• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায় – লিরিক্স – গাজী মাজহারুল আনোয়ার

লাইব্রেরি » বাংলা লিরিক্স » সিনেমার গান » অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায় – লিরিক্স – গাজী মাজহারুল আনোয়ার

অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়
মিছে তারে শিকল দিলাম রাঙা দুটি পায়।।

আর তো আমায় ডাকবে না সে সকাল-দুপুর-সাঁঝে
বলবে না আর মনের কথা মধুর মধুর লাজে
গাইবে না সে গান আমারই দূর আকাশের গায় ॥

কত সুখের স্বপন ছিল দুটি নয়ন ভরে
চিনেছিলাম দুজনারে কত আপন করে
মিলনমালা আজ খুলে গো যায় সে চলে যায় ॥*

.

কথা : গাজী মাজহারুল আনোয়ার,
সুর : বশীর আহমদ,
অভিনয় : রাজ্জাক,
চিত্রপরিচালক : কাজী জহির
কণ্ঠ : বশীর আহমদ,
ময়নামতি (১৬ মে ১৯৬৯)

.

* ‘অনেক সাধের ময়না আমার’ গানটি কার লেখা
গবেষণা – আসলাম আহসান

‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়/ মিছে তারে শিকল দিলাম রাঙা দুটি পায়।’ বশীর আহমদের গাওয়া শ্রোতানন্দিত এ গানের গীতিকার কে—এ নিয়ে একটি ধোয়াশা রয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখে সৈয়দ শামসুল হক মারা যাওয়ার পর সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সৈয়দ শামসুল হকের স্মরণে নির্মিত অনুষ্ঠানে গানটি তাঁর নামে প্রচারিত হয়। কারও কারও কাছে মনে হতে পারে, সৈয়দ হকের গান সৈয়দ হকের নামেই প্রচারিত হবে, এখানে বিতর্কের অবকাশ কোথায়? সিনেমার গান সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা রাখেন যাঁরা, প্রায় সবাই অবগত যে, ১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কাজী জহির পরিচালিত ময়নামতি ছবির কাহিনি, সংলাপ ও গীত রচয়িতা সৈয়দ শামসুল হক। এ ছবির ছয়টি গান রেকর্ডে প্রকাশিত :

শিল্পী – গানের কথা – গীতিকার

১. বশীর আহমদ – হরিণ হরিণ নয়ন কেন – সৈয়দ শামসুল হক

২. বশীর আহমদ – ডেকো না আমারে তুমি – সৈয়দ শামসুল হক

৩. সাবিনা ইয়াসমীন – ফুলের মালা পরিয়ে দিলে – সৈয়দ শামসুল হক

৪. সাবিনা ইয়াসমীন – ওগো বলো ভালোবাসা – সৈয়দ শামসুল হক

৫. আনোয়ারউদ্দীন খান – টাকা তুমি সময়মতো – সৈয়দ শামসুল হক

৬. বশীর আহমদ – অনেক সাধের ময়না আমার – সৈয়দ শামসুল হক? / গাজী মাজহারুল আনোয়ার?

গানটির গীতিকার সম্পর্কে বিভিন্নজন নানা রকম মতামত দিচ্ছেন নিছক অনুমানের ওপর নির্ভর করে। বস্তুত কোনো ছবির তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করার ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান সোর্স হচ্ছে স্বয়ং ওই ছবিটি। আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের বহু স্মরণীয় সিনেমা পর্যায়ক্রমে ভিসিডিতে প্রকাশিত হলেও ময়নামতি এখনো ভিসিডি আকারে প্রকাশিত হয়নি। সে কারণে, মূল ছবি দেখে ওই সমস্যার সমাধান এক রকম অসম্ভব। ময়নামতি ছবিটি এখন দুষ্প্রাপ্য।

কোনো ছবির গীতিকার একজন হলে কোনো রকম সংশয় থাকে না। কিন্তু একাধিক গীতিকার থাকলেই সমস্যা দেখা দেয় : কোন গান কার লেখা? তখন দেখতে হয় রেকর্ড। রেকর্ড থেকেও সব সময় সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। ময়নামতি ছবির গীতিকার নিয়ে দৃশ্যত কোনো সংশয় ছিল না। ২০১২ সালে পুরোনো একটি রেকর্ডের দোকানে ময়নামতি ছবির গান-সংবলিত একটি রেকর্ডে ওই গানের গীতিকার হিসেবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম দেখে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ি। এখানে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম এল কী করে! এইচএমভি থেকে প্রকাশিত 45 আরপিএম রেকর্ড (7KDR 5063)-এ এই গানটির গীতিকারের নাম লেখা হয়েছে ইংরেজি অক্ষরে : Mazharul Haque.

লক্ষণীয়, নামটি বিভ্রান্তিকর— Mazharul Anwar-ও নয় Syed Shamsul Haque-ও নয়; দুজনের নামের দুটি অংশ নিয়ে Mazharul Haque!

এইচএমভি প্রকাশিত রেকর্ডে ‘অনেক সাধের ময়না’র গীতিকার Mazharul Haque

এইচএমভি প্রকাশিত রেকর্ডে ‘অনেক সাধের ময়না’র গীতিকার Mazharul Haque

রেকর্ডে মুদ্রিত তথ্যে অবশ্য বিভিন্ন কারণে ভুলও থাকে। যেমন রেকর্ডের তথ্য অনুযায়ী আয়না ও অবশিষ্ট (১৯৬৭) ছবির আয়না অংশের জনপ্রিয় গান ‘যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে’-এর গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, যা নিঃসন্দেহে ভুল। গানটি সৈয়দ শামসুল হকের রচনা। ময়নামতি ছবির ওই গানের ক্ষেত্রে বাস্তব সত্যটা কী? রেকর্ডে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম দেখতে পেয়ে বশীর আহমদকে ফোন করে জানতে চাই : ময়নামতি ছবিতে সৈয়দ শামসুল হক ব্যতীত অন্য কোনো গীতিকার কি ছিলেন? কিছুটা অনিশ্চয়তার সঙ্গে তিনি বলেন, ‘বোধ হয় ছিল, ছিল বোধ হয়।’

ময়নামতি ছবির গানের 33 আরপিএম রেকর্ড ( SJ 221137 ) বেরিয়েছিল Bangladesh Gramophone Co. Ltd.-এর ব্যানারে ‘সুর ঝংকার’ থেকেও। সেখানে আলোচিত গানটির গীতিকারের নাম লেখা বাংলায় : সৈয়দ সামশুল হক্। HMV-এর রেকর্ডে খানিকটা ভুলভাবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম লেখা হয়েছে এবং ‘গাজী’ শব্দটি সেখানে লেখা নেই।

‘Bangladesh Gramophone Co. Ltd’ প্রকাশিত রেকর্ডে ‘অনেক সাধের ময়না’র গীতিকার সৈয়দ সামশুল হক্‌

‘Bangladesh Gramophone Co. Ltd’ প্রকাশিত রেকর্ডে ‘অনেক সাধের ময়না’র গীতিকার সৈয়দ সামশুল হক্‌

দেখা যাচ্ছে, ‘অনেক সাধের ময়না আমার’ গানটির গীতিকার নিয়ে সবার অগোচরে একটি রহস্য জট পাকিয়ে আছে ছবিটি মুক্তির পর থেকেই। আরও অনেক আগেই বিষয়টি আলোচনায় আসা উচিত ছিল এবং গানটির রচয়িতা কে, তা-ও পরিষ্কার হয়ে যাওয়া উচিত ছিল বর্ণিত দুজন গীতিকারের জীবদ্দশাতেই। সৈয়দ শামসুল হক ও গাজী মাজহারুল আনোয়ার—দুজনই গানটি নিরঙ্কুশভাবে নিজের বলে দাবি করেছেন। যেহেতু গানটির দাবিদার এখন দুজন এবং কারও কাছেই কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই, গবেষণার রীতি অনুযায়ী দুজনের কারও মৌখিক দাবিকেই এ অবস্থায় প্রমাণ হিসেবে আমরা গ্রহণ করতে পারি না। খুঁজতে হবে বিকল্প পথ।

সাধারণ যুক্তিতে ওই গানের গীতিকার হিসেবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নামটি মেনে নেওয়া যায় না। ময়নামতি ছায়াছবির পাঁচটি গান যদি সৈয়দ শামসুল হক লিখে থাকেন, তাহলে শুধু একটি গান লেখার জন্য গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে দায়িত্ব দেবেন কেন কাজী জহির কিংবা বশীর আহমেদ, বিশেষত যে গানটি ছবির শিরোনাম ও কাহিনির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ১৯৬৯-এ ময়নামতিযখন মুক্তি পায়, চলচ্চিত্রের অঙ্গনে গাজী মাজহারুল আনোয়ার তখন মোটামুটি নবীন গীতিকারই। চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম গান লেখেন আয়না ও অবশিষ্ট-তে, যা মুক্তি পায় ১৯৬৭ সালে অর্থাৎ ময়নামতি মুক্তির মাত্র দুই বছর আগে। বেতারে অবশ্য তিনি ১৯৬৪ সাল থেকেই গান লিখতে শুরু করেন। আর ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সুতরাং ছবির মধ্য দিয়েই সৈয়দ শামসুল হক গীতিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত প্রায় নিয়মিত গান লিখেছেন সৈয়দ হক।

এই যুক্তিও অবশ্য ধোপে টেকে না। কারণ, যে আয়না ও অবশিষ্ট দিয়ে চলচ্চিত্রে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের অভিষেক, সেই প্রথম ছবিতেই তো তিনি মুখ্য গীতিকার। একটি লালনগীতির (আছে ভাবের তালা) কথা আলোচনার বাইরে রাখলে এ ছবির চারটি গানের তিনটিই গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা। কেবল একটি গান লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক। এখন, কী উত্তর আসবে, যদি প্রশ্ন করা হয়, যে ছবির চারটি গান গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের, সেখানে শুধু একটি গান কেন লিখতে যাবেন সৈয়দ শামসুল হক? এমন দৃষ্টান্ত আরও আছে। রাজধানীর বুকে (১৯৬০) ছবিতে ছয়টি গান লিখেছেন প্রতিষ্ঠিত কবি গীতিকার আজিজুর রহমান। শুধু একটি গান লেখেন সে সময়ের নবীন গীতিকার কে জি মোস্তফা : ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো’। একটি গানেই মাত! প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত শেষ উত্তর (১৯৪২) ছবির সব গানের রচয়িতা প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত গীতিকার শৈলেন রায়। শুধু একটি গান লেখেন প্রণব রায়—’ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে’। এ গান এখনো মানুষের মুখে মুখে। মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক।

২০১৪ সালে ঘটে আরেক ব্যাপার। সে বছর ৭ নভেম্বর জাকির হোসেন রাজুর পরিচালনায় মুক্তি পায় ময়নামতি ছবির ছায়া অবলম্বনে নির্মিত অনেক সাধের ময়না। ছবিটির নামকরণ করা হয় সেই আলোচিত গান—’অনেক সাধের ময়না’ দিয়েই। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, অনেক সাধের ময়না (২০১৪) ছবির টাইটেলে গীতিকার হিসেবে গাজী মাজহারুল আনোয়ার বা সৈয়দ শামসুল হক—কারও নামেরই উল্লেখ নেই! এ বিষয়ে সৈয়দ শামসুল হকের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অনেক সাধের ময়না (২০১৪) ছবিটি মুক্তির পর এ ছবিতে ব্যবহৃত ‘অনেক সাধের ময়না আমার’ গানটি নিয়ে আপত্তি তোলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। ছবির টাইটেলে গীতিকার হিসেবে তাঁর (গাজী মাজহারুল আনোয়ার) নাম উল্লেখ নেই কেন জানতে চাওয়া হলে জাকির হোসেন রাজু এ ব্যাপারে সংশোধনী দিয়ে কয়েকটি পত্রিকায় (মানবকণ্ঠ, দৈনিক ডেসটিনি, দৈনিক বর্তমান) গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন তাঁর অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য। এসব বিষয় আমি জানতে পারি জাকির হোসেন রাজুর সঙ্গে কথা বলে। ২০১৬ সালের দিকে অনেক সাধের ময়না ছবিটি প্রদর্শিত হয় বিজিবি, পিলখানা প্রেক্ষাগৃহে। গবেষণার প্রয়োজনে ছবিটি আমরা দেখতে যাই। লক্ষ করা গেল, পূর্বকৃত অঙ্গীকার অনুযায়ী জাকির হোসেন রাজু ছবির টাইটেলে কিছু তথ্য সংশোধন-সংযোজন করেছেন। গীতিকার হিসেবে গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও সুরকার হিসেবে বশীর আহমদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা পূর্বে এ ছবিতে ছিল না।

স্পষ্ট করা দরকার, অনেক সাধের ময়নাতে মূল ময়নামতি ছবির কেবল একটি গানই ব্যবহার করা হয়েছে—’অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’। গানটির মূল শিল্পী বশীর আহমদ। অনেক সাধের ময়নাতে গানটি গেয়েছেন নবাগত শিল্পী মনির। সংগীত পরিচালনা করেন ইমন সাহা ও শফিক তুহিন। গান রচনা করেন শাহ আলম সরকার ও আবু সায়েম চৌধুরী। এ ছবিতে নতুন গান রচনা, সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন যাঁরা, তাঁদের তথ্য নির্ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ছবির টাইটেলে। কিন্তু যে গানটিকে শিরোনাম করে ছবিটি নির্মিত হয়েছে, এ ছবির বড় আকর্ষণ সেই অবিস্মরণীয় গানটির গীতিকার ও সুরকারের নাম টাইটেলে আলাদাভাবে উল্লেখ থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু টাইটেলে না আছে সৈয়দ শামসুল হকের নাম, না গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম—যার মানে দাঁড়ায় এ গানের গীতিকার হয় শাহ আলম সরকার, কিংবা আবু সায়েম চৌধুরী! বস্তুত এ হলো পরিচালকের দায়িত্বহীনতার পরিচয়। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলায় এ বিষয়ে অভিমত জানার জন্য আমি সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করি তাঁর সহধর্মিণী সাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হকের মাধ্যমে। সৈয়দ শামসুল হক জানান, ওই গানটি তাঁরই লেখা। আমি তখন জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত ‘অনেক সাধের ময়না’ এবং গাজী মাজহারুল আনোয়ারের প্রতিক্রিয়া ও দাবি সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করি। তখন তিনি অনেকটা দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলেন, “তাই না কি? তিনি যদি দাবি করে থাকেন, হয়তো গানটা তাঁরই।’ কিন্তু মৃত্যুর বছরখানেক আগে ২৪ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত কবির বকুলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৈয়দ শামসুল হক বলেন :

কাজী জহিরের ময়নামতি ছবিতে বশীর আহমদের সুর ও কণ্ঠে আমার লেখা একটি গান বেশ আলোচিত হয়। গানটি ছিল ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায় / মিছে তারে শিকল দিলাম রাঙা দুটি পায়’। মনে পড়ে, গানটি কাজী জহিরের গ্রিনরোডের বাসায় বসে লিখেছিলাম।

২০১৫-এর ফেব্রুয়ারিতে যে প্রশ্নের জবাবে তিনি দ্বিধান্বিত ছিলেন, সে বছরেরই ডিসেম্বরে তিনি কিসের ভিত্তিতে এমন স্পষ্ট মতামত দিলেন?

আলোচ্য গানটির শিল্পী বশীর আহমদ (একই সঙ্গে যিনি ময়নামতি ছবির সুরকার ও সংগীত চিত্রপরিচালক) ‘চলচ্চিত্রের গল্প’ নামক একটি সাক্ষাৎকারমূলক অনুষ্ঠানে এই গানের গীতিকার হিসেবে সৈয়দ শামসুল হকের নাম উল্লেখ করেন। ফলে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করে। কোনো গানের গীতিকার নিয়ে সংশয় দেখা দিলে এ গানের সুরকারের মতামত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ছবির গানের ক্ষেত্রে গীতিকার নির্বাচনে সংগীত পরিচালকের মতামতই প্রাধান্য পায়। সে হিসেবে, কোন গান কার লেখা, সেটি সুরকারেরই সবচেয়ে ভালো জানার কথা। কিন্তু ওই টিভি সাক্ষাৎকারে বশীর আহমদ কি সঠিক তথ্য দিতে পেরেছিলেন? সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না। ময়নামতির বুকলেট পাওয়া গেলে একটা সুরাহা হতো। কারণ, সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, সে সময়ে প্রকাশিত সব বুকলেটেই সংশ্লিষ্ট ছবির পূর্ণাঙ্গ তথ্য (চিত্রপরিচালক, প্রযোজক, গীতিকার, সুরকার ইত্যাদি) নির্ভুলভাবে মুদ্রিত থাকত। এ প্রবন্ধ লেখা পর্যন্ত বহু প্রত্যাশিত সেই বুকলেট সংগ্রহ করা যায়নি। এ ছবির চিত্রপরিচালক কাজী জহির (১৯২৭-১৯৯২) বেঁচে থাকলে অনায়াসে এ সমস্যার সমাধান হতে পারত।

বাকি থাকল একটি মাত্র সোর্স— ময়নামতি ছবির মূল প্রিন্ট। অনুসন্ধানে জানতে পারি, এ ছবির মূল 35mm প্রিন্ট ঢাকার বিজয়নগরে অবস্থিত ‘চিত্রা ফিল্মস’-এর অফিসে সংরক্ষিত। বহু কষ্টে যোগাযোগ করা হলো ‘চিত্রা ফিল্মস’-এ। এ অংশে আমাকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন চলচ্চিত্র নির্মাণ, সংরক্ষণ এবং এতৎসংক্রান্ত কাজে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গবেষক মীর শামছুল আলম বাবু। ‘চিত্রা ফিল্মস’-এর অফিসে বসে ১ মার্চ ২০১৬ তারিখে স্বচক্ষে ময়নামতির টাইটেল তথা ক্রেডিট লাইন দেখার সুযোগ হয় আমাদের। ক্রেডিট লাইন দেখতে হচ্ছিল হাতে রিল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, ম্যাগনিফাইং গ্লাসের মাধ্যমে। আমরা তখনো নিশ্চিত নই, গীতিকার হিসেবে টাইটেলে কার নাম বা কজনের নাম লেখা আছে। পুরো ক্রেডিট লাইন দেখা হলো।

কণ্ঠশিল্পী

বশীর আহমদ
সাবিনা ইয়াসমীন
মঞ্জুশ্রী রায়
আনোয়ার উদ্দিন খান

গীতিকার

সৈয়দ শামসুল হক
গাজী মাজহারুল আনোয়ার

ময়নামতি ছবির টাইটেলের অংশবিশেষ যেখানে গীতিকার হিসেবে সৈয়দ শামসুল হকের পাশাপাশি গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম দেখা যাচ্ছে। সৌজন্যে : মীর শামছুল আলম

ময়নামতি ছবির টাইটেলের অংশবিশেষ যেখানে গীতিকার হিসেবে সৈয়দ শামসুল হকের পাশাপাশি গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম দেখা যাচ্ছে। সৌজন্যে : মীর শামছুল আলম

উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে স্পষ্ট। যুক্তিসংগতভাবে সিদ্ধান্তে আসা যায় এভাবে-

• ময়নামতি ছবিতে গীতিকারের সংখ্যা দুজন : ১. সৈয়দ শামসুল হক ও ২. গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

• এ ছবির প্রাপ্ত ছয়টি গানের মধ্যে পাঁচটি গানের গীতিকার সৈয়দ শামসুল হক। এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। বিতর্ক উঠেছে ‘অনেক সাধের ময়না আমার’ গানটি নিয়ে। শুধু এ গানটির গীতিকার হিসেবেই দুটি ভিন্ন রেকর্ডে ভিন্ন ভিন্ন গীতিকারের নাম মুদ্রিত।

• যেহেতু এ ছবির টাইটেল ও রেকর্ডে গীতিকার হিসেবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম উল্লেখ আছে, অতএব এ ছবির অন্তত একটি গান অবশ্যই তাঁর রচনা।

ছয়টি গানের মধ্যে পাঁচটিই যদি সন্দেহাতীতভাবে সৈয়দ শামসুল হকের নামে চিহ্নিত হয়ে যায়, তাহলে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গান কোনটি? আমাদের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ বলছে : অনিবার্যভাবে সেটি ‘অনেক সাধের ময়না’।

যৌক্তিকভাবে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছি। তারপরও সম্পূরক তথ্য যুক্ত করতে চাই। ‘জয় বাংলা’ গানের ৪৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘আমরা সূর্যমুখী’ সংগঠনের পক্ষ থেকে জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে ১২ মার্চ ২০১৬ তারিখে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনা উপলক্ষে প্রকাশিত ব্রোশিউরে গাজী মাজহারুল আনোয়ার রচিত বিশেষভাবে স্মরণীয় গানগুলোর মধ্যে ‘অনেক সাধের ময়না’ গানটিও উল্লেখ করা হয়।

সবশেষে, গানটি নিয়ে ২৪.০২.২০১৭ তারিখে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলি গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সঙ্গে। বশীর আহমদের বক্তব্য, প্রথম আলোতে সৈয়দ হকের ইন্টারভিউ ইত্যাদি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘এটা সত্য যে, ময়নামতি যখন তৈরি হচ্ছিল, সৈয়দ শামসুল হক তখন কাজী জহিরের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। ময়নামতি ছবির অধিকাংশ গান যেহেতু সৈয়দ শামসুল হকের লেখা, সেদিক থেকে ‘অনেক সাধের ময়না’ গানটিও সৈয়দ হকেরই রচনা—এমন মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু রিয়েলিটি হচ্ছে, গানটি আমার লেখা। তবে এর কোনো তাত্ত্বিক প্রমাণ আমার কাছে নেই। এখন কেউ যদি এ গানের গীতিকার হিসেবে অন্য কারও নাম উল্লেখ করে, আমি কী করতে পারি! আমার তো আরও বহু জনপ্রিয় গান আছে। একটি গান অন্য কারও নামে গেলে কী এমন আসে যায়?’

সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়ার আরেকটা সোর্স আছে; বলা উচিত ছিল। সেটি হলো সেন্সর বোর্ড। দুঃখের বিষয় হলো, সেন্সর বোর্ডে ১৯৭৮ সালের আগেকার কোন ছবিরই বিস্তৃত তথ্য এখন আর সংরক্ষিত নেই। অকাট্য প্রমাণ কারও কাছে না থাকলেও প্রাপ্ত তথ্যাবলি পর্যালোচনা করে ‘অনেক সাধের ময়না’ গানটিকে আমরা গাজী মাজহারুল আনোয়ার রচিত গান হিসেবেই চিহ্নিত করতে পারি।

Category: সিনেমার গানTag: গাজী মাজহারুল আনোয়ার
Previous Post:ওগো বলো মনে কি যে দোলা লাগে – লিরিক্স – সৈয়দ শামসুল হক
Next Post:এই নীল নীল নিঃসীম নিরজনে – লিরিক্স – সৈয়দ শামসুল হক

Reader Interactions

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