চেতন মিস্তিরির গল্প

চেতন মিস্তিরির গল্প

চেতন মিস্তিরির বাড়ি ছিল সিউরির অদূরে লাখেরাজপুর গ্রামে। মাটির দেওয়াল ঘেরা বাড়ি, ভেতরে দু-খানি ঘর ও একটি রান্নাঘর। একটা গোয়ালঘরও ছিল এক কালে, একবার ঝড়ে তার চালা উড়ে যায়, নতুন করে আর ছাউনি দেওয়া হয়নি, কারণ গোয়ালে আর গরু নেই।

চেতন মিস্তিরির বুড়ি মা এখনও বেঁচে আছে, চোখে দেখতে পায় না। কানে শুনতে পায় না। সংসারে একটা বোঝা ছাড়া সে আর কিছুই না। চেতনেরই বয়েস হল ষাটের কাছাকাছি। চেতনের বউ মারা গেছে অনেককাল আগে। চেতনের ছেলে মাত্র একটি। চেতনও ছিল তার বাবার একটি ছেলে।

চেতন মিস্তিরির কাঠের কাজের জন্য এককালে বেশ নামডাক ছিল। শুধু দরজা-জানলা বানানোই না, শৌখিন খাট-আলমারি বানাতেও তার দক্ষতা ছিল খুব। কিন্তু গত দু-বছর ধরে তার হাতে পায়ে বাত। যাঁদা চালাতে-চালাতে হঠাৎ হাতে খিচ ধরে যায়, তখন যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে।

যন্ত্রপাতি সামনে নিয়ে বাড়ির সামনের মাটির দাওয়ায় বসে থাকে চেতন মিস্তিরি। সে নিজে আর কোথাও কাজ খুঁজতে যায় না, বড় অভিমানী মানুষ সে, কোথাও কাজ চাইতে গিয়ে যদি প্রত্যাখ্যাত হয় তার বুকে লাগবে। প্রতীক্ষা করে থাকে যদি নিজে থেকে কেউ এসে ডাকে। একসময় এরকম আসত, অনেক সাধ্য-সাধনাও করত। এখন আর প্রায় কেউই আসে না, দৈবাৎ কেউ হয়তো ভাঙা জানলা সারাতে বা কাটারির হাতল বানাতে ডাকে—এসব কুঁচোকাচা কাজে আর মন ওঠে না। এই সময়েই কিনা মনে হয়, দুনিয়াটা বড় সুন্দর জায়গা। মাঠের ওধারে শ্রেণিবদ্ধ তালগাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, এমন জীবন্ত কাঠের কাজ কে গড়েছে!

যন্ত্রপাতি রেখে চেতন মিস্তিরি গুটিগুটি হাঁটতে শুরু করে। হরঠাকুরের কাছে অনেক দিনের কটা টাকা পাওনা আছে, টাকাগুলো পেলে সে একবার কালীঘাটে তীর্থ করে আসবে। সংসারের অভাব তো কোনওদিন মেটাবার নয়।

রেল লাইনের ধারে অনেকগুলি কামিন কাজ করছিল, হঠাৎ তারা হইহই করে উঠল। কে একজন রেলে কাটা পড়েছে। এসময় তো ট্রেন আসার কথা নয়, উটকো একটা ইঞ্জিন এসে পড়েছিল। কাছে গিয়ে দেখা গেল, কুলিদের কেউ নয়, বুড়ো মতন একজন লোক।

কুলিদের মধ্যে ছিল চেতন মিস্তিরির ছেলে বংশী, সে ছুটতে ছুটতে এসে উঁকি দিয়েই চিৎকার করে উঠল। তার বাবাকে সে দেখছে, রক্তাক্ত, ছিন্নভিন্ন। সবাই ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চায়।

চেতন মিস্তিরর তখনও একটু-একটু জ্ঞান ছিল। সে বলল, আমাকে বাড়িতে নিয়ে চলো, ও বংশী আমাকে নিয়ে চল।

সবাই ওকে বাড়িতেই নিয়ে গেল। বংশীর চেহারা অসুরের মতন, কিন্তু তার শরীরে এখন একটুও শক্তি নেই। সে তার বাবাকে ধরতে পারল না। চেতন মিস্তিরির ডান হাতটা লগবগ করে ঝুলছে। ওই হাতে সে একসময় কত কারুকার্য বানাত!

বাড়ির সদর দরজায় পৌঁছনো মাত্র মারা গেল চেতন মিস্তিরি। তারপর কান্নাকাটি। চেতনের মা কানে শোনে না, চোখে দেখে না। সে শুধু অনেক লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে বলল, ও চেতন, কী হয়েছে রে! এত লোকজন কেন? ও চেতন!

কেউ কিছু তাকে বোঝাতে পারল না। বুড়ি জানল না তার ছেলে মারা গেছে।

দু-চারদিন পর সবাই ভুলে গেল চেতন মিস্তিরির কথা। বংশীর বউ লক্ষ্মীর একটিমাত্র ছেলে, সে ছেলে-শাশুড়িকে নিয়ে ঘর সংসার করে আর বংশী গেল চালকলে কাজ করতে। রেল লাইনের কন্ট্রাক্টররা তাকে ছাঁটাই করে দিয়েছে।

কিন্তু চেতন মিস্তিরির বংশে যেন একটা অভিশাপ লেগেছে। কথা নেই বার্তা নেই বংশীর তিন বছরের ছেলেটা কদিন আগে কলেরায় মারা গেল। বংশী থাকে অনেক দূরে, সপ্তাহে একবার বাড়ি আসে, মহা বিপদে পড়ে গেল বউটি, হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগল। প্রতিবেশীরা এল সহানুভূতি জানাতে, একজন গেল বংশীকে খবর দিতে।

সেদিনও চেতনের বুড়ি মা চেঁচাতে লাগল, ও চেতন, কী হয়েছে রে! ও চেতন, বাড়িতে এত লোক কেন, নেমন্তন্ন খাওয়াচ্ছিস নাকি? চেতনের মা জানল না, তার পুতি মারা গেছে।

বংশী এসে একেবারে উঠোনে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগল। বাবার মৃত্যুতে সে কাঁদেনি, ছেলের মৃত্যুতে সে না কেঁদে পারে না। কদিন বাড়িতে বসে-বসে গুমরে মরল স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু অন্ন সংস্থান করতে হবে তো, বংশী আবার চলে গেল চালকলে কাজ করতে।

চালকলের চাল শহর-বাজারে চলে যায়, যারা ওখানে কাজ করে তাদের কোনওদিন পেট ভরে না। বংশীর চেহারা অসুরের মতন। এক কিলো চালের ভাত একা পেলে তার ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়। কিন্তু অতখানি সে পাচ্ছে কোথায়? সেইজন্য সব সময়েই তার পেটে খিদে থাকে আর তাই রাগ থেকে যায়। বংশী লোকজনের সঙ্গে দাঁত মুখ খিচিয়ে কথা বলে। লোকে তাকে বলে পাগল বংশী।

কী একটা তুচ্ছ কারণে একদিন চালকলে ধর্মঘট হয়ে গেল। তারপরই লক আউট। সবারই চাকরি যাওয়ার অবস্থা! আধপেটা খাওয়া জুটবে না দেখে অসম্ভব রেগে গেল বংশী। সে। লোকজন ডেকে হাঙ্গামা বাড়াবার চেষ্টা করল। মস্ত বড় একটা লোহার রড নিয়ে বংশী দমাদম মারতে লাগল চালকলের গেটের তালায়। সে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকবে। কিন্তু দেশে কি আইন শৃঙ্খলা নেই নাকি! অবিলম্বে এসে গেল পুলিশ। দারোগা চোখ রাঙিয়ে বলল, এই হঠো, হঠো…

ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে বংশী বলল, না, যাব না। ওরে তোরা সবাই আয় রে…

একটা বিরাট শোক মিছিল এসে থামল চেতন মিস্তিরির বাড়ির সামনে। খাঁটিয়ায় চাপানো গুলিতে ঝাঁঝরা বংশীর দেহটা, তারা বয়ে এনেছে তার স্ত্রীকে দেখাতে। দেখবে কে? খবর শুনেই তো লক্ষ্মী অজ্ঞান। আর বংশীর ঠাকুমা বলতে লাগল, ও চেতন, এত লোকজন কেন, ও চেতন, এদিকে শুনে যা…

মিছিলটা আবার বংশীর দেহটা নিয়ে চলে গেল। এবং দু-দিন বাদেই সেই সব লোক ভুলে গেল বংশীকে। বংশীর বিধবা কী খেয়ে বাঁচবে, সে কথা আর কে মনে রাখে!

বংশীর বউ লক্ষ্মী দু-একমাস ঘটিবাটি বিক্রি করে চালাল। তারপর গেল লোকের বাড়িতে কাজ করতে। স্বাস্থ্যটি তার ভালো। খাটতে পারে আর মুখ বুজে কাজ করে। বাড়িতে একটা কালা, কানা, বুড়ি আছে, সে বাচ্চা পাখির মতে হাঁ করে বসে থাকে। তাকে খাবার যোগাতে হয়।

কিন্তু গরিব ঘরের যুবতী বিধবার স্বাস্থ্যটি থাকা উচিত নয়, তাতে বিপদ আসে। এলও একদিন। অন্য বাড়ির কাজ সেরে একটু রাত করে বাড়ি ফিরছিল লক্ষ্মী। কোঁচড়ে খানিকটা চাল আর ঝিঙে। বাবুদের বাড়ির দান। খালপাড়ে তিনজন লোক তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শব্দ করারও সময় ছিল না, মুখ বেঁধে নিয়ে গেল তাকে। কোনওদিন আর লক্ষ্মীর কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না। পাঞ্জাবে কিংবা আরবে এই সব মেয়ে চড়া দামে বিক্রি হয়। বিশেষত যাদের সম্পর্কে খোঁজখবর কেউ রাখে না।

চেতনের বুড়ি মা শুধু খিদের জ্বালায় চেঁচায়, ও চেতন, সব গেল কোথায়! দুটি খেতে দিবি না আমায়! ও নাতবউ!

সব জানাজানি হওয়ার পর, পাশের বাড়ির একটি মেয়ে দয়াপরবশ হয়ে খানিকটা ভাত এনে বলল, ও দিদি, নাও। খাইয়ে দিতে হবে, না নিজেই পারবে?

মেয়েটির সত্যিই খুব দয়া। প্রত্যেক দিনই সে বুড়ির জন্য একবেলা খাবার দিয়ে যায়। মাঝে মাঝে খোঁজখবর নিতেও আসে। একদিন সকালে দেখল, বুড়ি উঠোনের মাঝখানে পড়ে আছে, মুখের ওপর উড়ছে কয়েকটা মাছি।

চেতন মিস্তিরির বংশনাশ হয়ে গেল। ও বাড়িতে আর জনপ্রাণী রইল না। বাড়িটাকে কেউ জবরদখল করে নিল না বটে, তবে চোর-ছ্যাঁচড়ারা এসে দরজা-জানলাগুলো অবধি খুলে নিয়ে যায়। দুপুরবেলায় বাড়িটা খাঁ-খাঁ করে।

অনেকদিন বাদে দূর গাঁয়ের একজন লোক এল চেতনকে খুঁজতে। এ-লোকটা কোনও খবরই জানে না। সরাসরি চেতন মিস্তিরির বাড়িতে চলে গেল। সদরে পা দিয়ে ডাকল, ও চেতন, আছ নাকি! কোনও সাড়া না পেয়ে লোকটা ঢুকে এল উঠোনে। লোকটা ভালো মানুষ গোছের। তখনও কিছু বুঝতে পারেনি, গলা চড়িয়ে ডাকল, চেতন! ও চেতন! বংশী!

কোনও সাড়া নেই।

লোকটি বিড়বিড় করে বলল, কী আশ্চর্য! এরা কেউ নেই নাকি!

চতুর্দিক নির্জন। মাঠে প্রান্তরে হুহু করছে হাওয়া। বাড়িটার কোনও একটা ভাঙা পাল্লা বুঝি নড়ে উঠল হাওয়ায়। লোকটি কান পাতল। তার মনে হল, সেই শব্দ যেন শোনা যাচ্ছে। আছে, আছে!

লোকটি আবার ডাকল, চেতন… আবার সেই পাল্লার শব্দ। এবার স্পষ্টই মনে হয় কিছুই হারায়নি। সবই আছে, আছে, আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *