বই পরিচিতি – নিজের আয়নায় কালের মুখ

ঢাকা থেকে কলকাতা
নিবেদিতা নাগ
আলোচনা চক্র, কলকাতা
প্রচ্ছদঃ বিপ্লব মণ্ডল
১২৮ পৃষ্ঠা
১০০ টাকা

সুচিয়া গ্রামের একটি মেয়ে। বেড়া দেওয়া কোনো এক আঁতুরঘরে জন্ম নিয়ে দিনে দিনে যিনি নানা পথের বাঁক পেড়িয়ে এক অগ্নিগর্ভা সময়কে ইতিহাস হতে দেখলেন। দেখলেন সময়ের সন্ধিক্ষণগুলোঃ ব্রিটিশ রাজের ভারতবর্ষ এবং ভারত ভাগ হওয়ার অস্তাচল মুহূর্তটিও ঘটল তাঁর চোখের সামনে। এত আগুন পাড়ি দেওয়া সময়ের বিবরণ গ্রন্থাবদ্ধ হলে স্বাভাবিকভাবেই সেটি ইতিহাস হয়ে ওঠে; ওই ইতিহাসের রচয়িতা সুচিয়া গ্রামের সেই মেয়েটি হয়ে ওঠেন সময়ের জলজ্যান্ত রক্তজবা, সময়ের অনেক রক্তের চিহ্ন যাঁর গায়ে লেগে আছে। আমাদের সুচিয়া গ্রামের মেয়ে কমরেড নিবেদিতা নাগের ঢাকা থেকে কলকাতা বইটি পড়তে পড়তে যেন ফিরে পাচ্ছিলাম সময়ের অবিনাশী স্থিরচিত্র। আত্মকথনমূলক এই গ্রন্থে নিজের কথা বলতে বলতে বিপ্লবী নিবেদিতা নাগ যখন নিজ আয়নার সামনে দাঁড়ালেন, সেই দর্পণে এই প্রজন্মের আমরা দেখতে পেলাম কালের মুখ। ফলে বইটির ভূমিকায় পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট নেতা অশোক মিত্রের লেখা ‘ব্যক্তির ইতিহাসকে সমাজের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব প্রস্তাব’ কথাটিকে মেনে নিয়েই দেখলাম ব্যক্তি বিবেদিতা নাগ কীভাবে নিজেকে সমাজের কেন্দ্রে স্থাপন করে প্রকারান্তরে সামাজিক ইতিহাসই বলে চলেছেন!

বইটি নিবেদিতা নাগের আত্ম্নৃতি। বাড়তি পাওনা বিপ্লবী সূর্য সেনের ওপর দেওয়া একটি ্নারক বক্তৃতা।একই মতাদর্শের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিবেদিতা আবেগ ও যুক্তির পরম্পরায় পৌঁছে যেতে চেয়েছেন সাম্যবাদের সোনালি স্বপ্নে।

বইটিতে লেখকের স্বপ্ন যেমন ধরা আছে, তেমনভাবে নিবেদিতা নাগকে নিয়ে লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের একটি প্রবন্ধ এবং তাঁর জীবনসঙ্গী ও রাজনৈতিক সহকর্মী কমরেড নেপাল নাগকে নিয়ে বঙ্গেশ্বর রায় ও রণেশ দাশগুপ্তের দুটি প্রবন্ধ রয়েছে, যা নিজের স্বীকারোক্তির পাশাপাশি অন্য চোখের আলোয় নিবেদিতা নাগের কেমন আকৃতি ফুটে ওঠে, তা-ও বুঝতে সাহায্য করে।
ঢাকা থেকে কলকাতা গ্রন্থের আত্মকথা পর্বটি কয়েকটি অধ্যায়ে বিভক্ত-মনে পড়ে, বাকি কিছু কথা, ভাষা আন্দোলনের ্নৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ্নৃতি-এই অধ্যায়গুলোয় সেই সময়ের সমাজের রূপ যেভাবে সাজানো রয়েছে, তার মধ্যে গ্রামভিত্তিক সমাজকাঠামো, গ্রাম-শহরের দ্রুত রূপান্তরের ইতিহাস ও দুর্দমনীয় আদর্শের দীপ্তিরেখা যেমন পাওয়া যায়, তেমনি সশস্ত্র বিপ্লবের শেষ মুহূর্তের বাঙালি মানস, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, তৎকালীন ঢাকা-কলকাতার প্রেক্ষাপট এবং সেই সময়ের কমিউনিস্ট নেতাদের ত্যাগ ও আদর্শিক লড়াইয়ের ছবিও ফুটে ওঠে। পরিবার কীভাবে একজন মানুষকে রাজনৈতিক আদর্শের লড়াইয়ে শামিল করে সেই প্রসঙ্গ পাই ঢাকা থেকে কলকাতায়। নিবেদিতা নাগ বলেন, “হারিকেনের পাশে রাখা ছোট্ট একটা মেয়েদের হাতঘড়ি আমার চোখে পড়ল। ···আমি সেজকাকাকে জিজ্ঞাসা করলাম ঘড়িটা কার? সেজকা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘তা জেনে তোর কি হবে? ···তুই কি তার মত হতে পারবি? ···তার মত পান্তা ভাত খেতে পারবি, রাত জেগে দেশের কাজ করতে পারবি?’” সেজকাকার এতগুলো প্রশ্নের সূত্র ধরে লেখক আমাদের জানিয়ে দেন ওই ঘড়িটির মালিক প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। আর এভাবে ছোট ছোট ঘটনার সরস বর্ণনা আমাদের জানিয়ে দেয় যে একসময় পরিবার কী প্রক্রিয়ায় যৌথতার মন্ত্রে, দেশপ্রেমের শপথে নিবেদিতা নাগদের উদ্দীপ্ত করেছিল। আজকের পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় নিয়ত বিচ্ছিন্নতার বাতাবরণের মধ্যে দাঁড়িয়ে আলোচ্য গ্রন্থটি বারবার আমাদের নিয়ে গেছে সোনার আলোয় মোড়ানো সেই সময়ে। আবার ওই আলো চূর্ণ হওয়ার মর্মান্তিক বিবরণও আমরা জেনে যাই এই গ্রন্থ পাঠে-‘সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানেই তখন অদ্ভুত রকমের একটা অরাজকতা বিরাজ করছিল। ···এই সঙ্গে একটা প্রচণ্ড আঘাত এল পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি জগতে।’ সময়ের ভাঙা-গড়াগুলো লেখক নিবেদিতা নাগ এমন করেই বলে গেছেন। তবে তাঁর এই বলে যাওয়ার মধ্যেও রয়েছে গদ্যধর্মী কাব্যিকতা ও রসমঞ্জরি। যেমন, ঢাকা থেকে কলকাতার জার্নি শুরু হয়েছে ‘সঘন গহন রাত্রি, ঝরিছে শ্রাবণ ধারা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লাইনটি দিয়ে। এর পরেই লেখক বলতে শুরু করেন, ‘মায়ের মুখে শুনেছি-প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির দাপটে বিপর্যস্ত একটি শ্রাবণের রাত্রে আমি জন্মেছিলাম।’

সুচিয়া গ্রামের নিবেদিতা নাগের বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে যেভাবে একটি কালের জন্ম হয়, কাল গড়ে ওঠে, সমাজ বেড়ে ওঠে; আজকের পৃথিবীর বাস্তবতায় তা অনেকটা রোমাঞ্চকর ভ্রমণের মতো। ঢাকা থেকে কলকাতা গ্রন্থটি পাঠ করে পাঠক সেই ভ্রমণের আনন্দ পাবেন।

শাহনেওয়াজ আলতাফ
সূত্রঃ প্রথম আলো, ডিসেম্বর ডিসেম্বর ০৫, ২০০৮

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *