• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

উপনিষদ – অখণ্ড সংস্করণ (অসম্পূর্ণ)

লাইব্রেরি » অতুলচন্দ্র সেন » উপনিষদ – অখণ্ড সংস্করণ (অসম্পূর্ণ)
উপনিষদ অখণ্ড সংস্করণ
লেখক: অতুলচন্দ্র সেনবইয়ের ধরন: ধর্মীয় বই

উপনিষদ – অখণ্ড সংস্করণ
অতুল চন্দ্র সেন, সীতানাথ তত্ত্বভূষণ, মহেশচন্দ্র ঘোষ কর্তৃক অনূদিত ও সম্পাদিত

(অসম্পূর্ণ)

ঈশ, ‘কেন, কঠ, প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, তৈত্তিরীয়, ঐতরেয়, শ্বেতাশ্বতর, ছান্দোগ্য, বৃহদারণ্যক ও কৌষীতকি এই বারখানি বৈদিক উপনিষদের অন্বয়, অনুবাদ, ব্যাখ্যা ও মন্তব্য তৎসহ গ্রন্থপঞ্জি, মন্ত্রসূচি, পরিচিতিপঞ্জি ও নির্দেশপঞ্জি

.

ভূমিকা

বেদ যে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির মূল উৎস একথা হিন্দুমাত্রেই স্বীকার করেন। কিন্তু অনেকে বেদের একটি সঙ্কীর্ণ অর্থ গ্রহণ করেন। বস্তুত বেদ কোন গ্রন্থ বিশেষের নাম নহে। ইহা একটি সমগ্র সাহিত্য সূচিত করে। এই সাহিত্যকে মোটামুটি তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়— সংহিতা, ব্রাহ্মণ ও উপনিষৎ। সংহিতায় ও ব্রাহ্মণে যাগ- যজ্ঞ প্রভৃতির অনুষ্ঠান ও তাহার প্রণালী, উদ্দেশ্য, ফলশ্রুতি ও দার্শনিক ব্যাখ্যা আছে। উপনিষদে এ সকলের কিছুই নাই। যে উচ্চ অধ্যাত্মজ্ঞান হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য— ইহাতে তাহারই আলোচনা আছে। কালক্রমে যাগ-যজ্ঞ অনুষ্ঠান ও নানা দেবদেবীর পূজা প্রভৃতি যেমন সাধারণ হিন্দুধর্মের বিশেষ অঙ্গে পরিণত হইল, তেমনি আত্মা, ভগবান প্রভৃতি সম্বন্ধে সংসারত্যাগী সাধু-সন্তের বহু সাধনালব্ধ জ্ঞান হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপন্ন করিল। বস্তুত বৈদিক সংহিতা ও ব্রাহ্মণে যে সকল যাগ-যজ্ঞের বিধি আছে তাহার অনুষ্ঠান হিন্দুদের মধ্যে খুব বেশী প্রচলিত নাই। কিন্তু উপনিষদে যে তত্ত্বজ্ঞান বর্ণিত ও ব্যাখ্যাত হইয়াছে তাহাই হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠ অংশ বলিয়া গৃহীত হয়। পরবর্তীকালে যে সমুদয় ধর্ম ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে তাহা এই উপনিষদের ভিত্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত। বৌদ্ধ, জৈন, বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত প্রভৃতি সকল ধর্ম-সম্প্রদায়ই যে বেদের যাগ-যজ্ঞ প্রভৃতি কর্ম অনুষ্ঠানের পরিবর্তে উপনিষদের দ্বারাই বেশী প্রভাবিত তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। যে ভগবদ্‌গীতা কেবল বৈষ্ণবদের নহে, আজ সমগ্র হিন্দুজাতির শ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ বলিয়া বিবেচিত ও সম্মানিত হয় তাহা উপনিষদ গ্রন্থাবলীর সারমাত্র বলিয়া মনে করা হয়। একটি প্রসিদ্ধ শ্লোক আছে— “বহু উপনিষদ-রূপ গাভীর দুগ্ধ দোহন করিয়া ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাহার সারাংশ দ্বারা শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতারূপ ক্ষীর প্রস্তুত করিয়া হিন্দুর বিশিষ্ট ভোজনসামগ্রী প্রস্তুত করিয়াছেন।”

বেদের সংহিতা ও ব্রাহ্মণ ভাগে যজ্ঞানুষ্ঠান প্রধান অংশগ্রহণ করিলেও ইহাতে দার্শনিক চিন্তার ধারা অপরিস্ফুটভাবে দেখা যায়, এবং ইহা প্রধানত ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। কিন্তু যে উপনিষদে দার্শনিক চিন্তা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছিয়াছে ক্ষত্রিয়গণই ইহাতে প্রধান অংশগ্রহণ করেন, এবং স্ত্রীলোক ও ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় ভিন্ন অন্য জাতির লোকও যে এই উচ্চ দার্শনিক চিন্তার ধারক ও বাহক ছিলেন তাহার যথেষ্ট প্রমাণ আছে।

সাংসারিক জীবনের বন, মান, প্রতিপত্তির প্রতি বীতস্পৃহ এবং সম্পূর্ণ উদাসীন এক শ্রেণীর লোকই জীবনের প্রকৃত গূঢ় অর্থ নির্ধারণে উৎসুক হইয়া সংসার ত্যাগ-পূর্বক এ বিষয়ে অরণ্যে বসিয়া গভীর ধ্যান-ধারণা করিতেন, তাঁহাদের চিন্তাপ্রসূত উক্তিগুলিই উপনিষদে স্থান পাইয়াছে। তাঁহাদের শিষ্য-প্রশিষ্যেরা তাঁহাদের পদপ্রান্তে বসিয়া শিক্ষালাভ করিতেন এবং নিজেরাও গুরুর নিকট লব্ধ জ্ঞানের ও সাধনার অনুশীলন করিয়া এই চিন্তাধারার উৎকর্ষ সাধন করেন। এইরূপেই ক্রমে ক্রমে বহুসংখ্যক উপনিষদের সৃষ্টি হয়। অরণ্যে উক্ত বলিয়া এই শ্রেণীর গ্রন্থ প্রথমে ‘আরণ্যক’ নামে অভিহিত হইত এবং সাধারণতঃ বেদের ‘ব্রাহ্মণ’ ভাগের পরিশিষ্টরূপে সঙ্কলিত হইত। চিন্তাধারার উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে গদ্য ও পদ্যে রচিত এই শ্রেণীর গ্রন্থ স্বাতন্ত্র্য লাভ করে এবং উপনিষদ নামে পরিচিত হয়। কিন্তু প্রাচীন উপনিষদগুলি কোন না কোন বেদের সঙ্গে সংযুক্ত।

উপনিষদ নামে পরিচিত বহুসংখ্যক গ্রন্থ এখনও প্রচলিত আছে। ইহাদের মধ্যে ছয়খানি উপনিষদ— ‘ঐতরেয়’, ‘বৃহদারণ্যক’, ‘ছান্দোগ্য’, ‘তৈত্তিরীয়’, ‘কৌষীতকি’ এবং ‘কেন’—সর্বপ্রাচীন বলিয়া পরিগণিত হয় এবং বেদান্ত-দর্শনের আদি ও অকৃত্রিম রূপ ইহাদের মধ্যেই প্রাপ্ত হওয়া যায়। ‘কঠ বা ‘কাঠক’, ‘শ্বেতাশ্বতর’, ‘ঈশ’, ‘মুণ্ডক’, ‘মাণ্ডুক্য’ ও ‘প্রশ্ন’—এই ছয়খানি-উপনিষদে বেদান্ত দর্শনের প্রাধান্য থাকিলেও ইহাতে সাংখ্য ও যোগ-দর্শনের প্রভাব দেখিতে পাওয়া যায়।

বিভিন্ন উপনিষদের ক্রমিক রচনাকাল ও প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। তবে পণ্ডিতগণের অনেকে পূর্বোক্ত বারোখানি উপনিষদই প্রাচীন ও প্রামাণিক ধর্মগ্রন্থ বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন। পণ্ডিত রানাডে ‘মৈত্রী’ উপনিষদকেও প্রাচীন বলিয়া মনে করেন। ইহা ছাড়াও দুই শতের বেশী উপনিষদ আছে। এগুলি পরবর্তী কালে রচিত। বেদান্ত-দর্শনের ব্যাখ্যা ছাড়াও এগুলির মধ্যে প্রধানত যোগ ও সন্ন্যাস এবং বিষ্ণু, শিব ও শক্তির মহিমা বর্ণিত হইয়াছে। প্রাচীনতম উপনিষদের তারিখ রাধাকৃষ্ণনের মতে ১০০০ খ্রীষ্টপূর্ব, কিন্তু অন্যান্য অনেকের মতে ৭০০ খ্রীঃ পূঃ। এ- বিষয়ে কোন স্থির সিদ্ধান্ত করা সম্ভব নহে।

এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে ‘ঈশ’, ‘কেন’, ‘কঠ’, ‘প্রশ্ন’, মুণ্ডক’, ‘মাণ্ডুক্য’, ‘তৈত্তিরীয়’, ‘ঐতরেয়’ ও ‘শ্বেতাশ্বতর’—এই নয়খানি প্রাচীন উপনিষদের বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা আছে। গীতা ও উপনিষদ যে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্বরূপ ইহা উপলব্ধি করিয়াই স্বদেশবাসীর তত্ত্বজ্ঞান ও ধর্মজীবনের উন্নতিকল্পে ঁঅতুলচন্দ্র সেন এই গ্রন্থগুলির বাংলা অনুবাদে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। এ সমুদয় অনূদিত গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখিয়াছেন (১৯৪২ সালে) যে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অতি নৃশংস ও বীভৎস যুদ্ধের মধ্যে আধুনিক সভ্যতার যে নগ্নরূপ প্রকটিত হইয়াছে তাহার ফলে বিশ্বের বহু মনীষী ভারতীয় ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যেই শান্তির সন্ধান খুঁজিতেছেন; এই কারণে আমাদের ধর্ম ও শাস্ত্রগ্রন্থের আদর ক্রমশই বৃদ্ধি পাইতেছে। সুতরাং যাঁহারা সংস্কৃত ভাষা অল্প জানেন বা আদৌ জানেন না তাঁহারাও যাহাতে উপনিষদসমূহের মর্ম সহজে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই তিনি উপনিষদগুলির অনুবাদে প্রবৃত্ত হন। ইহার রচনাপ্রণালী গ্রন্থকার নিজেই তাঁহার ভূমিকায় বিবৃত করিয়াছেন, সুতরাং তাহার পুনরুল্লেখ করিবার প্রয়োজন নাই। যে আশা লইয়া তিনি এই অনুবাদকার্য সম্পন্ন করিয়াছেন তাহা যে সম্পূর্ণ ফলবতী হইয়াছে একথা নিঃসঙ্কোচে বলা যায়। সংস্কৃতে অনভিজ্ঞ বাঙ্গালী পাঠকের সম্মুখে সর্বোচ্চ জ্ঞানের এই ঐশ্বর্যভাণ্ডার উন্মুক্ত করিয়া ঁঅতুলচন্দ্র সেন তাঁহার কর্মময় জীবনে একটি মহৎ কার্য সম্পাদন করিয়াছিলেন। এই গ্রন্থে তাঁহার জীবনের যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ আছে তাহাতে তাঁহার নিজের জীবনেও যে তিনি গীতা ও উপনিষদের আদর্শ অনুসরণ করিতেন তাহার স্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়।

গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে ‘ছান্দোগ্য’, ‘বৃহদারণ্যক’ ও ‘কৌষীতকি’—এই তিনখানি প্রাচীন উপনিষদের সটীক বঙ্গানুবাদ দেওয়া হয়েছে। ইহাদের মধ্যে ছান্দোগ্য ও বৃহদারণ্যক উপনিষদের অনুবাদ (টীকা ও মন্তব্য সহ) ঁমহেশ চন্দ্র ঘোষ (বেদান্তরত্ন) কৃত। ঁসীতানাথ তত্ত্বভূষণ মহাশয়ের সম্পাদনায় ঐ গ্রন্থদ্বয় প্রকাশিত হয় প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্বে। কৌষীতকি উপনিষদের অন্বয় সহ অনুবাদ পণ্ডিত সীতানাথ তত্ত্বভূষণ স্বয়ং করিয়াছেন। এই দুই আত্মমগ্ন মানবপ্রেমিক সাধক ও জ্ঞানতপস্বীকে আজ আমরা ভুলিতে বসিয়াছি। এই তিনটি উপনিষদের অনুবাদ হইতেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনে আমরা তাঁহাদের জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও গভীরতা উপলব্ধি করিতে পারিব।

উপনিষদের শিক্ষা মানুষকে জীবনবিমুখ করে না, ইহা world and life negation-এর কথা বলে না; বলে এক পরিপূর্ণ জীবনের কথা, যে জীবন জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি বা প্রেমের দ্বারা ব্রহ্মের সহিত সর্বদাই যুক্ত। উপনিষদের শিক্ষাকে এইভাবে জীবনে প্রয়োগ করার কথাই আমরা শুনিতে পাই রামমোহন হইতে অরবিন্দ পর্যন্ত আধুনিক কালের মনীষীদের কণ্ঠে। বর্তমান গ্রন্থের বারোটি উপনিষদের ব্যাখ্যাতে এই সিদ্ধান্তই প্রকট হইয়াছে।

উপনিষদের দার্শনিক তত্ত্ব ও মূল্যায়ন সম্বন্ধে এই গ্রন্থের শেষাংশে শ্রীহিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীত্রিপুরাশংকর সেনশাস্ত্রী বিস্তৃত আলোচনা করিয়াছেন। এই পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধ দু’টি গ্রন্থটিকে একটি স্বকীয় বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছে। রমেশচন্দ্র মজুমদার
কলিকাতা
২৮ মে, ১৯৭৮

.

উপনিষদ গ্রন্থাবলী – প্ৰথম খণ্ড

গ্রন্থে ব্যবহৃত সাংকেতিক চিহ্নের অর্থ :

শ—শংকরাচার্য
উ—উপাধ্যায় গৌরগোবিন্দ রায়
অ—অরবিন্দ

শংকরাচার্য—(৭৮৮-৮২০) দাক্ষিণাত্যে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অদ্বৈতবাদের জনক না হলেও এর প্রধান প্রবক্তা। এগারখানি উপনিষদ, ভগবদ্‌গীতা ও ব্রহ্মসূত্র—এই প্রস্থানত্রয়ের ভাষ্য রচনা করে তিনি অদ্বৈতবাদের প্রতিষ্ঠা ও বেদান্তধর্মের পুনরুজ্জীবন করেন।

উপাধ্যায় গৌরগোবিন্দ রায়— (১৮৪১-১৯১২) কেশবচন্দ্র সেনের অনুগামী ও ধর্মপ্রচারক ছিলেন। কেশবচন্দ্র তাঁকে হিন্দুধর্মের ব্যাখ্যাতা নিযুক্ত করেন এবং ‘উপাধ্যায়’ উপাধি দেন। তাঁর রচিত ‘বেদান্ত সমন্বয়’ গ্রন্থে তিনিই প্রথম আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপনিষদের বাংলা ব্যাখ্যা করেন।

শ্রীঅরবিন্দ— (১৮৭২-১৯৫০) বিশিষ্ট যোগী ও দার্শনিক। তাঁর রচিত ‘Essays on the Gita’ গ্রন্থটি ধর্মজগতে যথেষ্ট সাড়া জাগায়। তিনি ‘ঈশ’, ‘কেন’, ‘কঠ’ প্রভৃতি আটটি বৈদিক উপনিষদের ইংরাজী অনুবাদ করেন। তাছাড়া তিনি স্বতন্ত্রভাবে ‘ঈশ’ ও ‘কেন’ উপনিষদের ব্যাখ্যা রচনা করেছেন। এই দুটি গ্রন্থে তিনি শংকরের মায়াবাদ পরিহার করে উপনিষদ দর্শনের উপর এক নতুন আলোক-সম্পাত করেন।

.

মুখবন্ধ

আজকাল আমাদের দেশীয় বহু শিক্ষিত লোকের হৃদয়ে ভারতীয় ধর্মশাস্ত্র পাঠ করিবার একটা আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিয়াছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অতি নৃশংস ও বীভৎস যুদ্ধের মধ্যে আধুনিক সভ্যতার নগ্নরূপ এরূপভাবে প্রকটিত হইয়াছে যে মনীষী লোকেরা এক্ষণে ভারতীয় ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যেই শান্তির সন্ধান খুঁজিতেছেন। এই কারণে আমাদের ধর্ম ও শাস্ত্রগ্রন্থের আদর দেশে এবং বিদেশে ক্রমশঃই বৃদ্ধি পাইতেছে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় জনসাধারণের মধ্যে এই সকল গ্রন্থের বহুল প্রচার হইতে পারে নাই। তাহার প্রধান কারণ এই যে প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থ ও উহার ভাষ্য,

টীকা প্রভৃতি প্রায় সমস্তই সংস্কৃত ভাষায় লিখিত। এই হেতু যাঁহারা সংস্কৃত অল্প জানেন অথবা মোটেই জানেন না তাঁহাদের পক্ষে এই সকল গ্রন্থের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। উপরোক্ত অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে আমরা প্রাচীন ভারতের প্রধান ধর্মগ্রন্থসকল সহজ বাংলা ভাষায় অনুবাদ ও ব্যাখ্যার সহিত সাধারণ পাঠকের উপযোগী করিয়া প্রকাশ করিবার সংকল্প করিয়াছি। ইতিমধ্যে শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার একটি বৃহৎ সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে। এক্ষণে উপনিষদ্ গ্রন্থাবলী খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত হইতেছে।

এই গ্রন্থে প্রতি শ্লোকের মূল, অন্বয় ও সরলার্থ দেওয়া হইয়াছে। তাহা ছাড়া স্থানবিশেষে দুরূহ শব্দের অর্থ ও বিশদ ব্যাখ্যা সংযোজিত হইয়াছে। এই সকল ব্যাখ্যায় আমি অনেক স্থলে ভাষ্যকার শংকরের মত গ্রহণ করিতে পারি নাই। আচার্য শংকর স্বীয় দার্শনিক মত প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত উপনিষদের অনেক শ্লোকের যে কষ্টকল্পিত অর্থ করিয়াছেন তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই।

এই গ্রন্থ প্রণয়নে আমি প্রাচীন ও আধুনিক অনেক গ্রন্থের সাহায্য পাইয়াছি। আচার্য শংকরের ভাষ্য ছাড়া উপাধ্যায় গৌরগোবিন্দ রায়ের কৃত ‘বেদান্ত-সমন্বয় ভাষ্য’, মহামহোপাধ্যায় দুর্গাচরণ সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ সম্পাদিত উপনিষদ্ গ্ৰন্থসমূহ, শ্রীঅরবিন্দের ‘ঈশ উপনিষৎ’, পণ্ডিত সীতানাথ তত্ত্বভূষণ সম্পাদিত উপনিষৎসমূহের সংস্করণ এবং রামকৃষ্ণ মিশন প্রকাশিত ‘উপনিষদ্ গ্রন্থাবলী’ হইতে আমি বিশেষ সাহায্য লাভ করিয়াছি। সকলের নিকটই আমার হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি।

যাঁহারা অল্প সংস্কৃত জানেন অথবা আদৌ জানেন না তাঁহারাও যাহাতে বেদের সারভাগ উপনিষৎসমূহের মর্ম সহজে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন তজ্জন্য আমি এই গ্রন্থে যথাশক্তি প্রয়াস পাইয়াছি। কতদূর কৃতকার্য হইয়াছি তাহা সহৃদয় পাঠকবর্গ বিবেচনা করিয়া দেখিবেন।

অতুলচন্দ্র সেন
কলিকাতা
১৯৪২ সাল
উপনিষদ-২

.

উপনিষদ গ্রন্থাবলী – দ্বিতীয় খণ্ড

মুখবন্ধ

যে দ্বাদশ উপনিষদের উপর বেদান্ত দর্শন প্রতিষ্ঠিত তন্মধ্যে ছান্দোগ্য একখানা প্রধান ও প্রাচীন উপনিষদ। সামবেদের ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণে দশটি অধ্যায় আছে। শেষ আটটি অধ্যায়ের নাম ছান্দোগ্য উপনিষদ। উপনিষদের প্রায় প্রত্যেক অংশই এক একটি বিদ্যা বা উপাসনা। উপনিষদে বিদ্যা ও উপাসনা পরমার্থ-চিন্তা অর্থে ব্যবহৃত হয়। আচার্য শংকর তাঁহার ছান্দোগ্যভাষ্যের উপক্রমণিকায় এই সকল উপাসনাকে তিনভাগে বিভক্ত করিয়াছেন। এক শ্রেণীর উপাসনা যজ্ঞ ও সামগণের সহিত সম্বন্ধ। আর এক শ্রেণীর উপাসনা সগুণ ব্রহ্মবিষয়ক। তৃতীয় শ্রেণীর উপাসনা নির্গুণ ব্ৰহ্মবিষয়ক।

প্রথম শ্রেণীর উপাসনাগুলি আধুনিক পাঠকের তেমন প্রীতিপদ না হইতে পারে। বর্তমান সময়ে ইহাদের আধ্যাত্মিক উপযোগিতা আছে কিনা সন্দেহ। কিন্তু বাহ্যিক অনুষ্ঠান-প্রধান ধর্ম হইতে ধ্যানপ্রধান ধর্মে জাতীয় ক্রমোন্নতির ইতিহাস বুঝিবার পক্ষে ইহাদের উপযোগিতা আছে সন্দেহ নাই। দ্বিতীয় শ্রেণীর উপাসনাগুলি জগতের বিচিত্র বস্তুতে ব্রহ্মের উপলব্ধি সাধনে নিশ্চয়ই উপযোগী। তৃতীয় শ্রেণীর উপাসনাগুলির উপযোগিতা ব্রহ্মের জগদতীত, দেশকালের সীমাতীত, অনন্ত, অখণ্ড স্বরূপ উপলব্ধি- বিষয়ে। ছান্দোগ্যের প্রথমার্ধে যে সকল আখ্যায়িকা আছে সেগুলি বেদান্ত সাহিত্যে সুপ্রসিদ্ধ এবং পরমার্থতত্ত্ব হৃদয়ে বদ্ধমূল করিবার পক্ষে বিশেষ সহায়ক।

দার্শনিক তত্ত্বব্যাখ্যা সম্বন্ধে ছান্দোগ্যের শেষ তিন অধ্যায় সর্বাপেক্ষা মূল্যবান। ষষ্ঠ অধ্যায়ে ‘তৎ ত্বমসি’ মহাকাব্য নানাভাবে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। বেদান্ত দর্শনে ইহার স্থান সুপ্রসিদ্ধ। সপ্তম অধ্যায়ে ‘নাম’ হইতে আরম্ভ করিয়া ঋষি (সনৎকুমার) সোপান পরম্পরা অতিক্রমপূর্বক যে ভাবে চিন্তার উচ্চতম স্তর ‘ভূমা’তে উত্থিত হইয়াছেন, তাহাতে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনধ্যায়ী এই ব্যাখ্যা পাঠ করিতে করিতে নিশ্চয়ই হেগেলের ন্যায়পদ্ধতি স্মরণ করিবেন। অষ্টম অধ্যায়ে পাঠক অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ইন্দ্র-প্রজাপতি সংবাদে জাগ্রৎ-স্বপ্নাদি অবস্থা সম্বন্ধে বৃহদারণ্যকে ব্যাখ্যাত মতের বিরুদ্ধ, অন্তত আপাতবিরুদ্ধ মত দেখিতে পাইবেন। তৎ ত্বমসি মহাকাব্যের বিবৃতি, সনৎকুমারের ভূমাতত্ত্ব ব্যাখ্যা এবং প্রজাপতির আত্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা— এই তিনটিই বেদান্ত সাহিত্যের অমূল্য রত্ন। উপনিষদের পরলোকবাদ পঞ্চম, অষ্টম অধ্যায়ে বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। আধুনিক পাঠক সমপ্রভাবে সেই মত গ্রহণ করুন আর নাই করুন, ইহা তাঁহার নিবিষ্ট অধ্যয়নের উপযুক্ত। অশ্বপতি ও ষডুব্রাহ্মণ-সংবাদ সামাজিক ও দার্শনিক উভয় দিক হইতেই প্রয়োজনীয়।

বৈদিক সাহিত্যে বৃহদারণ্যকের স্থান সম্বন্ধে উপনিষদের অনুবাদক ও ব্যাখ্যাতা পণ্ডিত মহেশচন্দ্র বেদান্তরত্নের মন্তব্য উদ্ধৃত করিয়া তৎপর আমার বক্তব্য বলি। তিনি লিখিয়াছেন : “বিষয় ও কালের বিভাগানুসারে বৈদিক সাহিত্য মন্ত্র, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ— এই চারি শ্রেণীতে বিভক্ত। শুক্ল যজুর্বেদের দুই শাখা, (১) কাণ্ব শাখা ও (২) মাধ্যন্দিন শাখা। প্রত্যেক শাখাতেই ‘শতপথ’ নামক একখানা ব্ৰাহ্মণ আছে। এই উভয় শতপথ ব্রাহ্মণ যে সর্বাংশেই এক, তাহা নহে; কিছু কিছু পার্থক্যও আছে, তবে অধিকাংশ স্থলেই ঐক্য রহিয়াছে। কাণ্ব শাখার শতপথ ব্রাহ্মণে সতেরটি কাণ্ড। শেষ কাণ্ডই অর্থাৎ সপ্তদশ কাণ্ডই বৃহদারণ্যক উপনিষদ নামে খ্যাত। এই উপনিষদের প্রায় সমগ্র অংশই মাধ্যন্দিন শাখায় পাওয়া যায়, কিন্তু এক স্থলে নহে।”

উপনিষদ সাহিত্যের সাধারণ লক্ষণ অনুসারে আমরা উপনিষদ গ্রন্থে ব্ৰহ্মজ্ঞানই অন্বেষণ করি। বৃহদারণ্যকে গভীর ব্রহ্মজ্ঞান যথেষ্ট পরিমাণে আছে। কিন্তু হয়ত পাঠক দেখিয়া বিস্মিত হইবেন যে, ইহাতে এমন অনেক বিষয় আছে যাহাকে ব্রহ্মজ্ঞান বলা যায় না। ইহার প্রধান কারণ এই যে, উপনিষদ একটি বৃহৎ ‘ব্রাহ্মণ’-এর অন্তর্গত। ‘ব্রাহ্মণ’-এর অন্তর্গত হওয়াতেই ইহাতে এমন অনেক বিষয় প্রবেশ করিয়াছে যাহার প্রকৃত স্থান ব্রাহ্মণ গ্রন্থে। প্রাচীন পুস্তকে স্পষ্ট বিষয়-বিভাগ দুর্লভ।

দ্বিতীয় কারণ এই যে, এই গ্রন্থ স্পষ্টতই অনেক ঋষির রচিত। প্রতিভা ও অন্তর্দৃষ্টি সম্বন্ধে এই ঋষিদের মধ্যে অনেক প্রভেদ ছিল, সন্দেহ নাই। কেহ কেহ অতি গভীর চিন্তাশীল। তাঁহারা যে সকল বিষয়ে শিক্ষা দিয়া গিয়াছেন, এই বিজ্ঞানালোকিত বিংশ শতাব্দীতেও সেই সকল বিষয়ের বিচার চলিতেছে। এমন কি বর্তমান যুগের অনেক সুশিক্ষিত ব্যক্তিও এই সকল চিন্তার গভীরতা উপলব্ধি করিতে পারেন না। পক্ষান্তরে বোধ হয় অনেক ঋষিই যাগযজ্ঞ লইয়া এত ব্যস্ত ছিলেন যে, চিন্তা করিতে গিয়া তাঁহাদের চিন্তা যজ্ঞাঙ্গ এবং যজ্ঞাঙ্গের সহিত সম্বন্ধ বিষয়কলাপকে অতিক্রম করিতে পারে নাই। অনেক স্থলে তাঁহাদের কথা অবোধ্য, এমন কি আপাতত অৰ্থহীন, অন্তত বর্তমান সমাজের অনুপোযোগী বলিয়া বোধ হয়।

যে সকল দার্শনিক-তত্ত্ব এই গ্রন্থে বিবৃত হইয়াছে সে, সকল সম্বন্ধেও আমার বোধ হয় এই সকল তত্ত্বের উদ্ভাবক মহর্ষিগণ উপনিষদ গ্রন্থসমূহের রচয়িতা নহেন। সম্ভবত তাঁহাদের শিক্ষা শিষ্য পরম্পরায় চলিয়া আসিয়াছিল, কোনও সময়ে কোনও লেখক বা বক্তা দ্বারা তাহা গ্রন্থাকারে নিবদ্ধ হইয়াছে। উপনিষদ সাহিত্যে যেভাবে উপনিষদবক্তা ঋষিদের উল্লেখ বা বর্ণনা আছে— প্রকৃত বক্তা বা লেখকগণ সেভাবে নিজের উল্লেখ বা বর্ণনা করেন না, অন্য ব্যক্তিরাই সেরূপ উল্লেখ বা বর্ণনা করেন। বিশেষত যাঁহারা গভীর চিন্তাশীল এবং সূক্ষ্মতত্ত্বের আবিষ্কারক, তাঁহাদের ব্যাখ্যাপ্রণালী চিন্তাশীল ও যুক্তিপূর্ণ হওয়াই সম্ভব। বর্তমান লেখকদের তো কথাই নাই, প্লেটো প্ৰভৃতি প্রাচীন গ্রীক লেখকদের মধ্যেও এই রচনাকৌশল দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু উপনিষদুক্ত দার্শনিক উপদেশগুলিতে আমরা সেই বাক্‌চাতুর্য বা লিপি-কৌশলের পরিচয় পাই না। এই সাহিত্যে অতি গভীর তত্ত্বনিচয়ও অনেক স্থলে অতি অস্পষ্ট ও অবিন্যস্ত ভাষায় বিবৃত হইয়াছে। ইহাতে যেন প্রমাণ হয় যে, তত্ত্বের স্রষ্টা ও ব্যাখ্যাতা এক ব্যক্তি নহেন— দ্রষ্টা যে প্রণালীতে তত্ত্ব দেখিয়াছিলেন এবং প্রকাশ করিয়াছিলেন, সেই প্ৰণালী আমরা পাই না; যিনি তত্ত্ব দেখেন নাই, অন্তত সম্যভাবে দেখেন নাই, কেবল শুনিয়াছেন এবং হয়ত আংশিকভাবে দেখিয়াছেন, এমন কোন ব্যক্তিই তাহা বচনবদ্ধ বা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। দার্শনিক গ্রন্থ হিসাবে উপনিষদ সাহিত্যে যে অসম্পূর্ণতা দেখিতে পাওয়া যায়, আমার বোধ হয় ইহাই তাহার কারণ।

যাহা হউক বৃহদারণ্যকোক্ত ঋষিদের বিষয় এখন কিঞ্চিৎ বিশেষভাবে বলি। ইহাতে অজাতশত্ৰু, জনক, যাজ্ঞবল্ক্য, আরুণি, উষস্ত, প্রবাহণ প্রভৃতি অনেক ঋষিরই উল্লেখ আছে। সুপ্রসিদ্ধা ব্রহ্মবাদিনী গার্গী ও মৈত্রেয়ীর মনোহর আখ্যায়িকাও পাঠক এই উপনিষদে দেখিতে পাইবেন। কিন্তু ইহাও দেখিবেন যে, যাজ্ঞবল্ক্যই এই উপনিষদের প্রধান ঋষি। এই উপনিষদুক্ত গভীরতম তত্ত্বগুলি প্রধানত তাঁহারই নামে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। পরবর্তী দার্শনিক চিন্তায় যাজ্ঞবন্ধ্যের প্রভাব অতি গভীর ও ব্যাপক।

ঔপনিষদ ব্রহ্মবিদ্যার দুই ধারার একটির প্রধান উপদেষ্টা যাজ্ঞবল্ক্য এবং অপরটির প্রধান উপদেষ্টাদ্বয় ইন্দ্র ও প্রজাপতি। বৃহদারণ্যকের ভূমিকায় যাজ্ঞবন্ধ্যের মত সমালোচনা সহ ব্যাখ্যাত হইয়াছে এবং ইহার সহিত ইন্দ্র ও প্রজাপতির উপদিষ্ট মতের প্রভেদ স্পষ্টরূপে দেখান হইয়াছে। উহাতে যে সকল দার্শনিক যুক্তি দেওয়া হইয়াছে ইহাতে সেগুলির পুনরুক্তি করিব না।

কৌষীতকি উপনিষদের প্রথম ও তৃতীয় অধ্যায় উপনিষদ দর্শন বুঝিবার পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ের বিষয়গুলি প্রকৃতপক্ষে উপনিষদের বিষয় নহে; জ্ঞানী ও জ্ঞানার্থীর পক্ষে এই সকল বিষয় নিষ্প্রয়োজন। সেইজন্য আমরা এই সকল বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করিলাম না। প্রথম ও তৃতীয় অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করিতেছি। প্রথম অধ্যায়ের আখ্যায়িকা এবং ‘ছান্দোগ্য ও বৃহদারণ্যক’- এর কোন কোন স্থল পড়িলে বোধ হয় ব্রহ্মর্ষিরা অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-জাতীয় ঋষিগণ সম্ভবত যাগযজ্ঞে অতি ব্যস্ততাবশত পরলোক সম্বন্ধে গভীর চিন্তা করেন নাই; এমন কি অনেকে হয়ত এ-বিষয়ে সন্দিহানই ছিলেন। রাজর্ষি অর্থাৎ ক্ষত্রিয়-জাতীয় ঋষিদের চিন্তা ও বিশ্বাস এই বিষয়ে উজ্জ্বলতর ছিল। এই বিষয়ে ব্রহ্মর্ষিগণ রাজর্ষিগণের নিকট শিক্ষালাভ করিয়াছিলেন। ব্রহ্মস্বরূপ সম্বন্ধেও যে রাজর্ষিগণের চিন্তা ব্রহ্মর্ষিগণের চিন্তা হইতে ভিন্ন ছিল, তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। ফলত দেখা যায় যে, নির্বিশেষ অদ্বৈতবাদ ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ— এই দুই ভিন্ন মত ব্রহ্মর্ষি ও রাজর্ষি এই দুই ভিন্ন শ্রেণীস্থ ঋষির মত; কেবল শঙ্কর, রামানুজ ব্যাখ্যাকারদের মত নহে। উপনিষদে নির্বিশেষ অদ্বৈতবাদ ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ উভয় মতবাদেরই পরিচয় পাওয়া যায়। উভয়ই ব্ৰহ্মবাদ, উভয়ই অদ্বৈতবাদ, সুতরাং উভয়ের মধ্যে একতা ও সাধারণত্ব যথেষ্ট আছে। কিন্তু ইহাদের অনৈক্য, বিশেষত্বও যথেষ্ট আছে; তাহাও বিশেষ মনোযোগের উপযুক্ত।

এই দুই মতের ভিন্নতা ‘কৌষীতকি’তে যে ভাবে বিবৃত হইয়াছে, তাহা আমরা যতদূর সম্ভব সংক্ষেপে বলি। প্রথম অধ্যায়ের উল্লিখিত গাঙ্গ্যপুত্ৰ চিত্ৰ সম্ভবত একজন রাজর্ষি। ব্রহ্মর্ষি উদ্দালক আরুণি তাঁহার পুরোহিত। শ্বেতকেতু আরুণির পুত্র। আরুণি শ্বেতকেতুকে চিত্রের যজ্ঞ সম্পাদন করিতে পাঠাইলেন। চিত্র শ্বেতকেতুকে জিজ্ঞাসা করিলেন তিনি এই লোকে এমন কোন গুপ্ত স্থান জানেন কিনা, যাহাতে তিনি তাঁহাকে স্থাপন করিতে পারেন; অথবা এমন কোন পথ তিনি জানেন কিনা যে পথে গেলে পরলোকে এরূপ স্থান পাওয়া যায়। চিত্র স্পষ্টতই অতীন্দ্ৰিয় আধ্যাত্মিক জগতের কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, যে জগৎ ইহলোকেই হউক আর পরলোকেই হউক ব্রহ্মসাধকের প্রাপ্য। শ্বেতকেতু চিত্রের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিলেন না। গৃহে ফিরিয়া আরুণিকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনিও এ-বিষয়ে নিজের অজ্ঞতা স্বীকারপূর্বক চিত্রের নিকট উপনীত ও শিক্ষিত হইতে গেলেন। ক্ষত্রিয়ের নিকট ব্রাহ্মণ উপনয়ন ও শিক্ষা চাহিতেছেন, ইহাতে আরুণির নিরহঙ্কারের প্রশংসা করিয়া চিত্র তাঁহাকে পরলোকতত্ত্ব শিক্ষা দিলেন।

পরলোকতত্ত্বের বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি বলিলেন— যাহারা যজ্ঞাদি দ্বারা দেবপূজা করে এবং লোকহিতকর নানা কর্ম করে, কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞান ও ব্রহ্মোপসনা সাধন করে না, তাহারা দেহান্তে ‘পিতৃযাণ’ পথে চন্দ্রাধিষ্ঠিত পিতৃলোক বা স্বর্গলোকে যায় এবং নিজ পুণ্যকর্মের ফল ভোগ করে। এই ফল নিঃশেষিত হইলে কর্মী আত্মা পুনর্জন্ম গ্রহণ করে। যাঁহারা কর্মে সন্তুষ্ট না হইয়া ব্ৰহ্মজ্ঞান ও ব্রহ্মোপাসনা সাধন করেন, তাঁহারা মরণান্তে ‘দেবযান’ পথে ব্ৰহ্মলোকে যান এবং সেখানে মুক্ত আত্মাদেয় সঙ্গে ব্রহ্মসান্নিধ্যে চিরবাস করেন। ‘পিতৃযাণ’ ও ‘দেবযান’ পথের যেরূপ বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে তাহাতে স্পষ্টই বোধ হয় এই বর্ণনা রূপাত্মক— এই পন্থাদ্বয় আকাশব্যাপী পন্থাদ্বয় নয়, প্রকৃতপক্ষে দুইটি আধ্যাত্মিক সাধনপ্রণালী। ব্রহ্মলোক এবং ব্রহ্মধামের যে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে তাহাতেও স্পষ্টই বোধ হয় এই লোক ও ধাম দূর দেশস্থিত কোন লোক বা ধাম নয়, ইহলোক ও পরলোক জীবাত্মার আধ্যাত্মিক জীবনের দুইটি স্তর মাত্র।

চিত্রের মুক্তিবাদ ব্রহ্মর্ষিদের লয়বাদ হইতে অত্যন্ত ভিন্ন। ব্রহ্মর্ষিদের লয়বাদ এই পর্যন্ত পাঠক ‘প্রশ্ন’, ‘মুণ্ডক’ ও ‘মাণ্ডুক্য’ উপনিষদে পাইয়াছেন। এই বাদে মুক্তাবস্থায় জীব-ব্রহ্ম কোন ভেদ থাকে না। চিত্রের মতে ভেদ ও অভেদ দুই থাকে, অভেদবোধেও ‘তুমি’-’আমি’র ভেদ থাকে, সুতরাং উপাসনাও থাকে। রাজর্ষিরা প্রথম হইতেই দেখান যে, জীব-ব্রহ্মের সম্বন্ধ একান্ত ভেদও নহে, একান্ত অভেদও নহে— মুক্তাবস্থায় এই সম্বন্ধ পরিস্ফুট হয়। ‘কৌষীতকি’র তৃতীয় অধ্যায়ে এই মৌলিক ভেদাভেদই ব্যাখ্যাত হইয়াছে।

তৃতীয় অধ্যায়ের বক্তা দেবর্ষি ইন্দ্র, শ্রোতা ঋগবেদোক্ত রাজা দিবোদাসের পুত্র প্রতর্দন। ঋগ্‌ বেদীয় ইন্দ্রদেব ঔপনিষদ দর্শন ব্যাখ্যা করিতেছেন এই অনুমানই সম্ভব। এই ইন্দ্রপ্রতর্দন সংবাদ উপনিষদুক্ত ব্রহ্মাত্মবাদের দার্শনিক ভিত্তি। কি অর্থে মানুষ ঈশ্বরের সঙ্গে একত্ব দাবি করিতে পারে, তাহাই এই সংবাদে ব্যখ্যাত হইয়াছে। ‘ব্রহ্মসূত্র’এর (১।১।৩০) সূত্রে পাঠক এই বিচার পাইবেন। সমগ্র তৃতীয় অধ্যায়ের সারমর্ম এই— চিন্তাহীন লোকে, এমন কি গভীর চিন্তাবিহীন দার্শনিকেরাও প্রাণ, প্রজ্ঞা (অহপ্রত্যয়, আত্মবোধ), জ্ঞানেন্দ্রিয় অর্থাৎ জ্ঞানলাভের শক্তি, কর্মেন্দ্রিয় অর্থাৎ কর্ম করিবার শক্তি, জ্ঞানেন্দ্রিয়ের বিষয় রূপ-রসাদি এবং কর্মেন্দ্রিয়ের বিষয় বাক্য, গতি প্রভৃতি, এই সকলকে পরস্পর হইতে পৃথক মনে করিয়া গভীর দার্শনিক ভ্রমে পতিত হন। এই সকলকে পরস্পর হইতে ভিন্ন বলিয়া কল্পনা করা যায় বটে, কিন্তু এরূপ ভেদকল্পনায় ইহারা পৃথক হয় না। বস্তুত ইহারা পরস্পরের সহিত এক, অস্বতন্ত্র। জ্ঞানের বিষয় ও কর্মের বিষয় যুক্ত, জ্ঞান ও শক্তি সমন্বিত, প্ৰাণ— প্রজ্ঞাই একমাত্র, অখণ্ড, অদ্বিতীয় আত্মা অসীমভাবে দেখিলে পরমাত্মা, সসীমভারে দেখিলে জীবাত্মা। দর্শন শ্রবণাদি প্রত্যেক জ্ঞানক্রিয়াতে এবং গতি-বাক্যোচ্চারণ প্রভৃতি কর্মে এই অখণ্ড আত্মবস্তুই বিষয়ী ও বিষয়রূপে প্রকাশিত হয়। লোকে এই ভেদাভেদতত্ত্ব না বুঝিয়া কল্পনা করে যে, তাহারা স্বতন্ত্র জড়জগৎ, স্বতন্ত্র জীব এবং জড় ও জীব হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঈশ্বরকে জানিতেছে। অধ্যায়ের শেষভাগে এই ভেদাভেদতত্ত্ব সংক্ষেপে ও স্পষ্ট ভাষায় উক্ত হইয়াছে।

যাহা হউক, ইন্দ্রের ভেদাভেদ-ব্যাখ্যায় একটি কথা অস্পষ্ট থাকিয়া গিয়াছে, সেটি স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক। তিনি বলিতেছেন যে, নিদ্রাকালে ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়ের বিষয় প্রাণে একীভূত বা বিলীন হইয়া যায়, জাগরণে ইহারা পুনরায় ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়। প্রশ্ন এই যে ভেদ একবার অভেদে বিলীন হইয়া গেল, তাহা কিরূপে পুনরায় ভেদরূপে প্রকাশিত হইবে? জ্ঞানের বিষয় কেবল জ্ঞানেই থাকিতে পারে। যে ভেদ জ্ঞানের অবিষয় হইয়া গেল তাহা পুনরায় জ্ঞানে প্রকাশিত হইতে পারে না। আমরা পুনর্জাগরণে দেখি নিদ্রার পূর্ববর্তী ভেদসমূহ ফিরিয়া আসিতেছে। যাহা থাকে, কেবল তাহাই ফিরিতে পারে। ভেদগুলি নিদ্রাকালে আমাদের সসীম জ্ঞানে ছিল না, কিন্তু ইহারা আমাদেরই স্মৃত বিষয়রূপে ফিরিয়া আসাতে প্রমাণ হইল যে আমাদেরই অন্তরাত্মা অনিদ্ৰ থাকিয়া এই সকল ভেদ ধারণ করিয়া থাকেন এবং নিদ্রান্তে আমাদিগকে এই সকল প্রত্যর্পণ করেন। বুঝিতে হইবে যে, মৃত্যু ও অমরত্বের স্থলেও এরূপই ঘটে। জীবের অর্জিত জ্ঞান মৃত্যুতে বিলুপ্ত হয় না, লুক্কায়িত হয় মাত্র। তাহা অমর পরমাত্মাতে অক্ষুণ্ণ থাকিয়া পরকালে অমর জীবের জ্ঞানে পুনঃপ্রকাশিত হয়। নির্বিশেষ অদ্বৈতবাদী জ্ঞানের প্রকৃতি স্পষ্ট বুঝেন না, জ্ঞানের বিষয় ও বিষয়ীর ভেদাভেদ স্পষ্টরূপে ধারণা করিতে পারেন না; উহাকে কল্পিত জড় পদার্থের ন্যায় গুণ ও গুণযুক্ত বস্তুর ন্যায় কল্পনা করিয়া ভ্রমে পতিত হন। ইহাদের ভেদাভেদ বুঝিলে নির্বিশেষবাদের ভ্রম দূর হয়।

চতুর্থ অধ্যায়ের বালাকি-অজাতশত্রু-সংবাদে দেখা যায় বালাকির ব্রহ্মজ্ঞানের অভিমান সত্ত্বেও তিনি প্রকৃতপক্ষে সসীম উপাসনার উপরে উঠেন নাই। রাজর্ষি অজাতশত্রুকে তিনি ব্রহ্মবাদ শিক্ষা দিতে অসমর্থ হইয়া তাঁহার নিকট উপনীত হইতে চাহিলেন। ক্ষত্রিয়ের নিকট ব্রাহ্মণের উপনয়ন সেই সময় লোকাচার-বিরুদ্ধ ছিল। রাজর্ষি লোকাচার লঙ্ঘন না করিয়া বিনা উপনয়নেই বালাকিকে শিক্ষা দিলেন। এই আখ্যায়িকাই কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত আকারে ‘বৃহদারণ্যক’-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম ব্রাহ্মণে পুনরুক্ত হইয়াছে। অজাতশত্রুর প্রদত্ত ব্রহ্মব্যাখ্যা সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট। ইহাতে এই পর্যন্ত শিক্ষা লাভ হয় যে, যাঁহাকে কোন বিশেষ দেশ, কাল বা কার্যে আবদ্ধ বলিয়া কল্পনা করা হয়, তিনি যত বড় হউন না কেন, তাঁহাকে ‘ব্রহ্ম’ বলা যায় না, ব্ৰহ্ম সর্বাধার, সর্বাশ্রয় বৃহদ্বস্তু। তিনি দেশ, কাল ও ব্যষ্টি ব্যক্তিত্বের সীমার অতীত।

সীতানাথ তত্ত্বভূষণ
কলিকাতা
১৩৩৪ বঙ্গাব্দ, ১৯২৭ খ্রীঃ

Book Content

উপনিষদ গ্রন্থাবলী - প্রথম খণ্ড
ঈশ উপনিষদ
কেন উপনিষদ
কঠ উপনিষদ
প্রশ্ন উপনিষদ
মুণ্ডক উপনিষদ
মাণ্ডুক্য উপনিষদ
তৈত্তিরীয় উপনিষদ
ঐতরেয় উপনিষদ
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ
উপনিষদ গ্রন্থাবলী - দ্বিতীয় খণ্ড
ছান্দোগ্য উপনিষদ 8 Topics
Lesson Content
0% Complete 0/8 Steps
ছান্দোগ্য উপনিষদ – প্রথম অধ্যায়
ছান্দোগ্য উপনিষদ – দ্বিতীয় অধ্যায়
ছান্দোগ্য উপনিষদ – তৃতীয় অধ্যায়
ছান্দোগ্য উপনিষদ – চতুর্থ অধ্যায়
ছান্দোগ্য উপনিষদ – পঞ্চম অধ্যায়
ছান্দোগ্য উপনিষদ – ষষ্ঠ অধ্যায়
ছান্দোগ্য উপনিষদ – সপ্তম অধ্যায়
ছান্দোগ্য উপনিষদ – অষ্টম অধ্যায়
বৃহদারণ্যক উপনিষদ
কৌষীতকি উপনিষদ

Reader Interactions

Comments

  1. Promdo Baruah

    May 10, 2025 at 10:41 pm

    I want this book

    Reply
  2. Arup Mukherjee

    June 6, 2025 at 3:50 am

    This books increases our spiritual knowledge satisfaction of our soul.j6

    Reply

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.