মৃচ্ছকটিক – শূদ্রক
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
অনুবাদ – জ্যোতিভূষণ চাকী
প্রথম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সংস্করণ – পৌষ ১৪২১ জানুয়ারি ২০১৫
প্রকাশক – মো. আলাউদ্দিন সরকার
ভূমিকা
কাহিনী
শিপ্রানদীর তীরে উজ্জয়িনী। চির-উৎসবময়ী নগরী। অসংখ্য প্রাসাদ, অগণিত রাজপথ, অনিন্দ্য লাবণ্য তার। দ্যূতসভা, গণিকালয়, বৌদ্ধবিহার, মহাকালমন্দির— সবকিছুতে পূর্ণ।
সেই উজ্জয়িনীর বণিকপাড়ায় চারুদত্তের বাস। ব্রাহ্মণ বড় ভালো লোক। ব্যবসায়ে এককালে পয়সা ছিল প্রচুর— সেটা জীর্ণ বিশাল বাড়িটা দেখলেই আঁচ করা যায়। কিন্তু ‘পণই-জন-সংকামিদবিহব’ অর্থাৎ বন্ধুজনকে দান করতে করতে সব ফুরিয়েছে। নগরে নাম-ডাক প্রচুর। বিয়ে করেছেন, স্ত্রীর নাম ধূতা; ছেলে একটি আছে, তার নাম রোহসেন।
সেদিন বসন্তোৎসব। কামদেবের মন্দিরে সবাই গেছেন। চারুদত্ত এসেছেন, এসেছেন অগণিতের মধ্যে উজ্জয়িনীর সেরা নটী বসন্তসেনা। যৌবনমদে মত্তা, কিন্তু হৃদয়বতী। জন্মের খাতিরে গণিকাবৃত্তি গ্রহণ করেছেন, ছাড়তে পারলে বাঁচেন। নাম শুনেছেন চারুদত্তের, মনে মনে পুষ্পাঞ্জলি দিয়েছেন চরণে এবং আজ মনোরথ-প্রিয়ের এই প্রথম দর্শনেই পঞ্চশরে বিদ্ধ হলেন।
বসন্তোৎসব থেকে চারুদত্ত তাড়াতাড়িই ফিরেছিলেন। সন্ধ্যা-আহ্নিকের তাড়া ছিল। কিন্তু বসন্তসেনার ফিরতে রাত হল। আকাশ তখন অঞ্জন বর্ষণ করছে। সঙ্গের লোকজন ভিড়ের চাপে কোথায় গেছে হারিয়ে কে বলবে। বসন্তসেনা নৃত্য-নিপুণ চরণযুগলকে দ্রুততর করছিলেন। সহসা পিছনে ধ্বনিত হল— ‘তিষ্ঠ বসন্তসেনে, তিষ্ঠ।’ এ কণ্ঠ বিটের। শিক্ষিত ভদ্র লম্পটের নাম বিট। অন্ধকার রাত দেখে সে তার সঙ্গী শকার এবং তস্য ভৃত্যকে নিয়ে শিকার অন্বেষণে বেরিয়েছে। সে মূর্খ এবং চরিত্রহীন, রাজধনে ধনী। বসন্তসেনার প্রতি লোভ তার বহুদিনের কিন্তু অভিজাত হৃদয় নীচকে প্রশ্রয় দেয়নি। শকার আকুল কণ্ঠে বলল, ‘রামভীতা দ্রৌপদীর মতো পালাচ্ছ কেন?’ ক্ষিপ্রগতি ক্ষিপ্রতর হল। শকার তখন কদর্য ভাষায় গালাগালি শুরু করল। সামনেই চারুদত্তের বাড়ি। দেখেই জ্বলে উঠল শকার। ওই ব্রাহ্মণই বসন্তসেনার হৃদয়বল্লভ এ কথা জেনেছিল সে। আর্তনাদ করে উঠল, ‘পণ্ডিত, বাঁ-দিকেই চারুদত্তের বাড়ি— এ গর্ভদাসী ওকেই চায়। দেখো, হাতছাড়া না হয়।’ মুঞ্জরিত হল বসন্তসেনার হৃদয়। অন্ধকারে অলক্ষে উঠে পড়লেন দরজার সিঁড়িতে। উঠলেন কিন্তু প্রিয়জন-গৃহে প্রথম প্রবেশে বাধা পেলেন। দ্বার রুদ্ধ। শকারের লুব্ধ চিৎকার অন্ধকারকে খান্ খান্ করে চিরে দিচ্ছে। পলকে যুগ মানছেন বসন্তসেনা। হেনকালে চারুদত্তের বন্ধু মৈত্রেয় এবং দাসী রদনিকা প্রদীপ হাতে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। ওঁরা চতুষ্পথে মাতৃগণকে পূজোপহার অর্পণ করতে যাচ্ছিলেন। মুক্তপথে প্রবেশ করেই বসন্তসেনা চকিতে আঁচল দিয়ে দীপ নিভিয়ে দিলেন। ওঁরা ভাবলেন বাতাসে প্রদীপ নিভেছে; মৈত্রেয় আবার আলো জ্বাললেন। তাঁর মাধ্যমে সাক্ষাৎ হল চারুদত্ত এবং বসন্তসেনার। চারুদত্ত তাঁকে ‘মাননীয়া’ বলে সম্বোধন করলেন। আনন্দে বিহ্বল হলেন বসন্তসেনা। অন্ধকারে আপন ঘরে তাঁকে এগিয়ে দিলেন চারুদত্ত। যাবার আগে বসন্তসেনা অলঙ্কারগুলো পুঁটুলি বেঁধে রেখে গেলেন— এই নিবিড় নিশীথে নিরাপদ নয় অলঙ্কৃত হয়ে যাওয়া।
দাসী মদনিকার সঙ্গে প্রিয়গুণগানে মগ্ন ছিলেন বসন্তসেনা। এ হেন সময়ে পথে কোলাহল উঠল। দুজনে গবাক্ষপথে এগিয়ে এলেন। একটি লোক পালাচ্ছে— তার পেছনে ছুটছে দুজন। লোকটা পাশা খেলে দশ মোহর হেরেছে—দেবার শক্তি নেই তাই শ্রীচরণ ভরসা করেছে। ওর নাম সংবাহক। লক্ষ্মী যখন চারুদত্তের গৃহে অচঞ্চলা ছিলেন তখন তাঁর গাত্র মর্দন করত, এখন বেকার হয়ে পাশা খেলে। ছুটছে প্রাণপণে, কিন্তু যায় কোথায়! সামনে শূন্য মন্দির, তার মাঝখানে বিগ্রহ সেজে বসে রইল। দ্যূতসভার মালিক মাথুর লোকজন নিয়ে হাজির সেখানে। নিপুণভাবে দেখে একজন বলল, ‘কণ্ঠমঈ পডিমা’ (প্রতিমা কাঠের তৈরি); আর একজন বলল, ‘ণহু বহু শৈলপডিমা’ (না না, প্রতিমা পাথরের তৈরি)। হতাশ হয়ে দুজনেই বলল, ‘চুলোয় যাক, একদান খেলি।’ পাশার শব্দে সংবাহক আত্মবিস্মৃত হল, ‘আমার দান’ বলে এগিয়ে এল ছকের কাছে। আরম্ভ হল প্রহার। হেনকালে রঙ্গস্থলে হাজির হল দর্পরক। লোকটা আগে পাশা খেলত— সম্প্রতি ছেড়েছে। দুজনকেই চেনে। দশ মোহরের জন্যে একটা লোক খুন হবে! ঝগড়া বাধিয়ে দিল মাথুরের সঙ্গে এবং ইঙ্গিত করল সংবাহককে। সে পালাল। অতঃপর মাথুরের রক্তিম চক্ষে একমুষ্টি ধূলি নিক্ষেপ করে স্বয়ং অদৃশ্য হল দর্দুরক।
দৈবজ্ঞের আদেশ তখন লোকের মুখে-মুখে। সে আদেশ এই— বর্তমান রাজা পালক রাজ্যচ্যুত হবেন, এবার রাজা হবেন গোপবালক আর্যক। দর্পরক তাঁরই সন্ধানে চলল। এদিকে সংবাহক পালিয়ে এল বসন্তসেনার গৃহে। তার ইতিবৃত্ত শুনে হাতের বালাটি দিয়ে বসন্তসেনা আর্য চারুদত্তের পুরনো সেবকের ঋণ শোধ করলেন। দুঃখে দগ্ধ হয়ে সে মুণ্ডিতশীর্ষ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীতে পরিণত হল।
রেভিল উজ্জয়িনীর শ্রেষ্ঠ গায়ক। তাঁর গান শুনে চারুদত্ত এবং বিদূষক সেদিন ফিরছিলেন। গানের তানে অঙ্গ অবশ হয়েছে দুজনেরই। গৃহে প্রবেশ করেই তারা সুপ্ত হলেন।
বাইরে আবির্ভাব ঘটল সিঁধ হাতে শর্বিলকের। এ ব্যক্তি ব্রাহ্মণ। শিক্ষিত কিন্তু দরিদ্র। চুরি কস্মিনকালেও পেশা নয়। তবে চৌর্যশাস্ত্র পড়েছে। বসন্তসেনার পরিচারিকা মদনিকার সঙ্গে ওর প্রেম কিন্তু মুক্তিমূল্য না দিলে তাকে ছাড়ানো যাচ্ছে না। অগত্যা এসেছেন ধনসংগ্রহে।
সুন্দর একটি সিঁধ কাটলেন তিনি— গৃহে প্রবেশ করেই কিন্তু হতাশ হতে হল। জীর্ণ ঘর, চারিদিকে পুঁথি-পত্র, মৃদঙ্গ, পণববাদ্য, দর্দুর, বীণা, বাঁশি। মন্ত্রপূত সর্ষে ছিটিয়ে দিল মেঝেয়, ফুটল না। তবে তো মাটির তলায়ও ধন নেই। সহসা চোখে পড়ল শাড়ির পুঁটলির মধ্যে ঝিলিক দিচ্ছে অলঙ্কার। ভদ্রপীঠ নামক আগ্নেয় কীট ছেড়ে দিলেন শর্বিলক। পোকা উড়ে গিয়ে প্রদীপ নেভাল। অলঙ্কার নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন শর্বিলক। দাসী রদনিকার কণ্ঠ তখন সপ্তমে উঠেছে, ‘অজ্জ মিত্তেয়, উঠেহি, উঠেহি, গেহে সন্ধিং কপ্পিয় চোরো নিক্কন্তো – আর্য মৈত্রেয়, উঠুন, উঠুন, সিঁধ কেটে চোর পালিয়েছে।
গয়নার পুঁটলি নিয়ে শর্বিলক এলেন বসন্তসেনার গৃহে। মদনিকার সঙ্গে মিলন হল। আড়াল থেকে সে মধুর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলেন বসন্তসেনা। কিন্তু মুক্তিমূল্যের নমুনা দেখে স্তম্ভিত হল মদনিকা। বসন্তসেনা অলক্ষে শুনলেন ত্রস্ত কণ্ঠের উক্তি,— ‘এ করেছ কী?’ স্ত্রীবুদ্ধি উপদেশ দিল— আর্য চারুদত্তের লোক হিসেবে দেবীর কাছে সমর্পণ করো অলঙ্কার। ‘তথাস্তু’ বলে শর্বিলক বসন্তসেনার কাছে গিয়ে বললেন, ‘গৃহ জীর্ণ, অলঙ্কার রক্ষা করা দুরূহ তাই বণিক চারুদত্তের অনুরোধে এটা গ্রহণ করুন।’ বসন্তসেনা বললেন, ‘আমার জবাবটাও নিয়ে যান।’
–কী জবাব?
–মদনিকাকে গ্রহণ করুন। বুঝছি না কিছু।
–আমি বুঝেছি।
–কী রকম!
–আর্য চারুদত্ত আমায় বলেছেন এই অলঙ্কার যে নিয়ে যাবে তার হাতে মদনিকাকে দান করবে।
গোশকটচালককে ডাকলেন বসন্তসেনা। মদনিকাকে বললেন, ‘ওঠো!’ শৰ্বিলক বললেন, ‘প্রণাম কর এঁকে যাঁর কৃপায় দুর্লভ বধূশব্দের অবগুণ্ঠন পেলে তুমি।’ কেঁদে ফেলল মদনিকা, ‘আমায় ত্যাগ করলেন!’ বসন্তসেনা বললেন, ‘সুমরেসি মং’– আমায় মনে রেখো।
শকট চলল। হঠাৎ নেপথ্যে সেনাপতির আদেশ ঘোষিত হল— ‘দৈবজ্ঞের আদেশে ভীত হয়ে রাজা পালক গোপপল্লি থেকে আর্যককে বন্দি করে কারাগারে শৃঙ্খলিত করেছেন— সবাই হুঁশিয়ার থাক!’ চমকে উঠলেন শর্বিলক— ‘বন্ধু আর্যক কারাগারে!’ নেমে পড়লেন লাফ দিয়ে। শকটচালককে বললেন, ‘বণিক রেভিলের বাড়ি চিনিস?’
–চিনি।
–তত্র প্রাপয় প্রিয়াম্। সেখানে প্রিয়াকে নিয়ে যাও।
শর্বিলক মিত্রমুক্তির গুরুতর আয়োজনে উদ্যোগী হলেন।
.
রদনিকার ডাকে সবাই যখন উঠলেন তখন তস্কর উধাও হয়েছে। চারুদত্ত মাথায় হাত দিয়ে বসলেন— এখন করেন কী! ধূতাদেবী তাঁর রত্নহারটি দিলেন, সেই হার নিয়ে বিদূষক মৈত্রেয় বসন্তসেনার গৃহে এলেন। দাসী নিয়ে চলল কর্ত্রীর কাছে। ভবনদ্বার দেখে বিস্মিত হলেন মৈত্রেয়। বিশাল দরজা যেন আকাশ স্পর্শ করছে। জলে ধুয়ে সবুজ রঞ্জকে লিপ্ত করেছে, প্রাকারে মল্লিকার মালা দুলিয়েছে। পতাকা উড়ছে শীর্ষে, দু-পাশে দুই বেদিতে স্ফটিকের মঙ্গলকুম্ভ স্থাপিত, মুখে আম্রপল্লব। হাতির দাঁতের তোরণের নিচে সোনায় মোড়া কপাট দুটিতে হীরে-মুক্তার কী অপূর্ব কাজ!
স্বর্ণযুথিকার লতার কাছে রেশমিসূতোয় বাঁধা একটি দোলনার পাশে বসে ছিলেন বসন্তসেনা। বিদূষক রত্নহারটি সমর্পণ করে বললেন— চারুদত্ত পাশা খেলে গচ্ছিত অলঙ্কার হারিয়েছেন। দ্যূতসভার অধ্যক্ষ ও রাজদূত, এখন কোথায় প্রস্থান করেছেন তার ঠিকানা নেই— অতএব এই রত্নমালা পাঠিয়েছেন। বসন্তসেনা বুঝলেন সব। মুগ্ধচিত্তে রত্নমালা গ্রহণ করলেন। বলে দিলেন প্রদোষকালে সাক্ষাৎ করবেন চারুদত্তের সঙ্গে।
সেদিন সন্ধ্যায় যখন বসন্তসেনা চারুদত্তের গৃহে পৌঁছলেন আকাশ তখন মেঘে ঢাকা। বৃষ্টি পড়ছে, কালো আঁধারের বক্ষ বিদীর্ণ করছে বিদ্যুৎ। দুজনে দেখা হল। সে রাতে রইলেন তিনি প্রিয়নিকুঞ্জে। প্রভাতে উঠে ধূতাদেবীকে সেই রত্নমালা ফিরিয়ে দিতে চাইলেন— কিন্তু ‘অজ্জউত্তো জ্জেব মম আহরণবিসেসো’—আর্যপুত্রই আমার বিশেষ অলঙ্কার, এই বলে তা প্রত্যাখ্যান করলেন ধূতা। চারুদত্ত প্রত্যূষেই পুষ্পকরণ্ডক উদ্যানে গিয়েছেন। তাঁর কথামতো বর্ধমানক শকটে করে বসন্তসেনাকে সেইখানে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত। হেনকালে রোহসেন কান্না জুড়ল। ও ওর বন্ধুর সোনার শকট দিয়ে খেলছিল এতক্ষণ। বন্ধু সেটি নিয়ে গেছে। এখন বায়না ধরেছে— ‘আমার সোনার গাড়ি চাই।’ রদনিকা মাটির শকট একটা দিল, শিশু বলে— ‘কিং মম এদাএ মট্টিআ শঅডিআএ’– এই মাটির গাড়ি দিয়ে আমার কী হবে?
–কেঁদো না। তুমি সোনার গাড়ি দিয়েই খেলবে— বললেন বসন্তসেনা।
রোহসেন— কা এসা?
রদনিকা— দে জননী।
— অলিঅং তুমং ভণাসি— মিথ্যে কথা বলছ। আমার মা হলে গয়না পরেছেন কেন? শ্রাবণধারার মতো অশ্রু ঝরতে লাগল বসন্তসেনার চক্ষে। একটি একটি করে আভরণ মুক্ত করলেন অঙ্গ থেকে।
–এইবার তোমার মা হলাম। বালক বিহ্বল।
–এই নাও। এই দিয়ে সোনার গাড়ি তৈরি করাও।
–রোদিসি তুমং—তুমি কাঁদছ, তোমার জিনিস নেব না।
–আর কাঁদব না।
অলঙ্কারে মাটির শকট পূর্ণ করে পুত্রপ্রতিমকে অর্পণ করলেন।
এদিকে রাজশ্যালক শকারের হুকুমে স্থাবরক আবার একটি গাড়ি নিয়ে চলেছিল পুষ্পকরণ্ডকে। শকারের ভগিনীপতি রাজা পালক তাঁর শ্যালককে দান করেছিলেন এই উপবন। ভোরেই সেখানে হাজির হয়েছে বিটকে নিয়ে শকার। গাড়িতে সম্ভবত খাবার নিয়ে যাবার হুকুম দিয়ে গিয়েছিল।
ভিড়ের চাপে একটু দাঁড়িয়ে ছিল গাড়ি চারুদত্তের সদরের সামনে। বাইরে এসে ভুল করে তাতেই উঠলেন বসন্তসেনা। ঘটনা জটিল হল— কারণ হেনকালে শর্বিলকের চেষ্টায় আর্যক কারাগার থেকে পলায়ন করে পথে বেরিয়ে চাপলেন বর্ধমানকের গাড়িতে। যথাকালে গাড়ি যখন উদ্যানে পৌঁছল, পর্দা তুলে বিদূষক বললেন, ‘আরে এ তো বসন্তসেনা নয়, এ যে বসন্তসেন।’ আর্যক শরণ নিলেন চারুদত্তের। এই উদার পুরুষ তাঁকে অভয় দিয়ে নিজের শকটেই ত্বরিতগতিতে নিরাপদ স্থানে প্রেরণ করে বসন্তসেনার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে মৈত্রেয়’র সঙ্গে অন্যত্র গেলেন।
ক্ষণপরে স্থাবরকের গাড়ি চেপে বসন্তসেনা এলেন। পর্দা উঠিয়ে তাঁকে দেখে শকার পূর্ববৎ প্রসাদিত করার চেষ্টা করল— বসন্তসেনা অটল। অতঃপর ভীতি প্রদর্শন। বিট অনেক চাতুর্য অবলম্বন করল তাঁকে রক্ষা করবার— কিন্তু শকার অটল। বিটের অলক্ষে বসন্তসেনার গলা টিপে অচৈতন্য করে মৃত ভেবে পাতায় ঢাকল তার দেহ, তারপর অন্তর্হিত হল সে। স্থাবরক পাছে ব্যাপারটা প্রকাশ করে এই ভেবে আপন অট্টালিকার ছাদে নিগড়বদ্ধ করে রাখল তাকে। প্রবেশ করল সংবাহক। পুষ্পকরণ্ডকের সরোবরে স্নান সেরে কৌপীন শুকোবার স্থান খুঁজছিল ও। পাতার আড়ালে বসন্তসেনার তখন জ্ঞান ফিরেছে। দুঃসময়ের উদ্ধারিকাকে চিনল সংবাহক। কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁর জ্ঞান ফিরিয়ে বৌদ্ধমঠে নিয়ে গেল তাঁকে সুস্থ করবার জন্য।
শকার ভাবল ব্যাপারটা প্রকাশ পেলে কী হবে বলা কঠিন অতএব নিজেই গিয়ে রাজার অধিকরণে নালিশ জানাল, চারুদত্ত অলঙ্কারের লোভে বসন্তসেনাকে হত্যা করেছে। জটিল সমস্যা। এলেন বসন্তসেনার জননী, আনা হল চারুদত্তকে; জননী বলছেন— এ ব্রাহ্মণ হত্যা করতে পারেন না তাঁর কন্যাকে, শকার বলে, ওই মেরেছে। আরম্ভ হল জেরা। দুর্ভাগ্য যেন পণ করেছে চারুদত্তের বিরুদ্ধে। বসন্তসেনা সেই যে অলঙ্কার দিয়েছিলেন রোহসেনকে, চারুদত্ত সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সমর্পণ করেছিলেন মৈত্রেয়’র হাতে। অমন করে কারুর দান নেওয়া তাঁর মর্যাদায় বেধেছিল। মৈত্রেয় চলেছিলেন বসন্তসেনার বাড়ি। পথে খবর পেয়ে এলেন বিচারালয়ে। শকারের অভিযোগ শুনে আস্ফালন শুরু করতেই কক্ষ থেকে খসে পড়ল অলঙ্কারের রাশি। কে আর কার কথা শোনে। আধিকরণিক বললেন— মৃত্যুই এর দণ্ড। তবে ব্রাহ্মণ অবধ্য, একে নির্বাসিত কর। কিন্তু রাজা পালক বার্তা শুনে হুকুম দিলেন— শূলে দাও।
দক্ষিণ শ্মশানে দুজন চণ্ডাল নিয়ে চলল চারুদত্তকে। নগরীর গবাক্ষপথে শত শত অশ্রুসিক্ত নয়ন ব্যর্থ প্রতিবাদ করল। স্থাবরক ছিল শকারের বাড়ির ছাদে শৃঙ্খলবদ্ধ। চণ্ডালের ঘোষণা শুনে চিৎকার করে সমস্ত ঘটনা ব্যক্ত করল। দুর্মদ আকর্ষণে শৃঙ্খলও ছিন্ন হল। স্থাবরক নামল রাজপথে। শকারও ছুটল পেছনে, তার অপূর্ব মিথ্যার জালে সত্য আবার ঢাকা পড়ল। চণ্ডালেরা স্বকার্যে প্রস্তুত। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চারুদত্ত, সম্মুখে দাঁড়িয়ে পুত্র রোহসেন। সহসা এসে দাঁড়াল ভিক্ষু সংবাহক বসন্তসেনাকে নিয়ে। বৌদ্ধমঠে সুস্থ হয়ে বসন্তসেনা ভিক্ষুককে অনুরোধ করেছিলেন— দয়িতের গৃহে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পথে শুনলেন দারুণ সংবাদ। রুদ্ধশ্বাসে গিয়ে পৌঁছলেন বধ্যভূমিতে। ঘাতকের উদ্যত হস্ত নিরস্ত হল যেন মন্ত্রবলে। প্রবেশ করল শর্বিলক। বড় উত্তেজিত তিনি— কেননা সদ্য রাজা পালককে বধ করেছেন আর্যক। নতুন রাজার আদেশ এসেছে মৃত্যুপথযাত্রীকে উদ্ধার করতে। চারুদত্ত জীবিত শুনে কৃতার্থ হল তাঁর শ্রবণ। শর্বিলক জানালেন, আর্যক প্রিয়বন্ধু চারুদত্তকে বেণানদীর তীরে বিস্তীর্ণ রাজ্য দান করেছেন। শর্বিলকের আদেশে শকারকে বন্ধন করে আনা হল- সে চাইল চারুদত্তের করুণা। ব্রাহ্মণ বললেন— ‘অভয়ম্ অভয়ং শরণাগতস্য।’
রক্ষা পেল শকার। ধূতাদেবী স্বামীর আসন্ন বিয়োগের আশঙ্কায় অগ্নিতে আত্মদানে উদ্যত হয়েছিলেন। সবাই ত্বরিতগতিতে গিয়ে তাঁকে অমৃতবাণী শোনালেন। রাজাদেশে বধূ আখ্যা লাভ করলেন বসন্তসেনা— ধূতাদেবী আলিঙ্গন করলেন তাঁকে। অপূর্ণ রইল না কিছু। সংবাহক হলেন বৌদ্ধমঠের অধিপতি; শকার তার আগের কাজেই রইল।
.
প্রাসঙ্গিক কথা
(ক) মৃচ্ছকটিক : প্রকরণ
আলঙ্কারিকগণ মৃচ্ছকটিককে বলেছেন— ‘প্রকরণ’, প্রকরণ নাটকেরই এক বিশেষ রূপভেদ। প্রকরণের কাহিনীটি লৌকিক এবং কবির স্বকপোলকল্পিত হবে। অর্থাৎ পৌরাণিক হবে না, অলৌকিকত্বও থাকবে না তাতে। শৃঙ্গার এতে প্রধান রস; নায়ক হবেন ব্রাহ্মণ, রাজার অমাত্য কিংবা বণিক। ধর্ম, অর্থ, কামে তিনি ব্রতী থাকবেন কিন্তু জীবন তাঁর বিঘ্নসংকুল হবে। তাঁর স্বভাবটি ধীর, প্রশান্ত হওয়া চাই। নায়িকা হবেন কুলস্ত্রী কিংবা গণিকা অথবা দুই-ই। এতে ধূর্ত, জুয়াড়ি, বিট, প্রভৃতি পাত্রের সমাবেশ থাকবে। যে সম্ভোগের খাতিরে সম্পদ খুইয়েছে, নাচে গানে কিছু পটু, জুয়া খেলায় পটু, গণিকালয়ের রীতিনীতি জানে, লোকের ভালোবাসা কাড়তে পারে— তেমন লোককে বলা হয়েছে বিট্। চেট শব্দের অর্থ ভৃত্য। লক্ষণ দেখে বোঝা যায় নাটকের মতো উত্তুঙ্গ কোনো মহিমায় মণ্ডিত হবে না প্রকরণ।
মৃচ্ছকটিক-এ প্রকরণের এই লক্ষণগুলো বর্তমান। এর নায়ক চারুদত্ত বিপ্র এবং বণিক। শৃঙ্গার এর রস। এক নায়িকা ধূতা কুলকামিনী, দ্বিতীয়া বসন্তসেনা বারবণিতা। কাহিনী কবির কল্পিত; বিট, চেট, ধূর্ত আদির অভাব নেই এতে। অতএব মৃচ্ছকটিকম্ একটি প্রকরণ।
(খ) নামকরণ
প্রকরণের নাম মৃচ্ছকটিকম্। মৃৎ = মৃত্তিকা। শকটিকা = ছোট্ট শকট বা গাড়ি। মৃৎ + শকটিকা = মৃচ্ছকটিকা, মাটির ছোট শকট। ষষ্ঠ অঙ্কে এই ক্ষুদ্র মাটির গাড়ির বৃত্তান্ত আছে। চারুদত্তের শিশুপুত্র রোহসেন পাশের বাড়ির এক ধনী বণিকের পুত্রের ছোট্ট সোনার গাড়ি নিয়ে খেলছিল। সে ওটি নিয়ে যাবার পর রোহসেন কান্না জুড়ে দিল। চারুদত্তের দাসী রদনিকা একটা মাটির গাড়ি এনে তাকে সামলাবার চেষ্টা করল কিন্তু ভবী ভোলবার নয়। ঘটনাস্থলে বসন্তসেনা হাজির ছিলেন, গায়ের গয়নাগুলো খুলে দিলেন সোনার গাড়ি তৈরি করাবার জন্য। এই গয়না অতঃপর নাটকে দুর্বার গতি এনেছিল এবং মাটির গাড়িই গয়না দেবার মূল বলে নাটকের নাম হলো মৃচ্ছকটিকম্।
কথা হল, সোনার গাড়ির জন্য যে গয়না দেওয়া হল তা যদি রূপকটিতে বিশিষ্ট অংশগ্রহণ করে থাকে তবে ‘সুবর্ণশকটিকম্’ নাম হল না কেন?
একটি কারণ, মৃচ্ছকটিকম্ নামটি কৌতূহল উদ্রেক করে। মাটির গাড়ি নিয়ে নাটক? পাঠকের পক্ষে যেন চুম্বকের কাজ করে।
আর এক কথা, চারুদত্তের দান হেতু দারিদ্র্য উন্মোচন করা এ নাটকের স্থানে স্থানে লক্ষ্য বলে বোঝা যায়। ওই দারিদ্র্য তাঁর বিত্তকে হরণ করেছে কিন্তু চিত্তকে বড় করেছে। একাধিকবার বসন্তসেনা বলেছেন তাই তিনি তাঁকে ভালোবাসেন। ওই মাটির গাড়ি প্রতিপাদন করেছে তাঁর নিঃস্বতা। একদা অনেক সোনার গাড়ি দেবার সামর্থ্য ছিল যাঁর আজ মাটির খেলনাই তাঁর একমাত্র সন্তানকে দেয়। এই দরিদ্রের পায়ে ধনজনযৌবনবতী বসন্তসেনা তনুমনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছিলেন— এতে তাঁর প্রেমের গভীরত্ব উদ্ঘাটিত হয়েছে। শূদ্রক বারাঙ্গনার প্রেমে নিকষিত হেম আবিষ্কার করবার অধিকারী ছিলেন।
এছাড়াও ‘সুবর্ণশকটিকম্’ নাম হয়নি এই কারণে যে সুবর্ণ পরবর্তীকালে বহু কৰ্ম সম্পাদন করলেও সেই কর্মধারা গতি পেয়েছিল মাটির গাড়ির প্রত্যাখ্যান থেকে। সুতরাং ‘মৃচ্ছকটিকম্’–এই নামই যুক্তিসঙ্গত।
নাট্যশাস্ত্র প্রণেতাদের নিয়মমতো কিন্তু নাম হওয়া উটিত ছিল ‘বসন্তসেনা- চারুদত্তম্’, কেননা ওঁদের মতে ‘নায়িকানায়কাখ্যানাং সংজ্ঞা প্রকরণাদিষু’ (সাহিত্যদর্পণ, ৬.১৫৮)— প্রকরণ প্রভৃতিতে গ্রন্থের নামকরণ হবে নায়িকা এবং নায়কের নাম দিয়ে, যথা ‘মালতী-মাধবম্’। মৃচ্ছকটিকম্-এর ক্ষেত্রে নামটি গর্ভিত অর্থের প্রকাশক, যেটি নাটকের বেলায় ঘটবে। এখানে বক্তব্য এই যে প্ৰতিভাবান্ সর্বত্র লিখিত বিধি মেনে চলেন না, তার প্রমাণ বহুত্র বহু আর্যপ্রয়োগ।— এই কারণেই রামচরণ তর্কবাগীশ প্রকরণের নামের ওই নিয়ম সম্পর্কে বলেছেন, ‘এতৎ প্রায়িকম্’— এটা প্রায়শ মেনে চলা হয় অর্থাৎ সর্বত্র নয়।
(গ) নাট্যকার : কাল
মৃচ্ছকটিকম্-এর রচয়িতা রাজা শূদ্রক। কবেকার এবং কোথাকার রাজা আজও তার হদিস মেলেনি। Sten Konow তাঁর Indian Drama-তে যেসব মত সংগ্ৰহ করেছেন তাতে দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত রূপকটির কাল অবধারণ করেছেন পণ্ডিতবর্গ। ভাস-এর চারুদত্ত চার অঙ্কে পাওয়া যায় একালে। এমন মত আছে এই চারুদত্তই মৃচ্ছকটিকম্-এর ভিত্তি। নান্দীর পরে প্রস্তাবনায় কবির পরিচিতি আছে। সাধারণত এই পরিচয় কবি স্বয়ং দেন। তখনকার দিনের রীতি অনুযায়ী এতে আপন গৌরব আপনি কীর্তন করা দোষাবহ বিবেচিত হত না। তৃতীয় শ্লোকের মর্মকথা—শূদ্রক বিখ্যাত কবি। গজরাজের মতো তাঁর চলন। দেহ সুঠাম। মুখখানি পৌর্ণমাসীর চাঁদের মতো। চোখদুটি যেন চকোরের অনুকৃতি। এরপরের শ্লোকের সার হল— তিনি ঋকবেদ, সামবেদ, গণিত, কলাবিদ্যা, হস্তীবিষয়ক শিক্ষা আয়ত্ত করেছিলেন। মহাদেবের কৃপায় তাঁর দুটি চক্ষু রোগমুক্ত হয়েছিল। ছেলেকে সিংহাসনে বসিয়ে, অশ্বমেধ যজ্ঞ করে একশ বছর দশ দিন বেঁচে শূদ্রক অগ্নিতে প্রবেশ করেন।
যুগযুগান্ত থেকে বিভিন্ন গ্রন্থে এবং জনশ্রুতিতে শূদ্রক একজন কীর্তিমান পুরুষ এবং তাঁর নামের সঙ্গেই অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত রয়েছে মৃচ্ছকটিকম্। তাঁর কাল সম্বন্ধে এটুকু বলা যায় যে বামন তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ কাব্যালঙ্কার সূত্রে শ্লেষের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন : ‘শূদ্রকাদিরচিতেষু প্রবন্ধেষু অস্য ভুয়ান্ প্রপঞ্চো দৃশ্যতে’—শূদ্রক প্রভৃতির রচিত কাব্যে এর প্রচুর দৃষ্টান্ত আছে। এখানে শূদ্রকের নামমাত্র গৃহীত হয়েছে কিন্তু বিশেষোক্তির দৃষ্টান্তরূপে বামন উদ্ধৃত করেছেন : ‘দ্যূতং হিনাম পুরুষস্য অসিংহাসনং রাজ্যম্’–পাশাখেলা হল আসলে পুরুষের সিংহাসনবিহীন রাজ্য। এই ছত্রটি মৃচ্ছকটিকস্-এর দ্বিতীয় অঙ্কে এক পাশাখেলোয়াড় দর্দুরকের উক্তি। বামন খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর শেষদিকের লেখক সুতরাং মৃচ্ছকটিকম্ তার পূর্ববর্তী, এই সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত।
(ঘ) উৎস
প্রকরণের কাহিনী ইতিহাস-পুরাণাদি হতে নেবার প্রয়োজন নেই পরন্তু তার কাহিনী কবির মন থেকে আবির্ভূত হবে এই হল রীতি। মৃচ্ছকটিকম্ সে-রীতিতে প্রতিষ্ঠিত কারণ চারুদত্ত, বসন্তসেনা, শার্বিলক বা দর্দুর কেউ বিখ্যাত নন। তবু এ-কাহিনীতে কবির মৌলিক স্বত্ব আছে কিনা এ প্রশ্ন ওঠে। ভাস শূদ্রকের পূর্ববর্তী, চার অঙ্কের একটি রূপক চারুদত্ত তাঁর রচনা। মৃচ্ছকটিকস্-এ যেখানে বসন্তসেনা চারুদত্তের প্রেরিত রত্নহার সঙ্গে নিয়ে মেঘমেদুর এক সন্ধ্যায় চারুদত্তের গৃহে আসছেন অভিসারে, ভাসের চারুদত্ত সেইখানে সহসা থেমে গেছে। ভাসের এটি অন্তিম এবং অপূর্ণ রচনা বলে অনুমিত। বিশেষজ্ঞগণের মতে মৃচ্ছকটিকম্-এর কাহিনী মৌলিক নয়, তার জন্মভূমি ভাসের চারুদত্ত। চার-অঙ্কের বিষয় বাদ দিলে অতিরিক্ত ছয় অঙ্কের ক্রিয়াকলাপ, কবিরই সৃষ্টি। তাই প্রকরণের যা দাবি, কাহিনীটি মৌলিক হবে, তা প্রতিপালিত হয়েছে মৃচ্ছকটিকম্-এ। অন্তত এটি পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক নয়।
(ঙ) সাধারণ আলোচনা
মৃচ্ছকটিকম্ সংস্কৃত সাহিত্যের অনন্য সৃষ্টি কারণ অন্যত্র মহাকাব্য বা নাটকে যেখানে একটি বৃহৎ আদর্শ রচনাই গূঢ় কথা সেখানে শূদ্রক একটি রক্ত-মাংসে গড়া সমাজের ছবি যেমন দেখেছেন তেমনি হাজির করেছেন। কাব্য তো ‘রামাদিবৎ প্রবর্তিতব্যম্’ কাব্য থেকে রাম প্রভৃতির মতো আচরণ শিখতে হবে এবং ‘ন রাবণাদিবৎ — রাবণ প্রভৃতির মতো নয়— এই হল মহাজনকথিত নীতি (কাব্যপ্রকাশ, প্রথম উল্লাস) এই রূপকে তাদৃশ রাম অনুপস্থিত এবং রাবণেরও একান্ত অভাব অতএব বিধি এবং নিষেধ কোনোটিরই দৃষ্টান্ত নেই। আপন পত্নীতে অসন্তুষ্ট এবং গণিকার প্রেমে নিমগ্ন হয়ে তাকে কলত্ররূপে গ্রহণকারী চারুদত্ত রামাদিবৎ নন, যদিচ তিনি বহুগুণে গুণী I বসন্তসেনা গণিকা কিন্তু প্রেমে পূর্ণা এবং গৃহজীবনের জন্য উৎসুক।
বসন্তসেনা বা মদনিকার যা গুণ তা একান্তই ব্যক্তিগত। তার দ্বারা সমাজে একটি শ্রেণির গুণবত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশে সেকালে বারাঙ্গনার সঙ্গে গৃহস্থ ব্রাহ্মণের বিবাহ চালু ছিল এমন ঐতিহাসিক উপকরণও জানা নেই। দশম-অঙ্কে এই প্রকরণ যখন সমাপ্তির মুখে তখন শর্বিলক বলছেন : ‘আর্যে বসন্তসেনে, পরিতুষ্টো রাজা ভবতীং বধূশব্দেন অনুগৃহাতি’—আর্যা বসন্তসেনা, রাজা খুশি হয়ে আপনাকে বধূ-শব্দের দ্বারা সম্মানিত করেছেন। ফলত রাজার অনুমোদন পেয়েই এই বিবাহ সিদ্ধ হয়েছিল। সুতরাং ঈদৃশ বিবাহের চলন ছিল না বলে সেই বিবাহের অনুষ্ঠান সাহিত্যে কবির এক দুঃসাহসিক কর্ম সম্পাদন। তিনি কি এই ইঙ্গিত করেছেন যে অপাঙ্ক্তেয় জীবন যাপন করে যারা পঙ্ক্তিতে উঠতে চায় এইভাবে সমাজ তাদের গ্রহণ করুক?
কিন্তু কথা উঠেছিল এই প্রকরণে আদর্শ চরিত্র নিয়ে। কবির কোনো নর বা কোনো নারীই মহৎ বা বৃহৎ নয়, আটপৌরে মানুষ সব। তাঁর বাস্তব দৃষ্টি অতি প্রখর কিন্তু সে দৃষ্টি মহিমময় নয়, তাতে ব্যাপ্তি নেই। শ্লোকের ছড়াছড়ি রয়েছে এবং তাতে অন্ধকার, বর্ষা, মানুষের চরিত্র, জীবনের নানা পর্যায় সম্পর্কে বহু উক্তি রয়েছে কিন্তু ‘লিম্পতীব তমোহঙ্গানি’ (১.৩৪)— অন্ধকার যেন অঙ্গগুলো লেপে দিচ্ছে, ইত্যাদি শ্লোকের প্রাচুর্য নেই। কোথায়ও বর্ণনা যেন শিথিল। স্বাভাবিক অবস্থাটি অস্ফুট রয়ে গিয়েছে। শর্বিলক সিঁধ কাটতে গিয়ে সৰ্পদষ্ট হলেন, বিষের জ্বালার অভিনয় করলেন, চিকিৎসা করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ হয়ে কাজে মন দিলেন। এই দ্রুততা এবং লঘুতা সর্পদংশনকে বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপিত করেনি। এটি তৃতীয় অঙ্কের ঘটনা। পঞ্চম অঙ্কের ষষ্ঠ শ্লোকে মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশের বর্ণনা করেছেন কবি : বলে অতি দর্পিত দুর্যোধনের মতো হৃষ্ট ময়ূর গর্জন করছে। পাশাখেলায় হেরে যাওয়া যুধিষ্ঠির যেমন পথে বেরিয়েছিলেন তেমনি কোকিল নীরব হয়েছে। হাঁসেরা পাণ্ডবদের মতো বন থেকে অজ্ঞাতবাসে চলে গেছে। নিন্দিত দুর্যোধনের সঙ্গে তুলনা দেওয়ায় নৃত্যপর ময়ূরের অনুপম সৌন্দর্যবোধে বাধা ঘটেছে এখানে। পাশা খেলায় হেরে যাওয়া যুধিষ্ঠিরের পথে ভ্রমণ তাঁর স্বকর্মের ফল, কোকিলের মধ্যে কোন কর্ম তার এই নির্বাসন অর্জন করল তা দুর্বোধ্য এবং পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসে গমনের কথা শুনলে যে ঐতিহাসিক বিরাট ঘটনার কথা মনে জাগে হাঁসদের বন থেকে অচিনপুরে গমনের পশ্চাতে তার মতো কোনো বিপুল পর্বের কিছুমাত্র অস্তিত্ব না থাকায় রসগ্রহণে ব্যাঘাত ঘটেছে। একথা ঠিক যে উপমায় উপমান এবং উপমেয়ের হুবহু মিল থাকে না, তবে তো চাঁদের সঙ্গে মুখের উপমা ব্যর্থ হত কিংবা পুরুষের সঙ্গে ব্যাঘ্রের তুলনাও চালু হত না, কিন্তু উপমাটি এমন হবে না যে চিত্ত পুলকিত না হয়ে ক্ষুব্ধ হয়। দুর্যোধনের গর্জন আর ময়ূরের গর্জন এক নয়। এরকম ক্ষেত্র একাধিক আছে। প্রকৃতির ক্ষেত্রে কবির বিশ্লেষণ আছে কিন্তু তা মর্মকে সর্বত্র সিক্ত করে না। বরং জীবনের নানা চিত্র তাঁর হাতে অনেক বেশি প্রাণময় হয়েছে। কিন্তু এখানেও মানুষ আজ অবধি যে প্রবৃত্তির বিকাশকে শ্রদ্ধা করেছে তার বিবরণে কবি কিছু কৃপণ। তিনি বসন্তসেনার এবং বিটের লুব্ধ পদসঞ্চার; পাশার আড্ডার বৃত্তান্ত, মাথুরের হাতে শর্বিলকের লাঞ্ছনা, শর্বিলকের চুরি, ধনী বারস্ত্রীর প্রাসাদবর্ণনা, পুষ্পকরণ্ডকে শকারের হাতে বসন্তসেনার নিগ্রহ এবং শকারের আত্মরক্ষার আয়োজন, বিচারশালার ব্যর্থ কর্ম দীর্ঘ সময় নিয়ে এঁকেছেন কিন্তু সংবাহক যে পাশা ছেড়ে বৌদ্ধ ভিক্ষু হল কিংবা শর্বিলক যে পালকের শৃঙ্খল থেকে আর্যককে মুক্ত করলেন—এ সব কথা অতি সংক্ষিপ্ত। বসন্তসেনাকে সূক্ষ্ম বর্ণনায় পরিস্ফুট করেছেন কবি কিন্তু ধূতার বেলায় শুধু বাণী শুনিয়ে ক্ষান্ত হয়েছেন। ধূতার অগ্নিপ্রবেশের চেষ্টাও অল্প রেখায় আঁকা। রূপকের অন্তিম মুহূর্তে ধৃতাকে একবার আনতে হয়েছিল বসন্তসেনাকে আলিঙ্গন করবার জন্য। এটি না হলে নাটকের দুখান্তভাব যাই যাই করেও যায় না। সংস্কৃত-নাটকে ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ এই নীতি আছেই, লেখক স্বয়ং চারুদত্তের পাদপতিত শকারকে অবধি ছাড়পত্র দিয়েছেন সুতরাং তাঁর ঈপ্সিত নায়িকার সঙ্গে চারুদত্তের মিলনকে নিরঙ্কুশ করতে চাইবেন। পাঠক সেটা প্রত্যক্ষ না করলে নিঃসংশয় হবেন কিনা এই সন্দেহে সতী ধূতাকে (বিদূষকের উক্তি স্মরণীয় : ‘অহো সদীএ পহাবো’— আহা সতীর প্রভাব!) রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত করলেন। উজ্জয়িনীর বৌদ্ধ মঠ এবং মহাকালের মন্দির মৃচ্ছকটিকস্-এ বড় দূরে।
বসন্তসেনা চারুদত্তকে মদনমহোৎসবে কামদেবের মন্দিরে রেখে তাঁর প্রেমে বিহ্বল হয়েছিলেন একথা প্রথম অঙ্কে বিদূষকের প্রতি শকারের তর্জনে আমরা শুনেছি। দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম-ভাগে মদনিকার সঙ্গে বসন্তসেনার কথোপকথনেও তাই প্রতিপালিত হয়েছে। এই উৎসবটি অতীতে অনুষ্ঠিত হত মাঘের শুক্লাপঞ্চমীতে যার নাম বসন্তপঞ্চমী। বসন্তপঞ্চমীর পর দিনে দিনে শুক্লপক্ষ পার হয়েছে, সন্ধ্যাবেলায় চাঁদ ওঠে না, ওঠে বেশ একটু দেরি করে। এমনি কোনো দিনে প্রথম অঙ্কের যবনিকা উঠেছে। বসন্তসেনাকে যখন কালিগোলা অন্ধকারের মধ্যে বিট এবং শকার তাড়া করেছে তখন আকাশে চাঁদ ওঠেনি কিন্তু ঘণ্টা দেড়-দুই পরে চারুদত্ত যখন তাঁকে পৌঁছে দেবার জন্য সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছেন তখন ‘উদয়তি হি শশাঙ্কঃ কামিনীগণ্ডপাণ্ডঃ।’
চারুদত্তের বন্ধু চূর্ণবৃদ্ধ চারুদত্তকে জাতিফুলের গন্ধ জড়ান একটি চাদর বন্ধুর জন্য উপহার পাঠিয়েছেন চারুদত্তের বিদূষক ব্রাহ্মণ মৈত্রেয়ের হাতে— এইখানেই কাহিনীর আরম্ভ। এই চাদর রূপকের একটি উপকরণ। মৈত্রেয় যে সন্ধ্যায় বন্ধুকে এই চাদর অর্পণ করলেন সেই সন্ধ্যায়ই বসন্তসেনা প্রবেশ করেছিলেন চারুদত্তের গৃহে এবং চারুদত্ত তাঁর দাসী রদনিকা ভেবে বসন্তসেনার গায়ে এই চাদর নিক্ষেপ করেছিলেন পুত্র রোহসেন-এর শীত নিবারণের জন্য। ওই গন্ধবিধুর উত্তরীয় অতঃপর পথচারী চারুদত্ত বসন্তসেনার মাহুত কর্ণপূরককে এটি পুরস্কার দিয়েছিলেন কারণ সে মনিবের শিকল ছেঁড়া দুষ্ট হাতি দুষ্ট মোড়ককে বশ করে তার কবল থেকে রক্ষা করেছিল এক পরিব্রাজককে। পরিব্রাজক হলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। দ্বিতীয় অঙ্কে পাশা খেলোয়াড় সংবাহক ভিক্ষু হয়েছিল। এদিকে ব্রাহ্মণ চারুদত্ত গৃহদেবতা এবং মাতৃদেবতাদের পূজা নিবেদন করছেন। দুটি মত সহাবস্থান করছে সমাজে।
ওই উত্তরীয়ই চারুদত্ত দিয়েছিলেন কারণ তাঁর আর দেবার কিছু ছিল না। দেহে গয়না পরবার জায়গায় অভ্যাসবশে দৃষ্টিপাত করেছিলেন তিনি কিন্তু শূন্য দেখে চাদরটি দিলেন। প্রিয় যদি দরিদ্র হয় তবে ধনী প্রেমিকার প্রেম নিবিড়তর হয়। কর্ণ-পূরককে গয়না দিয়ে চাদরটি আত্মসাৎ করেছিলেন বসন্তসেনা।
চারুদত্ত যখন চাদর পেলেন তখন তিনি গৃহদেবতাদের পূজা শেষ করে অনুরোধ করছেন মৈত্রেয়কে চতুষ্পক্ষে মাতৃদেবতাদের পূজা দিয়ে আসবার জন্য। মৈত্রেয় যেতে চান না কারণ অন্ধকার রাজপথে এখন বিট চেট, রাজার প্রিয়পাত্র পুরুষেরা চড়ে বেড়াচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চে অগ্রে বসন্তসেনা এবং পশ্চাৎপশ্চাৎ বিট, শকার এবং চেটি অর্থাৎ ভৃত্যের প্রবেশ ঘটল। শকার হল রাজা পালকের অবিবাহিতা পত্নীর ভ্রাতা। এর লালসার চিত্র নিখুঁত হয়ে ফুটেছে কবির হাতে। সে মূর্খ, বোকা। তার সংলাপে কবি হাসি জুগিয়েছেন প্রথম এবং অষ্টম অঙ্কে। এই হাসিতে ব্যঙ্গের স্পর্শ আছে। শকার বসন্তসেনাকে বলছে : ‘কিং দোব্বদী বিঅ পলাঅশি লামভীদা’ (১.২৫)– রামের ভয়ে দ্রৌপদীর মতো পালাচ্ছ কেন? দ্রৌপদীর পলায়ন অনৈতিহাসিক। তা-ও রামের ভয়ে। রামকে অধঃপাতে পাঠিয়ে শকার স্বখাতসলিলে ডুবল। দ্রৌপদীর প্রতি তার একটা বিশেষ আকর্ষণ দেখা যায় এবং কেমন করে সে টের পেয়েছিল যে তার পিছনে অনেক লোক ছুটেছে। তাই চারুদত্তের সদরে অন্ধকারে রদনিকার চুল ধরে বলল— ধরেছি। ‘চাণক্যেণেব্ব দোব্বদী’ (১.৩৯)– চাণক্য যেমন দ্রৌপদীকে ধরেছিল, তেমনি। বসন্তসেনা আপন পরিজন থেকে পরিভ্রষ্ট হয়েছেন তাই এই দুর্দৈব। নাম ধরে ডাকলেন তাদের। এই কাপুরুষ ভয়ে চমকে উঠল! কিন্তু পরক্ষণেই বসন্তসেনা যখন ‘মাধবিকা’ বলে চিৎকার করলেন, পৌরুষ জাগ্রত হল শকারের, বলল, ‘ইথিয়াণং শদং মালেমি। শূলে হগ্গে’— একশটা মেয়েলোক মারতে পারি। আমি বীর।
এই ব্যাপারে বিটও কম যান না। প্রথম-অঙ্কে বসন্তসেনার সঙ্গে উভয়ের আলাপের কিছুটা এইরকম :
বসন্তসেনা : ‘অজ্জ, অবলা, খু অহম্’–আর্য, আমি অবলা।
বিট : ‘অত এব ধিয়সে’–তাই তো ধরছি।
শকার : ‘অতো জ্জেব ণ মালীঅশি’–তাই তো মেরে ফেলছি না।
লাম্পট্য যে শিক্ষিতকেও আক্রমণ করেছিল এই ব্যাপ্তিটুকু দেখানোর জন্যই বিটের আমন্ত্রণ। শকারের সঙ্গী হলেও শিক্ষা তাঁকে শিক্ষিত করেছিল। ‘দীনানাং কল্পবৃক্ষঃ’—গরিবদের কল্পতরু ইত্যাদি উক্তিতে (১.৪৮) তিনি চারুদত্তের মাহাত্ম্যের যে-বিশ্লেষণ করেছেন তাতে রাতের ওই নিকষকালো আঁধারের মধ্যেও তাঁর চরিত্র আলোক বিকীর্ণ করেছে। চারুদত্তের দেহলীতে রদনিকাকে ধরেছিল শকার, ভেবেছিল এই তার বসন্তসেনা। সেই ভুল যখন ভাঙল, তখন বিদূষক মৈত্রেয় হাতের লাঠি তুললেন। বিট সঙ্গে সঙ্গে তার পায়ে পড়লেন। পা ছেড়ে ওঠার একটিই শর্ত তাঁর : ‘যদি ইমং বৃত্তান্তম্ আর্য চারুদত্তস্য ন আখ্যাস্যসি’– যদি এই ঘটনা আর্য চারুদত্তকে না বলেন। মৈত্রেয় প্রতিশ্রুতি দিলেন। বিটের এই প্রার্থনা চারুদত্তকে মহিমান্বিত করেছে, বিটকেও বড় করল। এটা শাস্তির ভয়ে নয় কিন্তু নায়কের জন্য যে শ্রদ্ধা ব্যক্ত করেছেন বিট তাতে বোঝা যায় চারুদত্তের কাছে এই হীন কর্ম প্রকাশিত হওয়া তাঁর পক্ষে লজ্জাকর। শকারের প্রশ্ন— ‘তুমি কাকে ভয় করছ?’ বিটের জবাব—’চারুদত্তের গুণকে।’
দোষ করল শকার ক্ষমা চাইলেন বিট। শকারের কিছুমাত্র দুশ্চিন্তা নেই, বিদূষককে একবার বলছে ‘বস, বস’, আবার বলছে ‘ওঠ ওঠ’। এই চরিত্রটিকে চারুদত্তের প্রতিদ্বন্দ্বী খলনায়ক বলা যায় কি না সে চিন্তার বস্তু। শকারের নির্মম কাপুরুষতা এবং লিঙ্গ লালসা, বাক্যের অশালীনতা এবং নির্বুদ্ধিতা নায়ক শব্দটিকে এত দূরবর্তী করেছে। এ ‘খল’ বিশেষণও তাকে আত্মীয় করতে সঙ্কোচ পায়। এখানে চারুদত্তের সঙ্গে তাঁর __ প্রশ্নই ওঠে না। কখনও একজনের গুণ পার্শ্ববর্তী আর একজনকে হেয় প্রতিপন্ন __। এখানে কিন্তু অন্যনিরপেক্ষভাবেই শকার অপাঙ্ক্তেয়। বসন্তসেনার প্রতি তার আকর্ষণও তার প্রেমের ব্যঞ্জক নয়, এ তার দেহলালসার ছবি। অবশ্য মিলনান্তক যে কোনো কাহিনীতে যে কোনো খলনায়কের নায়িকাপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাই কামমাত্ৰ, প্ৰকৃত প্রেম হলে অচরিতার্থতার দরুন সে কাহিনীতে tragedy-র সুর আনবে, তবু তুঙ্গস্থিত নায়কের উত্তুঙ্গতাকে প্রকাশ করবার জন্যই খলনায়কের চরিত্রে বড়’র কিছু উপকরণ থাকে। শকার তা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
ধূতা এই কাহিনীর অন্যতমা নায়িকা বলে কথিত হয়েছেন। এটি চিন্তা করা যেতে পারে। কবি ওঁর এই নাম দিয়েছেন ‘ধূতা’ অর্থাৎ কম্পিতা। এই শব্দের অর্থ হতে পারে অস্থির, চঞ্চল। এক্ষেত্রে এটি ধূতাদেবীর স্বভাবের পরিচায়ক এবং তাঁর নায়িকা হওয়ার যোগ্যতার প্রতি কটাক্ষ করেছে। প্রেমরস প্রয়োগে নিপুণ চারুদত্ত ধৃতার ব্যাপারে যেন উদাসীন। বসন্তসেনার গয়না-চুরি যখন ধরা পড়ল তখন ধূতা পিতৃদত্ত ‘চদুসমুদ্দসারভুদা রঅণাবলী’ (বিদূষক, তৃতীয় অংক) —চার সমুদ্রের সার রত্নহারটি খেসারত হিসেবে দিলেন বিদূষককে ডাকিয়ে তাঁরই হাতে, বন্ধুকে দেবার জন্যে। চারুদত্ত শূলে যাচ্ছেন শুনে ধৃতা অগ্নিপ্রবেশের আয়োজন করেছিলেন। হিন্দুনারীর পক্ষে এটি কর্তব্য বলে পরিগণিত হত। সেকালে সহমরণ চলিত ছিল বলে মনে হয়। বিদূষক আত্মহনন থেকে বন্ধুপত্নীকে নিবৃত্ত করবার চেষ্টায় বলেছিলেন : ‘ভোদীএ দাব বজ্জণীএ ভিন্নত্তণেণ চিদাধিরোহণং পাবং উদাহরন্তি রিসীআে’ (দশম অঙ্ক)— আপনি ব্রাহ্মণী, ঋষিরা বলেছেন স্বামী ছাড়া আপনার চিতায় ওঠা পাপ। ধূতা স্বামীর মৃত্যু শোনবার আগেই আগুনে ঝাঁপ দিতে চেয়েছিলেন এটুকুই তাঁর মৌলিক কর্ম।
চারুদত্তের সম্বন্ধে ধূতার আচরণ একটি বিশিষ্ট ধ্যানধারণার প্রতীক। এটি তাঁকে উজ্জ্বল করেছে। কবির স্ত্রী-চরিত্রগুলো সবই দীপ্ত। বসন্তসেনা বারবনিতা কিন্তু মহীয়সী। তাঁর দাসী মদনিকাও তথৈব। এদের জীবিকা নিন্দিত কিন্তু কবির হাতে জীবনটি নন্দিত।
(চ) দৃশ্যস্থাপনার কাল
প্রথম অঙ্কে অন্ধকার রাজপথে শকার এবং বিট তথা ভৃত্যের বসন্তসেনাকে অনুসরণ করার মধ্যে রাজ্যের উচ্ছৃঙ্খল ভাব ফুটেছে। এটি বিপ্লবের ইঙ্গিত বহন করে।
তদানীন্তন রাজা পালককে আমরা নামে মাত্র পাই কিন্তু তাঁর অপশাসনের মূর্তিটি এতে পরিস্ফুট। তাঁর কণ্ঠ আমরা অন্তরাল থেকে শুনেছি। অধিকরণিক (বিচারপতি) দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় চারুদত্তকে ব্রাহ্মণ বলে মনুর বিধানমতে নির্বাসনের আদেশ দিয়েছিলেন কিন্তু পালক সে আদেশ রদ করে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দক্ষিণ-শ্মশানে নিয়ে তাঁকে শূলে দেবার হুকুম দিলেন। অতএব তিনি স্বৈরাচারী।
চারুদত্তের বধের আদেশ তাঁর সম্বন্ধে পাঠককে অকরুণ করেছিল। পাঠক জানেন চারুদত্ত নির্দোষ। তাঁর নির্বাসনই তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছে তাই পরমুহূর্তে ধর্মশাস্ত্রের অনুশাসন ভেঙে এই শূলদণ্ড যাঁর হাত থেকে এল তাঁর মৃত্যু অন্যায়ের প্রতিবিধান বলে মানুষ মেনে নেয়। এবং যে পরিমাণে পালক ঘৃণার্হ, সেই পরিমাণেই তাঁর বধের যিনি সম্পাদক সেই ব্যক্তি শ্রদ্ধেয় হলেন। পালক নামটি যেন নামীকে ব্যঙ্গ করছে।
পালক অনুপস্থিত হয়েও এই দৃশ্যকাব্যে যেমন উপস্থিত, আর্যক ক্ষণিক উপস্থিত হয়েও তেমনি চিরকালের জন্য হাজির এখানে কেননা চারুদত্তের দারিদ্র্যের অবসান এবং বসন্তসেনার সঙ্গে তাঁর বিবাহ, যেটি নাটকের মুখ্য কথা, শেষে রেশ রাখে মনে, সেটি তাঁরই কাজ। এই রূপকে ছোট আর একটি কাহিনী মদনিকা-শর্বিলককে নিয়ে। আর্যক-পালকবৃত্তান্ত তৃতীয় কাহিনী। আৰ্যক বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ছেঁড়া শেকল পায়ে বসন্তসেনার গাড়িতে চেপে পুষ্পকরওকে হাজির হয়ে যুক্ত হলেন মূল নায়ক চারুদত্তের সঙ্গে। চারুদত্ত গোপনে তাঁর পলায়নের পথ করে দিয়ে ভবিষ্যৎ অভ্যুদয়ের বীজ বপন করলেন। আর্যক পালককে বধ করে মৃত্যুর দ্বার থেকে বাঁচালেন চারুদত্তকে। গণিকা বসন্তসেনা তাঁর হাতেই __ দুর্লভ বধূ শব্দ। এটি সম্ভবত গৃহস্থজীবনের পক্ষে অপরিহার্য ছিল, নইলে __ করে তার উল্লেখ করতেন না।
কারাগার থেকে আর্যককে মুক্ত করেছিলেন শর্নিলক। প্রথম অঙ্কে বসন্তসেনা চারুদত্তের কাছে যে স্বর্ণভাণ্ড গচ্ছিত রেখেছিলেন তা অপহরণ করে শর্বিলক মূল কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। মূল কাহিনীর নায়িকা বসন্তসেনার দাসী মদনিকাকে বিবাহ করেও তাঁর সংযোগ ঘটেছে মূলের সঙ্গে।
দ্বিতীয় অঙ্কের কাল প্রথম অঙ্কের নৈশ ঘটনার পরবর্তী প্রভাত। প্রভাত এই কারণে যে বসন্তসেনার তখনও স্নান এবং দেবপূজা হয়নি। দাসী এসে নিবেদন করল ‘অজ্জএ, অত্তা অদিসদি, ণাদা ভবিঅ দেবদাণং পূঅং ণিব্বত্তেহি’–আৰ্যা, মা আদেশ করছেন, স্নান সেরে দেবপূজা করুন। এই প্রভাত প্রথম অঙ্কেরই রজনীকে অনুসরণ করেছে এই কারণে, যে জাতিকুসুমের গন্ধে বিধুর উত্তরীয় চারুদত্ত পূর্বরাত্রের অন্ধকারে ভ্রমে নিক্ষেপ করেছিলেন বসন্তসেনার গাত্রে, সেটি এই অঙ্কে যবনিকা ওঠাবার আগেই বসন্তসেনার মাহুত কর্ণপূরককে তার সাহসিকতার পুরস্কার স্বরূপ দান করেছিলেন তিনি। মাহুত সেটি মনিবকে দেখাল এবং মনিব প্রশ্ন করলেন— ‘কণুউরঅ, জাণীহি দাব কিং এসো জাদীকুসুমবাসিদো পাবারআেণবেত্তি’—কর্ণপূরক, দেখতো এই চাদরে জাতিফুলের গন্ধ আছে কি না। বিগত রজনীর পরে বেশি বিলম্বে এই ঘটনা ঘটলে ফুলের গন্ধ চাদরে আশা করতেন না নিপুণ নায়িকা।
এই অঙ্কে পাশা খেলার ঘটনা সংবাহককে বসন্তসেনার সঙ্গে মিলিত করল। চারুদত্তের সুখের দিনে সে তাঁর দেহ মর্দন করত। পাশাখেলা নিয়ে রচিত এই দৃশ্যটির সজীবতা বিস্ময় জাগায়। পাশার আড্ডার মালিক মাথুর ‘রাজবার্তাহারী’ অর্থাৎ রাজদূত একথা চতুর্থ অঙ্কের অন্তভাগে আমরা বিদূষকের কাছে শুনতে পাই। সে যুগের সামাজিক বৃত্তান্তে এই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ। বসন্তসেনা অলঙ্কার দিয়ে সভাপতির হাত থেকে সংবাহককে মুক্ত করলেন। সংবাহক মনের দুঃখে বৌদ্ধ ভিক্ষু হল। পুষ্পকরণ্ডকে শকারের অত্যাচারে মূর্ছিতা বসন্তসেনাকে সে-ই উদ্ধার করে বৌদ্ধবিহারে নিয়ে যায় এবং সুস্থ করে বধ্যভূমিতে হাজির করে সেই ক্ষণে যখন চণ্ডালেরা চারুদত্তকে শূলে দিচ্ছে।
তৃতীয় অঙ্কের ক’ল কেউ কেউ বলেছেন দ্বিতীয় অঙ্কের পরের দিন। এ মত সংগত মনে হয় না। কারণ রেভিলের গান শুনে চারুদত্ত এবং বিদূষক যখন ফিরলেন তখন ভৃত্য গয়নার পত্রটি দিলেন বিদূষকের হাতে। বিদূষক বিরক্ত হয়ে বললেন— ‘অজ্জ বি এদং চিঠদি’, ইত্যাদি (তৃতীয় অঙ্ক)— অর্থাৎ এগুলো আজও আছে। এই উজ্জয়িনীতে কি চোরও নেই যে এই দানীর পুত্র ‘নিদ্রাচৌর’কে চুরি করে নিয়ে যায় না। এই উক্তি স্বর্ণভাণ্ডের দায়িত্বে বেশ কয়েকদিন নিদ্রাহীন রজনী যাপনের পরেই সম্ভব হতে পারে। অতএব তৃতীয় অঙ্কের ঘটনা দ্বিতীয় অঙ্কের পরের দিন নয়। কতদিন পরে? এই প্রশ্নের জবাবে বলা যায়— ‘উন্নতকেটিরিন্দুঃ’ (৩.৬)—উন্নত অগ্রভাগযুক্ত চন্দ্র (অর্থাৎ দুই প্রান্ত যার সরু এবং উঁচু) অস্ত যাচ্ছেন একথা চারুদত্ত বিদূষককে বলছেন মধ্যরাত্রে ঘরে ফিরে। এটা ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী। অষ্টমী তিথির নিয়ম। প্রথম অঙ্ক যদি মাঘের কৃষ্ণা চতুর্থী বা পঞ্চমীতে হয়ে থাকে তবে দ্বিতীয় অঙ্ক হয়েছে তার পরের দিন মাঘের কৃষ্ণা পঞ্চমী বা ষষ্ঠীতে এবং তৃতীয় অঙ্ক যদি চাঁদের রূপ এবং ক্রিয়ার বিচারে ফাল্গুনের শুক্লা সপ্তমী বা অষ্টমীতে হয়ে থাকে তবে দ্বিতীয় অঙ্ক থেকে তার ব্যবধান হবে ১৬।১৭ দিনের।
তৃতীয় অঙ্কে রেভিলের গান শুনে চারুদত্ত বিদূষকের সঙ্গে গৃহে ফিরলেন গভীর রাত্রে। এই গানের প্রসঙ্গে বিদূষকের একটি মন্তব্য ঔৎসুক্য সঞ্চার করে—’স্ত্রিয়া সংস্কৃতং পঠন্ত্যা, মনুষ্যেণ চ কাকলীং গায়তা’ অর্থাৎ স্ত্রীলোক সংস্কৃত পড়ছে আর পুরুষ মানুষ মিহি সুরে গান গাইছে, এই দুটিতেই বিদূষকের ‘হসং জাঅদি’– হাসি পায়। চারুদত্তের আবার ওই ঢঙ্টিই ভালো লেগেছে কারণ— ‘অন্তর্হিতা যদি ভবেদ্ বনিতেতি মন্যে’ (৩.৪)—তাঁর মনে হচ্ছিল আড়াল থেকে কোনো মেয়েই হয়তো গাইছে। এই অঙ্কের তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্লোকে রেভিলের গানের যে বিশ্লেষণ ঘটেছে চারুদত্তের মুখে তা কবির সংগীতবিদ্যার পরিচয় দেয় এবং চারুদত্তের নায়কত্বকে মধুরতর করে। এই গান গভীর রাত অবধি চারুদত্ত এবং বিদূষককে জাগিয়ে রেখে তাঁদের নিদ্রাকে গভীরতর করে শর্বিলকের চৌর্যের সুযোগ এনে দিয়েছে। এই রূপকের অনেক দৃশ্যের মতনই চৌর্যের দৃশ্যটি এক অসাধারণ সৃষ্টি। নাট্যকার বিপুল যত্নে ‘ভগবান্ কনকশক্তিপ্রোক্ত চতুর্বিধ সিঁধ’ কাটার বিদ্যাই আয়ত্ত করেননি, চুরির উদ্যোগ থেকে তার নিষ্পত্তি অবধি যাবতীয় প্রক্রিয়া তাঁর নখদর্পণে। এখানে শর্বিলকের কর্মে ও বাক্যে যে বলিষ্ঠতা প্রকট হয়েছে তা ষষ্ঠ অঙ্কে পালকের বন্দিশালায় শৃঙ্খলিতচরণ আর্যককে মুক্ত করবার সামর্থ্যের আভাস দিচ্ছে। গয়না অনেক কাজ করেছে এই দৃশ্যকাব্যে। তাকে চারুদত্তের কাছে গচ্ছিত রাখা হল বলে সে অপহার্য হল। অতএব চুরি করার এক অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা সম্ভব করল। শর্বিলকের হাতে মুক্তিমূল্য রূপে মদনিকার কাছে হাজির হয়ে অলঙ্কার প্রেমিকার কাছে প্রেমিকের প্রেমের নিবিড়ত্ব ঘোষণা করল। এরই প্রসঙ্গে আড়াল থেকে দুই হৃদয়ের সংবাদ পেলেন বসন্তসেনা। গয়নার ভাঁড় নিলেন, মিলিয়ে দিলেন দুজনকে। গয়না অবশ্য শর্বিলক মুক্তিমূল্য হিসেবে বসন্তসেনাকে দেবার সুযোগ পায়নি, কিন্তু গয়নাই তাঁর অভিপ্রেত মুক্তিমূল্য হল। আবার অপহৃত গয়নার খেসারত দিতে ধূতা যে রত্নহার দিলেন সেই দান তাঁর চরিত্রকে ফোটাল। হার দিতে এসে বসন্তসেনার প্রাসাদ দেখলেন বিদূষক। এক বিপুল ঐশ্বর্যের বর্ণনা দেবার সুযোগ ঘটল কবির হার ঘনীভূত করল নায়িকার প্রেম কেননা সে যার প্রতিনিধি সে বস্তুত ভিন্ন উপাখ্যানের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই হাতে এসেছে। আসল কাহিনীটি আড়াল থেকে শুনেছিলেন বসন্তসেনা, কাজেই হার পেয়ে স্বগত উক্তি করলেন—’এই জন্যই ত (তাঁকে) চাই!’ গাঢ় প্রেমে তর সইল না সুতরাং সেই সন্ধ্যায়ই গেলেন প্রিয়-নিকেতনে এবং নিশা যাপন করে যখন পুষ্পকরণ্ডকের দিকে চললেন তখন গয়নাগুলো সোনার শকট বানাবার জন্য দিলেন চারুদত্তের তনয় রোহসেনকে (ষষ্ঠ অঙ্ক)। সেই আভরণ নবম অঙ্কে চারুদত্তের কথায় বসন্তসেনার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার সময় বিদূষক পথে শুনলেন চারুদণ্ডের বিচার চলেছে বসন্তসেনার হত্যার অপরাধে। প্রবেশ করলেন বিচারশালায়। সেখানে কাঁখ থেকে পড়ে গেল গয়না। বিচারক মেনে নিলেন শকারের অভিযোগ : চারুদত্ত গয়নার লোভে বসন্তসেনাকে হত্যা করেছে। অতঃপর দণ্ড দিলেন নির্বাসন, পালক তা অগ্রাহ্য করে জারি করলেন বধের আদেশ। একটি জড় পদার্থের বিভিন্ন ভাব এবং অবস্থা সৃষ্টির সামর্থ্যের পরিচয় দিলেন কবি।
চতুর্থ অঙ্কের ঘটনা ঘটেছিল সকালবেলা। সেই দিনেরই রাত্রে পঞ্চম অঙ্কের অবতারণা। বসন্তসেনা এসেছেন। কে এসেছেন সেই খবর দিতে গিয়ে বসন্তসেনার ভৃত্য কুম্ভীলক এবং বিদূষকের মধ্যে বসন্তসেনার নামটি নিয়ে এক প্রস্থ ধাঁধা জাতীয় আলোচনা হয়, যার মধ্যে চারুদত্তও লিপ্ত হন। এটি সময়াপহারক। কবির ইচ্ছা ছিল হাস্যরস পরিবেশন করা, যে কাজ আরও বড় উপায়ে তিনি অন্যত্র করে খাঁটি আনন্দ দিয়েছেন। পূর্বোক্ত বিট এসেছেন বসন্তসেনার সঙ্গে। বর্ষামুখর সন্ধ্যায় পন্থ বিজন অতি ঘোর, তাই কি বসন্তসেনার সঙ্গে তিনি? অথবা বর্ষার একপ্রস্থ বর্ণনা দেবার জন্যই তাঁকে ডাকলেন কবি? আর কোনো কাজ তাঁর এ অঙ্কে নেই। দেহলীতে পৌঁছেই বিদায় দিলেন নায়িকা বিটকে, তিনিও কদর্য গালি দিয়ে প্রস্থান করলেন (৫.৩৬)। আশ্চর্য, এই গালির জবাব ফোটেনি বসন্তসেনার মুখে। চতুর্থ অঙ্কে শর্বিলক এমনই বিশ্রী গালি দিয়েছিলেন মদনিকাকে এবং বসন্তসেনা আড়াল থেকে সব শুনেছেন কিন্তু কোনো স্থান থেকে কোনো উচ্চবাচ্য হয়নি। বর্ষার বিশ্লেষণ করেছেন কবি সবাইকে দিয়ে। প্রথমে চারুদত্ত বললেন কিছু, অতঃপর কুম্ভীলক, তারপর বিট এবং সবশেষে বসন্তসেনা। বিট বলেছেন : ‘নীপঃ প্রদীপায়তে’ (৫.১৪)— কদমগাছ প্রদীপের মতো দেখাচ্ছে। এ বর্ণনা পলকে পরিবেশ রচনা করে কিন্তু বসন্তসেনা যখন বলছেন : ‘জ্যোৎস্না দুর্বলভর্তৃকের বনিতা প্রোৎসার্য মেঘৈহৃতাঃ’ (৫.২০)— দুর্বল স্বামীর বধূর মতো জ্যোৎস্নাকে মেঘ হরণ করেছে, তখন চিত্ত ভরে না। কবির নাট্যরচনার মেজাজটাই আটপৌরে, তা কালিদাসাদির মতো মনকে দূরে বিসারিত করে না। ফলে প্রকৃতির বিভিন্ন পরিস্থিতিকে যখন কল্পনার সাহায্যে বিশ্লেষণ করছেন, তা সর্বত্র হৃদয়ে পশে না। এই অঙ্কে বসন্তসেনা বলছেন : ‘গতা নাশং তারা উপকৃতম্ অসাধাবিব জনে’ (৫.২৫)—অসাধু লোককে করা উপকারের মতোই তারাগুলো লোপ পেয়েছে; প্রথম অঙ্কে অন্ধকারের দুর্ভেদ্যতা বোঝাতে বিট বলেছেন : ‘অসৎপুরুষ সেবেব দৃষ্টিবিতং ফলং গতা’ (১.৩৪)–অসৎ পুরুষকে করা সেবার মতোই দৃষ্টি ব্যর্থ হয়েছে। বসন্তসেনা ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করছেন— ‘হে ইন্দ্ৰ, স্বাধীন তুমি যেমন অহল্যার জন্য ‘আমি গৌতম’ এই মিথ্যা বলেছিলে তেমনি আমার দুঃখও দূর কর’ (৫.৩০)। এখানে পূর্ববর্তী মিথ্যাকথনের সঙ্গে দুঃখ দূর করবার কোনো মিল খুঁজে পাইনি।
পঞ্চম অঙ্কের নাম দিয়েছেন তিনি ‘দুর্দিন’, যে শব্দের অর্থ ‘মেঘাচ্ছন্ন দিন’ (মেঘাচ্ছন্নেহহ্নি দুর্দিনম্, অমরকোষ)। একথা ঠিক যে বর্ষণমন্দ্রিত অন্ধকারে আবৃত বিভাবরীতে রূপকের এই অঙ্কের ঘটনা ঘটেছিল তাই কবি এর ওই নাম দিয়েছেন, কিন্তু শব্দের যে বিশেষ অর্থই থাক দূর এবং দিন এই দুটি মিলিয়ে যা তৈরি হল তা তলে তলে দুঃখেরই বাচক। ভানুজি দীক্ষিত দুর্দিন শব্দের ব্যাখ্যায় বলেছেন ‘দুর্ নিন্দিতং দিনম্’। মেঘাচ্ছন্ন দিবস বা রজনী বোঝাতে কবি অন্য শব্দ আনতে পারতেন। অঙ্কটি পরম সুখের কেননা এতে নায়ক এবং নায়িকার পরমবাঞ্ছিত মিলন নিষ্কণ্টকভাবে দেখান হয়েছে এবং সে মিলন পূর্ণতর হয়েছে ভবিষ্যতে। সুদিনের ছবি রয়েছে এতে অথচ নাম হল দুর্দিন।
পঞ্চম অঙ্কে যে রাতে মিলন হল উভয়ের তারই পরের প্রভাতে ষষ্ঠ অঙ্কের অবতারণা। এই অঙ্কটি গুরুত্বপূর্ণ। এরই প্রথম-ভাগে বসন্তসেনা সোনার শকট তৈরির জন্য তাঁর অলঙ্কার দিলেন রোহসেনকে। পাশের বাড়ির ছেলের সঙ্গে তার সোনার গাড়ি নিয়ে খেলছিল রোহসেন। ছেলেটি সেটা নিয়ে গেল, রোহসেন কান্না জুড়ল! সোনার গাড়ি নিয়ে খেলা, তা-ও রাজপুত্রের নয়, গৃহস্থের ছেলের, এটি লক্ষ করবার। মৃচ্ছকটিক সামাজিক কবিকর্ম। রাজা উজির এতে পটান্তরিত। কবি স্বয়ং রাজা হয়ে সাধারণ প্রজা নিয়ে নাটক লিখেছেন, এ-তাঁর অন্তরকে ব্যক্ত করেছে। প্রজার ইচ্ছার এবং শক্তির তিনি জয় দেখিয়েছেন তাঁর রাজআদর্শের এটিও চিহ্ন। রাজা হয়ে রাজার বধ ঘটিয়েছেন প্রজার হাতে এবং তার পরেও রাজার কোনো উত্তরাধিকারীকে নয়, কোনো অভিজাত পুরুষকেও নয় কিন্তু গোপপুত্রকে সিংহাসনে বসিয়েছেন, এও তাঁর স্বাধীন রাজচিন্তার প্রতীক। অতঃপর পুষ্পকরওকের দিকে যাত্রা করে ভুল করে চাপলেন দরজায় দৈবাৎ দাঁড়ানো শকারের গাড়িতে, যেটিরও গন্তব্য ছিল পুষ্পকরণ্ডক। শকারের হুকুম তাই ছিল এবং সে প্রতীক্ষা করছিল সেই জীর্ণোদ্যানে। বসন্তসেনার জন্য যে ঢাকা গাড়ি ছিল নির্দিষ্ট তাতে সদ্য শৃঙ্খলভাঙা আর্যক এসে উঠলেন গুপ্তভাবে। চালক বর্ধমানক গাড়িতে ভারি কিছু উঠেছে অনুভব করে না দেখেই চালিয়ে দিল গাড়ি, ভাবল বসন্তসেনাকে নিয়ে চলেছে চারুদত্তের আদেশমতো পুষ্পকরণ্ডককে। সেইখানে মিলন হবে আর এক দফা। নগরের দুই রক্ষকপ্রধান বীরক এবং চন্দনক তারস্বরে ঘোষণা করেছেন আর্যকের পলায়নের বাহিনী এবং চলমান সমস্ত গাড়ি খুঁজছেন। বর্ধমানকের গাড়ি ধরলেন দুজনে এবং এইখানেও পেয়েও না পাওয়ার সুন্দর বৃত্তান্ত দাখিল করেছেন কবি। চন্দনক যদি রাজার কাজে অটল থাকতেন, এ রূপকের কাহিনী কোন পথে বাঁক নিত জানি না। তবে রাজপুরুষ শক্তিমান হয়েও রাজার অনুগমন করেননি। ইতিহাসে এরাই বহু ভাঙাগড়ার কাজ করেছেন আড়ালে। চন্দনককে অনুসন্ধানরত অবস্থায় আর্যক বলেছিলেন—’শরণাগতোহস্মি’ এবং তিনিও বলেছিলেন—’অভয়ং শরণাগতস্য’। সেই বাণীই উত্তরণ ঘটাল, ‘যদ্ ভবতু তদ্ ভবতু। প্রথমম্ এর অভয়ং দত্তম্’– যা হয় হোক্, গোড়ায়ই অভয় দিয়েছি। আর্যক রক্ষা পেলেন, নতুন ইতিহাস রচিত হল এই ছাড়পত্রের সুবাদে উজ্জয়িনীতে
পুষ্পকরণ্ডক উজ্জয়িনী নগর থেকে কত দূরে কবি লেখেননি। চারুদত্তের শকটের সেইটুকু যেতে যে সময় লেগেছিল তারপরেই সপ্তম অঙ্কের শুরু। বসন্তসেনার জন্য প্রতীক্ষমাণ চারুদত্ত এবং বিদূষক ছিন্ন শিকল পায়ে আর্যককে গ্রহণ করলেন। তিনি শরণ নিলেন, চারুদত্ত তাঁকে শরণ দিলেন। ভৃত্যকে দিয়ে পায়ের শৃঙ্খল ভাঙিয়ে নিজের গাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন তাঁকে তাঁর অভিপ্রেতস্থানে। এই কর্ম এবং উভয়ের এই সখ্য নাটকের মধুর পরিণতির পক্ষে অপরিহার্য ছিল। চারুদত্ত সম্প্রতি দয়িতাকে পেলেন না কিন্তু যাঁকে পেলেন, দয়িতার পরিপূর্ণ প্রাপ্তি তিনিই ঘটিয়েছিলেন। পালক আর্যকের হাতে নিহত না হলে তা ঘটত না। অঙ্কের শেষভাগে চারুদত্ত বসন্তসেনার জন্য উদ্বেগ বহন করে পুষ্পকরণ্ডক ত্যাগ করলেন। সংবাহক তখন সেখানে প্রবেশ করছে।
সংবাহক তখন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী; এখানে পুকুরে কৌপীন ধুতে এসেছিল। অষ্টম অঙ্কের আরম্ভ এইখানে। শকার এবং বিট ইতিমধ্যেই হাজির সেখানে। শকার মেরে ফেলতে চাইল সংবাহককে, বিট কোনোক্রমে তাকে বাঁচালেন। শকারের ক্ষুধার উদ্রেক হয়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছে : ‘ণহমজ্ঝগদে শূলে দুপ্পে খে’— মাঝ আকাশে সূর্যের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। এ থেকে বোঝা যায় সপ্তম অঙ্কের পরেই দুপুরবেলা অষ্টম-অঙ্কের আরম্ভ হয়েছে। ফলত ষষ্ঠ, সপ্তম এবং অষ্টম-অঙ্ক একই দিনে প্রভাতকাল থেকে রূপকে ক্রমে ক্রমে স্থান পেয়েছে। ষষ্ঠ অঙ্কে বসন্তসেনা যে ভুল করে শকারের শকটে উঠেছিলেন পুষ্পকরণ্ডকে এসে তার মাশুল দিতে হল। শকার চাইল বসন্তসেনাকে। তিনি পূর্ববৎ প্রত্যাখ্যান করলেন। শকার ভাবল তার গাড়োয়ান স্থাবরক এবং বিটের সামনে ওঁর সঙ্কোচ হচ্ছে, অতএব বিদায় করল দুজনকে। তবু বসন্তসেনা অটল। এই অবজ্ঞা চারুদত্তের প্রতি প্রেমের বশে এই ভেবে শকার কণ্ঠরোধ করল, ভাবল সে মৃত। সহসা পুনরাবির্ভাব ঘটল বিট এবং স্থাবরকের। ঘৃণায় বিট শকারকে ছেড়ে চলে গেল। সেইখানে ‘যত্র আর্যশবিলকচন্দনকপ্রভুতয়ঃ সন্তি’—যেখানে আর্য শর্বিলক, চন্দনক প্রভৃতি আছেন। কবি আলতোভাবে জানিয়ে দিলেন, পালকের চরণতলে মাটি সরছে।
লাম্পট্যের প্রবণতা থাকলেও যে শিক্ষিত সে শিক্ষিত— এই বোধহয় কবির প্রতিপাদ্য। শকার কুকীর্তি গোপন করবার জন্য ভৃত্যকে প্রাসাদে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখবে ভেবে তাকে সরিয়ে দিল সেখান থেকে। শুকনো পাতায় ঢাকল অচেতন বসন্তসেনার দেহ। অত বড় কুকর্ম যে ঢাকা পড়বে না কবি বুঝিয়ে দিলেন সেটি, কারণ হালকা হাওয়াতেই পাতা উড়ে ঢাকা জিনিস বেরিয়ে আসে। তারপর সে পণ করল বসন্তসেনাকে হত্যার অভিযোগ আনবে চারুদত্তের নামে। উপলক্ষ— বসন্তসেনা চারুদত্তকে ভালোবাসত, অতএব প্রতিহিংসা এবং দ্বিতীয় কথা আত্মরক্ষা। বিট যাঁকে ‘নগরশ্রী’ (৮.৪৯) অর্থাৎ নগরলক্ষ্মী বলেছেন তাঁর হত্যা (বিটও তাঁকে মৃত ভেবে বহু বিলাপ করেছেন অষ্টম অঙ্কে) সাড়া জাগাবেই এবং বিট ভৃত্য কি ঘটাবে তারও কোনো বিশ্বাস নেই। চরিত্রানুগ কর্ম করল শকার। চারুদত্তের ওপরে দোষ আরোপের সুবিধা এই যে তিনি দরিদ্র এবং দুর্বল, অধিকন্তু বসন্তসেনার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আছে। শকার চলল নগরে। সংবাহক তখন কৌপীন শুকোবার সুযোগ খুঁজছে। দেখে শকার চমকে উঠল। তার উক্তি হল : ‘জেণ জেণ গচ্ছামি মগ্গেণ তেণ জ্জেব এশে দুষ্ট শমনকে গহিদক-শাওদকং চীবলং আঅচ্ছদি’- যে পথেই যাই সে পথেই এই দুষ্ট বৌদ্ধ সন্ন্যাসীটা ভেজা ছোপান কৌপীন নিয়ে হাজির হয়। পরবর্তীকালে সংবাহকই চূড়ান্ত পরাভব ঘটিয়েছিল শকারের জীবনে। তার উদ্ধত গতি রোধ করে দাঁড়িয়েছিল। তারই পূর্বাভাস যেন ফুটে উঠেছে শকারের মনে কবির কৌশলে। পাঁচিল ডিঙিয়ে তাকে এড়িয়ে গেল শকার। সংবাহক যখন রঙ্গমঞ্চে এল তখন বসন্তসেনার জ্ঞান হয়েছে। অলঙ্কৃত হাতখানি নাড়লেন তিনি। দ্বিতীয় অঙ্কে দূত্যকর মাথুরকে গয়না দিয়ে যে হাত সংবাহককে মুক্ত করেছিল সেই হাত চিনল সে। চিনিয়ে দিল নিজেকে। ‘জাব তাএ বসন্তশেণিআএ বুদ্ধোবাশিআএ পদ্ধৃবকালং ণ কলেমি’—যতক্ষণ ওই বুদ্ধের উপাসিকা বসন্তসেনার প্রত্যুপকার সে করতে পারছিল না ততক্ষণ স্বর্গেও তার রুচি জাগছিল না। কৃতার্থ হয়ে সে বৌদ্ধবিহারে নিয়ে গেল তাঁকে। সৎকর্ম সৎকর্মের দ্বারা পুরস্কৃত হয় এই হল কবির মন্তব্য। তাঁর রচনায় অসুন্দরের সমাবেশ ঘটেছে কিন্তু সুন্দরের সংস্পর্শে তাদের জন্মান্তর ঘটিয়েছে। শকারের পরিবর্তন আমরা প্রত্যক্ষ করিনি কিন্তু ‘পশ্চাদ্ববাহুবদ্ধ’ অর্থাৎ পিছন দিকে হাত বেঁধে যখন পুরুষেরা তাকে নিয়ে এল এবং ‘আর্য চারুদত্ত, পরিত্রাণ করুন’ বলে চারুদত্তের পায়ে পড়ে ঘোষণা করল : ‘ণ ঊণ মালায়িশশম্’ (দশম অঙ্ক)—আর আপনাকে মারব না, তখন তার অন্যায় থেকে ন্যায়ে উত্তরণে আমাদের আস্থা যদিও এল না কারণ বসন্তসেনাকে মুহূর্তপরেই ‘গর্ভদাসী’ বলে সম্বোধন করেছে সে, তবু তাঁর কাছেও ক্ষমা প্রার্থনা তার আপন ভাবের পরিবর্তনের প্রতীক। পৃথিবীর মালিন্য কবিকে নিরাশ করেনি। অন্ধকার যত নিবিড় এবং ব্যাপক হোক, আলো কিছু থাকবেই এবং পরিণামে সে-ই জয়ী হবে— এই তাঁর রূপকের বাণী।
নবম অঙ্কে ২৩ সংখ্যক শ্লোকে নগররক্ষী বীরক বলছে— গাড়িতে কে চলেছে দেখতে গিয়ে, চন্দনকের ‘পাদপ্রহার’ খেয়ে দুঃখ করতে করতে, ‘কথমপি রাত্রিঃ প্ৰভাতা মে’—কোনোমতে আমার রাত ভোর হয়েছে—এবার বিচারশালায় যাই। পাদপ্রহার ষষ্ঠ অঙ্কের ঘটনা। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম অঙ্ক একদিনের ব্যাপার সুতরাং এই তিন অঙ্ক যেদিনের তার পরের দিন সকালেই নবম অঙ্কের আরম্ভ।
এই অঙ্কে শকার অভিযোগ আনল চারুদত্তের বিরুদ্ধে— তিনি অর্থের লোভে বসন্তসেনাকে পুষ্পকরওকে হত্যা করেছেন। বিচারক চেয়েছিলেন দুষ্ট শকারের অভিযোগ অন্যদিন শুনবেন, কিন্তু সে বলল— তাহলে সে তার ভগ্নীপতি রাজা পালক এবং তার মা এবং ভগিনীকে বলে ‘এদং অধিঅলণিংঅং দূলে ফেলিঅ’ এই বিচারপতিকে দূরে ফেলে দিয়ে অন্য বিচারক বসাবে। অগত্যা বিচারপতিকে শকারের অভিযোগ শুনতে হল।
বিচারপতি বিচারপতিই বটেন। তিনি ‘ক্রোধন’ নন, ‘তুল্যো মিত্রপরস্বকেষু’–বন্ধু, পর এবং আপনজনে সমান, ‘ন লোভান্বিতঃ’, ঘুষ নেন না (৯.৫)। এই অঙ্ক পড়লে প্রাচীন ভারতের বিচারপদ্ধতির একটি বিশদ চিত্র মেলে। কত সহজ এবং দ্রুত বিচারের পদ্ধতি, কত শিষ্ট ছিল বিচারশালার ব্যবহার। বিচারকের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে শিষ্টতার অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে। তিনি চারুদত্ত এবং শকার দুজনকেই চিনতেন তাই গোড়ায় অভিযোগ বিশ্বাস করতে চাননি কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমাণ চারুদত্তের প্রতিকূলে গেল।
এই বিচারপর্বে একটি গুরুতর ত্রুটি হল, বীরকের জবানী পরখ করে দেখা হয়নি। সে পুষ্পকরণ্ডকে তদন্ত করে এসে বলল : ‘দিট ঠং চ মএ ইথিয়াকলেবরং সাবদেহিং বিলুপ্পন্তম্’—দেখলাম, একটি স্ত্রীলোকের কলেবর শ্বাপদে খেয়ে শেষ করছে। সেটা যে পুরুষের নয় এটা বিচারক বীরকের কাছ থেকে হলফ করিয়ে নিলেন দেহের অবশিষ্ট চুল, হাত, পা ইত্যাদির বর্ণনা নিয়ে কিন্তু তিনি যা সিদ্ধান্ত নিলেন তা হল যেহেতু পুষ্পকরণ্ডকে মৃত স্ত্রীলোক, সে বসন্তসেনা। বীরক বসন্তসেনাকে চিনত কিনা সে প্রশ্নও বিচারক তেলেননি, তিনি শুধু দেখতে বলেছিলেন : ‘তত্র কাচিদ্ বিপন্না স্ত্রী ন বা ইতি’–সেখানে কোনো স্ত্রীলোক মরে রয়েছে কি-না। বোঝা যাচ্ছে পূর্ব হতেই বিচারপতি এই ধারণায় অভিভূত যে স্ত্রীলোকের মৃতদেহ যদি ওখানে থেকে থাকে তবে সে নির্ঘাত বসন্তসেনার। শোধনক বা কায়স্থ বা শ্রেষ্ঠী কেউ এর প্রতিবাদ করলেন না। শ্রেষ্ঠী, এবং কায়স্থের প্রশ্ন হল : ‘কধং ত্বয়া জ্ঞাতং স্ত্রীকলেবরম্ ইতি?’—কেমন করে জানলে সেটা নারীর দেহ? বীরক চুলের, হাতের, পায়ের কথা বলল। বিচারক বললেন : ‘আর্য চারুদত্ত, সত্যম্ অতিধীয়তাম্’— আর্য চারুদত্ত, সত্য বলুন। অর্থাৎ আমরা বুঝলাম ওই মহিলা বসন্তসেনা এবং আপনিই তাকে হত্যা করেছেন, এবার আপনি কী বলেন?
আর একটি অপূর্ণতার কথা এই প্রসঙ্গে মনে আসে। বীরক পাদপ্রহার লাভ করেছিল চারুদত্তের ঢাকা গাড়ি দেখবার প্রসঙ্গে। সেই চারুদত্ত অভিযুক্ত হয়ে সম্মুখে দণ্ডায়মান। বিচারক যখন প্রশ্ন করলেন : জান কার সেই গাড়ি? বীরক বলল : ‘ইমস্য অকুচারুদত্তস্য’– এই আর্য চারুদত্তের। যাঁর গাড়ির সুবাদে লাথি, তাঁর প্রতি বিতৃষ্ণা প্রশ্নাতীত নয়। গাড়িতে বসন্তসেনা চলেছিলেন বিহার করতে এবং সেই বসন্তসেনাকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে চারুদত্তের নামে। বিচারশালায় প্রবেশ করে এ সংবাদ সে অবশ্য সংগ্রহ করেছিল রাজরক্ষীর স্বাভাবিক কৌতূহলের বশে, যদিও নাট্যকার সে সম্বন্ধে মৌন—কিন্তু সে যাইহোক, পূর্বোক্ত কারণে চারুদত্তের একটা সাজা পাওয়া তার কাম্য হওয়া সম্ভব হতে পারে এবং সেক্ষেত্রে তাকে দিয়ে অভিযোগ প্রমাণের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করান উচিত কিনা নিরপেক্ষ এবং উন্নত বিচারকের এটা ভাবা সঙ্গত ছিল। বিচারপ্রার্থী ক্ষুব্ধ বীরক যে সত্যই কোনো মৃত নারীদেহ দেখেছিল তাই-বা কে বলবে? আরও কথা, বিচারক বলেছিলেন : ‘বীরক, পশ্চাদ্দিহ ভবতো ন্যায়ং দ্ৰক্ষ্যামঃ’— বীরক, তোমার অভিযোগ পরে দেখব। তারপরেই তিনি তাকে পুষ্পকরণ্ডকে পাঠান। সে জানত যা আছে কিনা দেখতে তাকে আদেশ করা হল সেটি আছে বললে অকাট্য প্রমাণ বলে মামলার সঙ্গে সঙ্গে নিষ্পত্তি ঘটবে এবং নেই বললে চলবে আরও কিছুক্ষণ। প্রথম ক্ষেত্রে তার অভিযোগের বিচার হয়তো আরম্ভ হবে সদ্য সদ্য এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কখন বা কবে হবে তার ঠিকানা নেই। ক্রুদ্ধ অভিযোগী, লাথির অপমানে ‘অণুসোঅন্তস্য ইয়ং কধং পি রত্তী পভাদা’ (৯.২৩) দুঃখ করতে করতে যার কোনোমতে রাত কেটেছে, সে কোনটা চাইবে? সে নগররক্ষী, যা বলবে বিচারক তা-ই মানবেন এ সে জানত। বস্তুত বিচারক তার উক্তিকে যাচাই করেননি।
এই দুর্বলতাগুলো নাট্যকারের দৃষ্টি হয়তো আকর্ষণ করেনি অথবা পালকের বিরুদ্ধে বিতৃষ্ণা জাগাবার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাপূর্বকই তিনি তাঁর রাজত্বে বিচারশালায়ও অযোগ্যতা সপ্রমাণ করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি লঘুতর কেননা বিচারক এবং বিচারগৃহের যে সৌম্য গাম্ভীর্য তিনি চিত্রিত করেছেন তাতে এর স্থান সুসমঞ্জস নয়।
নবম অঙ্কের কিছু পরেই দশম অঙ্কের যবনিকা উঠল। নবম অঙ্কে রাজা পালক আদেশ দিয়েছেন চারুদত্তকে শূলে দিতে এবং বিচারক সেই উদ্দেশ্যে চণ্ডালদের আদেশ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। অতঃপর শোধনকও চারুদত্তকে নিয়ে অগ্রসর হলেন। এইখানেই নবম অঙ্কের ইতি। তারপরেই চারুদত্তকে নিয়ে দুজন চণ্ডালের প্রবেশ ঘটল দশম অঙ্কে। চারুদত্তের সারা গায়ে রক্তচন্দন লিপ্ত করে তাতে চালের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁর গলায় করবীফুলের মালা, কাঁধে শূল। দুজন চণ্ডাল তাঁকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছে। সেকালের শূলে দেবার ছবিটি লিপিবদ্ধ করেছেন কবি। মশানে পৌঁছিবার আগে পাঁচ জায়গায় ঢোল বাজিয়ে ঘোষণা করা হল কাকে কোন অপরাধে বধের দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। এই পাঁচবার ঘোষণার মধ্যবর্তীকালে কবি ঘটনা বিন্যাসের সুযোগ পেয়েছেন। নবম-অঙ্কে চারুদত্ত বিদূষকের কাছে রোহসেনকে দেখতে চেয়েছিলেন। প্রথমবারে ঘোষণার পরেই বিদূষক তাঁকে নিয়ে পৌঁছলেন। এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হল। সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যে শিশু-চরিত্রের ছড়াছড়ি নেই। শিশুর অবিবেচনার আব্দার অভিভাবককে কেমন বিপাকে ফেলতে পারে এইটে দেখান কবির অভিপ্রায় ছিল কিনা জানি না কেননা রোহসেনের সোনার গাড়ির বায়না বসন্তসেনাকে গয়না দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং সেই গয়না তাঁর মৃত্যুদণ্ডকে সুলভ করেছে, কিন্তু এই অঙ্কে তার বার্তালাপ এইরকম :
রোহসেন— বাবাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
চারুদত্ত— বাছা, বধ করবার জায়গায় যাচ্ছি।
রোহসেন— বাবাকে ছেড়ে দাও, আমাকে মেরে ফেল।
এগিয়ে চলেছে চণ্ডালেরা মশানের দিকে। দ্বিতীয় ঘোষণার জায়গায় আবার তারস্বরে দণ্ডের আদেশ উচ্চারণ করবার পরেই শৃঙ্খলিত স্থাবরকের প্রবেশ। শকার তাকে বেঁধে রেখেছিল ঘরের দালানে, পাছে পুষ্পকরণ্ডকে বসন্তসেনার হত্যার ব্যাপার সে প্রকাশ করে দেয়। সত্য যেন প্রাণপণে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছে। এইটেই তার ধর্ম, কবির বিন্যাসে তা স্পষ্ট হয়েছে। স্থাবরক জীবনকে তুচ্ছ করে মনিবের কুকীর্তি জানিয়ে দিল চণ্ডালদের, শকারের সামনেই কিন্তু অপূর্ব কৌশলে শকার তার উক্তি খণ্ডিত করে তাকে দূর করে দিল। মেঘের আড়ালে সূর্য ফুটিফুটি করেও ফুটতে পারল না। তৃতীয় স্থানে ঘোষণা হল। কবি একটি নিপুণ কবিকর্ম সম্পাদন করলেন এবার। প্রথম চণ্ডাল বীরক যখন সহযোগীর কাছে শুনল তারই আজ বধকার্যের পালা তখন বলল তার পিতা বলেছিলেন— ‘বধ্যকে হঠাৎ বধ করিস না।’ কারণ একগাদা, তার মধ্যে একটি হল : ‘কদাবি লাঅপলিপত্তে হোদি তেণ শব্ববজ্বঝাণং মোক্খে হোদি’— কখনও যদি রাজপরিবর্তন ঘটে তাতে সব বধ্য মুক্ত হয়ে যায়। এই উক্তি শকারকে চকিত কিন্তু পাঠককে পুলকিত করল। ট্রাজেডিতে পরবর্তী ঘটনার ছায়া পড়ে পূর্ব ঘটনায়, কমেডিতে বিস্ময়ের সুযোগ আছে। আকস্মিকতা আনন্দ আনতে পারে কিন্তু পূর্ব আভাসে অভিপ্রেত ঘটনাটি অনুমান করবার সুযোগ পেলে পাঠকের আত্মগৌরব চরিতার্থ হয়। এতে রচনা আকর্ষণীয় হয়। এছাড়া এখানে কবির কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল। পালকের মৃত্যু এই রূপকে সামগ্রিকভাবে ট্রাজেডির ছায়া ফেলেনি কিন্তু ব্যক্তিবিশেষ, যেমন, শকারের কাছে তা ট্রাজেডিই বটে। মনে হয় কবি তার মনে এই আসন্ন সর্বনাশের ইঙ্গিত করতে চেয়েছিলেন।’ চণ্ডাল বীরকের উক্তি শুনে শকার চিৎকার করে উঠেছিল : ‘কিং কিং লাঅপলিপত্তে হোদি!’— কী, কী, রাজার পরিবর্তন? বস্তুত পালকের মৃত্যু যাদের কাছে দুঃখ হয়ে দেখা দিল এবং যাদের কাছে সেইরূপে এল না এই উভয় পক্ষকেই কবি একটি উক্তিতে আলিঙ্গন করেছেন।
চতুর্থস্থানে ঘোষণা হল। এই সময়ে বৌদ্ধবিহারে সুস্থ হয়ে ভিক্ষু সংবাহকের সঙ্গে বসন্তসেনা রাজপথে পা দিলেন চারুদত্তের গৃহে যাবেন বলে। চণ্ডালেরা ততক্ষণে কর্মের কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। শেষ ঘোষণা করল তারা এবং তার মর্ম বুঝে সংবাহক বোঝাল বসন্তসেনাকে। দ্রুত হল পদক্ষেপ। ততক্ষণে চণ্ডাল খড়গ তুলেছে কিন্তু তা খসে পড়ল হাত থেকে। বধ যে হবে না তা বোঝাবার এটি একটি সাধারণ কৌশল। এবার শূলে তুলতে গেল দুই চণ্ডাল। সেই মুহূর্তে বসন্তসেনা বলছেন : ‘অজ্জা, মা দাব, মা দাব। অজ্জা, এসা অহং মন্দভাইণী জাএ কারণাদো এসো বাবাদী-অদি’— মহাশয়েরা, থামুন, থামুন, এই আমি সেই হতভাগিনী যার জন্য এঁকে বধ করা হচ্ছে। শকার পালাল। চণ্ডালেরা বলল— রাজার আদেশ, বসন্তসেনাকে যে মেরেছে তাকে মারতে হবে। তারা শকারের পশ্চাৎ ছুটল। ইতিমধ্যে পালক নিহত হলেন আর্যকের হাতে। শকারকে ধরে আনল জনতা। শর্বিলক তাকে শূলে দিতে যাচ্ছেন— কিন্তু সে শরণ নিল চারুদত্তের এবং চারুদত্তের উক্তি হল : ‘শস্ত্রেণ ন হন্তব্য, উপকারহতন্তু কর্তব্যঃ’ (১০.৫৫)— অস্ত্র দিয়ে ওকে মেরো না, উপকার দিয়ে বধ কর। লক্ষ করবার বিষয় হল— যে দুই ব্যক্তি চারুদত্তের বধের ব্যবস্থা করেছিলেন, বধ্য হলেন তাঁরাই, অভ্যুদয় হল চারুদত্তের। কবি মনুর ভক্ত। মনুর উক্তি অনুসরণ করেই তাঁর বিচারক চারুদত্তকে ব্রাহ্মণ বলে অবধ্য ঘোষণা করেছিলেন। মনুরই অব্যর্থ কণ্ঠের প্রতিধ্বনি জাগে তাঁর গ্রন্থে : ‘অধর্মেণৈধতে তাবৎ, ততো ভদ্রাণি পশ্যতি। ততঃ সপত্বান, জয়তি, সমূলস্তু বিনশ্যতি’ (মনুসংহিতা, ৪.১৭৪)– অধর্মের দ্বারা প্রথমে বড় হয়, তারপর ধনসম্পদ প্রচুর লাভ করে, ক্রমে শত্রুদেরও জয় করে কিন্তু অন্তিমে সমূলে ধ্বংস হয়।
আর একটি বাণীও কান পাতলে শোনা যায় : ভালো ভালোকেই শুধু শক্তি জোগায় না, খারাপকেও ভালো করে। চারুদত্তের জীবন বসন্তসেনাকে মুগ্ধ করে বারবধূ থেকে গৃহবধূতে উত্তীর্ণ করল। শর্বিলকের প্রেম মদনিকাকেও সেই পরমবাঞ্ছিত আশ্রয় দিল। বসন্তসেনার ঔদার্য পাশায় সব-খোয়ানো সংবাহকের পোশাককে গেরুয়ায় রাঙাল, এবং যার অসাধারণ দুরুক্তি এবং দুষ্কর্ম এই প্রকরণের তীব্র গতির মূল সেই শকারও, চারুদত্তের পায়ে পড়ে বলল : ‘পুণ্যে ন ঈদিশ কলিশম্’– আর এমন করব না।
‘কাব্যতো রামাদিবৎ প্রবর্তিতব্যম্’– প্রাচীন ভারতবর্ষের কাব্যরচনার এই শালপ্রাংশু আদর্শ নাই-বা রইল এতে কারণ এর কুশীলবের কর-চরণ ধরণীর ধুলায় ধূসর কিন্তু অশুভের কাছে অধুনা পরাহত মানুষের শুভশক্তির প্রতি কবি তাঁর অব্যর্থ বিশ্বাসের স্বাক্ষর রাখলেন মৃচ্ছকটিকম্-এ।
শ্রীতারাপদ ভট্টাচার্য
.
অনুবাদকের নিবেদন
শর্বিলকের কাটা সিঁধ দেখে চারুদত্ত সবিস্ময়ে বলেছিলেন : ‘অহো দর্শনীয়োহয় সন্ধিঃ!’ শূদ্রক সিঁধ কেটেছিলেন ভাসের ‘দরিদ্র-চারুদত্তে’র ঘরে, আশ্চর্য কৌশলে ভাস সেই সিঁধ দেখে বলতে পারতেন ‘অহো দর্শনীয়োহয়ং সন্ধিঃ’। শূদ্রক পরের ঘরে সিঁধ কেটে নাট্যরত্নের ভাণ্ডটি অপহরণ করলেন বটে, কিন্তু তা দিয়ে তিনি যে ‘রত্নহার’ গড়লেন তা কাব্যকান্তার কণ্ঠে কমনীয় হয়ে রইল।
মৃচ্ছকটিকের অনুবাদ করতে-করতে মনে হল সেই প্রাচীন উজ্জয়িনী পরিক্রমা করে এলাম। ভ্রমণের আনন্দ পেলাম কিন্তু ভাষান্তরে উজ্জয়িনীর সেই মোহিনী মূর্তিটিকে ধরা গেল না। মূর্তিটি ভাষা দিয়ে আঁকা। বহু ভাষা— বহু রঙের ভাষা। সংস্কৃতকে ছাপিয়ে প্রাকৃতের বিচিত্র কলধ্বনি। মহারাষ্ট্রি, শৌরসেনি আর মাগধি সহোদরার মতো হাত ধরাধরি করে চলেছে। সূত্রধারও যেন ভুল করে সাজানো সংস্কৃতে কথা শুরু করে প্রকৃতিকে ফিরে পেলেন— প্রাকৃতে প্রকাশ করলেন নিজেকে। প্রাকৃতের সঙ্গে মাঝে মাঝে মিশে আছে অপভ্রংশ—কোনোটি চণ্ডালি কোনোটি বা ঢক্কি। এ-নাটক যখন লেখা হয়েছে তখনকার ভাষা প্রায় অপভ্রংশের কাছাকাছি পৌঁছেছিল মনে হয়।
যার মুখে যে ভাষা মানায় নাট্যকার তাই তার মুখে বসিয়েছেন, তবে মিশ্রণ ঘটেছে বহুক্ষেত্রেই। মৈত্রেয়-শকার, মৈত্রেয়-কুম্ভীলক, শকার-চেট, শকার-বিট, সভিক-দ্যূতকর-দর্দুরক, বীরক-চন্দনক, আহীন্ত-গোহ—কত সংলাপ আর কী জীবন্ত সেই সংলাপ। শর্বিলক নিজের গুণগান করতে গিয়ে বলেছে ‘বাগ্ দেশভাষান্তরে’– আমি বিভিন্ন দেশি-ভাষায় সরস্বতী। এ তো শূদ্রকের নিজেরই কথা! তাই তো তিনি ওরকম আশ্চর্য-স্বাভাবিক সংলাপ রচনা করতে পারেন। সংস্কৃতায়িত রূপের মধ্যে এইসব সংলাপের রস অলভ্য, তাই প্রাকৃতের দিকে চোখ রেখেই এর অনুবাদ করতে হয়েছে, কারণ মূল বাগ্বিধি বা ইডিয়ম আছে সেইখানেই। এই প্রসঙ্গে আপনি-তুমি-তুই’ সমস্যা দেখা দিয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। মূলে একই পাত্রকে ‘ত্বং’ ও ‘ভবান্’ বলা হচ্ছে, তাই তা দেখে বুঝাবার উপায় নেই, বুঝতে হবে তার পারিবারিক বা সামাজিক মর্যাদা (স্ট্যাটাস) দেখে। সেখানেও সংশয় দেখা দিয়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’তে নেমে এসেছি যেখানে বচসাটি শেষপর্যন্ত মুদারা থেকে তারা গ্রামে পৌঁছেছে।
অনেক শব্দই ভাবিয়ে তুলেছে, যেমন ‘শলাবকে’। কেউ বলেছেন এর সংস্কৃত রূপ হবে ‘চার্বাকঃ’, কেউ বলছেন ‘শরাবকঃ’, কেউ বলছেন ‘শ্রাবকঃ’। এসব ক্ষেত্রে যেটি ভাষাতত্ত্বসম্মত এবং প্রসঙ্গের সঙ্গে যার বেশি সম্পর্ক সেইটিই গ্রহণ করেছি। বহু শাস্ত্রবিদ নাট্যকারেরা বিচিত্র পরিবেশ ও জনসমাজের বর্ণনায় এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করেছেন যা নিয়ে মতান্তরের অবকাশ আছে। প্রসঙ্গকথায় এ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এর পরের কথা সমাস-সমস্যা। মহামহোপাধ্যায় হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ মহাশয় মৃচ্ছকটিকের ভাষারীতি সম্বন্ধে বলেছেন ‘বাহুল্যেন বৈদভী রীতিঃ’। ‘অল্পবৃত্তিরবৃত্তি বা বৈদভী রীতি রিষ্যতে’। কিন্তু মাঝে মাঝে ‘সমাসভুয়স্তম্’ বেশ সমস্যাতেই ফেলেছে। একটু ভাঙচুর করতেই হয়েছে। নান্দী শ্লোকটি বৈদগ্ধ্যদীপ্ত হলেও অনুবাদকের পক্ষে তা নান্দী অর্থাৎ আনন্দপ্রদ হয়ে ওঠেনি। পর্যঙ্কগ্রন্থিবন্ধদ্বিগুণিত-ভুজগাশ্লেষ-সংবীত জানোঃ ইত্যাদি শ্লোকাংশকে ভুজগাশ্লেষ বলেই মনে হয়েছে। এই আশ্লেষ ছাড়াতে যে বেগ পেতে হয়েছে তা অকপটে স্বীকার্য।
ভাষান্তর করতে গিয়ে ভাসের চারুদত্তের কথা অনেক ক্ষেত্রে (চতুর্থ অঙ্ক পর্যন্ত) মনে পড়েছে। প্রসঙ্গকথায় যথাস্থানে তা আলোচনা করেছি। গতানুগতিকতার বাধন-ছেঁড়া এই নাটকটি, যাকে বলা হয়েছে ‘the most Shakespearian of all Sanskrit plays’ ভাষা ও সাহিত্যপ্রেমিকদের কাছে এক রত্নখনি। জিজ্ঞাসু বিদ্যার্থীর মন নিয়েই নাটকটিকে ভাষান্তরিত করতে চেষ্টা করেছি। মনে হচ্ছে, একটা শর্করাখণ্ডকে নাড়তে গিয়ে ভেঙে ফেললাম। তবে ভরসা এই— ‘জয়ি সক্কর সয় খণ্ড থিয় তো ইস মিঠী চুরি’— শর্করা শত খণ্ড হলেও তার চূর্ণ মাধুর্য ত্যাগ করে না।
জ্যোতিভূষণ চাকী
.
সূক্তিরত্নাবলী
(বর্ণানুক্রমিক, বন্ধনীর অন্তর্গত সংখ্যা অঙ্ক-নির্দেশক)
অপবাদ এব সুলভো দ্রষ্টগুণো দূরতঃ। (৯)
(বিচারকের অপবাদই সুলভ, তার গুণ অনেক দূরে অর্থাৎ কারো চোখে পড়ে না)
অপেয়েষু তড়াগেষু বহুতরমুদকং ভবতি। (২)
(যে পুকুরের জল পানের অযোগ্য—তাতেই খুব বেশি জল দেখা যায়)
ঈদৃশো দাসভাবো যৎ সত্যং কমপি ন প্রত্যায়য়তি। (১০)
(দাসত্ব এমন যে সত্য বললেও কেউ বিশ্বাস করে না)
কামো বামঃ। (৫)
(কাম প্ৰতিকূল)
কিং হীনকুসুমং সহকারপাদপং মধুকর্যঃ পুনঃ সেবন্তে? (২)
(যে আমগাছের মুকুলই গেছে ঝরে, মধুকরীরা কি আর তাতে গিয়ে বসে?
কোপেন বিনাহথ বা কুতঃ কামঃ। (৫)
(ক্রোধ ছাড়া কি প্রেম জমে?)
গগনতলে প্রতিবসন্তৌ চন্দ্ৰসূর্যাবপি বিপত্তিং লভেতে। (১০)
(গগনতলবাসী চন্দ্র ও সূর্যও বিপন্ন হয়)
গুণঃ খলু অনুরাগস্য কারণং ন পুনর্বলাৎকারঃ। (১)
(গুণই অনুরাগের কারণ, বলাৎকার নয়)
চিত্তং ন মুণ্ডিতং কিমর্থং মুণ্ডিতম্। (৮)
(চিত্তই যদি কলুষমুক্ত না হল তা হলে মাথা মুড়িয়ে আর কী হবে?)
ছিদ্রেম্বনৰ্থা বহুলীভবন্তি। (৯)
(ছিদ্রপথেই অনর্থেরা দলে দলে আসে)
দুষ্করং বিষমৌষধীকতুম্। (৮)
(বিষকে ওষুধ করা কঠিন)
দ্যূতং হি নাম পুরুষস্যাসিংহাসনং রাজ্যম্। (২)
(জুয়াখেলা হল পুরুষের সিংহাসনহীন রাজ্য)
দ্বয়মিদমতীব লোকে প্রিয়ং নরাণাং সুহৃচ্চ বনিতা চ। (৪)
(সংসারে দুজন মানুষের প্রিয়— বন্ধু আর বনিতা)
ন কালমপেক্ষতে স্নেহঃ। (৭)
(স্নেহ কালের অপেক্ষা করে না)
ন চন্দ্ৰাদাতপো ভবতি। (৪)
(চাঁদ থেকে উত্তাপ আসে না)
ন পুষ্পমোষমহত্যুদ্যানলতা। (১)
(উদ্যানলতার ফুল ছেঁড়া উচিত নয়)
ন যুক্তং পরকলত্রদর্শনম্। (১)
(পরস্ত্রীদর্শন অনুচিত)
পশ্যেয়ুঃ ক্ষিতিপতয়ো হি চারদৃষ্ট্যা। (৭)
(রাজারা চরের চোখ দিয়ে দেখুন)
বহুদোয়া হি শর্বরী। (২)
(রাত্রি বহুদোষময়ী)
শঙ্কনীয়া হি লোকেহস্মিনিষ্প্রতাপা দরিদ্রতা। (৫)
(প্রভাবহীন দারিদ্র্য এ সংসারে সন্দেহের উদ্রেক করে)
সৎকারধনঃ খলু সজ্জনঃ (২)
(সজ্জনদের সম্পদই হল পরহিত)
সর্বং শূন্যং দরিদ্রস্য। (১)
(দরিদ্রের সব শূন্য)
কুশীলব
পুরুষ-চরিত্র
সূত্রধার— নাট্যাধ্যক্ষ
চারুদও— উজ্জয়িনীর বিশিষ্ট নাগরিক, নায়ক
মৈত্রেয়– ব্রাহ্মণ, চারুদত্তের বয়স্য
শকার— রাজশ্যালক, খল-নায়ক (Villain)
বিট [১]— শকার-সহচর
চেট (স্থাবরক)— শকার ভৃত্য
সংবাহক— চারুদত্তের গাত্র-মর্দক ভৃত্য, পরে বৌদ্ধভিক্ষু
শর্বিলক — দুর্ধর্ষ ব্রাহ্মণযুবা, মদনিকার প্রণয়ী
মাথুর (সভিক) – দ্যূত-সভাধ্যক্ষ
দর্দুরক— জনৈক দ্যূতকর
কর্ণপূরক–বসন্তসেনার ভৃত্য
চেট (বর্ধমানক)— চারুদত্তের ভৃত্য
বন্ধুল— বসন্তসেনার গৃহবাসী জারজ
বিট [২] — বসন্তসেনার অনুচর
রোহসেন— চারুদত্তের পুত্র
আর্যক — গোপপুত্র, ভাবী রাজা
বীরক— পালকরাজের প্রধান সেনাপতি
চন্দনক— পালকরাজের সেনাপতি
শোধনক– বিচারালয়ের ভৃত্য
অধিকরণিক— বিচারক
শ্রেষ্ঠী ও কায়স্থ — বিচারালয়ের দুজন কর্মচারী
আহীন্ত ও গোহ— দুজন চণ্ডাল, ঘাতক।
.
স্ত্রী-চরিত্র
নটী — সূত্রধারের স্ত্রী
বসন্তসেনা– নটী
বৃদ্ধা– বসন্তসেনার মা
রদনিকা— চারুদত্তের দাসী
মদনিকা–বসন্তসেনার দাসী
চেটী [২]– বসন্তসেনার আর একজন দাসী
বধূ — চারুদত্তের পত্নী ধূতা
ছত্রধারিণী— বসন্তসেনার পরিচারিকা
চেটী–ধূতার দাসী।
.
উল্লিখিত-চরিত্র
চূর্ণবৃদ্ধ — চারুদত্তের একজন বন্ধু
পালক— উজ্জয়িনীর রাজা, পরে উৎখাত ও নিহত
রেভিল— উজ্জয়িনীর একজন বণিক, চারুদত্তের বন্ধু।
.
ঘটনাস্থল
উজ্জয়িনী নগরী এবং প্রান্তস্থিত পুষ্পকরণ্ডক উদ্যান।


Leave a Reply