খেলোয়াড়ের খেলায় অরুচি

খেলোয়াড়ের খেলায় অরুচি
[ দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য মিসিং থ্রি-কোয়ার্টার ]

বেকার স্ট্রিটের ঠিকানায় দুর্বোধ্য বিদঘুটে টেলিগ্রাম পাওয়ায় মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম আমরা। কিন্তু একটা কথা আমার বিশেষ করে মনে আছে। বছর সাত-আট আগে ফেব্রুয়ারির এক বিষণ্ণ সকালে টেলিগ্রামটা এসে পৌঁছোয় আমাদের হাতে। এবং তা পাওয়ার পর ঝাড়া পনেরো মিনিট রীতিমতো হকচকিয়ে বসে রইল মি. শার্লক হোমস। টেলিগ্রামটা এসেছিল তারই নামে :

দয়া করে আমার জন্যে অপেক্ষা করুন, ভয়ানক দুর্দৈব। রাইট উইং থ্রি-কোয়ার্টার* নিরুদ্দেশ। আগামীকাল অপরিহার্য।–ওভারটন।

পোস্টমার্ক স্ট্র্যান্ডের, ছাড়া হয়েছে সাড়ে দশটায়, টেলিগ্রামটা বার বার পড়তে পড়তে বলল হোমস। পাঠাবার সময়ে মি. ওভারটন বাস্তবিকই বিলক্ষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে সৃষ্টি হয়েছে এই অসংলগ্ন তারবার্তার। বেশ, বেশ, আমার তো মনে হয় টাইমস পড়া শেষ হওয়ার আগেই এসে পড়বেন ভদ্রলোক। তখনই না হয় জানা যাবে এ-ব্যাপারে আদ্যোপান্ত। এই আকালের দিনে হাত-পা গুটিয়ে জড় হয়ে থাকার চাইতে অতি তুচ্ছ সমস্যাকে স্বাগতম জানাব আমি।

যেমনটি আশা করেছিলাম, টেলিগ্রাম আসার একটু পরেই পৌঁছে গেলেন তারপ্রেরক স্বয়ং। কার্ডে নাম দেখলাম, মি. সিরিল ওভারটন, ট্রিনিটি কলেজ, কেম্ব্রিজ। আর তারপরেই দোরগোড়ায় আবির্ভূত হলেন নিরেট হাড় আর মাংসপেশি দিয়ে গড়া পাক্কা ষোেলো টন ওজনের এক অতিকায় যুবাপুরুষ। দুই বিশাল কাঁধ মেলে দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে ক্রমান্বয়ে আমাদের দুজনের ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন তিনি। সুশ্রী সুন্দর মুখে দেখলাম উদবেগজনিত বিভ্রান্তি আর বিহ্বল শীর্ণতা।

মি. শার্লক হোমস?

মাথা নীচু করে অভিবাদন জানাল আমার বন্ধু।

আমি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে গেছিলাম, মি. হোমস। ইনস্পেকটর স্ট্যানলি হপকিনসের সাথে দেখা করেছিলাম। তিনি আমায় পরামর্শ দিলেন আপনার কাছে আসতে। তাঁর মতে কেসটা সরকারি

পুলিশবাহিনীর আওতায় যতটা না পড়ুক, তার চেয়ে বেশি পড়ে আপনার এক্তিয়ারে।

দয়া করে বসুন, তারপর বলুন কী ব্যাপারে আপনার আগমন।

ব্যাপার অতি ভয়ংকর, মি. হোমস, এক কথায় বলতে গেলে অতি ভয়ংকর! আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি, ভাবনার চোটে আমার চুলগুলো এখনও সাদা হয়ে যায়নি কেন! গডফ্রে স্টনটন নিশ্চয় তার নাম শুনেছেন আপনি? আমাদের টিমের মেরুদণ্ড সে–গোটা টিমটার খেলা নির্ভর করে তার উপর।

ঘটনাটা এইভাবে ঘটে, মি. হোমস। কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির রাগবি টিমের ক্যাপ্টেন আমি। আমার দলের সেরা খেলোয়াড় হল গডফ্রে স্টনটন। আগামীকাল অক্সফোর্ডের সাথে আমাদের খেলা। গতকাল দলবল সমেত এসে উঠলাম বেন্টলির এক প্রাইভেট হোটেলে। দশটা নাগাদ এক চক্কর ঘুরে দেখে নিলাম প্রত্যেকেই যে যার কোটরে সেঁধিয়েছে কি না। আমার বিশ্বাস, একটা টিমকে চটপটে রাখতে হলে দরকার কড়া ট্রেনিং আর প্রচুর ঘুম। গডফ্রে শুতে যাওয়ার আগে ওর সঙ্গে দু-একটি কথা বললাম। ওকে একটু ফ্যাকাশে আর উদবিগ্ন মনে হল। জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার? ও বললে, সামান্য একটু মাথা রয়েছে। তা ছাড়া দিব্যি সুস্থ ওর শরীর। গুডনাইট জানিয়ে আধঘন্টাটাক বাদে দারোয়ান এসে জানালেন একজন রুক্ষ চেহারার দাড়িওয়ালা লোক একটা চিরকুট নিয়ে আসে গডফ্রের জন্যে। তখনও শুতে যায়নি গডফ্রে। তাই চিরকুটটা নিয়ে যায় ওর ঘরে। গডফ্রে তা পড়ামাত্র এমনভাবে ধপাস করে চেয়ারের ওপর এলিয়ে পড়ে যেন মোক্ষম কোনো চোট পাওয়ায় নাভিশ্বাস শুরু হয়েছে ওর। দারোয়ান তো দারুণ ঘাবড়ে যায় ওর রকম-সকম দেখে। আমাকে ডাকতে আসছিল, কিন্তু গডফ্রে বাধা দেয় ওকে। এক গ্লাস জল খেয়ে সামলে নেয় নিজেকে। তারপর নীচে যায় ও। লোকটা হল ঘরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সঙ্গে দু-একটা কথা বলার পর দুজনেই বেরিয়ে যায় বাইরে। শেষবারের মতো ওদের সম্বন্ধে দারোয়ান যা দেখে তা এই–যে-রাস্তাটা স্ট্র্যান্ডের দিকে গেছে, সেই রাস্তাটা ধরে প্রায় ছুটে চলেছিল ওরা দুজন। আজ সকালে দেখলাম গডফ্রের ঘর শূন্য। বিছানা পর্যন্ত স্পর্শ করেনি। ওর জিনিসপত্র আগের রাতে যেমন দেখে গেছিলাম, ঠিক সেইরকমই আছে, এতটুকু নড়চড় হয়নি। দাড়িওয়ালা আগন্তুক আসার সঙ্গেসঙ্গে এক মুহূর্তের নোটিশেই উধাও হয়েছে সে এবং এখনও পর্যন্ত ওর তরফ থেকে একটা শব্দও এসে পৌঁছোয়নি আমার কাছে। ও যে আর ফিরে আসবে, তা আমার মনে হয় না। গডফ্রে স্টনটন মনে প্রাণে স্পোর্টসম্যান। কাজেই খুব জবরদস্ত কারণ না-থাকলে ট্রেনিং ফাঁকি দেওয়া, ক্যাপ্টেনকে না যোক ভোগান্তিতে ফেলার পাত্র সে নয়। না, না, বেশ বুঝেছি, এই যাওয়াই ওর শেষ যাওয়া। আর কোনোদিনই তাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হবে না।

চোখে-মুখে নিবিড়তম তন্ময়তা নিয়ে এই আশ্চর্য কাহিনি শুনল শার্লক হোমস।

তারপর শুধোলে, এরপর আপনি কী করলেন?

কেম্ব্রিজে টেলিগ্রাম পাঠালাম যদি খবর পাওয়া যায় এই আশায়। উত্তর পেয়েছি। কেউ তাকে দেখেনি।

কেম্ব্রিজে ফিরে যাওয়া কি সম্ভব ছিল তার পক্ষে?

ছিল। রাত সওয়া এগারোটা নাগাদ একটা ট্রেন আছে।

কিন্তু আপনি খোঁজখবর নিয়ে যা জেনেছেন, নিশ্চয় সে ট্রেনে রওনা হয়নি?

না, কেউ তাকে দেখেনি।

তারপর কী করলেন?

লর্ড মাউন্ট-জেমসকে টেলিগ্রাম করলাম।

লর্ড মাউন্ট-জেমসকে কেন?

গডফ্রে মা-বাপ মরা ছেলে। লর্ড মাউন্ট-জেমস তার নিকটতম আত্মীয়–খুব সম্ভব কাকা।

সত্যি? তাহলে তো এ-ব্যাপারে নতুন আলোর হদিশ পাওয়া যাচ্ছে। ইংলন্ডের সেরা ধনীদের অন্যতম লর্ড মাউন্ট-জেমস।

গডফ্রেকেও তাই বলতে শুনেছি।

আপনার বন্ধু তার নিকট আত্মীয়?

হ্যাঁ, তার উত্তরাধিকারী। বুড়োর বয়স প্রায় আশি–গেঁটে বাতের হদ্দ রুগি। শোনা যায়, উনি নাকি আঙুলের গাঁট দিয়ে বিলিয়ার্ড খেলার ছড়ি কিউয়ের ডগা ঘষলেই খড়ি লাগানোর কাজ হয়ে যায়। সারাজীবনে একটা শিলিং দেননি গডফ্রেকে–এমনই হাড়কিপটে। অথচ বুড়ো চোখ বুজলে কানাকড়িটিরও মালিক হয়ে বসবে গডফ্রে।

লর্ড মাউন্ট-জেমসের কাছ থেকে কোনো খবর পেয়েছেন?

না।

লর্ড মাউন্ট-জেমসের কাছে আপনার বন্ধু কী মোটিভ নিয়ে যেতে পারে বলে মনে হয় আপনার?

আগের রাতে জানি না কী-এক দুশ্চিন্তায় ছটফট করছিল ও। এ-দুশ্চিন্তা যদি অর্থ সম্পর্কিত হয়, তাহলে নিকটতম আত্মীয়ের কাছেই এ-সমস্যা নিয়ে যাওয়া খুবই সম্ভব–বিশেষ করে তার যখন অর্থের অভাব নেই। কিন্তু বুড়ো সম্বন্ধে আমি যতদূর শুনেছি, তাতে আমার বিশ্বাস, খুড়োর একটা পেনিও খসিয়ে আনতে পারবে না গডফ্রে। তা ছাড়া বুড়োকে একদম দেখতে পারত না ও। উনি সাহায্য করতে চাইলেও যেত না বলেই মনে হয় আমার।

বেশ, বেশ, সে সমস্যার মীমাংসা শিগগিরই করে ফেলবখন। খুড়োমশাই লর্ড মাউন্ট-জেমসের কাছে যাওয়ারই মতলব যদি আপনার বন্ধুবরের থেকে থাকে তাহলে তো আর একটা জিনিসের ব্যাখ্যা শোনাতে হয় আপনাকে। অত রাতে ওই রুক্ষ লোকটাই-বা এল কেন এবং তার আসার ফলে আপনার বন্ধুটিই-বা এত উত্তেজিত হয়ে উঠল কেন?

দুই হাত মাথা চেপে ধরে সিরিল ওভারটন বললেন, আমি এর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।

হোমস বললে, বেশ, বেশ, কাজকর্মের ঝামেলা আজ আর কিছু নেই, কাজেই আপনার সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে পারলে বিলক্ষণ সুখী হব আমি। একটা কথা বিশেষ করে বলে রাখি। এই তরুণ ভদ্রলোকটির জন্যে আর অপেক্ষা না-করে ম্যাচের প্রস্তুতি শুরু করে দিন। আপনি যা বললেন, নিশ্চয় অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ কোনো দরকারে এইভাবে তাকে উধাও হতে হয়েছে এবং এই দরকারটুকুর জন্যেই এখনও তার আটক থাকা সম্ভব। চলুন, সবাই মিলে একবার হোটেলটা দেখে আসি। এব্যাপারে দারোয়ানটা হয়তো নতুন কিছুর হদিশ দিতে পারে।

দীনহীন নগণ্য সাক্ষীদের ভয় ভাঙিয়ে তাদের সহজ করে তোলার আর্টে মহাওস্তাদ শার্লক হোমস। দেখতে দেখতে গডফ্রে স্টনটনের পরিত্যক্ত ঘরের গোপন পরিবেশে দারোয়ানের পেট থেকে সব কথাই সে নিপুণ কায়দায় বার করে নিলে একে একে। গতরাতে যে-লোকটি দেখা করতে এসেছিল গডফ্রে স্টনটনের সাথে, সে তো ভদ্রলোক ছিলই না, শ্রমিকশ্রেণির লোকও নয়। দারোয়ানের ভাষায় সে একজন নিছক মাঝামাঝি লোক। বছর পঞ্চাশ বয়স। কঁচাপাকা চুল মেশানো ধূসর দাড়ি। সাদাসিদে পোশাক। খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছিল লোকটাকে। চিরকুটটা বাড়িয়ে ধরার সময় থর থর করে লোকটার হাতটা কাঁপতে দেখেছিল দারোয়ান। হল ঘরে নেমে এসে স্টনটন লোকটার সঙ্গে করমর্দন করেনি। শুধু কয়েকটি কথার আদানপ্রদান হয় ওঁদের মধ্যে। তার মধ্যে একটি শব্দ ধরতে পেরেছিল দারোয়ান। তা হল সময়। তার পরেই হন্তদন্ত হয়ে কীভাবে উধাও হন তাঁরা, তা তো আগেই বলা হয়েছে। হল ঘরের ঘড়িতে তখন ঠিক সাড়ে দশটা বেজেছিল।

স্টনটনের বিছানায় বসে হোমস বললে, আচ্ছা, তুমি তো দিনের বেলায় ডিউটি দাও, তাই না?

ইয়েস স্যার। এগারোটায় শেষ হয় আমার ডিউটি।

রাতের দারোয়ান কিছু দেখেনি, কেমন?

না, স্যার। অনেক রাতে একটা থিয়েটার-পার্টি এসেছিল। আর কেউ না।

কালকে সারাদিনই তুমি ডিউটিতে ছিলে?

ইয়েস স্যার!

মি. স্টনটনের কাছে কোনো খবর নিয়ে যেতে হয়েছিল তোমায়?

ইয়েস স্যার। একটা টেলিগ্রাম।

আ! ইন্টারেস্টিং! তখন ক-টা বেজেছিল?

প্রায় ছ-টা।

টেলিগ্রামটা নেওয়ার সময় কোথায় ছিলেন মি. স্টনটন?

এইখানে, তার ঘরে।

উনি যখন টেলিগ্রামটা খোলেন, তখন ছিলে এখানে?

ইয়েস স্যার। যদি কোনো উত্তর নিয়ে যাওয়ার দরকার থাকে তাই অপেক্ষা করছিলাম।

বেশ, বেশ, উত্তর কিছু–?

ইয়েস স্যার। উনি তখুনি লিখে ফেলেন।

তুমি নিয়ে গিয়েছিলে।

না, উনি নিজেই নিয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু তোমার সামনেই লিখেছিলেন বললে না?

ইয়েস, স্যার। আমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর উনি বসে ছিলেন ওই গাঁটরিটার দিকে পেছন করে। ওনার লেখা হলে বললেন, ঠিক আছে, দারোয়ান, আমি নিজেই যাচ্ছি।

কী দিয়ে লিখেছিলেন?

কলম দিয়ে, স্যার।

টেবিলের ওপর ওই যে টেলিগ্রামের ফর্মগুলো রয়েছে, সেটাও কি ওদের মধ্যেই ছিল? ইয়েস, স্যার। সবার ওপরে ছিল।

উঠে দাঁড়াল হোমস। ফর্মগুলো নিয়ে গেল জানলার সামনে। তারপর খুব সাবধানে পরীক্ষা করতে লাগল একদম ওপরের ফর্মটা।

কপাল খারাপ তাই ফর্মটা পেনসিলে লেখেননি মি. স্টনটন, নিরাশ হয়ে দুই কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফর্মগুলো টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল হোমস। নিশ্চয় লক্ষ করেছ ওয়াটসন, পেনসিলে লিখলে কাগজ কুঁড়ে ছাপাটা গিয়ে পড়ে পরের পাতায়। যার ফলে বহুবার বহু সুখময় বিবাহের পরিসমাপ্তি ঘটেছে নিতান্ত দুঃখজনকভাবে। সে যাই হোক, এখানে তো চিহ্নটির বালাই দেখছি না। তবুও আনন্দ হচ্ছে কেন জান? ভদ্রলোক চওড়া-মুখ পালকের কলম দিয়ে লিখেছিলেন ফর্মটা। সুতরাং ব্লটিং প্যাডের ওপর কোনো ছাপ পাব না, এ-রকম সন্দেহ যে আমি করতেই পারছি না। আ, হ্যাঁ, এই যে, যা খুঁজছি তাই!

ব্লটিং পেপারের একটা ফালি ছিঁড়ে নিলে হোমস। তারপর তা আমার দিকে ঘুরিয়ে ধরতেই চোখ পড়ল নীচের বিদঘুটে চিত্র-অক্ষরগুলো :

দারুণ উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন সিরিল ওভারটন, আয়নার সামনে ধরুন ফালিটা।

হোমস বললে, তার দরকার হবে না। কাগজটা খুবই পাতলা। কাজেই উলটো দিকেই পাওয়া যাবে টেলিগ্রামে পাঠানোর খবরটা। এই দেখুন। কাগজটা উলটে ধরতেই আমরা পড়লাম :

[ ভগবানের দোহাই, আমাদের পাশে দাঁড়ান ]

উধাও হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গডফ্রে স্টনটন যে-তারবার্তা পাঠিয়েছে, এইটাই তাহলে সে-খবরের শেষের অংশটা। গোটা খবরটার অন্ততপক্ষে গোটা ছয়েক শব্দ রয়ে গেল আমাদের নাগালের বাইরে। কিন্তু যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে অর্থাৎ ভগবানের দোহাই, আমাদের পাশে দাঁড়ান!–তা থেকে অন্তত একটা জিনিস প্রমাণিত হচ্ছে। তা হচ্ছে এই একটা আসন্ন ভয়াবহ বিপদের করাল ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন, এই তরুণ খেলোয়াড়টি। এ-বিপদ থেকে একজন তাকে বাঁচাতে পারতেন। আমাদের, লক্ষ করেছ তো! আর একজন জড়িয়ে পড়েছে এ-ব্যাপারে। যাকে কিনা অমন দারুণ নার্ভাস অবস্থায় দেখা গেছে, সেই ফ্যাকাশেমুখ, দাড়িওয়ালা লোকটিই এই দ্বিতীয় ব্যক্তি। সে ছাড়া আর কেউ হতে পারে বলে মনে হয় কি! তাই যদি হয়, গডফ্রে স্টনটনের সঙ্গে দাড়িওয়ালার কী সম্পর্ক শুনি? এবং সেই তৃতীয় মানুষটিই-বা কে যার কাছ থেকে কিনা দুজনের প্রত্যেকেই এগিয়ে আসা বিপদের খপ্পর থেকে রেহাই পাবার জন্যে। সাহায্যের প্রত্যাশা করেছেন? আমাদের তদন্ত কিন্তু ইতিমধ্যেই সীমিত হয়ে এসেছে এইটুকু পরিধির মধ্যে।

টেলিগ্রামটা পাঠানো হয়েছিল কার কাছে আমাদের এখন শুধু সেই খবরটা জানা দরকার। মত প্রকাশ করি আমি।

এগজ্যাক্টলি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন। তোমার চিন্তাশক্তির মধ্যে প্রজ্ঞার স্বাক্ষর থাকলেও আগেই তা আমার মাথায় খেলে গেছে। কিন্তু একটা কথা না-বলে পারছি না। যেকোনো পোস্ট অফিসে হনহন করে সটান ঢুকে গিয়ে তুমি যদি অন্য কারো পাঠানো তারবার্তার প্রতিলিপি দেখতে চাও, তাহলে হয়তো কর্মচারীরা বিলক্ষণ গররাজি হতে পারে তোমাকে অনুগৃহীত করার ব্যাপারে। আশা করি, এ-পয়েন্টটা তুমিও ভেবে দেখেছ। এসব ব্যাপারে লাল ফিতের দাপট এত বেশি যে কহতব্য নয়। যাই হোক, সামান্য একটু সূক্ষ্মবুদ্ধি ঘষামাজা কথাবার্তা দিয়েই কাজ হাসিল করা যাবে বলে মনে হয়। মি. ওভারটন, ইতিমধ্যে আপনার সামনেই আমি টেবিলের ওপর ফেলে যাওয়া এই কাগজপত্রগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে চাই।

অনেকগুলো চিঠি, বিল আর নোটবই পড়ে ছিল টেবিলের ওপর। চটপট কিন্তু কাঁপা কাঁপা আঙুল দিয়ে সব কিছু উলটপালটে চকিত অন্তর্ভেদী দৃষ্টি বুলিয়ে পরীক্ষা করে নিল হোমস। তারপর বললে, কিছুই নেই এখানে। ভালো কথা, আপনার বন্ধুর স্বাস্থ্য নিশ্চয় খুবই ভালো ছিল–মানে কোনোরকম গণ্ডগোল ছিল না দেহযন্ত্রে–তাই তো?

লোহার মতো মজবুত আর সুস্থ ওর শরীর।

কোনোদিন উনি অসুস্থ হয়েছেন বলে জানেন আপনি?

একদিনের জন্যেও নয়। বুটের ডগা দিয়ে শট করার ফলে একবার বিছানা নিতে হয়েছিল। আর একবার মালাইচাকি সরে গিয়েছিল। ব্যস, আর কিছু না।

আপনি যতটা মনে করেন, হয়তো ততটা মজবুত উনি ছিলেন না। আমার মনে হয় কোনো গোপন অসুখ তাঁর থাকলেও থাকতে পারে। তাই আপনার সম্মতি নিয়ে দু-একটা কাগজ পকেটস্থ করছি। বলা যায় না, ভবিষ্যৎ তদন্তে কাজে লেগে যেতে পারে।

ঠিক এই সময়ে খিটখিটে গলায় কে চেঁচিয়ে উঠল, সবুর! সবুর! তাকিয়ে দেখি আজব চেহারার একজন খর্বকায় বুড়ো দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে হাত বেঁকিয়ে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি জুড়েছেন। লোকটার পরনে কুচকুচে কালো পরিচ্ছদ। চিমটি কাটলে ধুলো উঠে আসে এমন ময়লা। মাথায় বেজায় চওড়া কিনারাওলা সিল্কের লম্বা টুপি। গলায় ঢিলেঢালা সাদা নেকটাই। সব মিলিয়ে মিশিয়ে বাহার যা খুলেছে যে দেখলে পরে মনে হয় নিশ্চয় কোনো অভব্য অমার্জিত গাঁইয়া। অথবা সমাধির ব্যবস্থা যারা করে তাদের ভাড়া করা কান্নাওয়ালা। কিন্তু এ-রকম নোংরা বিদঘুটে চেহারার লোকটার স্বরে এমন একটা আতীক্ষ্ণ টংকার ছিল, হাবভাবের এমন একটা চকিত তীব্রতা ছিল যে তা জোর করে মানুষের মনোযোগ আদায় করে তবে ছাড়ে।

আরে, মশাই, আপনি কে শুনি? আর কীসের অধিকারেই-বা এই ভদ্রলোকের কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছেন? শুধোলেন বৃদ্ধ।

আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। এই ভদ্রলোকের অদৃশ্য হওয়ার একটা ব্যাখ্যা খুঁজে বার করছি মাত্র।

ওহো, তাই নাকি? কার নির্দেশে চেষ্টা করছেন শুনি?

এই ভদ্রলোকের নির্দেশে। ইনি স্টনটনের বন্ধু। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এঁকে সুপারিশ করেছিলেন আমার সাহায্য নেবার জন্যে।

আপনি কে, মশাই?

আমি সিরিল ওভারটন।

তাহলে আপনিই আমায় টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। আমার নাম লর্ড মাউন্ট-জেমস। খবর পেয়েই চটপট চলে এসেছি। বেইজওয়াটারের বাসে আসতে যতটা সময় লাগে, ঠিক ততটুকু সময় গেছে আমার এসে পৌঁছোতে। আপনিই তাহলে ডিটেকটিভ নিয়োগ করেছেন?

খরচ বহন করতে আপনি প্রস্তুত তো?

আমার বন্ধু গডফ্রেকে খুঁজে বার করার পর সে-ই সে-খরচটা দিয়ে দেবে, সে-বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহই নেই, স্যার।

কিন্তু যদি কস্মিনকালেও খুঁজে না পাওয়া যায়, আঁ? উত্তর দিন এ-প্রশ্নের?

সেক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে তার পরিবারই—

ওসব কিচ্ছু হবে না মশাই, কিচ্ছু হবে না! গলা চিরে চিলের মতো চিৎকার করে ওঠেন খর্বকায় বৃদ্ধ। একটা কানাকড়িও আমার কাছে পাবেন না–ভুলেও সে-প্রত্যাশা করবেন না আপনি একটা কানাকড়ির জন্যেও নয়! বুঝেছেন তো, মি. ডিটেকটিভ! ওই ছোকরার আত্মীয়স্বজন বলতে শুধু আছি আমি। এবং পরিষ্কার বলে রাখছি এজন্যে আমি কোনো দায়িত্ব নিচ্ছি না। আমি কখনো পয়সার অপব্যয় করি না। সেইজন্যেই হয়তো তার অনেক আশা আকাঙ্ক্ষা থেকে থাকতে পারে। কিন্তু এখন আর নতুন করে অপব্যয় শুরু করার অভিপ্রায় আমার নেই। আর ওই যে কাগজগুলো নিয়ে স্বচ্ছন্দে নাড়াচাড়া করছেন, ওর মধ্যে যদি মূল্যবান কিছু থাকে তো বলে রাখছি আপনাকেই জবাবদিহি করতে হবে সেসবের জন্যে।

শার্লক হোমস বললে, ভেরি গুড, স্যার। ইতিমধ্যে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারি? এই তরুণটির অন্তর্ধান সম্পর্কে আপনার নিজস্ব কোনো থিয়োরি আছে কি?

না মশাই, নেই। যথেষ্ট লম্বা-চওড়া হয়েছে সে এবং নিজের ভালোমন্দ বোঝবার মতো বয়েসও হয়েছে। এখন যদি নিজেকে হারিয়ে ফেলার মতো মহামূখ হয়ে থাকে সে, তো আমি তাকে গোরুখোজা করার কোনোরকম দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত নই।

আপনার অবস্থাটা বেশ বুঝছি আমি, বলে হোমস। দুষ্ট বুদ্ধি মিটমিট করে ওঠে ওর দুই চোখে। আপনিও হয়তো আমার অবস্থাটা উপলব্ধি করতে পারবেন। গডফ্রে স্টনটনকে গরিব মানুষ বলেই মনে হচ্ছে। কাজেই তাকে যদি গুম করাই হয়ে থাকে, তবে তা নিশ্চয় তার নিজস্ব সম্পত্তির জন্যে করা হয়নি। আপনার ধন-বিভবের সুখ্যাতি সাগরপারেও পৌঁছেছে, লর্ড মাউন্ট-জেমস এবং সেইজন্যেই হয়তো আপনার ভাইপোকে একদল চোর-ডাকাত নিজেদের খপ্পরে এনে ফেলেছে আপনার বাড়ি, আপনার রোজকার অভ্যাস আর আপনার দৌলতের খবরাখবর আদায় করার জন্যে। আমার বিশ্বাস, এমনটি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

দেখতে দেখতে নেকটাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল খর্বকায় বুড়োর ত্রাসকম্পিত মুখখানা।

হায় ভগবান, এ কী ধারণা! এ-রকম শয়তানির কথা যে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি আমি! দুনিয়ায় এ-রকম অমানুষিক বদমাশের দলও আছে! কিন্তু গডফ্রে ছেলেটি খাসা–ভারি দুঁদে আর শক্ত ছেলে। কাকাকে পথে বসানোর মতো কাজ শত প্রলোভন দেখালেও তাকে দিয়ে করানো যাবে না। আজই সন্ধ্যায় মালকড়ি ব্যাঙ্কে সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করছি। ইতিমধ্যে আপনি চেষ্টার কসুর করবেন না, মি. ডিটেকটিভ! আমার অনুরোধ, ছেলেটিকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্যে কিছুই করতে বাকি রাখবেন না আপনি। আর টাকা? বেশ, পাঁচ পাউন্ড, এমনকী দশ পাউন্ড

পর্যন্ত খরচ করতে প্রস্তুত রইলাম আমি।

বেকায়দায় পড়ে বেশ দমে গেছিলেন বুড়ো লর্ড মাউন্ট-জেমস। কিন্তু তা সত্ত্বেও অভিজাত কৃপণের কাছ থেকে আমাদের কাজে লাগতে পারে এমন কোনো তথ্যই বার করা গেল না। ভাইপোর ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে বিশেষ কোনো খবরাখবর রাখতেন না উনি। দ্বিখণ্ডিত টেলিগ্রামের সূত্র ছাড়া যখন আর কিছুই এল না হাতে, তখন কাগজটার এক কপি নিয়ে হোমস রওনা হল যুক্তি-শৃঙ্খলের দ্বিতীয় গ্রন্থিটির প্রত্যাশায়। লর্ড মাউন্ট-জেমসকে বিদায় দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম আমরা। সিরিল ওভারটন গেছিলেন টিমের অন্যান্য বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে এই আকস্মিক দুর্দৈব সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করতে। হোটেল থেকে একটু এগিয়েই একটা টেলিগ্রাফ অফিস দেখতে পেলাম। বাইরে দাঁড়িয়ে পড়ল হোমস।

বলল, কপাল ঠুকে দেখা যাক, সফল হলেও হতে পারি। অবশ্য সময় থাকলে অনায়াসেই কাউন্টারফয়েলগুলো দেখে নিতে পারতাম কিন্তু সে-পর্যায়ে এখনও আমরা পৌঁছোইনি। এ-রকম ব্যস্তসমস্ত জায়গায় মুখ চিনে রেখে দেওয়া ওদের পক্ষে সম্ভব নয় বলেই তো মনে হয়। সাহসে বুক বেঁধে দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় দাঁড়ায়।

রেলিংয়ের ওদিকে বসে থাকা তরুণীটিকে মধুক্ষরিত কণ্ঠে শুধোল হোমস, আপনাকে বিরক্ত করার জন্যে দুঃখিত। গতকাল যে-টেলিগ্রামটা পাঠিয়েছিলাম তাতে কয়েকটা ছোট্ট ভুল রয়ে গেছে। এখনও কোনো উত্তর না-পাওয়ায় আমার মনে হচ্ছে তলায় হয়তো আমার নামটাই লিখতে ভুলে গেছি। সত্যিই তাই কিনা বলতে পারেন আমায়?

এক তাড়া কাউন্টারফয়েলের ওপর ঝুঁকে পড়ল মেয়েটি।

ক-টায়? শুধোয় সে!

ছ-টার একটু পরেই।

কার নামে?

ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে চকিতে আমার পানে তাকালে হোমস। তারপর, যেন বেজায় গোপনীয় কথা, এমনি সুরে ফিসফিস করে ওঠে, শেষ পঙক্তিতে লেখা ছিল ভগবানের দোহাই। উত্তর না-পাওয়ায় বড়ো উদবিগ্ন রয়েছি।

একটা ফর্ম আলাদা করে ফেললে মেয়েটি।

এইটা। নাম নেই। বলে ফর্মটা কাউন্টারের ওপর পরিষ্কার করে বিছিয়ে ধরে।

হোমস বলে উঠল, তাহলেই দেখুন, এইজন্যেই কোনো উত্তর পাইনি এখনও পর্যন্ত। কী বিপদ! বাস্তবিকই কী নিরেট বোকা আমি। গুডমর্নিং মিস। মন থেকে খামোখা চিন্তার বোঝা নামিয়ে দেওয়ার জন্যে অশেষ ধন্যবাদ! রাস্তায় বেরিয়ে এসে দু-হাত ঘষতে ঘষতে নিঃশব্দে একচোট হেসে নিলে হোমস।

হল? শুধোলাম আমি।

এগিয়ে চলেছি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন, দিব্যি এগিয়ে চলেছি আমরা। টেলিগ্রামখানায় এক ঝলক চোখ বোলাবার জন্যে মোটমাট সাতটা বিভিন্ন পরিকল্পনা এঁটে রেখেছিলাম। কিন্তু একেবারে প্রথমটাতেই যে এইভাবে কেল্লা ফতে করে দেব, তা আশাই করতে পারিনি।

লাভটা কী হল শুনি?

তদন্ত শুরু করার পয়লা নম্বর পয়েন্ট। একটা ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়ি ডাকল ও। দুজনে চড়ে বসার পর বললে, কিংস ক্রস স্টেশন।

রেলপথে ভ্রমণ আছে মনে হচ্ছে?

আমার মনে হয়, এখুনি দুজনের কেম্ব্রিজে যাওয়া দরকার। সবকটা পয়েন্ট থেকেই ওই একটি দিকেরই নির্দেশ পাওয়া যাচ্ছে।

সুপ্রাচীন ইউনিভার্সিটি শহরে যখন পৌঁছোলাম, অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে আশেপাশে। স্টেশন থেকে একটা ঘোড়ার গাড়ি নিলে হোমস। গাড়োয়ানকে হুকুম করল ড. লেসলি আর্মস্ট্রংয়ের বাড়িতে নিয়ে যেতে। মিনিট কয়েক পরেই শহরের জমজমাট অঞ্চলে রাস্তার ওপরেই একটা বাড়ির সামনে গাড়ি থামল। পথ দেখিয়ে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেল বাটলার এবং বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর প্রবেশ করলাম কনসালটিং রুমে। টেবিলের সামনে বসে ছিলেন ড. আর্মস্ট্রং।

আপনার নাম আমি শুনেছি, মি. শার্লক হোমস। আপনার বৃত্তিও আমার অজানা নয়। যেসব বৃত্তিকে আমি কোনোমতেই বরদাস্ত করি না, আপনারটিও পড়ে তাদের মধ্যে।

একটু খোঁজ নিলেই দেখবেন, ডক্টর, এদেশের প্রতিটি ক্রিমিনালের সঙ্গে এই বিষয়ে আপনি একমত, শান্ত স্বরে বললে বন্ধুবর।

আরে মশায়, আপনার বুদ্ধি শক্তি-প্রচেষ্টা যতক্ষণ কেবল অপরাধ নিবারণ করার উদ্দেশ্যেই নিয়োজিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজের যেকোনো ব্যক্তিই তা সমর্থন করবে, প্রতিটি কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের অনুমোদন জানাবে আপনার উদ্যােগ আয়োজনের। যদিও আমার বিশ্বাস এজন্যে সরকারি পুলিশবাহিনীই যথেষ্ট এবং এ-সম্বন্ধে তিলমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই আমার মনে। কিন্তু যখনই আপনি কিনা ব্যক্তিবিশেষের গোপন করে চুপিসারে নাক গলান, যেসব পারিবারিক তত্ত্ব লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেই মঙ্গল, সেগুলিকে খুঁচিয়ে তোলেন এবং আপনার চাইতে বেশি ব্যস্তবাগীশ যেসব পুরুষ, প্রসঙ্গক্রমে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে আসেন, তখনই জানবেন আপনার আবির্ভাবকে উটকো উৎপাত হিসেবেই সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়।

উদাহরণস্বরূপ, এই মুহূর্তে আপনার সঙ্গে আলাপ করার চাইতে একটা গ্রন্থ রচনা করাই শ্রেয় মনে করি আমি।

নিঃসন্দেহে, ডক্টর। কিন্তু তবুও কি জানেন, গ্রন্থ রচনার থেকে এই আলাপটাই হয়তো দেখবেন বেশি প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে। প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলে রাখি। আপনি যে-অভিযোগে এইমাত্র অভিযুক্ত করলেন আমাদের, আমরা কিন্তু ঠিক তার বিপরীতটাই করছি। যেমন ধরুন না কেন, ব্যক্তিগত বিষয় সর্বজনসমক্ষে যাতে প্রকাশ না-পায়, সেই চেষ্টাই করতে এসেছি আমরা–যা হওয়া মোটেই সম্ভব ছিল না, যদি এ-কেস সরকারি পুলিশের হাতে যেত। কেননা তাদের হাতে পৌঁছোনোর পরিণতিই হল সব কিছুই পাবলিকের সামনে উদঘাটিত হয়ে পড়া। আপনি আমায় একজন নিছক অনিয়ত পথ পরিষ্কারক সৈনিক হিসাবেই দেখতে পারেন। এদেশের বৈধ পুলিশ ফোর্সের আগেভাগেই চলে আমার অভিযান। আমি এসেছি মি. গডফ্রে স্টনটন সম্বন্ধে আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে।

কী হয়েছে তার?

আপনি তো তাঁকে চেনেন, তাই না?

সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

আপনি জানেন উনি অদৃশ্য হয়ে গেছেন?

আ, সত্যি! ডক্টরের সুকঠোর মুখের অমসৃণ রেখার বিন্দুমাত্র ভাব পরিবর্তন দেখা গেল না।

কাল রাতে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যান উনি। তারপর থেকে আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তাঁর।

ফিরে আসবে নিশ্চয়।

আগামীকাল ভার্সিটি ফুটবল ম্যাচ।

এসব ছেলেমানুষি খেলাধুলা সম্বন্ধে এতটুকু সমবেদনা নেই আমার। তরুণ গডফ্রের এহেন দূরদৃষ্টি শুনে খুবই আগ্রহ জাগছে সন্দেহ নেই, কেননা ওকে শুধু আমি চিনিই না, পছন্দও করি। কিন্তু ফুটবল ম্যাচ কোনোমতেই আমার এক্তিয়ারে আসে না।

তাই যদি হয় তো মি. স্টনটনের এহেন অন্তর্ধানের তদন্তকার্যে আপনার সমবেদনা আমি দাবি করছি। উনি কোথায়, তা আপনি জানেন?

নিশ্চয় না।

গতকাল থেকে ওঁকে আপনি দেখেননি?

না, দেখিনি।

মি. স্টনটন কি স্বাস্থ্যবান পুরুষ?

নিরেট স্বাস্থ্য তার।

ওঁকে কোনোদিন অসুস্থ হতে দেখেছেন আপনি?

না।

ফট করে ডক্টরের চোখের সামনে এক তাড়া কাগজ মেলে ধরলে হোমস।

তাহলে তেরো গিনির এই রসিদটার একটা ব্যাখ্যা হয়তো পাওয়া যাবে আপনার কাছে। গত মাসে মি. গডফ্রে স্টনটন এ-টাকাটা দিয়েছেন কেম্ব্রিজের ড. লেসলি আর্মস্ট্রংকে। ওঁর টেবিলের ওপর পড়ে থাকা অন্যান্য কাগজপত্রের মধ্যে থেকে এ-রসিদটা তুলে এনেছি আমি।

রাগে লাল হয়ে ওঠে ডক্টরের মুখ।

মি. হোমস, আপনার কাছে এ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা শোনাবার কারণ আছে বলে মনে হয় আমার।

রসিদটা আবার নোটবইয়ের মাঝে রেখে দিলে হোমস।

বলল, এ-সম্বন্ধে জনসাধারণের সামনে আপনার ব্যাখ্যা হাজির করা যদি ভালো মনে করেন তা, দু-দিন আগে হোক আর পরে হোক, তাই হবেখন। আগেই বলেছি আপনাকে, যে-খবর অন্য কেউ দৈনিক কাগজে ছেপে দিতে বাধ্য, আমি তা ধামাচাপা দিয়ে দিতে পারি অক্লেশে। এক্ষেত্রে, আমার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে সব কথা খুলে বললেই সত্যি সত্যি বুদ্ধিমানের কাজ করতেন।

এ-সম্পর্কে কিছুই জানি না আমি।

লন্ডন থেকে মি. স্টনটন আপনাকে কোনো খবর পাঠিয়েছিলেন কি?

নিশ্চয় না।

কী মুশকিল! কী মুশকিল! আবার পোস্ট অফিস! অবসন্নভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল হোমস। গতকাল সন্ধ্যা ছ-টা বেজে পনেরো মিনিটে লন্ডন থেকে মি. গডফ্রে স্টনটন একটা অত্যন্ত জরুরি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন আপনাকে। তার অন্তর্ধানের সঙ্গে এ-টেলিগ্রামের একটা নিগুঢ় সম্পর্ক যে আছে সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না। আর, তবুও কিনা এখনও পর্যন্ত সে-টেলিগ্রাম এসে পৌঁছোয়নি আপনার হাতে? ছিঃ ছিঃ, অত্যন্ত নিন্দনীয় অপরাধজনক গাফিলতি। আমি এখুনি স্থানীয় অফিসে গিয়ে একটা অভিযোগ লিখিয়ে রাখছি।

ছিলেছেঁড়া ধনুকের মতো তড়াক করে টেবিলের সামনে লাফিয়ে উঠলেন, ড. লেসলি আর্মস্ট্রং। নিদারুণ ক্রোধে উত্তেজনায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছিল তাঁর মলিন মুখ।

বললেন, আপনাকে মশাই, একটু কষ্ট দেব। লম্বা লম্বা পা ফেলে চটপট বাড়ির বাইরে সরে পড়ুন। আপনার নিয়োগকর্তা লর্ড মাউন্ট-জেমসকে বলে দেবেন তার সাথে বা তার এজেন্টের সাথে কোনোরকম বাক্যালাপ করার বাসনা আমার নেই। না, না, মশায়, আর একটা কথাও নয়। খেপে গিয়ে ঢং ঢং করে দারুণ জোরে ঘণ্টা বাজাতে লাগলেন ডক্টর। জন, এই ভদ্রলোকদের বাইরে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দাও। জমকালো চেহারার বাটলার এসে নির্দয়ভাবে দরজা পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল আমাদের এবং তার পরেই এসে দাঁড়ালাম রাস্তায়।

অট্টহাস্য করে উঠল হোমস।

বলল, ড, লেসলি আর্মস্ট্রং বাস্তবিকই জীবনীশক্তিতে ভরপুর কড়াধাতের মানুষ। স্বনামধন্য মরিয়ার্টির তিরোধানের পর তার শূন্যস্থান পূর্ণ করার পক্ষে ডক্টরের চাইতে যোগ্যতর ব্যক্তি আর আমি দেখিনি। অবশ্য ওই পথেই যদি ওঁর প্রতিভা পরিচালনা করতেন, তবেই পাওয়া যেত মরিয়ার্টির উপযুক্ত উত্তরসূরি। যাই হোক, বেচারি ওয়াটসন, আতিথেয়তাশূন্য নির্বান্ধব এই শহরে আমরা এখন আটকে পড়লাম। হাতের কেস পরিত্যাগ না-করে এ-শহর ছেড়ে এক পা-ও নড়তে পারি না। আর্মস্ট্রংয়ের বাড়ির উলটোদিকে ওই ছোট্ট সরাইখানাটা আমাদের চাহিদা মেটানোর পক্ষে আশ্চর্যরকমের উপযুক্ত। সামনের দিকের একটা ঘর দখল করে রাত কাটানোর মতো দরকারি জিনিসপত্র সওদা করার ব্যবস্থা যদি করতে পারি তো সেই অবসরে টুকটাক কয়েকটা তদন্ত করার সময় পাই আমি।

হোমস যা ভেবেছিল, তার চাইতেও যে বিলক্ষণ দীর্ঘ এই কয়েকটি টুকটাক তদন্ত, তা প্রমাণিত হল ন-টা পর্যন্ত সরাইখানায় তারা না ফিরে আসায়। ফ্যাকাশে হয়ে গেছিল বেচারি। বিমর্ষ মুখ হতাশায় শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছিল। সর্বাঙ্গে ধুলোকাদার বিস্তর দাগ। ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় আর ক্লান্তিতে অবসন্ন। রাতের খাওয়া ঠান্ডা হিম হয়ে পড়ে ছিল টেবিলের ওপর। জঠরানল শান্ত করে পাইপ ধরিয়ে বসার পর আবার ফিরে এল ওর অর্ধকৌতুকময় কিন্তু পুরোপুরি দার্শনিক ভাবভঙ্গি। কাজ করবার সিধে পথ ছেড়ে বাঁকা পথ ধরলেই আচার আচরণের মধ্যে ঠিক এমনই দৃষ্টিভঙ্গি ফুটিয়ে তোলাই ওর স্বভাব। ঘোড়ার গাড়ির চাকার শব্দ শুনে উঠে গিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল ও। ঝকঝকে গ্যাসবাতির আলোয় দেখলাম, একজোড়া ধূসর রঙের ঘোড়ায় টানা একটা ব্রহাম গাড়ি দাঁড়িয়ে ডক্টরের দরজার সামনে।

হোমস বললে, তিন ঘণ্টা লাগল। যাত্রা শুরু হয়েছিল সাড়ে ছটায়। ফিরে এলেন এখন। তার মানে এই যে দশ থেকে বারো মাইল ব্যাসার্ধ নিয়ে আঁকা বৃত্ত অঞ্চলের মধ্যেই যাতায়াত করলেন উনি। প্রতিদিন এমনি যাত্রা দিনে একবার তো বটেই, মাঝে মাঝে দুবারও উনি করেন।

যে ডক্টর প্র্যাকটিস করেন, তার পক্ষে তা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়।

কিন্তু আর্মস্ট্রং তো আর সত্যি সত্যি প্র্যাকটিসের ডক্টর নন। উনি কলেজের লেকচারার এবং কনসালট্যান্ট অর্থাৎ বিশেষজ্ঞ। জেনারেল প্র্যাকটিস করাকে থোড়াই পরোয়া করেন উনি। কেননা, এতে মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়, ফলে ক্ষতি হয় তার লেখাপড়ার। সেক্ষেত্রে এত লম্বা লম্বা পাড়ি দেওয়া তাঁর পক্ষে রীতিমতো বিরক্তিজনক। তা সত্ত্বেও কেন তার এত তৎপরতা! এবং রোজ রোজ কাকেই-বা দেখতে যান উনি?

ওঁর কোচোয়ান—

মাই ডিয়ার ওয়াটসন, তার কাছেই আমি প্রথম আগুয়ান হয়েছিলাম কি না, সে-বিষয়ে কি তোমার সংশয় আছে? বদখত স্বভাবচরিত্রের জন্যেই তোক বা মনিবের প্ররোচনাতেই হোক, আমি যাওয়ামাত্র লোকটা একটা কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল আমার পেছনে। ভারি চোয়াড়ে লোক। কিন্তু আমার ছড়িটার চেহারা কারোরই পছন্দ হল না, কুকুরটারও নয়, এবং ওই নচ্ছার লোকটারও নয়। কাজে কাজেই, এ-প্রসঙ্গে যবনিকা পড়ল ওইখানেই। এ-ব্যাপারের পর কোচোয়ানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক এমনই আড়ষ্ট হয়ে উঠল যে আরও কিছু খোঁজখবর নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যা কিছু জেনেছি তা আমাদের এই সরাইখানার উঠোনে একজন বন্ধুভাবাপন্ন স্থানীয় লোকের কাছ থেকে। ডক্টরের রোজকার অভ্যাস-টভ্যাস সম্বন্ধে অনেক খবর তার মুখেই শুনলাম। প্রতিদিন ব্রহাম হাঁকিয়ে যাবার খবর পেলাম তার কাছে। ঠিক এই সময়ে তার কথার যাথার্থ্য প্রমাণ করার জন্যেই গাড়িটা এসে দাঁড়াল দরজার সামনে!

অনুসরণ করলে না কেন?

চমৎকার, ওয়াটসন! আজকের সন্ধ্যায় দেখছি বুদ্ধির আভায় দিব্যি ঝলমল করছ তুমি! মতলবটা আমারও মাথায় এল। লক্ষ করেছ, হয়তো, সরাইখানার ঠিক পাশেই সাইকেলের একটা দোকান আছে। পড়ি কি মরি করে দৌড়ে গিয়ে ঝটিতি একটা সাইকেল দখল করলাম সেখানে। তারপর ব্রহাম গাড়িখানা চোখের আড়ালে পুরোপুরি যাওয়ার আগেই শুরু করলাম অনুসরণ–পর্ব। দ্রুতগতিতে চালিয়ে নাগাল পেলাম গাড়িখানার। তারপর বুদ্ধিমানের মতো শ-খানেক গজ কি ওইরকম দূর থেকে গাড়ির আলো দেখে আঠার মতো লেগে রইলাম পেছনে। দেখতে দেখতে এসে পড়লাম শহরের বাইরে। গাঁয়ের রাস্তার ওপর দিব্যি চলেছে ডক্টরের গাড়ি, ঠিক এই সময়ে একটা নিতান্ত অপমানজনক কাণ্ড ঘটল। হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল সামনের ব্রহাম। বেরিয়ে এলেন ডক্টর আর্মস্ট্রং। দ্রুত পদক্ষেপে এসে দাঁড়ালেন ঠিক যেখানে আমি সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেঁতো হাসি হেসে ভারি চমৎকার অবজ্ঞা ছড়ানো ভঙ্গিমায় বললেন যে, রাস্তাটা যেহেতু বেজায় সরু, সুতরাং তার মনে হয় না আমার সাইকেলকে এগিয়ে যেতে দেওয়ার মতো জায়গা করে দেওয়া সম্ভব হবে তাঁর গাড়ির পক্ষে। এমনভাবে কথাটা বললেন যে, তার চাইতে প্রশংসনীয় আর কিছু থাকতে পারে বলে আমার মনে হল না। ততক্ষণাৎ গাড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলাম আমি। বড়োরাস্তা ধরে বেশ কয়েক মাইল যাওয়ার পর সুবিধামতো একটা জায়গায় থেমে গিয়ে ঘাপটি মেরে রইলাম গাড়িটার আসার প্রতীক্ষায়। কিন্তু তাঁর টিকিটিও যখন দেখতে পাওয়া গেল না, তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে বড়োরাস্তা থেকে বেরিয়ে আসা যে কয়টি শাখা-পথ আছে, তাদেরই একটি ধরে উধাও হয়েছে ব্রুম গাড়ি। আবার বড়োরাস্তা ধরে ফিরে এলাম আমি কিন্তু গাড়ির চিহ্নমাত্র দেখতে পেলাম না। কিন্তু এখন তো তুমিও দেখলে, আমি ফিরে আসার পরেই ফিরে এল গাড়িটা। প্রথম প্রথম, এসব লম্বা গাড়ির সঙ্গে গডফ্রে স্টনটনের অদৃশ্য হওয়ার যে কোনোরকম সম্পর্ক থাকতে পারে, তা ভাববার মতো বিশেষ কারণ আমার মাথায় আসেনি সত্যি। মোটামুটি তদন্ত করতে গেলে যা যা দরকার, শুধু তারই ভিত্তিতে ড. আর্মস্ট্রং সম্পর্কিত সব কিছুরই খোঁজখবর নিতে চেয়েছিলাম আমি। কিন্তু এখন দেখছি যে কেউ তাকে অনুসরণ করছে কি না, সে-বিষয়ে বেশ প্রখর চোখ রেখেছেন উনি, তখন ঘটনাটা বিলক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। এবং এ-রহস্য ভেদ না-করা পর্যন্ত আমি খুশি হব না কোনোমতেই।

কালকে অনুসরণ করতে পারি তাঁকে।

পারি কি? যা ভাবছ অত সোজা নয় হে। কেম্ব্রিজ জেলার মাঠপ্রান্তরের সঙ্গে মোটেই পরিচয় নেই তোমার, গা ঢাকা দেওয়ার এতটুকু অবকাশ দেয় না এ-অঞ্চল। হাতের তেলোর মতো মসৃণ, চ্যাটালো, পরিষ্কার শুধু জমির পর জমি। তা ছাড়া যে-মানুষটার অনুসরণ করেছিলাম; তিনি তো আর হাঁদারাম নন। আজ রাতেই আমায় তা আচ্ছা করে সমঝে দিয়েছেন উনি। আমি ওভারটনকে টেলিগ্রাম করে দিয়েছি। লন্ডনে টাটকা যদি কিছু ঘটে, উনি যেন চটপট সে-খবর পাঠিয়ে দেন আমায়। ইতিমধ্যে আমরা শুধু একটি কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পারি, তা হল ড. আর্মস্ট্রংয়ের গতিবিধির ওপর আমাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা। পোস্ট অফিসের ভালোমানুষ মেয়েটির কৃপায় স্টনটনের পাঠানো জরুরি খবরের প্রতিলিপি দেখেই ড. লেসলি আর্মস্ট্রংয়ের নাম জেনেছিলাম। আমি শপথ করে বলতে রাজি আছি, গডফ্রে স্টনটন এখন কোথায় আছেন, তা ড. আর্মস্ট্রং জানেন। আর উনি যদি সে-খবর রাখেন, আর কায়দা করে আমরা যদি তা না জানতে গারি, তাহলে সে-দোষ আমাদেরই। বর্তমানে স্বীকার না-করে উপায় নেই যে এ-রহস্যের গোলমেলে অংশের চাবিকাঠিটি উনি নিয়ে বসে রয়েছেন। আর আমার স্বভাব তো তুমি জানই, ওয়াটসন এ-রকম অবস্থায় এ-খেলা ছেড়ে আমি সটকান দেওয়ার পক্ষপাতী নই।

কিন্তু পরের দিনও রহস্যের মূল সমাধানের খুব কাছাকাছি পৌঁছোতে পারলাম না আমরা। প্রাতরাশের পর এসে পৌঁছোল একটা চিরকুট। মুচকি হেসে আমার দিকে কাগজটা সরিয়ে দিলে হোমস।

চিরকুটটায় লেখা ছিল :

মহাশয়,

একটা বিষয়ে আপনাদের নিশ্চিন্ত রাখতে চাই আমি। আমার গতিবিধির ওপর নজর রাখবার চেষ্টা করে শুধু সময়ের অপব্যয় করছেন আপনি। গতরাতে নিশ্চয় আবিষ্কার করে ফেলেছেন যে আমার ব্রুহামের পেছনে একটা জানলা আছে। কাজেই, না হোক কুড়ি মাইল সাইকেল চালানোর পর যাত্রাশুরুর জায়গাতেই যদি খালি হাতে ফিরে আসা মনস্থ করে থাকেন তো আমায় অনুসরণ করতে পারেন। এই অবসরে আপনাকে জানিয়ে রাখি, গোয়েন্দাগিরি করে গুপ্তচরের মতো দিনরাত আমার ওপর সজাগ দৃষ্টি রেখেও স্টনটনকে কোনোমতেই সাহায্য করতে পারবেন না আপনি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মি. স্টনটনের সবচেয়ে বড়ো উপকার করতে পারেন যদি আপনারা লন্ডনে গিয়ে আপনার কর্মকর্তাকে রিপোর্ট পেশ করেন যে তার ভাইপোর হদিশ বার করতে আপনারা অক্ষম। কেম্ব্রিজে থাকলে সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কোনো লাভই হবে না আপনাদের।

—ভবদীয়
লেসলি আর্মস্ট্রং

ভারি স্পষ্টবাদী আর সাচ্চা প্রতিপক্ষ এই ডক্টর ভদ্রলোক, বলে হোমস। বেশ, বেশ, আমার কৌতূহলকে খুঁচিয়ে জাগিয়ে দিয়েছেন উনি। সুতরাং ওঁর সান্নিধ্য ত্যাগ করার আগে সত্যিকারের আরও কিছু খবর আমায় জানতেই হবে।

আমি বললাম, দরজায় গাড়ি পৌঁছে গেছে দেখছি। গাড়ির ভেতর উঠেছেন উনি। ওঠবার সময় লক্ষ করলাম আমাদের জানলার ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন ডক্টর। সাইকেল নিয়ে আমি একবার কপাল ঠুকে দেখব নাকি?

না, না, মাই ডিয়ার ওয়াটসন। তোমার বুদ্ধিশক্তির সহজাত তীক্ষ্ণ্ণতা সম্পর্কে যদিও আমার শ্রদ্ধা কিছুমাত্র ফিকে হয়নি, তবুও ওই ধড়িবাজ ডক্টরটার তুমি যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে বলে মনে হয় না আমার। তার চেয়ে বরং আমি গিয়ে আমার নিজস্ব পদ্ধতিমাফিক স্বনির্ভর কয়েকটা অভিযান চালিয়ে কিছু কিছু আবিষ্কার করে আমাদের উদ্দেশ্য সফল করলেও করতে পারি। তাই তোমাকে রেখে যাওয়া ছাড়া তো উপায় নেই, ভায়া। নিরালা নির্জন গাঁয়ের ধারে, যেখানে শহরের হট্টগোল নেই, সেখানে দু-দুজন সন্ধানী আগন্তুককে ঘুরঘুর করতে দেখলে কানঘুসোটা কী পরিমাণে প্রবল হয়ে উঠবে বুঝতেই পারছ। হাটেবাজারে এ নিয়ে আলোচনা হোক, তা আমি চাই না। অনেক কিছু দেখবার জিনিস আছে এ পবিত্র শহরে। তুমি না হয় তারই কিছু কিছু দেখে ফেল, নিঃসন্দেহে বিস্তর আনন্দ পাবে তাতে। আশা করছি সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসব। সঙ্গে আনব এমন রিপোর্ট যাতে আরও সরল হয়ে উঠবে আমাদের অনুসন্ধান পর্ব।

কিন্তু আরও একবার নিরাশ হওয়া লেখা ছিল বন্ধুবরের ললাটে। শ্রান্ত ক্লান্ত দেহে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল রাতের অন্ধকারে।

সারাদিনটা বিলকুল বরবাদ গেল, ওয়াটসন। ডক্টর মোটামুটি যেদিকে গেলেন, সেই দিক বরাবর গিয়ে সারাদিন ধরে কেম্ব্রিজ শহরের ওইদিকের সবকটা গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখেছি। যেসব আড্ডাখানায় গাঁয়ের লোকেরা আসে, বসে পাঁচটা কথা বলে, এইরকম পুঁড়ির দোকানে গিয়ে এন্তার পয়েন্ট লিখেছি আর মিলিয়েছি। খবর সংগ্রহ করার আরও যে কয়েকটা আঞ্চলিক কেন্দ্র আছে, কোথাও টু মারতে বাকি রাখিনি। বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে চক্কর দিতে হয়েছে আমায়। চেস্টারটন, হিসটন, ওয়াটারবীচ আর ওকিংটন–প্রত্যেকটিতে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। এবং প্রতিবারই হতাশ হয়েছি। এ-রকম খোলামেলা ফাঁকা জায়গা শহরের মতো যানবাহন পথচারীর ভিড় যেখানে মোটেই নেই, সেখানে অতবড়ো একটা ব্রুম আর গাড়িতে জোতা দু-দুটো ঘোড়া সবার দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া তো উচিত নয়। আরও একবার টেক্কা মারলেন ডক্টর। আমার নামে টেলিগ্রাম আছে?

আছে। আমি খুলেছি। এই যে ট্রিনিটি কলেজের জেরেমি ডিক্সনের কাছ থেকে পমপিকে চেয়ে নিন। মানে বুঝলাম না।

আরে এ তো জলের মতো পরিষ্কার। আমার একটি প্রশ্নের উত্তরে বন্ধুবর ওভারটনের টেলিগ্রাম এটা। এখুনি একটা চিরকুট পাঠিয়ে দিচ্ছি মি. জেরেমি ডিক্সনকে। তারপরেই যে আমাদের কপাল ফিরে যাবে সে-বিষয়ে আমার আর সন্দেহ নেই। ভালো কথা ম্যাচ সম্বন্ধে কোনো খবর আছে নাকি?

আছে। এখানকার সান্ধ্য দৈনিকের শেষ সংস্করণে বড়ো চমৎকার বিবরণ বেরিয়েছে ম্যাচটার। অক্সফোর্ড এক গোলে জিতেছে আর দুবার প্রতিপক্ষের গোল-লাইনের কাছে সবার আগে বল স্পর্শ করেছে। সবসুদ্ধ এক গোল দু-ট্রাইজে কেম্ব্রিজকে হারিয়েছে। বর্ণনার শেষ ক-টি লাইনে লেখা ছিল : লাইট ব্ল-দের হেরে যাওয়ার মূল কারণই হল তুখোড় ইন্টারন্যাশনাল খেলোয়াড় গডফ্রে স্টনটনের আকস্মিক অনুপস্থিতি। কেমব্রিজের বাস্তবিকই মন্দ ভাগ্য বলতে হবে, কেননা খেলার প্রতিটি মুহূর্তে পদে পদে উপলব্ধি করতে হয়েছে তার অভাব। থ্রি-কোয়ার্টার লাইনে সহযোগিতা না-থাকায় এবং আক্রমণ চালানো আর আক্রমণ ঠেকানো–এই দুয়ের মধ্যেই দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ায় দুর্মদ পরিশ্রমী দলটার সমস্ত প্রচেষ্টাই শুধু ব্যর্থ হয়নি, সূচনা করেছে আরও অনেক বিপর্যয়ের।

হোেমস বললে, তাহলে বন্ধুবর ওভারটনের আশঙ্কাই সত্য হল। ব্যক্তিগতভাবে ড. আর্মস্ট্রংয়ের সাথে আমিও একমত। ফুটবল আমারও এক্তিয়ারে পড়ে না। আজ সকাল সকাল শয্যা গ্রহণ করা যাক, ওয়াটসন। কেননা, এখনই দেখতে পাচ্ছি কালকের দিনটায়, অনেকরকম ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারে!

পরের দিন সকালে হোমসের ওপর চোখ পড়তেই রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে উঠলাম। আগুনের ধারে ওর ছোটো হাইপেডারমিক সিরিঞ্জটা হাতে নিয়ে বসে ছিল ও। ওর প্রকৃতির একটিমাত্র দুর্বলতার সঙ্গে সিরিঞ্জটার যোগাযোগ ভাবতেই ভয় পেলাম। তারপর যখন ওর হাতের মধ্যে, ঝকমক করে উঠতে দেখলাম জিনিসটাকে, তখন যেন নিঃসীম বিভীষিকা দেখলাম দুই চোখে। আমার মুষড়ে পড়া ভাব দেখে অট্টহাস্য করে উঠল হোমস। তারপর সিরিঞ্জটা নামিয়ে রাখলে টেবিলের ওপর।

আরে না না মাই ডিয়ার, ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। এবারে এ-যন্ত্রের ব্যবহার অশুভ উদ্দেশ্যে নয়। বরং রহস্যমোচনের চাবিকাঠি হিসেবে এ-বস্তুটির প্রয়োজন যে কতখানি, শিগগিরিই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। এই সিরিঞ্জের ওপরই রয়েছে আমার যাবতীয় আশা ভরসা। এইমাত্র ছোটোখাটো একটা অভিযান শেষ করে ফিরছি আমি। অভিযানটা গুপ্তচরগিরির। হাওয়া অনুকূল। জবরদস্ত ব্রেকফার্স্ট খেয়ে নাও, ওয়াটসন। কেননা, আজ ড. আর্মস্ট্রংকে অনুসরণ করার প্রস্তাব উত্থাপন করছি আমি এবং একবার যদি ওঁর পেছনে ধাওয়া শুরু হয় আমাদের, তাহলে জেনে রেখো ভদ্রলোকের কোটর পর্যন্ত না-গিয়ে বিশ্রাম বা খাওয়ার জন্যে এক সেকেন্ডও দাঁড়াতে পারব না।

আমি বললাম, সেক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হয় যদি আমরা ব্রেকফার্স্ট সঙ্গে নিয়ে যাই। কেননা, আজ সকালে রওনা হচ্ছেন উনি। দরজার সামনে ওঁর গাড়ি এসে গেছে।

ঘাবড়াও মাৎ! যেতে দাও ওঁকে। উনি যদি চালাক হন তো এমন জায়গায় গাড়ি হাঁকিয়ে নিয়ে যাবেন, যেখানে তাকে অনুসরণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। খাওয়া শেষ হলে নীচে নেমে এসো। একজন ডিটেকটিভের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেব। যে-কাজ এখন করতে চলেছি, সে-কাজে তিনি একজন বিশেষজ্ঞ।

নীচে এসে হোমসের পেছনে পেছনে গেলাম আস্তাবলের ভেতরে। একটা আলগা বাক্সের দরজা খুলে ভেতর থেকে ও বার করে আনল একটা মোটাসোটা লটপটে কান, সাদা আর খয়েরি মিশানো কুকুর। দেখতে বিল্ল আর ফক্সহাউন্ডের মাঝামাঝি বলে মনে হয়।

হোমস বলল, এসো, পমপির সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই। এ-অঞ্চলে গন্ধ শুকে অনুসন্ধানপটু ওস্তাদ হাউন্ডের গর্ব এই পমপি। হাওয়ার বেগে দৌড়োতে পারে না বটে, গড়ন দেখলে তা মালুম হয়, কিন্তু একবার গন্ধের ওপর নাক রাখলেই হল। তারপর গন্ধ শুকে শুকে ঠিক জায়গায় হাজির হতে মোটেই বিলম্ব হয় না। এ-রকম র্দুদে ব্লাডহাউন্ড আর নেই বললেই হয়। ওহে পমপি, তুমি বেগবান না হলেও, লন্ডন শহরের মাঝবয়েসি একজোড়া ভদ্রলোকের পক্ষে যে তুমি যথেষ্ট বেগবান, এমনটি আশা করতেই পারি আমি। কাজে কাজেই, তোমার গলাবন্ধে চামড়ার এই ফিতেটি আটকে দেওয়ার স্বাধীনতাটুকু নিচ্ছি। এখন বাপু চলে এসো দিকি সুড় সুড় করে। দেখাও তোমার কেরামতি। ডক্টরের দরজার সামনে পমপিকে নিয়ে গেল হোমস। মুহূর্তের জন্যে চারিদিকের গন্ধ শুকে নিলে পমপি। তারপরেই উত্তেজনায় তীক্ষ্ণ্ণ শব্দে গোঁ গোঁ করে গর্জে উঠে এগিয়ে চলল রাস্তা বরাবর। আরও তাড়াতাড়ি যেতে গিয়ে ঘন ঘন হ্যাচকা টান পড়তে লাগল চামড়ার ফিতেতে। আধঘন্টা যেতে-না-যেতে শহর ছাড়িয়ে বাইরে পড়ে দ্রুতগতিতে ধেয়ে চললাম গাঁয়ের রাস্তা ধরে।

হোমস, কী কাণ্ডটা করেছ শুনি? শুধোই আমি।

একটা বস্তাপচা সস্তা কৌশল, কিন্তু শ্রদ্ধা করার মতো। বিশেষ করে এসব ব্যাপারে তো দারুণ কাজে লেগে যায় পদ্ধতিটা। আজ কাল ডক্টরের উঠোনে ঢুকে সিরিঞ্জ ভরতি মৌরির তেল ছড়িয়ে এসেছি হামের পেছনের চাকায়। জানই তো, শুধু গন্ধ অনুসরণে পটু হাউন্ডের নাক একবার মৌরির তেলের ওপর পড়লে এখান থেকে শুরু করে সারা গ্রেট ব্রিটেন পেরিয়ে স্কটল্যান্ডের একদম উত্তর-পূর্ব প্রান্তে জন ও গ্রোটসয়ের আটকোনা ঘরে পৌঁছোতেও মোটেই বেগ পেতে হবে না তাকে। এ-রকম অবস্থায় পমপিকে ফাঁকি দিতে হলে ক্যাম নদীর মধ্যে দিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে যাওয়া ছাড়া বন্ধুবর আর্মস্ট্রংয়ের আর কোনো উপায় নেই। ধুরন্ধর রাসকেল। সেরাতে এইভাবেই আমার চোখে ধুলো দিয়েছিল লোকটা!

আচম্বিতে বড়োরাস্তা ছেড়ে ঘাসে ঢাকা একটা গলির মধ্যে ঢুকে পড়ল কুকুরটা। আধ মাইলটাক যাওয়ার পরেই গলি শেষ হল আর একটা চওড়া রাস্তার ওপর। তার পরেই, আমাদের গতিপথ চট করে বেঁকে গেল ডাইনের শহরের দিকে–যে-শহর এইমাত্র ছেড়ে এসেছি আমরা। বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে বেঁকে গেল রাস্তাটা; শহরের দক্ষিণ দিকে পৌঁছোনোর পর যেদিকে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম, তার ঠিক বিপরীত দিকে এগিয়ে গেল পথটা।

হোমস বললে, ঘুরপথে চক্কর দিয়ে আমাদের তাহলে বিলক্ষণ উপকার হল বল? গ্রামগুলোর কাদা ঘাঁটাই সারা হয়েছে কেন, তা এখন বুঝেছি। এ-রকম ধড়িবাজি করে থাকলে পণ্ডশ্রম আর আশ্চর্য কী? এতখানি লুকোচুরি খেলার পেছনে ডক্টরের নিশ্চয় কোনো জবরদস্ত কারণ আছে এবং আমি জানতে চাই আটঘাট বেঁধে এই বিরাট প্রতারণার আসল মানেটা কী? ডাইনের গ্রামটাই বোধ হয় ট্রামপিংটন। আরে সর্বনাশ! দেখো, মোড় ঘুরে এগিয়ে আসছে ব্রহাম গাড়িটা! তাড়াতাড়ি ওয়াটসন তাড়াতাড়ি, নইলে আমরা গেছি!

তড়াক করে লাফিয়ে উঠল হোমস। পাশের একটা খেতের ফটক পেরিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। অনিচ্ছুক পমপিকে টেনে হিচড়ে নিয়ে একটা ঝোঁপের আড়ালে লুকোতে-না-লুকোতেই রাস্তা কাঁপিয়ে ঘড় ঘড় করে বেগে বেরিয়ে গেল গাড়িটা। পলকের জন্যে ভেতরে ডক্টর আর্মস্ট্রংয়ের ওপর চোখ পড়ল আমার। দুই কাঁধ তার গোল হয়ে নেমে পড়েছে, মাথা এলিয়ে পড়েছে দু-হাতের মধ্যে। দুঃখ দুর্দশা আর যন্ত্রণা যেন মূর্তি পরিগ্রহ করে বসে ছিল গাড়ির মধ্যে। বন্ধুবরের গম্ভীর হয়ে-ওঠা মুখ দেখে বুঝলাম, দৃশ্যটি সে-ও লক্ষ করেছে।

আমার কী ভয় হচ্ছে জান, ওয়াটসন। খুবই নিরানন্দ ফলাফলের মধ্যে শেষ হবে আমাদের এই অভিযান, বলল হোমস। যাক, সে-ফলাফল যে কী, তা জানতে আর বিশেষ দেরি হবে না। এসো হে পমপি! খেতের মাঝে এই কাজটাই তাহলে আমাদের লক্ষ্য।

আমাদের বিচিত্র তদন্ত-পর্ব যে অন্তে পৌঁছেছে, সে-বিষয়ে আর সন্দেহ ছিল না। ফটকের বাইরের এদিকে সেদিকে দৌড়ে মহা উৎসাহে রীতিমতো চেঁচামেচি জুড়ে দিল পমপি। ব্রুমের চাকার দাগ তখনও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল মাটির ওপর। একটা পায়ে-চলা-পথ গিয়ে শেষ। হয়েছিল নিরালা কটেজটার সামনে। ঝোঁপের মধ্যে কুকুরটাকে বেঁধে রেখে হোমস, আমি দ্রুতপায়ে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। ধুলোকাদায় ছোট্ট জীর্ণ দরজাটায় টোকা দিল হোমস। আবার টোকা দিলে, কিন্তু তবুও কোননা সাড়া এল না ভেতর থেকে। সাড়া না-এলেও কটেজটা যে পরিত্যক্ত নয়, তা বুঝলাম ভেতর থেকে ভেসে আসা একটা মৃদু শব্দ পেয়ে। অবর্ণনীয় বিষাদমাখা সেই একঘেয়ে করুণ গোঙানির মতো শব্দটায় ওতপ্রোতভাবে ফুটে উঠেছিল নৈরাশ্য আর দুর্গতির অভিব্যক্তি। দ্বিধাগ্রস্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল হোমস। তারপর পেছন ফিরে যে-পথ দিয়ে এইমাত্র আমরা এসেছি, সেইদিকে তাকালে। একটা ব্রহাম গাড়ি আসছিল এদিকে। ধূসর ঘোড়া দুটি দেখে ভুল হবার জো-টি ছিল না।

সর্বনাশ, ডক্টর আবার ফিরে আসছেন দেখছি। চেঁচিয়ে ওঠে হোমস। আর দ্বিধা নয়। উনি আসার আগেই আমাদের দেখতে হবে এসবের মানে কী।

বলে দরজাটা খুলে ফেলল ও। দুজনে ঢুকলাম হল ঘরের মধ্যে। গোঙানির শব্দটা আরও জোরে আছড়ে পড়ল আমাদের কানের ওপর। কে যেন করুণ সুরে টেনে টেনে কাঁদছে, অপরিসীম বেদনা যেন ঝরে ঝরে পড়ছে সেই গুঙিয়ে ওঠার মধ্যে। শব্দটা আসছিল ওপরের তলা থেকে। তিরবেগে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল হোমস, আমি লেগে রইলাম ওর পেছনে। একটা ভেজানো দরজায় ঠেলা দিয়ে খুলে ফেলল ও; সঙ্গেসঙ্গে ভয়-অবশ দেহে দুজনে দাঁড়িয়ে গেলাম সামনের দৃশ্যটি দেখে।

শয্যার ওপর শুয়ে ছিল একটি তরুণীর প্রাণহীন দেহ। স্তবকে স্তবকে ছড়ানো সোনালি চুলের মধ্যে থেকে ওপরের পানে তাকিয়ে ছিল একটি শান্ত সুন্দর বিবর্ণ মুখ, নিষ্প্রভ আধখোলা দুটি-নীল চোখ। শয্যাপ্রান্তে আধবসা আধনতজানু একটি যুবক কাপড়চোপড়ের মধ্যে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন। প্রতিবার ফুঁপিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠছিল তার সর্বদেহ! নিঃসীম শোকে তিনি এমনই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন যে হোমস তার কাঁধের ওপর হাত রাখা সত্ত্বেও মুখ তুলে তাকালেন না উনি।

আপনিই কি মি. গডফ্রে স্টনটন?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিই কিন্তু বড়ো দেরি হয়ে গেছে। ও আর নেই।

এমন শোকাচ্ছন্ন মানুষকে বোঝানো মুশকিল যে আমরা ডক্টর নই এবং তার সাহায্যের জন্যেও আমাদের পাঠানো হয়নি। দু-চারটে সান্ত্বনার কথা বলার চেষ্টা করছিল হোমস। তার আকস্মিক অন্তর্ধানের ফলে বন্ধুবরের মধ্যে যে কী ধরনের সাড়া পড়ে গেছে, তা বোঝাবার চেষ্টা করতে-না-করতেই সিঁড়ি ওপর পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। পরক্ষণেই দরজার সামনে আবির্ভূত হল ড, আর্মস্ট্রংয়ের ইস্পাত কঠিন ভারী মুখ আর কটমটে জিজ্ঞাসু চাহনি।

বললেন উনি, জেন্টলমেন, শেষ পর্যন্ত দেখছি পৌঁছে গেছেন আসল জায়গায়। রবাহুতের মতো না বলে কয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ার পক্ষে বিশেষ রকমের জটিল একটি মুহূর্তও নির্বাচন করেছেন দেখা যাচ্ছে। মৃত্যুকে সামনে রেখে আর হট্টগোল করব না। কিন্তু আমার বয়স যদি কিছু কম হত জেনে রাখুন, আপনাদের এই অত্যন্ত জঘন্য নোংরা আচরণের সমুচিত দণ্ডবিধান না-করে রেহাই দিতাম না।

বেশ মর্যাদার সঙ্গে উত্তর দিলে বন্ধুবর হোমস, মাপ করবেন ড. আর্মস্ট্রং। আমার মনে হয়, একই উদ্দেশ্য নিয়ে ঠোকাঠুকি লেগে গেছে আমাদের পরস্পরের মধ্যে। আপনি যদি আমাদের সাথে নীচে আসেন তো আমার বিশ্বাস আমরা প্রত্যেকেই এ-ব্যাপার সম্বন্ধে কিছু কিছু আলোকপাত করতে পারি।

মিনিটখানেক পরেই নীচের তলায় বসবার ঘরে থমথমে মুখ ডক্টরের সাথে জমায়েত হলাম। আমরা।

তারপর? শুধোলেন উনি।

আমি চাই প্রথমেই একটা জিনিস আপনি বুঝুন। লর্ড মাউন্ট-জেমস আমার নিয়োগকর্তা নন। এবং এ-ব্যাপার সম্পর্কে আমার অন্তরের সবটুকু সমবেদনাই কিন্তু তার বিরুদ্ধে। কেউ হারিয়ে গেলে তার পরিণতিটা কী হল, তা জানার কর্তব্য আমার। কিন্তু কর্তব্য শেষ হলে সব কিছুরই পরিসমাপ্তি ঘটে সেখানেই অন্তত আমার ক্ষেত্রে তাই। তারপর ধরুন, অপরাধ আখ্যা দেওয়া যায় এমনি কোনো কিছুরই যখন পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না, তখন পারিবারিক কেলেঙ্কারিকে সমাজের মাঝে প্রচার করার চাইতে বরং ধামাচাপা দিয়ে দিতেই উদবিগ্ন হয়ে উঠি আমি। আমি যদি বুঝি যে এ-ব্যাপারে বেআইনি কিছুই নেই, তাহলে আমার বুদ্ধিবিবেচনা আর স্বাধীনতার ওপর আপনি. পরিপূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন। তা ছাড়া, কাগজে যাতে এসব ঘটনা প্রকাশ না-পায়, সে বিষয়েও আমার সহযোগিতা আপনি পাবেন।

চট করে এক পা এগিয়ে এসে দু-হাতে হোমসকে ধরে জোরে ঝাঁকুনি দিলেন ড. আর্মস্ট্রং।

বললেন, আপনি তোক ভালো। আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম আমি। আমার বরাত ভালো, স্টনটন বেচারাকে এ-রকম দূরবস্থায় একলা ফেলে রেখে গিয়ে বিবেক-দংশন সহ্য করতে না-পেরে ফিরে এসেছিলাম গাড়ি নিয়ে, তাই দেখা হয়ে গেল আপনার সাথে। আপনি যা দেখলেন শুনলেন, তা থেকে অনায়াসেই বুঝে নিয়েছেন আসল ব্যাপারটা। বছরখানেক আগে লন্ডনে কিছুদিনের জন্য ভাড়াবাড়িতে থাকার সময়ে ল্যান্ডলেড়ির মেয়েকে সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে গডফ্রে স্টনটন এবং তাকে শেষে বিয়ে করে সে। মেয়েটি যেমন ভালো তেমনি সুন্দরী আর বুদ্ধিমতী। এ-রকম বউ পেলে কোনো পুরুষেরই লজ্জিত হওয়ার কারণ থাকে না। কিন্তু তিরিক্ষে মেজাজের এই খিটখিটে বুড়োর উত্তরাধিকারী গডফ্রে। এবং তার বিয়ের খবর বুড়োর কানে যাওয়া মানেই যে ওয়ারিশি স্বত্বেরও বিলোপ হওয়া, সে-বিষয়ে আমাদের কারোরই সন্দেহ ছিল না। ছেলেটিকে আমি ভালো করেই জানি এবং তাকে ভালোবাসি অনেকগুলি চমৎকার গুণের জন্যে। ওকে যাতে কোনো ঝামেলায় না পড়তে হয়, তাই যথাসাধ্য সাহায্য করলাম আমি। এ-খবর যাতে আর কেউ না জানতে পারে, তাই চেষ্টার ত্রুটি করলাম না। কেননা, কানাঘুসো একবার শুরু হলেই হল, দেখতে দেখতে প্রত্যেকেই কিছু-না-কিছু আঁচ করে নেবে! সাধুবাদ জানাই গডফ্রের স্বাধীন বিচার-বিবেচনার জন্যে। এই নির্জন কটেজটা নির্বাচন করার ফলে আজ পর্যন্ত কাকপক্ষীও কিছু টের পায়নি এবং আমরা সফল হয়েছি আমাদের প্রচেষ্টায়। এদের গোপন রহস্য আমি আর একজন অনুগত পরিচারক ছাড়া আর কেউ জানে না। পরিচারকটি এখন গেছে ট্রামপিংটনে সাহায্যের জন্যে। আচম্বিতে একদিন নেমে এল বিধাতার প্রচণ্ড আঘাত। বিপজ্জনক ব্যাধিতে আক্রান্ত হল ওর স্ত্রী। রোগটা অত্যন্ত বিষময় প্রকৃতির এক ধরনের ক্ষয়রোগ। শোকে দুঃখে এমনই অভিভূত হয়ে পড়ল বেচারি যে প্রায় অর্ধোন্মাদের মতো অবস্থা হল ওর। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওকে লন্ডনে আসতে হল এই ম্যাচটা খেলার জন্যে। ম্যাচ না-খেলে আসার উপায় ছিল না। কেননা তাহলে তো একটা কারণ দর্শাতে হবে ওকে। তখনই ফাঁস হয়ে যাবে সব রহস্য। একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে ওকে উৎফুল্ল রাখবার চেষ্টা করলাম আমি। প্রত্যুত্তরে আমাকে একটা টেলিগ্রাম পাঠালে ও মিনতি করলে, আমার যথাসাধ্য যেন আমি করি। এই টেলিগ্রামই দেখেছিলেন আপনি। কিন্তু কী উপায়ে যে দেখেছিলেন তা অনেক বুদ্ধি খরচ করেও ভেবে পাইনি আমি। বিপদ যে আসন্ন তা আমি ওকে বলিনি। কেননা, এখানে সে থাকলেও তো কোনো লাভ হত না। কিন্তু মেয়েটির বাবার কাছে সত্য গোপন করলাম না–খবর পাঠালাম তাঁকে। তিনি অত্যন্ত অবিবেচকের মতো খবরটি জানিয়ে দিলে গডফ্রেকে। ফলে হল কী, প্রায় উন্মাদের মতো অবস্থায় সিধে এসে ও পৌঁছোল এখানে। তারপর থেকে সেই একই অবস্থায় শয্যাপ্রান্তে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে ও। আজ সকালে মৃত্যু এসে মেয়েটির সব জ্বালা যন্ত্রণা জুড়িয়ে দিলে। মি. হোমস, আর কিছুই নেই। আপনি এবং আপনার বন্ধু অবিবেচক নয়, সুতরাং নিশ্চিন্ত মনে আপনাদের ওপর ভরসা রাখছি আমি।

দু-হাতে ডক্টরের হাত জড়িয়ে ধরলে হোমস।

তারপর বললে, এসো, ওয়াটসন। শোক-ভবন থেকে বেরিয়ে এসে আমরা দাঁড়ালাম শীতার্ত দিনের মরা সূর্যের আলোয়।

——–

টীকা

খেলোয়াড়ের খেলায় অরুচি : দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য মিসিং থ্রি কোয়ার্টার্স অগাস্ট ১৯০৪ সংখ্যার স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনে এবং ২৬ নভেম্বর ১৯০৪-এর কলিয়ার্স উইকলিতে প্রথম প্রকাশিত। এই গল্পের পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে রাখা আছে।

রাইট উইং : রাগবি দলের ফরোয়ার্ড লাইনে মাঝে থাকে সেন্টার ফরোয়ার্ড। তার ডাইনে রাইট উইং, বাঁয়ে লেফট উইং।

কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির রাগবি টিম : কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি রাগবি ইউনিয়ন ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭২-এ। তার তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠা করা হয় অক্সফোর্ডের রাগবি ক্লাব। কিন্তু কেম্ব্রিজে রাগবি খেলা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৩৯ সালে।

অক্সফোর্ডের সাথে আমাদের খেলা : অক্সফোর্ড বনাম কেম্বিজ রাগবি খেলা প্রথম হয়েছিল ১৮৭২-এ। অক্সফোর্ডের মাঠে অনুষ্ঠিত সেই খেলায় জয়ী হয় অক্সফোর্ড। পরে, প্রথমত কেনিংটন ওভালে, আরও পরে ব্ল্যাকহিদে এবং শেষ পর্যন্ত কুইনস ক্লাবে এই বাৎসরিক খেলা অনুষ্ঠিত হত। খেলা হত প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় মঙ্গলবার। বর্তমানে এই খেলা হয় টিউকেনহ্যাম স্টেডিয়ামে।

বেইজওয়াটারের বাসে : বার্ডেট রোড থেকে শেফার্ডস বাস গ্রিন পর্যন্ত চলাচলকারী বেইজওয়াটার বাস ছাড়ত প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর।

পয়সার অপব্যয় করি না : লর্ডের বাসে চড়া থেকেই তা বোঝা যায়। দূরত্বের অনুপাতে বাসের ভাড়া নির্ধারিত হত ১ থেকে ৬ পেনির মধ্যে।

জন ও গ্রোটস : ওলন্দাজ জান ডে গ্রোট ইংলন্ডের মূল ভূখণ্ডের উত্তরপ্রান্তে বসতি স্থাপন করেন তার দুই ভাইকে নিয়ে। তিনি একটি আটটি আলাদা প্রবেশপথ সংবলিত আটকোণাকৃতি বাড়ি নির্মাণ করিয়েছিলেন, তার ওয়ারিশদের থাকবার জন্য। এই ঘটনা ইংলন্ডেশ্বর চতুর্থ জেমসের রাজত্বকালে (১৪৮৮-১৫১৩) ঘটেছিল।

ক্যাম নদী : এই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে কেম্ব্রিজ শহর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *