০৬-১০. রহমান সাহেব আজ অফিসে

রহমান সাহেব আজ অফিসে এসেছেন। তার পিএ বলে দিয়েছে এগারোটায় একটা বোর্ড মিটিং আছে, মিটিংয়ের আগে বড় সাহেব কারও সঙ্গে দেখা করবেন না। সোবাহান জিজ্ঞেস করল, বোর্ড মিটিং শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে?

পিএটি বিরক্ত মুখে বলল, তা কী করে বলব? কী কী এজেন্ডা আছে তার ওপর ডিপেন্ড করে। লাঞ্চ টাইমের আগেই শেষ হবে। লাঞ্চের পরে আসেন। এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।

সোবাহান তবু খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। এই মেয়েটির কথাবার্তায় অপমান করার চেষ্টা আছে। অথচ কেমন ভদ্র, বড় বোন বড় বোন চেহারা!

এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। কাজের ক্ষতি হয়। ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসুন।

একটা স্লিপ কি দয়া করে পাঠাবেন? আমার সঙ্গে তার আগে কথা হয়েছে। উনি আমাকে চিনেন।

চিনলেও কোনো কাজ হবে না। বোর্ড মিটিংয়ের আগে তিনি কারও সঙ্গে দেখা করবেন না। আপনি নিচে গিয়ে বসুন। এক কথা কবার বলব!

সোবাহান নিচে নেমে এল। রিসিপশনের মেয়েটি আজ একটা আগুন রঙের সিল্কের শাড়ি পরে এসেছে। তাকে চেনাই যাচ্ছে না। মেয়েদের সৌন্দর্যের বেশির ভাগই বোধহয় তাদের শাড়ি গয়নায়। সোবাহান এগিয়ে এসে পরিচিত ভঙিতে হাসল। মেয়েটি তাকাল অবাক হয়ে। সোবাহানকে কি চিনতে পারছে না? গতকালই তো অনেকক্ষণ কথাবার্তা হয়েছে। মেয়েটি বলল, আপনি কি আমাকে কিছু বলছেন?

জি-না। আমি রহমান সাহেবের কাছে এসেছি।

উনি খুব সম্ভব বোর্ড মিটিং-এ আছেন। উনার পিএ বসেন দোতলায়। রুম নম্বর ৩০২।

উনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ও আচ্ছা।

মেয়েটি একটি টেলিফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সোবাহানকে সত্যি সত্যি চিনতে পারছে না? অপমানিত হওয়ার মতো ব্যাপার। সোবাহানের কান ঝা ঝা করতে লাগল।

আমি গতকাল এসেছিলাম। আপনি বলেছিলেন আজ আসতে।

আমার মনে আছে। আপনি থাকেন শ্যামলীতে। বসুন ওখানে।

সোবাহান বসে রইল।

রহমান সাহেব একটার সময় লাঞ্চ খেতে গিয়ে আর ফিরলেন না। পিএটির সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। তবু তিনটার দিকে সোবাহান গেল তার কাছে। মেয়েটি শুকনো গলায় বলল, দুটোর দিকে তো চলে গেছেন।

আজ আসবেন কি আসবেন না বলে যাননি?

আমাকে বলে যাবেন কেন? আমি কি এখানকার হেড মিসট্রেস? উনি কখন আসবেন না আসবেন সেটা তার ব্যাপার।

এমন ভদ্র চেহারা মেয়েটির। শালীন পোশাকআশাক, অথচ কথাবার্তা বলছে। ছোটলোকের মতো। সোবাহান কিছু বলবে না বলবে না ভেবেও বলে বসল, ভদ্রভাবে বলেন।

ভদ্রভাবে কথা বলব মানে?

মেয়েটি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। সোবাহান শান্তস্বরে বলল, আপনার কথাবার্তা রাস্তার মেয়েদের মতো।

তার মানে? তার মানে?

মেয়েটি রাগে কাঁপছে। তার পাশের টেবিলের বুড়ো মতো ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। ভয় পাওয়া গলায় ডাকলেন, সবুর মিয়া, সবুর মিয়া।

সবুর মিয়া ঢুকল না। সোবাহান ভারী গলায় বলল, ভবিষ্যতে আর এরকম ব্যবহার করবেন না।

আপনি কি আমাকে মারবেন নাকি?

নাহ। মেয়েদের গায়ে আমি হাত তুলি না। ছেলে হলে এক চড়ে মাঢ়ির দুটো দাঁত নড়িয়ে দিতাম।

মেয়েটির গাল গোলাপি বর্ণ ধারণ করল। সোবাহান ঘর থেকে বেরিয়ে এল। খুব সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিচে গেল। তার ভয় করছিল হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকজন এসে তাকে ধরে ফেলবে। কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। শুধু বুড়োটি পিছু পিছু নেমে এল। সে তাকাচ্ছে ভয় পাওয়া চোখে। তাকে কি গুণ্ডাদের মতো লাগছে?

রিসিপশনের মেয়েটি টেলিফোনে খুব হাসছে। সকালবেলা তাকে যতটা রূপসী মনে হচ্ছিল এখন আর ততটা মনে হচ্ছে না। সোবাহান তার দিকে তাকিয়ে পরিচিত ভঙিতে হাসল। মেয়েটি টেলিফোনে কথা বলা বন্ধ রেখে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল তার দিকে। যেন সে বিস্মিত। কিন্তু বিস্মিত হওয়ার কী আছে? একজন মানুষ কি আরেকজন মানুষের দিকে তাকিয়ে হাসবে না!

সোবাহান সন্ধ্যা পর্যন্ত রাস্তায় ঘুরল। আজও দুপুরে তার খাওয়া হলো না। বৈশাখ মাসের অসম্ভব কড়া রোদ। ঝাঁ ঝাঁ করছে চারদিক। প্রেসক্লাবের কাছে কাটা তরমুজ বিক্রি হচ্ছে। এক টাকা করে পিস। খেলে হয় একটা।

কিনতে গিয়েও কিনল না। মাঝে মাঝে নিজেকে কষ্ট দিতে ইচ্ছা হয়। কড়া রোদেই সে আবার রাস্তায় নেমে পড়ল।

.

ফরিদ আলি বললেন, সোবাহান কি রোজ রোজই এমন দেরি করে? জলিল সাহেব দাঁত বের করে হাসলেন, তা করে। যুবক মানুষ।

যুবক মানুষ হলেই দেরি করে ফিরতে হবে এটা কী কথা?

এসে পড়বে। চিন্তা করবেন না।

এক্সিডেন্ট হয় নাই তো?

আরে এরা চালু ছেলে, এরা এক্সিডেন্ট করবে কী?

চাল্লু ছেলে? চাল্লু ছেলে বললেন কেন?

ফরিদ আলি গম্ভীর হয়ে গেলেন। জলিল সাহেব বললেন, রাতও তো বেশি হয় নাই। দশটা বাজে।

দশটা কম রাত?

এ আপনাদের নীলগঞ্জ না। এটা ঢাকা শহর। এখানে সন্ধ্যা হয় এগারোটায়। নেন ভাই সিগারেট ধরান, নার্ভ ঠান্ডা হবে।

আমি সিগারেট খাই না।

বাচ্চা ছেলে তো না যে এতটা অস্থির হয়েছেন। অস্থির হওয়ার কিছুই নাই।

ফরিদ আলি রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বেশ হাওয়া দিচ্ছে, আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড়বৃষ্টি হবে বোধহয়।

সোবাহান এল রাত এগারোটায়। ফরিদ আলি ভয় পাওয়া গলায় বললেন, কী ব্যাপার, এত দেরি?

সোবাহান জবাব দিল না। তাকাল না পর্যন্ত।

আমি তো চিন্তায় অস্থির।

চিন্তার কী আছে?

চিন্তার কী আছে মানে? তোকে বলেছিলাম না রাতের ট্রেনে চলে যাব। ছিলি কোথায় তুই?

সন্ধ্যাবেলা একটা পার্কে গিয়েছিলাম। কেমন করে যেন ঘুমিয়ে পড়লাম। টায়ার্ড হয়ে ছিলাম।

কোথায় ঘুমালি?

ওইখানে বেঞ্চি আছে। বেঞ্চিতে।

খাওয়াদাওয়া করেছিস?

হুঁ। আপনি খেয়েছেন?

হ্যাঁ। জলিল সাহেবের সঙ্গে খেয়ে এলাম।

ফরিদ আলি সোবাহানের হাত ধরলেন। মৃদুস্বরে বললেন, চল আমার সঙ্গে।

কোথায়?

নীলগঞ্জে। কয়েকদিন থেকে আসবি। তোর ভাবি খুব করে যেতে বলেছে।

একটা কিছু হোক, তারপর যাব।

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করছে। দেখতে দেখতে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হলো। সোবাহান যে গতিতে হাঁটছিল তার কোনো পরিবর্তন হলো না। ফরিদ আলি তার হাত ধরেই থাকল। দু’জনে ঘরে ঢুকল কাকভেজা হয়ে। ফরিদ আলির মুখ চিন্তাক্লিষ্ট। সোবাহানের ব্যাপারটা তিনি বুঝতে পারছেন না।

তারা ঘুমোতে গেল অনেক রাতে। চৌকিটি ছোট–দু’জনের জায়গা হয় না। ঘেঁসাঘেঁসি করে ঘুমোতে হয়। গত রাতে খুব কষ্ট গেছে। আজ আরাম করে ঘুমানো যাবে। শীতল হাওয়া। ফরিদ আলি বললেন, কাঁথা টাথা কিছু আছে নাকি রে? শীত শীত লাগছে।

বিছানার চাঁদরটা গায়ে দেন। কাঁথা নাই। একটা লেপ আছে শুধু। লেপ দিব?

না। এর পরেরবার আসার সময় কাঁথা নিয়ে আসব।

সোবাহান কিছু বলল না। ফরিদ আলি বললেন, ঘুমিয়ে পড়েছিস?

না।

মনসুর সাহেবের শালীকে দেখেছিস? যূথি? যূথি নাম।

দেখেছি।

মেয়েটি কেমন?

যক্ষ্মারোগী। আর কেমন। কেন?

ফরিদ আলি চুপ করে গেলেন। জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে। ভালোই লাগছে। সোবাহান বলল, ওই মেয়েটির কথা জিজ্ঞেস করেন কেন?

মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। ভালো মেয়ে। একটু রোগা এই যা। বিয়ের পর গায়ে গোশত লেগে যাবে। মনে সুখ থাকলে স্বাস্থ্য ভালো হয়। কত দেখলাম। তোর

ভাবিও তো রোগা ছিল। ছিল না?

এতসব বলছেন কেন?

তুই মেয়েটাকে বিয়ে কর। রোজগারপাতির কথা চিন্তা করিস না। আল্লাহপাক রুজি রোজগারের মালিক।

আপনি কি বিয়ের কথাবার্তা বলেছেন?

হুঁ। পাকা কথা দেই নাই। তোকে না জিজ্ঞেস করে দেই কীভাবে! ওদের তোকে পছন্দ হয়েছে।

সোবাহান চুপ করে রইল।

একটা মানুষ ভালো কি মন্দ সেটা চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। ভালো মানুষের চেহারায় নূরানী থাকে।

মেয়েটার চেহারায় নূরানী দেখলেন?

হুঁ। যাস কই?

একটু বারান্দায় গিয়ে বসি।

এখন আবার বারান্দায় বসাবসি কী? একটা বাজে।

ঘুম আসছে না।

সোবাহান বারান্দায় একটা চেয়ার টেনে নিয়ে গেল। বৃষ্টি পড়ছে সমানে। বৈশাখ মাসে এত দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি হয় না। ঝমঝম করে খানিকক্ষণ বৃষ্টি হয়ে সব শেষ। মুহূর্তে আকাশে তারা ওঠে। আজ বোধহয় সারা রাতই বৃষ্টি হবে। সমস্ত রাত আকাশ থাকবে মেঘলা।

কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। নাকি মনের ভুল? সোবাহান ভালো করে শুনতে চেষ্টা করল। বৃষ্টির শব্দে চাপা পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ যে কাঁদছে এতে সন্দেহ নেই।

সোবাহান!

সোবাহান তাকিয়ে দেখল ফরিদ আলি উঠে আসছেন। সে তার সিগারেট উঠোনে ছুঁড়ে ফেলল।

সোবাহান!

জি।

কাঁদছে কে?

মনসুর সাহেবের শালী বোধহয়। প্রায়ই কাঁদে।

কেন?

কী জানি কেন।

ফরিদ আলি বড়ই অবাক হলেন। একজন মানুষ শুধু শুধু কাঁদবে কেন?

.

০৭.

নীলগঞ্জ থেকে ভাবির চিঠি এসেছে।

চিঠি পড়ে বুঝবার উপায় নেই মহিলাটির পড়াশোনা ক্লাস সিক্স পর্যন্ত। সুন্দর হাতের লেখা। বানান ভুল প্রায় নেই। ভাষাটাও বেশ ঝরঝরে। দুপুরবেলা শরৎচন্দ্র পড়ে পড়ে তার এই উন্নতি। ‘দেবদাস’ ভাবি সম্ভবত মুখস্থ বলে যেতে পারেন। দেবদাস’ তিনি এগারোবার পড়েছেন।

সোবাহান ভাবির দীর্ঘ চিঠিটা দু’বার পড়ল।

প্রিয় ভাই,

দোয়া নিয়ো।

বড় খবর হইল তোমার ভাই উত্তর বন্দের জমি বিক্রি করিয়া দিয়াছেন। বিক্রয়ের পর আমি জানিতে পারি। আমার দুঃখ এই

তুমি শিক্ষিত ছেলে হইয়াও জমি বিক্রয়ের বিষয়ে নীরব থাকিলে। আমার সঙ্গে তোমার ভাই কোনো পরামর্শ করে নাই। কারণ মেয়েদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ তিনি করেন না। মেয়েদের পরামর্শে সংসার চলিলে নাকি সংসারে আয় উন্নতি হয় না।

জমি বিক্রয়ের টাকায় নামাজঘর তৈরি হইতেছে। নামাজঘর হইল একটা পাকা কোঠা। সেখানে তোমার ভাই এবাদত বন্দেগি করিবেন। এবাদতের জন্যে পাকা ঘর লাগে তাহা জানিতাম না। আমরা মেয়েমানুষেরা অনেক কিছু জানি না।

সংসারে নানান ঝামেলা। পরামর্শ করিবার কেহ নাই। তুমি আসিলে ভালো হইত। শুনলাম তোমার শরীরও নাকি খুব খারাপ হইয়াছে। হোটেলে খাওয়া–শরীর নষ্ট হইবে জানা কথা। তুমি ভাই কয়েকদিন আমাদের সঙ্গে থাক। তোমার ভাইয়ের নামাজঘর দেখিয়া যাও। আল্লাহ তোমাকে সুখে শান্তিতে রাখুক।

তোমার ভাবি

সোবাহান লক্ষ করল চিঠিতে যূথির কথা নেই। তার মানে ভাইসাহেব এই প্রসঙ্গে কিছু বলেননি। অদ্ভুত লোক!

কার চিঠি এত মন দিয়ে পড়ছেন?

ভাবির চিঠি।

ফরিদ সাহেবের স্ত্রী?

জি।

সুন্দর হাতের লেখা।

সোবাহান চিঠি পকেটে রেখে দিল। জলিল সাহেব বললেন, কোথাও যাচ্ছেন নাকি?

জি।

আরে, ছুটির দিনে কোথায় যাবেন? বসেন, গল্পগুজব করি।

কাজ আছে।

আরে ভাই রাখেন কাজ। চলেন ভিসিআর দেখে আসি। আমার চেনা জায়গা।

আরেকদিন যাব।

আরে না, আরেকদিন আবার কী! চলেন যাই। এমন জিনিস দেখবেন জীবনে ভুলবেন না। মারাত্মক ছবি।

সোবাহানকে বেরুতে হলো তার সঙ্গে। বারান্দায় যূথি দাঁড়িয়ে ছিল। জলিল সাহেব হাসিমুখে বললেন, কেমন আছ?

মেয়েটা অস্পষ্টভাবে কী যেন বলল ঠিক বোঝা গেল না।

তোমরা বাইরের মানুষদের দাওয়াত করে খাওয়াও। আমাদের কথা তো মনে করো না। আমাদেরও তো মাঝে মাঝে ভালোমন্দ খেতে ইচ্ছা করে। কী বলেন সোবাহান। সাহেব? করে না?

সোবাহান অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। রাস্তায় নেমে জলিল সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, মেয়েটা অপুষ্ট কিন্তু তার বুক কেমন ডেভেলপ লক্ষ করেছেন। এর কারণটা বলতে পারেন? পারবেন না? হা হা হা! দুনিয়ার হালচাল কিছু দেখি জানেন না। আজকের দিনটা সময় দিলাম, দেখেন ভেবে-টেবে বের করতে পারেন কি না।

.

মগবাজার চৌধুরীপাড়ার বাড়িটা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও বের করা গেল না। সোবাহান বিরক্ত হয়ে বলল, বাড়ি চিনেন না নিয়ে এলেন কেন?

আরে ভাই চিনি। চিনব না কেন? রাতের বেলা এসেছিলাম, তাই ঠিক ইয়ে হচ্ছে না। বাড়ির সামনে লোহার গেট।

লোহার গেট তো সব বাড়ির সামনেই।

তাও ঠিক।

ঘণ্টাখানিক খোঁজাখুঁজি চলল। জলিল সাহেব হাল ছাড়ার পাত্র নন। সোবাহান বলল, বাদ দেন, চলেন ফিরে যাই।

ফিরে গিয়ে তো সেই শুয়েই থাকবেন। আসেন আরেকটু দেখি। এই গলিটা চেনা লাগছে।

চেনা গলিতেও কিছু পাওয়া গেল না। জলিল সাহেবও একসময় হাল ছেড়ে দিলেন। ক্লান্ত স্বরে বললেন, লাচ্ছি খাবেন নাকি?

নাহ।

আরে ভাই খান, আমি পয়সা দেব।

পয়সা আমার কাছে আছে, আপনার দিতে হবে না। ইচ্ছে করছে না।

আরে চলেন চলেন।

লাচ্ছির দোকানটিতে ভিড় নেই। দৈয়ের উচ্ছিষ্ট খুড়িগুলিতে মোটা মোটা মাছি ভনভন করছে। ঘরের ভেতরে ভ্যাপসা গরম, তবে মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানের বাতাসও গরম।

জলিল সাহেব এক গ্লাস লাচ্ছি শেষ করতে আধা ঘণ্টা সময় নিলেন। লাচ্ছি শেষ করে পান আনালেন, সিগারেট আনালেন। ক্লান্ত স্বরে বললেন, বুড়ো হয়ে গেছি, বুঝলেন। ছুটির দিনগুলিতে কী করব বুঝতে পারি না।

বিশ্রাম করেন।

বিশ্রাম করেই বা হবেটা কী? সংসার দরকার। ঝামেলা দরকার। ঝামেলা অশান্তি এইসব না থাকলে বেঁচে থাকা যায় না। পান খাবেন নাকি একটা? মুখের মিষ্টি ভাবটা যাবে।

জি-না, খাব না।

এই তো দেখেন না আমার সংসারের কোনো দায়দায়িত্ব নাই। ছোট বোন ছিল বিয়ে দিয়েছি। এখন আমার দিন চলে না। দুপুরবেলা দৈয়ের দোকানে বসে থাকি।

জলিল সাহেব, আমি এখন যাব।

সোবাহান উঠে দাঁড়াল।

আরে এই রোদের মধ্যে কী যাবেন? বসেন বসেন, রোদ কমুক। আরেকটা লাচ্ছি খান।

আপনি খান।

সোবাহান রাস্তায় নেমে পড়ল। জলিল সাহেব লাচ্ছির শূন্য গ্লাস সামনে নিয়ে বসে রইলেন। তাকে ঘিরে নীল রঙের পুরুষ্ট মাছিরা উড়তে লাগল।

দুপুরে কোথাও যাওয়া যায় না। দুপুর হচ্ছে গৃহবন্দির কাল। সোবাহান উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরল অনেকক্ষণ। আজও তার দুপুরে খাওয়া হয়নি। সকাল থেকে এ পর্যন্ত চা খাওয়া হয়েছে সাত কাপ। সমুচা দুটি। তিনটি নোতা বিস্কিট। এক গ্লাস লাচ্ছি। এখন ক্ষিধে জানান দিচ্ছে। কিন্তু এ সময়ে হোটেলে উচ্ছিষ্ট খাবার ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না। ভাত হয় কড়কড়া। বেয়ারাগুলি ঝিমায়। তিনবার ডাকলে তবেই

সাড়া দেয়। অসময়ের কাস্টমারদের প্রতি এদের কোনো মমতা নেই।

সোবাহান মাঝারি সাইজের একটা হোটেলে ঢুকে পড়ল। এক প্লেট ভাত আর ডাল-গোশতের অর্ডার দিয়ে বসে রইল। ভাতের প্লেট নামিয়ে বয়টি দাঁত বের করে বলল, ডাল-গোশত নাই, ইলিশ মাছ আছে। আনুম?

বয়টির ডান হাতে একটা ফেঁড়া। সাদা হয়ে পেকে আছে। সোবাহানের ক্ষিধে মরে গেল।

কি, খাইবেন না?

না।

কোথায় খাওয়া যায়? খাওয়ার কি কোনো জায়গা আছে? সোবাহানের বমি বমি ভাব হলো। ভাতের থালাটির পাশে পেকে ওঠা ফোড়ার ছবিটি উঠে আসছে। কিছু কিছু ছবি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হতে থাকে। সে বাসে চাপা পড়া একটা কুকুর দেখেছিল। একবার। মাথাটা থেতলে মিশে গেছে। চোখ বেরিয়ে এসেছে কোটর থেকে। সোবাহানের মনে হয়েছিল চোখ দুটি এখনো সবকিছু দেখছে। অবাক হয়ে জগতের নিষ্ঠুরতা দেখছে।

মৃত্যুর পর যেন চোখ দুটির দেখার শক্তি অনেক বেড়ে গেছে। এরকম মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই, তবু মনে হয়। সোবাহান মিলিদের বাড়ির দিকে রওনা হলো।

.

আরে সোবাহান ভাই, আপনি!

কেমন আছ?

ইস! এই রোদের মধ্যে কেউ আসে? হেঁটে এসেছেন, না?

ঘুমাচ্ছিলে নাকি?

আমি দিনে ঘুমাই না। যেসব মেয়ের বয়স একুশ তারা দুপুরে ঘুমায় না।

মিলি, ঠান্ডা দেখে এক গ্লাস পানি দাও।

একটু বিশ্রাম করে নিন। এখন ঠান্ডা পানি খেলে সর্দি-গর্মি হবে। আসেন বারান্দায়। বসেন। বারান্দায় ঠান্ডা।

সোবাহান বারান্দায় বসে রইল। গা দিয়ে আগুনের হল্কা বেরুচ্ছে। পুকুরে গলা। পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। মিলি তাকিয়ে আছে। কে বলবে এই মেয়ের বয়স একুশ। পনেরো-ষোল বছরের কিশোরীর মতো লাগছে। ভারী মিষ্টি একটি মুখ।

একটা টেবিল ফ্যান এনে দেই? নাকি ঘরের ভেতর ফ্যানের নিচে বসবেন?

এখানেই বসব। তুমি পানি আন।

মিলি পানি আনতে গেল। সোবাহান হাত-পা ছড়িয়ে এলিয়ে পড়ল। মাঝে মাঝে সে আসে এ বাড়িতে। আসার তেমন কোনো কারণ নেই। মিলির বড় ভাইয়ের বন্ধু, সেই সূত্রে আসে।

নিন, পানি নিন।

শুধু পানি নয়, একটা প্লেটে দুটি সন্দেশ। সোবাহান লোভীর মতো সন্দেশ খেল। তার এতটা ক্ষিধে পেয়েছে আগে বোঝা যায়নি। মিলি সহজ স্বরে বলল, আপনি দুপুরে কিছু খাননি, তাই না?

হুঁ।

কেন, খাননি কেন?

সোবাহান না খাওয়ার কারণটা ব্যাখ্যা করল না। আরেক গ্লাস পানি চাইল। মিলি বড় একটা কাঁচের জগে পানি নিয়ে এল। পানির ওপর বরফের টুকরো ভাসছে। কাঁচের জগটি ঝকঝক করছে। বিন্দু বিন্দু পানি জমেছে চারপাশে দেখেই তৃষ্ণা কমে যায়।

সোবাহান ভাই, আপনি দুমাস পরে এলেন। আপনার কথা মা প্রায়ই বলেন।

খালা কেমন আছেন?

ভালো না।

এখনো কান্নাকাটি করেন?

হুঁ। এবং এখনো বিশ্বাস করেন ভাইয়া বেঁচে আছে। মিলিটারিরা তাকে পাকিস্তানে নিয়ে বন্দি করে রেখেছে।

বেশির ভাগ মা-ই তাই ভাবে। আমার নিজেরও মাঝে মাঝে মনে হয় ও হয়তো বেঁচেই আছে।

মিলি ছোট্ট করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। শান্ত স্বরে বলল, খেতে আসুন সোবাহান ভাই। খাবার দেওয়া হয়েছে।

খাবার দেওয়া হয়েছে মানে?

দুপুরে তো খাননি। টেবিলে ভাত দিতে বলেছি।

চারটার সময় ভাত খেতে বসব নাকি?

হ্যাঁ বসবেন। আসুন। সিগারেট ফেলে দিন।

শোনো, মিলি।

অল্প চারটা খান। আসুন।

সোবাহানকে উঠতে হলো। হাত-মুখ ধুয়ে ভাত নিয়ে বসতে হলো। কাজের মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে দূরে। মিলি তার ধবধবে ফর্সা হাতে ভাত বেড়ে দিচ্ছে। হাতভর্তি লাল টকটকে কাঁচের চুড়ি। অদ্ভুত সুন্দর একটা ছবি। স্বপ্নদৃশ্যের মতো।

মিলি, বাসায় কেউ নাই?

না। আব্বা আম্মা খালার বাসায় গেছেন। ছ’টার মধ্যে এসে পড়বেন। আপনি কিন্তু মার সঙ্গে দেখা না করে যেতে পারবেন না।

আরেকদিন আসব। আজ আমার যেতে হবে এক জায়গায়।

আপনি এলে মার সঙ্গে দেখা করতে চান না।

সোবাহান চুপ করে রইল। মিলি বলল, মা আপনাকে দেখলেই কান্নাকাটি করে তাই আপনার ভালো লাগে না। ঠিক না?

সোবাহান জবাব দিল না। মিলি বলল, এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন? আস্তে আস্তে খান। ডাল নিয়ে ভালো করে মাখুন। শুকনা শুকনা খাচ্ছেন কেন?

সোবাহান কী একটা বলতে গিয়েও বলল না। মিলি বলল, চাকরির কিছু হয়েছে আপনার?

নাহ।

মা যে আপনাকে এক ভদ্রলোকের কাছে যেতে বলেছিলেন, যাননি? রহমান সাহেব কে যেন।

এখনো দেখা হয়নি।

দেখা করবেন। আপনার চাকরি হবে।

আমার কিছু হবে টবে না মিলি। আমি গ্রামে চলে যাব।

এখনই হাল ছেড়ে দিচ্ছেন?

অনেকদিন চেষ্টা করলাম। আর ভালো লাগে না। উঠি মিলি?

মিলি তাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিল। রোদের তাপ কমে এসেছে। ঠাণ্ডা বাতাস, দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে হয়তো। সোবাহান বড় রাস্তায় নেমে একবার পেছনে তাকাল। মিলি দাঁড়িয়ে আছে। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে একধরনের কাঠিন্য আছে। সোবাহানের তবু মনে হলো, ঠিক এ ধরনের মেয়েদের কাছেই বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে।

একটা ভুল হয়ে গেল। মিলির বর কবে আসবে জিজ্ঞেস করা হয়নি। শিগগিরই তো আসার কথা। মিলির বরকে মিলি চোখে দেখেনি। বিয়ে হয়েছে টেলিফোনে। ভদ্রলোক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পিএইচডি। মিলির মতো একটি মেয়েকে পাশে পাওয়ার জন্যে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পিএইচডি করতে ইচ্ছা করে। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং জিনিসটা কী?

.

০৮.

ফরিদ আলির কাছে দু’জন লোক এসেছে নবীনগর থেকে। তিনি তাদের চিনতে পারলেন না। তারা বয়সে ফরিদ আলির কাছাকাছি, কিন্তু দেখা হওয়ামাত্র পা ছুঁয়ে সালাম করল। ফরিদ আলি যথেষ্ট অপ্রস্তুত হলেন। এর জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না। লোক দুটির একজন কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, হুজুর, আপনার দোয়া নিতে এসেছি।

ফরিদ আলি খানিকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না। কিছুদিন ধরেই তার কাছে দূর দূর থেকে মানুষজন আসে। গত সপ্তাহেই নান্দাইল রোড থেকে একজন প্রাইমারি স্কুলের টিচার তাঁর ছোট মেয়েটিকে নিয়ে এসেছিল। সেদিনও তিনি বলেছিলেন–”আমার কাছে কেন এসেছেন? আমি একজন অতি নগণ্য ব্যক্তি। আজও সেই কথা বললেন।

লোক দু’টি কী শুনে তাঁর কাছে এসেছে কে জানে। তারা জড়সড় হয়ে বসে রইল।

আপনারা নিশ্চয়ই খাওয়াদাওয়া করেন নাই?

জি-না।

বসেন। খাওয়াদাওয়া করেন। মাগরেবের নামাজের পর দোয়া করব।

হুজুর, ছেলেটা বাঁচবে?

ফরিদ আলি তাকালেন। খুব স্পষ্টভাবে বললেন, মানুষের মৃত্যু নাই। আত্মা বেঁচে থাকে। আত্মার কোনো বিনাশ নাই। মৃত্যুর কথা বলছেন কেন?

কথাটা বলে তার নিজেরও ভালো লাগল। সত্যিই তো মৃত্যু নিয়ে এত যে মাতামাতি তার কোনো অর্থ হয় না। আমরা সবাই এক মৃত্যুহীন জগতের বাসিন্দা।

আপনার ছেলেটার বয়স কত?

জোয়ান ছেলে, বিয়ে দিছি গত বৎসর।

কী হয়েছে?

জানি না হুজুর। রক্তবমি করতেছে।

হুজুর বলছেন কেন আমাকে? আমার নাম ফরিদ আলি। আমাকে নাম ধরে। ডাকবেন।

লোক দু’টি মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।

আল্লার নামের সাথে মিল রেখে আমাদের নাম। কাজেই নাম ধরে ডাকলে কোনো অপমান হওয়া ঠিক না। আপনারা হাত-মুখ ধোন, বিশ্রাম করেন, খানা আসবে।

.

এই গ্রামে একটি পাকা মসজিদ আছে।

ফরিদ আলি আগে মসজিদে যেতেন। গত কয়েক মাস ধরে যান না। বাংলাঘরে একা একা নামাজ পড়েন। ইদানীং অবশ্য একা একা নামাজ পড়া হয় না। অনেকেই এখানেই চলে আসে। কেন আসে? তিনি জানেন না, জানতেও চান না। নামাজের শেষে মাঝে মাঝে দু’একটা কথা বলতে চেষ্টা করেন। সেগুলি কি ওদের ভালো লাগে? বোধহয় লাগে। আজও দেখা গেল অনেকেই এসেছে। নামাজের শেষে তিনি অন্যদিনের। মতো কিছু কথাবার্তা বললেন

সুখ ভোগ করবার জন্যে আমরা আসি নাই। পৃথিবীতে সুখ নাইরে ভাই। চারদিকে দুঃখ আর কষ্ট। এখানে কেউ কি আছেন যিনি বলতে পারেন তার কোনো দুঃখ নাই। আছেন কেউ?

মৃদু একটা গুঞ্জন উঠল। নবীনগর থেকে আসা লোকটি চোখ মুছতে লাগল। কথা বলতে বলতে ফরিদ আলির মনে গভীর আবেগের সৃষ্টি হলো এবং তার নিজের চোখ দিয়েও টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল

এমন কেউ কি আছেন যিনি আমাদের দুঃখহীন জগতে নিয়ে যাবেন? যে জগতে মৃত্যু নাই, ক্লান্তি নাই। দুঃখ নাই। হতাশা নাই। বঞ্চনা নাই।

ফরিদ আলি কথা শেষ করে যখন উঠলেন তখন অনেক রাত। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। নবীনগরের লোক দুটিকে রাতে থেকে যেতে বলা হলো। তারা থাকল না। যাওয়ার সময় তারা আবার তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করতে এল। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে মাথা নিচু করা ঠিক না। তারা কী করবে বুঝতে পারল না। ফরিদ আলি বললেন, চলেন আপনাদের একটু এগিয়ে দিয়ে আসি।

জি-না, জি-না। হুজুর, লাগবে না।

ফরিদ আলি তাদের কথা শুনলেন না। তাদের এগিয়ে দিলেন নিমাই খালের পুল পর্যন্ত। জায়গাটা ঘন অন্ধকার। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ফরিদ আলি আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ বলে ফেললেন–চিন্তা করবেন না, আপনার ছেলে ভালো হয়ে যাবে। এই কথাটা কেন বললেন তিনি বুঝতে পারলেন না। কিন্তু বলেই সংকুচিত হয়ে পড়লেন।

এই কথাটি কেন তিনি বললেন? কেন, কেন? তারা অবাক হয়ে তাকাল তাঁর দিকে। অন্ধকারে তাঁর মুখ দেখা গেল না। লোকটি তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ফরিদ আলি গাঢ় স্বরে বললেন, ভয়ের কিছু নাই, যান, বাড়ি যান।

বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ফরিদ আলি ভিজতে ভিজতে রওনা হলেন। বেশ লাগছে। তাঁর। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার গা বেয়ে পানি পড়তে লাগল। তিনি বাড়ির দিকে না গিয়ে উল্টোদিকে রওনা হলেন। সেখানে একটা শিমুল গাছ আছে। তার নিচে বসে থাকতে কেমন লাগে এটাই তার দেখার ইচ্ছা। কিংবা তেমন কোনো ইচ্ছা নেই, বসার জন্যেই বসা।

ঘণ্টাখানিকের মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেল। তারও বেশ কিছুক্ষণ পর হারিকেন হাতে তাকে খুঁজতে এল বাড়ির কামলা। ফরিদ আলি হাসি মুখে বললেন, কিরে রশীদ?

রশীদ বলল, ছোড ভাই আইছে।

তাই নাকি?

জি। সঙ্গে তাইনের বন্ধু আছে।

ফরিদ আলির মন আনন্দে ভরে গেল। তিনি উল্লসিত বোধ করলেন।

.

০৯.

বুলু মুগ্ধ হয়ে গেল–আরে এ তো দেখি পোবন! সোবাহান নিজেও কম অবাক হয়নি। বাড়িঘর চেনা যাচ্ছে না। ঝকঝক তকতক করছে। নামাজঘরের সামনে চমৎকার বাগান। করা হয়েছে। বাড়ির উত্তরের বিশাল আমগাছটির নিচে লাল সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। বুলু বলল, কেমন যেন শান্তি শান্তি ভাব চলে আসছে। থেকে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে।

থেকে যা। দাড়ি রেখে মুরিদ হয়ে যা।

তুই মনে হচ্ছে বিরক্ত।

বিরক্ত ফিরক্ত না।

সন্ধ্যাবেলা অনেক লোকজন এল ফরিদ আলির কাছে। বুলু মহা উৎসাহে গেল কথাবার্তা শুনতে। সোবাহান বসে রইল গম্ভীর হয়ে। ভাবি বললেন–তুমি যাও, শুনে আসো। আমাদের বলো। মেয়েমানুষেরা তো আর শুনতে পারে না।

বহু লোকজন আসে নাকি ভাবি?

তা আসে। বড় বড় লোকজনও আসে।

বড় বড় লোকজন মানে?

গত সপ্তায় এক জজ সাহেব আসছিলেন।

বলো কী?

জিপ গাড়ি নিয়ে এসেছে। রাত আটটা পর্যন্ত ছিল।

জ্ঞানের কথা সব শুনল?

কী কথা শুনল জানি না। আমি মূর্খ মেয়েমানুষ। এত সব কি জানি?

বুলু খুব আগ্রহ নিয়ে বক্তৃতা শুনল। ফরিদ আলি কখনো মৃদুস্বরে কখনো নিচুগলায় কথা বলতে লাগলেন

মানুষ পশুর মতো, তবে পশুর মধ্যেও ভালো জিনিস থাকে। যেমন বাঘ। বাঘের ভালো জিনিসটা হচ্ছে তার সাহস। সেরকম মানুষের মধ্যে, খারাপ জিনিসের মধ্যে অনেক ভালো জিনিস থাকে। ওই ভালোটা রেখে খারাপটা বাদ দিতে হবে। রসুল করিম হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলয়হেস সাল্লামের মধ্যেও কিছু খারাপ জিনিস ছিল। সেই জন্যে ফিরিশতা পাঠায়ে আল্লাহপাক তার বুক কেটে সেটা পরিষ্কার করলেন। আর আমরা তো অতি নিম্নশ্রেণীর মানুষ, আমাদের মধ্যে খারাপ ভাবটা আরও বেশি। কাজেই রাত দিন আল্লাহপাকের কাছে আমাদের বলতে হবে, হে পাওয়ারদেগার, আমাদের ভালো করেন।

সমবেত প্রতিটি মানুষ একসঙ্গে বলল, আমাদের ভালো করেন। বুলুও বলল।

গভীর রাতে জিগির শুরু হলো, তবে ফরিদ আলি জিগিরে সামিল হলেন না। তিনি তাঁর নামাজঘরে ঢুকে পড়লেন। সেখানে কোনো বাতি জ্বালানো হলো না। অন্ধকারে ছোট্ট ঘরটিতে তিনি এক রহস্যময় পুরুষের মতো বসে রইলেন। বাংলাঘরের মুসল্লিরা। তালে তালে আল্লাহু আল্লাহু করতে লাগল। তাদের মাথা নড়ছে গা কাঁপছে। চোখমুখ আনন্দে উদ্ভাসিত। যারা এখানে জমা হয়েছে তারা সবাই কি রাতে ভরপেট খেয়েছে? বোধহয় না। অনাহারক্লিষ্ট মুখ দেখলেই টের পাওয়া যায়। এরা কি এখানে ক্ষুধা ভুলে থাকার জন্যে এসেছে? বুলু জিগির করার ফাঁকে ফাঁকে গভীর আগ্রহে সবার মুখের দিকে তাকাতে লাগল। তার বড় ভালো লাগছে।

এক সপ্তাহ থাকার কথা ছিল। তৃতীয় দিনেই সোবাহান ঠিক করল চলে আসবে। ফরিদ আলি বেশ কয়েকবার থাকতে বললেন। সোবাহান প্রতিবারই বলল, না আমার ভালো লাগছে না।

কী, ভালো লাগছে না?

এইসব জিগির ফিগির।

না হয় এই কদিন জিগির হবে না। সবদিন তো হয়ও না।

সোবাহান ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, আপনি সারা রাত ওই বাংলাঘরে বসে থাকেন কেন? মানুষের ঘুমের দরকার নাই?

ঘুমাই তো। দিনে ঘুমাই।

বুলুর আরও কিছুদিন থাকার ইচ্ছা ছিল। সোবাহান তাকে নিয়ে জোর করে চলে এল। ফরিদ আলি স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন। সারা পথে অসংখ্য লোক তাকে সালাম করল। একজন এগিয়ে এল ছাতা হাতে। রোদে যেন তার কষ্ট না হয়। তিনি মৃদু হেসে তাকে বললেন, রোদ তো আল্লাহর দান। রোদে কষ্ট হবে কেন? কোনো কিছুতেই কষ্ট নাই। কষ্ট মনে করলেই কষ্ট! সুখ মনে করলেই সুখ!

.

সোবাহান অফিসে ঢোকামাত্র রিসিপিশনের মেয়েটি বলল, আপনি অনেকদিন পরে এলেন। কী ব্যাপার, অসুখ-বিসুখ নাকি?

সোবাহান অবাক হলো। ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

বড় সাহেব আপনার খোঁজ করছিলেন।

উনি কি আছেন?

আছেন। আপনি বসুন। খবর পাঠাচ্ছি।

সে বসে রইল। রিসিপশনের মেয়েটিকে আজ আরও সুন্দর লাগছে। আজ সে। কালো রঙের একটি শাড়ি পরেছে। কালো রঙের শাড়িতে মেয়েদের এতটা সুন্দর লাগে তা তার জানা ছিল না।

যান, আপনি স্যারের ঘরে যান।

রহমান সাহেবের বয়স প্রায় পঞ্চাশ। মাথার চুল সব পেকে গিয়েছে। অসম্ভব গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। কথা বলবার সময় চোখে পলক পড়ে না। এদের দেখলেই মনে হয় এরা। জন্মেছে বস হওয়ার জন্যে।

বসুন। আপনার নাম সোবাহান?

জি।

ওইদিন আপনি এরকম অশালীন আচরণ করলেন কেন? একজন মেয়েমানুষকে অপমান করে পৌরুষ দেখালেন?

সোবাহান জবাব দিল না। লোকটির ব্যক্তিত্বের তারিফ করল মনে মনে।

আপনি পড়াশুনা কতদূর করেছেন?

বিএ পাস করেছি।

কোন ক্লাস?

সেকেন্ড ক্লাস।

যে মহিলাদের সম্মান দেখাতে জানে না তাকে আমি এই অর্গানাইজেশনে চাকরি দিতে পারি না।

সম্মান অর্জন করতে হয়। অনেক মহিলা আছেন যাদের সম্মান দেখানোর কোনো কারণ নেই।

আপনি যেতে পারেন।

সোবাহান উঠে দাঁড়াল। রহমান সাহেব বেল টিপতেই পিএ ছুটে এল এবং এমন ভাব করল যেন সে সোবাহানকে চিনতে পারছে না। রহমান সাহেব বললেন, ফরেন করেসপনডেন্স ফাইলে কোরিয়া ট্রেডার্সের কোনো চিঠি আছে কি না দেখুন তো।

সোবাহান লোকটির ব্যক্তিত্বের আবার প্রশংসা করল। লোকটি কত সহজেই বুঝিয়ে দিল–তুমি কীটস্য কীট। সোবাহান হাসিমুখে বলল, স্লমালিকুম।

রহমান সাহেব চোখ তুলে তাকালেন। শীতল স্বরে বললেন, আপনি নিচে অপেক্ষা করুন, আমি ডাকব।

সে নিচে নেমে এল। রিসিপশনের মেয়েটি কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। যাওয়ার সময় তাকে কি কিছু বলে যাওয়া উচিত? এখানে আর তো নিশ্চয়ই আসা হবে না। সোবাহান ইতস্তত করতে লাগল। কিন্তু কথা শেষ হচ্ছে না। বেশ মেয়েটি।

চলে যাচ্ছেন?

হ্যাঁ।

স্যার কী বললেন?

তেমন কিছু না।

মেয়েটি মনে হলো বেশ অবাক হয়েছে। অবাক হওয়ার কিছু কি আছে এর মধ্যে?

সোবাহান হঠাৎ বলে বসল, আপনার নাম জানা হয়নি।

আমার নাম ইয়াসমিন। নাম দিয়ে কী করবেন?

এমনি জিজ্ঞেস করলাম। কিছু মনে করবেন না।

চা খাবেন?

নাহ্।

খান, এক কাপ চা খান।

মেয়েটি কাকে যেন ইশারা করল। হালকা গলায় বলল, আমার ধারণা ছিল আপনার। চাকরিটা হবে।

এরকম ধারণার কারণ কী?

কারণ স্যারকে দেখলাম আপনাকে নামে চেনেন। আমাকে বলে রেখেছিলেন সোবাহান নামের কেউ এলে তাকে খবর দিতে। আপনার নিশ্চয়ই ভালো রেফারেন্স আছে।

নাহ, তেমন ভালো নেই। থাকলে এ অবস্থা হওয়ার কথা না।

তাও ঠিক।

সোবাহান লক্ষ করল মেয়েটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। কী দেখছে কে জানে। দেখার মতো কী আছে তার মধ্যে?

আপনি রুমাকে যে ট্রিটমেন্ট দিয়েছেন তাতে আমরা সবাই খুব খুশি। থ্যাংকস।

রুমা কে? রহমান সাহেবের পিএ?

হ্যাঁ।

সোবাহান বেতের সোফায় বসে রইল সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যাবেলা পিএ এসে বলল, আজ দেখা হবে না। স্যারের প্রেসার বেড়েছে।

সোবাহানের চোখের সামনেই রহমান সাহেব বের হয় গেলেন। পলকের জন্যে তাকালেন সোবাহানের দিকে।

রিসিপশনিস্ট মেয়েটি বলল, আপনি পরশু আসুন। একটা কিছু নিশ্চয়ই হবে।

দেখি।

না, দেখাদেখি না। আসুন। এত অল্পতে ধৈর্য হারানো ঠিক না।

ধৈর্য আছে। এখনো হারাইনি।

তারা দুজন একসঙ্গে বেরুল। সোবাহান পাশাপাশি হাঁটছিল। তার ইচ্ছা হচ্ছিল বলে–কোনো রেস্টুরেন্টে বসে এক কাপ চা খাবেন? কিন্তু বলল না। বাংলাদেশে মেয়েরা সন্ধ্যাবেলা কোনো রেস্টুরেন্টে বসে চা খায় না। সোবাহান বলল–আচ্ছা চলি? মেয়েটি মিষ্টি করে হাসল। হয়তো অভ্যাসের হাসি, তবু দেখতে ভালো লাগে। এই মেয়েটির দাঁতগুলি সুন্দর। কোন টুথপেস্ট ব্যবহার করে কে জানে।

সোবাহান ঘরে ফিরল রাত এগারোটায়। জলিল সাহেব বললেন, এত দেরি করলেন? আপনার বন্ধু বুলু সাহেব সন্ধ্যা থেকে বসে ছিলেন। খুব নাকি দরকার।

কী দরকার?

তা তো বলেন নাই, চিঠি লিখে গেছেন। ড্রয়ারে চিঠিটা আছে, পড়ে দেখেন।

চিঠিতে তেমন কিছু লেখা নাই। ইংরেজি বাংলা মিশানো যা আছে তার কোনে পরিষ্কার অর্থও হয় না। বোঝা যায় যে, একটা ইম্পর্টেন্ট খবর আছে। সে খবরটি কী সে সম্পর্কে কিছুই নাই।

জলিল সাহেব চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, ব্যাপারটা কি কিছু বুঝতে পারছেন?

নাহ্।

খারাপ কিছু না তো?

না, খারাপ আর কী হবে? চাকরি হয়েছে বোধহয়।

চলেন না যাই খোঁজ নিয়ে আসি।

এত রাতে কোথায় যাব!

সোবাহান কোনো উৎসাহ দেখাল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে ঘুমোতে গেল। ঘুম আসবে না জানা কথা। অনেক রাত জেগে থাকার পর খানিকটা তামতে হবে। ব্যস। কিংবা এও হতে পারে সারা রাত জেগে কাটবে।

রাত একটা পর্যন্ত ঘুমোবার চেষ্টা করে সোবাহান মশারির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। জলিল সাহেব আলো জ্বালিয়ে কী যেন পড়ছেন।

কী পড়ছেন?

তেমন কিছু না রে ভাই। ফুটপাতের একটা বাজে বই। আপনার মতে ইয়াংম্যানদের পড়া ঠিক না।

জলিল সাহেব, আপনি কি কোনো মেয়েকে দেখে বলতে পারেন মেয়েটি বিবাহিতা অবিবাহিতা?

জলিল সাহেব খানিকক্ষণ কুঁচকে রেখে বললেন, বলাটা ডিফিকাল্ট। বলতে হলে বিছানায় নিতে হবে। হা হা হা।

সোবাহান বারান্দায় গিয়ে বসল। জলিল সাহেব ভেতর থেকে বললেন, কি ভাই রাগ করলেন নাকি? বয়স হয়েছে, দুএকটা বেফাঁস কথা বলে বসি। এতে মাইন্ড করা ঠিক না।

মাইন্ড করিনি।

আপনি কি ভাই বিবাহিতা কারুর সঙ্গে কিছু বাধিয়ে বসেছেন? সিংকিং সিংকিং ড্রিকিং ওয়াটার। সুখে আছেন ভাই। বয়সটাই আপনাদের ফেভারে। জীবনটা কেটে গেল ভেজিটেবলের মতো। বহুত আফসোস হয়, বুঝলেন?

জলিল সাহেব বারান্দায় এসে বসলেন। সিগারেট ধরালেন। ক্লান্ত স্বরে বললেন, ফ্যামিলি লাইফের একটা চার্ম আছে। এই ধরেন, ফ্যামিলি থাকলে এ সময়ে লেবুর শরবত বানিয়ে খাওয়াত। মাথা টিপে দিত।

সোবাহান বলল, আপনার মাথা ধরেছে নাকি?

জলিল সাহেব জবাব দিলেন না।

মাথা ধরা থাকলে সিগারেট খাবেন না।

মাথা ধরে নাই। কটা বাজে?

একটার উপরে।

সামনের রাস্তায় লোক চলাচল নেই। গলির মোড়ের সিগারেটের দোকান একটার। দিকে ঝাঁপ ফেলে দেয়। আজ ফেলছে না। অল্পবয়েসী কিছু ছোঁকরা ঘোরাঘুরি করছে সেখানে। জলিল সাহেব ওই দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললেন, ওদের মতলবটা কিছু বুঝতে পারছেন?

জি-না।

গাঁজা খাবে। রাত একটার পর ওই দোকানে গাঁজা বিক্রি হয়।

তাই নাকি?

হুঁ। খাবেন নাকি?

নাহ্।

ইচ্ছা হলে চলেন যাই, দেখি জিনিসটা কী! দু’টাকা করে নেয়। সিগারেটের মধ্যে ভরে দেয়।

না, ইচ্ছা করছে না।

সবকিছু ট্রাই করতে হয়। জীবনে আছে কী বলেন? মরবার সঙ্গে সঙ্গেই তো ফুটটুস। কি ঠিক বললাম না?

জি ঠিকই বলেছেন।

আচ্ছা ঠিক আছে, চলেন যাই চা খেয়ে আসি।

রাতে চা কোথায় পাবেন?

ঢাকা শহরে একটার সময় চা পাওয়া যাবে না? বলেন কী? যান সার্টটা গায়ে দিয়ে আসেন।

বড় রাস্তায় দুটি চায়ের দোকান ভোলা পাওয়া গেল। একটিতে ইংরেজি গানের ক্যাসেট বাজানো হচ্ছে। জলিল সাহেব গানের দোকানটিতেই বসলেন। চা খাওয়া শেষ হওয়ার পরও বসে রইলেন। সোবাহান বলল, যাবেন না?

আরে বসেন না, গান শুনি। বাড়িতে গিয়ে তো সেই ঘুমাবেন। ভালোই লাগছে তো গান শুনতে। লাগছে না?

সোবাহান কিছু বলল না।

বেঁচে থাকতে হলে আনন্দ দরকার। চা খাবেন আরেক কাপ?

জি-না।

দৈ খাবেন? খান, পয়সা আমি দেব।

জি-না। আমি উঠব, ঘুম পাচ্ছে। আপনি কি আরও কিছুক্ষণ বসবেন?

বসি কিছু সময়। ঘরে গিয়ে করবটা কী?

জলিল সাহেব আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে গানের তালে মাথা নাড়তে লাগলেন। যেন খুব মজা পাচ্ছেন।

সোবাহানের মনে হলো–বেচারাকে ফেলে আসাটা ঠিক হয়নি। আরও খানিকক্ষণ বসলেই হতো। ঘরে গিয়ে তো ঘুমানো যাবে না। দরজা খুলবার জন্যে জেগে থাকতে হবে। তিনি কখন আসবেন তারও ঠিক নেই। দোকান বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত বসে থাকবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই।

.

১০.

নামাজঘরটি ফরিদ আলির পছন্দ হয়েছে।

একটি মাত্র দরজার গোলাকার ছোট্ট ঘর। মেঝে মোজাইক করার ইচ্ছা ছিল—টাকার টান পড়ে গেল। তাতে ক্ষতি হয়নি। কালো সিমেন্টের প্রলেপে ভালোই লাগছে দেখতে।

ঘরের ভেতরটা দিনের বেলাতেও অন্ধকার। অন্ধকার বলেই রহস্যময়। উপাসনার ঘর রহস্যময় হওয়াই তো উচিত। বসতবাড়ি থেকে পঞ্চাশ গজের মতো দূরে। এটাও ভালো। সংসারের কোলাহল থেকে দূরে থাকাই ভালো।

ফরিদ আলি সমস্ত দুপুর সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে ঘরের মেঝে পরিষ্কার করলেন। তার বাড়ির কামলা রোস্তম বলল, আমি সাফ কইরা দেই বড় মিয়া? ফরিদ আলি বললেন, না। এই ঘরে আমি ছাড়া কেউ ঢুকবে না।

রোস্তম তাকাল অবাক হয়ে।

নির্জনে আল্লাহ খোদার নাম নিতে চাই রোস্তম। নির্জনেই আল্লাহকে ডাকা উচিত। উচিত না?

জি উচিত।

সন্ধ্যাবেলা ফরিদ আলি ভেতরবাড়িতে অজু করতে গেলেন। অজুর পানি দিতে দিতে পারুল বলল, আপনের সাথে আমার কথা আছে।

ফরিদ আলির কপালে ভাঁজ পড়ল। পারুল তাকে তুমি করে বলত। এখন আপনি করে বলছে। রোজই ভাবেন জিজ্ঞেস করবেন–এর কারণটি কী? জিজ্ঞেস করা হয় না। লজ্জা লাগে। ফরিদ আলি অজু শেষ করে বললেন, বলো কী বলবে?

নামাজ শেষ কইরা আসেন তারপর বলি।

না, এখনই বলো। নামাজ শেষ করে আমি আজ আর বাড়ি ফিরব না। রাত কাটাব নামাজঘরে।

কেন?

ইবাদত বন্দেগি করব। ঘর তো সেজন্যেই বানালাম।

ভিতরের বাড়িতে ইবাদত বন্দেগি করা যায় না?

গণ্ডগোল হয়। মনে বসে না। বলো, তুমি কী বলতে চাও?

অন্যদিন বলব। আপনের নামাজের সময় হইছে। নামাজ পড়তে যান।

ফরিদ আলি বাংলাঘরে গিয়ে দেখেন নামাজ পড়ার জন্যে অনেকেই বসে আছে। তিনি বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, আজ থেকে একা একা আল্লাহকে ডাকবেন।

সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।

আপনারা কিছু মনে করবেন না।

জি-না জি-না। তবে আপনার দু’একটা কথা শুনতে বড় ভালো লাগে। মনে শান্তি হয়।

প্রতি বৃহস্পতিবার মাগরেবের পর আপনাদের সাথে কথা বলব।

জি আচ্ছা। জি আচ্ছা।

আর বলবই বা কী বলেন? আমি কী জানি? কিছুই জানি না। বোকার মতো যা মনে আসে বলি। আল্লাহর কাছে গুনাগার হই।

সমবেত মুসল্লিরা অভিভূত হয়ে পড়ে। তারা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। ফরিদ আলি নামাজঘরে ঢুকে পড়েন। ঘরের রহস্যময় আলো-আঁধার তাঁর বড় ভালো লাগে।

ভেতরবাড়িতে ফিরতে ফিরতে তাঁর রাত দশটা বেজে যায়। পারুল ভাত বেড়ে দেয়। তরকারি গরম করে আনে। ভাত মাখতে মাখতে ফরিদ আলি নিচুস্বরে কথা বলেন, কী যেন বলতে চেয়েছিলে?

তেমন কিছু না। আপনে ভাত খান। ডাইল নেন।

বলার থাকলে বলো।

পারুল অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, আপনে আরেকটা বিয়া করেন। সংসারে ছেলেপুলে আসলে মনে শান্তি আসে।

আমার মনে শান্তি আছে।

না, শান্তি থাকলে মানুষ এই রকম করে না।

কী করলাম আমি?

বিষয়সম্পত্তি বিক্রি করতেছেন। এইসব আপনের একার না। সোবাহানের অংশও আছে।

সোবাহানকে জিজ্ঞেস করেছি।

আপনে জিজ্ঞাস করলে সে না বলবে না। তবু এইটা উচিত না।

ফরিদ আলি গম্ভীর মুখে বললেন, আমি ধর্মকর্ম করি এটা চাও না তুমি?

ধর্মকর্ম নিয়া আপনি বাড়াবাড়ি করেন এইটা ঠিক না। মানুষের সংসারি হওয়া লাগে। আপনার উপর দায়িত্ব আছে।

কী দায়িত্ব?

সোবাহানের বিয়া দিবেন না?

তার বিয়ে ঠিক করে এসেছি। ওই নিয়ে চিন্তা করবার কিছু নাই। সব ঠিক আছে।

পারুল বিস্মিত হয়ে বলল, কোন জায়গায় ঠিক করলেন?

ঢাকায়। মেয়ের নাম যূথি। ভালো মেয়ে।

সোবাহান মেয়ে দেখছে? সে রাজি আছে?

রাজি অরাজির কী আছে? আল্লাহর ইচ্ছা থাকলে ওইখানে বিয়ে হবে। ইচ্ছা না থাকলে হবে না।

ওই মেয়ের কথা তো আমাকে কিছু বলেন নাই।

এই তো বললাম। আর কী জানতে চাও?

ফরিদ আলি উঠে পড়ে শান্তস্বরে বললেন, আজ রাতটা আমি নামাজঘরে কাটাব।

ওইখানেই ঘুমাবেন?

না, ঘুমাব না। এবাদত বন্দেগি করব।

রাতে আর ফিরবেন না?

ফজরের নামাজের শেষে ফিরব। আমাকে একটা পান দাও।

পারুল পান এনে দিল। ফরিদ আলি বিছানায় আধশোয়া হয়ে পান খেলেন। পারুল কিছুই বলল না।

নামাজঘরে ঢোকবার আগে ফরিদ আলি সোবাহানকে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখলেন।

তাঁর মনে আজ খুব আনন্দ। চিঠি লিখতে লিখতে তাঁর গভীর আবেগ উপস্থিত হলো। বেশ কয়েকবার তাঁকে চোখ মুছতে দেখা গেল। পারুল তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে। দীর্ঘ দিনের চেনা লোক কত দ্রুতই না অচেনা হয়ে যাচ্ছে! ফরিদ আলি চোখ তুলে তাকালেন। শান্তস্বরে বললেন, কী দেখছ?

না, কিছু না।

একটা চিঠি দিলাম সোবাহানকে। বিয়ের কথাটা লিখলাম। ওর বিয়ে হয়ে গেলে আমার একটা দায়িত্ব শেষ হয়। অজুর পানি দাও। অজু করে চলে যাব।

রাতে আসবেন?

না।

ফরিদ আলি উঠানে বসে অনেক সময় নিয়ে অজু করলেন। উঠানে ফকফকা জ্যোৎস্না। দেখতে খুব ভালো লাগে। পারুল দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখে। তাকে নতুন বিয়ে হওয়া কিশোরীর মতো লাগে।

প্রায় চৌদ্দ বছর হলো তাদের বিয়ে হয়েছে। পনেরোও হতে পারে। এত দীর্ঘ সময় তারা একসঙ্গে আছে এটা মনেই থাকে না। পারুলকে এখনো অচেনা লাগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *