সিনেমা হলে ঢোকার মুখেই ধূর্জটিকে দেখতে পেয়েছিল সুপ্রিয়া। ধূর্জটি তিন-চার জন বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে করতে আসছে। সুপ্রিয়া চট করে ধূর্জটির বন্ধু ক-জনকে একবার দেখে নিল। তারপর ধূর্জটির সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ার আগেই সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। স্বামীর পাশ ঘেঁসে সে ঢুকে এল ভেতরে।

এক সময় অন্ধকারের মধ্যে দীপংকর বলল, ওই দেখো ধূর্জটি বসে আছে ওখানে।

সুপ্রিয়া নির্লিপ্তভাবে বলল, তাই নাকি?

তবু, যতক্ষণ সিনেমা চলছিল, বার বার সুপ্রিয়ার চোখ চলে যাচ্ছিল ধূর্জটির দিকে। আর কিছু না, সে দেখতে চাইছিল ধূর্জটি তার দিকে পেছনে ফিরে তাকায় কিনা। কিংবা ধূর্জটির কোনো বন্ধু। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুপ্রিয়ার বুকের মধ্যে একটা শিরশিরানি ভাব জেগে ওঠে। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে যায়।

তারপর সিনেমা ভাঙার পর দীপংকরই আগ বাড়িয়ে ডাকল ধূর্জটিকে। একরকম জোর করেই ধূর্জটিকে নিয়ে এল বাড়িতে। দীপংকরের এতখানি আদিখ্যেতা পছন্দ হয় না সুপ্রিয়ার।

ধূর্জটির দিকে সোজাসুজি তাকাতে ইচ্ছে করে না সুপ্রিয়ার। কী লোভীর মতন দৃষ্টি! ধূর্জটি সবসময়ই এইভাবে তাকায়, যেন শাড়ি ব্লাউজ ভেদ করে একবারে ভেতর পর্যন্ত দেখে। উঃ, বিয়ের আগে কম জ্বালিয়েছে ওই ছেলেটা! কোনো লজ্জা-শরম নেই, যখন-তখন বাড়িতে এসেছে। বিশ্বসুদ্ধ বোধ হয় কারুকেই জানাতে বাকি রাখেনি যে সে ভালোবাসে সুপ্রিয়াকে। ইশ, কী ভালোবাসার ছিরি! শুধু কথার ফুলঝুরি।

সুপ্রিয়ার মামাতো ভাই রণজয়ের সঙ্গে তার কয়েকজন বন্ধুও আসত সুপ্রিয়াদের বাড়িতে। রণজয়ের বন্ধুদের মধ্যে ধূর্জটিই ছিল সবচেয়ে আমুদে আর হইচই স্বভাবের।

সুপ্রিয়াদের বাড়ির আবহাওয়ায় কখনোই খুব গম্ভীর কিংবা কড়াকড়ির ভাব ছিল না। ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গেই আড্ডা দিত, গান গাইত। একবার একটা নাটকও করেছিল। ধূর্জটিই ছিল সেই নাটকের পরিচালক। সে যে কবিতা লিখত, একথা গোপন করার চেষ্টা করেনি কখনো। সকলেই তাকে কবি কবি বলে ডাকত। যখন-তখন সে মুখস্থ বলত কবিতার লাইন, নিজের নয় অবশ্য, রবীন্দ্রনাথ কিংবা জীবনানন্দ দাশের। ধূর্জটি নিছক পাড়ার কবি ছিল না, তখনই খানিকটা নাম হয়েছিল, বড়ো বড়ো পত্রপত্রিকায় ছাপা হত তার কবিতা।

মেয়েদের সঙ্গে আগ্রহ তার বরাবরই বেশি। সব মেয়ের সঙ্গেই সে ঘনিষ্ঠতা করার চেষ্টা করত। থিয়েটারে যে চার-পাঁচটি মেয়ে ছিল, সকলকেই সে যেন নায়িকা বলে মনে করত, কথা বলত একেবারে বিগলিতভাবে। সুপ্রিয়াকেই অবশ্য জ্বালাতন করত বেশি। সুপ্রিয়া এইজন্যই পছন্দ করত না ধূর্জটিকে। গায়ে-পড়া ছেলেদের তার মোটেই ভালো লাগে না। যখন-তখন সুপ্রিয়াকে একটু একলা পেলেই—ধূর্জটি তার রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠত। বার বার শুনতে শুনতে কথাগুলি একঘেয়ে হয়ে যায়।

এক-এক সময় সে যখন কবিতা শোনাতো সুপ্রিয়াকেই উদ্দেশ্য করে লেখা, তখন মন্দ লাগত না অবশ্য। তবে ওই পর্যন্তই। তার বেশি না। অবশ্য সুপ্রিয়া কখনোই ধূর্জটিকে কোনো রূঢ়কথা বলেনি। হয়তো দু-একবার বলা উচিত ছিল। প্রশ্রয় পেয়ে পেয়ে ধূর্জটি অত্যন্ত বেশি সাহসী হয়ে উঠেছিল।

দীপংকর ধূর্জটিকে বাড়িতে নিয়ে এল যেদিন, সেদিন সুপ্রিয়া প্রথম প্রথম বিশেষ কথা বলতে চায়নি। প্রথম থেকেই কঠিন হয়ে থাকা ভালো। নাহলে ধূর্জটি যদি আবার ঘন ঘন আসতে শুরু করে? সুপ্রিয়ার বাপের বাড়িতে সে যখন-তখন আসত বটে, কিন্তু এখানে, ফাঁকা ফ্ল্যাটে সে ওরকম আসতে শুরু করলে পাড়াপ্রতিবেশীর চোখে পড়তই। তা ছাড়া ঝি চাকর রয়েছে। শুধু শুধু একটা বদনাম।

দীপংকরের আবার বড় বেশি বাড়াবাড়ি। ওকে স্কচ দেওয়া কেন? ও কী স্কচের মর্ম বুঝবে? এই স্কচের লোভেই যদি প্রতি সন্ধ্যে বেলা আসতে চায়!

ধূর্জটি অবশ্য প্রায় চুপচাপই বসে আছে। আগে সে ছটফটে ছিল খুব, কথাও বলত অনর্গল। এখন সে গুম হয়ে আছে কেন? সে কি বদলে গেছে না সুপ্রিয়ার ওপর রেগে আছে? দীপংকরের সঙ্গে যখন সুপ্রিয়ার বিয়ের ঠিক হয়, তখন সুপ্রিয়া সে-কথাটা ধূর্জটিকে জানায়নি পর্যন্ত। ধূর্জটিকে তো সেরকম গুরুত্বই দেয়নি কখনো। ধূর্জটি যে সুপ্রিয়াকে বিয়ে করার জন্য পাগলামি শুরু করেছিল কিন্তু সুপ্রিয়াকে বিয়ে করার যোগ্যতাই ছিল কিনা, সে-কথা তো ভেবেও দেখেনি। তবে আগে ধূর্জটিকে দেখলে বেশ মজা লাগত সুপ্রিয়ার এখন এতদিন পর, তাকে গম্ভীরভাবে বসে থাকতে দেখে ভয় লাগছে। মুখ-চোখ স্বাভাবিক করে বসে থাকলেও বুক কাঁপছে সুপ্রিয়ার।

সুপ্রিয়ার স্বামী ওদের দুজনকে বসিয়ে রেখে হঠাৎ বাথরুমে চলে গেল স্নান করতে। সুপ্রিয়া জানে এর মানে কী! দীপংকর চায় তার সঙ্গে ধূর্জটির একটু নিরালায় কথাবার্তার সুযোেগ দিতে। দীপংকর ধরেই বসে আছে, সে এখনও ধূর্জটির ভালোবাসা ভুলতে পারেনি। দীপংকর উদার হতে চায়। উদার হওয়া দীপংকরের নেশা। অফিসে, বন্ধুদের মধ্যে এমনকী স্ত্রীর কাছে সবসময় তার উদার সেজে না থাকলে যেন চলে না!

দীপংকর বাথরুমে যাবার পর ধূর্জটি সোজাসুজি সুপ্রিয়ার চোখের দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ?

সুপ্রিয়া বলল, ভালোই তো আছি।

সাজানো ফ্ল্যাটটার চারদিকে তাকিয়ে হঠাৎ ঠাট্টার সঙ্গে ধূর্জটি বলল, হ্যাঁ ভালোই তো আছ দেখছি! মেয়েরা তো এ-রকম ভালো থাকতেই চায়।

এই ধরনের ব্যাঁকা বাঁকা কথা সুপ্রিয়া পছন্দ করে না। সে উলটে বলল, কেন, তুমি বুঝি খারাপ আছ?

আমি কখনোই খারাপ থাকি না। তোমাদের এই দামি পেতলের জিনিসটা কি অ্যাশট্রে? এতে ছাই ফেলতে পারি?

হ্যাঁ, ফেলতে পার।

ধূর্জটি সিগারেট ধরালো, তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার স্বামী প্রায় জোরাজুরি করে আমাকে আজ ধরে আনল কেন বলো তো?

সুপ্রিয়া বলল, জোরাজুরি আবার কী? তোমার যদি একান্তই না আসার ইচ্ছে থাকত, তুমি বললেই পারতে! জোর করে কি কেউ কারুকে আনতে পারে?

এবার ধূর্জটি হাসল।

সত্যি কথা বলতে কী, আমার একটু একটু ইচ্ছে ছিল তোমার সুখের সংসারটা দেখে যাওয়ার!

সুখের সংসার—এই কথা দু-টির ওপর ধূর্জটি এমন জোর দিল যেন সুপ্রিয়া সত্যি সত্যি অসুখী। সে কেন অসুখী হতে যাবে? তার তো কিছুরই অভাব নেই। অভাব না থাকলেও মানুষের অনেকরকম দুঃখ থাকতে পারে, কিন্তু সুপ্রিয়ার তো সেরকমও কিছু নেই। স্বামী হিসেবে দীপংকরের কোনো খুঁত নেই, তা ছাড়া ফুটফুটে একটা সন্তান রয়েছে সুপ্রিয়ার। একমাত্র ধূর্জটিই শুধু বুঝি তাকে অসুখী করতে পারে এখন। ধূর্জটির যদি সেরকম কোনো উদ্দেশ্য থাকে। ধূর্জটিই শুধু প্রশ্ন করছে, সুপ্রিয়া নিজের থেকে কিছুই বলেনি এপর্যন্ত। একটা কিছু বলা উচিত বোধ হয়।

সুপ্রিয়া জিজ্ঞেস করল, তোমার খবর-টবর কী; তুমি কেমন আছ?

ধূর্জটি হালকাভাবে বলল, ভালোই। এই চলে যাচ্ছে আর কী!

তারপর আপনমনেই সে বলল, এ-পাড়াটা আমার খুব চেনা।

সুপ্রিয়া বলল, আমরা এই ফ্ল্যাটে মাত্র দু-মাস আগে এসেছি! ধূর্জটি চুপচাপ খানিকক্ষণ সিগারেট টানল। তারপর খুব সাধারণ কথার কথা হিসেবে জানালো, তুমি আগের মতনই সুন্দর আছ!

এইকথাটা শোনার অভ্যেস আছে সুপ্রিয়ার। অনেকের কাছেই শোনে, তবে, প্রতিবারই একটু একটু ভালো লাগে। যেন একটা নিরাপত্তা বোধ। কেউ তাকে অবহেলা করতে পারবে না এখনও।

ধূর্জটি একটুক্ষণ নিঃশব্দ হাসিমুখে তাকিয়ে রইল সুপ্রিয়ার দিকে। ঠিক চোখের ওপরে চোখ। এতক্ষণ গোমড়া মুখে থাকার পর এখন যে একটু হাসি ফুটেছে ধূর্জটির, তাতেই একটু খুশি হয়ে উঠল সুপ্রিয়া।

ধূর্জটি কিন্তু পরেই আঘাতটা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিচ্ছিল। সুপ্রিয়ার মুখের খুশির ভাবটা লক্ষ করে সে আলটপকা বলে ফেলল, অমলের সঙ্গে দেখা হয়?

সুপ্রিয়া একেবারে কেঁপে উঠল। সে কি এই কথাটারই অপেক্ষা করেছিল? কিংবা ভেতরে ভেতরে সবসময় অস্বীকার করার চেষ্টা করছিল যে, না, ও কথা আর কেউ কোনোদিন বলবে না!

তবু মুখের ভাব যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক রেখে সে বলেছিল, অমল, না তো. সে কি কলকাতায় থাকে নাকি?

তা ছাড়া কোথায় থাকবে?

দিল্লিতে চাকরি নিয়েছে শুনেছিলাম?

সে তো মাত্র বছর খানেকের জন্য। তিন-চার বছর ধরে তো এখানেই আছে।

সুপ্রিয়া নিরাসক্তভাবে বলল, কী জানি, আমি আজকাল একদম সময় পাই না, কারুর খবরই রাখি না—

ধূর্জটি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, সুপ্রিয়া তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আসছি আমি এক্ষুনি।

আর সে সহ্য করতে পারবে না। এখন খানিকটা মনের জোর না করে নিলে সোজাসুজি তাকাতে পারবে না ধূর্জটির দিকে। বাথরুমের দরজার কাছে গিয়ে সে দীপংকরকে জিজ্ঞেস করল, এই তোমার আর কত দেরি?

দীপংকর না বেরোনো পর্যন্ত সুপ্রিয়া আর বসবার ঘরে গেল না। ধূর্জটির সামনে সে একা যেতে পারবে না! সে শোয়ার ঘরে আয়নার সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এখন সুপ্রিয়া তার স্বামীর আড়ালে আশ্রয় নিতে চায়।

দীপংকর এসে পড়বার পর ধূর্জটি আর বিশেষ কিছু বলেনি। হয়তো সুপ্রিয়ার চোখ দিয়ে মিনতি ঝরে পড়েছিল। ধূর্জটি কি এতটা নীচে নামবে যে সে সুপ্রিয়ার স্বামীর সামনেই অমলের কথা…

যাওয়ার আগে ধূর্জটি শেষবার তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়েছিল সুপ্রিয়ার দিকে। সেই দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছিল একটাই কথা—সে অমল সম্পর্কে অনেক কিছু জানে!

দীপংকর বার বার অনুরোধ করল ধূর্জটিকে আবার আসতে। কেন, কেন, কেন? কেন ধূর্জটি আসবে? হে ভগবান, ধূর্জটি যেন আর না আসে।

রাত্রি বেলা বিছানায় শুয়েও দীপংকর বার বার বলতে লাগল ধূর্জটির কথা। আজকাল আবার ও কবিতা পড়তে শুরু করেছে। এ আবার কী উদ্ভট বাতিক দীপংকরের? বিয়ের সাত বছর বাদে সে কেন পুরোনো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে! এর আগে তো সে কোনো কবিতার বইয়ের পাতাও উলটে দেখেনি কখনো! ধূর্জটি কেন তাকে নিয়ে কবিতা লেখে এখনও? যদিও দীপংকরের কাছে অস্বীকার করেছে, কিন্তু সুপ্রিয়া মনে মনে ঠিকই জানে যে ধূর্জটি ওই কবিতাটি তাকে নিয়েই লিখেছে। ধূর্জটির তো সুপ্রিয়ার ওপর খুব রেগে থাকার কথা।

দীপংকর যত ইচ্ছে ভাবুক যে ধূর্জটি এখনও মনে মনে সুপ্রিয়াকে ভালোবাসে। তাতে কোনো ক্ষতি নেই। মনে মনে ভালোবাসা তো কেউ আটকাতে পারে না! বিয়ের আগে মেয়েরা দু-একটা ছোটোখাটো প্রেম করে থাকলেও স্বামীরা এখন তাতে কিছু মনে করে না। বিশেষত দীপংকরের মতন সবসময় উদারতা দেখাতে পছন্দ করে যেসব স্বামী।

কিন্তু বিয়ের পরে যদি—?

অমল, অমল, অমল!

নামটা মনে পড়লেই সুপ্রিয়ার এখনও গাঁ কাঁপে। অমল তার বুকের মণি, অমলই তার সর্বনাশ!

কত সাবধানে সুপ্রিয়া লুকিয়ে রেখেছে অমলের কথা। এমনকী তার বাড়ির কেউ জানে না কিছু।

সুপ্রিয়ার যখন বারো-তেরো বছর বয়েস, সেই সময় সে হঠাৎ একদিন টের পায় যে তার জীবনে একজনই দেবতা, তার নাম অমল। অথচ তার আগে কিছুই বোঝেনি, কতদিন ধরে পাশাপাশি বাড়িতে আছে। অমল তার থেকে চার-পাঁচ বছরের বড়ো, সেই সময় সে কৈশোর ছাড়িয়ে সদ্য যুবক, খুব গম্ভীর, জেদি আর অভিমানী। খুব ছোটোবেলায় অমল তাদের বাড়িতে খেলতে আসত, একবার তাদের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গিয়ে অমলের থুতনি কেটে যায়। অনেকটা মেয়েলি ধরনের চেহারা, তার ডাক নাম ছিল অমু, দূর থেকে যখন কেউ অমু অমু বলে ডাকত, তখন মনে হত যেন একটি মেয়েকেই ডাকা হচ্ছে।

কৈশোর ছাড়াবার পর অমল একেবারে বদলে যায়। হঠাৎ লম্বা হয়ে যায় অনেকখানি, শক্ত পুরুষালি চেহারাটা বেরিয়ে আসে। পাড়ার কারুর সঙ্গে সে আর মেশে না, একা একা থাকে। বই পড়ার সাংঘাতিক নেশা, শুধু গল্প-উপন্যাস নয়, অন্য ধরনের বই, কলেজ থেকে বেরিয়ে দুপুরগুলো সে বিভিন্ন লাইব্রেরিতে কাটায়। অনেক সময় মাঝরাত্রে, তার ঘর থেকে ভেসে আসে রেকর্ডের সেতার বাজনা।

একদিন সন্ধ্যে বেলা ছাদে উঠে সুপ্রিয়া দেখছিল, পাশের ছাদে, স্বামী বিবেকানন্দর ভঙ্গিতে বুকের ওপর আড়াআড়ি হাত রেখে অমল স্থিরভাবে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। কী অদ্ভুত সেই ভঙ্গি। তখন চৈত্রমাস, পরিষ্কার আকাশে অসংখ্য জ্বলজ্বলে তারা, অমল যেন, খালি চোখেই সেই নক্ষত্র জগতের সমস্ত ইতিহাস পাঠ করছে।

সেই প্রথম সুপ্রিয়ার বুক কাঁপল। সে একটি কথাও বলেনি। শুধু আড়ালে দাঁড়িয়ে নির্নিমেষে অমলকে দেখেছে। এর আগে সে অমলের সঙ্গে কত স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারত, সে-দিন পারল না।

নীচে নেমে আসার পর, সে-দিন সর্বক্ষণ, এমনকী ঘুমের মধ্যেও বার বার জেগে উঠে সে চোখের সামনে অমলের সেই মূর্তিটাই দেখতে লাগল বার বার।

এরপর থেকে অমলের সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে, জানলা দিয়ে কিংবা বাড়ির সামনের রাস্তায়, সুপ্রিয়া কথা বলতে পারেনি, চোখ নামিয়ে নিয়েছে। অমলও নিজের থেকে আর কোনো কথা বলে না। শুধু গম্ভীরভাবে তাকিয়ে থাকে।

অথচ অমলের কাছে যাওয়ার জন্য, তার সঙ্গে দুটো কথা বলার জন্য সুপ্রিয়ার বুকের মধ্যে আকুলিবিকুলি করে। তার মনে হয়, যেন অমলের কাছে একটা দারুণ শক্তিশালী চুম্বক রয়েছে, সেটা প্রবলভাবে সারাক্ষণ টানছে সুপ্রিয়াকে। অমল কিন্তু মুখে সেরকম কোনো ভাবই দেখায় না।

এর মাস চারেক পরেই অমলরা চলে গেল পাড়া ছেড়ে।

সে-রাত্তিরে সুপ্রিয়া কেঁদে কেঁদে তার বালিশ ভিজিয়ে দিল, কেউ টের পায়নি! কী অসহ্য কষ্ট বুকের মধ্যে! কারুকে তো একথা বলাও যায় না!

সুপ্রিয়াদের পাশের বাড়িতে অমলরা ভাড়া থাকত। এখন ওরা বালিগঞ্জ প্লেসে নিজেদের বাড়ি বানিয়ে উঠে গেল। কিন্তু মানুষ তো পুরোনো পাড়ায় বেড়াতেও আসে। কিন্তু অমল আর একবারও এল না। যেখানে ওরা সাত-আট বছর একটানা ছিল, সে-জায়গা সম্পর্কে অমলের যেন আর কোনো মায়াই নেই। সুপ্রিয়া নামের একটি মেয়ের অস্তিত্বও যেন সে ভুলে গেছে।

স্কুল ছাড়িয়ে কলেজে ভরতি হওয়ার পর সুপ্রিয়া প্রথম একা একা বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা পেল। তখন তার ইচ্ছে হত বালিগঞ্জ প্লেসে গিয়ে ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু জায়গাটা সে চেনে না। ঠিকানাও জানে না অমলদের বাড়ির, কারুকে জিজ্ঞেস করাও যায় না।

সেকেন্ড ইয়ারে উঠেই সুপ্রিয়া পূৰ্ণযুবতী হয়। তার শরীর শতদলের মতন মেলে দেখায় তার রূপ। যারাই তার দিকে তাকায়, সহজে চোখ ফেরায় না।

সেই সময় আচম্বিতে একদিন রাস্তায় অমলের সঙ্গে দেখা।

সুপ্রিয়াই প্রথম ডেকেছিল, অমলদা–!

অমল মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিল। তার দু-চোখে গভীর বিস্ময়।

সে যেন, সুপ্রিয়াকে চিনতেই পারছে না। এ যেন, অন্য এক সুপ্রিয়া। বিরাট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, সুপ্রিয়া, তুই?

সেদিন বেশি কথা হয়নি। অমলের কী একটা জরুরি কাজ ছিল। তবু যাওয়ার সময় সুপ্রিয়া জিজ্ঞেস করল, অমলদা, তোমাদের নতুন বাড়িটা কোথায়?

অমল বলল, এই তো কাছেই–!

তারপর সে ঠিকানাটা বলল এবং দ্রুত একটা বাসে উঠে পড়ল।

সারারাস্তা সুপ্রিয়া সেই ঠিকানাটা মুখস্থ করতে করতে এল। কিছুতেই আর ভুললে চলবে না।

তার পরদিন সুপ্রিয়া তার জীবনের প্রথম চিঠি লিখল অমলকে। চিঠিতে কিছুই ছিল না, নিছক সব ছেলেমানুষি কথা, তবুও সেই চিঠি লিখতে তার হাত কাঁপছিল।

অমল কিন্তু চিঠির উত্তর দিল না। অত পড়ুয়া যে-অমল সে এক লাইন চিঠি লিখতে পারে? সাত দিন, দশ দিন, পনেরো দিন অপেক্ষা করার পর সুপ্রিয়ার মন অভিমানে পাথর হয়ে গেল। আর সে অমলের কথা ভাববে না। অমল থাক তার অহংকার নিয়ে।

যোলো দিন পর, ঠিক যেখানে আগের বার দেখা হয়েছিল সেইখানে অমলকে আবার দেখতে পেল সুপ্রিয়া। এবার অমল নিজেই এগিয়ে এসে বলল, আমি পাটনায় গিয়েছিলাম, ফিরে এসে কাল তোমার চিঠি পেলাম।

ছেলেবেলায় সুপ্রিয়াকে অমল ডাকত তুই বলে, সুপ্রিয়া বলত, অমলদা। কিছুদিনের মধ্যেই দু-জনেরই সম্ভাষণ বদলে গেল।

বালিগঞ্জ প্লেসে অমলদের নতুন বাড়িটা বেশ বড়ো। কিছু অংশ ভাড়া দেওয়া হবে কি হবে, সে-বিষয়ে অমলের বাবা আর মা এখনও একমত হতে পারেননি! অনেকগুলো ঘর ফাঁকা পড়ে আছে! অমলের দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। অমলের ছোটোভাই খঙ্গপুর আই আই টি-তে পড়ে—সবাই একসঙ্গে এলে বাড়িটা তবু জমজমাট হয়। অন্য সময় খাঁ খাঁ করে প্রায়।

তিনতলায় একটিই মাত্র ঘর, সেটা অমলের নিজস্ব। অমলের মা তখন অসুস্থ, তাই সেই ঘরের জিনিসপত্রে কোনো মেয়েলি হাতের স্পর্শ নেই। অমল সুপ্রিয়াকে এনে সেই ঘরে বসালো।

বাইরে এত গম্ভীর থাকলেও অমল তার ঘরের মধ্যে উচ্ছল। সুপ্রিয়ার সঙ্গে তার কত কথা। সেকথা একদিন দু-দিনে ফুরোয় না। প্রায় কলেজ ছুটির পর, কোনো কোনোদিন ছুটি হওয়ার আগেই সুপ্রিয়া চলে আসে অমলদের বাড়িতে।

অমলের কাছ থেকেই সুপ্রিয়া তার শরীরে প্রথম পুরুষের স্পর্শ পায়।

কিন্তু অমল কখনো লোভীর মতন সুপ্রিয়ার সঙ্গে কর্কশ ব্যবহার করেনি। কত নরম, কত সুন্দর তার আদর। অমলের বুকে মাথা রেখে সুপ্রিয়া সেই চুম্বকটির সঠিক সন্ধান পেয়েছে।

অন্যান্য ছেলেরা তখন সুপ্রিয়ার স্তুতি করে, ধূর্জটি তাকে নিয়ে কবিতা লেখে, দাদার অন্যান্য বন্ধুরাও তাকে নিয়ে কম আদিখ্যেতা করে না, তাদের সকলের কাছে সুপ্রিয়া যেন, এক রাজকুমারী। একমাত্র অমলের কাছেই সুপ্রিয়া ক্রীতদাসীর মতন। এখানে সুপ্রিয়ার ইচ্ছে অনিচ্ছের কোনো দাম নেই, অমল যা বলবে, তাই শুনতে হবে। অমল যেদিন আসতে বলবে, সে-দিন আসতেই হবে সুপ্রিয়াকে, তা সে যতরকম বাধা তার থাকুক না কেন। সুপ্রিয়া তবু এতেই কৃতার্থ।

ওদের মধ্যে ভালোবাসার কথা হয়নি, বিয়ের কথা হয়নি, তবু যেন, ধরে নেওয়াই হয়েছিল, ওদের জীবন একেবারে আচ্ছন্ন। পরস্পরকে ছেড়ে ওরা বাঁচতে পারবে না।

যদিও স্ট্যাটিসটিকসে পিএইচ ডি করছে তখন অমল, তবু সেই সময় খুব গান-বাজনার দিকেও ঝুঁকেছে! নিজে গাইতে পারে না, কিন্তু সরোদ শেখা শুরু করেছে খুব মন দিয়ে।

যেমন একসময় অমল তার সুপ্রিয়াদের পাশাপাশি বাড়িতে ছিল, সেইরকম অমলদের নতুন বাড়ির ঠিক পাশের বাড়িতে বনানী নামে একটি মেয়ে থাকে। মেয়েটি ভালো গান গায়। সারাদিনরাতই যেন সে গানের চর্চা করে, অনেক বড়ো বড়ো ওস্তাদ আসে তাদের বাড়িতে। অমলের ঘরে বসেও সেই গান শোনা যায়। কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে গিয়ে অমল সেই গান শুনেছে।

দাদার বন্ধুরা একদিন হইচই করে মিউজিক কনফারেন্সে গিয়েছিল দল বেঁধে। সারারাত। সুপ্রিয়াকে নিয়ে গিয়েছিল। সুপ্রিয়া শুধু রাজি হয়েছিল এইজন্যই যে তাহলে সে দূর থেকেও অমলকে দেখতে পাবে। অমল নিয়মিত কনফারেন্সে যায়। সুপ্রিয়া তো আর অমলের সঙ্গে সারারাত গান শুনতে যেতে পারত না।

সেদিন দাদার বন্ধুদের মধ্যে ধূর্জটিও ছিল। ধূর্জটি সুপ্রিয়ার পাশে বসে খুনসুটি করছিল সারাক্ষণ। গান শোনার বদলে সুপ্রিয়ার রূপের স্তব করার দিকেই তার বেশি উৎসাহ। সুপ্রিয়া শুধু একদৃষ্টে তাকিয়েছিল, তাদের তিন সারি সামনে, ঠিক ডান দিকের কোণের সিটে বসা অমলের দিকে। একসময় ধূর্জটিও দেখতে পেল অমলকে।

ধূর্জটি আর আরও দু-একজন বন্ধু অমলকে আগে থেকেই চেনে। ধূর্জটি অমলকে ডেকে নানারকম ঠাট্টা-ইয়ার্কি করতে শুরু করে। অমল বাইরে যে-রকম গম্ভীর থাকে সেইরকম গম্ভীরই রইল। দুটো-একটার বেশি কথাই বলল না। সুপ্রিয়াও কথা বলেনি বিশেষ, অন্যদের সামনে অমলের সঙ্গে কোনোরকম পরিচয়ের কথাই বোঝাতে চায়নি। শুধু অমলের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলেছে, ও তো আমার, ও আমার, ও শুধু আমার–।

কিন্তু শেষপর্যন্ত সুপ্রিয়া অমলকে বিয়ে করতে পারেনি। কী যে হয়ে গেল সেই সময়টা। অমলের ধারণা হল সুপ্রিয়া বুঝি ধূর্জটিকে ভালোবেসে ফেলেছে। অমল সেই নিয়ে একটু সামান্য ভসনা করতেই সুপ্রিয়া চটে উঠেছিল। অমল এটুকুও বিশ্বাস করতে পারে না তাকে? আস্তে আস্তে, আরও দু-একটা ঘটনার পর সুপ্রিয়া বুঝেছিল অমলের ঈর্ষা কী সাংঘাতিক। আর কোনো পুরুষ, সুপ্রিয়ার সঙ্গে একটা কথা বললেই সে সহ্য করতে পারে না। এই নিয়ে সুপ্রিয়াকে আঘাত দিয়ে শুধু কাঁদায়নি সে, তাকে নিয়ে গেছে অপমানের শেষ সীমায়। কারুর সঙ্গে একটু হেসে গল্প করা মানেই কী প্রেম? তাহলে সুপ্রিয়া কী অমলের সঙ্গে বনানীকে একটা ব্যাপারে হিংসে না-করে পারত না। সুপ্রিয়ার একদম গানের গলা নেই। ছেলেবেলা থেকেই সে বুঝে গিয়েছিল, তার দ্বারা গান হবে না কোনোদিন। টনসিল অপারেশনের পর তার গলার জোর একদম কমে গেছে। তাই সুপ্রিয়া কিছুদিন সেতার শেখার চেষ্টা করেছিল। শেষপর্যন্ত ধৈর্যে কুলোয়নি। কিন্তু ছবি আঁকাটা সে ভালোই শিখেছিল।

Share This