কল্পনা

অনবচ্ছিন্ন আমি

আজি মগ্ন হয়েছিনু ব্রহ্মাণ্ড‐মাঝারে, যখন মেলিনু আঁখি হেরিনু আমারে। ধরণীর বস্ত্রাঞ্চল দেখিলাম তুলি, আমার নাড়ীর কম্পে কম্পমান ধূলি। অনন্ত আকাশতলে দেখিলাম নামি, আলোকদোলায় বসি দুলিতেছি আমি। আজি গিয়েছিনু চলি মৃত্যুপরপারে, সেথা বৃদ্ধ পুরাতন হেরিনু আমারে। অবিচ্ছিন্ন আপনারে...

অশেষ

                   আবার আহ্বান? যত‐কিছু ছিল কাজ               সাঙ্গ তো করেছি আজ                    দীর্ঘ দীনমান। জাগায়ে মাধবীবন                  চলে গেছে বহুক্ষণ                    প্রত্যুষ নবীন, প্রখর পিপাসা হানি                পুষ্পের শিশির টানি                   ...

অসময়

হয়েছে কি তবে সিংহদুয়ার বন্ধ রে?        এখনো সময় আছে কি, সময় আছে কি? দূরে কলরব ধ্বনিছে মন্দ মন্দ রে—        ফুরালো কি পথ? এসেছি পুরীর কাছে কি? মনে হয় সেই সুদূর মধুর গন্ধ রে        রহি রহি যেন ভাসিয়া আসিছে বাতাসে। বহু সংশয়ে বহু বিলম্ব করেছি—        এখন বন্ধ্যা সন্ধ্যা...

আশা

এ জীবনসূর্য যবে অস্তে গেল চলি, হে বঙ্গজননী মোর, ‘আয় বৎস’ বলি খুলি দিলে অন্তঃপুরে প্রবেশদুয়ার, ললাটে চুম্বন দিলে; শিয়রে আমার জ্বালিলে অনন্ত দীপ। ছিল কণ্ঠে মোর একখানি কণ্টকিত কুসুমের ডোর সংগীতের পুরস্কার, তারি ক্ষতজ্বালা হৃদয়ে জ্বলিতেছিল— তুলি সেই মালা প্রত্যেক কণ্টক...

উন্নতিলক্ষণ

১ ওগো পুরবাসী, আমি পরবাসী        জগৎব্যাপারে অজ্ঞ, শুধাই তোমায় এ পুরশালায়        আজি এ কিসের যজ্ঞ? সিংহদুয়ারে পথের দু ধারে        রথের না দেখি অন্ত— কার সম্মানে ভিড়েছে এখানে        যত উষ্ণীষবন্ত? বসেছেন ধীর অতি গম্ভীর       দেশের প্রবীণ বিজ্ঞ, প্রবেশিয়া ঘরে সংকোচে ডরে...

কাল্পনিক

বেহাগ আমি     কেবলি স্বপন করেছি বপন                  বাতাসে— তাই      আকাশকুসুম করিনু চয়ন                  হতাশে।          ছায়ার মতন মিলায় ধরণী,          কূল নাহি পায় আশার তরণী,          মানসপ্রতিমা ভাসিয়া বেড়ায়                  আকাশে। কিছু     বাঁধা পড়িল না শুধু এ...

কৃতঘ্ন শোক

ভোরবেলায় সে বিদায় নিলে। আমার মন আমাকে বোঝাতে বসল, ‘সবই মায়া।’ আমি রাগ করে বললেম, ‘এই তো টেবিলে সেলাইয়ের বাক্স, ছাতে ফুলগাছের টব, খাটের উপর নাম-লেখা হাতপাখাখানি— সবই তো সত্য।’ মন বললে, ‘তবু ভেবো দেখো—’ আমি বললেম, ‘থামো তুমি। ঐ দেখো-না গল্পের বইখানি,মাঝের পাতায় একটি...

চৈত্ররজনী

আজি উন্মাদ মধুনিশি ওগো      চৈত্রনিশীথশশী! তুমি এ বিপুল ধরণীর পানে      কী দেখিছ একা বসি      চৈত্রনিথীথশশী! কত নদীতীরে, কত মন্দিরে,      কত বাতায়নতলে— কত কানাকানি, মন‐জানাজানি,      সাধাসাধি কত ছলে! শাখাপ্রশাখার দ্বার‐জানালার      আড়ালে আড়ালে পশি কত সুখদুখ কত কৌতুক...

চৌরপঞ্চাশিকা

       ওগো সুন্দর চোর, বিদ্যা তোমার কোন্ সন্ধ্যার        কনকচাঁপার ডোর। কত বসন্ত চলি গেছে হায়, কত কবি আজি কত গান গায়, কোথা রাজবালা চিরশয্যায়        ওগো সুন্দর চোর— কোনো গানে আর ভাঙে না যে তার        অনন্ত ঘুমঘোর।          ওগো সুন্দর চোর, কত কাল হল কবে সে প্রভাতে...

জগদীশচন্দ্র বসু

বিজ্ঞানলক্ষ্মীর প্রিয় পশ্চিমমন্দিরে            দূর সিন্ধুতীরে, হে বন্ধু, গিয়েছ তুমি; জয়মাল্যখানি           সেথা হতে আনি দীনহীনা জননীর লজ্জানত শিরে           পরায়েছ ধীরে। বিদেশের মহোজ্জ্বল মহিমামণ্ডিত           পণ্ডিতসভায় বহু সাধুবাদধ্বনি নানা কণ্ঠরবে           শুনেছ...

জন্মদিনের গান

বেহাগ। চৌতাল ভয় হতে তব অভয়মাঝারে           নূতন জনম দাও হে! দীনতা হইতে অক্ষয় ধনে, সংশয় হতে সত্যসদনে, জড়তা হইতে নবীন জীবনে           নূতন জনম দাও হে!                                                 আমার ইচ্ছা হইতে, হে প্রভু,           তোমার ইচ্ছামাঝে— আমার স্বার্থ...

জুতা-আবিষ্কার

কহিলা হবু, ‘শুন গো গোবুরায়,        কালিকে আমি ভেবেছি সারা রাত্র— মলিন ধূলা লাগিবে কেন পায়        ধরণী‐মাঝে চরণ‐ফেলা মাত্র! তোমরা শুধু বেতন লহ বাঁটি,        রাজার কাজে কিছুই নাহি দৃষ্টি। আমার মাটি লাগায় মোরে মাটি,        রাজ্যে মোর একি এ অনাসৃষ্টি!             শীঘ্র এর...

ঝড়ের দিনে

         আজি এই আকুল আশ্বিনে          মেঘে‐ঢাকা দুরন্ত দুর্দিনে হেমন্ত‐ধানের খেতে          বাতাস উঠেছে মেতে,          কেমনে চলিবে পথ চিনে—          আজি এই দুরন্ত দুর্দিনে?            দেখিছ না, ওগো সাহসিকা,          ঝিকিমিকি বিদ্যুতের শিখা! মনে ভেবে দেখো তবে—    এ ঝড়ে...

দুঃসময়

যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,       সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া, যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,       যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া, মহা‐আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,       দিক্‌‍‐দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা— তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,       এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।...

নববিরহ

মল্লার হেরিয়া শ্যামল ঘন নীল গগনে সজল কাজল‐আঁখি পড়িল মনে—        অধর করুণা‐মাখা,        মিনতি‐বেদনা‐আঁকা        নীরবে চাহিয়া থাকা              বিদায়খনে— হেরিয়া শ্যামল ঘন নীল গগনে।   ঝরোঝরো ঝরে জল, বিজুলি হানে, পবন মাতিছে বনে পাগল গানে।        আমার পরানপুটে       ...

পরিণাম

ভৈরবী। ঝাঁপতাল জানি হে, যবে প্রভাত হবে, তোমার কৃপা‐তরণী       লইবে মোরে ভবসাগরকিনারে। করি না ভয়, তোমারি জয় গাহিয়া যাব চলিয়া,       দাঁড়াব আমি তব অমৃত‐দুয়ারে। জানি হে, তুমি যুগে যুগে তোমার বাহু ঘেরিয়া       রেখেছ মোরে তব অসীম ভুবনে। জনম মোরে দিয়েছ তুমি আলোক হতে আলোকে,...

পসারিনী

  ওগো পসারিনি, দেখি আয়          কী রয়েছে তব পসরায়। এত ভার মরি মরি             কেমনে রয়েছ ধরি,          কোমল করুণ ক্লান্তকায়। কোথা কোন্ রাজপুরে        যাবে আরো কত দূরে          কিসের দুরূহ দুরাশায়। সম্মুখে দেখো তো চাহি        পথের যে সীমা নাহি,          তপ্ত বালু...

পিয়াসী

   আমি তো চাহি নি কিছু। বনের আড়ালে দাঁড়ায়ে ছিলাম    নয়ন করিয়া নিচু। তখনো ভোরের আলস‐অরুণ    আঁখিতে রয়েছে ঘোর। তখনো বাতাসে জড়ানো রয়েছে    নিশির শিশিরলোর। নূতন তৃণের উঠিছে গন্ধ    মন্দ প্রভাতবায়ে; তুমি একাকিনী কুটিরবাহিরে    বসিয়া অশথছায়ে নবীননবনীনিন্দিত করে    দোহন...

পূর্ণকাম

কীর্তন সংসারে মন দিয়েছিনু, তুমি           আপনি সে মন নিয়েছ! সুখ ব’লে দুখ চেয়েছিনু, তুমি           দুখ ব’লে সুখ দিয়েছ! হৃদয় যাহার শতখানে ছিল           শত স্বার্থের সাধনে, তাহারে কেমনে কুড়ায়ে আনিলে,           বাঁধিলে ভক্তিবাঁধনে!   সুখ সুখ ক’রে দ্বারে দ্বারে মোরে...

প্রকাশ

হাজার হাজার বছর কেটেছে, কেহ তো কহে নি কথা, ভ্রমর ফিরেছে মাধবীকুঞ্জ, তরুরে ঘিরেছে লতা; চাঁদেরে চাহিয়া চকোরী উড়েছে, তড়িৎ খেলেছে মেঘে, সাগর কোথায় খুঁজিয়া খুঁজিয়া তটিনী ছুটেছে বেগে; ভোরের গগনে অরুণ উঠিতে কমল মেলেছে আঁখি, নবীন আষাঢ় যেমনি এসেছে চাতক উঠেছে ডাকি— এত যে গোপন...