৩০. ইবন ইসহাকের আরো একটা বৰ্ণনা

ইবন ইসহাকের আরো একটা বৰ্ণনা

ইবন ইসহাক ইয়ায়ীদ ইবন আবু হাবীব সূত্রে আবু আইউব (রা) থেকে বর্ণনা করেন :

রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন আমার গৃহে উঠেন, তখন তিনি নীচের তলায় অবস্থান করেন। আমি এবং উন্মু আইউব (অর্থাৎ আমার স্ত্রী) অবস্থান করি উপর তলায়। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন!! আমি উপর তলায় থাকবাে। আর আপনি থাকবেন নীচতলায়, এটা আমার নিকট অসহ্য এবং জঘন্য বেয়াদবী। তাই আমি চাই যে, আপনি উপরে চলে আসুন এবং আমি নীচে নেমে যাই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন :

হে আবু আইউব! আমি ঘরের নীচতলায় অবস্থান করলে তাহবে। আমি এবং যারা আমাদের কাছে আসা-যাওয়া করবেন, তাদের জন্য সুবিধাজনক। তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) গৃহের নীচতলায় অবস্থান করলেন, আর আমরা অবস্থান করতে থাকি উপর তলায়। একদিন একটা বড় পানির পাত্র ভেঙ্গে গেল যাতে পানি ছিল। তখন আমি এবং উম্মু আইউব একটা চাদর বা লেপ নিয়ে দাঁড়ায়। আর আমাদের ঘরে কেবল একটা চাদর ছিল—যাতে চাদর পানি চুষে নেয়, যেন তা

8\–

নীচে রাসূলের গায়ে পতিত হয়ে তাকে কোন কষ্ট না দেয়। বর্ণনাকারী আবু আইউব বলেন : আমরা রাসূল (সা)-এর রাত্রের খাবার পাকাতাম এবং তার কাছে প্রেরণ করতাম। তিনি খাবার খেয়ে বাড়তি অংশ ফেরত পাঠালে বরকতের আশায় আমি এবং উম্মু আইউব খুঁজে বেড়াতাম কোথায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাত পড়েছে। যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাত পড়েছে, বরকতের আশায় আমরা সেখান থেকে খেতাম। এক রাত্রে আমরা তার জন্য খাবার পাঠালাম, তাতে ছিল রসুন, বা পিয়াজ। ফলে তিনি খাবার ফেরত পাঠালেন। আমরা তাতে তার হাত দেয়ার কোন চিহ্নই দেখতে পেলাম না। বর্ণনাকারী বলেন, আমি ব্যাকুল হয়ে তার কাছে ছুটে আসি এবং আরয করি : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গ, আপনি রাত্রের খাবার ফেরত দিয়েছেন, তাতে আপনার হাত রাখার চিহ্ন পেলাম না। তিনি বললেন : আমি খাদ্যে এ গাছের গন্ধ পেয়েছি। আমি তো এমন এক ব্যক্তি, যে সঙ্গোপনে কথা বলে (আল্লাহ বা ফেরেশতার সঙ্গে)। তবে তোমরা তা খেতে পোর। বর্ণনাকারী আবু আইউব (রা) বলেন, আমরা তা আহার করি, কিন্তু পরবর্তীকালে আমরা আর তাঁর খাদ্যে পিয়াজ-রসুন ব্যবহার করিনি।

অনুরূপভাবে ইমাম বায়হাকী লায়ছ ইবন সাআদ সূত্রে আবু আইউব (রা) থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেন। আবু বকর ইবন শায়াবাও ইউনুস ইবন মুহাম্মদ আল-মুআদাব সূত্রে লায়াছ (র) থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেন।

ইমাম বায়হাকী (র)-ও আফলাহ এর বরাতে আবু আইউব থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেন। আবু আইউব বিচলিত হয়ে উপরে রাসূলের নিকট গিয়ে জানতে চাইলেন : রসুন কি হারাম! রাসূল বললেনঃ

না, হারাম নয়, তবে আমি তা পসন্দ করি না। তখন আবু আইউব বললেন, : আপনি যা অপসন্দ করেন, আমিও তা অপসন্দ করি। রাবী বলেন, নবী (সা)-এর নিকট ফেরেশতা আগমন করতেন। আহমদ ইবন সাঈদ সূত্রে ইমাম মুসলিম হাদীছটি বর্ণনা করেন। বুখারী এবং মুসলিম শরীফে হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণনা প্রমাণিত আছে যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট বন্দরে—অন্য বর্ণনায় বদর (এন)-এর স্থলে কিদূর (১১) অর্থাৎ ডেগ আছে—কিছু সবজি তরকারি হাযির করা হলে বর্ণনাকারী বলেন, তিনি জানতে চাইলেন তাতে কী আছে? তা তাকে জানান হয়। তিনি দেখে তা খাওয়া অপসন্দ করলেন। তবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেনঃ

তুমি খেতে পার। কারণ, আমি এমন সত্তার সঙ্গে সঙ্গোপনে কথা বলি, যাদের সঙ্গে

তোমরা কথা বল না।

ওয়াকিদী বর্ণনা করেন যে, আবু আইউবের গৃহে রাসূলুল্লাহ্ (সা) অবস্থানকালে আসআদ

ইবন যুরোরা সেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে অবস্থান করেন এবং আবু আইউব রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উটনীর রশি ধারণ করেন আর উটনীটি তাঁর নিকটই রয়ে যায়।

হযরত যায়দ ইবন ছাবিত (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, : রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আবৃ আইউবের গৃহে অবস্থানকালে সর্বপ্রথম তাঁর সমীপে যে হাদিয়া পেশ করা হয়, তা আমি বহন করে আনি। তা ছিল একটা পেয়ালায় কিছু রুটি এবং দুধ ও ঘি দ্বারা তৈয়ার করা ছারাদ। আমি বলি, আমার আম্মা এ পেয়ালা প্রেরণ করেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন :

بارك الله فيك

“আল্লাহ তোমাতে বরকত দান করুন।” এ বলে তিনি তার সাহাবীদেরকে ডাকলে তারা সকলে আহার করেন। এরপর আসে। হযরত সাআদ ইবন উবাদার ছারোদ আর গোশতের শুরুয়া ভর্তি পেয়ালা। এমন কোন রাত ছিল না, যে রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ঘরের দরজায় হাদিয়ার খাদ্যবাহী তিন-চারজন একের পর এক উপস্থিত থাকতেন না। আবু আইউবের গৃহে রাসূলুল্লাহ (সা) সাত মাস অবস্থান করেন। বর্ণনাকারী বলেন, : আবু আইউবের গৃহে অবস্থানকালেই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আযাদকৃত গোলাম যায়দ ইবন হারিছ এবং আবু রাফি’কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) দুটি উট এবং ৫শ’ দিরহামসহ প্রেরণ করেন রাসূলের কন্যাদ্বয় ফাতিমা আর উন্মু কুলছুম, নবী-সহধর্মিণী সাওদা বিনত যামআ এবং উসামা ইবন যায়দকে নিয়ে আসার জন্য। আর

আবুল আস ইবন রাবী’র সঙ্গে। তাদের সঙ্গে আগমন করেন যায়দ ইবন হারিছার স্ত্রী উন্মু

বকর, তাদের মধ্যে উন্মুল মু’মিনীন আইশা সিদীকা (রা)-ও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তখনো উন্মুল মু’মিনীন আইশা (রা)-এর সঙ্গে বাসর করেননি।

ইমাম বায়হাকী আলী ইবন আহমদ সূত্রে আবদুল্লাহ ইবন যুবােয়র থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় আগমন করলে জাফর ইবন মুহাম্মদ ইবন আলী এবং হাসান ইবন যায়দ-এর গৃহের মধ্যস্থলে তাঁর উটনীটি বসে পড়ে। তখন লোকেরা হাযির হয়ে তাদের নিজ নিজ ঘরে নবী করীম (সা)-কে আহবান জানান। শেষ পর্যন্ত তিনি আবু আইউবের ঘরে উঠেন। আবু আইউব আনসারী উটের পৃষ্ঠে বসার গদি তাঁর গৃহে নিয়ে যান। এরপর জনৈক ব্যক্তি এসে আরয করেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কোথায় অবস্থান করবেন? প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দিলেন :

ان الرجلی مع رحله حیث کان

“মানুষ সেখানেই থাকে, যেখানে তার বাহনের গদি থাকে।” রাসূলুল্লাহ (সা) কুবায়

মসজিদ নির্মাণ পর্যন্ত ১২ রাত্রি ছাপড়ায় অবস্থান করেন। আবু আইউব খালিদ ইবন যায়দের

এক বিরাট সম্মান ও মর্যাদার বিষয় যে, তাঁর গৃহেই মদীনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) অবস্থান করেছিলেন।

ইয়াখীদ ইবন আবু হাবীব সূত্রে মুহাম্মদ ইবন আলী ইবন আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, আবু আইউব বসরায় আগমন করলে তখন সেখানে ইবন আব্বাস

ছিলেন আলী ইবন আবু তালিবের পক্ষ থেকে বসরার শাসক। ইবন আব্বাস (রা) তাঁর গৃহ

রাসূলুল্লাহকে তাঁর গৃহে সসম্মানে বরণ করেছিলেন। ঘরের সবকিছুই তার হাতে তিনি তুলে দিয়েছিলেন। তিনি ফিরে আসতে মনস্থ করলে ইবন আব্বাস (রা) তাঁকে ২০ হাজার (দিরহাম) এবং :০টি গোলাম দান করেন। আর আবু আইউবের গৃহ পরবর্তীকালে তাঁর আযাদকৃত গোলাম আফলাহ-এর গৃহে পরিণত হয়। পরবতীকালে মুগীরা ইবন আবদুর রহমান ইবন হারিছ ইবন হিশাম, তার নিকট থেকে গৃহটি এক হাজার দীনারের বিনিময়ে ক্রয় করেন এবং তা মেরামত করে মদীনার নিঃস্বদেরকে তা দান করেন।

অনুরূপভাবে বনু নাজারের মহল্লায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অবস্থান এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য তা অবলম্বন করা এটাও এক বিরাট ফয়ীলতা ও মর্তবার ব্যাপার। মদীনায় ছিল অনেক পল্লী, যার সংখ্যা নয় পর্যন্ত পৌঁছে। বসবাসের গৃহ, খেজুর বাগান, খেতি-খামার আর বাসিন্দাসহ এসব পল্লী রীতিমত একেকটি মহল্লা ছিল। সেখানকার প্রতিটি গোত্র নিজেদের মহল্লা আর জনপদে সমবেত হয়ে পরস্পর সম্পৃক্ত জনপদে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য আল্লাহ তা’আলা বনু মালিক ইবন নাজ্জারের মহল্লাকে মনােনীত করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *