সাদাটে সৈন্যর সাংঘাতিক সংকট

সাদাটে সৈন্যর সাংঘাতিক সংকট
[ দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ব্লাঞ্চড সোলজার ]

বন্ধুবর ওয়াটসনের মাথাটি খুব উর্বর নয়–আইডিয়া বেরোয় কদাচিৎ–কিন্তু যখন বেরোয়। তখন তার পেছনে লেগে থাকে ছিনেজোঁকের মতো। অনেকদিন ধরেই ও আমাকে খেয়ে ফেলছে আমাকে দিয়েই আমার একখানা অ্যাডভেঞ্চার লেখানোর জন্যে। মতলবটা সম্ভবত আমিই জুগিয়েছি ওর মাথায়। ওর লেখা নিয়ে কম সমালোচনা তো করিনি। বরাবর বলেছি, লোকরঞ্জনের দিকে না-ঝুঁকে ঘটনার দিকে নজর দাও। ও খেপে গিয়ে বলত, নিজে চেষ্টা করলেই পার। কলম হাতে নিয়ে বুঝছি, লেখাটা পাঠকের মনোরঞ্জন করার মতো করেই লেখা দরকার। আমার ঝুলিতে জমানো সবচেয়ে অদ্ভুত কেসগুলোর একটা বেছে নিয়েছি। ওয়াটসন, আমার জীবনীকার, কিন্তু এ-কেসের বৃত্তান্ত জানে না। ওয়াটসনের নিজস্ব কতকগুলো অত্যাশ্চর্য গুণ আছে। আমাকে নিয়ে রং চড়িয়ে গল্প লিখতে গিয়ে নিজের গুণটা বিনয় সহকারে এড়িয়ে গেছে। স্যাঙাত যদি আপনার মতলব আগে থেকেই আঁচ করে ফেলে তাকে ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত দিয়ে চমকানো যায় না। কিন্তু যে তা পারে না, প্রতি মুহূর্তে সে চমকে চমকে ওঠে। ওয়াটসন ছিল তাই। ভবিষ্যতের খবর সে আঁচ করতে পারত না বলেই সঙ্গী হিসেবে সে আদর্শ–তার লেখার মধ্যেও এই চমকটা ফুটে উঠত এই লাইনে।

ওয়াটসন যে সময়ে স্বার্থপরের মতো বউ নিয়ে ঘরসংসার করবে বলে আমাকে একলা ফেলে গিয়েছিল, এ-কাহিনি তখনকার। ১৯০৩ সালের জানুয়ারি মাসের ঘটনা। বুয়র যুদ্ধ তখন সবে শেষ হয়েছে। আমার ঘরে পায়ের ধুলো দিলেন রোদেপোড়া তাজা চেহারার বিরাটকায় এক ইংরেজ। নাম তার জেমস এম ডড।

জানলার দিকে পিঠ দিয়ে বসে মক্কেলকে সামনের চেয়ারে বসিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করা আমার চিরকালের অভ্যেস। মিস্টার ড্ডকেও বসালাম সেই চেয়ারে। উনি কিন্তু কথা শুরু করবেন কী করে ভেবে না-পেয়ে মহা ধাঁধায় পড়লেন। আমিও কথা ধরিয়ে না-দিয়ে সেই ফাঁকে ভদ্রলোককে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে দু-একটা পিলে চমকানো খবর শুনিয়ে দেব ঠিক করলাম। আমি দেখেছি, এতে কাজ হয় ভালো।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এসেছেন দেখছি?

চমকে উঠে ড্ড বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ।

রাজকীয় অশ্বারোহী স্বেচ্ছাসেবক?

এক্কেবারে ঠিক।

মিডলসেক্স বাহিনী।

ঠিক, ঠিক। মিস্টার হোমস কি গণৎকার!

ভদ্রলোকের ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দেখে মুচকি হেসে বললাম, রোদেপোড়া মুখ দেখলেই বোঝা যায় এ-রোদ ইংলন্ডের রোদ নয়–বিশেষ করে রুমাল পকেটে না-রেখে হাতায় গুঁজে রাখলে পরিষ্কার বোঝা যায় আগমন হচ্ছে কোত্থেকে। খাটো দাড়ি দেখেই বুঝেছি আপনি বারোমেসে সেপাই নন–স্বেচ্ছাসেবক। চেহারার ধার দেখেই বোঝা যায় ঘোড়ায় চড়েন। মিডলসেক্স বাহিনীতে নাম লিখিয়েছেন বুঝলাম আপনার কার্ড থেকে–গ্রুগমর্টন স্ট্রিটের শেয়ারের দালাল আপনি। আরও বাহিনীতে যোগ দেওয়ার মতলব আছে দেখছি?

সবই দেখেন দেখছি।

আপনাকে ছাড়া কিছুই আর দেখিনি। চোখ মেলে সব কিছু দেখবার ট্রেনিং এই চোখ জোড়াকে দিয়েছি। যাকগে সে-কথা, পর্যবেক্ষণ-বিজ্ঞান নিয়ে গল্প করার জন্যে নিশ্চয় সাতসকালে আসেননি। ট্যাক্সবুরি ওল্ড পার্কে কী ঝামেলায় পড়েছেন বলুন।

মিস্টার হোমস–।

আরে মশাই, অমন আঁতকে উঠছেন কেন? এর মধ্যে রহস্য একদম নেই। আপনার চিঠিতে শিরোনাম দিয়েছিলেন ট্যাক্সবুরি ওল্ড পার্ক। দেখাও করতে চেয়েছিলেন খুব তাড়াতাড়ি–ঝামেলায় না-পড়লে এত ধড়ফড় কেউ করে?

তা ঠিক, তা ঠিক। চিঠিখানা লিখেছিলাম বিকেলে। তারপর জল অনেক গড়িয়েছে। কর্নেল এমসওয়ার্থ আমাকে লাথিয়ে বার করে না-দিলে—

লাথিয়ে বার করে দিয়েছেন?

প্রায় তাই। বড়ো দুঁদে লোক মশাই এই এমসওয়ার্থ। কর্নেল যখন ছিলেন, তখনও যা, এখনও তাই। কথাবার্তাও চোয়াড়ে। শুধু গডফ্রের খাতিরেই ভদ্রলোকের সামনে গিয়েছিলাম।

পাইপ ধরিয়ে নিয়ে হেলান দিয়ে বসলাম চেয়ারে। বললাম, খুলে বলুন।

দুষ্টামির হাসি হেসে মক্কেল বললেন, ভেবেছিলাম আপনাকে কিছু খুলে বলতে হয় না–সব বুঝে নেন। যাই হোক, যা-যা ঘটেছে, সব বলছি। সারারাত ভেবেও কূল-কিনারা পাইনি–দেখি আপনি পান কি না।

দু-বছর আগে আমি বাহিনীতে নাম লেখাই। সেই বছরেই একটা স্কোয়াড্রনে নাম লেখায় কর্নেলের ছেলে গডফ্রে এমসওয়ার্থ। বাপকা বেটা লড়াই ওর রক্তেও ছিল। দারুণ বন্ধুত্ব জমে গেল দুজনের মধ্যে। তারপর প্রিটোরিয়ার বাইরে ডায়মন্ড হিলের কাছে হাতিমারা বুলেটের চোট পেল গডফ্রে। কেপটাউনের হাসপাতাল থেকে একবার একটা চিঠি পেলাম–আর একটা পেলাম সাদাম্পটন থেকে। তারপর ছ-মাস কেটে গেছে মিস্টার হোমস আর কোনো চিঠি পাইনি।

যুদ্ধ শেষ হলে পর গডফ্রের বাবাকে একটা চিঠি লিখে ওর খবর জানতে চাইলাম। জবাব পেলাম না। আবার একখানা চিঠি ছাড়তেই কাঠখোট্টা ভাষায় আমাকে জানানো হল গডফ্রে বিশ্বপর্যটনে বেরিয়েছে জাহাজে চেপে ফিরতে সেই এক বছর।

জবাব মনে ধরল না আমার। গডফ্রের মতো ছেলে দোস্তের সঙ্গে এমন ব্যবহার করবে ভাবাও যায় না। আমি জানতাম উত্তরাধিকার সূত্রে বেশ কিছু টাকা পেয়েছে গডফ্রে। এও জানতাম যে বাপের সঙ্গে তার সম্পর্কটা খুব মধুর নয়। বাপের জোর জুলুম সইতে সইতে হাড় কালি হয়ে গিয়েছে গডফ্রের। তাই বাপের জবাব মনে ধরল না আমার। ঠিক করলাম শেষ পর্যন্ত দেখে ছাড়ব। কিন্তু নিজের কাজে এত জড়িয়ে পড়েছিলাম যে সময় করে উঠতে পারিনি অ্যাদ্দিন। দিন সাতেক হল গডফ্রের কেস নিয়ে পুরোদমে মাথা ঘামাচ্ছি–এসপার কি ওসপার করে ছাড়ব।

জেমস ডডের শক্ত চোয়াল আর কঠোর চাউনি দেখে বুঝলাম এ-লোক শত্রু না হয়ে বন্ধু হলেই মঙ্গল।

কী করলেন, তাই বলুন।

প্রথমেই ঠিক করলাম বেডফোর্ডের কাছে ট্যাক্সবুরি ওল্ড পার্কে নিজেই যাব। দেখব ব্যাপারটা কী। চিঠি লিখলাম গডফ্রের মাকে–রগচটা গোমড়ামুখো বাপকে এড়িয়ে যাওয়া মনস্থ করলাম। সোজাসুজি লিখলাম গডফ্রে আমার প্রাণের বন্ধু। তার সম্বন্ধে অনেক কথা বলার আছে আমার। তাই আমি আসতে চাই ট্যাক্সবুরি ওল্ড পার্কে। ভারি মিষ্টি জবাব দিলেন গডফ্রের মা। রাতটা বাড়িতে কাটিয়ে যেতে নেমন্তন্ন করলেন। তাই গত সোমবার গেলাম সেখানে।

ট্যাক্সবুরি ওল্ড পার্কে যেদিক দিয়েই যান না কেন, পাঁচ মাইল হাঁটতেই হবে। স্টেশন থেকে সুটকেস নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন পৌঁছোলাম, তখন সন্ধে হয়ে গেছে। বাড়িটা দেখলাম পেল্লায়–মস্ত পার্কের মাঝখানে পুরোনো আমলের হাজার রহস্যে ঘেরা ছায়াময় থমথমে ইমারত। এলিজাবেথ-আমলের ভিত, ভিক্টোরিয়া-আমলের গাড়িবারান্দা। পর্দা, তৈলচিত্র, কাঠের প্যানেল সব কিছুই কালের মহিমায় জীর্ণ, বিবর্ণ এবং হতশ্রী। খাস চাকরের নাম রালফ–বয়সটা বাড়ির বয়সের সমান বলেই মনে হল। তার বউয়ের বয়স যেন আরও বেশি। গডফ্রের ধাইমা সে। মায়ের মতোই ভালোবাসত গডফ্রে। ভালো লাগল আমারও। ভালো লাগল গডফ্রের মাকেও- ছোটোখাটো সাদা মহিলা–খলবলে ইঁদুরের মতোই চটপটে। পছন্দ হল না কেবল খোদ কর্নেলকে।

প্রথমেই এমন একচোট কস্তাকস্তি হয়ে গেল যে ইচ্ছে হল তৎক্ষণাৎ রওনা হই স্টেশন অভিমুখে। তারপর ভেবে দেখলাম বুড়ো কর্নেলেরও মতলব হয়তো তাই। ঘটনাটা ঘটল এইভাবে।

কর্নেলের ঘরে আমাকে ঢুকিয়ে দেওয়া পর দেখলাম রাজ্যের জিনিস ছড়ানো টেবিলের একপ্রান্তে বসে আমার দিকে জ্বলন্ত ধূসর চোখে তাকিয়ে আছেন ভদ্রলোক। পিঠ ধনুকের মতো বাঁকা, গালে দাড়ির জঙ্গল, বিরাট আকৃতি, চামড়া ধোঁয়াটে রঙের, লাল ধমনী ওঠা নাকটা বেরিয়ে গেছে শকুনির ঠোঁটের মতো, ভুরু দুটো ঝোঁপের মতো নেমে আছে জ্বলন্ত চোখজোড়ার ওপর। এক নজরেই বুঝলাম বাপ সম্পর্কে কেন ওই ধরনের টীকাটিপ্পনী ছাড়ত গডফ্রে ছোকরা।

উখোঘসা গলায় বললেন, বাড়ি বয়ে আসার আসল কারণটা জানতে পারি?

আমি তখন বললাম, চিঠিতে ওঁর স্ত্রীকে কী লিখেছি। উনি সন্দেহ প্রকাশ করলেন সত্যিই আফ্রিকায় থাকার সময়ে আমার সঙ্গে গডফ্রের বন্ধুত্ব ছিল কি না। গডফ্রের লেখা চিঠি বাড়িয়ে দিলাম। উনি পড়ে ফেরত দিয়ে বললেন, তা তো হল, এখন কী চাই?

গডফ্রে এখন কোথায় জানতে চাই?

আপনাকে আগেই একখানা চিঠিতে তা জানানো হয়েছে। জাহাজে করে পৃথিবী দেখতে বেরিয়েছে। যুদ্ধ থেকে ফিরে ওর এখন বিশ্রাম দরকার। সবাইকে তাই বলে দেবেন।

কোন জাহাজ দেশ বেড়াতে বেরিয়েছে, দয়া করে বলুন। চিঠি লিখব।

কর্নেল যেন হকচকিয়ে গেলেন আমার এই প্রশ্নে। কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে বসে থাকার পর যখন মুখ তুললেন, দেখলাম মুখ থমথম করছে। দাবা খেলায় যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর সামনাসামনি কোণঠাসা চালের পালটা চাল যেন ভেবে পেয়েছেন, এমনি সুরে বললেন, আপনার ছিনেজোঁকের মতো কথাবার্তা কিন্তু সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

সেটা আপনার ছেলের প্রতি আমার ভালোবাসার জন্যে।

প্রত্যেক ফ্যামিলির গোপন কথা থাকে বাইরের লোককে তা বলা যায় না। গডফ্রের বর্তমান বা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনোরকম খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আমার স্ত্রীর সঙ্গে কেবল তার অতীত নিয়েই আলোচনা করবেন–তার বেশি নয়।

মিস্টার হোমস, এরপর আর কথা জমল না। খেতে বসেও মুখ গোঁজ করে রইলাম তিনজনে। কর্তা-গিন্নিও হাওয়া স্বাভাবিক করতে পারলেন না। খাওয়া শেষ হতেই অছিলা করে উঠে গেলাম আমার একতলার ঘরে। বাইরে চাঁদ উঠেছে। জানলা খুলে দিয়ে বাগানের দিকে তাকিয়ে হাতের কাছে ল্যাম্প জ্বেলে বসলাম ফায়ার প্লেসের পাশে। এমন সময়ে এল বুড়ো চাকর রালফ। কথায় কথায় বললে, তার স্ত্রী গডফ্রেকে নিজের ছেলের মতোই মানুষ করেছে। সেইদিক দিয়ে গডফ্রের ধর্ম-বাপ বলা যায় তাকে। গডফ্রের কথা উঠতেই আমি তার সাহসের প্রশংসা করলাম। উচ্ছ্বসিত হয়ে রালফ সায় দিলে। ছেলেবেলায় পার্কের হেন গাছ নেই যাতে সে না-উঠেছে। দারুণ ডাকাবুকো ছেলেবেলা থেকেই।

বলল, বড়ো ভালো ছেলে ছিল। কিছুতেই গাছে চড়া আটকাতে পারতাম না। বড়ো হয়েও অমন চমৎকার মানুষ আর ছিল না।

তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বুড়োর কাঁধ খামচে ধরে বললাম, তার মানে? ছিল কেন বলছ? মরে গেলে তো বলে ছিল। কী হয়েছে গডফ্রের? বেঁচে আছে তো?

আমার চাউনির সামনে সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে রইল রালফ। তারপর এক ঝটকায় আমার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, মরলেই বরং ভালো ছিল।

মিস্টার হোমস, মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল এই কথা শুনে। এসে বসলাম চেয়ারে। মাথা হেঁট করে ভাবতে লাগলাম কী বলতে চেয়েছে বুড়ো রালফ। মানে একটাই দাঁড়ায়। নিশ্চয় কোনো গর্হিত কাজ করে ফেলেছে গডফ্রে। ওর বাপ তাই ওকে লুকিয়ে রেখেছে ফ্যামিলির সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে। ঘাড় হেঁট করে এইসব ভাবতে ভাবতে মাথা তুলে দেখলাম, খোলা জানলার ঈষৎ সরানো পর্দার ফাঁকে মুখ ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গডফ্রে এমসওয়ার্থ।

মিস্টার হোমস, সে-মুখের বর্ণনা দেওয়াও আমার পক্ষে কঠিন। জানলাটা মেঝে পর্যন্ত। পর্দার ফাঁকে গডফ্রের পুরো দেহটাই দেখা যাচ্ছিল। তা সত্ত্বেও আমার চোখ আটকে রইল কেবল মুখখানার ওপর। সাদাটে, ফ্যাকাশে, ভ্যাটভেটে, বীভৎস। চোখ তো নয় যেন মড়া তাকিয়ে আছে। শুনেছি ভূতদের মুখ এমনি মড়ার মতো ফ্যাকাশে হয়। কিন্তু গডফ্রের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই চোখজোড়ার মধ্যে প্রাণের সাড়া পেলাম। আমি দেখে ফেলেছি দেখেই পরমুহূর্তেই ছিটকে সরে গেল গডফ্রে।

ভয়ের চোটে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কোনো মানুষের মুখ এমন বিকট সাদা ভ্যাটভেটে ফ্যাকাশে হয় না। পালিয়ে যাওয়াটা কেমন যেন চোরের মতো, মহা অপরাধীর মতো আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। অথচ গডফ্রের ভেতরে লুকোছাপা কোনোকালেই ছিল না। চিরকালই খোলামেলা, পষ্টাপষ্টি চরিত্রের মানুষ সে। কিন্তু হাজার যোক আমি বুয়র যুদ্ধ লড়ে এসেছি, ভয়ে বসে থাকার পাত্র নই। তাই সঙ্গেসঙ্গে লাফিয়ে উঠে ছুটলাম দরজার দিকে। বেয়াড়া ছিটকিনি খুলতেই গেল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বাগানে ধেয়ে গিয়ে গডফ্রেকে আর দেখতে পেলাম না বটে, কিন্তু যেদিকে ছিটকে গিয়েছিল, সেইদিকের পথে গাছপাতা নড়া দেখে মনে হল নিশ্চয়ই ও দৌড়োচ্ছে সেদিকে। আমিও ছুটলাম। নাম ধরে ডাকলাম, এক জায়গায় রাস্তাটা অনেক ভাগ হয়ে গেছে। কোনদিকে যাব ভেবে না-পেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছি, এমন সময়ে স্পষ্ট শুনতে পেলাম সামনের দিকে দরজা বন্ধ করার শব্দ হল। পেছনে নয়–যে-বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটে এসেছি, সে-বাড়ি থেকে নয়–সামনের দিকে। আর কোনো সন্দেহ রইল না। গডফ্রেই আমাকে দেখে পালিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

আমিও ছাড়বার পাত্র নই। যেন বাগান দেখতে বেরিয়েছি এমনিভাবে এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে এগিয়ে গেলাম। অনেকগুলো আউটহাউস চোখে পড়ল। একটা বেশ বড়। মালি-টালির বাড়ি হতে পারে। বাড়িটার সামনে আসতেই কালো কোট আর টুপি পরা, দাড়িওলা ছোটোখাটো চেহারার চটপটে এক ভদ্রলোক দরজা খুলে বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে চাবি রাখলেন পকেটে। ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখেই অবাক হয়ে গেলেন।

আপনি কে?

আমি বললাম আমি কে। গডফ্রের বন্ধু। কিন্তু সে যে দেশ বেড়াতে বেরিয়ে যাবে কে জানত।

শুনে কেমন যেন চোরা গলায় বললেন ভদ্রলোক, তা ঠিক, তা ঠিক, বড়ো অসময়ে এসে পড়েছেন।

বলতে বলতে ভদ্রলোক এগিয়ে গেলেন বটে, কিন্তু আড়চোখে লক্ষ করলাম ঝোঁপের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখছেন আমি কী করছি। আমি তাই বাড়ি ফিরে এলাম। রাত গভীর হতেই চুপিসারে গেলাম আউটহাউসটায়। সব জানলায় পর্দা টানা, খড়খড়ি নামানো। বাড়ি বলেই মনে হয়। কিন্তু একটা জানলায় আলো দেখা যাচ্ছে খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে। কপাল ভালো আমার। জানলার খড়খড়িটা একটু ভাঙা ছিল, পর্দাও একটু ফাঁক ছিল। সে-ফাঁকে চোখ রাখতেই দেখতে পেলাম ঘরের মধ্যে ল্যাম্প জ্বলছে, ফায়ার প্লেসে আগুন লকলক করছে। কালো কোট পরা দাড়িওলা সেই লোকটা জানলার দিকে ফিরে কাগজ পড়ছেন।

এই পর্যন্ত শুনেই প্রশ্ন করলাম, কী কাগজ?

বাধা পেয়ে বিরক্ত কণ্ঠে ড্ড বললেন, তা জেনে কি দরকার আছে?

খুবই দরকার আছে।

অত দেখিনি।

সাইজ কী? দৈনিক কাগজের মতো বড়ো? না, সাপ্তাহিকের মতো ছোটো?

খুব একটা বড়ো নয়। স্পেকটেটর কাগজ হলেও হতে পারে। তখন অত ভাববার সময় বা মনের অবস্থা আমার ছিল না। জানলার দিকে পিঠ করে সে বসে আছে, তার মুখ দেখতে না-পেলেও পিঠের গোলভাব দেখেই বুঝলাম গডফ্রে। বিষণ্ণভাবে চেয়ে আছে আগুনের চুল্লির দিকে। কী করব ভাবছি। এমন সময়ে থাবড়া পড়ল কাঁধে।

ফিরে দেখি, কর্নেল এমসওয়ার্থ। চাপা গলায় ফাঁস করে খালি বললেন, এদিকে আসুন।

এলাম পেছন পেছন–এক্কেবারে আমার শোবার ঘরে। হল ঘর থেকে একটা টাইমটেবিল নিয়ে এসেছিলেন কর্নেল। বাড়িয়ে দিয়ে বললেন রাগ থমথমে গলায়, সকাল সাড়ে আটটায় লন্ডনের ট্রেন–আটটায় গাড়ি আসবে আপনাকে নিতে।

আমি তখন এমন অপ্রস্তুত হয়ে গেছি যে তোতলাতে তোতলাতে গডফ্রে প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে যেতেই উনি ফাঁস করে বলে বসলেন, খবরদার। এ নিয়ে আর কোনো কথা নয়। ফ্যামিলির গোপন ব্যাপারে নাক গলিয়েছেন আপনি। আপনাকে থাকতে দিয়েছিলাম অতিথি হিসেবে–কিন্তু আপনার কাজকর্ম স্পাইয়ের মতো। আর কোনোদিন যেন আপনার মুখ আমাকে দেখতে হয়।

এই শুনেই ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে উঠল প্রচণ্ড রাগে। চিৎকার করে বললাম, আমি আপনার ছেলেকে দেখেছি। তাকে আটকে রাখা হয়েছে। কেন রেখেছেন, তা আপনিই জানেন। কিন্তু তার স্বাধীনতা কেন কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা না-জানা পর্যন্ত আমি আপনাকে ছাড়ব না, কর্নেল এমসওয়ার্থ। এ-রহস্যের তলা পর্যন্ত দেখে ছাড়ব–ভয় দেখিয়ে চোখ রাঙিয়ে আমাকে আটকাতে পারবেন না।

বুড়োর মুখ দেখে মনে হল এবার আমাকে মেরে বসবেন। আগেই বলেছি, চেহারার দিক দিয়ে কর্নেলকে ছোটোখাটো দৈত্য বললেই চলে। আমিও কম যাই না। টক্কর লাগলে একাই লড়ে যেতাম। উনি কিন্তু কটমট করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বোঁ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। আমিও যথাসময়ে গাড়ি আসতেই স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে চেপে সোজা চলে এলাম আপনার কাছে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিলাম আগেই।

জেমস ডডের কাহিনি শুনে পাঠক পাঠিকারাও নিশ্চয় বুঝতে পারছেন সমস্যা সমাধান বেশ দুরূহ। কেসটা কিন্তু বিলক্ষণ ইন্টারেস্টিং।

প্রশ্ন করলাম, বাড়িতে চাকরবাকর ক-জন?

যদ্দূর দেখেছি বুড়ো রালফ আর তার বউ।

আউটহাউসে চাকর নেই?

কালো কোট পরা লোকটাকে কিন্তু চাকর বলে মনে হয়নি–উঁচু জাতের মানুষ বলেই মনে হয়েছে।

খুবই প্রণিধানযোগ্য পয়েন্ট। আউটহাউসে খাবার নিয়ে যাওয়া হয় কি না দেখেছেন?

বললেন বলে মনে পড়ছে। রালফকে ঝুড়ি হাতে ওদিকেই যেতে দেখেছি। তখন অবশ্য মনে হয়নি খাবার নিয়ে যাচ্ছে।

পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছে খোঁজখবর নিয়েছেন?

নিয়েছি। স্টেশন মাস্টার আর গাঁয়ের মোড়লকে জিজ্ঞেস করেছি। দুজনেই বলেছে, গডফ্রে যুদ্ধ থেকে ফিরেই পৃথিবী ভ্রমণে বেরিয়েছে।

আপনার সন্দেহের কথা কাউকে বলেননি?

একদম না।

ভালো করেছেন। আপনাকে নিয়ে ট্যাক্সবুরি ওল্ড পার্কে যাব ভাবছি।

আজ?

হাতে তখন কাজ ছিল। ডিউক অফ গ্রেমিস্টার আর তুর্কির সুলতান দুটি কেস দিয়েছিলেন হাতে। তাই জেমস ড্ডকে নিয়ে রওনা হলাম দিন সাতেক পরে। স্টেশনে পৌঁছে গম্ভীর বদন কঠোর চেহারার এক ভদ্রলোককে দেখিয়ে ড্ডকে বললাম, ইনি আমার পুরোনো বন্ধু, সঙ্গে থাকবেন–দরকার আছে। এর বেশি একটা কথাও আর বললাম না। ওয়াটসন আমার স্বভাব আর তদন্ত পদ্ধতির কথা আপনাদের জানিয়েছে। দরকারের বেশি একটা কথাও তদন্তকালে আমি বলি না–প্ল্যান নিয়ে আলোচনা করি না। জেমস ড্ড একটু অবাক হলেন–কিন্তু কৌতূহল দেখালেন না। ট্রেনে আর একটা কথা জিজ্ঞেস করলাম ভদ্রলোককে।

গডফ্রেকে জানলায় দেখে ঠিক চিনতে পেরেছিলেন তো? একই লোক?

এক্কেবারে। শার্সির কাচে নাক চেপে দাঁড়িয়ে ছিল। ল্যাম্পের আলো মুখে পড়েছিল।

আর কেউ নয়? একরকম দেখতে কেউ?

না।

আপনিই তো বললেন তার সবটাই গডফ্রের মতো নয়?

রংটাই কেবল আলাদা। মাছের তলপেটের মতো ভ্যাটভেটে সাদা মুখ। সব রং নিংড়ে বার করে নেওয়া মুখ।

মুখের আগাগোড়াই কি এমনি সাদাটে?

মনে হয় না। কপালটা কাচে ঠেকে ছিল বলেই স্পষ্ট দেখেছিলাম।

ডেকেছিলেন তখন?

আঁতকে উঠে কাঠ হয়ে গিয়েছিলাম–ডাকবার কথা মনে ছিল না। পরে পেছন পেছন গিয়ে ডেকেছিলাম।

সমাধান পেয়ে গেলাম। রহস্য আর কিছুই নেই। এখন শুধু একটা ঘটনা ঘটানো দরকার উপসংহার টানার জন্যে। ট্যাক্সবুরি ওল্ড পার্কে পৌঁছোলাম গাড়ি ভাড়া করে। গম্ভীর বদন বন্ধুটিকে গাড়িতে বসিয়ে জেমস ড্ডকে নিয়ে গেলাম পেল্লায় বাড়ির সদর দরজায়। দরজা খুলে দিল রালফ–হাতে চামড়ার দস্তানা। আমাদের দেখেই ঝটিতি হল ঘরের টেবিলে দস্তানা খুলে রেখে আমাদের কার্ড নিয়ে গেল কর্নেলের কাছে। সেই ফাঁকে আমি একটা ছোট্ট সন্দেহ ভঞ্জন। করলাম। অদ্ভুত একটা গন্ধ ভেসে আসছিল নাকে। ওয়াটসনের লেখনীর দৌলতে পাঠকপাঠিকারা নিশ্চয় জেনে গেছেন আমার গন্ধেন্দ্রিয় অত্যন্ত প্রখর। গন্ধটা আসছিল হল ঘরের মাঝখান থেকে। টেবিলের ওপর টুপি রেখে তুলে নেওয়ার অছিলায় মাথা হেঁট করে নাকটা নিয়ে এলাম চামড়ার দস্তানা জোড়ার কাছে। গন্ধটা আসছে দস্তানা থেকেই। যেটুকু বাকি ছিল সমাধানকে জোরদার করতে, তাও পেয়ে গেলাম ওই গন্ধের মধ্যে থেকে। ওয়াটসন হলে রহস্য শৃঙ্খলের এই বিশেষ গ্রন্থিটুকু না-জেনেই রহস্যকে রুদ্ধশ্বাসী করে উপস্থাপিত করত। আমাকে করতে হবে জেনেশুনেও তার কথা চেপে রেখে।

কর্নেল ওঁর ঘরে ছিলেন না। কার্ড পেয়ে এলেন দুমদাম করে। প্যাসেজে শুনলাম তার রাগী পায়ের আওয়াজ। পরক্ষণেই ঘরে ঢুকে গাঁক গাঁক করে বললেন, ফের এসেছেন? বললাম না আপনার মুখ দেখতে চাই না? তারপর ফিরলেন আমার দিকে, আপনার সুনাম আমি শুনেছি। ক্ষমতা দেখাতে হয় অন্য জায়গায় দেখান, এখানে নয়।

গোঁয়ার গলায় জেমস ড্ড বললেন, গডফ্রে আগে নিজে বলুক তাকে জোর করে আটকে রাখা হয়নি–তাহলেই যাব—নইলে নয়।

ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজিয়ে হাঁক দিলেন কর্নেল, রালফ! পুলিশকে টেলিফোন করো, দুজন কনস্টেবল পাঠাতে বলো। বাড়িতে চোর ঢুকেছে।

আমি বললাম ড্ডকে, কর্নেল ঠিকই বলেছেন। ওঁর বাড়িতে ওঁর ইচ্ছে না হলে আমরা থাকতে পারি না। কিন্তু আমি যদি কর্নেলের সঙ্গে মিনিট পাঁচেক কথা বলার সুযোগ পাই, তাহলে ব্যাপারটা সরল করে তুলতে পারব।

কোনো কথা নয়। রালফ, হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছ কী? যাও, ফোন করে থানায়।

দরজা আটকে দাঁড়িয়ে বললাম, সেটি হচ্ছে না। পুলিশ এলে আপনি যা ঢাকতে চাইছেন, তা ফাঁস হয়ে যাবে। বলতে বলতে পকেট থেকে নোটবই বার করে একতাড়া ছেড়া কাগজে একটা কথা লিখে এগিয়ে দিলাম কর্নেলের দিকে আমি এসেছি এইজন্যেই।

ফ্যালফ্যাল করে কাগজটার দিকে চেয়ে রইলেন কর্নেল। বিস্ময় ছাড়া সব অভিব্যক্তিই মুছে গেল মুখ থেকে।

ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, আপনি জানলেন কী করে?

জানাটাই আমার কাজ, আমার ব্যাবসা।

গুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে দাড়ি নিয়ে টানাটানি করে যেন হাল ছেড়ে দিলেন কর্নেল।

বললেন, ঠিক আছে, গডফ্রেকে দেখলেই যদি প্রাণ ঠান্ডা হয় তো তাই হোক। আপনারাই জোর করলেন আমার আর দোষ রইল না। রালফ, মিস্টার গডফ্রে আর মিস্টার কেন্টকে বলো পাঁচ মিনিট পর সবাই আসছি।

পাঁচ মিনিট ফুরোতেই রওনা হলাম রহস্যময় সেই আউটহাউস অভিমুখে। দাড়িওলা খর্বকায় এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিলেন দরজায়। সবিস্ময়ে বললেন, কর্নেল এমসওয়ার্থ, করছেন কী! প্ল্যান যে ভণ্ডুল হয়ে যাবে!

আমি নিরুপায় মিস্টার কেন্ট। চাপের কাছে নতি স্বীকার করা ছাড়া পথ আর নেই। গডফ্রে তৈরি?

হ্যাঁ।

সদলবলে ঢুকলাম ভেতরের ঘরে। আসবাবপত্র মামুলি। ঘরের ঠিক মাঝখানে ফায়ার প্লেসের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি। দেখেই দু-হাত বাড়িয়ে দৌড়ে গেলেন জেমস ড্ড গডফ্রে! গডফ্রে!

হাত তুলে কাছে আসতে নিরস্ত করল গডফ্রে।

বলল, আমাকে ছুঁয়ো না। তফাত থাকো। হ্যাঁ, ফ্যালফ্যাল করে শুধু দেখো! বি স্কোয়াড্রনের সেই স্মার্ট লান্স কর্পোরাল এমসওয়ার্থ আর আমি নই, ঠিক কিনা?

সত্যিই সে-চেহারা অস্বাভাবিক। একককালে দেখতে নিশ্চয় ভালো ছিল, কিন্তু আফ্রিকার রোদে পোড়া বাদামি চামড়ার ওপর অদ্ভুত ছোপ-ছোপ সাদাটে দাগের ফলে বীভৎস দেখাচ্ছে। এখন।

জিমি, এই কারণেই কারো সঙ্গে আমি দেখা করি না।

গডফ্রে, সেই রাতে জানলায় তোমাকে দেখা পর্যন্ত আমি পাগলের মতো হয়ে রয়েছি… সব ব্যাপার খোলসা না-করা পর্যন্ত থাকতে পারিনি।

রালফের মুখে তুমি এসেছ শুনে লুকিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম।

কিন্তু এ-হাল তোমার হল কী করে?

প্রিটোরিয়ার বাইরে ইস্টার্ন রেলওয়ের ওপর লড়াইটার কথা মনে আছে?

হ্যাঁ।

লড়তে লড়তে তিনজন দল থেকে ছিটকে গিয়েছিলাম। দুজন মারা গেল, আমি কাঁধে হাতিমারা বুলেটের চোট খেলাম। ঘোড়া হাঁকিয়ে বেরিয়ে গেলাম বেশ কয়েক মাইল, তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম মাটিতে।

জ্ঞান ফিরে আসার পর দেখলাম রাত হয়েছে। ঠান্ডায় হাড় পর্যন্ত কাপছে। বরফ পড়া ঠান্ডায় এত কষ্ট হয় না–ওখানকার সেই রাত-হলেই-বিতিকিচ্ছিরি-ঠান্ডার অভিজ্ঞতা তোমারও আছে, জিমি। খুব কাহিল লাগছিল নিজেকে। দেখলাম পেছনে একটা বড়ো বাড়ি দেখা যাচ্ছে। কোনোরকমে বুকে হেঁটে পৌঁছোলাম খোলা দরজায়–সিঁড়ি বেয়ে ঢুকলাম একটা বড়ো ঘরে। চোখে তখন ধোঁয়া দেখছি। অস্পষ্ট মনে আছে ঘরে অনেকগুলো বিছানা পাতা–কেউ কোথাও নেই। আমি একটা লাটঘাট বিছানায় শুয়ে আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে তৎক্ষণাৎ ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙল চেঁচামেচি টানাটানিতে। সকাল হয়েছে। আফ্রিকার সূর্য তেজালো রোদ ঢালছে জানলা দিয়ে। ঘরের সব কিছু অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমাকে বিছানা থেকে টেনে নামাবার চেষ্টা করছে মর্কটের মতো একটা অদ্ভুত লোক মাথাটা বাবের মতো প্রকাণ্ড গোল। পেছনে এক দঙ্গল কিম্ভুতকিমাকার লোক দাঁড়িয়ে রগড় দেখছে। এদের দেখেই আমার গা শিরশির করে উঠল। দুঃস্বপ্ন দেখছি কি না বুঝতে পারলাম না। স্বাভাবিক মানুষ কেউ নয়–প্রত্যেকেই বিকৃত, বীভৎস। দোমড়ানো তেউড়োনো হাত পা মুখের এমন চেহারা কোনো জীবন্ত দেহে কখনো দেখিনি। মর্কটের মতো লোকটা বাদামি স্পঞ্জের মতো অদ্ভুত হাত ছুঁড়তে ছুঁড়তে আর ডাচ ভাষায় চেঁচাতে চেঁচাতে আমাকে টেনে নামানোর চেষ্টা করছে, এমন সময়ে ঘরে ঢুকল একজন কর্তাব্যক্তি চেহারার মানুষ। কড়া গলায় ডাচ ভাষায় ধমকে উঠে সরিয়ে দিলেন সবাইকে। টানাহ্যাচড়ায় আমার কাঁধের ফুটো দিয়ে ফের রক্তপাত ঘটছে দেখে ভদ্রলোক কাছে এসে ইংরেজিতে বললেন, এখানে এলেন কী করে! ইস বড্ড রক্ত পড়ছে দেখছি! দাঁড়ান, ব্যান্ডেজ করে দিই। কিন্তু আপনি করেছেন কী! এর চেয়ে যে মৃত্যুও ভালো ছিল। কুষ্ঠরুগির বিছানায় শুয়ে রাত কাটিয়েছেন। এটা যে কুষ্ঠ হাসপাতাল।

জিমি, আমার মনের অবস্থাটা তখন কল্পনা করো। পরে শুনলাম, শত্রুপক্ষ এগিয়ে আসছে দেখে রুগিদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় সরে গেছিলেন ডাক্তার। এখন ব্রিটিশরা জিতেছে দেখে ফিরে এসেছেন। যাই হোক, দিন সাতেক পরে একটু সেরে উঠে চলে এলাম প্রিটোরিয়ার বড়ো হাসপাতালে।

তারপর থেকেই আতঙ্কে ছিলাম, আশা নিরাশায় দুলছিলাম। বাড়ি ফিরে আসার পর কুষ্ঠর লক্ষণ ফুটে বেরোেল মুখে। খবরটা জানাজানি হয়ে গেলে বাড়িছাড়া হতে হবে–কুরুগিদের সঙ্গে আলাদা থাকতে হবে। তাই লুকিয়ে বাড়িতে থাকাই ঠিক করলাম। চাকর দুজন ছাড়া সেবার জন্যে রইলেন মিস্টার কেন্ট–ডাক্তার মানুষ। কাকপক্ষীও যাতে জানতে না-পারে, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল–নইলে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে এমন এক ভয়ংকর পরিবেশে যা ভাবতেও গা ঠান্ডা হয়ে যায়। জানি না বাবা হঠাৎ নরম হল কেন, তোমাদের ডেকে আনল কেন।

আমাকে দেখিয়ে কর্নেল এমসওয়ার্থ বললেন, এই ভদ্রলোকের জন্যে। পকেট থেকে আমার দেওয়া কুষ্ঠ লেখা কাগজটা বার করে বললেন, এতই যখন জেনেছেন ভদ্রলোক, তখন বাকিটাও জানা উচিত, এই ভেবে নিয়ে এলাম তোর কাছে।

আমি বললাম, মিস্টার কেন্ট, আপনি কুষ্ঠরোগে বিশেষজ্ঞ?

একটু শক্ত হয়ে গিয়ে মিস্টার কেন্ট বললেন, মামুলি ডাক্তার আমি।

আপনার যোগ্যতা নিশ্চয় আছে। তবে কী জানেন, এসব ব্যাপারে বিশেষজ্ঞের মতামতের দাম আছে। পাছে রুগিকে ঘরছাড়া করতে হয়, এই ভয়ে আপনারা বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হননি।

তা ঠিক, সায় দিলেন কর্নেল।

তা ভেবেই আমি একজন বিশেষজ্ঞকে সঙ্গে এনেছি–গাড়িতে বসিয়ে রেখেছি। আমার পুরোনো বন্ধু বিশ্বাসের পাত্র। নাম, স্যার জেমস সন্ডার্স।

লর্ড রবার্টস স্বয়ং এসেছেন শুনেও বুঝি এত খুশি হতেন না মিস্টার কেন্ট। বিস্ময় আর আনন্দ উপচে উঠল চোখে-মুখে।

কর্নেল, চলুন আপনার স্টাডিতে বসে, সব ব্যাপারটা বলছি। ইতিমধ্যে স্যার জেমস এসে দেখুক আপনার ছেলেকে।

এরপরের কথাগুলো লিখতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে ওয়াটসনের অভাব অনুভব করছি। সে থাকলে বিস্ময়বোধ, উচ্ছ্বাসোক্তি, চতুর প্রশ্ন দিয়ে আমার এই অতি সহজ বিধিবদ্ধ কমনসেন্সের আর্টকে বেশ একটা উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারত। সে-উপায় আমার নেই। তাই যেভাবে শুনিয়েছিলাম সস্ত্রীক কর্নেলকে ঠিক সেইভাবেই লিখছি সব কথা।

কর্নেল এমসওয়ার্থ, সমস্ত অসম্ভব সম্ভাবনা বাদ দেওয়ার পর যা পড়ে থাকে, তা যত অবিশ্বাস্য উদ্ভটই হোক না কেন–আসলে তাই নির্জলা সত্য। এই সূত্র অনুসারে এ-বাড়িতে গডফ্রে রহস্যর তিনটে ব্যাখ্যা আঁচ করেছিলাম। হয় সে কোনো কুকর্ম করেছে, নয় পাগল হয়ে গিয়েছে, অথবা এমন কোনো ছোঁয়াচে রোগ হয়েছে যার জন্যে তাকে পাঁচজনের থেকে আলাদা করে রাখা দরকার। এখন এই তিনটে সম্ভাবনাকে খুঁটিয়ে করে দেখতে হয় কোনটা সঠিক।

কুকর্ম সম্ভাবনা বাদ দেওয়া যেতে পারে। গা-ঢাকা দেওয়ার মতো বড়ো রকমের কোনো অপরাধ করলে আমার কানে সে-খবর আসতই। পাগল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটা বরং বেশি জোরদার। দরজায় তালা দেওয়া থাকে শুনেই সন্দেহটা বাড়ল। পাগল বলেই তাকে চব্বিশঘণ্টা ঘরবন্দি করে রাখা হয়নি রাত্রে বন্ধুকে দেখতে এসেছিল সেই কারণেই। একজনকে রাখা হয়েছে পাগলের দেখাশুনা করার জন্যেই। সেই মানুষটা যে কাগজ পড়ছিল, তার সাইজটা মিস্টার ড্ডকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেট বা ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালের মতো আকারে ছোটো হলেই সন্দেহ আর সন্দেহ থাকত না। কিন্তু পাগলকে আটকে রাখার মধ্যে এত লুকোচুরি কেন? কাজটা তো বেআইনি নয়? তবে?

তাহলে বাকি রইল শেষ সম্ভাবনাটা। সব রহস্যের সমাধান পাওয়া গেল ওই সম্ভাবনার মধ্যে। দক্ষিণ আফ্রিকায় কুষ্ঠরোগ খুব একাট বিরল রোগ নয়। গডফ্রে হয়তো এই রোগ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। জানাজানি হলেই তাকে কুষ্ঠরোগীদের সঙ্গে আলাদা থাকতে হবে এই ভয়ে জানাশুনো এক ডাক্তারের হেপাজতে বাড়িতেই রাখা হয়েছে শুধু রাত্রে বাগানে বেড়ায় কেউ দেখতেও পায় না। এ-রোগে চামড়া সাদাটে হয়ে যায়। প্রমাণটা পেলাম এ-বাড়ি এসে রালফকে চামড়ার দস্তানাপরা হাতে খাবারের ঝুড়ি নিয়ে যেতে দেখে। নিশ্চয় ছোঁয়াচে রোগের ভয়ে দস্তানা-পরা হয়েছে। নাকে জীবাণুনাশকের গন্ধ আসতেই দস্তানা শুকে দেখলাম অ্যান্টিসেপটিক লাগানো রয়েছে তাতে। এ-সম্ভাবনাটাই যে একমাত্র সম্ভাবনা, সে-বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম বলেই আসবার সময়ে সঙ্গে এনেছিলাম বিশেষজ্ঞকে আপনাকেও কাগজে লিখে জানিয়েছিলাম মিছে গোপনতা–সব জেনে গিয়েছে। আমার কথা শেষ হতে-না-হতেই ঘরে ঢুকলেন সুবিখ্যাত চর্মরোগ বিশারদ। এখন আর ততটা গম্ভীর আর কঠোর নন–কৌতুকের রোশনাই ভাসছে চোখে। সোজা এগিয়ে গিয়ে কর্নেলের হাত ধরে বেশ করে ঝাঁকুনি দিলেন।

বললেন, সবসময়ে বদ সংবাদ আমি আনি না ভালো খবরও আনি। যেমন এনেছি এখন। রোগটা কুষ্ঠরোগ নয়।

কী বললেন?

এ হল ছদ্ম কুষ্ঠ বা ইকথিয়োসিম। চামড়ার খোসা ওঠা অবস্থা। বড়ো ছ্যাচড়া রোগ। কিন্তু সারানো যায় এবং ছোঁয়াচে মোটেই নয়। কিন্তু এ বড়ো অদ্ভুত কাকতালীয় মিস্টার হোমস। কাকতালীয় কি না সে-বিষয়েও সন্দেহ হচ্ছে আমার। অনেক জিনিসই জানি না আমরা। গডফ্রে। এমসওয়ার্থও কি স্রেফ ভয়ে সিটিয়ে থেকে রোগের লক্ষণ ফুটিয়ে তুলেছে চামড়ায়? কে জানে! আমার বিদ্যেবুদ্ধি অনুসারে অবশ্য আরে! ভদ্রমহিলা যে অজ্ঞান হয়ে গেলেন! মিস্টার কেন্ট বরং ওঁর সঙ্গে থাকুন আনন্দের ধাক্কা কাটিয়ে না-ওঠা পর্যন্ত কাছছাড়া হবেন না।

————-

টীকা

সাদাটে সৈন্যর সাংঘাতিক সংকট : দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ব্লাড সোলজার নভেম্বর ১৯২৬-এর স্ট্যান্ড ম্যাগাজিনে এবং আমেরিকার লিবার্টি পত্রিকার ১৬ অক্টোবর ১৯২৬ তারিখের সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়।

কলম হাতে নিয়ে বুঝেছি : কোনো কোনো গবেষক মনে করেছেন শার্লক হোমসের বকলমে ড. ওয়াটসন কিংবা আর্থার কন্যান ডয়াল লিখেছেন এই গল্পটি। কারণ, হোমসের লেখা হত কাঠখোট্টা প্রবন্ধ-গগাছের। তা ছাপা হত কোনো বিশেষ জার্নালে।

বুয়র যুদ্ধ : দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ এবং ওলন্দাজদের জমি দখলের লড়াই।

সময় : ১৮৯৯ থেকে ১৯০২। ওলন্দাজ ভাষায় বুয়র (BOER) শব্দের অর্থ কৃষক।

রাজকীয় অশ্বারোহী স্বেচ্ছাসেবক : ১৭৯৪-এ সংগঠিত ইয়োমনরি ক্যাভালরির নাম ১৯০১-এ বদলে ইম্পিরিয়াল ইয়োমেনরি করে দেওয়া হয়।

মিডলসেক্স কাহিনি : মিডলসেক্স (ডিউক অব কেম্ব্রিজস হাসার্স) ইয়োমনরি ক্যাভালরিকে বলা হত মিডলসেক্স কোর। ১৯০১-এ এই বাহিনীর নাম হয় মিডলসেক্স ইম্পিরিয়াল ইয়োমেনরি এবং ১৯০৮-এ ফার্স্ট কাউন্টি অব লন্ডন ইয়েমেনরি।

প্রিটোরিয়া : সাউথ আফ্রিকান ট্রান্সলের পূর্বতন রাজধানী প্রিটোরিয়া শহরের পত্তন ১৮৫৫ সালে বুয়র নেতা আন্দ্রিস প্রিটোরিয়াসের নামে। বুয়র যুদ্ধের সময়ে ইংলন্ডের মর্নিংপোস্ট কাগজের সংবাদদাতা উনিস্টন চার্চিল এই শহরে গ্রেপ্তার হলেও পরে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। পরবর্তীযুগে ইংলন্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের স্মৃতিচারণে প্রিটোরিয়া সম্পর্কে বহু তথ্য জানা যায়।

ডায়মন্ড হিল : ব্রিটিশ বাহিনীর প্রিটোরিয়া দখলের ঠিক পরে ১৯০০ সালের ১১ এবং ১২ জুন ডায়মন্ড হিলের যুদ্ধ সংগঠিত হয়।

তুর্কির সুলতান : তুর্কির সমসাময়িক সুলতান ছিলেন দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ (১৮৪২-১৯১৪)। ১৮৭৬-এ পূর্ববর্তী সুলতান পঞ্চম মুরাদ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার সুযোগে তার ভাই আব্দুল হামিদ ক্ষমতা দখল করেন।

ফোন করো : লন্ডনের প্রথম টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপিত হয় ১৮৭৯-তে। ১৯০২ সালে ন্যাশনাল টেলিফোন কোম্পানির গ্রাহক সংখ্যা ২৫০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া পাঁচ হাজারের বেশি পোস্ট অফিসেও টেলিফোন পৌঁছেছিল।

ইস্টার্ন রেলওয়ে : খুব সম্ভব ইস্ট আফ্রিকান রেলওয়ে।

কুষ্ঠরোগীর বিছানায় শুয়ে : বিশেষজ্ঞরা বলেন, কুষ্ঠরোগীর বিছানায় শুয়ে একরাত কাটালেই যে রোগ সংক্রামিত হবে, সেই সম্ভাবনা খুবই কম।

লর্ড রবার্টস : ফ্রেডরিক স্নে রবার্টস বা ফার্স্ট আর্ল রবার্টস অব কান্দাহার (১৮৩২-১৯১৪), ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ফ্রিড মার্শাল ছিলেন। ভারতের সিপাহী বিদ্রোহে তাঁর অবদানের জন্য ভিক্টোরিয়া ক্রসে ভূষিত হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *