০২. রামনামে রত্নাকরের পাপক্ষয়

মনুষ্য মারিয়া আনি যত ধন আমি।
আমার পাপের ভাগী বট কিনা তুমি।।
পুত্রের বচন শুনি কহিল চ্যবন।
হেন কথা তোমারে কহিল কোন্ জন।।
কোন্ শাস্ত্রে শুনিয়াছ কে কহে তোমারে।
পুত্রকৃত পাপ কেন লাগিবে পিতারে।।
অজ্ঞান বালক তোরে কি কহিব কথা।
কভু পিতা পুত্র হয়, পুত্র হয় পিতা।।
যখন বালক আমি পিতা ছিনু আমি।
এখন বালক আমি পিতা হৈলা তুমি।।
যখন বালক ছিলে না ছিল যৌবন।
বহু দুঃখ করি তোমা করেছি পালন।।
যত করিয়াছি পাপ আপনি সংসারে।
সে সব পাপের ভাগ না লাগে তোমারে।।
এবে পিতা হইয়াছ, পুত্রতুল্য আমি।
কোন রূপে আমারে পুষিবে নিত্য তুমি।।
মনুষ্য মারিতে তোমা বলে কোন্ জন।
তোমার পাপের ভাগী হব কি কারণ।।
শুনিয়া বাপের বাক্য হেঁট মাথা করে।
কান্দিতে কান্দিতে কহে মায়ের গোচর।।
সত্য করি আমারে গো কহিবে জননী।
আমার পাপের ভাগী নহে কি আপনি।।
জননী কহিল ক্রুদ্ধা হইয়া অপার।
এক দিবসের ধার কে শোধে আমার।।
দশ মাস গর্ভে ধরি পুষেছি তোমারে।
তব কৃত পাপ পুত্র না লাগে আমারে।।
শুনিয়া মায়ের বাক্য হেঁট কৈল মাথা।
পত্নীর নিকটে গিয়া কহে সব কথা।।
জিজ্ঞাসি তোমারে প্রিয়ে সত্য করি কও।
আমার পাপের ভাগী হও কি না হও।।
শুনিয়া স্বামীর বাক্য কহিছে রমণী।
নিবেদন করি প্রভু শুন গুণমণি।।
বিধাতা করিল মোরে অর্দ্ধাঙ্গের ভারী।
অন্য পাপ নিতে পারি এই পাপ নারি।।
যখন করিলা তুমি আমারে গ্রহণ।
সর্ব্বদা করিবে মম রক্ষণ পোষণ।।
আর যত পাপ পুণ্য ভাল লাগে মোরে।
পোষণার্থ পাপ-ভাগ না লাগে আমারে।।
মনুষ্য মারিতে কেবা বলিল তোমায়।
এইমাত্র জানি তুমি পালিবে আমায়।।
শুনিয়া ভার্য্যার কথা রত্নাকর ডরে।
কেমনে তরিব আমি এ পাপ-সাগরে।।
পাপেতে ডুবিনু আমি কি হইবে গতি।
কান্দিতে লাগিল দস্যু ভাবিয়া দুষ্কৃতি।।
লোহার মুদগর তবে মাথায় মারিয়া।
পড়িল ভূমিতে এবে অচেতন হৈয়া।।
উঠিয়া মুনির পুত্র ভাবিল অন্তরে।
সেই মহাজন যদি মোরে কৃপা করে।।
ইহা ভাবি উভয়ের সন্নিধানে গিয়া।
কহিল ব্রহ্মার পায় দণ্ডবৎ হৈয়া।।
একে একে জিজ্ঞাসিনু আমি সবাকারে।
মম পাপভাগী কেহ নাহিক সংসারে।।
আপনি করিয়া কৃপা দিলা দিব্যজ্ঞান।
এ সকল পাপে কিসে পাব পরিত্রাণ।।
কহিলেন পিতামহ মুনির কুমারে।
তুমি স্নান করিয়া আইস সরোবরে।।
শুনিয়া চলিল তবে সরোবর-পাড়ে।
তার দৃষ্টিমাত্র জল অন্তরীক্ষে উড়ে।।
শুষ্ক স্থলে মরে মীন মকর কুম্ভীর।
কহিল ব্রহ্মার কাছে না পাইয়া নীর।।
ছিল যে অগাধ জল এই সরোবরে।
মম দৃষ্টিমাত্র জল হইল অন্তরে ।।
শুনিয়া কহেন ব্রহ্মা সঙ্গী তপোধনে।
হইয়াছে পূর্ণ পাপ তরিবে কেমনে।।
কমণ্ডলু-জল ছিল দিলেন মাথায়।
মহামন্ত্র মুনি তারে কহিবারে যায়।।
নিকটে আসিয়া ব্রহ্মা কহে তার কাণে।
একবার রামনাম বলরে বদনে।।
পাপে জড় জিহ্বা রাম বলিতে না পারে।
কহিল আমার মুখে এ কথা না স্ফুরে।।
শুনিয়া ব্রহ্মার বড় চিন্তা হৈল মনে।
উচ্চারিবে রাম নাম এ মুখে কেমনে।।
ম-কার কহিলে অগ্রে রা কহিলে শেষে।
তবে বা পাপীর মুখে রামনাম আসে।।
ব্রহ্মা বলিলেন তারে উপায় চিন্তিয়া।
মনুষ্য মরিলে বাপু ডাক কি বলিয়া।।
শুনিয়া ব্রহ্মার কথা বলে রত্নাকর।
মৃত মনুষ্যের মড়া বলে সব নর।।
মড়া নয়, মরা বলি জপ অবিশ্রাম।
তবে মুখে তখনি সরিবে রামনাম।।
শুষ্ক কাষ্ঠ দেখিলেন বৃক্ষের উপরে।
অঙ্গুলি ঠারিয়া ব্রহ্মা দেখান তাহারে।।
বহুক্ষণে রত্নাকর করি অনুমান।
বলিল অনেক কষ্টে মরা কাষ্ঠখান।।
মরা মরা বলিতে আইল রামনাম।
পাইল সকল পাপে দস্যু পরিত্রাণ।।
তূলারাশি যেমন অগ্নিতে ভস্ম হয়।
একবার রাম নামে সর্ব্বপাপ ক্ষয়।।
নামের মহিমা দেখি ব্রহ্মার তরাস।
আদিকাণ্ড গাইল পণ্ডিত কৃত্তিবাস।।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

One thought on “০২. রামনামে রত্নাকরের পাপক্ষয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *