অঙ্কুর – ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

অঙ্কুর – ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

রাত তখন কত তা বলতে পারব না। কেননা আমি ঘড়ির দিকে তাকাই নি। হঠাৎ কলিংবেলটা বেজে উঠতেই ঘুম ভেঙে গেল। জিরো পাওয়ারের আলোটা জ্বলছিল তাই সুখশয্যা ছেড়ে টিউব লাইটের সুইচটা অন করলাম। আলো জ্বলে উঠতেই কলিংবেল থেমে গেল।

দরজা খোলার আগে সাড়া দিলাম—কে?

বাইরে টক টক শব্দ।

আবার বললাম—কে?

—একবার দরজাটা খুলুন না?

নারীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। এই প্রচণ্ড শীতের রাতে কেরে বাবা! বললামকাকে চাই?

—আমি ডাক্তার সেনকে চাইছি। বিশেষ দরকার।

নিশ্চয়ই কোন ডেলিভারি কেস। গাইনি হওয়ার বড় জ্বালা। অথচ উপায় নেই। প্রসূতি এবং নবজাতকেরা জীবন মরণ সমস্যা হলে যেতেই হবে। এই মফঃস্বল শহরে। আমি আসবার পর থেকে ঠাকুরের কৃপায় একবারও ব্যর্থ হইনি। আমার হাতে যেসব শিশু জন্মগ্রহণ করেছে তারা সবাই সুস্থ। কাজেই এই অঞ্চলে ডাক্তার হিসেবে আমার যথেষ্ট সুনাম হয়েছে।

আমি চোর ডাকাত বা দুষ্ট লোকের ভয় করি না। তার কারণ এখানকার মানুষজন খুব ভালো। এরা আর যাই করুন না কেন আমার কোন ক্ষতি করবে না। করলে এরাই বিপদে পড়বে। আমি গভীর রাতে এলাকা থেকে বহুদূরে ভাঙা বাড়ির এক কোণে পড়ে থাকা যন্ত্রণাকার ভিখারিনীকেও বিনা পারিশ্রমিকে সন্তান প্রসব করিয়ে এসেছি। আবার অনেক প্রাসাদোপম অট্টালিকার ভেতরেও বৃষ্টি বাদল মাথায় নিয়ে হাজির হয়েছি মধ্যরাতে।

আবার টক টক শব্দ—দরজাটা খুলুন। আমি নির্ভয়ে দরজা খুললাম।

দরজার সামনে বোরখা ঢাকা এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রচণ্ড শীতে শির শির করে কাঁপছেন তিনি।

–বলুন।

-আপনিই কি ডাঃ সেন? আমি একটা ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।

—ভেতরে আসুন।

মহিলা ভেতরে এলে দরজা বন্ধ করলাম। যদিও এটা আমার নীতিবিরুদ্ধ ও করলাম রাত গভীর এবং শীতের দাপট বেশি বলে। সারা গায়ে শালটা মুড়ি দিয়ে আরামকেদারায় বসে মহিলাকে বসতে বললাম।

মহিলা বসতে বসতে বললেন—এমন অসময়ে আপনাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে সত্যিই খুব অন্যায় করেছি। অথচ বিশ্বাস করুন এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না।

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না ব্যাপারটা কি। কে এই রহস্যময়ী? এত রাতে আমাকেই বা তার কিসের প্রয়োজন? তবে এই মুহূর্তে আমাকে যে শীতের কামড় খেয়ে বাইরে বেরতে হবে না তা বেশ বুঝতে পারলাম।

শুধু বুঝতে পারলাম না এই বোরখার আড়ালে যিনি লুকিয়ে আছেন তিনি কি রকম। কুমারী না সধবা? যুবতী না বিগতযৌবনা? তবে তার শ্বেত-শুভ্র দুটি হাত ও পায়ের পাতা দেখে বুঝলাম যে বোরখার আড়ালে এক বিদ্যুত্বর্ণা লুকিয়ে আছেন।

তিনি কিছু বলছেন না দেখে আমিই বললামবলুন, এত রাতে আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন?

মহিলা কি যেন বলতে চাইলেন অথচ বলতে পারলেন না। তাঁর গলাটা একবার একটু কেঁপে উঠল শুধু।

আমি বললাম-এই প্রচণ্ড শীতে এত রাতে এসেছেন, আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়ই? একটু কফি খাবেন?

সুরেলা গলার মহিলা বললেন—পেলে ভালো হয়। আমি উঠে গিয়ে হিটারে জল গরম করতে দিলাম।

—আপনি একা থাকেন বুঝি।

-হ্যাঁ। তবে আমার একজন লোক আছে। বেচারি বুড়ো মানুষ। পাশের বাড়িতে থাকে। একটু কফির জন্য তাকে আর ডাকলাম না।

–এ ব্যাপারে আমি কি আপনাকে একটু সাহায্য করতে পারি? অবশ্য যদি আপনার সংস্কারে না বাধে।

–না না, ও কিছু নয়। আমার কোন সংস্কার নেই। তবে আপনি আমার অতিথি। আর এই কাজে আমি অভ্যস্থ। তাই–।

—আপনার বউ নেই?

—আমি এখনো বিয়ে করিনি।

কথা বলতে বলতেই কফি তৈরি করলাম। এক কাপ নিজে নিয়ে এক কাপ এগিয়ে দিলাম তার দিকে। রহস্যময়ী নারী কফির পেয়ালাটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আমার দিক থেকে একটু সরে গিয়ে আমার দিকে পিছন হয়ে ঘরের চারিদিক দেখতে দেখতে কফি খেলেন।

এই সময় আমার খুব ভয় হল। কে ইনি? এমন স্পর্ধা কি করে হল? রাত দুপুরে ঘরে ঢুকে ঘরের চারিদিক এইভাবে দেখার মানে কি?

আমি একটু গম্ভীর হয়ে বললাম— শুনুন, আপনি কি বলতে চান তা চটপট বলে ফেলুন। এখন অনেক রাত। আমার চোখে ঘুম আছে তার ওপর এই শীতে আমি আপনাকে বেশিক্ষণ সময় দিতে পারব না।

মহিলা মৃদু হেসে আমার সামনে টি-পটে কফির শূন্য পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে বললেন—খুব ভয় পেয়ে গেছেন, না? ভাবছেন নিশ্চয়ই কোন জিন কবরখানা থেকে উঠে এসেছে। অথবা বোরখার আড়ালে লুকিয়ে আছে কোন ফুলন দেবী।

আমার মনের ভাব ঠিক বুঝতে পেরেছেন তো? আশ্চর্য। অসাধারণ বুদ্ধিমতী মহিলা। বললামনা, মানে সারাদিন রোগিনীদের সংস্পর্শে থাকার ফলে আমি খুব ক্লান্ত। আবার সকাল থেকেই শুরু হরে পরিশ্রম। তাছাড়া এক্ষুণি এই মুহূর্তেই হয়তো কোন মরণাপন্ন প্রসূতির জীবন রক্ষার জন্য ছুটতে হবে, কিংবা কোন নবজাতককে দেখাতে হবে পৃথিবীর আলো। কাজেই আমারও তো বিশ্রামের প্রয়োজন।

রহস্যময়ী এবার আমার মুখোমুখি বসলেন। তারপর বললেন—আমি অত্যন্ত বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি। আপনি যদি আমার একটু উপকার করেন তাহলে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। নাহলে হয়তো আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে।

—সেকি।

—হ্যাঁ। সে ভারি লজ্জার কথা।

আমি বললাম—শুনুন। রাত দুপুরে আমি কোন অচেনা মহিলার লজ্জার কথা শুনতে রাজি নই। সবে ডাক্তারি পাশ করে মফঃস্বল শহরের এই হাসপাতালে চাকরিটা জুটিয়েছি। এটাকে আমি খোয়াতে চাই না। আপনি কে, কেন এবং কোথা থেকে এসেছেন কিছুই বুঝতে পারছি না। এই অবস্থায় কোন জরুরি কল নিয়ে হঠাৎ কেউ এসে পড়লে আমার ঘরে আপনাকে দেখবে। তাতে আমার বদনাম হবে।

—আয়্যাম স্যরি ডক্টর। আমার বক্তব্য আমি এখুনি পেশ করছি।

–তার আগে আপনার মুখের, ঢাকাটা সরাতে হবে। আপনার মুখ না দেখলে আমি কথা বলব না।

বাঃ! বেশ বললেন তো? রাতদুপুরে আপনি পরস্ত্রীর মুখ দেখবেন? ছিঃ ছিঃ। আপনার মতো লোকের এ মানায় না।

—আপনি তাহলে যেতে পারেন।

বলার সঙ্গে সঙ্গেই নেকাবটা সরে গেল। আর এক পরমাসুন্দরীর মুখ প্রকাশিত হল সেই কালো নেকাবের আড়ালে। ঈশ্বর তার তুলির টানে এমন একটি মুখ এঁকেছেন যে সে মুখের তুলনা নেই। শুধু নেকাব নয়, বোরখার আড়াল থেকেও সেই মুর্তে রাজহংসীর মতো যে শরীরটা বেরিয়ে এলো তা দেখে অস্থির না হয়ে থাকতে পারে না কেউ। আমি চোখের পাতা ফেলতেও ভুলে গেলাম। বেশ কিছুদিন আগে এই এলাকায় একবার এই বিদ্যুত্বর্ণাকে দূর থেকে দেখেছিলাম। তখন বোরখা ছিল না। দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। মনে আছে চোখে চোখ পড়তেই চোখের ভাষায় মৃদু ধমক দিয়ে বিদ্যুতের মতো সরে গিয়েছিলেন উনি। আর আজ এই গভীর রাতে যৌবনের পশরায় রূপের প্রদীপ জ্বেলে সেই তিনি যে এমনভাবে আমার ঘরে এসে হাজির হবেন তা কি ভাবতে পেরেছিলাম?

এবার আমারই গলা কাঁপার পালা—আ-আ-আপনি।

-হ্যাঁ আমি। মিসেস হেনা আলম।

—আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

—কি করে বুঝবেন? আমার এই রূপ যে বিধ্বংসী অগ্নিশিখা। তাই তো একে বোরখা দিয়ে ঢেকেছিলাম। দেখতে চাইলেন বলেই দেখালাম। যাক, যে কথা বলতে এসছিলাম। আপনাকে আমার একটা উপকার করতে হবে।

—আই মাস্ট ডু ফর ইউ।

—আমি সাত মাসের প্রেগন্যান্ট। আমার এটাকে অ্যাবরশান করাতে হবে।

আমি শিউরে উঠলাম—মিসেস আলম। একি বলছেন আপনি?

—যা বলছি ঠিকই বলছি ডাক্তার।

—আমি জানি আপনি অত্যন্ত অভিজাত পরিবারের বউ। আপনার স্বামী বর্তমান। এ ক্ষেত্রে এই ব্যাপারে তাঁরই আসা উচিত ছিল। তার বদলে এই গভীর রাতে আপনি।

—আসতে বাধ্য হয়েছি। কেননা অ্যাবরশানের ব্যাপারটা অত্যন্ত গোপনীয়। আমার স্বামীর অজান্তেই এটা আমি করাতে চাই।

-কিন্তু ….।

—এর মধ্যে কোন কিন্তু নেই ডাক্তার।

—আপনি অন্যত্র যেতে পারেন। কারণ আমি এসব কাজ করি না। যদিও আমি গাইনি তবুও শিক্ষার ঐ দিকটা আমি বেছে নিইনি। তার কারণ আমার ধর্ম মানুষকে পৃথিবীর আলো দেখানোর সুযোগ করে দেওয়া। তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া নয়। বিশেষ করে প্রথম অবস্থায় হলেও একটু ভেবে দেখতাম। কিন্তু এখন বাচ্চাটার পুরো বডি ফর্ম করে গেছে। এই অবস্থায় ও কাজ আমার পক্ষে অসম্ভব।

হেনা আলম দু’হাতে আমার হাত দুটি জড়িয়ে ধরলেন। ওঁর পরশে আমি দুর্বল হয়ে পড়লাম। সেটা বুঝতে পেরে আমার দুটি হাত ওঁর বুকের মধ্যে টেনে নিলেন উনি। সে কি দারুণ উন্মাদনা। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম কিন্তু কেন আপনি এ কাজ করতে চলেছেন?

—এই সন্তান আমার বাঞ্ছিত নয়।

—তাহলে আগে আসেননি কেন?

—তখন বুঝতে পারিনি সে আমাকে এইভাবে ঠকাবে বলে।

–কে সে?

—আপনি আচ্ছা লোক তো? কোন নারী কি পারে তার গোপন প্রেমিকের কথা পর পুরুষকে বলতে?

এই শীতেও আমার তখন ঘাম দেখা দিল।

হেনা আলম আমার আরো কাছে এগিয়ে এলেন। উঃ সে কি মদির উষ্ণতা। আমাকে যেন পাগল করে দিল। হেনা আলমের সুললিত করুণ কণ্ঠস্বর আবার শুনতে পেলাম—ডাক্তার!

-বলুন।

 —আমার উপকার করবেন না?

–না। এ কাজ আমি করি না।

–আপনাকে আমি অনেক টাকা দেবো। আমার গায়ের সমস্ত গয়না দেবো। বিনিময়ে আপনি আমার এই উপকারটুকু করুন।

–মিসেস আলম, আপনি একটু কষ্ট করে অন্য কোথাও চলে যান। —উপায় থাকলে যেতাম।

—উপায় নেই বলেই এত রাতে লুকিয়ে এইভাবে এসেছি। সুইসাইড করলে এক্ষুনি আমার সমস্ত প্রবলেম সলভ হয়ে যায়; কিন্তু আমি বাঁচতে চাই ডাক্তার!

—আমি আপনাকে বাঁচাতে পারলাম না।

হেনা আলম উঠে দাঁড়ালেন। তারপর করুণ চোখে একবার আমার দিকে। তাকিয়ে আবার নিজেকে বোরখায় ঢেকে নিঃশব্দে চলে গেলেন।

উনি চলে যাবার অনেক পরেও আমি দরজায় খিল দিতে ভুলে গেলাম।

.

পরদিন সোনাঝরা সুন্দর সকালে গত রাত্রের ঘটনাটা ঘুমের ঘোরে একটা দুঃস্বপ্নের মতোই মনে হল আমার কাছে। আমাদের হসপিটালে এক প্রসূতি কদিন ধরেই কষ্ট পাচ্ছে। আজ একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব স্যালাইন দিয়ে পেন আনাবার। না হলে বাধ্য হয়েই সিজার করতে হবে।

আমার কাজের লোকটি এলে তাকে রান্নার ব্যবস্থা করতে বললাম। তারপর টুক করে সামান্য কিছু বাজারও করে আনলাম। আমার এই ঘোরাফেরার মধ্যে বারবারই কিন্তু হেনা আলমের কথাটা মনে হতে লাগল। তাঁর প্রস্তাব আমার পক্ষে রক্ষা করা সম্ভব হ’ল না। তাই বলে সত্যিই কি তিনি আত্মহত্যা করবেন? যদি করেন, তাহলে কিন্তু দুটি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী হবো আমি। অ্যাবরশনে সমস্যাটা মিটেই যায়। অথচ আমি কি করে এই কাজটা করি? একটি শিশু, প্রকৃতির নিয়মে সে আপন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যখন পূর্ণ রূপ পেয়ে গেছে তার হাত পা চোখ মুখ সব কিছুই যখন যথাযথ নিয়মে তৈরি হয়েছে তখন তাকে তার আত্মপ্রকাশের আগেই মাতৃগর্ভ থেকে জোর করে টেনে এনে গলা টিপে মেরে ফেলাটা…। না না না এ কাজ করলে আমি পাগল হয়ে যাবো। অর্থের লালসায় এ কাজ যারা করে করুক। আমি করতে পারব না। আমার সারা শরীর যেন সেই দৃশ্য কল্পনা করে শিউরে উঠল। অসহায় শিশুর অন্তিম আর্তনাদ যেন টা ট্যা করে আমার কানের কাছে বাজতে লাগল। এ কাজ আমাকে মেরে ফেললেও হবে না। আমি অন্যমনস্ক হবার চেষ্টা করলাম।

ঘরে ফিরে স্নান খোওয়া সেরে চলে গেলাম হসপিটালে। নতুন একজন পেশেন্ট ভর্তি হয়েছে এই মাত্র। বাড়িতে ডেলিভারি হতে গিয়ে বিপর্যয় ঘটিয়ে বসেছে। নার্স আয়া সবাইকে নিয়ে ঢুকে পড়লাম লেবার রুমে। ভুলে গেলাম হেনা আলমের কথা! অনেক পরিশ্রমের পর যথাযথ নিয়মে ভগবানের ইচ্ছায় ডেলিভারিটা করাতে পারলাম। প্রসূতির অবস্থা ভালো নয়। তবে বাচ্চাটা ভালো আছে। লাল রক্তের ড্যালা। যেন একটা। কি সুন্দর কচি মুখ। হাত পা নেড়ে চিউ চিউ করছে দুষ্টুটা। এই রকম একটি শিশুকে কখনো মাতৃগর্ভ থেকে বার করে এনে গলা টিপে মারা যায়?

আবার মনে পড়ল হেনা আলমের কথা। সারাদিনে বার বার চেষ্টা করেও হেনা আলমকে ভুলতে পারলাম না। হেনা আলমের প্রেমিক কে তা জানি না। তবে এটুকু জানি এই শহরের উপকেণ্ঠ পাহাড়ের গায়ে যে মার্বেল প্যালেসটা, সেটা হেনা আলমের! এখানকার দুদুটো সিনেমা হলের মালিক হেনা আলম। এ ছাড়াও একটি বস্তি, ধান কল ও অয়েল মিলের মালিক হেনা আলমরা। হেনা আলম মমতাজ সুন্দরী। মুঘল হারেমের রূপসীদের কথা যেন মনে করিয়ে দেয় হেনা আলম। কিন্তু কেন তার এই পদস্খলন? হেনা আলমের স্বামীকে আমি দেখিনি। হেনা আলমের মতো সুন্দরীকে যিনি রাজার ঐশ্বর্য দিতে পেরেছেন তিনি যেমন তেমন লোক নন। অথচ সেই মানুষকে ফাঁকি দিয়ে ঐ প্রাসাদের অভ্যন্তরে কি করে পর পুরুষের সন্তান গর্ভে ধারণ করেন উনি তা আমার বোধগম্য হল না।

সে রাতেও অনেকক্ষণ ধরে হেনা আলমের মুখ মনে করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত তখন বারোটা। শীতের রাত। প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহে সারা শহর, পাহাড় পাহাড়তলি কনকন করছে! গাছ থেকে পশুপক্ষি মরে পড়ে যাচ্ছে। জঙ্গল থেকে বড় বড় গাষ্ট্রে শুকনো গুঁড়ি এনে গাছতলায় ধুনি জ্বালানো হয়েছে! যাতে অধিক সংখ্যক পশুপক্ষী মরে না যায়।

ডোরবেলটা বেজে উঠল।

আঃ। সেরেছে। এই রাতে আবার কোথায় যেতে হয় কে জানে?

উঠে গিয়ে আলো জ্বেলেই সাড়া দিলাম—কে?

—আমি।

পরিচিত কণ্ঠস্বর। বুকটা যেন কেঁপে উঠল। লু জিজ্ঞেস করলাম কে আপনি?

–এরই মধ্যে ভুলে গেলেন।

হেনা আলম। হেনা আলম ছাড়া আর কেউ নয়। অপ্রত্যাশিত কিন্তু প্রত্যাশিত। সেই একই আবদার করবেন হয়তো। করুন। বু তো কিছুক্ষণের জন্যও দেখতে পাবো সেই চৌধবি কা চাঁদকে। দরজাটা খুলে দিলাম।

আজ আর কালো বোরখা নয়। কাশ্মিরী সিল্কের ওপর নানা রকম কাজ করা বোরখা। সেই সঙ্গে এক মধুর সৌরভে গোটা ঘর ভরে গেল। এ সৌরভ কাল ছিল না।

দরজাটা খোলা ছিল। হেনাই বন্ধ করলেন। আজ আর বলতে হ’ল না। মুখের ঢাকা নিজেই প্রালেন। তারপর একটা কৌচের ওপর বসে যেন ওনার নিজেরই বাড়ি এমনভাবে বললেন—কি হ’ল বসুন।

আমি গত রাতের মতোই সারা গায়ে শাল জড়িয়ে নার মুখোমুখি বসলাম। হেনা বললেন আমি চলে যাবার পর কাল রাতে নিশ্চয়ই আপনি ভালো করে ঘুমোতে পারেন নি?

–না পারিনি।

—আসলে আমার এই দেহতে এত রূপ কিভাবে যে তৈরি হয়েছিল তা নিজেই আমি ভাবতে পারি না। আয়নায় যখন নিজেকে দেখি তখন মনে মনে হিন্দুদের মতো পঞ্চপ্রদীপ জ্বেলে নিজেকে আরতি করি। তাই মরতে আমার ইচ্ছে করে না ডাক্তার। এর পরে আবার যদি কখনো রদেহ নিয়ে পৃথিবীতে আসি তখনো কি এই রূপ আমি পাবো?

আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে চোখের পাতা না ফেলে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

হেনা আলম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন–কি ঠিক করলেন ঐ ব্যাপারে?

আমি যেন কিছুই জানি না এমনভাবে বললাম–কোন ব্যাপারে?

—সেকি! কাল যে ব্যাপারে কথা বললাম। মানে যে ভাবেই হোক ওটা করাতেই হবে।

আমার রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। এই হেনা আলমের গর্ভে যে শিশু আছে সেটা ছেলে কি মেয়ে জানি না। মেয়ে হলে সে হয়তো হেনা আলমের চেয়েও সুন্দরী। হবে। ছেলে হলে হবে নবাবজাদা। তার আবির্ভাবকে আমি কোন অধিকারে বাধা দেবো? তোক সে অবাঞ্ছিত। বু সে শূন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ। তাকে আসতে দিতেই হবে। আমি বললাম–এ কাজ যে কখনো করিনি মিসেস আলম।

–জানি। কিন্তু আমার জন্য এটুকু আপনাকে করতেই হবে। যে ভুল আমি একবার করেছি জীবনে সে ভুল দ্বিতীয়বার করব না। আপনাকে আমি কথা দিলাম ডাক্তার।

–মিসেস আলম। আজ যাকে আপনি অবাঞ্ছিত মনে করছেন একদিন তো তাকেই চেয়েছিলেন একান্তভাবে? ওর পিতা আপনার ঘৃণ্য হতে পারেন কিন্তু ঐ শিশুটা আপনার কাছে কোন অপরাধটা করল শুনি? ও তো ওর পরম নির্ভরযোগ্য স্থান ভেবেই আপনার জঠরে নিশ্চিন্তে নিজের বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে।

হেনা আলম দুহাতে আমার দুটি হাত আবার জড়িয়ে ধরলেন। আবার সেই উষ্ণ প্রশ। এবার নিজেই আমার কোলের ওপর নুয়ে পড়ে বললেন–সেন্টিমেন্টাল হবেন না ডাক্তার, প্লিজ। আপনি যা বলছেন আমি ব বুঝতে পারছি। কিন্তু লুও আমি এ কাজ করতে চাইছি কেন জানেন? এর পিতা অর্থাৎ যাকে ভালোবেসে আমার সর্বস্ব দিয়েছিলাম সে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। সে আর কখনো আমার কাছে ফিরে আসবে না। আমার স্বামী মেহবুব আলম এই অঞ্চলে সব চেয়ে ধনী এবং মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। বছর দুই আগে একটি সাংঘাতিক বিস্ফোরণে তার দুটি চোখ নষ্ট হয়ে যায় একটা পাও বাদ দিতে হয় কেটে। ক্রাচে ভর দিয়ে তিনি এক পায়ে চলেন। তার বীভৎস মুখের দিকে তাকালে ভয়ে বুক শুকিয়ে যায়। এর ফলে স্বামীর সঙ্গে সহবাসে আমার রুচি হয় না। উনি বিচক্ষণ লোক। নিজেও সেটা বোঝেন। তাই আমাকে বিরক্ত করেন না। এই সময় আমাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়র একটি ছেলেকে ভালো লাগে আমার। সে আমাকে কথা দেয় আমায় নিয়ে সে দূরে বহুদূরে চলে যাবে। যেখানে মেহবুব সাহেবও আমাদের নাগাল পাবেন না। আমি তাকে বিশ্বাস করি। এবং তার সঙ্গে গোপনে মিলিত হই। অবশ্যই সেটা সন্তান উৎপাদনের জন্য নয়। দেহসুখের লালসায়। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে সে আমাকে ছেড়ে গেছে। এখন এই সন্তানের আমি কি পরিচয় দেবো? কোথায় রাখব একে? একা যে কোথাও চলে যাবে এখান থেকে, যাবই বা কোথায়? এই রূপই যে আমার শত্রু হবে। তাছাড়া মেহবুব সাহেবের ঐ বিশাল ঐশ্বর্যও তো ভোগ করতে পারব না আর।

আমি আমার কোলের ওপর থেকে হেনা আলমের মাথাটা তুলে নিলাম। বললাম–ভারী মুশকিলে ফেললেন দেখছি।

—একটা উপায় বার করুন ডাক্তার।

—কোন রকমে আপনি কি একবার আমার সঙ্গে এই শহরের বাইরে যেতে পারবেন?

—ক্ষেপেছে? যেখানে রাতের অন্ধকারে গোপনে আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসছি সেখানে কি করে আমি শহরের বাইরে যাবো? আমাকে এখানকার

বাই চেনে। আমি যখন ঘর থেকে বেরোই তখন বেয়ারা দরোয়ানরা আমাকে ঘিরে থাকে। এ কাজ এখানে করতে হবে ডাক্তার। তার জন্য আপনি যা চান যত টাকা চান দেবো। আমার শরীর খারাপের অছিলায় আমার লোক দিয়ে আপনাকে ডাকিয়ে নিয়ে গিয়ে আমার বাড়িতেই এই কাজ করাব আমি।

—সেকি।

–এছাড়া উপায় নেই।

এতক্ষণ নেকাবের ঢাকা সরিয়ে রাখলেও সেই সুদৃশ্য বোরখার আড়ালে ছিলেন হেনা আলম। এবার বোরখা মুক্ত হয়ে গলার বহুমূল্য নেকলেসটি খুলে আমাকে দিলেন। বললেন—এর সবগুলিই হীরে। এটা অগ্রিম হিসেবে দিলাম। আর টাকা। কত টাকা চাই আপনার? যা চাইবেন তাই পাবেন।

আমি কোন কথাই বলতে পারলাম না।

হেনা আলম আমার খুব কাছে এগিয়ে এলেন। এসে ঠিক গত রাতের মতোই আমার হাত দুটি ওঁর বুকের ওপর নিয়ে বললেন—একবার শুধু আমাকে দেখুন। তাকান আমার মুখের দিকে। আপনি দয়া না করলে আমাকে অকালেই ঝরে যেতে হবে। হেনা আলমের পরশে কি যাদু আছে? হয়তো। আমি যেন মোমবারি মতো গলে যেতে লাগলাম। এই অনিন্দ্যসুন্দরীকে আমার বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে এই মুহূর্তে ওর মুখ চুম্বন করতে ইচ্ছে হল। কি যে হয়ে গেল আমার তা জানি না। হঠাৎ ওর হাত দুটি আমি নিজের মুঠোয় ধরে নিয়ে বললাম আমি রাজি।

সেই মুহূর্তে হেনা আলমের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল উনি যেন স্বর্গ জয় করে ফেলেছেন। আমরা হাত দুটিতে আলতো করে প্রেমিকার মতো চুমু খেয়ে আমার কাছ থেকে সরে গিয়ে বললেন—আমি জানি ডাক্তার, রাজি আপনি হবেনই। সত্যি, কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেবো। তাহলে শুনুন! এই নেকলেসটির দাম কম করেও এক লাখ টাকা। এবার নগদ আপনি যা চাইবেন তাই পাবেন।

আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম টাকা আমি চাই না মিসেস আলম। আর ঐ নেকলেসেও আমার প্রয়োজন নেই। ওটা আপনি নিয়ে যেতে পারেন।

–সেকি! হেনা আলম লঘু পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তারপর ঠিক সেই আগের মতোই আমরা হাত দুটি ধরে বললেন—এত টাকার প্রলোভন আপনি কি জন্য ছেড়ে দেবেন?

—শুধু মাত্র আপনার জন্য।

—তার মানে?

—আমি আপনাকে চাই। আপনার রূপে আমি এমনই মুগ্ধ যে আপনার যৌবনের উত্তাপ আমাকে পেতেই হবে। এই মুহূর্তে আপনার চেয়ে লোনীয় আমার কাছে আর কিছুই নেই। যদি আপনি কোন রকম সংকোচ না করে আমার বিছানায় চলে আসতে পারেন তাহলে আমি আপনার প্রস্তাবে এক কথায় রাজি।

হেনা আলমের দু’চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। বললেন ডাক্তার! আপনি আগুন নিয়ে খেলা করতে চাইছেন। আমার দেহটা বাদ দিয়ে আপনি অন্য কিছু চান।

—দেখুন, যে কাজ আমি করতে চাই না, যে কাজে আমার বিপদ এবং আপনার জীবনের ঝুঁকি আছে সে কাজ যদি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে করতে হয় তাহলে তা এমন কিছুর জন্য করব যা দুর্লভ।

—এই আপনার শেষ কথা?

—হ্যাঁ।

হেনা আলম নেকলসেটা গলায় পরে বোরখা মুড়ি দিয়ে যেমন এসেছিলেন ঠিক তেমনি চলে গেলেন।

আমি দরজা বন্ধ করে আবার বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। আমার সর্বাঙ্গ তখন কামনার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে। এঃ। আমি কি বোক। কেন যে ওকে যেতে দিলাম। এই নিঝুম রাতে জোর করে ওকে আমার বিছানায় শোয়ালে নিশ্চয়ই ও চেঁচামেচি করত না। সুন্দরী রমণীকে জোর করেই ভোগ করতে হয় এই চিরকালের নিয়মটা ভুলে গিয়েই ভুল হল। তাই সারারাত বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগলাম।

.

পরদিন সকালেই সেই মর্মান্তিক সংবাদটা কানে এলো। মিসেস হেনা আলম আত্মহত্যা করেছেন। ধ্বরটা শুনেই শিউরে উঠলাম আমি। উঃ কি ভয়ঙ্কর। হেনা আলম মৃত্যুকে বরণ করে নিয়ে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছে। কিন্তু ওর গর্ভের সেই সস্তানটা! সেটাও যে দম বন্ধ হয়ে মরে গেল। হায় ভগবান! সেই অসহায় মহাপ্রাণ, যেটা মাতৃগর্ভ থেকে একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল …!

।এমন সময় হঠাৎ আমার সামনে যারা এসে দাঁড়াল তাদের দেখব বলে আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। ভয়ে আমার মুখ কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল।

—ইউ আর আণ্ডার অ্যারেস্ট মিঃ সেন।

আমি মড়ার মতো ফ্যাকাসে মুখে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম—হোয়াই?

—সেটা থানায় গেলেই জানতে পারবেন। —কেন এখন পারি না?

–আপনি কি শুনেছেন মিসেস আলম সুইসাইড করেছেন?

–শুনেছি। কিন্তু তার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক!

—আছে বৈকি। মরবার আগে তিনি একটি চিঠি লিখে গেছেন। তাতে লিখেছেন তার মৃত্যুর জন্য আপনি দায়ী। তার স্বলতার সুযোগ নিয়ে আপনি তার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করে তাকে প্রতারণা করেছে। এবং তাকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচনা করেছে।

আমি চিৎকার করে উঠলাম না না না। সী ইজ এ লায়ার। এঘ সত্যি নয়। এ মিথ্যা। আমি সম্পূর্ণ নিরপরাধ। আপনারা বিশ্বাস করুন।

–আমাদের বিশ্বাস অবিশ্বাসে কিছুই যায় আসে না মিঃ সেন। আপনার সততা প্রমাণ করার জন্য আদালত আছে। আপনি ভিমরুলের চাকে হাত দিয়েছেন। এখন ঠ্যালা সামলান। থানায় চলুন। মেহসুর সাহেব আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।

আমার গা মাথা যেন পাক খেয়ে ঘুরতে লাগল। এই আকাশে চন্দ্র সূর্য কি সত্যিই ওঠে? ওঃ মাই গড়। হেল্প মি।

.

আমার মান ইজ্জত চাকুরির নিরাপত্তা সব কিছুই এক লহমায় বিপন্ন হয়ে পড়ল। এক কথায় জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল আমার। ঐ সুন্দরী কুহকিনী কেন যে এ কাজ করল? কেন যে এইভাবে প্রতিশোধ নিল আমার ওপর তা ভেবেই পেলাম না। এখন ভাবছি কাল রাতে ঐ রকম প্রস্তাব না করে তার কথায় রাজি হলেই ল্যাঠা চুকে যেত। যেহেতু আমার অসহযোগিতায় তাকে মরতে হল সেই রাগে আমারও সর্বনাশ করে গেল সে। পুলিশ ঠিকই বলেছে আমি ভিমরুলের চাকেই হাত দিয়েছি। আমার সাধ্য কি যে মেহবু সাহেব্বে সঙ্গে লড়ি? সাধ্য থাকলেও হেনা আলমের ঐ রকম স্বীকারোক্তির পর আমার বাঁচাও তো অসম্ভব। আইনের চোখে আদালতের বিচারে আমার কি শাস্তি হবে জানি না। তবে মেহবু সাহেব যে আমাকে জ্যান্ত কবর দেবেন তা বুঝতেই পারছি।

থানার লকআপে প্রায় আধ ঘন্টা রাখার পর পুলিশ প্রহরায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হল মেহবুব সাহেবের মার্বেল প্যালেসে। একটি বিলাসবহুল হলঘরের মতো বড় ঘরে আমাকে এনে যখন বসানো হল তখন মেহবুব সাহেবের চেহারার দিকে। তাকিয়ে শিউরে উঠলাম। কী পৈশাচিক মুখ। এর চেয়ে একটা হায়না ভালো। এখানকার পুলিশ প্রশাসন সবাই সন্ত্রস্ত মেহবুব সাহেবের প্রতিপত্তি এবং ব্যক্তিত্বের কাছে।

মেহবুব সাহেবের চোখ কালো চশমায় ঢাকা। ক্রাচ দুটি কৌচের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা। টেবিলের ওপর একটা দোনলা বন্দুক। বাঘ মারা। একটি ব্লাঙ্ক ক্যাসেট লাগানো টেপ রেকর্ডার। সেটা চালিয়ে দিয়ে তিনি বললেন—আপনিই ডাক্তার সে?

—হ্যাঁ।

–বসুন।

ঘরে একটা সঁচ পড়লেও যেন শব্দ হবে।

মেহবুব সাহেব পুলিশ এবং তার লোকেদের বললেন—আপনারা একটু বাইরে যান। আমি না ডাকা পর্যন্ত কেউ এ ঘরে ঢুকবেন না বা এর ধারে কাছে আসবেন না।

ভীত সন্ত্রস্ত সবাই চলে গেল।

মেহবুব সাহেব বললেন বয়স কত? দেখে তো ছেলেমানুষ বলেই মনে হচ্ছে। বিয়ে থা করেছে?

ভয়ে ভয়ে বললেন—না।

—আমার স্ত্রীর সঙ্গে আপনার অবৈধ সম্পর্ক কত দিনের?

আমি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললাম—মেহবুব সাহেব! আল্লা কসম। ঈশ্বরের দোহাই। আমি সম্পূর্ণ নিরপরাধ।

—আমার স্ত্রীর ঐ স্বীকারোক্তিটা তাহলে মিথ্যা। কি বলুন? মেহবুব সাহেব এবার বন্দুকটা হাতে নিলেন। তারপর সেটা নিয়ে খেলা করতে করতে বললেন কাল রাত্রেই বোধ হয় আপনি শেষবারের মতন আমার স্ত্রীর দেহটা ভোগ করেছেন, তাই না?

আমি মাথা নত করে বললাম না না না। আপনি বিশ্বাস করুন আমি তার কোন ক্ষতি করিনি।

মেহবুব সাহেবের পৈশাচিক মুখে হিংস্রতা যেন প্রকট হয়ে উঠল। বললেন রাতের অন্ধকারে ঐ রকম একজন সুন্দরী যুবতী আপনার ঘরে গেল আর আপনি তাকে ভোগ না করেই ছেড়ে দিলেন? এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?

—আপনি তো সবই জানেন দেখছি।

—আমার স্ত্রীর ব্যাপারে আমি জানব না তো কি অন্য তোক জানবে? রাতের অন্ধকারে সে বেরিয়ে গেল, কোথায় গেল আমি জানব না? বলতে বলতেই বন্দুকে গুলি পুরে মেহবুব সাহেব বললেন—এটা কার জন্য তৈরি করলাম বলুন তো?

জানি না।

—আপনার জন্য। রাতের অন্ধকারে যে যুবক এক অসামান্যা সুন্দরীকে। নাগালের মধ্যে পেয়েও তাকে ভোগ করতে পারে না এটা তরা জন্যই খরচা করা উচিত। আপনিই বলুন না তাকে গুলি করে মারাটা উচিত কি না?

—আপনার কথার আমি কোন ঘের পাচ্ছি না মেহবুব সাহেব।

–না পাবার তো কিছু নেই। একজনকে ভোগকরার জন্য মেরেছি একজনকে করার জন্য মারব।

—মারবেন। তবে তার আগে ওর পোেস্টমর্টেম রিপোর্টটা একবার দেখুন। আমার রক্ত পরীক্ষা করান। মনে কোন সন্দেহ রাখবেন না মেহবুব সাহেব। আমি ওকে ভোগও করিনি। ওর গর্ভে আমার সন্তানও নেই!

—আমি জানি ডাক্তার। সব জানি। ওর গর্ভে এ অবৈধ সন্তানের বীজ যে বপন করেছে আমি তাকে নিজে হাতে গুলি করে মেরেছি। ও কিন্তু সেটা বুঝতে পারে নি। মানে আমি বুঝতে দিই নি। ওর প্রেমিককে মারবার আগে তাকে ভয় দেখিয়ে এমন একটা চিঠি আমি লিখিয়ে নিয়েছি যাতে ওর ধারণা হয়েছে ওর প্রেমিক ওকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ও তো আপনাকে অনেক কিছু দিতে চেয়েছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনি ওর অ্যাবরশানটা করালেন না কেন?

—আমি কখনো ও কাজ করিনি সাহেব। টাকার লোভে ঐ পাপ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তাছাড়া ওতে ওর জীবনের ঝুঁকি ছিল।

–আপনি খুব ধর্মভীরু লোক দেখছি। ভ্রূণ হত্যা করেন না। সুন্দরী যুবতীকে রাত্রিবেলা বেডরুমে একা পেয়েও তাকে জোর করে ভোগ করেন না। টাকার লোভ করেন না। আপনাকে দিয়ে এ জগতের কোন কাজটা হবে শুনি। এক্কেবারে যা তা লোক মশাই আপনি। যাক। আমার তরফ থেকে একটা সামান্য উপহার আপনাকে দিচ্ছি। এই নিন। এটা বাড়ি নিয়ে খুলে দেখবেন।

–কী আছে এতে?

—একটা বিশাল অঙ্কের টাকার চেক। আমি জানি এই ঘটনার পর আপনি আর এখানকার হাসপাতালে চাকরি করবেন না। নিজেই ইস্তফা দিয়ে চলে যাবেন। তাই সাময়িকভাবে যাতে আপনার কোন অসুবিধা না হয় সেইজন্যে এটা আপনাকে আমি দিচ্ছি। বলে একটি বড় খাম এগিয়ে দিলেন মেহবুব সাহেব। তারপর কি ভেবে যেন সেটা আবার চেয়ে নিয়ে তার ওপর নিজের নাম সই করে আমার নামটা খস খস করে লিখে দিলেন।

আমি অবাক হয়ে বললাম—শুনেছিলাম আপনি অন্ধ। কিন্তু আশ্চর্য। যেভাবে আপনি লেখালিখি করছেন বা এত কিছুর ওপর নজরদারি করছেন তাতে তো আপনাকে অন্ধ বলে মনেই হচ্ছে না।

মেহবুব সাহেব হেসে বললেন—শুনেছে ঠিকই। এক মারাত্মক বিস্ফোরণে আমার এই রকম দশা হয়েছিল। একটা পা গেছে। মুখটাও পুড়ে ঝলসে গেছে। দৃষ্টিশক্তিও হারিয়েছিলাম। তবে বহু চেষ্টার পর এবং বহু চিকিৎসার পর দুটি চোখেই অল্প অল্প দেখতে পাই। কিন্তু এ কথা আমি কাউকে বলিনি। এমনকি আমার স্ত্রীকেও না।

আমি অভিভূত হয়ে বললাম-কেন?

—আসলে আমার স্ত্রীকে আমি খুব ভালবাসতাম, আপনিই বলুন না কেন ওইরকম একজন নারীকে ভালো না বেসে কি পারা যায়? তা যাক। যখন বুঝতে পারলাম আমার এই অবস্থার পর ও অন্যের অনুগামী তখন মনে মনে খুবই দুঃখ পেলাম। কিন্তু সব জেনেও ওকে আমি বাধা দিই নি। নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে নিয়েছিলাম। পরপুরুষের সঙ্গে ও উপগত হোত। এক বিছানায় শুতো। সবই দেখতাম! এমন কি আমাকে অন্ধ ভেবে আমার সামনেই পরস্পরকে আলিঙ্গন চুম্বন করত। সব সহ্য করেছিলাম। কিন্তু যখন টের পেলাম ওরা অবাধ স্বাধীনতা পাবার আশায় আমার প্রচুর ধনসম্পত্তি আত্মসাৎ করে বরাবরের জন্য এখান থেকে পালাবার চেষ্টা করছে তখন আর থাকতে পারলাম না। প্রতিহিংসা নেবার জন্য তৎপর হলাম এবং ওদের একজনকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিলাম। তারপর আমরা স্ত্রী যখন আপনার সঙ্গে দেখা করবার চেষ্টা করল তখনও আমি ওর পিছু নিয়ে সব কিছু দেখলাম। আপনার দরজায় কান খাড়া করে ভেতরের কথাবার্তা শুনলাম। আপনার আদর্শ এবং ব্যক্তিত্বকে অভিনন্দন জানাই। তবে শেষ দিন অবশ্য আপনি ওর কাছে। অন্য একটি প্রস্তাব রেখেছিলেন। কিন্তু জোর করেন নি। তাতে অবশ্য আমি অসন্তুষ্ট নই। কেননা এটা হওয়াই স্বাভাবিক। তবে অর্থলোভে ঐ ঘৃণ্য কাজটি যে আপনি করেননি তার জন্য সামান্য একটু পুরস্কার অন্তত আপনার পাওয়া উচিত। তাই বিভিন্ন ব্যাঙ্কের কয়েকটা চেক আপনাকে দিলাম এবার আপনি যেতে পারেন।

—আপনি?

—ডাক্তার! দেরি করবেন না। মনে রাখবেন আপনি এখনো আসামী এবং পুলিশ আপনার জন্যে দরজার বাইরে অপেক্ষা করছে। আমাকে আমার বাকি কাজটুকু করতে দিন।

আমি চলে এলাম।

তবে ঘরের দরজা পার হবার সঙ্গে সঙ্গেই বন্দুকের গুলির শব্দ শুনে ছুটে গেলাম তার কাছে, থুতনির নীচে বন্দুকের নলটা ঠেকিয়ে ট্রিগার টিপেছেন মেহবুব আলম। টেপরেকর্ডার যন্ত্রেই সেই গুলির শব্দ ধরা পড়েছে। পুলিশের উদ্দেশ্যে লেখা একটা চিঠিও পড়ে আছে টেবিলের ওপর।

ততক্ষণে বাড়ির অন্যান্য লোকজন এবং পুলিশ, বাই ছুটে এসেছে।

টেপ রেকর্ডারে বলা কথা এবং তার চিঠির বিবরণ অনুযায়ী পুলিশ আমার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ তুলে নিল এবং আমাকে সসম্মানে আমার বাসায় পৌঁছে দিয়ে গেল।

বলা বাহুল্য কয়েকদিনের মধ্যে আমি নিজের চেষ্টায় অন্য জায়গায় বদলি হয়ে গেলাম। হেনা আলম আমার সুন্দর জীবনের এক সকরুণ স্মৃতি। এটা তো ঠিক, শুধুমাত্র আমারই গোঁড়ামিতে সেই প্রস্ফুটিত ফুলটিকে অকালে ঝরে যেতে হল। তাই মেহবুব সাহেবের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া ঐ চেকগুলো গ্রহণ করতে বিবেকে বাধল আমার। আসার সময় আমি সেগুলো পুলিশের হাতেই জমা দিয়ে এলাম।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *