১.১৪ ওপরতলায় নিজেদের অংশটায়

ওপরতলায় নিজেদের অংশটায় তালা বন্ধ করে মেয়ের হাত ধরে সুপ্রীতি নেমে এলেন নিচে। তাঁর শরীর সাংঘাতিক দুর্বল, তিনি গত কয়েকদিন ধরে খাওয়াদাওয়া একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। শরীর অশক্ত হলেও তাঁর মন শক্ত আছে, তাঁর চোখে জল নেই। এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিয়েছেন। এক পা এক পা করে তিনি সিঁড়ি দিয়ে নামছেন, একবারও ফিরে তাকালেন না।

কেউ তাঁকে বিদায় জানাতে এলো না, তিনিও কারুর কাছে যাননি। বাড়ির সব মানুষ যে-যার ঘরে দরজা বন্ধ করে রয়েছে, গোটা বাড়িটা একেবারে নিস্তব্ধ, এমনকি যে কাচ্চাবাচ্চাগুলো সর্বক্ষণ হৈ চৈ করে তাদেরও দেখা যাচ্ছে না। যদিও সবাই জানে যে সেজো তরফের গিন্নি আজ বিদায় নিচ্ছেন।

নিচের দালানে এ বাড়ির ঝি-চাকরেরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে, কারুর কারুর চক্ষু ছলছলে, এরা সুপ্রীতিকে ভক্তি করে। এরা এক এক করে মাটিতে মাথা ছুঁইয়ে গড় করলো, সুপ্রীতি তাদের দুটি করে টাকা দিলেন, কোনো কথা বলতে পারলেন না।

বৈঠকখানা পেরিয়ে বাইরের বারান্দায় এসে সুপ্রীতি একটু থমকে দাঁড়ালেন, কিছু যেন চিন্তা করলেন। তারপর ঈষৎ ধরা গলায় তিনি মেয়েকে বললেন, আমি হয়তো এ বাড়িতে আর কোনোদিন ফিরে আসবো না, কিন্তু এটা তোর বাবার বাড়ি, তুই আসবি।

তুতুলের মুখোনি এতদিন পর্যন্ত ছিল গোলগাল, গত কয়েকদিন ধরে সেই মুখ হয়ে গেছে ধারালো ও কৌণিক। তার শরীর ও মন ছিল নরম তুলতুলে, সেই জন্য তুতুল নামটি খুব মানানসই ছিল, ছোটবেলা থেকেই সবাই তার গাল টিপে আদর করে বলতো, মেয়েটা যেন ঠিক মোমের পুতুল। গত কয়েকদিন তার মনোজগতে যে দারুণ বিপর্যয় ঘটে গেছে, তার কারণ শুধু তার বাবার মৃত্যু-ঘটনাই নয়। এতদিন পর্যন্ত সে ছিল একটা গল্পের বইয়ের জগতে, হঠাৎ যেন। এক ফুৎকারে সমস্ত রঙিন বুদবুদ উড়ে গেল, সে দেখতে পেল কদর্য, নিষ্ঠুর, খলতাপূর্ণ এমন সব দৃশ্য, যার নাম বাস্তব। তুতুলের বয়েস সবে চোদ্দ পেরিয়েছে, তার বয়েসী অন্য ছেলে মেয়েদের তুলনায় এই বাস্তব সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা ছিল খুবই কম, তার মা তাকে পক্ষী মাতার মতন দুই ডানা মেলে সর্বক্ষণ আগলে রেখেছিলেন। এখন সে দেখতে পেল তার নিকট আত্মীয়দের লোভ, হিংসা, শঠতা, কানে শুনলো স্নেহ-মমতাহীন নিষ্ঠুর ভাষা।

মায়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরে সে বেরিয়ে এলো গেটের বাইরে। বুড়ো দারোয়ানটি শুধু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো তাকে দেখে।

প্রতাপ বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করেননি, তাঁর আর্দালি দয়ারামকে ভেতরে পাঠিয়েছিলেন মাল-পত্র সব বুঝে আনবার জন্য। অসিতবরণের কাকা জলদবরণ ও ওঁদের এক জামাই প্রিয়লাল কুৎসিত ভাষায় তাঁকে অপমান করেছে, তারপরেও প্রতাপকে ও বাড়িতে ঢুকতে হলে লাঠালাঠি করতে হতো। ও বাড়ির সদর থেকে একটু দূরে একটা ট্যাক্সি ডেকে প্রতাপ বাইরে। দাঁড়িয়েছিলেন, দিদিকে দেখে তিনি একবার চক্ষু বুজলেন, দিদির বৈধব্যবেশ তিনি এখনো সহ্য করতে পারছেন না, তারপর চোখ মেলে তিনি ট্যাক্সির দরজা খুলে দিলেন।

সুপ্রীতির হাতে একটি কাপড়ের ব্যাগে দুটি চওড়া ভেলভেটের বাক্স, তার মধ্যে রয়েছে তাঁর। যাবতীয় গয়না ও কোম্পানির কাগজপত্র। ট্যাক্সি চলতে শুরু করার পর সুপ্রীতি সেই ব্যাগটি প্রতাপের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, খোকন, তোর কাছে এগুলো রাখ।

ঠিক শোক-দুঃখ নয়, প্রতাপের মন একটা অন্যরকম চিন্তায় আক্রান্ত। অনেকসময় আনন্দ-বেদনা, উপভোগ-অনাসক্তির চেয়েও এই বিচারটাই বড় হয়ে ওঠে, ঠিক না ভুল? প্রতাপের মনে হচ্ছে তিনি একটা ভুলকে সায় দিয়ে নিজেও একটা বড় ভুল করতে যাচ্ছেন। অসিতবরণের মৃত্যুর পর সুপ্রীতির পক্ষে ও বাড়িতে টিকে থাকা অসহ্য হয়ে উঠেছিল, অন্য শরিকরা সুপ্রীতিকে তাড়াতে বদ্ধপরিকর কারণ তাতেই তাদের লাভ। ঐ রকম হিংস্র প্রতিকূলতার মধ্যে মেয়েকে নিয়ে সুপ্রীতি কখনো স্বস্তি বোধ করতে পারতেন না, তবু প্রতাপ অনুভব করছেন, দিদির এভাবে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে আসাটা ভুল হচ্ছে।

সারা পথ কোনো কথা হলো না।

বাড়ির সামনে ট্যাক্সি থামতেই প্রতাপের বাড়িওয়ালার স্ত্রী অতসী তিন তলা থেকে নেমে এসে সুপ্রীতির হাত ধরে বললেন, আসুন দিদি। তারপর তিনি তুতুলের থুতনিতে হাত ছুঁইয়ে। চুমু খেয়ে বললেন, এসো মা, এসো!

অতসীর কাছে প্রতাপ কৃতজ্ঞ। দেওঘর থেকে প্রাপ একা ফিরে আসার পর তিনি অনেক যত্ন করছেন। রোজ সকালে তিনি প্রতাপের জন্য চা-জলখাবার পাঠান, রাত্তিরেও রুটি-তরকারি পাঠিয়ে দেন। বাড়িওয়ালা জয়গোপাল দের সঙ্গে প্রতাপদের বরাবরই সদ্ভাব রয়েছে। জয়গোপাল দে-রা সুবর্ণ বণিক, ওঁরা কলকাতার আদি বাসিন্দা। জয়গোপাল কাপড়ের ব্যবসা করেন, প্রত্যেক বছর পূজোর সময় মমতাকে তিনি বিনা মূল্যে একটা শাড়ী পাঠাবেনই পাঠাবেন। বাড়িওয়ালা কর্তৃক কোনো ভাড়াটেকে এরকম উপহার প্রদানের ঘটনা নিশ্চিত দুর্লভ।

অতসী ও জয়গোপাল প্রতাপের কাছ থেকে তাঁর দিদির বাড়ির সব ব্যাপার শুনেছেন। অতসী দু’গেলাস লেবু-চিনির সরবৎ বানিয়ে রেখেছিলেন, দোতলায় এসে অতসী একটি গেলাস সুপ্রীতির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, নিন দিদি, এটা এক চুমুকে খেয়ে নিন তো আগে। শুনলুম আপনি নাকি কিছুই খাচ্ছেন না? অমন করলে কী চলে! শরীরটা রাখতে হবে তো। নিজের মেয়ের কথা ভাববেন নাকো? যারা যায় তারা তো চলেই যায়, যারা থাকে তাদের। কথাই বেশি করে ভাবতে হয়!

অতসীর মুখখানা বড় ভালোমানুষীতে মাখা। সুপ্রীতির সঙ্গে তিনি এমন সুরে কথা বলছেন যেন অনেককালের চেনা। কিছু কিছু মানুষ পারে অন্যকে এত সহজে আপন করে নিতে। বেশ কয়েকদিন পর একজন অনাত্মীয়ের মুখে এরকম কোমল কথা শুনে তুতুল তার মায়ের পিঠে মুখ গুঁজে হু-হুঁ করে কেঁদে উঠলো।

বিকেলে এলেন প্রতাপের বন্ধু বিমানবিহারী, তাঁর দুই ছোট ছোট মেয়ে অলি আর বুলিকে সঙ্গে নিয়ে। সুপ্রীতিকে বিমানবিহারীও দিদি বলেন, দু’একবার তিনি প্রতাপের সঙ্গে গেছেন বরানগরের বাড়িতে। অসিতবরণদের সঙ্গে বিমানবিহারীর একটা দূর সম্পর্কের আত্মীয়তাও বেরিয়ে গিয়েছিল, তাঁর মায়ের দিক দিয়ে, কিন্তু বিমানবিহারী সে সম্পর্কের বিশেষ গুরুত্ব দেননি। বিমানবিহারী শৌখিন ধরনের মানুষ। প্রতাপেরই মতন তিনি বেছে বেছে লোকদের সঙ্গে মেশেন।

প্রথমে তিনি কথা বললেন তুতুলের সঙ্গে। তুতুলের ভালো নাম বহ্নিশিখা, তিনি ওকে ঐ। নামেই ডাকেন।

তিনি বললেন, শোনো বহ্নিশিখা, আমার বাবা যখন মারা যান, তখন আমার বয়েস চোদ্দ, ঠিক তোমারই বয়েসী ছিলুম। আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছিল তার দু’ বছর আগে। তোমার বাবা ভারি সুন্দর মানুষ ছিলেন, তাঁর চলে যাওয়াটা একটা মস্ত বড় শূন্যতা, কিন্তু তোমার মা তো রয়েছেন!

এ বেলা তুতুলের চোখ মুখ অনেক পরিষ্কার হয়ে এসেছে। স্নান করে সে একটা শাড়ী পরেছে আজ। সে স্থির দৃষ্টিতে, বিমানবিহারীর দিকে তাকিয়ে রইলো।

বিমানবিহারী আবার বললেন, বড় কোনো শোক পেলে মানুষের বয়েস বেড়ে যায়। তুমিও এখন থেকে আর ছোট রইলে না, বড় হয়ে গেলে। আমার বেলাতেও তাই হয়েছিল। প্রায় এক লাফে আমি অ্যাডাল্ট হয়ে গেসলুম।

অলি আর বুলি বাবার দু’পাশে লক্ষ্মী মেয়ের মতন বাবু হয়ে বসে আছে আর অবাক অবাক চোখ মেলে তুতুলকে দেখছে। বিমানবিহারী মেয়েদের বললেন, তোমরা এই দিদির সঙ্গে ভাব করো, আমি একটু পাশের ঘরে যাচ্ছি।

বিমানবিহারী সুপ্রীতির কাছে এসে মেঝেতে বসলেন। তাঁর ধুতি ও পাঞ্জাবি সব সময় ধপধপে ফসা থাকে, তাঁর পায়ের তলাতেও একটু দাগ থাকে না। তিনি কথা বলেন সুস্পষ্ট উচ্চারণে।

তিনি বললেন, দিদি, আমার স্ত্রী আসতে পারলেন না, কাল থেকে খুব জ্বর, বড্ড ফ্লু হচ্ছে এখন কলকাতায়।

সুপ্রীতি বললেন, না, না, তাতে কী হয়েছে!

–দিদি, আপনাকে আমি কোনো সান্ত্বনার কথা জানাবো না। আপনার যথেষ্ট মনের জোর

৮৯

আমি জানি। কিন্তু আপনি ও বাড়ি ছেড়ে একেবারে চলে এলেন? এটা বোধহয় ঠিক করলেন না।

তিনি তাকালেন প্রতাপের দিকে। প্রতাপ জানতেন যে বিমানবিহারীও এই কথাই বলবেন। তাঁদের মনের গড়ন একরকম।

সুপ্রীতি বললেন, ও বাড়িতে আমি আর নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না।

–তবু যদি একটু কটা দিন দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে থাকতেন, তা হলে আবার বোধহয় ঠিক হয়ে যেত। বুঝলেন না। পজেশানই হচ্ছে মালিকানার পনেরো আনা। একবার বাড়ি ছেড়ে এলে ওরা কি আর বিষয়-সম্পত্তির ভাগ দেবে?

–না দেয় না দেবে। আমি চাই না ওদের টাকা পয়সা!

বিমানবিহারী আলতো ভাবে হেসে বললেন, অনেকেই এই কথা বলে। অনেকেই ভাবে টাকা পয়সা যেন একটা অপবিত্র জিনিস। কিন্তু দিদি, এ যুগে টাকা-পয়সাই হচ্ছে মানুষের জীবনের অশ্বশক্তি। এর অভাবে জীবনটা অচল হয়ে যেতে চায়।

সুপ্রীতি এবারে দৃঢ় ভাবে বললেন, বিমান, আমি হুট করে চলে আসি নি। ভেবে-চিন্তেই এসেছি। উনি চলে গেছেন, সেটা আমি মেনে নিয়েছি, আগে থেকেই এর জন্য একটু একটু তৈরি হয়ে ছিলাম। কিন্তু উনি নেই, তার পরেও ও বাড়িতে থাকা..তুমি জানো না ওখানকার পরিবেশ কী রকম! আমার বাবা পূর্ববঙ্গের। তাই ওরা কোনোদিনই আমাকে মেনে নিতে পারে নি। বিয়ের আগেই উনি আমাদের বাড়ি যেতেন বলে ওরা ভাবে যে আমার মা বাবা জোর করে।

–আমাদের বাড়িতেও তো পূর্ববঙ্গের মেয়ে এসেছে বউ হয়ে।

–সব বাড়ি তো এক রকম নয়। উনি রিফিউজিদের হাতে মারা গেলেন, ওঁদের বাড়ি উদ্ধার করা গেল না, সেই রাগে ওরা আমার ওপরে….। ওদের চোখে সব পূর্ববঙ্গের লোকই সমান-কী খারাপ ভাষা যে ব্যবহার করতো তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না! ঐ পরিবেশে আমার মেয়ে মানুষ হোক, তা আমি কিছুতেই চাই না। এর জন্য যদি না খেয়েও থাকতে হয়, তাও ভালো!

একটু থেমে তিনি আবার বললেন, আমি খোকনের ঘাড়ের ওপর ভর করে চিরকাল থাকবো না। অন্য একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবেই।

প্রতাপ বললেন, দিদি। তুমি কি ভাবছো…

সুপ্রীতি প্রতাপের বাহু ছুঁয়ে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে ব্যাকুল ভাবে বললেন, না রে, খোকন, আমি সে রকম কিছু ভাবি নি। আমি আর তুতুল তো তোর কাছেই থাকবো। বাবা বেঁচে থাকলে তিনি আমাদের আশ্রয় দিতেন না? বাবা নেই। তুই আছিস। দরকার হয় আমরা একবেলা খাবো। তবু ঐ অপমান সহ্য করে ওখানে থাকতে পারতাম না। আমি জানি। মমতা কোনোদিন আমাদের ফেলে দেবে না!

ওঠবার সময় বিমানবিহারী জিজ্ঞেস করলেন, প্রতাপ, তুমি তা হলে আবার বৈদ্যনাথধাম যাচ্ছো?

প্রতাপ বললেন, হ্যাঁ, সম্ভব হলে কালই। ফিরে এসে তোমায় খবর দেবো।

দেওঘর থেকে বিশ্বনাথ গুহ চিঠি পাঠিয়েছেন যে সুপ্রীতি আর তাঁর মেয়েকে যেন অবিলম্বে একবার সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। সুহাসিনীকে কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না। তিনি একেবারে পাগলের মতন হয়ে উঠেছেন। তিনি যখন তখন কলকাতায় চলে আসতে চান সুপ্রীতিকে দেখবার জন্য।

দিদি আর তুতুলকে দেওঘরে নিয়ে যেতে হবে ঠিকই, তবে সে’ব্যাপারে প্রতাপের মনের মধ্যে একটা বাধা আছে। ট্রেনের টিকিট কাটতে প্রতাপ দুদিন অহেতুক দেরি করলেন। দিদির সঙ্গে মায়ের যখন প্রথম দেখা হবে, তখনকার দৃশ্যটা কল্পনা করলেই প্রতাপের শরীর মন আড়ষ্ট হয়ে যায়। প্রতাপ কান্নাকাটির দৃশ্য সহ্য করতে পারেন না। মা সম্পর্কে প্রতাপের মনে একটা স্নেহের ভাব আছে, মা যেন একটা ছোট্ট মেয়ে, অবুঝ। মায়ের কোনো কষ্ট দেখলে তাঁর বুক মুচড়ে ওঠে।

তবু প্রতাপকে টিকিট কাটতেই হলো। এবং বৈদ্যনাথ ধাম স্টেশনে নামবার একটু আগে তিনি সুপ্রীতিকে বললেন, দিদি, তোমাকে কিন্তু এবারে শক্ত হতে হবে। তুমি তো মাকে জানো…..

সুপ্রীতি বললেন, তুই তো দেখেছিস, আমি ভেঙে পড়ি নি। আমি মাকে দেখবো। খোকন, আমি ভাবছি, তুতুলের তো পরীক্ষা দেওয়া শেষ হলো না এবার, নতুন স্কুলে ভর্তি হতে হবে। তার আগে দু’এক মাস এখানে মায়ের কাছে থেকে গেলে কেমন হয়?

–তা থাকতে পারো।

–বিশ্বনাথের অসুবিধে হবে না? ওকে কি কিছু টাকা পয়সা দিলে ও নেবে?

–সে নিয়ে তুমি এখন চিন্তা করো না, দিদি।

–না রে, সেদিন বিমান বললো–টাকা পয়সার মূল্য আমিও বুঝি! দেখলাম তো, ঐ একটা জিনিসের জন্য মানুষে মানুষে সম্পর্ক কত খারাপ হয়ে যায়!

–তুমি ওস্তাদজীকে সে রকম ভেবো না। তুমি তো ওঁকে বেশি দেখে নি। আমি দেখেছি। উনি টাকা পয়সার কোনো চিন্তাই করেন না!

স্টেশনে নেমে তুতুলকে দেখে প্রতাপ অনেকটা আশ্বস্ত হলেন। স্থান পরিবর্তনের একটা বিশেষ প্রভাব আছেই। এই কদিন তুতুল একেবারে গুম হয়ে থাকতো। এখানে এসে এই প্রথম তিনি তার মুখে হাসি দেখতে পেলেন। তুতুল বললো, মামু, আমি অনেকদিন আগে এখানে এসেছিলুম, স্টেশনটা ঠিক সেই রকমই আছে!

প্রতাপরা কোন ট্রেনে আসছেন তা বিশ্বনাথকে জানানো হয়নি, তাই স্টেশনে কেউ নেই। প্রতাপ বাইরে এসে একটা টাঙ্গা নিলেন। সুপ্রীতি বসেছেন একদিকে, আর একদিকে প্রতাপের পাশে তুতুল। তুতুল কী যেন বলছে, প্রতাপ মন দিয়ে শুনছেন না। সুপ্রীতি মুখ নিচু করে আছেন। হঠাৎ সুপ্রীতি ডান হাতটা বাড়িয়ে প্রতাপের বুকের ওপর রাখলেন। অদ্ভুত ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, মার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি! কতদিন পর আমরা সব ভাই-বোন এক সঙ্গে…।

প্রতাপের হৃদয় ঠিক একই সুরে বেজে উঠলো। দু জনের একই রকম স্মৃতি। অনেকদিন পর পারিবারিক মিলন। শেষ এরকম মিলন ঘটেছিল চার বছর আগে, মালখানগরে, আগে যা প্রতি বছরই ঘটতে পুজোর সময়। আকাশে সাদা সাদা মেঘ, শিউলি ঝরা সকাল, বাতাসে হালকা হালকা ভাব, নতুন পোশাকের স্পর্শ, মাঠে পাকা আউস ধানের গন্ধ। শেষের কয়েকটা বছর অসিতদা ব্যবস্থা করে রাখতেন, তিনি দিদিদের আর ছেলেপুলে সমেত মমতাদের নিয়ে চলে যেতেন কিছু আগে, প্রতাপ পুজোর কেনাকাটি করে যেতেন পরে। পুজোটা একটা উপলক্ষ মাত্র, প্রতাপ বা অসিতদা বা ওস্তাদজী কেউই পুজোর ধার ধারতেন না, পুজো মণ্ডপের ধারেও ঘেঁষতেন না বিশেষ, বিজয়া দশমীর দিন শান্তিজল নিতে যেতেন মাত্র। কিন্তু এই কটা দিন ধরে চলতো অবিচ্ছিন্ন আমোদ-প্রমোদ আর হৈ-হল্লা। কত হাসি, কত গান। একবার কালী পুজোর সময় সিদ্ধি খেয়ে অসিতদার তো অজ্ঞান হয়ে যাবার মতন অবস্থা, কিন্তু তাই দেখে অন্য সকলে হেসে একেবারে গড়াগড়ি দিচ্ছিল। বাবা ছিলেন রাশভারি মানুষ, তিনি যাতে কিছু জানতে না পারেন, সেদিকে সকলের নজর থাকত, কিন্তু সেবারে বাবাও টের পেয়ে গেলেন। অত হাসির শব্দ শুনে খড়ম খটখটিয়ে এসে ভবদেব মজুমদার জিজ্ঞেস করেছিলেন, কী ব্যাপার? কী ব্যাপার? কেউ কোনো উত্তর দেয় না, আবার সিদ্ধির ঝোঁকে হাসিও সামলাতে পারে না! মেজো বোন শান্তি বলছিল, বাবা দ্যাখো না, জামাইবাবু হি-হি-হি-হি। হাসি অনেক সময় সংক্রামক হয়, ভবদেব মজুমদার নিজেও এক সময় হাসতে শুরু করে দিয়েছিলেন।

র‍্যাডক্লিফ রোয়েদাদে সেই সব আনন্দের দিনের ওপর যবনিকা পড়ে গেছে!

আবার এতদিন বাদে ভিন্ন দেশে, ভিন্ন পরিবেশে পারিবারিক মিলন। বাবা নেই, অসিতদা নেই, পিতৃ-পিতামহের স্মৃতি জড়িত সেই বাড়ি, সেই পুকুর, আমবাগান কিছুই নেই। সেই ঢাকের আওয়াজ, সেই ধানের গন্ধ, সেই গ্রামীণ প্রতিবেশীদের পরিচিত মুখ, কিছুই নেই। আকাশ অবশ্য একই রকম।

সুহাসিনী ভবনের গেটের কাছে গাড়ি থামবার পর প্রতাপ তখনই ভেতরে গেলেন না। তিনি মায়ের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছেন। প্রথম শোক-প্রবাহটা কেটে যাক, তারপর তিনি ভেতরে যাবেন, তিনি সেইজন্য বিশ্বনাথের সঙ্গে বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগলেন। টাঙ্গাটাকে ছাড়া হয়নি। কিন্তু সুহাসিনী তাঁর প্রিয়তম পুত্রকে না দেখে থাকতে পারবেন কেন? ভেতর থেকে সুহাসিনী প্রতাপের নাম ধরে জোরে জোরে ডাকছেন শুনে তিনি তাড়াতাড়ি আবার টাঙ্গায় চড়ে বসে বললেন, ওস্তাদজী, আপনি মা-কে গিয়ে বলুন, কয়েকটা জরুরি কেনাকাটি আছে, আমি বাজার থেকে ঘুরে আসছি।

সুহাসিনীর সঙ্গে প্রতাপের দেখা হলো দুপুরবেলা। তিনি তখন কান্নাকাটি বন্ধ করেছেন। বরং তিনি অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। একখানা কম্বলের আসনে বসে আছেন তিনি, তাঁকে ঘিরে রয়েছে বাড়ির আর সকলে।

প্রতাপকে দেখে তিনি খুব কাজের কথার ভঙ্গিতে বললেন, অ খুকন, বুড়ি তো শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে, এখন ও থাকবে কোথায়? এখানে তো সকলে মিলে থাকা যাবে না, চলবেই বা কী করে? অ্যাাঁ? তুই বল!

প্রতাপ বললেন, মা, তুমি ও নিয়ে চিন্তা করো না। দিদি কলকাতায় আমাদের সঙ্গে থাকবে, সে সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে।

মমতা বললেন, হ্যাঁ, মা, দিদি আমাদের সঙ্গে থাকবেন।

সুহাসিনী বললেন, না, না, ওসব মোটেই কাজের কথা নয়। তোমরা কত দিক সামলাবা? কলকাতায় কী রকম খরচ আমি জানি না? খুকন, তুই ব্যবস্থা করে দে, আমরা দেশের বাড়িতে চলে যাই। সেখানে আমরা মায়ে-ঝিয়ে শান্তিতে থাকুম!

প্রতাপ বললেন, মা, আমাদের তো সেই দেশের বাড়ি আর নেই। এখন এটাই আমাদের দেশ। এটাই আমাদের বাড়ি!

সুহাসিনী গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ক্যান? এই কথা ক’স ক্যান? তুই তো মালখানগরে বাড়ি বিক্রি করিস নাই! সে বাড়ি তো আছে! নিজেগো বাড়িতে আমরা ফিরতে পারবো না? সেখানে আমাগো জমির ধান পাবো, গাছে ফল পাকুড় আছে, পুকুরে মাছ আছে, খেজুর গাছ কতগুলান, সেই রস বিক্রি করা যায়, আমাগো ভালো ভাবে চলে যাবে।

প্রতাপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মা আবার আগের যুগে ফিরে গেছেন। প্রতাপ মালখানগরের বাড়ি বিক্রি করেন নি বটে, কিন্তু সেখানে আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। ভবদেব মজুমদার বেঁচে থাকতে তবু কিছু লোক তাঁকে ভয় বা সমীহ করতো। তাঁর মৃত্যুর পর মালখানগরের ঐ বাড়িতে দু’দুবার ডাকাতি হয়েছিল। মুখে রুমাল বাঁধা ছেলেদের গলার আওয়াজ শুনে তখন চিনতেও পারা গিয়েছিল বেশ। জিনিসপত্র সব নিয়ে যাবার সময় তারা বলেছিল, পরের বার এলে জানে মেরে দেবে। থানায় খবর দিয়ে কোনো ফল হয়নি। থানার ওসি বিদ্রূপের সুরে বলেছিলেন, আপনাগো ইন্ডিয়ায় বুঝি ডাকাতি হয় না? তবে চলে যান না সেখানে! পাকিস্তান সরকার তখন হিন্দু বিতাড়নে পরোক্ষে প্রশ্রয় দিচ্ছে। বিহার ও পাঞ্জাব। থেকে আসা মুসলিম শরণার্থীদের জায়গা দিতে হবে তো। সুতরাং হিন্দুরা চলে যাক না পশ্চিম বাংলায়। মুসলিম লীগের প্ররোচনায় এক শ্রেণীর স্থানীয় মুসলমানও হিন্দুদের সম্পত্তি গ্রাস করার এই খেলায় বেশ মেতে উঠেছে।

প্রতাপ বিশ্বনাথের দিকে তাকিয়ে অনুনয় করে বললেন, ওস্তাদজী, আপনি একটু মা-কে বুঝিয়ে বলুন।

বিশ্বনাথ বললেন, আমি তো অনেক বলেছি, উনি যদি শোনেন তো তোমার কথাই শুনবেন। তুমিই বলো।

প্রতাপ বললেন, মা, ওখান থেকে ওরা আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। ওখানে আর ফেরা যাবে না। তুমি মালখানগরের কথা ভুলে যাও!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *