৩. ভদ্রতা

৩. ভদ্রতা

যুক্তরাজ্যের নায়ক এক সময় ভ্রমণে বার হয়েছিলেন। তাঁর গাড়িতে মোটে স্থান ছিল না–লোকের ভিড় খুব বেশি হয়েছিল। এমন সময় একটা নিগ্রো রমণী সেই গাড়িতে উঠলে, দেশনায়ক অমনি উঠে দাঁড়িয়ে সেই সামান্য নারীকে বসবার স্থান দিলেন। বাকি পথটুকু তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন।

রাষ্ট্রনায়কের এই ভদ্রতা কি মহত্ত্বের পরিচয় নয়? রমণীটি নিম্নশ্রেণীর তাকে সম্মান করে বিশেষ লাভ কী! তার মতো সামান্য স্ত্রীলোকের পক্ষে দেশনায়কের সামনে দাঁড়িয়ে থাকাই ভদ্রতা, এই সব চিন্তা রাষ্ট্রপতির মাথাকে অস্থির করে নি Lহোক না সে পথের নারী, নীচ বংশোদ্ভবা তাতে কী আসে যায়! নীচ বলে, ছোট বলে, ভদ্ৰ ব্যবহার করতে দেশনায়ক লজ্জাবোধ করেন নি।

রেলগাড়ির দুয়ারের কাছে কোনো লোক এলে সবাই যদি হেঁকে বলি–স্থান নাই, তাতে মোটেই ভদ্রতার পরিচয় দেওয়া হবে না। মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, আমি যদি জায়গা জুড়ে বসে থাকি–তাতেও বিশেষ মহত্ত্ব বা মনুষ্যত্ব দেখান হবে না।

যিনি ভদ্রলোক, তিনিই ভদ্রতার পরিচয় দেন। একটি কঠিন কথা বলে তো প্রাণে আনন্দ অনুভব করবার কিছু নাই।

সারাদিন পরিশ্রম করে বড় ক্লান্ত হয়েছ, একটা অবোধ মানুষ এসে তোমাকে বিরক্ত করছে, তাই বলে কি তাকে কঠিন কথা বলবে? ডাকঘরে, বাজারে, কাঁচারীতে অথবা থানায়, যেখানে তুমি থাক না, তোমাকে সব জায়গাতেই দ্র ও মধুর-স্বভাব হতে হবে।

ডাকঘরে কাজ কর, ভিতরে পাখার নিচে বসে মনে মনে যেন ক্ষমতার গর্ব না আসে, বাইরের লোকগুলির উপর যেন কোনও রকম নিষ্ঠুর ব্যবহার করবার প্রবৃত্তি তোমার না জাগে।

থানা-ঘরের চারিদিকে তোমার হুকুম তামিল করার জন্য সিপাইরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তোমার ইঙ্গিতে ওরা মানুষ পর্যন্ত খুন করে ফেলতে পারে, কিন্তু তবু তোমাকে নম্র ও মধুর স্বভাব হতে হবে, কারণ তুমি ভদ্রলোক। কারণ ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করিতে তুমি লজ্জাবোধ কর, বিনয়ে মধুর হয়ে মানুষের সঙ্গে দ্র ব্যবহার কর, চোর বদমাইশকে শাস্তি দাও কর্তব্যের খাতিরে–ক্রোধ বা বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে নয়।

এ জগতে উগ্র হয়ে দুর্বলকে কঠিন কথা বলবার অধিকার কারো নাই। মানুষ সব সময়ে দরিদ্র, এ জগতে এতটুকু অহঙ্কার করবার সুযোগ আমাদের নাই। মাথা নত করে কর্তব্যের আদেশ মেনে জীবন-পথের অগ্রসর হতে হবে।

এমার্সন বলেছেন–একটা সুন্দর মুখের চেয়ে একটা কুৎসিত মুখের মধুর কথা অধিকতর সুন্দর। সত্যই তো সুন্দর সুশ্রী মুখ আমাদের চিত্তকে আনন্দ দান করে না। মধুর জ্ঞানপূর্ণ সরলপূর্ণ সরল আলাপে কাফির জঘন্য চেহারাও আমাদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে।

জনসন দ্ৰতা জিনিসটাকে মোটেই পছন্দ করতেন না। কিন্তু তবু তিনি ভদ্রতার পরিচয় দিতেন, যা শুনলে বিস্মিত হতে হয়। যে ভদ্রতার মনের সঙ্গে যোগ নাই, তাই হয়তো তিনি ভালবাসতেন না।

পরাধীন দেশের মানুষ সব সময়ে যথার্থ বিনয়ের পরিচয় দিতে সক্ষম হয় না। অভাব ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের ভদ্রতাও অনেক সময় খাঁটি হয় না। যাকে মানুষের ভয় করে চলতে হয়, তার পক্ষে সব সময় সভ্য ভদ্রতার পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়। জীবনের এই কঠিন কলঙ্ক হতে মানুষকে সব সময় মুক্ত হতে চেষ্টা করতে হবে। কারণ এ অবস্থাটা আত্মার। পক্ষে খুবই অপমানজনক। স্বাধীন মুক্ত মানুষের ভদ্রতাই প্রকৃত ভদ্রতা। দরিদ্রের পক্ষে ভদ্র।

হয়ে উপায় কী? দুর্বল বা অনুগ্রহদগ্ধ জীবের পক্ষে বিনয়ে নম্র হওয়া ছাড়া পথ কৈ?

স্যার হেনরী সিনী তাঁর পুত্র ফিলিপ সিডনীকে বলেছিলেন, তুমি বড় বংশে জন্মেছ, বিনয় ও চরিত্র-মহিমায় তোমাকে তা প্রমাণ করতে হবে, তোমার সৎস্বভাব, তোমার বিনয় নম্র ব্যবহার, তোমার সত্য-প্রীতি; তোমার উচ্চকুলের পরিচয় দেবে। পিতার নাম করে যেন তোমাকে বড় বংশের লোক বলে পরিচয় দিতে না হয়। যদি ভীরু সঙ্কীর্ণহৃদয় ও নীচাশয় হও, তা হলে তোমার বড় বংশের কলঙ্ক হবে। পিতার এই উপদেশগুলি ফিলিপ সিনী গ্রহণ করেছিলেন। মৃত্যুশয্যায় তিনি যে মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, তার তুলনা। পাওয়া যায় না। ভদ্রতার প্রধান উপাদান ত্যাগ। স্বার্থে প্রাণ পূর্ণ হয়ে আছে, পরের জন্য এতটুকু কষ্ট স্বীকার করতে মন চায় না, নিজেদের দাবি কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতে খুব মজবুত, সব সময় নিজের সুখের সম্বন্ধে মন জাগ্রত; কিন্তু বাইরের লৌকিকতার খাতিরে প্রাণহীন ভদ্রতার পরিচয় দিচ্ছ, দেখা হলেই আদাব সালাম করে বিনয়ে মাথা অবনত করছ, এরূপ ভদ্রতার বিশেষ মূল্য আছে বলে মনে হয় না। পরের জন্য ত্যাগ স্বীকার, নিজের সুখের সঙ্গে সঙ্গে পরের সুখের প্রতি দৃষ্টি রাখা, পরকে আঘাত না দেওয়া, অর্থ দিয়ে হোক বা পরিশ্রম করে তোক অন্যকে সাহায্য করবার নাম ভদ্রতা।

ছোট বংশে যারা জন্মগ্রহণ করেছেন তাঁদের কি দ্ৰ হবার অধিকার নাই? সাধনার। সামনে কিছুই তো অসম্ভব নয়। মনের অহঙ্কার দূর করে দিয়ে, নিরপেক্ষ সমালোচক হয়ে। নিজেদের স্বভাবের প্রতি সর্বদা দৃষ্টি রাখ, সেখানে যে ভুলটুকু আছে, চরিত্রের যে দৃঢ়তা আছে, তা ধীরে ধীরে দূর করে ফেল, জ্ঞান রাজ্য হতে সর্বদা বড় মানুষদের অমূল্য উপদেশগুলি পালন কর, তোমাকে কেউ ছোটলোকের ছেলে বলতে সাহস পাবে না।

মানুষ মানুষকে যে ঘৃণা করে, তার কারণ কী? যার মধ্যে মনুষ্যত্ব নাই, যে মিথ্যাবাদী ও ভণ্ড, নিষ্ঠুর ও স্বার্থপর, যার ব্যবহার মিথ্যার সঙ্গে জড়িত; বল দেখি লোক যদি তাকে ঘৃণা করে, তা হলে কি তাদের দোষ দেওয়া যায়? এ কথাও ঠিক, মানুষ মানুষকে অনেক সময় অন্যায় করে ঘৃণা করে। অন্যায় করে মানুষকে অত্যাধিক ঘৃণা করলে মনের অবনতি ঘটে।

ভদ্রঘরের ছেলেই যে ভদ্র হয়, এমন কোনো কথা নয়। প্লেটো খুব বড় ঘরের ছেলে ছিলেন না; তবুও জগতের পণ্ডিতমণ্ডলীর মধ্যে তার স্থান কত উঁচুতে। দার্শনিক ক্লিয়ানথাসের (Cleanthus) বাপ ছিলেন বাগানের মালী। ইউরোপিডিসের (Europides) বাপও ছিলেন মালী। জ্যোতির্বিদ পিথাগোরাসের (Pythagores) বাপ কামারের কাজ করতেন। ডিমসূথেনিসের বাপ ছুরি-কাচি তৈয়ার করতেন। কবি ভার্জিলের বাপ ছিলেন কুম্ভকার। কত রত্ন কত জায়গায় পড়ে থাকে; তার খবর কে রাখে? প্রতিকূল অবস্থার চাপে কত প্রতিভা কত মহৎ আত্মা অজ্ঞাত, অবজ্ঞাত হয়ে পৃথিবীর হতে বিদায় গ্রহণ করে। কবি গ্রে বলেছেন, সমুদ্রের অতল তলে কত মণিমুক্তা লোকচক্ষুর, অন্তরালে বালি কাদার মধ্যে পড়ে থাকে, কত গিরি-উপত্যকায় কত ফুল ফুটে আপন মনে। ঝরে পড়ে।

যে ছোট হয়ে পড়ে আছে, সে হয়তো ছোট নয়। তার মধ্যে কত মনুষ্যত্ব, কত মাধুরী ঘুমিয়ে আছে তা তুমি আমি না জানতে পারি, সুবিধা ও সুযোগ পেলে সেও মানব সমাজে সম্মান পেতো।

মানুষ যতই ছোট হোক, যতই সে অবজ্ঞাত হয়ে থাকুক, তার মধ্যে অসীম ক্ষমতা, অনন্ত প্রতিভা ঘুমিয়ে রয়েছে; অনুকূল বাতাস পেলে তার ভিতরকার রূপ ও মহিমা অনন্ত শিখায় ফুটে উঠবে।

জাতির ভিতরকার লক্ষ মৌন আত্মাকে ডেকে তুলতে হবে। যে জাতির মাঝে সাধারণ মানুষের সামনে মুক্তির পথ খোলা নাই, সে জাতি দিন দিন দুর্বল হতে থাকে। তাদের শক্তি সাধারণ পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

কতকগুলি ভদ্রলোক উচ্চবংশ নিয়ে জাতি কখনও গৌরবের পথে অগ্রসর হতে পারে। মানবসমাজে মানুষের ঘরে নিত্য নূতন আত্মা নবীন শক্তি ও অনন্ত সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নিচ্ছে, তাদের গতিপথ রুদ্ধ করে রাখ, তাতে জাতিই ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

আভিজাত্য গর্বের মূলে কিছু সত্য থাকলেও মিথ্যা বংশগৌরব এবং ছোটকে অবজ্ঞা করার পাপে দেশ ও জাতির সমূহ ক্ষতি হয়। যে ছোট সে যদি বড় গুরুর আসনে বসে, তাতে আনন্দ ছাড়া নিরানন্দের কোনোই কারণ নাই।

শেক্সপীয়ার ছোট-ঘরের ছেলে ছিলেন। বেন জনসন, ওয়াট, জাসিয়া ওয়েজউড Josea Wedgewood) নিম্নশ্রেণীর লোক হতে উদ্ভূত। বার্নস লাঙ্গল চষতেন। কীটসকে (Keats) ওষুধ বেচে জীবিকা অর্জন করতে হতো।

পণ্ডিত প্রবর কার্লাইল নিজেকে মিস্ত্রীর ছেলে বলে পরিচয় দিতে কোন দিন লজ্জা বোধ করেন নি বরং সে কথা বলতে তিনি বিচক্ষণ গৌরব অনুভব করতেন। মিস্ত্রীর ছেলে বলে কার্লাইলের বড় হবার পথে কোনো অন্তরায় আসে নাই।

ভদ্র যিনি তিনি সহজে ক্রুদ্ধ হন না, আঘাত পেলেও অনেক চিন্তা করে দেখেন, তাঁর কোনো অপরাধ হয়েছে কি না, মানুষকে ব্যথা দেওয়া তার স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ। দুঃস্থ মানুষকে দেখলে তার মনে বেদনা উপস্থিত হয়। তিনি সাধ্যমত পীড়িতের বেদনা দূর করতে চেষ্টা করেন। দ্র যিনি তার কথা বড় মধুর, প্রকৃতি অতি অমায়িক, ক্ষতি স্বীকার করেও নিজেদের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেন। যিনি সত্যপ্রিয়, তার কথা ও কাজের মধ্যে কোনো ব্যবধান থাকে না। পরনিন্দা করা তাঁর পক্ষে খুব কঠিন। তিনি সাধ্যমত কারো কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করেন না। সর্বদা প্রতিবেশী, বন্ধু ও আত্মীয় স্বজনের সংবাদ দেওয়া তার স্বভাব। খোদার উপর নির্ভর করা তাঁর অভ্যাস। মানুষের মন খুশি করবার জন্যে তিনি অন্যায় কথা বলেন না। সৎসাহস তার স্বভাবের ভূষণ। তিনি ভদ্রতা দেখাবার সময় জাতি বিচার করেন না।

তুমি যে জাতিই হও না, ভিন্ন জাতির লোকের প্রতি তোমাকে অভদ্র হতে হবে কেন? তোমার মনুষ্যত্ব তোমার জ্ঞান দেখেই মানুষ তোমার ধর্ম ও সমাজকে সম্মানের চোখে দেখবে।

হযরত মোহাম্মদ (সঃ) যে এত মানুষকে মুসলমান করেছিলেন, সে কীসের বলে? তার মনুষ্যত্ব, তাঁর আশ্চর্য ভদ্রতা মানুষের মনকে মুগ্ধ করে দিত। বস্তুত হযরত মোহাম্মদের (সঃ) জীবনে তাঁর ভদ্রতা ছিল আশ্চর্য জিনিস। তাঁর স্নেহ তার সহনগুণ, তাঁর স্বভাবের অনন্ত মাধুরী মানুষকে পাগল করে দিত।

শুধু মুখের কথার মধ্যেই ভদ্রতা নিবদ্ধ নয়! ভদ্র ব্যক্তি সর্বদাই সহৃদয় ও স্নেহশীল। কাজেই তুমি সর্বদা নিষ্ঠুরতার পরিচয় দাও, তোমার কথার কোনো মূল্যই নাই, স্বতন্ত্র হয়ে নিজের মতো নিজে বাস করাতেই তোমার আনন্দ হয়, প্রতিবেশী মারা গেলেও তুমি। সেদিকে ফিরে তাকাও না, তোমার ওষ্ঠের মৃদু-মধুর হাসি অভিবাদনের কোনো মূল্য আছে বলে মনে হয় না। বাইরেটা রূঢ় রেখেও যদি তোমার অন্তরের মানুষটিকে মধুর, সরল ও বিনয়ী করে তুলতে পারতে হবে তাই সুন্দর হতো।

কামান গোলা যত কিছুই আয়োজন কর না, তুমি তোমার জাতিকে পতন ও দুর্দশার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। জাতির মনুষ্যত্বই তার সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি। যে জাতির মধ্যে নীচতা, হৃদয়হীনতা ও অজ্ঞানতা পরিপূর্ণ রকমে বিরাজ করছে, তার ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।

মনুষ্যত্বকে যারা শ্রদ্ধা করতে শেখে নাই, তাদের স্বাধীনতা পাবার কোনো অধিকার নাই। মনুষ্যত্ব মানব জীবনের উচ্চাঙ্গের দ্ৰতা ছাড়া মূলত আর কিছুই নয়।

মানুষের প্রতি প্রেম, দেশের আর্ত-পীড়িতের প্রতি মায়া, অত্যাচারিত, ক্লিষ্ট মানুষের প্রতি অকৃত্রিম সহানুভূতি যার নাই, তিনি ভদ্রলোক নন। যে জাতির মধ্যে ভদ্রতা নাই, যারা পাপ ও অন্যায় করতে ব্যস্ত, তাদের বেঁচে থাকা না থাকা একই কথা।

জগতের এই যে কর্মব্যস্ততা, মানব-সুখের জন্য এই যে শত আয়োজন, এই যে জ্ঞান বিজ্ঞান প্রচার, সবার উদ্দেশ্য জাতির প্রত্যেক মানুষকে ভদ্র ও মানুষ করে তোলা। যার মধ্যে মনুষ্যত্ব আছে তিনি ভদ্র। মানবের কল্যাণ হয় কীসে? সত্য-সাধন নিয়ত মধুর বিনয়ী জীবনে। যে জীবনে ভদ্রতার পরশ নাই, সে যতই কোনো ধর্ম-কাজ করুক না, তার মূল্য খুব কম। সেই ব্যক্তিরই ধার্মিক বলে পরিচয় দেবার অধিকার আছে, যার অন্তর-বাহিরে ভদ্র, সুন্দর ও সত্য।

মানুষকে কোনো বিশেষ ধর্ম গ্রহণ করার জন্যে আহ্বান করে বিশেষ কোনো লাভ আছে কি না, ঠিক বুঝতে পারি না। মানুষকে সুন্দর, মহৎ ও প্রেমিক হতে বলাই বোধ হয় শ্রেষ্ঠ ধর্মপ্রচারকের কাজ।

যে দুঃখ করে, যে ভয় করে, যে অনবরত হায় হায় করতে থাকে, তার অভিশপ্ত জীবন জগতে দুঃখ বর্ধন করে!

যদি পাপ-অন্যায়ে জীবন কলঙ্কিত হয়ে থাকে, যদি কারো প্রতি কোনো অবিচার করে থাকে, যদি সত্য পালন করতে পরাজিত হয়ে থাকে, তা হলেই তোমার দুঃখ হতে পারে! আর কোনো কারণেই তোমার মুখ ভার করবার দরকার নাই। অনন্ত মানুষকে নত মাথায় নমস্কার করে হাসি ও গানের আনন্দে তুমি জীবনপথে অগ্রসর হও। হিংসা পরশ্রীকাতরতা, অহঙ্কার তোমার ভিতর হতে দূর হোক। মানুষের বুকের সঙ্গে বুক লাগিয়ে প্রেম ও পুণ্যের গান গাও।

মানবজীবনে যতই দুঃখ-বেদনা থাক না, আনন্দের সঙ্গে তা বরণ করে নিতে হবে। মুখের হাসি চিত্তের স্ফুর্তি, সরল আলাপ, সকল বিপদ-আপদকে দূর করে দেয়। জীবনে নিরানন্দের কিছুই নাই-এ জীবন আনন্দ প্রবাহের একটা বিরাট বন্যা।জীবন-আকাশে মেঘের সঞ্চার হয়েছে, আল্লাহর নামে কেবল হাসতে থাক–ঐ মেঘ উড়ে যাবে।

সলোমন (Solomon) বলেছেন–যার প্রাণ স্ফুর্তিতে ভরা তার মুখোনি দেখলে প্রাণের গ্লানি দূর হয়। সে শুধু নিজের আনন্দে নিজেই মশগুল থাকে না; যারা তার আত্মীয়, যারা তার বন্ধু, তাদের প্রাণেও তাকে দেখে সাহস ও শক্তি আসে। উল্লাস ও আনন্দে যার প্রাণভরা সে শুধু আমাদেরকে বলে, জীবনে দুঃখের কোনো শঙ্কা নাই, মৃত্যুতে কোনো অশ্রু নাই–এস আল্লাহ্র নামে আমরা আমাদের দুঃখের বোঝা মাটিতে নামিয়ে রাখি; সকল। অবস্থায় সন্তুষ্ট থেকে তার আদেশগুলি পালন করি, মানুষকে যথাসম্ভব সুখ ও আনন্দ দেই।

আনন্দহীন জীবনের ভার বইবার মতো দুরবস্থা মানবজীবনে আর আছে কী? ব্যবসায়ে ক্ষতি হয়ে গিয়েছে, ঋণভারে মাথা নত হয়ে পড়েছে, মানুষের কড়া কথা শুনে প্রাণ অস্থির হয়ে উঠেছে, যা সম্পত্তি ছিল সব বেরিয়ে গিয়েছে, এসব ভেবে কাঁদলে চলবে না। যতদূর সম্ভব মানুষের কাছে নত হয়ে নিজের ত্রুটি স্বীকার কর, দীনাবস্থাকে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট থাক, হায় হায় করো না! তাতে কোনো লাভ হবে না জীবনের দুঃখ আরও বেড়ে যাবে–জীবন সমস্যার কোনই মীমাংসা হবে না।

আনন্দ-উৎফুল্ল মুখের শক্তি অসাধারণ, সমস্ত বিশ্বই তার বন্ধু। তার সকল বিপদের মীমাংসা হয়ে যায়। সে কারো সঙ্গে উগ্র হয়ে কথা বলে না। প্রতিবাদ করতে হলে সে কখনও ধৈর্য হারায় না, মানুষের মতের প্রতি সে শ্রদ্ধা পোষণ করে; কথায় ও ব্যবহারে সে কখনও দাম্ভিকতার পরিচয় দেয় না!

একটা মধুর কথা, একটু স্নেহের হাসি, ক্ষুদ্র হলেও মানুষের কাছে তা অতি বড় দান। মানব জীবনকে মধুময় করে তুলবার আর শ্রেষ্ঠ উপায় কী আছে, জানি না। দেশ ও জাতির মধ্যে একটা মহাবিপ্লব ও পরিবর্তন এনে নিজেকে শ্রেষ্ঠ করে তুলবার বাসনা করবার কোনো দরকার নাই। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সহানুভূতির উপহারে তুমি তোমার জীবনকে মধুর ও শ্রেষ্ঠ করে তোল, তাই তোমার পক্ষে যথেষ্ট। দেশপূজ্য মহাপুরুষ হবার কোনো দরকার নাই। তোমার ক্ষুদ্র সমাজে, তোমার ছোট গ্রামে, তোমার বন্ধু মহলে তুমি একজন আদর্শ

ভদ্রলোক হও। বেশি কিছু দরকার নাই। সমুদ্র তরঙ্গ তুলে, ভয়াবহ মূর্তি ধারণ করে, প্রাণে ভীতি, বিস্ময় ও শ্রদ্ধা সৃষ্টি করে সত্য, কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শান্ত শীতল বারিস্রোতগুলির কি কোনো সার্থকতা নাই? তারা কল কল করে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যায়, ক্লান্ত পথিক অঞ্জলি ভরে তার সুশীতল জল পান করে।

মানব-জীবনে সহানুভূতি একটা শ্রেষ্ঠ গুণ। যিনি ভদ্রলোক তার প্রাণ সহানুভূতিতে ভরা থাকবেই। যিনি মানুষকে সহানুভূতি দেখাতে অভ্যস্ত নন, তাঁকে ভদ্রলোক বলতে মন কুণ্ঠা বোধ করে।

নিজের সুখ-দুঃখ, নিজের উন্নতি নিয়ে আমার চিত্ত সর্বদা ডুবে আছে, যাদের মধ্যে বাস করি, যারা সর্বদা আমার পাশে পাশে ঘোরে, যারা আমার প্রতিবেশী, যারা জীবন সংগ্রামে অনেক আঘাত সয়েছে, তাদের প্রতি কি কোনো কর্তব্য নাই? এ জগতে নিজের কথা নিয়ে সবাই ব্যস্ত, পরের কথা ভাববার মতো প্রাণ তোমার হওয়া চাই, পরের জন্য সর্বস্ব তুমি দান কর এ আমি বলছি নে। হাজী মহসীন বা ফরাসি দেশের প্রাতঃস্মরণীয় গেঁয়োর মতো ত্যাগ মহিমায় তোমার জীবন উজ্জ্বল হোক, এত বড় কথাও আমি বলতে চাইনে। আমি চাই তোমার প্রাণ নিজের মধ্যেই যেন ডুবে না থাকে। এমন করে আত্মাকে বিনষ্ট করে ফেললে তোমার মনুষ্যত্বের প্রতি খুবই অবিচার করা হবে। রেল স্টেশনে বিপন্ন। ভদ্রলোকের বাক্সটি যদি ধরে তুলে দাও, তাতে তোমার ক্ষতি হবে না; শহরের রাস্তায় অপরিচিত পথিককে হাসিমুখে তার পথের সন্ধান বলে দেওয়া তো দোষের নয়। পথের ধারে যে পড়ে গিয়েছে, তার ব্যথিত অঙ্গে হাত বুলিয়ে দেওয়া লজ্জার কথা নয়,–হোক সে যে-কোনো জাতির লোক।

ক্ষিপ্ত উন্মত্ত ঘোড়ার বন্ধু চেপে ধরে তুমি সাহসিকতার পরিচয় দাও–এও আমি বলছি নে! অপরের প্রতি অবিচার করে মানুষের দুঃখ-ব্যথার প্রতি উদাসীন হয়ে নিজের সুখ-সুবিধাটুকু আদায় করে নিতে ভদ্রলোক সবসময়ই লজ্জাবোধ করেন। এরূপ সুবিধা তাকে মোটেই আনন্দ দেয় না।

পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল যদি আমরা হই, তা হলে মানবসমাজের কত সুখ বেড়ে যায়! অপরের অভাব ও দুঃখ-ব্যথা যদি আমরা নিজের মতো করে অনুভব করতে না শিখি, তা হলে মানব সমাজের মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবার ষোল আনা আনন্দ হতে আমরা বঞ্চিত হবো।

ভদ্রলোকের ব্যবহার দেখেই বুঝতে পারা যায়, তিনি কত উচ্চস্তরের লোক। তার কথা ও কাজ সর্বদাই সুন্দর। ধর্ম-জীবন তার স্বতন্ত্র নয়। এক শ্রেণীর লোক আছেন যারা ধর্ম জীবনকে নিজের কথা ও কাজ হতে স্বতন্ত্র করে গ্রহণ করতে চান। ধর্ম-জীবন অর্থ শুধু উপাসনা করা নয়! মানুষের সহিত ব্যবহার যদি নির্মল মধুর না হয়, তবে আমরা নিত্য যত রকমের জীবনের কাজ সমাধান করি, তা যদি অন্যায়ের কলঙ্ক হতে স্বতন্ত্র করে না রাখতে পারি, তা হলে আমাদের ধর্ম পালন ঠিক হবে না। যে জীবন পাপ, অন্যায় ও মিথ্যায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে তার ধর্ম কার্য করতে যাওয়া একটা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই না। জীবনের কাজগুলিই এক প্রকার উপাসনা। যথার্থ ধার্মিক পুরুষ কি অভদ্র, নীচ, শঠ ও প্রতারক হতে পারেন? মানুষকে ঠকিয়ে তিনি কখনও মসজিদে যেতে সাহস পান না। ধর্মকে স্বতন্ত্র করে দেখা তখনই সম্ভব হয়, যখন মানুষের মনের অধঃপতন ঘটে। অনুন্নত চিত্তের মানুষ মনে করে খোদার দয়া ভিক্ষা করলেই তার সঙ্গে প্রেম করা হয়-এবাদত করলেই ধর্ম-জীবনের কর্তব্যগুলি শেষ হয়। আসলে তা হয় না। আল্লাহর সঙ্গে প্রেম করার অর্থ-আমাদের জীবনকে সর্ব প্রকারের কলঙ্কমুক্ত করে তোলা। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি কেন? আমার অন্যায়, আমার হীনতা, আমার পাপকে ঢাকবার জন্য। মানুষের মাথায় বাড়ি দেওয়া, পরের ঘরে সিদ কাটাই যে জঘন্য জীবনের একমাত্র নিদর্শন তা নয়। ধার্মিক মানুষকে খুব উঁচুতে উঠতে হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কথা, মানব জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনাগুলি দিয়ে দীর্ঘ জীবনের ঘর গড়া হয়। ভাঙ্গা পুরানো ইট, খারাপ সুরকী দিয়ে যেমন ভাল ঘর হয় না, তেমনি ছোট ছোট অন্যায় কাজ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নীচ ব্যবহার আমাদের জীবনকে পরিপূর্ণ ও সুন্দর করে তুলতে পারে না।

ভদ্রলোক যিনি, তিনি ভদ্রলোকের সম্মান বুঝে থাকেন। ভদ্রলোক যেমন নিজের সম্মানও বোঝেন, অন্যের সম্মান ঠিক তেমনি করে বোঝেন। তার সম্মুখে যদি কোনো ভদ্রলোকের অপমান হয়, তিনি নীরবে তা সহ্য করতে পারেন না। বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে থাকলেও ভদ্রলোক ভদ্রলোকের বন্ধু। মুহূর্তের মাঝে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়ে যায়। যে নীচ ও দুবৃত্ত, সে নিতান্ত আপনার জন হলেও ভদ্রলোক তাকে আপনার বলে স্বীকার করতে ইচ্ছা করেন না। নিজের অসুবিধা হলেও ভদ্রলোক ভদ্রলোকের সুবিধা করে দিতে আনন্দবোধ করেন। ভদ্রলোক চিরকালই গুণগ্রাহী। ছোট চিরকাল ছোট থাকবে। পাছে নিজের সম্মান নষ্ট হয়, এই ভয়ে ভদ্রলোক মানুষের গুণ স্বীকার করতে লজ্জা বোধ করেন না। তিনি ইচ্ছা করেন, যে গুণী তাঁর সম্মান ও আদর হোক। যেখানে গুণের আদর হয় না, যেখানে ন্যায়, সত্যের অসম্মান হয়, ভদ্রলোক সেখানে দুঃসহ দুঃখ বোধ করেন।

মানুষের মন যখন ছোট হয়ে যায়, যখন গুণ ও মনুষ্যত্ব অপেক্ষা বাইরের চাকচিক্যকে মানুষ বেশি সমাদর করে, তখনই সে অন্যায় লাভ করতে চায়। কোনো জাতির মধ্যে মানুষ যখন মানুষের গুণ স্বীকার করে না, অন্যায় ক্ষমতার জোড়ে উঁচু আসন অধিকার করে রাখে, তখন হতেই তাদের পতন আরম্ভ হয়। ছোটকে বড় করা, মানুষের মনুষ্যত্বকে সমাদর করা এবং প্রয়োজন হলে নিজে নিম্নসনে বসাই শ্রেষ্ঠ মানুষের কাজ।

খলিফা আলী (রাঃ) যখন মুসলমান সাম্রাজ্যের অধিশ্বর হলেন, তখন সিংহাসনের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি জনমণ্ডলীকে বল্লেন–আমার চেয়েও যদি কোনো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্ধান আপনারা পান, তবে তাকেই সিংহাসনে বরণ করে নিন। আপনাদের আদেশ আজ আমি গ্রহণ করলাম, কিন্তু যখনই উপযুক্ত ব্যক্তি সন্ধান পাবেন, তখন যেন আমাকে বাদ দেওয়া হয়। হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন একজন যথার্থ ভদ্রলোক। তাঁর মধ্যে যে মহত্ত্ব, মনুষ্যত্বের গরিমা ছিল, তার তুলনা কোথায়?

ভদ্রলোক সব সময়েই ভদ্র। তিনি মানুষকে শ্রদ্ধা করতে ভালবাসেন। তিনি শ্রদ্ধা করে, মানুষকে–মনুষ্যত্ব ও মহত্ত্বের পথে আকর্ষণ করেন। তাঁর মুখের স্থির গাম্ভীর্য তার দৃষ্টি, তাঁর কথার আশ্চর্য ভঙ্গি মানুষকে আশ্চর্য রকমে উন্নত করে তোলে, তিনি উগ্র কঠিন হয়ে কারো কাজের সমালোচনা করে না, তার স্পর্শ, তার সঙ্গ আত্মার উপর মহত্ত্বের আলোক ছড়াতে থাকে। তার হাসিটুকু মানুষের মনে স্বর্গের কিরণ এনে দেয়। তিনি কাপুরুষ নন, অথচ তার তেজ কখনও উগ্রভীষণ হয়ে দেখা দেয় না। তিনি বিপদে ধৈর্য ধারণ করেন, ঝঞ্ঝার মাঝে তিনি আশা, আনন্দ ও শক্তির অমৃত বর্ষণ করেন।

ভদ্রলোক কখনও নীচ নন। মনের স্বাধীনতা রক্ষা করতে তিনি সদাই ব্যগ্র। মনের স্বাধীনতা যেখানে থাকে না, সেখানে তিনি অগ্রসর হন না। তার বহু টাকা ক্ষতি হয়ে যাক, জীবনে দুঃখের মাত্রা বেড়ে উঠুক, অভাবের বেদনা তাকে চেপে ধরুক, তবুও তিনি তার চিত্তের অবমাননা সহ্য করতে পারেন না।

রাণা প্রতাপ যখন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পুত্র-কন্যাদি নিয়ে বন-জঙ্গলে আশ্রয় নিলেন, তখনকার অবস্থা একবার চিন্তা কর। যার সুখের অন্ত ছিল না, সম্মান রক্ষার জন্য তিনি কত দুঃখ ভোগ করেছিলেন। সম্রাট আকবরের কাছে একটু বশ্যতা স্বীকার করলেই তাকে এত কষ্ট পেতে হতো না। যার মধ্যে মনুষ্যত্ব ও আত্মমর্যাদা জ্ঞান রয়েছে, তিনি জানেন fত্তর স্বাধীনতার মূল্য কত। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে মরে যাই সেও ভালো, তবু নিজের অমর্যাদা দেখতে ভদ্রলোক পছন্দ করেন না। বাদশাহ্ আকবর গুণগ্রাহী ছিলেন, তিনি রাণাকে সম্মান করেছিলেন। সম্রাট আকবর ভদ্রলোক ছিলেন। রাণাং ছিলেন ভদ্রলোক, তাই ভদ্রলোকের কাছে ভদ্রলোকের অবমাননা হয় না। হিন্দু হলেও রাণার মনের উচ্চতা কি মুসলমানের শ্রদ্ধা পাবার যোগ্য নয়?

দু’টি পয়সার জন্য যিনি নীচতার পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেন না, নিজের সম্মানের কথা ভুলে একটুখানি ক্ষতি স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করেন, যার জীবনের মর্যাদা সম্বন্ধে কোনো জ্ঞান নাই, তিনি কীরূপ ভদ্রলোক? বহু ভদ্রলোকের সঙ্গে তোমার আত্মীয়তা আছে, অনেক বড় লোক তোমার বন্ধু, তোমার মাসিক আয় হাজার টাকা, তুমি গাড়ি ঘোড়ায় চড় কিন্তু তুমি কাপুরুষ, মানুষ অসন্তুষ্ট হবে, নিজের আর্থিক ক্ষতি হবে ভেবে তুমি সত্য প্রকাশ করতে ভয় পাও–তুমি কি ভদ্রলোক? জান না, নিজের মনুষ্যত্বের কাছে সংসারের অর্থ বৈভবের মূল্য এক পয়সাও নাই। অসত্য ও অন্যায়কে মেনে নেবার বেদনা ভদ্রলোক। কখনও সহ্য করতে পারেন না।

ভদ্রলোক জ্ঞানের সেবক। দুনিয়ার পণ্ডিতমণ্ডলীর সঙ্গে তিনি যোগ না রেখে পারেন; কোন মহাপুরুষ কী বলে গিয়েছেন, দেশের চিন্তাশীল ব্যক্তিরা কী নতুন কথা বলছেন, এ জানবার জন্য তার মনে একটা স্বাভাবিক ব্যাকুলতা থাকবেই। পুস্তক পাঠ করা, দেশের খবর রাখা তাঁর জীবনের একটা বড় কর্তব্য। সাংসারিক আপদ-বিপদে তাঁর মন অবসন্ন। হয়ে পড়ে, ব্যাধির প্রকোপ শরীরে স্ফুর্তি না থাকতে পারে, নানা প্রকার দুর্বিপাকে সময়ে সময়ে তিনি নিজেকে নিঃসহায় মনে করতে পারেন, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই জ্ঞানালোচনাকে তিনি বাদ দিতে পারেন না। এ তার রোগশয্যার পরম বন্ধু, দুঃখের মাঝে আশা, বিপদের সান্ত্বনা, ধর্ম জীবনের অবলম্বন।

জগৎ দেশ ও সমাজের যিনি খবর রাখেন না, চিন্তাশীল পণ্ডিতমণ্ডলীর চিন্তার সঙ্গে যার যোগ নাই, তিনি নিজের আভিজাত্যের গৌরব করতে পারেন। কিন্তু তার মূর্খ জীবনের মূল্য খুব কম। ভদ্রলোক যিনি পরিচয় দিতে যাবেন, তাকে বিচক্ষণ হতে হবে। বিশ্বের কোনো খবর রাখি না, জাতির চিন্তার সঙ্গে আমার কোনো যোগ নাই, নিজের চিন্তা নিয়ে ডুবে আছি, আমার জীবনের বিশেষ মূল্য কী? ভদ্রলোক যিনি তাকে জীবন ভরে শরীর পোষণ করবার সঙ্গে সঙ্গে আত্মাকেও খোরাক যোগাতে হবে। শরীরের স্বাস্থ্যই শুধু স্বাস্থ্য নয়। দীনহীন আত্মাকে ঘিরে যদি একটা মূল্যহীন শরীর বেঁচে থাকে, তবে তাতে আনন্দ করার বিশেষ কিছু নাই। দুর্বল শরীরের উজ্জ্বল আত্মা বহন করা বরং ভালো কিন্তু সুস্থ দেহে অন্ধ আত্মার ভার বহন করা বড়ই লজ্জাজনক। জীবনের বহু অভাবকে আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি, কিন্তু পুস্তক, জ্ঞানীগণের অমূল্য উপদেশ, চিন্তাশীল পণ্ডিতের চিন্তাকে বাদ দিয়ে আমরা কিছুতেই বেঁচে থাকতে পারি নে। একদিন না খেয়ে থাকা উত্তম কিন্তু জ্ঞানীগণের সঙ্গে সংস্রব না রেখে জীবন কাটিয়ে দেওয়া ভদ্রলোকের পক্ষে নিতান্তই অশোভন। আমরা যেমন শরীরকে নিত্য আহার দিচ্ছি, আত্মাকেও তেমনি নিত্য জ্ঞানের খোরাক দিতে হবে। জ্ঞানের সঙ্গে যোগ না রেখে, যিনি হাসি-খেলা করে সংসারের সকল অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে জীবনকে উড়িয়ে দিতে পারেন তিনি কীরূপ ভদ্রলোক।

শুনেছি শীতকালে মহৎ ব্যক্তিরা নাকি ভাড়ে ভাড়ে টাকা দান করতেন। অনবরত যাকে তাকে টাকা দান করলে বিশেষ মনুষ্যত্বের পরিচয় দেওয়া হয় না। ভদ্রলোক দরিদ্র ও দুঃখী মানুষকে অর্থদান করেন নামের জন্য নয়; সেরূপ না করে তিনি পারেন না। যার অর্থের আবশ্যকতা নাই অথবা যেখানে দান করলে মানুষের প্রকৃত উপকার হয় না সেখানে অর্থ দান করবার দরকার নাই। দয়া প্রদর্শনে অথবা দান কার্যে অত্যাধিক হিসাব তর্ক করাও ভদ্রতা নয়।

ভদ্রলোকের প্রাণ দয়া-প্রেমে পরিপূর্ণ। তিনি বাড়ির কুকুর-বিড়ালের প্রতিও বিবেচনাশীল। নিষ্ঠুরতা বা অন্যের ভাব ও দাবির প্রতি অবহেলা প্রদর্শন তার স্বভাবে ভাল লাগে না। তিনি যেমন নিজের সুখ-সুবিধার প্রতি মনোযোগী, অন্যের প্রতিও ঠিক তেমনি মনোযোগী।

1 Comment
Collapse Comments

অসাধারণ লেখুনি বস ..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *