০৮. কবি রবার্ট ফ্রস্ট রসিক ছিলেন

কবি রবার্ট ফ্রস্ট রসিক ছিলেন। কবির মতে ডিপ্লোম্যাটরা মহিলাদের জন্মদিন মনে রাখেন, ভুলে যান তাদের বয়স। জন্মদিনের ওই আনন্দটুকু, ওই রসটুকুই কূটনীতিবিদদের প্রয়োজন; কালের যাত্রায় বিলীয়মান যৌবনের হিসাব রাখতে তাদের আগ্রহ নেই।

ডিপ্লোম্যাট হয়েও অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জি মহিলাদের জন্মদিনই মনে রাখেন না, স্মরণ রাখেন তাদের বয়স। বিলীয়মান যৌবনের হিসাব। শুধু আনন্দ, শুধু রস, শুধু মধু পান করেই উনি নিজের মনকে খুশি রাখতে পারেন না। বেদনাবিধুর আবছা অন্ধকার মনের কথাও তিনি জানতে চান।

হঠাৎ দেখলে ঠিক টপ কেরিয়ার ডিপ্লোম্যাট বলে মেনে নিতে মন চায় না। আর পাঁচজন ডিপ্লোম্যাটের মতো চাকচিক্য স্মার্টনেস, গ্ল্যামার একেবারেই নেই। মাথায় টপ হ্যাঁট বা হাতে লম্বা সরু ছাতা না থাকলেও পরনে পুরনো কালের ইংরেজদের মতো ঢিলেঢালা থ্রি-পিস্ স্যুট। সিলভার চেন-এর সঙ্গে মোটা পকেট ওয়াছ না ব্যবহার করলেও অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জিকে অনেকটা কেম্ব্রিজের বিখ্যাত সেলউইন কলেজের ওরিয়েন্টাল অধ্যাপক মনে হয়।

সবাই যে অ্যাম্বাসেডর রঘুবীর হবেন তার কি মনে আছে? ভরা যৌবনে আই. সি. এস. হয়ে দেশে ফেরার বছরখানেকের মধ্যেই রঘুবীর দেরাদুনের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হলেন। মাস ছয়েক ঘুরতে না ঘুরতে লাহোরের স্যার বীরেন্দ্রবীরের পুত্র রঘুবীর প্রভুভক্তির অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। গান্ধীজি ও সঙ্গীদের টিল দি কোর্ট রাইজ পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলেন।

ঘটনাটা নেহাতই সামান্য। তবু এমন সুযোগ তো বার বার আসে না! মীরাট থেকে মজঃফরনগর, রুরকি, দেরাদুন হয়ে গান্ধীজি মোটরে মুসৌরী যাচ্ছিলেন। মীরাট আর মজঃফরনগরে মিটিং ছিল কিন্তু রুরকি বা দেরাদুনে কোনো প্রোগ্রাম ছিল না। তবে অভ্যর্থনার জন্য দেরাদুন শহরের ধারে বেশ ভিড় হয়েছিল।

রঘুবীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে রিপোর্ট পাঠালেন, দেরাদুন শহরে মিলিটারি অ্যাকাডেমির ছেলেরা হরদম ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাইচান্স গান্ধীজি যদি ক্লক টাওয়ারের পাশ দিয়ে যাবার সময় বক্তৃতা দিতে শুরু করেন তবে মিলিটারি অ্যাকাডেমির ছাত্ররাও নিশ্চয়ই…। তাছাড়া যেমন অভ্যর্থনার উদ্যোগ আয়োজন হচ্ছে তাতে রিস্ক না নেওয়াই ঠিক হবে।

সুতরাং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টম জোনস্ সাহেবের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রঘুবীর আদেশ জারী করলেন, মিঃ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ইজ হিয়ারবাই নোটিফায়েড দ্যাট ইন দি ইন্টারেস্ট অফ সিকিউরিটি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যান্ড ল অ্যান্ড অর্ডার ইন দি রিজিয়ন, আপনি ও আপনার সাঙ্গপাঙ্গরা দেরাদুন শহরে যাবেন না।

দেরাদুন শহরের প্রান্তে কয়েকশো দেশি-বিদেশি সিপাহি নিয়ে রঘুবীর মহাত্মাজীকে অভ্যর্থনা জানালেন।

গাড়ি থেকে নেমে একটু মুচকি হেসে গান্ধীজি বললেন, কত দিনের জন্য অতিথি হতে হবে?

রঘুবীর জানালেন, না না, ওসব কিছু না। তবে স্যার, দেরাদুন শহরটা এড়িয়ে যান।

গান্ধীজি আইনজীবীর মতো পাল্টা প্রশ্ন করলেন, আপনার মহামান্য সরকার মুসৌরী যাবার জন্য নতুন কোনো রাস্তা তৈরি করছেন নাকি?

নো স্যার, দিস ইজ দি ওনলি রোড টু মুসৌরী।

তবে কি আমি উড়োজাহাজ…।

গান্ধীজি দলবল নিয়ে এগিয়ে যেতেই রঘুবীর গ্রেপ্তার করে কোর্টে নিয়ে গেলেন। বিচারে টিল দি কোর্ট রাইজ…

সেই রঘুবীর স্বাধীন ভারতবর্ষের অ্যাম্বাসেডর হয়ে আমেরিকায় গিয়ে বললেন, তোমাদের আব্রাহাম লিঙ্কন আর আমাদের গান্ধীজি বিশ্বমানব-সমাজের মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত। ইতালীতে অ্যাম্বাসেডর হবার পর ভ্যাটিকান-প্রধান পোপের কাছে পরিচয়পত্র দেবার সময়। বললেন, ত্রাণকর্তা যীশুকে আমি দেখিনি। কিন্তু ভারত-ত্রাণকর্তা মহাত্মা গান্ধীকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এই মহামানবের জীবন ও বাণীর মধ্য দিয়ে আমি মহাপ্রাণ যীশুকে উপলব্ধি করেছি।

রঘুবীর সাহেব অ্যাম্বাসেডর হয়ে নানাভাবে দেশসেবা করেছেন। পশ্চিম জার্মানীর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। আমরা বাঙালিরা বড়বাজার-পোস্তার হোলসেলার দেখেই কুপোকাৎ। সুতরাং জার্মান-ভারতের সে বাণিজ্য চুক্তির হিসেব রাখাই আমাদের পক্ষে দায়। একশো পঁয়ত্রিশ বেসিকের কেরানী বা একশো পঁচাত্তরের লেকচারার হয়েই মাটির পৃথিবী থেকে যাদের উদাস দৃষ্টি নীল আকাশের কোলে উড়ে যায়, তাদের পক্ষে কি শত শত সহস্র কোটি টাকার বিজনেসের অনুমান করা সম্ভব? ওঁরা বলেন মিলিয়ন, বিলিয়ন। বাঙালি ইন্টেলেকচুয়ালরা খবরের কাগজের প্রথম পাতা পড়েই গরম হন। কিন্তু যাঁরা ওই মিলিয়নের-বিলিয়নের প্রসাদ পান তারা খবরের কাগজের প্রথম পাতার চাইতে ভিতরের পাতার স্টক এক্সচেঞ্জ ও কোম্পানি মিটিং-এর রিপোর্ট বেশি পড়েন।

অ্যাম্বাসেডর রঘুবীরের জীবন-সঙ্গিনীর আদরের ছোট ভাইও খবরের কাগজের ওই ভিতরের পাতার পাঠক ছিলেন। ভাগ্যবান ছোট শালাবাবু জিজাজীর কাছে একবার আব্দার করেছিলেন, ইন্দো-জার্মান ট্রেডের কিছু একটা পাওয়া যায় না?

হোয়াই নট? একটু মনে করিয়ে দেবার জন্য দিদিকে বলে দিও।

রাইন নদীর জলে ওয়াটার জেট লঞ্চে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে দূরের কারখানার চিমনিগুলো চোখে পড়তেই মিসেস রঘুবীর স্বামীকে বলেছিলেন, তোমার মনে আছে আমার ওই ছোট্ট ভাইয়ের কথা?

হাঁ জী।

কদিন বাদেই বিখ্যাত এক জার্মান ফার্ম থেকে কোয়েরি এলো, মিলিয়ন মিলিয়ন মার্ক-এর মেসিনারী ইন্ডিয়াতে পাঠাতে হবে কিন্তু আমরা অফিস খুলব না, রেসিডেন্ট রিপ্রেজেনটেটিভ ও এজেন্সী দিতে চাই।

এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে পাইপটা নামিয়ে রাখলেন রঘুবীর। তারপর বেশ চিন্তিত হয়ে বললেন, এত বড় ব্যাপার, আমাকে একটু ভাবতে হবে।

বেশ তো ভাবুন না। তবে দেখবেন ওই ফার্ম যেন আর কোনো ফেমাস ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের কাজ না করে।

অ্যাম্বাসেডর হাসতে হাসতে বললেন, ইউ আর মেকিং মাই টাস্ক মোর ডিফিকাল্ট? ইওর এক্সেলেন্সি অ্যাম্বাসেডর্স আর নট ফর অর্ডিনারী…। এক সপ্তাহ পরে তাগিদ এলো অ্যাম্বাসেডরের কাছে। জবাব গেল ইন্ডিয়াতে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে।

তিন সপ্তাহ পরে অ্যাম্বাসেডর রঘুবীর রেকমেন্ড করলেন জলন্ধরের ছোট শালার ফার্মকে।

ফরেন সার্ভিসের দুচারজন বিশ্বনিন্দুক বলেন, ছোট শালাবাবু গুরু দক্ষিণাস্বরূপ জামাইবাবুকে দিল্লিতে ফ্রেন্ডস কলোনীর একটা আড়াই লাখ টাকার কটেজ উপহার দিয়েছেন।

রঘুবীরের মতো আরো অনেক আদর্শহীন বীর আছেন ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসে। অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জি একটু ভিন্ন ধাতুতে গড়া। টেবিলে যদি ফাইলের স্তূপ না থাকে তবে সহকর্মীদের নিয়ে বৈঠক জমান নিজের ঘরে। নানা কথার পর থার্ড সেক্রেটারি হঠাৎ বলে ওঠেন, স্যার, আপনার মতো সহজ সরল মানুষ ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোম্যাসিতে যে কিভাবে সাকসেসফুল হলেন, তাই ভেবে অবাক হই।

হাসতে হাসতে অ্যাম্বাসেডর জবাব দেন, ভেরী সিম্পল রঙ্গস্বামী।

To Thomas Moore-এ ব্যায়রন বলেছেন,

Heres a sigh to those who love me,
And a smile to those who hate,
And, whatever skys above me,
Heres a heart for any fate.

আর আমাদের রবীন্দ্রনাথ বলেছেন–

নিজেরে করিতে গৌরবদান
নিজেরে কেবলই করি অপমান
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া
ঘুরে মরি পলে পলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।

এই হচ্ছে ব্যানার্জি সাহেবের জীবন দর্শন। দৃষ্টিটা একটু সুদূরপ্রসারী! তাই তো মিশ্র সাহেবের মাতলামীর পিছনে তার অশান্ত স্নেহকাতর পিতৃ হৃদয়টাই ওঁর চোখে পড়ে।

জান তরুণ, এর চাইতে বড় সর্বনাশ, বড় ট্র্যাজেডি মানুষের জীবনে আর নেই। শিশুর জন্মের পর মায়ের বুক স্তন্যরসে ভরে যায়। কিন্তু ভাগ্যের দুর্বিপাকে যদি সে শিশু মায়ের কোল খালি করে হঠাৎ চিরকালের জন্য লুকিয়ে পড়ে তবে ওই বুকের যন্ত্রণায় মা পাগল হয়ে ওঠেন।

এবার মুখটা উঁচু করে মিঃ ব্যানার্জি বলেন, ওটা শুধু দেহের যন্ত্রণা নয়, ওর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যর্থ মাতৃত্বের বেদনা।

তরুণ কথা বলতে পারে না। শুধু মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জির দিকে। ইস্টার-সেশন পিরিয়ডে নেশনস্ হেড কোয়ার্টাসে বেশি ভিড় থাকে না। এমন কি ওই ছোট্ট ক্যাফেটেরিয়াটাও যেন ফাঁকা ফাঁকা হয়ে যায়। অধিকাংশ দেশের স্থায়ী প্রতিনিধি-অ্যাম্বাসেডররা হয় ছুটিতে না হয় বেড়াতে বেরিয়ে পড়েন। জুনিয়র ডিপ্লোম্যাটরাও একটু ঢিলে দেন কাজকর্মে।

সেদিন সকালে ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলের একটা ছোট্ট সাব-কমিটির মিটিং ছিল। আধ ঘণ্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে অত বিরাট ইউনাইটেড নেশনস হেডকোয়ার্টারটা প্রায় খালি হয়ে গেল। আট তলায় ইন্ডিয়ান ডেলিগেশনের ঘরে মিঃ ব্যানার্জি আর তরুণ বসে কথা বলছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নোংরামি থেকে হঠাৎ যেন। ইউনাইটেড নেশনস হেডকোয়ার্টার্স একেবারে মুক্ত হয়ে গেছে। তাই তো মনের কথা, প্রাণের ভাষা বলতে পারছিলেন অ্যাম্বাসেডর সাহেব।

দৃষ্টিটা হাডসন নদীর এপার-ওপার দিয়ে ঘুরিয়ে এনে নীল আকাশের কোলে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন মিঃ ব্যানার্জি। রিভলভিং চেয়ারটা নাড়তে নাড়তে বললেন, মিশ্রকে দেখলে বড় কষ্ট হয়। রীনাকে কাছে পেলে ওর মনের শূন্যতা, ব্যর্থ পিতৃত্বের জ্বালা যেন আমাকে আরো বেশি আপসেট করে দেয়।

মিসেস ব্যানার্জি ভাবতে পারেননি ব্যানার্জি সাহেব এখনও ইউ এন-এ আছেন। তরুণের ফ্ল্যাটে ফোন করে জবাব না পেয়ে ভাবলেন নিশ্চয়ই ওরা দুজনে কোনো জরুরী কাজে আটকে পড়েছেন। ওদিকে বেলা হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি লাঞ্চ খেয়েই এয়ারপোর্ট রওনা হতে হবে। তাই তো মিশ্রকে ফোন করলেন। ভাইসাব, ব্যানার্জি সাহেবের কি খবর বলো তো?

কেন এখনও ফেরেননি?

না। কোনো জরুরী কাজে গিয়েছেন কি?

তেমন কোনো জরুরী কাজের কথা তো আমি জানি না। আচ্ছা একবার তরুণকে ফোন করছি।

তরুণও বাড়িতে নেই…। মিসেস ব্যানার্জির কথা শেষ হবার আগেই মিঃ মিশ্র বললেন, দেন ডোন্ট ওরি। দুজন সেন্টিমেন্টাল বেঙ্গলী ঠিক কোথাও বসে আকাশ দেখছেন, না হয় আমার দুঃখের ব্যালান্স-সীট মেলাচ্ছেন।

মিশ্রের কথা শুনে মিসেস ব্যানার্জিও হেসে ফেলেন। তাহলে ভাই একটু দেখুন না। আবার তাড়াতাড়ি লাঞ্চ খেয়ে রীনাকে আনতে…।

তাতে ব্যানার্জি সাহেবের কি? সে তো আমার আর আপনার চিন্তা।

মিশ্র টেলিফোন নামিয়ে রেখে আর দেরি করলেন না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজির হলেন। ইউ এন-এ। গাড়ি পার্ক করতে গিয়ে দেখলেন দুটি পরিচিত গাড়ি প্রায় পাশাপাশি রয়েছে। অ্যাম্বাসেডর সাহেবের ড্রাইভারটাও কোথাও আড্ডা দিতে গেছে। মিশ্র দুষ্টুমি করে এমনভাবে নিজের গাড়িটা পার্ক করলেন যে ওই দুটি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব! লিফট দিয়ে। উঠতে উঠতে যদি ওই দুজন সেন্টিমেন্টাল বাঙালি নেমে আসেন, তাহলে বুঝবেন, যার সুখ-দুঃখের ব্যালান্সসীট তৈরি করতে ওরা এতক্ষণ ব্যস্ত ছিলেন সে এসে গেছে।

অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জির ঘরের সামনে এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে দাঁড়ালেন মিঃ মিশ্র। একবার ভাবলেন নক করবেন; আবার ভাবলেন, না-না, ওসব ফর্মালিটির কি দরকার।

আস্তে দরজাটা ঠেলে মিশ্র ভিতরে ঢুকতে দুজনেই অবাক!

অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জি আর তরুণ প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন, মিশ্র, ইউ আর হিয়ার?

হাসিমুখে মিশ্র জবাব দেয়, হোয়াট এলস কুড আই ডু?

একবার নিজের হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মিশ্র অ্যাম্বাসেডর সাহেবকে বললেন, স্যার, মিসেস ব্যানার্জি বলছিলেন আপনাকে খাইয়ে-দাইয়ে তবে উনি এয়ারপোর্ট…।

ও, তাই তো!

তাড়াহুড়ো করে সবাই উঠে পড়লেন। নিচে এসে গাড়িতে উঠবার সময় মিঃ ব্যানার্জি বললেন, তোমরাও বরং আমার ওখানেই চল। হোয়াট এভার ইজ দেয়ার, উই উইল শেয়ার ইট।

মিশ্র হাসতে হাসতে বলেন, স্যার, রীনাকে যখন প্রায় আমাকেই দিয়ে দিয়েছেন তখন আর খাওয়া-দাওয়া শেয়ার করতে লজ্জা কি?

মিশ্র আর মিসেস ব্যানার্জি এয়ারপোর্টে হাজির হবার পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে অ্যানাউন্সমেন্ট হলো, বি-ও-এ-সি অ্যানাউসেস দি অ্যারাইভাল অফ ফ্লাইট সিক্স-জিরো-ওয়ান ফ্রম লন্ডন।

রীনা টিপ করে মাকে একটা প্রণাম করেই মিঃ মিশ্রকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি জানতাম আংকল, তুমি আসবেই!

রীনার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মিশ্র উত্তর দিলেন, তোমরা যা এক-একটা বিচিত্র শত্রু! তোমাদের কি চোখের আড়ালে রাখা যায়?

রীনা আংকলের মাথাটা মুখের কাছে টেনে নিয়ে কানে কানে ফিসফিস করে কি যেন বলছে। মিশ্র একগাল হাসি হেসে বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে। ডোন্ট ওরি ডিয়ার ডার্লিং মামি!

মিসেস ব্যানার্জির মুখ খুশির আলোয় ভরে গেলেও একটু যেন বিরক্তির সুরে বললেন, আংকলকে বিরক্ত করা শুরু হলো, তাই না?

আংকল মনে মনে হাসেন। ভাবেন পৃথিবীর সব রীনারাই যদি ওর গলা জড়িয়ে ধরে কানে কানে ফিসফিস করে অমন আব্দার করত, তাহলে হয়তো অমলাকে…!

সেদিন রাতে মিশ্রের থার্টিটু স্ট্রিট ও ইস্টের ফ্ল্যাটে বিরাট উৎসবের আয়োজন হলে রীনার আনারে। অ্যাম্বাসেডর ও মিসেস ব্যানার্জি ছাড়াও ইন্ডিয়ান ডেলিগেশনের প্রায় সবাই এলেন।

নবাগত ইনফরমেশন অ্যাটাচি ভার্মা তরুণকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, কি ব্যাপার, মিঃ মিশ্রর এমন ডিনারে কোনো ড্রিংকস নেই?

রীনার সামনে ড্রিংক করেন না।

কেন?

বলেন মেয়েদের সামনে ড্রিংক করা উচিত না তাছাড়া…।

তাছাড়া কি?

তাছাড়া বলেন, রীনাকে কাছে পেলে ওঁর কোনো দুঃখ থাকে না, সুতরাং ড্রিংক করবেন কেন?

এত বিরাট ব্যাপক আয়োজন। তরুণ খাবে কি? শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখে মিশ্রকে। কপালের সেই চিন্তার রেখাগুলো কোথায় যেন লুকিয়ে পড়েছে, ক্লান্ত মানুষটির বিষণ্ণ শূন্য দৃষ্টি যেন আর নেই। কাজকর্মের পর যে মিশ্র রোজ সন্ধ্যার পর নিজেকে ভুলে যান, স্থবির হয়ে বসে বসে শুধু বোতল বোতল মদ গেলেন, তিনি যেন নবযৌবন ফিরে পেয়েছেন। কত চঞ্চল, কত প্রাণবন্ত! কত সুন্দর, কত প্রিয়।

তরুণ এগিয়ে গেল অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জির কাছে। স্যার, আপনি বাড়ি যাবেন না? রাত্রেই তো সব পেপার্স ঠিকঠাক করে রাখতে হবে, নয়তো কাল যাবেন কি করে?

যাব কি, এখনও খাওয়াই হয়নি।

সে কি?

আজ কি আমাকে দেখার সময় আছে মিশ্রের? অ্যাম্বাসেডর হাসতে হাসতেই বললেন।

তরুণও হাসে। তা ঠিকই বলেছেন স্যার। রীনাকে কাছে পেলে উনি প্রায় পাগল হয়ে ওঠেন।

একটা ছোট্ট চাপা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন অ্যাম্বাসেডর। তারপর বললেন, রীনাকে নিয়ে ওঁর মাতামাতি দেখতে বেশ লাগে। জান তরুণ, নিজের স্ত্রীকে, নিজের সন্তানকে তো সবাই ভালোবাসে। কিন্তু যখন আর পাঁচজনে ওদের ভালোবাসে তখনই তো সত্যিকার সার্থকতা।

তরুণ কোনো জবাব দেয় না। অ্যাম্বাসেডর ব্যানার্জির হৃদয়বত্তা মুগ্ধ করে ওকে।

তাছাড়া আর একটা দিক আছে। যারা অন্যের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে ভক্তি করে, শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে, স্নেহ করে, তাদের মহত্ত্বের কি তুলনা হয়?

ডিসআর্মামেন্ট কন্ট্রোল কমিশনের অধিবেশনে যোগ দেবার জন্য মিঃ ব্যানার্জি পরের দিন জেনেভা চলে গেলেন।

রীনার পনের দিনের ছুটি ফুরোতেও সময় লাগল না। মিশ্র আবার ফিরে পেলেন তার পুরনো দিনের যন্ত্রণা আর মদের বোতল। তরুণ ফিরে পেল তার ছন্দহীন জীবন।

পনেরটা দিন তরুণ শুধু দেখেছে মিশ্রের পাগলামি, আত্মভোলা মানুষটির অন্ধ স্নেহ। মনে মনে ভক্তি করেছে, শ্রদ্ধা করেছে ওই মাতালটিকে, যাকে একদল ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস বলে ডিবচ, স্কাউড্রেল এবং আরো কত কি!

টেলিভিশনের পর্দায় বেসবল খেলা নিয়ে অতগুলো লোকের হৈ-চৈ শুনতে বড় বেসুরো লাগল। সুইচটা অফ করে কোণার সিঙ্গল সোফাটায় চুপ করে বসে পড়ল তরুণ।

আকাশ-পাতাল চিন্তা এল মনে। আস্তে আস্তে চোখের স্বচ্ছ দৃষ্টিটা ঝাঁপসা হয়ে গেল। দুনিয়াটা ধোয়াটে, ঘোলাটে মনে হলো। ভাবতে ভাবতে কোথায় তলিয়ে হারিয়ে গেল ডিপ্লোম্যাট তরুণ সেনগুপ্ত। আস্তে আস্তে মনের পর্দায় কতকগুলো আবছা মূর্তি এসে ভিড় করল। কখন যে ভিড় সরিয়ে ইন্দ্রাণীর মূর্তিটা স্পষ্ট হয়ে দেখা দিল, তরুণ তা বুঝতে পারল না।

নিঃসঙ্গ তরুণ মাঝে মাঝেই এমনি দেখা পায় ইন্দ্রাণীর। মনে মনে কত কথা বলে, ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন দেখে। মাঝে মাঝে ওর ফাঁকা ফ্ল্যাটে এমন চিৎকার করে যে পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস রজার্স না ছুটে এসে পারেন না।

সেনগুপ্টা! অয়ার ইউ শাউটিং টু সামবডি?

লজ্জিত তরুণ বলে, আই অ্যাম সরি মিসেস রজার্স। সরি হবার কিছু নেই, তবে তুমি তো ভীষণ চুপচাপ থাকো। তাই হঠাৎ তোমার চেঁচামেচি শুনে…

সেদিন বোধহয় রজার্স পরিবার কোথাও বাইরে গিয়েছিলেন তাই মিসেস রজার্স ছুটে এলেন না। বাজারের আওয়াজ শুনে তরুণের চিৎকার থেমে গেল। তারপর দরজা খুলে যাকে দেখল, তিনি মিঃ মিশ্র।

তুমি ইন্দ্রাণীকে এত ভালোবাস?

তরুণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মিঃ মিশ্রের প্রশ্নের কি জবাব দেবে সে? চুপ করে রইল।

মিঃ মিশ্র তরুণের কাঁধে দুটি হাত রেখে একটু ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, এত ভালোবাসা তোমার মধ্যে চাপা আছে? আমি তো বোতল বোতল মদ খেয়েও ওই অমলার মুখোনা ভুলতে পারি না। তুমি তো আমার মতো মাতাল নও কিন্তু কি করে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত এই জ্বালাকে চেপে রাখ তরুণ?

তরুণ এবার মুখ তুলে জানতে চায়, আমি কি খুব বেশি চিৎকার করছিলাম?

মিশ্রের মুখেও হাসির রেখা ফুটে ওঠে। চল, চল, ভিতরে গিয়ে বসা যাক।

তরুণের পিছনে পিছনে প্যাসেজ দিয়ে ড্রইংরুমের দিকে এগুতে এগুতে মিশ্র বলেন, আমি মাঝে মাঝে একলা থাকলে চিৎকার করে অমলাকে কত কথা বলি।

তাই বুঝি?

ড্রইংরুমে বসার পর মিশ্র বললেন, অমলা মারা গেলেও হারিয়ে যায়নি আমার জীবন থেকে, মন থেকে। কথা না বলে থাকব কেমন করে বলো?

হঠাৎ মিশ্র পাল্টে গেলেন। যাকগে, ওই হতচ্ছাড়ী বোকা মেয়েটার কথা বলতে গেলেও আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বাদ দাও ওসব। গিভ মী এ গ্লাস অফ স্কচ।

দু গেলাস স্কচ নিয়ে এলো তরুণ।

মিশ্র স্কচের গেলাসটা তুলে ধরে বললেন, ফর অ্যান আর্লি অ্যান্ড হ্যাপি রি-ইউনিয়ন অফ। টরুণ উইথ হিজ ইট্যারনল লাভার ইন্দ্রাণী!

হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠল। সেন্টার টেবিলে গেলাসটা নামিয়ে রেখে তরুণ এগিয়ে গিয়ে টেলিফোনটা তুলে ধরে বলল, সেনগুপ্টা হিয়ার।…কে? মালকানী? ইয়েস, খবর কি?

মালকানীর কথা শুনে তরুণ বলল, এক্ষুনি মেসেজ এলো? দ্যাটস অল? থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।

টেলিফোন নামিয়ে রেখেই তরুণ মিশ্রকে জানাল, মালকানী জানাল এক্ষুনি মেসেজ এসেছে আমাকে বার্লিনে ট্রান্সফার করা হয়েছে।

মিশ্রও গেলাসটা নামিয়ে রাখলেন। তাহলে তুমি চললে!

তরুণ দৃষ্টিটা একটু ঘুরিয়ে নিয়ে কি যেন ভাবছিল।

এমার্সনের Conduct of Life পড়েছে তো নিশ্চয়ই। মনে পড়ে সেই লাইনটা?

তরুণ জবাব দেয় না, চুপ করে বসেই রইল।

মিশ্রও উত্তরের অপেক্ষা না করে আপন মনে আবৃত্তি করল,

He who has a thousand friends
has not a friend to spare.

একটু চুপ করে স্কচের গেলাসে এক চুমুক দিল! আমারও হয়েছে তাই।

এবার তরুণ একটু হেসে গেলাসটা তুলে নিল। এক চুমুক দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিল। এমার্সন তো ওমর খৈয়ামকে বেস করেই ওই কথা লিখেছেন। ওমর খৈয়ামের আরো কটা লাইন মনে পড়ছে–

মিশ্র কোনো কথা না বলে আবার এক চুমুক খেয়ে চেয়ে রইল তরুণের দিকে।

তরুণ আবৃত্তি করল :

The moving finger writes; and having writ
Moves on : not all our Piety nor Wit
Shall lure back to cancel half a line.
Nor, all our Tears wash our a Word of it.

ঠিক বলেছ তরুণ, ডিপ্লোম্যাট হয়েও স্বীকার করতে বাধ্য হই যে সব কিছুই যেন বিধির বিধান।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *