১.৫ এক রাতের স্বর্গবাস

এক রাতের স্বর্গবাস

মুলতান। উপমহাদেশের একমাত্র বসতি। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সময় থেকে আজ পর্যন্ত নানা উত্থান-পতন, ভাঙা-গড়া, দখল-মুক্তির শত পট-পরিবর্তনেও যা অমুসলিমদের পদানত হয়নি। উপমহাদেশ থেকে মোগল শাসনের অবসান ঘটলেও মুলতান ছিল সব সময় ইংরেজ বেনিয়াদের কজামুক্ত। এগারো শতকে উপমহাদেশ জুড়ে হিন্দুদের দাপট থাকলেও মুলতান ছিল পৌত্তলিক পঙ্কিলতা মুক্ত। অথচ তখন মুলতানের আশপাশের সব রাজ্যে ছিল হিন্দু পৌত্তলিকদের জয়জয়কার।

১০০২ খৃস্টাব্দের ঘটনা। মুহাম্মদ বিন কাসিমের পর ভারতের পৌত্তলিকদের গড়া রাম-রাজ্যের ভিত্তিমূলে দ্বিতীয়বারের মতো আঘাত হানেন সুলতান মাহমুদ গজনবী। মাহমুদ গজনবীর আঘাতে কেঁপে উঠল পৌত্তলিকদের স্বর্গ-সিংহাসন। ভারতের সবচেয়ে প্রতাপশালী হিন্দু রাজা জয়পালের তিনটি হামলা প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেন। চিরতরে স্তব্ধ করে দেন জয়পালের আগ্রাসী থাবা। জয়পালকে রণাঙ্গনে বন্দী করে ফেলেন। জয়পাল আর যুদ্ধ না করার অঙ্গীকার করে মোটা অংকের মুক্তিপণের চুক্তি করে মুক্ত হয়ে রাজধানীতে ফিরে ছেলে আনন্দ পালকে সিংহাসন সোপর্দ করে জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দেয়। আনন্দ পালকে জয়পাল মুক্তিপণ আদায় করতে এবং ভবিষ্যতে সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত থাকতে ভবিষ্যদ্বাণী করে। মাহমুদ গজনবী পেশোয়ারের অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে পেশোয়ার কেন্দ্রিক শাসন ক্ষমতা নিজের কর্তৃত্বে নিয়ে নেন। যার ফলে মাহমূদের রাজধানী গজনী অনেকটা বহিঃশত্রুর আক্রমণ আশংকা থেকে নিরাপত্তা লাভ করে।

সুলতান মাহমুদ রাজা জয়পালকে বন্দী করার পর আড়াই লাখ স্বর্ণমুদ্রা মুক্তিপণের শর্তে মুক্ত করে দেন। সেই সাথে পঞ্চাশটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতি যুদ্ধ খরচ বাবদ দেয়ার অঙ্গীকার করে জয়পাল। জয়পাল রাজধানীতে ফিরে যথারীতি সুলতানের কাছে পঞ্চাশটি হাতি এবং আড়াই লাখ স্বর্ণমুদ্রা পাঠানোর কথা বলে চিতায় আত্মাহুতি দেয়। কিন্তু আনন্দ পাল পিতার জ্বলন্ত চিতার পাশে দাঁড়িয়েই। সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। আনন্দ পাল সেই সামবেশেই তার পিতার প্রতিশ্রুত মুক্তিপণ ও যুদ্ধ জরিমানা দিতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে।

রাজা জয়পালের আত্মাহুতির ঘটনাটি ঘটে ১০০২ খৃস্টাব্দে। দেখতে দেখতে দু’বছর চলে গেল। জয়পালের প্রতিশ্রুত জরিমানা নিয়ে আসার পরিবর্তে সুলতান মাহমূদের গোয়েন্দারা খবর নিয়ে এল, আনন্দ পাল মুক্তিপণ পরিশোধের পরিবর্তে তার বাবার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছে।

… “এটা আমার কাছে আদৌ আশ্চর্যের কোন খবর নয়” বললেন সুলতান। মানসিকভাবে এমনটির জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। আমি এ জন্যই জয়পালের এলাকা কজা করেছি যে, জয়পালের চেলা ও পরামর্শদাতাদের কাছে গজনী এখন আসমানের তারার চেয়েও দূরবর্তী মনে হবে। আল্লাহর রহমত ও আমার জানবাজ যযাদ্ধাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শুধু গজনী নয় ওদের আজীবন লালিত দুঃস্বপ্ন খানায়ে কা’বাকে আমি ওদের আগ্রাসন থেকে নিরাপদ করতে পেরেছি।”

“জয়পাল পরাজিত হয়ে কাপুরুষের মতো আত্মাহুতি দিয়েছে। এখন সিংহাসনে বসেছে ওর ছেলে, ওদের আমরা মোটেও পরোয়া করি না।” বলল এক সালার।

“দুশমনকে এভোটা খাটো করে দেখতে নেই বন্ধুরা! দুশমনদের ব্যাপারে সবকিছু গভীরভাবে ভাবতে হয়।” বললেন সুলতান। “রাজা ভয়পালের মৃত্যুতে পৌত্তলিকতার পূজারীরা সব মরে যায়নি। ভারত থেকে বিলীন হয়ে যায়নি মূর্তিভক্তি। এটা দু’টি আদর্শের লড়াই। হিন্দুরাজা যুদ্ধ করতে না চাইলেও ওদের ধর্মীয় পণ্ডিতেরা তাদেরকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করবে। ওদের এলিট শ্রেণী এবং মাতাব্বররা কখনও শাসকদের নির্বিকার থাকতে দেবে না। দুশমনের শক্তিকে কখনও ছোট করে দেখবে না। বরং এখন তোমাদের ভাবতে হবে, এই জাতশত্রুদের পা কিভাবে চিরদিনের জন্যে ভেঙে দেয়া যায়।”

“আপনি যদি আমাদের পরামর্শ গ্রহণ করেন, তবে অভিমত হলো– এখনই আমাদের লাহোরের দিকে অগ্রাভিযান করা উচিত। তবে এর আগে হিন্দুস্তানে আমাদের একটি ঘাঁটি তৈরি করতে হবে, যাতে আমরা আরো অগ্রসর হতে পারি এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমের হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পারি।” বলল অপর এক সালার।

“ঘাটি আমাদের আছে।” বললেন সুলতান। “মুলতানকে আমরা ঘাটি মনে করতে পারি। মুলতানের শাসক আবুল ফাতাহ দাউদ বিন নসর একজন মুসলমান এবং আমাদের সুহৃদ।”

“জাঁহাপনা! দাউদ বিন নসর মুসলমান বটে, কিন্তু সে একজন কারামাতী, আপনি কারামাতীদের অতীত ইতিহাস জানেন, তাদের উপর ভরসা করা ঠিক নয়।” বলল উজীর।

“সে তো সুলতান সুবক্তগীন মরহুমের সাথে মৈত্রীচুক্তি করে প্রয়োজনের সময় একে অপরকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। সে আমাদের ধোকা দিতে পারে না।” বললেন সুলতান।

“আলীজাহ! চিহ্নিত দুশমনের উপর নির্ভর করা যায় কিন্তু, স্বজাতির গাদ্দারদের বিশ্বাস করা খুবই কঠিন।” বলল উজির।

“আগামীকাল প্রত্যূষে একজন দূত পাঠিয়ে দিন। আমার বিশ্বাস, মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজয় ভূমি থেকে আমরা আশানুরূপ সহযোগিতা পাব। দাউদ বিন নসর হিন্দু বেষ্টিত এলাকায় থাকে, সে হিন্দুদের মনোভাব আমাদের চেয়ে ভাল জানে। আমার মনে হয়, আমাদের অভিযানের সংবাদে সে খুশি হবে। তার সহযোগিতা আমাদের যেমন প্রয়োজন, তারও আমাদের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। আমার ইচ্ছা, সেখানে সামরিক দূত পাঠাব।”

“এ কাজে আসেম ওমর সবচেয়ে উপযুক্ত। বাহাদুর, উদ্যমী এবং চৌকস সেনা অফিসার। কথা বলার কৌশল জানে ভাল।”

“আসেম ওমর। কে যেন আমাকে বলেছিল, সে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ভদ্রলোক।” বললেন সুলতান।

“যুদ্ধ-কৌশল ও সামরিক বিষয়াদি সম্পর্কে আসেম ভাল জ্ঞান রাখে। সে একটা বিষয় যেমন বুঝে অপরকেও বোঝাতে পারে। রণাঙ্গনে শত্রুসেনাদের সামনেও সে স্বাভাবিক ভাবটা ধরে রাখতে পারে। এটা তার একটা বড় গুণ।” বলল সিপাহসালার।

“আপনি যদি মনে করেন সে-ই উপযুক্ত, তবে আমার দ্বিমত নেই। ওকে ডেকে পাঠান।” বললেন সুলতান। “আমি তাকে মৌখিক পয়গাম দেবো । কোন লিখিত পয়গাম দেবো না। কারণ, তাকে শত্রু এলাকা অতিক্রম করে যেতে হবে। লিখিত পয়গাম শত্রুদের হাতে চলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।”

আসেম ওমর সুলতানের পয়গাম নিয়ে মুলতানের শাসক দাউদ বিন নসরের দরবারে হাজির হয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। দাউদ বিন নসর-এর দরবারের জাঁকজমক দেখে আসেমের মনে হলো, দাউদ বিন নসর যেন সারা ভারতবর্ষের মহারাজা। সুলতান মাহমূদ এবং সুলতান সুবক্তগীনের রাজদরবারে আসেম ওমরের মতো কর্মকর্তা কেন সাধারণ সৈনিকেরাও সুলতানের পাশাপাশি বসে কথা বলতে পারে, কিন্তু দাউদ বিন নসরের দরবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুউচ্চ রাজ আসনে বসা দাউদ বিন নসর। আসনের নীচে সব কর্মকর্তা দাঁড়ানো।

অবস্থা দৃষ্টে আসেম নিজেকে দাউদ বিন নসরের সামনে অতি নগণ্য মনে করল। কী শান-শওকাত দাউদ বিন নসরের। তার দু’পাশে পরীর মত অনিন্দ্য সুন্দরী যুবতীরা পাখায় বাতাস করছে। মাথার উপরে বাহারী শামিয়ানা, রঙ বেরঙের ঝাড়বাতি। নীচে সামনে অতি সাধারণ কয়েকটি আসনে মন্ত্রীপর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বসার ব্যবস্থা। ওরা দাউদ বিন নসরের সামনে পাথরের মূর্তির মতো স্থির।

“প্রজাদের ত্রাণকর্তা, মহামান্য রাজা! সুলতান মাহমুদ বিন সুবক্তগীনের দূত দরবারে উপস্থিত।” উচ্চ আওয়াজে ঘোষণা করল একজন ঘোষক।

আসেম ওমর এদিক সেদিক তাকাল। কিন্তু ঠাহর করতে পারল না, এ আওয়াজ কোত্থেকে এলো।

“গজনীর দূতকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি।” বলল দাউদ। “কি সংবাদ নিয়ে এলে?”

“আপনার জন্যে কিছু উপঢৌকন নিয়ে এসেছি।” হতচকিত হয়ে বলল আসেম। নিজেকে সামলিয়ে বলল, “আগে আপনার খেদমতে সেগুলো পেশ করার অনুমতি চাচ্ছি।”

“সুলতান মাহমূদ কি তোমাদেরকে রাজ-দরবারের আদব শেখায়নি?” কিছুটা তাচ্ছিল্য মেশানো কণ্ঠে প্রশ্ন করল দাউদ!

“আলীজাহ্! আমাদের ওখানে এমন দরবারের ব্যবস্থা নেই। সুলতানের অধিকাংশ মজলিস হয় কোন ময়দান কিংবা সাধারণ ঘরে। সেখানে আমরা সবাই একসাথে বসে কথা বলি।”

“এটা কোন যুদ্ধ ময়দান নয় সম্মানিত অতিথি! আমার এখানে কোন লোকের আমার অনুমতি ছাড়া কাশি দেয়াও বেয়াদবী।”

“সুলতান হয়তো আমাকে কোন ভুল জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমাকে বলা হয়েছিল, মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজয় স্মৃতিবাহী ভূমির সর্বশেষ শাসকের কাছে আমাকে পাঠানো হচ্ছে। আমি তো মনে করেছিলাম, শত শত মাইলের দূরত্ব অতিক্রম করে আসা আরব মুজাহিদের মতো মুহাম্মদ বিন কাসিমের স্মৃতিবাহী এ রাজ্যের শাসকও হবেন আরব যোদ্ধাদের মতো তাবুর অধিবাসী।”

“তোমাকে কে বলল, আমি মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্তরসূরী। তোমরা ইতিহাস সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। আমরা এখানকার বিজয়ী শাসক। আমার দাদা আহমদ খান লোদী এই এলাকা জয় করে শাসন ক্ষমতা অর্জন করেন। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলে কারামতী আদর্শের প্রবর্তক। তবুও আজকের জন্য তোমাকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের রাজ্য বলার অধিকার দেয়া হলো। আমরা মুসলমান। আমাদের ভিন্নধর্মী মনে করার কারণ নেই। কিন্তু আমাদের রাজদরবারের একটা নিজস্ব নিয়ম-কানুন রয়েছে বৈকি।”

“এসব আদব রক্ষা না করা যদি অপরাধ হয়ে থাকে তবে আমি দুঃখিত ও লজ্জিত। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারণ এ আদব সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। আমি কি উপঢৌকন পেশ করতে পারি?” বলল আসেম ওমর।

“হ্যাঁ, অনুমতি দেয়া হলো।”

“দরবারের বাইরে আসেম ওমরের চার সাথী দাঁড়ানো। উপঢৌকন ছিল তাদের কাছে। আসেম দ্রুত পায়ে দরবার থেকে বেরিয়ে তাদের গিয়ে বলল, তোমরা এগুলো নিয়ে চল। উপহার সামগ্রীর মধ্যে কিছু ছিল খুব দামী হিরা মণিমুক্তার অলংকার এবং গজনী এলাকার দামী আসবাব। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি জিনিস ছিল রাজা জয়পালের তরবারী। এই তরবারীটি সর্বশেষ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণের সময় সুলতানের কদমে উৎসর্গ করেছিল জয়পাল এবং বলেছিল, “দয়া করে আমাকে প্রাণভিক্ষা দিন। আর জীবনে কখনও আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দুঃসাহস করব না।”

আসেম ওমর অগ্রসর হয়ে তরবারীটি দাউদ বিন নসরের পায়ের কাছে রেখে দিল।

“কোন পয়গাম আছে কি?”

“আমাকে কি একাকী কথা বলার সুযোগ দেয়া হবে?”

দরবারীদের দিকে চোখ ফেরাল দাউদ। সবাই উঠে চলে গেল বাইরে। রয়ে গেল মাত্র দুটি যুবতী। এরা দাউদের কুরসীর পেছনে দাঁড়িয়ে তাকে বাতাস করছিল। দাউদের ইশারায় তার সিংহাসনের কাছে রাখা একটি আসনে গিয়ে বসল আসেম। ‘

“এই দরবারের নিয়ম-কানুন আমাকে রক্ষা করতেই হয়, না হয় শাসন কাজ চালানো খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।” কিছুটা নমনীয় কণ্ঠে বলল দাউদ। “এসব নিয়ম রক্ষা করা আমাদের একটা সমস্যা। আর আপনার জন্যে সমস্যা হয়েছে এসব আইন-কানুন সম্পর্কে জানা না থাকা। আচ্ছা, আপনি কি লিখিত কোন পয়গাম এনেছেন?”

“জ্বী-না। পথে শত্রুদের হাতে সংবাদ হস্তগত হওয়ার আশংকায় সুলতান কোন লিখিত পয়গাম দেননি। আমি সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডার। যেহেতু পয়গামটিও সামরিক কৌশল বিষয়ক, এজন্য সুলতান আমাকে পাঠিয়েছেন মৌখিক পয়গাম দিয়ে, লিখিত পয়গাম দেননি।”

“আপনি জানেন, রাজা জয়পাল পর পর তিনবার আমাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু প্রত্যেকবার সে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। প্রত্যেকবারই সে মোটা অংকের জরিমানা দিয়ে আর যুদ্ধ না করার অঙ্গীকার করেছে কিন্তু কোন অঙ্গীকারই সে রক্ষা করেনি। শেষ পর্যন্ত তাকে জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিতে হলো। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুত মুক্তিপণ তার স্থলাভিষিক্ত পুত্র আনন্দ পাল আজো পর্যন্ত আদায় করেনি। বরঞ্চ পিতার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তার সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নেয়ার খবর পেয়েছি আমরা।”

যে দুই যুবতী দাউদ বিন নসরের পিছনে দাঁড়িয়ে বাতাস করছিল এরা উৎকর্ণ হয়ে উঠল।

“আপনি জানেন যে, আমাদের রাজধানীকে নিরাপদ করতে আমরা লুগমান ও পেশোয়র কজা করে নিয়েছি। চুক্তি মতে পাঞ্জাব আমাদের শাসনাধীন। আনন্দ পাল ও পাটনার শাসক বিজে রায় আমাদের নিয়োজিত শাসক। সুলতানের অনুমোদন ছাড়া তাদের কোন নির্দেশ জারি করার অধিকার নেই–এরা আমাদের সুলতানের অধীনে তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা পালন করবে মাত্র। কিন্তু উভয়েই রাজা জয়পালের কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। তাই অন্যান্য হিন্দু রাজাদের নিয়ে এরা যাতে আবার সেনা অভিযান চালাতে না পারে সেজন্য সুলতান ইচ্ছা করছেন লাহোরে । অগ্রাভিযান করবেন। সুলতানের উদ্দেশ্য দুটি। শাসকদের পীড়ন থেকে সাধারণ নাগরিকদের মুক্তি দেয়া এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমের হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধার করে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা। বহু ত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত একটি মুসলিম রাজ্য আজ মূর্তির বাগাড়ে পরিণত হয়েছে, সেখানে আবার তাওহীদের তাকবীর ধ্বনি উচ্চকিত করাই সুলতানের উদ্দেশ্য।”

“এ পরিকল্পনায় আমরা কি করতে পারি।” জিজ্ঞেস করল দাউদ।

“যেহেতু আমি সৈনিক, এজন্য সামরিক ঢংয়ে কথা বলছি। আমরা বিজি রায় এবং আনন্দ পালের অবস্থানের মাঝামাঝি স্থানে একটি ঘাঁটি স্থাপন করতে চাচ্ছি। আপনি যেহেতু উভয়ের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করছেন এজন্য আপনার এলাকাকে ঘাঁটি স্থাপনের সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা বিবেচনা করছি। আমরা ঘাঁটি স্থাপন করেই মুসলমান অধিবাসীদের সেনাবাহিনীতে ভর্তি করতে শুরু করব। এতে আপনাদের যেমন ফায়দা হবে আমরাও অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব। এটা হবে উভয়ের জন্যে উপকারী। আমরা এখানে এলে আপনার দিকে চোখ। তুলে তাকানোর সাহস পাবে না পৌত্তলিকরা। প্রয়োজনের সময় আমরা একে অন্যের সহযোগিতা করতে পারব। এ ব্যাপারে সুলতানের প্রয়োজন আপনার পক্ষ থেকে নিশ্চিত আশ্বাস। আপনার কাছ থেকে আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা চাই যে, আমরা যখন পেশোয়ার থেকে মুলতানের দিকে অগ্রাভিযান করে আপনার এলাকা অতিক্রম করব তখন যদি বিজি রায় কিংবা আনন্দ পাল আমাদের পথ রোধ করে তবে পিছন থেকে অথবা এ পাশ থেকে আপনি ওদের উপর হামলা করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলবেন। তাহলে তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে আমাদের সুবিধা হবে। আমরা কখন-ই আপনাকে একা ছেড়ে দেবো না। প্রয়োজনে আপনার জন্য আমরা আমৃত্যু লড়ে যাব।”

”সুলতান মাহমূদ অভিযান পরিচালনা করতে চাইলে তিনি তা করতে পারেন। আমরা তো আর তাকে বাধা দিতে পারব না। কিন্তু দুই রাজশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো সৈন্য আমাদের নেই।” বলল দাউদ বিন নসর।

“আপনার জবাবে আশ্বস্ত হতে পারলাম না। আপনার কাছ থেকে এ জবাব নিয়ে গেলে সুলতান নিশ্চিত হতে পারবেন না। সেনারা তো আপনার মতো আমার মতো সেনাপতিদের কমান্ডে অগ্রাভিযান চালাবে, কাজেই সমূহ বিপদ আশংকার বিষয়টি আমাদেরকেই ভাবতে হবে। আমি আসার সময় এ অঞ্চলের পথ ঘাট দেখে এসেছি। এলাকাটি আমাদের জন্য নিরাপদ হলেও পাহাড়ের চূড়া থেকে তীরন্দাজদের টার্গেট হওয়ার আশংকা প্রবল। কাজেই সেনাবাহিনীর জন্যে পথটি মোটেও সুগম নয়। আপনার কাজ হবে আগে থেকে আপনি আপনার তীরন্দাজ সেনা ইউনিটকে ওই এলাকায় পাহারায় নিয়োগ করবেন, যাতে আমাদের সেনারা নিরাপদে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো অতিক্রম করতে পারে।”

“এ কাজ করতে হলে আমাদের তীরন্দাজদেরকে আমাদের প্রশাসনিক এলাকার বাইরে হিন্দুদের এলাকায় পাঠাতে হবে।” বলল দাউদ বিন নসর।

“লুগমান ও গজনী কখনও জয়পালের এলাকা ছিল না। অবশ্য লুগমান ও হিন্দ আমাদের এলাকাও ময়। কিন্তু জয়পাল আমাদের এলাকাতে সেনা অভিযান করেছে, এর জবাবে আমরা তাদের এলাকায় অভিযান চালাচ্ছি। আপনি কি একথা ভুলে গেছেন, যে এলাকা এরা শাসন করছে তা প্রকৃতপক্ষে মুসলিম সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমরা আমাদের ভূমি তাদের দখলমুক্ত করতে চাচ্ছি।”

গভীর চিন্তায় তলিয়ে গেল দাউদ। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, “আসলে আপনার সুলতানের চাহিদার জবাব তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া মুশকিল। এজন্যে আমার ভাবতে হবে। উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনা করতে হবে। আপনি এখানে চারদিন অপেক্ষা করুন। শহরের দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে দেখুন, আমি আমার উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করে নেই। আজ থেকে আপনি রাজকীয় অতিথি। আজ রাতে আপনার সম্মানে ভোজসভা হবে। সেই সভায় আপনার সম্মানে বড় ধরনের আপ্যায়ন ও বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে।”

সত্যিই নৈশভোজের আয়োজন ছিল রাজকীয়। অনুষ্ঠানের বিলাসী আয়োজন দেখে আসেম ওমরের চোখ ছানাবড়া।

প্রাসাদের বাগানে আয়োজন করা হলো নৈশভোজের। রঙ-বেরঙের ঝাড়বাতি, জরিদার শামিয়ানা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে মনমাতানো প্যান্ডেল। ঝাড়বাতিগুলো দেখে আসেমের কাছে মনে হলো, সোনা ও রুপার তৈরি কতগুলো জ্বলন্ত তারা। বহু বর্ণের ফানুস এবং জরিদার কারুকার্যময় শামিয়ানার সাথে ঝুলানো ঝাড়বাতিগুলোর নীচে অবস্থানরত মানুষগুলোর গায়ের রং যেমনই হোক না কেন সবাইকে ফর্সা আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী মনে হচ্ছিল।

অভাবিত এই মজলিসের বর্ণাঢ্য আয়োজনে আসেম এমনই প্রভাবিত হয়ে পড়ল যে, সে ঘোরের মধ্যে হারিয়ে গেল। মনে হতে লাগল, সে কোন স্বপ্নলোকে বিচরণ করছে। তবলার ও ঢোলের হাল্কা বাজনার তালে মঞ্চে একটি নর্তকী নাচের নানা মুদ্রা উপস্থাপন করছে। যেন একটি নাগিনী ফনা তুলে খেলছে শিকার নিয়ে। নর্তকী ষোড়শী যুবতী। দুই বাহু সম্পূর্ণ খোলা, পরনের কাপড় অতি সূক্ষ্ম। নাভীর নীচে কতগুলো রেশমী সূতোর পাকানো ঝালর দোল খাচ্ছে নাচের তালে তালে। এমন দোলনীতে তার উরুসন্ধি বারবার প্রকাশ পাচ্ছে। বুকের স্বল্পবসন তরুণীর যৌবনকে ফুটন্ত গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত করছে। তরুণীটি হয়তো এমনিতেই সুন্দরী, কিন্তু আলোর বর্ণাঢ্য রঙ-এর প্রতিবিম্ব ওকে এভোই মায়াবী ও মোহনীয় করে তুলেছে যে, ওর রেশমী চুলের বাহার আর রুপোর মতো দাঁতের মুক্তা ঝরানো হাসিতে অনুষ্ঠানের সকল পুরুষের দৃষ্টি ওর দিকে নিবদ্ধ হতে বাধ্য।

নর্তকীটি বাজনার উচ্চাঙ্গ তালে নাচতে নাচতে আসর কাঁপিয়ে হারিয়ে গেল। যেন কোন জলপরী জলতরঙ্গের মধ্যে খেলা করে হঠাৎ জলরাশির মাঝে তলিয়ে গেল। বাজনা বদলে গেল। নতুন করে শুরু হল অন্য সুর। এবারের বাজনার তাল লয় ভিন্ন, আরো উগ্র, আরো তীব্র। ঠিক এ সময়ে জলরাশির ভেতর থেকে যেন হঠাৎ করে দৃশ্যমান হলো আরেক নর্তকী। যেন কোন জলপরী পানির তলা থেকে ভেসে উঠেছে। এটি আগের তরুণীর চেয়ে আরো স্বল্পবসনা, আরো বেশি উদ্দীপক। এর নাচ ও তাল আরো মোহনীয়।

আসেম বিন ওমর দাউদ বিন নসর থেকে দূরে। শত শত মেহমানের সাথে উপবিষ্ট। সবাই জানে, আজকের এ আয়োজন সুলতান মাহমূদের বিশেষ দূতের সম্মানে। কিন্তু কে কোথায় আর মেহমানই বা কে সে খবর নেয়ার খেয়াল নেই কারো। সবার দৃষ্টি মঞ্চের নৃত্যরত কিশোরীদের দিকে। ওদের নাচ আর যন্ত্রীদের বাজনা সমবেত সবাইকে আবেগের শৃঙ্গে পৌঁছে দিল। যুবতীদের নাচের মুদ্রা আর শারীরিক কসরত থেকে চোখ ফেরানো কারো পক্ষেই সম্ভব হলো না। আসেম ওমর অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নর্তকীর প্রতি। এতো সুন্দর, এতো আকর্ষণীয় হতে পারে নারী, সে তা কখনও ভাবতেই পারেনি। নর্তকীর নিক্কনের ঝংকারে কোথায় যে হারিয়ে গেল আসেম তার খবর কে রাখে।

এর আগে শরীরের কাঁপুনি ঝাঁকুনি আসেম দেখেনি তা নয়, তবে সেই কাঁপুনি ঝাঁকুনি নর্তকীর নয়। যুদ্ধ ময়দানে আহত মৃত্যু পথযাত্রী সৈনিকদের, যুদ্ধরত সিপাহীদের যারা আহত হয়ে মাটিতে-মরুতে কিংবা পাহাড়ী পাথুরে জমিনে তড়পাতে তড়পাতে নিস্তেজ হয়ে চিরদিনের জন্যে স্থির হয়ে গেছে। গত বিশ বাইশ বছর যাবত আসেম দেখেছে যুদ্ধাহত সৈনিকের মৃত্যু যন্ত্রণার ছটফটানি। সেখানে দোস্ত-দুশমনের একই রঙ, একই কাতর ধ্বনি।

মাটি আর খুন এই দু’য়ের সাথে ছিল আসেমের মিতালী। রণাঙ্গনের ভয়াবহ দৃশ্য আসেমের প্রিয়। মরা এবং মারা এই ছিল আসেমের নেশা, ভালবাসা । আসেম তার সুলতানের চরিত্রেও এই রঙ-ই দেখে আসছে। সুলতানের দরবারে আসেম ধুলোবালির যে আস্তরণ দেখে, সেই ধুলো মাটির চরিত্র-আদর্শ সে সুলতানের মাঝেও দেখেছে। সুলতানের দরবারে এ ধরনের রঙিন ফানুস কল্পনা করাও মুশকিল।

দাউদ বিন নসরের দরবারে আসেম নৃত্যরত নর্তকীদের যে নাচের মুদ্রা দেখেছে, উদ্ভিন্ন যৌবনা উর্বষী তরুণীদের স্নায়ু উদ্দীপক যে অঙ্গভঙ্গি আসেম প্রত্যক্ষ করল, তাতে তার মধ্য থেকে যোদ্ধার আদর্শ বিলীন হয়ে মনের ভেতর ভোগবাদী লিপ্সা জেগে উঠেছে। ভেতর থেকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে আসেমের ঘুমিয়ে থাকা কাম প্রবৃত্তি। যুদ্ধ ময়দানের বীভৎস রক্তাক্ত রূপের প্রতি তার মনে জন্ম নিতে লাগল প্রচণ্ড ঘৃণা। যুদ্ধাহত সৈনিকের রক্ত-রাঙা চেহারা আর তপ্ত খুনের গন্ধ তার মনের মধ্যে তীব্র বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করল, তদস্থলে জন্ম নিল ভোগের উন্মাদনা। দাউদ বিন নসরের এই কামোদ্দীপক রগরগে আয়োজন আসেমের ভেতরকার যোদ্ধাকে অল্প সময়ের মধ্যে আমূল বদলে দিল। সে অনুভব করল যুদ্ধের ক্লান্তি, ক্ষুধা-পিপাসার যাতনা। তার দু’পা এখন রণাঙ্গনের অশ্বারোহণে অক্ষম। তার তাবৎ সাহস, শক্তি ও প্রশিক্ষণ বিলীন হয়ে সেখানে উঁকি দিল ভীরুতা এবং যুদ্ধাবেগের স্থান দখল করল যৌবনের উন্মাদনা।

তরুণী দু’টি নৃত্য প্রদর্শন করে চলে যাওয়ার পর এলো চৌদ্দ পনেরো বছরের এক বালক। বালক হলেও তার চেহারা তরুণীদের চেয়ে আরো বেশি মোহনীয়। বালকটি আরো বেশি যৌন উদ্দীপক নৃত্য প্রদর্শন করতে শুরু করল। বালকের সাথে সমান তালে সহযোগী হলো অন্য দুটি তরুণী। এরা প্রত্যেকেই স্বল্পবসনা। এদের যৌথ নৃত্য উপস্থাপনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল আসেম । তার দৃষ্টি ওদিকেই নিবদ্ধ। আশপাশের কোন খেয়াল নেই, কে কোথায় কি করছে।

ঠিক এ মুহূর্তে তার কানের কাছে রিনঝিন শব্দ। উপরের দিকে চোখ তুলল আসেম। দেখল, নর্তকীদের মতোই এক উষী যুবতী শ্বেত শুভ্র রুপালী তশতরী হাতে তার সামনে দণ্ডায়মান। হাতে একটি পানপাত্র। তরুণীর ঠোঁটে ঈষৎ মুচকী হাসি, এমন মোহনীয় হাসি কখনও প্রত্যক্ষ করেনি আসেম। তরুণীর সলজ্জ গ্রহণের আবেদন আর আপ্যায়নের মাদকীয় ভঙ্গি আসেমকে মর্তে নামিয়ে দিল।

আসেম তরুণীকে অনুচ্চ কণ্ঠে বলল, “এটা হয়তো শরাব। আমি শরাব পান করি না। আমি মুসলমান।”

“শরাব নয় শরবত।” আসেমের সামনের টেবিলে তশতরী রেখে শৈল্পিক ভঙ্গিতে পানপাত্র সুরাহী থেকে ভরে দিল তরুণী।

একটা শংকা মনে চেপে রেখেই পানপাত্র হাতে নিল আসেম। চুমুক দিল পান পাত্রে। মুহূর্তের মধ্যে অনুভব করল এক অজানা ভাল লাগার অনুভূতি। আসেম ওমর অনুভব করল এক অভাবিত স্বাদ-তৃপ্তি। সে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাল তরুণীর দিকে আহ্! কি স্বাদ! এ কি শরবত না জান্নাতের নেয়ামত! কিন্তু জিজ্ঞেস করার অবকাশ হলো না। তরুণীর চোখে চোখ পড়তেই ওর মাদকীয় হাসিতে হারিয়ে গেল আসেমের কণ্ঠ। আরো গভীর আবেশে তলিয়ে গেল আসেম । পুনরায় সোরাহী থেকে পানপাত্র পূর্ণ করে দিল তরুণী। অব্যক্ত ভঙ্গিতে নিবেদন করল, পান করুন সম্মানিত মেহমান! আপনাকে পান করিয়ে মাতাল করাই আমার কাজ। ভেসে চলুন স্বপ্নময় আগুনের দিকে। ইত্যবসরে আসেমের সামনে হাজির হল আরো বড় ধরনের একটি তশতরী নিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর বালক। এ তশতরিতে ভুনা করা পাখি। তশতরী থেকে ভাপ উঠছে। মন ভুলানো স্বাদের গন্ধ। সে গন্ধে যে কোন ভোজনবিমুখ মানুষও আহারে প্রলুব্ধ হতে বাধ্য।

আশপাশে একবার চোখ বুলাল আসেম। সমবেত প্রত্যেক মেহমানের সামনে এ ধরনের পাখি ভুনার করা পাত্র রাখা হচ্ছে।

তরুণী ও বালক চলে গেছে। এবার সাগ্রহে আসেম তশতরী থেকে তুলে নিল একটি ভুনা পাখি। এক লোকমা মুখে পুরে চুমুক দিল পেয়ালায়। পাখির স্বাদ আর শরবতের তৃপ্তি বিস্মৃত করে দিল আপন কর্তব্য। একের পর এক পাখি ও আর পানপাত্র ভরে গলাধঃকরণ করতে থাকল আসেম। তৃপ্তির সুখে ভাসতে অ লাগল অন্য এক আসেম।

এই ফাঁকে বার কয়েক তার কাছে এলো সেই তরুণী ও বালক। খালিপাত্র তুলে নিল আর ভর্তি পাত্র রেখে দিল। সেদিকে খেয়াল ছিল না আসেমের। ৬ কতগুলো পাখি আর কত গ্লাস পানীয় পেটে চালান করেছে সে আন্দাজও ছিল না তার। চোখ দুটো গোল হয়ে এলো। মাথা কিছুটা ভারী ভারী মনে হল। খাবার পরিবেশনকারিণী তরুণী তাকে হাত ধরে নিয়ে গেল একটি কক্ষে। অস্বাভাবিক সুন্দর পরিপাটি সাজানো কক্ষ। বিশাল এক পালঙ্ক। তুলতুলে তোষকের উপর রেশমী গালিচা। আসেম ঠিক মতো পা ফেলতে পারছিল না। কক্ষের দরজায় গিয়ে অনুভব করল, সে হয়তো ভুল করে শাহী কক্ষে ঢুকে পড়েছে। এমন বিলাসী বিছানা সে কল্পনা করতে পারছে না। কিন্তু তরুণী তাকে হাত ধরে বসিয়ে দিল পালঙ্কের উপর। মাথা থেকে পাগড়ী খুলে রেখে দিল পাশের। টেবিলে।

“আহ! যা পান করালে সেটাতো শরবত নয় শরাব!” জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাল সে তরুণীর দিকে।

“আমরাও মুসলমান। এখানে ওই ধরনের শরাব পান করা হয় না, কাফের বেঈমানরা যেসব শরাব পান করে। আমরা মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্তরসূরী। আমরা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি।” বলল তরুণী।

আবারো পানপাত্র থেকে গ্লাস ভরে মুখের কাছে ধরল তরুণী। তরুণীর আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারল না আসেম। পান শেষে যখন গ্লাস রেখে দিল তখন তরুণী আসেমের গণ্ডদ্বয় হাতে নিয়ে আদুরে স্পর্শে চোখে চোখ রাখল।

“এটাই জীবন জনাব! এটাই ইসলাম! এতে কোন সাজাও নেই কোন দেনাও নেই।” মাদকতা মেশানো ভঙ্গিতে বলল তরুণী।

আসেমের সামনে অর্ধনগ্ন তরুণী। সে তার ভুবন ভুলানো মোহিনী হাসি আর শরীরের মিষ্টি গন্ধে আপুত। আরো ঘনিষ্ঠ হলো তরুণী। আসেম তরুণীর উষ্ণতায় ভুলে গেল নিজের অবস্থান, কর্তব্য ও আত্মপরিচয়। তার মাথা গুলিয়ে গেল কাম তৃষ্ণায়। তার ঈমানের প্রদীপ নিভে গেল মদ, নারীর দমকা ঝাঁপটায়। ভেসে চলল আসেম আদিমতার নেশায়, জীবনের রঙীন ভেলায়।

সন্ধ্যায় যে সময়টায় মেহমানরা ভোজসভায় আসতে শুরু করে তখন। রাজপ্রাসাদে দাউদকে বাতাসকারিণী দুই তরুণীর একজন নির্জন কক্ষে এক প্রৌঢ়কে বলছিল– “মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিশেষ দূত দাউদ বিন নসরকে কি পয়গাম দিয়েছে। সেই তরুণীই নৃত্য চলার সময় আসেম বিন ওমরকে আপ্যায়নে সহযোগিতা করছিল আর প্রৌঢ় লোকটি দাউদের পাশে বসে সবকিছু প্রত্যক্ষ করছিল, আপ্যায়নও গ্রহণ করছিল।

সেই লোকটি দাউদকে বলল, “সুলতান মাহমুদের পয়গামে আপনার ভয় পাওয়ার কি আছে! রাজা আনন্দ পাল এবং বিজি রায় মহাশয়দ্বয় আপনার রাজ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাদের প্রতিনিধি হিসেবেই আপনার এখানে রয়েছি আমি। যে কোন সমস্যায় আপনার জন্যে রাজাদের ভরপুর সহযোগিতা নিতে পারব আমি। সুলতান মাহমূদ একজন সাম্রাজ্যবাদী। রাজ্য বিস্তারে হিন্দু মুসলমান তার কাছে সমান। আপনার লাভ ক্ষতিতে তার কিছু যায় আসে না। সে তার নিজের স্বার্থে আপনাকে ব্যবহার করতে চায় মাত্র।”

“আপনি কি আমার প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না?” প্রৌঢ়কে প্রশ্ন করল দাউদ। “আপনাদের সাথে যে মৈত্রীর বন্ধন যে কোন মূল্যে তা অক্ষুণ্ণ রাখতে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আপনি কি খেয়াল করেননি, ইসলামের আত্মশক্তিকে আমি কিভাবে বিদায় করেছি আমার প্রশাসন থেকে আপনি খেয়াল করেননি, মুসলমানদের হৃদয় থেকে আখেরাতের শাস্তি ও পুরস্কারের বিষয়াদি আমি কত কৌশলে নির্মূল করছি? আপনাকে কে ধারণা দিল যে, আমি সুলতান মাহমুদের প্রত্যাশা পূরণ করব? দেখুন না ওর জন্যে কি ব্যবস্থা আমি করেছি! যে মেয়েটিকে আমি দূতের সেবায় নিয়োগ করেছি, যে কোন কঠিন আদর্শের অধিকারী পরহেযগার মুমেনকেও সে তার যাদুকরী কৌশলে ঈমানহারা করতে সক্ষম। তাকে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দিয়ে সেভাবেই তৈরি করেছি। দেখবেন সে দূত বেচারাকে ভেড়া বানিয়ে ছাড়বে।”

“এটাই যথেষ্ট নয় জাঁহাপনা! এই ব্যক্তি যেমন সামরিক বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা, আমিও সামরিক বাহিনীর অফিসার। আমিও আপনাকে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেই পরামর্শ দিচ্ছি। আমার বিশ্বাস, আপনি সুলতান মাহমূদকে মোটেও পছন্দ করেন না। আপনি এটাও আশা করেন যে, সুলতান মাহমুদের মতো আপদকে দূরে রেখেই যাতে ঠাণ্ডা করে দেয়া যায়। এজন্য আপনি এই দূতকে ব্যবহার করতে পারেন। আপনি দূতকে বলে দিন, সুলতান মাহমুদের অগ্রাভিযানে তার সৈন্যদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন আপনি। এ আশ্বাসের ভিত্তিতে ওরা যখন এগিয়ে আসবে, তখন আনন্দ পালকে বলে তার সৈন্যদের আমি সুবিধা মতো জায়গায় বসিয়ে রাখবো। ধারণাতীতভাবে আনন্দ পালের সৈন্যরা খেল খতম করে দেবে।”

“দূতের ব্রেন ওয়াশের ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। দেখেননি, শরবত মনে করে কতো গ্লাস খাঁটি মদ গিলেছে বেটা। এরপর যেটুকু হুশ-জ্ঞান থাকবে, সেটুকুও দূর হয়ে যাবে মেয়েটির কৌশলী পরিচর্যায়।” বলল দাউদ।

আসেম ওমরের চার দেহরক্ষী দাউদ বিন নসরের দেহরক্ষীদের সাথে আহার করল। ওরা ঘুর্ণাক্ষরেও জানল না, তাদের দূত দাউদ বিন নসুরের বালাখানায় এক রাতের স্বর্গবাসে মত্ত।

যে আসেমের ঘুম ভাঙতো অতি প্রত্যূষে, সেই আসেম সূর্যোদয়ের সময়ও গভীর ঘুমে তলিয়ে রইল। বেলা অনেক উপরে উঠার পর চোখ মেলল আসেম। চোখ মেলেই ঘাবড়ে গেল সে। গত রাতের ঘোর কেটে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে উঠল তার কাছে। ঠিক এ সময়ে ঘরে প্রবেশ করল সেই তরুণী। তার মুখে স্মিত হাসি আর হাতে তশতরী।

আসেম তাকে লক্ষ্য করে বলল, “গত রাতে তুমি আমাকে গুনাহগার করে । দিলে। এখানে আমি বিশেষ এক কাজে এসেছিলাম। কিছুটা আতংকিত কণ্ঠ আসেমের।

তরুণী তশতরী টেবিলের উপর রেখে দুধের একটি গ্লাস আসেমের হাতে ধরিয়ে দিল কিন্তু আসেম টেবিলে রেখে দিল গ্লাস। বলল, “গত রাতে কি ঘটেছিল তা না বলা পর্যন্ত তোমার হাতের কিছুই আমি স্পর্শ করব না।”

“তুমি জাহান্নাম থেকে জান্নাতে এসেছে! বুঝলে? এটার নাম জীবন, এটাই জিন্দেগী। বেঁচে থাকার সার্থকতা এখানেই।” বলল তরুণী।

এমন সময় এক শ্বেতশুভ্র শশ্রুধারী দীর্ঘ জুব্বা পরিহিত সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ প্রবেশ করল সে কক্ষে। স্বগতোক্তি করতে লাগল– “হতভাগ্য তোমাদের বাদশাহ! যাকে তোমরা সুলতান বলে থাকে। তার প্ররোচনায় জীবনের এই স্বাদ এই প্রাপ্তিকে তোমরা পাপ বলছে। অথচ জীবনে এতটুকু ভোগ করার অধিকার তোমাদের প্রাপ্য। কিন্তু সে তোমাদের জীবনকে বিষাদময় করে দিয়েছে। জীবনের স্বাদকে তোমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অগণিত প্রাণের বিনিময়ে নিজের স্বর্গবাসকে নিশ্চিত করতে চায় সে। এজন্য তোমাদের দিয়ে সে যুদ্ধ করায়, রক্তের হোলি খেলে। আর নিজে থাকে নিরাপদে। কে তোমাদের বলেছে যে, ইসলামে আরাম-আয়েশ, এতটুকু বিনোদন হারাম?” বুদ্ধের বলার ঢঙ এবং ভাষার কারুকাজ এতো নিপুণ এবং কণ্ঠ এতো মধুর যে, আসেম ওমর রাতের তরুণীর মতো বুড়োর কাছে নিজেকে কখন সঁপে দিল টেরই পেল না। সে এতোটাই বুড়োর কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়ল যে, বুড়োর প্রতিটি কথাকে তার মনে হচ্ছিল জীবনের প্রতিচ্ছবি, সত্য ও বাস্তবতার প্রতীক।

আসলে এটা মানুষের সৃষ্টিগত সীমাবদ্ধতা। পাপ যখন পূর্ণ অবয়বে মানুষকে গ্রাস করে ফেলে তখন তার সাধারণ বোধটুকুও লোপ পেয়ে বসে, পাপকাজকেই তখন আকর্ষণীয় মনে হতে থাকে। পাপ কাজের পক্ষে তখন যুক্তি খুঁজে ফিরে মানুষের মন। অপরাধকে যৌক্তিকতার লেবেল এটে আরো অপরাধের গভীরে তলিয়ে যেতে যুক্তি সংগ্রহ করে মানুষ । আসেম ওমরের মন থেকেও ইসলামের বিধি-নিষেধ লোপ পেয়ে গেল। ভোগবাদিতায় গা ভাসানোর জন্যে তার পক্ষে দরকার ছিল কিছু যৌক্তিক সাপোর্ট। কিন্তু তা আসেমের মাথায় ছিল না। এই পণ্ডিত লোকটি সেই হারামকে হালাল করণের যৌক্তিক ভিত্তিগুলোই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করছিল। আসেমের এ মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল ভোগবাদের পক্ষে এ ধরনের যৌক্তিক বিশ্লেষণ। বুড়ো তাই পরিবেশন করছিল। আরো নিবিড়ভাবে গ্রহণ করতে শুরু করল আসেম বুড়োর যুক্তিগুলো।

আসেম ওমর ছিল সুলতান মাহমুদের সেনাবাহিনীর অন্যতম সেরা কমান্ডার। তাকে বিপথগামী করতে পারলে সহজেই সুলতান বাহিনীর বড় একটি অংশকে যুদ্ধবিমুখ করা সম্ভব। সে লক্ষ্যকেই সামনে রেখে হিন্দু রাজা আনন্দ পাল ও বিজি রায়ের নিয়োজিত প্রতিনিধির সাথে পরামর্শ করেছিল দাউদ।

আসেম ওমর কুচক্রীদের ফাঁদে ফেঁসে গেল। তার কাছে দাউদ পয়গাম পাঠাল, আজ রাজকীয় মেহমান হিসেবে গজনীর বিশেষ দূতকে শহরের দর্শনীয় জায়গাগুলোতে নিয়ে যাওয়া হবে। আসেমের জন্যে রাজকীয় ঘোড়ার গাড়ি আনা হয়েছে। যে গাড়িতে স্বয়ং দাউদ চড়ে থাকে। গাড়িটি চারটি বিশেষ ঘোড়া টেনে নেবে। সাথে দেয়া হলো দাউদের বিশেষ নিরাপত্তা রক্ষীদের ক’জন। বিশেষ পোশাকে সজ্জিত এরা। আসেমকে নিয়ে যাওয়ার প্রোগ্রাম হলো সমুদ্রতীরের মনোরম দর্শনীয় জায়গায়।

রাজকীয় বিলাসী ব্যবস্থাপনায় আসেম ভুলে গেল নিজের কর্তব্য কাজ। সে এখন নিজেকে বিশেষ সম্মানিত বোধ করতে লাগল। তার মধ্যে জন্ম নিল রাজা রাজা মনোভাব। সাথীদের খোঁজ-খবর নেয়ার কোন প্রয়োজন বোধ করল না সে। তারা কোথায় আছে, কিভাবে আছে, সে খবর নেয়ার সুযোগ তার নেই। ওদেরকেও রাজপ্রাসাদ থেকে জানিয়ে দেয়া হলো, আজ তাদের দূরে ভ্রমণের প্রোগ্রাম করা হয়েছে। ইচ্ছে করলে তারাও এই সুযোগে শহর ঘুরে দেখতে পারে। সুযোগ পেয়ে তারাও শহর দেখতে বেরিয়ে পড়ল।

* * *

একজন ভাবগম্ভীর, সুদর্শন বুযুর্গ লোকই মনে হচ্ছিল তাকে দেখে। পরিধেয় পোশাক, মুখের দাড়ি আর কথা বলার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল, লোকটি বড় ধরনের আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তি। একটি উঁচু দেয়াল ঘেরা বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে থেমে গেল, যখন তার চোখে পড়ল চারজন সৈনিক ধরনের লোকের আগমন। ওদের পোশাক দেখেই তিনি আন্দাজ করেছিলেন, এরা মুসলমান সৈনিক এবং এখানে নবাগত। এদের মুলতানের অধিবাসী মনে হলো না, ভারতীয় মনে করাও কঠিন। বুযুর্গ লোকটি চারজনের পথ রোধ করে দাঁড়াল। মুচকি হেসে বলল, “আপনারা গজনীর অধিবাসী?”

তারা চারজন থেমে গেল এবং হেসে হ্যাঁ সূচক জবাব দিল ।

“আপনারা কি একটু সময়ের জন্যে আমার ঘরে আসবেন? আমাকে আপনাদের মেহমানদারী করার সুযোগ দিয়ে ধন্য করবেন?” ফারসী ভাষায় বললেন তিনি।

“পরবাসে নিজের মাতৃভাষার আহ্বানে কালবিলম্ব না করে সবাই তার অনুগামী হল। আপ্যায়নের ফাঁকে অতিথিরা জানাল তারা কমান্ডার আসেম ওমরের নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে গজনী থেকে এখানে এসেছে। কমান্ডার আসেম ওমর সুলতানের বিশেষ বার্তা নিয়ে দাউদ বিন নসরের এখানে এসেছেন।

“আসেম ওমর এ মুহূর্তে কোথায়?” জিজ্ঞেস করলেন বুযুর্গ।

“আমরা তাকে শাহী গাড়িতে সওয়ার হয়ে ভ্রমণে বের হতে দেখেছি।” জবাবে বলল এক নিরাপত্তারক্ষী।

“আমি আসেম ওমরের সাথে সাক্ষাত করতে চেয়েছিলাম কিন্তু জানতে পারলাম, সে এখন তার নিরাপত্তারক্ষীদের সাথেও সাক্ষাতের প্রয়োজন বোধ করছে না।” বলল লোকটি।

“কেন? কি হয়েছে?” বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জানতে চাইল এক নিরাপত্তারক্ষী। “এমন কিছু ঘটেনি তো যে তাকে বন্দী করে ফেলা হয়েছে? আর বন্দিশালায় না খেয়ে কষ্ট যাতনায় মৃত্যুবরণ করতে হবে তাকে!”

“সে বন্দিদশা অনেক ভাল যে বন্দিদশায় মানুষ কষ্ট দুর্ভোগ পোহায়, কষ্ট যাতনায় মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু যে জিঞ্জিরে আপনাদের কমান্ডারকে বাঁধা হয়েছে, তা খুব জটিল। এই জিঞ্জিরে মানুষ কষ্ট পায় না বটে কিন্তু তার ভেতরের বিবেক বোধ, ঈমানী শক্তি মরে যায়, সৈনিকের মধ্যে জন্ম নেয় ভীরুতা। এটা এমন এক জিঞ্জির যা হলো নারীর রেশমী চুল আর ঘোড়শী যুবতীদের দেহবল্লরীর মাদকতার বাঁধন। যে কোন সৈনিক এ ধরনের বন্দিদশার শিকার হলে সে সৈনিকের আর যুদ্ধ করার মুরোদ থাকে না, সে হয়ে পড়ে নারীর আঁচলে বাধা পোষা জন্তু। আচ্ছা, গতরাতের নৈশভোজে কি আপনারাও অংশগ্রহণ করেছিলেন?”

“না। আমাদেরকে ভিন্নভাবে খাবার দেয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানে আমাদের নেয়া হয়নি।” বলল এক নিরাপত্তাকর্মী।

“ওকে গতরাতে শরাব পান করানো হয়েছে এবং গতরাত সে এমন এক যাদুকন্যার বাহুডোরে ছিল যাকে এক কথায় আমরা মায়াবিনী বলে জানি।” বললেন বুযুর্গ।

“আপনিও কি সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন?”

“না, আমি ওখানে যাইনি। দাউদ শাহীর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমার কান ও চোখ সময় সময় শাহী মহলের দিকে তাক করা থাকে। ভেতরের সব খবর আমার জানা। দাউদের কাছে আসেম কি পয়গাম নিয়ে এসেছে সে খবরও আছে আমার কাছে।”

“তাহলে ভয়ের ব্যাপারটি কি?”

“আশংকার ব্যাপার হলো, আসেম সুলতানের বিশেষ দূত হিসেবে এসেছে বটে, কিন্তু সে দাউদ ও হিন্দুরাজাদের কাছে আত্মবিক্রি করে তাদের চর হিসেবে গজনী ফিরে যাবে। আসেম সুলতানের জন্যে এক কঠিন প্রতারণার ফাঁদে পরিণত হবে। আমি ভাবছিলাম, কি করে আসেম অথবা আপনাদের সাথে সাক্ষাত করি। কোন সুযোগই করতে পারছিলাম না। সৎ উদ্দেশ্য থাকলে যে কোন কাজে আল্লাহ্ সাহায্য করেন। আপনারা শহর দেখতে বের হলেন, আর এই সুযোগে আল্লাহ আপনাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ করালেন। আমার ভীষণ দুশ্চিন্তা এখন দূর হয়ে গেল।”

“আমাদেরকে বলা হয়েছে, মুলতান একটি ইসলামী রাজ্য।” বলল একজন নিরাপত্তারক্ষী। অপর একজন বলল, “মুসলমান হওয়ার কারণে সুলতান সুবক্তগীনের সময় থেকেই দাউদ বিন নসর আমাদের সুহৃদ।” ।

“আমি আশ্চর্যান্বিত হয়েছি এই ভেবে যে, সবকিছু জানা থাকার পরও সুলতান মাহমুদ কি করে আপনাদের এখানে পাঠালেন এবং প্রকৃত অবস্থা গোপন রাখলেন!

তো আমার কাছ থেকে জেনে রাখুন। যাতে আপনারাও আপনাদের কমান্ডারের মতো ওদের জালে আটকা না পড়েন।”

“… মুলতানের শাসন ক্ষমতা কেরামতীদের হাতে। এরা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে বটে কিন্তু তাদের আকীদা বিশ্বাস সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থী। যেমন– এরা আখেরাত বিশ্বাস করে না। এরা বিশ্বাস করে, বেহেশত দোযখ দুনিয়াতেই। আখেরাতে শাস্তি-পুরস্কার বলতে কিছু নেই। এরা ইসলামের হারাম হালালকে অস্বীকার করে। ব্যভিচার ও মদপানে উৎসাহিত করে। তারা মনে করে, মানুষকে আল্লাহ্ তা’আলা সৃষ্টিই করেছেন ভোগ-বিলাসের জন্যে এবং ইসলামের হারাম হালালের বিষয়টি সম্পূর্ণ অবান্তর। এরপরও মুসলমানদের ধোঁকা দিতে এরা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে। প্রকৃতপক্ষে এরা হিন্দু, খৃস্টান ও ইহুদীদের চেয়েও জঘন্য, ছদ্মবেশী ভয়ংকর দুশমন। আব্দুল্লাহ এবং মাইমুন নামের দু’ আরব এ মতবাদের উদ্ভাবক। কোন আরব দেশ থেকে তৃতীয় হিজরী শতকে এদের উত্থান শুরু। তবে এই মতবাদের মূল জনক এক খৃস্টান যাজক। ইহুদীদের সমর্থন ও সহযোগিতাও রয়েছে এদের পিছনে। কারো মতে ইরানের এক বড় অংশ এই কেরামতী মতবাদের অনুসারী।

এ থেকেই বোঝা যায়, এই বাতিল ফেরকা কেন সৃষ্টি করা হয়েছে। ইসলাম যখন রোম সাগর পেরিয়ে অর্ধেক পৃথিবী তৌহিদের আলোকে উদ্ভাসিত করে তুলে, তখন খৃস্টান ও ইহুদী পাদ্রী ও ধর্মযাজকদের টনক নড়ে। এরা বুঝেছে, কোন সত্য ধর্মকে তার অনুসারীদের হত্যা করে নিঃশেষ করা যায় না। তারা অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছে, সত্য ধর্মের অনুসারীদের যদি ধর্মের আবরণে বিভ্রান্ত করা যায় তবেই তাদের ঈমানী শক্তিকে বিনষ্ট করে দেয়া সহজ। এ হলো একটা পদ্ধতি। অন্য পদ্ধতি হলো, সেই ধর্মের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও শাসকবর্গকে ধৰ্ম-বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করা। শাসকদেরকে ভোগবাদী ও বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তোলা ।…

মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দৈহিক চাহিদা। যৌন চাহিদা মানুষের সহজাত বিষয় এবং তা পবিত্র বিধিমালার আওতায় প্রশংসনীয় বটে কিন্তু এটাই আবার বিধি-নিষেধের পরিপন্থী পন্থায় চরিতার্থ হলে চরম কদর্য হয়ে দাঁড়ায় । আল্লাহর কাছে তা মারাত্মক অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। তাই আমাদের চির শত্রুরা আমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও শাসকবর্গকে বিপথগামী করতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে নারী, মদ ও বিত্ত-বৈভব।

ইহুদী খৃস্টানরা আব্দুল্লাহ্ ও মাইমুনকে অপরিমেয় ধন-সম্পদ ও তাদের প্রশিক্ষিত নারী সরবরাহ করে ভৃত্যে পরিণত করে। এরা এদেরকে ব্যবহার করে মুসলিম শাসকবর্গকে বিলাসী ভোগবাদিতায় অভ্যস্ত করতে সক্ষম হয়। ওদের কাজকর্ম সম্পূর্ণ ইসলাম বিবর্জিত হলেও সব বিষয়ে ইসলামের লেবেল এঁটে দেয়। যার ফলে মুসলমানরা বিভ্রান্তির শিকার। দৃশ্যত এরা ইসলামের নাম ব্যবহার করে ভেতরে ভেতরে ইসলামের মৌল আকীদা, হারাম-হালাল, পরকালের আযাব-গযব ও জবাবদিহিতার অনুভূতিটুকুও মানুষের মন থেকে মুছে দিতে তৎপরতা চালায়। আর প্রচার করে, এটাই প্রকৃত ইসলাম। ধর্মান্ধ মুসলমানরা নাকি ইসলামের প্রকৃত রূপ বদল করে মানুষের কাছ থেকে ভোগবাদিতার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে। কত জঘন্য এদের কর্মকাণ্ড! কারামাতীরা প্রচার করে, মৃত্যুর পর জান্নাত জাহান্নাম বলতে কিছু নেই। এ সবই নাকি আলেমদের মনগড়া বিষয়। প্রত্যেক মুসলমানের মৌলিক অধিকার রয়েছে দুনিয়াতে সবকিছুর স্বাদ নেয়া এবং ভোগ করার। দুনিয়াতেই জান্নাত জাহান্নাম। যে কেউ ইচ্ছে মতো তার জীবনকে জান্নাতী সুখে ভরে নিতে পারে।…

স্বভাবত মানুষ ভাল কাজের দিকে ধীর লয়ে অগ্রসর হয়, কখনও পিছিয়েও আসে। কিন্তু মন্দ কাজের প্রতি মানুষ খুব দ্রুত অগ্রসর হয়। কারামাতীরা মানুষের এই সহজাত শক্তিটাকে কৌশলে ব্যবহার করছে। ২৯০ হিজরী সনে কারামাতীরা সিরিয়ার ব্যাপক জনসংখ্যাকে বিভ্রান্ত করে সেখানে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ঘটাতে সক্ষম হয়। এক পর্যায়ে সেখানে তারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেয়। ৩১১ হিজরী সনে এরা বসরা ও কুফা শহরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও লুটতরাজ চালিয়ে শহর দুটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। আবু তাহের নামের এক কুখ্যাত দস্যুকে তারা সে সময় ক্ষমতায় বসিয়ে মক্কা মুয়াজ্জিমাকেও দখলে নিতে সক্ষম হয়েছিল এই কারামতী গোষ্ঠী।

কারামাতীরা এক পর্যায়ে পবিত্র হাজরে আসওয়াদকে কা’বা গাত্র থেকে সরিয়ে বসরায় স্থানান্তরিত করে। প্রায় বিশ বছর হাজরে আসওয়াদ বসরায় ছিল ওদের কজায়। এরপর আল্লাহ্ ওদের শাস্তি দিতে শুরু করেন। হালাকু খান ওদের মৃত্যুদূত হিসেবে আভির্ভূত হন। হালাকু খানের আক্রমণে কারামাতীদের অধিকাংশ অনুসারী নিহত হয়। যারা বেঁচে থাকে তারা পালিয়ে ইরানে পাড়ি জমায়। ইরানেও ওরা স্থির থাকতে পারেনি। ইরানী স্থানীয়দের তাড়া খেয়ে শেষ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশে এসে বসতি স্থাপন করে। ওই বিতাড়িত কারামাতীদের উত্তরসূরীদেরকেই আজ আপনারা দাউদ বিন নসরের সুরতে দেখছেন।

দাউদ বিন নসরের দাদা আহমদ খান কারামাতী মুলতানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। সে ইসলামের সহীহ আকীদায় বিশ্বাসী মুসলমানদেরকে হত্যা করে, জুলুম অত্যাচার চালিয়ে এমন ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যে, ওদের মোকাবেলায় দাঁড়াবার মতো কেউ আর বেঁচে ছিল না। সকল প্রতিদ্বন্দ্বি শক্তিকে নিঃশেষ করে কারামাতীরা প্রচার করতে শুরু করে, আমরা যে ইসলাম প্রচার করি সেটিই সত্যিকার ইসলাম। অত্যাচার উৎপীড়ন ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আহমদ খান একটি অনুগত গোষ্ঠী তৈরি করে নেয় এবং মুলতানে কারামাতী শাসন প্রতিষ্ঠা করে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের স্মৃতিবাহী এই মুলতান। সারা দুনিয়ার ইহুদী খৃস্ট শক্তি এদের সহযোগী। কিন্তু বাইরে থেকে মুসলমানরা এদের অপকর্ম ততোটা অনুধাবন করতে পারে না বলে এদেরকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের পদাঙ্ক অনুসারী মনে করে বিভ্রান্তির শিকার হয়। প্রকাশ্যে এরা হিন্দুদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখলেও নেপথ্যে দাউদ বিন নসর হিন্দুদের প্রধান সহযোগী এবং হিন্দু পৃষ্ঠপোষকতাই তার প্রধান শক্তি। কারামাতীদের দীর্ঘ ইতিহাস আপনাদেরকে এজন্য শুনাচ্ছি যে, যদি দাউদ সুলতানকে সহযোগিতার ওয়াদা করে তবে তা মারাত্মক প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। আপনারা যাতে এদের ভালভাবে চিনতে পারেন এজন্যই আমার এতোসব বলা।”

“আসেম ওমর কি পয়গাম নিয়ে এলেন এ ব্যাপারে আপনি অবগত হলেন কিভাবে?” প্রশ্ন করল এক নিরাপত্তাকর্মী। “আপনি কি করে জানলেন, রাতের বেলায় সে মদ পান করেছে? আপনি কি এখানে গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করছেন?”

“না। আমি কোন গোয়েন্দা নই। আমি সুলতান মাহমূদেরও নিয়োগকৃত গোয়েন্দা নই। আমি মুহাম্মদ বিন কাসিমের আত্মার সন্তান। তারই উত্তরসূরী। আমরা সেই মহান ব্যক্তিদের বংশজাত– মুহাম্মদ বিন কাসিমের সাথে যারা এখানে এসে সত্যিকার ইসলাম প্রচারে আত্মনিবেদন করেছিলেন। আমরা কারামাতীদের বিপরীতে সত্যিকার ইসলাম প্রচারে গোপন সংগঠন গড়ে তুলেছি। আমাদের নিজস্ব লোক রাজমহলের ভেতরে কাজ করে। ভেতরের সকল সংবাদ তাদের মাধ্যমে আমরা পেয়ে থাকি। দাউদ বিন নসর ব্যক্তিগতভাবেও জানে, তার বিরুদ্ধে একটি গোপন শক্তি সক্রিয় রয়েছে, কিন্তু সে আমাদের কখনও চিহ্নিত করতে পারেনি। আমরা খুবই সতর্কভাবে কাজ করি। আমাদের প্রত্যেক সদস্য সুশিক্ষিত, বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। পুরুষ ছাড়াও অনেক মহিলা রয়েছে আমাদের সংগঠনে। তারা প্রত্যেকে ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদায় বিশ্বাসী। তারা সৎ, আমানতদার ও পরহেযগার। দাউদ যদি আমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযানের পরিকল্পনা করে তবে আগেই আমরা এর খবর পেয়ে যাই, তার পক্ষে আমাদের কার্যক্রম চিহ্নিত করা মোটেই সহজ নয়।”

“এখন আমাদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত?”

“আগে আপনাদেরকে এ বিষয়টি বুঝতে হবে, দাউদ আপনাদের সুহৃদ নয়, সে হিন্দুদের সুহৃদ। সেই সাথে আপনাদের দূতবেশী কমান্ডারের উপরও রসা ত্যাগ করতে হবে। সে যদি সুলতানের কাছে মুলতানে সেনা অভিযানের পরিকল্পনা পেশ করে তবে আপনারা সুলতানকে দাউদের প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে বলবেন। তিনি যদি হিন্দুদের পদানত করতে সেনা অভিযানে আগ্রহী হন তবে সর্বাগ্রে মুলতানের কারামতী আখড়াকে নির্মূল করতে হবে।

আমি আপনাদের এ আশ্বাস দিচ্ছি, ইসলামের নামে প্রতারণা করে কেউ রক্ষা পায়নি। দাউদেরও শেষ রক্ষা হবে না। যারাই ইসলামের নামে প্রতারণা করেছে ধ্বংস হয়েছে। দাউদের ধ্বংসও অনিবার্য।”

“তাহলে আমাদের আগে দেখতে হবে, কমান্ডার আসেম ওমর কি করেন।” বলল এক নিরাপত্তারক্ষী। তিনি তো দাউদের ফাঁদে পা নাও দিতে পারেন। যদি দেখি তিনি দাউদের ফাঁদে পা দিয়েছেন, তাহলে আপনি যা বলেছেন সে তথ্য সুলতানকে জানাব।”

* * *

দাউদ বিন নসরের সামনে উপবিষ্ট আসেম ওমর। তাদের সামনের টেবিলে একটি মানচিত্র।

“এ মানচিত্র আপনি সাথে নিয়ে যেতে পারেন।” বলল দাউদ। “আমি আপনাকে সুলতানের সেনাবাহিনীর জন্যে নিরাপদ পথ বলে দিলাম। চুন্নাব নদী পার হওয়ার জায়গাটিও বলে দিয়েছি।”

“আপনি যে পথের কথা বললেন, সে পথে আনন্দ পাল ও বিজি রায়ের সৈন্যরা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে। আমার কাছে তো পথটি অনিরাপদ মনে হচ্ছে। এ জটিল পথে আপনি কিভাবে আমাদের নিরাপত্তা দেবেন?” বলল আসেম।

দাউদের উত্তরে আশ্বস্ত হতে পারল না আসেম। দাউদের কথা ও তার প্রতিশ্রুতিকে সামরিক দৃষ্টকোণ থেকে যাচাই করতে শুরু করল আসেম। আসেমের মনে দাউদের কথায় সন্দেহ উঁকি দিল। সন্দেহ নিরসনকল্পে বহু প্রশ্ন করল আসেম। আসেমের অভাবিত জিজ্ঞাসায় দাউদ ভেবাচেকা খেয়ে গেল।

“আর কদিন কি এখানে আছেন না আপনি?”

“কর্তব্যের খাতিরে আমাকে যেতে হচ্ছে। নয়তো আমার আর ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছিল না।”

“কর্তব্যের ব্যাপার হলে সেই কর্তব্য আমি যেভাবে বলি সেভাবে পালন করুন। আপনি সুলতানকে এ পথে এনে আপনি আমাদের কাছে চলে আসুন। আপনি আমাদের এখানে এলে সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব সোপর্দ করা হবে আপনাকে। আর আরাম-আয়েশ যা পাচ্ছেন সেসব সব সময়ের জন্যে স্থায়ী করে দেয়া হবে।”

“আপনি যদি মাহমূদকে আমাদের পাতানো ফাঁদে আটকে দিতে পারেন, তবে আমি আপনাকে এ অঙ্গীকার দিচ্ছি, আমার রাজ্যের কিছু এলাকা ছেড়ে দিয়ে স্বাধীন শাসন কাজ চালানোর ব্যবস্থা করে দেবো আপনাকে। যুদ্ধ ময়দানে এতে কৃতিত্ব অর্জনের পর জীবনে কিছুটা আরাম-আয়েশ করার অধিকার অবশ্যই আপনার আছে। মানুষতো আর দুনিয়াতে বারবার আসে না!”

শ্বেত শুভ্র শ্মশ্রুধারী লোকটি যে ধরনের কথা বলেছিল দাউদের মুখেও সে ধরনের কথা শুনতে পেল আসেম। দাউদ বলল, “হিন্দুদের চেয়ে পরোপকারী কোন সুহৃদ আপনি ইহজগতে পাবেন না। আপনি হিন্দুদের সাথে মিশে দেখুন না! সুলতানের ইচ্ছার বলী হয়ে জীবনটাকে তিলে তিলে ধ্বংস করে কি লাভ? আগামীকাল সকালেই চলে যান। সুলতানকে গিয়ে বলুন–দাউদ বিন নসর আপনাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছে এবং অগ্রাভিযানের পথও বলে। দিয়েছে।”

সেই দিন বিকেলের ঘটনা। আসেম ওমর তার কক্ষে চার নিরাপত্তারক্ষীকে ডেকে পাঠাল। তাদের বলল, “আগামীকাল সকালেই আমি রওয়ানা হবো।” আসেম তাদের প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়ে বিদায় গ্রহণ করল।

তারা মহলের একটি গলিপথে নিজেদের থাকার ঘরে ফিরে যাচ্ছিল। এমন সময় পিছন দিক থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। তারা একটি মহিলাকে তাদের দিকে আসতে দেখল। মহিলাটি তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের দিকে না তাকিয়েই অনুচ্চ আওয়াজে নিজের ভাষায় ও ইঙ্গিতে বলল, “তোমাদের একজন এখনই ওই বুযুর্গ ব্যক্তির বাড়িতে চলে যাও, যার বাড়িতে তোমরা মেহমান হয়েছিলে।” মহিলাটি আর কোন কথা না বলে তার মতো করে ওদের অতিক্রম করে চলে গেল।

তাদের একজন তখনই গিয়ে সেই বুযুর্গ ব্যক্তির দরজায় কড়া নাড়ল। তিনি নিজেই দরজা খুলে তাকে ভেতরে নিলেন।

“আসেম ওমর কেরামাতীদের ফাঁদে আটকে গেছে।” বললেন বুযুর্গ। “সে দাউদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। চুক্তি মতো তাকে একটি মানচিত্র দিয়ে দেয়া হয়েছে, যে পথে সুলতানের বাহিনী নিয়ে আসবে সে। আপনারা আগামীকাল সকালেই এখান থেকে রওয়ানা হচ্ছেন। আপনারা সুলতানকে গিয়ে বলবেন, যাকে আপনি মুসলমান ও সুহৃদ মনে করছেন সে শত্রুতায় হিন্দুদের চেয়েও জঘন্য। কোন অবস্থাতেই আসেমের বলা পথে সেনাভিযানের চিন্তা যেন সুলতান করেন। আপনি জলদি এ দেশ থেকে চলে যান। পথে কোন সময় নষ্ট করবেন না।”

“আচ্ছা ওই মহিলাটি কে? যিনি আমাদের একজনকে আপনার সাথে দেখা করার সংবাদ দিলেন?” জিজ্ঞেস করল নিরাপত্তারক্ষী।

“সে এক ভাগ্য বিড়ম্বিতা নারী।” বললেন বুযুর্গ।

“আপনারা হয়তো তার সৌন্দর্য দেখে থাকবেন। তাকে তার মা-বাবা মোটা অংকের পণের বিনিময়ে এক চরিত্রহীন ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে বিয়ে দেয়। লোকটি দাউদের সাথে সুসম্পর্ক অটুট রাখার স্বার্থে নিজের স্ত্রীকে উপহার হিসেবে দিয়ে দেয়। দাউদ দু’বছর তাকে হেরেমে রেখে রাজকর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করে। মেয়েটি যেমন সুন্দরী তেমনই বুদ্ধিমতি, পড়ালেখাও জানে। সে ছিল আমার মেয়ের সহপাঠিনী। এই সুবাদে সে আমার বাড়িতে প্রায়ই আসে। আমার মেয়ের সাথে সময় কাটায়, কথাবার্তা বলে। ভাগ্যবিড়ম্বনার জন্য প্রথম দিকে সে খুব কান্নাকাটি করতো, কিন্তু আমার মেয়ের মাধ্যমে আমি তাকে যখন বলেছি, এই জাহান্নামের ভেতরে থেকেও তুমি ইচ্ছে করলে ইসলামের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পার, তখন সে দুঃখ বুকে চেপে আমাদের সহযোগিতা করতে শুরু করে। এর মাধ্যমে সব ধরনের শাহী ফরমান ও পরিকল্পনা আমরা আগেই জানতে পারি। সে যথাসময়ে আমাদের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেয়। প্রশাসনিক কাজে সে খুবই দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছে এবং নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হিসেবে রাজমহলে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজ দাউদ বিন নসর যখন আসেমকে ডেকে একান্তে হিন্দুদের তৈরি মানচিত্র দিয়ে ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকাতে রাজ্যদানের টোপ দিল তখন এই মেয়েটি তাদেরকে পানীয় ও শরাব পরিবেশন করছিল। দাউদের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করে এই মেয়ে। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল তাদের কথাবার্তা। ওখানকার কাজ শেষ হলেই সে আমার এখানে এসে সব বলে গেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুলতানকে আপনার আস্থায় নেয়া যে, আসেম ওমর যে প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছে তা প্রতারণার ফাঁদ আর আপনি যা বলবেন তা সঠিক।”

“এই মহিলা কি নিয়মিত আপনার নিকট যাতায়াত করে?” জিজ্ঞেস করল নিরাপত্তারক্ষী। “সে কি রাজমহল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পায়? তাকে কোথাও পাঠিয়ে দেয়ার কথা কি আপনি কখনও ভেবেছেন? কোন মুসলমান যদি ওকে নিয়ে কোন নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে চায় এবং বিয়ে করে। তা কি সম্ভব?”

“অনেকবার ওকে এই নরক-যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করার কথা ভেবেছি। কিন্তু নির্ভরযোগ্য এমন কোন মুসলিম যুবক পাইনি যে তাকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় সংসার গড়তে পারে। আজকেও সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনাদের কেউ যদি সাহস করেন তবে সে আপনাদের কারো সাথে গজনী চলে যেতে আগ্রহী। ওকে কেউ বিয়ে না করলেও কোন বুযুর্গ ব্যক্তির সেবা করেও জীবন কাটিয়ে দিতে রাজী।”

“আমরা ওকে সাথে নিয়ে যেতে চাচ্ছি। কিন্তু সবার গোচরে ওকে নিয়ে পথ চলা মুশকিল হবে। ওকে যুদি আমাদের যাত্রা পথের কোন জায়গায় শহর থেকে দূরে কোথাও আমাদের সাথে মিলিত করা যায় তবে সাথে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। অবশ্য আসেম ওকে সাথে নিয়ে যেতে বাধ সাধবে। সে দিকটা আমরা সামাল দেবো।” বলল নিরাপত্তারক্ষী।

পরদিন খুব ভোরে সূর্যোদয়ের অনেক আগেই কমান্ডার আসেম চার সঙ্গীকে নিয়ে গজনীর পথে রওয়ানা হল। তাদের সাথে নতুন যোগ হলো দাউদ বিন নসরের উপঢৌকন বোঝাই করা একটি উট। এক সৈনিকের বর্শার সাথে বেঁধে দেয়া হল সাদা পতাকা। যা শাসকদের পক্ষ থেকে দেয়া তাদের জন্যে নিরাপত্তার প্রতীক।

আসেমের কাফেলা শহর অতিক্রম করে নদী পেরিয়ে গেল। আসেম ওমর আসার সময় সাথীদের সাথে নানা খোশগল্পে পথ অতিক্রম করেছিল। সঙ্গীরা ও তার মধ্যে তেমন কোন আভিজাত্যের বিভেদ ভাব ছিল না তখন। কিন্তু ফেরার পথে সেই আসেম অন্য মানুষ। এখন সে সবার থেকে আগে আগে চলছে। কারো সাথে কোন গল্প করার মনোভাব তার নেই। কথা দু’চারটি যা বলছে, সেগুলোর সবই হয়তো সঙ্গীদের প্রতি নির্দেশ নয়তো দিক নির্দেশনামূলক। তার মধ্যে এখন রাজকীয় ভাব। মাথাটা যেন আগের চেয়ে উঁচু হয়ে গেছে এক হাত। আচরণে স্পষ্ট অহমিকার ছাপ।

সূর্য প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা। একটা ঘন জঙ্গলাকীর্ণ এলাকার ভেতর দিয়ে তারা যাচ্ছে। আসেম তাদের থেকে অনেকটা আগে। হঠাৎ এক সাথী অন্যদের ইশারায় বলল, দেখো তো ঝোঁপের আড়ালে দুটি লোকের অবস্থান মনে হয় কি-না। ওদের চোখ এবং দেহের কিছু অংশ আবছা অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছিল। অন্যরাও তাকে সমর্থন করল এবং বলল, মনে হয় বুযুর্গ ব্যক্তি সেই মহিলাকে এখানে পৌঁছিয়ে দিয়েছে।

তারা গত রাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংকল্পবদ্ধ হলো। তাদের একজন ঘোড়া থামিয়ে ধীরে ধীরে ঘন-জঙ্গলের দিকে অগ্রসর হল। বাকীরা আসেমের অনুগামী হল। সৈনিক একটু অগ্রসর হলেই সেই যুবতাঁকে দেখতে পেল। সে একটি ঘোড়ায় আরোহিত। সাথে একজন পুরুষ। লোকটি যুবতাঁকে সৈনিকের কাছে সোপর্দ করে নীরবে চলে গেল। যুবতাঁকে নিয়ে সৈনিক কিছুক্ষণ সেখানেই বসে রইল। এরা চোখের ভাব বিনিময় ও মুচকি হাসি ছাড়া কেউ কারো কথা পরিষ্কার বুঝতে পারে না। যুবতী ও সৈনিকের ভাষা ভিন্ন। যুবতী যখন ইঙ্গিতে সৈনিককে বলল চলুন, তখন সৈনিক তাকে চুপ করে বসে থাকতে অনুরোধ করল।

সূর্য ডুবে চারদিকে অন্ধকার নেমে এলো। সাথীদেরকে তাবু টাঙ্গিয়ে বিশ্রামের নির্দেশ দিল আসেম। আসেম যখন দেখলো, লোক একজন কম তখন অন্যদের জিজ্ঞেস করল, সে কোথায়? সবাই বিস্ময় প্রকাশ করল এবং অবজ্ঞাও দেখালো কিছুটা। বলল, সব সময় পিছনে পিছনে থেকেছে। বলছিল তার কাছে নাকি মুলতান খুবই ভাল লেগেছে। সে থেকে যাবে। আরেকজন বললো, কে জানে কোন বারবণিতাকে নাকি ভাল লেগেছে তার। ওখানেই ফিরে গেছে হয়তো।

আসেম ওদের প্রতি খুবই ক্ষোভ প্রকাশ করল। ওরাও আসেমের কথায় দৃশ্যত অনুতাপ করল। একজন বলল, “ওকে খোঁজা অর্থহীন। পশ্চাদ্ধাবন করেও কোন লাভ নেই। কে জানে কখন পালিয়েছে। আমরা তো স্বপ্নেও ভাবিনি ও এমন করে পালাবে।”

দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গেল আসেমের চেহারা। বহুক্ষণ পর বলল, “ঠিকই বলেছ, ওকে খোঁজা অর্থহীন। তার চেয়ে বরং ও যেখানে যেতে চাইছে সেখানেই চলে যাক।”

এতো গুরুত্বপূর্ণ একজন সাথীর হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটিও খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি আসেমকে। কারণ তার নিজের প্রাণই তো পড়ে রয়েছে দাউদের প্রাসাদে। তার তনু মনে এখনও পেয়ালা আর রমণীর উষ্ণতার অনুভব।

নিরাপত্তারক্ষী যদি কোন রমণীকে মন দিয়ে থাকে তো আর বেশি কি দিয়েছে। আসেম নিজেকেই তো বিক্রি করে দিয়েছে দাউদের কাছে। ঈমান বিলীন করে দিয়েছে তরুণীর দেহের উষ্ণতায় মদের পেয়ালায়। শরীরটা শুধু যাচ্ছে গজনীর দিকে, আসেমের মনটা বাঁধা মুলতানের প্রাসাদে। তাই সাধারণ একজন সৈনিকের পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা তাকে কতটুকু আর প্রভাবিত করবে। নিজের কাছেই আসেমকে রাজা রাজা মনে হচ্ছে। সৈনিক তো দূরের কথা, খোদ সুলতানেরই কোন গুরুত্ব নেই তার কাছে।

কল্পনাও করতে পারেনি আসেম– সে যখন তিন নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে বিশ্রাম করছে, তখন তার হারিয়ে যাওয়া সৈনিক এক যুবতাঁকে নিয়ে গজনীর পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

– প্রথম খণ্ড সমাপ্ত –

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *