উপনিষদের কথা – সতীন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায়
উপনিষদের কথা – সতীন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায়
সাহিত্য সংসদ
প্রথম প্রকাশ : আগস্ট ১৯৭২
প্রচ্ছদশিল্পী : আশিস দত্ত
প্রকাশক – দেবজ্যোতি দত্ত
শিশু সাহিত্য সংসদ প্রা লি
.
উৎসর্গ
পুতুলের উদ্দেশে
-বাবা-
.
প্রকাশকের নিবেদন
উপনিষদের কথা পরিমার্জিত তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হল৷ দীর্ঘদিন মুদ্রিত না-থাকায় বহু গবেষক-পাঠক অনুযোগ জানিয়ে আসছিলেন গ্রন্থটি পুনরায় মুদ্রণের জন্য৷ তাঁদের হাতে গ্রন্থটির পরিমার্জিত সংস্করণটি তুলে দিতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি৷ এটা ঠিক যে, উপনিষদকে ঘিরে পণ্ডিতদের দার্শনিক তর্কবিতর্কের আশ্রয়ে এ-গ্রন্থ রচিত হয়নি, শিক্ষিত সাধারণ পাঠকদের কাছে উপনিষদের প্রাথমিক পরিচয় এবং নয়টি দর্শনপন্থার (চার্বাক, জৈন, বৌদ্ধ ও ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, পূর্বমীমাংসা এবং উত্তরমীমাংসা বা বেদান্ত) সাধারণ রূপ ও উপনিষদের সঙ্গে এগুলির সম্পর্কের কথা তুলে ধরাই এ-গ্রন্থের প্রধান লক্ষ্য৷
পাঠক আরও লক্ষ করবেন, আমরা শাস্ত্রবাক্য হিসেবে উপনিষদের যেসব শ্লোক অহরহ ব্যবহার করি সেসব মূল শ্লোক সহজবোধ্য বাংলায় অনুবাদসহ দেওয়া হয়েছে এবং শ্লোকগুলি কোন উপনিষদের অন্তর্গত তাও দেখানো হয়েছে৷ পাঠকদের সুবিধার্থে শব্দসূচিও কিছুটা বিস্তৃতরূপে দেওয়া হল৷ প্রুফ সংশোধন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজে বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের সাহায্য পেয়েছি৷ তাঁকে ধন্যবাদ জানাই৷
দেবজ্যোতি দত্ত
কলকাতা
মে ২০০৪
.
ভূমিকা
আমরা উপনিষদকে মান্য করি, শ্রদ্ধা করি, কিন্তু দূর থেকে৷ কাছে টেনে এনে তাকে ঘরোয়া করতে পারিনি, কারণ উপনিষদের সঙ্গে আমাদের পরিচয়টা ঘনিষ্ঠ নয়৷
ঘনিষ্ঠ না-হওয়ার কারণ বহু৷ তার ফিরিস্তায় আমাদের প্রয়োজন নেই৷ সেগুলির মধ্যে আমাদের উল্লেখযোগ্য যেটি, তা হল আমাদের মতো শিক্ষিত সাধারণজনের উপনিষদগুলি সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানের অভাব৷ আমরা এগুলি দুর্বোধ্য বলে মনে করি৷ আমাদের উপনিষদ-ব্যাখ্যাতারাও যে-পথ দিয়ে আমাদের মতো সাধারণ মেধার লোককে সে অধিবিদ্যার রাজ্যে প্রবেশ করাতে চান, তা দুর্গম ও নানা শাস্ত্রমতের তর্কবিতর্কের কণ্টকে কণ্টকিত৷
বলা বাহুল্য, এ পুথিখানা পণ্ডিতদের ও দার্শনিকদের কোনো কাজে লাগবে না, সাধুসন্তেরও না৷ উপনিষদের যে-স্তরে তাঁদের দৃষ্টি তা আমাদের নাগালের বাইরে৷ তবে এ পুথিখানা কার জন্য? আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষিত মানুষ যাঁরা জানতে চান উপনিষদ বলতে কি বোঝা যায়, এর মূলগত আলোচ্য বিষয়টি কী এবং মানুষ-প্রজাতির ইতিহাসে তার মেধাবৃদ্ধির কোন স্তরের সঙ্গে এ পুথি বা পুথিগুচ্ছ জড়িত, এ পুথি তাঁদের জন্য৷
কাজেই এ লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি রেখেই আমরা অধিবিদ্যা জগতের দুরূহ তত্ত্ব পরিহার করে চলেছি, উপনিষদ-ভিত্তিক নানা দার্শনিক তর্ক-বিতর্ক ও নানা শাস্ত্রের তুলনামূলক সমালোচনার পথ বর্জন করেছি৷ বলা বাহুল্য, এই পুথিখানার লক্ষ্য দেশের সাধারণ শিক্ষিত জনগণের সঙ্গে উপনিষদের প্রাথমিক পরিচয় ঘটানো৷ এই প্রাথমিক পরিচয়ের ফলে যদি কোনো পাঠকের মনে উপনিষদ-পাঠের বিন্দুমাত্র ঔৎসুক্য জাগ্রত হয় তবে আমাদের পরিশ্রম সার্থক বলে মনে করব৷
উপনিষদের পটভূমিকা বিরাট; এর অন্তর্নিহিত চিন্তাধারাও সুদূরপ্রসারী৷ একে একটা ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে গিয়ে এর অঙ্গহানি তো করেছিই, এর মাধুর্যেরও লাঘব করেছি, সন্দেহ নেই৷ এ-সবই আমাদের অক্ষমতার নিদর্শন৷ ভরসা করি, মূল লক্ষ্যের কথা স্মরণ করে পাঠকসাধারণ এ-সকল অক্ষমতা মার্জনা করবেন৷
উপনিষদ কোনো জাতিবিশেষের সম্পদ নয়; এটি মানুষ-প্রজাতির প্রথম লিখিত চিন্তাধারা, সর্বমানবের সাধারণ সম্পত্তি৷ ভারতবর্ষের মানুষ এই আদি চিন্তাধারার সূত্র থেকে তাদের নয়টি দর্শনশাস্ত্র রচনা করেছে সত্য, কিন্তু তার জন্য উপনিষদ তাদের সম্পত্তি বলে পরিগণিত হয়নি বা হতেও পারে না৷ যে-কোনো দেশের মানুষের এর উপর সমান অধিকার৷ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মতো জগতের যে-কোনো মানুষের এতে দাবি রয়েছে৷ এটা আমাদের স্পষ্ট করে বোঝা প্রয়োজন৷
উপনিষদের জগৎ যে শুধু অধিবিদ্যারই জগৎ এ-কথা মনে করা অসংগত; এতে বৈজ্ঞানিক তথ্যের, এমনকি অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারারও সন্ধান পাওয়া যায়৷ এই ক্ষুদ্র পুথি সে আলোচনার স্থান নয়৷ আমরা অন্যতার উদ্দেশ দিতে চেষ্টা করেছি৷
একটি অধ্যায়ে ভারতবর্ষের এই নয়টি দর্শনপন্থার সাধারণ রূপ ও উপনিষদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নির্দেশ করতে চেষ্টা করেছি৷
আশা করি, পরিশিষ্টের যোজনা ‘শব্দ ও বিষয়-পরিচয়’ এবং ‘শব্দ ও বিষয়-সূচি’ পাঠকের কাজে লাগবে৷
পরিশেষে সাহিত্য সংসদের কর্ণধার শ্রীমহেন্দ্রনাথ দত্ত ও ওই প্রতিষ্ঠানেরই অধ্যক্ষ শ্রীগোলোকেন্দু ঘোষ উভয়কেই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই৷ এঁদের পরম সহযোগিতার ফলেই এ পুথিখানির সুষ্ঠু প্রকাশন সম্ভবপর হল৷
ইতি
শ্রী সতীন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায়
কলকাতা
১৫ আগস্ট, ১৯৭২।
.
”ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিনশ্চি-
ন্নায়ং কুতশ্চিন্ন বভূব কশ্চিৎ৷
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’’
(কঠোপনিষদ্-দ্বিতীয়া বল্লী ৪৭৷১৮)
.
”ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচি-
ন্নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ৷
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’’
(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-দ্বিতীয় অধ্যায় ২০)





Leave a Reply