৯. উম্মু কুলছুম বিনত নবী করীম (ﷺ)

৯. উম্মু কুলছুম বিনত নবী করীম (ﷺ)

পরিচিতি

উম্মু কুলছুম (রা) রাসূলে করীম (ﷺ)-এর তৃতীয় মেয়ে। তবে এ ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের কিছুটা মতপার্থক্য আছে। ইমাম আজ-জাহাবী তাকে রাসূলুল্লাহর সন্তানদের মধ্যে চতুর্থ বলেছেন। যুবাইর ইবনে বাক্কার বলেছেন, উম্মু কুলছুম ছিলেন রুকাইয়া ও ফাতিমা (রা) থেকে বড়। কিন্তু অধিকাংশ সীরাত লেখক এ মতের বিরোধিতা করেছেন। সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য মত এটাই যে, উম্মু কুলছুম (রা) ছিলেন রুকাইয়্যা (রা)-এর ছোট। তাবারী রাসূলুল্লাহর মেয়েদের জন্মের ক্রমধারা উল্লেখ করেছেন এভাবে

وولدت زينب وي ام كلثوم وفاطمة

‘যয়নব, রুকাইয়্যা, উম্মু কুলছুম ও ফাতিমা জন্ম গ্রহণ করেন। (তারীখ আত-তাবাবী (লেইডেন) ৩/১১২৮)

রুকাইয়্যা (রা) ছিলেন উছমান (রা)-এর স্ত্রী। হিজরী ২য় সনে তার ইন্তেকাল হলে রাসূল (ﷺ) কুলছুমকে (রা) উছমানের (রা) সাথে বিয়ে দেন। উম্মু কুলছুম বয়সে রুকাইয়্যার বড় যদি হতেন তাহলে উছমানের (রা) সাথে তাঁরই বিয়ে হতো আগে, রুকাইয়ার নয়। কারণ, সকল সমাজ ও সভ্যতায় বড় মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থাটা আগেই করা হয়। আর এটাই বুদ্ধি ও প্রকৃতির দাবী।

সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলিতে উম্মু কুলছুমের (রা) জন্ম সনের কোন উল্লেখ দেখা যায় না। তবে রাসূলুল্লাহর নবুওয়্যাত লাভের ছয় বছর পূর্বে তার জন্ম হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। কারণ, একথা প্রায় সর্বজন স্বীকৃত যে, নবুওয়্যাতের সাত বছর পূর্বে রুকাইয়্যার এবং পাঁচ বছর পূর্বে ফাতিমার (রা) জন্ম হয়। আর একথাও মেনে নেয়া হয়েছে যে, উম্মু কুলছুম (রা) ছিলেন রুকাইয়্যার ছোট এবং ফাতিমার বড়। তাহলে তাদের দুজনের মধ্যবর্তী সময় তার জন্ম সন বলে মেনে নিতেই হবে। আর এ হিসেবেই তিনি নবুওয়্যাতের ছয় বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। অনেকের মত উম্মু কুলছুম (রা)-এরও শৈশবকাল অজ্ঞতার অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেছে। আরবের সে সময়কালটা এমন ছিল যে, কোন ব্যক্তিরই জীবনকথা পূর্ণভাবে পাওয়া যায় না। এ কারণে তার বিয়ের সময় থেকেই তার জীবন ইতিহাস লেখা হয়েছে।

উম্মু কুলছুমের প্রথম বিয়ে

রাসূলুল্লাহর নবুওয়্যাত লাভের পূর্বে আবু লাহাবের পুত্র উতবার সাথে রুকাইয়্যার এবং তার দ্বিতীয় পুত্র উতাইবার সাথে উম্মু কুলছুমের বিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহর নবুওয়্যাত লাভের পর যখন আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর নিন্দায় সূরা লাহাব নাযিল হয় তখন আবু লাহাব, মতান্তরে আবু লাহাবের স্ত্রী দুই ছেলেকে লক্ষ্য করে বলে, তোমরা যদি তার মুহাম্মাদ (ﷺ) – মেয়েকে তালাক দিয়ে বিদায় না কর তাহলে তোমাদের সাথে আমার বসবাস ও উঠাবসা হারাম। রুকাইয়্যার (রা) জীবনীতে আমরা উল্লেখ করেছি যে, পিতা-মাতার এরূপ কথায় এবং সামাজিক চাপে উতবা তার স্ত্রী রুকাইয়্যাকে তালাক দেয়। তেমনিভাবে উতাইবাও মা-বাবার হুকুম তামিল করতে গিয়ে স্ত্রী উম্মু কুলছুমকে তালাক দেয়। এ হিসেবে উভয়ের তালাকের সময়কাল ও কারণ একই। উভয় বোনের বিয়ে হয়েছিল ঠিকই কিন্তু স্বামীর ঘরে যাবার পূর্বেই এ ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

উম্মু কুলছুমের দ্বিতীয় বিয়ে

হিজরী দ্বিতীয় সনে রুকাইয়্যা (রা) মৃত্যুবরণ করলে উছমান (রা) স্ত্রীর শোকে বেশ বিষন্ন ও বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তাঁর এ অবস্থা দেখে রাসূল (ﷺ) একদিন তাকে বললেন, উছমান, তোমাকে এমন বিমর্ষ দেখছি, কারণ কি উছমান (রা) বললেন, আমি এমন বিমর্ষ না হয়ে কেমন করে পারি? আমার ওপর এমন মুসীবত এসেছে যা সম্ভবত: কখনো কারো ওপর আসেনি। রাসূলুল্লাহর কন্যার ইনতিকাল হয়েছে। এতে আমার মাজা ভেঙ্গে গেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল তা ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন আমার উপায় কি? তার কথা শেষ না হতেই রাসূল বলে উঠলেন, জিবরীল (আ:) আল্লাহর দরবার থেকে আমাকে হুকুম পৌছে দিয়েছেন, আমি যেন রুকাইয়্যার সমপরিমাণ মোহরের ভিত্তিতে উ কুলছুমকেও তোমার সাথে বিয়ে দেই। অতঃপর আল্লাহর দরবার থেকে আমাকে হুকুম পৌছে দিয়েছেন, হিজরী ২য় সনের রাবীউল আউয়াল মাসে উছমান (রা)-এর সাথে উম্মু কুলছুমের আকন্দ সম্পন্ন করেন। আদের দুই মাস পরে জমাদিউস ছানী মাসে তিনি স্বামী গৃহে গমন করেন। উম্মু কুলছুম কোন সন্তানের মা হননি। অপর বর্ণনায় এসেছে, রুকাইয়্যার (রা) ইন্তেকালের পর ওমর ইবন খাত্তাব (রা) তাঁর মেয়ে হাফসাকে (রা) উছমানের (রা) সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তর না দিয়ে চুপ থাকেন। একথা রাসূল জানতে পেরে ওমরকে বলেন, আমি হাফসার জন্যে উছমানের চেয়ে ভালো স্বামী এবং উছমানের জন্যে হাফসার চেয়ে ভালো স্ত্রী তালাশ করবো। তারপর তিনি হাফসাকে বিয়ে করেন এবং উম্মু কুলছুমকে উছমানের সাথে বিয়ে দেন।

উম্মু কুলছুমের ইসলাম, বাইআত গ্রহণ ও হিজরত

উম্মু কুলছুম (রা) তাঁর মা উম্মুল মু’মিনীন খাদীজার (রা) সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে অন্য বোনদের সাথে রাসূলুল্লাহর আর হাতে বাই’আত করেন। রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরতের পর তিনি পরিবারে অন্য সদস্যদের সাথে মদীনায় হিজরত বিরল।

ওফাত

স্বামী উছমানের (রা) সাথে ছয় বছর কাটানোর পর হিজরী ৯ম সনের শা’বান মাসে উম্মু কুলছুম (রা) ইন্তেকাল করেন। আনসারী মহিলারা তাঁকে গোসল দেন। তাঁদের মধ্যে উম্মু আতিয়াও ছিলেন। রাসূল জানাযার সালাত পড়ান। আবু তালহা, আলী ইবন আবী তালিব, ফাদল ইবন আব্বাস ও উসামা ইবন যায়েদ (রা) লাশ কবরে নামান। উম্মু কুলছুম (রা)-এর ইন্তেকালের পর রাসূল বলেন, আমার যদি দশটি মেয়ে থাকতো তাহলে একের পর এক তাদের সকলকে উছমানের (রা) সাথে বিয়ে দিতাম। একটি বর্ণনায় দশটি মেয়ের স্থলে একশোটি মেয়ে এসেছে। (তাবাকাত) রাসূলে করীম কন্যা উম্মু কুলছুমের (রা) মৃত্যুতে ভীষণ ব্যথা পান। যখন কবরের কাছে বসেন তখন চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে।

একটি বর্ণনায় এসেছে, আনাস (রা) উম্মু কুলছুম (রা)-কে রেখা অঙ্কিত রেশমের কাজ করা একটি চাদর গায়ে দেওয়া অবস্থায় দেখেছেন। নরাধম উতায়বা তার জাহান্নামের অগ্নিশিখা পিতা আবু লাহাব এবং কাঠকুড়ানি মা উম্মু জামীল হাম্বলাতাল হাতাব-এর চাপে স্ত্রী উম্মু কুলছুমকে তালাক দানের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এসে চরম অমার্জিত আচরণ করে। সে রাসূলকে লক্ষ্য করে বলে : আমি আপনার দ্বীনকে অস্বীকার করি, মতান্তরে আপনার মেয়েকে তালাক দিয়েছি বলে সে গোয়ারের মত রাসূলুল্লাহর উপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং তাতে রাসূলুল্লাহর জামা ছিড়ে যায়। এরপর সে শামের দিকে সফরে বেরিয়ে যায়। তার এমন পসুলভ আচরণে রাসূল ক্ষুব্ধ হয়ে বদ-দুআ করেন এ বলে : আমি আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন তার কোন কুকুরকে তার ওপর বিজয়ী করে দেন। “উতাইবা কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফেলার সাথে শামের দিকে বেরিয়ে পড়লো। যখন তারা আয-যারকা’ নামক স্থানে রাত্রি যাপন করছিল, তখন একটি নেকড়ে তাদের অবস্থান স্থলের পাশে ঘুর ঘুর করতে থাকে। তা দেখে উতাইবার মনে পড়ে রাসূলুল্লাহর বদ-দআর কথা। সে তার জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। সে বলতে থাকে, আমার মা নিপাত যাক, মুহাম্মাদের কথা মত এ নেকড়ে তো আমাকে খেয়ে ফেলবে। যা হোক, কাফেলার ললাকেরা তাকে সকলের মাঝখানে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। নেকড়ে সকলকে ডিঙ্গিয়ে সকলের থেকে উতাইবাকে উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং কামড়ে, খামছে ও রক্তাক্ত করে তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *