চূড়ামণি উপাখ্যান

চূড়ামণি উপাখ্যান

ঘোড়ার পিঠে চেপে তারা আসে, শেষ রাত্তিরের দিকে। কোথা থেকে আসে আবার কোথায় চলে যায়, কেউ জানে না!

ঘোড়াগুলো ছোট হলেও দারুণ তেজী, চৈত্র মাসের ঝড়ের মতন হঠাৎ শোনা যায় তাদের আগমন-শব্দ। কিছুই সামাল দেওয়ার সময় পাওয়া যায় না, আবার উধাও হয়ে যায় চোখের নিমেষে।

সংখ্যায় তারা জনাছয়েকের বেশি নয়, যদিও বাড়ি ঘেরাও করার পর তারা এমনভাবে ছোটাছুটি করে যেন সবদিকেই কেউ-না-কেউ আছে, এক-একজনকেই মনে হয় অনেকজন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘোড়াগুলো গুনেছে।

এমন নয় যে তারা শুধু অমাবস্যার রাতে মিশমিশে অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে-লুকিয়ে আসে। গত কোজাগরী পূর্ণিমায় ফুটফুটে জ্যোৎস্নার মধ্যে তারা এসেছিল। সেদিন পীতাম্বর গড়াই-এর বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো। সারাদিন তুমুল ধূমধাম, সন্ধেবেলা কীর্তন গানের আসর বসেছিল, রাত্তিরে আত্মীয় কুটুমরা পাত পেড়ে খেয়েছে, সবাই বাড়ি ফেরেনি, থেকেও গেছে কয়েকজন। সব কাজকর্ম মিটিয়ে হ্যাজাক নেবাতে-নেবাতে রাত প্রায় একটা। ওরা এল তার প্রায় দু-ঘণ্টা পরে।

শেষ রাতের ঘুম বড় গাঢ় ঘুম। চোখ মেললেও সহজে চৈতন্য আসে না। কী হয়েছে বুঝতে-না বুঝতেই সব শেষ। উঠোনে খাঁটিয়ে পেতে শুয়েছিল মোংলা, সে নাকি প্রথম থেকে সব দেখেছে। এবারে ঠান্ডা-ঠান্ডা ভাব এসে গেছে আগে আগেই, একটা কম্বল চাপা দিয়ে শুয়েছিল মোংলা, কপাকপ-কপাকপ ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনে তার ঘুম ভাঙলেও সে ভেবেছিল বুঝি ঘুটিয়ারি। শরীফে ঘোড়দৌড়ের স্বপ্ন দেখছে। তারপর সেই আওয়াজ একেবারে তার ঘাড়ের ওপর এসে পড়তেই সে ধড়মড় করে উঠে বসল। কিন্তু খাঁটিয়া থেকে নামবারও সময় পেল না, একটা বিকট কালো মূর্তি দাঁড়াল তার বুকের ওপর এক পা চাপিয়ে। সেই পা জগদ্দল পাথরের মতন ভারী, তার ওপর মোংলার নাকের ডগার কাছে তরোয়াল।

মোংলার বর্ণনা মিথ্যে বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কারণ তার কপালে রয়েছে তরোয়ালের। খোঁচার ঘা, ডাকাতরা যাওয়ার সময় তার এক চোখের ওপর চাবুক মেরে গিয়েছিল, তারপর থেকে সে আর বাঁ-চোখটা খুলতে পারে না। তবু সেই অবস্থার মধ্যেই মোংলা অনেক কিছু দেখে ছিল। পীতাম্বর গড়াইয়ের বাড়ি মেটে বাড়ি হলেও দু-মহলা। ডাকাতরা সে বাড়ির অন্ধিসন্ধি সব আগে থেকেই জানে। তারা অন্য কোনও ঘরে খোঁজাখুঁজি করেনি, তাদের মধ্যে দুজন সোজা পীতাম্বরের ঘরের সামনে গিয়ে দুই লাথিতে দরজা ভেঙেছে। পীতাম্বরের চুলের মুঠি ধরে খাট থেকে নামিয়ে তাকে শেষ করেছে এক কোপে, তারপর এক ঝটকায় বিছানা থেকে তোশকটা তুলে নিয়েছে। তারা জানত, পীতাম্বরের সব টাকা ওই তোশকের মধ্যে সেলাই করা।

পীতাম্বরের ঘরে যখন এইসব কাণ্ড চলেছিল, তার মধ্যেই মোংলা শুনতে পাচ্ছিল জল ছেটানোর শব্দ। কেউ যেন সারা বাড়িতে গোবর ছড়া দিচ্ছে। আসলে জলও নয়, গোবর ছড়াও নয়, ডাকাতদের একজন কেরোসিন ছিটিয়ে দিচ্ছিল। চটপট কাজ হাসিল হতেই আগুন লাগিয়ে দিল, গোটা বাড়ি জ্বলে উঠল একসঙ্গে।

এই রকম করে ওরা যাওয়ার সময় আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে যায়, তাই কেউ আর ওদের পিছু ধাওয়া করতে পারে না। সবাই তখন প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত।

কেমন চেহারা ওই ডাকাতদের? মোংলার বর্ণনায় তাদের সকলেরই কুচকুচে কালো পোশাক, মুখও কালো কাপড়ে ঢাকা, তাই তাদের সকলকে একরকম দেখায়। তাদের বয়েস বোঝা যায় না। মোংলার মতে তারা শয়তানের জীব। অনেকে এটা বিশ্বাস করে। কারণ, খলসেখালির রতুবাবু এ ডাকাতদের দিকে বন্দুক চালিয়েছিলেন বলে শোনা যায়, রতুবাবুর বন্দুকের জোর আছে, তিনি একবার একটা বাঘ মেরেছিলেন, ধান লুটের সময় দুটি মানুষও মেরেছিলেন, কিন্তু তাঁর গুলিতে ওই ডাকাতদের গায়ে আঁচড়ও লাগেনি, তাদের ঘোড়াগুলোও জখম হয়নি। এক পক্ষকাল পরে তারা ফিরে এসে রতুবাবুর বাড়ি জ্বালিয়ে তাঁর গলা কেটে দিয়ে গেছে।

ওরা যে শুধু ধনবান লোকদের বাড়িতেই টাকা লুট করতে আসে তাও নয়। হারুণ শেখমানুষটা তেজী, কিন্তু তার ধন সম্পদ তো বিশেষ ছিল না। সেই হারুণ শেখের বাড়িতেও এক রাতে ডাকাত পড়ল। ঘোড় সওয়াররা হারুণ শেখকে শুধু খুন করেনি, তার হৃৎপিণ্ডটাই নাকি উপড়ে নিয়ে গেছে। এমন হৃৎপিণ্ড ওপড়াবার ঘটনা আরও শোনা যায়। আবার কোনও-কোনও বাড়িতে আসে ওরা যুবতী মেয়ে লুঠ করার জন্য। জীবন নায়েকের বাড়িতে পাঁচ ভরি সোনা ছিল। সে খবর ডাকাতরা পায়নি, সে বাড়ি থেকে জীবন নায়েকের সোমঙ্খ সুন্দরী বউটাকে শুধু তুলে নিয়েছে, অবশ্য সে বাড়িতেও আগুন জ্বালিয়ে যেতে ভুল করেনি।

অশ্বারোহী ডাকাতদের তাণ্ডবে গোটা তল্লাটের মানুষজনের রোম খাড়া হয়ে আছে। হাট-বাজারে, গঞ্জে এই ডাকাতদের কথা ছাড়া আর কোনও কথা নেই। গল্পও উড়ছে নানারকম। তবে আসল ঘটনাই এমন নৃশংস যে তার ওপর বেশি রং চড়াবার মতন কল্পনাশক্তি এদিককার মানুষদের নেই। রাত্তিরবেলা দূরে কোনও গ্রামে আগুন জ্বলে উঠলেই বোঝা যায়, এইমাত্র ডাকাতরা। টগবগিয়ে চলে গেল। কোথায় যায় ওরা? এই প্রশ্নের কোনও হদিশ নেই বলেই অলৌকিক কথা মনে আসে। শয়তানের জীব, ওরা ঘোড়া সুষ্ঠু ডুব দেয় গাঙের জলে।

এই নদী-নালার দেশেও ঘোড়ায় চড়ে ডাকাতি, ঘোড়া কোথায় এদেশে? বড়-বড় নৌকোয় যারা বিদেশ থেকে ব্যাবসা করতে আসে, তারা এই প্রশ্ন করে।

দিনেরবেলা ফনফন করে ওড়ে নোনা বাতাস, পাতলা রোদ্দুরে দুলে-দুলে উড়ে যায় বগেরি। পাখির ঝাঁক, মাছ ধরা ডিঙিগুলো রূপোলি জলে ছায়ার মতন ভাসে। রাত্তিরের ওই বিভীষিকা তখন মনে হয় অলীক।

হ্যাঁ, এই জল-কাদার দেশেও ঘোড়া আছে। এখানে জঙ্গলে আছে বাঘ, জলে আছে কামোঠ কুমির। কিন্তু ঘোড়া এমনই তেজী প্রাণী যে সাঁতরে নদী পার হয়ে যায়, কুমির কামোঠ তাকে ছুঁতে পারে না। জঙ্গলের বাঘ নাগাল পাওয়ার আগেই ঘোড়া জঙ্গলের পথ কাবার করে দেয়। তাই। বর্ধিষ্ণু লোকেরা কেউ-কেউ ঘোড়া রাখে। বনমালি ডাক্তার ঘোড়ায় চেপে রুগি দেখতে যান। তা ছাড়া ঘুটিয়ারি শরীফে ঘোড়দৌড় হয়। ইস্কুল ডাঙার মাঠে সত্যিকারের ঘোড়দৌড়, প্রতি হাট বারে, দশ-টাকা বিশ-টাকার বাজি থাকে প্রতি দৌড়ে। সাত-আটটা ঘোড়া দৌড়োয়, বেশ কিছু টাকার লেনদেন হয়।

প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল, ওই ঘোড়দৌড়ের ছেলেগুলিই বুঝি ডাকাতি শুরু করেছে। কিন্তু এই ছোঁড়াগুলো যে বড়ই বাচ্চা। এদিককার ঘোড়াও বেশ ছোট, প্রায় গাধার সঙ্গে উনিশ বিশ, বয়স্ক মানুষদেরও বহন করতে পারে বটে কিন্তু তাহলেও ছোটার গতি থাকে না। তাই ঘোড়দৌড়ের। সওয়াররা সবাই পাতলা চেহারায় কিশোর। যে ছোঁড়াটা প্রায় প্রতিবারই ফার্স্ট হয়, সেই কামরুল তো অন্যান্য দিন কাজ করে বাজারের মুদিখানায়। রোগা ডিগডিগে শরীর, মুণ্ডুটা বড়, মনে হয়। এক চড় মারলে ঘুরে পড়ে যাবে। কিন্তু ওই কামরুলই যখন ঘোড়া ছোটায়, কী তার তেজ, মাথার চুলগুলো সব খাড়া হয়ে যায়, বাতাসের বেগকেও যেন সে জয় করে নিতে পারে, ছপটি মারতে মারতে এক-এক সময় সে যেন দাঁড়িয়ে পড়ে ঘোড়ার পিঠে। কামরুলের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম বলরাম, কালু মিস্তিরির ছেলে, তার সারা গায়ে পাঁচড়া হলে কী হয়, গলার জোরেই সে তার ঘোড়াকে ক্ষেপিয়ে ছোটায়।

এই কামরুল, বলরাম, আনিসুল এরা কী ডাকাত হতে পারে?

অনেকে বলাবলি করতে লাগল, আজকাল গুঁড়ো-গাঁড়াদেরও বিশ্বাস নেই। দিনকাল পালটে গেছে। এখন মায়ের পেট থেকে পড়তে-না-পড়তেই এরা বুলি শেখে। দশ-এগারো বছর বয়েস হতে-না-হতেই টাকা পয়সা চিনে যায় খুব, মুখে শোভা পায় জ্বলন্ত বিড়ি। বগলে চুল গজাবার আগেই এরা মেয়েলোকদের দিকে নজর দিতে শুরু করে। চৌদ্দ বছর বয়েসেই এক-একজন। লায়েক।

এদের চেহারা ডাকাতসুলভ না হলেও এদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি সন্দেহের কারণ এদের অশ্বশক্তি। এমন জোরে ঘোড়া ছোটাতে তো আর কেউ পারে না এ তল্লাটে। ইস্কুল মাস্টার মধু নস্কর জনসাধারণের প্রতিনিধি হয়ে থানা পুলিশের কাছে আর্জি জানালেন এই ছোঁড়াগুলোর। বিরুদ্ধে। ঘুটিয়ারি শরীফের ঘোড়দৌড়ে প্রতি হাটবারে অনেক চাষী তাদের রক্তজল করা। পরিশ্রমের টাকা জলাঞ্জলি দেয়। লাভের টাকা যায় ঘোড়ার মালিকদের ঘরে। যে ছোঁড়াগুলো ঘোড়া ছোটায় তারা পায় মাত্র দশ টাকা করে, তবু ওই ছোঁড়াগুলোর ওপরেই মধু নস্করের রাগ বেশি।

এক হাটবারে পুলিশ এসে ঘোড়দৌড় মাঝপথে থামিয়ে কামরুল, বলরাম, কাদের, এককড়ি, আনিসুল সবাইকে কোমরে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে গেল। যারা ঘোড়দৌড়ের বাজি খেলতে এসেছে, তারা অসন্তুষ্ট হল খুব, ডাকাতির কথা তাদের তখন মনে নেই।

যেন মধু নস্কর আর তার জনসাধারণকে উপহাস করার জন্য সেই রাত্রেই ডাকাত পড়ল মধু নস্করের কাকা যাদব নস্করের বাড়িতে। গভীর রাতে সেই রকমই ঘোড়া ছুটিয়ে এল ছ-জন। ডাকাত, যাদব নস্করের ধানের গোলায় আগুন লাগিয়ে, দু-জনকে খুন করে একেবারে সর্বনাশ করে দিয়ে গেল। যাদব নস্করের সদ্য বিধবা শাপ-শাপান্ত করতে লাগল মধু নস্করকে।

এই অঞ্চলে থানা পুলিশের ওপর মানুষের ভরসা নেই। খুন-জখম, ডাকাতি লেগেই আছে। পুলিশকে খবর দিলেও গা করে না। যদি বা কখনও পুলিশ আসে, এসে আস্তানা গাড়ে গ্রামের সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু গৃহস্থের বাড়িতে, পেট ভরে খাওয়া-দাওয়ার পর দারোগা সাহেব হাই তুলতে থাকেন। লোকজনের অভিযোগ শুনতে-শুনতে তাঁর চোখ টেনে আসে ঘুমে।

কেউ-কেউ বলে, ওই পুলিসও যা, ডাকাতও তা। রূপকথার গল্পে যেমন থাকে, দিনের বেলা যে পাটরাণী, রাত্তিরবেলা সে-ই রাক্ষসী। সেইরকম দিনের বেলায় যারা পুলিশ, রাত্তিরে তারাই ডাকাত। যে রক্ষক সেই ভক্ষক বলে কথা আছে না?

তেঁতুলছড়ি গ্রামে এখনও ডাকাত পড়েনি। আশ-পাশের কোনও গ্রামই প্রায় বাদ যায়নি, সবাই ভাবে এবারে তেঁতুলছড়ির পালা। কবে আসবে, কবে আসবে এই ত্রাস। এই গ্রামের মানুষ

রাতের-পর-রাত জেগে কাটায়, যদিও জানে, রাত জেগে পাহারা দিয়েও লাভ নেই, ওই ডাকাতদের রোখার সাধ্য নেই তাদের। এক বাড়িতে ডাকাত পড়লে অন্য বাড়ির কেউ ছুটে আসবে না, সাধ করে কে নিজের প্রাণটা খোয়াতে চাইবে।

তেঁতুলছড়িতে অবশ্য সেরকম ধনবান কেউ নেই, প্রায় সবই চাষাভুষো আর কয়েক ঘর জেলে তাঁতী। রতনমণি ঘোষের বাবা গোয়ালা ছিল, এখন ওরা নিজেদের কায়স্থ বলে পরিচয় দেয়, ওদের জমি-জমা কিছু বেশি, আবার ও বাড়িতে পোষ্যও অনেক। কিছু জমা ধান-চাল থাকলেও টাকা-পয়সা সোনা-দানা বিশেষ নেই, ছজন ডাকাতের এক রাত্তিরের খরচা পোষাবে না।

কিন্তু টাকা পয়সা পাবার আশা না থাকলেও তো ওরা আসে। এমনি-এমনি এসে বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, মানুষ খুন করে। তাতে সন্দেহ হয়, ওরা বুঝি আসল ডাকাত নয়। ভাড়ায় ডাকাতি খাটে। এই কারুর ওপর কারুর রাগ আছে, অমনি কিছুটাকা খরচ করে লেলিয়ে দেওয়া হল ডাকাত। হারুণ শেখের বেলাতেই পাকা হয় সন্দেহটা। টাকার জোর ছিল না তার মোটেই কিন্তু হিম্মতের জোর ছিল, কারুকে সে ছেড়ে কথা কইতো না, রামলাল ব্যাপারীকেও সে মুখের ওপর তুড়ে দিয়েছিল। ডাকাতরা এসে তাকে কচুকাটা করে গেল নিশ্চয়ই অন্য কারুর প্ররোচনায়।

তেঁতুলছড়ি গ্রামে অবশ্য সেরকম তেজী মানুষও কেউ নেই। তা বলে কি আর পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে ঝগড়া হয় না কিংবা ভাই-ভাইকে মারতে দা উঁচিয়ে তেড়ে যায় না! কিন্তু ওই বাপ-মা তুলে গালমন্দ কিংবা তেড়ে যাওয়া পর্যন্তই, তার চেয়ে বড় কোনও ঘটনা অনেকদিন এখানে ঘটেনি।

তবু ভয় যায় না। নিজের অজ্ঞাতেই কে, ভিন গাঁয়ের কার চক্ষুশূল হয়ে বসে আছে, তার ঠিক কী? তাছাড়া দু-পাঁচটি স্বাস্থ্যবতী কন্যা বা বউ রয়েছেই এ গ্রামে, সেও তো কম বিপদের কথা নয়। বাড়িতে অমন রমণী থাকা আর হরিণ পুষে রাখা তো একই কথা।

সন্ধ্যে হলেই ভয় গা-ছমছম করে। গরম ভাতের গ্রাস মুখে তুলতেও সুখ আসে না। কারুর সঙ্গে কারুর কথা বলতেও ইচ্ছে করে না। ছোট কোনও বাচ্চা চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলে বড়রা রেগে যায়, তারা বাচ্চাটাকে থাবড়া মারে।

ইদানীং আর এদিকে বাঘের উপদ্রব নেই। বুড়ো বুড়িদের মুখে শোনা বাঘের গল্প এখন পানসে লাগে। বাঘ তো ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে যেত না।

কেউ-কেউ ভাবে, ডাকাতরা একবার এসে পড়লে বাঁচি। রোজ-রোজ এই ঘাড় শক্ত করে থাকা সহ্য হয় না। ডাকাতরা এলে একখানা-দুখানা বাড়ি পোড়াবে। দু-চারজনকে মারবে বড় জোর, তারপর তো অন্য সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবে।

মেয়েদের বাড়ির বাইরে যাওয়া একেবারে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মেয়েরা তা শোনে না। কাজে-কর্মে তাদের মাঠে যেতে হয়, দোকানে যেতে হয়। সন্ধের পর একবার নদীর ধারে না গেলে তো চলবেই না।

নদীর ওপরে একটা বাঁশের সাঁকো। সেই সাঁকো পার হয়ে ওপারের গ্রামে গেলে পাওয়া যায় মিষ্টি জলের পুকুর। ওই পুকুরের জল ছাড়া ডাল রাঁধা যায় না। ওই গ্রামে আছে বড় মুদির। দোকান, সেখানে পাওয়া যায় সর্ষের তেল। সেই গ্রাম পেরিয়ে তার পরের গ্রামে শুক্রবারের হাট।

সন্ধের পর নদীর ধারে গ্রামের স্ত্রীলোকেরা সার বেঁধে বসে। তখন পুরুষ মানুষদের এদিকে আসা নিষেধ।

তবু একদিন প্রথম প্রহরের জ্যোৎস্নায় ওই সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়েছিল মল্ল পাইকারের ছেলে শ্রীধর। কেষ্ট ঠাকুরের মতন সে বাঁশি বাজায়। সেই শ্রীধর তেঁতুলছড়ি গ্রামের বাতাসীকে একলা পেয়ে কুপ্রস্তাব দিল। বাতাসী তো আর শ্রীরাধিকের মতোন আলুথালু নয়, ঢলানীও নয়, বড় তেজী মেয়ে সে, জঙ্গল থেকে সে মস্ত বড় কাঠের বোঝা মাথায় করে আনে, একবার সে জ্বলন্ত চ্যালা কাঠ দিয়ে একটা গোখরো সাপ পিটিয়ে মেরেছে। বংশীবাদক শ্রীধর যখন বাতাসীর হাত চেপে ধরতে গেল, তখন বাতাসী তাকে ঠেলে ফেলে দিল জলে। তারপর তার কী হি-হি-হি হাসি! সেই হাসি যেন মাছরাঙা পাখির ডাক!

এই ঘটনায় তেঁতুলছড়ি গ্রামে আরও জাঁকিয়ে বসল ভয়। বাতাসী এ কাজটা বড় মন্দ করেছে। এখন শ্রীধর রাগের চোটে যদি ডাকাত লেলিয়ে দেয়?

এতদিনে সবার খেয়াল হল যে কাঠকুডুনী বাতাসীর শরীরে একটা জেল্লা আছে। অল্প বয়সে। বিধবা হয়েছে সে, তার নিজের সাধ আহাদ না থাকতে পারে। কিন্তু তাকে দেখে দুষ্ট প্রকৃতির লোকদের সাধ আহ্বাদ তো জাগতেই পারে! যারা বাতাসীর দিকে আগে ভালো করে তাকিয়ে দেখেনি, এখন দেখতে শুরু করল।

কেউ-কেউ অবশ্য বলল, না-না, শ্রীধর অমন মানুষই নয়। সে একটু তরলমতি হতে পারে, কিন্তু চোর-ডাকাতদের সঙ্গে তার কোনও সংশ্রব নেই। তবু ভয়ের কাঁটা খচখচ করে। শ্রীধর না বলুক অন্য কেউ তো রটিয়ে দিতে পারে যে তেঁতুলছড়ি গ্রামে আছে বাতাসীর মতন এক আগুনের ঢেলা। আগুনের টানেই তো আগুন আসে।

তেঁতুলছড়ি গ্রামের প্রবীণরা শলাপরামর্শ করতে বসে অশখতলায়। কারুর-কারুর হাতে হুঁকো, কয়েকজনের হাতে বিড়ি। অনেক তামাক পুড়ে যায়, কোনও বুদ্ধি আসে না। কেউ-কেউ বলে, বাতাসীকে এ গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিলে কেমন হয়? কাঠ কুড়োনোই যার জীবিকা, সে তো যে কোনও গ্রামেই থাকতে পারে; সাঁকোর ওপারে শ্রীধরদের গ্রামেই গিয়ে থাকুক। তারপর বাতাসীকে শ্রীধর খাবে না ডাকাতরা খাবে, সে তারা বুঝবে, তেঁতুলছড়ি গ্রামের লোক তো বাঁচবে!

কথাটা অনেকের মনঃপূত হয়, কিন্তু কে যে বাতাসী বা তার মাকে এই কথাটা বলবে, তা ঠিক হয় না। সকলেরই বুকের মধ্যে থাকে একইসঙ্গে গরম আর ঠান্ডা। যার মনে হয় যে বাতাসীটাকে। তাড়াতে পারলেই শান্তি, সে-ই আবার ভাবে, যতদিন আছে থাক না, তবু তো পাছা-ভারি। মেয়েটিকে দু-চোখ ভরে দেখেও খানিকটা আরাম পাওয়া যায়।

বাতাসীর মায়ের নাম তুলসি হলেও লোকে তাকে আড়ালে বলে কাঁদুনী। কারণ তার গলার আওয়াজটা খোনা-খোনা। মা আর মেয়ে এই দুজনের সংসার। দুজনেই বাল্যবিধবা। গ্রাম প্রধানদের প্রস্তাবটা ক্রমে বাতাসীর মায়ের কানে আসে।

এক সন্ধেবেলা অশঙ্খতলায় গিয়ে কাঁদুনী এক দঙ্গল পুরুষ মানুষের সামনে কপাল চাপড়ে ডুকরে কেঁদে উঠে বলে, হায় রে, এ গ্রামে কি পুরুষ মানুষ নেই? মেনিমুখোরা আমাদের তাড়িয়ে দিতে চায়! আমরা কারুর সাতে-পাঁচে নেই, দিন আনি দিন খাই, ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ করবে আমাদের? আজ যদি থাকত চুড়ামণি…আজ যদি থাকত চুড়ামণি…

চূড়ামণি নামটা শুনেই থেমে যায় সব গুঞ্জন। কেউ আর বিড়ি টানে না, যার হাতে হুঁকো, সে গুড়ুক টানতে ভুলে যায়। এ-ওর মুখের দিকে তাকায়। চূড়ামণি নামটায় যেন একটা জাদু আছে। অশঙ্খতলায় যারা জমায়েত হয়েছে তারা অনেকেই চূড়ামণিকে চোখে দেখেনি, কিংবা অল্প বয়েসে দেখলেও এখন আর স্মরণে নেই। কিন্তু সকলেই চূড়ামণির কথা শুনেছে। তার নাম শুনলেই রোমাঞ্চ হয়।

শুধু এই তেঁতুলছড়ি গ্রাম নয়, আশপাশের পাঁচ-দশখানা গ্রামের নয়নমণি ছিল ওই চূড়ামণি। যেমন ছিল তার হাসিমাখা সুন্দর মুখ, তেমনই ছিল তার লোহার মতন বুকের পাটা। সংসারে আর কেউ ছিল না তার। যে-কোনও লোকের বিপদ আপদের কথা শুনলে সে দৌড়ে গিয়ে বুক। পেতে দিত। একবার এ গ্রামের একটি শিশুকে কুমিরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, চুড়ামণি জলে। ঝাঁপিয়ে পড়ে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে সেই শিশুটিকে উদ্ধার করে। কুমিরটাকে ছিঁড়ে দু-ভাগ করে দিয়েছিল সে।

এই কাহিনির কতটা সত্য আর কতটা কল্পনায় রঙিন তা এখন জানার উপায় নেই। এখন নদীটিকে দেখলে বিশ্বাস করাই শক্ত যে-কোনওদিন ওখানে কুমির আসা সম্ভব ছিল, তবু লোকে চূড়ামণির ওই বীরত্বের কথা বিশ্বাস করে। আর, অনেক কথা রটেছে তার নামে। সে নাকি একবার শুধু কয়েকটা ধমক দিয়ে বাঘ তাড়িয়ে দিয়েছিল। এক খুনে ডাকাতের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে চুড়ামণি তার চুল ধরে এমন টান দিয়েছিল যে সেই মুহূর্তে ডাকাতটি ন্যাড়া। সারা। জীবনে তার মাথায় আর চুল গজায়নি। নিশ্চয়ই অনেক গুণ ছিল চূড়ামণির, নইলে তার নামেই বা এতসব কথা রটবে কেন?

যখন পূর্ণ যৌবন বয়েস তখন হঠাৎ-ই একদিন চূড়ামণি এই গ্রাম ছেড়ে চলে যায় চিরতরে। কেন যে সে গেল, কোথায় গেল তা কেউ জানে না। তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে জনশ্রুতি আরও বাড়তে থাকে। যে-কেউ বিপদে পড়লেই কপাল চাপড়ে বলে, আজ যদি চূড়ামণি থাকত, তাহলে আর দুঃখ ছিল না!

এসব বিশ-পঁচিশ বছর আগেকার কথা। অনেকদিন পর বাতাসীর মা কাঁদুনির মুখে শোনা গেল সেই খেদ বাক্য। অমনি সকলের মনে পড়ে গেল!

এরপর কয়েকদিন ঘোড়সওয়ার ডাকাতদের কথা উঠলেই কেউ-না-কেউ বলে ওঠে, হায় রে, আজ যদি চূড়ামণি থাকত! দুর্দমনীয় ডাকাতদের একমাত্র প্রতিপক্ষ সেই অতীতের চূড়ামণি।

নতুন করে চূড়ামণির কীর্তি-কাহিনীর কথা মুখে-মুখে ছড়ায়, অল্প বয়েসিরা রোমাঞ্চিত হয়ে শোনে। সবাই ভাবে, চূড়ামণি থাকলে সব মুশকিল আশান হয়ে যেত। সে নেই, তাই এত দুর্দশা। ডাকাতগুলো এসে কবে যে কার গলা কাটবে তার ঠিক নেই।

এর মধ্যেই একদিন অন্য গ্রামে আর-একবার ডাকাতির খবর এল! অর্থাৎ তারা থেমে নেই। তেঁতুলছড়ি গ্রামে তারা একদিন আসবেই! পাশের গ্রামে শ্রীধরকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে কি তবে ওই ডাকাতদের সন্ধানেই গেছে? শীতের রাতে বাতাসী তাকে জলে ঠেলে ফেলে। দিয়েছিল, সেই অপমানের প্রতিশোধ সে নেবে।

বাতাসীর অবশ্য বিশেষ ভয় ডর নেই। সন্ধে গাঢ় হলে নদীর ধার থেকে অন্য স্ত্রীলোকেরা চলে এলেও সে একা-একা দাঁড়িয়ে থাকে সাঁকের ধারে।

জ্যোৎস্নায় ধু-ধু করে ওপারের মাঠ। দূরের তালগাছগুলোকে মনে হয় সারি-সারি ঠুটো জগন্নাথ। বাতাসে মিশে থাকে ভীতু মানুষদের নিঃশ্বাস। বাতাসী তাকিয়ে থাকে শূন্যের দিকে। সে যেন। হঠাৎ কল্পনার চোখে দেখতে পায় চূড়ামণিকে। সেই এক রূপবান যুবক, পরের দুঃখে যার পাথরের মতোন বুকখানা কাতর। সে মাঠ ঘাট জঙ্গল পেরিয়ে আসছে, সে বাতাসীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলবে, আমি তো আছি, তোমার ভয় কী!

যারা অল্প বয়েসে চলে যায়, তাদের বয়েস বাড়ে না।

কিছুদিন ধরে চুড়ামণির কাহিনি খুব চলবার পর ছিরু বৈরাগী একটা নতুন কথা শোনাল। চূড়ামণি ঠাকুর মারা যায়নি গো, নিরুদ্দেশেও যায়নি। কয়েক মাস আগেই ছিরু বৈরাগী তাকে দেখেছে পিয়ালী নদীর বাঁকে কানা ফকিরের আখড়ায়। অবশ্য এখন তাকে চেনাই যায় না, সে এখন বুড়ো, নেশাখোর, আত্মবিস্মৃত। সবসময় কাঁদে। চূড়ামণি ঠাকুর এখনো শুধু নিজের নামটা শুনলে জেগে ওঠে।

ছিরু বৈরাগীর কথা শুনে সকলের মনে আঘাত লাগে, আবার কেউ পুরোপুরি অবিশ্বাসও করতে পারে না। ভিক্ষে করতে-করতে ছিরু বৈরাগী দেশ-বিদেশে চলে যায়। সে ক্যানিং, মোল্লাখালি, মুর্শিদাবাদ, যশোর এইসব দূর দেশের গল্প বলে। এককালের চূড়ামণি দাস এখন চূড়ামণি ঠাকুর হয়ে গেছে শুনেও কেউ আপত্তি জানায় না।

পিয়ালী নদী তো বেশি দূরে নয়। সে নদীর যতগুলো বাঁকই থাক, শেষ পর্যন্ত পৌঁছোতে এক বেলাও লাগবে না। গ্রামের কয়েকটি অল্প বয়েসি ছেলে কানা ফকিরের আখড়া খুঁজে বার করবার জন্য বেরিয়ে পড়তে চায়। তাই শুনে বাতাসী বলল, আমিও যাব, আমিও যাব!

কানা ফকিরের যে-চক্ষুটি ভালো সেই চক্ষুটি যেন বেশি জ্বলজ্বলে। মাথা ভরতি চুলের জঙ্গলে উকুনের বাসা। মাঝে-মাঝেই সে ঘ্যাস-ঘ্যাস করে মাথা চুলকোয়। খিদে পেলে সে খায় কিন্তু আঁচায় না, অর্ধেক খাবার লেগে থাকে দাড়ি-গোঁফে! চরস-গাঁজার নেশায় সে সারাদিনই প্রায় বোম হয়ে থাকে। যখন একটু মাথা পরিষ্কার হয় তখন সে উরুতে চাপড় মেরে গান ধরে।

যদি সুন্নৎ দিলে হয় মুসলমান
নারীর তবে কী হয় বিধান
বামন চিনি পৈতা প্রমাণ
বামনী চিনি কিসে রে!

তার বেশিরভাগ গানই তার নিজের রচিত নয়, লালন ফকিরের। এক দঙ্গল চেলা জুটেছে তার, তাদের কে হিন্দু, কে মুসলমান বোঝার কোনও উপায় নেই। সকলের মুখেই ওই এক গান, চরস গাঁজার দিকে চেলাদের টান বেশি ছাড়া কম নয়। দিন-রাত তারা নেশার ঘোরে, গানের ঘোরে। মহানন্দে আছে।

বাতাসী আর তার দলবল সেই কানা ফকিরের আখড়ায় এসে পৌঁছল সন্ধের ঝোঁকে। তারা যে কয়েকজন নতুন মানুষ এসে দাঁড়াল, তাতে কারুরই কোনও হুঁস বোধ নেই। জায়গাটা ধোঁয়ায় ধোঁয়াক্কার, তার মধ্যেই চলছে চ্যাঁচামেচির সঙ্গীত।

একবার গান শেষ হওয়ার পর কানা ফকির যখন আবার ছিলিম সাজতে বসল, চ্যালারা ব্যগ্রভাবে তাকিয়ে রইল তার দিকে, সেই সময় এক অপেক্ষাকৃত তরুণ সুপুরুষ চ্যালার পায়ে বাতাসী আর তার সঙ্গীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, চূড়ামণি ঠাকুর, আমাদের বাঁচাও!

যেন পায়ে আগুনের ছ্যাঁকা লেগেছে এইভাবে আঁতকে উঠে সেই চ্যালাটি বলল, আরে, আরে, আরে, এ কী উৎপাত! আমি কে, তোমরা কে, চূড়ামণি ঠাকুর কে? কেউই না! তুমি ওই! তুমি ওই!

সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, তুমি ওই! তুমি ওই!

বাতাসীরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কানা ফকির তার জ্বলজ্বলে একচক্ষু দিয়ে বাতাসীকে নেক নজরে লক্ষ করে গেয়ে উঠল,

কিবা রূপের ঝলক দিচ্ছে উজলে
রূপ দেখলে নয়ন যায় ভুলে
ফণী মণি সৌদামিনী
জিনি এ রূপ উছলে…

তুমি কে বাছা? কার খোঁজে এয়েছ?

বাতাসী হাত জোড় করে ভক্তিভরে বলল, বাবা, আমরা তেঁতুলছড়ি গ্রামের মানুষ। আমাদের বড় বিপদ। আমরা এসেছি চূড়ামণি ঠাকুরের খোঁজে! শুনেছি তিনি আপনার ছিরি পাদপদ্মে আশ্রয় নিয়েছেন।

তখন মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা প্রায় অচেতন একজন চ্যালা মাথা তুলে জড়ানো গলায় বলল, কে রে? কে রে? কে রে? কে আমার নাম ধরে কথা বলে? তুমি ওই! তুমি ওই!

কানা ফকির বলল, তোমরা চূড়ামণির খোঁজে এয়েছ? ওই তো চূড়ামণি! এখানে তোমাদের কোনও ডর নেই, যা প্রাণে চায় খুলে বলো!

কানা ফকির যার দিকে আঙুল দেখালেন, সেই লোকটির বয়েস ষাটের কাছাকাছি, মাথার অর্ধেক চুল পাকা, একদা বলবান শরীরটি এখন দড়ির মতন পাকানো, শিরাগুলি স্পষ্ট দেখা যায়, চোখ দুটি পাকা করমচার মতন লাল।

বাতাসীর সঙ্গে যারা এসেছে তাদের ভক্তি চটে গেছে এরই মধ্যে। তারা ভাবল, তারা ভুল জায়গায় এসেছে। কিংবা ওই মরকুট্টে বুড়োটা যদি চূড়ামণি হয়, তবে তার খুরে-খুরে দণ্ডবৎ, দরকার নেই ওই ঝামেলাটিকে গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে। তাদের একজন আর সকলকে বলল, চল রে চল, এখনও হাঁটা শুরু করলে লোকালয়ে ফিরতে পারব।

কানা ফকিরের কিন্তু কৌতূহল জন্মেছে। তিনি বাতাসীর মুখ থেকে দৃষ্টি না ফিরিয়ে বললেন, জয় রাধেশ্যাম, জয় সত্য পীর! তুমি ওই! তুমি ওই! এবারে খুলে বলল তো বাছা, তোমার বৃত্তান্তখানি।

বাতাসী তখন সবকথা সাত কাহন করে সবিস্তারে শোনাল।

তাই শুনে কানা ফকির দয়ার্দ্র কণ্ঠে বলল, ওরে চূড়ামণি, তুই অবোধমণি হয়ে আছিস। তোর গ্রামের মানুষের মাথায় বিপদের খাঁড়া, তুই গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়া। সাঁই-এর কৃপা হলে তুই আবার ফিরে আসবি। দড়ি-পাকান চেহারার বুড়োটি এই আদেশ শুনে কাঁদতে শুরু করে দিল ভেউ ভেউ করে। কানা ফকির তার দিকে ছিলিম এগিয়ে দিয়ে বললেন, লে বেটা! দু-তিন টান দে! তারপর সুস্থ হয়ে সবকথা বুঝে দ্যাখ। আহা রে, এরা এসেছে কত দূর থেকে তোর নিয়তি ধরে টান দিতে। এই নারীটির বদন যেন ছাই বর্ণ হয়ে গেছে। এদের সাথে না যাস যদি তবে তোর মুক্তি হবে না। তুমি ওই! তুমি ওই!

ছিলিমে কয়েক টান দিয়ে সেই দড়ি-পাকানো চেহারার লোকটি অনেকটা তাজা হলে বলল, বাবা, তুমি সব পারো! এরা যা চায়, তুমিই সাধ মিটিয়ে দাও না! এই বুড়োকে নিয়ে টানাটানি কেন?

আরও কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটির পর কানা ফকিরের চরম আদেশ হল এই যে, দড়ি-পাকানো চেহারার চূড়ামণিকে যেতেই হবে তেঁতুলছড়ি গ্রামে। বাতাসীকে তিনি বললেন, যাওয়ার পথে ওরা যেন চূড়ামণিকে কোনও পুকুরের পানিতে চুবিয়ে নিয়ে যায়। তাতে ওর জ্ঞান ফিরবে!

বাতাসী আর তার দলবল অত্যন্ত অনিচ্ছা সত্বেও নিয়ে চলল চূড়ামণিকে। এ বুড়োকে গ্রামে নিয়ে গিয়ে কী উপকার হবে? তাও সে নিজে চলতে পারে না, ধরে-ধরে নিয়ে যেতে হয়। মাঝে-মাঝে হোঁচট খেয়ে পড়ে। এক-একবার চেঁচিয়ে ওঠে। বড় তৃষ্ণা, জল দে! জল! গুরু, তুমি কোথায় পাঠাচ্ছ আমাকে? তুমি ওই!

খানিক দূরে যাওয়ার পর পথের পাশে দেখা গেল এক পুষ্করিণী! কানা ফকিরের কথা মতোন বাতাসীরা বুড়োটাকে সেখানে ঠেলে ফেলে দেওয়ার উদ্যোগ করছে, তার আগেই সে ছুটে গিয়ে পুকুরের জলে উপুড় হয়ে পড়ল। শোঁ-শোঁ শব্দ হতে লাগল এবং এক পুষ্করিণী ভরতি জল কিছুক্ষণের মধ্যেই সে পান করে নিল চেপেপুটে।

তারপর পাড়ে উঠে সে কাঁদতে লাগল। অস্ফুটভাবে বলতে লাগল, যে-দেশে ভালোবাসা নাই, সে দেশে বাসা নাই আমার! এই একই কথা বারবার বলতে লাগল আর ঝরতে লাগল তার চোখের জল। সে কী কান্না! ক্রমে তার চোখের জলেই আবার প্রায় ভরে গেল সেই পুকুরটা।

এই কাণ্ড দেখে বাতাসী ও তার দলবলের বাক্যরহিত হয়ে গেছে। তারা আরও চমকৃত হল, যখন সেই বৃদ্ধ বাতাসীর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, তুমি তুলসি না? ডাক নাম কাঁদুনী? পাশের ছেলেটিকে বলল, তুমি ভূধর না? তার পাশের ছেলেটিকে বলল, তুমি তো একলাস? আর তুমি মঈনুদ্দিন?

একে-একে প্রত্যেকের বাবা-মায়ের নাম নির্ভুল বলে গেল সে। তখন আর সন্দেহ রইল না যে, এই লোকটিই প্রকৃত চূড়ামণি। সে নতুনদের চেনে না পুরোনোদের চেনে।

তেঁতুলছড়ি গ্রামে পৌঁছবার আগেই আরও কিছু কাণ্ড হয়ে গেল চূড়ামণিকে নিয়ে। কয়েক পা করে হাঁটার পরই সে বসে পড়ে আর হাত-পা ছড়িয়ে কেঁদে বলে, ওগো, আমায় নিয়ে যাচ্ছ কেন? ডাকাত তাড়াবার মতন শক্তি কি আমার আছে? আমি যে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি!

কিন্তু বাতাসীরা তখন তাকে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। এ বুড়োকে দিয়ে ডাকাত আটকান যাবে না ঠিকই, কিন্তু এতকালের প্রবাত-প্রসিদ্ধ চূড়ামণিকে দেখে গ্রামের মানুষ আবার তো নতুন করে গল্পের উপাদান পাবে! একটা মানুষ হারিয়ে গিয়েছিল, সে আবার ফিরে এসেছে, এ রকম ঘটনা গ্রামে তো সচরাচর ঘটে না। চূড়ামণির একটা অদ্ভুত ক্ষমতা তত তারা একটু আগে নিজের চোখেই দেখল।

তেঁতুলছড়ি গ্রামে পৌঁছবার প্রায় এক ক্রোশ আগে চূড়ামণি হঠাৎ বেশ স্বাভাবিক হয়ে উঠল। নেশার ঘোর কেটে যাচ্ছে। অন্যদের হাত ছাড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সে বলল, এ আমি কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি? তোমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাকে?

বাতাসী বলল, ঠাকুর, তুমি ফিরে যাচ্ছ তোমার নিজের গ্রামে। তোমার গ্রামের নাম তেঁতুলছড়ি, মনে নেই? চূড়ামণি জিগ্যেস করল, সেখানে কী ভালোবাসা আছে? বাতাসী চট করে উত্তর দিতে পারল না। অন্যরাও নিরুত্তর। ভালোবাসার কথা কেউ জানে না।

চূড়ামণি গান গেয়ে উঠল, যে দেশে ভালোবাসা নাই, সে দেশে বাসা নাই আমার! আমি তেঁতুলছড়ি গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম কেন জানিস? সেখানে কেউ কারুকে ভালোবাসে না।

বাতাসী চূড়ামণির হাত ধরে সকাতরে বলল, চূড়ামণি ঠাকুর, আমাদের বড় বিপদ, তুমি আমাদের বাঁচাও। তোমাকে সবাই ভালোবাসবে।

চূড়ামণি আকাশের দিকে আঙুল তুলে চেঁচিয়ে বলল, তুমি ওই! তুমি ওই! কে কাকে বাঁচায়? কে কাকে মারে? মানুষ নিজেকেই নিজে মারে। নিজেকেই নিজে বাঁচায়।

বাতাসী এবার হাঁটু গেড়ে চূড়ামণির পা চেপে ধরল।

চুড়ামণির একদৃষ্টে চেয়ে রইল তার দিকে। আবার তার চোখ ছলছল করে আসছে। তার মুখে। কথা নেই। সন্ধের আকাশ জুড়ে কালি-কালি মেঘ। অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে গাছপালা। বাঁশ বনে শোনা যাচ্ছে শেয়ালের রা।

চূড়ামণি একটুক্ষণ স্থির হয়ে থেকে কাতরভাবে বলল, আমার শরীরের তাগ কমে গেছে। তোরা একটু-একটু ভালোবাসা দিলে যদিশক্তি ফিরে পাই! দিবি? তোরা ভালোবাসা দিবি?

বাতাসী বলল, আমার বুকে যত ভালোবাসা আছে সব তোমায় দেব।

গঙ্গাধর, কামাল, মাণিকচন্দ্র, সঈফুদ্দিনরাও বলল, হ্যাঁ দেব, হ্যাঁ দেব।

চূড়ামণি হাত বাড়িয়ে বলল, দে, ভালোবাসা দে!

এমনভাবে কী ভালোবাসা দেওয়া যায়! মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল সকলে।

চূড়ামণি এগিয়ে গিয়ে একটা বাঁশঝাড়ের সামনে দাঁড়াল। একটা বাঁশ ধরে টানাটানি করে বলল, দ্যাখ, বুড়ো হয়ে গেছি, হাড় ঝুনো হয়ে গেছে, শরীরে বল নাই। তোরা ভালোবাসা দে, তবে যদি মনের বল ফিরে পাই! তোরা আমার গায়ে হাত বুলা।

তখন সবাই চূড়ামণিকে ঘিরে তার গায়ে হাত বুলোত লাগল। বাতাসী তার মুখখানা ঘষতে লাগল চূড়ামণির পিঠে।

আস্তে-আস্তে যেন চূড়ামণির শরীর সোজা হয়ে যেতে লাগল, খুলে গেল চুলের জট, চাপা পড়ে গেল হাতের শিরা-উপশিরা, চক্ষে ফুটে উঠল জ্যোতি।

চূড়ামণি হুংকার দিল, তুমি ওই! তুমি ওই!

তারপর একটানে সে পট করে তুলে ফেলল একটা মস্ত বড় বাঁশ।

তাই দেখে বাতাসী আর গঙ্গাধর আর কামালরা কাঁদতে লাগল ঝরঝর করে। তাদের ভালোবাসার যে এত জোর তা তারা নিজেরাই জানত না এতদিন!

চূড়ামণি বাঁশটাকে মাটিতে ফেলে উলটোদিকে ফিরে দু-হাত জোড় করে বলল, আমার গুরু কানা ফকির, তিনি সব দেখতে পান, তিনিও কাঁদছেন তোদের জন্য। বাবা, তুমি আর কেঁদো না, এরাই এখন আমায় সামাল দেবে।

আবার খানিক দূরে যাওয়ার পর চূড়ামণি দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, আমার যে বড় ক্ষুধা পেয়েছে। কে আমাকে খেতে দেবে? বাতাসী বলল, ঠাকুর, আর মাত্র দু-ক্রোশ পথ। তুমি গ্রামে গেলে সবাই তোমাকে খাবার দেবে।

চূড়ামণি বিহুলভাবে বলল, সবাই আমাকে খাবার দেবে? বলিস কী?

বাতাসী আর তার সঙ্গীরা একসঙ্গে বলল, হ্যাঁ ঠাকুর দেবে।

চূড়ামণি বলল, আমি যে অনেক খাই!

—তুমি যত চাও সব দেবে। তুমি পেট ভরে খেও।

—সত্যি দেবে? শেষে কথা ফিরাবি না তো?

ওরা গ্রামে পৌঁছোবার পর এমন হইচই পড়ে গেল যে, এদিক-ওদিকের গ্রামের লোক ভাবল ডাকাত এসেছে বুঝি!

ভিড় ঠেলেঠুলে একেবারে সামনে এসে ছিরু বৈরাগী বলল, হ্যাঁ, এই তো সেই মানুষ! বাতাসী অতদূর থেকে ধরে এনেছে, অসাধ্য সাধন করেছে মেয়েটা।

কিন্তু অনেকে মানতে চায় না। অনেকের চোখেই সন্দেহ। এই কি সেই অজেয় বীর চূড়ামণি। এই মাথার চুল পাকা, খসখসে বুড়ো? এরকম নেশাখোর চেহারার মানুষ তো যে-কোনও শ্মশানঘাটে দেখতে পাওয়া যায়!

তাদের চোখে চূড়ামণির চেহারা হবে নব কার্তিকের মতন। কোথায় সেই কপাট বুক, কোথায় সেই চোখের দীপ্তি! পঁচিশ বছর আগে যে উধাও হয়ে গেছে, সে কি আর ফিরে আসতে পারে?

তবু কেউ-কেউ বলল, হ্যাঁ, এই-ই সেই! অন্যরা প্রতিবাদ করে ওঠে। ঘর থেকে মেয়েরা ছুটে-ছুটে এসে ওই বুড়োকে দেখে থমকে যায়। হতাশায় তাদের মুখ ঝুলে পড়ে।

প্রতিবাদীর সংখ্যা বাড়তে থাকে ক্রমেই। বাতাসী আর তার সঙ্গীরা আসার পথে যা-যা অদ্ভুত ঘটনা দেখেছে তা বলতে যেতেই হা-হা করে হেসে উঠে অনেকে। এই অপদার্থটা এক পুকুর জল শুষে খেয়েছে, একটা আস্ত তলতা বাঁশ উপড়ে তুলেছে? গাঁজাখুরি গল্প বলার আর জায়গা। পাওনি? এই লোকটা তো গাঁজাখোর বটেই, বাতাসীরাও কি গাঁজা টেনে এসেছে কানা ফকিরের আখড়া থেকে?

চূড়ামণি কোনও কথা বলে না, কোনও সাড়া শব্দ করে না। ঠায় বসে থাকে অশখতলার চাতালে। ক্রমেই সে যেন বেশি বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। হই-হই চরমে উঠতে সে একপাশে ঢলে পড়ল। অজ্ঞান হল না মরেই গেল তা বোঝা গেল না।

চূড়ামণিকে গড়িয়ে পড়ে যেতে দেখে এক নিমেষে থেমে গেল গোলমাল। সবাই থমকে গেছে।

বাতাসীর মা কাঁদুনী ছুটে এসে চুড়ামণির বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাউহাউ করে বলে উঠল,

ওগো, তোমরা ওকে মেরে ফেললে? মানুষটা অ্যাদ্দিন বাদে ফিরে এল তাকে তোমরা কেউ কিছু দিলে না?

বাতাসীর মনে পড়ল, মানুষটা বলেছিল খিদে পেয়েছে!

ছিরু বৈরাগী বলল, ওর নাম ধরে ডাকো। ওকে ডাকলে ও জেগে ওঠে।

বাতাসীরও সেই কথাই মনে হল। কানা ফকিরের আশ্রমে নাম শুনেই চূড়ামণি উঠে বসেছিল।

সে চূড়ামণির কানের কাছে মুখ নিয়ে ডাকল, চূড়ামণি ঠাকুর! চূড়ামণি ঠাকুর! ফিরে এস!

আরও অনেকে সেই নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠল।

ছিরু বৈরাগী দু-হাত তুলে সকলকে উদ্দেশ করে বলল, সবাই ডাকো! সবাই ডাকো! জোরে, আরও জোরে।

দেখাই যাক না কী হয়, এই ভেবে যারা অবিশ্বাসী তারাও গলা মেলাল। যখন আর একজনও বাকি রইল না, সবাই সমস্বরে ডাকছে, তখন চোখ মেলল চূড়ামণি। আস্তে-আস্তে উঠে বসে বলল, আমায় ডাকছিলে কেন গো? আমি তো দিব্যি ফিরে যাচ্ছিলুম, কেন ডেকে আনলে?

ছিরু বৈরাগী বলল, মানুষটা এতদিন বাদে গ্রামে ফিরল, তোমরা কেউ ওকে একটু খেতেটেতে দেবে না? অন্তত একটু জল-মিষ্টি দাও!

বাতাসী বলল, চূড়ামণি ঠাকুর, তুমি আমাদের বাড়ি চল, তোমাকে ভাত বেঁধে খাওয়াব।

চূড়ামণি বাতাসীর চোখের দিকে তাকিয়ে তারপর মুখ ফিরিয়ে সমস্ত মানুষদের দেখল, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তুমি খাওয়াবে? তবে যে বলেছিলে, গ্রামের সব মানুষ আমায় খাওয়াবে? বাতাসীর মা কাঁদুনী বলল, আমরা কাঠকুডুনী, তবু তোমায় পেটভরা ভাত দিতে পারব। চলো ঠাকুর!

চূড়ামণি তবু বাতাসীকে জিগ্যেস করল, তুমি যে বলেছিলে, গ্রামের সব মানুষ খাওয়াবে? তুমি কথা রাখলে না।

তারপর অবুঝ শিশুর মতোন মাথা নেড়ে-নেড়ে সে বলতে লাগল, না, আমি খাব না। সবাই মিলে আমায় না খাওয়ালে আমি খাব না।

সবাই অবাক। একটা মানুষের জন্য সব বাড়িতে রান্না হবে নাকি? এ কি মানুষ না রাক্ষস?

ছিরু বৈরাগী বলল, আরে না, না, চূড়ামণি ঠাকুর সে কথা বলেনি। তোমরা সব বাড়ি থেকে পাঁচ দানা করে চাল দাও। তারপর সেই চাল একত্র করে একজন কেউ ফুটিয়ে দিক। তাহলেই সবাই মিলে খাওয়ান হবে।

একটা মাটির সরা নিয়ে বাতাসী আর অন্য ছেলেরা ঘুরল সব বাড়ি-বাড়ি। গ্রাম শেষ করে ঘুরে আসার পরেও, সেই সরা অর্ধেক ভরল না।

বাতাসী সেই সরাটা এনে ছিরু বৈরাগীর সামনে এসে খুব দুঃখী গলায় বলল, এইটুকু চালে কি এত বড় মানুষটার পেট ভরবে? তুমি কেন মাত্র পাঁচ দানা বললে?

সেই কথা শুনে চূড়ামণি মিটিমিটি হেসে ছিরু বৈরাগীর দিকে তাকাল। ছিরু বৈরাগী কপাল চাপড়ে বলল, ওরে, ভিক্ষের তণ্ডুল আমি ভালোই চিনি! সবাই পাঁচ দানা দেয়নি। কেউ-কেউ দিয়েছে তিন দানা, কেউ-কেউ দিয়েছে দু-দানা, কেউ-কেউ দিয়েছে ভুষি! যে গ্রামের মানুষ এত তঞ্চক হয়, সে গ্রামের মানুষকে ডাকাতে মারবে না তো কী?

তখন লজ্জা পেয়ে আরও অনেকে দু-দানা, তিন দানা করে চাল দিয়ে গেল। শুধু তিনজন এসে বলল, আমাদের ঘরে এক দানাও চাল নেই, ঠাকুর! দোষ দিও না। ইচ্ছে থাকলেও দেওয়ার সাধ্য নেই। আর একদিন দেব।

বাতাসী ভাত ভুটিয়ে এনে কলাপাতায় বেড়ে দিল। সঙ্গে একটু নুন, দুটি লঙ্কা। সেই ভাতই অমৃতের মতন খেল চূড়ামণি। তৃপ্তির সঙ্গে বলল, আঃ!

ছিরু বৈরাগী বলল, ঠাকুর, এবার তুমি একটু শোও। আজকের রাতটা ঘুমিয়ে নাও। কতদূর থেকে এসেছ? কাল সবকথা শুনো।

কিন্তু বিশ্রামের সময় পাওয়া গেল না। কয়েকজন ছুটতে-ছুটতে এসে আছড়ে পড়ে বলল, আসছে! আসছে! নদীর ওপারের মাঠে ধুলোর ঝড় এসেছে, ডাকাতরা আসছে।

সবাই একদৃষ্টে তাকাল চূড়ামণির দিকে। এইবার। আসল না নকল তার প্রমাণ দাও! দেখি তোমার কেমন মুরোদ!

বাতাসী ব্যাকুলভাবে বলল, ঠাকুর, ওঠো, ডাকাতরা আসছে।

চূড়ামণির মুখে ভয়ের ছায়া। শরীরটা যেন কুঁকড়ে যাচ্ছে। সে মাটিতে মিশে যেতে চায়।

বাতাসী তার হাত ধরে টেনে বলল, ঠাকুর, ওঠো! নদী পেরিয়ে ওরা এক্ষুনি এসে পড়বে।

চূড়ামণি কাতরভাবে বলল, আমি ঠাকুর নই, আমি শুধু চূড়ামণি। আমি কী করে পারব অতগুলো ডাকাতের সঙ্গে আমার যে শরীরে আর সেই শক্তি নেই। আমাকে তোমরা ভালোবাসা দাও!

বাতাসী অমনি উন্মাদিনীর মতন সকলের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ওগো, তোমরা সবাই এসো। চূড়ামণি ঠাকুরকে ভালোবেসে ছুঁয়ে দাও। হাত বুলিয়ে দাও।

ডাকাতরা এসে পড়ল বলে, আর দ্বিধা করার সময় নেই। সবাই ছুটে এসে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল চূড়ামণির গায়ে-মাথায়।

চূড়ামণি বলতে লাগল, আরও দাও, আরও ভালোবাসো। ভালোবাসায় আমার মন ভরে না! আরও দাও!

বাতাসী চুমো দিতে লাগল চূড়ামণির সারা শরীরে। তার দেখাদেখি অন্য মেয়েরাও। সে কী ব্যাকুলতা। যেন মাঝখানে চুড়ামণি নেই, সবাই সবাইকে চুমু দিচ্ছে।

হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে সবাইকে সরিয়ে উঠে দাঁড়াল চূড়ামণি। দু-দিকে দু-হাত ছড়িয়ে বলল, এবার আমি বল পেয়েছি! আর ভয় নেই।

সকলেই দেখল, চোখের নিমেষে যেন রূপান্তর হয়েছে চুড়ামণির। তার শরীরে ঝকঝক করছে তেজ। তার ম্লান মুখে ফুটে উঠেছে হাসি, সেরকম হাসি আগে কেউ কখনও দেখেনি। তার বুক যেন লোহার কপাট আর দুই হাত যেন মুদগর। মাথার চুল তো পাকা নয়, ধুলোবালি মাখা।

চূড়ামণি বলল, আমার অস্ত্র কই?

ডাকাতদের কাছে কত মারাত্মক অস্ত্র থাকে, তাদের বিরুদ্ধে চূড়ামণি একা খালি হাতে দাঁড়াবে কী করে? একটা অস্ত্র তো নিশ্চয়ই চাই। কিন্তু এ গ্রামে লাঠি-সোঁটা ছাড়া আর বিশেষ কিছু নেই। শুধু রতনমণির কাছে আছে একটা রাম দা। সে সেটাই এনে দিল।

চূড়ামণি বলল, শুধু ওতে তো হবে না। সকলের কাছ থেকে কিছু কিছু চাই। আর যদি কিছু না দিতে পার তো প্রত্যেকে মাথা থেকে একগাছা চুল ছিঁড়ে দাও!

সবাই পট-পট করে ছিঁড়তে লাগল মাথার চুল।

বাতাসী নিজের চুল ছিঁড়তে যেতেই কেঁপে উঠল তারা সারা শরীর। একটা সাজ্জাতিক ভয়ের তরঙ্গ। এই মানুষটা পারবে তো? ডাকাতরা এসে যদি এক কোপে এর মাথাটা কেটে ফেলে? সে ফিসফিস করে বলল, ঠাকুর, তুমি পালাও, তুমি পালাও! তুমি ডাকাতদের সামনে যেও না।

ডাকাতরা নদী পেরিয়ে এসেছে, কপাকপ শোনা যাচ্ছে ঘোড়ার পায়ের শব্দ। অন্য সবাই ভয়ে পালাচ্ছে ঘর বাড়ি ছেড়ে মাঠের দিকে।

চূড়ামণি বলল, এখন আর কোথায় পালাব? আর যে উপায় নেই!

বাতাসী বলল, তুমি কি পারবে ওদের সঙ্গে? একলা কি কেউ পারে? তোমায় ওরা ছাড়বে না!

চূড়ামণি বলল, পালালেই গ্রামের লোক কি আমায় ছাড়বে? আর যদি বা ডাকাতদের সঙ্গে পারি, কিন্তু তারপর আমার কী হবে? আমার ভয় করছে কীসের জানো, তারপর আর আমি মানুষ থাকব না। বাতাসী, আমার খুব মানুষ হয়ে থাকতে ইচ্ছে করে!

বাতাসী বলল, তুমি মানুষ থাকবে না তো কী হবে?

চূড়ামণি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, মাটি! মাটি!

মূল রাস্তার ওপরে এসে গেছে ডাকাতেরা। চূড়ামণি দৌড়ে মাঝ রাস্তায় বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে হুংকার দিল, তুমি ওই!

এই প্রথম দুর্ধর্ষ ডাকাতের দল থমকে গেল।

পরপর ছজন ঘোড় সওয়ার, তাদের সারা শরীর কালো কাপড়ে ঢাকা, তাদের মুখও দেখা যায় না। তাদের তিন জনের হাতে জ্বলন্ত মশাল।

চূড়ামণি নিজের মাথা থেকে একটা চুল ছিঁড়ে হাতের চুলের ডেলাটার সঙ্গে মেশাল। তারপর সেই ডেটা মাটিতে ছুড়ে দিয়ে বলল, তোরা আগে এইটা কাট, তারপর আমার মাথা কাটবি।

একজন ঘোড় সওয়ার ঘোড়া থেকে নেমে এগিয়ে এল। তার হাতে খোলা তলোয়ার। সে চুলের গোছাটা কাটার জন্য তলোয়ার তুলতেই অট্টহাসি করে উঠল চূড়ামণি। সে হাসিতে যেন মেঘের গর্জন। সে হাসিতে সমুদ্রের ঢেউ।

তলোয়ারের প্রচণ্ড কোপে সেই চুলের গোছার একটাও কাটল না। ডাকাতের সর্দারটি পরপর তিনটে কোপ লাগাল, চতুর্থ কোপে দু-টুকরো হয়ে গেল তার তলোয়ার।

চূড়ামণি আবার হেসে উঠে বলল, আর একটা অস্ত্র আন। এবারে আমার মাথায় একটা কোপ মেরে দ্যাখ কী হয়!

ডাকাতদের সর্দার ভাঙা তলোয়ারটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে চূড়ামণির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কম্পিত গলায় বলল, ঠাকুর, আমরা অনেক পাপ করেছি। তুমি আমাদের কী শাস্তি দেবে দাও। আমরা তোমারই অপেক্ষায় ছিলাম এতদিন।

চূড়ামণি তার ডান পা-টা তুলে ডাকাত সর্দারের মাথার ওপরে রাখল।

অন্য ডাকাতরা ঘোড়া থেকে নেমে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইল দূরে।

চূড়ামণি আর ডাকাত সর্দার সেই একই জায়গায় একই ভঙ্গিতে স্থির হয়ে রইল। আস্তে-আস্তে তাদের দুজনেরই শরীর থেকে খসে-খসে যেতে লাগল মাংস, তাদের হাড়ের খাঁচাটা হয়ে গেল কঞ্চির, তার ওপর লাগল মাটি আর রং।

যারা ভয় পেয়ে দূরে পালিয়ে গিয়েছিল, তারা ফিলে এল, কাছে এসে গোল হয়ে দাঁড়াল। কেউ কেউ উচ্চারণ করতে লাগল দোয়া, কেউ-কেউ নিয়ে এল ফুল আর বেলপাতা। শুধু বাতাসী ভাসল নয়নজলে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *