০১. মাঝে মাঝে মনে হয়

মাঝে মাঝে মনে হয়, এই যে মানুষ হয়ে জন্মেছি, এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কিছু নেই। না জন্মাতেও পারতাম এবং তাতে আর কােরর কোনো ক্ষতি হতো না। লা জলমালে দেখতে পেতাম না। এই ষড়ৈশবর্যময়ী পথিবী, আমার নিশবাসের জন্য বরাদ্দ বাতাসটকু নেওয়া হতো না, মধ্যরাত্রির আকাশের দিকে যারা তাকিয়ে দেখেতাদের মধ্যে একজন মানষি কম পড়তো। জলের আঙল দিয়ে একটি শিশী ছবি আকিতো না। ছািটতে ছািটতে পাহাড়ের ওপর উঠে একটি বালকের উল্লাসে ফেটে পঢ়া-কখনো উপস্থাপিত হতো না সেই দশ্য। একটি নারীর অনাবত ঝকঝকে বকে মাথা রেখে যে চাঞ্চল্যকর শান্তি পাওয়া যায়—কখনো পেতাম না তার সন্ধান।

আমি না জন্মালে—আমার মা, বাবা, কয়েকজন কাকা ও জ্যাঠা, ভাই বোন, আত্মীয়, কয়েকটি অনাত্মীয়া নারী, চার পাঁচটি নদী ও দটি দেশ নিয়ে আমার যে লগপােশ নিজস্ব জগৎ, এত ব্যাকুলতা ও মমতা-থাকতো না। এর কোনো অস্তিত্ব। দিশবাসই করা যায় না! বিশ্ববাস করা যায় না বলেই পানজন্ম, নিয়তি, কমফল—এই চাষ ভালো ভালো মায়াময় বিশদ্বাস তৈরী হয়েছিল একসময়। এখন আবার আকস্মিকতায় ফিরে এসেছি, তাই ভাবতে গেলেও বক কাঁপে। আমি না জন্মালে এই ক্ষদ্র জগৎ’টিতে আমার অন্যােপস্থিতি কেউ অনভিব করতো না, কেউ অপেক্ষা করতো না। আমার জন্য। যা নেই, তার জন্য আবার অপেক্ষা কি! আর সবাই থাকতো, “আমি” থাকতাম না, এর চেয়ে বেশী গরত্নপণ উপলব্ধি আর হয় না। মানষের। মাতৃত্যু চিন্তার চেয়েও মমান্তিক। কৈশোরে ও প্রথম যৌবনে আমি তিন চারবার আত্মহত্যার কথা জেবেছি। অনেকেই ভাবে। আত্মহত্যারও একটা মম আছে। কখনো কখনো গৌরবও থাকে-কিন্তু না জন্মানো ? মানষ হয়ে জন্মেছি বলেই বৰ্ব্বতে পারি, না-জন্মানো মানে কি অসীম শান্যতা। আমি মনষ্যজন্ম পেয়েছি, আমি ধন্য।

মাঝে মাঝে এ কথাও মনে হয়, এই জীবনের সার্থকতা কী ? এই যে দলভ সৌভাগ্য আমাকে দেওয়া হলো, কি এর শ্রেষ্ঠ ব্যবহার ? অবহেলায় ঔদাসীন্যে ধর্লো কাদায় ফেলে রাখার জিনিস তো এ নয়! এই দেহ নিয়ে জন্মাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, মোমবাতির ওপরে শিখাটাকুর মতন, মানষের জীবনের সঙ্গে জড়ে থাকে আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাংক্ষার অলৌকিক চোখ নিয়ে দদােন্ত অবাধ্য বালকের মতন সে ঘারিয়ে ফিরিয়ে দেখে চারদিক, সে আরও কিছ চায়। জীবন যেখানে থেমে আছে, তা ছাড়াও আরও কিছ। কি সেটা ? যশ, অর্থ, ভোগ বা ভালবাসাও শেষ কথা নয়।

যৌবন পেরিয়ে গেলে কোনো এক বাদামী সন্ধেবেলা মানষের মনে হয়, এই জীবন অন্যরকম হবার কথা ছিল। কৈশোরের য়ে মহিমা-উত্তজবল জীবনের ছবি ভেসে উঠতো চােখে, কোথায় গেল সেই মহিমা ? মেঘলা আকাশের জ্যোৎস্নার মতন চতুদিকে ছড়িয়ে থাকে সাবপেইেনর শব। মনে হয়, যদি আর একবার নতুন করে জীবনটাকে শর করা যেত—শৈশব থেকে আবার ফিরে আসা ! রাষ্ট্ৰপতিকেও দীঘর্শবাস ফেলতে হয়। কোটিপতিও শেবতশত্র বাথটাবের ঠান্ডা-গরম জলে শরীর ডুবিয়ে আরাম করতে করতে হঠাৎ ক্ষর দিয়ে হাতের শিরা কেটে ফেলে। কেননা আমরা তো প্রায়ই ভুলে যাই, ণে আমরা কুকুর অথবা পিপড়ে হয়ে জন্মাইনি!! আমরা মানষ, এই উত্তরাধিকারের

al-S S

একা এবং কয়েকজন

দায়িত্ব কি বিরাট! একটি সিংহ আর একটি সিংহকে কখনো হত্যা করে না, পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করার সময় নোখ গাঁটিয়ে রাখে। মানৱষই শািন্ধ তার ভাই, বন্ধ, পরিজন ও প্রতিবেশীকে খােন করার জন্য আবিস্কার করেছে কতরকম অস্ত্র। জন্মসাত্রে বে। সে একা, এই কথা সম্পপণ্য বিস্মত হয়ে সে বারবার গোষ্ঠীবদ্ধ হতে গিয়ে গোষ্ঠীকে 石T码1

কখনো কখনো যেন একটা বিশাল কঠিন, বন্ধ দরজার গায়ে দম দম করে আঘাত করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, বলো, বলো, কার নাম সাৰ্থকতা ! বলে দাও! ইতিহাসের কোনো কোনো শতাব্দীতে এক আধজন ধর্মগর, সেই দরজা একটি ফাঁক করে বলতে চেয়েছেন, শোনো, আমি বলছি। এই পথ অনসরণ করলে মনয্যেজন্ম তার সম্পপণ্যতা পাবে। আমার কাছে এসো, আমি পথ দেখাচ্ছি… । কিন্তু সব কথা শোনা যায় নি, সব প্রশ্ৰেনর উত্তর পাওয়া যায়নি, তার আগেই ধােপ ধানোর ধোঁয়া আর চাটকারিতার হট্টগোলে সব ঢেকে গেছে। দ’এক শতাব্দীতেই কেটে যায় ঘোর। তারপরও হাজার হাজার অতৃপ্ত মানষ ধাক্কা মেরে সেই দরজা ভেঙে ফেলতে চায়।

হয়তো এই সার্থকতার সন্ধানও সবার মধ্যে জাগে না। সারা জীবনে। কেননা, এই পথিবীতে অনেক নেশা আছে। বাদাড়ের ডানায় একবার হাত দিলে সেই তেলতেলে কালো রং সহজে উঠতে চায় না, গন্ধও জড়িয়ে থাকে। অনেকের হাত একবার মপোর টাকা ছলে রপোর দাগ লেগে যায়-তারপর সারাজীবন দাঁহাতে রূপো ছানাছানি করতে ভালোবাসে। সেই রকমই, নারী। কেউ চায় অন্যের ওপর প্রভুত্ব করতে কিংবা অন্যদের নিজের মতে চালাতে। এই নেশাটাই সবচেয়ে তীব্র। একটা দেশ বা একটা শহর বা একটা দল বা একটা অফিস বা নিছক নিজের পাড়ার পান্ডা হবার জন্য কি আকুলি বিকুলি চেন্টা। যে-পথিবীতে সে সত্তর বা আশী, বড়জোর একশো বছরের বেশি থাকবে না—সেই পথিবীকেও সে বদলাবার জন্য প্রাণপাত করে। এই শরীর বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছল শেষ—এই কঠোর সত্যটা জেনেও কত মানষি অতীন্দ্ৰিয় তত্ত্বের কথা ছড়িয়ে যায়।

অনেকেই অবশ্য মায়ার ঘোরে জগৎটা খাব ছোট করে আনে, নিজের সন্ত্রী পত্র কন্যা। আত্মীয়দের নিয়ে ছোট্ট সংসারের বাইরে আর কিছ দেখতে চায় না-এদের খশী বা সখী করার জন্য সারাজীবন ভূতের ব্যাগার দিয়ে যায়। একই মানষি দ্বিতীয় পক্ষে বিবাহ করে ছেলেকে আদর করে সম্পপণ্য স্নেহে, বাড়ি থেকে বেরবার আগে ভক্তিভরে প্রণাম করে শ্ৰীরামকৃষ্ণের ছবির সামনে এবং অফিসে গিয়ে ঘষে নেয়-এও তো নেশার ঘোের। এমন নেশাগ্ৰস্ত মানষে অনেক দেখেছি।

যাই হোক, আমি আমার ছেলেবেলা থেকেই একজন মানষকে জানি, যিনি জীবন সম্পকে নানা ধরণের প্রশন ও সংশয়ে কম্পট পেতেন। তিনি আমার পিসেমশাই ৷ তখন অবশ্য সব বঝিনি। সেই লক্ষবা চওড়া, সপরিষ, সদাহাস্যময় মানষটি মাঝে মাঝে দারণ বিষন্ন হয়ে যেতেন। তিন চারদিন ধরে কােরর সঙ্গে কথা বলতেন না, তিন তলার ঘরে একা শহয়ে থাকতেন। বাড়ির কেউ বিরক্ত করতে সাহস করতো না। ওঁকে। শধ্যে আমার জ্যাঠামশাই খড়ম ঠকঠকিয়ে ওপরে উঠে। জিজ্ঞেস করতেন, কি হে অমরনাথ, কি হলো আবার তোমার ? চলো, শিশিরবাব আবার ষোড়শী বই নামিয়েছেন, १ाथ उठान।

জ্যাঠামশাইকে দেখে পিসেমশাই উঠে বসতেন। ফ্যাকাশে ভাবে হেসে বলতেন, জানো পি আর, ইচ্ছে করে আবার সবকিছ ছেড়ে ছাড়ে বেরিয়ে পড়ি !

R

62 63 कदeन

জ্যাঠামশাই উত্তর দিতেন, এখন বয়েস হয়েছে, এখন আর ওসব পাগলামি কয়ো না। শরীরে সইবে না।

BDB DDD DDDD DLDDLBDB BB DBDBDB BDB DBB DB DB BBBBD S তখন পিসেমশাইয়ের বয়েস ষাটের কাছাকাছি। আমার জ্যাঠামশাই ও ওঁর থেকে পাঁচ ছ’ বছরের ছোট।

আমার পিসেমশাইকে আমরা সবাই ডাকতাম বড়বাব। আমার বাবা-কাকারাও তাই বলতেন। ছেলেবেলায় এ ডাকটা আমরা সবাভাবিক হিসেবেই গ্রহণ করেছিলাম, কারণ জানতাম না। পরে জেনেছি। পিসেমশাই-এর আসল নাম অমরনাথ ভাদুড়ী কিন্তু ওঁর চেহারার সঙ্গে শিশিরকুমার ভাদড়ীর খােব মিল ছিল। যদিও শিশিরভাদােড়ীর পরিবারের সঙ্গে পিসেমশাইদের কোনোরকম আত্মীয়তা ছিল না। তখন রূপগমিন্যে শিশির ভাদড়ীর দেশজোড়া নাম। তাঁর ডাকনাম অনসারেই পিসেমশাইকে বাড়ির সবাই বড়বাব বলতো। অবশ্য ওঁর আসল নাম অমরনাথেরও একটা ইতিহাস VI

আমার যখন ছ’সাত বছর বয়েস, তখন একদিন বিকেলবেলা পিসেমশাই আমাকে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন এক জায়গায়। সেদিন আমার একটা অদভুত অভিজ্ঞতা इGछिा ।

আমরা কলকাতায় পিসেমশাইয়ের বাড়িতেই থাকতাম। পিসেমশাই সেই সময় গোয়ালিয়র থেকে ব্যবসা গটিয়ে কলকাতার বিবেকানন্ন রোডে একটা বাড়ি কিনেছেন। বিকেকানন্ন রোড তখন প্রায় নতুন রাস্তা, পাড়াটার ইউজৎ ছিল। তিনতলা বাড়ি, অনেকগলি ঘর। তখন বসতবাড়ি ভাড়া দেবার বিশেষ রেওয়াজ ছিল না-আমরা গ্রাম থেকে এসে পিসেমশাইয়ের বাড়িতেই উঠ,তাম, বিসদশ কিছ দেখাতো না তাতে । আমার জ্যাঠামশাই বয়েসে ছোট হলেও তাঁর ভগনীপতির সঙ্গে কথা বলতেন ভারিাক্কী ঢালে। পারিবারিক সম্পকের মাল্য তখন ছিল সামাজিক, প্রতিষ্ঠার চেয়েও একটা

ली।

আমার পিসেমশাই বিধবা বিবাহ করেছিলেন। অর্থাৎ, আমার পণিমা পিসীমা বিধবা হয়েছিলেন এগারো বছর বয়েসে। সতরো বছর বয়েসে অমরনাথ ভাদড়ীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তখন আমার পিসিমা গভবতী। এর এক বছর আগেই অমরনাথ ভাদড়ী আমার ঠাকুদার কাছে পণিমা পিসীমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব জানান। আমার ঠাকুদা ঐ অমরনাথ ভাদড়ী নামক উদ্ধত ছোকরাকে রূপো বাঁধানো লাঠি দিয়ে মেরেছিলেন। কেননা বিদ্যাসাগর মশাইয়ের বিধবা বিবাহের তত্ত্বটি অনেকেই কাগজ-কলমে সমর্থন করলেও নিজ পরিবারে চালাতে দেন নি। তারপর পাৰ্ণিমা পিসীমার ঐ অবস্থাটা জানার পর আমার ঠাকুদা দেয়ালে কপাল ঠকে ঠমকে রক্ত বার করে ফেলেছিলেন। হায় হায় করেছিলেন অন্তত এক হাজার বার। কারণ, তখনকার দিনে ভদ্রঘরের বিধবারা যাতে দশচরিত্রা না হয়ে যায়। সেজন্য নিরাপদ ব্যবস্থা ছিল তাদের কাশী পাঠিয়ে দিয়ে দশ পনরো টাকা করে মাসোহারা পাঠানো। তারপর সেখানে তারা বাঁচুক, মরকে বা চরিত্র নস্ট করােক সে খবর এত দরে এসে পৌছবে না। আমার ঠাকুদা নেহাত কন্যার প্রতি মায়াবশতঃ এ ব্যবস্থা না নিয়ে ঐ ভুলটি করেছিলেন।

পাব বাংলার ছোট শহরে ঐ ঘটনায় কি রকম হৈ-হাল্লা হয়েছিল তা বোঝাই যায়। তাছাড়া অমরনাথ ভাদড়ী ছিলেন অজ্ঞাতকুলশীল। তখনকার দিনে একটা চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। জমিদার বাড়িতে বা অনেক অবস্থাপন্ন বাড়িতেই পাঁচ-দশটি দঃস্থ

একা এবং কয়েকজন

ছেলেকে থাকতে খেতে দিয়ে পড়াশনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো। আমাদের পাড়াতেই রায়চৌধরিী বাড়িতে ঐ রকম দটি ছেলে থাকতো, অমরনাথ ভাদড়ী তাদের মধ্যে একজন, তিনি তখন কলেজের ছাত্র। গ্রীষ্মের ছটিতে বিরাট বিরাট শান্য দপাির, রায় চৌধরিীদের বাড়িতে কত ফাঁকা জায়গা, কত বড় বাগান! পণিমা পিসীমা ঐ বাগানে জামরাল কিংবা কামরাঙা ফল পাড়তে যেতেন।

যাই হোক, অমরনাথ ভাদড়ীর সঙ্গে পণিমা পিসীমার নমো নমো করে বিয়ে দিয়ে রাতারাতি তাদের দেশছাড়া করে দেওয়া হলো। কলকাতাতেও না, কারণ সেখানেও অনেক চেন্নাশনা লোক আছে, ওঁরা গিয়ে ঘর বাঁধলেন। পাটনায়। তারপর ওদের ভুলে গেল সবাই। পণিমা পিসীমা মাঝে মাঝে চিঠি লিখতেন, কেউ কোনোদিন তাঁকে বাপের বাড়ি আনার কথা বলেনি। এমন কি, পণিমা পিসীমার দ’ বছরের মেয়েটি যখন সমল পক্স-এ মারা গেল, তখনও কেউ দেখতে যায়নি। আমাদের वाg tथक।

উদার হয়ে উঠলেন। ততদিন পিসেমশাইরা পাটনা থেকে এলাহাবাদে চলে গিয়ে ব্যবসা করে বেশ বড়লোক হয়েছেন। আমার বাবা দিল্লিতে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ফেরার সময় এলাহাবাদে পণিমা পিসীমাদের বাড়িতে থেকে এলেন। কয়েকদিন পর ফিরে এসে গলেপির আর শেষ হয় না। পিসেমশাইদের এলাহাবাদের বাড়িতে তিনজন ঝি-চাকর, একজন দরোয়ান, বাগানের জন্য একজন মালি—এবং সবচেয়ে বড় কথা, একজন জমাদার রোজ সকালে এসে বাথরম পরিস্কার করে যায়। দোতলার বাথরুমে জমাদারের আসা-যাওয়ার জন্য বাড়ির পেছনে আলাদা লোহার ঘোরানো সিড়ি। পাড়াগাঁর মানষের চোখে এসব অত্যাশচষ্য ঘটনা।

তার পরের বছর পজোর সময় পণিমা পিসীমারা বেড়াতে এলেন আমাদের দেশের বাড়িতে। গাঠাঁর বাঁধা বাঁধা সব ধতি-শাড়ি কম্বল এনেছিলেন গাঁয়ের মানষের মধ্যে বেলাবার জন্য। বাড়ির প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা উপহার। পণিমা পিসীমা আমার মাকে দিয়েছিলেন জারমান সিলভারে বাঁধানো বড় আয়না। পিসেমশাই-এর সন্দর চেহারা। অঙ্গে পরোপরি সাহেবী পোশাক—তব্য তিনি তাঁর ছেলেবেলারপরিচিত মানষজনের বাড়িতে গিয়ে দাওয়ায় বসে হাকোয় তামাক খেতেন—এইজন্য তাঁর খাতিরের সীমা ছিল না। একদিন এই জায়গা থেকে তিনি অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হয়েছিলেন-আজ সেখানেই ফিরে এসেছেন প্রবল প্ৰতাপে। সব মানষেই বোধহয় এরকম ভাবে ফিরে আসতে চায়। কাউণ্ট অফ মন্টােক্রিসেন্টা গলেপর মতন। পণিমা পিসীমার বয়েসী বিধবা কিংবা সবামী না-নেওয়া অবজ্ঞাত বউ আমাদের সেই ছোট শহরে তখন অনেক ছিল।

একবারও শবশরিবাড়িতে যায়নি। কিংবা সারা জীবনে তিন চার বারের বেশি। স্বামীকে চোখে দেখে নি—ব্রাহ্মণ পরিবারের এমন মেয়েমানষের সংখ্যা তখন অজস্র। তিন চার বছরের মেয়েকে থালার ওপর বসিয়ে বদ্ধ জরদািগবের সঙ্গে সাত পাক ফেরানো কিংবা রক্ত-মাংসের সবামীর অভাবে কলাগাছের সঙ্গে সোমখ মেয়েদের বিয়ে দেওয়াও বেশী দিনের ঘটনা নয়। সেই রকম কোনো বিয়ের অনষ্ঠান আমি চোখে দেখিনি বটে, তবে সেই সব বন্ধাদের আমি দেখেছি। কচি বয়েসের বিধবাকে সেই সময় চলতি কথায় বলা হতো, কড়ে রাঢ়ী।। তারা পণিমা পিসীমার সৌভাগ্য দেখে দীঘর্শবাস ফেলতো। পণিমা পিসীমারও তো ঐ রকম অবস্থাই হওয়ার কথা ছিল।

8

এক এবং কয়েকজন

এখনও সবাই গলপ করে যে পণিমা পিসীমার স্বভাব খর্ব নরম, কােরর সঙ্গে উচু পলায় কথা বলতেন না। কিন্তু প্রতিবেশিনী কড়ে রাঢ়ীরা পণিমা পিসীমা সম্পকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ঐ জাত-খোয়ানো মাগীর দেমাকে যেন মাটিতে পা পড়ে না! আ৩ সখি কপালে সইলে হয়! :

সত্যিই সহ্য হয়নি। সেবার এলাহাবাদে ফিরে যাবার পর কিছদিন বাদেই পাৰ্ণিমা পিসীমার চিঠিতে অন্য সরে দেখা দিতে লাগলো। প্রায়ই পিসেমশাই সম্পকে নানারকম অভিযোগ। পিসেমশাইয়ের ব্যবসায়ে মন নেই, হঠাৎ হঠাৎ কোথায় চলে যান। তিন চারদিনের জন্য, বাড়িতে কিছু বলা কওয়া নেই। সাধা-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে খােব মেশেন, মানষটা বঝি এবার সন্ন্যাসীই হয়ে যাবেন! এক বছর বাদে আবার অন্যরকম অভিযোগ, এবার আরও গরতর। পিসেমশাই একটি মসলমান মেয়ের প্রেমে পড়ে। পাগল হয়েছেন। জ্যাঠামশাই এলাহাবাদ ছটে গেলেন তাঁর বোনেক বাঁচাতে। ফিরে এসে দীঘ শবাস ফেলে বললেন, পণিমার কপালে দঃখ আছে। অমরনাথকে ফেরানো যাবে না—সে বড় আত্মম্পভরী মানষ, অন্য কারার কথা শোনে না। তা ছাড়া, সেই মসলমান মেয়েটির মতন সন্দর নারী এ দানিয়ায় দলভ, তাকে দেখলে মাথা ঠিক রাখা অনেক পরিষের পক্ষেই শক্ত। পাঁচখানা মোহর দিয়ে তার নােচ দেখতে হয়। নিরালায়। অমরনাথ এবার সব স্বাস্ত হবে।

আমার ঠাকুমা তখনও বেচে, তিনি ঝাঁঝের সঙ্গে বলেছিলেন, পণিমাকে তুই নিয়ে চলে এলি না কেন ? ও জামাইয়ের সঙ্গে আমরা আর কোনো সম্পপক রাখতে চাই না। আগেই জানতাম

জ্যাঠামশাই বলেছিলেন, পণিমা আসতে চেয়েছিল। আমি ইচ্ছে করে আনি নি। পণিমা একবার চলে এলে বিষয়-সম্পত্তির আর কিছই কি ও পাবে? সব জলাঞ্জলি যাবে। তব ও যেটকু সামলে রাখতে পারে

এরপর দ’ চার বছরের ইতিহাস একটি অস্পষ্ট। পিসেমশাই এলাহাবাদের বাড়ি বিক্রি করে চলে গেলেন গোয়ালিয়র-পণিমা পিসীমাও সঙ্গে গিয়েছিলেন এবং নতকীটিও। পণিমা পিসীমার একটি মেয়ে হয়ে মারা গিয়েছিল, আর কোনো ছেলেপালে হয়নি। সেই নতকীর একটি ছেলে হয়, তার নাম সন্য। এই ছেলেটি তার তিন বছর বয়েস থেকে পণিমা পিসিমার কাছেই বেশী থাকতো। পণিমা পিসীমা তখন তাঁর আইন বহির্ভূত সতীনের সঙ্গে মোটামটি মানিয়ে নিয়েছিলেন। সতীন থাকা তো তখনকার দিনে খাব অস্বাভাবিক ছিল না। আমার ঠাকুদাই তিনটি বিয়ে করেছিলেন। س

এলাহাবাদের সেই নতকীর নাম ছিল বলবল। পোশাকী নাম নাসিম-আরা বান। এলাহাবাদ থেকে গোয়ালিয়রে আসবার পর তাঁর ভক্তসংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এই নিয়ে পিসেমশাইয়ের সঙ্গে মন কষাকষি দেখা দেয়। তাঁর ছেলে সহযোির বয়েস যখন পাঁচ বছর, তখন বলবোেল হঠাৎ আত্মহত্যা করেন বিষ খেয়ে। বলবল সেই সময় গোয়ালিয়র রাজবাড়িতে মােজরো পেতে শার করেছিলেন-অনায়াসেই

আত্মহত্যা করার কোনো মানেই হয় না। সন্য সেই থেকে পরোপরি পণিমা পিসীমারই ছেলে হয়ে গেল।

পণিমা পিসীমার শেষ জীবনটা মোটামটি সদখেই কেটেছিল। স্বামীকে আবার সম্পর্ণেভাবে ফিরে পেয়েছিলেন এবং শেষবার অসখের সময় পেয়েছিলেন

gा ५gय९ दीदछन्म

সামীর হাতের সেবা। বাবা আর মা গিয়েছিলেন সেবার, ফিরে এসে বললেন, পর্যন্য মানষে যে ওভাবে সেবা করতে পারে, তা চোখে না দেখলে বিশ্ববাস করা যায় না। অমরনাথের মনটা ভীষণ নরম- w

পণিমা পিসীমার মাতুর পর সম্ষকে বোডিং স্কুলে পাঠিয়ে পিসেমশাই দৰাবছরের জন্য নির্যান্দেশ হয়ে যান। কেউ আর তাঁর কোনো পাত্তা পায় নি। ওঁর গোয়ালিয়রের বিষয় সম্পত্তি এবং ব্যবসা অরক্ষিত অবস্থায় নন্ট হয়ে যেতে থাকে। তারপর হঠাৎ একদিন এক মািখ চুল দাড়ি নিয়ে এসে উদয় হলেন। সব কিছু বিক্লি করে দিয়ে কলকাতায় এই বাড়ি কিনলেন।

এসবই আমার জন্মের আগেকার কথা। পণিমা পিসীমাকে আমি চোখেও দেখিনি কখনো।

একেবারে বাল্যকালের সমিতি মাঝে মাঝে দ’এক ঝলক মনে পড়ে, কিন্তু তার সত্যতা যাচাই করা যায় না। যে-পদ্মকুর পাড়ে তিন বছর বয়েসে খেলা করেছি মনে হয়, আসলে সে পােবুকুরটা ঠিক সেই রকম দেখতে নয়। একটা শিউলি গাছের তলায় ফলে কুড়োতে যেতাম, প্রত্যেকটি শিউলি ফলেই কি শিশির-মাখা থাকতো ? সন্মতি কেন সেই ছবি দেখায়? দৰগাপজোর এক মাস আগে কালো রঙের নিখত পঠিা কিনে রাখা হতো বলিদানের জন্য। বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা ঘাস পাতা খাইয়ে মোটা করতো সেই পঠিাগলোকে। পাঁঠাকে ” খাওয়াবার জন্য ধান ক্ষেত থেকে ধানের ডগা ছিড়িতে গেছি, ধারালো ধান পাতায় আমার আঙলি কেটে গেল, ঝরঝর করে রক্ত পড়তে লাগলো। শৈশবের শােধ এই দশ্যটাই বা আমার মনে গোথে আছে কেন ? আঙলে দাগ পযন্ত নেই।

এমন অনেক জায়গার সমিতির ছবি হািবহ দেখতে পাই, আসলে যে-সব জায়গায় আমি কখনো যাইনি। যেমন, মানষের জন্মদিনটির কথা তো মনে রাখা অসম্ভব, তব, যেন মনে হয়, আমার মনে আছে। ভীষণ বন্টির দিনে জন্মেছিলাম বলে আমার নাম রাখা হয় বাদল। নাসিং হোমে জন্মাইনি, মামা বাড়িতে, পাড়াগাঁর আতুড়ঘরে। উঠোনের মধ্যে সাময়িক ভাবে বানানো। তিনদিন ধরে অশ্রান্ত বান্টি-সেই সময় জন্ম গ্ৰহণ করে আমি বাড়ির সবাইকে খাব বিপদে ফেলেছিলাম। একজন প্রৌঢ়া ধাই-এর কৃতিত্বেই বেচে গেছি কোনোক্রমে। মা-মাসীদের কাছে পরে এতবার শানেছি সেই গল্প যে, সন্মতিতে যেন হািবহ দেখতে পাই সেই দশ্য অঝোর বর্ষার মধ্যে একটি সদ্যোজাত শিশর পায়ের পাতায় টােকা মারা হচ্ছে আর সে ট্যাঁ ট্যা করে কাঁদছে।

পাঁচ কি ছ’ বছর বয়েস থেকে পিসেমশাইয়ের কথা আমার মোটামটি পদ্ট মনে আছে। একদিন ওঁর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে একটা অদ্ভূত অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

যে-সময়কার কথা বলছি তখনও দ্বিতীয় মহাষন্ধে লাগে নি। তার দ্য এক বছর অ্যাগের কথা। তখন চাল কিনতে হতো মদির দোকানো, অনেক রকমের চাল সাজানো থাকতো, তিন টাকা মণের খবা সর চালের অডার দিলে মদির দোকানের লোকই বাড়ি পৌছে দিত। সেলনি চুল কাটতে গেলে চুল-কাটার ডিজাইন পছন্দ করার জন্য বাঁধানো ছবি থাকতো সাহেবদের। অনেক সাহেবও তখন সিথি কেটে পাশে চুল অাঁচড়াতো। শিয়ালদা ও হাওড়া সেন্টশনের কাছে লাইন বোধে দাঁড়িয়ে থাকতো ঘোড়ার গাড়ি। যে চটের থলিকে এখন র্যাশন ব্যাগ বলে—সে জিনিসের প্রচলন ছিল না। পরিবার পরিকল্পনা বা জন্ম-নিয়ন্ত্রণের কথা কেউ শোনে নি। মিনেিটর দোকানে এক টাকার মিলিট কেনা হলে এক আনা পয়সা ফেরতন দিত। এক পয়সা ও আধলার

একা এবং কয়েকজন

প্রচলন ছিল। ধতির সঙ্গে শ-মোজা পরা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। কলকাতায় অনেক রাস্তাতেই গ্যাসের আলো জলতো। গান্ধীজী, সভাষ বোস, ফজলল হকেরও প্রচুর নিন্দক ছিল। গলিতে গলিতে ক্রিকেটের বদলে ড্যাংগলি বা চু-কিতােকতের খেলা চলতো। ইস্কুলে ভাতি হবার আগে যেতে হতো পাঠশালায়। নাপিতকে বলা

ठा *द्वाभानिक।

কলকাতায় তখন বাঙািল্লরা ছিল প্রকৃতপক্ষেই সংখ্যালঘ। নাটক নভেলে হাস্যকর চরিত্র উপস্থাপিত করার জন্য অবধারিত ভাবে ব্যবহার করা হতো বাঙাল ভাষা, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে যারা শৱ। বাঙালিরা কলকাতায় এসে অতি দ্রুত কলকাত্তাই ভাষা শিখে নেবার চেষ্টা করে জগা-খিচুড়ি পাকিরে ফেলতো। বাঙালিদের মখে অতি মিহি গলায় কলকাতার ভাষা বলতে শািনলেই হাসি পেত।

বাঙািলদের সম্পকে তখন চিত্তাকর্ষক কয়েকটি ছড়াও প্রচলিত ছিল, সেগলির রচয়িতার নাম জানা যায় না। পথে-ঘাটে প্রায়ই ছোটদের মখে শোনা যেতঃ

বাঙালি মনয্যে নয় অদ্ভুত জন্তু

লম্বফ দিয়ে গাছে ওঠে। व्जाऊ नाझे क्लूि!

আসলে “অদ্ভুত” কথাটার বদলে অন্য কিছ ছিল, সেটা এক ঢিলে দিব পাখি মারার ব্যাপার। সে শব্দটা এখন ব্যবহার না করাই ভালো। ছড়াটির মধ্যে কিন্তু বেশ কল্পনাশক্তির পরিচয় আছে। আরও শোনা যেতঃ

द७ळ फ़िशए भाcछद्ध का७ान ! এটার ঠিক মানে বোঝা যায় না। কেননা বাঙালিদের সঙ্গে ইলিশ মাছই বেশী জড়িত। চিংড়ি মাছও বাঙলাদেশে কম পাওয়া যায় না। সতরাং তারা বেছে বেছে চিংড়িমাছের কাঙাল হবে কেন কে জানে। ]

বাঙালিদের বোধহয় ছড়া বানাবার ক্ষমতা কম কিংবা সংখ্যালঘ বলে ভয় পেত। ধারণ বাঙালিরা কোনো ছড়া বানিয়ে কলকাতার লোকদের যোগ্য উত্তর দিতে পারে। নি। কলকাতার লোকদের কোনো দিবোধ্য কারণে তারা ঘটি আখ্যা দিয়েছিল, এবং বড়জোর কখনো চোচিয়ে বলতো, ঘটি, ফটো ঘটি!

বাঙালিদের সম্পকে আর একটি ছড়া নিশ্চয়ই কোনো ঘটনা উপলক্ষে রচিত। কিন্তু এটিও বেশ জনপ্রিয় ছিলঃ

२४ळ রস খাইলো उाँg डा७रना পয়সা দি-লো-না ! শেষের দিলো নাটা খাব টেনে টেনে বলেই ছটে ছটে যাওয়া নিয়ম ছিল। কারণ, এটাতেই বেশী রেগে যেত বাঙালিরা। বাঙালিরা সাধারণতঃ গোঁয়ার এবং তাদের হাতের টিপ অব্যৰ্থ, তারা ইট ছাড়ে মারতে যায়।

সব পাড়ার মধ্যেই একটি যাড়ি বাঙালিদের বাড়ি’ বলে পরিচিত হতো তখন। সে বাড়ির ছেলে বাঙািলদের ছেলে, সে বাড়ির বোঁ বাঙািল বাড়ির বোঁ। বাঙািল ও ঘটিদের

মধ্যে পারস্পরিক বিয়ে প্রায় নিষিদ্ধই ছিল বলা যায়। কলকাতায় আমি এই রকমই একটা বাঙাল বাড়িতে থাকতাম।

একদিন বিকেলবেলা পিসেমশাই আমাকে বললেন, বাদলা, তোর মা-কে গিয়ে বল, তোকে ভালো জামা-প্যাস্ট পরিয়ে দিতে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, বড়বাব, আমি কোথায় যাবো ? পিসোেমশাই বললেন, চল, তোকে এক জায়গা থেকে বেড়িয়ে নিয়ে আসি ! তাই শনে বাড়ির অন্যান্য বাচ্চারা আমিও যাবো, আমিও যাবো বলে চ্যাঁচামেচি শর করে দিল। বড়বাব বললেন, না, আর কেউ না! শািন্ধ ও একলা যাবে।

বড়বাব সাধারণতঃ বাড়ির ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেড়াতে যেতেন না। আমাদের বাড়িতে বাচ্চাও তখন ছ’ সাতজন। বড়বাব হঠাৎ সেদিন আমাকে কেন বেছে নিয়েছিলেন জানি না। ভাগ্যিস নিয়েছিলেন!

 

One thought on “০১. মাঝে মাঝে মনে হয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *