১২. সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর আবিসিনিয়ায় হিজরত

সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর আবিসিনিয়ায় হিজরত

মুসলমানদের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছিলেন। তাদের প্রতি মুশরিকদের অত্যাচার-নির্যাতন, নির্দয় প্রহার এবং অপমান, লাঞ্ছনার কথা ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা প্রিয়নবী (সা) থেকে ওদেরকে সরিয়ে রেখেছিলেন এবং চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে তাকে কাফিরদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। এ বিষয়ে ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্যে।

ঐতিহাসিক ওয়াকিদী বলেন, তারা নবুওয়াতের পঞ্চম বছর রজব মাসে আবিসিনিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সর্বপ্রথম ১১জন পুরুষ এবং : জন মহিলা সেখানে হিজরত করেন। পদব্রজে এবং সওয়ারীতে আরোহণ করে তারা সাগর তীরে গিয়ে পৌছেন। এরপর অর্ধ দীনারের বিনিময়ে আবিসিনিয়া পর্যন্ত একটি নীেকা ভাড়া করেন। তারা হলেন উছমান ইবন আফফান, তার সহধর্মিণী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কন্যা রুকাইয়া, আবু হুযায়ফা ইবন উতবা, তাঁর স্ত্রী সাহিলা বিনত সুহায়ল, যুবােয়র ইবন আওআম, মুসআব ইবন উমায়র, আবদুর রহমান ইবন আওফ, আবু সালামা ইবন আবদুল আসাদ, তাঁর স্ত্রী উন্মু সালামা বিনত আবু উমাইয়া, উছমান

ইবন মাসউদ বাযিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন।

ইবন জারীর (র) প্রমুখ বলেন, মহিলা ও শিশু ব্যতীত শুধু পুরুষ ছিলেন ৮২ জন। আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) তাদের সাথে ছিলেন। কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। তিনি যদি তাদের সাথে থাকেন, তবে তাদের সংখ্যা হবে ৮৩ ৷৷

মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সাহাবীদের উপর আপতিত মুশরিকদের জুলুম-নির্যাতন দেখলেন এবং এও দেখলেন যে, আল্লাহ তা’আলা নিজ কুদরতে এবং আবু তালিবের মাধ্যমে তাঁকে ওদের জুলুম থেকে রক্ষা করছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) কিন্তু নিজে তাঁর সাহাবীদেরকে বিপদাপদ ও জুলুম-নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে পারছেন না। তখন

হত। কারণ, সেখানে একজন রাজা আছেন যিনি কারো প্ৰতি জুলুম করেন না। এবং সেটি একটি ভাল রাজ্য। ওখানে গেলে আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে এই জুলুম-নির্যাতন থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দিবেন। এ প্রেক্ষিতে জুলুম-অত্যাচার থেকে মুক্তি এবং দীন-ধর্ম রক্ষার

লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণের একটি দল আবিসিনিয়ায় হিজরত করলেন। এটি হল ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানদের প্রথম হিজরত। সর্বপ্রথম যারা বের হলেন, তারা হলেন উছমান ইবন আফফান (রা), তার স্ত্রী ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কন্যা রুকাইয়া (রা)।

বায়হাকী (র) ইয়াকুব ইবন সুফিয়ান…….কাতাদা (র) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সর্বপ্রথম সপরিবারে যিনি হিজরত করলেন তিনি হলেন উছমান ইবন আফফান (রা)। আমি নাযার ইবন আনাসকে বলতে শুনেছি, তিনি বলছিলেন যে, আমি আবু হামযা অর্থাৎ আনাস ইবন মালিক (রা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলছিলেন, উছমান ইবন আফফান (রা) আবিসিনিয়ায় হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেন। তার সাথে ছিলেন তার স্ত্রী নবী দুহিতা রুকাইয়া (রা)। দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের কোন খোঁজখবর পাচ্ছিলেন না! এরপর এক কুরায়শী মহিলা তার নিকট উপস্থিত হয়ে বলে, হে মুহাম্মদ! (সা) আমি তো আপনার জামাতাকে দেখে এসেছি। তার সাথে তার স্ত্রীও আছেন। ওদের কী অবস্থায় দেখে এসেছ? রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমি দেখেছি যে, স্ত্রীকে একটি গাধার পিঠে তুলে দিয়ে তিনি গাধাটিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, L.–1। — আল্লাহ্ তা’আলা তাদের সঙ্গে থাকুন! লুতের (আ) পর উছমানই সর্বপ্রথম সপরিবারে হিজরত করেন।

ইবন ইসহাক বলেন, হিজরতকারীদের মধ্যে ছিলেন আবু হুযায়ফা ইবন উতবা তাঁর স্ত্রী সাহলা বিনত সুহায়ল ইবন আমর, সেখানে তাদের একটি পুত্ৰ সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়, তার নাম

ইবন আওফ, আবু সালামা ইবন আবদুল আসাদ, তার স্ত্রী উন্মু সালামা বিনত আবু উমাইয়া ইবন মুগীরা। সেখানে তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়, তার নাম যায়নাব, উছমান ইবন মাযউন, আমির ইবন রাবীআ, ইনি খাত্তাব পরিবারের মিত্র ছিলেন। তাঁর গোত্র হল বনু আনায ইবন ওয়াইল গোত্র, তাঁর স্ত্রী লায়লা বিনত আবু হাছামাহ। আবু সাবুরা ইবন আবু রুহাম

ইবন আবদ শামস ইবন আবদূন্দ ইবন নাসর ইবন মালিক ইবন হাসল ইবন আমির। কথিত আছে যে, তিনি সবার আগে ওখানে পৌছেছিলেন এবং সুহায়ল ইবন বায়যা। আমার নিকট বর্ণনা পৌছেছে যে, উল্লিখিত ১০ জন পুরুষ সর্বপ্রথম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, উছমান ইবন মাযউন তাদের নেতৃত্বে ছিলেন।

ইবন ইসহাক বলেন, এরপর যাত্রা করেন জাফর ইবন আবু তালিব (রা)। তাঁর সাথে

জন্ম হয়। এরপর একের পর এক মুসলমানগণ সেখানে হিজরত করতে থাকেন। ফলে আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের একটি বিরাট দল একত্রিত হয়।

মূসা ইবন উকবা মনে করেন যে, আবু তালিব ও তার মিত্ৰ গোত্রগুলো যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে গিরিসঙ্কটে অন্তরীণ ছিলেন, তখন মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের ঘটনা ঘটে। অবশ্য এ মন্তব্য সন্দেহাতীত নয়। আল্লাহই ভাল জানেন।

খুযায়মা— তার দুই পুত্র আমর ইবন জুহাম এবং খুযায়মা ইবন জুহম, আবু রওমা ইবন উমােয়র ইবন হাশিম ইবন আবদ মানাফ ইবন আবদুন্দদার ফিরাস ইবন নাযার ইবন হারিছ ইবন কালদাহ, সাআদ (রা)-এর ভাই আমির ইবন আবু ওয়াক্কাস, মুত্তালিব ইবন আযহার ইবন আবদ আওফ আৰ্য যুহরী, তার স্ত্রী রামলা বিনত আবু আওফ ইবন যাবীরা— সেখানে তাঁর পুত্ৰ আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ্দ, তার ভাই উতবা, মিকদাদ ইবন আসওয়াদ, হারিছ। ইবন খালিদ ইবন সাখার আত-তায়মী, তাঁর স্ত্রী রাবতা বিনত হারিছ ইবন জাবীলা, সেখানে তাদের ছেলে মুসা, এবং তিন মেয়ে আইশ, যয়নাব ও ফাতিমার জন্ম হয়।

ইবন উছমান ইবন শারীদ আল মািখযুমী। কথিত আছে যে, তিনি অত্যন্ত সুদৰ্শন ছিলেন বিধায় তাঁর এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। মূলত তাঁর নাম ছিল উছমান ইবন উছমান। হাব্বার ইবন সুফিয়ান ইবন আবদুল আসাদ আল মািখযুমী, তার ভাই আবদুল্লাহ, হিশাম, ইবন আবু হুযায়ফা ইবন মুগীরা ইবন আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন মািখযুম সালামা ইবন হিশাম, ইবন মুগীরা, আইয়াশ ইবন আবু রাবীআ ইবন মুগীরা, মুআত্তাব ইবন আওফ ইবন আমির— তাকে আইহামা নামেও ডাকা হত, তিনি বনু মািখযুম গোত্রের মিত্র ছিলেন।

উছমান ইবন মাযউন-এর দুই ভাই কুদামা ও আবদুল্লাহ, সাইব ইবন উছমান ইবন মাযউন, হাতিব ইবন হারিছ। ইবন মা’মার। তাঁর সাথে ছিলেন তার স্ত্রী ফাতিমা বিনত মুজাল্লিল। তাদের দু’ পুত্র মুহাম্মদ ও হারিছ, হাতিবের ভাই খাত্তাব, খাত্তাবের স্ত্রী ফুকায়হা বিনত ইয়াসার, সুফিয়ান ইবন মা’মার ইবন হাবীব, তার স্ত্রী হাসানা, তাদের দু’পুত্ৰ জাবির ও জুনাদা। হাসান-এর পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত পুত্র শুরাহবীল ইবন আবদুল্লাহ, তিনি গাওদা ইবন মুছাহিম ইবন তামীম গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি শুরাহবীল ইবন হাসানা নামেও পরিচিত উছমান ইবন রাবীআ ইবন ইহবান ইবন ওয়াহাব ইবন হুযাফা ইবন জুমাহ, খুনায়সা ইবন হুযাফা ইবন কায়স ইবন

মা’মার ‘সাইবা বিশর ও সাঈদ এবং বৈপিত্রেয় ভাই সাঈদ ইবন কায়স ইবন আদী, তার মূল

ইবন সাহম, বনু সাহিম গোত্রের মিত্ৰ মাহমিয়্যা ইবন জুয আয যুবায়দী, মা’মার ইবন আবদুল্লাহ আল আন্দাবী, উরওয়া ইবন আবদুল উন্যযা, আদী ইবন নায়লা ইবন আবদুল উযযা, তার পুত্ৰ নুমান, আবদুল্লাহ ইবন মাখরামাহ আল-আমিরী, আবদুল্লাহ ইবন সুহায়ল ইবন আমর, সালীত ইবন আমর, তার ভাই সুকরান, তার সাথে তাঁর স্ত্রী সওবিত যাম’আ’,

আমিরী, তাদের মিত্ৰ সাআদ ইবন খাওলা (তিনি ইয়ামানী বংশোদ্ভূত ছিলেন) আবু উবায়দা

মাতা ছিলেন। বায়যার মূল নাম দা’দ বিনুত জাহিদাম ইবন উমাইয়া ইবন যারব ইবন হারিছ। ইবন ফিহর এই সুহায়াল হলেন সুহায়ল ইবন ওয়াহাব ইবন রাবীআ ইবন হিলাল

উছমান ইবন আবদ গানাম ইবন যুহায়র, সাঈদ ইবন আবদ কায়স ইবন লাকীত এবং তার ভাই হারিছ। তাঁরা ফিহর বংশের অন্তর্ভুক্ত।

ইবন ইসহাক বলেন, অনুষঙ্গী হিসেবে গমনকারী নাবালক পুত্ৰগণ এবং সেখানে জন্মগ্রহণকারী শিশুগণকে বাদ দিয়ে হিসেব করলে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলমানদের সংখ্যা হয় ৮৩। অবশ্য, যদি আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)-কে হিজরতকারীদের মধ্যে গণ্য করা হয়, তবে ৮৩ জন হবে। তবে তার আবিসিনিয়ায় গমন সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে জানা যায় না।

ইবন ইসহাক যে উল্লেখ করেছেন যে, মক্কা থেকে যারা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছেন, তাদের মধ্যে আবু মূসা আশআরীও রয়েছেন আমার মতে তাঁর এই মন্তব্য নির্ভরযোগ্য মনে হয় না? এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ (র) বলেন, হাসান ইবন মূসা. ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে নাজাশী নিকট প্রেরণ করলেন। আমরা সংখ্যায় প্রায় ৮০ জন ছিলাম। তাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ্দ, জাফর, আবদুল্লাহ ইবন আরাফাত, উছমান ইবন মাযউন এবং আবু মূসা। তাঁরা নাজাশীর নিকট এলেন। অন্যদিকে কুরায়শ গোত্রের লোকেরা আমর ইবন আস এবং আম্মার ইবন ওয়ালীদকে মূল্যবান উপটৌকন দিয়ে নাজাশীর নিকট প্রেরণ করে। নাজাশীর দরবারে উপস্থিত হয়ে তারা তাকে সিজদা করে এবং খুব দ্রুত তাদের একজন তার ডানদিকে এবং অপরজন বামদিকে বসে পড়ে। তারপর তারা তাকে বলে, আমাদের স্বগোত্রীয় কিছু লোক আমাদের প্রতি বিরূপ হয়ে এবং আমাদের ধর্ম ত্যাগ করে আপনার রাজ্যে এসে আশ্রয় নিয়েছে। নাজাশী বললেন, ওরা এখন কোথায়? তারা বলল, আপনার রাজ্যেই আছে। ওদেরকে ডেকে পাঠান। নাজাশী তাদেরকে ডেকে আনলেন। হযরত জাফর (রা) তার সাথীদেরকে বললেন, “আজ আমি আপনাদের সকলের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখব।” সকলে তা মেনে নিলেন। তিনি নাজাশীকে সালাম দিলেন, কিন্তু সিজদা করলেন না। রাজ-দরবারের লোকেরা বলল, আপনি জাহাঁপনাকে সিজদা করলেন না কেন? হযরত জাফর উত্তরে বললেন, আমরা মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সিজদা করি না। নাজাশী বললেন, এ কেমন কথা? জাফর (রা) বললেন, “আল্লাহ তা’আলা আমাদের প্রতি একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। ওই রাসূল আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যেন একমাত্ৰ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সিজদা না করি। তিনি আমাদেরকে নামায আদায় করতে এবং যাকাত দানের নির্দেশ দিয়েছেন।” কুরায়শ প্রতিনিধি আমরা বলে উঠলেন, ওরা ঈসা ইবন মারিয়ামের ব্যাপারে আপনার বিশ্বাসের বিপরীত বিশ্বাস পোষণ করে। নাজাশী বললেন, ঈসা (আ) এবং তাঁর মা মারিয়াম সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী? তিনি বললেন, তাদের সম্পর্কে আমরা ঠিক তা-ই বলি যা আল্লাহ বলেছেন, আর তা হলো, তিনি আল্লাহর কালেমা ও বাণী এবং তার রূহ। এ রূহকে তিনি সতীসাধবী কুমারী মারিয়ামের প্রতি নিক্ষেপ করেছেন। কোন পুরুষ ওই কুমারীকে স্পর্শ করেনি এবং কোন পুরুষ তার মধ্যে সন্তানের বীজ

বপন করেনি।” একথা শুনে নাজাশী মাটি থেকে একটি শুকনাে কাঠ তুলে নিলেন এবং বললেন, হে আবিসিনীয় সম্প্রদায়, পাদ্রী ও ধর্ম যাজকগণ! আমরা ঈসা (আ) সম্পর্কে যা বলি এরা তা থেকে এতটুকুও বাড়িয়ে বলেনি। হে আগন্তুক প্রতিনিধিদল! সাদর অভিনন্দন, আপনাদের প্রতি এবং যার পক্ষ থেকে আপনারা এসেছেন তার প্রতি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি সেই ব্যক্তি যার বর্ণনা আমরা ইনজীল কিতাবে পাই এবং তিনিই সেই রাসূল ঈসা (আ) যার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। আপনারা আমার রাজ্যের যেখানে ইচ্ছা বসবাস করতে থাকুন। আল্লাহর কসম, আমি যদি এখন রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বে না থাকতাম, তবে আমি নিশ্চয়ই তার নিকট যেতম এবং তার জুতা বহন করতাম। এরপর তাঁর নির্দেশে কুরায়শী প্ৰতিনিধি দলের দেয়া উপঢৌকন তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে অন্যতম হিজরতকারী হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা)-এর অব্যবহিত পরেই আবিসিনিয়া থেকে ফিরে আসেন এবং বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

বর্ণিত আছে যে, নাজাশীর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর মাগফেরাতের জন্যে দুআ করেন। এটি একটি মযবুত ও সুদৃঢ় সনদে বর্ণিত। এর বর্ণনা রীতিও চমৎকার। এ বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আবু মূসা (রা) সে সকল লোকের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা মক্কা থেকে আবিসিনিয়া গিয়েছিলেন। অবশ্য, এটা সঠিক হবে তখন যদি তাঁর নাম কোন বর্ণনাকারীর পক্ষ থেকে সংযোজিত না হয়ে থাকে। আবু ইসহাক সুবায়ঈ থেকে অন্য সনদেও এরূপ বৰ্ণিত আছে।

হাফিয আবু নুআয়ম (র) ‘আদদালাইল” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সুলায়মান ইবন আহমদ…… আবু মূসা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন জা’ফর ইবন আবু তালিব (রা)-এর সাথে নাজাশীর রাজ্যে চলে যেতে। কুরায়শগণ এ সংবাদ অবগত হয়। তারা প্রচুর পরিমাণে উপহার-উপঢৌকনসহ আমর ইবন “আস ও আম্মারা ইবন ওয়ালীদকে নাজাশীর নিকট পাঠায়। তারা উপহার সামগ্ৰী নিয়ে নাজাশীর দরবারে উপস্থিত হয়। নাজাশী ওই সব উপহার গ্রহণ করেন। তারা তাকে সিজদা করে। এরপর আমর ইবন আস বলেন, “আমাদের দেশের কতক লোক আমাদের পিতৃধৰ্ম ত্যাগ করে পালিয়ে এসে আপনার রাজ্যে অবস্থান করছে।” অবাক হয়ে নাজাশী বললেন, ওরা আমার রাজ্যে অবস্থান করছে? তারা বলল, হ্যা, আপনার রাজ্যেই। নাজাশী আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন। হযরত জাফর (রা) আমাদেরকে বললেন, আজ আমিই আপনাদের পক্ষে বক্তব্য রাখব, আপনাদের কেউ কোন কথা বলবেন না। এরপর আমরা নাজাশীর নিকট উপস্থিত হই। তিনি তখন আপন আসনে উপবিষ্ট। আমর ইবন আস–তাঁর ডানদিকে আর আম্মারা তার বাম দিকে বসা ছিলেন, পাদ্ৰীগণ দু’সারিতে বসা ছিলেন। কুরায়শ প্রতিনিধি আমার ও আম্মারাহ রাজাকে পূর্বেই বলে রেখেছিলেন যে, ওরা আপনাকে সিজদা করবে না। আমরা ওখানে পৌছানোর পর উপস্থিত পাদ্রী ও যাজকগণ আমাদেরকে বলল, “আপনারা জাহাঁপনাকে সিজদা করবেন।” হযরত জাফর (রা) বললেন, আমরা মহান আল্লাহ ব্যতীত কাউকে সিজদা করি না। আমরা যখন নাজাশীর নিকটে উপস্থিত হলাম, তখন তিনি জাফরকে বললেন, তুমি সিজদা

করলে না কেন? হযরত জাফর (রা) বললেন, আমরা মহান আল্লাহ ব্যতীত কাউকে সিজদা করি না। নাজাশী বললেন, সেটি কিরূপ? হযরত জাফর (রা) বললেন, আল্লাহ তা’আলা। আমাদের প্রতি একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। তিনি সেই রাসূল, ঈসা ইবন মািরয়াম তার পরে আহমদ নামের যে রাসূলের আগমনী সুসংবাদ দিয়েছিলেন। ওই রাসূল আমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং তার সাথে কাউকে শরীক না করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যেন নামায আদায় করি, যাকাত দিই। তিনি আমাদেরকে সৎকাজ করার আদেশ দিয়েছেন এবং অসৎ কাজ থেকে বারণ করেছেন। নাজাশী তার কথায় চমৎকৃত হন। এ অবস্থা দেখে আমর ইবন ‘আস নাজাশীকে বললেন, “আল্লাহ সম্রাটের মঙ্গল করুন, ওরা ঈসা (আ:)-এর ব্যাপারে আপনার বিরুদ্ধ মত পোষণ করে। নাজাশী জাফর (রা)-কে বললেন, আপনাদের নবী হযরত মারিয়াম পুত্র ঈসা (আ) সম্পর্কে কী বলেন? উত্তরে জাফর (রা) বললেন, তিনি তো তাই বলেন, যা আল্লাহ তা’আলা নিজে বলেছেন আর তা হলো, তিনি আল্লাহর প্রেরিত রূহ, এবং আল্লাহর কালেমা ও বাণী। আল্লাহ তা’আলা তাকে এমন একজন সতী-সাধবী কুমারীর গর্ভ থেকে বের করেছেন কোন পুরুষ যার নিকট যায়নি এবং যার মধ্যে কোন সন্তানের বীজ নিক্ষেপ করেনি। তারপর নাজাশী মাটি থেকে একটি শুকনো কাঠ তুলে নিয়ে বললেন, “হে পাদ্রী ও যাজক সম্প্রদায়! মািরয়াম পুত্র সম্পর্কে আমরা যা বলি, ওরা তা থেকে এতটুকুও অতিরিক্ত বলে না। এমনকি এই শুকনো কাঠ পরিমাণও নয়।”

“হে প্রতিনিধিদল, সাদর অভিনন্দন আপনাদের প্রতি এবং আপনারা যার পক্ষ থেকে এসেছেন তাঁর প্রতি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি সেই মহান পুরুষ হযরত ঈসা (আ) যার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। আমি যদি রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বে না। থাকতাম, তবে আমি অবশ্যই তাঁর নিকট যেতম এবং তাঁর পাদুকাদ্বয়ে চুমু খেতাম। আপনারা আমার রাজ্যে যেখানে ইচ্ছা বসবাস করুন। তিনি আমাদেরকে খাদ্য ও পোশাক-পরিচ্ছদ দানের নির্দেশ দিলেন এবং কুরায়শ প্রতিনিধিদের উপহার সামগ্ৰী ফেরত দেয়ার আদেশ করলেন।

আমর ইবন আস ছিলেন একজন বেঁটে মানুষ। আর আম্মারা ছিল সুদৰ্শন ব্যক্তি। তারা দু’জনে সাগর তীরে এসে পানি পান করেন। আমারের সাথে তার স্ত্রীও ছিলেন। পানি পান করার পর আম্মারা তার সাখী। আমরকে বলল, তুমি তোমার স্ত্রীকে নির্দেশ দাও সে যেন আমাকে চুমু খায়। আমরা বললেন, তাতে তোর লজ্জা হয় না। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে আম্মারা তার সাখী আমরকে তুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে। আমারের কাকুতি-মিনতি ও প্ৰাণে বঁাচানোর দোহাই দেয়ার প্রেক্ষিতে আম্মারা তাকে নীেকায় তুলে নেয়। এ ঘটনায় আম্মারার প্রতি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। আমরা। প্ৰতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে তিনি নাজাশীকে গিয়ে বলেন যে, আপনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে আম্মারা গিয়ে আপনার স্ত্রীর সাথে কুকর্ম করে। নাজাশী তখন আম্মারাকে ডেকে আনেন। তারপর তার পুরুষাঙ্গে ছিদ্র করে দেন। অবশেষে সে বন্য প্রাণীদের সাথে ঘুরে বেড়াতো। হাফিয বায়হাকী (র) আদ-দালাইল গ্রন্থে আবু আলী হাসান ইবন সালাম আসা সাওয়াক সূত্রে উবায়দুল্লাহ ইবন মূসা থেকে নিজস্ব সনদে এরূপ বর্ণনা করেছেন, “তিনি আমাদের জন্যে খাদ্য ও বিস্ত্রের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিলেন” পর্যন্ত।

বায়হাকী (র) বলেন, এটি একটি বিশুদ্ধ সনদ। বাহ্যত মনে হয় যে, আবিসিনিয়ায় হিজরতের অব্যাহিত পূর্বে হযরত আবু মূসা (রা) মক্কাতেই অবস্থান করছিলেন এবং সেখান থেকে তিনি জাফর ইবন আবু তালিবের সাথে আবিসিনিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তবে বিশুদ্ধ সনদে ইয়াখীদ ইবন আবদুল্লাহ। . আবু মূসা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তারা ইয়ামানে অবস্থান কালে সংবাদ পান যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হিজরত করেছেন। ফলে তাঁরা পঞ্চাশাধিক লোক একটি নৌকায় করে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হন।

নৌকা তাদেরকে আবিসিনিয়ার রাজা নাজাশীর দরবারে নিয়ে পৌছায়। সেখানে জাফর ইবন আবু তালিব ও তাঁর সাথীদের সাথে তাদের সাক্ষাত হয়। জাফর ইবন আবু তালিব তাদেরকে সেখানেই অবস্থান করতে বলেন। ফলে, তারা সেখানে থেকে যান। অবশেষে খায়বারের যুদ্ধের সময় তাঁরা সকলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এসে পৌছেন।

এরপর বায়হাকী বলেন, জাফর ইবন আবু তালিব এবং নাজাশীর মধ্যে আলাপচারিতার সময় আবু মূসা (রা) উপস্থিত ছিলেন এবং পরে তিনি তা বর্ণনা করেছেন। তবে যে বর্ণনায় আবু মূসার এ বক্তব্য এসেছে, “রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন জাফরের সাথে আবিসিনিয়ায় যেতো।” সে বর্ণনায় সম্ভবত বর্ণনাকারীর ভুল হয়েছে। আল্লাহই ভাল জানেন।

ইমাম বুখারী (র) “আবিসিনিয়ায় হিজরত” অধ্যায়ে অনুরূপ উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেন, মুহাম্মাদ ইবন আলা……. আবু মূসা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন আমরা এ সংবাদ অবগত হলাম। আমরা তখন ইয়ামানে। এরপর হিজরতের উদ্দেশ্যে আমরা একটি নৌকায় আরোহণ করি। নৌকা আমাদেরকে আবিসিনিয়ায় নাজাশীর নিকট নিয়ে পৌছায়। সেখানে জাফর ইবন আবু তালিব (রা)-এর সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। আমরা তার সাথে সেখানেই অবস্থান করতে থাকি। অবশেষে আমরা ফিরে আসি এবং খায়বার বিজয়কালে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে আমাদের দেখা হয়। আমাদের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “হে নীেকার আরোহিগণ তোমরা দুটো

ইমাম মুসলিম (র) আবু কুরায়ব এবং আবু আমির আবদুল্লাহ ইবন বুরাদ সূত্রে আবু উসামা থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তাঁরা দু’জনে অন্যত্র এ বিষয়ে আরও দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন।

আসাকির তার ইতিহাস গ্রন্থে “জাফর ইবন আবু তালিবের প্রসঙ্গ” অধ্যায়ে জাফর (রা)-এর নিজের জবানীতে উদ্ধৃত করেছেন। আবার তিনি আমর ইবন আসের বর্ণনাও উদ্ধৃত করেছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে ইতোপূর্বে উল্লিখিত ইবন মাসউদ (রা)-এর বর্ণনাটিও উদ্ধৃত করেছেন। হযরত উন্মু সালামা (রা)-এর একটি বর্ণনা তিনি এনেছেন যা একটু পরেই আমরা উল্লেখ করব। বস্তৃত, জাফর ইবন আবু তালিবের নিজের বর্ণনাটি বিশুদ্ধতর। ইবন আসাকির সেটি উল্লেখ করেছেন এভাবে : আবুল কাসিম……. আবদুল্লাহ ইবন জাফর তাঁর পিতা সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে,

তিনি বলেছেন, আবু সুফিয়ানের পক্ষ থেকে সংগৃহীত মূল্যবান উপহারসামগ্ৰী নিয়ে কুরায়শের লোকেরা আমর ইবন আস ও আম্মারা ইবন ওয়ালীদকে নাজাশীর নিকট প্রেরণ করে। আমরা

তখন আবিসিনিয়ায়। তারা নাজাশীকে বলল, আমাদের কতক নীচু স্তরের মুর্থ লোক দেশ ছেড়ে আপনার রাজ্যে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আপনি ওদেরকে আমাদের হাতে তুলে দিন। রাজা বললেন, “না, ওদের বক্তব্য না শুনে আমি ওদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না।” রাজা আমাদের নিকট লোক পাঠালেন। আমরা তার দরবারে উপস্থিত হলে তিনি বললেন, ওরা এসব কী বলছে? আমরা বললাম, ওরা তো এমন এক সম্প্রদায়, যারা মূর্তি পূজা করে। এদিকে আল্লাহ তা’আলা আমাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। আমরা ওই রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাকে সত্য বলে গ্রহণ করেছি। কুরায়শ প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে নাজাশী বললেন, এদের মধ্যে কি তোমাদের কোন দাস-দাসী আছে? ওরা বলল, না নেই। রাজা বললেন, এদের কারো কাছে কি তোমাদের কোন পাওনা আছে? ওরা বলল, না, নেই। এবার রাজা বললেন, “তবে ওদের ব্যাপারে নাক গলিয়ে না। ওদেরকে ওদের মত থাকতে দাও।”

হযরত জাফর (রা) বলেন, আমরা দরবার থেকে বেরিয়ে এলাম। এরপর আমর ইবন “আস রাজাকে বলল, এরা ঈসা (আ) সম্পর্কে আপনি যা বলেন, তার বিপরীত বলে। রাজা বললেন, ঈসা (আ) সম্পর্কে আমি যা বলি তারা যদি সেরূপ না বলে, তবে আমি তাদেরকে এক মুহুৰ্তও আমার রাজ্যে থাকতে দেব না। রাজা আমাদেরকে পুনরায় ডেকে পাঠালেন। আমাদেরকে দ্বিতীয়বার ডাকা আমাদের নিকট প্রথমবারের চেয়ে গুরুতর মনে হল। তোমাদের নবী হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে কী বলেন? রাজা জিজ্ঞেস করলেন। আমরা বললাম, তিনি বলেন যে, ঈসা (আ:) আল্লাহর রূহ এবং তাঁর কালেমা, যা তিনি সতী-সাধ্বী কুমারীর মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন। রাজা লোক পাঠিয়ে বললেন, অমুক পাদ্রী এবং অমুক যাজককে ডেকে নিয়ে আস।। কতক যাজক ও পাদ্রী উপস্থিত হল। রাজা বললেন, আপনারা ঈসা (আ) সম্পর্কে কী বলেন? তারা বলল, আপনি তো আমাদের মধ্যে সবচাইতে জ্ঞানী ব্যক্তি, আপনি কী বলে? নাজাশী ইতোমধ্যে মাটি থেকে কিছু একটা হাতে তুলে নিলেন এবং বললেন : “এরা ঈসা (আ) সম্পর্কে যা বলছে মূলত ঈসা (আ) তার চাইতে এতটুকুও বেশী নন। এরপর রাজা আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমাদের কাউকে কি কেউ কোন কষ্ট দেয়? আমরা বললাম, জী হ্যা তখন রাজাদেশে জনৈক ঘোষক ঘোষণা দিয়ে বলল; এদের কাউকে যদি কেউ কষ্ট দেয়, তবে চার দিরহাম জরিমানা দিতে হবে। তারপর আমাদেরকে বললেন, এতে তোমাদের চলবে তো? আমরা বললাম, জী না। তখন তিনি জরিমানা দ্বিগুণ নির্ধারণ করে দিলেন। হযরত জাফর (রা) বলেন, পরবতীতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন হিজরত করে মদীনা এলেন এবং সেখানকার কর্তৃত্ব লাভ করলেন, তখন আমরা রাজাকে বললাম, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় হিজরত করে সেখানকার কর্তৃত্ব লাভ করেছেন, আর যে কাফির নেতাদের কথা আমরা আপনাকে বলেছিলাম ওরা নিহত হয়েছে। এখন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে মিলিত হতে চাই। আপনি আমাদের যাওয়ার অনুমতি দিন। নাজাশী বললেন, : ঠিক আছে, তাই হবে। তিনি আমাদের যানবাহনের ব্যবস্থা করে দিলেন এবং আমাদেরকে প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম দিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, “আমি আপনাদের প্রতি যে সদ্ব্যবহার করেছি। তাকে বলবেন। আর এ লোক আমার প্রতিনিধি হিসাবে আপনাদের সাথে যাবে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা’বুদ নেই এবং

দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। জাফর (রা) বলেন, আমরা সেখান থেকে যাত্ৰা করে মদীনায়

ধরলেন। তারপর বললেন, এখন আমি খায়বার বিজয়ের আনন্দে বেশী আনন্দিত, নাকি জাফরের আগমনে বেশী আনন্দিত, তা বুঝতে পারছি না। এটা ছিল খায়বার বিজয়কালের ঘটনা। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বসলেন। নাজাশীর প্রতিনিধি বললেন, এ যে জাফর, তাকে জিজ্ঞেস করুন, আমাদের রাজা তার সাথে কেমন আচরণ করেছেন?

জাফর বললেন, হ্যা অবশ্যই রাজা আমাদের সাথে এরূপ এরূপ সদাচারণ করছেন। আমাদের যানবাহন ও পাথেয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা’বুদ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি আমাকে বলেছেন, আমি যেন আপনাকে বলি তাঁর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে। এসব শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) উঠে দাঁড়ালেন এবং উযু করে নিলেন। তারপর ৬-৯L L + 2। 11 —“হে আল্লাহ নাজাশীকে ক্ষমা করুন।” বলে উপযুপরি তিনবার দু’আ করলেন। প্রতিবার উপস্থিত মুসলমানগণ আমীন” বলেন। এরপর হযরত জাফর (রা) প্রতিনিধিকে বললেন, আপনি এবার আপনার দেশে যেতে পারেন এবং সেখানে গিয়ে আপনার রাজাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে যা লক্ষ্য করলেন সে সম্পর্কে অবহিত করবেন।

ইবন আসাকির এটি হাসান-গরীব পর্যায়ের বর্ণনা বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত উন্মে সালামা (রা)-এর বর্ণনা এই, ইউনুস ইবন বুকায়ার…….. উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। যে, তিনি বলেছেন, মক্কায় সাহাবীগণের জীবন যাত্রা যখন দুর্বিষহ হয়ে উঠে এবং তারা চরমভাবে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হতে থাকেন। দীন-ধর্ম পালনের প্ৰেক্ষিতে নানা প্রকার জুলুম-পীড়নের সম্মুখীন হচ্ছিলেন, নিজ সম্প্রদায় এবং তার চাচা আবু তালিবের প্রভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) মোটামুটি নিজে কিছুটা রক্ষা পেলেও তাঁর সাহাবীগণকে রক্ষায় তিনি অপারগ। হয়ে পড়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি তার সাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বললেন, আবিসিনিয়ায় একজন রাজা আছেন, তার রাজ্যে কারো প্ৰতি জুলুম করা হয় না। তোমরা সবাই তাঁর রাজ্যে চলে যাও। এখানে তোমরা যে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, সেখানে গেলে আশা করি আল্লাহ্ তা’আলা তা থেকে নিস্কৃতি দেবেন। তখন আমরা ওই রাজ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। সেখানে আমরা সবাই একত্রিত হই। আমাদের দীনের ব্যাপারে নিরাপদ হয়ে আমরা একটি ভাল দেশে ভাল পরিবেশে গিয়ে পৌছি। সেখানে আমাদের উপর কোন জুলুম-অত্যাচারের আশংকা ছিল না। কুরায়শের লোকেরা যখন লক্ষ্য করল যে, আমরা একটি নিরাপদ বাসস্থান পেয়েছি, তখন তারা আমাদের প্রতি আরো মারমুখো হয়ে উঠে। তারা একমত হয় যে, আমাদেরকে ওই রাজ্য থেকে বের করে তাদের হাতে সোপর্দ করে দেয়ার জন্যে তারা নাজাশীর নিকট একটি প্রতিনিধিদল পাঠাবে। তারা আমর ইবন ‘আসা এবং আবদুল্লাহ ইবন আবু রাবী আকে নাজাশীর নিকট পাঠায়। তারা নাজাশী এবং তাঁর প্রত্যেক সেনাপতির জন্যে পৃথক পৃথক উপহারসামগ্ৰী প্রস্তুত করে। প্রতিনিধি দু’জনকে তারা নির্দেশ দেয় যে, রাজার সাথে পলায়নকারীদেরকে প্রত্যার্পণের আলোচনা শুরু করার পূর্বেই প্রত্যেক সেনাপতিকে নির্ধারিত

উপহার দিয়ে দিবে। তারপর রাজার জন্য নির্ধারিত উপহার তাকে দেবে। পলায়নকারীদের সাথে রাজার কথোপকথন হওয়ার পূর্বে যদি তাঁর কাছ থেকে ওদেরকে ফেরত নিতে পোর, তবে তাই করবে। পরিকল্পনা মুতাবিক আমর ইবন আস এবং আবদুল্লাহ ইবন আবু রাবীআ নাজাশীর দরবারে উপস্থিত প্রত্যেক সেনাপতিকে নির্ধারিত উপহার প্রদান করে। তারা বলে যে, আমরা এ রাজ্যে এসেছি আমাদের কতক মুখ লোককে ফেরত নিয়ে যেতে। ওরা পিতৃধৰ্ম ত্যাগ করেছে কিন্ত আপনাদের ধর্মও গ্ৰহণ করেনি। ওদের সম্প্রদায়ের লোকজন আমাদেরকে এ জন্যে জাহাঁপনার নিকট পাঠিয়েছে যে, তিনি যেন ওই লোকগুলোকে স্বদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেন। আমরা এ বিষয়ে জাহাঁপনার সাথে যখন আলোচনা করব, তখন আপনারা সেনাপতিবর্গ ওদেরকে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে তাকে উৎসাহিত করবেন, তার বলল, আমরা তাই করব। এরপর তারা নাজাশীর নিকট যায় এবং তাঁর জন্যে নির্ধারিত উপটৌকন তার হাতে তুলে দেয়। মক্কা থেকে প্রেরিত উপঢৌকন সামগ্ৰীর মধ্যে সবাধিক প্রিয় ও মূল্যবান ছিল চামড়া। মূসা ইবন উকবা উল্লেখ করেছেন যে, তারা তাকে একটি ঘোড়া ও একটি রেশমী জুব্বাও উপহার দেয়। উপহার হস্তান্তর করে তারা বলল :

রাজন! আমাদের সম্প্রদায়ের কতক মূখ্য যুবক পিতৃধৰ্ম ত্যাগ করেছে কিন্তু আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি। তারা এমন একটি নতুন ধর্ম এনেছে যা সম্পর্কে আমরা কিছুই জ্ঞাত নই। এখন তারা আপনার রাজ্যে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ওদের ব্যাপ-চাচা ও সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাদেরকে আপনার নিকট পাঠিয়েছে যাতে করে আপনি এদেরকে ওঁদের নিকট ফেরত পাঠিয়ে দেন। এ লোকগুলো কিন্তু ভীষণ দাম্ভিক। ওরা কোন দিন আপনার ধর্ম গ্রহণ করবে না। যে আপনি তাদেরকে নিরাপত্তা দেবেন। একথা শুনে রাজা ক্রুদ্ধ হন। তিনি বললেন, না, আল্লাহর কসম, ওদেরকে ডেকে এনে ওদের কথা না শোনা এবং ওদের প্রকৃত অবস্থা না জানা পর্যন্ত আমি ওদেরকে ফেরত দেব না। ওরা তো এমন কতক লোক, যারা আমার রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে এবং অন্যের প্রতিবেশী হওয়া অপেক্ষা আমার প্রতিবেশী হওয়ার অগ্রাধিকার দিয়েছে। হাঁ এরা যা বলেছে। ওরা যদি সত্যি সত্যি সেরূপ হয়ে থাকে, তবে আমি ওদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দেব। কিন্তু ওরা যদি সেরূপ না হয়, তবে আমি ওদেরকে আশ্রয় দেবো। ওদের উপর কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করব না এবং ওদের প্রতিপক্ষকে খুশী করব না। মূসা ইবন উকবা বলেন, তখন পারিষদ নাজাশীকে ইঙ্গিতে বলেছিলেন, যেন ওদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রাজা বললেন, না, আল্লাহর কসম, ওদেরকে ফেরত দেব না।

হিজরতকারী মুসলমানগণ রাজ-দরবারে এলেন। তারা রাজাকে সালাম দিলেন বটে, কিন্তু সিজদা করলেন না। রাজা বললেন, হে লোকসকল! বল দেখি, তোমাদের সম্প্রদায়ের যারা ইতোপূর্বে আমার নিকট এলো তারা আমাকে যে ‘ভাবে অভিবাদন জানালো তোমরা সেভাবে অভিবাদন জানালে না কেন? আমাকে আগে বল, ঈসা (আ) সম্পর্কে তোমাদের বক্তব্য কী এবং তোমাদের ধর্ম কি? তোমরা কি খৃস্টান? মুসলমানগণ উত্তরে বললেন, না, আমরা খৃস্টান নাই। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা কি ইয়াহুদী? তারা বললেন, না, আমরা ইয়াহুদীও নই। তিনি বললেন তাহলে তোমরা তোমাদের স্বজাতির ধর্মানুসারী? তাঁরা বললেন, না, আমরা তাও নই।

এবার রাজা বললেন, তাহলে তোমাদের ধর্ম কি? তারা বললেন, ইসলাম। রাজা বললেন: ইসলাম কী? তারা বললেন, আমরা আল্লাহর ইবাদত করি। তাঁর সাথে কাউকে শরীক করি না। তিনি বললেন, এই ধর্ম কে নিয়ে এসেছেন? তারা বললেন, এটি আমাদের নিকট নিয়ে এসেছেন আমাদের মধ্যকার একজন। আমরা তাকে সম্যক চিনি। তার বংশ পরিচয় জানি। আমাদের পূর্ববতী সম্প্রদায়সমূহের প্রতি আল্লাহ তা’আলা যেমন রাসূল প্রেরণ করেছেন, তেমনি তাকে আমাদের প্রতি রাসূল রূপে প্রেরণ করেছেন। তিনি আমাদেরকে সততা, সত্যবাদিতা, প্রতিজ্ঞাপূরণ ও আমানত রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন এবং মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আমাদেরকে আদেশ করেছেন একক লা-শরীক আল্লাহর ইবাদত করতে। আমরা তাকে সত্য নবী বলে বরণ করে নিয়েছি। আল্লাহর বাণী উপলব্ধি করেছি এবং তিনি যা এনেছেন তা যে আল্লাহর পক্ষ থেকেই এনেছেন তা অনুধাবন করেছি। আমরা এরূপ করার কারণে আমাদের সম্প্রদায় আমাদের শক্রতে পরিণত হয়েছে! তারা সত্যবাদী নবীর সাথে শক্ৰতা পোষণ করেছে। তাকে মিথ্যাবাদী ঠাওরিয়েছে এবং তাকে হত্যার প্রয়াস পেয়েছে। তারা আমাদেরকে মূর্তিপূজায় ফিরিয়ে নিতে চেয়েছে। ফলে, আমরা আমাদের প্রাণ বাঁচানাে ও ধর্ম রক্ষার জন্যে আপনার নিকট পালিয়ে এসেছি।

রাজা বললেন, আল্লাহর কসম, এতো সেই জ্যোতির উৎস থেকে উৎসারিত, যেখান থেকে এসেছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর ধর্ম।

হযরত জাফর (রা) বললেন, অভিবাদন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে বলেছেন যে, জান্নাতবাসীদের অভিবাদন হল “সালাম”। তিনি আমাদেরকে সালামের মাধ্যমে অভিবাদন জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং আমরা পরস্পরে যে ভাবে অভিবাদন জানাই, আপনাকেও সে ভাবে অভিবাদন জানিয়েছি। আর ঈসা ইবন মারিয়াম (আ:) সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হল, তিনি আল্লাহ তা’আলার বান্দা ও রাসূল। তিনি মািরয়ামের প্রতি নিক্ষিপ্ত আল্লাহর কালেমা ও রূহ এবং তিনি সতী-সাধবী কুমারী মাতার পুত্র। এবার রাজা একটি শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ড হাতে তুলে নিলেন। এবং বললেন, এরা যা বলেছে মারিয়াম পুত্র ঈসা তার চেয়ে এতটুকুও অতিরিক্ত নন। তখন আবিসিনিয়ার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ বললেন, রাজন হাবশী লোকজন আপনার একথা শুনলে তারা অবশ্যই আপনাকে সিংহাসনচ্যুত করবে। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি ঈসা (আ) সম্পর্কে যা বলেছি কখনো তার ব্যতিক্রম কিছু বলব না। আল্লাহ যখন আমাকে আমার রাজত্ব ফিরিয়ে দেন, তখন লোকজন তো আল্লাহর আনুগত্য করেনি। সুতরাং আমিও আল্লাহর দীনের ব্যাপারে লোকজনের কথা মানবো না। এ জাতীয় অপকর্ম থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। ইবন ইসহাক সূত্রে ইউনুস বর্ণনা করেছেন যে, রাজা নাজাশী মহাজিরগণের নিকট লোক পাঠিয়ে তাদেরকে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি মুসলমানদের কথা শুনবেন আমর ইবন আস এবং আবদুল্লাহ ইবন আবু রাবী আর নিকট এর চেয়ে ক্ষোভের বিষয় অন্য কিছু ছিল। না। নাজাশীর দূত আগমন করার পর মুসলমানগণ একত্রিত হলেন এবং পরস্পর আলোচনা করলেন যে, তারা কী বলবেন? শেষে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, পরিস্থিতি যাই হোক, আল্লাহর কসম, আমরা তাই বলব, যা আমরা জানি। আমরা যে দীনের উপর আছি এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের নিকট যা নিয়ে এসেছেন, তাই বলবো। তাতে যা হয় হবে।

রাজ-দরবারে উপস্থিত হওয়ার পর জাফর ইবন আবু তালিব (রা) সকলের পক্ষে কথা বললেন। রাজা বললেন, তোমরা যে ধর্ম অনুসরণ করছে, সেটা কী? তোমরা তো স্বজাতির ধর্ম ত্যাগ করেছে। অথচ ইয়াহুদী কিংবা খৃস্টান ধৰ্মও গ্রহণ করেনি। জাফর (রা) বললেন, “রাজন, আমরা ছিলাম অংশীবাদী। আমরা মূর্তিপূজা করতাম। মৃত প্রাণীর গোশত খেতাম। প্রতিবেশীর সাথে অসদাচরণ করতাম। খুন-খারাবী ও অন্যান্য অপকর্মকেও আমাদের কেউ কেউ বৈধ মনে করত। আমরা হালাল-হারামের ধার ধরতাম না। এ অবস্থায় আল্লাহ তা’আলা। আমাদের প্রতি আমাদেরই মধ্য থেকে একজন লোককে রাসূল রূপে প্রেরণ করলেন। তাঁর সত্যবাদিতা প্রতিজ্ঞাপূরণ ও আমানতদারী সম্পর্কে আমরা সম্যক অবগত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে আহবান জানলেন আমরা যেন এক লা-শরীক আল্লাহর ইবাদত করি। আমরা যেন আত্মীয়তা বন্ধন ছিন্ন না করি। প্রতিবেশীর হক নষ্ট না করি। মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামায আদায় করি। তাঁর সন্তুষ্টির জন্যে রোযা পালন করি এবং তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করি।

ইবন ইসহাক থেকে যিয়াদ উদ্ধৃত করেছেন যে, জাফর ইবন আবু তালিব আরো বলেন, “ওই রাসূল আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি আহবান জানান। তিনি আদেশ করেন আমরা যেন আল্লাহর একত্ববাদ মেনে নিই, তার ইবাদত করি আর আমাদের পূর্বপুরুষগণ এবং আমরা আল্লাহ ব্যতীত যে মূর্তিপূজা ও পাথরপূজা করতাম, তা যেন পরিহার করি। তিনি আমাদেরকে সত্য কথা বলার জন্যে, আমানত পরিশোধের জন্যে, আত্মীয়তা রক্ষার জন্যে, সৎ প্রতিবেশী সুলভ আচরণ করার জন্যে এবং হারাম কাজও খুন-খারাবী থেকে বেঁচে থাকার জন্যে নির্দেশ দেন। অশ্লীলতা, মিথ্যাচার, ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ সতী-সাধবী নারীর প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করতে তিনি বারণ করেন। তিনি আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যেন আল্লাহর ইবাদত করি। তাঁর সাথে কিছুকে শরীক না করি, নামায আদায় করি, যাকাত দেই এবং রোষা পালন করি। বৰ্ণনাকারী বলেন, এভাবে ইসলামের বিধি-বিধানের কথা তারা এক এক করে তাঁর নিকট পেশ করেন। অত:পর আমরা সেই রাসূলকে সত্য বলে গ্রহণ করি। তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করি। আল্লাহর নিকট থেকে তিনি যা নিয়ে এসেছেন আমরা তা অনুসরণ করি। এ প্রেক্ষিতে আমরা একক, অনন্য লা-শরীক আল্লাহর ইবাদত করতে থাকি। তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা থেকে বিরত থাকি। তিনি আমাদের জন্যে যা হারাম বলে ঘোষণা করেছেন আমরা সেগুলোকে হারামরূপে বর্জন করতে থাকি এবং তিনি যা হালাল ঘোষণা দিয়েছেন তা হালালরূপে গ্ৰহণ করি। এই পরিস্থিতিতে আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজন আমাদের শক্ৰ হয়ে উঠে। আমাদেরকে আমাদের দীন-ধর্ম থেকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে এবং আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে মূর্তিপূজায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আমাদের উপর তারা নির্যাতন চালাতে থাকে। আমরা পূর্বে যেমন নাপাক ও অপবিত্র কাজগুলো হালাল মনে করতাম এখনও যেন তা করি, সে জন্যে তারা আমাদেরকে দুঃখ-কষ্ট দিতে থাকে। তারা যখন আমাদের উপর নির্যাতন চালােল, আমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলল এবং আমাদের ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করল, তখন আমরা আপনার রাজ্যে পালিয়ে এলাম। অন্য সকলের পরিবর্তে আপনাকেই আমরা বেছে নিলাম। অন্যদের পরিবর্তে আপনার প্রতিবেশকেই অগ্রাধিকার দিলাম। রাজন!

আমাদের একান্ত আশা যে, আপনার আশ্রয়ে আসার পর কেউ আমাদের উপর জুলুম করতে পারবে না।

রাবী বলেন, তখন নাজাশী বললেন, তোমাদের নবী তোমাদের নিকট যা নিয়ে এসেছেন তার কোন অংশ কি তোমার নিকট আছে? ইতোমধ্যে তিনি তার ধর্মযাজকদেরকে ডেকে এনেছিলেন। তাঁর পাশে বসে তাঁরা ধর্মগ্রন্থ খুলে বসলেন। হযরত জাফর বললেন, হ্যা বাণী আছে। রাজা বললেন, তা নিয়ে এসো এবং পড়ে শুনাও? হযরত জাফর সূরা মািরয়ামের শুরু থেকে কিছু অংশ তিলাওয়াত করলেন। তা শুনে নাজাশী কাঁদতে শুরু করলেন। অশ্রুতে তার দাড়ি ভিজে গেল। ধর্মযাজকরা কেঁদে কেঁদে তাদের ধর্মগ্রন্থ ভিজিয়ে ফেললেন। এবার রাজা বললেন, এই বাণী নিশ্চয়ই সেই জ্যোতির্ময় উৎস থেকে উৎসারিত হয়েছে, যেখান থেকে মূসা (আ)-এর বাণী উৎসারিত হয়েছিল। কুরায়শ প্রতিনিধিদেরকে তিনি বললেন, তোমরা সোজা চলে যাও। আমি এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেবো না এবং এ বিষয়ে আমি তোমাদেরকে খুশী করতে পারব না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমরাও ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। ওদের দু’জনের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন আবু রাবীআ আমাদের প্রতি অনেকটা সহানুভূতিশীল ছিল।

এরপর আমর ইবন আস বলল, আল্লাহর কসম, পরের দিন আমি আবার যাব এবং এমন কাজ করব যে, এই সবুজের দেশ থেকে আমি ওদেরকে সমূলে উৎপাটিত করে দেব! আমি রাজাকে বলব, রাজা যে ঈসা (আ:)-এর উপাসনা করে থাকেন সেই ঈসাকে ওরা দাস বলে বিশ্বাস করে। আবদুল্লাহ ইবন আবু রাবীআ৷ তাকে বলল, “তুমি ওসব করো না। কারণ, ওরা আমাদের বিরোধিতা করলেও তারা তো আমাদের আত্মীয়, আমাদের উপর তাদেরও একটা হক রয়েছে। সে বলল, না, আল্লাহর কসম, আমি ওই কাজ করবই।

পরের দিন সে রাজ-দরবারে উপস্থিত হয়ে বলে, রাজন! ওরা তো ঈসা (আ) সম্পর্কে গুরুতর কথা বলে। ওদেরকে ডেকে এনে ঈসা (আ) সম্বন্ধে ওদের বিশ্বাসের কথা জিজ্ঞেস করুন।

রাজা পুনরায় আমাদের নিকট লোক পাঠালেন। আল্লাহর কসম, এসময়ে আমরা যে বিপদের সম্মুখীন হই ইতোপূর্বে আর তেমনটি হইনি। আমরা একে অন্যকে বললাম, যদি ঈসা। (আ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন তবে কী উত্তর দিবে? আমাদের সকলে বলল, তার সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা যা বলেছেন এবং আমাদের নবী (সা) আমাদেরকে যা বলার নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা তাই বলব। তখন তাঁরা সকলে রাজার নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁর সেনাপতিগণ তখন তাঁর পাশে উপবিষ্ট। আমাদের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, ঈসা (আ) সম্পর্কে তোমরা কী বলো? সবার পক্ষ থেকে জাফর (রা) বললেন, আমরা এটা বলি যে, তিনি আল্লাহর বান্দা, আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর রূহ এবং আল্লাহর কালেমা, সতী-সাধবী কুমারীর প্রতি আল্লাহ সেটিকে নিক্ষেপ করেছেন। একথা শুনে নাজাশী যমীনের দিকে হাত নামালেন এবং দ্য আঙ্গুলোর মাঝে একটি ছোট শুকনো কাষ্ঠখণ্ড তুলে নিয়ে বললেন, আপনি ঈসা (আ) সম্পর্কে যা বলেছেন ঈসা। (আ) তা থেকে এতুটুকুও বেশী নন।

রাজার এ বক্তব্যে সেনাপতিদের মধ্যে গুঞ্জরণ সৃষ্টি হয়। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, তোমরা গুঞ্জরণ করা আর অসন্তুষ্ট হও আমি যা বলেছি তাই সঠিক। মুসলমানদেরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, আপনারা যেতে পারেন। এ রাজ্যে আপনারা সম্পূর্ণ নিরাপদ। কেউ আপনাদেরকে গালি দিলে জরিমানা দিতে হবে। কেউ আপনাদের গালি দিলে জরিমানা দিতে হবে। কেউ আপনাদেরকে গালি দিলে জরিমানা দিতে হবে। একে একে তিনবার তিনি এ ঘোষণা দিলেন। আপনাদের কাউকে কষ্ট দিয়ে আমি স্বর্ণখণ্ডের অধিকারী হব, তাও আমি পসন্দ করি না। ইবন ইসহাক থেকে যিয়াদের বর্ণনায় আছে, আমি স্বর্ণের মালিক হই তাও আমার পসন্দ নয়। ইবন হিশাম বলেন, রাজা তখন স্বর্ণখণ্ডের পরিবর্তে “স্বর্ণের পাহাড়’ শব্দ বলেছিলেন।

এরপর নাজাশী বললেন, আল্লাহ তা’আলা যখন আমাকে রাজত্ব ফিরিয়ে দিলেন, তখন তিনি আমার থেকে ঘুষ নেননি। আর তখন লোকজন আমার আনুগত্য করেনি। তাহলে আমি তাদের কথা মানতে যাবো কেন? তারপর তিনি তাঁর লোককে বললেন, কুরায়শ প্রতিনিধিদের দেয়া উপঢৌকন সামগ্রী ফিরিয়ে দাও।

ওসবে আমার প্রয়োজন নেই। আর তাদেরকে বললেন, তোমরা দু’জন আমার রাজ্য ছেড়ে চলে যাও। এরপর তারা যা নিয়ে এসেছিল তা সহ ব্যর্থতার গ্রানি নিয়ে চলে গেল। আমরা উত্তম রাষ্ট্রের উত্তম মানুষের প্রতিবেশে সেখানে বসবাস করতে থাকি।

ইতোমধ্যে আবিসিনিয়ার জনৈক বিদ্রোহী ব্যক্তি নাজাশীর রাজ্য কেড়ে নিতে উদ্যত হয়। এতে আমরা ভীষণ দুঃখ পাই। আমরা এ জন্যে শংকিত হয়ে পড়ি যে, সে লোক যদি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তবে নাজাশী আমাদের যেরূপ কদর করেছেন ওই ব্যক্তি তা নাও করতে পারে। আমরা আল্লাহর দরবারে নাজাশীর জন্যে দু’আ ও সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকি। নাজাশী যুদ্ধাভিযানে বের হলেন। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবীগণ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলাম যে, আমাদের মধ্য থেকে ঘটনাস্থলে কে যাবে এবং দেখবে কোন পক্ষ বিজয়ী হচ্ছে। যুবােয়র (রা) বয়সে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি বললেন, “আমি যাবো”। উপস্থিত সাথিগণ চামড়ার একটি মশক ফুলিয়ে তাঁর বুকের নীচে বেঁধে দেন। ওই মশকে ভর করে সাতার দিয়ে তিনি নীলনদ পার হন। তিনি নদীর অপর তীরের যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে পৌছেন। শেষ পর্যন্ত রাজত্বের দাবীদার বিদ্রোহী লোকটি পরাস্ত ও নিহত হয়। নাজাশীর জয় হয়। যুবােয়র (রা) ফিরে আসেন। দূর থেকে চাদর নেড়ে তিনি আমাদেরকে বিজয়ের সুসংবাদ জানিয়ে বলেন, সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আল্লাহ তা’আলা নাজাশীকে জয়ী করেছেন। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, নাজাশীর বিজয়ে আমরা যা খুশী হয়েছিলাম অন্য কোন বিষয়ে তেমন খুশী হয়েছি বলে আমাদের জানা নেই। এরপর আমরা সেখানে বসবাস করতে থাকি। ইতোমধ্যে আমাদের কেউ কেউ মক্কায় ফিরে আসেন এবং কেউ কেউ ওখানে থেকে যান।

যুহরী বলেন, উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত এই বর্ণনা আমি উরওয়া ইবন যুবায়র (রা)-কে শুনাই। তখন উরওয়া বললেন, আল্লাহ যখন আমার রাজত্ব ফিরিয়ে দিলেন, তখন তিনি তো আমার নিকট থেকে ঘুষ নেননি যে, আমি তার ব্যাপারে ঘুষ নিব? এবং তখন

SS–

জনসাধারণ আমার আনুগত্য করেনি যে, আমি এ বিষয়ে তাদের আনুগত্য করব? নাজাশীর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা তুমি জানাে? আমি বললাম, জী না, তা তো জানি না। এ বিষয়ে আবু বকর ইবন আবদুর রহমান উন্মে সালামার বরাতে আমাকে কিছু বলেননি। উরওয়া বললেন, হযরত আইশা (রা) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, নাজাশীর পিতা নিজেও একজন রাজা ছিলেন। তার একটি ভাই ছিল। ভাইটির ছিল ১২ টি পুত্র। পক্ষান্তরে নাজাশীর পিতার তিনি ছিলেন একমাত্র পুত্র। আবিসিনিয়ার অধিবাসিগণ নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে পরামর্শ করে যে, আমরা যদি এখন ক্ষমতাসীন রাজাকে হত্যা করে তার ভাইকে সিংহাসনে বসাই, তাহলে আমাদের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ও সার্বভৌমত্ব দীর্ঘ দিন সুসংহত থাকবে। আর রাজার ভাইয়ের রয়েছে ১২জন পুত্ৰ। পিতার মৃত্যুর পর এই ১২জন পুত্র ধারাবাহিক ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষম হবে। ফলে দীর্ঘদিন যাবত বাধা-বিপত্তি ও মতভেদ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। এই পরিকল্পনায় তারা ক্ষমতাসীন রাজাকে হত্যা করে এবং তার ভাইকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে। নাজাশীও তার চাচার নিকট উপস্থিত হন এবং তার উপর প্রভাব বিস্তার করেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, তার পরামর্শ ছাড়া রাজা কোন কাজই করতে পাতেন না নাজাশী অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোক ছিলেন। রাজার নিকট নাজাশীর মর্যাদা দেখে লোকজন শংকিত হয়ে পড়ে। তারা বলাবলি করত, এই যুবক তো তার চাচার উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে। এক সময় সে যে রাজার পদ দখল করে বসবে না। সে ব্যাপারে আমরা তো নিশ্চিত নই। আমরা তার পিতাকে হত্যা করেছি তা সে জানে। সুতরাং একবার যদি সে রাষ্ট্ৰীয় ক্ষমতা দখল করতে পারে, তবে আমাদের সকল সন্ত্রান্ত লোককে সে খুন করে ফেলবে। তাকে মেরে ফেলার জন্যে কিংবা দেশ থেকে বহিষ্কার করার জন্যে তারা সলা-পরামর্শ করতে থাকে। তারপর তার চাচার নিকট গিয়ে বলে, আপনার উপর এই যুবকের প্রভাব আমরা লক্ষ্য করেছি। আপনি তো জানেন যে, আমরা তার পিতাকে হত্যা করে আপনাকে তার স্থানে বসিয়েছি। এখন যে পরিস্থিতি তাতে সে যে একদিন সিংহাসন দখল করবে না। সে ব্যাপারে আমরা নিরাপদ বোধ করছি না। ক্ষমতা আয়ত্ত করতে পারলে সে আমাদের সকলকে খুন করে ফেলবে। আপনি হয় তাকে হত্যা করুন, না হয় তাকে দেশান্তরিত করুন।

রাজা বললেন, “ধিক, গতকাল তোমরা তার পিতাকে হত্যা করেছ। আর আজকে আমি তাকে হত্যা করব? তবে আমি তাকে দেশ থেকে বের করে দিব। তারা নাজাশীকে নিয়ে বের হয় এবং একটি বাজারে নিয়ে ৬০০ কিংবা ৭০০ দিরহামে বিক্রি করে দেয়।” ব্যবসায়ী তাকে নীেকায় তুলে যাত্রা করে। সন্ধ্যা বেলা হেমন্তকালীন প্রচণ্ড ঝড়-তুফান শুরু হয় তার চাচা বৃষ্টিতে নেমেছিলেন। প্রচণ্ড বজাঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়। লোকজন ছুটে যায় তাঁর পুত্রদের নিকট। তারা লক্ষ্য করে যে, তাদের সকলেই অযোগ্য ও গণ্ডমূর্থ। তাদের কারো মধ্যেই কোন প্রকারের সদগুণ ছিল না। ফলে তাদের মধ্যে মারাত্মক মতানৈক্য দেখা দেয়। তারা পরস্পরে বলাবলি করে যে, তোমরা যাকে গতকাল বিক্রি করে দিয়েছিলে, সে ব্যতীত এমন কোন রাজা তোমরা খুঁজে পাবে না যে তোমাদের রাজ্যে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে পারবে। আবিসিনিয়ার অধিবাসীদের কল্যাণ যদি তোমাদের কাম্য হয়, তবে তাকে দূরে নিয়ে যাওয়ার পূর্বেই খুঁজে

নিয়ে এসো। নাজাশীর খোজে। ওরা বেরিয়ে পড়ে। অবশেষে তাকে খুঁজে পায় এবং ফিরিয়ে। নিয়ে আসে। রাজমুকুট পরিয়ে তারা তাকে সম্রাটের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে।

ক্রেতা ব্যবসায়ীটি বলল, আপনারা আমার নিকট থেকে যুবককে যখন ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন, তখন আমার মূল্যাটা ফেরত দিন। লোকজন বলল, না, তা দেয়া হবে না। সে বলল, তাহলে আল্লাহর কসম, আমি নিজে তার সাথে কথা বলব। ব্যবসায়ী নিজে নাজাশীর সাথে সাক্ষাত করে বলল, রাজনী! আমি একটি যুবক ক্রয় করেছিলাম। বিক্রেতাদেরকে আমি তার মূল্যও পরিশোধ করে দিয়েছি। পরে তারা এসে আমার নিকট থেকে যুবকটিকে কেড়ে নেয়। কিন্তু আমার মূল্য ফেরত দেয়নি। নাজাশী সর্বপ্রথম উত্থাপিত এই মামলায় নিজের দৃঢ়তা প্রদর্শন করে রায়ে বললেন, “তোমরা হয় ব্যবসায়ীর মূল্য ফেরত দিবে, নতুবা তোমাদের বিক্ৰীত যুবক তাকে ফিরিয়ে দেবে। ওই যুবককে নিয়ে যেখানে ইচ্ছা সে চলে যাবে। তারা বলল, আমরা বরং তার মূল্য ফিরিয়ে দেব। তারা মূল্য ফেরত দিয়ে দেয়। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটেই নাজাশী বলেছিলেন, “আমার রাজত্ব আমার নিকট ফিরিয়ে দেয়ার সময় মহান আল্লাহ তো আমার নিকট থেকে ঘুষ নেননি যে, তার ব্যাপারে। আমি ঘুষ নেব, আর আমার

ক্ষেত্রে লোকজন তো আমার আনুগত্য করেনি যে, আমি তাদের কথা মত চলবো!”

মূসা ইবন উকবা (রা) বলেন, নাজাশীর পিতা ছিলেন আবিসিনিয়ার রাজা। তাঁর পিতার যখন মৃত্যু হয়, তখন নাজাশী ছিলেন ছােট শিশু। মৃত্যুকালে নিজ ভাইকে তিনি ওসীয়্যত করেছিলেন : “আমার পুত্ৰ সাবালক না হওয়া পর্যন্ত রাজত্ব তোমার হাতে থাকবে। সাবালকত্ব প্ৰাপ্তির পর সে-ই রাজা হবে।” পরবতীতে তাঁর ভাই নিজে রাজত্বের জন্য লালায়িত হয়ে পড়ে এবং জনৈক ব্যবসায়ীর নিকট নাজাশীকে বিক্রি করে দেয়। ওই রাতেই নাজাশীর চাচার মৃত্যু হয়। আবিসিনিয়ার জনগণ তখন নাজাশীকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে তার মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দেয়। মূসা ইবন উকবা এভাবে সংক্ষিপ্তাকারে এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন। ইবন ইসহাকের বর্ণনাটি অধিকতর বিস্তারিত এবং সুবিন্যস্ত। আল্লাহই ভাল জানেন।

ইবন ইসহাকের বর্ণনায় আছে যে, কুরায়শ প্রতিনিধি হিসেবে নাজাশীর নিকট আমর ইবন “আস এবং আবদুল্লাহ ইবন আবু রাবী আকে প্রেরণ করা হয়েছিল। পক্ষান্তরে মূসা ইবন উকবা,। উমাবী এবং অন্যান্যদের বর্ণনায় এসেছে যে, তারা আমর ইবন আস এবং আম্মারা ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরাকে প্রেরণ করেছিল। কা’বা শরীফের সম্মুখে নামায আদায়ের সময় যেদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিঠে উটের নাড়িতুড়ি তুলে দেয়া হয়েছিল, সেদিনের ঘটনায় উপস্থিত কাফিরদের হাসাহাসির প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যে সাতজনের বিরুদ্ধে বদ দু’আ করেছিলেন আম্মারা ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরা ছিল তাদের একজন। ইতোপূর্বে আবু মূসা আশআরী ও ইবন মাসউদ (রা)-এর হাদীছে। এ ঘটনা আলোচিত হয়েছে। বস্তুত আমর ইবন আস এবং আম্মারা ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরা দু’জনে যখন মক্কা থেকে বের হয়, তখন আমর ইবন “আসের সাথে তার স্ত্রী ছিল। আম্মারা ছিল সুদৰ্শন যুবক। তারা দু’জনে একসাথে নীেকায় উঠে। আম্মারার লোলুপ দৃষ্টি পড়ে আমরের স্ত্রীর উপর। সে আমর ইবন আসকে সমুদ্রে ফেলে দেয় যাতে সে সাগরে ডুবে মরে যায়। কিন্তু আমরা সাঁতরিয়ে জীবন রক্ষা করে এবং নৌকায় উঠে

পড়ে। আম্মারা বলল, আপনি সাঁতারে পারদশী এটা জানলে আমি আপনাকে সাগরে ফেলতাম না। আম্মারার প্রতি প্ৰচণ্ড বিক্ষুদ্ধ হয় আমরা। হিজরতকারী মুসলমানদের প্রত্যার্পণের ব্যাপারে নাজাশীর নিকট তারা যখন ব্যর্থ হয়, তখন আম্মারা জনৈক আবিসিনীয় লোকের নিকট যায়। এদিকে আমরা দেখা করে নাজাশীর সাথে এবং আম্মারার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে তার কান ভারী করে তোলে। এরপর নাজাশীর নির্দেশে আম্মারাকে জাদু করা হয়। ফলে সে উন্মাদ হয়ে যায়। সে বন্য প্রাণীদের সাথে বনে-জঙ্গলে ঘুরাফেরা করতে থাকে {

এ বিষয়ে উমা৷ভী একটি দীর্ঘ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তাতে এ কথাও আছে যে, হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা)-এর শাসনামল পর্যন্ত আম্মারা জীবিত ছিল। জনৈক সাহাবী বন্য জন্তুর সাথে বিচরণকারী আম্মারাকে ফাঁদ পেতে ধরে ফেলেছিলেন। সে তখন বলছিল, “আমাকে ছেড়ে দাও না হয় আমি মারা যাব।” তাকে ছেড়ে না দেয়ায় তার মৃত্যু হয়। আল্লাহই ভাল

জানেন। ジ

কেউ কেউ বলেছেন যে, হিজরতকারী মুসলমানদেরকে ফেরত পাঠানোর জন্যে কুরায়শ নাজাশীর নিকট দু’দফা প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল। একবার পাঠিয়েছিল। আমর ইবন ‘আসা এবং আম্মারা ইবন ওয়ালীদকে। দ্বিতীয়বার পাঠিয়েছিল। আমর ইবন ‘আসা এবং আবদুল্লাহ ইবন আবু রাবী আকে। আবু নুআয়ম তাঁর “দালাইল” গ্রন্থে স্পষ্টভাবে তা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহই ভাল জানেন।

কেউ কেউ বলেছেন, দ্বিতীয় দফায় প্রতিনিধি প্রেরণের ঘটনা ঘটেছিল বদর যুদ্ধের পর। এটি যুহরীর উক্তি। বদরের যুদ্ধে নিহত কাফিরদের প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে মুসলমানদেরকে ফিরিয়ে দেয়ার প্রস্তাব সহকারে তারা দ্বিতীয় দফায় প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল। কিন্তু নাজাশী তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। আল্লাহ্ তাআলা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাকে সন্তুষ্ট করুন।

ইবন ইসহাক সূত্রে যিয়াদ উল্লেখ করেছেন যে, মুসলমানদেরকে ফেরত আনার জন্যে

চরণ লিখে পাঠান। নাজাশীর নিকট আশ্রয় গ্রহণকারী মুসলমানদের প্রতি ইনসাফ প্রদর্শন ও সদয় আচরণ করার জন্যে তিনি নাজাশীকে উৎসাহিত করেন। কবিতার চরণগুলো এই :

آلالیت شغری کیف فی النای جغفر–و عمرو و أعداء العد و الاقارب আহ! আমি যদি জানতে পারতাম। ওই দূর দেশে কেমন আছে জাফর ও আমার এবং কেমন আছে আমার নিকটাত্মীয় শক্রির শক্ররা।

وما نالت أفعال النجاشى جغفرا– وأصحابة أو عاق ذلك شاغب নাজাশীর সদাচরণ ও সহানুভূতি কি জাফর ও তার সাথীদের ভাগ্যে জুটেছে? নাকি কোন বিরোধী পক্ষের ষড়যন্ত্র তাদেরকে ওই সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত করেছে।

ونعلم أبيت اللَّغن أنك ماحد – كريم فلا يشفى اليك ألمجانب –

আমি জানি “আপনার জয় হোক।” আপনি একজন সম্মানিত ও মর্যাদাবান ব্যক্তি। দূর-দূরান্ত থেকে আগত পথিক আপনার নিকট দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হয় না।

ونملمُ بأن اللّه زادك بسنطة – وأسباب خير كُلّها بك لأزبআমি এও জানি যে, মহান আল্লাহ। আপনাকে শক্তি ও প্রাচুর্য দান ও অনুগ্রহ দানে ধন্য করেছেন এবং সকল প্রকার কল্যাণ অর্জনের উপায়-উপকরণ আপনার নিকট মওজুদ রয়েছে।

ইবন ইসহাক থেকে ইউনুস বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াযীদ ইবন রূমান উরওয়া ইবন যুবায়র থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, নাজাশী কথাবার্তা বলেছিলেন। হযরত উছমান ইবন আফফান (রা)-এর সাথে। তবে প্রসিদ্ধ বর্ণনা হল, তিনি কথা বলেছিলেন। হযরত জাফর (রা)-এর সাথে।

ইবন ইসহাক থেকে যিয়াদ বুকাঈ বলেছেন, ইয়াখীদ ইবন রূমান উরওয়া সূত্রে হযরত আইশা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, নাজাশীর মৃত্যুর পর সর্বত্র আলোচিত হত যে, তাঁর কবরের উপর সর্বদা জ্যোতি ও আলো দেখা যেত। ইমাম আবু দাউদ……….. মুহাম্মদ ইবন ইসহাক সূত্রে ওই সনদে উদ্ধৃত করেছেন যে, যখন নাজাশীর মৃত্যু হয়, তখন আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতাম যে, তার কবরের উপর সর্বদা আলো ও জ্যোতি দৃশ্যমান হচ্ছে।

যিয়াদ বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মদ ইবন ইসহাক থেকে তিনি বলেছেন যে, জাফর ইবন মুহাম্মদ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একদিন আবিসিনিয়ার অধিবাসীরা একত্রিত হয়। তারা নাজাশীকে বলে, আপনি আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছেন। একথা বলে তারা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। রাজা হযরত জাফর ও তার সাখীদের নিকট সংবাদ পাঠান এবং একটি নীেকা প্ৰস্তুত করে দিয়ে তাদেরকে বলেন যে, আপনারা ভালোয় ভালোয় এ নীেকাতে উঠুন। আমার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমি পরাজিত হলে আপনারা যেখানে ইচ্ছা চলে যাবেন। আর আমি বিজয়ী হলে আমার রাজ্যেই থাকবেন। এরপর তিনি এক টুকরা কাগজ নিলেন। তাতে লিখলেন, “তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা’বুদ নেই, মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দা, তার রাসূল তার রূহ এবং তার কালেমা, যেটিকে তিনি মারিয়ামের প্রতি নিক্ষেপ করেছেন।” লিখিত কাগজটি তিনি তাঁর জুবিবার ডান কাধের মধ্যে লুকিয়ে রাখলেন। এরপর তিনি আবিসিনীয়দের নিকট গেলেন। তারা তখন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়েছিল। তিনি বললেন, আবিসিনিয়বাসিগণ! তোমাদের সম্মান পাওয়ার জন্যে আমি কি সর্বাধিক যোগ্য পাত্র নই? তারা বলল, “হ্যা, অবশ্যই। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে আমার আচার-আচরণ কেমন? তারা বলল, সুন্দর ও সবেত্তিম চরিত্র। তিনি বললেন, এখন তোমাদের মধ্যে আমার অবস্থান কেমন? তারা বলল, আপনি আমাদের ধর্মত্যাগ করেছেন এবং আপনি মনে করেন যে, ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি বললেন, ঈসা সম্বন্ধে তোমরা কি বল? তারা বলল, আমরা বলি যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। নাজাশী তাঁর জুব্বার উপর দিয়ে বুকে হাত রেখে এই সাক্ষ্য দিয়ে বললেন, ঈসা ইবন মারিয়াম এর চেয়ে মোটেই অতিরিক্ত কিছু নন। অর্থাৎ তিনি যা

লিখেছেন তার অতিরিক্ত কিছু নন। এতে তারা তার প্রতি সন্তুষ্ট হয় এবং স্বগৃহে ফিরে যায়। এ ংবাদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট পৌছে। নাজাশী যখন ইনতিকাল করেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তার জানাযার নামায আদায় করেন এবং তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, যেদিন নাজাশীর মৃত্যু হয়, সেদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রচার করেন এবং সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে জানাযার নামাযের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে আসেন। এরপর সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে চার তাকবীরের সাথে জানাযার নামায আদায় করেন।

ইমাম বুখারী (র) বলেন, “নাজাশীর ইনতিকাল বিষয়ক অধ্যায়” আবু রাবী…… হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাজাশী যখন ইনতিকাল করেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আজ একজন নেককার লোক ইনতিকাল করেছেন। তোমরা সকলে প্ৰস্তুত হও, তোমাদের ভাই আসহামাহ-এর জন্যে জানাযার নামায পড়। আনাস ইবন মালিক, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ ও অন্যান্য অনেক সাহাবী থেকে এটি বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, তার নাম মুসহিমা। তিনি মূলত আসহামাহ ইবন আবহুর। তিনি একজন নেককার, বুদ্ধিমান, মেধাবী, ন্যায়পরায়ণ ও বিজ্ঞ লোক ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাকে সন্তুষ্ট করুন।

ইবন ইসহাক সূত্রে ইউনুস বলেন, নাজাশীর মূল নাম মাসহামা। বায়হাকী এটির বিশুদ্ধ রূপ আসা হাম বলে মন্তব্য করেছেন। আসহাম শব্দের অর্থ দান-দক্ষিণা। তিনি এও বলেছেন যে, নাজাশী হল আবিসিনিয়া রাজ্যের উপাধি। যেমন বলা হয় কিসরা, হিরাকল প্রভৃতি।

আমি বলি হিরাকল দ্বারা সম্ভবত রোম সম্রাট কায়সারের কথা বুঝানো হয়েছে। কারণ, রোমান নগরসমূহের দ্বীপগুলোসহ সিরিয়ার রাজাকে বলা হয় কায়সার। পারস্য সম্রাটের উপাধি কিসরা। সমগ্র মিসরের সম্রাটের উপাধি ফিরআওন। আলেকজান্দ্ৰিয়ার রাজার উপাধি মুকাওকিস। ইয়ামান ও শাহারর রাজার উপাধি তুবাবা’। আবিসিনিয়ার রাজার উপাধি নাজাশী। গ্ৰীস এবং কারো কারো মতে ভারতবর্ষের সম্রাটের উপাধি বাতলীমূস এবং তুর্কদের সম্রাটের উপািধ খাকান।

কোন কোন আলিম বলেছেন, যেহেতু নাজাশী তার ঈমান গ্রহণের বিষয়টি গোপন রাখতেন এবং যেদিন তাঁর ইনতিকাল হয়, সেদিন সেখানে তাঁর জানাযার নামায পড়ার কেউ ছিল না, সেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় তাঁর জানাযার নামায আদায় করেন। এ প্রেক্ষিতেই ফকীহগণ বলেছেন যে, কোন ব্যক্তি যে দেশে মৃত্যুবরণ করে, সে দেশে যদি তার জানাযা পড়া হয়, তবে যে দেশে সে অনুপস্থিত, সে দেশে তার জানাযা পড়া বৈধ নয়। এজন্যে মদীনা মুনাওয়ারা ব্যতীত অন্য কোন স্থানে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জানাযার নামায হয়নি। মক্কাতেও নয়, অন্য কোন স্থানেও নয়। হযরত আবু বকর (রা), উমর (রা), উছমান (রা)-সহ অন্যান্য সাহাবীর ক্ষেত্রেও এমন কোন বিবরণ পাওয়া যায় না যে, তারা যেখানে ইনতিকাল করেছেন এবং যেখানে তাদের জানাযা হয়েছে, সেখানে ব্যতীত অন্য কোন শহরে তাদের জানাযা হয়েছে।

আমি বলি, নাজাশী (রা)-এর জানাযায় আবু হুরায়ারা (রা)-এর উপস্থিতি একথা প্রমাণ করে যে, খায়বার বিজয়ের পর তার ইনতিকাল হয়েছে। খায়বার বিজয়ের দিনে জাফর ইবন আবু তালিব (রা) অবশিষ্ট মুহাজিরদেরকে নিয়ে আবিসিনিয়া থেকে মদীনায় ফিরে এসেছিলেন। এ প্রেক্ষিতেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছিলেন, আল্লাহর কসম, আমি বুঝে উঠতে পারছি না, আমি জাফরের আগমনে বেশী আনন্দিত, না খায়বার বিজয়ের জন্যে বেশী আনন্দিত। তারা ফিরে আসার সময় নাজাশীর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্যে প্রচুর উপঢৌকন নিয়ে এসেছিলেন। আবু মূসা আশআরী (রা)-এর সাথিগণ এবং আশআরী সম্প্রদায়ের নৌকাযাত্রী লোকজন জাফর ইবন আবু তালিবের সহযাত্রী হয়েছিলেন।

নাজাশীর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমত করার জন্যে উপহার সামগ্ৰী ও জাফর ইবন আবু তালিবের সাথে নাজাশী তাঁর এক ভ্রাতুষ্পপুত্ৰকে প্রেরণ করেছিলেন, ওই ভ্রাতুষ্পপুত্রের নাম ছিল। যু-নাখতারা কিংবা যু-মাখমারা। সুহায়লী বলেন, নবম হিজরীর রজব মাসে নাজাশীর ইনতিকাল হয়। এ মন্তব্যের যথার্থতা পর্যালোচনা সাপেক্ষ। আল্লাহই ভাল জানেন।

বায়হাকী বলেন, ফকীহ আবু ইসহাক……. আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাজাশীর পাঠানো প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপস্থিত হওয়ার পর তিনি নিজে তাদের খিদমত করতে লাগলেন। সাহাবায়ে কিরাম আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ওদের খিদমতের জন্যে আমরাই তো যথেষ্ট। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, ওরা আমার সাহাবীদের প্রতি সম্মানজনক আচারণ করেছে, তার বিনিময়ে আমি নিজ হাতে ওদের প্রতিদান দিতে চাই।

এরপর বায়হাকী (র) বলেন, আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবন ইস্পাহানী ……. আর কাতাদা (র) সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নাজাশীর প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়। তখন তিনি নিজে ওদের সেবা করতে শুরু করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রা) আর্য করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার পক্ষ থেকে আমরাই তো ওদের সেবা করার জন্যে যথেষ্ট। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ওরা আমার সাহাবীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করেছে, আমি নিজ হাতে ওদেরকে কিছু প্রতিদান দেয়া পসন্দ করি। আওযাঈ থেকে তালহা ইবন যায়দ একা এ হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

বায়হাকী (র) আরো বলেন, আবুল হুসাইন…… ইবন বিশারান আমরা সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমর ইবন আস আবিসিনিয়া থেকে ফিরে এসে তার বাড়িতে অবস্থান করছিল। বাইরে বের হচ্ছিল না। লোকজন বলল, ওর কি হল, বাড়ী থেকে বের হয় না কেন? তখন আমর বলল, নাজাশী আসহামা বিশ্বাস করে যে, তোমাদের প্রতিপক্ষ মুহাম্মাদ (সা) একজন अङा नदेत्री।

ইবন ইসহাক বলেন, আমর ইবন আস এবং আবদুল্লাহ ইবন আবু রাবীআ সাহাবীগণকে ফেরত আনতে ব্যর্থ হয়ে নাজাশীর পক্ষ থেকে অনাকাজ্যিক্ষত উত্তর নিয়ে কুরায়শদের নিকট ফিরে আসে। এদিকে উমর ইবন খাত্তাব (রা) ইসলাম গ্ৰহণ করে ফেলেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও আত্মমর্যাদাশীল লোক। তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস কারো ছিল না। তার এবং হামযার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণ নিরাপত্তা লাভ করেছিলেন। এসকল

পরিস্থিতি কুরায়শদেরকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত আমরা কা’বা শরীফের নিকট নামায আদায় করতে পারতাম না। হযরত উমর (রা) যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন তিনি কুরায়শদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন এবং নিজে কা’বা শরীফে নামায আদায় করলেন। আমরাও তার সাথে সেখানে নামায আদায় করলাম।

আমি বলি, সহীহ বুখারীতে ইবন মাসউদ (রা)-এর একটি হাদীছ আছে। তিনি বলেছেন, “হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আমরা শক্তিশালী হতে লাগলাম যিয়াদ বুকাঈ বলেন, ইবন মাসউদ (রা) বলেছেন, হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্ৰহণ করাই ছিল একটি বিজয়। তার হিজরত ছিল বিরাট সাহায্য এবং তার শাসন ছিল একটি রহমত। হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমরা কা’বা শরীফের নিকট নামায আদায় করতে পারতাম না; তার ইসলাম গ্রহণ করার পর কুরায়শদের প্রতি তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন এবং কা’বা গৃহের নিকট নামায আদায় করলেন। আমরাও তাঁর সাথে নামায আদায় করলাম।

ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবীগণের আবিসিনিয়ার হিজরতের পর হযরত উমর (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। ইবন ইসহাক… উম্মে আবদুল্লাহ বিনত আবু হাছাম৷ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম, আমরা আবিসিনিয়ার দিকে যাচ্ছিলাম। জরুরী প্রয়োজনে আমির (রা) বাইরে গিয়েছিলেন। হঠাৎ উমর এসে উপস্থিত হলেন। তিনি আমার নিকট এসে দাঁড়ালেন। তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। তাঁর বহু জুলুম-নির্যাতনের শিকার আমরা হয়েছিলাম। উমর (রা) বললেন, হে উম্মে আবদুল্লাহ তোমরা কি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে? আমি বললাম হ্যা আপনারা যখন আমাদেরকে নানা ভাবে কষ্ট দিচ্ছেন, নির্যাতন করছেন, তখন আমরা আল্লাহর দুনিয়ার অন্য কোন দেশে চলে যাব। যেখানে মহান আল্লাহ আমাদের নিস্কৃতির ব্যবস্থা করবেন। তখন উমর বললেন, তাই হোক, আল্লাহ তোমাদের সহায় হোন। সে মুহূর্তে আমি উমরের মধ্যে এমন নম্রতা ও উদারতা লক্ষ্য করলাম, যা ইতোপূর্বে কখনো তার মধ্যে দেখা যায়নি। এরপর তিনি নিজ গন্তব্যে চলে গেলেন। আমার যা মনে হল আমাদের দেশত্যাগে তিনি ব্যথিত হয়েছিলেন। ইতোমধ্যে প্রয়োজন সমাধা করে আমির ফিরে এলেন। আমি বললাম, হে আবু আবদুল্লাহ! একটু আগে আপনি যদি উমরের নম্রতা ও উদারতা এবং আমাদের ব্যাপারে দুঃখিত হওয়ার পরিস্থিতিটা দেখতে পেতেন! আমির বললেন, উমর ইসলাম কবুল করুন তুমি কি তা” কামনা করা? আমি বললাম, হ্যা, তা বটে। তিনি বললেন, খাত্তাবের গাধা যতক্ষণ ইসলাম গ্ৰহণ না করবে, ততক্ষণ তোমার এ দেখা সত্ত্বেও তাতে উমরের ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনা নেই। উম্মে আবদুল্লাহ বলেন, ইসলামের প্রতি উমরের অনমনীয়তা, রুক্ষতা ও কঠোরতার প্রেক্ষিতে তিনি এ মন্তব্য করেছিলেন।

আমি বলি, যারা মনে করেন যে, হযরত উমর (রা:) :০তম ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি এ বর্ণনা তাদের মন্তব্যকে রদ করে দেয়। কারণ, আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলমানদের সংখ্যা ৮০-এর উপরে ছিল। তবে উপরোক্ত মন্তব্য সঠিক বলে ধরে নেয়া যাবে তখন, যখন বলা হবে যে, হিজরতকারীদের হিজরতের পর যারা মক্কায় অবশিষ্ট ছিলেন তাদের সংখ্যা অনুসারে হযরত

উমর (রা:) :০তম ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি। অবশ্য, হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্ৰহণ বিষয়ক যে ঘটনা ইবন ইসহাক বৰ্ণনা করেছেন, তাতে উপরোক্ত ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়। ইবন ইসহাক বলেছেন, হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত যে ঘটনা আমার নিকট এসেছে তা” এরূপ : r

তার বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব ছিলেন সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়াল এর স্ত্রী। তারা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ইতোপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি উমর থেকে গোপন রেখেছিলেন। বনু আদীি গোত্রের নুআয়ম ইবন আবদুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি ইসলাম গ্ৰহণ করেছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি তিনিও নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট থেকে গোপন রেখেছিলেন। খাবাব ইবন আরত (রা) বিভিন্ন সময়ে উমরের বোন ফাতিমার বাড়িতে এসে তাকে কুরআন শিক্ষা দিতেন।

একদিন উমর নাঙ্গা তরবারি হাতে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সাথীদেরকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাকে জানানো হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সাহাবীগণ সাফা পাহাড়ের নিকটে একটি বাড়িতে অবস্থান করছেন। নারী-পুরুষ মিলে তাদের সংখ্যা ছিল চল্লিশ-এর কাছাকাছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট তখন তার চাচা হামযা (রা), আবু বকর ইবন আবু কুহাফা (রা) এবং আলী ইবন আবু তালিব (রা) সহ মক্কায় অবস্থানকারী মুসলমানগণ ছিলেন।

পথে উমরের সাথে দেখা হয় নুআয়ম ইবন আবদৃল্লাহ (রা)-এর। নুআয়ম বললেন, উমর! কোথায় যােচ্ছ? উমর বলল, “যাচ্ছি। তো ধর্মত্যাগী মুহাম্মদ (সা)-এর উদ্দেশ্যে। সে কুরায়শ জাতির ঐক্য বিনষ্ট করেছে। জ্ঞানী-গুণীদেরকে মুখ ঠাওরিয়েছে। কুরায়শদের ধর্মের নিন্দা ও দোষারোপ করেছে এবং আমার দেবতাদেরকে গালমন্দ করেছে। আমি তাকে খুন করব।” নুআয়ম (রা) বললেন, উমর! তোমাদের আত্মগরিমা তোমাকে প্রতারিত করেছে। তুমি যদি মুহাম্মদ (সা)-কে খুন কর, তবে তুমি কি মনে করেছ যে, আবদ মানাফ গোত্র তোমাকে দুনিয়াতে বিচরণ করার জন্যে ছেড়ে দেবে? আগে নিজ পরিবারের দিকে ফিরে গিয়ে তাদেরকে ঠিক কর। উমর বললেন, আমার পরিবারের কার কথা বলছ? নুআয়ম বললেন, তোমার চাচাত ভাই ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবন যায়ীদ এবং তোমার সহোদরা ফাতিমার কথা বলছি। আল্লাহর কসম, তারা দু’জনে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং মুহাম্মদ (সা)-এর দীন কবুল করেছেন। তুমি আগে ওদেরকে ঠিক কর। উমর তখন ছুটে গেলেন তার বোন ফাতিমার বাড়ী অভিমুখে। খাকবাব ইবন আরত তখন ফাতিমা (রা)-এর বাড়ীতে ছিলেন। সূরা ত্বা-হা লিখিত একটি কপি থেকে তিনি ফাতিমাকে কুরআন পাঠ শিক্ষা দিচ্ছিলেন। উমরের আগমন আঁচ করতে পেরে খাকবাব (রা) একটি ক্ষুদ্র কক্ষে অথবা গৃহকোণে লুকিয়ে গেলেন। ফাতিমা (রা) কুরআনের কপিট তার উরুর নীচে লুকিয়ে রাখলেন। গৃহের দরজার পাশে এসেই উমর ফাতিমাকে খাববাবের কুরআন শেখানোর শব্দ শুনেছিলেন। ঘরে প্রবেশ করে ফাতিমাকে বললেন, একটু আগে আমি কিসের শব্দ শুনছিলাম? ফাতিমাও তাঁর স্বামী বললেন, কই না-তো, আপনি কিছুই শুনেননি। উমর হুংকার ছেড়ে বললেন, আমি অবশ্যই শুনেছি। আর আল্লাহর কসম, আমি

RO–

জানতে পেরেছি যে, তোমরা দু’জনে মুহাম্মদ-এর দীন কবুল করেছ। এ বলে তিনি তাঁর ভগ্নিপতি সাঈদ ইবন যায়দের উপর আক্রমণ করলেন এবং তাঁকে বেধড়ক পেটাতে লাগলেন। ফাতিমা তার স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন। উমর তাকেও প্ৰহারে প্রহারে রক্তাক্ত করে তুললেন। শেষ পর্যন্ত ফাতিমা (রা) ও তাঁর স্বামী বললেন, “হ্যা, আমরা ইসলাম গ্ৰহণ করেছি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। এখন আপনার যা ইচ্ছা করতে পারেন।”

বােনের রক্তাক্ত শরীর দেখে উমর নিজের কৃতকর্মের জন্যে পাঠজ্জিত হলেন এবং প্রহার বন্ধ করে দিলেন। বােন ফাতিমাকে বললেন, ইতোপূর্বে তোমরা যা করছিলে সেটি আমাকে দাও। মুহাম্মাদ কি নিয়ে এসেছেন তা আমি একটু দেখি। উমর লেখাপড়া জানা লোক ছিলেন। ফাতিমা (রা) বললেন, আপনি সেটির অমর্যাদা করবেন বলে আমার আশংকা হচ্ছে। তিনি বললেন, না, ভয় করো না। পাঠ শেষে ওই কপি ফাতিমাকে ফিরিয়ে দিবেন বলে তিনি আপন উপাস্যের শপথ করলেন। একথা শুনে হযরত উমর ইসলাম গ্ৰহণ করবেন এমন আশার সঞ্চার হয় ফাতিমার মনে। ফাতিমা (রা) বললেন, ভাইয়া! শিরক অনুসরণ করার কারণে আপনি অপবিত্র হয়ে আছেন। পবিত্রতা অর্জন ব্যতীত কেউ এটি স্পর্শ করতে পারে–না। উমর উঠে দাঁড়ালেন এবং গোসল সেরে এলেন। ফাতিমা (রা) লিপিকাটি তাকে দিলেন। তাতে সূরা ত্বা-হা লিখিত ছিল। উমর তা পাঠ করতে লাগলেন। শুরু থেকে কিছু পাঠ করার পর তিনি বলে উঠলেন, কী চমৎকার! এটি কত সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ বাণী। উমরের কথা শুনে খাকবাব ইবন আরত গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে এলেন এবং বললেন, হে উমর। আল্লাহর কসম, আমি নিশ্চিত আশা রাখি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দু’আর প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ। আপনাকে বিশেষভাবে কবুল করেছেন। কারণ আমি গতকাল রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলছিলেন। “كالة إعالة عن اللّم أيد ألإسلام بأبى الحكم بن هشام أو بعمر بن الخطاب হিকাম ইবন হিশাম অথবা উমর ইবন খাত্তাবের দ্বারা আপনি ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন। সুতরাং হে উমর! আপনি আল্লাহকে ভয় করুন, তাঁর পথ অবলম্বন করুন।

উমর বললেন, হে খাকবাব! আমাকে বল, মুহাম্মদ (সা) কোথায় আছেন? আমি যাতে তার নিকট গিয়ে ইসলাম গ্ৰহণ করতে পারি। খাবাব (রা) বললেন, কতক সাহাবীসহ মুহাম্মদ (সা) সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একটি বাড়ীতে অবস্থান করছেন। উমর তার তরবারি হাতে নিলেন। সেটি কোষমুক্ত করে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবীদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ছুটে চললেন। গন্তব্যে পৌছে তিনি দরজায় করাঘাত করলেন। শব্দ শুনে একজন সাহাবী দরজার ফাক দিয়ে বাইরে তাকালেন। খোলা তরবারি হাতে উমরকে দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট ফিরে যান এবং বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! খোলা তরবারি হাতে উমর দ্বার প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। হযরত হামযা (রা) বললেন, ওকে আসতে দাও, সে যদি ভাল চায়। তবে আমরা তাকে সে সুযোগ দিব। আর সে যদি কোন মন্দ উদ্দেশ্যে এসে থাকে। তবে তার নিজ তরবারি দিয়েই আমরা তাকে হত্যা করব।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, ওকে ভেতরে আসার অনুমতি দাও। অনুমতি দেয়া হল। কক্ষে প্রবেশ করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর প্রতি এগিয়ে গেলেন। উমরের কোমর অথবা চাদরের

গিট ধরে তিনি সজোরে এক ঝাকুনি দিলেন। তারপর বললেন, “খাত্তাব তনয়। কি উদ্দেশ্যে এসেছ? আল্লাহর কসম, তুমি এ মন্দ পথে থেকে যাও আর শেষ পর্যন্ত তোমার উপর আল্লাহর গযব নাযিল হোক তা আমি চাই না।” এবার উমর বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এসেছি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করার জন্যে এবং তাঁর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি। বর্ণনাকারী বলেন, একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সজোরে তাকবীর বলে উঠলেন। তাতে ঐ ঘরে অবস্থানকারী সকলে বুঝে নিলেন যে, হযরত উমর (রা:) ইসলাম গ্ৰহণ করেছেন। তখন থেকে সাহাবায়ে কিরাম (রা) ছেড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েন এবং হযরত হামযা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পর হযরত উমর (রা) বাড়ি ইসলাম গ্ৰহণ করায় মুসলমানদের মনােবল বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। তাঁরা আশ্বস্ত হন যে, এঁরা দু’জনে এখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করবেন এবং এদের সাহায্যে মুসলমানগণ শক্ৰদের অত্যাচারের মুকাবিলা

করবেন।

ইবন ইসহাক বলেন, মদীনায় অবস্থানকারী বর্ণনাকারিগণ হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে এরূপ বর্ণনা করেছেন। ইবন ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আবু নাজীহ মক্কী তার সমসাময়িক আতা’, মুজাহিদ এবং অন্যান্য বর্ণনাকারী থেকে হযরত উমরের ইসলাম গ্ৰহণ সম্পর্কে তাঁর নিজের বর্ণনা এভাবে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি বলতেন, আমি ইসলাম থেকে বহুদূরে অবস্থান করছিলাম। জাহিলী যুগে আমি মন্দ পানে আসক্ত ছিলাম। মদ ছিল আমার প্রিয় বস্তু। আমি রীতিমত মদপান করতাম। হাযুরা নামক স্থানে আমাদের এক মদপানের আসর বসত। কুরায়শের অভিজাত লোকজন সেখানে সমবেত হত। এক রাতে আমি সাথীদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে সেখানে যাই। কিন্তু ওদের কাউকেই সেখানে পেলাম না। আমি মনে মনে বললাম, তাহলে অমুক মদ্যপের নিকট যাই আশা করি তার নিকট মন্দ পোব এবং সেখানে মদ পান করব। আমি তার বাড়ি পৌছি কিন্তু তাকেও পেলাম না। এবার মনে মনে বললাম, এখন যদি কা’বা গৃহে গিয়ে সাতবার কিংবা সত্তরবার তাওয়াফ করি, তবে তাওতো ভাল হয়।

হযরত উমর (রা) বলেন, এরপর আমি মাসজিদুল হারামে আসি। হঠাৎ দেখতে পাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছেন। তিনি তখন সিরিয়ার দিকে মুখ করে নামায আদায় করতেন। তার এবং সিরিয়ার মধ্যখানে থাকত কা’বাগৃহ। রুকন-ই-আসওয়াদ এবং রুকন-ই-ইয়ামানীর মধ্যবর্তী স্থান ছিল তাঁর নামাযের স্থান। উমর (রা) বলেন, তাকে দেখে আমি মনে মনে বললাম, আজ রাতে আমি যদি মুহাম্মদের কথাবার্তা শুনি, তাহলে আমি বুঝতে পারব যে, তিনি কী বলেন? আমি মনে মনে বললাম, তার কাছে গিয়ে আমি যদি শুনি, আহলে তিনি আমাকে দেখে ফেলবেন এবং তাতে তাঁর একাগ্রতা বিঘ্নিত হবে। তাই আমি হাজারে আসওয়াদের দিকে আসি এবং কা’বার গিলাফের মধ্যে ঢুকে পড়ি। তারপর ধীরে ধীরে অতি সন্তৰ্পণে অগ্রসর হই। গিলাফের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে আমি ঠিক তাঁর সম্মুখে গিয়ে তাঁর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে যাই। তার মাঝে আর আমার মাঝে ব্যবধান শুধু কা’বার গিলাফ টুকু ৷ তার কুরআন পাঠ শুনে আমার মন বিচলিত হয়। আমার কান্না এসে পড়ে এবং ইসলাম আমার অন্তরে স্থান করে নেয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নামায শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি ওখানে দাঁড়িয়ে

থাকি। নামায শেষ করে তিনি চলে যান। তিনি ফিরে গিয়ে ইবন আবু হুসাইনের গৃহে উঠতেন। ইবন আবুল হুসাইনের গৃহ ছিল আদ-দারুর রাকতায়। সেটি পরবতীতে মুআবিয়ার মালিকানাধীনে আসে।

উমর (রা) বলেন, আমি তাঁর পেছন পেছন যাত্ৰা করি। হযরত আব্বাসের বাড়ী এবং ইবন আযহারের বাড়ীর মধ্যবতীর্ঘস্থানে আমি তার নাগাল পাই। আমার পদধ্বনি শুনে তিনি আমাকে চিনে ফেললেন। তিনি মনে করেছিলেন তাকে কষ্ট দেয়ার ও তার ক্ষতি করার উদ্দেশ্যেই বুঝি আমি তার নিকট উপস্থিত হয়েছি। তাই তিনি আমাকে সজোরে ধমক দিলেন। তারপর বললেন, “ইবনুল খাত্তাব! এ সময়ে তুমি এখানে কেন? আমি বললাম,” আমি এসেছি আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করার জন্যে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যা এসেছে তা সত্য বলে মেনে নেয়ার জন্যে।” আমার উত্তর শুনে তিনি আল্লাহর প্রশংসা

করলেন এবং বললেন :

“হে উমর! মহান আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত দান করেছেন।” তারপর তিনি আমার বুকে হাত বুলিয়ে দিলেন এবং ঈমানে আমার দৃঢ়তার জন্যে দু’আ করলেন। এরপর আমি চলে গেলাম। তিনি ঘরে ঢুকে পড়লেন। ইবন ইসহাক বলেন উমরের ইসলাম গ্ৰহণ উক্ত ঘটনা দু’টির কোনটির প্রেক্ষিতে হয়েছিল তা আল্লাহ তা’আলাই জানেন।

আমি বলি, উমর (রা)-এর জীবনী গ্রন্থের প্রথম ভাগে আমি তাঁর ইসলাম প্রহণের ঘটনা এবং এ সম্পর্কিত যত বৰ্ণনা ও মন্তব্য রয়েছে তার সবগুলো বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করেছি। সকল প্ৰশংসা আল্লাহর।

ইবন ইসহাক বলেন, নাফি’ ইবন উমর (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে, হযরত উমর (রা) যখন ইসলামগ্রহণ করলেন, তখন তিনি বললেন, কুরায়শের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বার্তা প্রচার করতে পারে কে? তাকে বলা হল যে, জামীল ইবন মা’মার জুমাহী তা পারে। পরের দিন সকালে উমর (রা) তার নিকট গেলেন। আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) বলেন, আমিও তিনি কী করেন তা দেখার জন্যে তার পেছনে পেছনে গেলাম। তখন আমি এ বয়সের বালক যে, যা দেখি তা বুঝতে পারি। উমর (রা) এলেন জামীলের নিকট। তাকে বললেন, তুমি কি জান হে জামীল! আমি তো ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং মুহাম্মদ (সা)-এর ধর্মে প্রবেশ করেছি। ইবন উমর (রা) বলেন, আল্লাহর কসম, সে আর দেরী করেনি, কোন উত্তরও দেয়নি এবং চান্দরটি টেনে নিয়ে ছুটে চলল। আমি আর উমর (রা) তার পেছনে পেছনে ছুটলাম। মাসজিদুল হারামের দরজায় গিয়ে সে দাঁড়ায় এবং উচ্চৈস্বঃরে চীৎকার করে বলে, হে কুরায়শ সম্প্রদায়! ওরা তখন কা’বাগৃহের আশে-পাশে তাদের আসরে উপস্থিত ছিল। তোমরা শুনে নাও, খাত্তাবের পুত্র ধর্মত্যাগী হয়েছে। তখন তার পেছন থেকে উমর (রা) বলে উঠলেন, সে মিথ্যা বলেছে, আমি বরং ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল। একথা শুনে তারা সবাই হযরত উমর (রা)-এর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি একা ওদের সকলের বিরুদ্ধে লড়তে লাগলেন। ওরা সবাই একযোগে তাঁর বিরুদ্ধে লড়তে লাগল। এভাবে যুদ্ধ চলতে চলতে সূৰ্য এসে পড়ল তাদের

মাথার উপর। এবার তিনি ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেন। ওরা সকলে তখন তাকে ঘেরাও করে রয়েছে। তিনি বলছিলেন, তোমাদের যা মন চায় করতে পোর, তবে আল্লাহর কসম করে বলছি, আমরা যদি সংখ্যায় ৩০০ জন থাকতাম, তাহলে কি আমরা তোমাদেরকে এমন ছেড়ে দিতাম, না তোমরা আমাদের এভাবে ছেড়ে দিতে?

তারা এ পরিস্থিতিতে ছিল। হঠাৎ রেশমী চাদর ও নকশা খচিত জামা গায়ে বয়ােবৃদ্ধ এক কুরায়শী ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হয়। সে বলে, তোমাদের কী হলো হে? তারা বলল, উমর ধর্মত্যাগী হয়েছে। বৃদ্ধটি বলল, থাম, একজন লোক তার নিজের জন্যে যা ভাল মনে করেছে তা গ্ৰহণ করেছে। এখন তোমরা কী করতে চাও? তোমরা কি মনে করেছি আদীি গোত্রের

লোকেরা তাদের একজন লোককে এ অবস্থায় তোমাদের হাতে ছেড়ে দেবে? তোমরা ওর পথ ছেড়ে দাও। আল্লাহর কসম, এরপর তারা ভয় পেয়ে সকলে তার কাছ থেকে এমন ভাবে সরে পড়ে যেমন কাপড় গা থেকে সরে পড়ে যায়।

ইবন উমর (রা) বলেন, পরবতীতে আমার পিতা যখন মদীনায় হিজরত করলেন, তখন আমি বললাম, পিত! মক্কায় যেদিন আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, সেদিন আপনার উপর আক্রমণকারী লোকজনকে ধমক মেরে যে ব্যক্তি আপনার নিকট থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, সে ব্যক্তিটি কে ছিল? উত্তরে তিনি বললেন, বৎস, সে হল আস ইবন ওয়াইল সাহিমী। এটি একটি মযবুত ও উৎকৃষ্ট সনদ। এ বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, উমর (রা) বিলম্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কারণ, উহুদ যুদ্ধের দিন ইবন উমর নিজেকে মুজাহিদ তালিকাভুক্ত করার জন্যে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র চৌদ্দ বছর। উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তৃতীয় হিজরীতে। যখন তাঁর পিতা ইসলাম গ্ৰহণ করেন, তখন তিনি মোটামুটি চালাক-চতুর ছিলেন। এ হিসেবে ধরে নেয়া যায় যে, হযরত উমর (রা:) ইসলাম গ্রহণ করেছেন। হিজরতের চার বছর পূর্বে। এ হিসেবে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ঘটে নবুওয়াতের নবম বছরে। আল্লাহই ভাল জানেন।

বায়হাকী (র) বলেন, হাকিম……. ইবন ইসহাক সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় অবস্থান করছিলেন। তাঁর নবুওয়াতের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ায় আবিসিনিয়া থেকে প্রায় কুড়ি জন খৃস্টান রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খেদমতে হাযির হয়। তখন তিনি একটি মজলিসে বসা ছিলেন। তারা তার সাথে আলাপ-আলোচনা করে এবং বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কুরায়শের কতক লোক ক’বাগৃহের আশে-পাশে তাদের আসরে উপস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তাদের যা জিজ্ঞেস করার ছিল তা জিজ্ঞেস করার পর তিনি তাদেরকে আল্লাহ তা’আলার দিকে দাওয়াত দেন এবং তাদের নিকট কুরআন তিলাওয়াত করেন। কুরআন তিলাওয়াত শুনে তাদের দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে থাকে। তারা তার আহবানে সাড়া দেয়, তার প্রতি ঈমান আনয়ন করে। তাকে সত্যবলে মেনে নেয় এবং তার সম্পর্কে তাদের ইনজীল কিতাবে যেসকল পরিচয় পেয়েছে তার মধ্যে সে গুলোর সত্যতা উপলব্ধি করে।

তাঁর মজলিস থেকে ফেরার পথে কতক কুরায়শ লোকসহ আবু জাহল তাদের সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। সে তাদের উদ্দেশ্যে বলে, তোমাদের এ আরোহী দলকে আল্লাহ তা’আলা ব্যর্থ করে দিন। তোমাদের ধর্মানুসারী লোকের, তোমাদেরকে প্রেরণ করেছিল এজন্যে যে, তোমরা এই লোকের নিকট আসবে এবং তার খোঁজখবর নিয়ে ওদেরকে জানাবে। কিন্তু তোমরা করেছি কী? তার মজলিসে বসেছি আর শেষ পর্যন্ত নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করে সে তোমাদেরকে যা বলল, তাকে সর্ব সত্য বলে মেনে নিলে! তোমাদের চাইতে অধিক মূখ্য কোন প্রতিনিধিদল আমরা দেখিনি।

প্রতিনিধিদল বলল, আমরা আপনাদেরকে মূখ্য বলব না। আপনাদের প্রতি সালাম। আমাদের কর্ম আমাদের জন্যে আর আপনাদের কর্ম আপনাদের জন্যে। আমাদের কল্যাণ সাধনে আমরা কমতি করব না। কথিত আছে যে, ওরা ছিল নাজরানের খৃস্টান প্রতিনিধিদল! আল্লাহই ভাল জানেন। কথিত আছে যে, নিম্নোক্ত আয়াতগুলো ওদেরকে উপলক্ষ করে নাযিল হয়েছে :

যাদেরকে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা এটিতে বিশ্বাস করে। যখন তাদের নিকট এটি তিলাওয়াত করা হয়, তখন তারা বলে, আমরা এটিতে ঈমান আনি, এটি আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত সত্য। আমরা তো পূর্বেও আত্মসমর্পণকারী ছিলাম। ওদেরকে দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দেয়া হবে। কারণ, তারা ধৈর্যশীল এবং তারা ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিরোধ করে এবং আমি ওদেরকে যে রিফিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। ওরা যখন আসার বাক্য শ্রবণ করে, তখন তা উপেক্ষা করে চলে এবং বলে” “আমাদের কাজের ফল আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের জন্যে, তোমাদের প্রতি সালাম আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না।” (Rb 3 (†S-&(f)

পরিচ্ছেদ

বায়হাকী (র) আদ-দালাইল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “নাজাশীর নিকট রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্র বিষয়ক পরিচ্ছেদ” তারপর তিনি হাকিম…… ইবন ইসহাক সূত্রে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি বলেছেন,

– এটি রাসূলুল্লাহ-এর পক্ষ থেকে আবিসিনিয়ার রাজা আসহাম নাজাশীর প্রতি প্রেরিত লিপি। শান্তি বৰ্ষিত হোক তার উপর যে হিদায়াতের পথ অনুসরণ করে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তার কোন শরীক নেই। তিনি স্ত্রী কিংবা সন্তান গ্ৰহণ করেননি এবং যে ব্যক্তি এই সাক্ষ্য দেয় যে, মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমি আপনাকে আল্লাহ তা’আলার প্রতি দাওয়াত দিচ্ছি। আমি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল। আপনি ইসলাম গ্ৰহণ করুন, তাহলে নিরাপত্তা পাবেন। হে কিতাবিগণ! এসো সে কথায় যা আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে অভিন্ন। যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করি। কোন কিছুকেই তাঁর শরীক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ ব্যতীত প্রতিপালকরুপে গ্ৰহণ না করে। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম (২৩) (৩ : ৬৪) হে নাজাশী! আপনি যদি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান, তবে আপনার সম্প্রদায়ের সকল খৃস্টানের পাপ আপনার উপর বতাবে।

বায়হাকী (র) আবিসিনিয়ায় হিজরত সম্পর্কিত ঘটনা বর্ণনা করার পর এভাবে চিঠি বিষয়ক আলোচনা উল্লেখ করেছেন। অবশ্য এভাবে উল্লেখ করার যথার্থতা সন্দেহমুক্ত নয়। কারণ, এচিঠি দেয়া হয়েছিল হযরত জাফর (রা) ও তাঁর সঙ্গীগণ যে নাজাশীর সাথে কথা বলেছিলেন সে নাজাশীর পরে ক্ষমতাসীন নাজাশীকে। বস্তুত মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিয়ে অন্যান্য রাষ্ট্রনায়কদেরকে যে পত্রাবলী দিয়েছিলেন। এটি তারই একটি। এ সময় তিনি রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস, পারস্য সম্রাট কিসরা, মিসর-রাজ ফিরআওন এবং আবিসিনিয়ার রাজা নাজাশীর নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন।

যুহরী বলেন, সকল রাষ্ট্র প্রধানের নিকট রাসূলুল্লাহকেই মর্মের পত্র প্রেরণ করেছিলেন। সকল চিঠিতেই এ আয়াত ছিল। এটি সূরা আলে-ইমরানের আয়াত। এটি যে মাদানী সূরা তাতে কোন দ্বিমত নেই। এ আয়াতগুলো সূরার প্রথম দিকের আয়াত। আলোচ্য সূরার প্রথম দিকের ৮৩ টি আয়াত নাজরানের খৃস্টান প্রতিনিধিদেরকে উপলক্ষ করে নাযিল হয়েছে। তাফসীর গ্রন্থে আমরা এটি উল্লেখ করেছি। সকল প্রশংসা আল্লাহর।

সুতরাং ঐ পত্ৰখানা দেয়া হয়েছিল দ্বিতীয় নাজাশীকে। প্রথম নাজাশীকে নয়। বর্ণনায় “আসহাম” নামের উল্লেখ সম্ভবত কোন বর্ণনাকারীর নিজস্ব উপলব্ধি প্রসূত সংযোজন। আল্লাহই ভাল জানেন।

এ আলোচনার সাথে উপরোক্ত পত্র অপেক্ষা নিম্নে বর্ণিত পত্রটি উদ্ধৃত করা অধিকতর

প্রাসংগিক ও যুক্তিসংগত। বায়হাকী (র) উল্লেখ করেছেন যে, হাকিম. মুহাম্মদ ইবন ইসহাক সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) জাফর ইবন আবু তালিব ও তাঁর সঙ্গীদের

প্রতি সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ করার অনুরোধ সম্বলিত একটি চিঠি সহকারে আমর ইবন উমাইয়া যামারীকে নাজাশীর নিকট প্রেরণ করেছিলেন।

পরম দয়ালু, দয়াময় আল্লাহর নামে। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সা)-এর পক্ষ থেকে আবিসিনিয়ার রাজা আসহাম নাজাশীর প্রতি। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক! আপনার নিকট আমি সর্বাধিপতি পবিত্ৰ, নিরাপত্তা বিধায়ক ও রক্ষক মহান আল্লাহর প্রশংসা পেশ করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ঈসা (আঃ) আল্লাহর রূহ ও বাণী। আল্লাহ তা’আলা নিক্ষেপ করেছেন সতী-সাধবী, পবিত্ৰাত্মা মারিয়ামের নিকট। ফলে তিনি ঈসা (আ:)-কে গর্ভে ধারণ করেছেন। মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আ:)-কে সৃষ্টি করেছেন তাঁর রূহ ও ফু দ্বারা যেমন হযরত আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেছেন তাঁর কুদরতী হাত ও ফু দ্বারা। আমি আপনাকে একক, লা-শরীক আল্লাহর প্রতি আহবান জানাচ্ছি এবং তারই আনুগত্যে অবিচল থাকার দাওয়াত দিচ্ছি। আমি আরও দাওয়াত দিচ্ছি, আপনি যেন আমার অনুসরণ করেন এবং আমার প্রতি ঈমান আনয়ন করেন। কারণ, আমি আল্লাহ তা’আলার রাসূল। আমার চাচাত ভাই জাফর এবং তার সাথে কতক মুসলমানকে আপনার নিকট প্রেরণ করলাম। ওরা আপনার নিকট পৌঁছলে ওদের আতিথ্য দেবেন। ওদের প্রতি রূঢ় আচরণ করবেন না। আমি আপনাকে এবং আপনার বাহিনীকে মহামহিম আল্লাহর দিকে আহবান করছি। আমি রিসালাতের বাণী পৌছিয়েছি এবং উপদেশ দিয়েছি। আপনারা আমার উপদেশ গ্ৰহণ করুন। শান্তি বর্ষিত হোক তাদের উপর— যারা হিদায়াতের অনুসরণ করে।

রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রেরিত পত্রের উত্তরে নাজাশী নিম্নোক্ত চিঠি প্রেরণ করেন :

“পরম দয়ালু দয়াময় আল্লাহর নামে। আসহাম ইবন আব্বজুর নাজাশীর পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি। হে আল্লাহর নবী আপনার উপর শান্তি বৰ্ষিত হোক এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত নাযিল হোক! যে মহান সত্তা আমাকে ইসলামের প্রতি হিদায়াত করেছেন তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ ও উপাস্য নেই। হে আল্লাহর রাসূল! আপনার চিঠি আমার নিকট পৌছেছে। ওই চিঠিতে আপনি ঈসা (আ:)-এর বর্ণনা দিয়েছেন। আসমান ও যমীনের প্রতিপালকের কসম, ঈসা (আ) সম্পর্কে আপনি যা, উল্লেখ করেছেন তিনি তার চাইতে এতটুকুও অতিরিক্ত নন। আপনি আমার প্রতি যে বিষয়গুলো সম্বলিত পত্র প্রেরণ করেছেন তা আমি উপলব্ধি করেছি। আপনার চাচাত ভাই ও তার সাথীদের জন্যে আতিথ্যের ব্যবস্থা করেছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি সত্যবাদী এবং আল্লাহর সত্যায়িত রাসূল আমি আপনার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছি এবং আপনার চাচাত ভাইয়ের নিকট বায়আত করেছি। আর আপনার চাচাত ভাইয়ের মাধ্যমে বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছি। হে আল্লাহর নবী! আমি বারিহা ইবন ইসহাম ইবন আব্বজুরকে আপনার নিকট প্রেরণ করলাম। আমি তো আমার নিজের ব্যতীত অন্য কারো উপর কর্তৃত্বশীল নই। আপনি যদি চান, তাহলে আমি আপনার খিদমতে হাযির হবো। তবে আমি নিশ্চিত সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি যা বলেন, তা অকাট্য সত্য।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *