উড়োজাহাজ

উড়োজাহাজ

অনেক ওপর দিয়ে মন্থর এক এরোপ্লেন উড়ে যায়। পুরোনো আমলের উড়োজাহাজ, ঘুমপাড়ানি গানের মতো তার শব্দ, সেই শব্দে আকাশ পেরোনোর ক্লান্তি। অনেক সময় নিয়ে সে তার অনন্ত পথ অতিক্রম করতে থাকে। কুয়াশার আকাশে তার আবছায়া চিহ্নটি একবার দেখা গিয়েছিল। তারপর মিলিয়ে গেল। কিন্তু তার শব্দটা আসতে থাকল। আসতেই থাকল।

উড়োজাহাজ দেখার মধ্যে আর মজা নেই। এখন কাকপক্ষীর মতো কত উড়ে যায় আকাশ দিয়ে, নিষ্ঠুণহরি চোখ তুলে দেখে না। কিন্তু এটা দেখার চেষ্টা করল সে। কারণ, শব্দ শুনে মনে হয়েছিল, এ হচ্ছে বুড়ো–সুড়ো এক এরোপ্লেন। আকাশের গরুর গাড়ির মতো ধীরে চলা। উড়োজাহাজ, তার যৌবন সময়ে যে শব্দ পেয়ে ছেলেবুড়ো ঘর ছেড়ে মাঠেঘাটে দৌড়ে আকাশমুখো চোখ তুলে হাতের পাতায় রোদ আড়াল করে চেয়ে থাকত।

নির্গুণহরি আবছা প্লেনটাকে একবার দেখল। দেখা পেল না ঠিক। কাকতাড়ুয়ার মতো দু’দিকে ছড়ানো দুই সটান হাত, আর কেলেহাঁড়ির মতো মাথা, একটা লম্বা শুটকো শরীর–এই রকম একটা ভূতুড়ে ছায়া কুয়াশা থেকে কুয়াশায় ডুবে গেল। একটা চোখে ছানি কাটা আর একটায় আসছে। পৃথিবীতে দেখারও আর বেশি কিছু নেই। সংসারে শান্তি না থাকলে…

বাঁ-হাতে সিগারেটের তামাক জলকাগজে পাক খাওয়াবে নির্গুণহরি, সেই সময়ে উড়োজাহাজাটা গেল। চোখ নামিয়ে আবার পাকানোর চেষ্টা করতে লাগল সে। বিড়বিড় করে বলল –সংসারে শান্তি না থাকলে…শুয়োরের বাচ্চা…

ডানহাতটা একবার সুমুখে তুলে ধরে দেখে সে। হাতটা কাঁপে। অনবরতই গত চার পাঁচ বছর ধরে কেঁপেই যাচ্ছে। ফলে তামাকটা কাগজে পাক খাওয়ানোর ব্যাপারটা কত জটিল হয়ে গেছে এখন! হাতটাকে কত কী গালমন্দ দেয় সে, কিন্তু শালা নিজের মতো কেঁপেই যায়। কেঁপেই যায়। ফলে এখন নির্গুণহরি বাঁ-হাতেই দেশলাই জ্বালা শিখেছে, বাঁ-হাতেই সই সাবুদ করে, টিপ ছাপ দেয়, বাঁ-হাতেই হেঁসে ধরে গরুর ঘাস নিড়িয়ে আনে, কুয়োর বালতি টেনে তোলে। অভ্যেস। সংসারে নানা অশান্তি, তার ওপর এই ডানহাতটা…

হাতটাকে ফের আর একবার শুয়োরের বাচ্চা বলে গাল দেয় নির্গুণহরি। তারপর সিগারেট পাকানোর মতো সহজ বহুদিনের অভ্যস্ত কাজটা আর একবার চেষ্টা করতে থাকে। কেনা সিগারেটের তামাক নরম, নইলে কবে এই সিগারেট পাকানোর নেশা ছেড়ে দিত সে। সিগারেটের প্যাকেট কিনে ফসফস একটার পর একটা ধরাত। কিন্তু সিগারেটটাই তো নয়, তামাকটা কাগজে পাক খাওয়ানাটাও একটা নেশা। আগে নির্ণহরি চমৎকার নিটোল পাকানো সিগারেট তৈরি করত। একধারটা মোটা, একধারটা সরু। তামাকটা এমন মিহি করে ডলে নিত যে আগুন ধরালে সহজে নিবত না। সরু ধারটা ঠোঁটে ধরে টানলে ধোঁয়া বেরিয়ে আসত। বহুদিনের অভ্যেস!

অনেক কষ্টে সিগারেটটা পাক খেল। থ্যাবড়া দেখতে হল। জিব বুলিয়ে আঠা জুড়ে চেয়ে দেখল নির্গুণহরি। থুথুটা বেশি লেগে জ্যাবড়া হয়ে গেছে। ভেজা ভেজা। এর চেয়ে ভালো এখন আর ভাবা যায় না। শালার ডানহাতটা…।

সিগারেট ধরিয়ে উঠল নির্ণহরি। উঁচু বাঁধের মতো কর্ড লাইন পড়ে আছে, নিস্তেজ আলোয় দু-ফলা ইস্পাত ঝিকোচ্ছে। খাটালের দুটো মোষ নির্ভয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে লাইন। ওপাশে জলা, সেইখানে ডুবে থাকবে। ভাবতেই শীত করে ওঠে। নির্গুণহরি মাথার উলের টুপিটা টেনে নামায়, সতর্ক হাতে গলায় ফাঁস দেওয়া কম্ভর্টারটা দেখে নেয়। গায়ে কোট, পায়ে মোজা তবু শীতটা ঠিক শরীরে ঢুকে পড়ে। এই হচ্ছে বুড়ো বয়েস।

নির্গুণহরি দাঁড়িয়ে কোন ধারটায় যাবে তা একটু চিন্তা করে নেয়। ছেলেটা যে কোথায় কোন রাস্তায় পড়ে আছে তা বলা মুশকিল। কিন্তু কাছে–পিঠেই আছে কোথাও। কাল রাতে বাড়ি ফেরেনি। কিন্তু তার জন্যে দুশ্চিন্তা নেই তার। বাড়ি না ফিরলেও বেঁচেই আছে। প্রায়দিনই নেশা করে। তবু ছেলের মা সারারাত ঘুমোতে দেয় না। রাত না পোয়াতেই ঠেলে বের করে দেয়, ছেলে খুঁজে আনো আগে, তারপর অন্য কথা। ছেলে না পেলে আমি কুরুক্ষেত্র করব….

ছেলে প্রতি রবিবারই পাওয়া যায়। রাস্তায় ঘাটে পড়ে থাকে। নির্গুণহরি দেখতে পায়, কিন্তু কুড়িয়ে নেয় না শুধু নজর রাখে। সতুয়ার চায়ের দোকানে বসে ভাঁড়ে চা খেতে-খেতে খবরের কাগজ দেখে। হিন্দি কাগজ, নিষ্ঠুণহরি ভাষাটা জানে না। তবু পড়বার চেষ্টা করে। ফাঁকে-ফাঁকে নজর রাখে, উঠে গিয়ে ছেলের আশেপাশে ঘুরে আসে, কুকুর-টুকুর কাছে পিঠে থাকলে তাড়িয়ে দেয়। মুখের কাছে প্রায়দিনই বমির স্তূপ দেখা যায়, তার ওপর নীল মাছির ভিড়। সেগুলোও  ঝাঁপটা মেরে উড়িয়ে দিয়ে আবার সতুয়ার দোকানে এসে বসে। চা খায়। দুর্বোধ্য হিন্দি কাগজটা চোখের সামনে তুলে চেয়ে থাকে। তখন তার ডানহাতটা কাঁপে। কখনও চা চলকে পড়ে ছ্যাঁকা। লাগে। নির্গুণহরি গাল দেয়–শুয়োরের বাচ্চা।

হাতটাকে দেয়। ছেলেটাকে দেয়। জগৎ সংসারকে দেয়।

উড়োজাহাজটা এতক্ষণে কত দূর চলে গেছে? তবু শব্দটা গড়িয়ে-গড়িয়ে আসছে ঠিক। মুছে যাচ্ছে না। হাঁপিয়ে গেছে বুড়ো উড়োজাহাজটা। আকাশটা তো কম বড় নয়। সেটা পেরোতে আরও কত সময় চলে যাবে।

নির্গুণহরি নিশ্চিন্দার রাস্তা ধরে এগোল। মুখের শ্বাসের সঙ্গে ধোঁয়ার মতো ভাপ বেরিয়ে যাচ্ছে। সিগারেটের গোড়াটা মুখের লালায় ভিজে নেতিয়ে গেছে। কটু স্বাদ পায় সে। তামাকের আঁশ জিব থেকে থুঃ করে ছিটকে ফেলে ধ্যাবড়া সিগারেটটার দিকে তাকায়। নিবে গেছে। আবার ধরায়। কাশে, হাঁটে।

সতুয়ার দোকানে পশ্চিমা কুলি কামিনদের মেলা বসে গেছে। ভাঁড়ের চা সাত পয়সা। গুড় দেওয়া। আর তিন পয়সা বেশি দিলে কাপে চিনি–দেওয়া চা পাওয়া যাবে। স্বাদ একই, আট টাকা। কিলো দরের চা আর শুকনো পেয়ারা পাতায় কোনও তফাত নেই।

নগেনের ডিসপেন্সারি পেরিয়ে মাকালতলার রাস্তায় পা দিতেই ছেলের দেখা পেয়ে গেল নির্গুণহরি। গায়ে লাল সাদা ডোরাওলা শার্টটা বাহার দিয়েছে। এক ঠ্যাং সোজা পড়ে আছে, অন্য ঠ্যাংটা শোয়ানো, ঠ্যাঙের ওপর ভাঁজ করা। উপুড় হয়ে হাতের খাঁজে মাথা রেখে শুয়ে আছে ছেলেটা। মাথা ঘিরে মাছি। ধুলোর মধ্যে মুখ। মরেনি। শ্বাস বইছে, ওঠানামা করছে পিঠ। আশপাশ দিয়ে বাজারমুখো রাস্তায় লোকজন যাচ্ছে, আসছে, গা করছে না। পরিচিত দৃশ্য। নিষ্ঠুণহরি এগোল। কাছাকাছি এসে একটু নুয়ে দেখল। কালো রোগাটে–রোগাটে চেহারা, চোয়াল। ভাঙা, মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় জড়িয়ে একবার কানের ওপরটা ফেঁসে গিয়েছিল। সেই দাগটা দেখা যাচ্ছে। ছেলেটা তারই। মমতাভরে একটু চেয়ে থাকে নির্গুণহরি। নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছে করে। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। রাতের হিম শরীরটা কেমন ঠান্ডা মেরে গেছে।

কিন্তু ছুঁল না। উঠে দাঁড়াল। উড়োজাহাজটা এখনও যাচ্ছে। আশ্চর্য! শব্দটা কোন দিগন্ত থেকে অস্পষ্ট ভেসে আসছে এখনও?

ফিরে এসে মোড় ঘুরে সতুয়ার দোকানে ঢুকল নির্গুণহরি। পশ্চিমাদের ভিড়ের একপাশে বসল। খবরের কাগজটা ভাগ-ভাগ হয়ে গেছে হাতে হাতে। একটা পাতা পড়ে ছিল। নির্গুণহরি তুলে নিল পাতাটা। ভারী দুর্বোধ্য ভাষা। তবু অক্ষর চিনে-চিনে পড়বার চেষ্টা করতে লাগল। অ্যালুমিনিয়ামের বড় মগে চামচে নেড়ে চায়ের কাথ গুড় আর দুধে মেশাচ্ছে সতুয়া। শীতের সকালে চায়ের লিকারের গন্ধটি বড় ভালো লাগে। নির্গুণহরি নিশ্চিন্তে অপেক্ষা করতে থাকে।

পশ্চিমাদের ভিড়ের পিছনে নগেনের কম্পাউন্ডের বনবিহারী তার কৌটোটি র‍্যাপারে ঢেকে কুঁজো হয়ে বসেছিল। মুখখানা তুলে বলল –দাদা যে?

নির্গুণহরি চিনতে পেরে হাসল–বনবিহারী? অনেককাল দেখি না?

–কোথায় বেরিয়েছেন সকালে? ছেলে খুঁজতে?

–হু।

–পেলেন?

–পেয়েছি। তোমার কোলে চাদরে ঢাকা ওটি কে? বাচ্চা নাকি?

বনবিহারী হেসে ফেলেনা, বাচ্চা নয়, বাচ্চার ফুড। আজকাল পাওয়া যায় না। অনেক কষ্টে জোগাড় হল নিয়ে যাচ্ছি।

কৌটোটা চাদরের তলা থেকে বের করে দেখায় বনবিহারী। নির্গুণহরি দেখে ভ্রূ কোঁচকায়–মায়েদের বুকে আজকাল দুধ হয় না কেন হে? সব আমড়া–আঁটি হয়ে যাচ্ছে!

–কী জানি দাদা। সেটাই ভাবি। আমরা তো মায়ের দুধ খেয়েই…

–খুব অবাক কাণ্ড। কারও বুকে দুধ নেই, এ কী করে হয় ভেবেছ?

–ভাবছি।

ভাবো, খুব ভাবো। ভেবে বের করে ফেল। এ ভালো কথা নয়।

বোধহয় ভাবনার জন্যই বনবিহারী র‍্যাপারের ভিতরে আবার কৌটো ঢেকে কুঁজো হয়ে বসে। হাতে সাত পয়সার ভাঁড়ের চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ মিটমিট করে। শিশুর মতো আদরে পরিপাটি আঁকড়ে ধরে কোলের বেবিফুডের কৌটো।

নির্গুণহরি হিন্দি কাগজটার পাতার দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশ থেকে এখনও একটা এরোপ্লেনের গুনগুন শব্দ ঝরে পড়ছে। কেউ না শুনুক নির্গুণহরি ঠিক শুনতে পায়।

.

বুকে কফের ঘড়ঘড় শব্দের মতো আওয়াজ তুলে উঁচু দিয়ে এরোপ্লেন উড়ে যায়।

ধুলো থেকে চোখ তুলে চেতন দেখল, আকাশময় এক সাদা আলোর বল। এরোপ্লেনটা দেখতে পায় না চেতন। আলোটা ফটাস করে চোখে কামড়ায়, মাথা তুলতেই ঝিনন করে একটা বিদ্যুৎ স্পর্শ করে তাকে। মাথার ভিতরে ফেটে পড়ে একটা রঙের বোমা। নানা রঙের ঢেউ মাথাটা ভাসিয়ে নেয়। আবার ধুলোয় মাথাটা রেখে দেয় চেতন। চারদিকটা এখনও স্পষ্ট নয় তার কাছে। সেই আবছা চেতনায় একটা বুড়ো উড়োজাহাজের আকাশ পেরোনোর দূর শব্দ আসতে থাকে।

কিছুক্ষণ চুপ করে পড়ে রইল চেতন। চোখ বুজে থাকলেও তার সাড় ফিরে আসছে। বুকের নীচে মাকালতলার কাঁচা রাস্তা, শরীর ঘেঁষে লোকজনের পা যায় আসে। রবিবারই হবে আজ, কাল যখন শনিবার ছিল, কাল রাতে রিকশাওয়ালাটা তাকে ঢেলে দিয়ে গেছে এইখানে। রিকশাওয়ালাটার তেমন দোষ নেই, নয়া আদমি, চেতনের বাড়ি তার চিনবার কথা নয়, তবু অনেক রাত পর্যন্ত ঘুরে-ঘুরে খুঁজেছে, তারপর ঢেলে দিয়েছে রাস্তায়। চেতনের মনে পড়ে উঁচু রিকশা থেকে ধাক্কা খেয়ে সে পড়ে গেল শক্ত মাটির ওপর। কিন্তু লাগেনি। ভেসে-ভেসে পড়েছিল।

চোখ মিটমিট করে নিজেকে একটু দেখল সে। পায়ের চপ্পলজোড়া ঠিক আছে, টেরিকটনের ওলিভ গ্রিন প্যান্টটা কেউ খুলে নেয়নি, পায়ে লালমোজা, ডোরাওলা জামা, জামার নীচে সোয়েটার–সবই ঠিক আছে। গায়ে ধুলো লেগেছে খুব। মুখের এক ফুট দূরে তার বমির ওপর মাছি জমাট বেঁধে আছে। সাড় ফিরে আসতেই কম্প দিয়ে একটু শীত করে তার। কুয়াশার জন্য রোদ এখনও তেমন তেজাল নয়। সারা রাতের হিমে শরীরটা ভিজে আছে। উঠে পড়ল চেতন। ঠিক ওঠা নয়, নিজেকে দাঁড় করানো। ভারী কসরতের ব্যাপার এসব সময়ে। হাত কাঁপে, পা ঠিক থাকে না, মাথাটাকে দু’হাতে ঘটের মতো ধরে জায়গামতো রাখতে হয়। পেচ্ছাপে তলপেটটা ভারী। মাকালতলার রাস্তার ধুলো এক পোঁচ জিবে উঠে এসেছে। থুথু ফেললে কাদাগোলা রং দেখা গেল।

নগেন ডাক্তারের ডিসপেন্সারির দেওয়ালে বিচিত্র একটা নকশা কেটে পেচ্ছাপ করল চেতন, এক হাত বাড়িয়ে দেওয়ালটায় ভর রেখে। তলপেটটা কেমন টনটন করে এখনও। শরীরটা আরও একটু দুর্বল লাগে।

চেতন জানে, তার বাপটা বসে আছে সতুয়ার দোকানে। বাপের এই বসে থাকাটা ভারী বিরক্তিকর। এসব সময়ে বাপটাপ কাছে এলে একরকমের অসোয়াস্তি হতে থাকে। বাপ আছে  তো আছে, বাপগিরি পাঁচজনকে দেখানোর কী? প্রেস্টিজ নেই?

দেওয়ালটা ধরে-ধরেই চেতন মোড় পর্যন্ত আসে। রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে হাতে ইশারা করে। একটা রিকশা এগিয়ে আসে। গাছে চড়ার মতো কষ্টে রিকশার সিট পর্যন্ত উঠবার চেষ্টা করতে গিয়ে টের পেল কে যেন তার বাঁ-হাতের কনুয়ের ওপর ধরে তাকে উঠতে সাহায্য করে। মুখ ফিরিয়ে দেখল, নির্গুণহরি–তার বাপ।

–আঃ, তুমি আবার ধরছ কেন? আমিই পারব। যাও—

নির্ণহরি পিছিয়ে যায়।

–সোজা বাড়ি যাস, বুঝলি? নিষ্ঠুণহরি চেঁচিয়ে বলে দিল।

ফালতু কথা। আর কোন চুলোয় যাওয়ার আছে! কথা না বলেই মুখটা ফিরিয়ে নেয় চেতন। বাপটাপগুলো হচ্ছে এক একটা গেরো।

রিকশাটা দুকদম এগোতেই কাঁচা রাস্তার গর্তে ঝকাং করে ঝাঁকুনি খেল। মাথার ভিতরে আর একটা রঙের বোমা ফেটে রামধনুর রং ছড়াল। নিজের পকেটগুলো একবার হাতিয়ে নেয় চেতন। ফরসা। রাতে রিকশাওয়ালাটা কিংবা অন্য কেউ হিস্যা নিয়ে গেছে, অনেকেরই গত-জন্মের বিস্তর পাওনা আছে চেতনের কাছে। সবাই নেয়। বেশি যায়নি। সত্যিকারের মাতাল কখনও বেশি

পয়সা পকেটে নিয়ে বেরোয় না। বাড়ি ফিরলে রিকশার ভাড়ার জন্য চিন্তা নেই। মা মিছরি ভিজিয়ে রেখেছে। দাদামশাইয়ের একসেরি কাঁসার গ্লাস ভরে দেবে। চেতন চোখ বুজে রইল। পাতকোটায় পোকা হয়েছে। সাদাটে পোকার খোসায় বিজবিজ করে বালি ওঠে। দশটা কই মাছ ছাড়া হয়েছে, চুন আর পটাস দেওয়া হয়েছে। কিছু হয়নি। খাওয়ার জল বাইরে থেকে আনতে হয়।

পাথরবাটিতে মিছরি ভেজানো আছে। দাদাশ্বশুরের দিয়ে যাওয়া একসেরি কাঁসার গ্লাসটা মেজে ঝকঝকে করে রাখা হয়েছে। টাটকা জল আনলে বত হবে।

–বউ, গেলি? শাশুড়ি চেঁচাচ্ছে ঘর থেকে।

–যাই। মিনতি পুবের জানালার ধারে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উত্তর দেয়। হাতে পাউডারের পাফ। মোছা-মোছা করে একটু দিয়ে নেবে মুখে। চুল আঁচড়ে নিয়েছে। ধোঁয়াটে আয়নাটার ওপর ঝুঁকে মুখখানা দেখছিল মিনতি। কালো কুচ্ছিৎই বলা যায় তাকে, চিরকালই সবাই তাই বলেছে। ইদানীং কি একটু জেল্লা লেগেছে তার? চোখের কোল আর তেমন বসা লাগে না তো! রংটা মাজা মাজা হয়েছে যেন একটু! আর জ্বর মাঝখানে একটা কুমকুমের টিপ বসিয়ে নেয় সে।

–কখন থেকে তো যাই–যাই করছিস। ছেলেটা হ–ক্লান্ত হয়ে এসে পড়বে এখখুনি। বাসি জল মেটে কলসিতে পাথর হয়ে আছে, মুখে দিলে দাঁত নড়ে যায়। পা চালিয়ে যা—

–যাই। উত্তর দেয় মিনতি। তবু তার তাড়া নেই। সামনের চুলগুলো হাতের তেলোয় চেপে কপালটা একটু ঢাকবার চেষ্টা করে সে। উঁচু কপাল তার, সহজে ঢাকা পড়ে না। কী ভেবে কাজললতা খুলে চোখের কোলে একটু টেনে দেয়। খুব বেশি সাজগোজ হয়ে গেল নাকি? ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মুখখানা দেখে। মণ্ডলদের বাড়ির কলে জল আনতে গেলে আজকাল মেস-বাড়ির মোটা পুলিশটা তার সঙ্গে যেচে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে। ভাবতেই একটা আনন্দের গুরুগুরুনি ওঠে বুকে। সে খুব কুচ্ছিৎ হলে কি হত এরকম?

সে সাজগোজ করলে শাশুড়ি রাগ করে না, বরঞ্চ খুশি হয়। ভাবে ছেলেকে মজাতে বউ সাজছে। বয়ে গেছে মিনতির। চেতন দেখে নাকি মিনতিকে? কোনওদিন দেখেছে? বিয়ের আগে মিনতি তার কেপ্পন দাদার সংসার আগলাত। গোটা দশেক গরু, পাঁচ সাত বিঘে ধানজমির মালিক তার দাদা পয়সা খরচের ভয়ে বোনের বিয়ের নামও করত না। সেসময়েই এক দোলের দিনে দাদার সিদ্ধি-গেলা একপাল বন্ধু গিয়ে রং মাখিয়েছিল। চেতনের হাতে ছিল রুপোলি তেলরং, লঙ্কা বাটা মেশানো। সেই রং মুখে চোখে ডলে দিয়েছিল খুব। কী কান্না মিনতির! সেই দেখে নেশার ঝোঁকে তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল চেতন। ওর বাপ-মা রাজি হয়নি বিয়েতে। চেতন তখন আর একদিন গভীর নেশা করে পুরুত আর জনকয় বাজনদার আর-এক পাল বন্ধু নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে আনল তাকে। দাদার এক পয়সা খরচ হয়নি। বিয়ের পর মিনতি শ্বশুরবাড়ি রওনা হল–সামনে হ্যাজাক উঁচু করে ধরে একজন হাঁটছে, তার পেছনে রোগা রোগা কয়েকজন বাজনদার ট্যাং টাং করে বাজনা বাজাতে-বাজাতে চলেছে, পিছনে রিকশায় মাতাল চেতনের পাশে কাঠ হয়ে বসে মিনতি। শ্বশুরবাড়িতে কেউ নতুন বউ বরণ করেনি, বরঞ্চ কান্নার রোল উঠেছিল। হিন্দ মোটরের হাতুড়ে চেতন বিড়বিড় করে বলছিল–মালটা যখন এনেই। ফেলেছি তখন তুলেই নাও না। বিয়ে তো করতুমই…

ওকে বিয়ে বলে না। সঠিক বিয়ে মিনতির আজও হয়নি। তবু তার শ্বত্রবাড়ি আছে। শ্বশুর শাশুড়ি দেওর আছে–এ বড় আশ্চর্য!

বালতি আর কলসি নিয়ে বেরোনোর সময়ে খুড়িশাশুড়ির উঁচু গলা শুনতে পায় মিনতি।

–দেখে নাও, নড়া ব্যথা করে সাত সকালে বারান্দা মুছেছি, কাদা মেখে নোংরা করে দিয়ে গেল, শত্তুরের বারান্দা যে…

বাড়িটা ভাগ ভাগ হয়ে গেছে। তিনটে ভিটে জুড়ে ব্যারাকবাড়ির মতো, উঠোন একটা, কুয়ো পায়খানাও একটা করে। হাঁড়ি আলাদা। লেগে যায় প্রায়ই।

দেওর রতন বারান্দায় মাদুর পেতে পড়তে বসেছিল। মাদুরটা তেমনি পড়ে আছে, বই খোলা। সে নেই, একটু আগে বড়–বাইরে সেরে এসে কুয়ো পাড়ে হাত মুখ ধুচ্ছিল, দেখেছে। মিনতি। বোধ হয় কাটা ঘুড়ি ধরতে ওই অবস্থায় ছুটে গেছে খুড়ির বারান্দা দিয়ে ভিজেপায়ে। উঠোনের ধুলোর ছাপ ফেলে গেছে।

শাশুড়ি কুয়োপাড় থেকে ডাল ধুয়ে গামলা হাতে বারান্দায় উঠছিল, তাকে দেখে থমকে বলল  –এতক্ষণে সময় হল? ছেলেটা সারারাত বাইরে, চিন্তায় মরি, তোদের প্রাণে ফুর্তি দেখলে মরে যাই! হাঁদানে ছেলেটা এসে পড়বে…বলতে-বলতে গলা নামিয়ে বলে–কে উঠেছিল রে ও বারান্দায়?

–রতন বোধহয়।

–আন্দাজে বলিস না, বলি দেখেছেটা কে? বলেই গলা চালায় শাশুড়ি বলি কার পা সারা বারান্দায় ছাপ ফেলেছে তা কি কেউ গজ ফিতে নিয়ে মেপে দেখেছে নাকি…

গোলমাল থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল মিনতি। একটু হাঁটলে দুগগাপুরের সদর রাস্তা। সেটা পেরিয়ে মণ্ডলদের বিশাল বাড়ি, সতেরো ভাড়াটের হাট। এ অঞ্চলের জল ভালো না। লোহার গন্ধ, ঘোলা, তার মধ্যে মণ্ডলদের বাড়িতেই যা ভালো জল ওঠে। কুয়া দুটো, টিউবওয়েলে পাড়াপড়শি অনেকেই জল নেয়।

নীচের তলায় পুলিশদের মেস। আসল পুলিশ নয়, এরা হচ্ছে কর্ডনিংয়ের পুলিশ, চোর ধরে। মোটা পুলিশটার নাম বিজয় সোরেন। ভুড়ির নীচে বেল্ট বাঁধে, গোঁফের ডগায় মোম লাগায়। অবিকল পশ্চিমা মনে হয়। কথাও বলে ওই রকম টানে–বুঝলে হে চেতনের বউ, এবার যখন চেতনকে তুলে লিব, আর ছাড়ব না, মাতালটাকে বুঝিয়ে দিও। রোজ রাতে শালাদের ডানা গজায়। জায়গাটা মাতালের হাট বানিয়ে দিয়েছে। তোমরা আটকাতে পারো না?

পুলিশের পোশাক পরলে ভারী চমত্তার দেখায় বিজয় সেরেনকে। লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা থাকলে নিরীহ ভালোমানুষ মনে হয়। দেখা হতেই হাসল মিনতি।

বিজয় সোরেন চোখ নামিয়ে বলে–চেতনটা কোথায়? ফিরেছে?

–তার খবর কে রাখে?

বিজয় সোরেন একটু গম্ভীর হয়ে গেল। আবার ফিক করে হেসে বলে–কাল বাদলপাড়া। থেকে ফিরতে রাত হয়ে গেল, কুমোরপট্টির ভাঁটিখানায় দেখি একটা মাতাল আকাশের দিকে চেয়ে বসে আছে। সবজিওয়ালা নিধে, জিগ্যেস করলাম, করছে কী? বলে, চেতন এইমাত্র আকাশে উড়ে গেল, এইবার নেমে আসবে।

খুব হাসল বিজয় সোরেন।

পুরুষমানুষের সামনে টিউবওয়েল পাম্প করতে লজ্জা করে। শরীরটা লকড়পড় করে তো। কিন্তু বিজয় সোরেন ওই যে মোড়া পেতে বারান্দায় বসেছে, আর নড়বে না। মিনতি জল নিয়ে গেলে উঠবে, ভাবতে একটু রাগ মেশানো শিহরণ বোধ করে মিনতি। তেমন কুচ্ছিৎ সে এখন আর নয়!

শাড়িটা শক্ত করে জড়িয়ে সে টিউবওয়েলের হাতলটা ধরল। বড় শক্ত হাতল। কষ্টে পাম্প দিতে থাকল। কপালের ওপর চুল উড়ে আসছে। মাঝে-মাঝে চোখে পড়ছে বিজয় সোরেনকে,

একটু চোখাচোখি, একটু আধটু হাসির ছিটে। বড় ভালো লাগে মিনতির।

–এবার যখন ধরব চেতনকে, ছাড়ব না, বলে দিও।

মিনতি ঠোঁট উলটে বলে–ইস! চাল ধরা পুলিশের ক্ষমতা জানা আছে।

বিজয় সোরেন হাসে-ক্ষমতাটা দেখবে একদিন, দেখবে।

–আচ্ছা, জানা আছে।

বাঁ-কাঁখে কলস, ডান হাতে বালতি। জল চলকে পড়ছে ছপছপ। মিনতি দুলকি পায়ে সদর রাস্তা পার হয়ে চক্রবর্তীদের ভাঙা মন্দিরের চাতালে পড়ল। বালতিটা নামিয়ে দম নিল একটু। কাঁখ বদলাবে। ঠিক সেই সময়ে এরোপ্লেনটা এল। অনেক উঁচু দিয়ে কুয়াশার ভিতর একটা ছায়া ধীরে উড়ে যাচ্ছে।

মিনতি কপালের চুল সরিয়ে ঘাড়ের ওপর মাথা ফেলে মুখখানা সম্পূর্ণ আকাশে তুলে দেখল। ধীর, গম্ভীর শব্দ। মিনতি চেয়েই থাকে। ভাবে, একজন কালো চশমা পরা লোক এরোপ্লেনটা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার মাথায় টুপি, ফরসা রং, খুব অহঙ্কারী চেহারা। তার ঘর-সংসার নেই, খাওয়া পরার ভাবনা নেই। কেবল দিন রাত সে তার উড়োজাহাজ নিয়ে উড়ে যায়। উড়ে যায়।

আকাশ থেকে মুখ নামায় মিনতি। কলসটি কাঁখ বদলে নেয়। আবার হাঁটে, জল চলকে পড়ে ছপছপ। শাড়িটা পায়ের কাছে ভিজে যায়। শীত করে।

শাশুড়ি মাঝে-মাঝে তার দিকে সন্দেহের চোখে চেয়ে বলে–কুড়ির বুড়ি তবু বাচ্চা হয় না কেন রে? বাঁজা নোস তো?

মিনতি ঠোঁট ওলটায়। কে জানে! ধামার মতো পেট নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। মাগো! এই বেশ আছে মিনতি। চ্যাপটা শরীর। আর একটু চর্বি হলে চমক্কার গড়ন হবে তার। বাচ্চা কাচ্চার দরকার নেই। সে বড় ঝামেলা। একদিন সে উড়ে যাবে। বিজয় সোরেন কিংবা গগলস–পরা উড়োজাহাজের লোকটা কেউ না কেউ একদিন লুটে নিয়ে যাবে ঠিক।

.

ডাক্তাররা বলে বটে মাঝে-মাঝে জোলাপ নিতে। কিন্তু সেটা কোনও কাজের কথা নয়। নির্গুণহরি জানে, বয়সে মলভাণ্ডং না চালয়েৎ।

দুপুরে জল সরতে গিয়ে বেগ চাপল। কঠিন কোষ্ঠের মানুষ নির্গণহরির কাছে ভারী আনন্দের ব্যাপার সেটা। কদিন বুকটা পেটটা চাপ ধরে আছে। প্রেশারটাও ভালোনা।

গামছা পরে, বালতিতে জল নিয়ে গিয়ে দেখে পায়খানার দরজা বন্ধ।

বারান্দায় এসে ওই অবস্থায় বসে রইল নির্গুণহরি। দরজাটা খুলল না। ভিতরে থেকে থুথু ফেলার আওয়াজ আসছে। ছোটো বউ–টউ কেউ গিয়ে থাকবে। শ্বশুর, ভাসুর যাবে টের পেয়েছে, তাই ইচ্ছে করে বেরোচ্ছে না।

সংসারে শান্তি নেই। কাঁপা ডানহাতে অতি কষ্টে সিগারেটটা পাকিয়েছিল। জ্বলে–জ্বলে শেষ হয়ে গেল সেটা।

নিজেদের আলাদা ব্যবস্থা করার কথা প্রায়ই ভাবে নির্গুণহরি, কিন্তু ব্যবস্থা কি সোজা কথা! সেপটিক ট্যাঙ্ক ফ্যাঙ্ক বসাতে গুচ্ছের টাকা। ছেলেটা শুড়ির হাতে মাস মাইনের অর্ধেক তুলে দিয়ে আসে। অন্য বদখেয়ালও আছে। পাত্তিখেলার জো এসেছে গঞ্জে। সেদিকেও কিছু ঢালে নিশ্চয়ই।

বেগটা চলে গেল। আবার লুঙ্গি পরে ঘরে ফিরে আসে নির্ণহরি। দক্ষিণের জানলার ধারে বসে। নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছ চেতনের মা। গালে পানের ঢিবি। নির্গুণহরি ডানহাতটা তুলে ধরে চেয়ে থাকে। বিশ্বসংসারে সবাই বিশ্রাম নেয়, ঘুমোয় কিংবা চুপ করে থাকে। কেবল এই শুয়োরের বাচ্চারই বিশ্রাম নেই, ঘুম বা চুপ করে থাকা নেই। শালা নড়ছে তো নড়ছেই।

বিকেলের দিকে ঘুম ভাঙতে বালিশটা খাটের বাজুতে খাড়া করে উঁচু হয়ে শুয়েছিল চেতন। হাতে সিগারেট। পূবের জানালার কাছে ধোঁয়াটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজছে মিনতি। খুব মন দিয়ে সাজছে।

একপলক সেদিকে চেয়ে থাকে চেতন। খুব নেশার ঘোরেই বিয়েটা করেছিল সে, সন্দেহ নেই।

আলগা গলায় জিগ্যেস করল–অত সাজগোজ কীসের?

মিনতি ফিরে তাকালও না। বলল  কীসের আবার! এমনিই।

–এমনিই কেউ সাজে নাকি?

–মেয়েরা সাজে।

–কেন?

–ভালো লাগে?

–দূর ঢ্যামনা, এমনি সেজে কী হয়? গুচ্ছের পাউডার স্নো নষ্ট।

মিনতি ফুঁসে উঠে বলে–আমারটা নষ্ট হচ্ছে হোক। তোমার কী?

–বাপের বাড়ি থেকে ক’বাক্স রূপটান এনেছিলে? বড় বড় কথা।

মিনতি একটুও মিইয়ে যায় না। সমান তালে বলে–আর কী দাও শুনি? কেবল তো একটু স্নো, পাউডার।

চেতনের শরীরটা এ সময়ে বড় ঢিস মিস করে। ঝগড়া কাজিয়া ভালো লাগে না। হাই তোলে। দু-চারটে কথা কাটাকাটি হলেই মেরে বসবে, থাকগে।

–চা করো তো।

–মা করছে।

–কই, শব্দ পাচ্ছি না তো। মা উঠলে শব্দ পেতাম।

–উঠেছে। আমি দেখেছি।

–অ! বলে চুপ করে চেয়ে মিনতির সাজ দেখে সে। হতে পারে যে মিনতি আগের মতো রুক্ষ নেই। গা একটু মোলায়েম মনে হচ্ছে। একটু ভার–ভারিকও হয়েছে বোধহয়। কিন্তু তবু তেমন ছুঁতে ঘাঁটতে ইচ্ছে করে না। কার জন্য সাজে মাগিটা? কাউকে যদি পটাতে পারে তো খুশিই হবে চেতন। উড়ে যা পাখি, উড়ে যা। পিছু নেবে না কেউ, উড়ে যেতে দেবে। সংসারে যত টান কমে তত ভালো। সতুয়ার দোকানে গিয়ে বাপটা বসে থাকে তার খোঁয়াড়ি ভাঙার সময়ে। মা মিছরি ভিজিয়ে রাখে। বউটা সাজে, এসব একদম ভালো লাগে না। চেতনের কোথাও একটু নিশ্চিন্তে নিজের মতো গড়িয়ে থাকার উপায় নেই। বাড়িশুষ্টু লোক তোমার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে। তার চেয়ে উড়ে যা পাখি, উড়ে পুড়ে যা সব। যে যেখানে খুশি চলে যা। চেতন একাই থাকবে।

–বউ, চা নিয়ে যা। মা ডাকছে। মিনতি উঠে গেল।

উড়ে বেরিয়ে গেল ছুটির একটা দিন। কাল থেকে হপ্তা পড়ে যাচ্ছে, ছুটির দিনটা কেমন কুয়াশার মধ্যে কেটে যায়। ছুটি কেমন তা বুঝতে পারে না। যেমন বুঝতে পারে না বউ কেমন, বাবা কেমন, মা কেমন, কিংবা এই বাড়িটা কেমনধারা, বুঝতে না পেরে ভালোই আছে চেতন।

আয়না দিয়ে একপলক দেখেছিল মিনতি। সাজতে–সাজতে, দেখল অন্যমনস্ক চেতন তাকে গোগ্রাসে দেখছে। চেতন দেখছে। ভারী অবাক হল মিনতি। তবে কি সত্যিই সুন্দর হয়েছে আগের চেয়ে? ভাবতেই বুক গুরুগুরু করে উঠল তার। বিয়ের রাতে যেমনটা করেছিল।

চা আনতে উঠে গিয়েও মিনতি উত্তেজনাটা সামলাতে পারছিল না। তিন বছরের বিয়ে তাদের। তার মধ্যে শেষ আড়াই বছর চেতনকে নেশার মধ্যে ছাড়া কখনও দেখেনি মিনতি। নেশার মধ্যে কখনও-সখনও তাকে ঘেঁটেছে চেতন। জ্ঞান হলে তাকিয়ে দুপলক দেখেনি। এই প্রথম দেখল, ওইরকমভাবে।

একটা আনন্দ খিমচে ধরে তার বুক। যদি সে সত্যিই সুন্দর হয়ে থাকে, আর চেতনের যদি চোখ পড়ে যায় তবে হয়তো কী একটা কাণ্ড হবে! ভাবতেই ভালো লাগে। বিশ্বাস হতে চায় না।

শাশুড়ি বড় যত্নে পরিষ্কার কাপ প্লেটে চা করে দেয়। কাপের ধারে দুটি চিড়ের মোয়া।

চা হাতে সাবধানে ঘরে এসে ঢোকে মিনতি। উত্তেজনায় চা একটু চলকে যায় বুঝি! সাবধানে হাঁটে মিনতি। এক-পা, এক-পা করে বিছানার কাছে আসে। এসে নববধূর মতো মাথা নত করে দাঁড়ায়। এসব সময়ে কী করতে হয় তা তো জানে না। কিছু একটা হবে, প্রত্যাশা করে।

–চা নাও। কাঁপা গলায় বলে।

হাত বাড়িয়ে নেয় চেতন, উঠে বসে চা খায়।

মিনতি একটু দাঁড়িয়ে থাকে কাছে। তারপর ধীর পায়ে ফিরে যায় জানালাটার ধারে। সেখানে ধোঁয়াটে আয়না, তার সামনে সস্তা স্নো পাউডার।

মিনতি ঝুঁকে নির্লজ্জের মতো মুখখানা দেখে। সুন্দর কি না তা বুঝতে পারে না।

চেতন উঠে পোশাক পরছে। নেশা করতে যাবে। রোজ অবশ্য বেশি নেশা করে না, ঝুমঝুমে মাতাল হয়ে ঘরে ফেরে। বেশি নেশা করে ছুটির আগের দিন। সেদিন প্রায়ই ফেরে না। না ফিরুক, মিনতিও তাই চায়।

চেতন জুতো পরে বেরিয়ে গেল।

বাইরে শাশুড়ির গলা শোনা গেল–চেতন, বেরোচ্ছিস?

–হ্যাঁ।

–রাতে ফিরবি তো? বলে যানইলে ভাত নষ্ট।

–ফিরব।

চেতনের পায়ের শব্দ উঠোন পেরিয়ে গেল। জানালার ধারের আয়নার সামনে বসে আছে মিনতি। বিজয় সেরেনের কথা ভাবছে। কিংবা ভাবছে উড়োজাহাজের সেই কালো চশমা পরা যুবকটির কথা।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *