অর্কেস্ট্রা (১৯৩৫) – কাব্যগ্রন্থ – সুধীন্দ্রনাথ দত্ত
.
ভূমিকা
পিতৃদেব ছিলেন নিশ্চিন্ত বৈদান্তিক; এবং আকৈশোর অদ্বৈতের অনির্বচনীয় আতিশয্যে উত্ত্যক্ত হয়ে, আমি যদিও অল্প বয়সেই অনেকান্ত জড়বাদের আশ্রয় নিয়েছিলুম, তবু বিচারবুদ্ধির স্বাতন্ত্র্য আজও আমার অধিকারে এসেছে কিনা সন্দেহ। এখন ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে একদা আমার কলমও চলত অবাধে; এবং বোধহয় সেই জন্যে, প্রেরণাতে অলৌকিকের আভাস আছে ব’লে, সাহিত্য-সৃষ্টির উক্ত উপকরণ আমি সাধ্যপক্ষে মানতে চাইনি, তার বদলে আঁকড়ে ধরেছিলুম অভিজ্ঞতাকে। অবশ্য বর্তমানে, লেখনীর পক্ষাঘাত সত্ত্বেও, স্বপ্নচারী পথিককে যেমন, অনুপ্রাণিত কবিকে আমি তেমনিই ডরাই; এবং কালের বৈগুণ্যে ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষের মূল্য বাড়ছে বই কমছে না। কিন্তু ক্রোচে-র নন্দনতত্ত্বে আধ্যাত্মিক অভিনিবেশ থাক বা না থাক, উক্তি ও উপলব্ধির যে-অভেদে তিনি বিশ্বাসী, তার সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠার বিবাদ আর আমার চোখে পড়ে না; এবং যত দিন যাচ্ছে, তত বুঝছি যে অনুরূপ অন্তর্দৃষ্টি ব্যতীত, শুধু কাব্যরচনা কেন, স্বায়ত্তশাসনও দুষ্কর।
শারীরবৃত্তে ক্ষুধা অন্ত্রের প্রসার-সংকোচ-মাত্র; এবং এ-কথা দেহাত্মবাদীরও স্বীকার্য যে উক্ত প্রক্রিয়া গবেষকের বোধগম্য বটে, কিন্তু বুভুক্ষার ব্যক্তিগত অনুভব একেবারে আলাদা জাতের। উপরন্তু একজন জড়বাদী বৈজ্ঞানিকই দেখিয়েছেন যে শিক্ষার গুণে বেদনার স্বভাবসিদ্ধ প্রবর্তনা বদলানো আদৌ শক্ত নয়, বরঞ্চ সমাজমুক্ত মানুষের পক্ষে তার অন্যথাই অভাবনীয়; এবং সেই জন্যে ক্ষুধার মতো মৌল অভিজ্ঞতা সুদ্ধ সংস্কার- সংক্রমিত। অবশ্য অনেক দার্শনিক ও অধিকাংশ মনোবিজ্ঞানীর মতে সামান্যের উপলব্ধি অসম্ভব; এবং সংস্কার যদিও গোষ্ঠীগত, তবু অনুভূত সংস্কার স্পষ্টতই প্রাতিস্বিক। তবে এখানে অন্বীক্ষার কূট তর্ক তুলে লাভ নেই : সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ- ব্যতিরেকেও ধরা পড়ে যে স্থূল ভাষায় আমরা যাকে অভিজ্ঞতা বলি, তাতে বেদনার বৈশিষ্ট্য আর ভাবনার সাধারণ্য প্রায় সমান অনুপাতে বিদ্যমান; এবং উক্তি ও উপলব্ধি যখন অবিচ্ছেদ্য, তখন অন্তত অভিজ্ঞতাপ্রধান লেখা পড়লে, বোঝা উচিত তার কতটুকু রচয়িতার নিজস্ব আর কতখানি গতানুগতিক
