১০. হেয়ার সাহেব

হেয়ার সাহেব শাস্তি দেবেন। শুনে গঙ্গানারায়ণ তেমন ভয় পায়নি। ওঁর কাছ থেকে শাস্তি পাওয়া একটা মজার অভিজ্ঞতা। পিঠে দু চার ঘা পড়ে বটে কিন্তু তারপর হেয়ার সাহেব নিজেই এমন ব্যাকুল হয়ে পড়েন যে তখন তাঁকেই সামলাবার জন্য বলতে হয়, না মহাশয়, অতি অল্পের ওপর হয়েছে, বিশেষ বেদনা বোধ নাই।

কিন্তু গঙ্গানারায়ণ বিস্মিত হয়েছে বেশী। এই সকালবেলা যে হেয়ার সাহেব স্বয়ং তাদের বাড়িতে উপস্থিত হবেন, সে ভাবতেই পারেনি। কলেজের বালকরা কেউ দু চারদিন অনুপস্থিত হলে বা কেউ অসুস্থ হলে হেয়ার সাহেব খোঁজখবর নিতে গেছেন বা নিজের হাতে সেবা করেছেন, একথা গঙ্গানারায়ণ শুনেছে বটে। তবে হালে হেয়ার সাহেব ছোট আদালতের কমিশনার নিযুক্ত হওয়ায় কলেজে আগেকার মতন অত বেশী সময় দিতে পারছিলেন না। বহুদিন ধরে ডেভিড হেয়ার নিঃস্বার্থভাবে শিক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। নিজের ব্যবসাপত্ৰ তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন। এক সময় বহু ধন উপার্জন করেছিলেন বটে। কিন্তু এত বৎসরে তা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি কোনোদিন কোনো বেতন গ্ৰহণ করেননি, বরং নিজ অর্থ ব্যয় করেছেন। মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর সেক্রেটারি হিসেবে তাঁর মোটা বেতন নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, সে অর্থও দান করে দিয়েছেন তিনি।

সরাসরি হেয়ারকে কিছুতেই আর্থিক সাহায্য করা যাবে না। বুঝেই সরকার সুকৌশলে তাঁকে আদালতকর্মে নিযুক্ত করেছেন। সেইজন্য ইদানীং সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁকে স্কুল পাড়াতে দেখা যেত না। আবার বুঝি তিনি নবোদ্যমে উঠে-পড়ে লেগেছেন।

এক হাত গঙ্গানারায়ণের কাঁধে রেখে অন্য হাতে মোটা ছড়িটা ঠিকঠকিয়ে হাঁটতে লাগলেন হেয়ার সাহেব। খানিক দূরে গিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতার সহিত যে দ্বিতীয় ব্যক্তি বসিয়াছিলেন, তিনি কে?

গঙ্গানারায়ণ বললো, উনি আমার খুড়া। আমার পিতার বাল্য সুহৃদ।

—হুঁ। তুমি ফ্রান্সিস বেকনের প্রতিমূর্তি কখনো দেখিয়াছ কি?

গঙ্গানারায়ণ দুদিকে মাথা নেড়ে জানালো যে সে দেখেনি।

হেয়ার আবার বললেন, দেখিলে বুঝিতে, ঐ লোকটির সহিত ফ্রান্সিস বেকনের মুখের আশ্চর্য সাদৃশ্য রহিয়াছে। একই রকমের চোখ। আমি প্রায়শই অবাক হইয়া দেখি যে অনেক এ-দেশীয় ব্যক্তির সহিত অনেক উওরোপীয়ের মুখাকৃতির খুব মিল থাকে। শুধু গাত্রবর্ণের তফাৎ।

ফ্রান্সিস বেকনের নাম শেক্সপীয়ার পাঠের সময় দু-একবার শুনেছে মাত্র গঙ্গানারায়ণ। বিশেষ কিছু জানে না। হঠাৎ সেই সাহেবের সঙ্গে বিধুশেখরের কেন মিল খুঁজে পেলেন হেয়ার সাহেব, তা সে বুঝলো না।

খানিক পথ গিয়ে হেয়ার সাহেব। আবার থমকে দাঁড়ালেন। সস্নেহে প্রশ্ন করলেন, তোমার ক্ষুধা লাগে নাই তো? উপবাসী-ভঙ্গ করিয়াছিলে?

গঙ্গানারায়ণ বললো, হাঁ, মহাশয়।

—সত্য বলে। ভয় নাই, আমার গৃহে খাওয়াইয়া তোমার জাত মারিব না। কোনো মিঠাইওয়ালার দোকানে ভোজন সারিয়া লইতে পারো;।

গঙ্গানারায়ণ দৃঢ়ভাবে জানালো যে তার কোনো প্রয়োজন নেই। সে সত্যিই খেয়ে এসেছে। আসলে যদিও সে কিছুই খায়নি। খাবার দেওয়া হয়েছিল, হেয়ার সাহেবের আগমন বার্তা শুনে তাড়াতাড়ি উঠে এসেছে, খাওয়ার সময় পায়নি।

হেয়ার তবু দাঁড়ালেন না। আবার জিজ্ঞেস করলেন, তবে বলো, কোন কোন দ্রব্য ভক্ষণ করিয়াছ?

গঙ্গানারায়ণ বললো, দুধ।

—শুধু দুধ? ব্যাস, আর কিছু নহে?

—আম, কলা, সন্দেশ।

—উত্তম। তবে এত ধীরে ধীরে হাঁটিতেছ। কেন? আমার সহিত দ্রুত পা মিলাও।

হেয়ার সাহেব হাঁটেন রীতিমতন ধুপ ধাপ শব্দ করে। বয়েস যথেষ্ট হয়েছে, এখনো পদব্ৰজে বেশ দড়। ওঁর হাবভাব দেখলে যেন ঠিক ধোপদূরস্ত সাহেব মনে হয় না, মনে হয় যেন কোনো বৃহৎ পরিবারের আপনাভোলা বড় মামা।

—তোমাদের সহপাঠী ভোলানাথ সরকারের কুঠী কোথায় তুমি জানো?

—হাঁ, জানি।

—বাহির সিমলায় জগমোহন সরকারের কুঠী কি?

—জগমোহন সরকার ভোলানাথের জ্যাঠা। পাশাপাশি দুই পৃথক বাড়ি।

—চলো, সেখানে যাইব। ভোলানাথের কোনো সংবাদ জানো? জানো না। শুনিয়াছি সে গুরুতর পীড়ায় পড়িয়াছে। তোমাদের কোনো সহপাঠী বাঁচিল কি মরিল, সে সংবাদও তোমরা রাখো না। আজ সারাদিন তুমি ভোলানাথের সেবা করিবে, এই তোমার শাস্তি।

গঙ্গানারায়ণের শরীরে দারুণ একটা সুখানুভূতি হলো। এই রকম কোনো মানুষের সংস্পর্শে এলেই মন উন্নত হয়ে যায়। হেয়ার সাহেব সর্বক্ষণ পরের জন্য চিন্তা করেন, নিজের কথা কিছুই ভাবেন না। সম্পূর্ণ স্বার্থশূন্য হয়েও মানুষ যে কত আনন্দে থাকতে পারে, ইনি তার অবিশ্বাস্য উদাহরণ।

হেয়ার সাহেব বললেন, জগমোহন সরকারের সহিত আমার প্রয়োজনীয় কথা আছে। স্ত্রী শিক্ষা বিষয়ে উহার সাহায্য পাইব মনে হয়। সুতরাং ভোলানাথের নিকট আমি বেশীক্ষণ থাকিতে পারিব না। তুমি থাকিবে।

গঙ্গানারায়ণ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, মহাশয় কি এবার স্ত্রীলোকদের জন্য বিদ্যালয় খুলচেন?

হেয়ার সাহেব কৃত্রিম ধমক দিয়ে বললেন, কেন, তোমার আপত্তি আছে বুঝি?

—আপত্তি দূরে থাক, আহ্লাদ করবো। কিন্তু এ-ও কি সম্ভব?

—কেন সম্ভব নয়।

তোমরা সাহায্য করিলেই সম্ভব! ফিমেল সোসাইটি স্থাপন করিয়া এক সময় বালিকাদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা শুরু হইয়াছিল। কিন্তু অর্থাভাবে আর বড়মানুষদের আগ্রহের অভাবে তাহা বেশীদিন চলে নাই। তোমরা বালিকা-স্ত্রীলোকদের অন্ধকারে রাখিয়া দিতে চাও?

—আমি চাই না!

–জগমোহন সরকার উদ্যাগী হইয়াছেন। লোকটি অতি সদাশয়। উহার সাহায্যে শীঘ্রই একটি বালিকাদিগের স্কুল স্থাপন করিব। আমি যদি আর দশ বৎসর বাঁচিয়া থাকি, তাহা হইলে এ-দেশে স্ত্রী শিক্ষার প্রসার ঘটাইয়া যাইব নিশ্চয়।

গঙ্গানারায়ণের অমনি বিন্দুবাসিনীর কথা মনে পড়লো। পড়াশুনো করার কী তীব্ৰ সাধ ছিল বিন্দুর। সে জিজ্ঞেস করলো, এইস্থলে কি বিধবা স্ত্রীলোকরাও পাঠ নিতে আসবে?

হেয়ার সাহেব মাথা নীচু করে প্রশ্ন করলেন, কী কহিলে, আবার কহো তো?

গঙ্গানারায়ণ তার কথার পুনরাবৃত্তি করলো। হেয়ার সাহেবের মুখখানা বিষণ্ণ হয়ে গেছে। তিনি অভিমানের সঙ্গে বললেন, এ কথা কহিতে তোমার শরম বোধ হইল না? আমি স্কুল খুলিলেই কি তোমরা বিধবা বালিকাদের সেথা পাঠাইবে? তাহারা সূৰ্য্যলোক দেখে না, তাহাদের বিদ্যার আলোক দেখাইবে কে?

একটু থেমে তিনি আবার বললেন, শোনো গঙ্গা, আমি হিন্দু নই, কিন্তু হিন্দুজাতির বিধবা বালাদের কথা মনে আসিলেই আমার চক্ষে জল আসে। স্ত্রী জাতি মাতৃজাতি, তবু তাঁহাদের এত কষ্ট দেওয়া কি মানুষের উচিত কাজ হয়?

গঙ্গানারায়ণ অধোবাদন হয়ে রইলো।

হেয়ার সাহেব তার পিঠ চাপড়ে বললেন, বিদ্যাশিক্ষা করিতেছ, যদি পারো তো দেশবাসীকে বুঝাইয়ো। মাতৃজাতির দুঃখ দূর করিবার জন্য কিছু যত্ন করিয়ো! ও কাজ আমি পারিব না। তোমাদিগেরই কাহাকেও উদ্যোগ লইতে হইবে।

খানিকটা পথ আবার দুজনে নিঃশব্দে হাঁটতে লাগলো। মাঝে মাঝেই পথ চলতি কেউ কেউ হেয়ার সাহেবকে দেখে অভিবাদন জানাচ্ছে। প্ৰায় কুড়ি বাইশ বছর ধরে বহু ছাত্র হেয়ার সাহেবের অধীনে থেকে পড়াশুনো করে গেছে। শহরে শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে হেয়ার সাহেবকে চেনে না। হেয়ার সাহেব কারুর সঙ্গেই দুটো একটার বেশী কথা বলছেন না। আজ যেন হেয়ার সাহেবকে একটু আলাদা রকম মনে হচ্ছে গঙ্গানারায়ণের। মুখে কেমন যেন একটা উদাসীন ভাব। রঙ্গপ্রবণ লঘু মেজাজটি একেবারেই নেই।

মে মাসের শেষের দিক। সকালবেলাতেই রোদ উঠেছে চড়চড়িয়ে। রোদের আচে হেয়ার সাহেবের মুখখানা লাল হয়ে গেছে, ঘামে ভিজে গেছে পিঠ। তবু হেয়ার সাহেবের কোনো হুঁশ নেই।

প্রথমেই জগমোহন সরকারের বাড়ি পড়লো। জগমোহন আর বিরাজমোহন দুই ভাই। এদের মধ্যে জগমোহনই বেশী অর্থ ও খ্যাতি অর্জন করেছেন। পৈতৃক সম্পত্তি বিশেষ পাননি। কিন্তু ভাগ্য খুলে গেছে আমদানি রপ্তানির ব্যবসা খুলে। সরকার, আঢ্য অ্যাণ্ড কোং এ শহরের নামকরা প্রতিষ্ঠান। শুধু অর্থ জুটলেই কৌলীন্য জোটে না। শেরবোর্ণ সাহেবের ইস্কুলে কিছুদিন পড়ে ইংরেজি ভাষাটা মোটামুটি রপ্ত করে নিয়েছেন জগমোহন। যুবা বয়েসে কিছুদিনের জন্য খৃস্টান হবার দিকে ঝুকেছিলেন, সেই খবর পেয়ে তাঁর মাতাঠাকুরানী বিষের পাত্র নিজের ওষ্ঠের সামনে ধরে বলেছিলেন, আর এক বার বল ও কথা! বল! তুই জাত খোয়াবি, আর আমি বেঁচে থাকবো?

এখন ওসব চুকেবুকে গেছে, জগমোহন মহা ধুমধাম করে বাড়িতে প্রতি বৎসর দোল দুর্গোৎসব লাগান, পাবলিক কাজে দান করেন মুক্ত হস্তে, দু-দশজন মোসাহেব প্রতিপালন করছেন, সভায় রামগোপাল ঘোষের, পাশে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেন এবং মাঝে মাঝে ইংরেজি কাগজে কৃষকদের দুরবস্থা অথবা স্ত্রী-শিক্ষা বিষয়ে জ্বালাময়ী আটিকেল লেখেন। শহরের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে তাঁর এখন বেশ নাম ছড়িয়েছে।

জগমোহন সপরিষদ বসেছিলেন বৈঠকখানা ঘরে। তার ঠিক ডান পাশেই বসে আছে। একজন দীর্ঘকায়, শীর্ণ, খড়গনাশা মানুষ। এ আমাদের পূর্ব পরিচিত রাইমোহন। সুকৌশলে সে এ গৃহে নিজের স্থান করে নিয়েছে। জগমোহন বহু ব্যাপারে তার ওপরে নির্ভর করেন।

হেয়ার সাহেব আগে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। দ্বারের কাছে হেয়ার সাহেবকে দেখে জগমোহন বিশালবপু নিয়ে প্রায় ছুটে এলেন সেদিকে। দু হাত বাড়িয়ে বললেন, কী সৌভাগ্য! কী সৌভাগ্য! আপনি এশ্চেন! মহামতি হেয়ার আজ আমার বাড়িতে! আজই আপনার কথা স্মরণ কচ্চিালুম। আগামী মাস থেকেই আমি বালিকা বিদ্যালয় খুলে ফেলচি। আমারই এ বাড়িতে। শোভাবাজারের রাধাকান্ত দেব বাহাদুর প্রচুর উৎসাহ দিয়েচেন-সব বলচি আস্তে আস্তে, মহাশয় বসুন, বসতে আজ্ঞা হোক।

হেয়ার সাহেব বসলেন না, গঙ্গানারায়ণের কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই বললেন, খুবই সুসংবাদ। আমার যথাসাধ্য সাহায্য করিব। আপনারই গৃহে স্কুল, কিন্তু শিক্ষিক কোথায় পাইবেন?

জগমোহন বললেন, লণ্ডনের ব্রিটিশ অ্যাণ্ড ফরেন স্কুল সোসাইটিতে পত্র পাটিয়িচি, দ্বারকানাথবাবু ওঁদের সঙ্গে নিজে কথা কইবেন, একজন লেডি টিচার পাওয়া যাবে মনে হয়। খরচ-খচা আমি দোবো। এ-দেশের মেয়ে শিক্ষিকা আর পাবো কোতায়। প্রথম দু-চার মাস বুড়ো বুড়ো পণ্ডিতদের দিয়ে কাজ চালিয়ে নোবো…নাম দিইচি ফিমেল পাঠশালা।।—

হেয়ার সাহেব বললেন, আগে আর একটি কথা জানিয়া লই! সে পাঠশালে ফিমেলারা আসিবে তো? পূর্বে দেখিয়াছি, ছাত্রী জোটানোই ভার।

–আলবাৎ আসবে!

—আপনার নিজ পরিবারের কন্যারা যাইবে আশা করি।

—হায় হায়! আমার তো কোনো কন্যা সন্তানই নেই। থাকলে নিশ্চয়ই যেত। আমি এ পল্লীর প্রতি বাড়ি বাড়ি ঘুরে গিনীদের উদ্দেশ্যে হাত জোড় করে বলিচি, মা জননীরা, দেশ আজ জেগেচে, অজ্ঞানের অন্ধকার দূর হয়ে জ্ঞানের উষালোক প্রস্ফুটিত হচ্চে, আর দ্বিধা করবেন না, আমাদিগের কন্যাসমা, ভগ্নীসমা বালিকাদের জন্য জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত করুন। মুশকিল কি জানেন, হেয়ার সাহেব, এখনো অনেক লোকের ধারণা, সেই অনেকের মধ্যে অনেক আচ্ছা আচ্ছা বড়মানুষ, শিক্ষিত লোক রয়েচে, যারা মনে করে, নেকাপড়া শিখুলে মেয়ে-সন্তানরা বিধবা হয়! বুঝুন! হাউ ইগনোরেন্ট!

—আর বিধবারা লেখাপড়া শিখিলে তাহাদের কী হয়? তাহারা তো দ্বিতীয় বার বিধবা হইতে পরিবে না! এই যুবকটি প্রশ্ন করিতেছিল যে বিধবারা লেখাপড়া শিখিতে পরিবে কি না

—বিধবাদের লেখাপড়া শিখিয়ে লাভ কী হবে? এই ছেলেটি-ইটি কে?

গঙ্গানারায়ণ বললো, আমি ভোলানাথের সহপাঠী। আমার নাম গঙ্গানারায়ণ সিংহ। পিতার নাম রামকমল সিংহ।

রামকমল সিংহর নাম শুনে জগমোহনের ভুদ্বয় ঈষৎ কুঞ্চিত হলো। রামকমল সিংহ জগমোহনের তুলনায় আরও তিন চার ধাপ উঁচু তলার বড় মানুষ। সেজন্য জগমোহনের খানিকটা ঈর্ষাবোধ আছে।

তিনি শুকনো গলায় বললেন, অ। তারপর হেয়ার সাহেবের মুখের ওপর দৃষ্টি ফেলে বললেন, ওসব ব্যাগড়ার কথা কানে তুলবেন না। বিধবাদের শিক্ষার কথা উচ্চারণ করাও পাপ। বিধবারা আমাদের সংসার পবিত্র করে। ওদের সংযম, ওদের সহনশীলতা কত মহান। এতখানি আত্মকৃছ কৃছ কৃছ কৃস, ইয়ে কৃচ্ছতা শুধু হিন্দু রমণীতেই সম্ভব। বিধবারা আছে বলেই আমাদের ধর্ম টিকে আছে।

রাইমোহন বকের মতন গলা উঁচিয়ে বললো, ঠিক কতা! লাক কতার এক কত।

জগমোহন আবার বললেন, রাজা রাধাকান্ত দেব স্ত্রী-শিক্ষা বিষয়ে বই লিখে প্ৰমাণ করেচেন যে প্রাচীনকালে বড় ঘরের হিন্দু মেয়েদের মধ্যেও শিক্ষার চলন ছেল। মোছলমান আমলেই আমরা মেয়েছেলেদের ঘরে সেঁদিয়ে রেখিচি। বুঝলেন সার, তৈমুর লং ভারত আক্রমণ করবার পরই আমাদিগের স্ত্রীলোকেরা অন্ধকারে ড়ুবে গ্যাচে। আবার আমরা মেয়েছেলেদের ঘরের বার করবো, তবে ধীরে ধীরে।

রাইমোহন বললো, রাজাবাহাদুর বেধবাদের নেকাপড়া শোকাবার কতা কিছু বলেননি!

জগমোহন গঙ্গানারায়ণের দিকে একবার ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, ও সব কথা তুললে সর্ব কাজ ভণ্ডুল হয়ে যাবে। বুঝলেন, মিঃ হেয়ার, এমনিতেই পাঁচরকম কথা উঠবে। লোকে বলবে আমরা বুঝি ঘরের মেয়েদের মেম বানাবার হুজুগে মেতিচি। লোকে তো সু দ্যাকে না, কু-টাই বড় করে দ্যাকে, কেউ হয়তো আমাদের চরিত্রে কটাক্ষ করবে।

রাইমোহন জিভ কেটে বললো, না মশায়, ও কতা বলবেন না। আর যার সম্পর্কে যাই বলুক, আপনার মতন দেবতুল্য মানুষের চরিত্র তুলে কতা বললে ধর্মে সাইবে না।

জগমোহন উদারভাবে বললেন, সবাই কি সব বোঝে। হেয়ার সাহেব বললেন, আপনারা বিজ্ঞ, আপনারাই ভালো বুঝিবেন। বিধবাদের প্রয়োজন নাই।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকাদের লইয়াই কাৰ্য শুরু হোক।

জগমোহন বললেন, বসুন মিঃ হেয়ার। অনেক কতা আচে। পুরুষেরা যেসব কেতাব পড়ে, বালিকারাও কি সেই একই কেতাব পড়বে? আমার তো মনে হয়, বালিকাদের জন্য নীতিশিক্ষার পৃথক পাঠ্যবই লেকানো দরকার। স্কুল বুক সোসাইটি কি এ কাজে সাহায্য করবে?

হেয়ার সাহেব বললেন, আমি আলোচনা করিব। পরে আসিয়া আপনার সহিত কথা কহিব, আগে ভোলানাথকে দেখিয়া আসি। তার কোন ব্যাধি হইয়াছে?

জগমোহন বললেন, ভোলানাথ? ও বাড়ির ভোলা? দুদিন ধরে তার অনেকবার দাস্ত পায়খানা হচ্চে শুনিচি।

জগমোহন বিষয়টিতে কোনো গুরুত্বই দিলেন না। তিনি অনেক বৃহৎ বৃহৎ সমস্যা নিয়ে চিন্তিত, ভাইপো ভাগ্নেদের সামান্য অসুখের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নেই তাঁর।

হেয়ার সাহেব বেরিয়ে এলেন গঙ্গানারায়ণকে নিয়ে। গঙ্গানারায়ণ মনে মনে বললো, বিন্দু তোর ভাগ্য খারাপ। এ জীবনে তুই আর কিছু পাবি না। পরজন্মে যেন বিধবা না হোস।

হেয়ার সাহেব যেন ঠিক তার মনের কথাটাই পড়ে ফেলে মুখ কুঁকিয়ে গঙ্গানারায়ণের কানে কানে বললেন, প্রিয় বৎস, দেখিয়া লইয়ো, ক্ৰমে ক্ৰমে বিধবা বালারাও বিদ্যালয়ে আসিবে। যদি আমি আর দশ বৎসর বাঁচি, তবে সকল শ্রেণীর বালিকাদের জন্যই শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করিয়া যাইব। এই আমার শেষ ইচ্ছা।

কথাটা শুনে গঙ্গানারায়ণের শরীরে খানিকটা রোমাঞ্চ হলেও সে তেমন খুশী হতে পারলো না। দশ বুলিবাসিনীর কি আর পড়াশুনা করার আগ্রহ থাকবে? অত বেশী বয়সে সে স্কুল যাবেই বা কী করে!

পাশের গৃহটির দ্বার খোলা, বৈঠকখানাটি খাঁ-খাঁ করছে। গঙ্গানারায়ণ প্রথমে একলা ভেতরে ঢুকে ভোলানাথের নাম ধরে ডাকাডাকি করতে লাগলো। অচিরেই ভোলানাথের বাবা বিরাজমোহন নেমে এসে ওঁদের দেখে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন, হেয়ার সাহেবের হাত জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, সাহেব, আপনি এয়েচেন। কিন্তু ভোলা বুঝি বাঁচে না।

ভোলানাথ চলৎশক্তিহীন হয়ে দ্বিতলের এক কক্ষে শুয়ে আছে শুনে হেয়ার সাহেব বললেন, আমি কি উহাকে উপরে যাইয়া দেখিতে পারি?

হেয়ার সাহেবকে শুধু যে ওপরে নিয়ে যাওয়া হলো তাই না, ভোলানাথের মা ও পিসী উপস্থিত রইলেন সেখানে, হেয়ার সাহেব যেন এ গৃহের একজন পরমাত্মীয়।

ভোলানাথ একখানি পালঙ্কে দু হাত ছড়িয়ে শুয়ে আছে। মুখখানি দারুণ বিবর্ণ। চোখ বোজা। বিরাজমোহন তার মাথার কাছে গিয়ে বললেন, বাবা ভোলা, দ্যাকো, কে এয়েচেন! একবারটি চোখ ম্যালো–

ভোলানাথ অতিকষ্টে চোখ মেললো। চিনতে পারলো কি না বোঝা গেল না, কিন্তু কিছু একটা কথা বলতে গিয়েই ওয়াক তুলে বমি করলো। সেই বমি খানিকটা পড়লো বিছানায়, খানিকটা মেঝেতে।

হেয়ার সাহেব বিড়বিড় করে বললেন, কলেরা! শহরে সর্বত্র কলেরার মহামারি শুরু হইয়াছে। প্রতি বৎসর গ্ৰীষ্মকালে এমন হয়। বৃষ্টি না নামিলে কমিবে না।

তারপর তিনি বিরাজমোহনের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি একটি সম্মার্জনী ও একপাত্র জল চাই। সত্বর আনিয়া দিবেন। কি?

গঙ্গানারায়ণকে তিনি নিম্নস্বরে বললেন, তোমাদিগের হিন্দুদিগের গৃহগুলি বড় অপরিচ্ছন্ন। রোগীর কক্ষ সর্বদা উত্তমরূপে পরিষ্কার রাখা কর্তব্য। তোমরা ইহা পালন করো না বলিয়াই রোগ বেশী ছড়ায়।

জল ও ঝাঁটা এসে পৌঁছোনো মাত্র হেয়ার সাহেব নিজে সেই বমি পরিষ্কারে প্রবৃত্ত হলেন। অমনি হা-হা করে উঠলো বাড়ির লোক। বিরাজমোহন সাহেবের হাত থেকে ঝাঁটা কেড়ে নিতে এলো। হেয়ার সাহেব কিছুই শুনলেন না। কাজ শেষ করে বললেন, আমি এই ছাত্রটিকে রাখিয়া যাইতেছি। ভোলা বমন করিবামাত্র সে পরিষ্কার করিবে। আমি উহাকে এই দায়িত্ব দিয়াছি। বোর এক খণ্ড পরিষ্কার বস্ত্র চাই

দ্বারের কাছে দাঁড়িয়েছিল আট ন বছরের এক বালিকা। সে তার শাড়ির আঁচলটা ফাঁস করে ছিঁড়ে ফেলে সেই টুকরোটা এগিয়ে দিল সাহেবের দিকে। মেয়েটিকে চিনতে পারলো গঙ্গানারায়ণ। মাত্র মাস হুয়েক আগেই সে এ-বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেয়ে গেছে। এই মেয়েটি ভোলানাথের স্ত্রী মানকুমারী। ভোলানাথের অসুখের জন্যই নিশ্চয়ই তাকে আনানো হয়েছে পিতৃগৃহ থেকে।

হেয়ার সাহেব সেই বস্ত্রখণ্ড জলে ভিজিয়ে ভোলানাথের মুখখানা ভালো করে মুছে দিতে দিতে মৃদু। স্বরে বলতে লাগলেন, ভোলা, মনে জোর আনো, তোমাকে বাঁচিতেই হইবে, ভোলা, জীবন বড় সুন্দর, ইহা ছাড়িয়া যাইতে নাই। না ভোলা, আমরা তোমাকে রাখিব।

ভোলানাথ চোখ বুজেই রইলো। অসহ্য যন্ত্রণায় তার শরীর কুঁকড়ে উঠছে, কিন্তু সে কোনো শব্দ করছে না। তার চোখের দু পাশে বিন্দু বিন্দু জল।

হেয়ার সাহেব ভোলানাথের চিকিৎসার বিষয়ে কিছু খোঁজখবর নিলেন। বড় বড় কবিরাজরা ভোলানাথকে দেখে প্ৰায় জবাব দিয়ে গেছে। হেয়ার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের চিকিৎসার উপর আপনাদিগের ভরসা আছে কি?

ভোলানাথের মা বললেন, সাহেব, আপনি যা বলবেন, আমরা তাই শুনবো।

হেয়ার সাহেব বললেন, তবে আমি পত্র দিতেছি, শীঘ্ৰ কাহাকেও তথায় প্রেরণ করুন।

হেয়ার সাহেব আর সেখানে বেশীক্ষণ রইলেন না। যাবার সময় গঙ্গানারায়ণকে বলে গেলেন, আগামীকল্য কলেজে তুমি আমাকে ভোলার সংবাদ দিও।

হেয়ার সাহেব দ্বারের কাছে যেতেই মানকুমারী হঠাৎ আর্তম্বরে কেঁদে উঠলো। সকলেই থমকে গেল এক মুহূর্ত। হেয়ার সাহেব মুখ ফেরালেন, তাঁর দু চোখে জল, খুব সম্ভবত ভোলার সম্পর্কে তিনি নিজেও খুব আশা পোষণ করেন না। ধরাগলায় তিনি বললেন, মন দুর্বল করিও না, মা। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।

তারপর তিনি দ্রুত বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

কিন্তু পরদিন গঙ্গানারায়ণ কোনো সংবাদ দেবার আগে নিজেই এক সাঙ্ঘাতিক সংবাদ শুনলো। গঙ্গানারায়ণ সেদিন ভোলানাথের সেবার জন্য বেশীক্ষণ থাকতে পারেনি। বিরাজমোহন খানিকবাদে প্রায় জোরাজুরি করেই তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। গঙ্গানারায়ণ যে বড়মানুষের ছেলে তা তিনি জানেন, সংক্রামক রোগীর পাশে বসে থেকে যদি সেও অসুখ বাধিয়ে বসে তাহলে বড় লজ্জার ব্যাপার হবে। গঙ্গানারায়ণ যেতে চায়নি, কিন্তু ভোলানাথের মা পর্যন্ত বললেন,এবার তুমি বাড়ি যাও বাবা। আমরা তো রয়িচিই, তোমার জননী আবার তোমার জন্য চিন্তে করবেন। আবার না হয়। কাল এসো।

পরদিন সকালে বন্ধু গঙ্গানারায়ণের বাড়িতে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, মহা সর্বনাশ হয়েচে। শিগগির চ।

গঙ্গানারায়ণ শিউরে উঠে জিজ্ঞেস করলো, ভোলা কি…

বঙ্কু বললো, ভোলার খবর জানি না। হেয়ার সাহেব মারা গেছেন।

একটুক্ষণ থমকে থেকে তারপর দুই বন্ধুই কেঁদে উঠলো ড়ুকরে।

দুই নবীন যুবকের মুখে আহত বিস্ময়। এই সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত শোকের মর্ম তারা যেন ঠিক বুঝতে পারছে না। শুধু চক্ষু দিয়ে অবিরাম জল পড়ছে। গঙ্গানারায়ণের মুখখানি বিবৰ্ণ, রক্তহীন হয়ে গেছে।

হেয়ার সাহেব থাকতেন লালবাজারের বাঁদিকে গ্রে সাহেবের বাড়িতে। পালকি ডাকার সময় হলো না, দুজনে ছুটতে লাগলো সেদিকে। ততক্ষণে শহরের বহু লোকই ছুটছে খবর শুনে। গঙ্গানারায়ণের কাছে খবরটা এত আকস্মিক যে কিছুতেই যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না। কাল যে মানুষটি তাদের বাড়িতে এসেছিল, অতিক্ষণ যার সঙ্গে সে ছিল…

গ্রে সাহেবের ভবনের সম্মুখভাগে লোকে লোকারণ্য। কোনো বৃটিশ ব্যক্তির বাড়ির সামনে এর আগে এত দেশীয় মানুষ জড়ো হয়নি। বস্তুত, এ শহরের আর কোনো ঘটনাতেই বুঝি একসঙ্গে এত মানুষের সমাবেশ হয়নি কখনো।

হিন্দু স্কুলের বর্তমান, প্রাক্তন কোনো ছাত্রই বাদ যায়নি। এসেছেন ডিরোজিওর শিষ্যরা। সম্ভ্রান্ত, বুনিয়াদী ঘরের ব্যক্তিরাও আসছেন এক এক করে। গঙ্গানারায়ণের বন্ধুরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে গোল হয়ে। এমনকি যে মধুর ঘুম ভাঙে বেশ বেলায়, সে-ও হাজির হয়েছে আজ। মধু মুখে অনেক লম্বা চওড়া কথা বলে, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের সম্পর্কে অশ্রদ্ধেয় উক্তি করতে ভালোবাসে। কিন্তু আসলে তার মনটি বড় নরম। সে-ও মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। ফুলে ফুলে। যারা দেরিতে এসেছে, তারা বারবার শুনতে চাইছে সব খবর। কীভাবে হেয়ার সাহেবের মৃত্যু হলো, সে কথা শতবার বলাবলি করে বা শুনেও আশ মিটছে না।

রাত একটায় ঘুম থেকে উঠে। হঠাৎ হেয়ার সাহেব বমি করতে শুরু করলেন। পেটে অসহ্য ব্যথা। তবু তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি স্থিরভাবে রইলেন। তাঁর সদর বেহারাকে ডেকে তুলে তিনি বললেন, বাপু একবার গ্রে সাহেবের নিকট যাও তো! তাঁহাকে গিয়া বলো, আমার জন্য একটি শবাধার তৈয়ার করাইয়া নিয়া আসিতে। সে কথা শুনি বেহার বাইরে গিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।

সেই চেঁচামেচিতে জেগে উঠলো আরো অনেকে। ছুটে এলেন গ্রে সাহেব। সেই গভীর রাত্রেই চিকিৎসকের জন্য পালকি পাঠানো হলো। তাঁর প্ৰিয় ছাত্র মেডিক্যাল কলেজের সাব-অ্যাসিসট্যান্ট সার্জন প্ৰসন্ন মিত্তির রাত জেগে বসে রইলো পাশে। পেটের বেদনা প্রশমনের জন্য সে ব্লিস্টার লাগাচ্ছিল, এক সময় হেয়ার সাহেব বললেন, প্ৰিয় বৎস, ঐ বেলেস্তরা সরাইয়া লাও। এবার আমি শান্তিতে মরি।

ভোরের আলো ফুটবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন।

জুড়ি গাড়ি, ল্যাণ্ডো; ফিটনে ভরে গেল পল্লী। আকাশে গুম গুম করে গজরাচ্ছে মেঘ। বার্তাসের বেগ ক্রমেই প্রবল হচ্ছে। রেভারেণ্ড চার্লস আয়ার এসে পৌঁছবার পর শুরু হলো শবযাত্রা। অমনি সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো প্রবল ঝড় আর বৃষ্টি। কিন্তু মিছিল ছত্ৰভঙ্গ হলো না। একজনও কেউ বৃষ্টির ভয়ে শাবানুগমন বন্ধ করলো না। নিঃশব্দে নতমস্তকে সবাই চললো গোলদীঘির দিকে। সাহেবদের জন্য নির্দিষ্ট বেরিয়াল গ্ৰাউণ্ডে নয়। ডেভিড হেয়ারের সমাধি হবে তাঁর স্বপ্নজগৎ হিন্দু কলেজের কাছেই। তাঁর শেষকৃত্যের ব্যয় বহন করবে জনসাধারণ।

গঙ্গানারায়ণের মনে পড়ছে অনেক কথা। বিশেষত গতকালের কথা। হেয়ার সাহেব বলেছিলেন, বৃষ্টি নামলে কলেরার প্রকোপ কমবে। উনি নিজে এ বৎসরের কলেরার শেষ শিকার হয়ে বৃষ্টি নামিয়ে দিয়ে গেলেন।

রাস্তায় জল জমে গেছে। সেই জল ঠেলে যেতে যেতে গঙ্গানারায়ণের কানে অনবরত একটা কথা বাজতে লাগলো। হেয়ার সাহেব কাল অন্তত দুবার তাকে বলেছিলেন, যদি আর দশ বছর বাঁচি, যদি আর দশ বছর বাঁচি…। উনি বাঁচতে চেয়েছিলেন, বলেছিলেন, জীবনটা কী সুন্দর, আরও অনেক কাজ করতে চেয়েছিলেন…

গঙ্গানারায়ণের চোখ থেকে টপ টপ করে জলের ফোঁটা মিশে যেতে লাগলো বৃষ্টির জলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *