২. যশোর রোড ধরে

।। ২৷৷

কৈগাছি কোলকাতা থেকে মাত্র বিয়াল্লিশ কিলোমিটার দূরে- যশোর রোড ধরে যেতে হয়। তবে রাস্তা তেমন ভালো নয় আর ট্র্যাফিকও ভীষণ, সুতরাং সময় লাগে অনেকটা। আমারা থাকব ছায়ানীড়-এ। ওটা একটা গেস্ট হাউস কমবয়সি এক দম্পতি চালায়। একেনবাবু ওঁর পুলিশি সূত্র কাজে লাগিয়ে জায়গাটি আবিষ্কার করেছেন। কৈগাছিতে থ্রি-স্টার হোটেল আশা করা যায় না। তবে জায়গাটা নাকি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর ভাড়াও খুব রিজনেবল। ভাড়া যে আনরিজনেবল নয়, সেটা আমাকে না বললেও বুঝতাম। একেনবাবুর মতো হাড়কেপ্পন লোক হিসেবপত্তর না করে জায়গাটা বুক করতেন না। তাছাড়া কৈগাছি টুরিস্ট স্পট নয়। ডিসেম্বরের শেষের দিকটা হল বেড়ানোর মোক্ষম সময়। এই সময়ে কৈগাছিতে ছুটি কাটাতে কে আসবে! এগুলো বলছি বটে, কিন্তু কলকাতা থেকে বেরিয়ে পড়ার একটা আনন্দ আছে। যশোর রোডে যখন পড়লাম, তখন অজস্র ট্রাক, সাইকেল রিক্সা, গাড়ি, বাস ইত্যাদির দৌরাত্ম সত্ত্বেও মনে বেশ ফুর্তিই এল।

আমি গাড়ি চালাচ্ছি, পাশে প্রমথ –আমার ন্যাভিগেটর। একেনবাবু পেছনে।

আমি বললাম, “বেশ লাগছে, না রে?”

প্রমথ তার উত্তর না দিয়ে বলল, “ঐ যাঃ, মশারিটা প্যাক করতে ভুলে গেছি।”

প্রমথ মশার কামড় সহ্য করতে পারে না। আর মশারাও প্রমথকেই টার্গেট করে। কোথাও মশা থাকলে আমাদের থেকে প্রমথই কামড় খায় বেশি।

“গেস্ট হাউসে নিশ্চয় মশারি থাকবে।” আমি ভরসা দিলাম।

“তোর মুণ্ডু।”

“তাহলে কোনো দোকান থেকে একটা কিনে নিস।”

“তুই পয়সা দিবি?”

“আমি কেন দেব? সমস্যাটা তো তোর!”

প্রমথ চটল, তাই অন্য লাইন ধরল। “বেশ আমিই কিনব, কিন্তু তুই দোকান খুঁজে বের করবি।”

“আমি মশারির দোকান কোথায় পাব!”

“তাহলে বললি কেন-দোকান থেকে কিনে নিস। সব সময়ে বড় বড় কথা।”

আমাদের তর্কাতর্কি বন্ধ করার জন্যে একেনবাবু বললেন, “যাই বলুন স্যার, কলকাতার বাইরে এলেই মনটা বেশ ঝরঝরে হয়ে যায়।”

“গুড, তা বলে গান ধরবেন না, বাপি গাড়ি চালাচ্ছে। এমনিতেই ও আনস্টেডি।”

“জানলে তো ধরব স্যার, গান আমার আসেই না।”

“বাঁচিয়েছেন। আপনার ঐ ঘ্যানঘ্যানে গলায় গান এলে, সত্যিই একটা সমস্যা হতো।”

প্রমথ অকারণে মানুষকে আঘাত করে। আমি প্রমথকে বললাম, “তোর বাজে কথা বলাটা একটা স্বভাবে দাঁড়িয়েছে।”

“কোনটা বাজে কথা?”

“এই একেনবাবুর গান নিয়ে।”

“বাজেটা কী বললাম, গলায় সুর থাকলেই তো শুধু হয় না, সেটা শ্রুতিমধুর করার জন্য গলার একটা ক্যারেক্টার চাই। সেটা একেনবাবুর নেই।”

“তোর ওপিনিয়ন আমরা কেউ শুনতে চাই না।”

“না চাইলে শুনিস না। তোর মতো গা বাঁচিয়ে আমি চলি না।”

“তোর সঙ্গে তর্ক করা অর্থহীন।” আমি বিরক্ত হয়ে বললাম।

“গুড, তোর একটু লেট-এ বোঝা স্বভাব।”

সারাটা পথ এইরকম হাবিজাবি অবান্তর কথা চালাচালি করেই কাটল। পাক্কা আড়াই ঘন্টা লেগে গেল ছায়ানীড়ে পৌঁছতে। কুড়ি মিনিট অবশ্য একস্ট্রা লাগল জায়গাটা খুঁজে পেতে। বাড়িটা বড় রাস্তার ওপর নয়। একটা ছোটো মেঠো রাস্তা ধরে বেশ খানিকটা যেতে হয়। খান ছয়েক কুঁড়েঘর পার হয়ে, রাস্তার ওপর বসা ছাগল, মুরগির পালকে ক্রমাগত হর্ন দিতে দিতে সরিয়ে রাস্তাটা যেখানে ডান দিকে মোড় নিয়েছে সেখানে পৌঁছনোর পর বাড়িটা চোখে পড়ে। বড় রাস্তায় অবশ্য ছায়ানীড় এইদিকে বলে একটা ছোটো সাইন বোর্ড আছে, কিন্তু সেটা প্রথমবার মিস করেছিলাম।

বাড়িটা নতুন রঙ করা –ছিমছাম সুন্দর। মালিক সুবীর দাস আমাদের জন্য বাইরের ঘরে বসে অপেক্ষা করছিলেন। আমাদেরই বয়সি-হয়তো বা একটু ছোটোই;

বেঁটেখাটো গোলগাল ফর্সা চেহারা। বয়সের তুলনায় মনে হল একটু বেশি সিরিয়াস। ঘরে ঢুকতেই “আসুন আসুন, বসুন,” বলে অভ্যর্থনা জানালেন। তারপর চেঁচিয়ে একজনকে ডেকে বললেন, “একটু চা কর, ওঁরা এসে গেছেন।”

যাঁকে ডাকলেন তিনিও এক ঝলকের জন্য দেখা দিলেন। শ্যামলা রঙ, বড় বড় চোখ, কোঁকড়ানো চুল টেনে খোঁপা করে বাঁধা, মিষ্টি চেহারা। সুবীরবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন, “আমার স্ত্রী অঞ্জনা।”

আমরা উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করলাম।

অঞ্জনা বেশ সপ্রতিভ। বললেন, “চায়ের সঙ্গে একটু টা-ও দিচ্ছি, দুপুরের খাবার কিন্তু একটার আগে পাওয়া যাবে না।”

আমি একটু ভদ্রতা করলাম, “শুধু চা হলেই চলবে।”

প্রমথ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “ওর কথা শুনবেন না, আপনার যা ইচ্ছে তাই করবেন।”

অঞ্জনা মুখ টিপে হেসে ভেতরে চলে গেলেন।

সুবীরবাবু আমাদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা মনে হচ্ছে বেশ ভালোই বন্ধু।”

“একেবারে প্রাইমারি স্কুল থেকে, প্রমথ বলল। “সেই থেকে ওকে সামলাতে হচ্ছে। তবে ইনি আমাদের নতুন বন্ধু –বিখ্যাত গোয়েন্দা একেন্দ্র সেন।”

“কী যে বলেন স্যার,” একেনবাবু একটু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেন।

“কেন বলব না –লোককে তো জানাতে হবে, বাপির কলমের জোরে আপনার পরিচিতি হবে ভেবে থাকলে পস্তাবেন।”

আমি প্রসঙ্গটা পালটাবার জন্যেই বললাম, “আমাদের ঘরগুলো কোথায়?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসুন,” বলে সুবীরবাবু আমাদের নিয়ে বাইরে এলেন। বাড়ির পাশ দিয়ে সিমেন্ট-বাঁধানো সরু প্যাসেজ পেছনের দিকে চলে গেছে। একটু এগোলেই পাশাপাশি তিনটে ঘর। ঘরে ঢোকার জন্য আলাদা আলাদা দরজা। পাশে একটা করে ছোটো জানলা। সবগুলোই বন্ধ। প্যাসেজের উলটো দিকে মাঝারি সাইজের ফুলের বাগান। একেনবাবু সেটা দেখে মুগ্ধ।

“গ্র্যান্ড বাগান স্যার আপনার! সত্যি কোলকাতায় এসব ভাবা যায় না….এত বড় সাইজের ডালিয়া আমি বহুদিন দেখিনি।”

সুবীরবাবু খুশি হলেন বাগানের প্রশংসায়। “এবারের ডালিয়া বেশ ভালো হয়েছে। তবে এর থেকে আরও অনেক বড় ডালিয়া দেখবেন প্রশান্তদার বাগানে।”

“উনি কি কাছাকাছি থাকেন?”

“খুবই কাছে, সামনের রাস্তাটা যেখানে শেষ হয়েছে।”

“সেটা তো দেখতে হচ্ছে স্যার।”

.

আমার আর প্রমথর কারোরই ফুলের ব্যাপারে উৎসাহ নেই। প্রমথ বলল, “তার আগে আমাদের ঘরগুলোর ভেতরটা দেখি।”

“ও হ্যাঁ,” বলে সুবীরবাবু একটা দরজা খুললেন। “সবগুলো ঘরই এক রকম।”

ঘরটা বন্ধ ছিল বলে একটু ভ্যাপসা গন্ধ। সেটা অবশ্য একটু বাদেই চলে গেল। এমনিতে ভেতরটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ফার্নিচার বলতে একটা ডাবল বেড, মাথার পাশে দুটো নাইট স্ট্যান্ড, দুটো চেয়ার। এক দিকের দেয়ালে জামাকাপড় রাখার জন্য একটা ক্লজেট। তার পাশেই আয়না লাগানো নীচু ড্রেসিং টেবিল।

“প্রত্যেকটা ঘরেই অ্যাটাচড বাথরুম,” একটু গর্বের সঙ্গেই বললেন সুধীরবাবু। “ওগুলোকে মর্ডান স্টাইলে করেছি বিদেশি বা আপনাদের মতো গেস্টদের জন্য।”

বাথরুমটা একটু উঁকি দিয়ে দেখলাম। কমোডটা দেশি বা ওয়েস্টার্ন স্টাইল কোনোটাই নয়, আবার দুটোই। অর্থাৎ, দেশি স্টাইলেও হাঁটুমুড়ে বসা যায় আবার চেয়ারের মতো করেও যায়। কী জানি স্পেশাল নাম আছে এগুলোর, ঠিক মনে পড়ল না।

টয়লেট টিস্যু অবশ্য দেখলাম না, শুধু জলের কল আর মগ। গিজার লাগানো শাওয়ার আছে, সেই সঙ্গে বালতিও।

শাওয়ার খুললে পুরো বাথরুমটাই ভিজে যাবে। বিদেশি পর্যটকদের সেটা পছন্দ হবে না, তবে আমাদের কোনো অসুবিধা নেই।

সুবীরবাবু এতক্ষণ আমাদের রি-অ্যাকশন দেখছিলেন। দেখা শেষ হলে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনাদের পছন্দ হয়েছে?”

প্রমথকে সন্তুষ্ট করা শক্ত। পাছে ও একটা বাঁকা মন্তব্য করে বসে তাই আমি বললাম, “বেশ ভালোই তো।”

একেনবাবু সেটাকে আরেক ধাপ চড়িয়ে বললেন, “ভাবাই যায় না স্যার, এত সুন্দর বন্দোবস্ত। বিদেশি গেস্ট বললেন, সাহেবরাও এখানে আসেন নাকি স্যার?”

“লোক-উৎসব দেখতে গত বছর দু’জন সাহেব এসেছিলেন আমেরিকা থেকে। ওঁরাও বাথরুমের অ্যারেঞ্জমেন্ট দেখে খুশি হয়েছিলেন।”

“না হবার তো কোনো কারণ নেই স্যার।”

ব্যাগগুলো নিজেদের ঘরে রেখে সবাই বাইরের ঘরে এসে বসলাম। সুবীরবাবু বললেন, “যখন খুশি এখানে এসে বসবেন –এটা মন বসার ঘর। সকালের খাবারটা এখানেই খাওয়া হয়। পাশে খাবার ঘর –লাঞ্চ আর ডিনার সেখানে হয়। সকাল আটটায় ব্রেকফাস্ট, একটায় লাঞ্চ আর রাত আটটায় ডিনার। আপনারা তো নন-ভেজ, তাই না? আগেই অবশ্য আমার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল।”

“ভেজ, নন-ভেজ কিছু একটা হলেই চলবে।” আমি বললাম, “কিন্তু আপনার স্ত্রী আবার এই দশটার সময় কষ্ট করে রান্না করছেন –ব্রেকফাস্টের সময় তো অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে।”

“আরে তাতে কী হয়েছে, সময়টা কিছু বাঁধাধরা নয়। সময়ের অত হিসেব করলে কি চলে?”

প্রমথ এতক্ষণ টেবিলের ওপর রাখা একটা পত্রিকা তুলে নিয়ে চোখ বোলাচ্ছিল। পত্রিকাটা নামিয়ে বলল, “আমরা দু’দিন থাকব, সেটা তো আপনাকে আগেই জানানো হয়েছে, কিন্তু যদি সেটা এক্সটেন্ড করতে হয়, পারা যাবে?”

“নিশ্চয়ই। আগামী সপ্তাহে বুকিং আছে, এ সপ্তাহটা এখন পর্যন্ত ফাঁকা।”

“গুড।”

“এক্সটেন্ড করার কথা কেন ভাবছিস?” আমি একটু অবাক হয়ে প্রমথকে জিজ্ঞেস করলাম।

“কারণ রান্নার সুন্দর গন্ধ পাচ্ছি।”

প্রমথর রসিকতাটা সুবীরবাবু বোধহয় ঠিক ধরতে পারলেন না। রেজিস্ট্রি বইয়ের পাতা উল্টে বললেন, “নেক্সট উইকের মঙ্গলবার পর্যন্ত নিশ্চিন্ত মনে এখানে কাটাতে পারেন।”

তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “এ দু’দিন কোথাও বেড়াতে যেতে চান আপনারা?”

“কিছু দেখার আছে এখানে?” প্রমথ উলটে প্রশ্ন করল। “তেমন কিছু নেই। একটা ভাঙ্গা প্রাসাদ আছে –রাজা জগদীশনারায়ণের। এখন ওটা একটা পোড়ো বাড়ি –সমাজ বিরোধীদের জায়গা। দিনদুপুরে অবশ্য কোনো ভয় নেই। প্রাসাদের পেছনের বাগানটা এখনও আছে, একটা ট্রাস্ট দেখভাল করে। এই সময়টাতে অনেক ফুলের গাছ দেখবেন। ক’দিন বাদে এলে কাছেই একটা লোক-উৎসব হয়, সেখানে যেতে পারতেন। বেশ বড় মেলা বহু লোক আসে। তখন আশেপাশে কোথাও থাকার জায়গা পাওয়া কঠিন।”

“অন্য সময়ে আপনার গেস্টরা স্যার কারা?” একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

বার বার ‘স্যার’ শুনে সুধীরবাবু যে অসোয়াস্তি বোধ করছেন, সেটা বুঝছিলাম। এবার উনি বলেই ফেললেন, “আমাকে ‘স্যার, স্যার’ বলে লজ্জা দিচ্ছেন কেন।”

“ঐ লজ্জাটা আপনাকে কয়েক দিন পেতে হবে, প্রমথ গম্ভীর মুখে বলল, “একেনবাবু আমাদেরও ‘স্যার’ বলেন। ও নিয়ে না ভেবে উত্তরটা দিন –এখানে সাধারণত কারা থাকেন?”

“কাছাকাছি কয়েকটা কারখানা হয়েছে, তাদের ভেন্ডার সাপ্লায়েররা কেউ কেউ আসেন। এছাড়া আশেপাশে বেশ কিছু কনস্ট্রাকশন চলছে। কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ইঞ্জিনিয়াররা মাঝে মাঝেই দু-এক মাসের জন্য ঘর ভাড়া নিয়ে নেন। কেউ কেউ আবার নিরিবিলিতে সময় কাটানোর জন্যেও আসেন-যেমন আপনারা এসেছেন।”

“আমরা কিন্তু স্যার নিরিবিলিতে সময় কাটানোর জন্যে ঠিক আসিনি।”

“তাহলে কীসের জন্যে এসেছেন?” সুবীরবাবুর চোখে কৌতূহল।

.

এমন সময় অঞ্জনা একটি কাজের মেয়েকে নিয়ে চা, পরোটা আর আলুর তরকারি নিয়ে ঢুকলেন। সুন্দর গন্ধে ঘরটা আমোদিত হয়ে উঠলো।

“চায়ে চিনি বা দুধ দিইনি, আপনারা পছন্দ মতো মিশিয়ে নিন।”

“থ্যাঙ্ক ইউ।” বলে প্রমথ একটা প্লেট তুলে নিয়ে আমার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে অঞ্জনাকে বলল, “আমার মনে হয় না, বাপি খাবে বলে। ওরটাও আমি খাচ্ছি।”

“আরও অনেক পরোটা আর তরকারি আছে,” অঞ্জনা হেসে প্রমথকে অভয় দিয়ে সুবীরবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাকেও দেব?”

“আরে না, আমি তো একটু আগেই খেলাম।”

আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। বললাম, “আমরা একলা একলা খাব?”

উত্তরটা ওঁদের আগে প্রমথই দিল, “খাস না। তোকে তো কেউ খেতে সাধছে না।”

এবার অঞ্জনাও বললেন, “আপনারা সত্যিই ভীষণ বন্ধু –এরকম আজকাল বেশি দেখি না।”

আমরা খাওয়া শুরু করতে সুবীরবাবু বললেন, “আপনারা বেড়াতে আসেননি বললেন, তাহলে কীসের জন্য এসেছেন?”

“আসলে স্যার এখানে বহুদিন আগে একটা মার্ডার হয়েছিল, সেটা নিয়ে একটু খোঁজখবর করতে।“

কথাটা শোনামাত্র সুবীরবাবু আর অঞ্জনা চোখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। আমাদের কারোরই সেটা নজর এড়ালো না। প্রমথ বলল, “একেনবাবু নিউ ইয়র্কের একজন বিখ্যাত গোয়েন্দা, আপাতত কলকাতায় আছেন। একজনের অনুরোধে ওটা নিয়ে খোঁজখবর নিতে এসেছেন।”

সুবীরবাবু গলায় একটু উত্তেজনার আভাস পেলাম, “কতদিন আগের কথা বলছেন?”

“তা প্রায় বাইশ বছর আগের ঘটনা।”

“কিন্তু সেই খুনের জন্যে তো একজনের জেল হয়েছিল। ক’দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম সে মারাও গেছে।”

“ঠিকই দেখছেন স্যার।”

“তাহলে?”

“তার উত্তরটা তো স্যার এখনও জানি না। প্রশ্নটা শুধু জানি।”

“কী প্রশ্ন?”

“যে খুনি বলে শাস্তি পেয়েছে, সেই আসল খুনি কি না।”

সুবীরবাবু অঞ্জনার দিকে তাকালেন।

অঞ্জনা বললেন, “বেশ কয়েক বছর আগে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক একই কারণে এসেছিলেন, আমার বাবার সঙ্গে অনেক কথাও হয়েছিল তাঁর।”

“ভদ্রলোকের নাম কি বিনয়বাবু?”

“হ্যাঁ, ঐ রকমই একটা নাম বলেছিলেন। আপনি তাঁকে চেনেন?”

প্রমথ আমাকে দেখিয়ে বলল, “তিনি এঁর মামা।”

তাতে অবশ্য অঞ্জনা বা সুবীরবাবুর বিস্ময় কাটল না।

একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, আপনারা কী ব্যাপারটা সম্পর্কে কিছু জানেন, বা এমন কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারেন যাঁর সেই সময়কার কথা মনে আছে?”

“সেটাই মুশকিল,”সুবীরবাবু বললেন। “যাঁরা জানতেন, অর্থাৎ অঞ্জনার বাবা আর আমার বাবা-তাঁদের কেউ বেঁচে নেই।”

“অঞ্জনা অনুচ্চস্বরে বলল, ওর বাবাও খুন হন সেই সময়ে –রাজা জগদীশনারায়ণের সঙ্গে।”

অঞ্জনার শেষ কথাটা আমরা কেউই এক্সপেক্ট করিনি।

“মাই গড! সুরেশ মিত্র আপনার বাবা স্যার?” একেনবাবু সুবীরবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন।

সুবীরবাবু এই প্রশ্নে ক্ষণিকের জন্য একটু থতমত খেয়ে গেলেন, তারপর বললেন, “হ্যাঁ।”

“আমি একটু কনফিউজড স্যার। আপনার পদবী তো দাশ, উনি তো ছিলেন মিত্র?”

“উনি যখন মারা যান, আমি তখন ছোটো। মা তারপর আরেক জনকে বিয়ে করেন, তাঁর পদবীই আমি ব্যবহার করি।”

অঞ্জনা বললেন, “আমার বাবার সঙ্গে সুবীরের দুই বাবারও খুব বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু একটা কথা বলুন তো, এতদিন বাদে আপনাদের কেন মনে হচ্ছে যে আসল খুনি ধরা পড়েনি?”

“হয়তো ধরা পড়েছে ম্যাডাম। ওই যে বিনয়বাবুর কথা বললেন, তাঁর মানে একটা খটকা ছিল। আর আমাদেরও হাতে কোনো কাজকর্ম নেই, তাই ভাবলাম বেড়ানোও হবে আর রহস্য নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটিও হবে।”

অঞ্জনা বলল, “আমি ডিটেকটিভ গল্প ভীষণ ভালোবাসি, আমি আপনাদের যা সাহায্যের দরকার করতে পারি। কিন্তু একটা কন্ডিশনে- কী করে রহস্যভেদ করলেন জানাতে হবে।”

“থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম, থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, নিশ্চয়ই জানাব।”

“সবই বুঝলাম, তবে লাঞ্চ না হওয়া পর্যন্ত আপনি এদিকে কোনো অ্যাটেনশন দেবেন না।” প্রমথ সতর্ক করল।

“না, দেব না,” অঞ্জনা বুদ্ধিমতী– প্রমথকে ইতিমধ্যেই চিনে নিয়েছেন। “লাঞ্চের আইটেম মোটেও কম হবে না।”