দুর্ভাগ্যবশত উল্লিখিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার অনেক আগেই ‘অর্কেস্ট্রা’ রচিত ও প্রকাশিত; এবং তখন, পরবর্তী কবিতাগুলোয় অভিজ্ঞতা প্রেরণার স্থান নিয়েছে ব’লে, বেশ খানিকটা গর্ববোধ করেছিলুম। কিন্তু অভিজ্ঞতাও প্রেরণার মতো উপাত্তমাত্র; এবং শিল্প সচেতন রূপকারের অভূতপূর্ব সৃষ্টি। অর্থাৎ শিল্পসামগ্রীর উপাদান যদিও সনাতন ও সার্বজনীন সংসারেই আহরণীয়, তবু যে-অসামান্য বিন্যাসে সেই চিরপরিচিত উপকরণসমূহ আমাদের বিস্ময় জাগায়, তার উৎপত্তি শিল্পীর একাগ্র সংকল্পে; এবং এই দিক থেকে শিল্পবস্তু আমার মতে ব্যক্তির সঙ্গে তুলনীয়। কারণ দার্শনিক পরিভাষায় যার নাম বিশেষ, সে-রহস্যও আসলে হয়তো অসংখ্যাত সাধারণের অনন্য সমষ্টি; এবং তাই যেমন মানুষে মানুষে আদান-প্রদান সম্ভব, তেমনই এক ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধি অপর ইন্দ্রিয়ের দ্বারা গ্রাহ্য। অন্ততপক্ষে নিপট নৈয়ায়িক ছাড়া আর সকলেই মানবেন যে ব্যক্তিগত অনুভূতির পাঞ্চজন্য অভিব্যক্তি বিপ্রলাপ নয়; এবং সাহিত্যে ওই অঘটন- সংঘটক মূলত বেদনা ও ভাষার সামঞ্জস্য-সাপেক্ষ।
বলা বাহুল্য উক্ত সমীকরণ একা প্রতিভার কর্ম নয়, অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরন্তর প্রযত্নের পুরস্কার; এবং যাঁরা ভাবতে অভ্যস্ত যে কাব্য প্রেরণা বা অভিজ্ঞতার লীলাভূমি, তাঁদের বিচারে কলাকৌশল স্বাচ্ছন্দ্যের জন্মশত্রু। এমনকি রবীন্দ্রনাথের মতো সাধক পুরুষও অনুরূপ বিশ্বাস ছাড়তে পারেননি; এবং এক দিন ‘উড়ে চ’লে গেছে’–এই অপরিচ্ছন্ন ক্রিয়ার উড্ডীন’-বিশেষণে রূপান্তরের চেষ্টায় আমাকে সারা সন্ধ্যা কাটাতে দেখে, তিনি খুশী হয়েছিলেন বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সাবধান ক’রেও দিয়েছিলেন যে যদি ওই ভাবে, অত আস্তে আস্তে লিখি, তবে আমার কলম অচিরে একেবারে থেমে যাবে। উপরন্তু ‘অর্কেস্ট্রা’-র বিষয়বস্তু তাঁর সুরুচিতে বাধলেও, এ-বইয়ে তিনি যেহেতু লেখকের অকপট অভিজ্ঞতা খুঁজে পেয়েছিলেন, তাই এর প্রকাশে তাঁর অসম্মতি ছিল না; এবং বই বেরোনোর পরে তাঁর মত বদলে থাক বা না থাক, মনে আছে পাণ্ডুলিপি প’ড়ে ‘অর্কেস্ট্রা’-র পূর্ববর্তী আমার প্রায় সকল কবিতা তাঁর কাছে কৃত্রিম লেগেছিল।
অবশ্য তখনও জানতুম যে ওই মন্তব্যে স্নেহের ভাগ বিবেচনার চেয়ে বেশী; এবং আজ সমালোচনার অংশে আত্মপ্রসাদের কণাও মেলে না, বুঝি যে তাতে কাব্য- জিজ্ঞাসার অভাবই সুপ্রকট। কারণ যে-কবিতা অভিজ্ঞতার নিজস্বে সমৃদ্ধ, তার অভিব্যক্তি স্বতই স্বকীয়; এবং ‘অর্কেস্ট্রা’-য় রবীন্দ্রনাথের একাধিক পক্তি তো, জ্ঞানে বা অজ্ঞানে, এসে গেছেই, এমনকি সাধু ও প্রাকৃতের মধ্যবর্তী যে-সান্ধ্য ভাষায় সে-কালের অধিকাংশ বাংলা কবিতা লেখা হত, তাই এ-গ্রন্থের বাহন। তাছাড়া অন্ত্যানুপ্রাসের চাহিদায়, তথা ছন্দোরক্ষার প্রয়োজনে, শব্দের বিকৃতি, পাদপূরণের জন্যে ক্রিয়াপদের গ্রাম্য রূপ অথবা বর্ণ-সংকোচ ও বৃদ্ধি, হওয়া ও করা ধাতুর পৌনঃপুন্য, সম্বোধনের অনাবশ্যক বাহুল্য ইত্যাদি বাংলা পদ্যের সুপ্রচলিত যথেচ্ছাচার ‘অর্কেস্ট্রা’-র সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল; এবং এর নায়িকা যদিও বিংশ শতাব্দীরই তরুণী, তবু তার অঙ্গে যেমন নূপুরাদি প্রাচীন ভূষণের প্রাদুর্ভাব, তেমনই তার সঙ্গে আলাপে ও আচরণে সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রের প্রভাব প্রায়ই সুস্পষ্ট।
এলিয়ট্ কবিকে ঘটক আখ্যা দিয়েছেন; এবং আমিও মনে করি যে ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস ফুটিয়ে তোলাই কবিজীবনের পরম সার্থকতা। কিন্তু আপন কালের স্বধর্ম ভুললেই, সে-সমন্বয় সহজ হয় না, যিনি উক্ত সংগমের দিকে এগোতে চান, নিজের অভিজ্ঞতাকে, তথা জাতিগত চৈতন্যকে, প্রতীক-রূপে দেখতে তিনি বাধ্য; এবং ওই দিব্য দৃষ্টি যাঁর অধিকারে, তাঁর কাছে আমার প্রিয়া আর কালিদাসের কান্তা এক বটে, তবু সে-অভেদের ভিত্তি ব্যতিহার্য ছদ্মবেশে নয়, প্রেমানুভূতির নৈর্ব্যক্তিক স্বরূপে। পক্ষান্তরে ‘অর্কেস্ট্রা’-র অভিজ্ঞতা নিষ্কর্ষের ধার ধারে না; তার পুঙ্খানুপুঙ্খও যাতে স্মৃতিপটে চিরমুদ্রিত থাকে, সেই জন্যে তার চতুর্দিকে মনের এই অবিরাম পরিক্রমা; এবং তার প্রতি লেখকের মমতা আত্যন্তিক ব’লেই, সে-তিলোত্তমার স্বতন্ত্র সত্তা সে-দিন ধরা পড়েনি। অর্থাৎ ‘অর্কেস্ট্রা’-য় উক্তি ও উপলব্ধির সাযুজ্য অনুপস্থিত; এবং তাই তীব্র ও সংক্ষিপ্ত আবেগের প্রণোদনা সত্ত্বেও, এ-বইয়ের মুক্ত ছন্দ প্রায়ই শিথিল।
আমার বিশ্বাস যে তদানীন্তন কাব্যাদর্শে মারাত্মক ভুল না থাকলে, ‘অর্কেস্ট্রা’-য় এত ত্রুটি জমতে পারত না; এবং এ-কথা নিশ্চয় বলতে পারি যে রচনাকালেও অনেক দোষই আমাকে পীড়া দিয়েছিল। কিন্তু সকল রোগের প্রতিকার তখন আমার সাধ্যে কুলায়নি; এবং কোনও কোনও কবিতায় ভাবের অগতি ও ছন্দের অসংগতি দেখেও, সংস্কারের চেষ্টা করিনি, পাছে আপাতস্বচ্ছন্দ অভিজ্ঞতার অপঘাত ঘটে, সেই জনশ্রুত ভয়ে। আজ যদিও জানি না ইতিমধ্যে লিপিচাতুর্যে সত্যই এগিয়েছি কিনা, তথাচ আমার বিচারবুদ্ধি সন্নিকর্ষের ফলে আর ব্যাহত নেই; এবং সেই জন্যে বিনা সংশোধনে ‘অর্কেস্ট্রা’-র পুনর্মুদ্রণ আমার বিবেকে বাধল। তবে সর্বত্র, এমনকি যেখানে সমস্ত উলটে-পালটে গেছে সেখানেও, প্রয়াস পেয়েছি যাতে বর্তমান পরিবর্তন, তখন যে- ক্ষমতাটুকু ছিল, তাকে ছাড়িয়ে না যায়; এবং সংগতির তাগিদে মাঝে মাঝে চিত্রকল্প আগা-গোড়া বদলেছি বটে, তবু জ্ঞানত কোথাও অর্থ-গৌরব বাড়াতে চাইনি।
অনেকের ধারণা—এবং তাঁদের মধ্যে লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিকের অভাব নেই— প্রকাশিত রচনা যেহেতু লেখকের অধিকারবহির্ভূত, তাই তার রূপান্তর অনুচিত, এমনকি অবশ্যদণ্ডনীয়; এবং য়েট্স্ প্রভৃতি একাধিক মহাকবির মত যদিচ একেবারে বিপরীত, তবু আমি প্রথম পক্ষের সমর্থনে এই পর্যন্ত মানতে প্রস্তুত যে অতীত বৈকল্যের অস্বীকার, শুধু অপলাপের নয়, স্বাবমাননারও চূড়ান্ত। কারণ ব্যক্তিস্বরূপ পরিণতিসাপেক্ষ : উত্তরাধিকারসূত্রে আমরা পাই চারিত্র্য; এবং সেই বংশানুক্রমিক ঝোঁক যত দিন সংকল্পিত উদ্দেশ্যের দিকে এগোতে থাকে, তত দিনই আমরা সৃষ্টিক্ষম। অন্তত তাই হেগেল-এর সিদ্ধান্ত। এবং সেই নির্দেশের অনুসারে হর্বর্ট, রীড় দেখিয়েছেন যে স্বয়ং ওয়য়-ও পরিণামী ব্যক্তিস্বরূপে আস্থা হারিয়েই, বাগদেবীর ত্যাজ্যপুত্র হয়েছিলেন। সুতরাং অ্যারিস্টটেলীয় ভগবানের মতো আপন পরিপূর্ণতার ধ্যানে ডুবে গেলে, কবিপ্রতিভার সর্বনাশ অনিবার্য; এবং উপনিষদে পরমাত্মার অন্যতম উপাধি কবি বোধহয় এই জন্যে যে জন্মান্তরীণ অভিব্যক্তিবাদ হিন্দু বিশ্ববীক্ষার মূল সূত্র।
কিন্তু কপট বিনয়ীর আত্মলাঘব আর অনুব্যবসায়ীর আত্মশুদ্ধি অন্বয়-ব্যতিরেকী সম্বন্ধে সংযুক্ত, এবং ‘অর্কেস্ট্রা’-র স্খলন-পতন-ত্রুটি আজ আমার কাছে যতই লজ্জাকর ঠেকুক না কেন, তদন্তর্গত কবিতাবলীর পুনর্মুদ্রণে বাধা দিলে, যেমন অমূলক আত্ম- মর্যাদাই প্রকাশ পেত, এগুলোর সংস্কার-সাধনে বিরত থাকলে, তেমনই সূচিত হত রূপকারী বিবেকের অভাব, তথা পাঠকের প্রতি অবজ্ঞা। কেননা আমরা বই ছাপাই পাঠকেরই প্রত্যাশায়, আমাদের লেখায় চেষ্টার অভাব মার্জনা করতে তিনি মোটেই বাধ্য নন। পক্ষান্তরে ‘অর্কেস্ট্রা’-কে আমার বর্তমান রচনার পর্যায়ে তুলতে আমি অসম্মত; এবং আমার বিশ্বাস এই বিকলাঙ্গ কাব্যসংগ্রহ ঐতিহাসিক মূল্যে একেবারে বঞ্চিত নয়। আগেই বলেছি যে রৈবিক উদ্ধৃতি এ-গ্রন্থের অনেক জায়গা জুড়ে আছে; এবং যেখানে সে-ঋণ ইচ্ছাকৃত, হয়তো সেখানেই আমার বক্তব্য বিশেষত অতিরাবীন্দ্রিক। তাছাড়া বাংলা কবিতার পদলালিত্য এ-গ্রন্থে প্রত্যাখ্যাত; এবং এতে রোমান্টিক্ সৌন্দর্যবোধের ব্যবহার বিরূপ বিশ্বের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে।
বুঝি বা সেই জন্যে যে-সংগতি পাশ্চাত্ত্য সিম্ফনিক্ সংগীতের প্রধান লক্ষ্য, তার ইঙ্গিতও ‘অর্কেস্ট্রা’-র প্রথম সমালোচকেরা নাম কবিতায় খুঁজে পাননি; এবং তাঁদের মন্তব্যে যদিচ সাংগীতিক সামঞ্জস্যের সঙ্গে মানসিক নির্দ্বন্দ্বের পার্থক্য বোঝার চেষ্টা পর্যন্ত দেখি না, তবু আজ আমি মুক্ত কণ্ঠে মানি যে, সার্থক কবিতা যে-অমায়িক অভিজ্ঞার অমোঘ অভিব্যক্তি, তার আভাস সুদ্ধ পরবর্তী রচনাগুলোর একটাতেও নেই। কিন্তু ‘অর্কেস্ট্রা’-অভিধেয় বহুরূপী লেখাটা, বাক্যের অসহযোগ সত্ত্বেও, কায়-মনের সপ্তপদী; এবং তার সাত কাণ্ড যেমন গতিমূলক পরাকাষ্ঠার সোপানপরম্পরা, তেমনই প্রত্যেক পর্ব আবার ত্রিবিধ উপলব্ধির তাৎকালিক সমন্বয়। অর্থাৎ প্রতি ভাগে ঘুরে ঘুরে এসেছে রঙ্গালয়ের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য, শ্রাব্য ঐকতানের অতিশ্রুতি ব্যঞ্জনা, আর শ্রোতৃবিশেষের সমবায়ী ভাবানুষঙ্গ; এবং সমগ্র কবিতার ত্রিবেণীতে এক দিনের সাত প্রহরব্যাপী অভিজ্ঞতাই কৈবল্যপ্রার্থী নয়, তাতে—সম্ভবত গ্রন্থের অন্যত্রও বহিঃপ্রকৃতি ও অন্তরাত্মার, তথা লোকায়ত ও লোকোত্তরের, অবৈকল্যও অন্তত উহ্য আছে।
উল্লিখিত সংগতির দ্বিধ্রুবীয় ক্ষেত্রে সত্যসন্ধানীর বিহার প্রশস্ত কিনা, সে প্রশ্নের উত্তর ‘অর্কেস্ট্রা’-র লেখক হিসাবে আমার দেয় নয়; এবং আজ আমার পক্ষে শিশুশিক্ষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অনাবশ্যক বটে, কিন্তু এখনও কবি ও প্রবক্তার পঙ্ক্তিভোজন আমার জাতিবিচারে বাধে। সে যাই হোক, আমি ভাবতে পারি না যে প্রাণযাত্রার পথনির্দেশে আমার লেখা বা কাব্যাদর্শ আর্য প্রয়োগের উপযুক্ত; এবং এ-কথাও বোধহয় ঠিক যে, গুরুগম্ভীর তত্ত্বে বঞ্চিত ব’লেই, ‘অর্কেস্ট্রা’ স্বাভাবিক। পক্ষান্তরে রিঙ্কে-র মতে অল্প বয়সের কবিতামাত্রেই শূন্যগর্ভ; এবং সুদীর্ঘ জীবনের সমস্তটা তাৎপর্য ও মাধুর্যের ধ্যানে কাটালে, তবে হয়তো অন্তিমে দশটা সার্থক পদ কলমের মুখে জোটে; আর তত দিন শুধু মনে রাখা যথেষ্ট নয়, ভোলা দরকার, যাতে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত স্মৃতির পরিণতি ঘটে ধমনীর রক্তে, চোখের চাওয়ায়, এমনকি আপতিক অঙ্গভঙ্গীতে—অর্থাৎ আমাদের অনামিক একান্তে, ক্রোচে-প্রদর্শিত উক্তি ও উপলব্ধির অদ্বৈতে।
ওই কথাটাকেই ঘুরিয়ে বলা যায় যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর কাব্যগত অভিজ্ঞা এক নয়, প্রথম যেখানে সারা, সেখানেই দ্বিতীয়ের শুরু; এবং যে-পর্যন্ত কবিতারচনা না ফুরায়, সে-পর্যন্ত শেষোক্তের বিকাশ তো চলে বটেই, উপরন্তু, কাব্যবিশেষের সমাধানেও, তার উন্মুদ্রণ অনেক সময়ে থামে না। ফলত গ্যেটে-প্রমুখ কবিদের অভিজ্ঞা আমরণ বাড়তে থাকে, আর সঙ্গে সঙ্গে বদলায় অতীত অভিজ্ঞতার অর্থ; এবং আমি যদিও সে-গোষ্ঠীর মানুষ নই, তবু তাঁরাই যেহেতু আমার ঈর্ষার পাত্র, তাই বোধহয় আমার লেখা আজ অবধি স্থায়িত্ব পায়নি। ইতিমধ্যে, রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যদ্বাণী সফল ক’রে, আমার লেখনী প্রায় অচল হয়েছে; এবং সে-জন্যে মাঝে মাঝে যেমন আত্মধিক্কার জাগে, তেমনই এ-সত্যেও কেবলই ফিরে আসি যে তাঁর আর আমার ধর্ম আকাশ-পাতালের মতো পৃথক। তিনি সূর্য, উদয়াস্ত নির্বিকার : আমি অন্ধকারে বদ্ধমূল, আলোর দিকে উঠছি; সদ্গতির আগেই হয়তো তমসায় আবার তলাব।
কখনও যদি লেখবার মতো কথা মানসে জমে, তবে তার উচ্চারণপদ্ধতিও আপনি যোগাবে; এবং তত দিন আমি বাক্সংবরণ করলে, আর যার ক্ষতি হোক, বঙ্গসাহিত্য রসাতলে যাবে না। কারণ এ-দেশে স্বভাবকবির অভাব নেই; এবং, কথ্য ভাষা কোন্ ছার, লিখিত গদ্যের সঙ্গেও নাড়ির সম্পর্ক কাটিয়ে, আমাদের পদ্য অদ্যাবধি নিজেকে অবাধ রেখেছে। উপরন্তু ভারতচন্দ্র, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদির উদ্যমে গীত বাংলা কবিতার অপটু ছন্দঃপ্রকরণে যে-সুব্যবস্থা এসেছিল, তাও, তথা ব্যাকরণ, বর্তমান কবিপ্রগতির অন্তরায়; এবং আমি যেহেতু উচ্ছ্বসিত আত্মপ্রকাশের বয়স পেরিয়েছি, তাই স্বরচিত নিয়মের অঙ্গীকারেই আমার মুক্তি। পক্ষান্তরে অসমাপ্ত স্বায়ত্তশাসনের অন্যতম বিড়ম্বনা বৈফল্যবোধ; এবং সন্ধিলগ্নের প্রতীক্ষায় বেলা ফুরাতে দেখে, অহংকার যেই অতীতে তাকায়, অমনই বেরিয়ে পড়ে পুরাতন রচনাবলীর সংস্কারসাধ্য দোষ। সে- সকল ত্রুটির কিছুও শোধরাতে পারছি কিনা, তা অবশ্য পাঠকেরই বিচার্য; কিন্তু আমার দিকে চেষ্টার কার্পণ্য নেই।
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত
১ অগস্ট ১৯৫৩
.
সত্যেন্দ্রনাথ বসুর
করকমলে—



sudhin dutta