১. ভালবাসা থাকলে সত্যি সব হয়

প্রিয় – উপন্যাস – ইমদাদুল হক মিলন

ভালবাসা থাকলে সত্যি সব হয়!

এই যে সকালবেলা সেতুদের বাড়ির পেছন দিককার বাগানে আতাগাছের স্নিগ্ধ ছায়ায় বসে শিস দিচ্ছে দোয়েল, ভালবাসা না থাকলে দোয়েল পাখিরা কি এরকম শিস দেয়, না দিতে পারে!

আতাগাছের মাথার ওপরকার আকাশ আজ একটু বেশি নীল, বেশি স্বচ্ছ। রোদ্রছায়া আর তুলোর মতো মেঘে মেঘে আকাশ যেন আজ পুরনো আকাশ নয়। আকাশ যেন আজ এক নতুন আকাশ। আজকের আগে যেন কখনও ছিল না মানুষ কিংবা পৃথিবীর মাথার ওপর।

এও কি ভালবাসার জন্যে নয়!

যে হাওয়া এইমাত্র বইতে শুরু করেছে, শিশুর ত্বকের মতো নরম কোমল এবং আদুরে, ফুলের গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে আছে যে হাওয়া, ভালবাসা ছাড়া এরকম হাওয়া কি কখনও বয়!

বাগানে এত যে ফুল ফুটেছে, গাছের পাতারা হয়েছে গাঢ় সবুজ, ঘনঘাসের বনে মায়ামমতার মতো পড়ে আছে রোদ, কোথাও কোথাও পাতার ছায়া হাওয়ায় হাওয়ায়। দোলে, এই তো ভালবাসা! না কী!

আজ সকালে দোতলার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে ভালবাসাকে এইভাবে আবিষ্কার করল সেতু। আসলে বাগানের দিকে তাকিয়ে সেতুর মনে পড়েছিল শুভর কথা। শুভর কথা মনে পড়লে চারদিকে ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না সে। অনেকদিন ধরেই এমন হচ্ছে।

সেতুর রুমের সঙ্গে চওড়া বারান্দা। বারান্দার পুবদক্ষিণে সুন্দর রেলিং। যে কোনও দিককার রেলিংয়ে দাঁড়ালে বাগানের সবখানি দেখা যায়।

কত রকমের যে গাছপালা বাগানে! ফুল ফল, পাতাবাহার লতাগুল্ম, মূল্যবান অর্কিড, মেহেদি এবং চওড়া পাতার মানকচু। ডুমুরঝোঁপ আছে, বাঁশঝাড় আছে, পাথরকুচি এবং লজ্জাবতি আছে।

দেড়বিঘার ওপর বাড়িটার দশবারো কাঠা জায়গা জুড়ে বাগান। সামনের দিকে পাঁচ সাতকাঠা জুড়ে লন, মাঝখানে পুরনো আমলের দোতলা বিল্ডিং।

গুলশান এলাকার প্রথম দিককার বাড়িগুলো এরকমই। আজকালকারগুলো অন্যরকম। বাগান লন তো দূরের কথা, একইঞ্চি জায়গাও কেউ বনেদিআনার জন্য খরচা করে না। এককাঠা জায়গার দাম পঁচিশ তিরিশ লাখ টাকা। যে কারণে বেশিরভাগ পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন করে তৈরি করা হয়েছে, হচ্ছে। প্রতিটিই ছতলা।

এই এলাকায় ছতলার ওপর বাড়ি করা যায় না।

তবে পুরনো বাড়িগুলোর চেহারা বদলে যাওয়ার ফলে এলাকটাও বদলে গেছে। আগের সেই বনেদিভাবটা যেন নেই।

কিন্তু সেতুদের বাড়িটা যা ছিল তাই আছে। ভেঙেচুরে নতুন করা হয়নি। ছোটভাই একবার চেয়েছিলেন দেড়বিঘা জমি তিনভাগ করে তিনটি ছতলা বিল্ডিং করবেন।

গ্রাউন্ডফ্লোরে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা, সিকিউরিটি রুম ইত্যাদি, বাকি পাঁচতলার একেকতলায় দুটো করে ফ্ল্যাট। তিনভাই বোনের প্রত্যেকের একটা করে বিল্ডিং। একটা বিল্ডিং মানে দশটা ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটের সাইজ প্রায় তিনহাজার স্কোয়ার ফিট। এই এলাকায় পার স্কোয়ার ফিট আড়াই হাজার টাকা। তার মানে একেকটি ফ্ল্যাটের দাম হবে পঁচাত্তোর লাখ টাকা। প্রতিটি ফ্ল্যাটের সঙ্গে থাকবে দুটো করে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা। একেকটির জন্য আড়াই লাখ টাকা। এক্ষেত্রে পাওয়া যাবে আরও পাঁচলাখ। তাহলে ফ্ল্যাটের মোট দাম পড়ছে আশিলাখ। দশটি ফ্ল্যাট আটকোটি। অর্থাৎ এই বাড়িটাকে ব্যবহার করেই সেতুরা তিনভাই বোনের একেকজন হয়ে যেতে পারে আটকোটি টাকার মালিক।

বড়ভাই নিমরাজি ছিলেন, কিন্তু সেতু একেবারেই রাজি হয়নি। সব শুনে বুকের ভেতর হু হু করে ওঠেছিল। যে বাড়িতে জন্মে এতটা বড় হয়েছে সে, ঘুম ভেঙে যে বাড়ির সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়, ঘুরে ফিরে প্রতিদিনকার জীবন কাটে যে বাড়িতে সেই বাড়ি হঠাৎ করে অন্যরকম হয়ে যাবে একদিন, এই চেহারা, এই স্নিগ্ধতা বাড়ির থাকবে না এ কিছুতেই ভাবতে পারেনি সেতু। নিজের শরীর আচমকা একদিন বদলে গেলে, নতুন কিংবা অচেনা হয়ে গেলে যেমন লাগবে এও যেন তেমন এক ব্যাপার।

শুভকে ভালবাসার পর থেকে যে কোনও বিষয়ে ভাবতে শুরু করলে এক পর্যায়ে শুভর কথা সেতুর মনে পড়বেই। সেদিনও পড়েছিল। এই বাড়ির সঙ্গে কোথায় যেন শুভর খুব মিল।

শুভকে কি বদলে ফেলা যায়? শুভর জায়গায় কি দাঁড় করানো যায় নতুন প্রেমিক? ভালবাসা যায় তাকে?

তারপর সেতু একেবারে ছটফট করে উঠেছিল। না, না।

নিচতলার ড্রয়িংরুমে সেদিন সবাই ছিল। সেতুর দুভাই মামুন এবং স্বপন, দুভাবী শিলা এবং রেখা। বাড়ির বহুকালের পুরনো ঝি রানি বিকেলের চা দিয়ে গেছে। চা খেতে খেতেই কথাটা তুলেছিল স্বপন। সেতুর ছটফটানি দেখে থতমত খেয়ে গেল। চায়ের কাপ হাতে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সেতুর দিকে।

স্বামীর অবস্থা দেখে রেখা তার পক্ষ নিল।

রেখার গলা একটু বেশি সরু। তার ওপর মিষ্টতা বলে কিছু নেই গলায়। ফলে নরম স্বরে কথা বললেও শোনায় বেশ রুক্ষ্ম। তখনও শোনাল। তুমি এমন করছ কেন সেতু? তোমার ভাই তো ঠিকই বলেছে! এতবড় বাড়িটা অকারণে পড়ে আছে। এই বাড়ি ব্যবহার করে যদি একেকজন আটকোটি টাকার মালিক হয়…।

রেখার কথা শেষ হওয়ার আগে গম্ভীর গলায় মামুন বললেন, না হওয়া যাবে না। কারণ বিল্ডিং তৈরির খরচা আছে। সেসব খরচা বাদ দেয়ার পর বোঝা যাবে কতটাকা টিকলো। এই ধরনের প্রজেক্ট ব্যাংকলোন নিয়ে করতে হয়। ইন্টারেস্টসহ লোন শোধ করার পর আসল লাভটা বোঝা যাবে।

শিলা বললেন, তোমাদের কি টাকার অভাব আছে? ইচ্ছে করলে ব্যাংকলোন ছাড়াও এরকম তিনটা বিল্ডিং তোমরা করতে পার।

স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসলেন মামুন। পারলেও করব না। অসুবিধা আছে। ইনকামট্যাক্সওয়ালারা খেয়ে ফেলবে।

স্বপন বলল, আর একটা কাজ করা যায়। সেটা সব চাইতে সহজ। আজকাল সেভাবেই অনেকে করছে। বাড়িটা আমরা ডেভলাপারকে দিয়ে দিলে পারি। ফ্ল্যাটের হিসেবটা হবে সিক্সটি ফোরটি। একেক বিল্ডিংয়ের ছটা ফ্ল্যাট ওদের, চারটা আমাদের। চারটা ফ্ল্যাটের সঙ্গে আটটা গ্যারেজ। তিনকোটি বিশলাখ টাকার প্রপার্টি। সঙ্গে আরও লাখ পঞ্চাশেক করে ক্যাশ টাকা। এছাড়া নিজেরা ফ্ল্যাট করে বিক্রি করলেও ভাল বিজনেস হবে।

মামুন মাথা নাড়লেন। তা হবে। এবং বিজনেস হিসেবে এটা এখন খুবই ভাল। এলাকার অনেকেই করছে। আসলে ব্যাপারটা হল এত দামী জায়গা আজকাল এভাবে কেউ ফেলে রাখে না।

অনেকক্ষণ ধরে সবার কথা শুনছিল সেতু। এবার সে বলল। কিন্তু আমরা ফেলে রাখব ভাইয়া। আমাদের অত টাকা পয়সার দরকার নেই। আমাদের যা আছে তাই যথেষ্ট। এতবড় বিজনেস তোমাদের, এই বাড়ি ছাড়াও আরও অনেক প্রপার্টি আছে। দিন দিন টাকা পয়সা, প্রপার্টি আরও বাড়বে। চাইলে ওরকম বিল্ডিং যে কোনও জায়গায় তোমরা করতে পারবে। এই বাড়িটা যেমন আছে তেমনই থাকুক।

তারপর মাথা নিচু করে বলল, মা মারা গেলেন এই বাড়িতে, বাবা গেলেন। দুজনের কত চিহ্ন ছড়ানো বাড়িতে, কত স্মৃতি। মা সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন বাগান নিয়ে, গাছপালা নিয়ে। মা মারা যাওয়ার কিছুদিন পর হার্টএ্যাটাক করল বাবার। সিঙাপুর থেকে বাইপাস করিয়ে আনলে তোমরা। তারপর থেকে সারাক্ষণ নিজের রুমের সঙ্গের বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে থাকতেন। এখনও হঠাৎ হঠাৎ বাবাকে যেন সেভাবে বসে থাকতে দেখি আমি। টাকার জন্য এসব স্মৃতি নষ্ট করে ফেলা কি ঠিক হবে? সবচে’ বড় কথা আমাদের কোনও অভাব নেই।

সেতুর কথা শুনে থমথমে হয়ে গিয়েছিল পরিবেশ। খানিক কেউ কোনও কথা বলেনি।

শেষ পর্যন্ত মামুন বললেন, ঠিক আছে, তোর কথাই থাকবে। তোর কথা শুনে আমার ভাল লেগেছে। এত সুন্দর করে কথাগুলো বললি তুই! তোকে তো সব সময়ই আমি খুব ছোট্ট মনে করি, আজ মনে হল তুই বেশ বড় হয়ে গেছিস।

শিলা বলল, ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে, বড় হবে না!

শিলার কথায় সেতু বেশ লজ্জা পেয়েছিল। আবার মনে পড়েছিল শুভর কথা। বড় তো সে হয়েছেই। বড় না হলে কি শুভকে সে এমন করে ভালবাসে! শুভকে পাওয়ার জন্য এমন করে পাগল হয়!

তারপর আরেকটি কথা মনে হয়েছিল সেতুর। বিয়ে হলে এই বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে তাকে। শুভদের বাড়ি গিয়ে থাকতে হবে। তখন? তখন এত মায়া জড়ানো প্রতিদিনকার বাড়িটির জন্য মন কেমন করবে না তার!

ঠিক এই কথাটাই দুদিন পর শিলা তাকে বলেছিল। এই বাড়ির জন্য এত যে মায়া তোমার, এই বাড়ি তুমি তাহলে ছেড়ে যাবে কী করে?

বুঝেও বেশ ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে শিলার কথার জবাব দিয়েছিল সেতু। ছেড়ে যাব মানে? কোথায় যাব?

শ্বশুরবাড়ি যাবে না?

সেতু হেসেছিল। না ওতো যেতে পারি।

তার মানে কী? তুমি বিয়ে করবে না?

নিশ্চয় করব।

তাহলে?

বিয়ে করলেই যে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আমার ক্ষেত্রে উল্টোটাও হতে পারে।

বর নিয়ে আসবে এই বাড়িতে?

হতে পারে।

তাহলে তোমার ভাইদের বলি তোমার জন্য ঘরজামাই দেখতে।

সেতু ছটফট করে উঠেছিল। এই, না ভাবী! খবরদার! বিয়ে টিয়ের কথা এক্ষুনি বলবে না।

তারপর যা হয় আর কী, সঙ্গে সঙ্গে শুভর কথাও মনে পড়েছিল। শুভর সঙ্গে বিয়েতে ভাইভাবীরা কিছুতেই রাজি হবে না। শুভরা বেশ গরিব। ওরকম গরিব ফ্যামিলিতে সেতুকে কিছুতেই বিয়ে দেবে না ভাইরা। যত ভালই সেতুকে তারা বাসুক, কিন্তু এ কিছুতেই মেনে নেবে না। এ কারণেই শুভর কথা বাড়ির কাউকে বলেনি সেতু। জীবনের সবচে ভাললাগা মানুষটির কথা, সবচে ভালবাসার মানুষটির কথা বাড়ির সবার কাছে চেপে রেখেছে।

বারান্দার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে এখন এসব কথা মনে পড়ল সেতুর। মন খারাপ হয়ে গেল। শুভকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালবাসা সম্ভব নয় তার, অন্য কাউকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।

কিন্তু শুভকে সে কেমন করে পাবে?

ঠিক তখুনি আতাগাছের দোয়েল পাখি শিস বন্ধ করল। খানিক চুপচাপ থেকে ভয়ার্ত ভঙ্গিতে বাঁশঝাড়ের দিকে উড়াল দিল। ডুমুরঝোঁপের আবছা অন্ধকার থেকে ছটফটে ভঙ্গিতে উড়ে এল একজোড়া টুনটুনি। এসে মেহেদিঝোঁপের চারপাশে ওড়াউড়ি করতে লাগল, উত্তেজিত ভঙ্গিতে ডাকাডাকি করতে লাগল।

কী ব্যাপার? পাখি দুটো এমন করছে কেন?

তারপরই টুনটুনিদের উত্তেজনার কারণ বুঝতে পারল সেতু। কচুঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে একজোড়া বেজী। স্বভাব চঞ্চল ভঙ্গিতে বাগানের ইতিউতি চড়তে শুরু করেছে। এই দেখে ছোট্ট টুনটুনিরা ভয় পেয়েছে। কিন্তু বেজীরা নির্বিকার।

সেতু তারপর বেজী দেখতে লাগল। চঞ্চল ভঙ্গিতে একবার মানকচু ঝোঁপটার দিকে যায়, একবার ডুমুরঝোঁপের দিকে। বাঁশঝাড়ের ওদিকটা ঘুরে এল একবার। তারপর বাগানের মাঝামাঝি এসে মেহেদিঝোঁপের ছায়ায় অলস ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ল একটি। আরেকটি খানিক দাঁড়াল শুয়ে পড়াটির সামনে, তারপর একবার এদিক যায় আরেকবার ওদিক, যেদিকেই যায় খানিক গিয়েই আবার ফিরে আসে। শুয়ে পড়াটির মুখের কাছে মুখ নেয়, মুখ তোলে।

আশ্চর্য এক ভালবাসার দৃশ্য।

এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আবার শুভর কথা মনে পড়ে সেতুর। সেই কথাটি মনে পড়ে। ভালবাসা থাকলে সব হয়। কথাটা যদি সত্য হয় শুভকে তাহলে সে নিশ্চয় পাবে। কেমন করে পাবে সেই পথ খুঁজে বের করতে হবে।

পথটা সেতু আজ থেকে খুঁজবে।

মামুনের রুম থেকে ঠিক তখুনি ভেসে এল, শিলা, শিলা। কোথায় গেলে তুমি?

বড়ভাই ডাকছেন ভাবীকে। তার অফিসে যাওয়ার সময় হল।

.

স্ত্রীর সঙ্গে মামুনের সম্পর্কে চিনির পরিমাণটা একটু বেশি।

অর্থাৎ খুবই মিষ্টি সম্পর্ক দুজনার। বাবলু ফাঁইয়ারে পড়ে, মুন্নি পড়ে ক্লাশ এইটে, হলে হবে কী, ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে কথাটা যেন মনেই থাকে না তাদের। দুজন সারাক্ষণই আছে ঠাট্টা মশকরার মধ্যে, হাসি মজার মধ্যে।

এই যেমন এখন।

স্বামীর জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে বেডরুমে ঢুকেছে শিলা। মামুন ছিল ড্রেসিংরুমে। মাত্র টাই বাঁধা শেষ করেছে। শিলার সাড়া পেয়েই ড্রেসিংরুম থেকে গলা বাড়াল। মুখটা কার্টুনের মতো করে বলল, এসেছ?

শিলা গম্ভীর গলায় বলল, হ্যাঁ।

তোমাকে খানিক না দেখলে জানটা আমার বেরিয়ে যায়। এজন্য অমন ত্রাহি ডাক ছাড়ছিলাম।

বলতে বলতে ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে এল মামুন। শিলার একেবারে গা ঘেষে দাঁড়াল।

সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে সরে যেতে চাইল শিলা। হাতে পানির গ্লাস আছে বলে লাফটা সে দিতে পারল না। ছটফটে গলায় বলল, কাছে এস না, কাছে এস না।

প্রিয়তমা স্ত্রীর আচমকা এরকম কাছে এস না, কাছে এস না শুনে মামুন খুবই ভড়কে গেল। থতমত খেয়ে বলল, কেন? কী হয়েছে? আপন স্ত্রীর কাছে আসতে অসুবিধা কী?

অসুবিধা আছে। ভীষণ অসুবিধা।

না বললে বুঝব কী করে?

সকালবেলা ওসব তোমাকে বলতে চাই না।

বললে কী হবে?

তেমন কিছুই হবে না। শুধু মনটা তোমার খারাপ হবে। অফিসে যাওয়ার সময় স্বামীর মন খারাপ করে দেয়া কোনও স্ত্রীর কর্তব্য হতে পারে না।

মামুন বিগলিত ভঙ্গিতে মুখটা হাসি হাসি করল। না না, তাতে কী? আমার মন যে খারাপ হবে তুমি তা কী করে বুঝলে?

আমি জানি, হবে।

হবে না, তুমি বল।

তারপর দূর থেকে হাত বাড়িয়ে শিলার গালটা ছুঁয়ে দিল মামুন। এই দুষ্টু, বল না!

মুখ নিচু করে খুবই লাজুক ভঙ্গিতে শিলা বলল, তুমি যে আমার চে অনেক বেটে, কাছে এসে দাঁড়ালে তা খুব বোঝা যায়। স্বামীর চে স্ত্রী মাত্র একবিঘত লম্বা এ কেমন কথা, বল। আমার বুঝি লজ্জা করে না?

সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা ম্যানেজ করল মামুন। অযথা হে হে করে একটু হাসল। না, তাতে কী? বারোহাত কাকুড়ের তেরোহাত বিচি তো হতেই পারে! স্বামীর চে স্ত্রী লম্বা হলে ক্ষতি কী? আমি সব সময় হাতে একখানা জলচৌকি নিয়ে ঘুরব।

কেন?

চুমু খেতে হলে জলচৌকির ওপর দাঁড়িয়ে নেব।

শিলা খিলখিল করে হেসে উঠল।

মামুনও হাসছিল। হাসতে হাসতে গ্লাসের দিকে হাত বাড়াল। চুমু না, দাও এখন পানিটা খাই।

পানি খেয়ে গ্লাসটা শিলার হাতে ফিরিয়ে দিল মামুন। খুবই পরিতৃপ্ত গলায় বলল, অফিসে যাওয়ার সময় তোমার হাতের পানিটা খেয়ে গেলে মন এবং মাথা দুটোই বেশ ঠাণ্ডা থাকে। বিজনেসটা খুবই মন দিয়ে করতে পারি।

শিলা মুখ ঝামটে বলল, এসব ছাড়।

কেন ছাড়ব?

আমার সঙ্গে চালাকির দরকার নেই।

কোথায় চালাকি করছি?

এটাই তো চালাকি। আমার হাতের পানি নিয়ে যা বললে এটা তোমার পুরনো কায়দা। আমাকে পটাবার জন্য বলছ।

একুশ বছরের পুরনো স্ত্রীকে পটাবার কী আছে। সঙ্গে তো এই মুহূর্তে জলচৌকিও নেই!

শিলা আবার হাসল। ওহ্! তুমি পারও।

সঙ্গে সঙ্গে সিরিয়াস হল মামুন। ঠিক আছে, আর ঠাট্টা নয়। রানিকে পাঠাও, স্বপন রেডি হয়েছে কি না দেখে আসুক।

পাঠাচ্ছি।

খালি গ্লাস হাতে বেরিয়ে গেল শিলা।

.

আজকালকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর ফিচার পাতায় মজার মজার সব লেখা ছাপা হয়। একদম চানাচুরের মতো। পাঠকরা এসব লেখা পড়ে না। খায়।

লেখা খাওয়ার কথাটা বলেছিল স্বপনের বন্ধু হাসান। সে একটি নতুন ধরনের দৈনিক পত্রিকার ফিচার এডিটর। তার পাতাগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়। এইসব পাতার জন্য পত্রিকাটিও খুব জনপ্রিয় হয়েছে। পুরনো এবং জাদরেল বেশ কয়েকটি পত্রিকার বিক্রি কমে গেছে। কারণ তাদের পাঠক ভাগিয়ে নিয়ে গেছে হাসানদের পত্রিকা।

স্বপনের অফিসে আড্ডা দিতে এসে, চা খেতে খেতে হাসান একদিন বলল, আমাদের কাগজটা তুই পড়িস না?

স্বপন মাত্র সিগ্রেট ধরিয়েছে। টান দিয়ে বলল, না।

কেন?

আমি পড়ি ইত্তেফাঁক আর জনকণ্ঠ।

আমাদেরটাও পড়ে দেখ।

কেন, কী আছে তোদের কাগজে?

চানাচুরে ভর্তি।

মানে?

চা শেষ করে স্বপনের প্যাকেট থেকে সিগ্রেট নিয়ে ধরাল হাসান। মানে প্রচুর মজার মজার লেখা থাকে। বিশেষ করে আমি যে পাতাগুলো করি সেগুলো তো মজায় ভর্তি। ওসব পাতার লেখা পাঠকরা খুব খাচ্ছে। একবার হাতে নিলে তুইও খেতে থাকবি।

শুনে স্বপন একেবারে হতভম্ব। সিগ্রেটে টান দিতে ভুলে গেল। লেখা আবার খায় কী করে?

পড়লেই বুঝতে পারবি।

তারপর হাসতে হাসতে স্বপন বলল, কালচারাল মিডিয়াতে খাওয়া শব্দটা খুব চলছে আজকাল। বাজার কাটতি জিনিসগুলোকে জনপ্রিয় না বলে খাওয়া’ বলা হচ্ছে। যেমন ধর সিনেমার অমুক নায়িকা খুব জনপ্রিয়। যে ছবিতে সে আছে সেই ছবি হিট। আমাদের ভাষায় নায়িকাটিকে আমরা কিন্তু জনপ্রিয় বলব না। বলব অমুক নায়িকাকে লোকে আজকাল খুব খাচ্ছে।

শুনে হো হো করে হেসেছিল স্বপন। নায়িকাকে খাচ্ছে? সর্বনাশ!

তারপর থেকে বাড়িতে ইত্তেফাঁক এবং জনকণ্ঠের সঙ্গে হাসানের কাগজটাও সে রাখতে শুরু করেছে। সত্যি, পাতায় পাতায় নেশা ধরানো সব লেখা। পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না।

আজ সকালে তেমন একটি লেখা চোখে পড়ল স্বপনের। বাঁশের কী কী প্রতিভা আছে ওই নিয়ে লিখেছেন ইমদাদুল হক মিলন। সত্যি চানাচুর, খাঁটি চানাচুরের মতো লেখা। পড়তে শুরু করলে কুড়মুড় কুড়মুড় শব্দও হয়।

দিকপাশ ভুলে লেখাটির ওপর হামলে পড়ল স্বপন। নিবিষ্ট মনে খেতে লাগল। বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে সে। হাতের কাছে চায়ের কাপ, চাটা পুরো শেষ হয়নি, সেই চায়ের কথা ভুলে গেল। ঠোঁটে সিগ্রেট জ্বলছে, টান দিতে ভুলে গেল।

প্রতিভার দিক দিয়ে বাঁশের কোনও তুলনা হয় না।

বস্তুটির ভাল নাম বংশ। যার তিনটি সরল অর্থ বাঁশ বাঁশি এবং মেরুদণ্ড।

বাঁশের এক অর্থ মেরুদণ্ড জেনে আমি খুবই পুলকিত। আমার এক চীন ফেরত বন্ধুর মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। নানা রকম চিকিৎসার পরও প্রায়ই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে

সে। চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে। এই অবস্থায় তাকে একটু আনন্দ দানের জন্য আমি একদিন টেলিফোনে বললাম, বন্ধু, তোমার বাঁশটি কেমন আছে?

শুনে প্রথমে সে একটু হকচকিয়ে গেল, তারপর শব্দটির একটি কদর্য অর্থ করল। ভাবল পুরুষমানুষের শরীরের নিচের দিককার বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি আমি। বন্ধুর সঙ্গে বন্ধু এই ধরনের ঠাট্টা করতেই পারে।

বন্ধুটি বিবাহিত। সুতরাং সবিস্তারে সে ওই বিষয়ের দিকে ধাবিত হল। আমার তখন ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। কোনও রকমে বললাম, তুমি যা ভেবেছ তা নয়, বন্ধু। বাঁশ অর্থ মেরুদণ্ড।

শুনে সে খুবই হতাশ হল। তোমরা লেখকরা কত সহজ শব্দের কত বকা অর্থ কর। হাতে কলম আছে বলে যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছ। কর, আমরা নিরীহ মানুষরা পিঠের বাঁশে ব্যথা নিয়ে শুনে যাই।

তবে বাঁশের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক সত্যি খুব গভীর। বাগচী মহাশয়ের বাড়িতে যদি বাঁশঝাড় না থাকত তাহলে বাংলা সাহিত্য বঞ্চিত হত এক অসাধারণ কবিতা থেকে। ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ’। বাংলা গল্প উপন্যাস বঞ্চিত হত বাঁশঝাড়ের বর্ণনা থেকে। জীবনানন্দ দাশ এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় খুবই ফাঁপড়ে পড়তেন। আর বাংলা সাহিত্যের গ্রামীণ ভূতগুলো তো সব বাঁশের ডগায়ই বসে থাকে। বাঁশ এবং তার ঝাড় না থাকলে ভূতগুলো যেত কোথায়? ভূতের গল্পের লেখকরা তাদেরকে কোত্থেকে জোগাড় করতেন?

এ তো গেল সাহিত্যে সংক্ষেপে বাঁশের ভূমিকা। এমনকি অংকশাস্ত্রেও একটি তৈলাক্ত বাঁশের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। একটি বানর দিনে কতবার তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওপরে উঠবে এবং কতবার নামবে এই নিয়ে জটিল একখানা অংক তৈরি করে পাঠ্য বইতে বাঁশের মতো করেই প্রবিষ্ট করিয়ে রেখেছেন আমাদের পণ্ডিতরা।

বাঁশের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তো আরও গভীর। ভাবা যায়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রেম কাহিনীটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বাঁশ। ওই যে বাঁশের দ্বিতীয় অর্থ, বাঁশি। কৃষ্ণের হাতে যদি বাঁশিটি না থাকত তাহলে রাধার সঙ্গে তার প্রেমই হত না। কৃষ্ণের বাঁশি শুনেই তো রাধা তার প্রেমে পাগল হয়েছিলেন! এবং একদা বাংলা গান বলতেই কানু বিনে গীত নাই। শচীনদেব বর্মন ‘সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’ বলে চিরকাল কেঁদে গেলেন। তারাশঙ্করের মতো মহান ঔপন্যাসিকও গান লিখলেন,

‘মধুর মধুর বংশি বাজে
কোথা কোন কদমতলীতে’।

গ্রামের প্রেমিক প্রেমিকারা এখনও রাতের আঁধারে কিংবা দিনের নির্জনতায় মিলিত হয় বাঁশঝাড় তলায়। দুষ্ট লোকেরা অবশ্য মলও ত্যাগ করে ওইসব জায়গায়। প্রেমের সঙ্গে মলেরও একটা সম্পর্ক আছে। গ্রাম্য ভিলেনরা প্রেমিকের সঙ্গে প্রেমিকাকে মিলিত হতে দিতে চায় না বলে দল বেঁধে বাঁশঝাড় তলায় যে মল ত্যাগ করে আসে এরকম ঘটনা আমি নিজ কানে বহুবার শুনেছি।

এরকম অজস্র বিষয় জড়িত বাঁশের সঙ্গে। যে বাঁশে বাঁশি হয় সেই বাঁশে আবার লাঠিও হয়। লাঠির ব্যবহারবিধি আর নাই বা বললাম। সবাই জানে। এবং এও জানে বাঁশ দিয়ে দেয়া’ বলে একটা কথা আছে। সেটার অর্থও বিশদ বলবার দরকার নেই। জীবনে বহুবার বহুভাবে আমরা এ ওকে বাঁশ দিয়ে যাচ্ছি। যে দিচ্ছে সেও টের পাচ্ছে জিনিসটা কী, যে নিচ্ছে সে তো পাচ্ছেই।

বাঁশের সর্বশেষ প্রতিভা শুনে আমি প্রায় ভিড়মি খাচ্ছিলাম। যার বাঁশে ব্যথা আমার ওই বন্ধু চীনদেশ থেকে ফিরে বলল, প্রকাশনা জগতে চীন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে।

আমি অবাক হয়ে বললাম, কী রকম?

যন্ত্রের একদিক দিয়ে বাঁশ দিয়ে দিচ্ছে আরেক দিক দিয়ে চাররঙা দৈনিক পত্রিকা ছাপা হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

বলে কী?

হ্যাঁ। যন্ত্রের ভেতর বাঁশ ঢুকবার পর সেই বাঁশ থেকে মুহূর্তে তৈরি হচ্ছে কাগজ, সেই কাগজে ছাপা হয়ে যাচ্ছে দৈনিক পত্রিকা।

লেখা টেখা?

তাও নিয়ন্ত্রণ করছে বাঁশ।

কীভাবে?

লেখক টেখকদের পেছনে সক্রিয় একখানা বাঁশ তো সব সময়ই আছে। সেই বাঁশের গুতো না খেলে কি লেখা বেরয়!

এই বন্ধুই একবার ঈদের আগে আমাকে বলেছিল, আজকাল আকাশের চাঁদও নিয়ন্ত্রণ করছে বাঁশ। চাঁদ দেখা কমিটি না সমিতি কী যেন একখানা আছে, তার সদস্যরা। বাঁশ হাতে জনমানবহীন নির্জন স্থানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠতম চাঁদগুলো উঠতে না চাইলেও বাঁশ দিয়ে ঠেলে ঠেলে আগে ভাগেই তুলে দেয় তারা। ফলে সবেবরাত, ঈদ এইসব মহান দিবস কোনও কোনও সময় আগেভাগেই পালন করতে হচ্ছে আমাদের।’

রচনাটি খাওয়া শেষ করে তৃপ্তির ঢেকুর মাত্র তুলবে স্বপন তার আগেই রেখা এসে ঢুকল রুমে। স্বামীকে তখনও বিছানায় দেখে অবাক হল। ওমা, তুমি দেখি এখনও ওঠোইনি!

তেরো বছর একসঙ্গে থাকার ফলে স্ত্রীর গলার রুক্ষ্মতা বেশ সয়ে গেছে স্বপনের। কখন সত্যিকার রুক্ষ্ম হয় তার গলা কখন কোমল, ভালই বুঝতে পারে।

এখনও পারল। গলা স্বাভাবিকই আছে রেখার। হাসি হাসি মুখে তারপর স্ত্রীর দিকে তাকাল স্বপন। উঠিনি তো কী হয়েছে? এজন্য নিজের মাকে ডাকতে হবে নাকি?

কথাটা বুঝতে পারল না রেখা। বলল, কী বললে?

না মানে ‘মা’ বললে তো!

তাতে কী হয়েছে?

কিছুই হয়নি। যা বলছিলে বল।

তুমি বাথরুমে ঢুকবে কখন, কখন নাশতা করবে, কখন বেরুবে?

এত কখন কখন করো না। মজার একটা লেখা পড়লাম। মুডটা খুব ভাল। সেটা নষ্ট করো না।

তোমার মুড নষ্ট করার দরকার আমার নেই। ভাইয়া রেডি হয়ে বসে আছেন।

আমি আজ ভাইয়ার সঙ্গে বেরুব না। আমার লেট হবে।

কেন?

কোনও কারণ নেই। আমার ইচ্ছে। আমি কারও চাকরি করি না। পৈতৃক বিজনেস দুভাইয়ে মিলে দেখি। একদিন একভাই একটু লেটে গেলে কোনও অসুবিধা নেই।

সঙ্গে সঙ্গে স্বামীকে জব্দ করার চান্সটা নিল রেখা। ঠিক আছে, কথাগুলো তাহলে ভাইয়াকে গিয়ে বলে আসি।

শুনে ভয় পেয়ে গেল স্বপন। না না এভাবে বললো না। বলো আমার শরীরটা একটু খারাপ লাগছে। আমি ঘন্টাখানেক পরে যাব।

সকালবেলা মিথ্যে কথা আমি বলতে পারব না।

রেখার চোখের দিকে তাকিয়ে খুবই রোমান্টিক স্বরে স্বপন বলল, হাজব্যান্ডের জন্য মেয়েরা কত স্যাক্রিফাইস করে, আর তুমি এই সামান্য কাজটা করতে পারবে না?

রেখার বোধহয় একটু মায়া হল। স্বভাবসুলভ রক্ষ্ম গলা যতটা সম্ভব নরম করে বলল, ঠিক আছে, করছি।

চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে রেখা, গলা আগের চেয়েও বেশি রোমান্টিক করে স্বপন বলল, শোন।

রেখা ঘুরে দাঁড়াল। কী?

কাছে এস।

আনমনা ভঙ্গিতে স্বামীর কাছে এসে দাঁড়াল রেখা। উঠে বসল স্বপন। হাত বাড়িয়ে স্ত্রীর চিবুকের কাছটা ধরল। তুমি কী ভাল! তোমার মতো ভাল বউ আমি জীবনে দেখিনি।

সঙ্গে সঙ্গে ঝটকা মেরে স্বপনের হাত সরিয়ে দিল রেখা। সত্যিকার রুক্ষ্ম গলায় বলল, সকালবেলা এসব ঢং করো না। বিচ্ছিরি লাগে।

ব্যাপারটা একটু অপমানকর। কিন্তু এই অপমান গায়েই লাগল না স্বপনের। নির্বিকার গলায় সে বলল, আচ্ছা করলাম না। কিন্তু আমার যে একটা মেয়ে আছে, সাত আটবছর বয়স, নাম হচ্ছে টুপলু, সে কোথায়?

জানি না।

.

টুপলুর খুবই সাজগোজের শখ।

আটবছর বয়সে সে একটু বেশি লম্বা, বেশি রোগা। হলে হবে কী, মুখটা অসম্ভব মিষ্টি। কথা বলে একটু বেশি জোর দিয়ে। ফলে কথা বলার সময় গলার একপাশের রগ ফুলে ওঠে।

আর টুপলু হচ্ছে অসম্ভব আদুরে স্বভাবের। যে কোনও বিষয়ে তার অনেক অভিযোগ, অনেক কান্না। ছোটখাট বহু ব্যাপার তীক্ষ্ণচোখে খেয়াল করে।

ছোট খালামণির গায়ে হলুদ উপলক্ষে টুপলুকে তার মা আড়াই হাজার টাকা দামের লাল টুকটুকে একটা কাতান শাড়ি কিনে দিয়েছিল। সঙ্গে ব্লাউজ ছায়া, রুপোর গহনা, মল। বেইলি রোডের শাড়ির মার্কেটে শিশুদের এইসব জিনিসও পাওয়া যায়।

সেই লাল কাতান আর গহনা ইত্যাদি পরে খালামণির বিয়েতে টুপলু একেবারে ছবির মতো ফুটেছিল। কতজন কত যে ছবি তুলেছে তার! মা বাবার বেডরুমে একটা ছবি বড় করে বাঁধানোও আছে।

আজ সকালে টুপলুর ইচ্ছে হল ওরকম সাজ সাজার।

শাড়ি গহনা ইত্যাদি হাতের কাছেই থাকে, চেসটার ড্রয়ারে। ড্রয়ার খুলে জিনিসগুলো নিয়ে সে সোজা এসেছে মুন্নির রুমে। আপু, আমাকে বউ সাজিয়ে দাও।

মুন্নি একটু মোটাসোটা, গোলগাল ধরনের ফর্সা মেয়ে। ঘাড়টা সামান্য ছোট। কখনও কখনও তীক্ষ্ণচোখে খেয়াল করলে তাকে সামান্য কুঁজো দেখায়। তবে বেশ মেজাজি মেয়ে সে। মুড ভাল থাকলে টুপলুর জন্য সব করে আর খারাপ থাকলে ধমক দিয়ে বিদেয় করে দেয়।

ধমক খেয়ে কাঁদে টুপলু ঠিকই কিন্তু আবার যখন কোনও ব্যাপারে মুন্নির দরকার হয় সব ভুলে তার কাছে আসে। মুন্নির মুড ভাল কী খারাপ তোয়াক্কা না করে নিজের কথাটা বলে। ধমক খাবে কী খাবে না বুঝতে পারে না।

আজও পারেনি।

তবে ভাগ্য ভাল টুপলুর মুন্নির মুড আজ ভাল ছিল। নিজের বিছানায় শুয়ে কমিকস পড়ছিল সে। কমিকসটা বোধহয় ভাল লাগছিল না। এজন্য কথাটা টুপলু বলার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠল। আয় সাজিয়ে দিচ্ছি। খুব মজা হবে।

তারপর থেকে টুপলুকে শাড়ি পরাচ্ছে মুন্নি। বউ সাজাচ্ছে। যে কোনও কাজ একটু সময় নিয়ে করার স্বভাব তার। আস্তেধীরে গুছিয়ে গাছিয়ে নিখুঁতভাবে করার স্বভাব। এখনও সেভাবেই করছে। হঠাৎ টুপলু বলল, আপু, আমাকে যেন একদম বউর মতো লাগে।

টুপলুর ছোট্ট কোমরে শাড়ি গুজতে গুজতে মুন্নি বলল, লাগবে। কিন্তু কথা বললে হবে না।

কেন?

নতুন বউরা কথা বলে না।

কথা বললে কী হয়?

এবার মুন্নি একটু রাগল। জানি না।

মুন্নির রাগ পাত্তা দিল না টুপলু। বলল, কেন জান না?

আমার ইচ্ছে আমি জানি না।

এমন ইচ্ছে কেন তোমার?

চুপ করলি?

এবার মুন্নির রাগ বুঝতে পারল টুপলু। সে চুপ করল।

শাড়ি পরানো শেষ করে টুপলুকে গহনা পরাতে লাগল মুন্নি। পরাতে পরাতে বলল, প্রথমে যাবি ভাইয়ার রুমে।

টুপলু অবাক। ভাইয়ার রুমে কেন?

তুই যে বউ সেজেছিস ভাইয়াকে দেখাবি না?

দেখাব তো!

তাহলে?

আচ্ছা যাব।

তারপর যাবি ফুপির রুমে। গিয়ে আড়াল থেকে নাম ধরে ডাকবি। তারপর হঠাৎ করে সামনে যাবি।

কেন এমন করব?

মজা করার জন্য। তোকে দেখে যেন চমকে যায়।

শুনে খুশি হয়ে গেল টুপলু। আচ্ছা।

পুরোপুরি বউ সাজার পর পা টিপে টিপে বাবলুর রুমের সামনে এসে দাঁড়াল টুপলু। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে রুমের ভেতর উঁকি দিল।

পড়ার টেবিলে বসে আছে বাবলু। সামনে মোটা একটা বই খোলা পড়ে আছে। কিন্তু পড়ছে বলে মনে হচ্ছে না। কানে ওয়াকম্যানের হেডফোন লাগানো। তারপরও কোনওদিকে তাকাচ্ছে না।

পাখির মতো গলায় বাবলুকে ডাকল টুপলু। বাবলু ভাইয়া।

বাবলু শুনতে পেল না।

টুপলু আবার ডাকল। এবারও শুনতে পেল না বাবলু। খানিক দাঁড়িয়ে টুপলু ভাবল, কী করা যায়? তারপর পা টিপে টিপে বাবলুর পেছনে এসে দাঁড়াল। দুবার ডেকে সাড়া পায়নি বলে মেজাজ বোধহয় একটু খারাপ হয়েছিল। এবার ডাকলেও হয়তো শুনবে না ভেবে বাবলুর কোমরের কাছে একটা খোঁচা মারল সে। এই বাবলু ভাইয়া, এই, তুমি শোন না?

চমকে পেছন ফিরে তাকাল বাবলু। কান থেকে হেডফোন খুলল। কানে হেডফোন থাকলে বাইরের কথা তেমন শোনা যায় না। তাছাড়া ওয়াকম্যানে বাজছে রিকি মার্টিনের মারিয়া। অত ধুমধারাক্কা মিউজিক এবং চিৎকার চেঁচামেচির গান বাজলে কি অন্যকিছু শোনা যায়?

হেডফোন খুলে অবাক বিস্ময়ে টুপলুর দিকে তাকাল বাবলু। তুই কে রে?

টুপলু অবাক। আমাকে তুমি চিনতে পারছ না?

না।

একদম চিনতে পারছ না?

একদম চিনতে পারছি না।

টুপলু হি হি করে হাসল। আমি টুপলু।

বাবলু খুবই মজার মুখভঙ্গি করল। ও তুই টুপলি?

তারপরই আচমকা রেগে গেল। যা ভাগ এখান থেকে।

বাবলুর বাঁজখাই গলা শুনে প্রথমে একটু ভড়কাল টুপলু। তারপর শাড়িটা সামান্য তুলে ধরে, মুখ ভেংচে দৌড় দিল।

শাড়ি পরা থাকলে দৌড়তে যে অসুবিধা এই বয়সেই টুপলু তা বুঝে গেছে।

.

এ্যালবামের মাঝামাঝি জায়গায় নিজের সুন্দর ছবির তলায় শুভর একটা ছবি রেখে দিয়েছে সেতু। যখনই ইচ্ছে হয় ছবিটা একবার বের করে দেখে। ছবির সঙ্গে মনে মনে কথা বলে।

আজ সকালে বারান্দা থেকে ফিরে এসে শুভর জন্য এতই কাতর হল সে, ছবিটা বের করে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। মনে মনে কথা বলা শুরু করার আগে বেশ কিছুদিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ল। শুভ বলেছিল সাড়ে বারোটার দিকে রমনা রেস্টুরেন্টে সেতুর জন্য অপেক্ষা করবে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে আসবে সেতু। আর সেতুর আগেই রেস্টুরেন্টের লেক সাইডের ঝুল বারান্দায় এসে বসে থাকবে শুভ। কোত্থেকে আসবে, বলেনি।

সেতুর নিয়ম হল শুভ যে সময় দেয় তারচে পাঁচ দশমিনিট দেরি করে পৌঁছানো। দেরিটা সে ইচ্ছে করেই করে। কারণ জায়গা মতো পৌঁছে শুভকে না পেলে তার মেজাজ খুবই খারাপ হয়। সময়ের পাঁচ দশমিনিট আগ থেকেই এসে বসে থাকে শুভ। সেতুর জন্য অপেক্ষা করে। এসব সেতু জানে। তবু সে আসে দেরি করে। যদি শুভর কখনও পাঁচ দশমিনিট দেরি হয়ও তবু সেতু এসে তাকে পাবে।

সেদিন হয়ে গেল ভয়ংকর কাণ্ড। পৌনে একটার দিকে পৌঁছে সেতু দেখে শুভ নেই। দেখে প্রথমে বিশ্বেস হয়নি শুভ সত্যি সত্যি পৌঁছয়নি। মনে হয়েছে নিশ্চয় পৌঁছে গেছে। হয়তো টয়লেট ফয়লেটে গেছে।

কিন্তু টয়লেটে যাওয়ার দরকার হলেও সেতু এসে পৌঁছবার আগেই শুভ তা সেরে রাখে। সেতুর আসার সময় হয়ে গেছে আর শুভ পৌঁছয়নি কিংবা টয়লেটে, এমন কখনও হয়নি।

সেতু বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা খেল কিন্তু বিশ্বাস করল না যে শুভ পৌঁছয়নি। সে একটা টেবিলে বসে রইল।

পাঁচমিনিট দশমিনিট পনেরমিনিট চলে গেল শুভর দেখা নেই। ভেতরে ভেতরে মেজাজ খারাপ হতে লাগল সেতুর। সুন্দর মুখে এসে ভর করতে লাগল বিরক্তি।

এইসব রেস্টুরেন্টের ওয়েটারগুলো তালে থাকে কাস্টমার এসে টেবিলে বসার সঙ্গে সঙ্গে কতক্ষণে অর্ডার নেবে, কতক্ষণে খাবার সার্ভ করবে।

সেতুর ক্ষেত্রেও তাই করল।

মেনু হাতে ওয়েটার এসে সামনে দাঁড়াল। কী খাবেন ম্যাডাম? চায়নিজ থাই। ইন্ডিয়ান না বাংলাদেশী খাবার?

সেতুর প্রায় মুখে এসে গিয়েছিল, তোমার মুণ্ডু।

অতিকষ্টে নিজেকে সামলাল সে। কোনও রকমে বলল, পরে অর্ডার দেব।

লোকটির বোধহয় বেশি কথা বলার স্বভাব। বলল, কত পরে?

জানি না।

জ্বী?

আমি একজনের জন্য ওয়েট করছি। সে আসুক, তারপর।

লোকটি বিগলিত হাসল। আমিও তাই ভেবেছি। আপনার মতো ম্যাডামরা একা এসে কখনও খায় না। স্যার আসবেন কখন?

বিরক্তি তখন চরমে সেতুর। তবু চেপে রাখতে হল। এই এক্ষুণি চলে আসবে।

শুভ এল একটা দশে। অর্থাৎ তার হিসেবে চল্লিশমিনিট লেট, আর সেতু আসার পর পঁচিশমিনিট। কিন্তু মুখটা খুবই করুণ তার এবং সামান্য হাঁপাচ্ছিল। দিশেহারা ভঙ্গিতে রেস্টুরেন্টের ঝুলবারান্দায় ছুটে এসেছিল সে, প্রায় হুড়মুড় করে সেতুর মুখোমুখি চেয়ারে বসেছিল। কখন এসেছ তুমি? নিশ্চয় অনেকক্ষণ! ইস আমার অনেক দেরি হয়ে। গেল। কী করব বল? আমাদের তো গাড়ি নেই! রিকশা স্কুটারে চলাফেরা করতে হয়। স্কুটার বেশ এক্সপেনসিভ। তারপরও তোমার জন্য আজ স্কুটারে চড়েছিলাম। কিন্তু। স্কুটারগুলোর যা নেচার। হয় প্লাকে ময়লা আসে, নয় স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। আমারটারও তাই হয়েছে আজ। পার্কের ওদিকটায় এসে একেবারেই নষ্ট হয়ে গেল। কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছিল না।

সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল সেতু। থমথমে গলায় বলল, আমি এখন চলে যাব। পরিবেশ ভুলে থাবা দিয়ে তার হাত ধরল শুভ। পাগল হয়েছ নাকি? আমি এত কষ্ট করে এলাম আর তুমি চলে যাবে? আমি কি ইচ্ছে করে লেট করছি? আজ পর্যন্ত কখনও এমন হয়েছে, বল? স্কুটার নষ্ট হয়ে গেলে আমি কী করব? বাড়ি থেকে বেরিয়েছি অনেক আগে। বারোটার দিকে। হেসে খেলে সোয়া বারোটা কিংবা বারোটা বিশে এখানে পৌঁছে যাওয়ার কথা।

এত কথা আমি শুনব না।

শুনতে হবে। কারণ আমি তোমার জন্য খুব কষ্ট করেছি। স্কুটার নষ্ট হওয়ার পর রিকশা টিকশা নিইনি। এই এতটা পথ পার্কের ভেতর দিয়ে দৌড়ে এলাম। তাও যেই। সেই দৌড়, একেবারে পাগলের মতো। ছেলেবেলার পর এমন দৌড় কখনও দৌড়াইনি। দেখছ না এখনও কেমন হাপাচ্ছি!

শুভর কথা শুনে মনটা একটু নরম হল সেতুর। তবু রাগি ভাবটা বজায় রাখল সে। অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, কোথায় হাঁপাচ্ছ? তোমাকে একেবারে নরমাল মনে হচ্ছে।

শুভ তার নির্মল হাসিটা হাসল। মনে হওয়ার কারণ আছে। বস, বলছি।

যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও বসল সেতু।

শুভ বলল, আসলে হয়েছে কী, দৌড়াতে দৌড়াতে রেস্টুরেন্টের সামনে এসেছি, এসে ভাবলাম এমন হাঁপাতে হাঁপাতে এই ধরনের রেস্টুরেন্টে ঢোকা ঠিক হবে না। এক দুমিনিট রেস্ট নিয়ে নিই।

কেন, রেস্ট নিতে হবে কেন? হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকলে কী হতো?

লোকে কী ভাবত, বল! তার ওপর তুমি এভাবে একা বসে আছ! আমার জন্য ওয়েট করছ। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে, হাঁপাতে হাঁপাতে তোমার কাছে এলাম। দৃশ্যটা দেখতে কি ভাল লাগবে?

অন্যের কথা জানি না, আমার খুব ভাল লাগত।

কেন?

মনে হতো আমার জন্য পৃথিবীর যে কোনও প্রান্ত থেকে যে কোনওভাবে ছুটে আসতে পার তুমি। কোনও কিছুই কেয়ার কর না।

সেতুর চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় শুভ বলল, সত্যি আমি ছুটে এসেছি সেতু, সত্যি আমি কোনও কিছু কেয়ার করিনি! তোমার জন্য সব পারি আমি, সব।

বুক পকেট থেকে তারপর টকটকে লাল একটা গোলাপ বের করেছিল শুভ। সেতুর হাতে দিয়ে বলেছিল, আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি তোমাকে খুব ভালবাসি।

এই মুহূর্তে শুভর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যেন শুভর সেদিনকার কথা আবার শুনতে পেল সেতু। ভুলে গেল সে তাকিয়ে আছে শুভর ছবির দিকে। নিজের অজান্তেই পরিষ্কার উচ্চারণে সেতু বলল, আমিও তোমাকে ভালবাসি। আমিও তোমাকে খুব ভালবাসি।

সঙ্গে সঙ্গে সেতুর পেছন থেকে পাখির মত মিষ্টি আদুরে গলায় কে যেন বলল, তা তো আমি জানিই।

এ হচ্ছে টুপলু। প্ল্যান মতো বাবলুর রুম থেকে সেতুর রুমে এসেছে সে। এসে দেখে সেতু মগ্ন হয়ে আছে এ্যালবামে। কোনওদিকে খেয়াল নেই। ফুপিকে চমকে দেয়ার জন্য পা টিপে টিপে তার একেবারে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তখনই ভালবাসার কথাটা বলেছে সেতু। টুপলু ভেবেছে তাকে দেখতে পেয়েও মজা করার জন্য অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে তাকেই কথাটা বলেছে ফুপি। এজন্য সেও মুগ্ধ গলায় জবাব দিয়েছে।

কিন্তু টুপলুর গলা শুনে চমকে উঠল সেতু। ঝটপটে হাতে শুভর ছবি চালান করে দিল নিজের ছবির তলায়। এ্যালবাম বন্ধ করল। টুপলুকে দেখতে পেল। ও তুই? আমি ভয় পেয়ে গেছি।

টুপলু অবাক হল। কেন? ভয় পাবে কেন? আমি কি ভূত?

মুখের মিষ্টি একটা ভঙ্গি করে, অতি আদুরে ভঙ্গিতে দুহাতে টুপলুকে বুকের কাছে। টেনে আনল সেতু। তুই তো ভূতই। ছোট্টভূত।

তারপর কী ভেবে বলল, না না তুই হচ্ছিস পেত্নি। পেত্নি। মেয়েভূতগুলোকে বলে পেত্নি। তোকে এরকম পেত্নির সাজ কে সাজাল রে?

শুনে টুপলু একেবারে হা হা করে উঠল। না না পেত্নির সাজ না তো! নতুন বউর সাজ। দেখছ না লাল শাড়ি, গহনা।

দেখছি।

টুপলু খুশি হয়ে বলল, আমাকে কেমন লাগছে ফুপি?

গাল টিপে টুপলুকে একচোট আদর করল সেতু। খুব সুন্দর লাগছে, খুব সুন্দর। একদম নতুন বউর মতো। এই তোর বিয়ে কবে রে?

টুপলু কথা বলবার আগেই কডলেস ফোন হাতে রানি এসে ঢুকল। আফা, আপনের ফোন। দোলন আফায় ফোন করছে।

লাফ দিয়ে উঠে ফোনটা নিল সেতু। দৌড়ে বারান্দায় চলে গেল।

তারপর যেন টুপলুকে খেয়াল করল রানি। মুখের হা-টা একটু বড় রানির। হাসলে দুদিক থেকে মুখ চলে যায় প্রায় কানের কাছাকাছি। এই ধরনের হাসিকে বলে আকৰ্ণ হাসি। সেই আকর্ণ হাসি হেসে বলল, আরে, এতক্ষুণ দেখি নাই? এইডা কে? কার বউ?

রানিকে দুই চোক্ষে দেখতে পারে না টুপলু। রানি যতই আদর করে তাকে সে ততই বিরক্ত হয়।

এখনও হলো। রানির মুখের দিকে ফিরেও তাকাল না। গম্ভীর গলায় বলল, তোর বউ।

তারপর গুটগুট করে হেঁটে সেতুর রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু টুপলুর কথায় রানি খুব মজা পেয়েছে। রুমে কেউ নেই দেখে প্রাণখুলে আকর্ণ হাসিটা হাসতে লাগল সে।

.

তোর আজ কোনও কাজ আছে?

আপনি কে যে এভাবে আমাকে তুই তোকারি করছেন? অভদ্র, ছোটলোক। ফোন তুলেই কেউ কাউকে তুই তোকারি করে? ভদ্রতা শেখেননি? বাড়িতে কি নতুন ফোন লেগেছে? আজকের আগে টেলিফোনে কখনও কথা বলেননি? টেলিফোনে কথা বলা শিখে তারপর আমাকে ফোন করবেন।

গলা অন্যরকম করে কথা বলতে শুরু করেছিল সেতু। ফলে দোলন একটু ভড়কে গেল। তবে মুহূর্তের জন্যই। তারপরই নিজেকে ম্যানেজ করল। থাপ্পড় মেরে দাঁত ভেঙে ফেলব।

সেতু আগের গলায় বলল, ছি ছি ছি, আপনি কী রকম মেয়ে? মেয়ে হয়ে আরেকটি মেয়ের দাঁত ভেঙে ফেলতে চাইছেন? সত্যি যদি দাঁত ভেঙে দিন মেয়েটির তাহলে কী ক্ষতি হবে আপনি জানেন?

না জানি না। কী ক্ষতি হবে বল?

বোকরা দাঁত নিয়ে তার বিয়ে হবে কী করে?

‘বোকরা’ মানে?

মানে ফোকলা আর কী!

ফোকলা দাঁতে বিয়ে হলে কী হবে?

বর তাকে কিস করবে কেমন করে? কিস করার সময় ফোকলা দাঁতের ফোকড়ে শো শো করে শব্দ হবে না!

এ কথায় খিলখিল করে হেসে উঠল দোলন। ইস তুই যা হয়েছিস না!

সেতুও হাসল। কী হয়েছি?

মহাপাজি।

তবে আমি যখন গম্ভীর গলায় কথা বলছিলাম তখন তোর চেহারাটা কেমন হয়েছিল, একজাক্টলি আমি তা দেখতে পাচ্ছিলাম।

কেমন বল তো?

সবকিছুর বর্ণনা দিয়ে লাভ নেই। মাত্র একটা বিষয়ের বর্ণনা দিচ্ছি।

কোনও অসভ্য বিষয় না তো?

আরে না।

তাহলে বল।

তোর নাকটা আরও লম্বা হয়ে যাচ্ছিল। ঠোঁট ছাড়িয়ে ঝুলে পড়ছিল।

যা ভাগ।

সেতু চুপ করে রইল।

দোলন বলল, বললি না?

কী বলব? আজ কোনও কাজ আছে কি না?

না।

ইউনিভার্সিটি?

নেই। একটা সেমিস্টার গ্যাপ দিচ্ছি। তিনমাস ফ্রি।

গুড। আমাদের বাড়ি চলে আয়।

কেন? আমাদের কি বাড়িঘর নেই যে তোদের বাড়ি আসতে হবে!

আয় সারাদিন আড্ডা দেব।

আমি কি লেসবিয়ান যে তোর সঙ্গে আড্ডা দেব?

ছি। তোর মুখে দেখি কোনও কথাই আটকায় না।

কেন আটকাবে? আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে যা মনে আসে, মুখে আসে বলতে পারব না?

ঠিক আছে যত ইচ্ছে বলার বলিস, আগে আমাদের বাড়ি আয়।

তোর ইউনিভার্সিটি নেই?

আছে। যাব না।

কিন্তু তোর সঙ্গে আড্ডা দিতে যে আমার ভাল লাগবে না।

কার সঙ্গে লাগবে?

তুই জানিস।

অপজিট সেক্স?

এখন যে তুই সেক্স সেক্স করছিস তোর মুখে আটকাচ্ছে না?

এবার যেন একটু অধৈর্য হল দোলন। এত প্যাচাচ্ছিস কেন? বল না আসবি কি না! তোর যার সঙ্গে আড্ডা দিতে ভাল লাগবে তাকেও আসতে বলি।

সত্যি?

সত্যি।

চারদিক তাকিয়ে সাবধানি গলায় সেতু বলল, তুই তাহলে শুভকে ফোন কর। বল বারোটার মধ্যে যেন তাদের বাড়িতে চলে আসে। আমি তার আগেই চলে আসব।

এক্ষুনি করছি। তবে তুই বাড়িতে বলে আয় বিকেল পর্যন্ত আমাদের এখানে থাকবি।

খাওয়া?

না খাইয়ে রাখব তোদেরকে। সিরিয়াসলি।

তারপর একটু থেমে বলল, খিচুড়ি আর ডিম ভাজা করা হবে। আয়।

তুই শুভকে ফোন কর।

করছি।

সেতুর লাইন কেটে শুভদের নাম্বারে ডায়াল করতে লাগল দোলন।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *