বলাকা

আজ এই দিনের শেষে

আজ এই দিনের শেষে সন্ধ্যা যে ওই মানিকখানি পরেছিল চিকন কালো কেশে গেঁথে নিলেম তারে এই তো আমার বিনিসুতার গোপন গলার হারে। চক্রবাকের নিদ্রানীরব বিজন পদ্মাতীরে এই সে সন্ধ্যা ছুঁইয়ে গেল আমার নতশিরে নির্মাল্য তোমার আকাশ হয়ে পার; ওই যে মরি মরি তরঙ্গহীন স্রোতের ‘পরে ভাসিয়ে...

আজ প্রভাতের আকাশটি এই

আজ প্রভাতের আকাশটি এই শিশির-ছলছল, নদীর ধারের ঝাউগুলি ওই রৌদ্রে ঝলমল, এমনি নিবিড় করে এরা    দাঁড়ায় হৃদয় ভরে তাই তো আমি জানি বিপুল   বিশ্বভুবনখনি অকূল মানস-সাগরজলে কমল টলমল। তাই তো আমি জানি আমি    বাণীর সাথে বাণী, আমি    গানের সাথে গান, আমি    প্রাণের সাথে প্রাণ,...

আনন্দ-গান উঠুক তবে বাজি

আনন্দ-গান উঠুক তবে বাজি এবার আমার ব্যথার বাঁশিতে। অশ্রুজলের ঢেউয়ের ‘পরে আজি পারের তরী থাকুক ভাসিতে। যাবার হাওয়া ওই যে উঠেছে–ওগো ওই যে উঠেছে, সারারাত্রি চক্ষে আমার ঘুম যে ছুটেছে। হৃদয় আমার উঠছে দুলে দুলে অকূল জলের অট্টহাসিতে, কে গো তুমি দাও দেখি তান তুলে...

আমরা চলি সমুখপানে

আমরা চলি সমুখপানে, কে আমাদের বাঁধবে। রইল যারা পিছুর টানে কাঁদবে তারা কাঁদবে। ছিঁড়ব বাধা রক্ত-পায়ে, চলব ছুটে রৌদ্রে ছায়ে, জড়িয়ে ওরা আপন গায়ে কেবলি ফাঁদ ফাঁদবে। কাঁদবে ওরা কাঁদবে। রুদ্র মোদের হাঁক দিয়েছে বাজিয়ে আপন তূর্য। মাথার ‘পরে ডাক দিয়েছে মধ্যদিনের সূর্য। মন...

আমার কাছে রাজা আমার রইল অজানা

আমার কাছে রাজা আমার রইল অজানা। তাই সে যখন তলব করে খাজানা মনে করি পালিয়ে গিয়ে দেব তারে ফাঁকি, রাখব দেনা বাকি। যেখানেতেই পালাই আমি গোপনে দিনে কাজের আড়ালেতে, রাতে স্বপনে, তলব তারি আসে নিশ্বাসে নিশ্বাসে। তাই জেনেছি, আমি তাহার নইকো অজানা। তাই জেনেছি ঋণের দায়ে ডাইনে বাঁয়ে...

আমার মনের জানলাটি আজ হঠাৎ গেল খুলে

আমার মনের জানলাটি আজ হঠাৎ গেল খুলে তোমার মনের দিকে। সকালবেলার আলোয় আমি সকল কর্ম ভুলে রইনু অনিমিখে। দেখতে পেলেম তুমি মোরে সদাই ডাক যে-নাম ধ’রে সে-নামটি এই চৈত্রমাসের পাতায় পাতায় ফুলে আপনি দিলে লিখে। সকালবেলার আলোতে তাই সকল কর্ম ভুলে রইনু অনিমিখে। আমার সুরের...

আমি যে বেসেছি ভালো এই জগতেরে

আমি যে বেসেছি ভালো এই জগতেরে; পাকে পাকে ফেরে ফেরে আমার জীবন দিয়ে জড়ায়েছি এরে; প্রভাত-সন্ধ্যার আলো-অন্ধকার মোর চেতনায় গেছে ভেসে; অবশেষে এক হয়ে গেছে আজ আমার জীবন আর আমার ভুবন। ভালোবাসিয়াছি এই জগতের আলো জীবনেরে তাই বাসি ভালো। তবুও মরিতে হবে এও সত্য জানি। মোর বাণী একদিন...

এই দেহটির ভেলা নিয়ে দিয়েছি সাঁতার গো

এই দেহটির ভেলা নিয়ে দিয়েছি সাঁতার গো, এই দু-দিনের নদী হব পার গো। তার পরে যেই ফুরিয়ে যাবে বেলা, ভাসিয়ে দেব ভেলা, তার পরে তার খবর কী যে ধারি নে তার ধার গো, তার পরে সে কেমন আলো, কেমন অন্ধকার গো। আমি যে অজানার যাত্রী সেই আমার আনন্দ। সেই তো বাধায় সেই তো মেটায় দ্বন্দ্ব।...

এইক্ষণে মোর হৃদয়ের প্রান্তে আমার নয়ন-বাতায়নে

এইক্ষণে মোর হৃদয়ের প্রান্তে আমার নয়ন-বাতায়নে যে-তুমি রয়েছ চেয়ে প্রভাত-আলোতে সে-তোমার দৃষ্টি যেন নানা দিন নানা রাত্রি হতে রহিয়া রহিয়া চিত্তে মোর আনিছে বহিয়া নীলিমার অপার সংগীত, নিঃশব্দের উদার ইঙ্গিত। আজি মনে হয় বারে বারে যে মোর স্মরণের দূর পরপারে দেখিয়াছ কত দেখা কত...

এবার যে ওই এল সর্বনেশে গো

এবার যে ওই এল সর্বনেশে গো। বেদনায় যে বান ডেকেছে রোদনে যায় ভেসে গো। রক্ত-মেঘে ঝিলিক মারে, বজ্র বাজে গহন-পারে, কোন্‌ পাগোল ওই বারে বারে উঠছে অট্টহেসে গো। এবার যে ওই এল সর্বনেশে গো। জীবন এবার মাতাল মরণ-বিহারে। এইবেলা নে বরণ ক’রে সব দিয়ে তোর ইহারে। চাহিস নে আর...

এবারে ফাল্গুনের দিনে সিন্ধুতীরের কুঞ্জবীথিকায়

এবারে ফাল্গুনের দিনে সিন্ধুতীরের কুঞ্জবীথিকায় এই যে আমার জীবন-লতিকায় ফুটল কেবল শিউরে-ওঠা নতুন পাতা যত রক্তবরন হৃদয়ব্যথার মতো; দখিন হাওয়া ক্ষণে ক্ষণে দিল কেবল দোল, উঠল কেবল মর্মর কল্লোল। এবার শুধু গানের মৃদু গুঞ্জনে বেলা আমার ফুরিয়ে গেল কুঞ্জবনের প্রাঙ্গণে। আবার যেদিন...

ওরে তোদের ত্বর সহে না আর

ওরে তোদের ত্বর সহে না আর? এখনো শীত হয় নি অবসান। পথের ধারে আভাস পেয়ে কার সবাই মিলে গেয়ে উঠিস গান? ওরে পাগল চাঁপা, ওরে উন্মত্ত বকুল, কার তরে সব ছুটে এলি কৌতুকে আকুল। মরণপথে তোরা প্রথম দল, ভাবলি নে তো সময় অসময়। শাখায় শাখায় তোদের কোলাহল গন্ধে রঙে ছড়ায় বনময়। সবার আগে উচ্চে...

ওরে  নবীন, ওরে আমার কাঁচা

ওরে  নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা। রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে আজকে যে যা বলে বলুক তোরে, সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ ক’রে পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা। আয় দুরন্ত, আয় রে আমার কাঁচা। খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায়; আর তো কিছুই নড়ে না রে...

কত লক্ষ বরষের তপস্যার ফলে

কত লক্ষ বরষের তপস্যার ফলে ধরণীর তলে ফুটিয়াছে আজি এ মাধবী। এ আনন্দচ্ছবি যুগে যুগে ঢাকা ছিল অলক্ষ্যের বক্ষের আঁচলে। সেইমতো আমার স্বপনে কোনো দূর যুগান্তরে বসন্তকাননে কোনো এক কোণে একবেলাকার মুখে একটুকু হাসি উঠিবে বিকাশি– এই আশা গভীর গোপনে আছে মোর মনে। শান্তিনিকেতন,...

কে তোমারে দিল প্রাণ রে পাষাণ

কে তোমারে দিল প্রাণ রে পাষাণ। কে তোমারে জোগাইছে এ অমৃতরস বরষ বরষ। তাই দেবলোকপানে নিত্য তুমি রাখিয়াছ ধরি ধরণীর আনন্দমঞ্জরী; তাই তো তোমারে ঘিরি বহে বারোমাস অবসন্ন বসন্তের বিদায়ের বিষণ্ন নিশ্বাস; মিলনরজনীপ্রান্তে ক্লান্ত চোখে ম্লান দীপালোকে ফুরায়ে গিয়াছে যত অশ্রু-গলা গান...

কোন্‌ ক্ষণে সৃজনের সমুদ্রমন্থনে

কোন্‌ ক্ষণে সৃজনের সমুদ্রমন্থনে উঠেছিল দুই নারী অতলের শয্যাতল ছাড়ি। একজনা উর্বশী, সুন্দরী, বিশ্বের কামনা-রাজ্যে রানী, স্বর্গের অপ্সরী। অন্যজনা লক্ষ্মী সে কল্যাণী, বিশ্বের জননী তাঁরে জানি, স্বর্গের ঈশ্বরী। একজন তপোভঙ্গ করি উচ্চহাস্য-অগ্নিরসে ফাল্গুনের সুরাপাত্র ভরি...

জানি আমার পায়ের শব্দ রাত্রে দিনে শুনতে তুমি পাও

জানি আমার পায়ের শব্দ রাত্রে দিনে শুনতে তুমি পাও, খুশি হয়ে পথের পানে চাও। খুশি তোমার ফুটে ওঠে শরৎ-আকাশে অরুণ-আভাসে। খুশি তোমার ফাগুনবনে আকুল হয়ে পড়ে ফুলের ঝড়ে ঝড়ে। আমি যতই চলি তোমার কাছে পথটি চিনে চিনে তোমার সাগর অধিক করে নাচে দিনের পরে দিনে। জীবন হতে জীবনে মোর পদ্মটি...

তুমি কি কেবল ছবি শুধু পটে লিখা

তুমি কি কেবল ছবি শুধু পটে লিখা। ওই যে সুদূর নীহারিকা যারা করে আছে ভিড় আকাশের নীড়; ওই যে যারা দিনরাত্রি অলো-হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী গ্রহ তারা রবি তুমি কি তাদেরি মতো সত্য নও। হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি। চিরচঞ্চলের মাঝে তুমি কেন শান্ত হয়ে রও। পথিকের সঙ্গ লও ওগো পথহীন।...

তুমি দেবে, তুমি মোরে দেবে

তুমি দেবে, তুমি মোরে দেবে, গেল দিন এই কথা নিত্য ভেবে ভেবে। সুখে দুঃখে উঠে নেবে বাড়ায়েছি হাত দিনরাত; কেবল ভেবেছি, দেবে, দেবে, আরো কিছু দেবে। দিলে, তুমি দিলে, শুধু দিলে; কভু পলে পলে তিলে তিলে, কভু অকস্মাৎ বিপুল প্লাবনে দানের শ্রাবণে। নিয়েছি, ফেলেছি কত, দিয়েছি ছড়ায়ে,...

তোমার শঙ্খ ধুলায় প’ড়ে

তোমার শঙ্খ ধুলায় প’ড়ে, কেমন করে সইব। বাতাস আলো গেল মরে এ কী রে দুর্দৈব। লড়বি কে আয় ধ্বজা বেয়ে, গান আছে যার ওঠ-না গেয়ে, চলবি যারা চল্‌ রে ধেয়ে, আয় না রে নিঃশঙ্ক। ধুলয় পড়ে রইল চেয়ে ওই যে অভয় শঙ্খ। চলেছিলাম পূজার ঘরে সাজিয়ে ফুলের অর্ঘ্য। খুঁজি সারাদিনের পরে কোথায়...