৩৫. আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা)-এর ইসলাম গ্ৰহণ

আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা)-এর ইসলাম গ্ৰহণ

ইমাম আহমদ (র) মুহাম্মদ ইবন জাফর সূত্রে আবদুল্লাহ ইবন সালাম থেকে বর্ণনা করেন : রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আগমন করলে লোকেরা দ্রুত তাঁর দিকে ছুটে আসে। যারা তার দিকে ছুটে আসে, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আমি তার চেহারা দেখেই চিনতে পারি যে, এটা কোন মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। আমি সর্বপ্রথম তাঁকে যে কথাটি বলতে শুনি, তা এই :

افسشوا السلام و اطعموا الطعام وصلوا بالليل و الناس نيام تدخلوا الجنة

بسلام“সালামের বিস্তার ঘটাও, লোকজনকে আপ্যায়িত কর, রাত্রিকালে নামায আদায় কর যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে, আর এর পরিণামে শান্তিতে জান্নাতে প্ৰবেশ করবে।” তিরমিয়ী ও ইবন মাজহ আওফ আল-আরাবী সূত্রে যুরোরা ইবন আবু আওফা থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেন এবং তিরমিয়ী হাদীছটিকে সহীহ’ বলেন। এ বর্ণনা থেকে প্রতিয়মান হয় যে, তিনি নবী করীম (সা)-এর পবিত্র মুখ থেকে তা শ্রবণ করেছেন এবং তিনি মদীনায় আগমন করে কুবায় বনু আমর ইবন আওফ-এর মহল্লায় অবস্থান করার প্রথম পর্যায়েই, যখন সেখানে উটি বসান, তখনই তাকে তা বলতে শুনেন এবং তাকে সরাসরি দেখেন আবদুল আয়ীয ইবন সুহায়ব সূত্রে আনাস-এর বর্ণনায় ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কুবায় থেকে বনু নাজ্জারের মহল্লায় আগমন করে উট বাঁধার সময়ই আবদুল্লাহ ইবন সালাম রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে মিলিত হন। সম্ভবত কুবায় যিনি নবী করীম (সা)-কে সর্বপ্রথম দেখতে পান এবং বনু নাজারের মহল্লায় তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। আল্লাহই ভাল জানেন।

বুখারীর বর্ণনায় আবদুল আষীয (র) আনাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন :

রাসূলুল্লাহ্ (সা) (মদীনায়) আগমন করলে আবদুল্লাহ ইবন সালাম উপস্থিত হয়ে বললেনআমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল এবং সত্য নিয়ে আপনি আগমন করেছেন। ইহুদীরা একথা ভাল করেই জানে যে, আমি তাদের নেতা এবং নেতার পুত্র এবং আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী ব্যক্তি এবং সবচেয়ে বড় জ্ঞানী ব্যক্তির সন্তান। আমি ইসলাম গ্ৰহণ করেছি একথা তারা জানার আগেই তাদেরকে ডেকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন। কারণ, তারা যদি জানতে পারে যে, আমি ইসলাম গ্ৰহণ করেছি, তাহলে তারা আমার সম্পর্কে এমন সব কথা বলবে, যা আমার মধ্যে নেই। সুতরাং আল্লাহর নবী (সা) তাদের নিকট বার্তাবাহক প্রেরণ করেন। তারা আসলে তিনি বললেন, : “হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! (তোমাদের জন্য আফসোস, তোমরা আল্লাহকে ভয় করা! যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, সে আল্লাহর শপথ, তোমরা অবশ্যই (একথা) জান যে, আমি সত্য সত্যই আল্লাহর নবী এবং (তোমরা একথাও জান যে,) আমি তোমাদের নিকট সত্য নিয়ে আগমন করেছি। সুতরাং তোমরা সকলে ইসলাম গ্ৰহণ কর! তারা বললো : আমরা তো তা জানি না। তারা নবী করীম (সা) সম্পর্কে একথা তিনবার বলে। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন : তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন সালাম কে? তিনি কেমন

সবচেয়ে বড় জ্ঞানী এবং সবচেয়ে বড় জ্ঞানীর পুত্র। তিনি বললেন, : আচ্ছা বল দেখি, তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন? (তবে কেমন হবে?)। তারা বললো : আল্লাহর পানাহ, তিনি মুসলমান হতে পারেন না। তিনি বললেন : “হে ইবন সালাম! বেরিয়ে এসো। তিনি বেরিয়ে এসে বললেন:

নিশ্চিত জানো যে, তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি সত্য নিয়ে আগমন করেছেন।” তখন তারা

বললো : তুমি মিথ্যা বলছো। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বের করে দেন। এ হল বুখারীর ভাষ্য। অন্য বর্ণনায় আছে : তিনি বেরিয়ে এসে সত্য সাক্ষ্য দান করলে তারা বলে : (এতো) আমাদের মধ্যে দুষ্ট লোক এবং দুষ্ট লোকের সন্তান। তারা তাকে গাল-মন্দ করে। তিনি বললেন। : ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটাই তো আমি আশংকা করছিলাম।

বায়হাকী হাফিয আবু আবদুল্লাহ সূত্রে … আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন :

আবদুল্লাহ ইবন সালাম তাঁর এক খামার থেকেই রাসূল (সা)-এর আগমন সম্পর্কে শুনতে পান। তখন তিনি নবী করীম (সা)-এর নিকট আগমন করে বলেন, : আমি আপনাকে তিনটি বিষয়ে প্রশ্ন করছি, কোন নবী ছাড়া কে এ কথাগুলো জানে না। (প্রশ্নগুলো এই— (১) কিয়ামতের প্রথম লক্ষণগুলো কি? (২)জান্নাতবাসীরা প্ৰথম কী খাদ্য খাবে? (৩) শিশু কখনো মায়ের অবয়বে। আবার কখনাে বাপের অবয়বে হয়, এর রহস্য কি? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : জিবরাঈল (আ) এইমাত্র আমাকে এসব বিষয়ে অবহিত কবেছেন। জিজ্ঞেস করলেন : জিবরাঈল? নবী করীম (সা) বললেন : হ্যা। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, : ইনি তো ফেরেশতাদের মধ্যে ইয়াহুদীদের দুশমন। এরপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করেন :

من كان عدو الجبريل فانه نزله على قلبك باذن الله

“যে ব্যক্তি জিবরীলের দুশমন এ জন্য যে, সে তোমার হৃদয়ে কুরআন পৌছিয়েছে আল্লাহর নির্দেশ্যে।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, : কিয়ামতের প্রথম আলামত হবে একটা আগুন, যা দেখা দেবে মানুষের উপর (অর্থাৎ মানুষের নিকট প্রকাশ পাবে) এবং লোকদেরকে চালিত করবে: প্ৰাচ্য থেকে প্রতীচ্যের দিকে। আর জান্নাতীরা প্ৰথম যে খাদ্য আহার করবে তা হবে মাছের কলিজা। আর শিশু সন্তান, যখন পুরুষের বীর্য নারীর বীর্যের উপর প্রবল হয়, তখন শিশু হয় পিতার অবয়বে, আর যখন নারীর বীর্য পুরুষের বীর্যের উপর প্রবল হয়, তখন সন্তান হয় মায়ের আকৃতির। তখন তিনি বললেন, : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল। ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইয়াহুদীরা হল বড়ই অপবাদপ্রবণ জাতি।

আপনি তাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পূর্বেই তারা যদি আমার ইসলামগ্রহণ সম্পর্কে জানতে পারে, তবে তারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ছড়াবে। তখন ইয়াহুদীরা উপস্থিত হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, : তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ কে? (অর্থাৎ সে কেমন লোক?) তারা বললো : সে আমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি এবং উত্তম ব্যক্তির সন্তান। আমাদের মধ্যে সে নেতা এবং নেতার পুত্র। তিনি বললেন, : তোমরা কী বল? সে যদি ইসলামগ্রহণ করে? তারা বলে : এ থেকে আল্লাহ তাকে রক্ষা করুন। তখন আবদুল্লাহ বের হয়ে বললেন :

اشهد ان لا الله الا الله وأشهد أن محمد ا رسول الله তারা বললো : সে আমাদের মধ্যে নিকৃষ্ট লোক এবং নিকৃষ্ট লোকের সন্তান-একথা বলে তারা তার ত্রুটি বর্ণনা করে। তখন তিনি বললেন, : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো এ আশংকাই করছিলাম। বুখারী আব্দ ইবন মুনীর সূত্রে আবদুল্লাহ ইবন আবু বকর (রা) থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেন। তিনি হামিদ ইবন উমর সূত্রে হুমায়দ থেকেও হাদীছটি বর্ণনা করেন।

পরিবারের জনৈক ব্যক্তির বরাতে তার ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার কাহিনী বর্ণনা করেন?

আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আগমনের কথা শুনতে পেলাম এবং তার নাম, গুণাবলী ও পরিচয় জানতে পারলাম এবং তাঁর যমানায় আমরা যার অপেক্ষায় ছিলাম, তখন আমি কুবায় বিষয়টি গোপন রেখে চুপচাপ ছিলাম। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় আগমন করেন। মদীনায় আগমন করে তিনি কুবায় বনু আমর ইবন আওফের মহল্লায় অবস্থান করেন। জনৈক ব্যক্তি এগিয়ে এসে তাঁর আগমন-বার্তা জানায়। এ সময় আমি খেজুর গাছের মাথায় কাজ করছিলাম। আর আমার ফুফু খালিদা বিনত হারিছ নীচে বসা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আগমনের খবর শুনে আমি তাকবীরধ্বনি দেই। আমার তাকবীরধ্বনি শ্রবণ করে আমার ফুফু। বললেন, তুমি মূসা ইবন ইমরানের আগমনের খবর শুনলে এর চাইতে জোরে তাকবীরধ্বনি দিতে না। তিনি বলেন, আমি তাকে বললাম, হে আমার ফুফু। আল্লাহর কসম, তিনি মূসা ইবন ইমরানের সমপর্যায়ের এবং তার দীন নিয়েই তিনি প্রেরিত হয়েছেন। তিনি বললেন, : হে ভ্রাতুষ্পপুত্ৰ! তিনি কি সে ব্যক্তি যার সম্পর্কে আমরা জানতাম যে, কিয়ামতের পূর্বে তাঁর আগমন ঘটবে? আমি বললাম, হ্যা। তিনি বললেন, তবে তিনিই সে ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর নিকট গেলাম, ইসলামগ্রহণ করলাম, এরপর আমার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে এসে তাদেরকে বললে তারাও ইসলামগ্রহণ করে। আমি আমার ইসলাম গ্রহণ ইয়াহুদীদের নিকট গোপন রাখি। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহুদীরা এক অপবাদপ্রবণ জাতি। আমি পসন্দ করি যে, আপনি আমাকে কোন গৃহে তাদের থেকে লুকিয়ে রাখবেন। এরপর আমার সম্পর্কে তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, আমি কেমন। আর এ কাজটা করবেন আমার ইসলাম গ্ৰহণ সম্পর্কে তারা জানিবার আগে। তারা এটা জানতে পারলে আমার সম্পর্কে অপপ্রচার চালাবে আর আমার দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করলে। আগের মতো ঘটনা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, এরপর আমার এবং আমার পরিবার-পরিজনের ইসলাম গ্রহণের কথা প্ৰকাশ করলাম এবং ফুফু খালিদা বিনত হারিছও ইসলাম গ্ৰহণ করলেন।

ইউনুস ইবন বুকােয়র মুহাম্মদ ইবন ইসহাক সূত্রে সাফিয়্যা বিনত হুয়াই-এর বরাতে বলেন : আমার পিতা এবং চাচার সন্তানদের মধ্যে কেউ তাদের উভয়ের নিকট আমার চেয়ে বেশী প্রিয় ছিল না। তাদের সন্তানদের মধ্যে তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করলে তারা আমাকেই অগ্রাধিকার দিতেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুবায় বনু আমর ইবন আওফের জনপদে আগমন করলে আমার পিতা এবং চাচা আবু ইয়াসির ইবন আখতাব ভোরে তার কাছে গমন করতেন (এবং রাতে ফিরে আসতেন)। আল্লাহর কসম, কেবল সূর্যস্তকালেই তারা ফিরে আসতেন। আমাদের নিকট। তারা আমাদের নিকট ফিরে আসতেন বিষন্ন মনে, ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে, পড়ন্ত অবস্থায় ধীরে ধীরে পদ-চারণা করে সাধারণত আমি সাহায্য বদনে তাদের নিকট আগমন করলে আল্লাহর কসম, তারা কারো দিকে তাকাতেন না। তখন আমি আমার চাচা আবু ইয়াসিরকে বলতে শুনতাম, তিনি আমার পিতাকে বলতেন : ইনিই কি তিনি? তিনি বলতেন, হ্যা, আল্লাহর কসম! তিনি বলতেন : তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে কি তুমি জান? তিনি বলেন, হ্যা, আল্লাহর কসম। তিনি

বললেন, তাহলে তাঁর ব্যাপারে তোমার মনের কী অবস্থা? তিনি বললেন, : আল্লাহর শপথ,

মূসা ইবন উকবা যুহরী সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় আগমন করলে আবু ইয়াসির ইবন আখতাব তাঁর নিকট গিয়ে তাঁর কথা শুনেন এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলে নিজ জাতির নিকট ফিরে এসে বলেন, হে আমার জাতির লোকেরা! তোমরা আমার আনুগত্য কর, কারণ, তোমরা যার অপেক্ষায় ছিলে, আল্লাহ তোমাদের নিকট তাকে প্রেরণ করেছেন। তোমরা তাঁর অনুসরণ করবে, বিরোধিতা করবে না। তখন তার সহোদর হুয়াই ইবন আখতাব—যিনি তখন ইয়াহুদীদের সরদার বা নেতা,আর এরা উভয়েই ছিল বনু নায়ীরের লোক, রাসূলুল্লাহ (সা)–এর কাছে গিয়ে বসল এবং তার কথা শুনলো, এরপর তার জাতির নিকট ফিরে এলে—আর সে ছিল জাতির মধ্যে মান্যবর-—সে বললো :

আমি এমন এক ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি, আল্লাহর কসম, আমি চিরকাল তার শত্রুই থাকরো। (তার মুখে একথা শুনে) তার ভাই আবু ইয়াসির বললো : হে আমার সহোদর ভাই! এ ব্যাপারে। আমার আনুগত্য কর আর পরে যা খুশী আমার অবধ্যতা-নাফরমানী করবে। তবে নিজেকে ধ্বংস করবে না। সে বললো: না। আল্লাহর কসম, আমি কখনো তোমার আনুগত্য করবো না। শয়তান তার উপর আধিপত্য বিস্তার করে এবং তার জাতি তারই মতামতের

অনুসারী হয়।

আমি বলি, আবু ইয়াসিরের নাম হুয়াই ইবন আখতাব ১ তার কী শেষ পরিণতি হয়েছিল আমার জানা নেই। তবে সাফিয়্যার পিতা হুয়াই ইবন আখতাব নবী করীম (সা) এবং তার সাহাবীগণের প্রতি শক্রিতা ছিল মজ্জাগত। এটাই ছিল তার অভ্যাস। তার প্রতি আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক। বনু কুরায়যার যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সম্মুখে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তার এ অভ্যাসের পরিবর্তন হয়নি। বনু কুরায়যার যুদ্ধের আলোচনায় তার সম্পর্কে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *