৬৪.৭ টুং করে একটা শব্দ হতেই

টুং করে একটা শব্দ হতেই অতীন মুখ তুলে ওপরে তাকালো। আসনবন্ধনী আটকে নেবার ও ধূমপান নিষেধের নির্দেশ জ্বলে উঠেছে। এর মধ্যেই এসে গেল ডেনভার? কী করে যে সময়টা কেটে গেল, অতীন খেয়ালই করেনি। বিমানে উঠেই সে ফাইল খুলে অফিসের কাগজপত্রে ডুব দিয়েছিল। নতুন কিছু যে পড়ার আছে কিংবা কিছু তথ্য মুখস্থ করে রাখা দরকার তা নয়। এই শিক্ষাটা সে তার সহকর্মী জিমি গারনারের কাছ থেকে নিয়েছে, অফিসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে গেলে সব সময় মাথায় ঐ চিন্তাটাই রাখতে হয়, অন্য কোনো চিন্তার স্থান দিতে নেই, তাতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ক্ষিপ্রতা বাড়ে। গত পাঁচ দিন ধরে সে প্রত্যেক সন্ধেবেলা আকাশে উড়ছে। দিনের বেলা এক শহরে, রাত্তিরটা অন্য শহরে।

ফাইলটা বন্ধ করে সে হাত-সুটকেশে রাখলো। বিমানযাত্রা তার কাছে এমনই একঘেয়ে যে সে সহযাত্রীদের দিকেও তাকায় না। সে জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখলো। নীচে ডেনভার নগরের আলোর আলপনা দেখা যাচ্ছে। অতীন এর আগে ডেনভারে আসেনি। এবারেও না-আসার মতন। এই কলোরাডো রাজ্যের গভীর অরণ্যানী ও পর্বতের সৌন্দর্য বিশ্ববিখ্যাত, চোদ্দ হাজার ফিটের ওপর তুষারময় পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে হাই ওয়ে আছে এখানে, কিন্তু অফিসের কাজে এলে কেউ সে সব দেখে না। অতীন ডেনভার শহরের ডাউন টাউন ছাড়া কিছুই দেখবে না। এদেশের সব বড় শহরের ডাউন টাউন প্রায় একই রকম চোখ ধাঁধানো অথচ কৃত্রিম। কংক্রিট, ইস্পাত ও কাচের যথেচ্ছাচার।

হলিডে ইন হোটেলে রাত্রি যাপন, সকাল ঠিক সাড়ে ন’টায় এক কারখানার দু নম্বর সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎকার নির্দিষ্ট হয়ে আছে, সেই আলোচনা মধ্যাহভোজ পর্যন্ত গড়াবে। তারপর আর একজনের সঙ্গে চুক্তিপত্রের খসড়া নিয়ে আলোচনা। পাঁচটা দশে আবার বিমান ধরতে হবে নিউ মেক্সিকোর সান্টা ফে-তে যাবার জন্য। কোম্পানীর দূত হয়ে অতীনকে বিভিন্ন কারখানায় ঘুরতে হচ্ছে। কোম্পানি তাকে বুমেরাং-এর মতন ছুঁড়ে দিয়েছে, ঠিক ঠিক জায়গায় আঘাত করে তাকে ফিরতে হবে সোমবারের মধ্যে। এর মধ্যে তাকে একটুও মচকালে চলবে না।

ভুল করে অতীন সিগারেট ধরাতে যাচ্ছিল, প্যাকেটটা রেখে দিল জ্যাকেটের পকেটে। সিদ্ধার্থ সিগারেট ছেড়েছে, বন্ধুরা আরও অনেকে ছেড়ে দিয়েছে, অতীন পারছে না। জরুরি কাজের টেনশানে ধূমপান আরও বেড়ে যায়। অন্যমনস্কভাবে সে একবার দেখে নিল টাই-এর গিটটা। আজ সারাদিন সে এতই ব্যস্ত ছিল যে খবরের কাগজ পড়ার সময় পায়নি। এখনও তিন চার মিনিট সময় আছে, সে তুলে নিল লস এঞ্জেলিস টাইমসের গোছাটা। প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ বুলিয়ে নিল দ্রুত। অনেকদিনের অভ্যেস, আগেই দেখে নেয় ভারতবর্ষের কোনো খবর আছে কি না। নেই, প্রায় কোনোদিনই থাকে না। না থাকলেই নিশ্চিন্ত লাগে। কোনো বড় রকমের দুর্ঘটনা, খুনোখুনি বা দুঃসংবাদ থেকে দেশটা তাহলে অন্তত একদিনের জন্য মুক্ত আছে।

পৃথিবীটা ইদানীং ছোট হয়ে আসছে, কিন্তু ইন্ডিয়া এখান থেকে অনেক, অনেক দূরে।

কয়েকদিন ধরেই এখানকার কাগজগুলো পোল্যান্ড নিয়ে খুব মেতে উঠেছে। ছোট্ট একটা দেশ, তাকে নিয়ে চার কলম হেড লাইন। সেখানকার শ্রমিকরা সরকার-বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে, সেই ছবিও যোগাড় করেছে এরা। পোল্যান্ডের শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে অ্যামেরিকানদের কত মাথাব্যথা আর দরদ! অতীন ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসলো।

অতীনের মনে পড়লো জিমি গারনারের কথা। অফিসের এই সহকর্মীটির সঙ্গেই অতীনের সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব। অবশ্য প্রায়ই তার সঙ্গে খুব তর্কাতর্কি, ফাটাফাটিও হয়। জিমি ইচ্ছে করে অতীনকে মাঝে মাঝে খুঁচিয়ে দেয়। কিছুদিন আগে এখানকার কাগজে উড়িষ্যার কালাহাণ্ডিতে দুর্ভিক্ষে মানুষ মরার সংবাদ বেরিয়েছিল। জিম বলেছিল, ওটিন, দু’ বছর আগে কিউবার কানকুন শহরে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনে যোগ দিতে তোমাদের প্রাইম মিনিস্টার ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন মনে আছে? সেখানে তিনি বলেছিলেন, ভারতে এখন যথেষ্ট খাদ্যশস্য জন্মায়, ভারত আর কারুর কাছে খাদ্যের জন্য ভিখিরির মতন হাত পাতবে না! আমাদের এখানে টি ভি ইন্টারভিউতেও তিনি সে কথাই রিপিট করেছিলেন। উনি কি তা হলে মিথ্যাবাদী? এখনও তোমাদের দেশে না-খেয়ে মানুষ মরে, এখনো কলকাতার রাস্তা-ঘাটে খেতে-না-পাওয়া লোকেরা শুয়ে থাকে কেন? অতীন ইন্দিরা গান্ধীর সমর্থক নয়। রাজনীতি যারা করে তারা প্রত্যেকেই তো মিথ্যে কথা বলে। খাদ্যের উৎপাদন যথেষ্ট হলেও দেশের বহু মানুষের ক্রয় ক্ষমতা নেই। খাদ্য তো বিনামূল্যে দেওয়া হয় না। ভারতের গ্রামাঞ্চলে কোটি কোটি ভূমিহীন শ্রমিকের কোনো কাজ থাকে না বছরে তিন চার মাস। কোনো উপার্জন না থাকলে তারা খাদ্য কিনবে কী দিয়ে, তাই তারা না খেয়ে থাকে। ভারত রাষ্ট্র এখনো এইসব মানুষদের কাজ দিতে পারেনি।

কিন্তু বিদেশে থাকলে প্রত্যেককেই খানিকটা রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা পালন করতে হয়। ইন্দিরা গান্ধীকে যতই অপছন্দ করুক অতীন, কিন্তু সে কথা সে জিমিকে বলবে কেন? কূটনৈতিক চালে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও স্বভাব নয় অতীনের। তার ভাষায় নম্রতা কম, শব্দগুলি উগ্র ও ধারালো। জিমিকে সে বলেছিল, ইন্ডিয়া চিরকালই গরিব দেশ, সেখানকার মানুষদের প্রাণের মূল্য নেই, তাদের নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে। কিন্তু নিউ ইয়র্ক শহরেও ভিখিরি থাকে কেন বলো তো? এই সপ্তাহের নিউজ উইক দেখো, নিউ ইয়র্কে প্রত্যেক রাতে কতজন ভবঘুরে রাস্তায় শুয়ে থাকে, তার একটা রিপোর্ট বেরিয়েছে!

বিমানটি ভূমি স্পর্শ করেছে, এরপর দরজা খুলতে কিছুটা সময় লাগলেও সবাই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। এক্ষুনি বেরুনো যাবে না জেনেও যেন আর দু’ এক মিনিট ধৈর্য ধরে থাকতে পারে না। এই সদা ব্যস্ততার দেশে থাকতে থাকতে অতীনেরও সেই অভ্যেস হয়ে গেছে। বিমানবন্দরে কেউ তাকে প্রত্যুৎগমন করতে আসবে না। সে প্রশ্নই ওঠে না। তবু প্রত্যেকবার প্লেন থেকে নেমে ভিড়ে ভর্তি চাতালটিতে এসে অতীন একবার উৎসুকভাবে মুখ তুলে দেখে। কতজন হাসছে, কেউ কেউ হাতছানি দিচ্ছে, কেউ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে। চুমু, এরা কেউ অতীনকে চেনে না।

ডেনভারে এবং কাছাকাছি অতীনের দু’ একজন পরিচিত ব্যক্তি অবশ্য আছে। এই শহরেই থাকে আবিদ হোসেন, বহু বছর আগে কেমব্রিজে এর সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতো অতীন, এখনও যোগাযোগ আছে। এই বাংলাদেশী ছেলেটি উন্নতি করেছে খুব, এখানে আর্কিটেক্ট হিসেবে তার নাম ছড়িয়েছে, সে বড় বড় আকাশ ঝাড় বাড়িগুলির নকশা বানায়। আবিদ খুব বন্ধুবৎসল, তার স্ত্রীর হাতের রান্না বিশ্ববিখ্যাত। আর আছে একটু দূরে বোলডার শহরে শুভেন্দু দত্ত ও তার স্ত্রী বিশাখা। অতীনের স্কুল জীবনের বন্ধু শুভেন্দু এখন মস্ত বড় অধ্যাপক, ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স ফ্যাকালটির হেড, আর বিশাখার সঙ্গে শর্মিলার এত ভাব যে অতীনের এখানে আসার খবর পেলে ওরা জোর করে অতীনকে হোটেল থেকে বাড়িতে ধরে নিয়ে যেত।

অতীন কারুকেই খবর দেয়নি। সে তো বেড়াতে আসেনি, সে এসেছে কাজ নিয়ে। খুব কঠিন কাজ। বিজনেসের সঙ্গে প্লেজার মেশানো যায় না। অতীনের অফিসের ঠিক একধাপ ওপরের কর্তা রবার্ট ম্যাককরমিক একবার তাকে একটা প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়েছিল। সে বলেছিল, জানো তো, প্রতিটি সপ্তাহেরই দুটি ভাগ আছে। পাঁচ আর দুই। পাঁচদিন কাজ, দু’ দিন ছুটি। পাঁচদিন তুমি একরকম, দু’ দিন তুমি আলাদা মানুষ। এই দুটোকে কক্ষনো একসঙ্গে মেশাবে না। শনি রবিবারে তুমি বাড়িতে বসে অফিসের কাজ করবে না, অফিসের কথা চিন্তাও করবে না। আমার তো এই দুটি দিন পরিবারের জন্য উৎসর্গীকৃত। আমি বাগান করি, তার কাটি, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সময় কাটাই, প্রতিবেশী বা বন্ধুদের সুখ দুঃখের খবর নিই। তুমি ইয়াং ম্যান, তোমরা অন্যরকম ফুর্তি-ফাৰ্তা করতে পারো এই দুটো দিন। কিন্তু বাকি পাঁচদিন তুমি-আমি কোম্পানির ক্রীতদাস। কোম্পানি তো সেইজন্যই মাইনে দিচ্ছে, তাই না? প্রাতরাশের সময় থেকে রাত্তিরে শুয়ে আলো নেবানো পর্যন্ত তোমাকে কাজের কথাই চিন্তা করতে হবে। এমন কি স্বপ্নেও তুমি অফিসের লোকজনদের দেখে ফেলবে। আর একটা কথা! অফিসের কাজের ব্যাপারে বাইরের কোনো পার্টির সঙ্গে যদি তোমার জরুরি কোনো কথাবার্তা থাকে, তা হলে আগের রাত্তিরটা অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেবে। সে রাত্রে পরিমিত মদ্যপান এবং ঘুমের বড়ি সেবন বাঞ্ছনীয়। রাত্রি জাগরণে মন চঞ্চল থাকে। আগের রাত্রে তুমি যদি অন্য লোকজনের সঙ্গে বেশি গল্পগাছা করো, তা হলে পরের দিনও মনের মধ্যে সেইসব কথার রেশ থেকে যায়, কাজের কথাগুলি সব যথাসময়ে ঠিকঠাক মনে পড়ে না। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব ঠিক মতন অনুধাবন করা, সেই জন্য তোমার মস্তিষ্কটা সব সময় একাগ্র করে রাখা উচিত। অফিসের স্বার্থে তুমি যদি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চাও, তা হলে আগের রাত্রে জমাট সাত ঘণ্টা খুম অবশ্য প্রয়োজনীয়।

এখন প্রত্যেকদিনই অতীনকে জরুরি কথাবার্তা চালাতে হচ্ছে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কথা মনে রেখে। রবার্ট ম্যাককরমিকের উপদেশ শিরোধার্য করে সে প্রত্যেক রাতেই ঘুমের বড়ি খাচ্ছে, সকালে শরীরটা বেশ ঝরঝরে থাকে। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে অতীন একটা ট্যাক্সি নেবে। শৃঙ্খলাবদ্ধ হোটেলগুলির সব জায়গাতেই ঘর একরকম, ব্যবস্থা সমান। দু পেগ সুরা, হালকা আহার ও ঘণ্টাকয়েক টি ভি দেখা, তারপর ওষুধ খেয়েই ঘুম। আজ সন্ধেবেলা তার আর কিছুই করার নেই। পাঁচটি শহরের অভিযানের মধ্যে তিনটিতেই অতীন সার্থক হয়েছে, এখন পর্যন্ত তার পরিকল্পনা অনুযায়ী সব চলছে ঠিকঠাক, আর দুটি কোম্পানীর মালিকদের ঠিকমতন তার বক্তব্য বোঝাতে পারলেই অতীন বিজয়ীর মতন ফিরবে নিউ ইয়র্কে।

অনেকদিন আগে অতীন একটা ফিল্ম দেখেছিল, নাম, ‘দ্য ম্যান ইন দা গ্রে ফ্লানেল সুট’। এমন কিছু উচ্চাঙ্গের ফিল্ম নয়। তবু সেটা অতীনের মনে দাগ কেটে আছে। নায়ক গ্রেগরি পেক। যুদ্ধ পরবর্তী কালে এদেশে মাঝারি চাকুরিজীবীরা সবাই গ্রে ফ্লানেল স্যুট পরতো। হাতে ব্রীফ কেস নিয়ে ঐ পোশাক পরা হাজার হাজার মানুষ ট্রেন থেকে নেমে ভূগর্ভ ফুড়ে উঠে আসতো নিউ ইয়র্ক শহরে। তারপর অফিসের দিকে ছোটাছুটি। সারাদিন ধরে তাদের কাজ যেন মস্ত বড় একটা চাকার ছোট ছোট পেরেকের মতন। তাদের আলাদা কোনো চরিত্র নেই। সন্ধের পর বাড়ি ফিরেও একই রুটিন বাধা জীবন। প্রথমেই খাওয়া, তারপর বউ বাচ্চাদের সঙ্গে দু চারটে টুকিটাকি কথা, তারপর টি ভি দেখতে দেখতে হাই তোলা। ঐ রকম একজন মানুষ গ্রেগরি পেগ। কিন্তু অফিসে কিংবা বাড়িতে হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতন তার মনে পড়ে যেত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার টুকরো টুকরো ঘটনা। অন্যান্য সমর্থ আমেরিকানদের মতন তাকেও যুদ্ধে যেতে হয়েছিল। নর্মাণ্ডি উপকূলে সে একদিনে ঠাণ্ডা মাথায় একুশজন নারী-পুরুষকে খুন করেছিল গুলি চালিয়ে। একবার একটা কামানের শেলের গর্তের মধ্যে পড়ে গিয়ে সে দুটি জার্মান কিশোরের মুখোমুখি হয়, অতি তৎপরতায় বেয়নেট চালিয়ে সে দু’জনকেই গেঁথে ফেলেছিল মাটিতে। মাঝে মাঝেই তার চোখে ভেসে ওঠে সেই মৃত্যুকাতর কিশোর দুটির মুখ। এখন গ্রে ফ্লানেল স্যুট পরা এই অফিস কর্মচারীটিকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না, সে একজন কতবড় খুনী। সে এখন আর পাঁচজনের মতনই, অফিসে কাজের সুনাম আছে, বাড়িতে সে দায়িত্বশীল স্বামী ও দুটি ছেলেমেয়ের স্নেহময় পিতা।

অতীনের পোশাক অবশ্য ধূসর নয়। সে পরে আছে একটা হালকা নীল রঙের স্ট্রাইপড স্যুট। সে কিছুটা লম্বা বলেই স্ট্রাইপ পছন্দ করে, তাতে আরও একটু লম্বা দেখায়। বহু বছর ঠাণ্ডার দেশে থাকার জন্য তার রং বেশ ফর্সা হয়েছে। অবশ্য তাহলেও এদেশে কেউ তাকে শ্বেতাঙ্গ বলে মনে করবে না, বড়জোর মিশ্রিত মেকসিক্যান ভাবতে পারে। এখনও তার মাথার চুল সমস্তই কালো। এই পোশাক ও গাম্ভীর্যমাখা মুখোনির আড়ালে তার সমস্ত অতীত চাপা পড়ে গেছে।

জিমি গারনার প্রায়ই অতীনকে ক্ষ্যাপাবার চেষ্টা করে। একদিন সে বলেছিল, আচ্ছা, ওটিন, তুমি এতটা লম্বা হলে কী করে? আমার তো ধারণা ছিল, সমস্ত ভারতীয়রাই আফ্রিকানদের মতন বেঁটে বেঁটে। গরিব জাতির পক্ষে বেঁটে হওয়াই স্বাভাবিক, যেমন ধরো ইটালিয়ানরা।

অতীন বলেছিল, দ্যাখো, মূর্খ অনেকেই হয়। কিন্তু তোমরা অ্যামেরিকানরা, তোমাদের মতন আর কেউ মূর্খটা এমন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে জাহির করে না। তোমাদের ইতিহাস-ভূগোলের জ্ঞান দেখে আমার পিলে চমকে যায়! তোমরা নিজের দেশটা ছাড়া আর কিছু চেনো না! আফ্রিকায় পিগমিদের মতন দু’ একটি উপজাতি মাত্র খর্বকায়, তুমি শুধু সেই কথাটাই কোথায় যেন শুনেছো। গড় আফ্রিকানরা বেশ লম্বা। তোমাদের দেশের কালো মানুষদের দেখেই বোঝা উচিত, তারা আফ্রিকা থেকেই এসেছে। মাসাই ট্রাইবের নাম শুনেছো? তারা প্রত্যেকেই ছ ফিটের ওপর। বেশিরভাগ ভারতীয়ই আদি আর্যদের বংশধর, তারা বেঁটে হবে কেন? তুমি এদেশে পাঞ্জাবীদের দেখোনি? তুমি গত রবিবার সি বি এস চ্যানেলে চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার দেখেছিলে। তার মতন দীর্ঘকায়, সুপুরুষ তোমাদের দেশে কটা আছে খুঁজে বার করো তো!

জিমি হো হো করে হেসে উঠেছিল। এই একটা এদের অদ্ভুত গুণ। মুখের ওপর কঠোর সত্য কথা শুনিয়ে ধমক দিলেও এরা হাসে। এদের ফুসফুস জোরালো, এরা যখন তখন হাসতে জানে।

জিমি হাসতে হাসতে বলেছিল, তোমাকে তোমার দেশের কথা তুলে একটু খোঁচা মারলেই তোমার গণ্ড রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে আর চক্ষু বিস্ফারিত হয়। তুমি তোমার দেশের জন্য সবসময় খুব টান অনুভব করো, তাই না? তোমার পাসপোর্টটার কথাও মনে থাকে না!

এটাও আর একটা মারাত্মক খোঁচা, অতীন যেন সর্বাঙ্গ জ্বলে পুড়ে ছটফট করে, ঠিক কোনো উত্তর দিতে পারে না, তখন জিমি তাকে টানতে টানতে বীয়ার খেতে নিয়ে যায়।

অতীন নিজের সুটকেসটি খালাস করার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ালো, বেশ বড় এয়ারপোর্ট, সন্ধেবেলা অনেকগুলো ফ্লাইট। অবিরাম জনস্রোত ও অপেক্ষারত যাত্রী-যাত্ৰিণীদের মধ্যে দু’ চারজন ভারতীয়ও রয়েছে। অতীন তাদের কারুর চোখে চোখ ফেলে না। শুধু ভারতীয় বলেই যে কারুর সঙ্গে অকারণে কথা বলতে হবে তার কোনো মানে নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে আবার অফিসের কাজের কথাই ভাবছে। ডেনভারে যদি আলোচনা ফলপ্রসূ হয়, তাহলে সান্টা ফে-তে কাজ অনেকটা এগিয়ে থাকবে। আজ ক্যানসাস সিটিতে সে একটা মহা জেদী লোকের পাল্লায় পড়েছিল, সারা দুপুর তার সঙ্গে বাক কৌশল দিয়ে ধস্তাধস্তি করতে হয়েছে। খানিকক্ষণ পরেই তার সন্দেহ হয়েছিল, লোকটি ইহুদি। নামটা জার্মান ঘেঁষা, হতেও পারে। রবার্ট ম্যাককরমিক তাকে সাবধান করে দিয়েছিল, ইহুদিদের সঙ্গে সব সময় হিসেব করে কথা বলতে হবে। ওরা কোনো প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয় না, সব সময় একটা প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। এমনকি, তুমি যদি অতি সাধারণ ভাবে জিজ্ঞেস করো, আজকের আবহাওয়াটা খুব সুন্দর না? তার উত্তরে একজন ইহুদি বলবে, কেন, তোমার মতে কি গতকালের আকাশ কম নীল ছিল?

অ্যাংলো স্যাক্সনদের সংস্পর্শে থেকে থেকে অতীনের মনেও বোধহয় একটা সূক্ষ্ম ইহুদি-বিদ্বেষ জন্মে যাচ্ছে। এদেশে ইহুদিদের বেশ প্রতাপ, সেইজন্যই এদের সম্পর্কে একটা চাপা বিরোধিতাও রয়েছে। যতই টাকা পয়সার জোর থাক, তবু কোনো ইহুদির পক্ষে অ্যামেরিকায় প্রেসিডেন্ট হওয়া অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব নয়। অতীনের দু একজন ইহুদি বন্ধু। আছে। তারা চমৎকার মানুষ, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে অতীন দেখেছে, ওদের সঙ্গে কথার প্যাঁচে পারা খুবই শক্ত। আজ দুপুরেই অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে অতীনের মনে হয়েছিল, তাকে ক্যানসাস সিটিতে আরও দু’ একটা দিন থেকে যেতে হবে। তা হলে পরবর্তী অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো বদল করতে হবে। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত অনেকটা রফা হয়েছে, তবে অনেকটাই এখনো নির্ভর করছে ডেনভারের দুটো লোকের সঙ্গে আলোচনার সার্থকতার ওপর।

এই শনিরবিবারেও অতীনের ছুটি নেই। আলোচনাটা এমনি জরুরি যে একটি কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট সপরিবারে সান্টা-ফে শহরে বেড়াতে গেছে, অতীন সেখানে যাচ্ছে সেই ব্যক্তিটির সঙ্গে কথাবার্তা পাকা করতে। এই কাজটায় সময়ের একটা বিশেষ মূল্য আছে, তা বুঝেই সেই ব্যক্তিটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে রাজি হয়েছে তার ছুটির মধ্যেও রানিং এগেইনস্ট টাইম যাকে বলে। মাথার ওপর ঝুলে আছে জাপানী খাড়া। জাপানকেই নিয়ে যত ভয়।

অতীন বিজ্ঞানের ছাত্র ছিল, এখন সে একটি গ্লোরিফায়েড সেলসম্যান। তার কোম্পানি নতুন নতুন প্রোডাক্ট বার করলে অতীনের কাজ হচ্ছে অন্য কোম্পানির সঙ্গে যৌথ দায়িত্ব স্থাপন কিংবা পৃথিবীর অন্য দেশে সেই বস্তুটির উৎপাদনের ব্যাপারে টেকনিক্যাল দিকগুলি নিয়ে বোঝাঁপড়া করা। অতি সম্প্রতি তার কোম্পানি এক অভিনব ভূমি-সার প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ম্যাজিক ফার্টিলাইজার। এতে যে-কোনো ফসলের উৎপাদন ত্বরান্বিত ও অন্তত তিনগুণ করা যাবে। অ্যামেরিকায় এ বস্তুটির মার্কেটিং কোনো সমস্যা নয়, সে দায়িত্বও অতীনের নয়। কিন্তু চীন সম্প্রতি সে দেশে বিদেশী কোম্পানিদের কিছু কিছু কারখানা স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে, দেড় শো মিলিয়ন ডলারের একটি গ্লোবাল টেন্ডার ফ্লোট করেছে সার কারখানার জন্য। জাপান ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই সেই দেড় শো মিলিয়ন ডলারের অর্ডারটা গ্রাস করা দরকার। চার-পাঁচটি অ্যামেরিকান কোম্পানি সিণ্ডিকেট করে এই কাজে হাত দিলে চট করে শুরু করে দেওয়া যায়। এখানকার জন ডিয়ার কম্পানির ক্যাটার পিলার নামে ট্রাক্টর জগৎবিখ্যাত, তারা এখন সার নির্মাণেও হাত দিয়েছে। সেই কোম্পানিরই ভাইস প্রেসিডেন্ট আছে সান্টা-ফে শহরে, তাকে ভজাতে পারলেই অতীনের দ্বিগুণ পদোন্নতি কেউ আটকাতে পারবে না, মাইনে বাড়বে বছরে চব্বিশ শো ডলার। এই টাকাটা তার খুব দরকার, বাড়িটা পাল্টাতে হবে, একটা নতুন বাড়ি কেনার জন্য শর্মিলা পছন্দ করে রেখেছে। মায়ের হাত খরচের টাকাও বাড়াতে পারবে অতীন, বাবাকে সে লিখবে একটা গাড়ি কেনার জন্য। এই বয়েস আর বাবা-মায়ের কলকাতার রাস্তায় ট্রামে বাসে ঘোরার দরকার নেই।

সুটকেসটা ঘুরতে ঘুরতে আসছে, হঠাৎ অতীনের কেমন যেন একটা অস্বস্তির ভাব হলো। কিছু একটা ভুল শব্দ সে শুনতে পাচ্ছে, কিছু কিছু ভুল অক্ষর সে দেখছে। এরকম শব্দ, এরকম অক্ষর এখানে থাকার কথা নয়। কী হচ্ছে গোলমাল? কেউ তার নাম ধরে ডাকছে? এরকম হয় মাঝে মাঝে, আচমকা পেছন থেকে ডাক শুনতে পায়। পরিষ্কার বাংলায়। একবার সে অবিকল কৌশিকের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিল, কৌশিক যেন ব্যাকুলভাবে ডাকছে, অতীন! অতীন! বাবলু! সেবার অতীন ভয় পেয়েছিল, তা হলে কি কৌশিক বেঁচে নেই? তার কুসংস্কার নেই, তবু ছেলেবেলায় ঠাকুমার মুখে গল্প শোনা স্মৃতি মনে পড়ে গিয়েছিল। মৃত্যুর ঠিক মুহূর্তটায় মানুষ নাকি তার ঘনিষ্ঠজনকে ডাকে, সে যতদূরেই থাকুক, ঠিক শুনতে পায়। সেটা অবশ্য মেলেনি, কৌশিক বেঁচে আছে।

সুটকেসটা তুলে নিয়ে অতীন ওপরের দিকে তাকালো। টি ভি স্ক্রিনে বিমানগুলির আগমন-নির্গমনের নির্ঘণ্ট দেখানো হচ্ছে অনবরত। অতীনের আজ আর কোথাও যাবার দরকার নেই, তবু এমনিতেই চোখ পড়ে যায়। তার বুকটা ধক করে উঠলো। জলের মতন ভাসতে ভাসতে চলে যাচ্ছে কয়েকটি অক্ষর, সেটা আসলে তার নাম। একি সত্যি হতে পারে? নাকি তার চোখে ঘোর লেগেছে।

শুধু নাম নয়, একটি বার্তা। অতীন মজুমদার, ফ্লাইট নাম্বার এ এল সাতশো দুইয়ের সদ্য আগত যাত্রী, আপনাকে অবিলম্বে অনুসন্ধান কাউন্টারে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। আপনার জন্য জরুরি সংবাদ আছে।

তারপর সে শুনতে পেল, অন্তরীক্ষে যন্ত্রস্বরেও সেই কথাই ঘোষণা করা হচ্ছে। তা হলে সে ভুল ডাক শোনেনি, ভুল অক্ষর দেখেনি। ঘোষকের বীভৎস উচ্চারণের জন্যই অতীন তার নিজের নামটা ঠিক বুঝতে পারেনি এতক্ষণ।

কে তার নামে এখানে খবর পাঠাবে। সে যে আজ এই সময়ে ডেনভার বিমানবন্দরে এসে পৌঁছোবে, তারও তো কোনো ঠিক ছিল না। বাড়ি থেকে হতেই পারে না। গত রাত্তিরে সে ছিল শিকাগোতে, সেখান থেকে শর্মিলাকে ফোন করে বলেছিল, ক্যানসাস সিটিতে তার ক’দিন থাকতে হবে, তার ঠিক নেই।

অফিসের কেউ? কাল রাতে সে জন ম্যাককরমিককেও ফোন করেছিল, তারপর আর এর মধ্যে এমন কী ঘটতে পারে? তাহলে কি আবিদ হোসেন কোনোভাবে খবর পেয়ে গেল? কিংবা শুভেন্দু? ওদের পক্ষে অতীনের গতিবিধি জানার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

ব্যাপারটা যেন ফ্রান্স কাফকার উপন্যাসের মতন। অতীন যে আজ সন্ধেবেলা এই নির্দিষ্ট বিমানটিতে ডেনভার-এ এসে পৌঁছোবে, সে বিষয়ে সে নিজেই নিশ্চিত ছিল না, টিকিট কেটেছে শেষ মুহূর্তে এয়ারপোর্টে এসে, অথচ এখানে তার জন্য একটা বার্তা অপেক্ষা করে আছে!

খুব একটা ব্যস্ততা না দেখিয়ে অতীন হাঁটতে শুরু করে দিল। অফিস থেকেই আন্দাজে কোনো খবর পাঠিয়েছে নিশ্চয়ই! আবার নতুন কী ঘটতে পারে? তার কাজে কোনো ভুল। হয়েছে? পুরো ডিলটাই বানচাল হয়ে গেছে, জাপানীরা মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে? কিংবা কোম্পানিটা হঠাৎ বিক্রি হয়ে গেল নাকি? আজ থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে? এদেশে তা বিচিত্র কিছু নয়।

অনুসন্ধান অফিসে একটি তরুণী মেয়ে কী সব লেখালেখিতে খুব ব্যস্ত। অতীন তার সামনে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতেই সে এক টুকরো কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললো, এখানে ফোন করো

কাগজে শুধু একটা টেলিফোন নাম্বার লেখা। সেটা দেখা মাত্রই অতীনের সমস্ত শরীর ঝিমঝিম করতে লাগলো। তার চোখে ভেসে উঠলো ছেলে আর মেয়ের মুখ। রণ আর অনীতা। নিশ্চয়ই ওদের একজনের কিছু হয়েছে। কতবড় বিপদ? রণ ভীষণ দুষ্ট, যখন তখন বাড়ির দরজা খুলে বেরোয়, বাড়ির কাছেই হাই ওয়ে!… অনীতা ওর এক বান্ধবীর বাড়িতে পড়তে যায়, ফেরে একলা একলা, হেঁটে হেঁটে। কতদিন অতীন শর্মিলাকে বলেছে যে মেয়ে এখন বড় হয়েছে…। দিনকাল খারাপ, গুণ্ডামি বদমাইশি বাড়ছে হু-হু করে, ছেলেচুরি, নাবালিকা ধর্ষণ… একমাস আগেই তাদের বাড়ির কাছের লেকে গলা মোচড়ানো অবস্থায় একটি কিশোরী মেয়েকে পাওয়া গিয়েছিল…। ছেলেটা সম্পর্কেই বেশি ভয়, বেসমেন্টে একদিন ওয়াশিং মেশিনের মধ্যে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেছিল…

অতীন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো, টেলিফোন বুথের দিকে যেতে তার পা সরছে না। অচেনা জায়গায় একা একা প্রচণ্ড কোনো খারাপ খবর সে সহ্য করবে কী করে? সে যে এত দুর্বল, তা সে নিজেই জানতো না। রণের কী হয়েছে? রণ আর নেই? রণ, রণ, তার প্রিয়তম সন্তান! অতীনের বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে।

অনুসন্ধান কাউন্টারের তরুণীটির চোখ সত্যি সত্যি অনুসন্ধিৎসু। সে একটা টেলিফোনে কথা বলছিল, তাতে হাত চাপা দিয়ে অতীনকে জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে আমি কিছু সাহায্য করতে পারি?

মেয়েটির মাথায় চুল গোলাপি রঙের, চোখের মণি নীল। ঠিক যেন একটা পুতুল। উচ্চারণে একটা ত ত ভাব আছে।

অতীন একটা সিগারেট ধরিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলো, এই ফোন নাম্বারটা ছাড়া আর কোনো মেসেজ নেই?

মেয়েটি বললো, দাঁড়াও, দেখছি। একজন লেডি খুব ব্যস্তভাবে তোমাকে ফোন করছিলেন। নাম হচ্ছে… ইয়ে, শার্ম… শার্মাইলা?

–শর্মিলা মজুমদার। হ্যাঁ, কী বলেছেন তিনি?

–তোমার স্ত্রী? তোমাকে এয়ারপোর্ট থেকেই ফোন করতে বলেছেন। নিশ্চয়ই কোনো ভালো খবর আছে তোমার জন্য। কিংবা আজ তোমাদের বিবাহবার্ষিকী নাকি, ভুলে গেছ?

এরা সবসময়ই কৌতুক করে কথা বলে। কিন্তু অত তুচ্ছ কারণ হলে এরা সময় নষ্ট করতে না। শর্মিলাকে নিশ্চয়ই ঘটনার গুরুত্ব বুঝিয়ে বলতে হয়েছে। বাচ্চা ছেলেমেয়েদের দুর্ঘটনায় সবাই বিচলিত হয়। অনীতা অনেকটা বড় হয়েছে, সে সাবধানী, কিন্তু রণ, সে অতীনের লাইটার নিয়ে খেলা করে, আগুন জ্বালিয়ে ফেলেছে? শর্মিলা রান্নাঘরের গ্যাস খুলে রেখেছিল?

যুবতীটির চোখে যেন সহানুভূতির চিহু। সে বললো, সব টেলিফোন বুথগুলি ভর্তি দেখছি, তুমি এখান থেকেই ফোন করতে পারো, তবে অপারেটারের থ্রু দিয়ে কালেক্ট কল…

অতীন বললো, তোমাকে অজস্র ধন্যবাদ।  

মেয়েটি একটি হাসির ঝিলিক দিয়ে বললো, ইউ আর ওয়েলকাম।

রিসিভারটা ধরে অতীন বুঝতে পারলো তার হাত কাঁপছে। মনে মনে দুবার বললো, স্টেডি। স্টেডি!

তারপর সে জিজ্ঞেস করলো, হ্যালো কে?

অনেক দূর থেকে মিষ্টি, সুরেলা এক বালক কণ্ঠ ভেসে এলো, হাই ড্যাডি! হোয়ার আর ইউ ইন টেক্সাস?

ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার কথা অতীন অনেকবার শুনেছে,আজ অনুভব করলো সেটা কী রকম সত্যি সে দরদর করে ঘামছে। তার বুকের ওপর যেন একটা ভারী ওজন ছিল, এইমাত্র সরে গেল। রণ ভালো আছে। রণ ভালো আছে। তার ইচ্ছে করছে দু হাতে জড়িয়ে বণকে আদর করতে।

অতীন এবার ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করলো, রণি, কেমন আছিস রে তোরা? কী হয়েছে। বাড়িতে? দিদি কোথায়?

রণ বললো, দিদি ইজ ওয়াচিং টিভি। আ ভেরি বোরিং মুভি, আই ডিডনট লাইক ইট!

ড্যাডি, হোয়েন আর ইয়া কামিং হোম?

রণ ভালো আছে! অনীতা ভালো আছে। শর্মিলা কোথায়?

রণ উচ্চকণ্ঠে ডাকলো, মম, মম, ড্যাডি ইজ কলিং ইয়া। মম, ম ও ম…। ড্যাড, আর ইয়া রিয়েলি ইন টেকসাস? হ্যাভ ইয়া মেট এনি কাউ বয়!

অতীনের এবার ভুরু কুঁচকে গেল। তাহলে কিছুই ঘটেনি, শুধু শুধু তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলা হয়েছিল? এর মানে কী? এরপর রণ যেই জানালো যে মা এখন বাথরুমে ঢুকেছে, আধ ঘণ্টার মধ্যে বেরুবে না, অতীন তাকে এক ধমক দিয়ে বললো, শিগগির মাকে ডাকো? ছেলে ভালো আছে, সুতরাং এখন আর তাকে স্নেহের আদিখ্যেতা দেখাবার কোনো মানে হয় না!

রণ বাথরুমের দরজায় কয়েকবার কিল মেরে ফিরে এসে বললো, মা বলছে, তোমার নাম্বার দাও, আধ ঘণ্টা বাদে রিং ব্যাক করবে!

অতীন আবার আদেশ করলো, রণ, যাও মাকে বলো, এক্ষুনি বেরিয়ে আসতে। আমার একটুও সময় নেই!

রিসিভারটা নামিয়ে রেখে অতীন আবার সিগারেট ধরালো। সে আর ধৈর্য ধরতে পারছে না। শর্মিলার এরকম পাগলামির কারণটা সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। কাউন্টারের মেয়েটি কী ভাবছে! শুধু শুধু ফাজলামি করে ওদের ধোকা দেওয়া হয়েছে। শর্মিলাকে বকুনি দেওয়ার জন্য সে চোয়াল শক্ত করলো।

বহু দূরে নিউ জার্সির বাড়িতে শর্মিলা বাথরুমে বাথটাবে শুয়ে মাথায় ও মুখে জলের ধারা নিচ্ছে। টাবের জলে এত ফেনা যেন মনে হয় সে আশ্বিনের পুঞ্জ পুঞ্জ সাদা মেঘের মধ্যে শুয়ে আছে। সন্ধেবেলার এই স্নান তার একটা প্রধান বিলাসিতা। অফিস থেকে ফিরেই তাকে রান্না করতে হয়।

ফ্যামিলি রুমে টিভিটা খোলা। কার্পেটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে অনীতা, এক হাতে একটা স্বচ্ছ ঠোঙা ভর্তি আলু ভাজা, অন্য হাতে লুঙলাম নামে একজন জনপ্রিয় লেখকের রোমহর্ষক উপন্যাস। কৈশোর সদ্য পার হয়ে আসছে অনীতা, এর মধ্যেই তার শরীরে যৌবন ঝনঝন শব্দ করতে শুরু করে দিয়েছে। এ দেশে যৌবন তাড়াতাড়ি আসে। অনীতার চুল একটা নীল রিবন দিয়ে বাধা, সুন্দর চুল হয়েছে তার। টি ভি-তে সে তার প্রিয় ধারাবাহিক মাপেট শো দেখছে, মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপন এসে গেলেই সে মনোযোগ দিচ্ছে হাতের বইতে ও আলুভাজায়।

একটু দূরে নানারকম খেলনা ছড়িয়ে বসে আছে তার ছোট ভাই। সবই নকল যুদ্ধের সরঞ্জাম। ছোট ভাইটিকে অনীতা ডেনিস দা মিনেস বলে ডাকে, এ রকমই মুখখানা রণের।

বেশ গাট্টাগোট্টা স্বাস্থ্য, আইসক্রিম আর চকলেট তার প্রিয় খাদ্য, ভাত তার চোখে বিষ, বাড়ির তৈরি স্যান্ডুইচও সে সহজে ছুঁতে চায় না। একমাত্র ম্যাকডোনাল্ড কোম্পানির হ্যামবার্গার সে বিশেষ পছন্দ করে। এক একদিন তার কান্না থামাবার জন্য শর্মিলাকে গাড়ি চালিয়ে গিয়ে ঐ হ্যামবার্গার কিনে আনতে হয়।

শীত বিদায় নিয়েছে। জানলার বাইরে রাস্তার গাছগুলিতে দেখা যায় নতুন কিশলয়। ফিরে আসছে পাখিরা।

ছেলের মুখে দ্বিতীয়বার খবর পেয়ে শর্মিলা অবাক হয়ে ভাবলো, অতীন হঠাৎ তাকে ব্যস্ত হয়ে ফোনে ডাকছে কেন? সে তো রাত ন’টার আগে কখনো ফোন করে না?

ভুলো-মনা বলে শর্মিলার খ্যাতি আছে বন্ধু মহলে। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন বেড়ে যাচ্ছে তার বিস্মরণ। তোয়ালে আর সাবান নিয়ে একদিন সে রান্নাঘরে ঢুকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভেবেছিল, এখানে কেন যেন এসেছি? একবার একমাসে সে তিনবার গ্যাসের বিল শোধ করার জন্য চেক পাঠিয়েছিল, সেই কোম্পানির একজন কর্মী ফোন করে জানতে চেয়েছিল, কী ব্যাপার, তুমি আমাদের এত টাকা দিতে চাইছো কেন বলো তো?

বন্ধুরা কেউ এই জন্য শর্মিলাকে হাসি ঠাট্টা করলেই সে বলে, বয়েস হচ্ছে তো, কিছুই মনে রাখতে পারি না। তা ছাড়া এই দেশে আর আমার একটা দিনও থাকতে ইচ্ছে করে না!

শর্মিলাকে দেখে অবশ্য বয়েস বোঝা যায় না। দুটি সন্তানের জননী হয়েও শর্মিলার শরীর একটুও ভাঙেনি। প্রতিদিন স্নানের পর মনে হয়, তাজা, সমুদ্র থেকে উঠে আসা কোনো দেবীর মতন। অনেকেই বলে, কুমারী বয়েসে কিংবা বিয়ের সময় শর্মিলা এমন কিছু রূপসী ছিল না। রোগাটে ছিল, চোখের কোণে ক্লান্তির ছাপ লুকোতে মুখের হাসিতে। তার হাসিটুকুই ছিল সুন্দর। দুই ছেলেমেয়ের জন্মের পরেই যেন সে পূর্ণ বিকশিত হলো, রংও খুলেছে অনেকটা। ছেলে-মেয়ে সঙ্গে থাকলেও তাকে জননী বলে মনেই হয় না। মনে হয় যেন যৌবনের রঙ্গভূমিতে সে সদ্যই এসেছে।

কয়েক মুহূর্ত পরেই শর্মিলার মনে পড়ে গেল। দারুণ ব্যস্তভাবে সে শরীরের ফেনা ধুয়ে, কোনো রকমে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে, হাউস কোটটা জড়িয়ে নিয়ে ছুটে এলো বাথরুমের বাইরে। টেলিফোন ধরে উৰ্বশ্বাসে বললো, সরি বাবলু, আমার একটু দেরি হয়ে গেল।

অতীন কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলো, হোয়াটস দা জোক?

শর্মিলা অনুতপ্ত গলায় বললো, এক্সট্রিমলি সরি, চান করছিলাম, তুমি কোথা থেকে ফোন করছো? তুমি আমার মেসেজ পেয়েছিলে?

–হোয়াট ইজ দি মেসেজ?

–তোমার অফিসে ফোন করেছি, জিমি গারনারকে খবর দিয়েছি, তারপর ক্যানসাস আর ডেনভার এয়ারপোর্টে… ওরা কিছুতেই মেসেজ নিতে চায় না, বললো, পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না।

–কাট ইঁট শট, মিলি! আমি খুবই টায়ার্ড। তোমার যদি ইম্পটান্ট কিছু বলবার থাকে।

অনীতা যদিও একইসঙ্গে টি ভি দেখা, আলুভাজা খাওয়া ও খুনোখুনির গল্প পড়া চালিয়ে যাচ্ছে, তবু পারিবারিক ঘটনা প্রবাহের দিকে তার চোখ কান খোলা থাকে। মায়ের স্বভাবও সে জানে। এরই মধ্যে মাকে সে তার নিজের তুলনায় একজন ছেলেমানুষ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। সে এবার চেঁচিয়ে বললো, মা-আ, সামবডি আজ ইন্ডিয়া থেকে ফোন কল করেছে। গ্র্যান্ড পা ইজ সিক, সেইজন্যই তুমি বাবাকে মেসেজ দিতে চাইছিলে।

শর্মিলা এবারে একবার দম নিল। খবরটা সে অতীনকে কী ভাবে বলবে সেটাই সে বুঝতে পারছিল না। মেয়ের নির্দেশ পেয়ে সে বললো, হ্যাঁ, বাবলু, দেশ থেকে আজ একটা ফোন এসেছে, তোমার লালুকাকা ফোন করেছিল…

–লালুকাকা? সে আবার কে? নেভার হার্ড অফ হিম!

–বাঃ, তোমার একজন কাকা আছে না?

–আমার একটিই কাকা, তাকে আমরা কানুকাকা বলি।

–হ্যাঁ, তিনিই। ঠিক। ভালো করে শোনা যাচ্ছিল না।

–ভালো করে শোনা না গেলেও লালুকাকা নামে কি নতুন কেউ গজাবে? এনি ওয়ে, কী বললেন কানুকাকা?

–বাবলু, মাথা ঠাণ্ডা করে শোনো। ডোন্ট গেট আপসেট! তোমার বাবা খুব অসুস্থ। তোমার এক্ষুণি একবার কলকাতায় যাওয়া দরকার।

–কে অসুস্থ?

–বাবা। তোমার বাবা।

কয়েক মুহূর্ত অতীন নীরব রইলো। চোখের সামনে সে দেখতে পেল বাবাকে। জেদী, চিরকালের অভিমানী। বাবার ব্লাড প্রেসার যথেষ্ট বেশি। মাঝে মাঝে এখান থেকে চেনাশুনো যারা দেশে যায়, তাদের হাত দিয়ে অতীন ওষুধ পাঠায়, সে ওষুধ তিনি নিয়মিত খান কি না সন্দেহ। এই বয়েসেও বাবার অনেকরকম ছেলেমানুষী আছে, বয়েসটা মানতে চান না। কারডিয়াক অ্যারেস্ট? সেরিব্রাল অ্যাটাক?

–কী অসুখ হয়েছে? কতটা সীরিয়াস? হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে?

–তা ঠিক বোঝা গেল না। দেশের টেলিফোন কি বোঝা যায় ভালো করে? আমি তবু খানিকটা শুনতে পাচ্ছি, তোমার কানুকাকা বোধ হয় কিছুই শুনতে পাচ্ছিলেন না, শুধু হ্যালো হ্যালো করে চাচাচ্ছিলেন, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন, আমি যত বলছিলুম যে তুমি এখানে নেই, উনি তা বুঝতেই পারছিলেন না। তিনঘণ্টা চেষ্টা করে নাকি লাইন পেয়েছেন, বললেন, তোমার পক্ষে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলকাতায় ফেরা…

–অসম্ভব! আমি এখন কী করে যাবো?

–ওর কথা শুনে মনে হলো, তোমার যাওয়াটা খুব জরুরি!

–তুমি জানো না আমার মাথার ওপর এখন কত বড় দায়িত্ব? তোমার উচিত ছিল ভালো করে জেনে নেওয়া যে অসুখের চেহারাটা কী! কতটা ক্রিটিক্যাল।

–কথা বোঝা গেল না যে! তিন মিনিট হতে না হতেই ছেড়ে দিলেন, তার মধ্যে দু মিনিট তো হ্যালো হ্যালো করেই কাটালেন।

–তুমি রিং ব্যাক করতে পারতে।

–কোথায়? তোমাদের বাড়িতে? সে ফোন তো অনেকদিন খারাপ। কানুকাকা অন্য জায়গা থেকে ফোন করছিলেন, সেখানকার নাম্বারটা জেনে নেবার চান্সই পেলাম না।

-–কানুকাকার নিজের বাড়িতেই ফোন আছে, সে নাম্বারটা আমাদের খাতায় লেখা নেই। যাকগে, পাঁচুদারা কলকাতায় গেছেন, তুমি ওঁদের ফোন করে এক্ষুনি একটা খবর নিতে বলল

–পাঁচুদা-শান্তাবৌদিরা পরশুদিনই ফিরে এসেছেন। বাবলু, তুমি ওখান থেকেই ইন্ডিয়া চলে যাবে, না একবার নিউ জার্সিতে ফিরে আসবে?

–এখান থেকে কী করে যাবো? তা ছাড়া যাওয়াটা কি চাট্টিখানি কথা। অফিসের কাজ হুট করে মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়া যায়? কাল দুটো অ্যাপয়েন্টমেন্ট, পরশুদিন সান্টা-ফে শহরে গিয়ে ডিলটা করা সবচেয়ে ক্রুশিয়াল, তার আগে…

বাবলু, তোমার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তোমাকে তো যেতেই হবে। মা একলা, তিনি অসহায় হয়ে পড়বেন…।

–যদি এতই সীরিয়াস ব্যাপার হয়, দেশ থেকে ফোন এসেছিল, তবু আমি ডাকার পর তুমি বাথরুম থেকে বেরুতে চাওনি? আধঘণ্টা বাদে আমাকে

–সেজন্য তুমি আমায় পরে বকুনি দিও। প্লীজ, মাথা গরম করো না। জানোই তো, মাঝে মাঝে আমার অ্যামেনেশিয়া মতন হয়, মন খারাপ থাকলে আরও বেশি হয়…।

–এখন ছেড়ে দিচ্ছি, পরে আবার ফোন করবো। ভেবে দেখি কী করা যায়। বাই-ই। অতীনের মুখখানা থমথমে হয়ে গেছে। তাতে যতখানি উৎকণ্ঠা, তারচেয়েও বেশি রাগ ও অসহায় মাখা। যে-অবস্থার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, সেরকম কোনো সংকটের মধ্যে হঠাৎ পড়ে গেলে মানুষের এরকম রাগ ও অসহায় ভাব আসে। বাড়ি ঘর ছেড়ে দিনের পর দিন সে নতুন নতুন শহরে ঘুরছে, মাথার মধ্যে শুধু কাজ আর কাজ, অদূরেই সার্থকতার হাতছানি, এই সময় চোদ্দ হাজার মাইল দূর থেকে যদি বাবার অসুখের খবর আসে, তা হলে তৎক্ষণাৎ কী করা উচিত তা অতীন জানবে কী করে?

কানুকাকার ফোন! বড়বাজারের ব্যবসায়ীদের মতন টিপিক্যাল হেঁতকা চেহারা হয়েছে কানুকাকার। সব সময় লম্বা চওড়া কথা। মাঝে মাঝে চিঠি দিয়ে কানুকাকা লোকদের পাঠায়, তাদের বাড়িতে থাকার জায়গা দিতে বলে। কানুকাকার এক শালা এসে তো প্রায় দেড় মাস থেকে গেল! বাড়িতে গেস্ট রাখতে আপত্তি নেই অতীনের, কিন্তু দেশ থেকে গেস্টরা এলেই মনে করে, তাদের জন্য আমি অফিস টফিস ছুটি নিয়ে স্ট্যাচু অফ লিবাটিতে যেতে হবে, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং-এ চড়তে হবে, নায়েগ্রা বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে…

কানুকাকার অম্বলের অসুখ, সব সময় সেই অসুখের কথা বলতে ভালোবাসে। অসুখ সম্পর্কে বাতিকগ্রস্ত। কতটা বাড়িয়ে বলেছে কে জানে। অতীন যদি এখানকার সবকিছু ফেলে কলকাতায় গিয়ে দেখে বাবা কয়েকদিন বুকের ব্যথায় কষ্ট পেয়ে, সেই সময়ে নার্সিংহোমের থাটে আধ-শোওয়া হয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন, তখন কী রকম লাগবে? তার যে কী সাংঘাতিক ক্ষতি হয়ে গেল, তা কি কেউ বুঝবে? বাবার যা বয়েস, তাতে এখন থেকে মাঝে মাঝে অসুখ তো হবেই, তার জন্য প্রত্যেকবার তো চোদ্দ হাজার মাইল দূর থেকে ছুটে যাওয়া যায় না! বাবা নিজেই নিশ্চয়ই অসন্তুষ্ট হয়ে বলবেন, তুই শুধু শুধু কেন কাজ ফেলে চলে এলি, বাবলু। এক কাড়ি টাকা খরচ। আমি কি অথর্ব হয়ে গেছি? আই কেন টেক কেয়ার অফ নাই সেলফ!

মাঝে মাঝে চেক-আপের জন্য বাবা তো অনায়াসেই নার্সিংহোমে ভর্তি হতে পারেন। টাকা পয়সার কোনো অসুবিধে হবার কথা নয়। ব্যাঙ্কে ইনস্ট্রাকশান দেওয়া আছে, প্রত্যেক মাসে মায়ের নামে এক শো ডলার পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এক শো ডলার মানে দেশের বারোশো টাকা, এ বছর ডলারের ভ্যালু আরও বেড়েছে।

প্রায় তিন-চার বছর দেশে যাওয়া হয়নি। এই সেপ্টেম্বরে সবাইকে নিয়ে যাওয়া মোটামুটি ঠিক হয়ে আছে, শর্মিলা টুকিটাকি উপহারের জিনিস কিনতে শুরু করে দিয়েছে। এর মধ্যে অতীনকে যদি সামান্য কারণে একা ঘুরে আসতে হয়, তাহলে পরে আর শর্মিলাদের নিয়ে। ঘাওয়াটা–

বাবা কাজের মানুষ, সারাজীবন খাটাখাটনি করেছেন, তিনি কাজ এবং দায়িত্বের মর্ম বোঝেন। দেশের অনেকেরই এই জ্ঞানটা নেই, সেখানে ওয়ার্ক কালচারই তো গড়ে ওঠেনি। কাজে ফাঁকি মারাটাই ন্যাশনাল প্যাস্টাইম। একটা কাজের দায়িত্ব নিয়ে মাঝপথে সেটা যে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিতে পারে, সে মানুষ হিসেবেও ছোট হয়ে যায়। কোম্পানির এই নতুন। প্রজেক্টের টেকনিক্যাল দিকটা অন্যদের বোঝাবার জন্য অতীনই রপ্ত করেছে, সেটা এখন অন্য কোনো সহকর্মীর বুঝে নিতে আবার খানিকটা সময় লাগবে, জাপানীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সময়টা এখানে বিশেষ মূল্যবান, একটা দিনও নষ্ট করা চলে না।

একজন ধরা-পড়া মাফিয়া চাঁই-এর স্বীকারোক্তি খবরের কাগজে পড়েছিল অতীন। ঐ গুণ্ডা দলে দীক্ষা নেবার সময় লোকটি যে শপথ বাক্য পাঠ করেছিল, তাতে ছিল যে, কোনোদিন সে নিজের মা বাবার নাম উচ্চারণ করতে পারবে না, স্ত্রী যদি মৃত্যুশয্যাতেও থাকে, তাহলেও সেই অজুহাতে দলপতির আদেশ অমান্য করা চলবে না।

এখানকার বড় বড় কমার্শিয়াল হাউজ, এদেশের ভাষায় যে-গুলিকে বলে করপোরেশন, সেখানকার নিয়ম কানুনের সঙ্গে ঐ মাফিয়াদের মন্ত্র গুপ্তির বিশেষ কোনো তফাত নেই। প্রত্যাশার বেশি কাজ তুলে দাও, তুমি আদর পাবে, বড় বাড়ি, বড় গাড়ি পাবে, হাওয়াইতে ছুটি কাটানো ইত্যাদি সুবিধে পাবে। আর যদি তোমার উৎপাদন ঝুলে যায়, দায়িত্ব থেকে সামান্য ভ্রষ্ট হও, অমনি তোমাকে কোল থেকে নামিয়ে আর একজনকে কোলে বসাবে। মাফিয়াদের মতনই এইসব করপোরেশনগুলো দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতারও নিয়ন্ত্রণ করে। চীনের অর্ডারটা পাবার জন্য রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি-তেও তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে, অতীনের কোম্পানির বড় সাহেবরা সেই ব্যাপারে ব্যস্ত, অতীনের ওপর সব কিছু নির্ভর করছে না মোটেই, কিন্তু এরা শুধু রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়েই কাজ আদায় করায় বিশ্বাস করে না, প্রডাকশান, ম্যানেজমেন্ট, লিয়াঁজ থেকে প্যাকেজিং পর্যন্ত নিখুঁত হওয়া চাই।

অতীনের ওপর শুধু দায়িত্ব নতুন দ্রব্যটির কেমিক্যাল কম্পাউন্ড এবং ভায়াবিলিটি বিষয়ে কয়েকজন মানুষকে বুঝিয়ে দলে টানা, এর মধ্যে জন ডিয়ার কোম্পানির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর, যিনি ছুটি নিয়ে সান্টা ফে শহরে বসে আছেন, তাঁর সম্মতি আদায় করাই সবচেয়ে জরুরি।

জো ম্যাককরমিককে অতীন যদি নিজের অবস্থাটা বুঝিয়ে বলে ছুটি চাইতে যায়, জো অধৈর্যভাবে সবটা শুনবেই না। রাগে গরগর করতে করতে বলবে, শোনো, পৃথিবীর কোন প্রান্তে তোমার পিতা কী অবস্থায় রয়েছেন, তা নিয়ে আমি মোটেই মাথা ঘামাতে চাই না। আমার মাথা এমনিতেই যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় পূর্ণ, সেইসব সমাধান করবার জন্যই কোম্পানি আমাকে টাকা দেয়। তুমি যদি এই অবস্থায় কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যেতে চাও, তাহলে তোমার বিবেককে জিজ্ঞেস করো।

অর্থাৎ অতীনের পদোন্নতি তো হবেই না, চাকরিটাই চলে যেতে পারে। এ রকম বদনাম নিয়ে চাকরি ছাড়লে অন্য কোনো কোম্পানি তাকে ভালো কাজ দেবে না।

নাঃ, এখন যাওয়া হবে না, যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

সুটকেসটা কোথায় গেল? এনকোয়ারি কাউন্টার ছেড়ে অতীন আনমনে চলে এসেছে একটা কফি কনারে, সুটকেসটা ফেলে এসেছে ভুলে। আজকাল ছিচকে চোরের উপদ্রব বেশ বেড়েছে। দৌড়ে ফিরে যেতে গিয়েও অতীন বাধা পেল। একদল কৃষ্ণ ভক্ত ফর্সা ছেলে-মেয়ে গান গাইতে গাইতে যাচ্ছে। মেয়েরা শাড়ি পরা, কোনো কোনো ছেলের মাথার টিকিতে ফুল বাঁধা। এয়ারপোর্টের বাকি লোকরা হাঁ করে দেখছে এদের। এরা কোথায় চলেছে, কিউবা নাকি? আশ্চর্য কিছু না, রাশিয়াতেও নাকি এদের প্রভাব ছড়িয়েছে। সিদ্ধার্থ ঠিকই বলেছিল, স্বামী বিবেকানন্দর চেয়েও প্রভুপাদের সাহেব-মেম শিষ্য-শিষ্যার সংখ্যা অনেক বেশি! গাঁজা-ভাং-মদ-যৌনতা ছেড়ে আরও বড় কোন নেশায় এরা মেতে আছে?

সুটকেসটা নিয়ে এসে অতীন এক কাপ কফি নিয়ে একা একটা টেবিলে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে এয়ারপোর্টের সব কিছু মুছে গিয়ে তার চোখে ভেসে উঠলো অন্য একটি ছবি। বাবা নয়, সে দেখতে পেল মাকে। হাসপাতালের সাদা ধপধপে খাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মা। মা ঠিক এইদিকেই তাকিয়ে আছে, মায়ের পেছন দিকে জানলা। মায়ের চোখ দুটো ফুলোফুলো, কান্নাকাটি করেছে মনে হয়। মাকে অতীন বড়জোর আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে দেখেছে কয়েকবার, ঝরঝরিয়ে কাঁদতে দেখেছে কি কখনো? হ্যাঁ, বহুদিন আগে, অনেক ছেলেবেলায়, অতীন একবার দোতলা বাসে চেপে সাউথ ক্যালকাটায় গিয়েছিল একা, বাবা খুব মেরেছিল, সেইদিন মা…

দাদা তখনও বেঁচে, দাদার সঙ্গে এক বিছানায় শুতে অতীন, দাদা প্রায়ই বলতো, তুই বুঝিস না বোকা, মা তোকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে!

অতীনের দম আটকে আসতে লাগলো। গলাটা যেন কেউ চেপে ধরেছে। মায়ের চোখ ছলছল করছে, মা তার জন্য প্রতীক্ষা করে আছে, আর অতীন এখনো যাবে কি যাবে না ভাবছে! চুলোয় যাক চাকরি। একটা কিছু ব্যবস্থা করতেই হবে, জো ম্যাকরমিককে বললে কিছুই লাভ হবে না। কিন্তু জিমি গারনার তার বন্ধু, জিমিকে অনুরোধ জানালে সে সাহায্য করবে নিশ্চিত।

গরম কফিতে চুমুক দিয়ে অতীন একটু ধাতস্থ হলো। জিমি আন্তরিকভাবে সাহায্য করতে চাইলেও পারবে কি? জিমি অ্যাকাউন্টসের লোক, এইসব টেকনিক্যাল জ্ঞান তার প্রায় কিছুই নেই। তাকে সব বুঝিয়ে সুঝিয়ে দিতে কিছুটা সময় তো লাগবেই। সময়, সময়টাই বড় কথা!

টেবিলের ওপর একটা ছোট্ট ঘুষি মেরে অতীন অস্ফুট কাতর স্বরে বললো, বাবা, তুমি অসুখ বাধাবার আর সময় পেলে না? অন্তত আর সাতটা দিনও যদি আমাকে দিতে?

প্রথমেই নিউ ইয়র্কে ফেরার একটা টিকিট কাটা দরকার। আজ রাতের মধ্যেই বাড়ি ফিরে যেতে পারলে, কাল সকাল থেকেই ইন্ডিয়ার ফ্লাইট বুকিং-এর চেষ্টা চালানো যায়। চট করে একদিনের মধ্যে কি বুকিং পাওয়া যাবে?

বিমানবন্দরের চাতাল দিয়ে অনেকখানি হেঁটে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো অতীন। আজ রাতের মধ্যেই সে নিউ ইয়র্ক ফিরবে? এ কি করছে সে, এ তো স্রেফ পাগলামি। অফিস থেকে অন্য একজনকে আনার ব্যবস্থা না করে সে কি এমনভাবে চলে যেতে পারে। কাল সকালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট কারুকে না কারুকে রাখতেই হবে। তারপর সান্টা ফে। কিন্তু শনি-রবিবার কাকে পাওয়া যাবে অফিস থেকে?

এত দ্বিধার মধ্যে অতীন জীবনে পড়েনি। সে দাঁড়িয়েই রইলো ভিড়ের মাঝখানে। এই অবস্থায় যদি পরামর্শ দেবার কেউ থাকতো!

একটু পরে একটা সমাধান মাথায় এলো অতীনের। তার বদলে শর্মিলাকে পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়? শমিলা বুদ্ধিমতী, সে মাকে সবরকম সাহায্য করতে পারবে। রণ আর অনীকে কিছুদিনের জন্য সিদ্ধার্থদের কাছে রাখা যেতে পারে। আচমকা তার চোখ দুটো জ্বালা করে। উঠলো, মুখটা অস্পষ্ট হয়ে গেল অভিমানের ছায়ায়। দেশ থেকে ফোন এলো, বাবার অসুখ, গুরুতর ব্যাপার, অতীনকে কলকাতায় যেতে হবে, এই সাংঘাতিক বিষয়টাও শর্মিলা ভুলে গেল কী করে? বাথরুম থেকে তাড়াতাড়ি বেরুতে চায়নি। যদি শর্মিলার বাবা কিংবা মা সম্পর্কে এই রকম খবর আসতো, তাও কি সে হাফ-হার্টেডভাবে নিতে পারতো? অতীনের বাবা-মাকে শর্মিলা ভালো করে চিনলোই না!

কিন্তু এখন রাগ করার সময় নয়, এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। অতীনের শরীরটা বেশ দুর্বল লাগছে, দুপুরে সে প্রায় কিছু খায়নি, কফিটা পান করার পর আরও খিদে বোধ হলো। কোম্পানির পয়সায় হোটেলটা যখন বুক করাই আছে, তখন সেখানে গিয়ে, স্নানটা সেরে নিয়ে, কিছু খেয়ে তারপর সবদিক ভেবে দেখতে হবে। দু’ এক ঘণ্টা সময়ে আর কী আসবে যাবে!

এখন সন্ধে সাড়ে সাতটা। নিউ ইয়র্কে সময় অনেক এগিয়ে, একটু পরেই ছেলেমেয়েরা শুয়ে পড়বে। আজ শুক্রবার, কল্যাণ-মিতালি প্রায়ই একটু বেশি রাত করে, বাচ্চাদের ঘুম পাড়াবার পর, ভিডিও ছবি দেখার জন্য শর্মিলাকে ডাকে। শর্মিলা যদি সেখানে চলে যায়? ওকে এখানকার হোটেলের ফোন নাম্বারটা জানানো হয়নি, দেশ থেকে আবার কোনো খবর আসতে পারে।

এবার অতীন টেলিফোন বুথে গিয়ে একজন লোকের পেছনে দাঁড়ালো। তার মনে পড়ছে সমীরের কথা। সমীর তার বাবার অসুখের খবর পেয়ে পরের দিনই দেশের দিকে পাড়ি দিয়েছিল। ততক্ষণে সব শেষ। ফিরে এসে সমীর বলেছিল, এবার থেকে শুধু শ্রাদ্ধ করার জন্য দেশে যেতে হবে। বাপ-মা ফুরিয়ে গেলে আর হুড়স ধাড়স করে দেশে ছুটতে হবে না। তাই শুনে সিদ্ধার্থ বলেছিল, বাপ-মা আর শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে মোট চারবার। তাও শ্বশুর-শাশুড়ির বেলায় শুধু বৌকে পাঠালেই চলে।

শর্মিলা ফোনের পাশেই বোধ হয় দাঁড়িয়ে ছিল, রিং হবার সঙ্গে সঙ্গে সে বললো, ইয়েস? বাবলু?

অতীন বললো, শোনো খুকু…

শর্মিলা বললো, তার আগে আমার কথাটা শুনে নাও। আবার খবর এসেছে। লন্ডন থেকে এইমাত্র ফুলদি ফোন করেছিল। তোমার ফুলদি, মানে তুতুলদি। উনি কলকাতা থেকে কল পেয়েছেন, ওরা কিছুতেই অ্যামেরিকার লাইন পাচ্ছে না, লন্ডন নাকি তবু পাওয়া যায়। ফুলদিকে অলি জানিয়েছে…

–অলি, মানে আমাদের অলি চৌধুরী।

–হ্যাঁ। কী বলেছে সে?

–সে ফুলদিকে বলেছে তোমাকে জানিয়ে দিতে যে তোমার বাবা হয়তো ভালো হয়ে যাবেন, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তাই তোমাকে দেখতে চেয়েছেন একবার

-–ঠিক করে বলল, কী হয়েছে!

–উনি খুবই অসুস্থ—

–অসুস্থ… না…শেষ? আমার কাছে লুকিও না!

–ও রকম কথা ভাবছে কেন, বাবলু! যদি ফাস্ট অ্যাটাক হয়, ভালো হয়ে ওঠার খুবই চান্স আছে। তবে তোমার একবার যাওয়া নিশ্চয়ই দরকার, তেই ওর খানিকটা বুস্টিংআপ হতে পারে, ফুলদি সেই কথাই বললো। তুমি কি ওখান থেকেই সোজা চলে যেতে চাও? বাড়ি আসবে না?

–খুকু, তুমি এত অবুঝ হও কি করে? জানো না, কী ধরনের কাজ নিয়ে আমি ঘোরাঘুরি করছি? এখানে বেড়াতে আসিনি। ফুল ইনফরমেশান না পেলে

–আমার ওপর রাগ করছো কেন? তোমার খুব তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার, তাই ভাবলুম যদি ওয়েস্ট কোস্ট দিয়ে চলে যাও…

–কী করে এই কথা ভাবলে? আমার কাছে অত টাকা কোথায়? তাছাড়া অফিসকে পুরোপুরি লেট ডাউন করে…

–তুমি কি যাবে না ভাবছো? তোমার যাওয়াটা নিশ্চয়ই খুব ইম্পটান্ট, নইলে লন্ডন ধরে। আমার তোমাকে খবর দেবার চেষ্টা…

–শোনো খুকু, এই রকম সময়ে তুমি আমাকে একটু সাহায্য করবে না? আমাকে শুধু শুধু প্রশ্ন না করে তুমি নিজে একটা কিছু সাজেস্ট করতে পারো না? এই অবস্থায় আমি…

–আমি বলছি, বাবলু, তোমার যাওয়া উচিত, তোমার যত কাজই থাক…

–যাবো তো নিশ্চয়ই। কিন্তু হাউ সুন? বাড়ি হয়েই যেতে হবে, টাকার ব্যবস্থা করতে হবে, সঙ্গে বেশ কিছু টাকা না নিয়ে গেলে

–তুমি যদি আজই ফিরে আসতে চাও, তা হলে যত রাতই হোক আমি তোমাকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে যাবো না

–আজ রাতে ফেরা অসম্ভব! কাল বিকেলের আগে কিছুতেই হবে না। তুমি ততক্ষণে এক কাজ করো। তুমি যেভাবেই হোক, এক্ষুনি সুরেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলো।

–কোন সুরেশ?

-–আঃ, কী মুশকিল, তুমি সুরেশ ভাটিয়াকে চেনো না? যার ট্রাভল এজেন্সি আছে। ওকে বলল, কাল রাত্তিরে অথবা পরশু সকালে যে-কোনো ফ্লাইটের একটা টিকিট যেন বুক করে রাখে। সোজা যেন কলকাতায় যাওয়া যায়, মাঝপথে বসিয়ে রাখলে চলবে না। যেমন করেই হোক, ওকে একটা টিকিট যোগাড় করতেই হবে। এই সময়টা টিকিটের খুব রাশ থাকে। আর তুমি কলকাতায় একটা টেলিগ্রাম পাঠাও যে আমি আসছি। ঠিক কখন পৌঁছোবো, সেটা পরে জানাচ্ছি। প্লিজ, মনে করে এগুলো করো। আবার যেন ভুলে যেও না!

দু-তিন সেকেন্ড থেমে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে করুণ গলায় শর্মিলা বললো, না, ভুলবো না, লিখে রাখছি। সুরেশকে না পেলে কল্যাণকে রিকোয়েস্ট করবো, ওর কোন ট্রাভল এজেন্সির সঙ্গে চেনা আছে বাবলু, আমাকে কলকাতায় নিয়ে যাবে না? আমিও বাবাকে দেখতে যেতে চাই…  

–দু’জনে একসঙ্গে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ছেলেমেয়েরা থাকবে…আমি এখন রাখছি—

–বাবলু, আর একটা কথা বলবো? একটা রিকোয়েস্ট…

–বলো…

–তুমি অত দূরে আছো, একলা একলা, মাথায় অফিসের কাজের চিন্তা, তার মধ্যে এরকম একটা দুঃসংবাদ শুনলে বুঝতে পারছি তোমার মনের অবস্থা কী রকম। বেশি চিন্তা করো না, আমার মনে হচ্ছে, সব ঠিক হয়ে যাবে। অফিসে তোমার সুনাম আছে, ওরা ঠিক বুঝবে যে না গিয়ে তোমার উপায় ছিল না…বাবলু, আর একটা কথা, তুমি আজ বেশি ড্রিংক করো না, প্লীজ

–না, না, ওসব ভয় পেও না। আমি ঠিক থাকবো…

–আজ রাতটা তুমি একলা একলা থাকবে, আমার মোটেই ভালো লাগছে না

–কিচ্ছু হবে না। তুমি তো জানো, আমার নার্ভ কত স্ট্রং!

ফোনটা রেখে অতীন রুমাল দিয়ে মুখ মুছলো। তার প্রচণ্ড গরম লাগছে। জ্যাকেটের তলায় জমাটা ভিজে সেঁটে গেছে গায়ের সঙ্গে। তবু, বাড়িতে কাল বিকেলে ফিরবে, শর্মিলার কাছে এই কথাটা উচ্চারণ করে ফেলার পর অনেকখানি নিশ্চিন্ত বোধ করছে সে। কাল বিকেলের দিকে ফেরা, দ্যাটস লজিক্যাল! তার মধ্যে অফিসের একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবেই, সে সকালের প্রথম মিটিংটা অন্তত অ্যাটেন্ড করতে পারবে। শর্মিলা ভয় পাচ্ছে, এখানে একা একা সে এত বড় একটা খবরের চাপ সামলাতে পারবে না। হুঁ! লাইফ ইজ হার্ড!

অতীন নিজের নাকের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কথা বলে যাচ্ছে।

আমি যদি আমার বাবার মৃত্যুসংবাদও পেতাম, তাহলেও সেটা খুব শান্তভাবে নিতে পারতাম। বাবার প্রায় সত্তরের কাছাকাছি বয়েস, নেহাৎ কম না। নিজের ইচ্ছেমতন জীবন কাটিয়েছেন। একদিন তো চলে যেতে হবেই। তবে, অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর শুনলে বিচলিত হয়ে পড়তে হয়ই। ঠিকমতন চিকিৎসা করলে আরও দশ-বারো বছর আয়ু পাওয়া এমন কিছু শক্ত নয় আজকাল। মুন্নি আর অনুনয় অনেক দূরে থাকে, মা একা একা অসহায় হয়ে পড়বে। সে রকম আত্মীয়-স্বজনও কেউ নেই। কানকাকার ওপর মোটেই ভরসা করা যায় না। মা আশা করবে–আমি ফিরে গিয়ে সব ব্যবস্থা করবো। কার্ডিয়াক বা সেরিব্রাল অ্যাটাক হলে তো অন্য কিছু করার নেই, খুব তাড়াতাড়ি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে নিয়ে যাওয়া ছাড়া…মায়ের হাতে কিছু টাকা আছে আশা করি…

খুকু ভাবছে, খবরটা পেয়ে আমি উতলা হয়ে উঠেছি। ঠিক তা নয়। আসলে একটা ডায়লেমা, ঠিক এই সময়ে, একটা দারুণ প্রয়োজনীয় কাজের মধ্যে, হঠাৎ দেশে ফেরার ব্যবস্থা। করার মধ্যে যে ঝাট… বাবা শেষনিঃশ্বাস ফেলে থাকলে এত ব্যস্ততার কিছু ছিল না। শুধু শ্রাদ্ধ করতে যাওয়ার জন্য আমার অত গরজ নেই, বাবারও ওসব ব্যাপারে তেমন বিশ্বাস ছিল না , নেহাৎ একটা নিয়মরক্ষা, শ্রাদ্ধ তো দশ-বারোদিন পর হয়, ঠিক ঠিক খবরটা যদি পাওয়া যেত, তাহলে এদিকের কাজ চুকিয়ে…। বাবা যখন তাঁর নিজের বাবার অসুস্থতার খবর শুনে। মালখানগরে গিয়েছিলেন, তখন তিনিও ঠাকুদাকে দেখতে পাননি…

এইসব ভাবতে ভাবতে অতীনের চোখের সামনে একটা চলচ্চিত্রও তৈরি হয়ে যাচ্ছে। যাদবপুরে তাদের বাড়ি, গলির মোড়ে এক রাশ জঞ্জাল, পুরোনো পুরোনো গাড়িগুলোর বিকট হন, ভিড়ে ভর্তি দোতলা বাসগুলো একদিকে হেলে পড়েছে প্রায় একটা নার্সিং হোম, সেখানে। একটা ক্যাবিনের মধ্যে আর কেউ নেই কেন? শুধু মা। নার্সিংহোমের সাদা ঘর, জানলার বাইরে সাদা আকাশ, বিছানার ওপর সাদা চাঁদর ঢাকা, মায়ের পরনে সাদা শাড়ি, এক রাশ শূন্যতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মা, চোখ দুটিতে টলটল করছে জল, মা তাকিয়ে আছে এদিকে, এই ডেনভার এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ছুটে এসেছে মায়ের দৃষ্টি…

এই ছবিটা দেখতে দেখতে অতীন কেঁপে উঠলো, একচল্লিশ বছর বয়স্ক, আত্মবিশ্বাসী, সার্থকতা-শিকারী অতীন মজুমদার সেই মুহূর্তে একটি বালক হয়ে গেল। তার ইচ্ছে হলো তক্ষুনি এক ছুট লাগাতে। আট বছর বয়েসে, দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে ভিড়ের মধ্যে একবার মাকে হারিয়ে ফেলে বাবলু যেমন ছোটাছুটি করেছিল। তার ইচ্ছে হলো, অফিসের কাগজপত্র ভর্তি সুটকেসটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এক দৌড়ে যে-কোনো একটা প্লেনে উঠে পড়তে।

এখানে কেউ কারুর মুখের দিকে এক পলকের বেশি তাকায় না। প্রয়োজন ছাড়া কেউ অন্যের মনোজগতে উঁকি মারে না। অতীন এই বিশাল বিমানবন্দরে কী অসহায়ভাবে একা!

একটু পরে সে কাঁধ দুটি ঝাঁকিয়ে আস্তে-আস্তে বেরিয়ে এলো বাইরে। ঠাণ্ডা বাতাসের ঝলক সে গ্রাহ্যও করলো না। একটা ট্যাক্সিতে উঠে সে নাম বলে দিল হোটেলের। মাকে ঐ নার্সিং হোমের ঘরটাতেই সে কেন দেখছে বার বার? মায়ের চোখে জল।

কী সাংঘাতিক ইনসুটিংকট এই মাতৃস্নেহ ব্যাপারটা। অত দূরে থেকেও মা তাকে প্রবলভাবে টান মারতে পারে হঠাৎ হঠাৎ। প্রথম প্রথম তো বিদেশে এসে অতীন প্রায়ই মাকে স্বপ্ন দেখতো। শিলিগুড়ি থাকার সময় এরকম হয়নি, জামসেদপুর কিংবা জেলে থাকার সময়েও না, কিন্তু লন্ডনে আসার পর সে দূরত্বের কষ্টটা অনুভব করতো। এখনও মাঝে মাঝে মায়ের স্বপ্নটা ফিরে আসে। মাত্র বছরখানেক আগেই তো, ক্রিসমাসের ঠিক পরেই, রণের যেদিন পা ভাঙলো, খুকু বাড়িতে ছিল না। খুকুকে খবর না দিয়েই সে রণকে নিয়ে গেল হাসপাতালে, বিশেষ কিছু হয়নি অবশ্য। সেই রাতেই অতীন তার মাকে স্বপ্ন দেখেছিল, কী স্বপ্ন মনে নেই, কিন্তু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল সে। পাশেই ঘুমিয়ে ছিল শর্মিলা, তার ঘুম ভাঙেনি, তাকে জাগিয়ে অতীন কিছু বলতেও চায়নি। সেই কান্না একেবারে গোপন থেকে গেছে। অতীনের মতন মানুষ। যে স্বপ্ন দেখে কাঁদতে পারে তা কেউ বিশ্বাসই করবে না। ঐ সব সেন্টিমেন্টাল স্বপ্ন-টপ্ন তো। সবাই দেশে ফেলে আসে। প্রথমবার না হোক, দ্বিতীয়বার অবশ্যই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *