২৬. আকাবার দ্বিতীয় শপথ

আকাবার দ্বিতীয় শপথ

ইবন ইসহাক বলেন, তারপর মুসআব ইবন উমােয়র মক্কায় ফিরে এলেন। তার সাথে আনসারী হাজীগণ এবং তাদের সম্প্রদায়ের মুশরিক হজ্জ সম্পাদনে ইচ্ছুক ব্যক্তিরাও। তারা সকলে মক্কায় উপস্থিত হলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে তাদের কথাবার্তা হল যে, আইয়ামে তাশরীকের মধ্যবতী দিবসে অর্থাৎ ১২ই যিলহাজ্জ তারিখে তারা আকাবা নামক স্থানে একত্রিত হবেন। তাদেরকে মহিমান্বিত করার জন্যে, নবী (সা)-কে সাহায্য করার জন্যে এবং ইসলাম ও মুসলমানদেরকে বিজয়ী করার জন্যে আল্লাহ তা’আলা এই সময়টি তাদের জন্যে নির্ধারিত করেছিলেন ।

মা বাদ ইবন কাআব ইবন মালিক আমাকে জানিয়েছেন যে, তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবন কাআব তাকে জানিয়েছেন। এই আবদুল্লাহ ছিলেন আনসারীদের একজন বড় আলিম । বস্তৃত আবদুল্লাহ বলেছেন যে, তাঁর পিতা তাকে জানিয়েছেন, তিনি আকবার শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাতে তখন বায়আত হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, আমাদের সম্প্রদায়ের মুশরিক হাজীদেরকে নিয়ে আমরা সবাই মক্কায় রওনা হলাম। আমরা তখন নামায পড়তাম এবং দীনের জ্ঞান অর্জন করতাম। আমাদের সাথে ছিলেন। আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বারা ইবন মা’রূর। মদীনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে আমরা যখন যাত্রা করলাম, তখন বারা (রা) বললেন, হে লোক সকল! আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি— তোমরা আমার সাথে একমত হবে কিনা আমি জানি না। আমরা বললাম, “সিদ্ধান্তটা কী ?” তিনি বললেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এই গৃহকে অর্থাৎ কা’বাগৃহকে আমি পেছনে রাখতে পারব না। আমি বরং ওই কা’বাগৃহের দিকে মুখ করেই নামায আদায় করব। আমরা বললাম, আমরা তো জানি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সিরিয়ার দিকে (বায়তুল মুকাদামের দিকে) মুখ করেই নামায আদায় করেন। সুতরাং আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিপরীত কাজ করব না। বারা” (রা) বললেন, আমি কা’বা গৃহের দিকে মুখ করেই নামায আদায় করব। আমরা বললাম, আমরা কিন্তু তা করব না। এরপর নামাযের সময় হলে আমরা নামায পড়তাম সিরিয়ার (বায়তুল মুকাদাসের) দিকে মুখ করে আর তিনি নামায আদায় করতেন কা’বার দিকে মুখ করে। এভাবে আমরা মক্কা এসে পৌছি।

মক্কায় এসে তিনি আমাকে বললেন, ভাতিজা! তুমি আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট চল । সফরে আমি যা করেছি। সে সম্পর্কে আমি তার কাছে জানতে চাইব। কারণ, আমি যা করেছি। সে সম্পর্কে আমার মনে একটু খটকা সৃষ্টি হয়েছে এজন্যে যে, আমি তোমাদের সকলের উল্টো কাজ করেছি। বর্ণনাকারী কাআব (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে বিষয়টি জানার জন্যে আমরা তার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমরা কিন্তু তখনও তাকে চিনতাম না এবং ইতোপূর্বে তাঁকে কোন দিন দেখিনি। পথে মক্কার এক লোকের সাথে আমাদের দেখা হয়। আমরা তাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। সে বলল, আপনারা কি তাঁকে চিনেন ? আমরা বললাম, না, তাকে আমরা চিনি না। সে বলল, তবে তার চাচা আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবকে চিনেন ? আমরা বললাম, “হ্যা, আমরা তাকে চিনি। আব্বাস নিয়মিত ব্যবসায়িক কাজে মদীনা যেতেন বলে আমরা তাকে চিনতাম। লোকটি বলল, আপনারা মাসজিদুল হারামে প্ৰবেশ করলে দেখতে পাবেন যে, আব্বাস-এর সাথে একজন লোক বসা আছেন। তিনিই রাসূলুল্লাহ্ (সা)। আমরা মসজিদে প্রবেশ করে দেখলাম, আব্বাস বস আছেন এবং তার সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-ও বসা আছেন। আমরা সালাম দিলাম এবং তার কাছে গিয়ে বসলাম। আব্বাসের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, হে আবুল ফযল। আপনি কি এ দু’জনকে চিনেন? আব্বাস বললেন, হ্যা, চিনি। ইনি হচ্ছেন গোত্রপতি বারা” ইবন মা’রূর আর উনি হচ্ছেন কাআব ইবন মালিক। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, কবি কাআব? আব্বাস বললেন, হ্যা, তাই। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যে বলেছেন “কবি কাআব” তা আমি কোন দিন ভুলবো না।

এরপর বারা ইবন মা’রূর বললেন, হে আল্লাহর নবী! আল্লাহ তা’আলা আমাকে ইসলামের পথে হিদায়াত করেছেন। আমি ইসলাম গ্ৰহণ করেছি। আমি যখন এই সফরে বের হই, তখন আমার মনে একটি ভাব জন্মে যে, এই কা’বাগৃহকে পেছনে রাখা সমীচীন হবে না। ফলে আমি বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ না করে বরং কা’বা গৃহের দিকে মুখ করেই নামায আদায় করেছি। আমার সাথীগণ সকলে আমার বিপরীত কাজ করেছে; অর্থাৎ তারা কা’বা গৃহকে পেছনে রেখে বায়তুল মুকাদাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করেছেন। ফলে এ বিষয়ে আমার মনে খটকার সৃষ্টি হয়েছে। এখন এ বিষয়ে আপনার মতামত কি? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তুমি তো একটা কিবলারই (বায়তুল মুকাদাসের) অনুসারী ছিলে–যদি তুমি তাতে অবিচল থাকতে! বৰ্ণনাকারী বলেন, এরপর বারা” (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অনুসৃত কিবলার অভিমুখী হলেন এবং আমাদের সাথে সিরিয়া অভিমুখী (বায়তুল মুকাদাসমুখী) হয়ে নামায আদায় করতে লাগলেন। তাঁর পরিবারের লোকজন মনে করে যে, মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কা’বামুখী হয়ে নামায আদায় করেছেন। আসলে তা ঠিক নয়। তাঁর অবস্থান সম্পর্কে ওদের চেয়ে আমরা বেশী জানি।

বর্ণনাকারী কাআব ইবন মালিক বলেন, এরপর আমরা হজের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ি এবং ১২ই যিলহাজ আকাবা তে তার সাথে সাক্ষাত করব বলে কথা দিয়ে যাই। আমরা হজ শেষ করি। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে সাক্ষাতের ওই রাতটি আসলো। আমাদের সাথে ছিলেন। আমাদের সমাজপতি আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম আবু জাবির। তিনি তখনাে মুশরিক। আমাদের সাথী মুশরিকদের থেকে আমরা আমাদের কার্যক্রম গোপন রাখতাম। আমরা আমাদের সমাজপতি ও নেতা আবদুল্লাহ ইবন আমরের সাথে একান্তে কথা বলি। আমরা বললাম, হে আবু জাবির! আপনি আমাদের অন্যতম নেতা এবং সন্ত্রান্ত ব্যক্তি। আপনি যে পথে আছেন, সে পথে থেকে আখিরাতে জাহান্নামের জ্বালানি হবেন তা হতে আমরা আপনাকে রক্ষা করতে চাই। এরপর আমরা তাকে ইসলামের দাওয়াত দেই এবং আকাবায়ে আমাদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আসন্ন বৈঠকের কথা তাকে অবহিত করি। তিনি ইসলামগ্রহণ করেন এবং আমাদের সাথে আকাবায় উপস্থিত হন। তিনি একজন অন্যতম নকীব হন।

ইমাম বুখারী বলেন, ইবরাহীম ……. জাবির (রা) সূত্রে বলেন, তিনি বলেছেন, আমি আমার পিতা এবং আমার মামা আকাবায় শপথ গ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলাম। আবদুল্লাহ ইবন

মুহাম্মদ বলেন যে, ইবন উয়ায়না বলেছেন, শপথ গ্রহণকারীদের একজন হলেন বারা” ইবন মা’রূর। জারির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বলেছেন, “আমার দুই মামা আমার সাথে আকাবার শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

ইমাম আহমদ (র) বলেন, আবদুর রাযযাক ….. জাবির (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় ১০ বছর অবস্থান করেছিলেন। তখন তিনি লোকজনকে দাওয়াত দেয়ার জন্যে তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়েছেন। উকায মেলা উপলক্ষে মাজান্না বাজারে এবং হজ্জের মওসুমে তিনি মানুষের নিকট গিয়েছেন এবং বলেছেন, “আমাকে কে আশ্রয় দেবে, আমাকে কে সাহায্য করবে, যাতে করে আমি আমার প্রতিপালকের দেয়া রিসালাতের বাণী পৌছাতে পারি? যে আশ্রয় দেবে, যে সাহায্য করবে, সে জান্নাত পাবে। কিন্তু তাঁকে আশ্রয় দেয়ার মতও সাহায্য করার মত কাউকে তিনি পেলেন না। কখনো কখনো ইয়ামান থেকে লোক আসত। মুদার গোত্র থেকে লোক আসত। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের নিকট যেতেন এবং আপন বক্তব্য পেশ করতেন। সাথে সাথে তারই গোত্রের লোকজন এবং তারই আত্মীয়-স্বজন ওই লোকের নিকট উপস্থিত হত এবং বলত কুরায়শী এই বালক থেকে আপনারা সতর্ক থাকবেন। সে যেন আপনাদেরকে বিভ্রান্ত করতে না পারে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর বক্তব্য নিয়ে

ও কটুক্তি করত। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা ইয়াছরিব থেকে আমাদেরকে তাঁর নিকট পাঠালেন। আমরা তাকে সত্য বলে গ্রহণ করলাম এবং তাকে আশ্রয় দিলাম। এরপর আমাদের একেকজন তার নিকট যেত। তাঁর প্রতি ঈমান আনত। তিনি তাকে কুরআন পড়াতেন। সে লোক তার পরিবারের নিকট ফিরে আসত এবং তার ইসলামের বদৌলতে তার পরিবারের লোকজন ইসলাম গ্ৰহণ করত। অবশেষে এমন হয়ে গেল যে, আনসারদের ঘরে ঘরে, মহল্লায় মহল্লায় মুসলমানদের জামাআত সৃষ্টি হয়ে গেল। তারা প্রকাশ্যে ইসলামের কথা বলতে লাগল। তারা সকলে এ বিষয়ে পরামর্শ করল যে, আর কত দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে মক্কায় রাখব যে, তিনি মক্কার পাহাড়ে-পর্বতে ঘুরে বেড়াবেন আর ভয়-ভীতির মধ্যে দিন গুজরান করবেন? আমাদের ৭০ জন লোক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নিয়ে আসার জন্যে রওনা হলেন। হজ্জের মওসুমে তারা তার নিকট গিয়ে পৌঁছলেন। আকাবার গিরি সংকটে তার সাথে আমাদের সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত হল। যথা সময় একজন দু’জন করে আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। শেষ পর্যন্ত আমরা সকলে সেখানে সমবেত হলাম। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন বিষয়ে আমরা আপনার হাতে বায়আত করব? তিনি বললেন, তোমরা আমার হাতে বায়আতি করবে যে, সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় তোমরা আমার কথা শুনবে, আমার নির্দেশ পালন করবে। অভাবের সময়, সচ্ছলতার সময় সর্বসময়ে তোমরা আল্লাহর পথে দান-সাদাকা করবে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিবে। আর অসৎ কাজ থেকে বারণ করবে। তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির পক্ষে কথা বলবে, আল্লাহর পক্ষে কথা বলতে গিয়ে, কাজ করতে গিয়ে কোন ভৎসনাকারীর ভৎসনার তোয়াক্কা করবে না। তোমরা এ বিষয়েও বায়আত করবে যে, তোমরা আমাকে সাহায্য করবে এবং তোমাদের নিকট আমি যখন যাই, তখন তোমরা আমাকে তেমন ভাবে নিরাপত্তা দিবে, যেমনটি নিরাপত্তা দাও তোমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের স্ত্রী-পুত্রদেরকে। বিনিময়ে

তোমরা জান্নাত পাবে। তার হাতে বায়আত হবার জন্যে আমরা উঠে দাঁড়ালাম। তখনি আসআদ ইবন যুরারা এসে তার হাতে হাত রাখলেন। তিনি আমাদের ৭০ জনের ছোটদের অন্যতম ছিলেন। অবশ্য আমি তার চেয়েও ছোট ছিলাম। তিনি বললেন, হে ইয়াছরিবের অধিবাসিগণ। থামুন, আমরা উটের পিঠে আরোহণ করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছি এজন্যে যে, আমরা বিশ্বাস করি তিনি আল্লাহর রাসূল। তবে কথা হল, আজ যদি আপনারা তাকে এখান থেকে নিয়ে যান, তবে আরবদের সকলেই আপনাদের শক্র হয়ে যাবে। আপনাদের নেতৃস্থানীয় লোকগুলো নিহত হবেন। তীক্ষ্ণ তরবারি আপনাদের গর্দান উড়াবে। এ পরিস্থিতিতে আপনারা যদি এই অঙ্গীকারে অবিচল থাকতে পারেন, অটল থাকতে পারেন, তবে তাকে নিয়ে যাবেন, ফলশ্রুতিতে আল্লাহর নিকট সাওয়াব পাবেন। আর যদি আপনারা নিজেদের ব্যাপারে শংকিত হয়ে থাকেন, তাঁর পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদানে অক্ষমতার ভয় করেন, তবে তাকে রেখে যান। আল্লাহর নিকট ওযর পেশ করার জন্যে এটিই হবে সহজতর। উপস্থিত লোকজন বলল, হে আসআদি! তুমি সরে যাও, আমরা এই বায়আত ত্যাগ করব না এবং কস্মিনকালেও এর বরখেলাপ করব না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সম্মুখে দাঁড়ালাম এবং তার হাতে বায়আত হলাম। তিনি আমাদের থেকে কিছু শর্ত ও অঙ্গীকার আদায় করলেন আর বিনিময়ে আমাদেরকে জান্নাত লাভের প্রতিশ্রুতি দিলেন।

ইমাম আহমদ ও বায়হাকী (র) দাউদ ইবন আবদুর রহমান আত্তার……. আবু ইদরীস থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম (র)-এর শর্ত অনুযায়ী এটি একটি উত্তম সনদ, যদিও তিনি এ হাদীছ তাঁর সহীহ গ্রন্থে উদধূত করেননি। বায়যার বলেছেন, একাধিক ব্যক্তি ইবন খায়ছম থেকে এ হাদীছ বৰ্ণনা করেছেন। তবে এই সনদ ব্যতীত অন্য কোন সনদে জাবির (রা) থেকে এ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

ইমাম আহমদ (র) বলেন, সুলায়মান ইবন দাউদ. জাবির (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, উক্ত অনুষ্ঠানে আব্বাস রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাত ধরে রেখেছিলেন আর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের থেকে সুদৃঢ় অঙ্গীকার নিচ্ছিলেন। আমরা যখন অঙ্গীকার প্রদান শেষ করলাম, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, 5-1.1,–৫, ২। —আমি কিছু অঙ্গীকার আদায় করেছি এবং কিছু কথা দিয়েছি।

বাষযার বলেন, মুহাম্মদ ইবন মামার…….. জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনসারী নকীবগণকে বললেন, “……..”, ‘g8’, —তোমরা কি আমাকে আশ্রয় দিবে এবং আমাকে নিরাপত্তা দিবে? নকীবগণ বললেন, “হ্যা, তা দেবো বটে, বিনিময়ে আমরা কী পাব? তিনি বললেন তোমরা বিনিময়ে জান্নাত পাবে। বাযযার বলেন, জাবির (রা) থেকে এই সনদ ব্যতীত অন্য কোন সনদে এ হাদীছটি বর্ণিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

ইবন ইসহাক বলেন… কাআব ইবন মালিক বলেছেন, এই রাতে আমাদের লোকদের সাথে আমরা আমাদের তাঁবুতে ঘুমিয়ে পড়ি। রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে প্রতিশ্রুত সাক্ষাতের জন্যে আমরা তাঁবু হতে বেরিয়ে পড়ি। আমরা

বের হলাম চুপি চুপি অতি সন্তৰ্পণে যেমন বেরিয়ে আসে বিড়াল। আমরা সকলে আকাবায় গিয়ে একত্রিত হলাম। আমরা ছিলাম ৭৩ জন পুরুষ। আমাদের সাথে দু’জন মহিলাও ছিল। একজন উন্মু আম্মারা নাসীবাহ বিনত কাআবা। সে বনু মাযিন। ইবন নাজ্জার গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বিতীয়জন আমর ইবন আব্দী ইবন নাবীর কন্যা আসমা। তিনি ছিলেন বনু সালামা গোত্রের মেয়ে। তার উপনাম ছিল উন্মু মানী”। ইবন ইসহাক ইউনুস ইবন বুকয়ারের বর্ণনার মাধ্যমে আকাবায় উপস্থিত লোকদের নাম ও বংশ পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। যে সকল বর্ণনায় এসেছে যে, তারা ৭০ জন ছিলেন, সে বর্ণনা সম্পর্কে বলা যায় যে, আরবগণ সংখ্যা বর্ণনায় সাধারণত দুই দশকের মধ্যবতী খুচরা সংখ্যাগুলো ছেড়ে দিত। সে হিসেবে আলোচ্য বর্ণনাগুলোতে ৭০-এর অতিরিক্ত সংখ্যাগুলো বাদ পড়েছে।

উরওয়া ইবন যুবােয়র ও মূসা ইবন উকবা (রা) বলেছেন, আকাবায় উপস্থিত ছিলেন ৭০ জন পুরুষ এবং একজন মহিলা। তন্মধ্যে :০ জন ছিলেন প্রবীণ আর ৩০ জন যুবক। সবার ছােট ছিলেন আবু মাসউদ ও জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা)।

কাআব ইবন মালিক বলেন, আকাবার গিরিসঙ্কটে উপস্থিত হয়ে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আগমনের অপেক্ষায় ছিলাম। এক সময় তিনি এলেন। তাঁর সাথে ছিলেন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব। আব্বাস তখনাে তার পিতৃধর্মের অনুসারী ছিলেন। তবে ভাতিজা মুহাম্মদ (সা)-এর সম্পর্কে গৃহীতব্য সিদ্ধান্তে উপস্থিত থাকতে তিনি আগ্রহী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পক্ষে সুদৃঢ় অঙ্গীকার নেয়াও তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) এসে বসলেন। প্রথম কথা বললেন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব। তিনি বললেন, “হে খাযরাজের লোকজন! আরবগণ আনসারীদের আওস ও খাযরাজ উভয় গোত্রকে খাযরাজ গোত্ৰ নামে ডাকত। তাদের উদ্দেশ্যে আব্বাস বললেন, আমাদের মধ্যে মুহাম্মদ (সা)-এর অবস্থা সম্পর্কে তোমরা অবগত আছ। আমাদের মতবাদে বিশ্বাসী লোকদের হাত থেকে আমরা কিন্তু তাকে নিরাপত্তা দিয়েছি। ফলে আপনি সম্প্রদায়ের মধ্যে সে তাদের ধরা-ছোয়ার বাইরে এবং আপন শহরে সে নিরাপদ রয়েছে। এখন সে তোমাদের সাথে মিলিত হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তোমরা যদি মনে কর যে, মুহাম্মদ (সা)-কে দেয়া প্রতিশ্রুতিসমূহ তোমরা পুরোপুরি পালন করতে পারবে এবং বিরোধিতাকারীদের হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে পারবে, তবে ভাল। আর যদি তোমরা মনে করা যে, শেষ পর্যন্ত তোমরা তাকে রক্ষা করতে পারবে না। বরং বিরুদ্ধবাদীদের হাতে তুলে দেবে এবং তাকে লাঞ্ছিত করবে, তবে এখনই তাকে রেখে যাও, কারণ, নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে আপন দেশে সে সম্মান ও নিরাপত্তার মধ্যে আছে। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা আব্বাসকে বললাম, আপনার কথা আমরা শুনেছি। ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)-এবার আপনি কথা বলুন এবং আপনার প্রতিপালকের পক্ষে আমাদের থেকে যত অঙ্গীকার নিতে চান, নিন।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) কথা বললেন। তিনি কুরআন তিলাওয়াত করলেন, আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিলেন এবং ইসলামের প্রতি উৎসাহিত করলেন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের অঙ্গীকার নেবো যে, তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের স্ত্রী-পুত্ৰকে যেভাবে রক্ষা কর, আমাকেও সেভাবে রক্ষা করবে। বারা ইবন মারূর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাত ধরে ফেললেন এবং বললেন,

যে মহান সত্তা আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন তার শপথ করে বলছি, আমাদের স্ত্রীদেরকে আমরা যেভাবে রক্ষা করি আপনাকেও অবশ্যই সেভাবে রক্ষা করব। সুতরাং ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাদেরকে বায়আত করান। আল্লাহর কসম, আমরা তো যোদ্ধা জাতি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা যুদ্ধ পেয়ে আসছি। বারা কথা বলছিলেন, এরই মধ্যে আবু হায়ছাম ইবন তায়হান বলে উঠল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এখন আমাদের মাঝে এবং স্থানীয় সম্প্রদায় ইয়াহুদীদের মাঝে একটি মৈত্রী চুক্তি আছে। আপনার অনুসরণ করতে গিয়ে আমরা ওই চুক্তি ভঙ্গ করব। পরে আপনি এমন কিছু করবেন নাকি যে, আমরা যদি এই চুক্তি ভঙ্গ করি এবং আপনাকে নিরাপত্তা দেই তারপর আল্লাহ তা’আলা আপনাকে সার্বিক বিজয় দান করেন, তাহলে আপনি আমাদেরকে ছেড়ে আপনার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে আসবেন? তার কথায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুচকি হাসলেন এবং বললেন :

بل الرم الدم والهدم الهدم آنا منگم و انتم منی أحارب من حار بتُمْ وأسالم

من سالمنامঅর্থাৎ আমার জীবন তোমাদের জীবন, আমার ধ্বংস তোমাদের ধ্বংস। আমি তোমাদের তোমরা আমার। তোমরা যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। আর তোমরা যার সাথে সন্ধি করবে। আমি তার সাথে সন্ধি করব। কাআব (রা) বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আমাকে তোমাদের মধ্য থেকে ১২ জন প্রতিনিধি নির্বাচন করে দাও। তারা তাদের সম্প্রদায়ের উপর দায়িত্বশীল হবে। তারা খাযরাজ গোত্র থেকে ৯ জন এবং আওস গোত্ৰ

থেকে ৩ জন— মোট ১২ জন প্রতিনিধি বাছাই করে দিলেন ইসলামের ইতিহাসে এই বারোজন নকীবরূপে পরিচিত।

ইবন ইসহাক বলেন, ওই বারো জন হলেন পূর্বোল্লিখিত আবু উমাম আসআদি ইবন যুরোরাহ, সাআদ ইবন রাবী (ইবন আমর ইবন আবু যুহায়র ইবন মালিক ইবন মালিক ইবন ইমরুল কায়স ইবন মালিক ইবন ছ’লাবা ইবন কাআব ইবন খাযরাজ ইবন হারিছ। ইবন খাযরাজ, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ইবন ইমরুল কায়স ইবন আমর ইবন ইমরুল কায়স ইবন

রাফি’ ইবন মালিক ইবন আজলান, বারা ইবন মা’রূর ইবন সাখার ইবন খানসা ইবন সিনান

হারাম ইবন ছ’লাবা ইবন হারাম ইবন কাআব ইবন গানাম ইবন কাআব ইবন সালামা), পূর্বোল্লিখিত উবাদা এর সামিত, সাআদ ইবন উবাদা (ইবন দালীম ইবন হারিছা ইবন খুযায়মা ইবন ছ’লাবা ইবন তারীফ ইবন খাযরাজ ইবন সাইদ ইবন কাআব ইবন খাযরাজ), মুনযির ইবন আমার খুনায়াস ইবন হারিছ। লুযান ইবন আবদূন্দ (ইবন যায়দ ইবন ছা’লাবা ইবন খাযরাজ ইবন সাইদ ইবন কাআব ইবন খাযরাজ (রা)। এই নয় জন হলেন খাযরাজ গোত্ৰভুক্ত।

আওস গোত্রের ছিলেন তিনজন। তারা হলেন (১) উসয়দ ইবন হুযায়র (ইবন সিমাক ইবন আতীক ইবন রাফি’ ইবন ইমরুল কায়স ইবন যায়দ ইবন আবদুল আশাহাল ইবন জােশম ইবন খাযরাজ ইবন আমর ইবন মালিক ইবন আওস) (২) সাআদ ইবন খায়৷ছামা (ইবন হারিছ

ইবন ইমরুল কায়স ইবন মালিক ইবন আওস (৩), রিফাআ ইবন আবদুল মুনযির (ইবন যানীর ইবন যায়দ ইবন উমাইয়া ইবন যায়দ ইবন মালিক ইবন আওফ ইবন আমর ইবন আওফ ইবন মালিক ইবন আওস।

ইবন হিশাম বলেন, বিদ্বান ব্যক্তিগণ উপরোল্লিখিত রিফা আর স্থানে আবু হায়ছাম ইবন তায়হানকে গণ্য করেন। ইবন ইসহাক থেকে ইউনুস সূত্রে বর্ণিত বর্ণনায়ও তাই রয়েছে। সুহায়লী এবং ইবনুল আহীর তার উসদুল গাবায়ও তা সমর্থন করেছেন। এই বক্তব্যের প্রমাণ স্বরূপ ইবন হিশাম, আবু যায়দ আনসারী থেকে বর্ণিত কাআৰ ইবন মালিকের কবিতাটি পেশ করেন। আকাবার দ্বিতীয় শপথের রাতে উপস্থিত ১২জন প্রতিনিধি সম্বন্ধে কাআব ইবন মালিক

বলেছেন :

آبلغ ابیا آنهٔ قال ر آیهٔ–وحان غداة الشغب و الحین واقع–উবায়কে জানিয়ে দাও যে, তার অভিমত ও পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে এবং তা সম্পূর্ণই ধ্বংস হয়েছে আকাবার শপথ দিবসে। ধবংস তো তাদের উপর আপতিত হবেই।

یہ ممبر . イ」* 、イ」 、イ 」イ : * سمی م ع .3 می تن حمص

তোমার মন যা কামনা করেছে আল্লাহ তা’আলা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। মানুষের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে তিনি সদা সতর্ক। তিনি সব দেখেন, সব শুনেন।

و ابلغ ابا سفیان آنهٔ قد بدالنا–بأحمر نور من هادی الله ساطع

আবু সুফিয়ানকে জানিয়ে দাও যে, আহমাদ (সা)-এর সাথে সাথে আমাদের নিকট আল্লাহ তা’আলার হিদায়াতের প্রদীপ্ত আলো প্ৰকাশিত হয়েছে।

فلا ترغبن فی حشد. آمار ثریده–و آلب و جمیع کل ما آنت جامعসুতরাং তুমি যে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কামনা করছ, তা পূর্ণতা লাভের আশা করোনা। তুমি যত ইচ্ছা প্ৰস্তুতি নাও, যা ইচ্ছা সংগ্ৰহ কর তাতে কোন কাজ হবে না।

3 ممبر سمجمہ سمہ محی

তুমি এটাও জেনে রেখো যে, মুহাম্মাদ (সা)-এর সাথে সম্পাদিত আমাদের শপথ ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করার জন্যে তুমি যে প্রস্তাব ও প্ররোচনা দান করেছ। আমাদের দল তা প্রত্যাখ্যান করেছে। যখন তারা অঙ্গীকার করেছে, তখনই তোমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

১. ব্র্যাকেটের অংশটি সীরাতে ইবন হিশামে নেই।

أباه البراء وابن عمرو كلاهما – وأسعد يأباه عليك ورافع= বারা” এবং ইবন আমরা দু’জনেই তোমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। আসআদি এবং রাফি”ও তা প্ৰত্যাখ্যান করেছেন।

و سغد آباه السسَاعدیت ومنذر – لأنفك ان حاولت ذلك جاد غসাআদ সাইদী তা প্ৰত্যাখ্যান করেছেন। মুনীযরও তা প্ৰত্যাখ্যান করেছেন। যদি তুমি ওই প্ৰস্তাব বাস্তবায়ন করতে চাও, তবে তোমার নাক কাটা যাবে।

وما ابن ربيع. إن تناولت عهده – بمسلميم لا يطمعن ثم طامع – তুমি যদি ইবন রাবীকে বায়আত ভঙ্গের প্রস্তাব দাও, তবে তিনি তা মানবেন না। সুতরাং কেউ যেন সে বিষয়ে লোভ না করে।

و ایضافلا یا غصب یکهٔ ابن رو احة–و اخفاره من دونهٔ السلام ناقع–ইবন রাওয়াহা তোমাকে তোমার কাম্য বস্তু দিবেন না। তাঁর আশ্রিত ব্যক্তির নিরাপত্তা বিয় করা তাঁর জন্যে পরিপূর্ণ বিষের ন্যায়। m

وفاء به والقوقلى بن صامت – بمندوحة عما تحاول يافعরাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেয়া অঙ্গীকার পূর্ণকরণ ও প্রতিশ্রুতি পালনে কাওকালী ইবন সীমিত উদারমনা ও মুক্তহস্ত। তুমি যা চাচ্ছি তা রহিতকরণে তিনি সদা প্ৰস্তুত।

آبو هيثم أيضا وفی بهبمثلها – وفاء بما أعطا مین العهد خانع আবু হায়ছামও অনুরূপ প্রতিশ্রুতি পালনকারী। যে অঙ্গীকার তিনি প্ৰদান করেছেন, তা পালনে তিনি অবিচল।

وما ابن حضير ان أردت بمطامع – فهل أنت عن أخموقة الغي نازغতুমি যদি চাও, তবু ইবন হুযায়র তোমাকে সে আশ্বাস দেবেন না। এখন গোমরাহীর বােকামি থেকে তুমি কি বেরিয়ে আসবে?

و سغد آخو عمرو بن عوف فانه–ضروح لما حاولت ملا آمار مانعআমর ইবন আওফ গোত্রের সাআদ, তুমি যা কামনা কর তা প্রতিরোধ করার জন্যে তিনি সদা প্ৰস্তুত।

أولاك نجوم لا يغيبك منهم – عليك بنحسر فى ذجى الليل طالعএই সব নক্ষত্রে অনুসরণ করাই তোমার জন্যে শ্রেয়। অন্ধকার রাতে আগমনকারী কোন অশুভ শক্তি যেন তোমাকে ওঁদের থেকে আড়াল করতে না পারে।

ইবন হিশাম বলেন, কাআব ইবন মালিক এই কবিতায় আকাবায় উপস্থিত লোকদের মধ্যে আবু হায়ছামার নাম উল্লেখ করেছেন। রিফাআর নাম উল্লেখ করেননি।

আমি বলি, কাআব ইবন মালিক তো এই কবিতায় সাআদ ইবন মু’আযের নামও উল্লেখ করেছেন। অথচ এই রাতে উপস্থিত প্রতিনিধিদের মধ্যে তিনি মোটেই ছিলেন না। ইয়াকুব ইবন সুফিয়ান মালিক থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আকাবার শপথের রাতে উপস্থিত আনসারদের ংখ্যা ছিল ৭০ ৷ তাদের নেতা মনোনীত হয়েছিলেন ১২ জন। ৯ জন খাযরাজ গোত্রের এবং ৩ জন আওস গোত্রের। জনৈক আনসারী প্ৰবীণ ব্যক্তি বলেছেন, আকাবার শপথের রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাদেরকে নেতা বানাবেন, জিবরাঈল (আ) ইঙ্গিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। উসায়দ ইবন হুযায়র (রা) সে রাতে একজন নকীব মনোনীত হয়েছিলেন। বায়হাকী এটি বর্ণনা করেছেন।

ইবন ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আবু বকর বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মনোনীত নকীবগণের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন :

سمہ,

کفيل على قومىনিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্যে আপনারা এক একজন দায়িত্বশীল ও যিম্মাদার, যেমন হাওয়ারিগণ ঈসা (আ:)-এর পক্ষে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্যে যিম্মাদার ছিলেন। আর আমি আমার সম্প্রদায়ের জন্যে যিম্মাদার। উপস্থিত সকলে তাতে সম্মতি প্ৰদান করেন।

আসিম ইবন উমর ইবন কাতাদ আমাকে জানিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে বায়আত হওয়ার জন্যে লোকজন যখন একত্রিত হলেন, তখন বনু সালিম ইবন আওফ গোত্রের

বিষয়ে তার হাতে বায়আত করতে যােচ্ছ তা কি তোমরা জান? উপস্থিত লোকজন বলল, হ্যা, জানি। তিনি বললেন, বস্তুত তোমরা বায়আত করছি এ বিষয়ে যে, তার কারণে তোমাদেরকে যুদ্ধ করতে হবে গোরা কালো সকল মানুষের বিরুদ্ধে। তোমরা যদি মনে কর যে, তোমরা বিপদে পড়লে, তোমাদের ধন-সম্পদ বিনষ্ট হলে এবং যুদ্ধে তোমাদের নেতৃস্থানীয় লোকজন নিহত হতে দেখলে, তোমরা তাকে শক্রর হাতে তুলে দেবে, তবে এখনই তাকে রেখে যাও। কেননা, তখন যদি তোমরা তাকে ছেড়ে যাও, তবে তা হবে তোমাদের ইহকাল-পরকাল উভয় জগতের জন্যে ক্ষতি ও লাঞ্ছনার কারণ। আর যদি তোমরা মনে কর যে, ধন-সম্পদ বিসর্জন

পূরণ করতে পারবে, তবে তোমরা তাঁকে নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম, তখন তা হবে তোমাদের ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতের জন্যে কল্যাণকর। উপস্থিত লোকজন বলল, ধন-সম্পদ বিসর্জন এবং নেতাদের বিনাশ হওয়ার আশংকা সত্ত্বেও আমরা তাকে নিয়ে যাব। ইয়া রাসূলাল্লাহ আমরা যদি এই অঙ্গীকার পালন করি, এই বায়আত রক্ষা করি, তবে আমরা কী পাব? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমরা জান্নাত পাবে। তাঁরা বললেন, তবে আপনি আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। সকলে তার হাতে বায়আত করলেন। আসিম ইবন উমর ইবন কাতাদা বলেন, আব্বাস ইবন উবাদা এ কথাটি বলেছিলেন বায়আতের

দায়-দায়িত্ব যেন তাদের কাধে মযবুত ভাবে বর্তায় ৷ পক্ষান্তরে আবদুল্লাহ ইবন আবু বকর বলেছেন, ওই বক্তব্য দানের পেছনে আব্বাসের উদ্দেশ্য ছিল ওই বায়আত যেন বিলম্বিত হয়, ওই রাতে যেন তা অনুষ্ঠিত না হয়। তাঁর উদ্দিষ্ট ছিল যে, এই অবসরে খাযরাজ গোত্রের নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুল এসে পৌঁছবে এবং আপনি সম্প্রদায়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। মূলত কী উদ্দেশ্য ছিল, তা আল্লাহই ভাল জানেন।

ইবন ইসহাক বলেন, বনু নাজ্জার গোত্র দাবী করে যে, আবু উমামা আসআদি ইবন যুরোরাহ-ই সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে বায়আত করেন। বনু আবদ আশহাল বলে যে, সর্বপ্রথম বায়আত করেন আবু হায়ছাম ইবন তায়হান।

ইবন ইসহাক বলেন, মা’বাদ ইবন কাআব তার ভাই আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর পিতা কাআব ইবন মালিক বলেছেন, সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে হাত রেখে বায়আতি করেছিলেন বারা” ইবন মা’রূর তারপর অবশিষ্ট লোকজন। ইবন আহীর “উসদুল গাবা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বনু সালমা গোত্রের দাবী হল, ওই রাতে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে বায়আতি করেছিলেন কাআব ইবন মালিক (রা)। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে যুহরী…… কাআব ইবন মালিকের হাদীছে আছে, তাবৃক যুদ্ধে অংশ গ্ৰহণ না করা প্রসংগে তিনি বলেছেন, আমি আকাবার রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন আমরা ইসলামকে মযবুত ভাবে ধারণ করার জন্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই। সেই রাতের পরিবর্তে বদরের যুদ্ধে উপস্থিত থাকা আমার নিকট অধিক প্রিয় মনে হয় না, যদিও লোক সমাজে বদরের যুদ্ধই অধিক স্মরণীয় ও আলোচ্য বিষয়। বায়হাকী বলেন, আবুল হুসাইন ইবন বিশারান… আমির শা’বী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার চাচা আব্বাসকে নিয়ে আকাবাতে বৃক্ষের নীচে ৭০ জন আনসারী লোকের নিকট উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন, আপনাদের মধ্য থেকে যিনি কথা বলবেন, তাকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখতে হবে। বক্তব্য দীর্ঘ করা যাবে না। কারণ মুশরিকদের পক্ষ থেকে আপনাদের পেছনে গুপ্তচর নিয়োজিত আছে। তারা যদি আপনাদের অবস্থান জানতে পারে, তবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে ছাড়বে। তাদের একজন আবু উমামা বললেন, হে মুহাম্মাদ (সা:)! আপনার প্রতিপালকের জন্যে আপনি আমাদের থেকে যত অঙ্গীকার নিতে চান নিন। তারপর আপনার জন্যে যত অঙ্গীকার নিতে চান নিনি! তারপর ওই সব অঙ্গীকার পালনের ফলশ্রুতিতে আমরা আপনার থেকে এবং আপনার প্রতিপালকের নিকট থেকে কী কী প্রতিদান পাব, তা আমাদের অবহিত করুন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আমার প্রতিপালকের জন্যে আমি আপনাদের নিকট এই অঙ্গীকার চাই যে, আপনারা তার ইবাদত করবেন, তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবেন না। আর আমার জন্যে এবং আমার সাহাবীদের জন্যে এই অঙ্গীকার চাই যে, আপনারা আমাদেরকে আশ্রয় দেবেন, সাহায্য করবেন। এবং নিজেদেরকে যেভাবে নিরাপত্তা প্ৰদান করেন, আমাদেরকেও সে ভাবে নিরাপত্তা প্ৰদান করবেন। উপস্থিত লোকজন বললেন, আমরা যদি তা পালন করি, তাহলে বিনিময়ে আমরা কী পাব? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আপনারা পাবেন জান্নাত। তাঁরা বললেন, তবে আমরা আপনাকে অঙ্গীকার প্রদান করলাম।

शशब्……. আবু মাসউদ আনসারী থেকে বর্ণিত। তিনি উক্ত ঘটনা আলোচনা করেছেন। আবু মাসউদ আনসারী উপস্থিত লোকদের মধ্যে সকলের ছােট ছিলেন। আহমদ……. শা’বী সূত্রে বলেছেন….. উপস্থিত-যুবক বৃদ্ধ কেউই ইতোপূর্বে এমন চমৎকার বক্তৃতা শুনেননি। বায়হাকী বলেন, আবু তাহির মুহাম্মদ….. ইসমাঈল ইবন উবায়দুল্লাহ ইবন রিফাআ তাঁর পিতা সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন যে, আমি শরাবের পাত্র এগিয়ে দিলাম। উবাদা ইবন সামিত সেখানে এলেন এবং ওই পাত্র ছিড়ে ফেললেন এবং বললেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে বায়আত করেছি। আমরা অঙ্গীকার করেছি যে, আনন্দ-বিষাদ সকল অবস্থায় তাঁর আনুগত্য করব। সচ্ছল অসচ্ছল সর্বাবস্থায় আল্লাহর পথে ব্যয় করব। আমরা সৎকাজের আদেশ দেবো, অসৎ কাজ থেকে বারণ করবো। আমরা আল্লাহর পথে কথা বলে যাব, কোন নিন্দুকের নিন্দা আমাদেরকে পিছপা করতে পারবে না। আমরা আরো অঙ্গীকার করেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াছরিবে আমাদের নিকট এলে আমরা তাকে সাহায্য করব এবং আমাদের নিজেদেরকে ও সন্তানদেরকে যেভাবে রক্ষা করি তাকেও সে ভাবে রক্ষন করব। বিনিময়ে আমরা জান্নাত পাব। এটি ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে আমাদের অঙ্গীকার। তার হাতে আমাদের বায়আত। এটি একটি উত্তম সনদ। কিন্তু সিহাহ সঙ্কলকগণ এটি উদধূত করেননি।

ইউনুস……. উবাদা ইবন সামিত (রা) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে অঙ্গীকার করেছি। যুদ্ধের অঙ্গীকারের ন্যায়। আমরা অঙ্গীকার করেছি যে, অভাবে-সচ্ছলতায় সর্বাবস্থায় আমরা তার আনুগত্য কর। সুখে দুঃখে এবং আমাদের উপর অন্যদেরকে অগ্রাধিকার দিলেও আমরা তাঁর আনুগত্য করে যাবো। আমরা দায়িত্বশীলদের বিরোধিতা করবো না। আমরা যেখানেই থাকি সত্য কথা বলবো। আল্লাহর পথে আমরা কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবো না।

ইবন ইসহাক মা’বাদ ইবন কাআব থেকে তিনি তার ভাই আবদুল্লাহ ইবন কাআব ইবন মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে বায়আত করলাম, তখন আকাবা পাহাড়ের চূড়া থেকে শয়তান এমন জোরে একটি চীৎকার দিল, যা ইতোপূর্বে কখনাে আমি শুনিনি। চীৎকার দিয়ে সে বলল, হে তাঁবু ও গৃহের আধিবাসীবৃন্দা! এক নিন্দিত লোক এবং তার সাথে কতক ধর্মত্যাগী লোকদের ব্যাপারে তোমরা কোন ব্যবস্থা নিবে কি? তারা তো তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সমবেত হয়েছে, একমত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, এই চীৎকারকারী হল আকাবার ঘূণ্য আযিবা জিন। সে ঘূণ্য বংশজাত। ইবন হিশাম বলেন, শয়তানকে “ইবন আয়ীব” বলা হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বললেন, “হে আল্লাহর দুশমন! আমরা তোকে ওই সুযোগ দেবো না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, এবার সবাই নিজ নিজ তাঁবুতে ফিরে যাও! আব্বাস ইবন উবাদা ইবন নাযিলা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যে মহান সত্তা আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন তার কসম, “আপনি চাইলে আগামীকাল ভোরে আমরা তরবারি নিয়ে মীনাবাসীদের উপর অভিযান চালাতে পারি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, না, এখনও আমরা সে বিষয়ে আদেশপ্রাপ্ত হইনি। সবাই বরং তাঁবুতে ফিরে যাও! বৰ্ণনাকারী বলেন, আমরা সবাই আমাদের তাঁবুতে ফিরে গেলাম এবং ভোর পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালাম। সকালে কুরায়শের কতক নেতৃস্থানীয় লোক আমাদের নিকট উপস্থিত হলো!

তারা বলে, হে খাযরাজের লোকজন! আমরা খবর পেয়েছি যে, তোমরা আমাদের বিরোধী লোকটির নিকট গিয়েছিলে। তোমরা নাকি তাকে আমাদের কাছ থেকে বের করে নিয়ে যেতে চাও। আর তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে তার সাথে অঙ্গীকার করেছ। তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে আমরা যত ঘূণা করি আরবের অন্য কোন গোত্রের সাথে যুদ্ধকে আমরা তত ঘূণা করি না। ওদের কথা শুনে আমাদের সম্প্রদায়ের মুশরিকরা উঠে দাঁড়াল এবং কসম করে বলল, এমন কোন ঘটনা তো ঘটেনি এবং এবিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। বস্তৃত তারা সত্যই বলেছিল। আসলে তারা তো এ বিষয়ে কিছুই জানতো না; বর্ণনাকারী বলেন, আমরা যারা শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম, আমরা পরস্পরে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলাম। এরপর কুরায়শের লোকজন চলে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে হারিছ ইবন হিশাম ইবন মুগীরা মািখযুমী ছিল। তার পায়ে ছিল এক জোড়া নতুন জুতা। আমার সম্প্রদায়ের লোকজন ওদেরকে যা বলেছে সে বক্তব্যে আমিও শামিল আছি বুঝানাের জন্যে আমি বললাম, হে আবু জাবির! আপনি আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা, আপনি কি কুরায়াশর ওই নওজোয়ান যুবকের ন্যায় দুখানি জুতা ব্যবহার করতে পারেন না? হারিছ আমার কথা শুনেছিল। পা থেকে জুতা দুখানি খুলে সে আমার দিকে ছুড়ে মারল এবং বলল, আল্লাহর কসম, এ দুটো তোমাকে পরিধান করতেই হবে। আবু জাবির বলল, আহ থামো! তুমি তো যুবকটিকে ক্ষেপিয়ে তুলেছি। তার জুতা তাকে ফিরিয়ে দাও। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি ওগুলো ফেরত দেবো না। আল্লাহর কসম, এটি একটি শুভচিহ্ন। এই শুভ যাত্ৰা যদি সত্য হয়, তবে আমি তাকেও ছিনিয়ে

আনিব।

ইবন ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আবু বকর আমাকে বলেছেন যে, তারা আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলের নিকট গিয়েছিলেন এবং কাআবি যা উল্লেখ করেছেন তা তাকে জানালেন, সে বলল, এ বিষয়টি তো খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার সম্প্রদায়ের লোকজন বিচ্ছিন্ন হয়ে এমন কাজ করল অথচ আমি তার কিছুই জানি না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তাঁরা তার কাছ থেকে ফিরে এলেন। আমাদের লোকজন মীনা ছেড়ে চলে গেল। অন্যদিকে কুরায়শের লোকেরা এই ঘটনা সম্পর্কে গোপনে খোঁজখবর নিল। তারা ঘটনার সত্যতা উদঘাটন করল। তারা আমাদের লোকজনকে খুঁজতে লাগল। ইযখির ঘাসসহ তারা সাআদ ইবন উবাদাকে ধরে ফেলল। মুনযির ইবন আমার যিনি বনু সাইদ ইবন কাআব ইবন খাযরাজ গোত্রের মিত্র ছিলেন, তাকেও তারা খুঁজে পেল। তারা দু’জনেই ওই রাতে নকীব নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু মুনযির তাদেরকে ফাঁকি দিয়ে কৌশলে পালিয়ে আসেন। তারা সওয়ারীর রশি দিয়ে সাআদ ইবন উবাদার হাত দুটো গলার সাথে বেঁধে তাঁকে নিয়ে মক্কার দিকে যাত্রা করল। তারা তাকে প্ৰহারে প্ৰহারে জর্জরিত করে মাথার চুল টেনে ধরে মক্কায় নিয়ে এল। তার মাথায় অনেক চুল ছিল। সাআদ (রা) বলেন আল্লাহর কসম, আমি তাদের হাতে বন্দী ছিলাম। তখন দেখি সেখানে উপস্থিত হল একদল কুরায়শী লোক। তাদের মধ্যে একজন খুব ফর্সা দীপ্তিময় চেহারা বিশিষ্ট নেতৃস্থানীয় লোক ছিল। আমি মনে মনে বললাম, এদের মধ্যে যদি কারো নিকট কোন উপকার পাওয়া যায়, তবে এই লোকের নিকট পাওয়া যাবে। সে যখন আমার কাছাকাছি এল, তখন হাত উপরে তুলে আমাকে প্রচণ্ড এক ঘুষি দিল। তখন আমি আপন মনে বললাম, এরপর ওদের

কারো নিকট আর কোন সহানুভূতি আশা করা যায় না। আমি তাদের হাতে ছিলাম। তারা আমাকে টানা-হঁচড়া করতে থাকে। মাটিতে ফেলে টানতে থাকে। হঠাৎ তাদের এক লোক আমার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। সে বলল, ধুতুরী, তোমার সাথে কি কুরায়শের কোন একজন লোকের সাথেও আশ্রয় চুক্তি ও মৈত্রী চুক্তি নেই? আমি বললাম, হ্যা আছে তো আমি তো আমার শহরে জুবােয়র ইবন মুতঙ্গম-এর ব্যবসায়ী কাফেলাকে আশ্রয় দিতাম এবং কেউ তাদের উপর জুলুম করতে চাইলে তাদেরকে রক্ষা করতাম এবং মক্কার লোক হারিছ ইবন হারব ইবন উমাইয়া ইবন আবদ শামস-এর সাথেও তো আমি, একই আচরণ করতাম। লোকটি আমাকে বলল, তাড়াতাড়ি তুমি ওই দু’জনের নাম ধরে চীৎকার দাও, ওদেরকে ডাক এবং ওদের সাথে তোমার যে সম্পর্ক চীৎকার করে তা সবাইকে জানিয়ে দাও; সাআদ (রা) বলেন, আমি তাই করলাম। ওই লোক দ্রুত ওই দু’জনের নিকট রওনা করল। সে তাদেরকে কা’বা গৃহের নিকট মসজিদে খুঁজে পেল। সে ওদেরকে বলল, মক্কার সমতলভূমিতে খাযরাজ গোত্রের একজন লোককে প্রচণ্ডভাবে মারপিট করা হচ্ছে। সে আপনাদের দু’জনের নাম ধরে ডাকছে। তারা বলল, লোকটি কে? সে বলল, লোকটি হল সাআদ ইবন উবাদা। জুবােয়র ইবন মুতঙ্গম ও হারিছ ইবন হারব বলল সে তো ঠিকই বলেছে। নিজ শহরে সে আমাদের ব্যবসায়ী কাফেলাকে আশ্রয় দিত এবং তাদের উপর কেউ জুলুম করতে চাইলে সে তাদেরকে রক্ষা করত। এরপর তারা দু’জনে এল এবং সাআদ (রা)-কে অত্যাচারী কুরায়শীদের হাত থেকে রক্ষা করল। সাআদ (রা) আপন পথে চলে গেলেন। হযরত সাআদ (রা)-কে যে ব্যক্তি ঘুষি মেরেছিল, সে ছিল সুহায়ল ইবন আমরা। ইবন হিশাম বলেন, যে ব্যক্তি হযরত সাআদ (রা)-এর প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিল, সে হল আবুল বুখতারী ইবন হিশাম।

বায়হাকী (র) আপনি সনদে ঈসা ইবন আবু ঈসা ইবন জুবােয়র থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে, এক রাতে আবু কুবায়স পাহাড় থেকে এক ঘোষক ঘোষণা দিয়েছিল, কুরায়শগণ তা শুনেছিল। ঘোষক বলেছিল?

فان يُسلم السعد ان يصبح محمد – بمكة لا يخشى حلاف المخالف – সাআদ নামের ব্যক্তিদ্বয় যদি ইসলাম গ্রহণ করে, তবে মুহাম্মদ (সা)মক্কা নগরীতে এমন অবস্থায় পৌঁছে যাবেন যে, কোন বিরোধিতাকারীর বিরোধিতাকে তিনি ভয় করবেন না।

সকালে আবু সুফিয়ান বলল, ওই দুই সাআদ কে? সাআদ ইবন ব্যকর, নাকি সাআদ ইবন হুযায়ম? দ্বিতীয় রাতে তারা শুনতে পেল, ঘোষক ঘোষণা দিয়ে বলছে :

أياسغد سعد الاوس كن أنت ناصرا – وياسغد سعد الخزر حين الغطارف –

হে সাআদ! আওস গোত্রের সাআদ! তুমি সাহায্যকারী হয়ে যাও। এবং হে সাআদ সুন্দর ও চালাক গোত্ৰ খাযরাজ গোত্রের সাতমাদ!

اجی با الی داعی الهدی و تمنایا–علی الله فی الفردوس منیة عارف–

১. সীরাতে ইবন হিশাম-এ আছে, তারা আমায় ছেড়ে চলে গেল।

\S–

তোমরা দু’জনে সাড়া দাও হিদায়াতের পথে আহবানকারীর ডাকে। আর আল্লাহর নিকট জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চস্থান কামনা করা যেমন কামনা করে আল্লাহর পরিচয় লাভকারী

ङि।

فان ثواب اللّه للطالب الهدى – جنان من الفردوس ذات ر فارف –

বাগানসমূহ যেগুলোতে রয়েছে সবুজ আসন।

ভোর হওয়ার পর আবু সুফিয়ান বলল, আলোচ্য দুই সাআদ হল সাআদ ইবন মুআয এবং

সাআদ ইবন উবাদা।

পরিচ্ছেদ

ইবন ইসহাক বলেন, আকাবার দ্বিতীয় শপথের রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে বায়আন্ত সম্পন্ন করে আনসারী সাহাবীগণ মদীনায় ফিরে আসার পর সেখানে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তাদের মধ্যে কতক বয়ােবৃদ্ধ লোক ছিল, যারা তখনও তাদের পিতৃধৰ্ম শিরকের অনুসরণকারী ছিল। তাদের একজন হল আমর ইবন জামূহ ইবন যায়দ ইবন হারাম ইবন কাআব ইবন গানাম ইবন কাআব ইবন সালামা। তার পুত্ৰ মুআয ইবন আমার আকাবার শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। আমর ইবন জামূহ ছিল বনু সালামা গোত্রের অন্যতম নেতা ও শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি। তার গৃহে সে কাঠের তৈরী একটি মূর্তি স্থাপন করেছিল। সেটির নাম মানাত। শিরকবাদী সন্ত্রান্ত লোকেরা তাই করত। এক একটি মূর্তি নির্মাণ করে তারা তার পূজা করত, সেটিকে ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন করত। বনু সালামা গোত্রের দু’ যুবক ইসলাম গ্ৰহণ করলেন। একজন আমরের পুত্ৰ মুআয, অন্যজন মুআয ইবন জাবাল। তারা রাতের অন্ধকারে আমরের পূজনীয় মূর্তির নিকট যেতেন। সেটিকে তুলে এনে বনু সালামা গোত্রের এক কুয়োর মধ্যে উপুড় করে ফেলে দিতেন। কুয়োটিতে লোকজন ময়লা-আবর্জনা ফেলত। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা বলত, “তোমাদের জন্যে ধ্বংস আসুক, গত রাতে আমাদের মূর্তির উপর চড়াও হল কে? এরপর সে মূর্তি খুঁজতে বের হত। খুঁজে পাওয়ার পর সেটিকে গোসল করিয়ে খোশবু লাগিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে যথাস্থানে রাখত এবং বলত, আল্লাহর কসম, কে আমার মূর্তিকে এমন করেছে তা যদি আমি জানতে পারতাম, তবে তাকে আমি চরম ভাবে অপমানিত করতাম। সন্ধ্যা বেলা আমার ঘুমিয়ে পড়লে মুআয ইবন আর্মর ও মুআয ইবন জাবাল মূর্তির নিকট আসতেন এবং পূর্ব রাতে যা করেছেন এ রাতেও তা করতেন। সকালে আমার মূর্তির খোজ করত এবং ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত অবস্থায় তুলে এনে গোসল করিয়ে খোশবু লাগিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে যথাস্থানে রাখতো। আবার সন্ধ্যা হলে সে ঘুমাতে যেত। তাঁরা এসে মূর্তি নিয়ে পূর্বের ন্যায় আচরণ করতেন। বহুদিন এভাবে চলার পর একদিন সে ময়লা-আবর্জনা থেকে সেটিকে তুলে এনে যথাস্থানে স্থাপন করে। তারপর সেটির গলায় একটি তরবারি বুলিয়ে দিয়ে বলে, আল্লাহর কসম, কে যে তোমার এই অবস্থা করে তা আমি জানি না। মূলত তোমার মধ্যে যদি কোন কল্যাণ থাকে, তবে এই তরবারি তোমার সাথে রইল, এটি দিয়ে তুমি নিজেকে রক্ষা করো। সন্ধ্যায় আমার ঘুমিয়ে পড়ল। তারা মূর্তির উপর চড়াও হলেন। সেটির গলা থেকে

তলোয়ারটি খুলে নিলেন। একটি মৃত কুকুর এনে রশি দিয়ে সেটিকে মূর্তির সাথে মিলিয়ে বাধলেন। তারপর মূর্তি ও কুকুরটি বনু সা’লামা গোত্রের আবর্জনা নিক্ষেপের কুয়োতে ফেলে দিলেন। সকালে এসে আমর মূর্তিটিকে যথাস্থানে পেল না। খুঁজতে গিয়ে সে দেখতে পেল মৃত কুকুরের সাথে একই রশিতে বাঁধা অবস্থায় ওই কুয়োতে সেটি উপুড় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ অবস্থা দেখে মূর্তিটির আসল পরিচয় তথা অক্ষমতা সে উপলব্ধি করে। তার সম্প্রদায়ের যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তারাও তার সাথে কথাবার্তা বলে। ফলে আল্লাহর দয়ায় সে ইসলাম গ্রহণ করে এবং ভাল ভাবে ইসলাম পালন করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে উপযুক্ত মাআরিফাত লাভ করে। পরবতীতে তার মূর্তির প্রকৃত অবস্থা এবং অন্ধত্ব ও গোমরাহী থেকে আল্লাহ তাকে যে মুক্তি দিলেন, তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বললেন :

واللّه لو كنت الها لم تكن – أنت وكلّب وسط بئر فى قرن. * হর কত N, (2 মূর্তি! তুমি যদি প্রকৃতই ইলাহ \g 竜や”マエ হতে, তবে মৃত কুকুরের সাথে মিলিত ভাবে কুয়োর মধ্যে পড়ে থাকতে না।

أفاً لمقاك الها مستدن – آلأن فتشناك عن سوء الغبن – *

দুঃখ হয় তোমার নিক্ষিপ্ত হওয়া দেখে। তুমি তো লাঞ্ছিত উপাস্য। মন্দতম প্রতারণার বশবতীর্ণ হয়ে আমি তোমাকে বরণ করেছিলাম।

الحمد للّه العلي ذى المنن–الواهب الرزاق ديان الدين – সকল প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার, যিনি সর্বোচ্চ, অনুগ্রহশীল, দাতা, রিযিক প্রদানকারী এবং সকল দীন ও ধর্মের স্রষ্টা।

هو الذی آن قذني من قبل–آن آگون فی ظلمة قبر مرتهن ওই মহান আল্লাহ আমাকে মুক্তি দিয়েছেন। কবরের অন্ধকারে আবদ্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্বে

আকাবার দ্বিতীয় শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ৭৩ জন পুরুষ ২ জন মহিলার নামের তালিকা

আওস গোত্রের ছিলেন ১১জন। তারা হলেন (১) উসায়দ ইবন হুযায়র, সেই রাতে মনােনীত একজন নকীব, (২) আবু হায়ছাম ইবন তায়হান বন্দরী, (৩) সালামা ইবন সা’লামা ইবন ওয়ােকশ বদরী, (৪) যাহীর ইবন রাফি’, (৫) আবু বুরদাহ ইবন দীনার বদরী, (৬) নাহীর ইবন হায়ছাম ইবন নাবী ইবন মাজদাআঁ। ইবন হারিছাহ, (৭) সাআদ ইবন খায়৷ছামা, ওই রাতে মনোনীত একজন নকীব। বদর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, (৮) রিফাআ ইবন আবদুল মুনয্যির ইবন যানীর বদরী, ওই রাতে মনােনীত একজন নকীব, (৯) আবদুল্লাহ ইবন জুবায়র ইবন নুমান

১. শুদ্ধ। —যে রশি দ্বারা বন্দী লোককে বাধা হয়।

1 SN كم عسس الفين .

ইবন উমাইয়া ইবন বারুক বন্দরী, উহুদ যুদ্ধে তীরন্দাজ বাহিনীর নেতা ছিলেন। ওই যুদ্ধে শহীদ হন, (১০) মান ইবন আব্দী ইবন জাদ ইবন আজলান ইবন হারিছ ইবন যাবীআ বােলাভী। তিনি আওস গোত্রের মিত্র। বদর ও অন্যান্য যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন। ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন, (১১) উওয়াইম ইবন সাইদা বদর ও অন্যান্য যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন।

উক্ত অনুষ্ঠানে খাযরাজ গোত্রের ৬২ জন পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা হলেন (১) আবু আইয়ুব খালিদ ইবন যায়ীদ (রা) তিনি বদর ও অন্যান্য যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন। হযরত মুআবিয়া (রা)-এর শাসনামলে রোমান রাজ্যে শহীদ হয়েছেন, (২) মুআয ইবন হারিছ (৩) তাঁর ভাই আওফ (৪) তাঁর ভাই মুআওয়ায। তারা তিন জন আফরার পুত্র। তারা সকলে বদর যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন, (৫) আম্মারা ইবন হাযম। তিনি বদর ও অন্যান্য যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন, (৬) আসআদ ইবন যুরোরাহ আবু উমামা মনোনীত অন্যতম নকীব। বদর যুদ্ধের পূর্বে ইনতিকাল করেন। (৭) সােহল ইবন আতীক বন্দরী, (৮) আওস ইবন ছাবিত ইবন মুনয্যির বদরী, (৯) আবু তালহা যায়দ ইবন সাহল বদরী, (১০) কায়স ইবন আবু সাসাআ আমর ইবন যায়দ ইবন আওফ ইবন ম্যাবয়ুল ইবন আমর ইবন গানাম ইবন মাযিন। বদরের যুদ্ধে পশ্চাৎবতী বাহিনীর নেতা ছিলেন, (১১) আমর ইবন গাযিয়াহ, (১২) সাআদ ইবন রাবী’। ওই রাতে মনোনীত একজন নকীব। বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন, (১৩) খারিজা ইবন যায়দ, বদরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। (১৪) আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ওই রাতে মনোনীত একজন অন্যতম নকীব, বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। মূতার যুদ্ধে সেনাপতির দায়িত্ব পালনকালে শহীদ হন। (১৫) বাশীর ইবন সাআদ বন্দরী, (১৬) আবদুল্লাহ ইবন যায়দ ইবন ছ’লাবা ইবন আবদ রাব্বিহী। আল্লাহ তা’আলা তাকে স্বপ্নে আযানের বাণী দেখিয়েছিলেন। বদর যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন, (১৭) খাল্লাদ ইবন সুওয়াইদ বদরী, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। বনু কুরায়যা যুদ্ধের দিন শহীদ। হন। তার মাথায় একটি যাতা ফেলে দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। কথিত আছে যে, তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন : ৩,৭৩,৫৯, ১১ 11 ৩। —তীর জন্যে দু’শহীদের সমান সাওয়াব থাকবে, (১৮) আবু মাসউদ উকবা ইবন আমর বদরী। ইবন ইসহাক বলেন, আকাবায় যারা উপস্থিত ছিলেন, তাদের মধ্যে ইনি বয়সে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন। বদরের যুদ্ধে হাযির হননি। (১৯) যিয়াদ ইবন লাবীদ বন্দরী, (২০) ফরওয়া ইবন আমর ইবন ওয়াদ্দাফী, (২১) খালিদ ইবন কায়স ইবন মালিক বন্দরী, (২২) রাফি’ ইবন মালিক। সে রাতের মনোনীত একজন নকীব, (২৩) যাকওয়ান ইবন আবদ কায়স ইবন খালদা ইবন মাখলাদ ইবন আমির ইবন যুরায়ক, তাকে মুহাজির সাহাবী এবং আনসারী সাহাবী দু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কারণ, তিনি মক্কায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে দীর্ঘদিন অবস্থান করেছিলেন এবং সেখান থেকে মদীনায় হিজরত করেন। তিনি বদরী সাহাবী। উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন, (২৪) আব্বাদ ইবন কায়স ইবন আমির ইবন খালিদ ইবন আমির ইবন যুরায়ক বদরী (২৫) তাঁর ভাই হারিছ ইবন কায়স ইবন আমির বদরী। (২৬) বারা ইবন মারার। অন্যতম নকীব, বনু সালামা গোত্রের দাবী হল বারা ইবন মারূর-ই সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে বায়আত করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা)

মদীনায় আসার পূর্বে তার ইনতিকাল হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্যে তার সম্পত্তির এক-তৃতীয় অংশ ওসীয়্যত করে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার সবই তার ওয়ারিসদের ফেরত দিয়ে দেন। (২৭) বারা-এর পুত্র বিশর, তিনি বদর, উহুদ এবং খন্দকের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। খায়বারের যুদ্ধে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে দেয়া ইয়াহুদীর বিষ মাখানাে বকরীর গোশত খেয়ে তিনি শহীদ হন, (২৮) সিনান ইবন সায়ফী ইবন সাখার বন্দরী, (২৯) তুফোয়ল ইবন নুমান ইবন খানসা বন্দরী। তিনি খন্দকের যুদ্ধে শহীদ হন, (৩০) মাকিল ইবন মুনাযির ইবন সারা বদরী, (৩১) তাঁর ভাই ইয়াখীদ ইবন মুনয্যির বদরী, (৩২) মাসউদ ইবন যায়দ ইবন সুবায়, (৩৩) দাহহাক ইবন হারিছা ইবন যায়দ ইবন ছ’লাবা বন্দরী, (৩৪) ইয়াখীদ ইবন খুযাম ইবন সুবায়’ (৩৫) জাব্বার ইবন সাখার ইবন উমাইয়া ইবন খানসা ইবন সিনান ইবন উবায়দা বদরী, (৩৬) তুফোয়ল ইবন মালিক ইবন খানসা বন্দরী, (৩৭) কাআব ইবন মালিক, (৩৮) সুলায়ম ইবন আমির ইবন হাদীদা বদরী, (৩৯) কুতবা ইবন আমির ইবন হাদীদা বন্দরী, (৪০) তাঁর ভাই আবু মুনযির ইয়াখীদ বন্দরী, (৪১) আবু ইউসর কাআব ইবন আমর বন্দরী, (৪২) সায়কী ইবন সাওয়াদ ইবন আব্বাদ, (৪৩) ছ’লাবা ইবন গানামা ইবন আব্দী ইবন নাবী বন্দরী। তিনি খন্দকের যুদ্ধে শহীদ হন, (৪৪) তাঁর ভাই আমর ইবন গানামা ইবন আদী, (৪৫) আবাস ইবন আমির ইবন আদী বন্দরী, (৪৬) খালিদ ইবন আমর ইবন আব্দী ইবন নাবী, (৪৭) আবদুল্লাহ ইবন উনায়াস। কুযাআ গোত্রের মিত্র, (৪৮) আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম। ওই রাতে মনোনীত একজন নকীব। বন্দরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং উহুদের যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। (৪৯) তাঁর পুত্র জাবির ইবন আবদুল্লাহ, (৫০) মুআয ইবন আমর ইবন জামূহ বন্দরী, (৫১) ছাবিত ইবন জাযা” বন্দরী। তিনি তাইফের যুদ্ধে শহীদ হন, (৫২) উমােয়র ইবন হারিছ ইবন ছ’লাবা বন্দরী, (৫৩) খাদীজ ইবন সালামা বালী গোত্রের মিত্র, (৫৪) মুআয ইবন জাবাল।। বদর ও অন্যান্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। উমর ইবন খাত্তাব (রা)-এর শাসনামলে আমওয়াসের প্লেগ রোগে মৃত্যুবরণ করেন, (৫৫) উবাদা ইবন সীমিত। ওই রাতে মনােনীত নকীব। বদর ও অন্যান্য যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, (৫৬) আব্বাস ইবন উবাদী ইবন নাযিলা, তিনি মক্কায় অবস্থান করছিলেন। অবশেষে সেখান থেকে মদীনায় হিজরত করেন। তাই তাকেও মুহাজির ও আনসার সাহাবী বলা হয়। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন, (৫৭) আবু আবদুর রহমান ইয়ায়ীদ ইবন ছ’লাবা ইবন খাযামা ইবন আসরাম। বালী গোত্রের মিত্র, (৫৮) আমর ইবন হারিছ ইবন কিনদা, (৫৯) রিফাআ ইবন আমর ইবন যায়দা বদরী, (৬০)। উকবা ইবন ওহাব ইবন কালদা। ইনি খাযরাজীদের মিত্র ছিলেন। প্ৰথমে মক্কায় চলে এসেছিলেন। সেখানে অবস্থান করছিলেন। পরে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। তাই তিনিও একই সাথে মুহাজির ও আনসারী নামে পরিচিত। (৬১) সাআদ ইবন উবাদা ইবন দালীম। ওই রাতে মনােনীত একজন নকীব, (৬২) মুনয্যির ইবন আমর। ওই রাতে মনােনীত নকীব। বদর ও উহুদ যুদ্ধে শরীক হন। বিরে মাউনা দিবসে সংশ্লিষ্ট কাফেলার নেতা হিসেবে শহীদ হন। তাঁকে মৃত্যু আলিঙ্গনকারী নামে আখ্যায়িত করা হয়।

আকাবার দ্বিতীয় শপথের রাতে উপস্থিত মহিলা দু’জন হলেন (১) উন্মু আম্মারা নাসীবা বিনত কাআব ইবন আমর ইবন আওফ ইবন মান্বযুল ইবন আমর ইবন গানাম ইবন মাযিন ইবন

নাজার মাযিনিয়্যা নাজারিয়্যা। ইবন ইসহাক বলেন, ইনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে বহু যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তার বোন এবং স্বামী যায়দ ইবন আসিমও যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তার দু’পুত্ৰ খুবায়ব এবং আবদুল্লাহ তার সাথে যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তাঁর পুত্র খুবায়বকে ভণ্ড নবী মুসায়লামা কাযযাব হত্যা করেছিল। মুসায়লামা তাকে বলেছিল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল? খুবায়ব (রা) বললেন, হ্যা, আমি তো ওই সাক্ষ্যই দিই। এবার মুসায়লামা বলল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমি আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, না, আমি ওই সাক্ষ্য দিই না। তুমি ভাল করে শুনে নাও যে, আমি ওই সাক্ষ্য দিই না। ফলে সে একটি একটি করে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি কাটতে থাকে। ওই অবস্থায় মুসায়লামার হাতেই তিনি শাহাদাতবরণ করেন। তিনি অবিরত বলে যাচ্ছিলেন, না, আমি তোমার কোন কথাই শুনছি না। তার মা উন্মু আম্মারাহ (রা) মুসলমানদের সাথে ওই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। যাতে মুসায়লামা নিহত হয়। যুদ্ধ শেষে তিনি যখন বাড়ী ফিরে এলেন, তখন তাঁর দেহে তীর ও ছুরির আঘাত মিলিয়ে প্ৰায় ১২ টি ক্ষতচিহ্ন ছিল।

আকাবার শপথে উপস্থিত অপর মহিলা হলেন উম্মু মানী’ আসমা বিনত আমর ইবন আব্দী ইবন নাবী ইবন আমর ইবন সাওয়াদ ইবন গানাম ইবন কাআব ইবন সালামা। আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি প্ৰসন্ন হোন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *