৩১. আনসারদের শ্রেষ্ঠত্ব

আনসারদের শ্রেষ্ঠত্ব

বুখারী এবং মুসলিম শরীফে শু’বা সূত্রে আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন :

আনসারগণের সমস্ত বংশের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে বনু নাজ্জার, তারপর বনু আবদুল আশাহাল, তারপর বনু হারিছ ইবন খাযরাজ, তারপর বনু সাইদা। আনসারগণের সকল জনপদেই মঙ্গল আর কল্যাণ নিহিত আছে। সাআদ ইবন উবাদা বলেন? আমি দেখি যে, নবী করীম (সা) আমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তখন বলা হলো, তোমাদেরকেও অনেকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এটা বুখারীর শব্দমালা। অনুরূপভাবে ইমাম বুখারী ও মুসলিম আনাস ও আবু সালামা সূত্রে এবং আবু হুমায়দ সূত্রে নবী করীম (সা) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। আবু হুমায়দের বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে। তখন আবু উসায়দ সাআদ ইবন উবাদাকে বলেন : তুমি কি দেখ না যে, নবী করীম (সা) আনসারগণকে শ্রেষ্ঠ আখ্যা দিয়েছেন আর আমাদেরকে তাদের মধ্যে সকলের শেষে স্থান দিয়েছেন। তখন সাআদ নবী করীম (সা)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আনসারদের জনপদকে আপনি শ্রেষ্ঠত্ব দিযেছেন এবং আমাদেরকে সকলের শেষে স্থান দিয়েছেন। তিনি বললেন :

او لیسه یحسبکم ان تکونوا من الاخیار ؟

“তোমরা সর্বোত্তমদের অন্তর্ভুক্ত থাকবে, এটা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয়?” সমস্ত

মদীনাবাসী মুসলমানদের মধ্যে আনসারগণ দুনিয়া এবং আখিরাতে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন :

والسابقون الأولون من المهاجرين والأنصار والذين اتبغوهم باخستانر رضي اللهٔ عنهم و رضا و اعنه و اعد لهم جنئاتر تجاری تحتها الانهار خالدین فیها ذالك الفوز العظيمমুহাজির-আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি প্ৰসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে। রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত, যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এটা মহাসাফল্য (৯ : ১০০)।

মহান আল্লাহ আরো বলেন : والذين تبؤاً الدار والايمان من قبلهم يحبون من هاجر اليهم ولا يجدون فى صدورهم حاجة مما أوتوا ويؤثرون على أنفسهم ولو كان بهم خصاصة ومن

. یوق شیخ نف به فأولئك هم المفلحون. আর তাদের জন্যও, মুহাজুিরদের আগমনের পূর্বে যারা এ নগরীতে বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে। তারা মুহাজিরদের ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে সে জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না, আর যারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্ৰাধিকার দেয় নিজের অভাবগ্ৰস্ত হলেও। মনের কার্পণ্য থেকে যাদেরকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম (@88)1

আর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন :

لولا الهجرة لكنت امرأ من الانصار ولو سلك الناس واديا وشعيا لسلكت

وادی الانصار و شسعبهم الانصار شعار و الناس دثار–‘হিজরত না হলে আমি হতাম। একজন আনসারী ব্যক্তি। আর মানুষ কোন গিরিপথ দিয়ে

চললে আমি চালতাম। আনসারদের উপত্যকা ও গিরিপথ দিয়ে। আনসাররা প্ৰতীক পোশাক

স্বরূপ আর সাধারণ লোকেরা সাধারণ চাদর স্বরূপ।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন :

الانصار کر ش و عیبتی “আনসাররা হল আমার একান্ত আপনজন আর নির্ভর-স্থল।”

انا سلم لسمن سالسمهم و حرب لمن حار بهم – যারা আনসারদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করে আমিও তাদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করি, আর যারা আনসারদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়, আমিও তাদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হই।”

হাজ্জাজ ইবন মিনহাল সূত্রে বারা” ইবন আযিবা (রা) থেকে বর্ণনা করে ইমাম বুখারী (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন :

الانصار لا يحبهم الا مؤمن ولا يبغضهم الا منافق

“মু’মিন ছাড়া অন্য কেউ আনসারদেরকে ভালবাসে না। আর মুনাফিক ছাড়া কেউ আনসারদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না। যে আনসারদেরকে ভালবাসে আল্লাহ তাকে ভালবাসেন; আর যে আনসাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, আল্লাহ তাকে অপসন্দ করেন।” শূবা সূত্রে আবু দাউদ ছাড়া সিহাহ সিত্তােহর অন্যান্য সংকলকগণ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।

ইমাম বুখারী মুসলিম ইবন ইবরাহীম আনাস ইবন মালিক থেকে, আব্ব তিনি নবী করীম (সা) থেকে বর্ণনা করেন :

أية الايمان حب الانكسار و أبة النفاق بغض الانصار

“আনসারকে ভালবাসা ঈমানের লক্ষণ আর আনসারকে ঘূণা করা নিফাকের লক্ষণ।” ইমাম বুখারী আবুল ওয়ালীদ সূত্রেও হাদীছটি বর্ণনা করেন। আনসারদের ফয়ীলত। আর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে প্রচুর আয়াত এবং হাদীছ রয়েছে। আনসারদের অন্যতম কবি আবু কায়স সুরমা ইবন আবু আনাস, যার সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে—তিনি আনসারগণের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আগমন, তার প্রতি তাদের সাহায্য-সহায়তা এবং রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণের প্রতি আনসারগণের সহানুভূতি বিষয়ে কী চমৎকার কবিতাই না রচনা করেছেন। তাদের সকলের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকুন।

ইবন ইসহাক বলেন, : আবু কায়স সুরমা ইবন আবু আনাস ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা আনসারগণকে যে মর্যাদা দান করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মাধ্যমে আনসারগণকে, যে বৈশিষ্ট্য দান করেছে সে সম্পর্কে তিনি কবিতা রচনা করেছেন :

ثونی فی قریش ة بضع عشرة حجة–یذکرلو یلقی صدیقا مواتیا তিনি কুরায়শের মধ্যে ১৩ বছরের অধিক কাল অবস্থান করেন।

তিনি তাদেরকে উপদেশ দেন। যদি মিলে একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী।

و یعرض فی اهل المواسم نفسهفلم یر من یوزوی و لم یر داعیا

হজের মওসুমে লোকদের মধ্যে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করতেন; কিন্তু তিনি দেখেননি কোন আশ্রয়দাতা, পাননি কোন আহবানকারী।

فلما اتانا و اطمانت به النوی–واصبح مسرو را بطیبة راضیا

তিনি যখন আসেন আমাদের কাছে আর স্থিত হয় তাঁর সওয়ারী। আর তিনি তুষ্ট হন মদীনা তায়্যিবা দ্বারা এবং সন্তুষ্ট হন।

তিনি লাভ করেন সঙ্গী আর তুষ্ট হয় তাঁকে নিয়ে বাহন। আর আসে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট সাহায্য।

يقصب لنا ما قال نوج القومه – و ما قال موسى اذ اجاب المناديا তিনি আমাদের নিকট কাহিনী বর্ণনা করেন, যা করেছেন নূহ (আঃ) তাঁর জাতির নিকট। আর যা বলেছেন মূসা (আ), যখন তিনি সাড়া দেন আহবায়ককে।

فاصبح لایبخشی مسن الناس و احدا–قریبا و لا یخشی مسن الناس انسانیا ফলে তিনি ভয় করেন না মানুষের মধ্যে কাউকেও, না কাছের কোন মানুষকে, না দূরের কোন মানুষকে।

بذلناله الاموال سن جل۔ مالنا–وانفسنا عند الوغی و التا سیا আমাদের সম্পদ থেকে আমরা তাঁর জন্য প্রচুর ব্যয় করি। লড়াই আর সমবেদনাকালে আমরা বিলিয়ে দিয়েছি আমাদের জীবন।

যারা তার সঙ্গে শত্ৰুতা করে আমরা তাদের সকলের সঙ্গে শক্রিতা করি, যদিও সে অন্তরঙ্গ বন্ধু হোক না কেন।–

ونعلم ان الله لا شئ غيره – وان کتاب الله اصبح هاديا আমরা জানি যে, আল্লাহ আছেন, তিনি ছাড়া অন্য কিছু নেই। আর আল্লাহর কিতাব, তা-ই তো কেবল পথ-নির্দেশক।

اقوالی اذا صلیت فی کلی بیعة–حنانیل لا تظاهر علینا الا عادیا যখন আমি সালাত আদায় করি সকল পবিত্ৰ স্থানে, তখন আমি বলি, চাপিয়ে দিও না আমাদের উপর দুশমনদেরকে।

اقول اذا جاوزت ارضا مخيفة – تباركت اسم الله انت المواليا আমি বলি, যখন আমি অতিক্রম করি ভীতিপ্ৰদ অঞ্চল; পবিত্ৰ আল্লাহর নাম, তুমিই তো মাওলা।

  • فطاً معرضا ان الحتوف كثيرة–وانك لا تبقى لنفسك باقيا তাই তুমি এগিয়ে চল বিপদ উপেক্ষা করে, মৃত্যুর উপলক্ষ তো প্রচুর, তুমি তো রক্ষা করতে পারবে না নিজেকে চিরদিন।,

فوالله مایدری الفتی کیف سعیه–اذا هولم یجعل له الله و اقیا আল্লাহর শপথ, যুবক জানে না। কী তার চেষ্টার পরিণতি; যদি আল্লাহ তার জন্য হিফাযতকারী নিয়োগ না করেন।

و لا تحفل النخل المعيمة ر بها – اذا اصبحت ريا و اصبح ناو يا বালুকাময় স্থানের খেজুর গাছও তোয়াক্কা করে না তার মালিকের, যখন সে হয় তৃপ্ত, যখন সে দাঁড়ায় নিজের পায়ে।

ইবন ইসহাক প্রমুখ কবিতাটি উল্লেখ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবন যুবােয়র আল-হুমায়াদী প্রমুখ সুফিয়ান ইবন উয়ায়না, ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আনসারী সূত্রে এক আনসারী বৃদ্ধার উদধূতি দিয়ে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসকে এ কবিতমালা বর্ণনাকালে সুরমা ইবন কায়স-এর নিকট আসা-যাওয়া করতে দেখেছি। ইমাম বায়হাকী বর্ণনাটি উদধূত করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *