অজ্ঞাত রচনা

অন্তর্যামী

ভীমচাঁদ নিজের বাঁ হাতের উপর সজোরে ডান হাত চাপড়াইয়া তাহার ষোড়শী স্ত্রীর কাছে আস্ফালন করিয়া কহিল, ‘মানুষের মুখের পানে চেয়ে যদি তার মনের কথাই না জানতে পারলুম ত এ দুটো চোখ বৃথাই রাখি! ওগো আমাকে ফাঁকি দেওয়া সোজা কাজ নয় !’ তাহার স্ত্রী বিনোদিনী, রাগ করিয়া বলিল,...

একটি অসমাপ্ত গল্প

আচ্ছা, জ্যাঠামশাই? কেন মা? বলিয়া গোবিন্দ মুখুয্যে ভাগবত হইতে মুখ তুলিয়া পরম স্নেহে তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্রীর দিকে চাহিলেন। সুরমার দুই চোখে জল টলটল করিতেছিল। হাত দিয়া একগোছা কালো চুল মুখের উপর হইতে পিঠের দিকে সরাইয়া দিয়া মহা অভিমান ভরে অভিযোগ করিল,—আচ্ছা, সাহেবরা যদি এতই...

কোরেল

এক লন্ডন নগরের পঞ্চাশৎ মাইল উত্তরে কোরেল নামে একটি গ্রামে ক্ষুদ্র স্রোতস্বতীতীরস্থ দুইখানি অট্টালিকা গ্রামের শোভা শতগুণে বর্ধিত করিয়া রাখিয়াছিল। উভয়ের সৌন্দর্যে একটা সাদৃশ্য থাকিলেও একটি অপরটি অপেক্ষা এত বৃহৎ জমকাল এবং মূল্যবান যে, দেখিলে বোধ হয় যেন কোন রাজা তাঁহার...

দু’টি আবেদন

এক ভারতের সর্বাঙ্গীণ মুক্তি-আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেসই ছিল এতাবৎ একমাত্র রাজনীতিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ইহার শক্তি ছিল ক্ষুদ্র, উদ্যম ছিল অকিঞ্চিৎকর, পরিসর ছিল সঙ্কীর্ণ, এবং জীবন ছিল নৈরাশ্যপীড়িত, দেশের যৌবনশক্তি না যতদিন ইহাতে যোগ দিয়াছিল। ইহা যে অত্যুক্তি নয় একটু চিন্তা...

দুটি অসমাপ্ত প্রবন্ধ

এক দেশকে স্বাধীন করার প্রয়াস ‘ন্যারো ন্যাশনালিজম্‌’ ও নয়; ‘চাঊভিনিজম্‌’ ও নয়; বিশ্বমানবের হিতের জন্যই নিজের দেশ। যে দেশে জন্মেছি, মানুষ হয়েছি, সে দেশকে পরা-অধীনতার নিদারুণ অভিশাপ থেকে মুক্ত কোরব। আদর্শের উল্লেখ যখন কোরব তখনই বৃহৎ আদর্শ, কল্যাণের আদর্শ গৌরবের আদর্শের...

দেশসেবা

দেশসেবা কথার কথা নয় দেশসেবা মানবের শ্রেষ্ঠ সাধনা। স্বার্থ-গন্ধ থাকবে না, নাম-যশের আকাঙ্ক্ষা থাকবে না, প্রাণের ভয় পর্যন্ত থাকবে না, এক দিকে দেশসেবক নিজে, আর দিকে তার দেশ, মাঝে আর কিছু থাকবে না। যশ, অর্থ, দুঃখ, পাপ, পুণ্য, ভাল, মন্দ সব যে দেশের জন্য বলি দিতে পারবে,...

বামুনের মেয়ে’র নাট্যরুপ

প্রথম অঙ্ক দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক দুদিন পরে পথ্যি কোরেই আজ আবার কেন সেলাই নিয়ে বসলি মা? একটু শুগে না। সেলাই-এর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়াই কহিল, দুপুরবেলা আমি ঘুমোতে পারিনে মা। তা ছাড়া সন্ধ্যা ভারী তাগাদা করে পাঠিয়েছে, আজ এটা শেষ করে দিতেই হবে। কাল সকালেই হাট কিনা। এই সব...

বারোয়ারি উপন্যাস

একুশ অরুণের মুখে শাশুড়ীর ওই দুর্দান্ত অসুখের কথা শুনে কমলার দু’চক্ষু ছলছল করে এল। এবং বিশেষ করে সে যখন জানালে যে, জামাইবাবু নিরুদ্দেশ, হয়ত বা তিনি এখন হিমালয়ের কোন গুহার মধ্যে তপস্যায় নিযুক্ত, এবং তাঁকে একটা সংবাদ দেওয়া পর্যন্ত সম্ভবপর নয়, তখন সেই দুটি চোখ দিয়ে...

বিচার

এক রাঠোন রাজকুমারী যমুনাবাই ছেলেবেলায় তাহার পিতার ক্রোড়ে বসিয়া বলিত—‘বাবা, তুমি সিংহাসনে বসিয়া বিচার কর না কেন?’ অজয় সিংহ কন্যার শির চুম্বন করিয়া বলিতেন—‘মা, তোমার বুড়ো বাবার বড় ভুল হয়, তাই সে আর বিচার করে না—সিংহাসনে বসিয়া শুধু ক্ষমা করিতে ভালবাসে। তুমি যখন ঐ স্বর্ণ...

বিপ্রদাস-এর পরিত্যক্ত এক পৃষ্ঠা

মুখুয্যেমশাই, আমি সঙ্গে যাবো। বিপ্রদাস সবিস্ময়ে কহিল, কোথায়? বলরামপুরে? বন্দনা বলিল, নিয়ে যান ত রাজী আছি। কিন্তু এখন সে যাওয়ার কথা বলচি নে, বলচি দক্ষিণেশ্বরে যাবার, সাধুজীকে দেখবার ভারী ইচ্ছে হচ্ছে,—আর যদি আপত্তি না করেন ত মা-কালীকেও দর্শন করে আসবো। কিন্তু তুমি ত এ-সব...

ভালমন্দ

অবিনাশ ঘোষাল আরও বছর-কয়েক চাকরি করতে পারতেন কিন্তু তা সম্ভব হোলো না। খবর এলো এবারেও তাঁকে ডিঙিয়ে কে একজন জুনিয়ার মুনসেফ সব-জজ হয়ে গেল। অন্যান্য বারের মতো এবারেও অবিনাশ নীরব হয়ে রইলেন, শুধু প্রভেদ রইলো এই যে, এবারে তিনি ডাক্তারের সার্টিফিকেট সমেত অবসর গ্রহণের আবেদন...

মাতৃভাষা এবং সাহিত্য

গোড়াতেই বলিয়া রাখা ভাল, এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে আমি যে সাহিত্যের সকল দিক ও বিভাগ লইয়া প্রকাণ্ড একটা কাণ্ড বাধাইয়া দিতে পারিব, আমার এমন কোন মহৎ উদ্দেশ্য বা ভরসা নাই। তবে মাতৃভাষা এবং সাহিত্যের সাধারণ ধর্ম এবং প্রকৃতি এই ক্ষুদ্র স্থানে যতটা সম্ভব, আলোচনা করিবার চেষ্টা করিব...

শেষের পরিচয় – এর অপ্রকাশিত অংশ

‘শেষের পরিচয়’ – এর অপ্রকাশিত অংশ ষোল সারদাকে অপমান করিয়া তাহার ঘর হইতে ফিরিয়া রাখাল বাসায় আসিল। দাসী তখনো বাড়ি যায় নাই, কুকারে রান্নার সমস্ত ব্যবস্থা প্রস্তুত করিয়া তখনো সে অপেক্ষা করিতেছিল। রাখাল বলিল, আজ খাবো না নানী, ক্ষিদে নেই। রান্নার দরকার হবে না। ঝি রাগ করিয়া...

শ্রীকান্ত’র পরিত্যক্ত অংশ

‘শ্রীকান্ত’র পরিত্যক্ত অংশ ‘আরে যাঃ—এই ত বটে! মনে মনে প্রায় হাল ছাড়িয়া দিয়াছিলাম, বুঝি বা ইহজন্মে হাতের লেখা আর ছাপার অক্ষরে দেখা ঘটিল না! না, তা কেন? এই যে বেশ পথের সন্ধান মিলিয়াছে। আমি ভ্রমণ-বৃত্তান্ত লিখিব। এ বুদ্ধি এতদিন আমার ছিল কোথায়? দেখি, সবাই লেখে...

৫৭তম জন্মদিনে প্রতিভাষণ

৩১এ ভাদ্র—আমার জন্মদিনের আশীর্বাদ-গ্রহণের আহ্বান আমার স্বদেশের আপনজনদের কাছ থেকে প্রতি বৎসরই আসে, আমি শ্রদ্ধানত শিরে এসে দাঁড়াই; অঞ্জলি ভরে আশীর্বাদ নিয়ে বাড়ি যাই,—সে আমার সারা-বছরের পাথেয়। আবার আসে ৩১এ ভাদ্র ফিরে, আবার আসে আমার ডাক, আবার এসে আপনাদের কাছে দাঁড়াই। এমনি...