পদ্মিনী
বাপ্পাদিত্যের সময় মুসলমানেরা ভারতবর্ষে প্রথম পদার্পণ করেন। তার পর থেকে সূর্য্যবংশের অনেক রাজা, অনেকবার চিতোরের সিংহাসনে বসেছেন, রাজসিংহাসন নিয়ে কত ভায়ে ভায়ে বিচ্ছেদ, কত মহা মহা যুদ্ধ, কত রক্তপাত, কত অশ্রুপাতই হয়ে গেছে; কিন্তু এত রাজা, এত যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে কেবল জনকতক রাজার নাম আর গুটিকতক যুদ্ধের কথা সমস্ত রাজপুতের প্রাণে এখনও সোনার অক্ষরে লেখা রয়েছে। তার মধ্যে একজন হচ্ছেন, মহারাজ খোমান, যিনি চব্বিশবার মুসলমানের হাত থেকে চিতোরকে রক্ষা করেছিলেন, যিনি আরব্য-উপন্যাসের সেই বোগ্দাদের খলিফ হারুণ আল রসীদের ছেলে আলমামুনকে চিতোরের রাজপ্রাসাদে অনেক দিন বন্দী রেখেছিলেন। আশীর্ব্বাদ করতে হলে এখনো যাঁর নাম করে রাজপুতেরা বলে,—“খোমান তোমায় রক্ষা করুন।” আর একজন রাজা, মহারাজ সমরসিং, যেমন বীর তেমনি ধার্ম্মিক! তিনি যখন নাগা সন্ন্যাসীর মত মাথার উপর ঝুঁটি বেঁধে পদ্মবীজের মালাগলায় ভবানীর খাঁড়া হাতে নিয়ে রাজসিংহাসনে বসতেন, তখন বোধ হত যেন সত্যই ভগবান একলিঙ্গের দেওয়ান কৈলাস থেকে পৃথিবীতে রাজত্ব করতে এসেছেন। তখনকার দিল্লীশ্বর চৌহান পৃথ্বীরাজের হাত থেকে শাহাবুদ্দীন ঘোরি যখন দিল্লীর সিংহাসনের সঙ্গে অর্দ্ধেক ভারতবর্ষ কেড়ে নিতে এসেছিলেন, সেই সময় এই মহারাজ সমরসিংহ তেরো হাজার রাজপুত আর নিজের ছেলে কল্যাণকে নিয়ে অর্দ্ধেক ভারতবর্ষের রাজা পৃথ্বীরাজের পাশে পাশে, কাগার নদীর তীরে, মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। সেই যুদ্ধই তাঁর শেষ যুদ্ধ! পৃথ্বীরাজ সমরসিংহের প্রাণের বন্ধু;— তাঁর আদরের মহিষী মহারাণী পৃথার ছোট ভাই; দুজনে বড় ভালোবাসা ছিল। তাই বুঝি এই শেষ-যুদ্ধে সমরসিং জন্মের মত বন্ধুত্বের সমস্ত ধার শুধে দিয়ে চলে গেলেন! যখন যুদ্ধের দিনে প্রলয়ের ঝড়-বৃষ্টির মাঝে পৃথ্বীরাজের লক্ষ লক্ষ হাতী–ঘোড়া, সৈন্য–সামন্ত ছিন্নভিন্ন, ছারখার হয়ে গেল, যখন জয়ের আর কোনো আশা নেই, প্রাণের মায়া কাটাতে না পেরে যখন প্রায় সমস্ত রাজাই পৃথ্বীরাজকে বিপদের মাঝে রেখে একে একে নিজের নিজের রাজত্বের মুখে পালিয়ে চল্লেন, তখন একমাত্র সমরসিং স্ত্রীপুত্ত্রপরিবার, রাজমুকুট, রাজসিংহাসন তুচ্ছ করে প্রাণের বন্ধু পৃথ্বীরাজের জন্য মুসলমানের সঙ্গে ঘোর যুদ্ধে প্রাণ দিলেন। আগে সেই ধর্ম্মাত্মা মহাবীর সমরসিংহ, তাঁর ষোল বছরের ছেলে কল্যাণ আর সেই তেরো হাজার রাজপুতের বুকের রক্তে কাগার নদীর বালুচর রাঙা হয়ে গেল, তবে পৃথ্বীরাজ বন্দী হলেন, তবে দিল্লীর হিন্দুসিংহাসন মুসলমান বাদশা শাহাবুদ্দিনের হস্তগত হল। এখন সে শাহাবুদ্দিন কোথায়, কোথায় বা সে দিল্লীর রাজতক্ত! কিন্তু যে ধর্ম্মাত্মা, বন্ধুর জন্যে নিজের প্রাণকে তুচ্ছ কল্লেন, সেই মহাবীর সমরসিংহের নাম, রাজপুত-কবিদের সুন্দর গানের মধ্যে, চিরকাল অমর হয়ে আছে;—এখনও রাজপুতনার সেই গান গেয়ে কত লোক রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে!
সমরসিংহের পর থেকে প্রায় একশ বৎসর কেটে গেছে। চিতোরের রাজসিংহাসনে তখন রাণা লক্ষ্মণসিংহ আর দিল্লীতে পাঠান বাদশা আল্লাউদ্দীন। সেই সময় একদিন রাণা লক্ষ্মণসিংহের কাকা ভীমসিং, সিংহলদ্বীপের রাজকুমারী পদ্মিনীকে বিয়ে করে সমুদ্রপার থেকে, চিতোরে ফিরে এলেন। পদ্মের সৌরভ যেমন সমস্ত সরোবর প্রফুল্ল কোরে ক্রমে দিগ্দিগন্তে ছড়িয়ে যায়, তেমনি কমলালয়া লক্ষ্মীর সমান সুন্দরী সেই পদ্মমুখী রাজপুতরাণী পদ্মিনীর রূপের মহিমা, গুণের গরিমা দিনে দিনে সমস্ত ভারতবর্ষ আমোদ কল্লে! কি দীন দুঃখীর সামান্য কুটীর, কি রাজাধিরাজের রাজপ্রাসাদ,—এমন সুন্দরী, এ হেন গুণবতী কোথাও নেই!
এই আশ্চর্য্য সুন্দরী পদ্মিনীকে নিয়ে ভীমসিংহ যখন চিতোরের একধারে, সাদাপাথরে বাঁধানো সরোবরের মধ্যস্থলে, রাজ-অন্তঃপুরে, শীতল কোঠায় সুখে দিন কাটাচ্ছিলেন, সেই সময়ে একদিন, দিল্লীতে, তখনকার পাঠান-বাদশা আল্লাউদ্দীন, খাসমহলের ছাদে গজদন্তের খাটিয়ায় বসে বসন্তের হাওয়া খাচ্ছিলেন। আকাশে চাঁদ উঠেছিল, পাশে সরবতের পেয়ালা হাতে পিয়ারী বেগম বসেছিলেন, পায়ের কাছে বেগমের এক নতুন বাঁদী সারঙ্গীর সুরে গজল গাইছিল। বাদশা হঠাৎ বলে উঠলেন,—“কি ছাই, আরবী গজল! হিন্দুস্থানের গান গাও!” তখন পিয়ারী বেগমের নতুন বাঁদী নতুন করে সারঙ্গী বেঁধে নতুন সুরে গাইতে লাগল,—“হিন্দুস্থানে এক ফুল ফুটেছিল—তার দোসর নেই, তার জুড়ি নেই। সে কি ফুল? সে কি ফুল? আহা সে যে পদ্ম ফল, সে যে পদ্ম ফুল!— চারিদিকে নীল জল, মাঝে সেই পদ্ম ফুল! দেবতারা সে ফুলের দিকে চেয়েছিল, মানুষে সে ফুলের দিকে চেয়েছিল, চারিদিকে অপার সিন্ধু তরঙ্গভঙ্গে গর্জ্জন করছিল! কার সাধ্য সে সমুদ্র পার হয়, কার সাধ্য সে রাজার বাগিচায় সে ফুল তোলে; সে রাজার ভয়ে দেবতারাও কম্পমান!” আল্লাউদ্দীন বলে উঠলেন,—“আমি হিন্দুস্থানের বাদশা, আমি কোনো রাজারও তোয়াক্কা রাখি না, কোনো দেবতাকেও ভয় করি না। পিয়ারী! আমি কালই সেই পদ্ম ফুল তুলতে যাব!” বাঁদী আবার গাইতে লাগল, —“কে সে ভাগ্যবান সিন্ধু হল পার? কে সে গুণবান তুলিল সে ফুল?—মেবারের রাজপুতবীরের সন্তান! রাণা ভীমসিং! নির্ভয় সুন্দর!”
আলাউদ্দীন কিংখাবের মছলন্দে সোজা হয়ে বসলেন, আনন্দের সুরে গান শেষ হল,—“আজ চিতোরের অন্তঃপুরে সে ফুল বিরাজে, কবি যার নাম গায় ভারতে, তার দোসর কোথা? জগতে তার জুড়ি কই? ধন্য রাণা ভীমসিং! জয় রাজরাণী, চিতোরের রাজউদ্যানে প্রফুল্ল পদ্মিনী!” আল্লাউদ্দীনের কানে অনেকক্ষণ ধরে বাজতে লাগল— “চিতোরে রাজউদ্যানে প্রফুল্ল পদ্মিনী!” তিনি আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে বলে উঠলেন,—“বাঁদী, তুই কি স্বচক্ষে পদ্মিনীকে দেখেছিস্? সে কি সত্যই সুন্দরী?” বাঁদী উত্তর কল্লে,—“জাঁহাপনা! দিল্লী আসবার আগে আমি চিতোরে নাচগান করে জীবন কাটাতেম; পদ্মিনীর বিয়ের রাত্রে আমি রাণীর মহলে নেচে এসেচি।”
আল্লাউদ্দীন গালে হাত দিয়ে ভাবতে লাগলেন; কিছুক্ষণ পরে বলে উঠলেন,— “পিয়ারী, আমার ইচ্ছে করে পদ্মিনীকে এই খাসমহলে নিয়ে আসি।” পিয়ারী বেগম বলে উঠলেন,— “শাহেনশা, আমার সাধ যায় আকাশের চাঁদটাকে সোনার কৌটায় পুরে রাখি।” কথাটা আল্লাউদ্দীনের ভালো লাগল না। দিল্লীর বাদশা, যাঁর মুঠোর ভিতর অর্দ্ধেক ভারতবর্ষ, তিনি কি একজন রাজপুত-রাণীকে ধরে আনতে পারেন না? শাহেনশা মুখ গম্ভীর করে উঠে গেলেন,—মনে মনে বলে গেলেন,—“থাকো পিয়ারী, যদি পদ্মিনীকে আনতে পারি তবে তোমাকে তার বাঁদী হয়ে থাকতে হবে!”
তার পর দিন, লক্ষ লক্ষ সৈন্য নিয়ে আল্লাউদ্দীন চিতোরের মুখে চলে গেলেন। পাঠান-সৈন্য যে দিক দিয়ে গেল, সে দিকে, পথের দুই ধারে, ধানের ক্ষেত, লোকের বসতি ছারখার করে যেতে লাগল।
তখন বসন্তকাল। সমস্ত চিতোর জুড়ে দিকে দিকে আনন্দের রোল উঠেছে,—“হোরি হ্যায়! হোরি হ্যায়!” ঘরে ঘরে আবিরের ছড়াছড়ি, হাসির হো-হো, আর বাসন্তী রঙের বাহার! সেই ফাগুনে, ভরা আনন্দ আর হাসিখেলার মাঝখানে, একদিন চিতোরে খবর পৌঁছল, আল্লাউদ্দীন আসছেন;—ঝড়ের মুখে প্রদীপের মত চিতোরের সমস্ত আনন্দ এক—নিমিষে নিবে গেল! তখন কোথায় রইল রাণার রাজসভায় ধ্রুপদ খেয়ালে হোরি—বর্ণনা, কোথা রইল রাণীদের অন্দরে ‘ফাগুনমে হোরি মচাও’ বলে মিষ্টি সুরে মধুর গান, কোথায় লালে-লাল-রাস্তায় দলে দলে হাসি তামাসা আর কোথায় বা গোলাপজীর মন্দির থেকে রাগ বসন্তে নওবতের সুর! আবিরে গোলাপে লালে-লাল চিতোরের ঘরে ঘরে অস্ত্রশস্ত্রের ঝন্ঝনার সঙ্গে আর এক ভয়ঙ্কর খেলার আয়োজন চলতে লাগল;—সে খেলা লোকের প্রাণ নিয়ে খেলা,—তাতে, বুকের রক্ত, ছুরির ঘা, কামানের গর্জ্জন আর যুদ্ধের খোলা মাঠ! শেষে একদিন পাঠান বাদশার কালো নিশান শকুনির মত মেবারের মরুভূমির উপরে দেখা দিলে। ভীমসিং হুকুম দিলেন, কেল্লার দরজা বন্ধ কর। ঝন্–ঝন্ শব্দে চিতোরের সাতটা ফটক তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
আল্লাউদ্দীন ভেবেছিলেন,—যাব আর পদ্মিনীকে কেড়ে আনব; কিন্তু এসে দেখলেন, বুকের পাঁজর প্রাণের চারিদিক যেমন ঢেকে রাখে, তেমনি রাজপুতের তলোয়ার পদ্মিনীর চারিদিকে দিবারাত্রি ঘিরে রয়েছে। সমুদ্র পার হওয়া সহজ, কিন্তু এই সাতটা ফটক পার হয়ে চিতোরের মাঝখান থেকে পদ্মিনীকে কেড়ে আনা অসম্ভব। পাঠান-বাদশা পাহাড়ের নীচে তাঁবু গাড়বার হুকুম দিলেন।
সেই দিন গভীর রাত্রে যুদ্ধের সমস্ত আয়োজন শেষ করে রাণা ভীমসিং পদ্মিনীর কাছে এসে বল্লেন, —“পদ্মিনী, তুমি কি সমুদ্র দেখতে চাও? যেমন অনন্ত নীল সমুদ্রের ধারে তোমাদের রাজ-প্রাসাদ ছিল তেমনি সমুদ্র?” পদ্মিনী বল্লেন,—“তামাসা রাখো, তোমাদের এ মরুভূমির দেশে আবার সমুদ্র পেলে কোথা থেকে?” ভীমসিংহ, পদ্মিনীর হাত ধরে কেল্লার ছাদে উঠলেন। আকাশ অন্ধকার;—চন্দ্র নাই, তারা নাই। পদ্মিনী দেখলেন, সেই অন্ধকার আকাশের নীচে আর একখানা কালো অন্ধকার কেল্লার সম্মুখ থেকে মরুভূমির ওপার পর্যন্ত জুড়ে রয়েছে। পদ্মিনী বলে উঠলেন,—“রাণা, এখানে সমুদ্র ছিল আমি তো জানি না; মাগো, সাদা সাদা ঢেউ উঠ্ছে দেখ!” ভীমসিং হেসে বল্লেন,—“পদ্মিনী, এ যে-সে সমুদ্র নয়;—ও পাঠান-বাদশার চতুরঙ্গ সৈন্যবল। ঐ দেখ, তরঙ্গের পর তরঙ্গের মত শিবিরশ্রেণী, জলের কল্লোলের মত, ঐ শোনো, সৈন্যের কোলাহল! আজ আমার মনে হচ্ছে, সেই নীল সমুদ্র যার বুকের মাঝ থেকে আমি একটি সোনার পদ্মফুলের মত তোমায় ছিঁড়ে এনেছি, সেই সমুদ্র যেন আজ এই চতুরঙ্গিনী মূর্ত্তি ধরে তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে এসেছে। কেমন করে যে এই বিপদসাগর পার হব ভাবছি।” ভীমসিং আরও কি বলতে যাচ্ছিলেন হঠাৎ একটা কাল-পেঁচা চীৎকার করে মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল; তার প্রকাণ্ড দুখানা কালো ডানার ঠাণ্ডা বাতাস, সে অন্ধকার ছাদে, রাণা-রাণীর মুখের উপর, কার যেন দুখানা ঠাণ্ডা হাতের মত, বুলিয়ে গেল। পদ্মিনী চমকে উঠে রাণার হাত ধরে নেবে গেলেন। সমস্ত রাত ধরে তাঁর মন বলতে লাগল,—একি অলক্ষণ! একি অলক্ষণ!
তার পর দিন পূবের আকাশে ভোরের আলো সবেমাত্র দেখা দিয়েছে এমন সময় একজন রাজপুত সওয়ার পাঠানশিবিরে উপস্থিত হল। বাদশা আল্লাউদ্দীন তখন রূপোর কুর্সিতে বসে তশবী-দানা জপ করছিলেন; খবর হল,—“রাণা লক্ষ্মণসিংহের দূত হাজির।” বাদশা হুকুম দিলেন,—“হাজির হোনেকো কহো।” রাণার দূত তিনবার কুর্ণিশ করে বাদশাহের সামনে দাঁড়িয়ে বল্লে,—“রাণা জানতে চান বাদশাহের সঙ্গে তাঁর কিসের বিবাদ যে, আজ এত সৈন্য নিয়ে তিনি চিতোরে উপস্থিত হলেন?” আলাউদ্দীন উত্তর করলেন,—“রাণার সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নেই, আমি রাণার খুড়ো ভীমসিংহের কাছে পদ্মিনীকে ভিক্ষা চাইতে এসেছি, তাঁকে পেলেই দেশে ফিরব।” দূত উত্তর কল্লে,—“শাহেনশা, আপনি রাজপুত জাতকে চেনেন না সেই জন্য এমন কথা বলছেন। রাণার কথা ছেড়ে দিন, আমরা দুঃখী রাজপুত আমরাও প্রাণ দিতে পারি, তবু মান খোয়াতে পারি না। আপনি রাণীর আশা পরিত্যাগ করুন, বরং শাহেনশার যদি অন্য কিছু নেবার ইচ্ছে থাকে তবে—”। আল্লাউদ্দীন দূতের কথায় বাধা দিয়ে বল্লেন,—“হিন্দুস্থানের বাদশার এক কথা,—হয় পদ্মিনী, নয় যুদ্ধ।” রাণার দূত পিছু হটে তিনবার কুর্ণিশ করে বিদায় হল।
সেইদিন সন্ধ্যাবেলা চিতোরের রাজসভায় সমস্ত রাজপুত-সর্দ্দার একত্র হলেন। কি করে চিতোরকে মুসলমানের হাত থেকে রক্ষা করা যায়?—রাজস্থানের রাজ-মুকুটের সমান চিতোর; রাজপুতের প্রাণের চেয়ে প্রিয় চিতোর! মুসলমানেরা প্রায় ভারতবর্ষ গ্রাস করেছে, তাদের সঙ্গে যুদ্ধে কত বড় বড় হিন্দু-রাজার রাজত্ব ছারখার হয়ে একেবারে লোপ পেয়ে গেছে, কিন্তু চিতোরের সিংহাসন সেই পুরাকালের মত এখনও অটল, এখনও স্বাধীন আছে! কি করে আজ এই ঘোর বিপদে চিতোরকে উদ্ধার করা যায়। অনেকক্ষণ ধরে অনেক পরামর্শ, তর্ক বিতর্ক চল্লো। শেষে রাণা ভীমসিংহ উঠে বল্লেন,—“পদ্মিনীর জন্যে যখন চিতোরের এই সর্ব্বনাশ উপস্থিত, তখন না হয় পদ্মিনীকেই পাঠানের হাতে দেওয়া যাক, আমার তাতে কোনো দুঃখ নেই; চিতোর আগে না পদ্মিনী আগে!” কথাটা বলে ভীমসিংহ একবার রাজসভার একপারে যেখানে শ্বেতপাথরের জালির পিছনে চিতোরের রাণীরা বসেছিলেন, সেই দিকে চেয়ে দেখলেন; তারপর সিংহাসনের দিকে ফিরে বল্লেন,—“মহারাণা কি বলেন?” লক্ষ্মণসিংহ বল্লেন,—“যদি সমস্ত সর্দ্দারের তাই মত হয় তবে তাই করা কর্ত্তব্য।” তখন সেই রাজভক্ত রাজপুত-সর্দ্দারের প্রধান, রাজসভায় উঠে দাঁড়িয়ে বল্লেন,—“রাণার বিপদে আমাদের বিপদ, রাণার অপমানে আমাদের অপমান! পদ্মিনী শুধু ভীমসিংহের নয় তিনি আমাদের রাণী বটে। কেমন করে আমরা তাঁকে পাঠানের বেগম হতে পাঠিয়ে দেব? পৃথিবীসুদ্ধ লোকে বলবে, রাজস্থানে এমন পুরুষ ছিল না যে, তার রাণীর হয়ে লড়ে। মহারাণা, আমরা প্রস্তুত, হুকুম হলেই যুদ্ধে যাই!” মহারাণা হুকুম দিলেন— “আপাততঃ যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, সাবধানে কেল্লার দরজা বন্ধ রাখ, আল্লাউদ্দীন যতদিন পারে চিতোর ঘিরে বসে থাকুক!” সভাস্থলে ধন্য ধন্য পড়ে গেল, চারিদিকে চিতোরের সমস্ত সামন্তসর্দ্দার তলোয়ার খুলে দাঁড়ালেন, সমস্ত রাজসভা এক সঙ্গে বলে উঠল,—“জয় মহারাণার জয়, জয় ভীমসিংহের জয়, জয় পদ্মিনীর জয়।” রাজসভা ভঙ্গ হল। সেই সময় রাজসভার এক পারে, সেই শ্বেতপাথরের জালির আড়াল থেকে, সোনার পদ্মফুল-লেখা একখানি লাল রুমাল সেই রাজভক্ত সর্দ্দারদের মাঝে এসে পড়ল। সর্দ্দারেরা পদ্মিনীর হাতের সেই লাল রুমাল বল্লমের আগায় বেঁধে ‘রাণীর জয়!’ বলে রাজসভা থেকে বিদায় হলেন।
তারপর, দিন কাটতে লাগল। আল্লাউদ্দীন লক্ষ লক্ষ সৈন্য নিয়ে চিতোরের কেল্লা ঘিরে বসে রইলেন। বাদশার আশা ছিল যে, কেল্লার ভিতর বন্ধ থেকে রাজপুতদের সমস্ত খাবার ফুরিয়ে যাবে, তখন তারা প্রাণের দায়ে পদ্মিনীকে পাঠিয়ে দিয়ে সন্ধি করবে; কিন্তু দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, ক্রমে সম্বৎসর কেটে গেল, তবু সন্ধির নামগন্ধ নেই! বর্ষা, শীত কেটে গিয়ে গ্রীষ্মকাল এসে পড়েছে, পাঠান-সৈন্যেরা দিল্লীতে ফেরবার জন্যে অস্থির হতে লাগল, এমন গরমের দিনে দিল্লীতে চাঁদনী-চৌকে কত মজা! সেখানে কাফিখানায় কত আমোদ চলেছে; আর তারা কিনা, কি বর্ষা, কি হিম, এই হিন্দুর মুল্লুকে এসে খোলা মাঠে পড়ে রয়েছে?—এখানে না পাওয়া যায় ভালো পান-তামাক, না আছে ফুলের বাগিচা, না আছে একটা লোকের মিষ্টি গলা—যার গান শুনলেও ভুলে থাকা যায়। এখানকার লোকগুলাও যেমন কাঠখোট্টা, তাদের গানগুলোও তেমনি বেসুরো, পানগুলোও তেমনি পুরু, তামাকটাও তেমনি কড়ুয়া। এ ইিঁদুর মুল্লুকে আর মন টেঁকে না।
আল্লাউদ্দীন দেখলেন, নিষ্কর্মা বসে থেকে তাঁর সৈন্যেরা ক্রমে বিরক্ত হয়ে উঠছে। তাঁর ইচ্ছা আরো কিছু দিন চিতোর ঘিরে বসে থাকেন; যে কোনো উপায়ে হোক্ সৈন্যদের স্থির রাখতে হবে। বাদশা তখন এক এক দিন, এক এক দল সৈন্য নিয়ে শিকার করে বেড়াতে লাগলেন। সেই সময় এক দিন শিকার-শেষে আল্লাউদ্দীন শিবিরে ফিরে আসছেন;— একদিকে সবুজ জনারের ক্ষেত সন্ধ্যার অন্ধকারে কাজলের মত নীল হয়ে এসেছে, আর-এক দিকে পাহাড়ের উপর চিতোরের কেল্লা, মেঘের মত দেখা যাচ্ছে, মাঝে সুঁড়ি পথ; সেই পথে প্রথমে শিকারী পাঠানের দল বড় বড় হরিণ ঘাড়ে গাইতে গাইতে চলেছে, তার পর বড় বড় আমীর ওমরা কেউ হাতীর পিঠে, কেউ ঘোড়ায় চড়ে, চলেছেন; সব-শেষে বাদশা আল্লাউদ্দীন;—এক হাতে ঘোড়ার লাগাম আর হাতে সোনার জিঞ্জীর-বাঁধা প্রকাণ্ড একটা শিক্রে পাখী। বাদশা ভাবতে ভাবতে চলেছেন, এতদিন হয়ে গেল তবু তো চিতোর দখল হল না। সৈন্যেরা দিল্লী ফেরবার জন্য ব্যস্ত, আর কত দিন তাদের ভুলিয়ে রাখা যায়? যে পদ্মিনীর জন্য এত সৈন্য নিয়ে এত কষ্ট সয়ে বিদেশে এলেম, সে পদ্মিনীকে তো একবার চক্ষেও দেখতে পেলেম না। বাদশা একবার বাঁ হাতের উপর প্রকাণ্ড শিক্রে পাখীটার দিকে চেয়ে দেখলেন। হয়তো তাঁর মনে হচ্ছিল,—কোন রকমে দুখানা ডানা পাই, তবে এই বাজটার মত চিতোরের মাঝখান থেকে পদ্মিনীকে ছোঁ-মেরে নিয়ে আসি। হঠাৎ সন্ধ্যার অন্ধকারে দুখানি ডানার একটুখানি ঝটাপট সেই ঘুমন্ত শিক্রে পাখীর কানে পৌঁছল, সে ডানা ঝেড়ে ঘাড় ফুলিয়ে বাদশার হাতে সোজা হয়ে বসল; আল্লাউদ্দীন বুঝলেন, তাঁর শিকারী বাজ নিশ্চয়ই কোনো শিকারের সন্ধান পেয়েছে। তিনি আকাশে চেয়ে দেখলেন, মাথার উপর দিয়ে দুখানি পান্নার টুকরোর মত এক-জোড়া শুক-শারী উড়ে চলেছে। বাদশা ঘোড়া থামিয়ে বাজের পা থেকে সোনার জিঞ্জীর খুলে নিলেন;—তখন সেই প্রকাণ্ড পাখী বাদশার হাত ছেড়ে নিঃশব্দে অন্ধকার আকাশে উঠে কালো দুখানা ডানা ছড়িয়ে দিয়ে শিকারীদের মাথার উপরে একবার স্থির হয়ে দাঁড়াল, তারপর একেবারে তিন শ’ গজ আকাশের উপর থেকে, এক-টুকরো পাথরের মত, সেই দুটি শুক-শারীর মাঝে এসে পড়ল। বাদশা দেখলেন, একটি পাখী ভয়ে চীৎকার করতে করতে সন্ধ্যার আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর একটি পাখী প্রকাণ্ড সেই বাজের থাবার ভিতর ঝপট্ করছে। তিনি শিশ্-দিয়ে বাজ-পাখীকে ফিরে ডাকলেন, পোষা বাজ শিকার ছেড়ে বাদশার হাতে উড়ে এল; আর ভয়ে মৃতপ্রায় সেই সবুজ শুক ঘুরতে ঘুরতে মাটিতে পড়ল। বাদশা আনন্দে সেই তোতা-পাখী তুলে নিতে হুকুম দিয়ে শিবিরের দিকে ঘোড়া ছোটালেন; আর সেই তোতা-পাখীর জোড়া পাখীটি প্রথমে করুণ সুরে ডাকতে ডাকতে সেই শিকারীদের সঙ্গে সঙ্গে সন্ধ্যার আকাশ দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে উড়ে চল্লো; শেষে, ক্রমে ক্রমে, আস্তে আস্তে, ভয়ে ভয়ে যে ওমরাহের হাতে একটি ছোট খাঁচায় ডানা-ভাঙা তার সঙ্গী তোতা ছট্ফট্ কচ্ছিল, সেই খাঁচার উপর নির্ভয়ে এসে বস্ল। ওমরাহ আশ্চর্য্য হয়ে বলে উঠলেন,—“কি আশ্চর্য্য সাহস! তোতার বিপদ দেখে তুতী এসে আপনিই ধরা দিয়েছে।” আলাউদ্দীন তখন পদ্মিনীর কথা ভাবতে ভাবতে চলেছিলেন; হঠাৎ ওমরাহের মুখে এই কথা শুনে তাঁর মনে হল,—যদি ভীমসিংহকে ধরা যায়, তবে হয় তো সেই সঙ্গে রাণী পদ্মিনীও ধরা দিতে পারেন।
বাদশা শিবিরে এসে সমস্ত রাত্রি ভীমসিংহকে বন্দী করবার ফন্দি আঁটতে লাগলেন। দু এক দিন পরেই রাণার সঙ্গে কথাবার্ত্তা স্থির হল যে, আল্লাউদ্দীন সমস্ত পাঠান-সৈন্য নিয়ে বিনা যুদ্ধে দিল্লীতে ফিরে যাবেন, তার বদলে একা মাত্র তিনি একখানি আয়নার ভিতরে রাজপুত-রাণী পদ্মিনীকে একবার দেখতে পাবেন, আর চিতোরের কেল্লার ভিতর বাদশা যতক্ষণ একা থাকবেন ততক্ষণ তাঁর কোনো বিপদ না ঘটে সে জন্য স্বয়ং মহারাণা দায়ী রইলেন। বাদশা চিতোরে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। শিকার যে এত শীঘ্র ফাঁদে পা দেবে আল্লাউদ্দীন স্বপ্নেও ভাবেন নাই। তিনি মহা আনন্দে পাঠান ওমরাহদের নিয়ে সমস্ত পরামর্শ স্থির কল্লেন। তার পর বৈকালে গোলাপ-জলে স্নান করে, কিংখাবের জামাজোড়া, মোতীর কণ্ঠমালা, হীরেপান্নার শিরপেঁচ পরে, শাহেনশা সাদা ঘোড়ার উপর সোনার রেকাবে পা দিয়ে বসলেন;— সঙ্গে প্রায় দুশোজন পাঠান বীর;—যারা প্রাণের ভয় রাখে না, যুদ্ধই যাদের ব্যবসা! বাদশা ঘোড়ায় চড়ে একা পাহাড় ভেঙে কেল্লার দিকে উঠে গেলেন; আর সেই পাঠান সওয়ারেরা পাহাড়ের নীচে থেকে প্রথমে নিজের শিবিরে ফিরে গেল, তারপর আবার একে একে সন্ধ্যার অন্ধকারে কেল্লার কাছে ফিরে এসে পথের ধারে প্রকাণ্ড একটা আমবাগানের তলায় লুকিয়ে রইল।
সূর্য্যদেব যখন চিতোরের পশ্চিম দিকে প্রকাণ্ড একখানা মেঘের আড়ালে অস্ত গেলেন, সেই সময় পাঠান-বাদশা আল্লাউদ্দীন রাণা ভীমসিংহের হাত ধরে পদ্মিনীর মহলে শ্বেতপাথরের রাজদরবারে উপস্থিত হলেন। সেখানে আর জনমানব ছিল না,—কেবল হাজার হাজার মোমবাতির আলো, সেই শ্বেতপাথরের রাজমন্দিরে, যেন আর একটা নূতন দিনের সৃষ্টি করেছিল। রাণা ভীম সেই ঘরে সোনার মছনদে বাদশাকে বসিয়ে তাঁর হাতে এক পেয়ালা সরবৎ দিয়ে বল্লেন,—“শাহেনশা, একটু আমিল ইচ্ছা করুন।” আল্লাউদ্দীন সেই আমিলের পেয়ালা হাতে ভাবতে লাগলেন,—যদি এতে বিষ থাকে তবে তো সর্ব্বনাশ! রাজপুতের মেয়েরা, শুনেছি, শত্রুর হাতে অপমান হবার ভয়ে অনেক সময় এই রকম আমিল খেয়ে প্রাণ দিয়েছে। বাদশা পেয়ালা—হাতে ইতস্তত করতে লাগলেন। রাণা ভীম আল্লাউদ্দীনের মনের ভাব বুঝে একটু হেসে বল্লেন,—“শাহেনশা, বিষের ভয় করবেন না। মহারাণা স্বয়ং যখন আপনার কোনো বিপদ না ঘটে সে জন্য দায়ী, তখন আজ যদি আপনি সমস্ত চিতোর একা ঘুরে আসেন, তবু একজনও রাজপুত আপনার গায়ে হাত তুলতে সাহস পাবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। অতিথিকে আমরা দেবতার মত মনে করি।” আল্লাউদ্দীন তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন,—“রাণা, আমি সে কথা ভাবছিনে। আমি ভাবছিলেম, আজ যেমন নির্ভয়ে আমি তোমার উপর বিশ্বাস করছি, তেমনি তুমিও আমাকে বিশ্বাস করতে পার কি না?” আল্লাউদ্দীন মুখে এই কথা বল্লেন বটে, কিন্তু সেই আমিলের পেয়ালায় চুমুক দিতে তাঁর প্রাণ কাঁপতে লাগল। তিনি অল্পে অল্পে সমস্ত আমিলটুকু নিঃশেষ করে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। শেষে যখন দেখলেন বিষের জ্বালার বদলে তাঁর শরীর, মন বরং আনন্দে প্রফুল্ল হয়ে উঠল, তখন বাদশা ভীমসিংহের দিকে ফিরে বল্লেন,— “তবে আর বিলম্ব কেন? এখন একবার সেই আশ্চর্য্য সুন্দরী পদ্মিনী-রাণীকে দেখতে পেলেই খুসী হয়ে বিদায় হই!”
তখন রাণা ভীম আলিপো-দেশের প্রকাণ্ড একখানা আয়নার সম্মুখ থেকে একটা পর্দ্দা সরিয়ে নিলেন;—কাকচক্ষু জলের মত নির্ম্মল সেই আয়নার ভিতর পদ্মিনীর রূপের ছটা, হাজার হাজার বাতির আলো যেন আলোময় করে, প্রকাশ হল! বাদশা দেখতে লাগলেন;— সে কি কালো চোখ! সে কি সুটানা ভুরু! পদ্মের মৃণালের মত কেমন কোমল দুখানি হাত! বাঁকা মল-পরা কি সুন্দর ছোট দুখানি রাঙা পা! ধানী-রঙের পেশোয়াজে মুক্তোর ফুল, গোলাপী ওড়নায় সোনার পাড়, পান্নার চুড়ি, নীলার আংটি, হীরের চিক্! বাদশা আশ্চর্য্য হয়ে ভাবলেন,—এ কি মানুষ না পরী? আল্লাউদ্দীন আর স্থির থাকতে পাল্লেন না; তিনি মছনদ্ ছেড়ে সেই প্রকাণ্ড আয়নার ভিতর ছায়া-পদ্মিনীকে ধরবার জন্য দুইহাত বাড়িয়ে ছুটে চল্লেন, গ্রহণের রাত্রে রাহু যেমন চাঁদকে গ্রাস করতে যায়! ভীমসিংহ বলে উঠলেন,—“শাহেনশা, পদ্মিনীকে স্পর্শ করবেন না।” রাণার মনে হল, রাজদরবারে একদিকে বসে সত্যই তাঁর পুণ্যবতী রাণী পদ্মিনী যেন পাঠানের হাতে অপমান হবার ভয়ে কাঁপছেন। রাগে রাণার দুই চক্ষু রক্তবর্ণ হয়ে উঠল, তিনি সেই ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উঠে সোনার একটা পেয়ালা সেই আয়নাখানার ঠিক মাঝখানে সজোরে ছুঁড়ে মারলেন;—ঝন্-ঝন্ শব্দে সাত হাত উঁচু চমৎকার সেই আয়না চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ল। আল্লাউদ্দীন চমকে উঠে তিন পা পিছিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি মনে মনে বুঝলেন, পাগলের মত রাণীর দিকে ছুটে যাওয়াটা বড়ই অভদ্রতা হয়েছে, এজন্য রাণার কাছে ক্ষমা চাওয়া দরকার। বাদশা ভীমসিংহের দিকে ফিরে বল্লেন,—“রাণা, আমার অন্যায় হয়েছে, আমার মহলে এসে যদি কেউ এমন অভদ্রতা করত, তাহলে হয়তো আমি তার মাথা কেটে ফেল্তে হুকুম দিতুম,—আমায় ক্ষমা করুন।” তারপর, অনেক তোষামোদ, অনেক অনুনয়বিনয়ে রাণাকে সন্তুষ্ট করে গভীর রাত্রে আল্লাউদ্দীন ভীমসিংহের কাছে বিদায় চাইলেন। পেয়ালার পর পেয়ালা আমিল খেয়ে একেই রাণার প্রাণ খুলে গিয়েছিল; তার উপর, দিল্লীর বাদশা তাঁর কাছে যখন ক্ষমা চাইলেন, তখন তাঁর মন একেবারে গলে গেল;— রাণা আদর করে নূতন বন্ধু দিল্লীর বাদশাকে কেল্লার বাইরে পৌঁছে দিতে চল্লেন।
অমাবস্যার রাত্রি, আকাশে শুধু তারার আলো, পৃথিবীতে কালো অন্ধকার। ঘরে ঘরে দরজা বন্ধ,—সমস্ত দিন পরিশ্রমের পর নগরের লোক ঘুমিয়ে আছে; চিতোরের রাজপথে জনমানব নেই। আলাউদ্দীন সেই জনশূন্য রাজপথ দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে চলেছেন, সঙ্গে রাণা ভীম আর কুড়ি জন রাজপুত সেপাই। আজ রাণার মনে বড় আনন্দ;—চিতোরের প্রধান শত্রু আল্লাউদ্দীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হল, আর কখনো চিতোরকে পাঠানের অত্যাচার সহ্য করতে হবে না। রাণা যখন ভাবলেন, কাল সকালে পাঠান-সৈন্য চিতোর ছেড়ে চলে যাবে, যখন ভাবলেন, চিতোরের সমস্ত প্রজা, কাল থেকে নির্ভয়ে রাণা-রাণীর জয়-জয়কার দিয়ে, যে যার কাজে লাগবে, তখন তাঁর মন আনন্দে নৃত্য করতে লাগল। তিনি মহা উল্লাসে বাদশার পাশে পাশে ঘোড়ায় চড়ে কেল্লার ফটক পার হলেন। তখন রাত্রি আরো অন্ধকার হয়েছে; পাহাড়ের গায়ে বড় বড় নিম-গাছ, কালো কালো দৈত্যের মত, রাস্তার দুই ধারে সারি-বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। আর কোথাও কোনো শব্দ নেই, কেবল কেল্লার উপর থেকে এক একবার প্রহরীদের হৈ-হৈ আর পাথরের রাস্তায় সেই বাইশটা ঘোড়ার খুরের খটাখট।
আল্লাউদ্দীন ভীমসিংকে নিয়ে কথায় কথায় ক্রমে পাহাড়ের নীচে এলেন। সেখানে একদিকে জনারের ক্ষেত, আর-একদিকে আমবাগান, মাঝে মেঠো রাস্তা। এই রাস্তার দুই ধারে প্রায় দুশো পাঠান আল্লাউদ্দীনের হুকুম মত লুকিয়ে ছিল। ভীমসিংহ যেমন এইখানে এলেন, অমনি হঠাৎ চারিদিক থেকে পাঠান-সৈন্য তাঁকে ঘিরে ফেল্লে; তারপর সেই অন্ধকার রাত্রে শত শত শত্রুর মাঝে কুড়িজনমাত্র রাজপুত তাদের রাণাকে উদ্ধার করবার জন্য প্রাণপণে যুঝ্তে লাগল। কিন্তু বৃথা! বাজপাখী যেমন ছোঁ-মেরে শিকার নিয়ে যায়, তেমনি পাঠান আল্লাউদ্দীন, রাজপুতদের মাঝখান থেকে, রাণা ভীমকে বন্দী করে নিয়ে গেলেন। কুড়িজনের মধ্যে পাঁচজনমাত্র রাজপুত চিতোরে ফিরল! প্রতিপদের সকালবেলায় সমস্ত চিতোরে রাষ্ট্র হল,—ভীমসিংহ বন্দী হয়েছেন। পদ্মিনীকে না দিলে তাঁর মুক্তি নেই।
আল্লাউদ্দীন যখন শিবিরে পৌঁছিলেন, তখন রাত্রি আড়াই প্রহর। তিনি ভীমসিংহকে সাবধানে বন্ধ রাখতে হুকুম দিয়ে নিজের কানাতে বিশ্রাম করতে গেলেন। আজ তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হল যে, রাণা যখন ধরা পড়েছেন, পদ্মিনী আর কোথায় যায়! হিন্দুর তখন মেয়ে স্বামীর জন্য প্রাণ দিতে পারে, বাদশার বেগম হতে কি রাজি হবে না? পদ্মিনীকে না পেলে রাণাকে কিছুতেই ছাড়া হবে না! আলাউদ্দীন মনে মনে এই প্রতিজ্ঞা করে সোনার খাটিয়ায় দুধের ফেনার মত ধপ্ধপে বিছানায় শুয়ে হিন্দুরাণী পদ্মিনীর কথা ভাবতে ভাবতে শেষরাত্রে ঘুমিয়ে পড়লেন।
সকাল হলে বাদশা মনে ভাবলেন, এইবার পদ্মিনী আসছেন। সকাল গিয়ে দুপুর কেটে সন্ধ্যা হল, পদ্মিনী এলেন না। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত চলে গেল, তবু পদ্মিনীর দেখা নেই। বাদশা অস্থির হয়ে উঠলেন! তাঁর মনে হতে লাগল,― এ ভীমসিং কি আসল ভীমসিংহ নয়? আমি কি ভুল করে সামান্য কোনো সর্দ্দারকে বন্দী করে এনেছি? আল্লাউদ্দীন বন্দী রাণাকে হুজুরে হাজির করতে হুকুম দিলেন। লোহার শিকলে বাঁধা রাণা ভীম; বাঁধা সিংহের মত, বাদশার দরবারে উপস্থিত হলেন। শাহেনশা জিজ্ঞাসা কল্লেন, —“তুমিই কি পদ্মিনীর ভীমসিংহ?” রাণা উত্তর কল্লেন,—“পাঠান! এতে তোমার সন্দেহ হচ্চে কেন?” আল্লাউদ্দীন বল্লেন,—“যদি তুমি সত্যই ভীমসিংহ, তবে তোমাকে উদ্ধার করবার জন্য রাজপুতদের কোনোই চেষ্টা দেখছি না যে?” রাণা বল্লেন,—“যে মূর্খ নিজের বুদ্ধির দোষে মিথ্যাবাদী পাঠানের হাতে বন্দী হয়েছে, তার সঙ্গে চিতোরের মহারাণা, বোধ হয়, আর কোনো সম্বন্ধ রাখতে চান না!” কথাটা শুনে বাদশার মনে খটকা লাগল,—যদি সত্যই ভীমসিংহকে পাঠানের হাতে ছেড়ে দিয়ে মহারাণা নিশ্চিন্ত থাকেন! আল্লাউদ্দীন মহা ভাবিত হয়ে দরবার ছেড়ে উঠে গেলেন।
সেই দিন শেষরাত্রে চিতোরের উপরে কেল্লার খোলা ছাদে পদ্মিনী গালে হাত দিয়ে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন। নীল পদ্মের মত তাঁর দুটি সুন্দর চোখ, পাঠান-শিবিরের দিকে—যেখানে ভীমসিং বন্দী ছিলেন সেই দিকে চেয়ে ছিল। আকাশ তখনও পরিষ্কার হয় নি, পূর্ব্বদিকে সূর্য্যের আলো সোনার তারের মত দেখা দিয়েছে মাত্র, এমন সময় দুজন রাজপুত-সর্দ্দার পদ্মিনীর পায়ে এসে প্রণাম কল্লেন। একজনের নাম গোরা, আর-একজনের নাম বাদল।গোরার বয়স পঞ্চাশের উপর, আর তার বড় ভায়ের ছেলে বাদলের বয়স বছর বারো। গোরা, বাদল দুইজনেই পদ্মিনীর বাপের বাড়ির লোক। রাজকুমারী পদ্মিনী যখন ভীমসিংহের রাণী হয়ে সিংহল ছেড়ে চলে আসেন, তখন তাঁর সঙ্গে এই গোরা এক-হাতে তলোয়ার, আর–হাতে মা-বাপ-হারা কচি বাদলকে নিয়ে দেশ ছেড়ে চিতোরে এসেছিলেন। পদ্মিনী জিজ্ঞাসা কল্লেন,—“মহারাণা কি আমার কথা-মত কাজ করতে রাজি হয়েছেন?” গোরা বল্লেন,—“তাঁরি হুকুমে রাণীজিকে পাঠান-শিবিরে পাঠাবার বন্দোবস্ত করার জন্য এখনি বাদশার সঙ্গে দেখা করতে চলেছি।” পদ্মিনী একটু হেসে বল্লেন,—“যাও, বাদশাকে বোলো, আমার জন্য দিল্লীতে একটা নূতন মহল বানিয়ে রাখেন।”
গোরা, বাদল বিদায় নিলেন। দেখতে দেখতে সমস্ত পৃথিবী প্রকাশ করে সূর্য্যদেব উদয় হলেন। পদ্মিনী দেখলেন, আল্লাউদ্দীনের লাল রেশমের প্রকাণ্ড শিবির সকালবেলার সূর্য্যের আলোয় ক্রমে ক্রমে রক্তময় হয়ে উঠল! তিনি সেই বাদশাহের কানাতের দিকে চেয়ে চেয়ে বলে উঠলেন,—“ধূর্ত্ত পাঠান, তোতে আমাতে আজ যুদ্ধ আরম্ভ হল। দেখি, কার কতদূর ক্ষমতা!”
সেদিন শুক্রবার, মুসলমানদের জুম্মা। আল্লাউদ্দীন ফজরের নামাজ শেষ করে দরবারে বসেছেন, এমন সময় মহারাণার চিঠি নিয়ে গোরা, বাদল উপস্থিত হলেন। বাদশা মহা আনন্দে মহারাণার মোহর-করা চিঠি হাতে নিয়ে পড়তে লাগলেন। তাতে লেখা রয়েছে,—“পদ্মিনীকে বাদশার হাতে দেওয়াই স্থির হল, তার বদলে রাণা ভীমসিংহের মুক্তি চাই! আরও, রাজরাণী পদ্মিনী সামান্য স্ত্রীলোকের মত দিল্লীতে যেতে পারেন না, তাঁর প্রিয় সখীরাও যাতে পদ্মিনীর সঙ্গে থেকে চিরদিন তাঁর সেবা করতে পারেন, বাদশাহ যেন সে বন্দোবস্ত করেন; তাছাড়া চিতোরের রাণী পদ্মিনীকে শাহেন্শার শিবিরে পৌঁছে দেবার জন্য যে সব বড় বড় ঘরের রাজপুতনী সঙ্গে যাবেন, তাঁদের যাতে কোনো অসম্মান না হয়, সেজন্য বাদশা তাঁর সমস্ত সৈন্য কেল্লার সামনে থেকে কিছু দূরে সরিয়ে রাখবেন। শেষে, মহারাণার এই ইচ্ছে যে, এর পর থেকে আল্লাউদ্দীন আর যেন তাঁর সঙ্গে শত্রুতা না করেন।” চিঠিখানা পড়ে বাদশার মন আনন্দে নৃত্য করতে লাগল;—তিনি হাসিমুখে গোরা ও বাদলের দিকে ফিরে বল্লেন,—“বেশ কথা! আমি আজ রাত্রের মধ্যেই সমস্ত ফৌজ কেল্লার সামনে থেকে উঠিয়ে নেব, রাণীর আসবার কোনোই বাধা হবে না। তোমরা মহারাণাকে জানাওগে তাঁর সকল কথাতেই আমি রাজি হলেম।”
গোরা, বাদল বিদায় হলেন। বাদশা, কেল্লার সামনে থেকে সমস্ত সৈন্য উঠিয়ে নিতে হুকুম দিলেন। একদিনের মধ্যে এত সৈন্য অন্য জায়গায় উঠিয়ে নেওয়া সহজ নয়! বাদশা বল্লেন,—“তাম্বুকানাত, গোলাগুলি, অস্ত্রশস্ত্র, আসবাবপত্র যেখানকার সেইখানেই থাক, কেবল সেপাইরা নিজের ঘোড়া নিয়ে একদিনের মত অন্য কোথাও আশ্রয় নিক্।” তাতেও প্রায় সমস্ত রাত কেটে গেল!
পরদিন, সূর্য্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে চিতোরের প্রধান ফটক রামপোলের উপর কড়কড়-শব্দে নাকড়া বাজতে লাগল। বাদশা দেখলেন, চিতোরের সাতটা ফটক একে একে পার হয়ে, চার চার বেহারার কাঁধে, প্রায় সাতশ’ ডুলি তাঁর শিবিরের দিকে আসছে;—মাঝে রাণী পদ্মিনীর চিনাপোত-মোড়া সোনার চতুর্দ্দোল, তার এক পাশে পঞ্চাশ বৎসরের সর্দ্দার গোরা, আর এক পাশে বারো বৎসরের বালক বাদল,—দুজনেই ঘোড়ায় চড়ে। বাদশা, পদ্মিনী আর তাঁর সহচরীদের থাকবার জন্য, প্রায় আধক্রোশ জুড়ে কানাত ফেলেছিলেন। একে একে যখন সেই সাতশ’ পাল্কি কানাতের ভিতর পৌঁছিল, তখন গোরা, বাদশার হুজুরে খবর জানালেন,—“শাহেনশা, রাণীজি উপস্থিত; এখন তিনি একবার ভীমসিংহের সঙ্গে দেখা করতে চান, বাদশাহের বেগম হলে আর তো দুজনে দেখা হবে না।” বাদশা বল্লেন,—“পদ্মিনী যখন রাণাকে দেখতে চেয়েছেন, তখন আর কথা কি? আমি আধ-ঘণ্টা সময় দিলেম, তার বেশি রাণা যেন পদ্মিনীর কাছে না থাকেন।” গোরা তথাস্তু বলে বিদায় হলেন।
আল্লাউদ্দীন একলা বসে দেখতে লাগলেন— এক দুই করে প্রায় সাতশ’ পাল্কি কানাতের ভিতর থেকে বেরিয়ে চিতোরের মুখে চলে গেল, সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে বারো বৎসরের বাদল। বাদশা একজন ওমরাহকে জিজ্ঞাসা কল্লেন,—“এসব, পাল্কিতে কারা যায়?” শুনলেন, চিতোর থেকে যে সকল বড়-ঘরের রাজপুতনী রাণীকে বিদায় দিতে এসেছিলেন, তাঁরা ফিরে গেলেন। বাদশা জিজ্ঞাসা কল্লেন,—“ভীমসিং কোথায়?” উত্তর হল—“অন্দরে আছেন।”
আল্লাউদ্দীন শিবিরের এক কোণে বালির ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলেন, আধ-ঘণ্টা হয়ে গেছে। এইবার পদ্মিনীর সঙ্গে দেখা হবে। বাদশা সাজগোজ করবার জন্য, অন্য এক শিবিরে উঠে গেলেন। সেখানে আতরগোলাপ, হীরেজহরতের ছড়াছড়ি!— কোথাও সোনার আতরদানে হাজার টাকা ভরি গোলাপী আতর, কোথাও মুক্তোর তাজ, পান্নার শিরপেঁচ, কৌটোভরা মাণিকের আংটি, আলনায় সাজানো কিংখাপের জামাজোড়া, রেশমী রূমাল, জরীর লপেটা!
বাদশা যতক্ষণ কিংখাপের জামাজোড়া, জরীর লপেটা পোরে আয়নার সম্মুখে বসে পাকা দাড়িতে গোলাপী আতর লাগাচ্ছিলেন, ততক্ষণ সেই সাতশ’ পাল্কির একখানিতে রাণা ভীমসিংহকে লুকিয়ে মেবারের বাছা-বাছা রাজপুত-সর্দ্দারেরা পাঠান-শিবিরের মাঝখান দিয়ে চিতোরের মুখে এগিয়ে চলেছিলেন। ক্রমে আল্লাউদ্দীনের সাজগোজ সাঙ্গ হল। আধ-ঘণ্টা শেষ হয়ে এক-ঘণ্টা পূর্ণ হতে চল্লো, এখনও পদ্মিনীর শিবির থেকে ভীমসিং ফিরে এলেন না! বাদশা গোরাকে ডাকতে হুকুম দিলেন; গোরার কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না! আল্লাউদ্দীন আর স্থির থাকতে পাল্লেন না, ব্যস্তসমস্ত হয়ে যেখানে আধক্রোশ জুড়ে কানাত খাটানো হয়েছিল, সেইখানে উপস্থিত হলেন; দেখলেন,—পদ্মিনীর সোনার চতুর্দ্দোল শূন্য পড়ে আছে। যে লাল মখমলের প্রকাণ্ড শিবিরে তিনি চিতোরের রাণী পদ্মিনীকে মাণিকের খাঁচায় সোনার পাখীটির মত পুষে রাখবেন ভেবেছিলেন, সে শিবির অন্ধকার! কোথায় পদ্মিনী! কোথায় তাঁর একশ’ সখী! আর কোথায় বা বন্দী রাণা ভীমসিংহ! পাঠানশিবিরে হুলুস্থূল পড়ে গেল। সকলেই শুন্লে, পাল্কিবেহারা সেজে রাজপুতেরা বন্দী রাণাকে ফাঁকি দিয়ে নিয়ে গেল।
বাদশা তখনি সমস্ত সৈন্য জড়ো করতে হুকুম দিয়ে দুহাজার ঘোড়-সওয়ার সঙ্গে চিতোরের মুখে বেরিয়ে গেলেন। সবেমাত্র রাণার পাল্কি চিতোরের ফটক পার হয়েছে, এমন সময়, পাঠান বাদশার ঘোড়সওয়ার কালবৈশাখের ঝড়ের মতন ধূলিধ্বজায় চারিদিক অন্ধকার করে, দীন্-দীন্-শব্দে রাজপুত সৈন্যের উপর পড়ল। তখন বেলা দুই প্রহর। আগুনের সমান তপ্ত রৌদ্রে বারো বৎসরের বালক বাদল আর পঞ্চাশ বৎসরের বৃদ্ধ গোরা, একদল রাজপুতকে নিয়ে, প্রাণপণে চিতোরের সিংহদ্বার রক্ষা করতে লাগলেন। সন্ধ্যা হয়ে এল, তবু যুদ্ধ শেষ হল না। চিতোর থেকে দলের পর দল রাজপুত এসে সেই যুদ্ধে যোগ দিতে লাগল। বাদশা হাজারের পর হাজার পাঠান এনেও চিতোরের একখানা পাথর পর্যন্ত দখল করতে পাল্লেন না! শেষে, যে ভীমসিংহকে তিনি কাল রাত্রে লোহার শৃঙ্খলে বন্ধ রেখেছিলেন, সেই ভীমসিংহ যখন হাতীর পিঠে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন, তখন পাঠান-বাদশার আশা-ভরসা নির্ম্মূল হল। সন্ধ্যার অন্ধকারে অর্দ্ধেক ভারতবর্ষের সম্রাট আল্লাউদ্দীন চিতোরের সম্মুখ থেকে ঘোড়া ফিরিয়ে শিবিরে গেলেন। জয় জয় রবে চিতোর নগর পরিপূর্ণ হল।
সেই দিন গভীর রাত্রে যুদ্ধ-শেষে রাণা ভীমসিংহ যখন পদ্মিনীর শয়নকক্ষে বিশ্রাম করতে এলেন, তখন রাণার দুই চক্ষে জল দেখে পদ্মিনী জিজ্ঞাসা কল্লেন, —“এ সুখের দিনে চক্ষে জল কেন?” রাণা নিশ্বাস ফেলে বল্লেন,—“পদ্মিনী, আজ আমার পরম-উপকারী চিরবিশ্বাসী গোরা, চিরদিনের মত যুদ্ধের খেলা সাঙ্গ করে, দেবলোকে চলে গেছে।” দুজনে আর একটিও কথা হল না। রাণী পদ্মিনী শয়ন-ঘরের প্রদীপ অন্ধকার করে দিলেন;—দক্ষিণের হাওয়ায় সারারাত্রি চিতোরের মহাশ্মশানের দিক থেকে একটা যেন হায় হায় হায় হায়-শব্দ সেই ঘরের ভিতর ভেসে আসতে লাগল।
আল্লাউদ্দীন যখন পদ্মিনীর আশায় চিতোর ঘিরে বসেছিলেন, সেই সময় কাবুল থেকে মোগলের দল একটু একটু করে ক্রমেই ভারতবর্ষের দিকে এগিয়ে আসছিল। রাজপুতের কাছে হার মেনে বাদশা নিজের শিবিরে এসে শুনলেন,— মোগল-বাদশা তৈমুর লং দিল্লী আক্রমণ করতে আসছেন। সেই সঙ্গে দিল্লী থেকে পিয়ারী বেগমের এক পত্র পেলেন, তার এক জায়গায় বেগম লিখেছেন,—“শাহেনশা আর কেন? পদ্মিনীর আশা পরিত্যাগ করুন। হে মধুকর, তুমি পদ্মের সন্ধানে মরুভূমির মাঝে ফিরতে লাগলে, আর বনের ভাল্লুক এসে তোমার সাধের মৌচাক লুটে গেল! সকলি আল্লার ইচ্ছা! আজ অর্দ্ধেক ভারতবর্ষের রাজা, কাল হয় তো পথের ভিখারী! হায় রে হায়, দিল্লীর পিয়ারী বেগমকে এতদিনে বুঝি মোগল-দস্যুর বাঁদী হতে হল!” বাদশা পিয়ারীর চিঠি পড়ে স্তম্ভিত হলেন। বিপদ যে এত গুরুতর তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। আল্লাউদ্দীন তৎক্ষণাৎ শিবির ওঠাতে হুকুম দিলেন। সেই রাত্রে পাঠানফৌজ রাজস্থান ছেড়ে কাশ্মীরের মুখে চলে গেল।
* * * *
তেরো বৎসর পরে, চিতোরের সম্মুখে পাঠান-বাদশার রণডঙ্কা আর-একবার বেজে উঠল। তখন চিতোরের বড় দুরবস্থা। সমস্ত দেশ দুর্ভিক্ষে, মহামারীতে উজাড় হয়ে যাচ্ছে,—দেশ প্রায় বীরশূন্য; নূতন নূতন লোকের হাতে যুদ্ধের ভার। রাণা ভীমসিংহ সেই সব নূতন সৈন্য, নূতন সেনাপতি নিয়ে গ্রামে গ্রামে, পথে পথে পাঠান-সৈন্যকে বাধা দিতে লাগলেন, কিন্তু তাঁর সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হল। যুদ্ধের পর যুদ্ধে রাজপুতদের হটিয়ে দিয়ে, গ্রামের পর গ্রাম, কেল্লার পর কেল্লা, দখল করতে করতে একদিন আল্লাউদ্দীন চিতোরের সম্মুখে এসে উপস্থিত হলেন। বাদশাহী-ফৌজ চিতোরের দক্ষিণে, পাহাড়ের উপর গড়বন্দী তাম্বু সাজিয়ে, রাজপুতের সঙ্গে শেষ-যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। এবার প্রতিজ্ঞা, চিতোরের কেল্লা ভূমিসাৎ না করে দিল্লী ফেরা নয়!
মলিনমুখে রাণা ভীমসিংহ চিতোরগড়ে ফিরে এলেন। মহারাণা লক্ষ্মণসিংহ রাজসভায় ভীমসিংহকে ডেকে বল্লেন,—“কাকাজি, এত দিনে বুঝি চিতোর-গড় পাঠানের হস্তগত হয়, আর উপায় নেই! প্রজাসকল হাহাকার করছে, সমস্ত দেশ দুর্ভিক্ষে উজাড় হয়ে যাচ্ছে, তার উপর এই বিপদ উপস্থিত। এখন কি নিয়ে, কাকে নিয়েই বা লড়াই করি?” ভীমসিংহ বল্লেন,—“চিতোর এখনও বীরশূন্য হয়নি, এখনও আমরা একবৎসর পাঠানের সঙ্গে যুদ্ধ চালাতে পারি, এমন ক্ষমতা রাখি।” লক্ষ্মণসিংহ ঘাড় নাড়লেন,—“কাকাজি, আর যুদ্ধ বৃথা! আমি বেশ বুঝতে পারছি, পাঠানের সঙ্গে সন্ধি না করলে আর রক্ষা নেই; তবে কেন এই দুর্ভিক্ষের দিনে সমস্ত দেশ জুড়ে যুদ্ধের আগুন জ্বালাই? সমস্ত প্রজা আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে! আমার ক্ষতিতে রাজ্যে যদি শান্তি আসে, যদি আগুন নিভে যায়, তবে পাঠানের সঙ্গে সন্ধি করায় ক্ষতি কি? না হয়, কিছুকাল, পাঠানবাদশার একজন তালুকদার হয়েই কাটালেম!” ভীমসিংহের দুই চক্ষে জল পড়তে লাগল, তিনি মহারাণার দুটি হাত ধরে বল্লেন,—“হায়, লছমন্, মনে বেশ বুঝছি আর উপায় নেই, তবু আমার একটি অনুরোধ আছে। দুই বৎসর বয়সে যখন তোর মা গেলেন, বাপ গেলেন, তখন আমিই তোকে ছেলের মত বুকে টেনে নিয়েছিলেম; সমস্ত বিপদ-আপদ, রাজ্যের সমস্ত ভাবনাচিন্তা তোরই হয়ে অকাতরে সহ্য করেছিলেম। আজ আমার একটি অনুরোধ রক্ষা কর। বৎস! সাত দিন সময় দে। আমি এই শেষবার চিতোর-উদ্ধারের চেষ্টা দেখি। এই সাত দিন যেন পাঠানের সঙ্গে সন্ধি না হয়, এই সাত দিনে যেন আমার হুকুম মহারাণার হুকুম জেনে সকলে মান্য করে।” লক্ষণসিংহ বল্লেন, —“তথাস্তু।”
সেই দিন থেকে ভীমসিংহের হুকুম-মত এক একজন রাজপুত-সর্দ্দার পাঠানের সঙ্গে যুদ্ধে যেতে লাগলেন। প্রতিদিন খবর আসতে লাগল,—আজ অমুক রাজকুমার যুদ্ধে প্রাণ দিলেন, আজ অমুক সামন্ত বন্দী হলেন;—চিতোরের ঘরে ঘরে হাহাকার উঠল! সেই হাহাকার, সেই হাজার হাজার অনাথ শিশু আর বিধবার ক্রন্দন, পদ্মসরোবরের মাঝখানে, যেখানে রাজরাণী পদ্মিনী শ্বেত-পাথরের দেব-মন্দিরে পূজায় বসেছিলেন, সেইখানে পৌঁছিল। পদ্মিনী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে পূজা সাঙ্গ কল্লেন। তাঁর কোমল প্রাণ সেই সব দুঃখী পরিবার, অনাথ শিশুর জন্য সারাদিন, সারা সন্ধ্যা কেবলি কাঁদতে লাগল। ভীমসিংহ যখন মহলে এলেন, তখন পদ্মিনী দুই হাত জোড় করে বল্লেন,—“প্রভু, আর কত দিন যুদ্ধ চলবে?” ভীমসিংহ বল্লেন, “তিন দিন মাত্র। কিন্তু যুদ্ধে আর কোনো ফল নেই, —রাজপুতের প্রাণে সে উৎসাহ আর নেই। এখন উপায় কি? সূর্যবংশের মহারাণাকে এইবার বুঝি পাঠান-বাদশার তালুকদার হতে হল!” পদ্মিনী জিজ্ঞাসা কল্লেন,—“প্রভু, চিতোর রক্ষার কি কোনোই উপায় নেই?” ভীমসিংহ বল্লেন,— “উবরদেবী যদি কৃপা করেন তবেই রক্ষে! হায় পদ্মিনী, কার পাপে চিতোরের এ দুর্দ্দশা হল?” তারপর দু’ একটি কথার পর ভীমসিংহ অন্য কাজে চলে গেলেন।
একা ঘরে পদ্মিনীর কানে কেবলি বাজতে লাগল, —হায় পদ্মিনী, কার পাপে আজ চিতোরের এ দুর্দ্দশা! অন্ধকারে পদ্মিনী কপালে করাঘাত করে বলে উঠলেন, —“হায়, হতভাগিনী পদ্মিনী, তোরি এ পোড়া রূপের জন্য এ সর্ব্বনাশ,—তোরি জন্য এ সর্ব্বনাশ!” নিঃশব্দ ঘরে প্রতিধ্বনি হল,—তোরি জন্য এ সর্ব্বনাশ! ঠিক সেই সময় চৈত্রমাসের পরিষ্কার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নাবল। পদ্মিনী একটা মোটা চাদরে সর্ব্বাঙ্গ ঢেকে নিজের মহল থেকে চিতোরেশ্বরী উবরদেবীর মন্দিরে একা চলে গেলেন। রাত্রি দুই প্রহর, উবরদেবীর মন্দিরে সমস্ত আলো নিভে গেছে, কেবল একটি মাত্র প্রদীপের আলো! সেই আলোয় বসে দেবীর ভৈরবী, রাজরাণী পদ্মিনীকে বল্লেন,—“মহারাণী, আমি আবার বলি, তুমি যে কাজ করতে যাচ্ছ, তার শেষ হচ্ছে মৃত্যু! দেবীর রত্নঅলঙ্কার একবার অঙ্গে পরলে আর নিস্তার নেই! ছয় মাসের মধ্যে জীবন্ত-অবস্থায় জ্বলন্ত আগুনে দগ্ধ হতে হবে!” পদ্মিনী বল্লেন,—“হে মাতাজি, আশীর্ব্বাদ করুন, যে রূপসীর জন্য রাজস্থানে আজ এ আগুন জ্বলেছে, তার সেই পোড়া রূপ জ্বলন্ত আগুনেই ভস্ম হোক।” ভৈরবী বল্লেন,—“তবে তাই হোক বৎস, আমি এই আশীর্ব্বাদ করি, যে চিতোরের জন্য তুমি নিজের প্রাণ তুচ্ছ করলে, সেই চিতোরে তোমার নাম চিরদিন যেন অমর থাকে; যে মহাসতীর রত্নঅলঙ্কার আজ তুমি পরতে চল্লে, সেই মহাসতী মরণান্তে তোমায় যেন চরণে রাখেন।” রাণী পদ্মিনী ভৈরবীর হাত থেকে একটি চন্দন কাঠের কৌটায় উবরদেবীর সমস্ত রত্ন-অলঙ্কার নিয়ে বিদায় হলেন।
সেই দিন রাত্রি আড়াই প্রহরে চিতোরের রাজপ্রাসাদে একটুখানি সাড়াশব্দ ছিল না; মহারাণা নির্জ্জন ঘরে একা ছিলেন। যখন তাঁর সমস্ত প্রজা, পাঠানের সঙ্গে সন্ধি হবে, দেশে শান্তি আসবে মনে করে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়েছিল, সেই সময় সমস্ত মেবারের রাজা ভগবান একলিঙ্গের দেওয়ান মহারাণা লক্ষ্মণসিংহের চোখে ঘুম ছিল না। হায় অদৃষ্ট! কাল সন্ধির সঙ্গে সঙ্গে চিতোর ছেড়ে যেতে হবে, এ জীবনে আর হয় তো ফেরা হবে না! রাজ্য, সম্পদ, মান, মর্যাদা, আত্মীয়স্বজন সব ছেড়ে কোন্ দূরদেশে সামান্য বেশে নির্ব্বাসনে যেতে হবে! মহারাণা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চারিদিকে চেয়ে দেখলেন; ঘরের এক কোণে সোনার দীপদানে একটিমাত্র প্রদীপ জ্বলছিল, প্রকাণ্ড ঘরের আর সমস্তটা অন্ধকার। খিলানের পর খিলান, থামের পর থামের সারি অন্ধকার থেকে গাঢ় অন্ধকারে মিশে গেছে;— একটিমাত্র প্রদীপের আলোয় নিঃশব্দ সেই প্রকাণ্ড ঘর আরও যেন অন্ধকার বোধ হতে লাগল! মহারাণা অন্তঃপুরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন; হঠাৎ পায়ের তলায় মেঝের পাথরগুলো একবার যেন কেঁপে উঠলো; তার পর মহারাণা অনেকখানি ফুলের গন্ধ আর অনেক নুপূরের ঝিনি-ঝিনি শব্দ পেলেন।—কারা যেন অন্ধকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে! মহারাণা বলে উঠলেন,—“কে তোরা? কি চাস?” চারিদিকে—দেওয়ালের ভিতর থেকে, ছাদের উপর থেকে, পায়ের নীচে থেকে শব্দ উঠল,—“ময় ভূখা হুঁ!” লক্ষ্মণসিংহ বল্লেন,— “আঃ, এত রাত্রে চিতোরের রাজপ্রাসাদে উপবাসে কে জাগে?” আবার শব্দ উঠল—“ময় ভূখা হু!” তার পর, গাঢ় ঘুমের মাঝখানে, স্বপ্ন যেমন ফুটে ওঠে, তেমনি সেই শয়নঘরের অন্ধকারে এক অপরূপ দেবীমূর্ত্তি ধীরে ধীরে ফুটে উঠল! মহারাণা বলে, উঠলেন,—“কে তুমি? দেবতা না দানব, আমায় ছলনা করছ?” লক্ষ্মণসিংহ দীপদান থেকে সোনার প্রদীপ উঠিয়ে ধরলেন। প্রদীপের আলো, দেবীর কিরীটকুণ্ডলে, রত্ন-অলঙ্কারে, অসংখ্য অসংখ্য মণিমাণিক্যে, হাজার হাজার আগুনের শিখার মত, দপ্দপ্ করে জ্বলতে লাগল! লক্ষ্মণসিংহ দেখলেন,—চিতোরেশ্বরী উবরদেবী! ভয়, ভক্তি, বিস্ময়ে মহারাণার সর্ব্বশরীর অবশ হয়ে এল;— পরমানন্দে-দুর্ব্বল তাঁর হাত থেকে সোনার প্রদীপ খসে পড়ল। তার পর, সব অন্ধকার! সেই অন্ধকারে মহারাণা স্বপ্ন দেখছেন, কি জেগে আছেন, বুঝতে পাল্লেন না! তিনি যেন শুনতে লাগলেন, দেবী বলছেন, —“ময় ভূখা হুঁ!—বড় ক্ষুধা, বড় পিপাসা, আমি মহাবলি চাই;—রক্ত না হলে এ পিপাসার শান্তি নাই! মহারাণা! ওঠো, জাগো, দেশের জন্য বুকের রক্তপাত কর; আমার খর্পর রক্তের শতধারায় পরিপূর্ণ কর! রাজাপ্রজা, বালকবৃদ্ধ যদি চিতোরের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করে, তবেই কল্যাণ; না হলে, সূর্য্যবংশের রাজপরিবার আর কখনো চিতোরের সিংহাসন পাঠানের হাত থেকে ফিরে পাবে না!” পর্ব্বতের গুহায় প্রতিধ্বনি যেমন ঘুরতে থাকে, তেমনি সেই প্রকাণ্ড ঘরে দেবীর শেষ– কথা অনেকক্ষণ ধরে গম্ গম্ কর্তে লাগল। রাত্রি শেষ হয়ে গেল। ঊষাকালে সোনার আলো আর শীতল বাতাসের মাঝখানে চিতোরেশ্বরী কোথায় অন্তর্দ্ধান করলেন। অনেক দূরে পার্ব্বর্তী-মন্দিরে নহবতের সুরে ভৈরবী রাগিণীতে মহাদেবীর স্তুতি-গান বাজতে লাগল।
প্রত্যূষে, রাজদরবারে মহারাণা লক্ষ্মণসিংহ যখন রাত্রের ঘটনা আর দেবীর আদেশ সকলের সম্মুখে প্রকাশ কল্লেন, তখন সকলে বিস্মিত হ’ল বটে, কিন্তু অনেকেই সে কথা বিশ্বাস করলে না। যাদের হৃদয়ে বিশ্বাস অটল, ভক্তি অচলা ছিল, যারা চিতোরের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত, তারা উৎসাহে উন্মত্ত হয়ে উঠল; আর যাদের প্রাণ নিরুৎসাহ, মন দুর্ব্বল, যারা পাঠানের সঙ্গে সন্ধি হলে সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটাবে ভেবেছিল, তারা ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ল। কিন্তু সেই রাত্রে মহারাণার আদেশে মেবারের ছোটবড় সামন্তসর্দ্দারেরা যখন দেবীর নিজের মুখের আদেশ শোনবার জন্য অন্তঃপুরের সেই ঘরে একত্র হলেন, যখন দ্বিপ্রহরে স্তব্ধ রাজপুরে হাজার হাজার রাজপুত বীরের চোখের সম্মুখে আবার সেই দেবী-মূর্ত্তি “ময় ভূখা হু!” বলে প্রকাশ হল, তখন আর কারো মনে কোনো সন্দেহ রইল না;—সকলের মন থেকে সমস্ত অবিশ্বাস, সকল দুর্ব্বলতা নিমেষের মধ্যে দূর হল;—আগুনের তেজে অন্ধকার যেমন দূরে যায়! সকলেই বীরত্বের নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠল; কেবল রাণা ভীমসিংহ যেন সেই দেবী-মূর্ত্তির ভিতরে পদ্মিনীকে দেখে মনে মনে তোলাপাড়া করতে লাগলেন,—এ কি দেবী না পদ্মিনী? পদ্মিনী না দেবী?
তার পর, মহাবলির উদ্যোগ হল। মহারাণা লক্ষ্মণসিংহ তাঁর বারোটি রাজপুৎত্রের মধ্যে সর্ব্বপ্রথম, সব চেয়ে বড় রাজকুমার, যুবরাজ অরিসিংহের মাথায় চিতোরের রাজমুকুট দিয়ে বল্লেন,—“হে ভাগ্যবান, দেবীর আদেশ শিরোধার্য্য কর! পাঠানযুদ্ধে অগ্রসর হও! আজ তুমি সমস্ত মেবারের মহারাণা। এই সমস্ত সামন্ত-সর্দ্দার তোমারি প্রজা বলে জানবে। আজ থেকে তোমারি হাতে যুদ্ধের ভার। জয় হলে তোমার পুরস্কার—ইহলোকে চিতোরের রাজসিংহাসন আর যুদ্ধে প্রাণ গেলে তার ফল—পরলোকে মহাদেবীর অভয় চরণ!” বৃদ্ধ রাণা লক্ষ্মণসিংহ অরিসিংহকে সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে নীচে দাঁড়ালেন;— নতুন রাণার মাথায় চিতোরের কিরীট শোভা পেতে লাগল। চারিদিকে রব উঠল,—“জয় মহাদেবীর জয়! জয় অরিসিংহের জয়!” লক্ষ্মণসিংহ বলতে লাগলেন,—“সর্দ্দারগণ, আমার আর একটি শেষ কর্ত্তব্য আছে। সে কর্ত্তব্য দেবীর কাছে নয়, চিতোরের কাছে নয়;—আমার পিতা পিতামহ স্বর্গীয় মহারাণাদের কাছে। এই মহা সমরে মেবারের রাজবংশ একেবারে নির্ম্মূল না হয়, পরলোকে পিতৃপুরুষেরা যাতে জল-গণ্ডূষ পান, রাজস্থানে বাপ্পার বংশ যুগে যুগে যাতে অমর থাকে, সেই জন্য আমার ইচ্ছা, অজয়সিংহ নিজের স্ত্রীপুত্ত্র নিয়ে কৈলবায়ার নির্জ্জন দুর্গে চলে যান।”
লক্ষ্মণসিংহের বারো জন রাজপুৎত্রের মধ্যে কেবল অজয়সিংহেরই দুটি শিশু সন্তান ছিল। অজয়সিংহ মহারাণার সম্মুখে জোড়-হাত করে বল্লেন, “পিতা, আমার এগারো ভাই চিতোরের জন্যে যুদ্ধে প্রাণ দেবে, আর আমি কিনা স্ত্রীলোকের মত শিশু সন্তান মানুষ করবার জন্য বসে থাকব? আমি কি এতই দুর্ব্বল, এমনি অক্ষম?” লক্ষ্মণসিংহ বল্লেন,—“বৎস, হতাশ হয়ো না, যে মহৎ কাজের ভার তোমায় দিলেম, চিতোরের যে-কোনো রাজপুত সে ভার পেলে নিজেকে ধন্য বোধ করত! হয় তো আমাদের রক্তপাতে চিতোর উদ্ধার হবে না, হয় তো তোমাকেও চিতোরের জন্য প্রাণপণ করতে হবে। আমরা হয় তো চিতোরকে পরাধীন রেখে চলে যাব, আর হয় তো তুমি সূর্য্যবংশের উপযুক্ত কোনো বীরপুরুষের হাতে রাজ্যভার দিয়ে পরম সুখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারবে! মনে রেখো, চিতোরের জন্য প্রাণ দেবার যে সুখ চিতোর-পুনরুদ্ধারের সুখ তার শতগুণ।” লক্ষ্মণসিংহ নীরব হলেন। জয়-জয়-শব্দে রাজসভা ভঙ্গ হল।
রাজসভা থেকে বিদায় নেবার সময় অরিসিংহ অজয়সিংহকে বলে গেলেন,— “চিতোর ছেড়ে যাবার আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যেও।” যাত্রার সমস্ত আয়োজন শেষ করে অজয়সিংহ যখন বড় ভায়ের ঘরে গেলেন, তখন অরিসিংহ একখানি চিঠি শেষ করে ছোট ভাইয়ের দিকে ফিরে বল্লেন, “ভাই, আজ আমাদের শেষ দেখা, কাল তুমি একদিকে, আমি একদিকে! এই শেষ দিনে তোমায় একটি কাজের ভার দিচ্ছি।” অরিসিংহ চামড়ায় মোড়া একটি ছোট থলি আর সেই চিঠিখানি অজয়সিংহের হাতে দিয়ে বল্লেন,—“অজয়, এ দুটি যত্ন করে রেখো, যদি আমি যুদ্ধ থেকে ফিরে আসি,তবে আবার চেয়ে নেব, নয় তো তুমি খুলে দেখো, আমার শেষ ইচ্ছা কি।” তার পর, অজয়সিংহকে আলিঙ্গন করে অরিসিংহ বল্লেন,—“চল ভাই, মায়ের কাছে বিদায় হই!”
সেই দিন শেষ-রাত্রে যখন রাজ-অন্তঃপুর থেকে দুই রাজপুত্র দুই দিকে বিদায় হয়ে গেলেন, তখন বারো ছেলের মা-জননী চিতোরের মহারাণী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে মাটির উপর লুটিয়ে পড়লেন, তাঁর সমস্ত শরীর পাষাণের মত স্থির হয়ে গেল, কেবল সজল দুটি কাতর চোখ সেইদিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল—যেদিক দিয়ে দুটি রাজকুমার চলে গেলেন। মহারাণা বলতে লাগলেন,—“প্রিয়ে, স্থির হও, ধৈর্য্য ধর, বুক বাঁধো, মহাকালের কঠোর বিধান নতশিরে শান্ত মনে বহন কর।” তার পর রণরণ-শব্দে রাজপুতের রণডঙ্কা দিক্দিগন্ত কাঁপিয়ে বাজতে লাগল;—যুবরাজ অরিসিংহ যুদ্ধযাত্রা কল্লেন।
সেই দিন থেকে একমাস কেটে গেল। পাঠানের বিরুদ্ধে রাজপুতের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হল! একের পর এক, এগারো জন রাজকুমার যুদ্ধে প্রাণ দিলেন। আর আশা নেই, আর উপায় নেই! কিন্তু তবু রাজপুতের বীর-হৃদয় এখনও অটল রইল। চিতোরের শেষ দুই বীর, লক্ষ্মণসিংহ আর ভীমসিংহ, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। রাণার হুকুমে মেবারের লক্ষ লক্ষ সৈন্যসামন্তের অবশেষ—ভীষণমূর্ত্তি ভগবান একলিঙ্গের দশহাজার দেওয়ানী ফৌজ একত্র হতে লাগল। তাদের একহাতে শূল, একহাতে কুঠার, দুই কানে শাঁখের কুণ্ডল, মাথায় কালো ঝুঁটি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, গায়ে বাঘছালের অঙ্গরাখা, পিঠে একটা কোরে প্রকাণ্ড ঢাল! তাদের আসবাবের মধ্যে এক ঘোড়া, এক কম্বল, এক লোটা, পৃথিবীতে আপনার বলবার আর কিছুই ছিল না। তারা দেবতার মধ্যে একমাত্র একলিঙ্গজির উপাসনা করত, মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র মহারাণার হুকুম মানত। সমরসিংহ এই ফৌজের সৃষ্টিকর্ত্তা। ছোটখাট যুদ্ধে এদের কেউ দেখতে পেতনা, কেবল মাঝে মাঝে ঘোর দুর্দ্দিনে, যখন চারিদিকে শত্রু, চারিদিকে বিপদ ঘনিয়ে আসত, যখন বিধর্ম্মীর হাতে অপমান হবার ভয়ে দেশের যত সুন্দরী—কি কুমারী, কি বিধবা, কি দশ বছরের কচিমেয়ে, কি ষোলো বছরের পূর্ণ যুবতী—চিতার আগুনে রূপযৌবন ছাই করে দিয়ে চিতোরেশ্বরীর সম্মুখে জীবনের শেষ ব্রত জহর–ব্রত উদযাপন করত, যখন আর কোনো আশা, কোনো উপায় নেই, সেই সময়, হতাশ রাজপুতের শেষ উৎসাহের মত দুর্দ্ধর্ষ, দুর্দ্দান্ত এই দেওয়ানী ফৌজ চিতোরের কেল্লায় দেখা দিত! সত্তর বৎসর পূর্ব্বে সমরসিংহের বিধবা রাণী কর্ম্মদেবী একদিন কুতুবুদ্দিনের হাত থেকে ছেলের রাজসিংহাসন রক্ষা করবার জন্য মেবারের সমস্ত সৈন্য একত্র করেছিলেন, সেই দিন একবার দেওয়ানী ফৌজের ডাক পড়েছিল, আর আজ কয় পুরুষ পরে মহারাণা লক্ষ্মণসিংহের হুকুমে দেওয়ানী ফৌজ আর একবার চিতোরের কেল্লায় উপস্থিত হল।
কালরাত্রি, তিথি অমাবস্যা যখন জগৎ-সংসার গ্রাস করেছিল, মাথার উপর থেকে চন্দ্রসূর্য্য যখন লুপ্ত হয়েছিল, সেই সময় চিতোরের মহাশশ্মশানের মধ্যস্থলে চিতোরেশ্বরীর মন্দিরে বারো-হাজার রাজপুত সুন্দরীর জহর-ব্রত আরম্ভ হল। মন্দিরের ঠিক সম্মুখে অন্ধকার একটা সুড়ঙ্গের উপরে দাঁড়িয়ে রাজস্থানের প্রথম সুন্দরী রাণী পদ্মিনী অগ্নিদেবের স্তব আরম্ভ কল্লেন,“হে অগ্নি, হে পবিত্র উজ্জ্বল স্বর্ণকান্তি, এসো! পৃথিবীর অন্ধকার তোমার আলোয় দূরে যাক। হে অগ্নি, হে মহাতেজ, এসো! তুমি দুর্ব্বলের বল, সবলের সহায়। হে দেবতা, হে ভয়ঙ্কর, আমাদের ভয় দূর কর, সন্তাপ নাশ কর, আশ্রয় দাও! লজ্জা-নিবারণ, দুঃখবিনাশন, বহ্নিশিখা, তুমি জীবনের শেষ-গতি, বন্ধনের মহামুক্তি!” পদ্মিনী নীরব হলেন, বারো-হাজার রাজপুতের মেয়ে সেই অগ্নিকুণ্ডের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে গাইতে লাগল,—“লাজহরণ, তাপবারণ!”—হঠাৎ এক সময় মহা কল্লোলে চারিদিক পরিপূর্ণ করে হাজার হাজার আগুনের শিখা যেন মহা আনন্দে সেই সুড়ঙ্গের মুখে ছুটে এল! প্রচণ্ড আলোয় রাত্রির অন্ধকার টলমল করে উঠল! বারো-হাজার, রাজপুতনীর সঙ্গে রাণী পদ্মিনী অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিলেন; চিতোরের সমস্ত ঘরের সমস্ত সোনামুখ, —মিষ্টি কথা, আর মধুর হাসি নিয়ে, এক নিমেষে, চিতার আগুনে, ছাই হয়ে গেল;— সমস্ত রাজপুতের বুকের ভিতর থেকে চীৎকার উঠল,—“জয় মহাসতীর জয়—!” আল্লাউদ্দীন নিজের শিবিরে শুয়ে সে চীৎকার শুনতে পেলেন; তিনি তৎক্ষণাৎ সমস্ত সৈন্য প্রস্তুত রাখতে হুকুম পাঠালেন।
পরদিন সূর্য্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে চিতোরের পাহাড় বেয়ে বর্ষাকালের স্রোতের মত রাজপুতসেনা হর-হর-শব্দে দিক্দিগন্ত কাঁপিয়ে ভয়ঙ্কর তেজে পাঠান-সৈন্যের উপর এসে পড়ল। আল্লাউদ্দীনের তাতার-সৈন্য দেওয়ানী ফৌজের কুঠারের মুখে নিমেষের মধ্যে ছিন্নভিন্ন, ছারখার হয়ে পলায়ন কল্লে। আল্লাউদ্দীন নতুন নতুন সৈন্য এনে বারম্বার রাজপুতদের বাধা দিতে লাগলেন,—স্রোতের মুখে বালির বাঁধের মত তাঁর সমস্ত চেষ্টা প্রতিবার বিফল হল। আল্লাউদ্দীন নিজে একজন সামান্য বীরপুরুষ ছিলেন না; এর চেয়ে ঢের কম সৈন্য নিয়ে তিনি মেবারের চেয়ে অনেক বড় বড় হিন্দু রাজত্ব অনায়াসে জয় করেছেন; কিন্তু আজ যুদ্ধে রাজপুতের বীরত্ব দেখে তাঁকে ভয় পেতে হল। বারো বার তিনি সৈন্য সাজিয়ে রাজপুতদের বাধা দিলেন, বারো বার তাঁকে হটে আসতে হল। আল্লাউদ্দীন বেশ বুঝলেন, আজ যুদ্ধের সহজে শেষ নেই। এক দিকে দিল্লীর বাদশাহী তক্ত আর-একদিকে চিতোরের রাজসিংহাসন;—কোনটা থাকে, কোনটা যায়!
তখন বেলা তৃতীয় প্রহর, আল্লাউদ্দীন নিজের সমস্ত ফৌজ একেবারে এক সময়ে সেই বারো হাজার রাজপুতের দিকে চালাতে হুকুম দিলেন। নিমেষের মধ্যে পাঠানবাদশার লক্ষ লক্ষ হাতীঘোড়া, সেপাইশাস্ত্রী, প্রলয়ঝড়ের মত ধূলার ধূলায় চারিদিক অন্ধকার ক’রে, দীন্—দীন্-শব্দে রাজপুতের দিকে ছুটে আসতে লাগল। তার পর, হঠাৎ এক সময়, সমুদ্রের তরঙ্গে নদীর জল যেমন, তেমনি সেই অগণিত পাঠান-সৈন্যের মাঝে কয়েক হাজার রাজপুত কোন্খানে লুপ্ত হল, কিছু আর দেখা গেল না। কেবল সূর্য্যাস্তের কিছু পূর্ব্বে সেই যুদ্ধ-রত অসংখ্য সৈন্যের মাথার উপরে সূর্য্যমূর্ত্তিলেখা চিতোরের রাজপতাকা একবারমাত্র সন্ধ্যার আলোয় বিদ্যুতের মত চমকে উঠল; তার পরেই শব্দ উঠল,—“আল্লা হো আকবর শাহনশা কি ফতে!”—পাঠানের পায়ের তলায় মহারাণার রাজছত্র চূর্ণ হয়ে গেল! সূর্য্যদেব, সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার করে অস্ত গেলেন; রক্তমাংসের লোভে রণস্থলের উপর দলে দলে নিশাচর পাখী কালো ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে লাগল।
চিতোর হস্তগত হল। পাঠানের তলোয়ার চিতোরের পথঘাট রক্তের স্রোতে রাঙা করে তুল্লে; ধনধান্যে, মণিমুক্তায়, লক্ষ লক্ষ তাতার-ফৌজের বড় বড় সিন্দুক পরিপূর্ণ হল। কিন্তু যে রত্নের লোভে আল্লাউদ্দীন আজ অমরাবতীর সমান চিতোর নগর শ্মশান করে দিলেন, যার জন্য দিল্লীর সিংহাসন ছেড়ে বিদেশে এলেন, সেই পদ্মিনীর সন্ধান পেলেন কি? বাদশা চিতোরে এসে প্রথমেই শুনলেন,—পদ্মিনী আর নাই— চিতার আগুনে সুন্দর ফুল ছাই হয়েছে! সেই দিন রাত্রে বাদশার হুকুমে চিতোরের ঘর, দ্বার, মন্দির, মাঠ, ছাইভস্ম চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল,—কেবল প্রকাণ্ড সরোবরের মাঝখানে রাণী পদ্মিনীর রাজমন্দির তেমনি নতুন, তেমনি অটুট রইল। আল্লাউদ্দীন সেই রাজমন্দিরে পদ্মসরোবরের ধারে শ্বেতপাথরের বারাণ্ডায় ঘেরা পদ্মিনীর শয়নমন্দিরে তিনদিন বিশ্রাম করেন। তার পর, মালদেবনামে একজন রাজপুতের হাতে চিতোরের শাসনভার দিয়ে, ধীরে ধীরে দিল্লীর মুখে চলে গেলেন। পাঠান-বাদশার প্রবল প্রতাপ, হিন্দুস্থানের এক দিক থেকে আর-এক দিকে বিস্তৃত হল; আর সেই বারো-হাজার সতী-লক্ষ্মীর পবিত্র নাম, বারোহাজার রাজপুত-বীরের কীর্ত্তি, চিরদিনের জন্য, জগৎসংসারে ধন্য হয়ে রইল। আজও চিতোরে মহাসতীর শ্মশানে পদ্মিনীর সেই চিতাকুণ্ড দেখা যায়, তার ভিতর মানুষে প্রবেশ করতে পারে না;—একটা অজগর সর্প দিবারাত্রি সেই গহ্বরের মুখে পাহারা দিচ্ছে।
