২১. দিলীপের অশ্বমেধ যজ্ঞ-বিবরণ

সৌদাস গেলেন আয়ুশেষে স্বর্গস্থলে।
হইলেন সুদাম ভূপতি ভূমণ্ডলে।।
সুদাম করেন রাজ্য অনেক বৎসর।
দিলীপ হইল রাজা রাজ্যের উপর।।
দিলীপের নন্দন হইল রঘুরাজা।
পুত্রের সমান পালে পৃথিবীর প্রজা।।
একে ত দিলীপ রাজা মহাবলবান।
তদ্রূপ হইল পুত্র পিতার সমান।।
পুত্রের বিক্রম দেখি ভাবে মনে মন।
অশ্বমেধ যজ্ঞ করিলেন আরম্ভণ।।
ঘোড়া রাখিবারে নিয়োজিলেন রঘুরে।
যেখানে সেখানে যাবে নিকটে কি দূরে।।
ঘোড়া দিয়া দিলীপ কহিল তার ঠাঁই।
যজ্ঞপূর্ণকালে যেন এই ঘোড়া পাই।।
ঘোড়া রাখিবারে রঘু করিল পয়ান।
সঙ্গেতে চলিল তুল্য যোদ্ধা বলবান।।
মহেন্দ্র বলেন, ব্রহ্মা কোন্ বুদ্ধি করি।
অশ্বমেধ করি রাজা লবে স্বর্গপুরী।।
কিসে নিবারণ হয় বল কৃপা করি।
বিরিঞ্চি বলেন তাঁর ঘোড়া কর চুরি।।
অশ্ব বিনা রাজা যজ্ঞ করিতে না পারে।
চলিলেন ইন্দ্র ঘোড়া চুরি করিবারে।।
দ্বিতীয় প্রহর দিবা অন্ধকার করি।
লইলেন দেবরাজ যজ্ঞ-অশ্ব হরি।।
ঘোড়া হারাইয়া ভাবে দিলীপ-নন্দন।
ইন্দ্র বিনা ঘোড়া মোর লবে কোন্ জন।।
নয় বৎসরের শিশু দশ নাহি পুরে।
রথ চালাইয়া দিল ইন্দ্রের উপরে।।
সহস্র ঘোড়ায় বহে স্বর্গে রথখান।
পলকে প্রবেশে গিয়া ইন্দ্র বিদ্যমান।।
ইন্দ্র কোথা বলি রঘু ঘন ছাড়ে ডাক।
আজি ইন্দ্র তোমা প্রতি ঘটিল বিপাক।।
মার মার বলি রঘু লাগিল ডাকিতে।
বাহির হইল ইন্দ্র চড়ি ঐরাবতে।।
রঘুরে দেখিয়া ইন্দ্র বলে কটুভাষে।
মরিবার নিমিত্তে আইলে স্বর্গবাসে।।
স্নান সন্ধ্যা করিয়া আইস মহামুনি।
করাইব তবে মাংস রন্ধন এখনি।।
বশিষ্ঠের রূপ সে দূরেতে তেয়াগিয়া।
প্রাচীন বিপ্রের বশ ধরিয়া আনিয়া।।
মনুষ্যের মাংস লৈয়া করিল রন্ধন।
বশিষ্ঠকে ডাকে রাজা করিতে ভোজন।।
যজমান-বাক্য মুনি লঙ্ঘিতে না পারে।
উপস্থিত হইলেন রন্ধন-আগারে।।
বসিলেন মুনি তবে করিতে ভোজন।
রাক্ষসী মনুষ্য-মাংস দিল ততক্ষণ।।
থাল কোলে থুইয়া রাক্ষসী গেল ঘরে।
দেখিয়া মুনির ক্রোধ বাড়িল অন্তরে।।
মনুষ্যের মাংস দিয়া কর উপহাস।
তুমি ব্রহ্মরাক্ষস যে হও হে সৌদাস।।
এত যদি শ্রীবশিষ্ঠ মুনি শাপ দিল।
মুনিরে শাপিতে রাজা হাতে জল নিল।।
অকারণে শাপ দিলা আমি নহি দোষী।
এই জলে পোড়াইয়া করি ভস্মরাশি।।
হেনকালে রাক্ষসী রাজার শাপ শুনি।
ঘর হইতে পলাইয়া চলিল আপনি।।
ধ্যান করি জানিল বশিষ্ঠ তপোধন।
রাক্ষসী আসিয়া মাংস মাগিল ভোজন।।
মুনিকে দিবারে শাপ রাজা নিল পানী।
নিষেধ করেন তারে দময়ন্তী রাণী।।
ক্রোধ সম্বরিল রাজা, ভাবে মনে মনে।
এই জল এখন থুইব কোন্ স্থানে।।
স্বর্গে থুই যদি তবে দেবগণ মরে।
নাগগণ মরে যদি ফেলি নাগপুরে।।
পৃথিবীতে ফেলিলে সকল শয্য যায়।
সেই জল ফেলে রাজা আপনার পায়।।
রাজার পুড়িয়া গেল দুখানি চরণ।
রাজার কল্মাষপাদ নাম সে কারণ।।
বশিষ্ঠ বলেন শাপ দিনু নৃপবর।
রাক্ষস হইয়া থাক এগার বৎসর।।
লোটায় ধরিয়া রাজা বশিষ্ঠ-চরণ।
কত দিনে হবে মম শাপ বিমোচন।।
মুনি বলে পাবে যবে গঙ্গা দরশন।
তবে ত তোমার শাপ হইবে মোচন।।
সৌদাস ভূপতি ব্রহ্মরাক্ষস হইয়া।
দেশে দেশে নিত্য ফিরে ব্রাহ্মণ খাইয়া।।
এগার বৎসর পূর্ণ হইল যখন।
তিন দিন আহার না মিলিল তখন।।
উত্তরিল গিয়া রাজা প্রভাসের কূলে।
শ্রমযুক্ত হইয়া বসিল বৃক্ষমূলে।।
ক্ষুধায় আকুল রাজা যে বৃক্ষ নেহালে।
এক ব্রহ্মদৈত্য আছে সেই বৃক্ষডালে।।
ব্রহ্মদৈত্য বলে ওরে তুমি কেন হেথা।
মম স্থান তুমি নিলা আমি যাব কোথা।।
শুনিয়া তাহার কথা সৌদাস হাসিল।
ব্রহ্মদৈত্য দেখি এটা খাইতে আইল।।
ব্রহ্মদৈত্য রাক্ষসে বিবাদ দুই জন।
ছয় মাস মল্লযুদ্ধ করিছে এমন।।
দুই জন যুদ্ধে সম ন্যূন নহে কেহ।
মিত্রতা করিয়া পরস্পর করে স্নেহ।।
সর্ব্ব দুঃখ দুই জন করেন প্রকাশ।
বশিষ্ঠ শাপিল মোরে বলেন সৌদাস।।
ব্রহ্মদৈত্য বলে মিত্র শুন বিবরণ।
বরদত্ত নামে আমি ছিলাম ব্রাহ্মণ।।
বহুকাল বেদ পড়িলাম গুরু-ঘরে।
চাহিলেন গুরু কিছু দক্ষিণা আমারে।।
মাছি হৈয়া সহিবা কি পর্ব্বতের ভার।
গলায় কলসী বান্ধি নদীতে সাঁতার।।
সহিতে ক্ষুরের ধার কেবা বল পারে।
বালক হইয়া এস আমার উপরে।।
রঘু বলে, গর্ব্ব কর রণ নাহি জিনি।
যার যত বল বুদ্ধি জানিব এখনি।।
আমাকে বালক দেখ আপনি কি বীর।
বালকের রণে আজি হও দেখি স্থির।।
তিন বাণ মারে রঘু বাসবের বুকে।
ঐরাবত সহ ইন্দ্র ফিরে ঘোরপাকে।।
ইন্দ্র বলে ভাল বলি বয়সে ছাওয়াল।
এড়িলেক বাণ যেন অগ্নির উথাল।।
দশ বাণ ইন্দ্র তবে পুরিল সন্ধান।
দশ বাণে কাটিল ইন্দ্রের দশ বাণ।।
দুই জনে বাণবৃষ্টি যেন জল ঘনে।
দুই জনে যুদ্ধ করে কেহ নাহি জিনে।।
রঘুরাজ জানে বাণ পাশুপত সন্ধি।
হাতে গলে দেবরাজে করিলেন বন্দী।।
ঐরাবত হইতে পড়িল ভূমিতলে।
লোহার শিকলে বান্ধি রথে নিয়া তোলে।।
ঘোড়া নিয়া আইল বাপের বিদ্যমানে।
সাত দিন ইন্দ্র বান্ধা অযোধ্যা ভুবনে।।
সঙ্গেতে করিয়া ব্রহ্মা যত দেবগণ।
আপনি চলিয়া গেল অযোধ্যা-ভুবনে।।
বিধাতা বলেন রাজা তুমি পুণ্যবান।
তোমার তনয় রঘু তোমারি সমান।।
আর কিবা বর দিব তোমার রঘুরে।
রঘুবংশ বলি যশ ঘুষিবে সংসারে।।
এত যদি বলিলেন ব্রহ্মা নরবরে।
তবে মুক্ত করিলেন দেব পুরন্দরে।।
রঘু বলিলেন, সত্য কর পুরন্দর।
অনাবৃষ্টি নহে যেন অযোধ্যা উপর।।
ইন্দ্র বলিলেন, চিন্তা না করিহ তুমি।
যে কিছু ক্ষেতের কর্ম্ম সে করিব আমি।।
করিলেন এই সত্য দেব পুরন্দর।
ইন্দ্র সহ স্বর্গে গেল সকল অমর।।
রঘুর বিক্রম শুনি শত্রুপক্ষে ত্রাস।
আদিকাণ্ড রচিল পণ্ডিত কৃত্তিবাস।।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

One thought on “২১. দিলীপের অশ্বমেধ যজ্ঞ-বিবরণ

  1. জল ঘোলা হওয়াটাই কি উপন্যাসের একটা বৈশিষ্ট্য নয় ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *