তিরিশ বছর আগের ডাইরিটা – শুভময় সাহা
১
দেওয়াল টপকে বাগান বাড়িতে ঢুকে পড়ে অভিরূপ। বাগান সংলগ্ন বাড়ির দরজাটি সবচেয়ে দুর্বল। যেন তেন ভাবে এর লক ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকতে পারলেই কেল্লাফতে। বৃদ্ধ বাড়িতে একাই থাকে। সাত কুলে তার কেউ নেই। কোনভাবে তালা ভেঙে বাড়িতে ঢুকতে পারলেই হস্তগত হবে সাত রাজার ধন।
না, অভাবে স্বভাব নষ্ট নয়। নেশাগ্রস্তের পাগলামি। চুরি করার নেশা। তাদের ভাষায় ‘প্যাশন’। প্রয়োজনে চুরি তারা করে না। তাদের পারিবারিক সচ্ছলতা শহরের শীর্ষস্থানীয়দের মত না হলেও, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করেই দিনের পর দিন দাপিয়ে বেড়ানো যায়। তবে উচ্চ মধ্যবিত্তের ডানার ভার তাদের শরীরের থেকে বেশি হয়। উড়তে ইচ্ছে হলেই এক অদৃশ্য শেকল তাদের পিছন থেকে টেনে ধরে। বাবা কাকারা সব সময় বোঝাতে চেষ্টা করে কিভাবে এক একটা ইট দিয়ে একটা বাড়ি তৈরি করা হয়।
তারা অবসর কাটানোর এমন কোনো পরিকল্পনা যদি করে থাকে যাতে প্রচুর অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা থাকে, তবে তাদের বাবারা চশমাটা একটু নামিয়ে তার ওপর দিয়ে একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে তাদের বুঝিয়ে দেন যে পরিশ্রম করে উপার্জন করে দেখো, দেখি তখন কত পয়সা নষ্ট করার কথা মাথায় খেয়াল আসে।
বারবার এরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে হাত পেতে চাওয়ার অভ্যেসটা তারা চিরতরে বন্ধ করে দেয়। ‘তারা’ বলতে এখানে দুজনের কথা বলা হচ্ছে, অভিরূপ এবং সায়ন্তন। দুই বন্ধু যারা ছোট থেকেই একসাথে বড় হয়েছে।স্বাবলম্বী হওয়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার সাথে সাথেই বিভিন্ন রকম ব্যবসার পরিকল্পনা শুরু হয়। কিন্তু প্রতিবারই হিসেব কষে পরিশ্রম এবং উপার্জনের অনুপাতটি তাদের অতৃপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা পেশা হিসেবে বেছে নেয় চুরি। না কোনরকম ছিঁচকে চুরি নয়। চোর হলেও তাদের একটা সেন্টিমেন্ট আছে। তারা এমন জায়গায় চুরি করে, যেখানে চুরির অংকটা এতটা হয়, যে অন্তত দুমাস আর তাদের অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে হয় না।
আজকের বাড়িটা একটি বৃদ্ধের। অবশ্য বাড়ি না বলে অট্টালিকা বললেই ভাল হয়। বহুকাল আগে তিনি বিপত্নীক হয়েছেন। শোনা যায় তার স্ত্রী নাকি মানসিক বিকারগ্রস্ত ছিলেন। আজ থেকে আনুমানিক পঁচিশ ছাব্বিশ বছর আগে মানসিক রোগের চিকিৎসার সুব্যবস্থা না থাকার কারণে তিনি অল্প বয়সেই ইহলোক ত্যাগ করেন।
বাগানের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে অভিরূপ। বাইরের দরজায় গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সায়ন্তন। বাইরে থেকে কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেখলেই অভিরূপ কে সতর্ক করবে সে। ভেতরে ঢোকার পর অভিরূপ এর মূল কাজ তিনটি। প্রথমত, বুড়োর শোবার ঘরে গিয়ে তার নাকের কাছে ক্লোরোফর্ম ধরতে হবে। বাইরে কোন শব্দ হলেও সারা রাতে তার যেন আর ঘুম না ভাঙ্গে। দ্বিতীয়ত, ড্রয়ারে যতগুলো চাবি থাকবে সবগুলো নিয়ে পকেটে পুরতে হবে। তৃতীয়ত, বাড়ির আলমারিটি খুঁজে সেখানে সমস্ত চাবি ঢুকিয়ে দেখে নিতে হবে কোন চাবি দিয়ে কার্যসিদ্ধি হবে। কোন মতো আলমারি খুলে টাকা বা গয়নাগাটি বের করে নিতে পারলেই কাজ শেষ।
প্রথম কাজটা খুবই সহজ ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় বৃদ্ধের নাকের কাছে ক্লোরোফর্ম ধরে তাকে পুরোপুরি অবশ করে দেওয়া হল।তারপর তার ড্রয়ার থেকে যতগুলো চাবি সে হাতের কাছে পায়, সবগুলো নিয়ে নিজের পকেটে পুরে নেয়। এবার সারা বাড়ি ঘুরে খুঁজতে থাকে সেই আলমারিটি। আলমারিটি খুঁজে পাওয়ার পর শুরু হয় আসল কাজ।
প্রথম দুটো কাজ সহজ হলেও এই তৃতীয় কাজেই ছিল আসল ধৈর্যের পরীক্ষা। প্রত্যেকটা চাবি লক এর মধ্যে ঢুকিয়ে দেখে নেওয়া কোনটা দিয়ে আলমারি খোলে। কোনো কোনো ভুল চাবি সেই লকের ফুটোয় ঢুকছেই না। তবে সমস্যা হচ্ছে, যখন কোনো চাবি লক এর ভেতরে ঢুকে আটকে যাচ্ছে আর বেরোতে চাইছে না। পাঁচ ছয় বার এরকম অক্লান্ত পরিশ্রম করার পর শেষমেশ একটি চাবি দিয়ে আলমারিটি খুলে যায়।
মনের মধ্যে একটা ‘মিশন সাকসেসফুল’ ভাব এনে আলমারির ভেতরের লকারটি সে খুলে ফেলে। বুক ভরা আশা নিয়ে লকারের ভেতর হাত ঢোকায় সে।
বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত চমকে যায় অভিরূপ। পুরো লকার ফাঁকা। টাকা-পয়সা তো কিছু নেই, গয়নাগাটিরও লেশমাত্র নেই। কিন্তু বৃদ্ধের স্ত্রীর অনেক গয়নাগাটি ছিল বলে শুনেছিল অভিরূপ। সেগুলো তাহলে গেল কোথায়! অস্থির হয়ে আরেকবার লকারটিতে হাত চালায় সে। হাতে বই জাতীয় কিছু একটা ঠেকতেই সেটা বের করে নেয় সেখান থেকে। একটা পুরোনো ডায়েরি।
লকার এর মধ্যে মানুষ পুরোনো ডায়েরি রাখে! মাথা গরম হয়ে ওঠে অভিরূপের। রাগে ডাইরিটি মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। পুরো আলমারি আরেকবার তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখে মূল্যবান কিছু পাওয়া যায় কিনা। না কোথাও কিছু নেই। এত দিনের পরিকল্পনা, বৃদ্ধের বাড়িতে এতদিন ধরে নজর রাখা, সবকিছুই এক নিমিষে মাটি হয়ে গেল। পাহাড় খুঁরে ইঁদুর বেরিয়ে আসার মত একটি ডায়েরি পেয়েছে অভিরূপ। তার মনের অবস্থা তাকে না দেখলে বুঝতে পারা সম্ভব নয়।
মাটিতে ধপ করে বসে পড়ে সে। সারা শরীর ও মন জুড়ে শুধু আফসোস আর আফসোস। এমন সময় খুব সুন্দর একটি সুগন্ধ ভেসে আসে তার নাকে। ধীরে ধীরে সুগন্ধটি যেন তীব্রতর হতে থাকে। সেই সুগন্ধির উৎস খোঁজার চেষ্টা করে অভিরূপ কিন্তু কিছুই খুঁজে পায়না। ঠিক সেই সময় তার চোখ যায় মেঝেতে পড়ে থাকা সেই ডাইরিটির ওপর। এমন কি মূল্যবান এই ডায়েরিটি! যে তাকে লকারের ভেতর রাখতে হবে!
ডাইরিটি হাতে তুলে একসাথে প্রায় অনেকগুলো পাতা উল্টে ডায়েরিটির মাঝখানের দিকে একটি বাক্যে তার চোখ আটকে যায়। “সেই ভোজালি দিয়ে তার স্ত্রীর গলায় এক কোপ মারে সে। গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। মহিলাটি চিৎকার করতে গিয়েও পারেনা। তার গলা থেকে চিৎকার বেরোতে চাইছে কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে বের হতে চাইছে না।”
ডাইরিটি ধপ করে বন্ধ করে ফেলে অভিরূপ। এইসব কি লেখা আছে এখানে! এই বৃদ্ধ কি কোন এক সময় একটা খুনের সাক্ষী হয়েছিলেন! কিন্তু এত বীভৎস এক খুন?
ধীরে ধীরে অভিরূপের সব গোলমাল হয়ে আসে। এই বাড়িতে আগমনের কারণ সে ভুলে যায়। কোন কিছু না পাওয়ায় একটু আগে যে তার আফসোস ছিল সেটাও তার মাথায় আসেনা। সে ডাইরিটি খোলে। সে দেখে ডায়েরিতে বৃদ্ধের নাম এবং তিরিশ বছর আগের তারিখ লেখা আছে। সে ডাইরির প্রথম পাতা মেলে ধরে।এই বীভৎস খুনের সাথে বৃদ্ধের কি সম্পর্ক তা জানতে হলে ডায়েরিটা প্রথম থেকে পড়তে হবে।
২
ডিসেম্বর ৩ ১৯৯১, মঙ্গলবার।
আজ আমি ভীষণ খুশি। আমার একাকিত্বের মেয়াদ শেষ। আমার জীবনে পলি এসেছে। আমার বউ। এত মিষ্টি দেখতে একটি মেয়ে আমার বউ ঠিক যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। বিয়ের সময় তাঁর মা বাবা বলেছিলেন ঠিক ই ,যে তাঁর বয়স আঠারো, আমি কিন্তু বিশ্বাস করিনি। ওইটুকু বিড়াল ছানার মতো একটি মেয়ে , ষোল সতের , তাঁর এক চুল বেশি নয়।
যেদিন প্রথম তাকে বাড়িতে এনে তুলি, তাঁর ডাগর ডাগর চোখে চারিদিকে চেয়ে সে শুধু বলে, “এত বড় বাড়ি!” তারপর সে রীতিমতো ভয় পেয়ে যায়। তাঁর ধারনা , এত বড় বাড়িতে নাকি সে হারিয়ে যাবে। বাড়ির অন্যপ্রান্তে গেলে সে যদি আর ফিরে আসার রাস্তা খুঁজে না পায়! আমার বড্ড হাসি পেল। আমি তাকে সঙ্গে করে পুরো বাড়িটি ঘুরিয়ে দেখালাম। তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম যে হারিয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই।
সে এক নিস্পাপ শিশুর মতো । অফিস গেলেই সে জেদ করে তাড়াতাড়ি ফিরে আসার জন্য। ফিরে এলেই তাঁর নতুন জেদ তাকে গল্প শোনাতে হবে। শরৎচন্দ্র ছাড়া সে কিছুই বোঝে না।
ডিসেম্বর ৭ ১৯৯১, শনিবার
কাল রাতে পলির চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিলো। তাঁর চিৎকারে ধড়মড় করে উঠে দেখি সে “বাঁচাও বাঁচাও” বলে হাত পা ছুঁড়ছে। বুঝলাম সে এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছে। ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পরও সে ক্রমাগত চিৎকার করতে থাকে। তাঁর কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে, সে যা অনুভব করেছে সেটা শুধুমাত্র একটা দুঃস্বপ্ন।
সকালবেলায় সে বলে যে, সে একটা খুন হতে দেখেছে। তাকে স্বপ্নের কথাটা মনে করাতে চাইলে, সে অবুঝের মতো বলতে থাকে সে স্পষ্ট অনুভব করেছে সবকিছু। সেটাকে শুধুমাত্র স্বপ্ন বলে মেনে নিতে সে নারাজ। এমত অবস্থায় আমিও মেজাজ হারিয়ে ফেলে তাকে জোরে ধমক দি। কিন্তু তাঁর চোখের জল দেখে আমার রাগ কর্পূরের মতো উবে যায়।
ডিসেম্বর ৯ ১৯৯১, সোমবার
পরপর দুদিন ঘুমোতে পারিনি। রোজ রাতে একই উপদ্রব শুরু হয়েছে। প্রায় মাঝরাতের সময় পলি ঘুমের মধ্যে চেঁচিয়ে ওঠে। স্বপ্নে সে কোন এক বীভৎস খুনের দৃশ্য দেখতে পায়। সমস্যা হল, তাকে কিছুতেই বিশ্বাস করানো যায় না যে সেটি একটি স্বপ্ন মাত্র। বাস্তবের সাথে তাঁর কোন মিল নেই। বাস্তবের মাটিতে পা দেওয়ার পরিবর্তে , আমি যেন তাকে বিশ্বাস করি, সেই বিষয়ে সে বেশি জোর দেয়। “তুমি বিশ্বাস করো আমি স্পষ্ট দেখলাম সেই লোকটি ভোজালি দিয়ে তাঁর স্ত্রীর গলায় এক কোপ মারে। গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। মহিলাটি চিৎকার করতে গিয়েও পারেনা। তাঁর গলা থেকে চিৎকার বেরোতে চাইছে কিন্তু এক অজানা কারনে বের হতে পারছে না। আমার হাত তাজা রক্তে লাল হয়ে ছিল। সে আমার চোখের সামনে মারা গেলো। তুমি আমার কথা বিশ্বাস করো।”
ডিসেম্বর ১৫ ১৯৯১, রবিবার
এতদিন যা ঘটছিলো তাঁর একটা ব্যাখা ছিল। স্বপ্নের মধ্যে ভয়ঙ্কর কিছু দেখে বাস্তবের সাথে মেলাতে পারতো না পলি। তাঁর দুর্বল মন স্বপ্ন এবং বাস্তবকে আলাদা করতে পারতো না। ভেবেছিলাম বাড়িতে সারাদিন একা থেকে ভয়ের কারনে তাঁর মস্তিস্ক বিকৃতি ঘটেছে। কিছুদিন তাকে নিয়ে কোথাও ঘুরে এলে তাঁর মন হালকা হবে। ধীরে ধীরে তাঁর ভয়টাও আবছা হয়ে আসবে। কিন্তু বেশ কয়েকদিন ধরে যা চলছে তাঁর কোন উপযুক্ত ব্যাখা আমার কাছে নেই।
আগে সমস্যা হতো ঘুমিয়ে যাওয়ার পর। এখন দিন দুপুরেও সেই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাঁর দাবী, সে কিছু শুনতে পাচ্ছে। বহুদূরের কোন আবছা গলার আওয়াজ তাঁর কানে এসে পৌঁছচ্ছে। সেই গলায় কাতর আবেদন। বেঁচে থাকার জন্য দয়া ভিক্ষা। খুন হওয়ার আগে আততায়ীকে অনুরোধ জানানো হচ্ছে প্রানভিক্ষা দেওয়ার জন্য। মাঝে মাঝেই “তুমি শুনতে পাচ্ছো না? তুমি কি কিছু শুনতে পাচ্ছো না?” বলে চিৎকার করে ওঠে পলি। কাতরভাবে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে আমার উত্তরের।
ডিসেম্বর ২১ ১৯৯১, শনিবার
অফিস থেকে প্রায় ছুটি নিতে হয় এখন। একজন মহিলাকে ঠিক করা হয়েছিলো পলিকে দেখাশোনা করার। কিন্তু পলির অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে একদিন পরেই সে আমাকে জানিয়ে দেয় তাঁর পক্ষে আমার বাড়িতে কাজ করা সম্ভব নয়। বেশি টাকার লোভ দেখিয়েও তাকে আমি ধরে রাখতে পারিনি। যাওয়ার আগে আমাকে কিছু তাবিচ কবচের উপদেশ এবং কিছু সাধুবাবার ঠিকানা বলে গেছে সে। মনের রাগ চেপে যতটা সম্ভব ভদ্র ভাষা প্রয়োগ করে তাকে বিদেয় করেছি। ইতিমধ্যে লোকালয়ে ছড়িয়ে যায় , আমার বউ পাগল। আমার ছেলেবেলার বন্ধু হরেন ডাক্তারের সাথে আমি সমস্ত ব্যাপার আলোচনা করি। সে সাফ জানিয়ে দেয় এমন রোগের চিকিৎসা কোন ভারতীয় ডাক্তার করতে পারবে বলে তাঁর জানা নেই। আমার প্রচণ্ড কাকুতি মিনতির পর সে নিজের প্রেসক্রিপসনে একটা ঘুমের ওষুধ লিখে দেয়।
ডিসেম্বর ২৬ ১৯৯১ , বৃহস্পতিবার
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে দেখি পলি পাশে নেই। পাগলের মতো গোটা বাড়ি খুঁজতে থাকি। শেষপর্যন্ত ছাদে গিয়ে দেখতে পাই, সে রেলিঙের ওপর বিপজ্জনক ভাবে দাড়িয়ে আছে। সামান্য পা হড়কে গেলেই ঘটে যেতে পারে বিশাল বিপদ। আমি দৌড়ে গিয়ে একটান দিয়ে তাকে নামিয়ে এনে বুকের দ্রুত ওঠানামা অনুভব করতে করতে বলি, “তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? একটু এদিক ওদিক হলে কি অবস্থা হতো?” সে আমার কথার উত্তর না দিয়ে নিজের মনেই বলে, “আমি ঘর থেকে ঠিক শুনতে পাচ্ছিলাম না। তাই ছাদে এলাম। একজন দৌড়োতে দৌড়োতে জঙ্গলে পৌছে গেছে। তাঁর পেছনে একজন………” আমি আর থাকতে পারলাম না। সপাটে তাঁর গালে এক চড় মারলাম। অবাক হয়ে দেখলাম সে আর ঠোট ফুলিয়ে কাদলো না। অভিমান করলো না। শুধু শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো আমার দিকে।
জানুয়ারি ৪ ১৯৯২, শনিবার
ঘরের মধ্যে চিৎকার আর জিনিস ভাঙার শব্দ শুনে দৌড়ে এসে দেখি, পলি দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে অদৃশ্য কাউকে উদ্দেশ্য করে বলছে, “একদম আমার কাছে আসবি না শয়তান, তোকে আমি খুন করে ফেলব” । এই কথা বলেই হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই ছুঁড়ে মারছে। সমস্ত জিনিসগুলো দেওয়ালে লেগে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তারপর চিৎকার করে বলছে, “বাঁচাও বাঁচাও”।
এই পর্যন্ত পড়ে ডাইরি বন্ধ করলো অভিরুপ। এর পরের ঘটনা আর ডাইরিতে লেখা নেই। বাকি পাতাগুলো সাদা। ডাইরি বন্ধ করে দেওয়ালে পিঠ ঠেকায় অভিরুপ। পকেটের ফোন হালকা নড়ে উঠতেই বের করে দেখে সায়ন্তনের ১৩ টা মিস কল। ডাইরি পড়তে পড়তে কতক্ষণ কাটিয়ে ফেলেছে তাঁর কোন হুঁশ নেই।
অভিরুপ নড়েচড়ে ওঠে। ডাইরি যথাস্থানে রেখে আলমারি লক করে। বুড়োর ঘরে গিয়ে চাবিগুলো রেখে আসে। সকালে বুড়ো যেন কিছুতেই বুঝতে না পারে যে রাতে তাঁর ঘরে কেউ ঢুকেছিল। বাড়ির বাইরে এসে সায়ন্তনের চিন্তিত মুখ দেখতে পায়। “কি রে, এতক্ষণ লাগলো কেন? মালকড়ি কিছু পেলি?” নিরাস মুখে অভিরুপ জানালো যে সে কিছুই পায়নি। “কিছু পাসনি? তাহলে এতক্ষণ ভেতরে কি করছিলি?”
“একটা ডাইরি………”
“ডাইরি! কিসের ডাইরি! তুই মাইরি ফাঁসাবি। চল কেউ দেখে ফেলে তাঁর আগে কেটে পড়ি।”
দ্রুত সেখান থেকে সরে যেতে গিয়েও হঠাৎ দাড়িয়ে পড়ে অভিরুপ। কানের কাছে একটা সোঁ সোঁ শব্দ শুনতে পায়। চলতি বাস বা ট্রেনের জানলার কাছে বসলে হাওয়া লেগে কানে যেমন অনুভুতি হয় অনেকটা সেরকম। তারপর হঠাৎ দূর থেকে আবছা কোনও মহিলা কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। কথাগুলো স্পষ্ট বুঝতে না পারলেও একটা কাতর প্রার্থনার সুর শুনতে পায় সে। সায়ন্তন পেছনে তাকিয়ে দেখে অভিরুপ দাড়িয়ে পড়েছে। বিরক্তমুখে চাপা গলায় সে ডাকে, “কি রে হাবাগোবার মতো দাড়িয়ে আছিস কেন? আয়।”
অভিরুপ জিজ্ঞেস করে, “তুই কিছু শুনতে পাচ্ছিস?”
“কি শুনব?”
“কোনও মহিলার গলার আওয়াজ।”
সায়ন্তন এদিক ওদিক কান পেতে শোনার চেষ্টা করে জবাব দেয়, “কই না তো”
৩
ঘরের দরজা বন্ধ। পালাবার কোন পথ নেই। মেঝেতে বসে বিস্ফারিত চোখে মহিলাটি দেখছে তাঁর আততায়ী এগিয়ে আসছে। মহিলার চুলের মুঠি ধরে তুলে তাকে দাড় করায় আততায়ী। তারপর প্রচণ্ড আক্রোশে ছুরি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে মহিলার শরীর। ঠিক সাতবার মহিলাটিকে কোপায় সে। তারপর মহিলার মৃতদেহ রেফ্রিজেরেটরে ঢুকিয়ে রাখে। ছুরিতে লেগে থাকা রক্তের দিকে তাকিয়ে তাঁর মুখে ফুটে ওঠে এক ক্রুর হাসি।
ধড়মড় করে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে ওঠে অভিরুপ। কি বীভৎস স্বপ্ন! এরকম স্বপ্ন এর আগে দেখেছে বলে তো মনে পড়েনা। ঘুম থেকে ওঠার পর পরিচিত পরিবেশ দেখে সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। দুঃস্বপ্ন এর আগেও সে অনেক দেখেছে। কিন্তু এবার যেন একটু অন্যরকম। স্বপ্নে যে একটা আবছা ভাব থাকে ,সেটা এই স্বপ্নে ছিল না। তাঁর যেন মনে হচ্ছে একটু আগে সে ঘটনাস্থলে দাড়িয়ে নিজের চোখে সব কিছু দেখেছে।
বিছানার পাশে রাখা মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে দেখে রাত ২ টো বাজে। বেডরুম সংলগ্ন বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে নেয় সে। আরেকবার ঘুমনোর চেষ্টা করতে গিয়ে কিছুতেই ঘুমোতে পারেনা। এক অদ্ভুত অস্থিরতা যেন তাকে চেপে ধরেছে। চোখ বন্ধ করলেই মনে হচ্ছে আততায়ীটি যেন তাঁর পাশেই দাড়িয়ে আছে। একটু অসাবধান হলেই যেন আক্রমন করতে পারে তাকে।
সকালবেলা খবরের কাগজ খুলে একটু যেন অবাক হয় সে। শিরোনামের এক জায়গায় লেখা আছে, ‘রেফ্রিজেরেটর থেকে উদ্ধার মৃতদেহ’। দীর্ঘ বিবাদের জেরে স্বামী স্ত্রীকে কুপিয়ে খুন করে। মৃতদেহের দেহে মোট সাতটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। রাতে চেঁচামেচি শুনে পাড়ার লোক পুলিশে খবর দেয়। অস্ত্র সহ গ্রেপ্তার করা হয় স্বামীকে।
ঘটনাটি ঘটেছিল উত্তর প্রদেশের সিতাপুরে। হুবহু অভিরুপের স্বপ্নের সাথে মিল আছে ঘটনাটার। বিষ্ময়ের মাত্রা বাড়লো যখন আততায়ীর একটি ছবি খবরের কাগজে দেখতে পেল। এ তো অবিকল সেই লোকটি যাকে সে স্বপ্নে দেখেছিলো। আরেকটু ভালো করে ছবিটি দেখে সে। না, কোনো ভুল নেই।একশো শতাংশ সেই লোকটিই।
সায়ন্তনকে ব্যাপারটা জানাতেই সে হেসে উড়িয়ে দেয়। “ওই বুড়োর ডাইরি পড়ে তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তুই স্বপ্নে হয়তো কিছু একটা দেখেছিস , কিন্তু তোর মনে নেই। মাঝে মাঝেই তো এমন হয়। তারপর সেই খবরের কাগজের শিরোনাম পড়ে হয়তো তোর মনে হয়েছে এই স্বপ্নটাই তুই দেখেছিলিস।”
“কিন্তু আমি কি দেখেছিলাম আমি তো ভুলিনি। তোকে তো বললাম, কোন আবছা স্বপ্ন নয়। যেন মনে হচ্ছিলো আমি সেখানেই দাড়িয়ে ছিলাম।”
“শোন, আমার মনে হয় ওই ডাইরিটা তোর মাথায় একটু বেশি প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়াও আমরা ভেবেছিলাম বুড়োর বাড়ি থেকে অনেক কিছু পাওয়া যাবে। কিছু না পেয়ে হয়তো তুই………”
“কিছু না পেয়ে কি? তোর কি মনে হয় আমি পাগল হয়ে গেছি? শোন সায়ন্তন, আমি কোনো গেঁয়ো ভুত না যে কোনো কারন বা লজিক ছাড়াই কথা বলবো।
“তোর কি মনে হচ্ছে না তুই একটু বেশি উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছিস? কুল ডাউন ব্রো।”
সত্যি হয়তো অভিরুপ একটু বেশি উত্তেজিত হচ্ছে। এমনও হতে পারে সায়ন্তন ঠিকই বলছে। হয়তো উত্তেজনার বশে তাঁর উলটোপালটা খেয়াল আসছে।
রাতে ঘুমোতে গিয়ে একটা অস্বস্তি অনুভব করে অভিরুপ। কানের কাছে যেন একটা সোঁ সোঁ শব্দ লেগে আছে। সবসময় যেন মনে হচ্ছে দুরের কোন আবছা শব্দ সে শুনতে পাচ্ছে। মাথার পেছনে বাঁ দিকটায় একটা যন্ত্রণা অনুভব করে সে। সকালে খবরের কাগজটা পড়ার পর থেকেই তাঁর দুটো হাত কাঁপছে। কিছু লিখতে গিয়ে নিজের হাতের লেখাই আর চিনতে পারেনি সে। সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে! তাঁর এই অবস্থা থেকে সে কি আর বেরোতে পারবে না? চিন্তা ভাবনার ভিড়ে কখন যে চোখ লেগে আসে বুঝতে পারেনা অভিরুপ।
হঠাৎ দেখে সে ছাদে দাড়িয়ে আছে। না, নিজের বাড়ির ছাদ নয়। জায়গাটা সে চিনতে পারছে না। কিন্তু কোন এক অজানা কারনেই তাঁর যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা দুর্ঘটনা হতে চলেছে। হঠাৎ সে দেখে, একজন লোক একটি মহিলাকে চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসছে। মহিলাটি যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আর লোকটি দাঁতে দাঁত পিষে বলছে, “হারামজাদি, তোর এত বড় সাহস ,তুই আমার পেছনে লোক লাগাস! খুব মুখে মুখে তর্ক করিস তাই না, এবার দেখ তোর কি হয়।” কথাটা বলেই লোকটা মহিলাটিকে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় নিচে। নিচে তাকিয়ে অভিরুপ দেখে মহিলার দেহ স্থির হয়ে পড়ে আছে মাটিতে। চারপাশে রক্ত।
ঘুম ভেঙ্গে গেলেই সোজা হয়ে বসে অভিরুপ। না কোন ভুল নেই। সে সব কিছু স্পষ্ট দেখেছে। এটা স্বপ্ন হতেই পারেনা। বিছানা থেকে উঠে অস্থির ভাবে পায়চারি করতে থাকে সে। তাঁর শুধু মনে হয়, কোথাও একটা কিছু ঘটেছে।
সকালবেলা খবরের কাগজ দেখে খুব একটা অবাক হয় না সে। মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে বধু হত্যার খবর বেড়িয়েছে কাগজে। অভিরুপ নিশ্চিত ছিল এরকম একটা খবর বেরোবেই। না বেরলেই হয়তো সে কিছুটা আশ্চর্য হতো। যে যাই বলুক, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ,তাঁর মাথা খারাপ নয়। দু রাত ধরে সে যা দেখছে, সেগুলো নিছক স্বপ্ন নয়। কোন এক অজানা কারনে খুন হওয়ার সময় সে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি কেউ টের পাচ্ছে না।
শুধু রাতেই নয় এখন দিনের বেলাতেও এক নতুন সমস্যা শুরু হয়েছে। সে অদ্ভুত সব শব্দ শুনতে পায়। বহুদুর থেকে আসা মানুষের কথা অদ্ভুত ভাবেই তাঁর কানে এসে পৌছয়। সেই কথাগুলিতে আততায়ীর হুঙ্কার অথবা অত্যাচারিতের কাকুতি মিনতি শোনা যায়। বাকি কোন কাজে এখন মন টেঁকে না। এক জায়গায় বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকে কানে আসা কথাগুলি। প্রত্যেকবার একটা খুনের আভাস পাওয়ার সাথে সাথেই মাথার পেছনে বাঁ দিকটা যন্ত্রণায় কেপে ওঠে।
বাড়ির লোকেরা তাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। মায়ের মুখে সে শুনেছে আগের দিন রাতে নাকি সে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিলো। মা বাবা দুজনেই তাঁর ঘরে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করে। এসব তাঁর কিছু মনে নেই। মনে করার কিছু অবকাশও থাকে না। সারাক্ষন কানের কাছে ফিসফিস শুনতে শুনতে তাঁর চিন্তা ভাবনার শক্তি লোপ পেয়েছে। একদিন শীতের রাতে বাড়ির জানালা দরজা বন্ধ ছিল বলে আওয়াজ গুলো আবছা হয়ে আসে। এতে অস্বস্তি বাড়ে তাঁর। একটি মেয়ের ওপর হামলা হয়েছিলো। স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিলো সে। কোনোমতে পালিয়ে দরজা বন্ধ করে হামলাকারীকে কিছুক্ষণের জন্য রোধ করেছিলো। কিন্তু তারপর কি হল? মেয়েটি নিজেকে বাঁচাতে পারলো? আবছা শব্দে কিছুই বোঝার উপায় নেই। জানলা খুলেও সে বিশেষ সুবিধে করতে পারলো না। শেষপর্যন্ত ছাদে গিয়ে কিছুটা স্পষ্ট হলেও আগের মতো শুনতে পাচ্ছিলো না সে। তাঁর মনে হল আরেকটু উঁচুতে উঠলে হয়তো ভালো ভাবে শোনা যেতে পারে। তাই সে ছদের রেলিঙে উঠে দাঁড়ালো। সে জানতো ব্যাপারটা বিপজ্জনক, কিন্তু একটা অদ্ভুত ঝোঁক যেন তাকে চেপে বসেছিল।
বৃদ্ধের বাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই এসব শুরু হয়েছে। সব সমস্যার সুত্রপাত সেই ডাইরিটা। বৃদ্ধের স্ত্রী যা অনুভব করতেন, তাঁর সাথেও ঠিক একই ঘটনা হচ্ছে। হঠাৎ একটা চিন্তা মাথায় আসতেই বিছানায় সোজা হয়ে বসে সে। বৃদ্ধের স্ত্রী তো এই রোগের কারনেই অল্প বয়সে মারা গেছিলেন। তাহলে সে ও কি খুব শীঘ্রই মারা যাবে? শিউরে ওঠে অভিরুপ। বৃদ্ধা ঠিক কি কারনে মারা গিয়েছিলেন জানে না অভিরুপ। ডাইরিতে সেটা লেখা ছিল না। সেটা জানতে গেলে একমাত্র উপায় বৃদ্ধের সাথে দেখা করা।
৪
“নমস্কার। ভেতরে আসতে পারি”?
দরজা খুলে বৃদ্ধ দেখেন, অচেনা একটা ছেলে দাড়িয়ে আছে। “তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।”
অভিরূপ বলে, “আমি আপনার স্ত্রীর ব্যাপারে কিছু কথা বলতে এসেছি। ভীষণ দরকার। দয়া করে আমাকে একটু সময় দিন।”
বৃদ্ধ একটু অবাক হয়ে বলে, “আমার স্ত্রী পলির ব্যাপারে! তুমি কি তার কোন আত্মীয়?”
বৃদ্ধ অভিরূপকে ভেতরে ডাকে। এমনিতেও তার সাথে খুব একটা কেউ দেখা করতে আসে না। এই ছেলেটি তার সাথে ঠিক কি দরকারী কথা বলতে এসেছে সেটা না জানলেও অনেকদিন পর তার সাথে যে কেউ দেখা করতে এসেছে এতেই তিনি খুশি।
অভিরূপ কে বসিয়ে বৃদ্ধ জানতে চান যে সে কি বলতে এসেছে। অভিরূপ বলে,”বহু বছর আগে আপনার স্ত্রী যা অনুভব করতেন আমিও ঠিক সেই সব জিনিস অনুভব করছি।”
বৃদ্ধ ভুরু কুঁচকে বলে,”আমি ঠিক বুঝলাম না। তুমি একটু বুঝিয়ে বল তো কি বলতে চাইছো।”
“দেখুন ভবতোষ বাবু, আমি স্বপ্নে দেখতে পাচ্ছি কেউ কাউকে খুন করছে। সব সময় যেন কানের কাছে কিছু ফিসফিসানি শুনতে পাচ্ছি। দূরে কোথাও কোন এক মারাত্মক অপরাধ হচ্ছে সেটা আমি যেন এখান থেকেই টের পাচ্ছি। ঠিক যেমন আপনার স্ত্রী টের পেতেন।”
“তুমি কি করে জানলে আমার স্ত্রী এসব অনুভব করতেন”?
অভিরূপ অকপটে স্বীকার করে,”দিন সাতেক আগে রাতের বেলায় আমি আপনার বাড়িতে চুরি করতে এসেছিলাম। আলমারির লক খোলার পর সেখানে কোন টাকা পয়সা পাইনি। তার পরিবর্তে পেয়েছিলাম আপনার ডাইরিটা। এক অদ্ভুত টানে যন্ত্রচালিতের মত পড়ে ফেলেছিলাম পুরো ডাইরিটা। ঠিক তার পর থেকেই আমার এসব অনুভূতি হচ্ছে।”
বৃদ্ধ ভুরু কুঁচকে অভিরূপ কে খুব ভালো করে দেখলেন। তার বাড়িতে চুরি হয়েছিল এবং চোর এখন তার সামনে। আর সেই চোর নিজের মুখেই স্বীকার করছে যে সে তার বাড়িতে চুরি করতে এসেছিল। পুলিশকে এখনি ফোন করাটা ঠিক হবে কিনা সেটাই হয়তো ভাবতে লাগলেন বৃদ্ধ।
হঠাৎ তিনি অভিরূপ কে অবাক করে দিয়ে বলেন, “কত টাকা চাই তোমার”? অভিরূপ নিজের সমস্যার মধ্যে এতটাই বিলীন হয়েছিল যে তার স্বীকারোক্তির পর বৃদ্ধ কি ভাবতে পারে সে বিষয়ে তার কোন চিন্তা মাথায় আসে নি। বৃদ্ধ হয়তো ভাবছে চুরি করতে এসে টাকা-পয়সা না পেয়ে এখন একটা অদ্ভুত গল্প ফেঁদে ব্ল্যাকমেল করে বৃদ্ধের কাছ থেকে টাকা হরফ করার চেষ্টা করছে সে।
অভিরুপ জবাব দেয়, “আমি টাকা চাই না। আমি বাঁচতে চাই। আমার মনে হচ্ছে আমি কিছুদিন পরেই মারা যাবো।”
বৃদ্ধ এবার হাসতে শুরু করে। “তুমি যদি এই বুড়ো মানুষটার সাথে মজা করে আনন্দ পেয়ে থাকো, তবে তাতে আমি খুশি। কিন্তু তুমি আমার বাড়িতে ঢুকে আলমারি খোলার চেষ্টা করে ভালো করনি। তুমি নেহাত একটা বাচ্চা ছেলে, নাহলে তোমাকে আমি পুলিশে দিতাম।”
“আপনি বোঝার চেষ্টা করুন ভবতোষ বাবু, আমি আপনার সাথে ফাজলামি করছি না। একটা মুহূর্ত আমি শান্তি পাচ্ছি না। আমার হাত কাঁপছে , মাথার পেছনে বাঁ দিকে প্রবল যন্ত্রণা হচ্ছে। প্রতিটা মুহূর্ত ছটফট করছি আমি।”
এবার বৃদ্ধকে খানিকটা গম্ভীর দেখালো। “পলির যে হাত কাঁপতো মাথার পেছন দিকে ব্যাথা হতো, একথা তো ডাইরিতে লেখা ছিল না। এটা তুমি জানলে কি করে?”
“জানলাম কারন আমি এটা অনুভব করছি। আপনি দয়া করে আমার কথা বিশ্বাস করুন।” অভিরুপের গলায় থেকে কাকুতি মিনতির সুর।
বৃদ্ধ বলে, “ দেখ তুমি যদি সত্যি কথাও বল, তাহলে আমি তোমাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি বুঝতে পারছিনা। পলির যে মানসিক রোগটা হয়েছিলো, সেটা তোমারও হয়েছে। আজ থেকে ছাব্বিশ সাতাশ বছর আগে এই রোগের কোন চিকিৎসা ছিল না।কিন্তু এখন তো বিজ্ঞান অনেক উন্নতি করেছে। আমাদের কলকাতাতেই অনেক মনোবিজ্ঞানী আছেন যারা হয়তো তোমাকে সাহায্য করতে পারে। তাদের একজনকেই………”
তাঁর কথার মাঝখানেই দৃঢ় ভাবে অভিরুপ বলে ওঠে, “ আপনি ভুল করছেন ভবতোষ বাবু। এটা কোন মানসিক রোগ নয়। আমি যা অনুভব করছি বাস্তবে কোথাও টা ঘটছে।”
“পলিও তাই বলতো।”
“আর আপনি বিশ্বাস করতেন না।”
“এটা কি একটা বিশ্বাসযোগ্য কথা!”
“বেশ, বিশ্বাস অবিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে আপনার বাক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু দয়া করে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”
“কি জানতে চাও?”
“উনি কিভাবে মারা গিয়েছিলেন? আপনার ডাইরিতে ওনার মৃত্যুর কথা লেখা নেই।”
“এই রোগে ভুগতে ভুগতেই তিনি মারা গিয়েছিলেন।”
“দয়া করে আমাকে ডিটেলস বলুন। মৃত্যুর আগে ওনার কি ধরনের সিম্পটমস দেখা গিয়েছিলো।”
বৃদ্ধ কোন কথা বলেনা। অভিরুপ বুঝতে পারছে তাকে সে বিশ্বাস করছে না। তাঁর এই সব প্রশ্ন একটা উটকো ঝামেলা মনে হচ্ছে। শুধুমাত্র ভদ্রতার খাতিরে উনি তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছেন না। অভিরুপ আবার জিজ্ঞেস করে, “ দয়া করে আমাকে বলুন ওনার মৃত্যু কিভাবে হয়েছিলো। আমি অনুরোধ করছি আপনাকে। “ এবারও বৃদ্ধ কোনরকম উত্তর না দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।
এই সময় অভিরুপ হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, “ বলছিস না কেন, বল।” কথাটা বলার সাথে সাথেই বৃদ্ধ চেয়ার থেকে পড়ে গিয়ে বিস্ফারিত চোখে অভিরুপের দিকে তাকিয়ে থাকে। অভিরুপ নিজেও ভীষণ অবাক হয়। কথাটা বলার কোন অভিপ্রায় তাঁর ছিল না। কেন সে কথাটা বলল? কেনই বাঁ চিৎকার করলো? তাঁর মনে পড়লো চিৎকার করার সময় তাঁর গলার আওয়াজটাও যেন একটু অন্যরকম শোনাচ্ছিলো। সে নিচে তাকিয়ে দেখে বৃদ্ধ মাটিতে পড়ে তাঁর দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে তাড়াতাড়ি বলে, “আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি ঠিক ওভাবে চিৎকার করতে চাই নি। বুঝতে পারছিনা আমি কেন ওরকম বলে ফেললাম।”
সে বৃদ্ধকে মেঝে থেকে তুলে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। সে দেখে বৃদ্ধ এখনো তাঁর দিকে অদ্ভুত ভাবে চেয়ে আছে। অভিরুপ বলে, “ আমাকে ক্ষমা করবেন। দেখুন ভবতোষ বাবু , আমি কোনদিন কোনরকম কাকতালীয় ব্যাপার বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এতদিন আমার সাথে যা হচ্ছে , আমার সব বিদ্যেবুদ্ধি যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, আপনি এই কয় বছরে কি একবারও আপনার স্ত্রীর উপস্থিতি অনুভব করেছেন? কোন অশরীরীর অস্তিত্ব টের পেয়েছেন?”
বৃদ্ধ চোখ তুলে তাকালেন। বড্ড অসহায় দেখাচ্ছে তাকে। অভিরুপের ভীষণ মায়া হয় তাকে দেখে। বৃদ্ধ বলেন, “এতদিন টের পায়নি ।কিন্তু আজ…” কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি আবার বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকালেন অভিরুপের দিকে।
অভিরুপ বলে, “ আমার খুব খারাপ লাগছে আপনাকে এভাবে বিরক্ত করতে। কিন্তু দয়া করে বলুন উনি কিভাবে মারা গিয়েছিলেন।”
বৃদ্ধ মাথা নিচু করে দুহাতে মুখ চেপে ধরলেন। “খুন করেছিলাম, আমি ওকে খুন করেছিলাম।”
৫
“বারান্দায় একটা চেয়ার নিয়ে বসেছিলাম আমি। আজকাল বেশিরভাগ সময়টা এখানেই বসে থাকি। পলির মুখের দিকে আজকাল তাকানো যায় না। সবসময় সে অস্থির হয়ে থাকে। আমাকে দেখলেই বোঝানোর চেষ্টা করে যে আমি তাঁর কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে কত বড় ভুল কাজ করছি। প্রায় সময় সে আমার কলার চেপে ধরে বলতো, “ শুনতে পাচ্ছ না? তুমি শুনতে পাচ্ছ না? একটু ভালো করে শোনার চেষ্টা করো।”
দুপুর গড়িয়ে সন্ধে হলেই সে হাত পা ছুড়তে শুরু করতো। বাধ্য হয়েই তাঁর হাত খাটের সাথে বেঁধে রাখতে হতো। সেই অবস্থায় আমার দিকে অসহায় ভাবে তাকিয়ে বলতো, “আমাকে বেঁধে রেখেছো কেন? আমাকে তুমি বেঁধে রেখেছ কেন?” আমার কান্না পেয়ে যেতো।
রাতের বেলা আমি ঘুমোতে পারতাম না। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে চিৎকার করতো। ঘুমের অভাবে সকালে মাথা বিগড়ে যেতো। তারপর পলির দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড রাগ হতো আমার। আমি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারতাম না। গিয়ে তাকে চড় থাপ্পর মারতে শুরু করতাম। রাগ ঠাণ্ডা হলে ভীষণ পাপবোধ হতো। তখন তাকে জড়িয়ে ধরে কাদতাম। এভাবে একদিন জড়িয়ে ধরতে গেলে সে আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। আর বলে ওঠে, “একদম ছুঁবে না আমাকে।”
ভীষণ রাগ হল আমার। আমি দিনরাত তোর পাগলামি সহ্য করবো আর তুই আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলবি! তুই আমার স্ত্রী! তোর কাছ থেকে আমি কোন সুখটা পেয়েছি? রাগে অন্ধ হয়ে গিয়ে তাঁর টুঁটি চেপে ধরি আমি। সে আমার কাছে অনুরোধ করতে থাকে তাকে মুক্ত করার জন্য ।কিন্তু তখন আমার রোখ চেপে গেছে। নিজের গায়ের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে তাকে শেষ করে ফেলি আমি।”
এই পর্যন্ত বলে বৃদ্ধ থামলেন। অভিরুপ তাঁর দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। কি বলবে ভেবে পায়না সে। ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে সে। বৃদ্ধ তাঁর দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। যাওয়ার আগে শুধু অভিরুপ বলে যায়, “উনি পাগল ছিলেন না ভবতোষ বাবু। একটু বিশ্বাস করে দেখতে পারতেন।” দরজা দিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে সে দেখে, বৃদ্ধ দু হাতে মুখ চেপে ডুকরে কাঁদছে।
পরেরদিন অভিরুপ সিদ্ধান্ত নেয় আর ঘরে বসে থাকবে না। দীর্ঘ সাতদিন ধরে সে একটা বদ্ধ পাগলের মতো জীবন যাপন করেছে। এবার তাকে সাধারন জীবনে ফিরে আসতেই হবে। নিজের পাড়ার মোড়ে এক চায়ের দোকানে সে বসেছিল ঠিক সেসময় সায়ন্তনের সাথে তাঁর দেখা হয়। সায়ন্তন বলে, “ওই বুড়োর খবর শুনেছিস?”
আভিরুপ জানতে চায়, “কোন বুড়ো?”
“আরে ওই ভবতোষ মল্লিক।” সে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দেয়, যে বাড়িতে তাঁরা চুরি করতে গিয়েছিলো।
আভিরুপ জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে তাঁর?”
সায়ন্তন বলে, “আজকের খবরের কাগজ পড়িসনি?” এই বলে সে চায়ের দোকানে পড়ে থাকা খবরের কাগজটা তাঁকে দেখিয়ে বলে, “বুড়ো পুলিশের কাছে নিজেকে সারেন্ডার করেছে। সাতাশ বছর আগে সে নাকি নিজের বউ কে খুন করেছিলো।”
বুড়োর যে কাহিনি অভিরুপ শুনেছিলো, এখন সেটা সবাই জানবে। নিজেকে অনেকটা হালকা মনে হয় তাঁর। হঠাৎ সে খেয়াল করে তাঁর কানের কাছে সোঁ সোঁ শব্দটা আর নেই।
(সমাপ্ত)

Leave a Reply