০৫. সন্তু আর জোজো কমলিকার সঙ্গে

সন্তু আর জোজো কমলিকার সঙ্গে নীচে নেমে এল।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, প্রবীর যাবে না?

কমলিকা বলল, না। বাবা দাদাকে এক জায়গায় পাঠিয়েছেন কিছু জিনিসপত্র কিনে আনার জন্য।

জোজো বলল, জিপগাড়িটাও তো নেই, তা হলে আমরা যাব কীসে?

কমলিকা বলল, হেঁটেই যাব। খুব বেশি দূর তো নয়!

জোজো বলল, এই রোদ্দুরের মধ্যে আমি বেশি হাঁটতে পারব না।

কমলিকা বলল, আহা-হা! একেবারে মোমের শরীর। আমি হাঁটতে পারি, আর তুমি পারো না। তাও তো এখানে শাড়ি পরে হাঁটতে হয়। সালোয়ার কামিজ পরলে দৌড়োতাম।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, তুমি জিন্স পরো না?

কমলিকা বলল, কলকাতায় জিন্স পরেই তো নাচের ক্লাসে যাই!

জোজো বলল, তুমি নাচ শিখছ? ধেই ধেই, না তাতা থই থই?

কমলিকা বলল, ও আবার কী! আমি শিখছি মণিপুরী।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনের রাস্তার দিকে না গিয়ে, ওরা ডান দিকে হাঁটতে লাগল বাগানের মধ্য দিয়ে। এককালে বাগান ছিল, এখন প্রায় কিছুই নেই। অযত্নে সব নষ্ট হয়ে গেছে। বড় বড় ঘাস আর জংলি গাছ, তার মধ্য দিয়ে সব পায়ে হাঁটা-পথ।

সন্তু বলল, এককালে এই বাড়িটা কত সুন্দর ছিল, তা এখনও বোঝা যায়। আর কিছুদিনের মধ্যে একেবারেই ভেঙে পড়বে!

জোজো বলল, সারিয়ে টারিয়ে নিলে এখনও সুন্দর করা যায়।

সন্তু বলল, এত বড় বাড়ি মেরামত করতে কত টাকা লাগবে, ভাবতে পারিস?

কমলিকা বলল, আমাদের অত টাকাই নেই! যাও বা একটা সিন্দুক পাওয়া গেল, সেটার মধ্যে যদি অনেক সোনার টাকা আর মণি-মুক্তো থাকত, তাও সিন্দুকটা চুরি হয়ে গেল। অবশ্য সিন্দুকটা থাকলেই বা কী হত? বাবা বলেছিলেন, ও সিন্দুক থেকে একটা পয়সাও নেওয়া চলবে না। সব গভর্নমেন্টকে দিয়ে দিতে হবে।

বাগানটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর, সামনে একটা পুকুর। ডান দিকে একটা সুরকির রাস্তা।

সেই রাস্তা ধরে বাড়িটার পিছন দিকে এসে পড়া গেল।

সেখানে কিছু বড় বড় গাছ, অনেকটা জঙ্গলের মতন। জঙ্গলের ফাঁকে একটা ভাঙা বাড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে কমলিকা বলল, ওই তো সেই দুর্গ!

সন্তু বলল, এত কাছে?

জোজো বলল, ধ্যাৎ! ওটা আবার দুর্গ নাকি? একটা ভাঙাচোরা বাড়ি!

কমলিকা বলল, ইয়েস স্যার, ওটাই দুর্গ। ছোট হলে কী হয়, বড় বড় কামান আছে।

জোজো বলল, ওই পচা দুর্গ দেখার একটুও ইচ্ছে নেই আমার। যাব না। আমি সারা পৃথিবীর কত দুর্গ দেখেছি!

কমলিকা বলল, এই দুৰ্গটার মধ্যে একটা খুব সুন্দর ছোট্ট পুকুর আছে। তাতে পদ্মফুল ফোটে। সেরকম কোথাও দেখেছ?

জোজো বলল, কত! হাঙ্গারিতে একটা দুর্গের মধ্যে পুকুর নয়, আছে আস্ত একটা লেক। তাতে সারা বছর ফুটে থাকে ওয়াটার লিলি। আর তার মধ্যে আছে তিনটে পেপাষা কুমির।

কমলিকা চোখ বড় বড় করে বলল, সত্যি?

জোজো বলল, সত্যি না তো কী, ফ্যাক্ট! নিজের চোখে দেখেছি!

কমলিকা বলল, এই পুকুরটার মধ্যেও একটা দারুণ জিনিস আছে। গেলেই দেখতে পাবে!

সন্তু বলল, কী? তিমি মাছ?

কমলিকা বলল, ভ্যাট। পুকুরে বুঝি তিমি মাছ থাকে? এ-পুকুরটার মাঝখানে আছে একটা পাথরের পিলার। সেটাতে যদি একটা ঢিল ছুড়ে লাগাতে পারো, দেখবে ঠিক সা-রে-গা-মা-র মতন সুর শোনা যাচ্ছে!

জোজো বলল, ধ্যাৎ। এ মেয়েটা এমন কাঁচা গুল মারে যে শুনলেই বোঝা যায়, মিথ্যে কথা। সন্তু, তুই যাবি তো যা, আমার যেতে ইচ্ছে করছে

না।

সন্তু বলল, চল, জোজো, মেয়েটা এত করে বলছে। একবার ঘুরে আসি। বেশি সময় লাগবে না!

কমলিকা বলল, কে সন্তু? কে জোজো?

সন্তু বলল, আমরা নাম বদলের খেলা খেলছি। আমি আসলে জোজো, এখন থেকে সন্তু হয়ে যাচ্ছি। আর সন্তু হচ্ছে জোজো! তাই না রে জোজো?

জোজো বলল, তার মানে, তুমি আমাকে সন্তু ডাকতে পারো, জোজো ডাকতে পারো। হোয়াটস ইন আ নেম!

এই সময় জঙ্গলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটা লোক। প্যান্ট-শার্ট পরা, মাথায় সামান্য টাক, চোখে চশমা। তার হাতে একটা লোহার হাতুড়ি।

জোজো বলল, লোকটাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে?

সন্তু বলল, আরে, এই তো সেই ট্রেনের চোখ-বোজা সাধু। চেহারা আর পোশাক টোশাক একেবারে পালটে ফেলেছে।

জোজো বলল, হ্যাঁ, ঠিক তো!

লোকটি ওদের দেখতে পেয়েছে। কাছে এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলল, কলকাতার অতিথি। বলেছিলুম না আবার দেখা হবে! তোমাদের কাকাবাবু কোথায়?

সন্তু খুবই অবাক হয়ে গেছে। সে উত্তর না দিয়ে বলল, আপনার চোখ খোলা!

লোকটি বলল, হ্যাঁ, মাসে পনেরো দিন আমার চোখ খোলা থাকে। আজ থেকে সেটা শুরু।

কমলিকা জিজ্ঞেস করল, আপনি কে?

লোকটি বলল, আমি একজন সাধু। এই দুজনের সঙ্গে আগে আমার দেখা হয়েছিল। মানে, ওরা আমাকে দেখেছিল।

কমলিকা আবার জিজ্ঞেস করল, আপনি এখানে কী করছেন?

লোকটি বলল, সাধুরা তো কিছু করে না। ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। আমিও তাই করছি।

আপনার হাতে ওটা কী?

হাতুড়ি। সব সময় সঙ্গে রাখি। যদি হঠাৎ সামনে একটা বাঘ এসে পড়ে। মন্তর দিয়ে তো বাঘকে বশ করা যায় না। তাই এটা দিয়ে ভয় দেখাই। তোমরাও এখানে বেশিক্ষণ থেকো না। দু-একদিন আগে একটা বাঘ পড়েছিল এদিকে।

লোকটি চলে গেল সুরকির রাস্তার দিকে।

কমলিকা বলল, এই সব জায়গাটাই আমাদের। বাইরের লোক যখনতখন ঢুকে পড়ে। কী আর করা যাবে। পাহারা দেওয়ার তো লোক নেই।

আর-একটু হাঁটতেই ভাঙা দুৰ্গটা পুরোপুরি দেখা গেল। সেটা একেবারেই ভাঙা। উপরের দিকে বটগাছ গজিয়ে গেছে। শক্ত শিকড় দিয়ে যেন মড়মড়িয়ে ভাঙছে বাড়িটার হাড়-পাঁজরা।

সামনে পড়ে আছে একটা লম্বা কামান।

কমলিকা বলল, দেখলে দেখলে, এটা দুর্গ ছিল কি না?

জোজো মুখ বিকৃত করে বলল, এটা একেবারে যা-তা কামান। মরচে ধরা। আমি দলমাদল কামান দেখেছি! বোঝাই তো যাচ্ছে, এখানে দেখার কিছু নেই। চল, সন্তু।

কমলিকা বলল, ভিতরের পুকুরটা দেখবে না?

জোজো বলল, সেটা দেখতেই হবে?

কমলিকা জোর দিয়ে বল, হ্যাঁ, দেখতেই হবে। তুমি কে, জোজো না সন্তু?

জোজো বলল, আমি এখন জোজো। আগে সন্তু ছিলাম। আবার সন্তু হয়ে যেতেও পারি।

সন্তু বলল, চল, বলছে যখন, দেখে আসি পুকুরটা! ভাঙাচোরা পাথর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে ওরা চলে এল দুৰ্গটার মধ্যে।

সন্তু বলল, আমার মনে হয়, আগে এখানে এই দুর্গ-কাম-বাড়িটাই ছিল। (কোনও কারণে এটা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর সামনের বড় বাড়িটা তৈরি হয়েছিল, সেটাও এখন ভাঙা।

ভোজো বলল, এ আর বেশিদিন থাকবে না। কই, পুকুর কোথায়?

সন্তু বলল, এই পুকুর!

সে হেসে ফেলল।

পুকুরের বদলে একটা বড় চৌবাচ্চাই বলা উচিত। দশ-বারো হাত চওড়া, সেরকমই লম্বা। জল দেখাই যায় না প্রায়, পানায় ঢেকে গেছে।

সন্তু বলল, এই পুকুরে রাজকন্যারা চান করত, তাই না? তাও বোধহয় একশো-দেড়শো বছর আগে!

জোজো বলল, কোথায় তোমার পদ্মফুল, রাজকুমারী? একটাও তো দেখতে পাচ্ছি না।

কমলিকা বলল, তাই তো, নেই তো?

সন্তু তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলল, আহা, পদ্মফুল তো সারা বছর ফোটে না! বসন্তকাল এসে দেখা যাবে।

জোজো বলল, আর সেই সা-রে-গা-মা গান গাওয়া পিলারটা?

কমলিকা বলল, সেটা বোধহয় জলে ড়ুবে গেছে!

সন্তু বলল, যথেষ্ট হয়েছে। এই রোদ্দুরে আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না। পাথরগুলো পর্যন্ত তেতে গেছে। চল, সন্তু চল, ফিরে যাই।

কমলিকা বলল, আহা, এত তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়ার কী হয়েছে? ওই তো বাইরের গাছতলায় বেশ ছায়া রয়েছে। ওইখানটায় বসবে চলো না।

জোজো বলল, বসে কী করব?

কমলিকা বলল, আমরা গল্প করব।

সন্তু বলল, বাড়িতে গিয়েও তো গল্প করা যায়। এখানে সত্যি খুব গরম।

কমলিকা বলল, ধুৎ, বাড়ির মধ্যে সর্বক্ষণ বুঝি ভাল লাগে? ওখানে ছায়ায় বসলে বেশ আরাম লাগে। এসো, একটুখানি বসেই দ্যাখো!

জোজো বলল, তুমি গল্প শোনাবে? কীসের গল্প?

কমলিকা বলল, অনেক গল্প আছে। গান শোনাতেও পারি। এসো, এসো, প্লিজ।

সন্তু বলল, চল, জোজো। বেশিক্ষণ না কিন্তু বড়জোর দুটো গান শুনব। দুৰ্গটার বাইরে কয়েকটা বড় বড় গাছের মাঝখানে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে ছায়া পড়েছে ঠিকই।

ঘাসের উপর একটা গোল চাটাই পাতা। সেটাও অনেকদিনের পুরনো।

কমলিকা বলল, তোমরা ওটায় গিয়ে বসো। আমি একটু আসছি।

সন্তু আর জোজো দাঁড়াল চাটাইটার উপর। সঙ্গে সঙ্গে ওরা অদৃশ্য হয়ে গেল!

আনন্দের চোটে হাততালি দিয়ে নাচতে লাগল কমলিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *