০৩. পুলিসের রিপোর্ট

পুলিসের রিপোর্ট থেকেই জানা যায় :  

ব্যবসা-সংক্রান্ত ব্যাপারেই দিন-পনের আগে ব্রজদুলালকে মাদ্রাজে যেতে হয়েছিল এবং কথা ছিল দিন-কুড়ি আগে সেখানে তিনি থাকবেন।

কিন্তু সাতদিনের মাথায় অফিস থেকে সকালবেলা আটটা নাগাদ অকস্মাৎ একটা জরুরী ট্রাঙ্ক কল পেয়ে ব্রজদুলালকে কলকাতায় ফিরে আসতে হয় ঠিক নিহত হবার রাত্রে—সন্ধ্যায় ভাইকাউন্টে।

সন্ধ্যা রাত সোয়া সাতটা নাগাদ গৃহে এসে পৌঁছান এয়ারপোর্ট থেকে ব্রজদুলাল তাঁর নিজেরই গাড়িতে গচা লেনের বাড়িতে।

রাত আটটা থেকে নটা তাঁর শোবার ঘরে সাধনের সঙ্গে কি সব কথাবার্তা হয়। তার পরই সাধনকে তিনি একটি জরুরী ব্যাপারে সেই রাত্রেই গাড়ি নিয়ে পাটনায় মাসখানেক পূর্বে সাহা অ্যাণ্ড স্টীল কোম্পানীর নতুন ব্রাঞ্চ অফিস খোলা হয়েছিল, সেই অফিসে যেতে বলেন।

সাধন নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে রাত সাড়ে নটা নাগাদ চলে যায় পাটনায়।

যতদূর জানা গিয়েছে দুর্ঘটনার রাত্রে ব্রজদুলালের বাড়িতে তিনি এবং ভৃত্যের দলই ছিল। কারণ দুপুরের দিকে বের হয়ে গিয়ে রাত সাড়ে আটটার শোতে রেবেকা মেট্রোতে সিনেমা দেখতে যায়।

তাছাড়া সে জানত না যে ঐ রাত্রেই ফিরে আসবেন ব্রজদুলাল।

রাত দশটায় ডিনার শেষ করে ব্রজদুলাল শুতে যান।

রাত পৌনে এগারোটায় কুড়ি মিনিটের জন্য ঐ অঞ্চল নিষ্প্রদীপ হয়।

সোয়া বারোটায় রেবেকা সিনেমা থেকে ফিরে এসে তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠবার সময় দোতলায় ব্রজদুলালের ঘরে আলো জ্বলতে দেখে। তার কৌতূহল হয় এবং গিয়ে দেখে ঘরের দরজা হা-হা করছে খোলা। খোলা দরজা-পথে উঁকি দিতেই ব্রজদুলালের ঘরের মধ্যের দৃশ্যটা তার চোখে পড়ে।

স্লিপিং গাউন ও পায়জামা পরিহিত ব্রজদুলাল সাহা একটা সোফার উপরে উপবিষ্ট, কিন্তু দেহের উধ্বাংশ ও মাথাটা সোফার হাতলের উপর থেকে অসহায়ভাবে নিচের দিকে ঝুলছে। একটা হাত ঝোলা অবস্থায় মাটিতে ঠেকে রয়েছে।  

ঐভাবে ব্রজদুলাল সাহার চেয়ারে বসে থাকার সমস্ত ভঙ্গীটাই এমন যে—রেবেকা যেন সেদিকে দৃষ্টি পড়ামাত্রই ভয়ানক চমকে ওঠে।

কেমন সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে সে খোলা দরজা-পথে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ঝুলে-থাকা ব্রজদুলালের মুখটা সে দেখতে পায়।  

চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বের হয়ে আসছে। সমস্ত মুখে তখনও স্পষ্ট হয়ে রয়েছে। যেন অসহ্য যন্ত্রণার চিহ্ন। দুহাতের আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ।

সামনের একটা গোলাকার শ্বেতপাথরের টেবিলের উপরে জ্বলছে সুদৃশ্য একটি টেবিল ল্যাম্প। তার পাশে একটি অর্ধসমাপ্ত ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটের বোতল, একটি দামী কাচের শূন্য গ্লাস উল্টে পড়ে আছে। তার পাশে সোডা সাইফন ও চাবির একটা রিং।

একটা অর্ধস্ফুট চিৎকার রেবেকার কণ্ঠ থেকে বের হয়ে আসে। প্রথমটায় ঘটনার আকস্মিকতায় কি করবে সে বুঝতে পারে না।

পাথরের মতই যেন কয়েকটা মুহূর্ত সেই ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে রেবেকা। একবার ভাবে সকলকে চিৎকার করে ডাকে।

 কিন্তু সাহস হয় না। ব্রজদুলাল সাহা যে মৃত সে কথাটা বুঝতে রেবেকার কেন যেন দেরি হয়নি। তবু সম্বিৎ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই-সোজা ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।  

ভাবে, কি করা কর্তব্য—কি সে করবে!  

অবশেষে কি মনে হওয়ায় পাশের ঘরে গিয়ে সাহার পারিবারিক চিকিৎসক ডাঃ চক্রবর্তীকে ফোন করে দেয় অবিলম্বে একবার আসার জন্য।

ফার্ণ রোডেই ডাঃ চক্রবর্তী থাকেন। ব্রজদুলালের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয়। ফোন পেয়ে আধ ঘণ্টার মধ্যেই চলে আসেন তিনি।

রেবেকা বারান্দাতেই দাঁড়িয়েছিল, ডাঃ চক্রবর্তীর গাড়ির সাড়া পেয়ে নিজে গিয়ে দরজা খুলে দেয়।

ডাঃ চক্রবর্তী জিজ্ঞাসা করেন, কি ব্যাপার, কেমন আছেন মিঃ সাহা?

চলুন, দেখবেন।

উপরে গিয়ে ব্রজদুলালকে পরীক্ষা করেই বুঝতে পারেন ডাঃ চক্রবর্তী তিনি মৃত। এতটুকুও আর বিলম্ব না করে সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিকটবর্তী থানায় ফোন করে দেন। আরও আধ ঘণ্টা পরে থানা-অফিসার সুখময় মল্লিক এসে হাজির হন।

ডাঃ চক্রবর্তীর মৃতদেহ দেখেই মনে হয়েছিল, কোন তীব্র বিষের ক্রিয়ায় ব্ৰজদুলালের মৃত্যু ঘটেছে। তাই তিনি কালবিলম্ব না করে পুলিসকে খবর দিয়েছিলেন।

পুলিস অফিসার সুখময় মল্লিক ও ডাঃ চক্রবর্তীর প্রথমটায় ধারণা হয়েছিল ব্যাপারটা আত্মহত্যা। মদের সঙ্গে কোন তীব্র বিষপান করে তিনি বুঝি আত্মহত্যা করেছেন এবং সেইভাবে তদন্ত শুরু করেছিলেন সুখময় মল্লিক।

কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটা ওলট-পালট হয়ে গেল আকস্মিক ভাবে অকুস্থানে কিরীটীর আবির্ভাবে পরের দিন সকালে।