কুটিল বুড়োর কুচক্র

কুটিল বুড়োর কুচক্র
[দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য উড বিল্ডার]

যে সময়ের কথা বলছি, তখন মাত্র কয়েক মাস হল অজ্ঞাতবাস সাঙ্গ করে ঘরে ফিরেছে হোমস। আমিও তার অনুরোধে প্র্যাকটিস বেচে দিয়ে ফিরে এসেছি বেকার স্ট্রিটের পুরোনো বাড়িতে। চেয়ারে কাত হয়ে বসে হোমস অসলভাবে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে সকালের কাগজে। এমন সময়ে দুজনেই সজাগ হয়ে উঠলাম সদর দরজায় দারুণ জোরে ঘণ্টা বাজানোর শব্দে। শুধু তাই নয়, সেইসঙ্গে দুমদাম ঢাক পিটোনোর মতো শব্দ–কেউ যেন আর একটা সেকেন্ডও দাঁড়াতে না-পেরে দমাদম ঘুসি মেরে চলেছে দরজার পাল্লার ওপর। দরজা খোলার সঙ্গেসঙ্গে তিরবেগে সে ছুটে গেল হল ঘরের মধ্যে দিয়ে, তার পরেই সিঁড়ির ওপর খটাখট জুতোর আওয়াজ একসঙ্গে কয়েকটা ধাপ টপকে লাফিয়ে উঠলে যেমন হয় এবং পরমূহুর্তেই ক্ষিপ্তের মতো ঘরে ঢুকল একটি তরুণ। বিস্ফারিত চোখ, পাঙাশপানা মুখের রং, উশকোখুশকো মাথার চুল। হাপরের মতো হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের দুজনের মুখের ওপর বারকয়েক চোখ বুলিয়েই তরুণটি নিজেই লজ্জিত হয়ে পড়ল আমাদের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিদেখে। এ-রকম অশোভনভাবে ঘরে ঢোকাটা খুবই অন্যায় এবং এজন্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত মনে করেই চেঁচিয়ে উঠল, আমি দুঃখিত, মি. হোমস। পাগল হতে আমার আর বাকি নেই। মি. হোমস, আমিই হতভাগ্য হেক্টর ম্যাকফারলেন। এই মুহূর্তে লন্ডনের সবচেয়ে দুর্ভাগা লোক আমিই। দোহাই মি. হোমস, ঈশ্বরের দোহাই, আমাকে তাড়িয়ে দেবেন না! আমার গল্প শেষ করার আগেই যদি ওরা এসে পড়ে আমাকে গ্রেপ্তার করতে, ওদের কিছুক্ষণ আটকে রেখে আমাকে অকপটে যা সত্য তা বলবার সুযোগ দিন। আপনি যে আমার হয়ে তদন্তে নেমেছেন এই বিশ্বাস নিয়ে আমি খুশিমনে হাজতে যেতে রাজি আছি।

গ্রেপ্তার করতে আসছে আপনাকে? শুনে খুবই সুখী–দারুণ ইন্টারেস্টিং লাগছে। কী চার্জে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলুন তো?

লোয়ার নরউড-এর মি. জোনাস ওলডাকারকে খুন করার চার্জে।

কাঁপা হাতে হোমসের হাঁটু থেকে ডেলি টেলিগ্রাফটা তুলে নিয়ে মেলে ধরল ম্যাকফারলেন।

এই জায়গাটায় চোখ পড়লেই আপনি বুঝতে পারতেন স্যার কী জন্যে সকাল বেলাই এসে পৌঁছেছি আপনার কাছটিতে। লোকের মুখে মুখে এখন ঘুরছে আমার নাম আর আমার দুর্ভাগ্যের কাহিনি। মাঝখানের পাতাটা খুলে ধরল ম্যাকফারলেন। এই যে, কিছু মনে করবেন না স্যার। আমিই পড়ে শোনাচ্ছি। হেডলাইন দিয়েছে : লোয়ার নরউডে রহস্যজনক ব্যাপার। প্রখ্যাত স্থপতির অন্তর্ধান। হত্যা এবং গৃহদাহের সন্দেহ। কে হত্যাকারী? একটি সূত্র। মি. হোমস এই সূত্র ধরেই ওরা এগিয়ে আসছে এবং আমি জানি শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হতে হবে আমাকেই। লন্ডন ব্রিজ স্টেশন থেকে ওরা পিছু নিয়েছে আমার আমার দৃঢ় বিশ্বাস শুধু গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটা বার করার জন্যই ওরা যা সময় নিচ্ছে। ওঃ, মি. হোমস, এ-খবর শুনলে আমার মা… আমার মায়ের মন একেবারেই ভেঙে যাবে–কিছুতেই সহ্য করতে পারবেন না উনি। ভয়ে বেদনায় দু-হাত কচলাতে কচলাতে সামনে পেছনে দুলতে লাগল ম্যাকফারলেন।

ভালো করে তাকালাম তার দিকে। খুনের অপরাধে অভিযুক্ত সে। কিন্তু তার সোনালি চুলে সুন্দর চেহারায়, নীল নীল ভয়ার্ত চোখে এবং পরিষ্কার দাড়ি গোঁফ কামানো মুখে দুর্বল ভাবাবেগের চিহ্ন। বয়স তার খুব জোর বছর সাতাশ, জামাকাপড় হাবভাব বেশ ভদ্রলোকের মতোই।

হোমস বললে, যেটুকু সময় এখন আছে তার সদ্ব্যবহার করা যাক। ওয়াটসন, কাগজটা তুলে প্যারাগ্রাফটা একটু পড়ে শোনাও তো ভাই।

জমকালো শিরোনামার নীচেই পড়লাম ইঙ্গিতময় সুদীর্ঘ খবর:

গতকাল গভীর রাতে লোয়ার নরউড-এ এক গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে। মি. জোনাস ওলডাকার শহরতলির এই অঞ্চলের বহু দিনের বাসিন্দা এবং সকলকেই তাঁহাকে চেনে। বহু বছর ধরিয়া স্থপতি ব্যাবসা করিয়া তিনি সুনাম অর্জন করিয়াছেন। মি. ওলডাকার চিরকুমার। তাঁহার বয়স বাহান্ন বছর। সিডেনহামের প্রান্তে ডীপ হাউসে তাহার নিবাস। রাস্তার নামকরণও তাঁহার বাড়ির নাম অনুসারে হইয়াছে। উকট খামখেয়াল স্বভাবের জন্য ওলডাকারের কিঞ্চিৎ নামডাক আছে। প্রচ্ছন্ন থাকিয়া অবসর জীবনযাপনেই তিনি অভ্যস্ত। সারাজীবন তিনি বিস্তর অর্থ উপার্জন করিয়াছেন। এবং সঞ্চয় করিয়াছেন। কিন্তু কয়েক বছর হইল ব্যাবসা হইতে সম্পূর্ণরূপে নিজেকে তিনি সরাইয়া আনিয়াছিলেন। বাড়ির পিছনে কাঠের বরগার ক্ষুদ্র একটি স্তুপ কিন্তু আর সরানো হয় নাই। তাহার এই কাঠের স্তুপেই নাকি আগুন লাগিয়েছে। তৎক্ষণাৎ দমকল আসিয়া পৌঁছাইলেও কিন্তু আগুন বন্ধ করা গেল না। কাঠের বরগাগুলি এমনিই শুষ্ক ছিল যে, দমকল বাহিনীর সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করিয়া ভূপটি পুড়িয়া একেবারেই ছাই হইয়া যায়। এই পর্যন্ত সকলেই অগ্নিকাণ্ডটিকে নিছক দুর্ঘটনা ভাবিয়াছিল। কিন্তু অচিরেই গুরুতর অপরাধ সংঘটনের চিহ্ন পাওয়া গেল। আগুন জ্বলার সময়ে বাড়ির মালিককে ধারেকাছে কোথাও দেখিতে না-পাওয়ায় সবাই আশ্চর্য হইয়া গিয়াছিলেন। এখন দেখা গেল যে, তিনি তাঁহার বাড়ি হইতে বেমালুম উধাও হইয়াছেন। ঘর পরীক্ষা করিয়া দেখা গেল যে, রাত্রে তিনি শয্যা স্পর্শ করেন নাই। শয়নকক্ষের আয়রনসেফটি খোলা এবং ঘরময় বহু মূল্যবান কাগজপত্র বিক্ষিপ্ত। আরও চিহ্ন পাওয়া গেল–ঘরে যেন একটি মরণ-যুদ্ধ, একটি খণ্ড-প্রলয় ঘটিয়া গিয়াছে। সামান্য রক্তের চিহ্নও পাওয়া গিয়াছে। একটি ওক কাঠের বেড়াইবার ছড়ির হাতলে রক্তের দাগ দেখা গিয়াছে। প্রকাশ, সেদিন বেশি রাত্রে শয়নকক্ষে মি. ওলকার এক ভদ্রলোকের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন। ছড়িটি তাহারই। ইনি লন্ডনের একজন তরুণ সলিসিটর, গ্ৰেহাম হ্যান্ড ম্যাকফারলেন, ৪২৬ গ্রেস্যামস বিল্ডিংস, ই. সি.র জুনিয়র পার্টনার, নাম–জন হেক্টর ম্যাকফারেলন। পুলিশের বিশ্বাস, প্রমাণাদি যা পাওয়া গিয়াছে, তাহা দিয়া অনায়াসেই অপরাধের একটা বিশ্বাসযোগ্য এবং যুক্তিসংগত মোটিভ খাড়া করা চলে। পরিণামে, অত্যন্ত শিহরনমূলক তথ্যাদি প্রকাশ পাইবে।

পরের খবর।–প্রেসে আসিবার সময়ে জোর গুজব শুনিলাম যে মি. জোনাস ওলডাকারকে হত্যার অভিযোগে মি. জন হেক্টর ম্যাকফারলেনকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। অন্ততপক্ষে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যে বাহির হইয়াছে, এ-বিষয়ে সকলেই নিঃসন্দেহ। নরউড-তদন্তের ফলে আরও কুটিল তথ্যাদি প্রকাশ পাইয়াছে। হতভাগ্য স্থপতির রুমে ধস্তাধস্তির চিহ্ন ছাড়াও এখন জানা গিয়াছে যে, একতলার ফ্রেঞ্চ উইন্ডোগুলিও উন্মুক্ত ছিল। হিচড়াইয়া জানলার মধ্য দিয়া কাঠের সৃপ পর্যন্ত লইয়া যাওয়ার চিহ্ন পাওয়া গিয়াছে এবং কাঠকয়লা ও ছাইগাদার মধ্যে পোড়া দেহাবশেষ দেখা গিয়াছে। পুলিশের ধারণা যে, অতি চাঞ্চল্যকর একটি অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে। হতভাগ্য স্থপতিকে তাঁহার শয়নকক্ষে পিটাইয়া হত্যা করার পর কাগজপত্র লুঠ করা হইয়াছে এবং হত্যার সব চিহ্ন মুছিয়া দেওয়ার জন্য তাঁহার মৃতদেহকে টানিয়া কাঠের পে ফেলিয়া আগুন দিয়া সব পুড়াইয়া ছাই করিয়া দেওয়া হইয়াছে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের স্বনামধন্য ইনস্পেকটর লেসট্রেডের হাতে তদন্ত পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে এবং তিনি তাঁহার অভ্যস্ত ক্ষিপ্রতা ও উৎসাহ সহকারে সূত্র অনুসরণ করিয়া কাজ প্রায় সারিয়া আনিয়াছেন।

দু-চোখ মুদে আঙুলে আঙুল জড়িয়ে হোমস একমনে শুনছিল এই বিচিত্র কাহিনি!

আমি থামলে পর অভ্যাসমতো অলস সুরে বললে, বাস্তবিকই বড়ো আজব কেস হে, বেশ কয়েকটা ভাববার মতো পয়েন্ট আছে। ভালো কথা মি. ম্যাকফারলেন, যা শুনলাম তাতে তো দেখছি যেসব প্রমাণ পাওয়া গেছে, তার বলেই আপনার এতক্ষণে গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু এখনও ধরা পড়েননি কেন বুঝলাম না তো?

মি. হোমস, আমার বাড়ি ব্লাকহিদের টরিংটন লজে। আমার বাবা মা-ও থাকেন সেখানে। কিন্তু গতরাতে মি. জোনাস ওলডাকারের সঙ্গে আমার কিছু কাজ থাকায় নরউডের একটা হোটেলে আমায় রাত কাটাতে হয়েছিল। আজ সকালে ট্রেনে ওঠার আগে পর্যন্ত কিছুই শুনিনি আমি। ট্রেনে উঠেই কাগজে চোখ বুলোতে গিয়ে জানতে পারলাম সব। তখুনি বুঝলাম কী বিষম বিপদে পড়েছি সম্পূর্ণ নিজের অজান্তে। কাজেই, আর এক সেকেন্ডও দেরি না-করে সিধে চলে এলাম আপনার কাছে আপনার সাহায্যের জন্যে! বেশ জানতাম, বাড়ি অথবা অফিস–এই দু-জায়গার কোনোটিতে গেলে গ্রেপ্তার হতাম আমি। কিন্তু তা সত্ত্বেও লন্ডন ব্রিজ স্টেশন থেকে আমার পিছু নিয়েছে একটা লোক! বেশ বুঝছি–গ্রেট হেভেন, ও কী?

সদর দরজায় ঘটাং করে শব্দ হওয়ার সঙ্গে সিঁড়ির ওপর শুনলাম ভারী জুতোর শব্দ। পরমুহূর্তে ঘরে ঢুকল বন্ধুবর লেসট্রেড। কাঁধের ওপর দিয়ে দেখলাম পেছনে দাঁড়িয়ে ইউনিফর্ম পরা দুজন পুলিশ।

ঘরে ঢুকেই পুলিশি হুংকার ছাড়ল লেসট্রেড, মি, জন হেক্টর ম্যাকফারলেন!

আমাদের ক্লায়েন্ট বেচারি রক্তশূন্য মুখে উঠে দাঁড়াল কাঁপতে কাঁপতে।

লোয়ার নরউডের মি. জোনাস ওলডাকারকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে আপনাকে গ্রেপ্তার করছি।

হতাশভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আমাদের দিকে ফিরে তাকাল ম্যাকফারলেন। তারপর ঝুপ করে চেয়ারে বসে পড়ে এমনভাবে গা এলিয়ে দিলে যেন এইমাত্র গিলোটিনের নীচে মাথা ঢুকিয়ে দেওয়া হল তার।

হোমস বলল, এক সেকেন্ড, লেসট্রেড! আধ ঘণ্টার এদিক-ওদিক হলে তোমার এমন কিছু ক্ষতি হবে না। ভদ্রলোক সব আদ্যোপান্ত বলতে যাচ্ছেন, এমন সময় ধূমকেতুর মতো এসে হাজির হলে তুমি। এঁর মুখে ঘটনাটা আগাগোড়া শুনলে আমার তো মনে হয় লেসট্রেড তোমার আমার দুজনেরই উপকার হবে তাতে।

গুম হয়ে বলল লেসট্রেড, শুনলেই-বা কী, না-শুনলেই-বা কী। জট ছাড়ানোর কোনো অসুবিধেই আমার হবে না।

তাহলেও লেসট্রড, তোমার অনুমতি নিয়ে ভদ্রলোকের মুখেই আমি এ-ঘটনার পুরো বিবরণটা শুনতে চাই।

বেশ, আপনি যখন বলছেন, তখন আর না বলব না। অতীতে বারদুয়েক ফোর্সকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন আপনি। আপনার ঋণ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড কোনোদিন ভুলতে পারবে না। তবু মি, ম্যাকফারলেন যা বলবেন, আমার সামনেই বলতে হবে এবং এ-ও জানিয়ে দিচ্ছি, তিনি যা কিছু বলবেন, সবই প্রমাণ হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে কাজে লাগাব আমরা।

ম্যাকফারলেন বলল, আমিও তাই চাই। আমার একান্ত অনুরোধ, ধৈর্য ধরে আমি যা বলতে চাই তা শুনুন এবং বিশ্বাস করুন আমার বক্তব্যের প্রতিটি অক্ষরই খাঁটি সত্য।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে লেসট্রেড বললে, ঠিক আধঘণ্টা সময় দিচ্ছি আপনাকে।

ম্যাকফারলেন বলল, প্রথমেই বলে রাখি, মি. জোনাস ওলডাকার সম্বন্ধে আমি কিছু জানতাম না। পরিচয় ছিল শুধু নামের সঙ্গে। কেননা, বহু বছর আগে আমাদের বাবা মার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তারপর কে যে কোনদিকে ছিটকে গেছে, তার কোনো হদিশ ছিল না। সেই কারণেই গতকাল বেলা প্রায় তিনটার সময়ে তাকে আমার সিটি অফিসে ঢুকতে দেখে খুবই অবাক হয়ে গেছিলাম। আর অবাক হলাম যখন শুনলাম তার আসার উদ্দেশ্য। হাতে করে নোটবইয়ের কয়েকটা ছেড়া পাতায় অনেক কিছু লিখে এনেছিলেন তিনি। এই দেখুন সেই কাগজগুলো।

টেবিলের ওপর ছেড়া পাতাগুলো রেখে বললেন মি. ওলডাকার, এই আমার উইল। মি, ম্যাকফারলেন, কানুনমাফিক যা কিছু করতে হয় করুন–পাকাপোক্ত হওয়া পর্যন্ত এখানেই বসে রইলাম আমি!

কপি করতে গিয়ে চোখ কপালে উঠল আমার। আমার তখনকার অবস্থাটা আপনিও খানিকটা অনুমান করতে পারবেন সব শুনলে। দেখলাম, সামান্য একটু রাখাঢাকা ছাড়া তাঁর সমস্ত সম্পত্তিই আমায় দিয়ে গেছেন তিনি। ভদ্রলোকের চেহারাটা অদ্ভুত। ছোটোখাটো মানুষ–অনেকটা নেউলের মতো খড়বড়ে! চোখের পাতাগুলো সমস্ত সাদা। চোখ তুলতেই দেখি তীক্ষ্ণ্ণ ধূসর চোখে সকৌতুক আমার দিকে তাকিয়ে আছেন উনি। উইলের শর্ত পড়তে পড়তে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু তিনিই বুঝিয়ে বললেন যে তিনি তো চিরকুমার, বয়েসও হয়েছে যথেষ্ট, কিন্তু জীবিত আত্মীয়স্বজন বিশেষ কেউ নেই। আমি যখন নাবালক, তখন থেকেই আমার বাবা-মাকে চেনেন তিনি। অনেকদিন ধরেই শুনেছেন যে ছেলে হিসেবে আমি নাকি হিরের টুকরো। সেইজন্যেই নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, আমার হাতে তার সম্পত্তি দিয়ে নিশ্চিন্তে চোখ মুদতে পারবেন। আমি তো সব শুনে এমন তোতলা হয়ে গেলাম যে, সামান্য ধন্যবাদটুকুও দিতে পারলাম না। যথাবিধি শেষ হল উইল, ওঁর সই হবার পর সাক্ষী হিসাবে সই করল আমার কেরানি। উইলটা লেখা হয়েছে নীল কাগজে। আর এই কাগজগুলো তো বললামই তাঁর নিজের হাতের লেখা উইলের খসড়া। উইলের পালা চুকে গেলে মি. ওলডাকার বললেন যে, বাড়ির লিজ, মর্টগেজ, রসিদ, টাইটেল-ডিড ইত্যাদি অনেকরকম দলিল আমার একবার দেখে এবং বুঝে নেওয়া দরকার। এসব কাজ একেবারে চুকেবুকে না-যাওয়া পর্যন্ত নাকি কিছুতেই শান্তি পাবেন না উনি। তাই অনেক করে অনুরোধ করলেন, গতরাতেই যেন উইলটা নিয়ে তার নরউডের বাড়িতে যাই সব ঝামেলা মিটিয়ে ফেলার জন্যে। যাবার সময়ে বলে গেলেন, তুমি কিন্তু বাবা একটা কথাও এখন তোমার বাবা মা-কে জানিয়ো না। সব শেষ করে তারপর তাঁদের চমকে দেওয়া যাবে, কি বল? এ নিয়ে বেশ জেদাজেদি শুরু করলেন উনি এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে দিয়ে শপথ করিয়ে তবে বিদায় নিলেন।

ঝুঝতেই পারছেন মি. হোমস তার এই সামান্য অনুরোধ না-শোনার মতো মনের অবস্থা আমার তখন নেই। তিনি যা বলতেন, তাই শুনতে রাজি ছিলাম তখন। আমার যা উপকার তিনি করলেন, তা ভোলার নয় এবং তাঁর যেকোনো ইচ্ছাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে চেয়েছিলাম আমি। বাড়িতে একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দিলাম। জানিয়ে দিলাম যে জরুরি কাজে আটকা পড়ে যাওয়ায় কত রাতে যে বাড়ি ফিরব তার কোনো ঠিক নেই। মি. ওলডাকার বলে গেছিলেন ন-টার আগে তিনি বাড়িতে না-ও থাকতে পারেন। কাজেই ন-টার সময়ে পৌঁছে তার সঙ্গে সাপার খাওয়ার নিমন্ত্রণও জানিয়ে গেলেন। বাড়ি খুঁজে বের করতে একটু বেগ পেতে হয়েছিল আমায়। কাজেই সাড়ে নটা নাগাদ পৌঁছোলাম আমি। তাঁকে দেখলাম—

এক সেকেন্ড! হোমস বলল, দরজা খুলেছিল কে?

একজন মাঝবয়েসি স্ত্রীলোক। আমার তো মনে হল ঘরকন্নার বন্দোবস্ত তিনিই করেন।

আর আপনার নাম উল্লেখ করেছিলেন এই স্ত্রীলোকটিই, তাই না?

এগজ্যাক্টলি। বলল ম্যাকফারলেন।

তারপর বলে যান।

ঘামে-ভেজা কপাল মুছে নিয়ে বলে চলল ম্যাকফারলেন, পিছু পিছু এলাম বসবার ঘরে। পরিমিত সাপার আগে থেকেই সাজানো ছিল যেখানে। খাওয়ার পরে মি. জোনাস ওলডাকার আমাকে তার শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরের মধ্যে একটা আয়রন-সেফ দেখলাম। মি. ওলডাকার সেফটা খুলে ফেলে একগাদা দলিল বার করে আমাকে দেখাতে বসলেন। দলিলের পাহাড় থেকে যখন চোখ তুললাম তখন রাত হয়েছে অনেক। এগারোটা কি বারোটা অথবা তার মাঝামাঝি হবে। মি. ওলডাকার আর স্ত্রীলোকটিকে বিরক্ত করতে চাইলেন না। ফ্রেঞ্চ উইন্ডো আগাগোড়া ভোলাই ছিল–আমাকে তার মধ্যে দিয়েই বিদায় দিলেন তিনি।

পর্দা ফেলা ছিল কি? শুধোলেন হোমস।

ঠিক বলতে পারব না, তবে মনে হয় অর্ধেক ফেলা ছিল। হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, জানলাটা পুরোপুরি খুলে নেওয়ার জন্যে পর্দাটা তুলে ধরেছিলেন উনি। ছড়িটা খুঁজে পেলাম না। মি. ওলডাকার বললেন, ঘাবড়াও মাত বাবা, মাঝে মাঝে এখন তো দেখা হবেই। আবার না-আসা পর্যন্ত ওটা আমার কাছেই গচ্ছিত থাকুক, কেমন? চলে এলাম আমি। আসবার সময় দেখে এলাম আয়রন-সেফ খোলা, দলিলপত্র বান্ডিল বাঁধা অবস্থায় টেবিলের উপর রাখা। এত রাত হয়ে গেছিল যে ব্ল্যাকহিদে ফিরে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি গতরাত্রে। তাই অ্যানারলি আর্মস-এ রাত কাটিয়ে আজ সকালে ট্রেনে উঠে কাগজে চোখ পড়তেই চক্ষুস্থির হয়ে গেল আমার। এর আগে কী হয়েছে না-হয়েছে, কিছুই জানি না আমি।

চমকদার এই ব্যাখ্যানা বলার সময়ে বারদুয়েক ভুরু তুলেছিল লেসট্রেড। এখন বলল, আর কিছু জিজ্ঞেস করতে চান, মি. হোমস?

ব্ল্যাকহিদে পৌঁছোনোর আগে নয়।

নরউডে বলুন। বলল লেসট্রেড।

ও হ্যাঁ, নরউডেই বটে। বলল হোমস মুখে তার অতি-পরিচিত পেটেন্ট দুর্বোধ্য হাসি।

বিচিত্র কৌতূহল চোখে নিয়ে বলল লেসট্রেড, মি, শার্লক হোমস, দেখছি আপনার সঙ্গে কিছু আলাপ-আলোচনা দরকার। মি. ম্যাকফারলেন,, গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে নীচে। দুজন কনস্টেবল অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছেন আপনার জন্যে বাইরে। শেষবারের মতো করুণ মিনতি-মাখানো চোখে আমাদের পানে তাকিয়ে বেরিয়ে গেল ম্যাকফারলেন। অফিসার দুজন দু-পাশে থেকে তাকে নিয়ে গেল অপেক্ষমাণ গাড়িতে। লেসট্রেড কিন্তু নড়ল না।

উইলের খসড়া করা নোটবইয়ের ছোঁড়া কাগজগুলো তুলে নিয়ে তীক্ষ্ণ্ণ চোখে দেখছিল হোমস–তার সারামুখে আগ্রহের নিবিড় রোশনাই।

কাগজগুলো লেসট্রেডের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল সে, দলিলটায় কতকগুলো বিদঘুটে পয়েন্ট রয়েছে, তাই না লেসট্রড?

এমনভাবে কাগজগুলো দেখতে লাগল লেসট্রেড যেন সব কিছুই গুলিয়ে গেল তার। একটু পরে বললে, লেখাটা পড়াও তো দেখছি বেশ মুশকিল। প্রথম কয়েকটা লাইন বেশ পড়া যাচ্ছে, তারপর আবার দ্বিতীয় পাতার মাঝের লাইনগুলোও বেশ স্পষ্ট। আর বোঝা যাচ্ছে সবশেষের দু-একটা লাইন। এগুলো ঠিক যেন ছাপার অক্ষরে লেখা। কিন্তু মাঝেরগুলো, বিশেষ করে তিন জায়গায় লেখা এমনই যাচ্ছেতাই যে একদম পড়তে পারছি না আমি।

এর মানে কী? শুধোল হোমস।

আপনি বলুন না এর মানে কী? পালটা প্রশ্ন করল লেসট্রেড।

মানে অতি সোজা। এটা লেখা হয়েছে চলন্ত ট্রেনের মধ্যে। স্পষ্ট লেখা মানে ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল, খারাপ লেখা মানে ট্রেন চলছিল, আর একদম যাচ্ছেতাই লেখা মানে ট্রেন কোনো পয়েন্টের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল। যেকোনো সায়েন্টিফিক এক্সপার্ট এক নজরেই বলবেন যে খসড়া করা হয়েছে শহরতলির লাইনে কেননা কোনো বিরাট শহরের একেবারে কাছটিতে আর কোথাও পর পর এত পয়েন্ট দেখতে পাওয়া যায় না। ধরে নেওয়া যাক, ট্রেন চলার সময়ে সারাপথটুকুই খসড়া করতে গেছে। ট্রেনটা তাহলে এক্সপ্রেস; নরউড আর লন্ডন ব্রিজের মাঝামাঝি জায়গায় শুধু থেমেছে একবারই।

হাসতে লাগল লেসট্রেড।

মস আপনি যখন আপনার থিয়োরি নিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন, তখন আর ত নাগাল পাওয়া এ-শর্মার কর্ম নয়। বর্তমান কেসের সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক তাই তো বুঝলাম না!

সম্পর্ক এইটুকু যে, জোনাস ওলডাকার যে গতকাল নরউড থেকে লন্ডন ব্রিজ আসার সময়ে উইলটা লিখেছিলেন–ম্যাকফারলেনের এই কাহিনির অন্তত এই অংশটুকুর সত্যতা প্রমাণিত হল। এ-রকম দরকারি একটা দলিল এমন যা-তা ভাবে লেখা হয়েছে ভাবলেও অদ্ভুত লাগে তাই না? এর অর্থ এই দাঁড়াতে পারে যে, ওলডাকার উইলটায় কোনোরকম গুরুত্বই আরোপ করেননি। উইলমতোই যে সব কিছু হবে, এ-রকম ধারণা একেবারেই তার মনে ছিল না। কার্যকর করার ইচ্ছে না-নিয়ে কোনো উইল যদি কেউ লেখে, তাহলে তা এইভাবেই লেখা স্বাভাবিক।

লেসট্রেড বলল, ভুলবেন না, নিজের মৃত্যুর পরোয়ানাও লেখা হয়েছে এইসঙ্গে।

ওহো, তুমি বুঝি তাই মনে কর?

আপনি মনে করেন না?

হতেও পারে। কেসটা কিন্তু এখনও তেমন পরিষ্কার হয়নি আমার কাছে।

এখনও হয়নি? এমন জলবৎ তরলং জিনিসটা যদি এখনও অপরিষ্কার থেকে যায় আপনার কাছে, তাহলে তো আমি নাচার। এমন কী আর কঠিন ব্যাপার! বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ যদি একটা জোয়ান ছেলে একদিন শোনে যে বিশেষ একটা বুড়ো অক্কা পেলেই বিরাট একটা সম্পত্তি হাতের মুঠোয় এসে যাচ্ছে, তখন সে করবে কী? খবরটা পাঁচকান না-করে চুপিসারে বুড়োর সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নিয়ে সেই রাতেই তার বাড়িতে সাক্ষাতের বন্দোবস্ত করবে সবার আগে। দেখা করার অছিলা খুঁজে বার করাটা বিশেষ কিছু কঠিন নয়। তারপর বাড়ির বাইরে ঘাপটি মেরে বসে থাকবে কোথাও যতক্ষণ না বুড়োর একমাত্র সঙ্গী চাকরটার নাক ডাকতে শুরু করেছে। এরপর তো খুবই সহজ। নিরালায় নিশুতি রাতে বুড়োর ঘরে ঢুকে তাকে পরলোকের পথ দেখিয়ে দেওয়ার পর লাশটাকে কাঠের গাদায় ঢুকিয়ে সবসুদ্ধ আগুন লাগিয়ে দিয়ে খোশমেজাজে বাকি রাতটা কাছাকাছি কোনো হোটেলে কাটিয়ে দেওয়াটা কি খুব অস্বাভাবিক, মি. হোমস? ঘরের মধ্যে আর ছড়িটার ওপর রক্তের দাগ যা পাওয়া গেছে তা খুবই সামান্য। অর্থাৎ আগে থেকেই খুনির মতলব ছিল রক্তারক্তি না-করেই কাজ সারা। লাশ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার মূলেও সেই কারণ–সব প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। কীরকম লাগল মি. হোমস? সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না কি?

একটু বেশি রকমের সম্ভব বলে মনে হচ্ছে। মাই গড লেসট্রেড, তোমার মস্ত মস্ত গুণগুলোয় কল্পনায় খাদ একেবারেই নেই। কিন্তু একটু যদি থাকত, এক মুহূর্তের জন্যেও যদি বেচারা ম্যাকফারলেনের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে তাহলে তুমি যত বড়ো দুঃসাহসীই হও না কেন, দিনে উইল করার প্রায় সঙ্গেসঙ্গে সেই রাতেই বুড়ো ওলডাকারকে কি খুন করার প্ল্যান করতে? দু-দুটো অসাধারণ ঘটনা এত তাড়াতাড়ি ঘটে যাওয়াটা তোমার পক্ষে খুব বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াত না? আর দেখ, খুন করার উদ্দেশ্য নিয়ে বাড়িতে ঢুকছে–অথচ সাক্ষী রেখে যাচ্ছে। চাকরকে। এ কেমনতরো প্ল্যান? সবশেষে, এত কষ্টে লাশটাকে সরিয়ে এনে কাঠের গাদায় আগুন দিলে খুনের প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে–অথচ, রক্তমাখা ছড়িটা রেখে এল বুড়োর ঘরেই তুমি হলে তাই করতে কি? কী হে, কীরকম বুঝছ? এসব সম্ভব বলে মনে হয়?

ছড়ি সম্বন্ধে বলা যায় যে, অবশ্য আপনিও তা জানেন, খুনের সময়ে এবং পরে খুনি বেসামাল হয়ে পড়ে এমন সব অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা করে বসে, যা ঠান্ডা মাথায় কারোর পক্ষেই সম্ভব হয় না। আবার ঘরে ফিরে গিয়ে ছড়ি আনার সাহস বোধ হয় তার ছিল না। না, মি. হোমস, এতে চলবে না। অন্য কোনো থিয়োরি যদি থাকে তো দিন।

কম করে আধ ডজন থিয়োরি এই মুহূর্তে দিতে পারি তোমায়!

একটা পয়েন্ট শুধু মনে রাখবেন মি. হোমস, মৃতের ঘর থেকে যতদূর জানি কোনো কাগজপত্র খোয়া যায়নি। আর, কাগজপত্র খোয়া না-গেলে সমূহ লাভ যার–এমন লোক শুধু একজনই আছে পৃথিবীতে। আইনানুসারে সমস্ত সম্পত্তির মালিক এখন মি. ম্যাকফারলেন, কাগজপত্র তো যথাসময়ে তার হাতে আসছেই, কাজেই সে তা সরাতে যাবে কেন?

কথাটা শুনে মনে হল হোমসের মনে খটকা লেগেছে।

অস্বীকার করে লাভ নেই যে প্রমাণগুলো সবই তোমার থিয়োরির অনুকূলে। তা সত্ত্বেও একটা কথাই শুধু বলে রাখতে চাই তোমায় লেসট্রেড–অন্যান্য থিয়োরি থাকা খুব বিচিত্র নয়। যাক, তোমার কথামতোই দেখা যাক, কার দৌড় কতদূর। গুড মর্নিং। নরউডে আজকে এলেও আসতে পারি। গেলে দেখতে পাব কীরকম কাজকর্ম চলছে তোমার।

লেসট্রেড চোখের আড়াল হতেই তৎপর হয়ে উঠল হোমস। এমনভাবে গোছগাছ শুরু করে দিলে না-জানি কী হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কাজই তাকে করতে হবে সারাদিন ধরে।

ফ্রক কোটটার মধ্যে হাত লাগাতে লাগাতে বলল হোমস, ওয়াটসন, আমার প্রথম গন্তব্যস্থান হচ্ছে, ব্ল্যাকহিদ।

নরউড নয় কেন?

কেননা, কেসটার পয়লা নম্বর বৈচিত্র্য হচ্ছে একই দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটো আশ্চর্য ঘটনা। পুলিশ মনোযোগ দিয়েছে দ্বিতীয় ঘটনায় কেননা খুনি সরাসরি জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। কিন্তু আমার মতে যুক্তির পথ ধরেই যদি চলতে হয়, তাহলে প্রথম ঘটনা থেকেই তদন্ত শুরু করা উচিত।

অনেক বেলায় ফিরল হোমস। শুকনো মুখ দেখেই বুঝলাম ব্যর্থ হয়েছে সে।

ব্ল্যাকহিদ গেছিলে?

গেছিলাম এবং গিয়েই জেনেছি যে বুড়ো ওলডাকার-এর মতো পাজির পা ঝাড়া দুনিয়ায় আর দুটি নেই। ম্যাকফারলেনের বাবা ছেলের খোঁজে বেরিয়েছিলেন। মা বাড়িতেই ছিলেন। ছোটোখাটো হৃষ্টপুষ্ট ভদ্রমহিলা, নীল নীল চোখ। ভয়ে আর ঘৃণায় তার সে-কাপুনি যদি দেখতে তুমি। ম্যাকফারলেনের অপরাধ স্বীকার করা তো দূরের কথা, এ-রকম কোনো সম্ভাবনাও তিনি মানতে রাজি নন। ভেবেছিলাম, ওলডাকারের শোচনীয় পরিণতি শুনে বিস্মিত হবেন ভদ্রমহিলা, নিদেনপক্ষে একটু দুঃখও প্রকাশ করবেন। কিন্তু সেসবের ধার দিয়েও গেলেন না উনি। ওলডাকারের নাম শোনামাত্র তেলেবেগুনে জ্বলে গিয়ে প্রথমেই ভদ্রমহিলা বললেন, মানুষ তো নয়, যেন একটা বড়ো সাইজের বাঁদর। শুধু আজ বলে নয়, ওর জোয়ান বয়স থেকেই এইরকম–যেমন ধড়িবাজ, তেমনি বদমাশ।

শুধোলাম–আপনি তাহলে সে সময় ওঁকে চিনতেন বলুন?

শুধু চিনতাম নয়, হাড়ে হাড়ে চিনতাম। লোকটা একসময়ে আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল মি, হোমস। কিন্তু আমার কপাল ভালো, সেই সময়ে আমার একটু সুমতি হওয়ায় এনগেজমেন্ট ভেঙে দিয়ে বিয়ে করি ওর চাইতে গরিব একজনকে।

ওলডাকার তাহলে এখন আপনাকে ক্ষমা করেছেন বলতে হবে। তা না-হলে তার সমস্ত সম্পত্তি আপনার ছেলেকে দিয়ে যেতেন?

আগুনে যেন ঘি পড়ল। দপ করে জ্বলে উঠে চিৎকার করে উঠলেন ম্যাকফারলেনের মা–জীবিত অথবা মৃত জোনাস ওলডাকারের কাছ থেকে কানাকড়িও চাই না আমার ছেলে অথবা

আমি।

বৃথাই চেষ্টা করলাম কিছুক্ষণ।কিন্তু আমাদের অনুমানের অনুকূলে তোদূরের কথা, প্রতিকূলেও কোনো পয়েন্ট পেলাম না ভদ্রমহিলার কাছ থেকে। শেষকালে হাল ছেড়ে দিয়ে গেলাম নরউডে।

প্রকাণ্ড হালফ্যাশনের ভিলা এই ডিপ ডেন হাউস। ইট বারকরা দেওয়াল, পলেস্তারার কোনো বালাই নেই। অনেকটা জমির ওপর দাঁড়িয়ে বাড়িটা, সামনের লনটা লরেল লতায় ঢেকে গেছে। রাস্তা থেকে একটু পেছনে ডান দিকে কাঠের স্তুপ রাখার উঠোন–আগুন লেগেছিল এইখানেই। নোটবইয়ের পাতায় মোটমুটি একটা স্কেচ করে এনেছি জায়গাটার। বাঁ-দিকে জানলাটা মি. ওলডাকারের ঘরের। দেখতেই পাচ্ছ, রাস্তা থেকেই জানলার মধ্যে দিয়ে ঘরের ভেতর দেখা যায়। আজকের অভিযানে এইটাই আমার একমাত্র সান্ত্বনা। লেসট্রেডকে দেখতে পেলাম না ওখানে, কিন্তু হেড কনস্টেবল বেশ খাতির করে সব দেখালে। আমি যাওয়ার ঠিক আগেই ওরা নাকি হিরে-জহরত পাওয়ার মতো বিরাট একটা আবিষ্কার করেছে শুনলাম। ছাইগাদা ঘাঁটতে ঘাঁটতে পোড়া দেহাবশেষ ছাড়াও কতকগুলো বিরং ধাতুর চাকতি পেয়েছে। খুব যত্ন করে চাকতি পরীক্ষা করে দেখলাম ওগুলো ট্রাউজার্সের বোতাম না হয়ে যায় না। একটা বোতামের ওপর হিয়ামস লেখা দেখে চিনতে পারলাম বুড়ো ওলডাকারের দর্জিকে। এরপর লনটা তন্নতন্ন করে দেখলাম যদি কিছু চিহ্ন-টিহ্ন পাওয়া যায়। কিন্তু অনাবৃষ্টির ফলে জমি শুকিয়ে এমনই লোহার মতো হয়ে গেছিল যে শুধু পণ্ডশ্রমই হল। কাঠের গাদার সঙ্গে এক রেখায় নীচু একটা ঝোপ ছিল। এই ঝোঁপের মধ্যে দিয়ে ভারী একটা বস্তু টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে–এ ছাড়া আর কিছু আবিষ্কার করতে পারলাম না আমি। অর্থাৎ যা কিছু পেলাম, সবই পুলিশের থিয়োরির স্বপক্ষে। অগাস্টের সূর্য পিঠে নিয়ে লনের ওপর হামাগুড়ি দিলাম ঘণ্টাখানেক ধরে। কিন্তু যে-তিমিরে ছিলাম, রইলাম সেই তিমিরেই। যখন এত করেও এক কণা আলোকপাত করতে পারলাম না, তখন ধুত্তোর বলে উঠে দাঁড়ালাম ধুলো ঝেড়ে।

যাই হোক, এইসব বারম্ভে লঘুক্রিয়ার পর গেলাম শোয়ার ঘরে। যথারীতি পরীক্ষা করলাম। রক্তের দাগ দেখলাম খুবই সামান্য, তাও বিবর্ণ হয়ে এসেছে। কিন্তু তবুও চিহ্নটা যে তাজা রক্তের সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ রইল না। ছড়িটাকে ওরা নিয়ে গেছিল, কিন্তু তাতেও শুনেছি রক্তের দাগ খুবই সামান্য। ছড়িটা যে আমাদের মক্কেলের, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। ম্যাকফারলেন নিজেই তো স্বীকার করেছে। কার্পেটের ওপর দুজন পুরুষের পায়ের ছাপ পেলাম–কিন্তু কোনো তৃতীয় জনের নয় অর্থাৎ আর একবার টেক্কা মারল লেসট্রেড। প্রতিটি প্রমাণ, প্রতিটি খুঁটিনাটি একে একে জোরালো করে তুলছে ওর থিয়োরিকে, আর আমরাই শুধু ন যযৌ অবস্থায় দাঁড়িয়ে লম্বা থিয়োরিই আউড়ে যাচ্ছি।

আশার সামান্য একটু আলো দেখেছিলাম, কিন্তু তাও শেষ পর্যন্ত টিকল না। আয়রন-সেফের জিনিসপত্র তন্নতন্ন করে দেখলাম। বেশির ভাগ কাগজপত্রই অবশ্য লেসট্রেড রেখে গেছিল বাইরে টেবিলের ওপর। সিল-করা কতকগুলো খামে ছিল কাগজগুলো। পুলিশ দু-একটা খুলেছে দেখলাম। দেখেশুনে দলিলগুলো খুব বিশেষ দরকারি বলে মনে হল না। ব্যাঙ্কের পাশ বই দেখে মি. ওলডাকারের আর্থিক প্রাচুর্যেরও বিশেষ কোনো প্রমাণ পেলাম না। এইটুকু বুঝলাম যে সবগুলো কাগজ সেখানে নেই। কতকগুলো দলিলের বার বার উল্লেখ দেখে মনে হল আসল দলিল বোধ হয় সেগুলোই। কিন্তু খুঁজে পেলাম না একটাও। শুধু এইটুকুই যদি আমরা অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে পারি, তাহলে তো এক হাত নেওয়া যায় লেসট্রেডের ওপর। লেসট্রেড খুব বড়াই করে গেল না, যে লোক সব কিছুরই মালিক হতে চলেছে দু-দিন পরেই, তার পক্ষে কাগজপত্র সরানো কোনোমতেই সম্ভব নয়? কাজেই, কাগজপত্র যে কিছু হারিয়েছে তা প্রমাণ করতে পারলে অন্তত কিছুটা কাজ হয়।

বাড়ির প্রতিটি মিলিমিটার তন্নতন্ন করে দেখে শেষকালে হাল ছেড়ে দিয়ে পড়লাম ঘরকন্নার কাজ যিনি দেখাশোনা করেন, তাঁকে নিয়ে। ভদ্রমহিলার নাম মিসেস লেক্সিংটন। মাথায় খাটো, গায়ের রং ময়লা, কথাবার্তা খুবই অল্প বলেন, আর তেরচা চোখে সবসময়ে সন্দেহের ছায়া। ইচ্ছে করলে লেক্সিংটন আমাকে অনেক কিছুই বলতে পারতেন। কিন্তু অনেক কিছু তো দূরের কথা, সামান্য কিছুও বার করতে পারলাম না তাঁর মোম-আঁটা মুখ থেকে। সাড়ে নটার সময় মি. ম্যাকফারলেনকে তিনি দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তার আগেই নাকি তার হাত দুটো খসে যাওয়া উচিত ছিল, তাহলে তো আর এত বড়ো কাণ্ডটা ঘটত না। সাড়ে দশটার সময় শুতে গেছিলেন তিনি। শোয়ার ঘর বাড়ির আর এক প্রান্তে, কাজেই এরপর কী হয়েছে-না-হয়েছে তা জানা তার পক্ষে সম্ভব নয়। যতদূর মনে হয় মি. ম্যাকফারলেন তার টুপি আর ছড়িটা হল ঘরে রেখে গেছিলেন। হঠাৎ আগুন, আগুন, চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে যায় তার। মি. ওলডাকারকে নিশ্চয় খুন করা হয়েছে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে। তার কোনো শত্রু ছিল কি না? শত্রু কার নেই? কিন্তু মি. ওলডাকার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন চব্বিশ ঘণ্টা এবং ব্যাবসা-সংক্রান্ত কথা না-থাকলে লোকজনের সঙ্গে দেখা করতেন না। বোতামগুলো দেখেছেন মিসেস লেক্সিংটন। গত রাতে মি. ওলডাকার যে-ট্রাউজার্স পরেছিলেন বোতামগুলো তারই। মাসখানেক বৃষ্টি না-হওয়ায় কাঠের গাদা শুকিয়ে খটখটে হয়েছিল। কাজেই খড়ের গাদার মতো দাউ দাউ করে সব জ্বলতে থাকে। মিসেস লেক্সিংটন যখন এসে পৌঁছোলেন, তখন আগুনের লকলকে শিখা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাননি। মাংস পোড়ার গন্ধ পেয়েছিলেন তিনি এবং দমকল বাহিনীর লোকেরা। মি. ওলডাকারের ব্যক্তিগত ব্যাপারে বা দলিলপত্র সম্বন্ধে কিছুই জানেন না মিসেস লেক্সিংটন।

মাই ডিয়ার ওয়াটসন, এই হল আমার আজকের ব্যর্থতার রিপোর্ট। কিন্তু তবুও–তবুও প্রবল প্রত্যয় যেন ঠিকরে পড়ে তার সরু সরু শিরাবহুল হাতের শক্ত মুঠির মধ্যে দিয়ে–তবুও আমি জানি সব ভুল, সমস্ত মিথ্যে। কোথায় যেন কী-একটা লুকিয়ে আছে। কিছুতেই আড়াল থেকে তা সামনে আসছে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মিসেস লেক্সিংটন ভালোভাবেই জানেন তা কী। ভদ্রমহিলার দু-চোখে আমি এমন এক চাপা বেপরোয়া ভাব দেখেছি যা শুধু জেনেশুনে অপরাধ যারা করে বা লুকিয়ে রাখে তাদের চোখেই দেখা যায়। যাক, এ নিয়ে আর মিথ্যে মাথা ঘামিয়ে কোনো লাভ নেই, ওয়াটসন। দৈব যদি সহায় হয়, কপালজোরে আকাশ ছুঁড়ে কোনো প্রমাণ-টমান যদি হাতের মুঠোয় এসে পড়ে, তবেই জেনো এ-রহস্যের আসল সমাধান আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দিতে পারব জনসাধারণকে। তা না-হলে আমাদের সাফল্যের ইতিহাসে চিরকাল ব্যর্থতার কালিমা নিয়ে বেঁচে থাকবে নরউড অন্তর্ধানের এই বিচিত্র মামলা।

আমি বললাম, অত ভেঙে পড়ছ কেন, ম্যাকফারলেনের চেহারা দেখেও তো জুরিদের মন টলতে পারে?

মাই ডিয়ার ওয়াটসন, বড়ো বিপজ্জনক যুক্তি এনে ফেললে তুমি। পয়লা নম্বরের খুনে গুন্ডা বার্ট স্টিভেন্স-এর কথা তোমার মনে আছে? ৮৭ সালে আমাদেরও তার পথ থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল? মনে পড়েছে? তার চেয়ে গোবেচারা, শান্তশিষ্ট, মিষ্টি স্বভাবের মানুষ কি আর তুমি দেখেছ?

তা অবশ্য সত্যি।

দু-নম্বর থিয়োরি না-পেলে ত্রিলোকের কারো ক্ষমতা নেই ম্যাকফারলেনকে ফাঁসির দড়ি থেকে রক্ষা করে। ওর বিরুদ্ধে যে-মামলা দাঁড় করানো হবে, তার মধ্যে একরতি ভুলও খুঁজে পাবে না তুমি উলটে যত দিন যাচ্ছে, ততই নিত্যনতুন প্রমাণ বার করে কেসটা জোরালো করে তুলছে লেসট্রেড। ভালো কথা, কাগজপত্র দেখে মনে হল তদন্ত চালানোর মতো অন্তত একটা সূত্র পেয়েছি আমি। পাশবইতে অত কম জমা দেখে সন্দেহ হওয়ায় একটু ভালো করে খুঁজতেই দেখলাম গত এক বছর এন্তার চেক কাটা হয়েছে মি. কর্নিলিয়াস নামে এক ভদ্রলোকের নামে। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স কমে যাওয়ার মূল কারণ হল এইটাই। কে এই মি. কর্নিলিয়াস? অবসর নেওয়ার পরেও মি. ওলডাকারের সঙ্গে তার এত টাকা লেনদেনের কারণ কী, তা আমাকে জানতেই হবে। এ-ব্যাপারে লোকটার কোনো হাত আছে কি? এও হতে পারে আসলে কর্নিলিয়াস একজন দালাল ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু সেক্ষেত্রেও তো কঁচা অথবা পাকা যা হয় একটা রসিদ থাকা দরকার। কিন্তু সে-রকম কিছুই নেই অথচ বিপুল অর্থের বিস্তর চেক কাটা হয়েছে তার নামে। আর কিছু যদি না-পারি তাহলে অন্তত এই খাতেই শুরু করতে হবে আমার গবেষণা। ব্যাঙ্কে গিয়ে তদন্ত করে জানতে হবে, যে-ভদ্রলোক এতগুলো চেক নিয়মিত ভাঙিয়ে নিয়ে গেছে কী তার পরিচয়। কিন্তু সত্যিই কি শেষই পর্যন্ত কোনো সুরাহা হবে ওয়াটসন? আমার মন বলছে, হবে না। বুক ফুলিয়ে বেচারা ম্যাকফারলেনকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাবে লেসট্রেড। আর কাগজ কাগজে উচ্ছ্বসিত ভাষায় বিজয়গাথা লেখা হবে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের।

সে-রাতে শার্লক হোমস ঘুমোতে পেরেছিল কি না জানি না। পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে নেমে দেখলাম উশকোখুশকো অবস্থায় আগে থেকেই বসে রয়েছে সে। টেবিলের ওপর একটা খোলা টেলিগ্রাম।

আমাকে দেখেই টেলিগ্রামটা আমার দিকে টোকা মেরে এগিয়ে দিয়ে বললে, ওয়াটসন এ-সম্বন্ধে তোমার কী মনে হয়?

টেলিগ্রামটা এসেছে নরউড থেকে:

গুরুত্বপূর্ণ তাজা প্রমাণ হাতে এসেছে। ম্যাকফারলেনের অপরাধ অবিসম্বাদিতভাবে প্রমাণিত হল। আমার উপদেশ–এ-কেস ছেড়ে দিন।–লেসট্রেড।

ব্যাপার বেশ গুরুতর মনে হচ্ছে।

আমার ওপর এক হাত নেওয়ার আনন্দে এবার বক দেখাতে শুরু করেছে লেসট্রেড, তিক্ত হেসে বলল হোমস। আমি কিন্তু এত সহজে ছাড়ছি না, সে সময় আসেনি এখনও। খুব দরকারি, দারুণ গুরুত্বপূর্ণ টাটকা প্রমাণের দু-দিকে ধার থাকে, জান তো। শাঁখের করাতের মতো যেতেও কাটে, আসতেও কাটে। লেসট্রেড যেদিক দিয়ে আমায় কুপোকাত করতে চাইছে, ওরই শিলনোড়া দিয়ে উলটোদিক থেকে হয়তো আমিও ওকে বেকায়দায় ফেলতে পারি। ব্রেকফার্স্ট খেয়ে নাও ওয়াটসন। আজ আমরা একসঙ্গেই বেরোব। বেশ বুঝছি, তোমার সঙ্গ, তোমার উপদেশ, তোমার সাহায্য ছাড়া এক পা-ও আজ আমি চলতে পারব না।

হোমস নিজে কিন্তু মুখে একটা দানাও দিলে না। না-দেওয়ার কারণও আমি জানি। তার অদ্ভুত খামখেয়াল স্বভাবের এও একটা দিক। চিন্তাভাবনা উবেগের চরমে পৌঁছেলেই খাওয়ার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলে সে। কাজেই সেদিন সকালে ব্রেকফার্স্ট স্পর্শ না-করে সে যখন আমাকে নিয়ে রওনা হল নরউডের দিকে, তখন খুব বেশি অবাক হইনি। ডিপডেন হাউসের চারদিকে তখনও এখানে-সেখানে বহু লোক দাঁড়িয়ে জল্পনাকল্পনা করছিল। মনে মনে বাড়িটা সম্বন্ধে যে-ছবি এঁকেছিলাম, বাস্তবেও দেখলাম প্রায় তাই। ফটকের মধ্যে মোলাকাত হয়ে গেল লেসট্রেডের সঙ্গে। জয়ের আনন্দ ফুটে উঠেছিল তার চোখ-মুখের হাবভাবে।

আমাদের দেখেই সোল্লাসে চেঁচিয়ে ওঠে লেসট্রেড, হ্যালো, মি. হোমস কতদূর এগোলেন? আমার থিয়োরি যে ভুল তা প্রমাণ করতে পারলেন নাকি? হাতের তাসে তুরুপ মিলল?

হোমস বলল, এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোইনি আমি।

কিন্তু আমরা পৌঁছেছি। গতকালই পৌঁছেছিলাম, আপনাকে তা বলেওছি। আর, আজ তা প্রমাণিত হল এবং এখন আপনাকে দেখাব। যাক, এবার তাহলে আপনার আগে আগেই চলেছি আমরা, কি বলেন মি. হোমস?

হোমস বলল, মনে হচ্ছে দারুণ অস্বাভাবিক একটা কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছ? ব্যাপার কী!

অট্টহাস্য করে উঠল লেসট্রেড।

আপনি দেখছি কিছুতেই আমাদের মতো হার স্বীকার করতে রাজি নন। প্রতিবারেই ঠিক পথে চলব, এমনটি আশা করা উচিত নয়–কী বলেন, ডা. ওয়াটসন? দয়া করে এদিকে আসুন, ম্যাকফারলেন যে খুনি, এ-সম্বন্ধে যদি কোনো সন্দেহ এখনও থাকে, তবে তা ভঞ্জন করে যান।

লেসট্রেডের পিছু পিছু প্যাসেজ পেরিয়ে অন্ধকার একটা হল ঘরে পৌঁছোলাম আমি আর হোমস।

লেসট্রেড বলল, খুন করার পর টুপি নেওয়ার জন্য এ-ঘরেই এসেছিল ম্যাকফারলেন ছোকরা। এদিকে দেখুন। বলেই আচম্বিতে নাটকীয়ভাবে ফস করে একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে দেওয়ালের সামনে ধরল সে।

সাদা চুনকাম করা দেওয়ালে দেখলাম সাদা রক্তের দাগ। জ্বলন্ত কাঠিটা আরও কাছে এগিয়ে নিয়ে যা দেখলাম তা নিছক রক্তের দাগ নয়, আরও কিছু। বুড়ো-আঙুলের একটা সুস্পষ্ট ছাপ ফুটে রয়েছে সাদা দেওয়ালের ওপর।

মি. হোমস, আপনার আতশকাচ দিয়ে দেখুন দাগটা।

হ্যাঁ দেখেছি!

জানেন তো দুটো বুড়ো আঙুলের ছাপ কখনো এক হয় না?

এ-রকম কথা শুনেছি বটে।

বেশ, তাহলে এই নিন মোমের ওপর তোলা ম্যাকফারলেনের বুড়ো আঙুলের ছাপ। এ-ছাপ নেওয়া হয়েছে আজ সকালেই। এবার দয়া করে ছাপ দুটো পাশাপাশি রেখে একটু মিলিয়ে দেখবেন কি?

দেওয়ালের রক্তের ছাপের পাশে মোমের ছাপটা ধরতেই আর আতশকাচের দরকার হল না। শুধু চোখেই পরিষ্কার দেখলাম দুটো ছাপই উঠেছে একই বুড়ো আঙুল থেকে। এবং চকিতে বুঝলাম, ম্যাকফারলেনের ফাঁসির দড়ি আলগা করার ক্ষমতা হোমসের কেন, ত্রিভুবনের কারো নেই।

লেসট্রেড বললে, এইখানেই তদন্তের শেষ।

হ্যাঁ, সব শেষ। প্রতিধ্বনি করলাম আমি।

সব শেষ। বলল হোমস।

হোমসের সুরটা যেন কীরকম! কানে লাগতেই ফিরে তাকালাম ওর পানে।

দেখি আশ্চর্য এক পরিবর্তন এসেছে ওর চোখে-মুখে সর্বদেহে। চাপা উল্লাসে যেন ময়ূরের মতো নৃত্য জুড়েছে ওর দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণু। আকাশের তারার মতো ঝকঝক করছিল ওর চোখ দুটো। মনে হল যেন দেহের মনের সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রাণপণে অদম্য অট্টহাসিকে বাঁধ দিয়ে আটকে রাখতে চেষ্টা করছে সে।

কী সর্বনাশ! কী সর্বনাশ! ছোকরার পেটে পেটে এত শয়তানি? আমি তো কল্পনাও করতে পারিনি। দেখতে তো দিব্যি শান্তশিষ্ট যেন সাত চড়ে রা বেরোয় না। আর তলে তলে কিনা… নাঃ লেসট্রেড, খুব শিক্ষা হল আমার। নিজের বিচারবুদ্ধিকে দেখছি আর বিশ্বাস করা চলে না।

তা ঠিকই বলেছেন মি. হোমস। আমাদের মধ্যে কারো কারো আত্মবিশ্বাসের বড়ো বাড়াবাড়ি দেখা যায়। অতটা ঠিক নয়। লোকটার স্পর্ধা দেখে মাথা গরম হয়ে গেল আমার। হোমস কিন্তু গায়ে মাখল না কিছু।

বলল, আমাদের পরম সৌভাগ্য আলনা থেকে টুপি নেওয়ার সময়ে দেওয়ালের উপর আঙুল টিপে ছাপটা রেখে গেল ম্যাকরফারলেন। যতই ভাবছি ততই মনে হচ্ছে কী নিরেট গাধা আমি। এমন স্বাভাবিক জিনিস।… ভালো কথা লেসট্রেড, এতবড়ো আবিষ্কারটা কার শুনি? হোমসের স্বর অত্যন্ত শান্ত। কিন্তু কথা বলার সময় যেন চাপা উত্তেজনা ঠিকরে ঠিকরে পড়তে লাগল তার ভাবে ভঙ্গিতে।

মিসেস লেক্সিংটনের। রাতের পাহারাদারকে ডেকে দাগটা দেখান উনি।

রাতের পাহারাদার তখন ছিল কোথায়?

যে-ঘরে খুনটা হয়েছে সেই ঘরেই ডিউটি ছিল তার। ঘরের জিনিসপত্র যাতে খোয়া না-যায়, তাই তাকে রেখেছিলাম।

কিন্তু গতকাল এ-দাগ পুলিশের চোখে পড়েনি কেন?

হল ঘরের দেওয়াল পরীক্ষা করার মতো বিশেষ কোনো কারণ তখন ছিল না বলে। তা ছাড়া দেখতেই তো পাচ্ছেন ঘরটা এমন জায়গায় যে সবার চোখ এড়িয়ে যায়। আমরাও তাই বিশেষ নজর দিইনি।

ঠিক, ঠিক। দাগটা গতকাল তাহলে ছিল, কেমন?

লেসট্রেড এমনভাবে হোমসের পানে তাকালে যে আমার মনে হল তার ধারণা মাথা-টাথা খারাপ হয়েছে তার। স্বীকার করতে লজ্জা নেই আমিও হোমসের কাণ্ডকারখানা দেখে অবাক হয়ে গেছিলাম। চোখ-মুখে দেহে খুশির রোশনাই, অথচ কথাবার্তা পর্যবেক্ষণ এলোমেলো, উদ্দাম।

লেসট্রেড বললে, মাঝরাতে ম্যাকফারলেন হাজত থেকে বেরিয়ে দেওয়ালের ওপর আঙুলের ছাপ রেখে গেছে ফাঁসির পথ সুগম করতে–এই যদি আপনি ভেবে থাকেন, তাহলে আমার আর কোনো জবাব নেই। পৃথিবীতে যেকোনো বিশেষজ্ঞকে আমি চ্যালেঞ্জ করছি–প্রমাণ করুন তিনি যে এ-ছাপ ম্যাকফারলেনের আঙুলের ছাপ নয়।

এ যে তারই বুড়ো আঙুলের ছাপ, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই আমার।

তবে আর কী? মি. হোমস, আমি প্র্যাকটিক্যাল মানুষ। প্রমাণ যখন পাই, সিদ্ধান্ত তৈরি করি তখন। বসবার ঘরে চললাম আমি রিপোর্ট লিখতে। যদি আপনার আর কিছু বলবার থাকে এ-সম্বন্ধে চলে আসুন সেখানে।

আবার নির্বিকার হয়ে গেছিল হোমস। যদিও তখনও তার হাবেভাবে কৌতুকের ছটা আমার চোখ এড়াল না।

ওয়াটসন, ম্যাকফারলেনের তো ভারি বিপদ হল দেখছি। আমি কিন্তু এখনও হাল ছাড়িনি। এমন কতকগুলো আশ্চর্য পয়েন্ট এসেছে হাতে যে হাল ছাড়তে ইচ্ছে যাচ্ছে না।

আন্তরিকভাবেই বললাম, শুনে আমার সত্যি সত্যি আনন্দ হচ্ছে, হোমস। আমি তো ভাবলাম দফারফা হয়ে গেল বেচারির।

মাই ডিয়ার ওয়াটসন, এত সহজে ভেঙে পড়লে কি চলে? আসল ব্যাপার কি জান? লেসট্রেড খেটেখুটে যেসব প্রমাণ জড়ো করে খাড়া করেছে কেসটাকে, তাদের মধ্যে মারাত্মক গলদ থেকে গেছে একটায়। লেসট্রেড কিন্তু সেই ভুল প্রমাণ নিয়েই তাণ্ডব নৃত্য শুরু করে দিয়েছে।

তাই নাকি! কোনটা শুনি?

গতকাল হল ঘরটা আমি পরীক্ষা করেছিলাম এবং আঙুলের কোনো ছাপ আমি তখন দেখিনি। এ-প্রসঙ্গ এখন থাকুক ওয়াটসন। চলো, খোলা রোদুরে এক পাক ঘুরে আসা যাক।

বাড়ির প্রতিটা দিক নতুন আগ্রহ নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল হোমস। তারপর ভেতরে এসে একতলা থেকে শুরু করে চিলেকোঠা পর্যন্ত কিছুই দেখতে বাকি রাখল না। বেশির ভাগ ঘরেই আসবাবপত্রের কোনো বালাই নেই, তবুও তন্নতন্ন করে দেখতে ছাড়ল না হোমস। ওপরের শোবার ঘর মোট তিনটে, কিন্তু ফাঁকা পড়ে থাকে বারোমাস, কেউই থাকে না সেখানে। চারিদিক ঘিরে চওড়া একটা করিডোর। এইখানে এসেই আবার নতুন করে আনন্দে আটখানা হয়ে পড়ল হোমস।

ওয়াটসন, বাস্তবিকই কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে কেসটায়। আমার তো মনে হয় এবার লেসট্রেডকেও আমাদের দলে টেনে নেওয়া উচিত। আমাদের ওপর টেক্কা দেওয়ায় বেশ কিছুক্ষণ হাসাহাসি করেছে লোকটা। আমার অনুমান যদি সত্য বলে প্রমাণ করতে পারি, তাহলে তার খানিকটা শোধ নেওয়া যেতে পারে। ঠিক, ঠিক, খাসা মতলব এসেছে মাথায়।

বাইরের ঘরে বসে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা-প্রবর পরম উৎসাহে রিপোর্ট লিখে চলেছিল। হোমস এসে বাধা দিয়ে বললে, কেসটার রিপোের্ট লিখছ নাকি?

হ্যাঁ।

শেষ না-দেখেই?

মানে?

মানে এই যে, আমার বিশ্বাস সব প্রমাণ এখনও তোমার হাতে আসেনি।

হোমসকে হাড়ে হাড়ে চেনে লেসট্রেড এবং বেশ জানে তার এ ধরনের কথাবার্তাকে আমল–দেওয়া খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কলম রেখে অদ্ভুতভাবে হোমসের পানে তাকাল সে।

বলল, কী বলতে চান মি. হোমস?

শুধু একটি কথা–যে-সাক্ষীকে আমাদের দারুণ দরকার, তাকে তুমি এখনও দেখতেই পাওনি।

আপনি দেখাতে পারেন?

মনে হচ্ছে পারি।

তাহলে দেখান।

আমার যথাসাধ্য আমি করব লেসট্রেড। কতজন কনস্টেবল আছেন এখানে?

তিনজন।

চমৎকার! প্রত্যেকে ষণ্ডামার্কা শক্তসমর্থ পুরুষ তো! তারস্বরে চেঁচাতে পারে সবাই?

হ্যাঁ, প্রত্যেকেই ষণ্ডামার্কা গাট্টাগোট্টা জোয়ান। কিন্তু তারস্বরে চেঁচানোর সঙ্গে এ-কেসের কী সম্পর্ক তা বুঝলাম না।

বুঝিয়ে দেব একটু পরেই—শুধু এই সম্পর্কে নয়, আরও অনেক কিছু। তোমাদের পালোয়ানদের তাহলে হাঁক দাও–আর দেরি করে কী লাভ!

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তিনজন এসে জমায়েত হল হল ঘরে।

হোমস বললে, আউটহাউসে প্রচুর খড় আছে। দুটো আঁটি সেখান থেকে নিয়ে এসো তোমরা। খড়টা থাকলে চট করে সাক্ষী বেরিয়ে আসবে সবার সামনে অন্তত আমার তো তাই বিশ্বাস। ধন্যবাদ। ওয়াটসনের পকেটে দেশলাই আছে। মি. লেসট্রেড, এবার সবাই মিলে আমার পিছু পিছু চলে এসো ওপরতলায়।

আগেই বলেছি, ওপরতলায় তিনটে শোবার ঘর ঘিরে ছিল এক চওড়া করিডোর। করিডোরের এক প্রান্তে সদলবলে এসে পৌঁছাল হোমস। কনস্টেবলরা দাঁত বার করে হাসতে শুরু করে দিয়েছিল। লেসট্রেড বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়েছিল বন্ধুবরের পানে। হোমসের দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা দেখে মনে হল যেন ঐন্দ্রজালিক এসে দাঁড়িয়েছে ভেলকি দেখিয়ে আমাদের মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যে।

একজন কনস্টেবলকে দু-বালতি জল আনতে পাঠাও তো লেসট্রেড। খড়ের বান্ডিল দুটো এখানে রাখো মেঝের ওপর–দু-দিকের দেওয়াল থেকে যেন তফাতে থাকে। ঠিক আছে, আমরা তৈরি।

রাগে লাল হয়ে উঠেছিল লেসট্রেডের মুখ।

মি. শার্লক হোমস, এ কি ছেলেখেলা হচ্ছে? আপনি যদি সত্যিই কিছু জেনে থাকেন, তবে তা এভাবে লোকহাসানো ভড়ং না-দেখিয়ে খুলে বলা উচিত আপনার।

মাই গড লেসট্রেড, তুমি তো জানই, জবরদস্ত কারণ না-থাকলে আমি কিছুই করি না। ঘণ্টা কয়েক আগে সাফল্যের সূর্য যখন প্রায় তোমার দিকেই ঢলে পড়েছিল, তখন আমাকে নিয়ে যে একটু ঠাট্টা-তামাশা জুড়েছিলে তা নিশ্চয় এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওনি। কাজেই আমি যদি একটু ধুমধাম করি, একটু উৎসব করি, তাহলে তো তোমার গায়ের জ্বালা হওয়া উচিত নয়। ওয়াটসন, এদিকের জানলাটা খুলে দিয়ে খড়ের গাদায় আগুন লাগাও।

করলাম তাই। জানলা দিয়ে হাওয়ার ঝাঁপটা আসায় পট পট শব্দে দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল শুকনো খড়ের গাদা, পুঞ্জ পুঞ্জ ধোঁয়ায় দেখতে দেখতে ভরে উঠল সমস্ত করিডোরটা।

লেসট্রেড, এবার দেখা যাক পাওয়া যায় কি না আমার সাক্ষীকে! সবাই মিলে একসঙ্গে গলা চিরে আগুন বলে চিৎকার করে উঠবে। সবাই তৈরি তো? আচ্ছা: এক, দুই, তিন—

আগুন! একসঙ্গে সবাই বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠলাম।

ধন্যবাদ। আর একবার কষ্ট দেব তোমাদের।

আগুন!

আর একবার–সবাই মিলে।

আগুন! নরউডের প্রত্যেকেই বোধ হয় আঁতকে উঠেছিল সে বাজখাই চেঁচানি শুনে!

শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই ঘটল আশ্চর্য ব্যাপারটা। করিডোরের যে-অংশটা চুনকাম করা নিরেট দেওয়াল ভেবেছিলাম, আচম্বিতে দড়াম করে সেখানকার খানিকটা অংশ ফাঁক হয়ে গেল দরজার মতো এবং গর্তের মধ্যে থেকে খরগোশ যেমন তড়াক করে লাফিয়ে বেরিয়ে আসে, ঠিক তেমনিভাবে ছিটকে দরজার ওপাশ থেকে এপাশে এসে পড়ল শুকনো চেহারার খর্বকায় একটি মানুষ।

শান্তস্বরে বলল হোমস, ক্যাপিটাল! ওয়াটসন, এক বালতি জল ঢেলে দাও খড়ের গাদায়। ঠিক আছে, ওতেই হবে! লেসট্রেড, এই হল তোমার পয়লা নম্বরের অদৃশ্য সাক্ষী, মি. জোনাস ওলডাকার।

ফ্যালফ্যাল করে নবাগতের দিকে তাকিয়েছিল লেসট্রেড। আর হঠাৎ করিডোরের জোরালো আলোয় বেরিয়ে এসে চোখ পিট পিট করে ধূমায়িত খড়ের গাদা আর আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল ভোজবাজির মতো বেরিয়ে আসা নবাগত লোকটা। জঘন্য মুখ তার–যেমন ধূর্ত, তেমনি কুটিল, মুখের পরতে পরতে বিদ্বেষ-বিষ ছড়ানো। হালকা, ধূসর দুটি চঞ্চল চোখ আর ধবধবে সাদা চোখের পাতা দেখলেই কেমন যেন মনে হয় ফিচেল বুদ্ধিতে জুড়ি নেই এ-বুড়োর।

অনেকক্ষণ পরে সামলে নিয়ে হুংকার দিয়ে ওঠে লেসট্রেড, এসবের মানে কী? এতদিন ওর ভেতরে কী করছিলেন শুনি!

রাগে গনগনে হয়ে উঠেছিল লেসট্রেডের মুখ। কুঁচকে ছোটো হয়ে গিয়ে হাসবার চেষ্টা করল ওলডাকার। বলল, কারো কোনো ক্ষতি করিনি আমি।

করেননি? নিরপরাধ একটি ছেলেকে ফাঁসির কাঠে ঝোলাতে হলে যা যা দরকার সবই করছেন আপনি। এই ভদ্রলোক না-থাকলে তো আপনার টিকি ধরা যেত না।

কাঁদো কাঁদো হয়ে উঠল ওলডাকারের কুৎসিত জানোয়ারের মতো মুখখানা। প্যানপেনে নাকি সুরে বলল, বিশ্বাস করুন স্যার, নিছক তামাশা ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না আমার।

আঁ, তামাশা? তামাশা বার করে দিচ্ছি আপনার কয়েক বছরের জন্য রামগরুড়ের ছানা বানিয়ে ছাড়ব আপনাকে। নীচে নিয়ে যাও একে–আমি না-আসা পর্যন্ত বসবার ঘরে আটকে রাখো।

ওয়াটসন! চলো এবার দেখা যাক ইঁদুরটা ঘাপটি মেরে বসে ছিল কোথায়।

কাঠের ওপর পলেস্তারা করা পার্টিশনের ঘায়ে সুকৌশলে লুকোনো দরজাটা। দেখলে মনে হয়, প্যাসেজের শেষ বুঝি এইখানে, কিন্তু দরজা খুললে বোঝা যায় আরও ছ-ফুট পরে নিরেট দেওয়ালের ধারে এসে তার শেষ। বরগার কাছে সরু সরু ঘুলঘুলি দিয়ে সামান্য আলো আসছিল ঘরটায়। দু-একটা আসবাবপত্র, খাবার আর জল ছাড়াও প্রচুর বই আর দৈনিক পড়ে থাকতে দেখলাম কুঠরির মধ্যে।

বেরিয়ে এসে হোমস বলল, স্থপতি হওয়ার সুবিধে তো এইখানেই। কাকপক্ষীকে না-জানিয়ে নিজেই বানিয়ে রেখেছে খাসা চোরাকুঠরিটা—বিটলেমোর সাক্ষী রেখেছে শুধু একজনকে, মিসেস লেক্সিংটন। লেসট্রেড, এ-ভদ্রমহিলাকেও ঝোলায় পুরতে ভুলো না যেন।

ভুলব না মি. হোমস। কিন্তু এ-জায়গার হদিশ কী করে পেলেন বলুন তো?

প্রথম থেকেই আমার স্থির বিশ্বাস ছিল বিটলে বুড়োটা বাড়িতেই লুকিয়ে আছে। দুটো করিডোরেই পা মেপে মেপে হেঁটে দেখলাম, ওপরেরটা নীচেরটার চাইতে ছ-ফুট কম লম্বা। সুতরাং আমার বিশ্বাস যে অমূলক নয় প্রমাণ পেলাম এবং তার গোপন জায়গারও হদিশ পেলাম। আগুন আগুন চিৎকার শুনলে প্রাণের ভয়ে কোটর ছেড়ে সে বেরোবেই–তাই ওই ছোট্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন। অবশ্য ওসব কিছু না-করেই তাকে গ্রেপ্তার করা যেত, কিন্তু তার নিজে বেরিয়ে আসাটা বেশ একটা মজার দৃশ্য হবে মনে করেই এ-নাটকের অবতারণা করেছি। এ ছাড়াও একটা উদ্দেশ্য ছিল; আজ সকালে তোমার মশকরার প্রতিফল এইভাবে তোমার পাওয়া উচিত।

সেদিক দিয়ে আপনি আমার উচিত শিক্ষাই দিয়েছেন, স্যার। কিন্তু লোকটি যে বাড়িতেই ঘাপটি মেরে আছে–এ-খবর আপনি পেলেন কার কাছ থেকে?

বুড়ো আঙুলের ছাপের কাছ থেকে। তুমি বললে, সব শেষ। আমিও বললাম তাই–কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে। আমি জানতাম গতকাল এ-ছাপ ছিল না ওখানে। সব জিনিস আমি একটু বেশি খুঁটিয়ে দেখি, আড়ালে-আবডালে দু-চার কথা বলতেও ছাড় না তোমরা। গতকাল হল ঘরটাও আমি এইভাবে দেখেছিলাম বলে ভালো করেই জানতাম দেওয়ালে কোনো দাগ ছিল না। তাহলে দাঁড়াচ্ছে ছাপটা ফেলা হয়েছে রাত্রেই।

কিন্তু কীভাবে?

খুব সহজে। প্যাকেটগুলো গালামোহরকরার সময়ে জোনাস ওলডাকার একবার ম্যাকফারলেনের বুড়ো আঙুলটা নরম মোমের ওপর চেপে ধরে গালার ওপর টিপে ধরেন। জিনিসটা এমনই স্বাভাবিক এবং এতই তাড়াতাড়ি হয়েছে যে খুব সম্ভব ম্যাকফারলেনের নিজেরও তা মনে নেই। ওলডাকার অবশ্য মনে কোনো প্যাঁচ না-নিয়েই এ-কাজ করেছেন। পরে, চোরাকুঠরির মধ্যে একলা বসে সমস্ত কেসটা মনে মনে তোলপাড় করার সময়ে ওঁর মাথায় আসে যে, ছাপটাকেই কাজে লাগিয়ে অকাট্য প্রমাণ খাড়া করে আরও জোরালো করে তোলা যাবে বেচারি ম্যাকফারলেনের মামলাকে। গালামোহর থেকে বুড়ো আঙুলের ছাপটা মোমের ছাঁচে তুলে নেওয়া খুবই সোজা। তারপরে আঙুলে আলপিন ফুটিয়ে রক্ত বার করে, সেই রক্ত দিয়ে মোমের ছাঁচটাকে ভিজিয়ে নিয়ে দেওয়ালে টিপেছেন হয় তিনি নিজেই, আর না হয় মিসেস লেক্সিংটন। দলিলপত্রগুলো যদি একবার নেড়েচেড়ে দেখ লেসট্রেড, আমি বাজি রেখে বলতে পারি অন্তত একটা গালামোহরে ম্যাকফারলেনের ছাপ তুমি পাবেই।

ওয়ান্ডারফুল। সোল্লাসে চেঁচিয়ে ওঠে লেসট্রেড।ওয়ান্ডারফুল! আপনার কথা শুনে সব কিছুই ক্রিস্টালের মতো পরিষ্কার মনে হচ্ছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন মি. হোমস, এই সাংঘাতিক শঠতার উদ্দেশ্য কী?

আমার খুব মজা লাগছিল লেসট্রেডের ছেলেমানুষের মতো প্রশ্ন করা দেখে, অশিষ্ট আচরণের খোলস চকিতে খসিয়ে ফেলে শিষ্যর মতো গুরুর কাছে সমস্যা সমাধানের প্রয়াস দেখে।

উদ্দেশ্য অনুমান করা খুব কঠিন নয়, লেসট্রেড। জোনাস ওলডাকারের মতো দারুণ ঈর্ষাকাতর, প্রতিহিংসাপরায়ণ লোক তুমি দুটি দেখতে পাবে কিনা সন্দেহ। জান কি, ম্যাকফারলেনের মা তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়নি? জান না? তখনই আমি তোমায় বললাম শুরু কর ব্ল্যাকহিদে, শেষ কর, নরউডে। যাক, ম্যাকফারলেনের মায়ের এই প্রত্যাখ্যান ওলডাকারের বুকে যে-প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়েছিল, তা জ্বলেছে সারাজীবন। বয়সের ভারে ক্ষমার বারিসিঞ্চনে তা স্তিমিত হয়ে আসার বদলে আরও লেলিহান হয়ে উঠেছে। বিদ্বেষ-বিষে জর্জর কুটিল মস্তিষ্কে সারাজীবন ধরে শুধু প্ল্যান এঁটেছেন আর প্রতীক্ষা করেছেন, সুযোগ কিন্তু আসেনি। গত দু-এক বছর ধরে কপাল বড়ো মন্দ গেছে তার। লুকিয়ে-চুরিয়ে শেয়ার মার্কেটে ভাগ্যপরীক্ষা করতে গিয়ে খুব সম্ভব বেকায়দায় পড়েছিলেন। পাওনাদারদের বুড়ো আঙুল দেখানোর মতলব এঁটে মি. কর্নিলিয়াসের নামে মোটা টাকার চেক কাটতে শুরু করেন। আমার বিশ্বাস, জোনাস ওলডাকারের ছদ্মনাম কর্নিলিয়াস। চেকগুলো সম্পর্কে এখনও কোনো তদন্ত করিনি বটে, তবে আমার ধারণা, ছোটোখাটো কোনো টাউনে কর্নিলিয়াসের নামেই ভাঙানো হয়েছে চেকগুলো। মাঝে মাঝে হয়তো সেখানে গিয়ে ওলকার কর্নিলিয়াস সেজে থেকেও এসেছেন। তাঁর আসল মতলব ছিল সমস্ত টাকা তুলে নেওয়ার পর একেবারে নাম-ধাম পালটে নতুন পরিবেশে নতুনভাবে নতুন জীবন শুরু করার।

আপনার অনুমান সঠিক হওয়াই স্বাভাবিক, মি. হোমস।

এখানকার পাততাড়ি গুটিয়ে পড়ার আগে তাঁর একদা প্রিয়তমার বুকে শেল হেনে যাওয়ার চমৎকার পরিকল্পনার জন্যে তুমি তার তারিফ না-করে পারবে না, লেসট্রেড। এক ঢিলে দু-পাখি মারার আয়োজন করেন ভদ্রলোক। পুলিশ যাতে তার পিছু নিতে না-পারে, তাই বেমালুম উধাও হয়ে যাওয়া, সঙ্গেসঙ্গে ম্যাকফারলেনের মায়ের মন ভেঙে দেওয়া তার ছেলেকে খুনি প্রমাণ করে। কী সাংঘাতিক নিষ্ঠুর প্ল্যান। দক্ষ শিল্পীর মতোই ধাপে ধাপে নিখুতভাবে প্রায় শেষ করে এনেছিলেন প্ল্যানটা। পাকাপোক্ত মোটিভ হিসাবে উইলের আইডিয়া, চুপিসারে মা বাপকে না-জানিয়ে ম্যাকফারলেনের ব্ল্যাকহিদে আসা, ছড়ি রেখে দেওয়া, রক্তের দাগ, ছাইয়ের গাদায় বোতাম আর জানোয়ারের দেহাবশেষ–সবই হয়েছিল অপূর্ব। কয়েক ঘন্টা আগেও আমিও হালে পানি পাইনি, ভেবেছিলাম, এ মরণ-জাল থেকে আর উদ্ধার নেই বেচারি ম্যাকফারলেনের। কিন্তু প্রত্যেক দক্ষ শিল্পীর একটা ঈশ্বর-প্রদত্ত ক্ষমতা থাকে। তা হচ্ছে, ঠিক কখন আর না-এগিয়ে থামা উচিত—সে-জ্ঞান। কেসটায় কোনো গলদই ছিল না, তবুও শিকারের গলায় দড়ির ফাঁস আরও একটু আঁট করে দেওয়ার বিকৃত কল্পনায় উল্লসিত হয়ে একটু এগোতেই গেল সব মাটি হয়ে। চলো হে লেসট্রেড, নীচে যাওয়া যাক। লোকটাকে দু-একটা প্রশ্ন করার আছে।

বৈঠকখানার দু-পাশে পুলিশম্যান নিয়ে বসে ছিলেন ধুরন্ধর শিরোমণি কুটিলমতি জোনাস ওলডাকার।

আমরা ঢুকতেই আবার শুরু হল নাকিসুরে একঘেয়ে প্যানপ্যানানি, বিশ্বাস করুন স্যার, নিছক রগড় করা ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না আমার। নিজেকে লুকিয়েছিলাম শুধু আমার অন্তর্ধানের ফলে কী হয় না হয় তাই দেখার জন্যে। বেচারি মি. ম্যাকফারলেনের কোনোরকম ক্ষতি করার মতলব নিয়ে আমি কিছু করিনি স্যার।

লেসট্রেড বললে, সে-বিচার করবে জুরিরা। আমরা আপনার নামে ষড়যন্ত্র করার মামলা দায়ের করব। খুন করার প্রচেষ্টার চার্জ আনতে পারলে তো কথাই নেই।

হোমস বললে, খুব সম্ভব এও দেখতে পাবেন যে আপনার পাওনাদারেরা আইনসংগতভাবেই মি. কর্নিলিয়াসের ব্যাঙ্ক তহবিল আটক করে বসেছে।

চমকে উঠে খরখরে বিষাক্ত চোখে বন্ধুবরের পানে এক ঝলক তাকিয়ে নিলেন খর্বকায় বুড়ো।

তারপর বললেন, ধন্যবাদ আপনাকে। আমার দেনা আমি শিগগিরই শোধ করে দেব।

অল্প হেসে বলল হোমস, আমার তো মনে হয় আগামী কয়েক বছর অনেক ঝামেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে আপনাকে। ভালো কথা, আপনার পুরোনো ট্রাউজার্সের সঙ্গে কাঠের গাদায় আর কী ফেলেছিলেন বলুন তো? মরা কুকুর? খরগোশ? তবে কী? বলবেন না? কী বিপদ! এত নিষ্ঠুর হলে চলে কী করে? বেশ, বেশ, আমি ধরে নিচ্ছি পোেড়া হাড়, ছাই আর রক্তের চাহিদা মেটাতে গোটা দুয়েক খরগোশই যথেষ্ট? এ-কাহিনি যদি কোনোদিন লেখ, ওয়াটসন, তবে খরগোশ দিয়েই তা শেষ কোরো।

————-

টীকা

কুটিল বুড়োর কুচক্র : দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য নরউড বিল্ডার ইংলন্ডে স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনের নভেম্বর ১৯০৩ সংখ্যায় এবং আমেরিকার কলিয়ার্স উইকলির ৩১ নভেম্বর ১৯০৩ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। এই গল্পের পাণ্ডুলিপি নিউইয়র্কের পাবলিক লাইব্রেরির ব্রেগ সংগ্রহে এখনও সযত্নে রাখা আছে।

প্র্যাকটিস বেচে দিয়ে ফিরে এসেছি : বহু গবেষক এই বক্তব্য থেকে এবং আরও অনেক ঘটনার বর্ণনা থেকে অনুমান করেন দ্য ফাইনাল প্রবলেম এবং দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য এম্পটি হাউস-এর ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ে ওয়াটসনের স্ত্রী মেরি মর্সটান পরলোকগমন করেন।

গতকাল গভীর রাতে : গতকাল গভীর রাতের ঘটনা এত বিস্তারিতভাবে পরবর্তী সকালের সংবাদপত্রে প্রকাশ করা ডেলি টেলিগ্রাফের সাংবাদিকের নিশ্চয় অতিমানবিক কৃতিত্ব।

গ্রেস্যামস বিল্ডিংস : বিখ্যাত ইংরেজ ব্যবসায়ী, অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ এবং রয়্যাল স্টক এক্সচেঞ্জ-এর প্রতিষ্ঠাতা স্যার টমাস গ্রেস্যাম-এর নামে অফিসবাড়ি অবস্থিত ছিল মটন স্ট্রিট-এ।

সাক্ষী হিসাবে সই করল আমার কেরানি : ইংলন্ডে এবং ভারতবর্ষের আইনে উইলে মাত্র একজন সাক্ষীর সই যথেষ্ট নয়। দরকার অন্তত দুজন সাক্ষী, সেক্ষেত্রে এই উইলটি আইনের চোখে অগ্রাহ্য।

ব্ল্যাকহিদে ফিরে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি : লোয়ার নরউড থেকে ব্ল্যাকহিদের দূরত্ব কিন্তু মাত্র চার মাইল।

মরা কুকুর? খরগোশ?: সামান্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাতেই কিন্তু লেসট্রেড বা হোমস বুঝতে পারতেন পোড়া দেহাবশেষ মানুষের নাকি পশুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *