প্রভাতসংগীত

অনন্ত জীবন

অধিক করি না আশা, কিসের বিষাদ, জনমেছি দু দিনের তরে-- যাহা মনে আসে তাই আপনার মনে গান গাই আনন্দের ভরে। এ আমার গানগুলি দু দণ্ডের গান রবে না রবে না চিরদিন-- পুরব-আকাশ হতে উঠিবে উচ্ছ্বাস, পশ্চিমেতে হইবে বিলীন। তোরা ফুল, তোরা পাখি, তোরা খোলা প্রাণ, জগতের আনন্দ যে তোরা, জগতের...

অনন্ত মরণ

কোটি কোট ছোটো ছোটো মরণেরে লয়ে বসুন্ধরা ছুটিছে আকাশে, হাসে খেলে মৃত্যু চারিপাশে। এ ধরণী মরণের পথ, এ জগৎ মৃত্যুর জগৎ। যতটুকু বর্তমান, তারেই কি বল’ প্রাণ? সে তো শুধু পলক, নিমেষ। অতীতের মৃত ভার পৃষ্ঠেতে রয়েছে তার, না জানি কোথায় তার শেষ। যত বর্ষ বেঁচে আছি তত বর্ষ মরে গেছি,...

আহ্বানসংগীত

ওরে তুই জগৎ-ফুলের কীট, জগৎ যে তোর শুকায়ে আসিল, মাটিতে পড়িল খসে-- সারা দিন রাত গুমরি গুমরি কেবলি আছিস বসে। মড়কের কণা,নিজ হাতে তুই রচিলি নিজের কারা, আপনার জালে জড়ায়ে পড়িয়া আপনি হইলি হারা। অবশেষে কারে অভিশাপ দিস হাহুতাশ করে সারা, কোণে বসে শুধু ফেলিস নিশাস, ঢালিস বিষের...

চেয়ে থাকা

মনেতে সাধ যে দিকে চাই কেবলি চেয়ে রব। দেখিব শুধু, দেখিব শুধু, কথাটি নাহি কব। পরানে শুধু জাগিবে প্রেম, নয়নে লাগে ঘোর, জগতে যেন ডুবিয়া রব হইয়া রব ভোর। তটিনী যায়, বহিয়া যায়, কে জানে কোথা যায়; তীরেতে বসে রহিব চেয়ে, সারাটি দিন যায়। সুদূর জলে ডুবিছে রবি সোনার লেখা লিখি,...

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ

আজি এ প্রভাতে প্রভাতবিহগ কী গান গাইল রে! অতিদূর দূর আকাশ হইতে ভাসিয়া আইল রে! না জানি কেমনে পশিল হেথায় পথহারা তার একটি তান, আঁধার গুহায় ভ্রমিয়া ভ্রমিয়া গভীর গুহায় নামিয়া নামিয়া আকুল হইয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া ছুঁয়েছে আমার প্রাণ। আজি এ প্রভাতে সহসা কেন রে পথহারা রবিকর আলয় না...

পুনর্মিলন

কিসের হরষ কোলাহল শুধাই তোদের, তোরা বল্। আনন্দ-মাঝারে সব উঠিতেছে ভেসে ভেসে আনন্দে হতেছে কভু লীন-- চাহিয়া ধরণী-পানে নব আনন্দের গানে মনে পড়ে আর-এক দিন। সে তখন ছেলেবেলা--রজনী প্রভাত হলে, তাড়াতাড়ি শয্যা ছাড়ি ছুটিয়া যেতেম চলে; সারি সারি নারিকেল বাগানের এক পাশে, বাতাস আকুল...

প্রতিধ্বনি

অয়ি প্রতিধ্বনি, বুঝি আমি তোরে ভালোবাসি, বুঝি আর কারেও বাসি না। আমারে করিলি তুই আকুল ব্যাকুল, তোর লাগি কাঁদে মোর বীণা। তোর মুখে পাখিদের শুনিয়া সংগীত, নির্ঝরের শুনিয়া ঝর্ঝর, গভীর রহস্যময় অরণ্যের গান, বালকের মধুমাখা স্বর, তোর মুখে জগতের সংগীত শুনিয়া, তোরে আমি...

প্রভাত-উৎসব

হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি! জগত আসি সেথা করিছে কোলাকুলি! ধরায় আছে যত মানুষ শত শত আসিছে প্রাণে মোর,হাসিছে গলাগলি। এসেছে সখা সখী বসিয়া চোখাচোখি, দাঁড়ায়ে মুখোমুখি হাসিছে শিশুগুলি। এসেছে ভাই বোন পুলকে ভরা মন, ডাকিছে, ‘ভাই ভাই’ আঁখিতে আঁখি তুলি। সখারা এল ছুটে, নয়নে তারা...

মহাস্বপ্ন

পূর্ণ করি মহাকাল পূর্ণ করি অনন্ত গগন, নিদ্রামগ্ন মহাদেব দেখিছেন মহান্‌ স্বপন্‌। বিশাল জগৎ এই প্রকাণ্ড স্বপন সেই, হৃদয়সমুদ্রে তাঁর উঠিতেছে বিম্বের মতন। উঠিতেছে চন্দ্র সূর্য, উঠিতেছে আলোক আঁধার, উঠিতেছে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের জ্যোতি-পরিবার। উঠিতেছে, ছুটিতেছে গ্রহ উপগ্রহ...

শরতে প্রকৃতি

কই গো প্রকৃতি রানী , দেখি দেখি মুখখানি , কেন গো বিষাদছায়া রয়েছে অধর ছুঁয়ে মুখখানি মলিন কেন গো ? এই যে মুহূর্ত আগে হাসিতে ছিলে গো দেখি পলক না পালটিতে সহসা নেহারি এ কি— মরনে বিলীন যেন গো ! কেন তনুখানি ঢাকা শুভ্র কুহেলিকা বাসে মৃদু বিষাদের ভারে সুধীরে মুদিয়া আসে নয়ন...

সমাপন

আজ আমি কথা কহিব না। আর আমি গান গাহিব না। হেরো আজি ভোরবেলা এসেছে রে মেলা লোক, ঘিরে আছে চারি দিকে চেয়ে আছে অনিমিখে, হেরে মোর হাসিমুখ ভুলে গেছে দুখশোক। আজ আমি গান গাহিব না। সকাতরে গান গেয়ে পথপানে চেয়ে চেয়ে এদের ডেকেছি দিবানিশি। ভেবেছিনু মিছে আশা, বোঝে না আমার ভাষা, বিলাপ...

সাধ

অরুণময়ী তরুণী উষা জাগায়ে দিল গান। পুরব মেঘে কনকমুখী বারেক শুধু মারিল উঁকি, অমনি যেন জগৎ ছেয়ে বিকশি উঠে প্রাণ। কাহার হাসি বহিয়া এনে করিলি সুধা দান। ফুলেরা সব চাহিয়া আছে আকাশপানে মগন-মনা, মুখেতে মৃদু বিমল হাসি নয়নে দুটি শিশির-কণা। আকাশ-পারে কে যেন ব'সে, তাহারে যেন...

সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়

দেশশূন্য, কালশূন্য, জ্যোতিঃশূন্য, মহাশূন্য-’পরি চতুর্মুখ করিছেন ধ্যান, মহা অন্ধ অন্ধকার সভয়ে রয়েছে দাঁড়াইয়া-- কবে দেব খুলিবে নয়ান। অনন্ত হৃদয়-মাঝে আসন্ন জগৎ-চরাচর দাঁড়াইয়া স্তম্ভিত নিশ্চল, অনন্ত হৃদয়ে তাঁর ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান ধীরে ধীরে বিকাশিছে দল। লেগেছে ভাবের ঘোর,...

স্নেহ উপহার

শ্রীমতী ইন্দিরা প্রাণাধিকাসু। বাব্‌লা। আয় রে বাছা কোলে বসে চা ' মোর মুখ - পানে , হাসিখুশি প্রাণখানি তোর প্রভাত ডেকে আনে। আমার দেখে আসিস ছুটে , আমায় বাসিস ভালো , কোথা হতে পড়লি প্রাণে তুই রে উষার আলো। দেখ্ রে প্রাণে স্নেহের মতো সাদা সাদা জুঁই ফুটেছে। দেখ্ রে , আমার...

স্রোত

জগৎ-স্রোতে ভেসে চলো, যে যেথা আছ ভাই! চলেছে যেথা রবি শশী চল্‌ রে সেথা যাই। কোথায় চলে কে জানে তা, কোথায় যাবে শেষে, জগৎ-স্রোত বহে গিয়ে কোন্‌ সাগরে মেশে। অনাদি কাল চলে স্রোত অসীম আকাশেতে, উঠেছে মহা কলরব অসীমে যেতে যেতে। উঠিছে ঢেউ, পড়ে ঢেউ, গনিবে কেবা কত! ভাসিছে শত গ্রহ...

০১. উৎসর্গ ও সূচনা (প্রভাতসংগীত)

শ্রীমতী ইন্দিরাদেবী প্রাণাধিকাসু রবিকাকা সূচনা ‘কড়ি ও কোমল’ রচনার পূর্বে কাব্যের ভাষা আমার কাছে ধরা দেয়নি। কাঁচা বয়সে মনের ভাবগুলো নূতনত্বের আবেগ নিয়ে রূপ ধরতে চাচ্ছে, কিন্তু যে উপাদানে তাদেরকে শরীরের বাঁধন দিতে পারত তারই অবস্থা তখন তরল; এইজন্যে ওগুলো হয়েছে ঢেউওয়ালা...