, দুঃখ, দীনতা।
আমার হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা দান করে
নিজেকে ফতুর করতে চাই,
তোমার দু’চোখের গভীর নীলিমায়
ডুবিয়ে দিতে চাই আমার সমস্ত ক্লান্তি।
তোমার নামে উৎসর্গ করতে চাই
আমার জাগ্রত ভোরের প্রথম আলো,
আমার রাত্রির গোপন দীর্ঘশ্বাস,
আমার বুকের ভেতর জেগে থাকা
অসংখ্য অব্যক্ত উচ্চারণ।
তোমার স্পর্শে ছড়িয়ে দিতে চাই
আমার শিরায় শিরায় জেগে থাকা বসন্ত,
আমার রক্তে বয়ে যাওয়া
অরণ্যের গোপন সবুজ সুর,
আমার মাটির গন্ধমাখা সমস্ত স্বপ্ন।
আর একদিন –
যখন আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো
সব দান শেষ করে,
তখন শুধু তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে
বলব – দেখো,
আমি তো কিছুই রাখিনি নিজের জন্য।
আমার আকাশ, বাতাস, নদী, হৃদয়,
সবই তোমার নামে লিখে দিয়েছি,
তুমি শুধু আমাকে রেখো
তোমার ভালোবাসার এক কোণে।
সন্ধ্যার আকাশে হারিয়ে যাওয়া পাখির মতো
আমার পথভোলা দিনগুলো
তোমারই নীড়ে ফিরে আসুক –
আর আমি সারা জীবন
তোমারই নামেই বেঁচে থাকতে চাই।
২১. নিবিড় রাতের অশ্রু
পৃথিবীর কোন্ কোণে কে আমাকে মনে রেখেছে,
তা কী আমি অনুভব করতে পারি?
কে কোথায় এক ফোঁটা অশ্রু ফেলেছে রাত্রির নিবিড়ে,
কার নিঃশ্বাসে জেগে আছে আমার নামের গোপন আলো?
হয়তো কোনো দূর জানালার পাশে
নিঃশব্দে বসে আছে কেউ –
তার আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে আছে স্মৃতিরা,
আমার কথা ভেবে হঠাৎ থেমে যায় তার রাতের গান।
হয়তো কোনো নির্জন নদীর ধারে
আমার জন্য রেখে গেছে কেউ অপ্রকাশিত কথা,
চাঁদের আলোয় ভেসে ওঠে সেই সব অনুচ্চারিত বাক্য
আর বাতাসে ভেসে আসে এক অচেনা মমতার গন্ধ।
পৃথিবী এত বড় –
তবু কোথাও না কোথাও
কোনো এক হৃদয়ের গভীরে
আমার জন্য একটু কোমল জায়গা রয়ে গেছে নিশ্চয়ই।
হয়তো কেউ ঘুমের আগে
আমার নামটুকু মনে করে একবার,
হয়তো অকারণে ভিজে ওঠে তার চোখ
যেন আমারই কোনো অদৃশ্য স্পর্শে।
আমি তা দেখি না, জানি না –
তবু মাঝেমাঝে হঠাৎ মনে হয়,
এই নিস্তব্ধ রাতের ভেতর
কারও নিঃশব্দ ভালোবাসা আমাকে ঘিরে আছে।
২২. থেকে যাওয়ার ইচ্ছে
যে চলে যাবে তাকে হাত টেনে ধরে রাখলেও
সে চলে যাবে,
যে সময় কাটাতে চায় তাকে একান্ত কাছের করে
দিয়া বাড়ির মোড়ে টং দোকানের বেঞ্চে বসে
চা খেতেও ভালো লাগবে,
আর ভালো না লাগলে রেডিসনের কিটক্যাট ক্যাফেতে বসেও কফি খেতে তার ইচ্ছে হবে না।
যে মনটা সত্যি পাশে থাকতে চায়
সে সন্ধ্যার ম্লান আলোয় ফুটপাথ ধরে হেঁটেও
সুখ খুঁজে পায়,
আর যে মন চলে যেতে চায়
সে হাজার আলো ঝলমলে শহরেও অকারণ
অন্ধকার খুঁজে নেয়।
যে মানুষটা আপনার গল্প শুনতে চায়
সে মাঝরাতে ফোনের ওপাশে নিঃশব্দেও বসে থাকে,
আর যে শুনতে চায় না
সে দিনের আলোতেও আপনার কথা এড়িয়ে যায়।
যে সত্যি ভালোবাসে
সে পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের ধুলোমাখা বিকেলেও
স্বপ্ন দেখে,
আর যে ভালোবাসে না
সে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়েও কোনো ঢেউ
অনুভব করে না।
কারণ থাকা–না থাকার হিসাবটা
জায়গা, সময় কিংবা কফির কাপে লেখা থাকে না,
লেখা থাকে শুধু মানুষের মনে,
থেকে যাওয়ার এক নীরব ইচ্ছেতে।
তাই কাউকে ধরে রাখার জন্য
পৃথিবীর সব সুন্দর জায়গা সাজিয়ে রাখার
দরকার নেই,
যে থাকতে চায়
সে আপনার একাকীত্বের পাশেও বসে থাকবে
এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের মতো উষ্ণ হয়ে।
২৩. নিরঞ্জনার পথে
তোমাকে নিয়ে একদিন এই শহরের বাইরে
চলে যাব, ধুলো, শব্দ, ক্লান্তি পেরিয়ে
কোনো নির্জন বিকেলের দিকে।
তুমি হাত ধরে থাকবে,
তোমার আঙুলে তখন থাকবে
আমার সমস্ত পথের নিশ্চয়তা।
নিরঞ্জনা নদীর মতো কোনো একটি নদী
খুঁজে বের করব,
যার জলে আকাশের নীল ঘুমিয়ে থাকে,
যার ঢেউয়ের ভেতর শোনা যায়
অতীতের অচেনা কোনো বাঁশির সুর।
সেখানেও থাকবে উলুখাগড়ার বন
শরতের হালকা বাতাসে দুলবে সাদা
তুলোর মতো ফুল,
তার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
তোমার শাড়ির আঁচলে লেগে থাকবে
ঘাসের শিশির আর বুনো মাটির গন্ধ।
আমরা হারিয়ে যাব গভীর অরণ্যে –
যেখানে মাটির গায়ে ঝরে পড়া পাতার শব্দ
মনে হবে বহুদিনের কোনো চিঠি খুলে পড়ছি,
যেখানে গাছেরা মাথা ঝুঁকিয়ে
আমাদের প্রেমের গল্প শুনবে।
দূরে কোনো নাম না-জানা পাখি ডাকবে,
সূর্য ডুবে যাবে লাল রঙের গভীরতায়,
তুমি চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে
যেন চোখের ভেতর দিয়ে
একটি দীর্ঘ নদী বয়ে যাচ্ছে।
আমরা আজ শুধু মানুষ নই –
আমরা আজ নদীর ধারে জন্ম নেওয়া
দুটি বাতাস, দুটি হারিয়ে যাওয়া পথের মায়া।
যদি কোনোদিন কেউ আমাদের খুঁজতে আসে,
তারা হয়তো শুধু দেখবে
উলুখাগড়ার বনে দুলছে সাদা আলো,
নদীর জলে ভাসছে সন্ধ্যার রঙ,
আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে
দুটি মানুষের অসমাপ্ত প্রেমের গল্প।
২৪. অনন্ত রাত্রির ভিতর
কোন এক সূর্য অস্তমিত মৌন সন্ধ্যায়
সূর্য তার লাল আভা ছড়িয়ে দিয়ে ডুবে যাবে,
পাখিরা কুলোয় ফিরে যাবে,
সন্ধ্যামালতী সুবাসিত হয়ে ফুটে উঠবে,
সারা আকাশ তারায় তারায় জ্বলে উঠবে –
আমি সব সৌন্দর্যের আবেশ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ব।
যদি ভোরবেলায় আমার আর ঘুম না ভাঙ্গে!
আমি সেই রুপালি সকালের ঝকঝকে রোদ দেখতে পাবো না।
তখন হয়তো জানালার পাশে এসে দোল খাবে
দখিনা নির্মল বাতাস,
দূরের কোনো গাছে বসে শালিক ডাকবে ধীরে,
কিন্তু সেই ডাক আমার কানে আর পৌঁছাবে না।
শিশিরভেজা ঘাসের উপর সূর্যের প্রথম আলো পড়বে,
তবু সেই ঝিলমিল সকাল আমার চোখে
ধরা দেবে না।
কেউ হয়তো এক কাপ চা বানাবে অভ্যাসবশে,
বাষ্প উঠবে ধোঁয়ার মতো –
আর পৃথিবী তার নিজস্ব ছন্দে চলতে থাকবে।
নদী তার জলে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সকালের রোদ,
হাওয়ায় ভেসে আসবে কিশোর বাঁশির সুর,
শিউলি ফুল ঝরে পড়বে নির্ঝর শব্দে –
কিন্তু আমি থাকব অন্য এক গভীর নীরবতায়।
হয়তো তখন আমার স্বপ্নগুলো
তারাদের ভিড়ে ছোট ছোট প্রদীপ হয়ে জ্বলবে,
আর এই পৃথিবীর সব সৌন্দর্য
নিঃশব্দে এসে বসবে আমার ঘুমের পাশে,
যেন আমি ঘুমিয়ে আছি –
এই মহাবিশ্বের এক মায়াময়, অনন্ত রাত্রির ভেতর।
২৫. অজানা তারিখ
আমার মৃত্যুর তারিখ
ঐ তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের ভেতরেই কোথাও
লুকিয়ে আছে –
কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায়
চুপচাপ দাগ কেটে রাখা এক অদৃশ্য দিন।
কিন্তু সে তারিখটা
আমার জানা হবে না কোনোদিন,
আমি শুধু প্রতিদিনের সূর্যোদয় দেখে ভাবব,
আজও কি সে দিনটি নয়?
হয়তো কোনো ভোরবেলা
শিউলি ঝরা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ থেমে যাবে আমার সমস্ত পথচলা,
পাখিরা তখনও গান গাইবে,
আকাশে রোদ উঠবে স্বাভাবিকের মতোই।
হয়তো কোনো গোধূলিতে
সূর্য লাল আভা ছড়িয়ে ডুবে যাবে,
আর আমি বুঝতেই পারব না –
এটাই ছিল আমার শেষ দেখা সন্ধ্যা।
পৃথিবী তবু তার নিয়মে ঘুরবে –
কোথাও শিশুরা হাসবে,
কোথাও নদী নীরবে বয়ে যাবে,
কোথাও কোনো অচেনা মানুষ
আমার নামটাও জানবে না।
শুধু আমার জীবনের ক্যালেন্ডারে
একটি তারিখ নিঃশব্দে জ্বলে উঠবে –
যেদিন আমি পৃথিবী থেকে সরে গিয়ে
মিশে যাব বাতাসে, মেঘে, নক্ষত্রের আলোয়।
আর বাকি তিনশো চৌষট্টি দিন
আমার জন্য রয়ে যাবে
একটি মায়াময় স্মৃতির মতো –
যেন আমি হেঁটে গেছি এখানে,
একটু ভালোবাসা রেখে গেছি পৃথিবীর বুকে।
২৬. কুসুমপুরের মাটি
নওদাফুল কোচা,
ইছামতীর উপনদী বয়ে যেত যে গাঁয়ের বুক চিরে,
যেখানে দুপুরে ঝিঁঝিঁ পোকার গান
আর সন্ধ্যায় খোলা ভিটায় শুয়ে
তারাভরা আকাশ নামত চোখের তারায়।
আঁড়াবনে পেঁচার ডাক,
মসজিদে কামাল মুন্সীর এশার আযান,
মাঝি বাড়ি, ঘোষ বাড়ি,
ছোনগাছার হাটে পুজোর মেলা –
সব মিলিয়ে এক গ্রাম,
ধূপ-ধুনোর মতো মায়াময়।
জারুল বনের পাশে খেলার মাঠ,
শিমুল-কৃষ্ণচূড়ার আগুনরঙা বসন্ত,
বাঁশঝাড়ের ফাঁকে পূর্ণিমার চাঁদ,
পুকুরের জলে ভেসে থাকা আরেকটা চাঁদ
চেয়ে দেখত আমার গ্রামকে।
একদিন হলুদ এক প্রজাপতি
এসে বসেছিল আমার হাতে –
সেদিনই নীরবে
বাবা হারিয়ে গিয়েছিলেন পৃথিবীর চেতনা থেকে।
আজ শহরের ভিড়েও
ভেসে আসে সেই মাটির গন্ধ
মহুয়ার মতো পাগল করা,
কুসুম কুসুম সুবাসে ভরা।
তাই আমার গ্রামকে
আজ ডাকতে ইচ্ছে করে
কুসুমপুর।
হায়, কবে ফিরব আবার
সেই মাটির কাছে –
যেখানে নিঃশব্দে
ঘুমিয়ে আছেন আমার মা।
২৭. চোখ
তুমি আমার চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তির রেখাগুলো দেখলে,
কিন্তু সেই চোখেই ভোরের শিশিরভেজা মাধুর্য যে জেগে আছে, তা দেখলে না।
তুমি আমার দৃষ্টির নিস্তব্ধতা পড়লে,
কিন্তু তার ভেতরে জ্বলতে থাকা নক্ষত্রের মতো ক্ষুদ্র আলোদের কথা শুনলে না।
তুমি আমার চোখের নিচে জমে থাকা সন্ধ্যার ছায়া দেখলে,
কিন্তু সেই চোখের ভেতরে আঁকা নীল আকাশের অসংখ্য তারা দেখলে না।
তুমি আমার চাহনির স্থিরতা বুঝলে,
কিন্তু তার গভীরে ঢেউ তোলা আলোর ভাষা বুঝলে না।
তুমি আমার চোখে জমে থাকা ক্লান্ত দিনের ধুলো দেখলে,
কিন্তু সেই চোখেই গোপনে বোনা রঙিন স্বপ্নের অরণ্য দেখলে না।
তুমি আমার চাহনির অবসাদ পড়লে,
কিন্তু তার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া আশার স্বচ্ছ নদীটা দেখলে না।
তুমি আমার চোখের কোণে জমে থাকা সন্ধ্যাতারার ম্লান আলো দেখলে,
কিন্তু সেই চোখের গভীরে জেগে থাকা ভোরের প্রথম সূর্যরেখা দেখলে না।
তুমি আমার দৃষ্টির নীরবতা চিনলে,
কিন্তু তার ভেতরে বাজতে থাকা অদৃশ্য স্বপ্নের সুর শুনলে না।
তুমি আমার চোখের পাতায় নেমে আসা ক্লান্ত রাতের ছায়া দেখলে,
কিন্তু সেই চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা আলোকময় প্রতীক্ষা দেখলে না।
তুমি আমার দৃষ্টির নিস্তব্ধতা বুঝলে,
কিন্তু সেই দৃষ্টির অন্তরালে জেগে থাকা আশার দীপশিখাটা দেখলে না।
২৮. পাগলামির প্রেম
চৈত্রের তপ্ত দুপুরে প্রেমিকাকে সাথে নিয়ে পিচঢালা পথের উপর হারমণিকা বাজিয়ে
চিৎকার করে সবাইকে ডেকে পরিচয় করে দেবো –
এই মেয়ে আমার প্রেয়সী।
তারপর রোদে গরম হয়ে ওঠা রাস্তাটাকে
মঞ্চ বানিয়ে দু’হাত তুলে বলবো –
শোনো পৃথিবী,
এই মেয়েটার হাসির কাছে সব শহরের আলো হার মানে।
হাটের ভিড়ের মাঝে হঠাৎ দাঁড়িয়ে তার
নাম ধরে ডাকবো বারবার,
যেন নামটা আকাশে উড়ে যায় ঘুড়ির মতো।
বিকেলের শেষে নদীর পাড়ে গিয়ে
জল ছুঁড়ে লিখে দেবো তার নাম,
আর বলবো – দেখো নদীও আজ আমাদের গল্প বয়ে নিয়ে যাবে।
একদিন বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে তার হাত ধরে হাঁটবো দীর্ঘ রাস্তা,
আর পথচারীরা অবাক হয়ে দেখবে –
দুইটা মানুষ কীভাবে এতখানি পাগল
হতে পারে।
তারপর কোনো এক নির্জন সন্ধ্যায়
শহরের সব আলো নিভে গেলে আমি আবার হারমণিকা বাজাবো ধীরে,
আর ফিসফিস করে বলবো –
পৃথিবীর যত পাগলামি আছে সব আমি
করতে রাজি –
যদি তুমি শুধু বলো – আমি আছি,
তোমার পাশে চিরদিন।
২৯. অতিরিক্ত সময়
এই ব্রহ্মাণ্ডের বিশাল স্টেডিয়ামে
আমি নেমেছিলাম একদিন খেলোয়াড় হয়ে,
সময়ের রেফারি বাঁশি বাজিয়েছিল জন্মের মুহূর্তে,
আর ঘাসভেজা এই পৃথিবীর মাঠে
শুরু হয়েছিল জীবনের খেলা।
দৌড়েছি বহুবার, কখনো জয়ের উল্লাসে,
কখনো হারের নিঃশব্দ ক্লান্তিতে,
বন্ধুত্বের পাস পেয়েছি,
ভালোবাসার গোলও করেছি বহুবার,
আবার কত সুযোগ
নিজের পায়ের কাছেই হারিয়েছি।
নব্বই মিনিটের খেলা কখন যে শেষ হয়ে গেল
ক্যালেন্ডারের পাতাগুলোই শুধু
চুপচাপ জানে তার হিসাব।
এখন আমি খেলছি অতিরিক্ত সময়,
এই সময়ের আকাশে একটু মেঘ থাকে
হাওয়া একটু ধীর, আর দর্শকসারির শব্দও
অদ্ভুতভাবে মায়াময়।
এখন আর গোল করার তাড়াহুড়ো নেই,
শুধু মাঠের ঘাস ছুঁয়ে দেখি –
কতদিন ধরে এই পৃথিবী
আমার পায়ের ছাপ বহন করে আছে।
কখনো মনে হয় যে কোনো মুহূর্তে
রেফারির শেষ বাঁশি বাজবে,
তবু ততক্ষণ পর্যন্ত আমি ধীরে ধীরে বলটা
এগিয়ে নিয়ে যাই।
সূর্যাস্তের আলো পায়ের কাছে গড়িয়ে পড়ে,
কারণ জানি – খেলা শেষ হলেও
এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের স্টেডিয়ামে আরও কত খেলোয়াড় নামবে,
আর আমার খেলার স্মৃতি বাতাসে ভেসে থাকবে মহাকালের সন্ধ্যার আলোয়।
৩০. হাসিমুখে বিদায়
আমার জন্য একদিন একটি দরজা খুলবে,
যে দরজার ওপারে আছে নিঃশব্দের গভীর আলো।
আমি ভয় পাই না সেই দরজাকে,
বরং মনে হয়, দীর্ঘ পথ হাঁটার পরে
কেউ যেন ভারী কণ্ঠে বলছে –
এবার এসো, বিশ্রাম নাও।
আমি তো বেঁচে ছিলাম পূর্ণ হয়ে
জীবনের রোদে, বৃষ্টিতে, জোছনায়।
একজন অসাধারণ স্ত্রীর হাত ধরে
দীর্ঘ পথ হেঁটেছি,
তার চোখের ভেতর আমি দেখেছি
ঘর নামের এক অনন্ত আশ্রয়।
আমার জীবনে
কোনো অপূর্ণতার ভার জমে নেই,
কোনো অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষার দীর্ঘশ্বাসও না।
যা পেয়েছি তা যেন আকাশভরা নক্ষত্র –
হাতে ধরতে পারিনি
তবু আলোয় ভরে গেছে পুরো জীবন।
তাই যখন যাব,
আমার জন্য কেউ কাঁদবে না,
আমি চাই না চোখে জল জমুক কারও।
আমাকে মনে রেখো একটা হাসির মতো,
একটা শান্ত বিকেলের বাতাসের মতো।
কারণ আমি তো যাচ্ছি না হারিয়ে-
আমি কেবল একটি দীর্ঘ দিনের শেষে
সূর্যের মতো ধীরে ধীরে ডুবে যাবো
রঙ ছড়িয়ে দিয়ে আকাশজুড়ে।
আর বিশ্বাস করো,
যে জীবন আমি কাটিয়েছি
তার চেয়ে সুন্দর জীবন সম্ভবত আর
হয় না।
তাই আমার বিদায় কোনো শোক নয়,
এ এক পরিপূর্ণতার নীরব উৎসব,
যেখানে আমি হাসিমুখে শেষ আলোয় ভেসে যেতে চাই অনন্তলোকে।
৩১. শেষ পথের যাত্রী
কোর্টের সিঁড়ি পেরিয়ে
একটি সম্পর্কের কাগজে সই করে
দুজন মানুষ আলাদা হয়ে গেল,
যেন নদীর দুই তীর, হঠাৎ বুঝতে পারে
তাদের মাঝখানে জল বেড়ে গেছে অনেক।
স্বামীটি বেরিয়ে এসে
একটি অটোতে গিয়ে বসে, মুখে ক্লান্ত নীরবতা,
চোখে ভাঙা দশ বছরের সংসার।
হঠাৎ অটোর অন্য পাশে
মৃদু পায়ে এসে বসে নমিতা, যার সঙ্গে একসময়
শীতের সকালের চা
আর বর্ষার দুপুর ভাগ করে খেয়েছিল সে।
একবার চোখ তুলে তাকায় পুরুষটি
সেই দৃষ্টি যেন প্রশ্নে ভরা,
এত সহজে কি শেষ হয়ে যায়
একটি ঘর?
নমিতা নিভে আসা হাসি দিয়ে বলে –
রেল স্টেশন বাস পর্যন্ত শেষ পথটা
তোমার সাথেই যেতে চাই।
কথাগুলো খুব ছোট ছিল,কিন্তু তার ভেতরে
দশ বছরের অগণিত দিন নিঃশব্দে কেঁপে উঠল।
স্বামী ধীরে মাথা নাড়ল, বললো,
ঠিক আছে।
অটো চলতে শুরু করল, রাস্তার ধুলো উড়ল,
মানুষজন এলো গেল,
শহর তার স্বাভাবিক শব্দে ভরে রইল,
কিন্তু অটোর ভেতরে সময় যেন থমকে ছিল।
দুজনেই চুপ।
কেউ কারও দিকে তাকায় না,তবু দুজনেই জানে
এই নীরবতার ভেতরে অনেক না বলা ক্ষমা,
অনেক অব্যক্ত ভালোবাসা
এখনও বেঁচে আছে।
রেল স্টেশনটা হয়তো খুব কাছে
কিন্তু এই ছোট পথটাই হয়তো তাদের
একসঙ্গে চলার শেষ দীর্ঘ যাত্রা।
( অনলাইনে একজনের একটি স্টাটাস থেকে কবিতায় রূপান্তরিত। )
৩২. সীমার ভেতরের আলো
জীবনের ঘরে ঘরে দায়িত্বের প্রদীপ জ্বলে,
চুলোর ধোঁয়া, সন্তানের হাসি,
দিনশেষের ক্লান্ত কাঁধে রাখা হাত
এসব নিয়েই গড়ে ওঠে সংসারের উষ্ণ অরণ্য।
তবু কোথাও না কোথাও
রয়ে যায় একটি অদেখা জানালা,
যেখানে বিকেলের নিঃসঙ্গ বাতাসে
হঠাৎ এসে বসে
কোনো নির্ভরতার মানুষ।
সব কথা তো ঘরের দেওয়ালে বলা যায় না,
কিছু কথা উড়ে যায় নীলাভ আকাশে
বিশ্বাসের পাখনা মেলে
বন্ধুত্বের কোমল ডানায় ভর করে।
সে হয়তো শুধু সহযাত্রী
মনের ক্লান্ত বিকেলের একটি শীতল ছায়া,
ঝড়ের দিনে
নিঃশব্দে কাঁধে রাখা একটুকু সাহস।
কিন্তু মনে রেখো
নদীরও একটি নির্ধারিত তীর থাকে
কারণ মানুষের মন বড় অদ্ভুত
নির্ভরতার উষ্ণতায় কখনো কখনো
চোখে নেমে আসে এক অলিক জ্যোৎস্না,
শব্দের ভেতর লুকিয়ে পড়ে
স্পর্শের অস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা।
একটি মাত্র পা সীমার বাইরে পড়লেই
স্বচ্ছ নদীর জল হঠাৎ ঘোলা হয়ে যায়;
নির্মল বন্ধুত্বের নাম
হারিয়ে যায় অন্ধকার কোনো অভিধানে।
মনের শান্তি যত স্বচ্ছ,
শরীরের তৃষ্ণা তত অস্থির
আর সেই অস্থিরতার এক ফোঁটা আগুনেই
দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে
একটি ঘরের সমস্ত বিশ্বাস।
তাই বন্ধুত্ব থাকুক
বসন্তের বাতাসের মতো নির্মল
দূর থেকে ছুঁয়ে যাক, কিন্তু দহন হয়ে না উঠুক।
কারণ একদিন
যদি মাটি সরে যায় পায়ের নিচ থেকে,
তখন ফিরে তাকিয়ে দেখবে
যে ঘরের জন্য এত আলো জ্বেলেছিলে
সেই সবচেয়ে আপন দরজাটিই
নীরবে বন্ধ হয়ে গেছে তোমারই অজান্তে।
৩৩. ছোট ছোট রীতি
জড়িয়ে ধরো আমাকে
যেন পৃথিবীর সব ঝড় থেমে থাকে
তোমার দুই বাহুর ভেতর।
চুমু খাও
গালে, কপালে, চোখের কোণে,
যেখানে ভালোবাসা এসে নিঃশব্দে বসে থাকে।
আমরা দুজনেই একটু শিশু হই
তোমার অভিমানের মুখটা দেখি,
আমার হাসিটা তোমার কাঁধে মাথা রেখে ঋজু
হয়ে যায়।
তুমুল ঝগড়ার পরেও
যখন দরজার কাছে অভিমান দাঁড়িয়ে থাকে,
তখন হঠাৎ এসে একটা ছোট্ট চুমু দিও
সব ভুলগুলো যেন
পাতাঝরার মতো ঝরে পড়ে মেঝেতে।
ফিরে আসার পরে জড়িয়ে ধরো,
যেন আমি দূরের কোনো দেশ থেকে
তোমার বুকের ভেতরেই ফিরে এলাম।
ঘুম থেকে ওঠার সময় চোখ আধখোলা
রেখেই বলো – এই যে, এখনও আছো তো?
আর আমি উত্তর দিই একটা চুমু দিয়ে।
কাজে বেরোনোর আগে
তোমার হাতটা একটু শক্ত করে ধরি
যেন দিনভর পৃথিবীর ভিড়ে
আমরা দুজনেই জানি
কোথাও একজন অপেক্ষা করে আছে।
বয়স বাড়ুক, চুলে রূপালি ধুলো পড়ুক,
তবু এই ছোট ছোট রীতিগুলো
কখনো পুরোনো না হোক।
পুরোনো জিনিসপত্রের মতো
ধুলো জমা দুটো মানুষ যেন না হই,
বরং প্রতিদিন একটু করে নতুন হয়ে উঠি –
একটা আলিঙ্গনে,একটা চুমুতে,
আর অবিরাম উষ্ণ ভালোবাসায়।
৩৪. আদিম তৃষ্ণা
নিঝুম রাতের গভীরতা যখন ধীরে ধীরে ঘন হয়ে ওঠে,
পৃথিবী যেন তার সমস্ত শব্দ গুটিয়ে নেয়
ঠিক তখনই আমার ভেতরে জেগে ওঠে
এক প্রাচীন নদীর অস্থির স্রোত।
মনে হয়, অনেকদিন ধরে আটকে রাখা জোয়ার
হঠাৎ চাঁদের ডাকে উথলে উঠতে চাইছে।
তোমার কথা মনে পড়লেই
রক্তের ভেতর জ্বলে ওঠে এক অদ্ভুত নীল আগুন।
যেন দূর অরণ্যের গোপন কোথাও
বৃষ্টি নামার আগে
বিদ্যুতের আলো নীরবে জমে আছে।
তোমার চুলের ঘ্রাণ অদ্ভুত এক মায়া,
সে ঘ্রাণ এসে বসে আমার নিঃশ্বাসে,
যেন পথ হারানো কোনো পাখি
হঠাৎ একটি নিরাপদ ডাল খুঁজে পেয়েছে।
তোমার শরীরের উষ্ণতা আমার শরীরের ভেতরে
এক অজানা ঢেউ তোলে
তখন ভাষা আর দরকার হয় না।
একটি হাতের স্পর্শ
অসংখ্য বাক্যের চেয়ে বেশি কথা বলে।
চোখের গভীরতা হয়ে ওঠে নীরব কবিতা,
আমরা তখন দুটি প্রাচীন বৃক্ষের মতো
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকি,
কিন্তু বাতাস এলে
ডালপালা গোপনে জড়িয়ে যায়।
তোমার কাছে এলে
মনে হয় আমি আর আমি নই।
আমি হয়ে যাই এক অস্থির সমুদ্র,
তুমি তার চাঁদের আলো।
আমি এক জ্বলন্ত অরণ্য, তুমি তার নরম বৃষ্টি।
এই যে দহন, এই যে তৃষ্ণা—
এ কেবল শরীরের ক্ষুধা নয়।
এ এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ।
কারণ তোমাকে স্পর্শ করতে চাওয়ার ভেতরে
আসলে লুকিয়ে থাকে আমার সমস্ত ক্লান্তি,
সমস্ত একাকীত্ব,
সমস্ত অপ্রকাশিত ভালোবাসা।
আর তোমার বুকের উষ্ণতায়
আমি তখন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যাই
যেন বহুদিন পথ চলার পর এক আদিম নদী
অবশেষে সমুদ্র খুঁজে পেয়েছে।
৩৫. অভ্যাসের আগে
শুরুটা ছিল শ্রাবণের ধারার মতো উত্তাল,
বৃষ্টিভেজা নদীর মতো উথালপাথাল ভালোবাসা
প্রতিটি স্পর্শে ছিল পাগলামি,
আর একরাশ মুগ্ধতা ঝরে পড়ত দু’জনের চোখে।
তখন রাত মানেই ছিল গল্পের ভেতর হারিয়ে যাওয়া,
একটি হাত অন্য হাতকে খুঁজে নিত অন্ধকারে,
একটি বুক হয়ে উঠত আরেকটি মানুষের আশ্রয়।
কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে
কখন যে সেই মুগ্ধতা
চুপিচুপি এসে দাঁড়াল “অভ্যাস” নামের এক নীরব ঘরে,
কেউ ঠিক বুঝতেই পারল না।
মিলনের পর
একটি শরীর উল্টো পাশে ফিরে শোয়,
আর অন্য একটি মন
নিঃশব্দে প্রশ্ন করে যায়—
শরীর কি তবে শুধু জৈবিক প্রয়োজন ছিল?
মনের খোঁজ নেওয়ার অবসর
এত দ্রুতই ফুরিয়ে গেল?
সম্পর্ক তো কেবল শরীরের উম্মাদনা নয়,
সম্পর্ক মানে দীর্ঘ ক্লান্তির শেষে
কারও বুকে মাথা রেখে
নির্ভয়ে স্বর্গীয় প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়া।
৩৬. অন্য ভ্রমণের গল্প
তুমি দূরদেশ থেকে ফিরে এসে গল্প শোনালে-
দানিউবের নীলাভ স্রোতের দীর্ঘশ্বাস,
প্রাগের শতবর্ষী সেতুর নিচে জমে থাকা
পাথরের নীরবতা,
ভেনিসের সরু জলপথে দুলতে থাকা গন্ডোলা,
যেন কোনো পুরোনো প্রেমের চিঠি
ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে জলের বুক বেয়ে।
বললে –
বার্সেলোনার এক অচেনা গলির পানশালায়
লাল মদের গাঢ় নেশায় ডুবে ছিল এক রাত,
যেখানে বাতাসেও নাকি লেগেছিল
শরীরের প্রাচীন উষ্ণতার গন্ধ।
আর সেখানে –
এক স্ক্যান্ডিনেভীয় শ্বেতত্বকের নারী,
উত্তরের বরফগলা নদীর মতো তার দৃষ্টি,
সোনালী চুলে জড়িয়ে ছিল
অর্ধেক গ্রীষ্ম, অর্ধেক চাঁদের আলো।
সে নাকি বসেছিল তোমার সামনে
মোমবাতির ক্ষীণ আলোয়,
তার সরু কটিদেশে রাতের ছায়া বাঁধা,
আর তার কণ্ঠে ভেসে উঠছিল
সমুদ্র আর শরীরের বহু পুরোনো উপকথা।
সে বলেছিল –
মানুষের নাভিমূলে নাকি লুকিয়ে থাকে
প্রথম জোয়ারের স্মৃতি,
যেখানে প্রতিটি স্পর্শ জাগিয়ে তোলে
আদিম কোনো ঢেউ।
তোমার সেই গল্প শুনতে শুনতে
আমি বসেছিলাম নিঃশব্দে –
শিকারীর ছায়া এড়িয়ে ফিরে আসা
এক ক্লান্ত হরিণীর মতো।
তবু আমার চোখে ছিল কৌতূহলের আলো
হয়তো কোনো এক অদৃশ্য মুহূর্তে
তুমি হঠাৎ থেমে যাবে,
আমার চোখের দিকেও তাকাবে।
আমি শুধু চেয়েছিলাম –
তুমি নিঃশব্দে একবার বলো,
‘এড্রিয়াটিকের নোনাধরা বাতাসে দাঁড়িয়ে
হঠাৎ কি তোমার কথা মনে পড়েনি?
সমুদ্রের ঢেউ যখন পায়ের কাছে এসে
বারবার ভেঙে পড়ছিল, তখন কি মনে হয়নি
তোমার কোমরের বক্রতাও
এমনই কোনো ঢেউয়ের মতো?’
তোমরা পুরুষেরা বুঝতে পারো না –
প্রিয় নারীর হৃদয় আসলে এক গোপন প্রদীপঘর,
সেখানে ভালোবাসা জ্বলে একটিমাত্র শিখায় –
নিঃশব্দ, নিবিড়, অনড়।
সেই আলো যদি ভেঙে যায় অন্য কোনো
জানালার বাতাসে,
তবে শিখাটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়
বৃষ্টিভেজা জোনাকির মতো।
আর তখন নারী শুধু শরীর নয়—
সে হয়ে ওঠে এক নিঃসঙ্গ উপকূল,
যেখানে ঢেউ আসে, ফিরে যায়,
কিন্তু কোনো জাহাজ আর নোঙর
ফেলে না।
তবু গভীর রাতে সেই উপকূলের বালিতে
লুকিয়ে থাকে এক অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষা –
কেউ যদি আবার এসে বলে,
‘সমুদ্রের এত পথ ঘুরেও শেষ পর্যন্ত
আমি তোমার কাছেই ফিরতে চেয়েছি।’
৩৭. উত্তাল ঢেউ
রাত যখন আরও গভীর হয়ে
নিঃশব্দ অন্ধকারে রক্তের ভেতর বাজে
কোনো আদিম ঢাকের শব্দ,
তখন শরীর খুলে দেয়
তার বহুদিনের গোপন দরজা।
পুরোনো ক্লান্ত আঁচল
অচেনা বাতাসে সরে যায় ধীরে,
নিষিদ্ধ কোনো ডাকে
জেগে ওঠে ঘুমন্ত নদী।
আজ একটিমাত্র স্পর্শে নয়
শরীর চায় বহুস্বরের জাগরণ,
যেন শ্যাওলা ধরা পাথুরে ঘাটে
বারবার এসে ভাঙে
লবণাক্ত উত্তাল ঢেউ।
উষ্ণ নিশ্বাসের আগুনে
গলে যাক জমে থাকা শীত,
পেশির উঁচু পাহাড়ে
হারিয়ে যাক শরীরের সব গোপন পথঘাট।
একটি দিগন্তেই কি থামে নারীর সমস্ত ঝড়?
শরীর হোক উন্মত্ত প্রান্তর, যেখানে প্রতিটি হার
আসলে আরেকটি গোপন জয়ের
অদৃশ্য দরজা খুলে দেয়।
৩৮. মায়াবিনীর কথা
আমি চেয়েছিলাম তুমি হও
গীতবিতানের কোনো গানের মতো মায়াবিনী।
রাত গভীর হলে,
চোখে যখন ঘুমের পাখি বসতে চায় না,
তখন ধীরে ধীরে গেয়ে ওঠো—
“এসো, এসো আমার ঘরে,”
আর সেই সুরে আমার অস্থির রাতগুলো
একটু একটু করে ঘুমের ভেলায় ভেসে যায়।
আমি চেয়েছিলাম,
মাঝে মাঝে তুমি হঠাৎই আবদার করবে –
চলো না কোথাও গিয়ে টং হোটেলে বসি,
ধোঁয়া ওঠা সিঙ্গারা ভেঙে
আধখানা আমার মুখে তুলে দেবে, তারপর
গরম কাপে চায়ে চুমু-ক।
তারপর খাওয়া শেষে
খুব শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরে
রিকশায় চড়ে বসবে,
আর শহরটা ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাবে,
আমরা দু’জন তখন
একটি ছোট্ট পৃথিবীর ভেতর বসে থাকবো।
বৃষ্টি নামলেই তুমি শাড়ি পরবে,
হাতভরা চুড়ি থাকবে, চোখে গাঢ় কাজল,
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনবে,
আর তোমার আঁচলে লাগবে
দু-এক ফোঁটা বৃষ্টির গোপন স্পর্শ।
আর যখন তোমার জন্মদিন আসবে
আমি সারা শহর খুঁজে থোকা থোকা কদমফুল
এনে তোমার খোঁপায় ভরিয়ে দেবো।
কদম ঘ্রাণে ভরে উঠবে আমাদের ছোট্ট ঘর,
কোনো এক নিঃশব্দ সন্ধ্যায়
তুমি হঠাৎ বলবে,
তোমার এইসব ছোট ছোট স্বপ্নগুলো
আমি খুব যত্ন করে রেখে দেবো।
৩৯. মাটির নিচে থেকেও
মরে গেলে এই দেহ
চিহ্নহীন হয়ে যাবে মাটির ভেতর,
ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে হাড়ের অস্তিত্ব,
রক্তের লাল স্মৃতি মিশে যাবে
অচেনা ধুলোর সঙ্গে।
হয়তো সেই মাটির বুকেই
একদিন জন্ম নেবে মাধবীলতার ঝাড়,
লতার ভেতর দিয়ে বয়ে যাবে
আমার অদৃশ্য কোনো নিঃশ্বাস,
ফুল ফুটলে হেমন্ত সন্ধ্যা
হঠাৎ কেন যেন একটু বেশি গন্ধে ভরে উঠবে।
রাত্রির গভীরে
জোনাকিরা এসে জ্বালাবে ক্ষুদ্র প্রদীপ,
মনে হবে তারা যেন অন্ধকারের ভেতর বসে
আমার পুরোনো কোনো গান গুনগুন করছে।
কোনো নিঝুম দুপুরে একটি কিশোরী
সেই মাটি ছেনে পুতুল বানাবে,
তার আঙুলের ভেজা স্পর্শে
হয়তো আমার ঘুমন্ত অনুভূতিগুলো
এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠবে।
তখন কি আমি কিছুই টের পাব না?
মাধবীলতার গন্ধ,জোনাকির আলো,
কিশোরীর হাসি,
সবই কি শুধু পৃথিবীর হবে?
নাকি মাটির গভীর অন্ধকারে
আমার আত্মা অদৃশ্য এক বাতাস হয়ে
সবকিছু ছুঁয়ে যাবে,
আর কেউ না জানলেও আমি নিঃশব্দে বলব, আমি আছি এই গন্ধে,
এই আলোয়, এই মাটির ভেতর লুকিয়ে থাকা অদেখা জীবনের মতো।
৪০. নুপুরের ঝংকারে
তার পায়ে রূপার নুপুর পরিয়ে দিয়ে বললাম-
যখন তুমি হাঁটবে ঝনঝন শব্দে মনে পড়বে আমার কথা,
আর তোমার হৃদয়ও ঝলমল করে
উঠবে
যেন পূর্ণিমার আলোয় হঠাৎ জেগে ওঠা
নদীর নীল ঢেউ।
তুমি যখন নিঃশব্দে উঠোন পেরিয়ে যাবে,
নুপুরের সেই মৃদু ঝংকারে
রাতের ঘুম ভাঙবে জোনাকির,
আর আমার নিঃসঙ্গতার জানালায়
টোকা দেবে এক ফালি চাঁদ।
আমি চাই,
তোমার প্রতিটি পদক্ষেপে
আমার নামের গোপন সুর লুকিয়ে থাকুক,
যেন বাতাস ছুঁলেই
বকুলফুলের গন্ধের মতো
ছড়িয়ে পড়ে আমার ভালোবাসা।
যদি কোনোদিন দূরের শহরে
আমাকে ভুলে যেতে চাও,
তবু হেঁটে যেও ধীরে –
নুপুরের ঝনঝনে শব্দে হঠাৎ মনে পড়ে যাবে
একজন মানুষ তোমার পায়ের শব্দ শুনেই
পুরো একটি জীবন
ভালোবাসতে শিখেছিল।
৪১. পুন্যে স্নাত
ভালোবাসা হোক পুন্যে স্নাত।
তুমি আমাকে দগ্ধ করো।
মেঘমল্লার আকাশকে বলি – তুমি বৃষ্টি ঢেলে দাও,
নিভিয়ে দাও দহন।
নদীকে বলি – তুমি ভাসিয়ে নিয়ে যাও
শঙ্খনীল সাগরে।
তারপর দেখি –
তোমার চোখের ভেতর জেগে ওঠে
কোনো অচেনা জোয়ারের নীল আলো।
সেখানে আমার সমস্ত ক্লান্তি
ধুয়ে যায় জলের গোপন মন্ত্রে।
তখন
ভালবাসা শুধু আগুন নয়,
ভালবাসা হবে শরীর ছুঁয়ে ওঠা গোপন জোয়ার,
তোমার উষ্ণ নিশ্বাসে কাঁপবে
আমার রাত্রির নিঃশব্দ উপকূল।
তুমি যদি হাত রাখো আমার বুকে,
দেখবে হৃদয়ের ভেতর জেগে ওঠে
অসংখ্য ঢেউয়ের অস্থিরতা।
তোমার আঙুলের স্পর্শে
জেগে উঠবে ঘুমন্ত সমস্ত নদী,
ধীরে ধীরে তারা মিশে যাবে
এক উন্মত্ত সাগরের নীল আলিঙ্গনে।
তখন –
ভালবাসা হবে শরীর ও আত্মার
এক গোপন পূর্ণিমা-রাত্রি,
যেখানে তোমার বাহুর ভেতর
আমার সমস্ত দহন গলে গিয়ে
নরম জ্যোৎস্নার মতো ঝরে পড়বে।
আর আমরা দু’জন
অন্ধকার আকাশের নিচে স্পর্শের দীপ্ত আগুনে নিঃশব্দে জ্বলে উঠব।
৪২. যদি আর না ফিরি
ঘরে থেকে বের হওয়ার সময় প্রিয় মানুষের হাতছানি ছুঁয়ে বের হই,
মনে হয়,ফিরে এসে যদি আর তাকে ছুঁতে না পারি,
তবে এই ছোঁয়াটুকুই কি শেষ হয়ে থাকবে সমস্ত জীবনের জন্য?
দরজার কাঠে কপাল ঠেকিয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়াই,
অদৃশ্য কোনো বিদায়ের ক্রন্দনের সুর বাজে ভেতরে,
সে কিছু বলে না, তবু চোখের ভাষায়
এক অনন্ত অপেক্ষার নীল নদী বয়ে যায়।
বাইরের পথগুলো অচেনা লাগে,
প্রতিটি মোড়ে যেন লুকিয়ে থাকে বিচ্ছেদের ছায়া,
আর আমার হাতের মুঠোয়
ধরে রাখা উষ্ণতা ধীরে ধীরে শিতল হয়ে আসে,
যেন সময় নিজেই নিঃশব্দে সরে যাচ্ছে দূরে।
ভিড়ের ভেতর হঠাৎ থেমে যাই,
মনে হয়, কেউ যেন নাম ধরে ডাকল,
পেছনে ফিরে দেখি –
শুধুই বাতাস, আর একফোঁটা অনুপস্থিতি।
কোনো এক অন্যমনস্ক বিকেলে
তার হাসির প্রতিধ্বনি এসে লাগে বুকে,
আর আমি বুঝতে পারি –
ভালোবাসা আসলে এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তা,
যেখানে প্রতিটি বিদায়ই
ফিরে না আসার সম্ভাবনায় ভেজা।
তাই সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি,
একটি তারার কাছে নিঃশব্দে প্রার্থনা করি,
যদি আর ফিরতে না পারি,
তবে তার স্মৃতির ভেতরেই আমাকে বাঁচিয়ে রেখো।
তার হাতছানির ভেতরেই
আমার সমস্ত অনুপস্থিতি জেগে থাকুক।
৪৩. যাত্রী আমি
আমি পথের সন্তান,
দিগন্ত আমাকে ডেকে নিয়েছে নামহীন আত্মীয়ের মতো,
ফেলে এসেছি চেনা উঠোন,
দরজায় ঝুলে থাকা শৈশবের বিকেল।
নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে
আমি ছুঁয়েছি ব্রাহ্মপুত্রের দীর্ঘ ইতিহাস,
তারপর দূরদেশে গিয়ে
অচেনা স্রোতে মিশে গেছে আমার ক্লান্তি।
বরফঢাকা শহরের জানালায় দাঁড়িয়ে
শুনেছি তুষার পতনেরও শব্দ আছে –
আর পাথরের পুরনো নগরে
পায়ের ধুলোয় জমেছে শত বছরের গল্প।
পথই আমার আশ্রয়,
প্রতিটি মোড়েই নতুন করে জন্ম নিই আমি,
অসংখ্য রঙের ভিড়ে
আমি খুঁজেছি আমার নিজের রং
যেখানে ফুল ফুটেছে,
সেখানে আমি গেছি মুগ্ধ হয়ে,
আর যেখানে কুঁড়ি ঝরে গেছে অনাদরে,
সেখানে নীরবে কেঁদেছি একা।
ভালোবাসার নামে কত ভাঙা ঘর,
কত নিঃশব্দ শূন্যতা, তবুও অচেনা মুখগুলো
হঠাৎই হয়ে উঠেছে কাছের মানুষ।
এই পথই আমার ঠিকানা,
এই ভেসে চলাই আমার নিয়তি,
তাই আজও বলি – আমি ঘরহারা নই,
পৃথিবীটাই আমার ঘর।
৪৪. শ্রদ্ধার অর্ঘ্য : আশা ভোসলে
যে কণ্ঠ একসময় প্রেমের প্রথম স্পর্শ হয়ে এসেছিল,
যে সুরে রঙিন হয়েছে অসংখ্য রাতের নিঃসঙ্গতা,
সেই কণ্ঠ নিশ্চুপ হয়ে যাবে,
এই ভাবনাটুকুই যেন বুকের ভেতর অদৃশ্য ব্যথা হয়ে বাজে।
আশা ভোসলে শুধু একটি নাম নয়,
তিনি এক অনন্ত সুরধারা,
যেখানে জীবনের সব রঙ মিশে আছে,
ভালোবাসা, বেদনা, উল্লাস আর নীরব কান্না।
তিনি সত্যিই অনন্তলোকে পাড়ি দিয়েছেন,
তবে পৃথিবীর আকাশে নিশ্চয়ই একটুখানি সুর কমে যাবে,
রাতগুলো হবে একটু বেশি নির্জন,
আর পুরোনো গানগুলো বাজবে আরও বেশি কাঁদিয়ে।
তবুও তিনি থাকবেন, প্রতিটি সুরের মায়াজালে,
প্রতিটি প্রেমের স্মৃতিতে,
প্রতিটি নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে।
কারণ কিছু মানুষ চলে যান না,
তারা রয়ে যান, গানের মতো,
অনন্তকাল।
তারিখ – ২৬/৪/২০২৬ ইং
৪৫. নিশ্চিন্ত মানুষ
একটা মনের মানুষ থাকুক
যার ভেতর আমি ডুবে যেতে পারি
সমুদ্রের মতো নিশ্চিন্ত নীলতায়,
যেখানে হারিয়ে যাওয়াও একধরনের পাওয়া,
আর ফিরে আসা মানে
নিজেকেই আবার নতুন করে খুঁজে পাওয়া।
সে থাকুক,
ভোরের প্রথম শিশিরবিন্দুর মতো নির্মল,
অথবা সন্ধ্যার ধূপছায়া আলো,
যেখানে ক্লান্ত দিন মাথা রাখে
নিঃশব্দ আশ্রয়ের কোলে।
ভালো-মন্দের সব ঋতুতে
সে হোক আমার চিরসবুজ বৃক্ষ,
ঝড় এলে যে আরও গভীরে গেঁথে দেয় শিকড়।
চোখ বন্ধ করলেই তার অস্তিত্ব ভেসে উঠুক
নক্ষত্রের মতো স্থির, অবিচল,
অন্ধকার যত গভীর হোক,
তার আলো ততটাই নির্ভুল হয়ে পথ দেখাক।
তার হাসি হোক
শুকনো নদীর বুকে হঠাৎ নেমে আসা বর্ষা,
যেখানে আমার সব বিষণ্ণতা
জলের স্রোতে ভেসে যায় অজানার দিকে।
যখন মেঘ জমে ভালোবাসার আকাশে,
সে যেন বিদায় নয়,
বৃষ্টির ভাষায় কথা বলে, ভাঙনের কিনারায় দাঁড়িয়ে সে খুঁজে নেয় জোড়ার সুর,
আঙুলে আঙুল জড়িয়ে
আরও দৃঢ় করে তোলে সম্পর্কের বুনন।
সে মানুষটা থাকুক,
যার ভালোবাসা শঙ্খের ভেতর লুকানো সুরের মতো,
শুনতে হলে কান পেতে থাকতে হয়,
আর একবার শুনলে
চিরকাল হৃদয়ের গভীরে বাজতে থাকে।
একটা মনের মানুষ থাকুক,
যার কাছে সম্পর্ক মানে শুধু থাকা নয়,
বরং বারবার বেছে নেওয়া;
প্রতিটি ভাঙনের পর
আরও নিখুঁত করে গড়ে তোলা।
৪৬. ফেরাহীন প্রস্থান
একটি চলে যাওয়া আছে, সে আর
ফিরে আসে না,
সে শুধু বলতে পারে, আমি চলে যাচ্ছি…
তারপর নিঃশব্দে দরজার ফাঁক দিয়ে
বয়ে যায় এক অদৃশ্য শূন্যতা,
যেখানে শব্দও আর শব্দ থাকে না
থাকে শুধু ভাঙা প্রতিধ্বনি।
জানালার ধারে বসে থাকে বিকেল,
হাতে তার এক মুঠো আলো –
কিন্তু সে আলোও কেমন মলিন,
যেন তোমার স্পর্শহীন হয়ে পড়েছে বহুদিন।
রাত এলে আকাশ ভরে ওঠে তারায়,
কিন্তু কোনো তারাই আর গল্প বলে না,
সবাই যেন জানে –
একটি চলে যাওয়া মানেই
অসংখ্য নীরবতার জন্ম।
বালিশে জমে ওঠা অশ্রুগুলো
ভোর হলে শুকিয়ে যায় ঠিকই,
কিন্তু তাদের লবণাক্ত দাগে
থেকে যায় তোমার অনুপস্থিতির ইতিহাস।
একটি চলে যাওয়া আছে
যার কোনো ফেরার পথ নেই,
শুধু স্মৃতির ভাঙা সেতু পেরিয়ে
মনে মনে ডেকে যাওয়া –
‘আরেকবার এসো…’।
কিন্তু সে আর ফিরে আসে না,
সে শুধু বলে, আমি চলে যাচ্ছি,
আর রেখে যায় –
একটি দীর্ঘ, অনন্ত, নিঃসঙ্গ অপেক্ষা।
৪৭. অর্ধেক তুমি, অর্ধেক আমি
অর্ধেক তুমি, অর্ধেক আমি
দূরে চলে গেলে তোমার অর্ধেক আমার কাছে থাকে,
যেমন আমার অর্ধেক থাকে তোমার কাছে,
যখন কাছে থাকি তখন দুজন হয়ে যাই একটি মানুষ
একটি শ্বাসে বেঁচে থাকা, একটি হৃদয়ের স্পন্দন।
তুমি দূরে গেলে বাতাসে তোমার গন্ধ মিশে থাকে,
আমার জানালার পর্দা ছুঁয়ে যায় তোমার অদৃশ্য হাত,
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি ;
মনে হয় তুমি ঠিক পেছনেই আছো।
রাত গভীর হলে
আমার ঘুমের ভেতর তোমার ছায়া নেমে আসে,
স্বপ্নের ভিতর তুমি আলো হয়ে জ্বলো,
আমি তোমার নাম ডাকি –
আর অন্ধকার আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
আমরা দুজন আলাদা থেকেও
কোনো অদৃশ্য সেতুতে বাঁধা,
তোমার চোখের জল আমার বুক ভিজিয়ে দেয়,
আমার হাসি পৌঁছে যায় তোমার ঠোঁটের কোণে।
যখন তুমি আমার পাশে থাকো,
সময় থমকে দাঁড়ায়
ঘড়ির কাঁটা ভুলে যায় তার গতি,
আমাদের নীরবতা কথা বলে হাজার ভাষায়।
তুমি আমার ভেতরে বেঁচে থাকা আরেকটি আমি,
আমি তোমার ভিতরে হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবী,
তাই দূরত্ব শুধু শরীরের,
মন তো সবসময় পাশাপাশি হাঁটে।
একদিন যদি সব দূরত্ব মুছে যায়,
আর আমরা আবার একসাথে হই
তখন বুঝব,
আমরা কখনোই আলাদা ছিলাম না,
শুধু ভালোবাসার ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানায় ছিলাম।
৪৮. নিমন্ত্রণ
তুমি কাছে এসো আবেগের উন্মত্ততায়,
প্রগাঢ় ভালোবাসার উষ্ণতায়,
বিশ্বাসের গভীরতায় –
যেখানে শব্দেরা থেমে যায়,
আর চোখের ভাষাই হয়ে ওঠে অনন্ত।
তুমি কাছে এসো, নিঃশ্বাসের ভেজা দূরত্বে
যেখানে তোমার গন্ধে জেগে ওঠে
আমার সুপ্ত সমস্ত নদী,
আর হৃদয়ের ভেতর ঢেউ তুলে অচেনা
এক জোয়ার।
তোমার আঙুলের স্পর্শে জেগে উঠুক
শরীরের নিঃশব্দ সুর,
অন্ধকারে গোপন আলোয়
হারিয়ে যাক সকল সংশয়
শুধু তুমি আর আমি, এক অবিচ্ছেদ্য
আবেশে বাঁধা।
তুমি কাছে এসো, যেন রাত ধীরে ধীরে
মিশে যায় ভোরে,
যেন দু’টি ছায়া মিলেমিশে
একটি শরীরের ভাষা খুঁজে পায়।
ভালোবাসা হোক নিভন্ত আগুন,
যা দহন নয়, বরং আলো হয়ে জ্বলে ওঠে অন্তরে।
তুমি কাছে এসো, এই অনির্বচনীয় টানে
যেখানে স্পর্শ মানে শুধু স্পর্শ নয়,
বরং আত্মার গভীরে লেখা চিরন্তন দলিল।
৪৯. যে থাকে নীরবে
যে মানুষটি পাশে থাকে
অসুস্থ রাতে জেগে থেকে নীরবে জল এগিয়ে দেয় পরম মমতায়
এমন একজন মানুষকেই পাশে রেখে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।
হয়তো সে কবিতা জানে না,
সে জানে না বড় বড় শব্দ –
কবিতার অলংকারে সাজাতে পারে না
তবুও তার প্রতিটি যত্ন
অঘোষিত একেকটি পংক্তি
যেখানে ভালোবাসা লেখা থাকে
অতি সরল ভাষায়।
সে জানে,
এই পৃথিবীতে শব্দের চেয়ে মমতার প্রয়োজন বেশি,
তার চোখে কোনো নাটক নেই
শুধু গভীর নিশ্চিন্ত আশ্রয়।
আমি ভাবি,
কবিতা কি তবে এমনই?
যেখানে ছন্দ নেই, তবু হৃদয় দোলে,
শব্দ নেই, তবু ভালোবাসা বলে ওঠে।
যে মানুষটি পাশে থাকে,
সব ঝড়-জ্বরে, ক্লান্তির রাতে –
তার হাত ধরে জীবন পার করতে ইচ্ছে করে,
কারণ সে কবিতা জানে না ঠিকই,
কিন্তু সে নিজেই এক জীবন্ত কবিতা।
৫০. শেষ অস্তরাগ
পৃথিবীর বুকে লুকিয়ে থাকা বিষাদগুলি
আনন্দে রূপান্তরিত হয়ে চলে গেল
ঐ শেষ অস্তরাগে,
দিনের শেষ আলোয় মিশে গিয়ে
অশ্রুরাও যেন খুঁজে পেল একটুখানি মুক্তি।
দূরে ছড়িয়ে থাকা মেঘকণাগুলি
অশ্রু হয়ে উড়ে এলো চোখের ‘পরে,
স্মৃতির ভেজা পাতায় রেখে গেল
কিছু না বলা গল্প, কিছু অপূর্ণতা,
কিছু নাম যাদের আর ডাকা হয় না।
একটা বছর ফুরিয়ে গেলে
কিছু স্বপ্ন ঝরে পড়ে নিঃশব্দে,
কিছু আশা কাঁপতে কাঁপতে টিকে থাকে,
আর কিছু ভালোবাসা হারিয়ে যায়
অজানা কোনো দূরত্বে।
তবুও,
শেষ আলো নিভে যাওয়ার আগে
আকাশ একটু লাল হয়ে ওঠে,
ঠিক তেমনি, সব হারানোর মাঝেও
মনে জন্ম নেয় একটুখানি নতুন ভোরের আলো।
যে কষ্টগুলো বয়ে এনেছি এতদিন,
সেগুলো রেখে যাই পেছনের বছরে
নতুন বছরে যেন আসে
একটু শান্তি, একটু নির্ভরতা,
একটু ভালোবাসা।
সবাইকে জানাই
নতুন বছরের আন্তরিক শুভেচ্ছা।
৩০ চৈত্র, ১৪৩২ বাংলা।





Leave a Reply