গ. গ্যালিলিওর ভুবনগুলো

গ. গ্যালিলিওর ভুবনগুলো

(এক্সট্রাক্ট, শুধু টেক্সট, বহিঃসৌরজগতে ভ্রমণকারীদের গাইড, ভলিউম, ২১৯.৩)

এমনকি আজকের দিনেও, এককালে যেটা বৃহস্পতি ছিল সেটার উপগ্রহগুলো মানুষের কাছে এক মহাবিস্ময়ের ব্যাপার। কেন কাছাকাছি আকৃতি ও একই রকম দূরত্বের হয়েও চার উপগ্রহে এত পার্থক্য?

শুধু সবচে ভিতরের উপগ্রহ আইওর ব্যাপারে একটা ব্যাখ্যা দেয়া চলে। বৃহস্পতির এত কাছে এটা যে ভিতরটা একেবারে গলিত। এমনকি উপরিভাগও আধা কঠিন। সব সময় দানব গ্রহের টানে ভীষণ জোয়ার হয় এখানে। এত বেশি অগ্নি উদগিরক, আগ্নেয়গিরিতে রা ভুবন সৌরজগতে আর নেই। আইওর মানচিত্রগুলোর অর্থ জীবন মাত্র কয়েক দশকের। ক্রমাগত পরিবর্তনশীল।

এমন ক্রমপরিবর্তনশীল পরিবেশে কখনো স্থায়ী মানবঘাটি বসানো যায়নি। কিন্তু ল্যান্ডিং হয়েছে অনেকবার। সব সময় মানুষের রোবট মনিটর কাজ করছে সেখানে।

.

(২৫৭১ সালের অভিযানের করুণ পরিণতি জানতে বিগল ৫ দেখুন।)

ইউরোপা বৃহস্পতি থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে দ্বিতীয় উপগ্রহ। প্রথমে, আসলে এটা ছিল বরফে মোড়ানো এক ভুবন। কিছু বিশাল বিশাল ফাটলের গোলকধাঁধা ছাড়া আর কোনো বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য ছিল না। আইওর উপর যেভাবে জোয়ার প্রভাব ফেলে ততটা প্রভাব নেই এখানে। আছে তাপ। গলে গেছে সব বরফ, পুরো ইউরোপা জুড়ে এখন সাগর। এখানে বিচিত্র সব প্রাণের উদ্ভব হয়েছে। (দেখুন স্পেসক্রাফট জিয়াং, গ্যালাক্সি, ইউনিভার্স।) বৃহস্পতি ছোষ্ট্র সূর্যে পরিণত হবার পর পুরো ইউরোপা সাগরে পরিণত হলেও অগ্নি উদগিরণে জন্ম নিয়েছে কিছু কিছু দ্বীপ।

সবার জানা একটা তথ্য হল, ইউরোপায় হাজার বছরে কোনো ল্যান্ডিং হয়নি। সর্বক্ষণ নজরদারি চলছে এখানে।

সৌরজগতে গ্যানিমিড সবচে বড় চাঁদ (ব্যাস ৫২৬০ কিলোমিটার)। এখানেও নতুন সূর্যের প্রভাব পড়ে। এর বিষুবিয় অঞ্চলের তাপমাত্রা জীবনের অনুকুল, যদিও আবহাওয়ামন্ডল এখনো শাসপ্রশ্বাসের জন্য ভাল নয়। এখানকার বেশিরভাগ অধিবাসীই বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানকর্মী। সবচে বড় সেটলমেন্ট আনুবিস সিটি (জনসংখ্যা ৪১,০০০) অবস্থিত দক্ষিণ মেরুর কাছে।

ক্যালিস্টোও ভিন্ন প্রকৃতির। এর পুরো উপরিভাগ নানা আকার ও প্রকারের জ্বালামুখ, উল্কার আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতে ভর্তি। ক্যালিস্টোর বুকে কোনো স্থায়ী ঘাঁটি না থাকলেও আছে কয়েকটা স্টেশন।

১৭. সেই গ্যানিমিড

বেশি ঘুমানোর অভ্যাস নেই ফ্র্যাঙ্ক পোলর, কিন্তু বিচিত্র সব স্বপ্ন এটুকু সময়েই ধরা দেয়। অতীত-বর্তমান তার স্বপ্নে একাকার হয়ে গেছে। কখনো সে ডিসকভারিতে, কখনো আফ্রিকা টাওয়ারে আবার কখনো ছেলেবেলার পোল ফিরে আসে, খেলা করে বন্ধুদের সাথে।

কোথায় আমি? সাতারুর মতো ঘুম থেকে জেগে উঠে প্রশ্ন করে সে নিজেকেই। বিছানার ঠিক উপরেই একটা গোলাকার জানালা। আলো আসছে পর্দার ফাঁক দিয়েও। বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়টায় এক ধরনের বিমান ছিল যেগুলোয় আরাম আয়েশের ব্যবস্থা অনেক বেশি থাকত। মানুষ এভাবে ঘুমাতে পারত। সহজে মনে হতে পারে, সে এমনি কোনো যাত্রাপথে আছে।

আসলে তা নয়, বাইরে তাকালেই দেখা যায়। নিচের দৃশ্যটা আটলান্টিকের মতো হলেও দক্ষিণ মেরুতে দুইটা সূর্য একই সাথে উদিত। এমন দৃশ্য পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুতে দেখা যাবে না।

শিপটা ভেসে আছে এমন চষা এক ভূমির উপর। যেন কোনো মাতাল চাষি চষতে গিয়ে সব ভন্ডুল করে দিয়েছে। এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে বরফ। সেই সাথে গোল গোল চিহ্ন। উল্কাপাতের নিদর্শন।

দরজায় কে যেন নক করল, ‘আমি এলে কিছু মনে করবে নাতো?’

জবাবের অপেক্ষা না করেই ঢুকল ক্যাপ্টেন চ্যান্ডলার।

‘নামা শেষ করে তোমার ঘুম ভাঙানোর ইচ্ছা ছিল, পারলাম না সময়মত নামতে। একটু বেশি লেগে যাচ্ছে। কিন্তু বিদ্রোহ করে পথটাকে সংক্ষিপ্ত করে এনেছি।’

হাসল পোল।

‘স্পেসে কখনো বিদ্রোহ হয়েছিল নাকি?’

‘হয়েছে তো অবশ্যই, মাত্র কয়েকটা। আগে। আমাদের আমলে নয়। তুমি মানবে, এ রীতি শুরু করেছিল হাল… স্যরি, আমার মনে হয় বলা উচিৎ হয়নি। ঐ দেখ, গ্যানিমিড সিটি।’

নিচে তাকায় সে। পথঘাট বোঝা যায়। জ্যামিতিক আকারের। সেই সাথে আছে একটা খাল। পোল ভুলেই গিয়েছিল যে গ্যানিমিডের বিষুবিয় অঞ্চলে এখন তরল পানি থাকতে পারে। মনে পড়ে গেল লন্ডনে কাঠ কাটা দেখার একটা স্মৃতির কথা।

একটু মজা পাবার ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে চ্যান্ডলার। মহানগরীর আকৃতির কথা মনে পড়ল সাথে সাথে।

‘গ্যানিমিডিয়রা,’ বলল সে শুকনো কণ্ঠে, নিশ্চই আকার আকৃতিতে বিশাল। পাঁচ থেকে দশ কিলোমিটার চওড়া রাস্তা বানানো মুখের কথা নয়।

‘কোথাও কোথাও বিশ। ইমপ্রেসিভ, তাই না? মাতা প্রতি অনেক বিচিত্র সব ব্যাপার ঘটায়। আমি তোমাকে আরো কৃত্রিম দেখায় এমন দৃশ্য দেখাতে পারব, আকারে একটু ছোট হবে, এই যা।

‘আমি বাচ্চা থাকার সময় মঙ্গলের বুকে খোদাই করা মুখ দেখা গেছে এমন কথা উঠেছিল। আসলে ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়। পৃথিবীতেও কিন্তু এমন নিদর্শন পাওয়া যায়।’

‘কেউ কি একবার বলেনি যে ইতিহাস নিজের পুনরাবৃত্তি করে গ্যানিমিড সিটির সাথেও কোনো ধরনের বিচিত্র ব্যাপার ঘটেছিল। কোনো কোনো অর্বাচীন দাবি করে এর নির্মাতা ছিল এলিয়েনরা। আমার ভয়, এটা বেশিদিন টিকবে না।

‘কেন?

‘গলে যাচ্ছে। এর পার্মাস্ট গলিয়ে দিচ্ছে লুসিফার। আর একশ বছর পর গ্যানিমিডকে তুমি চিনতেই পারবে না… ঐতো, ঐটা লেক গ্যানিমিডের প্রান্ত ভালভাবে তাকাও- ডানে

বুঝতে পারছি। হচ্ছেটা কী? পানি নিশ্চয়ই এ নিম্নচাপে ফুটছে না?

ইলেক্ট্রোলাইসিস প্ল্যান্ট। জানি না কত স্কিলিয়ন কেজি অক্সিজেন উৎপন্ন হয় প্রতিদিন। অবশ্যই, আশা করি হাইড্রোজেন উপরে উঠে হারিয়ে যাবে।’

হঠাৎ কণ্ঠটা বদলে যায়, নিচে যত পানি আছে তার অর্ধেকও দরকার নেই গ্যানিমিডের। কাউকে বলোনা, মাঝে মাঝে মনে হয় শুক্রের জন্য কিছুটা নিয়ে গেলে হত।

‘ধূমকেতুর গলায় ফাঁস লাগানোর চেয়ে সহজ?

যতক্ষণ এ্যানার্জির প্রশ্ন ওঠে, ততক্ষণ ঠিক। গ্যানিমিড ছেড়ে যেতে সেকেন্ডে মাত্র তিন ক্লিক প্রয়োজন। কিন্তু অন্যান্য সমস্যাও আছে…’

‘আমারও ভাল লাগছে ব্যাপারটা। তোমরা কি মাস-লঞ্চার দিয়ে শু্যট করবে?

না। আমি যদি করি, তো আবহাওয়ামন্ডল থেকে টোয়ার দিয়ে নিয়ে আসব। পথিবীর শুলোর চেয়ে ছোট হবে। পাম্প করে তুলে আনব পানি। এ্যাবসলুট জিনোর। কাছাকাছি এনে কঠিন করব। কিছুটা যে বাষ্প হয়ে যাবে তা সত্যি, কিন্তু বেশিরভাগ থেকে যাবে। হাসির কী হল?

‘স্যরি- আমি আইডিয়াটা নিয়ে হাসছি না- পারফেক্ট। কিন্তু স্মৃতি বয়ে আনলে তুমি কথাটা তুলে। আমাদের সময় গার্ডেন স্প্রিঙ্কলার ছিল। ঘুরে ঘুরে পানি ছিটাত বাগানে। তোমরাও একই কাজ করছ, শুধু বড় মাত্রায়। পুরো একটা গ্রহ নিয়ে।

আবার আরেক স্মৃতি উসকে এল। এ্যারিজোনার গরম এলাকায় গার্ডেন প্রিলার থেকে পানি বেরোনোয় ঘুরতে থাকা কুয়াশায় রিকি আর সে একে অন্যকে ধাওয়া করত।

ক্যাপ্টেন চ্যান্ডলারের আবেগ আরো ভাল।

‘ব্রিজে ফিরে যেতে হচ্ছে। আনুবিস নামার পর দেখা হবে।

১৮. গ্র্যান্ড হোটেল

গ্র্যান্ড গ্যানিমিড হোটেল সৌরজগতে হোটেল গ্যানিমিড’ নামে পরিচিত হলেও আসলে ততটা গ্র্যান্ড নয়। পৃথিবীর বুকে এমন একটা হোটেল দেড় তারকা পেত। প্রতিদ্বন্দ্বী হোটেলগুলো হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে হওয়ায় ম্যানেজমেন্টে আলসেমি দেখা যায়।

খুব বেশি অভিযোগ নেই পোলের, অভিযোগ সে জানাবেও না। শুধু দানিলের অভাব বোধ করে। সে থাকলে এখন সেমি ইন্টেলিজেন্ট যন্ত্রপাতিগুলোর কাজকারবার বুঝিয়ে দিতে পারত। একটু আতঙ্কিত হয়ে উঠল সে (মানুষ) বেলবয়ের পিছনে দরজা বন্ধ হয়ে যাবার সাথে সাথে। লোকটা বিখ্যাত অতিথিকে সবকিছু বুঝিয়ে দিতে অত্যুৎসাহী। দেয়ালের সাথে কথা বলে বলে পাঁচটা মিনিট নষ্ট করার পর সে এমন এক সিস্টেমকে কল করল যেটা তার উচ্চারণ আর শব্দগুলো বুঝতে পারবে। অল ওয়ার্ল্ডস নিউজে কী তরতাজা খবর বের হবে, কিংবদন্তির মহাকাশচারী গ্যানিমিড হোটেলরুমে আটকা পড়ে মারা গেছেন।

দম আটকে আসে এখানকার একমাত্র আন্তর্জাতিক সুইটটার নাম দেখেই। এমনি হবার কথা, তবু কেমন যেন ধাক্কা লাগে। ইউনিফর্ম পরা ডেভ বোম্যানের ছবি ঝুলছে দেয়ালে। একই সময়ে একই রকমের আরেকটা ছবি তুলেছিল পোল। হাজার বছর আগে। এ সাইটটার নাম বোম্যান সুইট।

গোলিয়াথের সব তুর কোনো না কোনো প্রিয়জন আছে এখানে। বিশ দিনের বিশ্রামে সবাই যার যার জায়গায় চলে গেছে। এখানে আফ্রিকা টাওয়ার যেন দুরের কোনো স্বপ্ন।

আর সব আমেরিকানের মতো পোলের মনেও একটা ইচ্ছা দানা বাঁধে, এমন কোনো হোত সমাজে যদি থাকা যেত যেখানে সবাই সবাইকে চিনতে পারবে সহজেই, সবার সাথে সবার সম্পর্ক থাকবে বাস্তবে, সাইবারস্পেসে নয়। আনুবিস সে হিসাবে মন্দ নয়।

তিনটা প্রেশার ডোম আছে। প্রতিটা দু কিলোমিটার এলাকাজোড়া। ডোমগুলো একটা বিশাল বরফের চাইয়ের উপর বসানো। বরফ হারিয়ে গেছে দিগন্তে। গ্যানিমিডের স্থানীয় সূর্য কখনো পর্যাপ্ত তাপ দিতে পারবে না। পোলার ক্যাপ গলবে না কস্মিনকালেও। এমন অস্বস্তিকর পরিবেশে আনুবিসকে স্থাপন করার এই আসল কারণ। আগামি কয়েক শতাব্দিতে মহানগরীর ভিত্তি ধ্বসে পড়ার কোনো উপায় নেই।

বোম্যান স্যুইটের সাথে মানিয়ে নেয়ার পর পোল টের পায় পরিবেশপ্রীতি আছে তার। সাগরপাড়ে সারি সারি পামগাছ লাগিয়ে দিয়ে সমুদ্রের গর্জন শুনতে মন্দ লাগত না। হ্যারিকেন এলেও কুছ পরোয়া নেহি। মেরিনার ভ্যালি বা হিমালয়, যে কোনো জায়গায় যেতে পারত ইচ্ছা হলেই।

কিন্তু সৌর জগতের অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়ে এসে অন্য একটা বন ঘোরার নেশা মাথায় রেখে পার্থিব স্মৃতির কষ্টে মুষড়ে পড়ার কোনো মানে হয় না। অলসভাবে কয়েকটা মাস কাটানোর সময় কিছু উপভোগ করাই বরং ভাল।

আফসোসের কথা, কখনো মিশরে যাওয়া হয়নি। গ্রেট পিরামিড বা স্ফিংসের কাছাকাছি বসে উপভোগ করার কোনো তুলনা নেই। এসব স্বপ্নে বিভোর থাকার সময় সে বোম্যান স্যুইটের কার্পেটে ধুত দেখতে পায়।

গিজার বুকে শেষ পাথরটা বসানোর পর গত পাঁচ হাজার বছরে এমন দৃশ্য কেউ কখনো দেখেনি। দেখেনি এমন আকাশ। কিন্তু এটা কোনো কল্পনা নয়, এই হল গ্যানিমিডের চির পরিবর্তনশীল প্রকৃতির দৃশ্য।

লুসিফারের প্রতাপ শুরু হবার পর থেকেই বদলে গেছে এ এলাকার উপগ্রহগুলোর ধরন। এটার অন্যপ্রান্ত, যা কখনো ঘুরে আসে না এবং যে কারণে এখানে কখনো দিন আসে না, সেটাকে নাইটল্যান্ড নামে ডাকা হয়। চান্দ্র এলাকার মতো এখানেও কিছু কিছু এলাকায় আংশিক দিন হয়।

প্রাইমারি অর্বিটে গ্যানিমিড ঠিক এক সপ্তাহ সময় নেয়। সাতদিন তিন ঘন্টা। তাই বলা হত এক মিড দিবস= এক পার্থিব সপ্তাহ। কি এ ক্যালেন্ডার আদ্যিকালে বর্জন করা হয়েছিল। তিন ঘন্টা বাড়তি সময়ই ঝামেলা পাকাতে ওস্তাদ। তার বদলে ইউনিভার্সাল স্টান্ডার্ডে পৃথিবীর দিবস হিসাবে চব্বিশ ঘন্টায় দিন ধরা হতে লাগল।

গ্যানিমিডের নতুন বায়ুমন্ডল এখনো একেবারে চিকণ। মেঘের নাম-নিশানা নেই। তাই সৌরজগতের বড় গড়নগুলো হরদম দেখা দেয় আকাশে। আইও আর ক্যালিস্টোকে পৃথিবীর বুক থেকে দেখা চাঁদের অর্ধেক আকারে দেখা যায় সর্বক্ষণ। কিন্তু আর কিছু সব সময় চোখে পড়ে না। লুসিফারের এত কাছের প্রজা এই আইও যে সেটাকে পাক খেয়ে আসতে সময় নেয় মাত্র দুদিন। মিনিটের ব্যবধানে আইওকে তাই চলতে দেখা যায়। চারগুণ দূরত্বে থাকা ক্যালিস্টো দু মিড দিন সময় নেয়, পৃথিবীর হিসাবে গড়পড়তা মোলদিন।

ক্যালিস্টোর গড়ন মোটেও পাল্টায় না। এর বরফমোড় অঞ্চলগুলো অপরিবর্তনীয়। বৃহস্পতি থাকাকালে লুসিফার শনির সাথে পাল্লা দিয়ে মহাকাশের জিনিসপত্র যোগাড় করত, আটকে রাখত নিজের এলাকায়। সেসব কারণে, শতকোটি বছরের মধ্যে কয়েকটা উস্কাপাতের ঘটনা ছাড়া খুব বেশিকিছু ঘটেনি ক্যাসিস্টোর কপালে।

আইওতে প্রতি সপ্তাহে কোনো না কোনো অঘটন ঘটছেই। এখানকার এক অধিবাসী বলেছিল, লুসিফারের জনের আগে আইও ছিল সাক্ষাৎ নরক, এখন নরকটা আরো উস্কে উঠেছে।

আফ্রিকার চেয়ে বড় এলাকাজুড়ে থাকা আইওর বিশাল জ্বালামুখগুলোর সালফার উদগিরণের কাহিনী বসে বসে জুম করে দেখে পোল, সময় পেলেই। প্রায়ই আগুনের হল্কা উঠে যায় শত শত কিলোমিটার উপরে।

এখানে শুধুই আগুনে রঙের খেলা- লাল, কমলা, হলুদ, খয়েরি। মহাকাশ যুগের আগে মানুষের দুঃস্বপ্নেও এমন ভুবনের কথা আসেনি। মানুষ এখানে নামার ঝুঁকি নিয়েছে কিনা কখনো তা খতিয়ে দেখতে হবে, যেখানে রোবট নামালেই নষ্ট করার শামিল…

অবশ্যই, তার আসল আগ্রহ ইউরোপা নিয়ে। পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহের মতো আকৃতির এক এলাকা, শুধু চান্দ্র আকৃতি পরিবর্তন করে চারদিনে একবার, এই যা…

খালি চোখে তাকিয়েও অবাক হয়ে পোল দেখে, ডিসকভারি বৃহস্পতির এলাকায় আসার পর এক হাজার বছরে কী বিচিত্র পরিবর্তন এসেছে ইউরোপায়! বরফের উপর ফাটলের আঁকিবুকিগুলো উধাও হয়ে গেছে, আছে শুধু দু মেরুতে। অন্য জায়গাগুলোয় সাগর উষ্ণতায় উদ্বেলিত। পৃথিবীর মতো তাপমাত্রা সেখানে।

এ সুযোগে বরফের ভিতরে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র সব প্রাণি মাথা তুলছে। এক হাজার বছরে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে তাদের মধ্যে। স্পাই স্যাটেলাইটগুলো এক সেন্টিমিটার এলাকাও চষে ফেলতে পারে। সেসব দিয়ে বোঝা যায়, তাদের উভচর পর্যায় চলছে এখন। কিন্তু বেশিরভাগ সময় সাগরের তলায় কাটানো প্রাণিগুলোর কী বিচিত্র উন্নয়ন। এরমধ্যেই ইউরোপা সরল বিল্ডিং বানানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে।

এক হাজার বছরে লাখ বছরের উন্নয়ন অকল্পনীয় হলেও সবাই মেনে নিয়েছে সেখানকার কিলোমিটার জুড়ে থাকা মনোলিথের কারবার এটা। গ্রেট ওয়াল নামের মনোলিথ পড়ে আছে সি অব গ্যালিলির প্রাতসীমায়।

কোন সন্দেহ নেই, দেখভাল করছে এটা। দেখভাল করছে সে পরীক্ষণের, যেমন পরীক্ষা করেছিল পৃথিবীর বুকে, চল্লিশ লাখ বছর আগে।

১৯. মানবজাতির পাগলামি

মিস প্রিঙ্গল

ফাইল- ইন্দ্রা

প্রিয় ইন্দ্রা- স্যরি, এর মধ্যে তোমাকে ভয়েস মেইলও পাঠাতে পারিনি। একই বাহানা, তাই আর বললাম না।

তোমার প্রশ্নের জবাব- হ্যাঁ। গ্যানিমিড়ে আমার বেশ ভাল্লাগছে। আমার স্যুইটে পাইপ ইন করা আকাশের দিকে আস্তে আস্তে আরো কম সময় দিচ্ছি। কাল রাতে আইও ফ্লাক্স টিউব দারুণ এক দৃশ্য দেখিয়েছে- আইও আর বৃহস্পতির, মানে লুসিফারের মধ্যকার লাইটনিং ডিসচার্জ অসম্ভব এক দৃশ্য। পৃথিবীর মেরুজ্যোতির মতোই বলা চলে, অনেক বেশি উজ্জ্বল। ব্যাপারটা আবিষ্কার করেছিল রেডিও এ্যাস্ট্রোনোমাররা, আমার জন্মেরও আগে।

আগের দিনের কথা বলছি, তুমি জান নাকি, আনুবিসে একজন শেরিফ আছে? পুরনোদিনের কথা মনে পড়ে যায়। আমার দাদা এ্যারিজোনার ব্যাপারে এসব গল্প বলত। মিডদের বলতে হবে গল্পগুলো…

ব্যাপারটা বিচিত্র- আমি এখনো বোম্যান স্যুইটের সাথে মানিয়ে নিতে পারিনি। মাঝে মাঝেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই….

সময় কাটাই কীভাবে? আফ্রিকা টাওয়ারের মতোই। এখানেও স্থানীয় হর্তাকর্তাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ চলছে হরহামেশা। কিন্তু তাদের দাম আরো একটু কম। (আশা করি কেউ বাগিং করবে না আমার এ মেইল…)। শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে যোগাযোগ করছি। ভালই। কিন্তু এ বিপরীত পরিবেশে আর কত ভাল হবে…

কিন্তু এতে আমি বুঝতে শিখছি কেন মানুষ এখানে থাকতে চায়। এখানে উদ্দেশ্য আছে, আছে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীতে এ ব্যাপারটা খুব বেশি নেই।

কথা সত্যি, বেশিরভাগ মিড জন্মেছে এখানেই, তাই বসতবাড়ি বলতে এ এলাকাকেই চেনে। তারা এখানেই অভ্যস্ত। পৃথিবী তাদের কাছে দূরের এক এলাকা। আমরা টেরিরা (এ নামেই পৃথিবীর লোকদের ডাকে তারা) এ নিয়ে কী করতে পারব? একটা টিনএজ ক্লাসের সাথে মিশেছিলাম আমি, তারা আমাদের জাগাতে চায়। কেউ কেউ গোপনে পৃথিবী জয়ের চিন্তায় মত্ত- আবার বলোনা আমি তোমাদের সাবধান করিনি।

আমি আনুবিসের বাইরে একবার গিয়েছিলাম। তথাকথিত নাইটল্যান্ডে যেখান থেকে কখনো লুসিফারের দেখা পাওয়া যায় না। দশজন ছিলাম। চ্যান্ডলার, আমি, গোলিয়াথের দুজন কু, ছজন মিড- গিয়েছিলাম দূরে। সূর্য ডুবে যাবার আগ পর্যন্ত ছিলাম। তারপর সত্যিকার রাত নেমে আসে। দারুণ। পৃথিবীতে মেরুর শীতের মতো। আকাশটা একেবারে মিশকালো। মনে হয় স্পেসে আছি।

দেখেছি আইওর জাদু। ট্রিপটাকে সেভাবেই সাজানো হয়…

বেশ কয়েকটা ছোট উপগ্রহও চোখে পড়ে। পৃথিবীকে কি মিস করছি? মনে হয় না। মিস করছি সেখানকার নতুন বন্ধুদের…

আর আমি সত্যি স্যরি। এখনো ডক্টর খানের সাথে দেখা হয়নি। আমার জন্য কয়েকটা মেসেজ দিয়েছেন। আমি কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা করব। পার্থিব দিন, মিডের দিন নয় অবশ্যই।

জোর জন্য বেস্ট উইশেস, দানিলের জন্যও শুভকামনা। জান নাকি কী হয়েছে তার? আবার রিয়েল পারসন হয়েছে? আর ভালবাসা তোমার জন্য…

স্টোর।

ট্রান্সমিট।

.

পোলের শতাব্দিতে মানুষের নামের সাথে তার বাহ্যিক গড়নের একটা মিল খুঁজে পাওয়া যেত। এখন সে উপায় নেই। যে কোনো এলাকার, যদি ধর্ম থাকে তো ধর্মের মানুষের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের সাথে নামের মিল নাও পাওয়া যেতে পারে। ডক্টর খান দেখতে মোটেও মধ্য এশিয়ার মানুষের মতো নয়, বরং খাঁটি নরডিক ব্লন্ড। দেখে মনে হয় ভাইকিং। লম্বায় দেড়শ সেন্টিমিটারের চেয়েও কম। একটু মানসিক বিশ্লেষণ না করে পারে না সে, ছোটখাট গড়নের মানুষগুলো বিখ্যাতদের সাথে একটু চরমপন্থি মনোভাব নিয়ে চলে। এমন বাস্তবতা ঘেরা এলাকায় চলতে হলে খানকে সার্টিফিকেট পেতে হবে।

আনুবিস সিটিতে ইউনিভার্সিটি গড়ার মতো জায়গা নেই। অনেকে মনে করে টেলিকমিউনিকেশনের বিপ্লব এসব সমস্যাকে দূর করে দিবে। ইন্দ্রা যে তামাশার সুরে বলেছিল দর্শন বিভাগে ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া আর কিছু দরকার নেই, সেটা একেবারেই বাস্তব নয়।

‘সাতজনকে ধরে রাখার জন্য বানানো হয়েছে এটা,’ খুব বেশি আরামদায়ক যেন না হয় এভাবে বানানো চেয়ারে বসতে বসতে গর্বিত ভঙ্গিতে বলল ডক্টর খান, ‘কারণ এর চেয়ে বেশি মানুষের সাথে ভালভাবে ইন্টার্যাক্ট করা সম্ভব নয় একজন মানুষের পক্ষে। যদি আপনি সক্রেটিসের ভূতের সন্ধান পান, সেও সাতজনের কথাই বলবে।‘

‘ও, গ্রাজুয়েশনের ঠিক আগে আগে আমি একটা ক্র্যাশ কোর্স নিয়েছিলাম ফিলোসফিতে সিলেবাস নিঙের সময় কেউ ঠিক করেছিল আমাদের মতো অসামাজিক ইঞ্জিনিয়ার-জীবদের সংস্কৃতির সামান্য নিদর্শন দেখানো উচিৎ।’

‘ভালতো। এভাবে সবকিছু সহজ হয়ে যায়। জানেন, এখনো আমার ভাগ্যের ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছি না। আপনার দেখা পাবার জন্য পৃথিবীতে যাব ঠিক করেছিলাম। সেই আপনিই কিনা সশরীরে হাজির হলেন! একেই বলে মিরাকল, অলৌকিক ঘটনা। প্রিয় ইন্দ্রা কি আমার- আহ- ভালবাসার কথা বলেছে?

‘না, সামান্য মিথ্যা মিশিয়ে জবাব দিল পোল।

ডক্টর খানের চোখমুখে আনন্দের আভা। নতুন শ্রোতা পেয়ে সে যার পর নাই খুশি।

‘আপনি হয়ত শুনে থাকবেন আমি একজন আস্তিক, কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আস্তিকতাকে প্রমাণ করা যায় না, তাই একই সাথে এটা খুব বেশি ইন্টারেস্টিংও নয়। যাই হোক, আমরা কখনো নিশ্চিত হতে পারব না যে ঈশ্বর কখনো ছিলেন এবং বর্তমানে তাকে ঠেলে অনেক দূরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে- এমন কোথাও যেখানে তাকে কেউ খুঁজে পাবে না… গৌতম বুদ্ধের মতো আমিও কোনো পক্ষ নিচ্ছি না। আমার আগ্রহের বিষয় ধর্ম নামের সাইকোপ্যাথলজিটা।

‘সাইকোপ্যাথলজি মনোবিকনের বিজ্ঞান? বিচিত্র সিদ্ধান্ড, বলতেই হয়।

ইতিহাসের রসে জারিত। ধরে নিন, আপনি একজন এ্যালিয়েন, সত্যের আপেক্ষিকতার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। আপনি এমন এক প্রজাতির সম্মুখীন হলেন যারা এর মধ্যেই হাজার হাজার গোত্র ও উপজাতিতে বিভক্ত, তাদের সবাই এ বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি ও বিজ্ঞান সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা পোষণ করে। ধরা যাক, তাদের বেশিরভাগ, নিরানব্বইভাগ বিশ্বাসই এক, শুধু একভাগ ভিন্ন, এটুকুর জন্য কত রক্তারক্তি হবে তার ইয়ত্তা নেই।

কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়? সুক্রেটিস এর ভিত্তিমূলে আঘাত হানলেন। তিনি বললেন, ধর্ম আসলে জন্ম নিয়েছে ভয় থেকে। রহস্যময়, বিরূপ প্রকৃতির বাইপ্রোডাক্ট। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই এ ছিল এক প্রয়োজনীয় অকল্যাণ- কিন্তু কেন সেটা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অকল্যাণকর হয়ে গেল আর কেন তখনো টিকে থাকল যখন এর কোনো দরকারই নেই?

‘আমি বলেছি অকল্যাণ- মিন করছি সেটাই, কারণ ভয়ই সব প্রাণিকে নিষ্ঠুরতার দিকে ঠেলে দেয়। এসব সম্পর্কে যার বিন্দুমাত্র ধারণা আছে সে নিজেকে মানবজাতির সদস্য বলে মানতেও লজ্জা পাবে… মানবেতিহাসের সবচে খারাপ বইগুলোর একটা হল হ্যাঁমার অব উইচেস, স্যাডিস্টিক মনোভাবের দুজন মানুষ লিখেছিল। চার্চে অনুমতি দিয়েছে উৎসাহ দিয়েছে- নিরীহ হাজার হাজার বৃদ্ধার উপর অত্যাচার চালানোর জন্য, যেন স্বীকার করে তারা। তারপর পুড়িয়ে মারার নিয়ম ছিল। খোদ পোপ নিজ হাতে এর অনুমতিপত্র দেখে!

দু একটা সম্মানযোগ্য ধর্ম ছাড়া বাকি প্রায় সবগুলোই খ্রিস্ট ধর্মের মতো নিষ্ঠুর… এমনকি আপনার শতাব্দিতেও ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেদের ধরে ধরে লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হত যে পর্যন্ত পিউস গিবেরিশ মুখস্ত করতে না পারে সে পর্যন্ত। একটা বাচ্চার কাছ থেকে তার বাল্যকাল কেড়ে নেয়ার মতো নিষ্ঠুর কাজ আর কী হতে পারে। তারপর যাজক হয়ে জলাঞ্জলি দিতে হত যৌবনকে…

সম্ভবত আরো বিচিত্র ব্যাপার হল, শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে পাগল লোকগুলো দাবি করে আসে সে, শুধু সে-ই পেয়েছে ঐশী গ্রন্থ। আর অন্য মানুষের সাথে তাদের ধর্মবিশ্বাসের মাইক্রোস্কোপিক পার্থক্যের কারণে লড়াই করে করে প্রাণপাত করেছে নির্বিধায়।

পোল ভাবে এখন দু একটা কথা নিজ থেকে বলা ভাল।

‘আপনার কথায় আমার বাল্যকালের ছবি ভেসে ওঠে। ঘটনাটা আমাদের শহরের। একজন হলি ম্যান দাবি করে বসে সে মিরাকল ঘটাতে পারে। তারপর মানুষ জুটে যেতে লাগল আশপাশে। এমনকি শিক্ষিত, দামি পরিবারের লোকগুলোও প্রতি রবিবারে তার টেম্পলের বাইরে গাড়ির লাইন লাগিয়ে দিত।

‘এটাকে রাশপুটিন সিন্ড্রোম বলে। শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে, সব সমাজে এমন মানুষের সন্ধান পাওয়া যেত। হাজারে মাত্র দশবার এমন সঘ টিকে থাকে দু প্রজন্ম ধরে। এক্ষেত্রে কী হয়েছিল?

‘যা হবার তাই। নামটা মনে পড়ছে না। বিশাল, ভারতীয় নাম। স্বামী কিছু একটা বা… কিন্তু দেখা গেল সে এসেছে আলাবামা থেকে। পাতলা বাতাস থেকে পবিত্র সব জিনিস তৈরি করা ছিল তার এক ট্রিক। বের করে এনে পুঁজারীদের হাতে তুলে দিত। আমাদের স্থানীয় রাব্বি সব ভেদ খুলে দেয় সবার সামনে এসব ট্রিক করে। কোনো পার্থক্য ছিল না। কিন্তু বিশ্বাসীরা বলে বেড়ায় যে রাব্বিরটা ছল চাতুরি হলেও তারটা একেবারে বাস্তব।

‘একবার, বলতে আমার লজ্জাও হচ্ছে, আমার মা লোকটার পাল্লায় পড়ে বাবা চলে যাবার পরের কথা, মার মন বিক্ষিপ্ত। তাকে ফিরিয়ে আনার চিন্তায় অস্থির। আমাকেও একবার এক সেসনে নিয়ে গিয়েছিল। মাত্র দশ বছর বয়সেই মনে হয়েছিল এমন অদ্ভুতদর্শন আর দেখলে খারাপ লাগে এমন লোক আগে কখনো দেখিনি। তার দাড়িগুলো একাধিক পাখির বাসা লুকিয়ে রাখতে পারত, আর রেখেছিল বলেই আমার ধারণা।

স্ট্যান্ডার্ড মডেল বলেইতো মনে হচ্ছে, কদ্দিন টিকেছিল?

তিন চার বছর। তড়িঘড়ি করে শহর ছাড়তে হয়েছিল। লোকটা টিনেজদের সেক্স টিম চালাত। অবশ্য হার মানেনি, দাবি করেছিল যে সে আত্ম রক্ষার কাজ করছে। আর আপনি বিশ্বাস করবেন না

ট্রাই মি।’

স্যরি- তখনো তার দল তার উপর বিশ্বাস হারায়নি। কখনো কখনো পুলিশ তাকে ব্যবহার করত- যখন অপরাধী ধরার আর কোনো উপায় নেই, তখন।

হুম, ওয়েল, আপনাদের ঐ স্বামী খুব টিপিক্যাল। খুব বেশি অবাক বা খুশি হতে পারলাম না। কি একটা কথা প্রমাণ করে দিল সে, মানবজাতি বেশিরভাগ সময়েই ভুলপথে চালিত হয়।

‘প্রায় সব সময়।

‘ঠিক। মানুষ নিজের বিশ্বাস জলাঞ্জলি দেয়ার আগে প্রাণপাত করতে প্রস্তুত। বিশ্বাস না বলে ইস্যুশন বলা ভাল। আমার কাছে অজ্ঞতার ব্যবহারিক সংজ্ঞা এটাই।

‘আপনি কি মনে করেন যে শক্ত ধর্মবিশ্বাসী কোনো মানুষ অজ্ঞ?’

‘খুব কঠিন টেকনিক্যাল সেলে বলতে গেলে- হ্যাঁ- তারা যদি সৎ হয়, এবং কোনো প্রতারণা না করে এ বিশ্বাস নিয়ে। আমার ধারণা নববইভাগ মানুষ এ শ্রেণীতে পড়ে।

আমি নিশ্চিত রাব্বি বেরেনস্টাইন বিশ্বাসে সৎ ছিল। কিন্তু আমার জানা মতে তার মতো সজ্ঞান ও ভালমানুষ দ্বিতীয়টা পাওয়া যাবে না। আপনি কী করে তার জবাব দিবেন? আর আমার জীবনে সবচে দামি জিনিয়াস ছিলেন ডক্টর চন্দ্র। হাল প্রজেক্টের জনক। ঘরের সামনে গেলাম একবার। নক করলাম। কোনো জবাব নেই। মনে হল ঘরটা খালি।

‘সে তখন চমৎকার একদল ব্রোঞ্জের মূর্তির সামনে প্রার্থনায় রত। ফুলে ফুলে সাজানো সেগুলো। একটা দেখতে হাতির মতো… আরেকটার অনেকগুলো হাত… আমি বেশ বিব্রত হয়ে পড়ি, কিন্তু কপাল ভাল বলতে হবে, সে আমার উপস্থিতি টেরও পায়নি। পা টিপে টিপে ভালমানুষের মতো বেরিয়ে গেলাম। আপনি কি বলবেন সেও সজ্ঞান ছিল না?

‘আপনি বেছে বেছে খুব খারাপ কয়েকটা উদাহরণ টেনেছেন। জিনিয়াস মাঝে মাঝেই ইনসেন হয়। ধরে নিই বাহ্যিক জ্ঞান তার ছিল, কিন্তু বাল্যকালের শিক্ষার বাইরে কখনো যেতে পানি। জেসাইটরা দাবি করে আমার কাছে দু বছরের জন্য একটা শিশুকে ছেড়ে দাও, সে সারা জীবন ধু আমার। তারা যদি সময়মত ছোট এক চন্দ্রকে কজা করতে পারত, সে তাহলে ধর্মভীরু ক্যাথলিক হত- কখনোই হিন্দু নয়।

সম্ভবত কিন্তু আমি বিভ্রান্ত আমার সাথে দেখা করার জন্য এত অস্থির ছিলেন কেন আপনি? যদ্দূর জানি আমি কখনোই কোনো জিনিসের জন্য পাগল ছিলাম না। কোনো বিশ্বাসের জন্যও নয়। এতকিছুর সাথে আমার কী সম্পর্ক?

আস্তে আস্তে, মনের সমস্ত ভার নির্ভর করে দিয়ে, ডক্টর খান খুব গোপন একটা কথা বলল তাকে।

২০. এ্যাপোস্ট্যাট

রেকর্ড–পোল

হ্যালো, ফ্র্যাঙ্ক… তাহলে শেষ অবধি টেডের সাথে দেখা হয়েছে তোমার। হ্যাঁ, তুমি তাকে এককেন্দ্রীক বলতে পার, কারণ সেন্স অব হিউমারের খানিকটা অভাব আছে তার মধ্যে। কিন্তু এককেন্দ্রীক লোকেরা কিন্তু বড় ধরনের সত্যের সম্মুখীন হয়। মাঝে মাঝে কিন্তু তাদের কথা শুনতে চায় না কেউ… তুমি মন দিয়েছ তার কথায়, তাতেই আমি খুশি, আশা করি সিরিয়াসলি নিবে।

টেডের এ্যাপার্টমেন্টে সব সময়ের জন্য একজন পোপের ছবি দেখে ভড়কে গিয়েছিলে তুমি, বললে না? তিনিই সম্ভবত তার হিরো। পোপ বিংশ পিউস। তাকে ইমপিউসও বলা হয়। তোমার জন্মের কিছুদিন আগে যেমন ভয়ানক ঘটনাগুলো ঘটে তেমনি ঘটিয়েছিলেন তিনি। তুমি নিশ্চয়ই জান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট গর্ভাচেভ কী করে সমস্ত পাপের বোঝা শেষ করে দিয়েছিল?

তিনি অতদূর যাননি- রিফর্ম করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রক্রিয়াটা দীর্ঘ। এমন ধারণা নিয়েই এগুচ্ছিলেন কিনা তা আর জানা যায়নি। কারণ ইনকুইজিশনের ফাইলগুলো প্রকাশ করে পৃথিবীকে বিস্মিত এবং একই সাথে ভীত করার পরপরই এক কার্ডিনালের হাতে খুন হন….

সে সময়ের মাত্র কয়েক দশক আগে আবিস্কৃত হয় টি এম এ জিরো। ধর্ম সমাজে এর প্রভাব পড়ে ভয়ানকভাবে। বিংশ পিউস এরই প্রভাবে পড়েছিলেন কিনা তা আর জানা যাবে না…

ঈশ্বরের খোঁজে নামার কাজে টেডকে কী করে তুমি সহায়তা করবে তাতো জানালে না। মনে হয় ঈশ্বর এত বেশি দূরে লুকিয়ে আছেন দেখেই সেও পাগলের মতো পিছনে পড়ে গেছে। আমি যে একথা বলেছি তা আবার বলোনা।

কেন বলবে না…

ভালবাসা-ইন্দ্রা।

স্টোর ট্রা

ন্সমিট

.

মিস থিঙ্গল

রেকর্ড

হ্যালো- ইন্দ্রা- ডক্টর টেডের সাথে আরো একটা সেশন হয়ে গেছে। আমি অবশ্য বলিনি কেন তুমি মনে কর সে ঈশ্বরের সাথে এত বেশি রেগে আছে।

কিন্তু দারুণ সব যুক্তিতর্কে নেমেছিলাম- কোনো ডায়ালগ নয়- যদিও তিনি নিজেই কথার ঝুলি উজাড় করে দেন সব সময়, আমার জন্য অপেক্ষাও করেন না… কখনো ভাবিনি এতদিনের প্রযুক্তিবিদ্যার কলকজা ছেড়ে আবার নামব দর্শনশাস্ত্রে। আমার হয়ত আগেই এসবের ভিতর দিয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল। জানি না ছাত্র হিসাবে আমাকে কোন শ্রেণীতে ফেলবেন তিনি।

আমি গতকাল ভিন্ন পথে কথা বলেছিলাম, রিএ্যাকশন দেখার জন্য। ডিসকাশনগুলো পাঠাচ্ছি —

মিস প্রিঙ্গল- কপি অডিও ৯৪।

‘আমি নিশ্চিত, টেড, পৃথিবীর বেশিরভাগ শিল্পকর্মই ধর্মের রসে জারিত, ধর্মই তাদের পথ দেখিয়েছে। এতে কি একটা ব্যাপার প্রমাণ হয়ে যায় না?

হ্যাঁ- কিন্তু এতে কোনো বিশ্বাসীর স্বস্তি হবে এমনতো বলছি না। মানুষ সব সময় বৃহত্তম, মহত্তম আর শ্রেষ্ঠদের তালিকা তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকত- আমি নিশ্চিত আপনার আমলে সেটাই পাবলিক এন্টারটেইনমেন্টের ব্যাপার ছিল।

‘নিশ্চই!

যাক, এসব শিল্পকর্মের ব্যাপারে বিখ্যাত কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। এগুলোর কোনো মহাকালীয় মূল্য নেই। কিন্তু এটুকু প্রমাণ করে, মানুষের রুচি কালে কালে যুগে যুগে বদলায়…

‘শেষটা দেখেছিলাম পৃথিবীর আর্টনেটে, কয়েক বছর আগে। স্থাপত্য, মিউজিক, ভিজুয়াল আর্টস সহ আরো নানা ভাগ ছিল সেটায়… মাত্র কয়েকটা উদাহরণ মনে আছে… প্যান্থিয়ন, তাজ মহল… বাঁচের টোকাটা আর ফুগু মিউজিকে সবার আগে ছিল; তারপরই ভার্দির রিকুয়েম মাস। আর্টে মোনা লিসাতো থাকবেই। আর ছিল শ্রীলঙ্কার কোথাও থাকা বুদ্ধমূর্তির সারি, তরুণ রাজা তুতের সোনালি মৃত্যু-মুখোশ।

যদি আর সবও মনে রাখতে পারতাম- অবশ্যই, তা সম্ভব নয়- তাতে কিছু যেত আসত না। তাদের কালচারাল আর রিলিজিয়াস ব্যাকগ্রাউন্ডই আসল। মোটের উপর, মিউজিক ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রে কোনো একক ধর্ম আধিপত্য দেখায়নি। প্রি-ইলেক্ট্রনিক ইন্সট্রুমেন্টের যুগে অর্গান ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি খ্রিস্টধর্মে সবচে বেশি অবদান রেখেছে সম্ভবত এ কারণে যে পশ্চিমা সভ্যতা তখন অগ্রসর ছিল। প্রভাবটা গ্রিক আর চৈনিকদের মধ্যে বেশি পড়ত যদি তারা মেশিনপত্রকে সামান্য খেলনা ভেবে বসে না থাকত।

তবে আমার যতদূর মনে হয় মানুষের শিল্পকলার একক বৃহত্তম নিদর্শন এ্যাঙ্কর ওয়াট। ধর্মটা যুগে যুগে, স্থানে স্থানে পরিবর্তিত হয়েছে, তবু এটুকু অবাক করে, সেখানে একজন ঈশ্বর নিয়ে কারবার করা হয়নি, ছিল শত শত দেবতা!

‘ধর্মের এই বিচিত্র হেরফেরের ব্যাপারে রাব্বি বেরেনস্টাইন ভাল বলতে পারত।’

‘আমার কোনো সন্দেহ নেই। পারত সে। তার সাথে দেখা করতে পারলেও ভাল হত। আর ভেবে ভাল লাগছে যে সে ইসরায়েলের ভাগ্যে শেষমেষ কী ঘটেছিল সেটা দেখার জন্য বেঁচে ছিল না।

এন্ড অডিও

.

এইতো, পেয়ে গেলে, ইন্দ্রা। আশা করি গ্যানিমিডের মেনুতে এ্যাঙ্কর ওয়াটও আছে– আমি কখনো দেখিনি। কিন্তু তুমি চাইলেই এক জীবনে সবকিছু দেখে ফেলতে পারবে না….

এখন, যে প্রশ্নের উত্তর চাইছিলে তুমি… আমি এখানে থাকায় ডক্টর টেড এত খুশি কেন?

সে নিশ্চিত, অনেক রহস্যের জবাব পড়ে আছে ইউরোপার বুকে, যেখানে হাজার বছর ধরে কেউ যায়নি।

সে মনে করে আমি হয়ত একটা ব্যাখ্যা নিয়ে এসেছি। হয়ত আমি নিজেই একটা ব্যাখ্যা। বিশ্বাস করে সেখানে আমার এক বন্ধু আছে। ঠিক ধরেছ- ডেভ বোম্যান, কিম্বা যাই সে হয়ে থাক না কেন এতদিনে…

আমরা জানি বিগ ব্রাদার মনোলিখের ভিতরে চলে গিয়েও সে ঠিক ঠিক বেঁচে আছে, অন্তত পরিবর্তিত হয়ে গেলেও তার অস্তিত্ব রয়ে গেছে। তারপর, পরে কোনো এক সময় চক্কর মেরেছে পৃথিবীর কাছাকাছি। কিন্তু আরো কয়েকটা ব্যাপার খুব কম মানুষ জানে। মিডরা জানাতে চায় না কাউকে, অস্বস্তি বোধ করে…

বছরের পর বছর ধরে প্রমাণ খুঁজেছে টেড খান। এখন সে নিশ্চিত- শুধু ব্যাখ্যা করাটা কঠিন। অন্তত দুবার, শত বছরের ব্যবধানে, বেশ কয়েকজন নিযোগ্য লোক বিচিত্র কিছু একটা দেখে আবির্ভাব- ভৌতিক আবির্ভাব- ঠিক যেমন ফ্লয়েড দেখে ডিসকভারিতে। তাদের কেউ ঘটনাটার কথা জানত না। কিন্তু যখনি ডেস্ত্রে হলোগ্রাম দেখানো হয়, তখনি চিনতে পারে। ছশ বছর আগে ইউরোপার কাছাকাছি যেতে থাকা আরেকটা সার্ভে শিপের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে…

এককভাবে কেউ ব্যাপারগুলোকে সিরিয়াসলি নিবে না, সব একত্র করলে একটা প্যাটার্ন দাঁড়িয়ে যায়। টেড নিশ্চিত ডেভ বোম্যান কোনো না কোনো রূপে বেঁচে আছে, বলা ভাল টিকে আছে, এবং তার সম্পর্ক গ্রেট ওয়াল নামের মনোলিথটার সাথে। এখনো আমাদের ব্যাপারে তার আগ্রহ প্রচুর।

যোগাযোগের কোনো চেষ্টা করে না সে, কিন্তু টেড মনে করে আমাদের মধ্যে যোগাযোগ হওয়া সম্ভব। তার বিশ্বাস, আমিই একমাত্র মানুষ যে এ কাজ করতে পারবে….

এখনো মনস্থির করতে পারিনি। কাল কথা বলব ক্যাপ্টেন চ্যাভলারের সাথে। তখন জানতে পারবে তুমি। ভালবাসা- ফ্র্যাঙ্ক।

স্টোর

ট্রান্সমিট- ইন্দ্রা

২১. কোয়ারেন্টাইন।

‘তুমি কি ভূতে বিশ্বাস কর, দিম?

‘অবশ্যই নাঃ আর সব মানুষের মতো আমিও তাদের ভয় পাই, এই যা। হঠাৎ এ কথা তুললে যে?

‘ভূত না হয়ে থাকলে আমার জীবনের সবচে বিচিত্র স্বপ্ন, কোনো সন্দেহ নেই। কাল রাতে ডেভ বোম্যানের সাথে আমার কিছু বাতচিত হয়েছিল।’

পোল জানে, সময় এলে ক্যাপ্টেন চ্যান্ডলার তার কথায় মনোযোগ দিবে, হেলাফেলা করবে না। তাকে হতাশ হতে হল না।

ইন্টারেস্টিং- কিন্তু ব্যাখ্যা আছে একটা। তুমি এখন বোম্যান স্যুইটে বসবাস করছ ভায়া, ফর ডিউস সেক! তুমিইতো বললে, মনে হয় জায়গাটা ভূতুড়ে।

‘আমি নিশ্চিত- সত্যি বলতে কী- নিরানব্বইভাগ নিশ্চিত- তোমার কথাই ঠিক, আর প্রফেসর টেডের সাথে কথাবার্তার ফল এটা। আনুবিসে মাঝে মাঝে ডেভ বোম্যান দেখা দেয় একথা শুনেছ তুমি কখনো? প্রায় প্রতি শত বছরে একবার করে? যেমন হয়েছিল ডিসকভারি ঠিক করার পর সেখানে, ডক্টর ফ্রয়েডের সাথে?

কী হয়েছিল? আমি ভাসাভাসা গুজব শুনেছি। কান দিইনি কখনো।

ডক্টর খান দেয়- আমিও- আমি আসল রেকর্ডিংগুলো শুনেছি। আমার পুরনো চেয়ারটায় বসে আছে ফ্লয়েড। ডেভের মুখমন্ডলের আদল নিতে শুরু করল তার পিছনের ধূলাবালি। তখনি তাকে সেই বিখ্যাত মেসেজটা দিল। জানিয়ে দিল, ফিরে যেতে হবে।’

কিন্তু সেটাতো হাজার বছর আগের কথা।

তাতে কী এসে যায়? আমি আর খান গতকাল দেখছিলাম। জীবন নিয়ে বাজি ধরতে পারি, এতে কোনো ছল চাতুরি নেই।’

আসলে, তোমার সাথে আমিও একমত। রিপোর্টগুলোর কথাও শুনেছি…’

চ্যান্ডলারের কষ্ঠ আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে পড়ে, একটু বিব্রত মনে হয়।

অনেক আগে, এখানে, আনুবিসে আমার এক গার্লফ্রেন্ড ছিল। মেয়েটা বলে, তার দাদা দেখেছে ডেভ বোম্যানকে। খুব হেসেছিলাম তখন।’

কে জানে টেডের লিস্টে ঐ লোকটার নামও আছে কিনা! তুমি কি সেই বন্ধুর সাথে টেডের দেখা করিয়ে দিতে পারবে?

উঁ… ঠিক পারব না। অনেক বছর ধরে কোনো কথাবার্তা নেই। এতদিনে সে চাঁদে গিয়ে থাকতে পারে, থাকতে পারে মঙ্গলে- যে কোনো জায়গায়… যাই হোক, প্রফেসর টেডের এত আগ্রহ কেন?’

এ ব্যাপারটা নিয়েই তোমার সাথে কথা বলতে চাই।’

‘ভালইতো! গো এ্যাহেড।’

‘টেড মনে করে ডেভ বোম্যান, বা যাই সে হয়ে থাক না কেন, বসবাস করছে ইউরোপার ধারেকাছে কোথাও।

‘হাজার বছর পর?’

‘আসলে–আমার দিকে তাকাও।‘

‘একটা স্যাম্পল নিয়ে ভাল স্ট্যাটিস্টিক্স হয় না, আমার অঙ্ক প্রফেসর সব সময় বলত। আচ্ছা, বলে যাও।’

কাহিনীটা জটিল। বলা চলে জিস’- যেখানে অনেকগুলো পিস নেই। এটা মেনে নেয়া হয়েছে যে চার মিলিয়ন বছর আগে আফ্রিকায় ঐ কালো মনোলিথ আসার পর আমাদের পূর্বসূরীদের কপালে সাতিক কিছু ঘটেছিল। প্রাক-ইতিহাসের সব দান উল্টে দেয় এ একটা ব্যাপার। টুলস-উইপনস-রিলিজিয়নস… সবকিছুতে পরিবর্তন চলে আসে। আমাদের মধ্যে বিচিত্র কিছু ঘটিয়ে দিয়েছিল মনোলিথটা, তারপর সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পূজা-অর্চনা নেয়ার জন্য অপেক্ষা করেনি…’ ।

‘টেড খুব বিখ্যাত এক প্যালিয়োনটোলজিস্টের কোটেশন পেয়েছে, ‘টি এম এ জিরো আমাদের প্যান্টে কষে বিবর্তনীয় লাথি ঝেড়েছে।’ সে দাবি করে, লাথিটার সব দিক এখনো আমরা বের করতে পারিনি। তার মতে, আমাদের মতো একটা নিষ্ঠুর প্রজাতির উন্মেষ হবার কথা না। আমরা মস্তিষ্কের দিক দিয়ে অপূর্ণ, নাহলে সব সময় যুক্তির পথে চলতাম। সব প্রজাতিই বাঁচার জন্য কোনো না কোনো নিষ্ঠুর পন্থা বেছে নেয়, আমাদেরটা অনেক বেশি অমানবিক, অনেক বেশি খারাপ কাজ করেছি যা না করলেও চলত। আর কোনো জানোয়ার নিজ প্রজাতিকে এতটা কষ্ট দেয় না যেমনটা মানুষ মানুষের সাথে করে। এটা কি বিবর্তনের দূর্ঘটনা নয়, জেনেটিক বিপর্যয় না?

‘এখন কথাটা পরিষ্কার, টি এম এ-ওয়ান চাঁদে বসানো হয়েছে এ প্রজেক্টের উপর বা এক্সপেরিমেন্টের উপর নজরদারির জন্য। এটা বৃহস্পতিতে রিপোর্ট পাঠাবে। বৃহস্পতির আকাশই তখন এ সৌরজগতের কন্ট্রোলরুম। সেজন্যই সেখানে আরেক মনোলিথ, বিগ ব্রাদার অপেক্ষা করেছিল চল্লিশ লাখ বছর ধরে। আমরা সেখানে ডিসকভারি পাঠানো পর্যন্ত এটা কাজ করে গেছে, এ পর্যন্ত সব ঠিক তো?

হ্যাঁ। আমি সব সময় মনে করতাম এটা সবচে ভাল থিওরি।

‘এখন, আরো বিস্তারিত আসা যায়। হেউড ফ্লয়েড দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযানে এসব নিয়ে আরো মাথা ঘামায়। বয়স তখন একশোরও বেশি, তবু তার কথা ঠিক ধরে নেয়া যায়, ঠিক আছে?

সেতো বুড়ো হাবড়াদের মতো বিহেভ করে থাকতে পারে।

‘সব রেকর্ড দেখলে তা কিন্তু মনে হয় না। একই সাথে তার নাতি ক্রিস গ্যালাক্সির সাথে বাধ্য হয়ে ইউরোপায় নামার পর এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল। ঠিক সেখানেই এখনকার মনোলিথটা আছে। চারপাশে বাসা বেঁধেছে ইউরোপানরা…’ ।

‘এখনি দেখতে পাচ্ছি ডক্টর টেডের লক্ষ্যবস্তু। ঠিক এখানেই আমরা এসেছিলাম। এভাবেই পুরো বৃত্ত শুরু করছে তার কাজ।

তাই! তাই। প্রতিটা বিষয় খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। বৃহস্পতিকে শেষ করে দেয়া হয় তাদের উত্তাপ দেয়ার জন্য, কাছাকাছি একটা নক্ষত্র দেয়ার জন্য, বরফের ভিতর থেকে টেনে তোলার জন্য। আমাদের দূরে থাকতে হবে- দূরে থাকতে হবে কারণ আমরা তাদের উন্নয়নে নাক গলাতে পারি…’

ফ্র্যাঙ্ক, কোথায় আইডিয়াগুলো পেয়েছিলাম প্রথমে মনে পড়ছে। তোমার সময়কার কথা। স্টার ট্রেকের সিরিজগুলোয়।

‘একজন অভিনেতার সাথে দেখা হয়েছিল আমার, বলেছি নাকি? এখন আমাকে দেখলে তারা ভিড়মি খেত… যাই হোক, আফ্রিকায় ফলাফলটী ভাল হয়নি। বিপর্যয়কর রেজাল্ট…’

‘তাহলে পরেরবার ভাল হোক- ইউরোপা!

হেসে ফেলল পোল।

‘খান ঠিক এ কথাটাই বলেছিল।

‘তাহলে এখন আমাদের কী করা উচিৎ বলে মনে করে সে? সবচে বড় কথা, এসবের মধ্যে তুমি এলে কোত্থেকে?

প্রথমেই-ইউরোপার বুকে কী ঘটছে সে ব্যাপারটা আমাদের বের করতে হবে। কেন ঘটছে? স্পেস থেকে নজরদারি করাই সব নয়।

‘তাহলে আর কী করতে পারি আমরা? মিড যত ভোব পাঠিয়েছে তার সবই ল্যান্ডিংয়ের আগে জ্বলে যায়।

আর গ্যালাক্সি পাঠানোর পর থেকেই যে কোনো মনুষ্যবাহী জাহাজকে ফোর্স ফিল্ডের মাধ্যমে সরিয়ে দেয়া হয়। কী সেই ফোর্স ফিল্ড, কেউ জানে না। প্রমাণ হয়ে যায়, নিচে যা-ই নিয়ন্ত্রণ করুক না কেন, সে ধ্বংস চায় না। মৃত্যু চায় না। এখানেই আসল কথা। যাই থাক না কেন, সে স্ক্যান করতে পারে, জেনে ফেলতে পারে এগিয়ে আসা কোনো স্পেসশিপে মানুষ আছে আর কোনোটায় রোবট- কোনোটা জীবনবাহী আর কোনোটা নির্জীব- সব চিনতে পারে।

‘আমার চেয়ে ভাল পারে তাহলে বলে যাও।

‘এবং, টেড মনে করে সেখানে এমন কেউ আছে যে তার মানুষ বন্ধুকে চিনতে পারবে, একজনকেই নামতে দিবে।

ক্যাপ্টেন দিমিত্রি চ্যান্ডলার একটা লম্বা, নিচু লয়ের শিষ দেয় সাথে সাথে।

‘আর তুমি এ ঝুঁকিটা নিবে স্বেচ্ছায়?

হু। হারানোর কিছু নেই।’

একটা দামি শাটল ক্র্যাফট হারাবে। যদি তুমি ঠিকমত বলতে পারকী করবে… এজন্যই তুমি ফ্যালকন চালাতে শিখছ?

‘তুমি যখন বলেই ফেললে… আইডিয়াটা আমার মাথাতেও এসেছিল।

‘ভাবতে দাও। আমি যদি রাজিও হই, নানা ঝক্কি-ঝামেলা আছে। বুঝতেই পারছ..

যদ্দূর চিনি, তুমি চাইলে পথে সেসব কাটা থাকবে না।

২২. গ্যানিমিড থেকে ভালবাসা

মিস প্রিঙ্গল- পৃথিবী থেকে আসা প্রায়োরিটি মেসেজগুলো লিস্ট কর

রেকর্ড

প্রিয় ইন্দ্রা- নাটুকেপনা করতে চাই না, কিন্তু গ্যানিমিড থেকে এটাই সম্ভবত আমার শেষ মেসেজ। তুমি এটা হাতে পেতে পেতে আমি থাকব ইউরোপার পথে।

সিদ্ধান্তটা হঠাৎ নেয়া। সব যে হয়ে যাবে তা ভাবিনি। কিন্তু আগুপিছু ভেবেছি অনেক। তোমার সন্দেহ ঠিক, পিছনে থেকে কলকাঠি নেড়েছে টেড খান… আমি আর ফিরে না এলে সে-ই সব ব্যাখ্যা করবে।

ভুল বুঝোনা, প্লিজ- আমি এটাকে কোনো অর্থেই সুইসাইড মিশন হিসাবে ধরছি না। আবার এক জীবনে এমন সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করতেও রাজি নই। সম্ভবত বলা উচিৎ ছিল দু জীবনে একবার সুযোগ…

গোলিয়াথের ওয়ান পারসন শাটল ফ্যালকনে চেপে বসব- আহা, স্পেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশনে যদি একবার চালিয়ে দেখাতে পারতাম! দূর্ঘটনা তেমন ঘটবে না। বড়জোর ইউরোপার কাছ থেকে ফিরিয়ে দেয়া হবে… এতেও অনেক শিক্ষা হতে পারে।

আর যদি সেই মনোলিথ- মহাপ্রাচীর সিদ্ধান্ত নেয় আমি একটা রোবট, তাহলে কপালে পুড়ে মরা ছাড়া আর কিছু নেই। এ ঝুঁকি নিজ দায়ে নিচ্ছি।

থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভরিথিং, শুভকামনা রইল জোর জন্য। গ্যানিমিড থেকে ভালবাসা আর আশা করি, অচিরেই ইউরোপা থেকে পাবে…

স্টোর

ট্রান্সমিট

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *