স্মরণ

আজি প্রভাতেও শ্রান্ত নয়নে

আজি প্রভাতেও শ্রান্ত নয়নে রয়েছে কাতর ঘোর । দুখশয্যায় করি জাগরণ রজনী হয়েছে ভোর । নবফুটন্ত ফুলকাননের নব জাগ্রত শীতপবনে সাথি হইবারে পারে নি আজিও এ দেহ – হৃদয় মোর । আজি মোর কাছে প্রভাত তোমার করো গো আড়াল করো — এ খেলা এ মেলা এ আলো এ গীত আজি হেথা হতে হরো । প্রভাত জগৎ...

আজিকে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে

আজিকে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে– রাখিব জ্বালি আলো। তুমি তো ভালো বেসেছ, আজি একাকী শুধু আমারে বাসিতে হবে ভালো। আমার লাগি তোমারে আর হবে না কভু সাজিতে, তোমার লাগি আমি এখন হতে হৃদয়খানি সাজায়ে ফুলরাজিতে রাখিব দিনযামী। তোমার বাহু কত-না দিন শ্রান্তি-দুখ ভুলিয়া...

আপনার মাঝে আমি করি অনুভব

আপনার মাঝে আমি করি অনুভব পূর্ণতর আজি আমি। তোমার গৌরব মুহূর্তে মিশায়ে তুমি দিয়েছ আমাতে। ছোঁয়ায়ে দিয়েছ তুমি আপনার হাতে মৃত্যুর পরশমণি আমার জীবনে। উঠেছ আমার শোকযজ্ঞহুতাশনে নবীন নির্মল মূর্তি; আজি তুমি, সতী, ধরিয়াছ অনিন্দিত সতীত্বের জ্যোতি, নাহি তাহে শোকদাহ, নাহি...

আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই

আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই— যাই আর ফিরে আসি, খুঁজিয়া না পাই। আমার ঘরেতে নাথ, এইটুকু স্থান— সেথা হতে যা হারায় মেলে না সন্ধান। অনন্ত তোমার গৃহ, বিশ্বময় ধাম, হে নাথ, খুঁজিতে তারে সেথা আসিলাম। দাঁড়ালেম তব সন্ধ্যা-গগনের তলে, চাহিলাম তোমা-পানে নয়নের জলে। কোনো মুখ, কোনো...

এ সংসারে একদিন নববধূবেশে

এ সংসারে একদিন নববধূবেশে তুমি যে আমার পাশে দাঁড়াইলে এসে, রাখিলে আমার হাতে কম্পমান হাত, সে কি অদৃষ্টের খেলা, সে কি অকস্মাৎ? শুধু এক মুহূর্তের এ নহে ঘটনা, অনাদিকালের এ আছিল মন্ত্রণা। দোঁহার মিলনে মোরা পূর্ণ হব দোঁহে, বহু যুগ আসিয়াছি এই আশা বহে। নিয়ে গেছ কতখানি মোর প্রাণ...

এসো, বসন্ত, এসো আজ তুমি

এসো, বসন্ত, এসো আজ তুমি আমারও দুয়ারে এসো। ফুল তোলা নাই, ভাঙা আয়োজন, নিবে গেছে দীপ, শূন্য আসন, আমার ঘরের শ্রীহীন মলিন দীনতা দেখিয়া হেসো। তবু, বসন্ত, তবু আজ তুমি আমারও দুয়ারে এসো। আজিকে আমার সব বাতায়ন রয়েছে, রয়েছে খোলা। বাধাহীন দিন পড়ে আছে আজ, নাই কোনো আশা, নাই কোনো...

গোধূলি নিঃশব্দে আসি আপন অঞ্চলে ঢাকে যথা

গোধূলি নিঃশব্দে আসি আপন অঞ্চলে ঢাকে যথা কর্মক্লান্ত সংসারের যত ক্ষত, যত মলিনতা, ভগ্নভবনের দৈন্য, ছিন্নবসনের লজ্জা যত– তব লাগি স্তব্ধ শোক স্নিগ্ধ দুই হাতে সেইমতো প্রসারিত করে দিক অবারিত উদার তিমির আমার এ জীবনের বহু ক্ষুব্ধ দিনযামিনীর স্খলন খণ্ডতা ক্ষতি ভগ্নদীর্ণ...

ঘরে যবে ছিলে মোরে ডেকেছিলে ঘরে

ঘরে যবে ছিলে মোরে ডেকেছিলে ঘরে তোমার করুণাপূর্ণ সুধাকণ্ঠস্বরে। আজ তুমি বিশ্ব-মাঝে চলে গেলে যবে বিশ্ব-মাঝে ডাকো মোরে সে করুণ রবে। খুলি দিয়া গেলে তুমি যে গৃহদুয়ার সে দ্বার রুধিতে কেহ কহিবে না আর। বাহিরের রাজপথ দেখালে আমায়, মনে রয়ে গেল তব নি:শব্দ বিদায়। আজি বিশ্বদেবতার...

জাগো রে জাগো রে চিত্ত জাগো রে

জাগো রে জাগো রে চিত্ত জাগো রে, জোয়ার এসেছে অশ্রু-সাগরে। কূল তার নাহি জানে, বাঁধ আর নাহি মানে, তাহারি গর্জনগানে জাগো রে। তরী তোর নাচে অশ্রু-সাগরে। আজি এ ঊষার পুণ্য লগনে উঠেছে নবীন সূর্য গগনে। দিশাহারা বাতাসেই বাজে মহামন্ত্র সেই। অজানা যাত্রার এই লগনে দিক হতে দিগন্তের...

জ্বালো ওগো, জ্বালো ওগো, সন্ধ্যাদীপ জ্বালো

জ্বালো ওগো, জ্বালো ওগো, সন্ধ্যাদীপ জ্বালো হৃদয়ের এক প্রান্তে ওইটুকু আলো স্বহস্তে জাগায়ে রাখো। তাহারি পশ্চাতে আপনি বসিয়া থাকো আসন্ন এ রাতে যতনে বাঁধিয়া বেণী সাজি রক্তাম্বরে আমার বিক্ষিপ্ত চিত্ত কাড়িবার তরে জীবনের জাল হতে। বুঝিয়াছি আজি বহুকর্মকীর্তিখ্যাতি আয়োজনরাজি...

তখন নিশীথরাত্রি; গেলে ঘর হতে

তখন নিশীথরাত্রি; গেলে ঘর হতে যে পথে চল নি কভু সে অজানা পথে। যাবার বেলায় কোনো বলিলে না কথা, লইয়া গেলে না কারো বিদায়বারতা। সুপ্তিমগ্ন বিশ্ব-মাঝে বাহিরিলে একা— অন্ধকারে খুঁজিলাম, না পেলাম দেখা। মঙ্গলমুরতি সেই চিরপরিচিত অগণ্য তারার মাঝে কোথায় অন্তর্হিত! গেলে যদি একেবারে...

তুমি মোর জীবনের মাঝে

তুমি মোর জীবনের মাঝে মিশায়েছ মৃত্যুর মাধুরী। চিরবিদায়ের আভা দিয়া রাঙায়ে গিয়েছ মোর হিয়া, এঁকে গেছে সব ভাবনায় সূর্যাস্তের বরনচাতুরী। জীবনের দিক্‌চক্রসীমা লভিয়াছে অপূর্ব মহিমা, অশ্রুধৌত হৃদয়-আকাশে দেখা যায় দূর স্বর্গপুরী। তুমি মোর জীবনের মাঝে মিশায়েছ মৃত্যুর মাধুরী।...

তোমার সকল কথা বল নাই, পার নি বলিতে

তোমার সকল কথা বল নাই, পার নি বলিতে, আপনারে খর্ব করি রেখেছিলে তুমি, হে লজ্জিতে, যতদিন ছিলে হেথা। হৃদয়ের গূঢ় আশাগুলি যখন চাহিত তারা কাঁদিয়া উঠিতে কণ্ঠ তুলি তর্জনী-ইঙ্গিতে তুমি গোপন করিতে সাবধান ব্যাকুল সংকোচবশে, পাছে ভুলে পায় অপমান। আপনার অধিকার নীরবে নির্মম নিজকরে...

দেখিলাম খানকয়েক পুরাতন চিঠি

দেখিলাম খানকয়েক পুরাতন চিঠি– স্নেহমুগ্ধ জীবনের চিহ্ন দু-চারিটি স্মৃতির খেলনা-ক’টি বহু যত্নভরে গোপনে সঞ্চয় করি রেখেছিলে ঘরে। যে প্রবল কালস্রোতে প্রলয়ের ধারা ভাসাইয়া যায় কত রবিচন্দ্রতারা, তারি কাছ হতে তুমি বহু ভয়ে ভয়ে এই ক’টি তুচ্ছ বস্তু চুরি করে লয়ে...

পাগল বসন্তদিন কতবার অতিথির বেশে

পাগল বসন্তদিন কতবার অতিথির বেশে তোমার আমার দ্বারে বীণা হাতে এসেছিল হেসে লয়ে তার কত গীত, কত মন্ত্র মন ভুলাবার, জাদু করিবার কত পুষ্পপত্র আয়োজন-ভার। কুহুতানে হেঁকে গেছে, খোলো ওগো, খোলো দ্বার খোলো। কাজকর্ম ভোলো আজি, ভোলো বিশ্ব, আপনারে ভোলো। এসে এসে কত দিন চলে গেছে দ্বারে...

প্রেম এসেছিল , চলে গেল সে যে খুলি দ্বার

প্রেম এসেছিল , চলে গেল সে যে খুলি দ্বার — আর কভু আসিবে না । বাকি আছে শুধু আরেক অতিথি আসিবার , তারি সাথে শেষ চেনা । সে আসি প্রদীপ নিবাইয়া দিবে এক দিন , তুলি লবে মোরে রথে — নিয়ে যাবে মোরে গৃহ হতে কোন্‌ গৃহহীন গ্রহতারকার পথে । ততকাল আমি একা বসি রব খুলি দ্বার , কাজ করি লব...

বজ্র যথা বর্ষণেরে আনে অগ্রসরি

বজ্র যথা বর্ষণেরে আনে অগ্রসরি কে জানিত তব শোক সেইমতো করি আনি দিবে অকস্মাৎ জীবনে আমার বাধাহীন মিলনের নিবিড় সঞ্চার! মোর অশ্রুবিন্দুগুলি কুড়ায়ে আদরে গাঁথিয়া সীমন্তে পরি ব্যর্থশোক-‘পরে নীরবে হানিছ তব কৌতুকের হাসি। ক্রমে সবা হতে যত দূরে গেলে ভাসি তত মোর কাছে এলে।...

বহুরে যা এক করে, বিচিত্রেরে করে যা সরস

বহুরে যা এক করে, বিচিত্রেরে করে যা সরস, প্রভূতেরে করি আনে নিজ ক্ষুদ্র তর্জনীর বশ, বিবিধপ্রয়াসক্ষুব্ধ দিবসেরে লয়ে আসে ধীরে সুপ্তিসুনিবিড় শান্ত স্বর্ণময় সন্ধ্যার তিমিরে ধ্রুবতারাদীপদীপ্ত সুতৃপ্ত নিভৃত অবসানে, বহুবাক্যব্যাকুলতা ডুবায় যা একখানি গানে বেদনার সুধারসে-সে...

ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা

ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা, তোমার হাসিটি ছিল বড়ো সুখে ভরা মিলি নিখিলের স্রোতে জেনেছিলে খুশি হতে, হৃদয়টি ছিল তাই হৃদিপ্রাণহরা। তোমার আপন ছিল এই শ্যাম ধরা। আজি এ উদাস মাঠে আকাশ বাহিয়া তোমার নয়ন যেন ফিরিছে চাহিয়া। তোমার যে হাসিটুক, সে চেয়ে-দেখার সুখ সবারে পরশি চলে...

মিলন সম্পূর্ণ আজি হল তোমা-সনে

মিলন সম্পূর্ণ আজি হল তোমা-সনে এ বিচ্ছেদবেদনার নিবিড় বন্ধনে। এসেছ একান্ত কাছে, ছাড়ি দেশকাল হৃদয়ে মিশায়ে গেছ ভাঙি অন্তরাল। তোমারি নয়নে আজ হেরিতেছি সব, তোমারি বেদনা বিশ্বে করি অনুভব। তোমার অদৃশ্য হাত হেরি মোর কাজে, তোমারি কামনা মোর কামনার মাঝে। দুজনের কথা দোঁহে শেষ করি...