২. ব্ল্যাক টাউন আর ব্ল্যাক জমিদার

ব্ল্যাক টাউন আর ব্ল্যাক জমিদার

সুদূর পশ্চিমের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে জাপানের পূর্ব উপকূলের মধ্যে এমন কোনও স্থান নেই, যেখানে মানুষের বিচারবুদ্ধি, সৌন্দর্যবোধ, রুচিজ্ঞান এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চিন্তা এমনভাবে লাঞ্ছিত হয়েছে। কথাগুলো বলেছিলেন ম্যাকিনটস সাহেব ১৭৮০ সালে। কলকাতা সম্পর্কে এই লাইনটি তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যের সারমর্ম। তবে ম্যাকিনটসের এই কলকাতা সাহেবের কলকাতা নয়, নেটিভের কলকাতা। কলকাতায় তখন দুই নগরী। সাহেবপাড়া আর ব্ল্যাক টাউন। ট্যাংক স্কোয়ার আর চৌরঙ্গি সাহেবপাড়া। রাজপুরুষ আর বিদেশি সওদাগরদের বাস এখানে। এখানকার চেহারা তাই ভিন্ন, জীবন ভিন্ন। নবাগত যে দেখে, সে-ই তাকিয়ে থাকে। ‘এমন বাহারের শহর আর হয় না। এশিয়ায় তো নেই-ই। পৃথিবীতেও অল্পই আছে।’ চৌরঙ্গির কলকাতা দেখে এমন মন্তব্য করেছেন অনেকেই। মেকলে থেকে লর্ড ভেলেনসিয়া।

কিন্তু ব্ল্যাক টাউনে উঁকি দিয়েই মত বদলাতে হয়েছে তাঁদের। অন্ধকার, তাকানো যায় না এমনই অন্ধকার এ শহরে। অজ্ঞতা, অসভ্যতা, অশালীনতার জমাট অন্ধকার। দেখে কিপলিং পর্যন্ত আঁতকে উঠলেন: ‘Palace, bire hovel, poverty and pride side by side!’

ডা. রোনাল্ড মার্টিন বলেছেন: ভারতের সব শহরের সব ত্রুটিগুলো জড়ো হয়েছে এখানে। ‘এ কী বিশৃঙ্খলা, এলোপাথাড়ি বাড়ি, খানা, ডোবা, গলি। হই-হট্টগোল, কোনও রীতি নেই, শৃঙ্খলা নেই। যেন স্থায়ী গৃহযুদ্ধ লেগে আছে এ শহরে।’ লিখেছিলেন প্রাইস।

অথচ আজকের মতো তখনও ব্ল্যাক টাউনই শহর কলকাতা। আজ শুনি কলকাতার দশ ভাগের এক ভাগ জুড়ে আছে বস্তি। শহরের এক চতুর্থাংশ লোকের বাস সেখানে। সেদিনও ছিল প্রায় তাই। ১৮২২ সালে কলকাতার বাড়ি গুনতি হয়েছিল একবার মাথা গুনতির মতো। তাতে দেখা গেল শহরে বাড়ি আছে মোট ৬৭,৫১৯খানা। তার মধ্যে ১৫,৭৯২খানা টালির বাড়ি, ৩৭,৪৯৭খানা খড়ো ঘর। আর বাকিগুলো একতলা কিংবা দোতলা পাকা বাড়ি।

ব্ল্যাক টাউনেও পাকা বাড়ি ছিল। শহরের ব্রাউনেরা তাতে বাস করতেন। বিরাট এলাকা জুড়ে বিরাট বিরাট বাড়ি। অন্দরমহল, বৈঠকখানা, খাজাঞ্চিখানা, তোষাখানা, আস্তাবল। সদর দরজা, খিড়কি দরজা। কিন্তু অপরিচ্ছন্ন। তাদের প্রচুর টাকা, প্রবল বশ্যতা। তদুপরি উৎসবে-ব্যসনে সাহেবদের খানা দেয়। সেলাম করে। সাহেবরা এদের খাতির করে বলেন ‘বাবু’। কিন্তু বাড়িগুলোকে স্থানান্তরিত করেননি, করতে দেননি। কারণ বাবু হলেও তারা ব্ল্যাক। ব্ল্যাকের জন্যে ব্ল্যাক টাউন। এশিয়া-আফ্রিকায় যেখানেই বসবাস করেছে ইংরেজরা সেখানে তারা তৈরি করেছে এক নগরে দুই শহর। ব্ল্যাক আর হোয়াইট টাউন। সাদায় এবং কালোয়, রাজায় এবং প্রজায় ব্যবধানটুকু বজায় রাখতে এ তাদেরই সৃষ্টি।

কলকাতার ব্ল্যাক টাউন তাই বিস্ময় নয়। বিস্ময় ব্ল্যাক টাউনের জীবন। এ জীবন আজও প্রায় এক। অষ্টাদশ শতকের ব্ল্যাক টাউনের বিবরণ শুনুন একটু, তারপর একবার তাকিয়ে দেখুন আজকের মহানগরীর দিকে। দেখবেন খ্যাতিতে যত বেড়েছে, মূল অর্থে ঠিক তত বদল হয়নি কলকাতার চরিত্র।

ব্ল্যাক টাউনে পা দিন একবার। পা ছাড়া গতি নেই। গাড়ি, ঘোড়া পালকি সবই আছে এ শহরে। কিন্তু এখানে এসব চলবে না। ১৮৪৫ সালে গভর্নর এক কমিটি বসিয়েছিলেন শহরের অবস্থা সরেজমিনে তদন্ত করার জন্যে। তাঁরা জানিয়েছিলেন ব্ল্যাকটাউনে নাকে রুমাল গুঁজে (…rankest compound of villaious that ever offend nostrill) পায়ে হেঁটে চলতে হয়েছে তাদের। সরু সরু গলি, সরু সরু মানুষ। রাশি রাশি এলোপাথাড়ি বাড়ি আর জঞ্জাল। তারপর আছে অগুনতি ডোবা, গাছপালা। এদের বাড়িঘর দেখলে বিস্মিত হতে হয়। বাংলা দেশের সনাতন গৃহশিল্প এখানে এসে যেন সব ভুলে গেছে। কোনওমতে একটুখানি ঠাঁই পেলেই এরা লেগে যাচ্ছে বাড়ি তৈরির কাজে। প্রথমেই জায়গাটার এক কোণ থেকে মাটি কাটবে কিছুটা। সে মাটিতে তৈরি হবে বাড়ির ভিত, আর গর্তটিতে পুকুর। তারপর এই মাটি আর আশপাশে যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে ওই ভিতখানার চারদিকে খাড়া হবে বুক-উঁচু দেওয়াল। অবশেষে তার উপরে চাপানো হবে একখানা ছাউনি—খড়, গোলপাতা, টালি, যা জোটে। বাড়ি হল। প্রবল বর্ষায় পুকুরখানাও জলে থই থই। শুরু হল গৃহস্থালি। ব্ল্যাক-টাউনের জীবন। ব্ল্যাক-টাউনের এই বাড়ি ঘরদোর দেখে কেউ কেউ লিখেছেন—দেখলে মনে হয়, যেন আয়ার্ল্যান্ডের দরিদ্রতম শ্রেণীর কেবিন দেখছি। কেউ আবার বললেন, সুসভ্য আইরিশদের সঙ্গে এদের তুলনাই চলে না। মিসিসিপির তীরে যে অসভ্য কাঠুরিয়ারা বাস করে তাদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে বাঙালিদের তুলনা চলে না। পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে বোধ হয় এখানকার মতো দশ ভাগের ন’ভাগ লোক খোলা মেঝেয় ঘুমোয় না।

যেমন বাড়ি তেমনই বাসিন্দা, তেমনই পরিবেশ। চারদিকে কাঁচা খোলা নর্দমা। নর্দমায় পড়ে পড়ে পচছে কুকুর, বেড়াল, জঞ্জাল মায় মানুষ। মানুষ শুনে চমকে উঠবেন না। নিজের চোখে দেখে লিখে গেছেন গ্যাঁপ্রি সাহেব। টেরিটি বাজারের বিপরীত দিকে একটা বাড়িতে ছিল সাহেবের বাস। তিনি লিখেছেন রোগে এবং অ্যাকসিডেন্টে বহু হতভাগ্য রাস্তায় মারা পড়ে। আমার দরজার গোড়াতেই এমন একটা মৃতদেহ পড়ে ছিল। শেয়ালেরা দু’ রাত্তির ধরে তাতেই ভোজ সারল।

ব্ল্যাক টাউনে একটি মৃতদেহই নয়, মরা মানুষের ভিড়ের চাক্ষুষ বর্ণনা রেখেই গেছেন আর এক লেখক তাঁর স্মৃতিকথায়। তিনি হিকি। হিকি ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ দেখেছিলেন। তাতে ব্ল্যাক টাউনে ১৫ জুলাই থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই নাকি লোক মরেছিল ছিয়াত্তর হাজার। তবে হিকি বলেছেন: সৌভাগ্য এই শেয়াল, শকুনেরও অস্বাভাবিক ভিড় হয়েছিল তখন। ‘(Fortunately an extraordinary folk of carnivorous birds, animals and vermin were allured from their fastness and their solitudes by the purefactions of the scene).’

ব্ল্যাক টাউনের মৃতের ভরসা শেয়াল আর শকুন। জীবিতের ভরসা দারিদ্র, সারাদিন খেটে ‘এক পেন্স কিংবা আধা পেন্সে’র রোজগার নিয়ে সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফেরে ব্ল্যাক টাউনের নাগরিক তখন চারদিকে শুরু হয়েছে শেয়ালের চিৎকার আর মশার গুঞ্জন। সন্ধ্যায় আগুন পড়ল উনুনে উনুনে। অন্ধকার নগর আর এক প্রস্ত অন্ধকার জড়িয়ে নিল গায়ে। ধোঁয়ার অন্ধকার। একটু শান্ত হল মশা। নয়তো, অনাহারক্লিষ্ট শরীরটাকে সকাল পর্যন্ত ঘুম পাড়িয়ে রাখা যেত কি না কে জানে! সাহেব স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা তাই নেটিভদের এই সন্ধ্যায় উনুন ধরানোর রীতিটার যারপরনাই প্রশংসা করেছেন। ‘(… It is indeed indebted to smoke raised in the public streets…huts and sheds for any respite it enjoys from mosquitoes)’

অদ্ভুত লোক এই ব্ল্যাক টাউনের বাসিন্দারা। ধোঁয়া এদের মশার ওষুধ। তাবিজ এদের কলেরার ধন্বন্তরি। এদের খাদ্যাখাদ্য বিচার নেই, ভালমন্দ বোধ নেই। জুয়া ছাড়া খেলাধুলা জানে না। ঋণ ছাড়া উপার্জনের পথ জানে না। সপ্তদশ, অষ্টাদশ শতকের ব্ল্যাক-টাউন সম্পর্কে সাহেবদের এই হচ্ছে সংক্ষিপ্ত অভিমত।

তাই বলে ব্ল্যাক টাউন একেবারে ব্ল্যাক নয়। এখানে আলো জ্বলে—শত শত ঝাড়লণ্ঠনের আলো। শ্রাদ্ধ হচ্ছে মহারাজা নবকৃষ্ণের পুণ্যশ্লোকা মায়ের। ন’লাখ টাকা খরচ হবে। হবে না কেন? সামান্য নিমু মল্লিক, সে-ই মাতৃক্রিয়ায় খরচ করেছে তিন লাখ টাকা আর মহারাজা নবকৃষ্ণ করবে তার চেয়ে কম? অন্ত্যেষ্টি চলছে ব্ল্যাক টাউনে দেওয়ান কাশী মিত্তিরের। চন্দনকাঠ, ধূপ-ধুনা। এলাহি ব্যাপার। এমনই প্রতিদিন কত এলাহি ব্যাপার হচ্ছে ব্ল্যাক টাউনে। সাহেবপাড়াতেও এমন হয় না। গভর্নমেন্ট গেজেটে বের হল—বাবু রামদুলাল সরকার জানাচ্ছেন: আগামী ৭ এবং ১১ ফাল্গুন তাঁর দুই পুত্রের শুভবিবাহ। এতদুপলক্ষে ১ এবং ২ ফাল্গুন ইউরোপীয় অতিথিবর্গকে আপ্যায়িত করার ব্যবস্থা হয়েছে। ১৩ এবং ১৬ ফাল্গুন যথাক্রমে হিন্দু এবং আরব মুঘল অতিথিদিগের জন্যে নির্দিষ্ট হয়েছে। ভোজদিনে তদীয় সিমলার বাড়িতে নাচ এবং অন্যান্য আমোদ ও আহ্লাদাদির ব্যবস্থা থাকবে, ইত্যাদি। অন্য এক খবরে শোনা গেল, রামদুলাল সরকারের শ্রাদ্ধ উপলক্ষে এই ব্ল্যাক টাউনেই ভূ-ভারত ঘেঁটে পণ্ডিতদের জমায়েত করা হয়েছে। যেসব দ্রব্যাদি উপহার দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে রৌপ্য এবং স্বর্ণপাত্রাদি অন্যতম। কয়েক লক্ষ দরিদ্রনারায়ণকে ভোজন ও তৎসহ এক টাকা হিসাবে ভোজনদক্ষিণা দেওয়া হয়েছে।

সুতরাং ব্ল্যাক টাউন একেবারে অথই অন্ধকার ছিল না। এখানে যাত্রা, কবিগান, বুলবুলির লড়াই, বেড়ালের বিয়ে, সঙের মিছিল ইত্যাদি ক্রীড়া-কৌতুকও ছিল। ছিল অতিথিখানা, মন্দির, ঘাট তৈরি ইত্যাদি ‘জনহিতকর’ কাজও।

কী করে ব্ল্যাক টাউনের ব্রাউনেরা এসবের খরচ জোগাতেন তা একটা প্রশ্ন বটে। এ প্রশ্নের উত্তর কী করে নয়। তবে এজন্যে কদাপি হোয়াইটদের পকেটে হাত দিতে হত না তাদের। তারাও তো পয়সার সন্ধানেই এসেছে এখানে। ব্রাউনদেরও তাই লক্ষ্য ছিল ব্ল্যাকরাই। একটিমাত্র এমনই ব্রাউনের কাহিনী বলছি এখানে। ব্ল্যাক টাউনের একটি ব্ল্যাক জমিদারের কাহিনী। উদাহরণস্বরূপ তিনিই যথেষ্ট।

তাঁর নাম গোবিন্দরাম মিত্র। গোবিন্দরাম ছিলেন কলকাতায় ব্ল্যাক জমিদার। ঠাট্টা করে দেওয়া নাম নয়, ওটাই ছিল তাঁর সরকারি পদবি। কলকাতায় তখনও মিউনিসিপাল শাসন গড়ে ওঠেনি। কোম্পানির রাজত্ব তখনও আধা-স্বপ্ন, আধা-বাস্তব। সেকালে শহর কলকাতার শাসক ছিলেন মাত্র একজন লোক। তাঁকে বলা হত জমিদার। কর্নওয়ালিসের জমিদার আর এ জমিদারের অনেক ফারাক। এ জমিদার ছিলেন রাজকর্মচারী এবং সাহেব, এবং তিনিই ছিলেন এ শহরের সর্বময় কর্তা। তাঁর হাতে ছিল শহরের লোকেদের উপর ট্যাক্স বসানো, ট্যাক্স আদায়, হিসাবপত্র রাখা, সুখ-শান্তি দেখাশুনা করা, বিবাদ-বিসংবাদ মীমাংসা করা ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি বাড়ি জমি গাড়ি থেকে বিয়েতে পাওয়া ক্রীতদাস ইত্যাদির উপর ট্যাক্স বসাতেন এবং আদায় করতেন। দেওয়ানি ফৌজদারি মামলা মোকদ্দমার বিচারকও ছিলেন তিনি। লোককে জরিমানা করা, অন্যবিধ দৈহিক শাস্তি দেওয়া, জেল খাটানো এমনকী ফাঁসি দেওয়ার পর্যন্ত অধিকার ছিল তাঁর। তবে ফাঁসি দিতে হলে কোম্পানির কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হত এই যা। এই সাহেবের মাইনে ছিল ২,০০০ টাকা। তবে তিনি কিছু কমিশনও নাকি পেতেন। যত আদায় হত তার উপর শতকরা হিসাবে সামান্য কিছু। অবশ্য এ ছাড়া অন্যবিধ স্বাধীন ব্যবসা তো তাঁর ছিলই।

এ-হেন পদটির একটি মাত্র মুশকিল ছিল এই পদটি কারও জন্যেই স্থায়ী ছিল না। কোম্পানির কী মর্জি, বছর বছর লোক বদল করে, এমনকী কখনও কখনও বছরে দু’ বার। ফলে কলকাতার শাসক হতেন নিত্য নতুন লোক। হয়তো এমন লোক এলেন যাঁর কোনও অভিজ্ঞতা নেই এদেশ সম্পর্কে, নেটিভদের বিষয়ে। অথচ কলকাতা নেটিভেরই শহর। তার উপর আর এক মুশকিল হিসেবপত্র রাখতে হবে সব দেশীয় ভাষায়। কী করে কাজ চলবে তা হলে? অনেক ভেবেচিন্তে কোম্পানি তাই নিয়োগ করতেন একজন দেশীয় সহকারী নেটিভ ডেপুটি। নাম হল, তার ব্ল্যাক জমিদার। ব্ল্যাক জমিদার বছর বছর বদল হয় না। ফলে তিনিই হয়ে উঠতেন কার্যত শহরের মালিক।

১৭২০ সালে প্রথম জমিদার নিযুক্ত হলেন শহর কলকাতায়। সঙ্গে সঙ্গে নিযুক্ত হলেন একজন ব্ল্যাক ডেপুটি বা ব্ল্যাক জমিদার। তিনিই আমাদের গোবিন্দরাম। মাসে মাইনে তিরিশ টাকা। মুখ বুজে ওই টাকাই ফতুয়ার পকেটে গুঁজে গোবিন্দরাম বাড়ি ফেরেন। আর মনে মনে হাসেন। তারপর ক’বছর বাদে কোম্পানিকে বললেন, মাইনেটা একটু বাড়িয়ে দাও, নয়তো যা দিন পড়েছে, আর যে চলে না। কোম্পানির দয়া হল। গোবিন্দরামের মাইনে আরও ২০ টাকা বাড়িয়ে দিলেন তাঁরা। এবার সাকুল্যে দাঁড়াল মাসে পঞ্চাশ টাকা। কিন্তু এ উপলক্ষ মাত্র। কুড়িয়ে নিতে জানলে এ-পদে টাকার অভাব নেই। গোবিন্দরাম সেটা জানতেন। ফলে অচিরেই তাঁর সিন্দুক ভরে উঠল। এবং ভরতে ভরতে তিরিশ বছর পরে গোবিন্দরামের খাজাঞ্চিখানা এমন চেহারা নিলে যে, কে বলবে তিনি পঞ্চাশ টাকা মাইনের চাকুরে।

কিন্তু সহসা গোবিন্দরামের ভাগ্যাকাশে আবির্ভূত হল জীবন্ত শনি। হলওয়েল (১৭৫২) জমিদার নিযুক্ত হলেন কলকাতার। গোবিন্দরামকে চেপে ধরলেন তিনি। কোম্পানির কাছে তাঁর অর্থোপার্জনের কাহিনী বিস্তারিত বিবরণ উপস্থিত করলেন তিনি সাক্ষ্য প্রমাণাদি সহ। গোবিন্দরাম বিপাকে পড়লেন। কিন্তু ঘাবড়ালেন না। কোম্পানির কর্তাদেরও তিনি চিনতেন। দেখা গেল, ক্রমে তাঁরা দয়ালু হয়ে উঠেছেন। গোবিন্দরাম তাঁদের নরম করে ফেলেছেন। লোকে বলে এ তাঁর ব্ল্যাকমানির কাজ। তাঁরা তাঁকে জেলেও পুরলেন না, ফাঁসিও দিলেন না। বরখাস্ত করলেন। হলওয়েলের নাকের সামনে ‘ছড়ি’ ঘোরাতে ঘোরাতে বেরিয়ে এলেন গোবিন্দরাম।

এবার ধর্মকর্ম। ব্ল্যাক টাউনের লোক অবাক হয়ে দেখল আকাশছোঁয়া মন্দির উঠছে তাদের পাড়ায়। গোবিন্দরাম মন্দির গড়লেন চিৎপুরে। বিরাট মন্দির। ১৬৫ ফুট উঁচু। হলওয়েল মনুমেন্টের চেয়ে অনেক, অনেক বড়। মাইল মাইল দূর থেকেও চিকচিক করে মন্দিরের উপরকার সোনার কলস, ধ্বজা। নবরত্ন মন্দির। ধন্যি ধন্যি রব পড়ে গেল ব্ল্যাক টাউনে।

চারদিকে ধন্য ধন্য রবের মধ্যেই একদিন বিগত হলেন গোবিন্দরাম। ক্রমে ১৭৩৭ সালের প্রবল ঝড়ে গুঁড়িয়ে গেল একদিন তাঁর নবরত্ন মন্দিরও। কিন্তু বেঁচে রইল ব্ল্যাক টাউন। বেঁচে রইল ব্ল্যাক জমিদাররাও। অবশ্য বেসরকারিভাবে। সরকারিভাবে গোবিন্দরামই প্রথম এবং শেষ ব্ল্যাক জমিদার। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরিরা বোধহয় আজও আছে। কলকাতা বোধহয় আজও ব্ল্যাক টাউনই এবং সাহেবদের হারিয়ে বোধ হয় পুরোপুরি ব্ল্যাক। কালো, অন্ধকার।

চিনেপাড়ায় গৃহযুদ্ধ

‘Tom Fatt, native of China, begs to inform the Gentlemen of Calcutta and the public in general, that any person having tanks in their gardens, or elsewhere, and being desirous to have them cleared out, he will contract with them for the same upon very reasonable terms, being certain that he can finish the work quicker than any Bengali people, by means of a China Pump. Any Gentleman willing to contract with the said Mr Fatt, is requested to enquire as his Rum Works, at Sulkey opposite Calcutta.

N. B. He makes Loaf-Sugar equal in quality to that made in Europe, and excellent Sugar-candy. Also all sorts of cabinet work, the same as in China.’

বিজ্ঞাপনটি ছাপা হয়েছিল ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ ১৭৮৪ সালের পয়লা এপ্রিল তারিখে। জনৈক টম ফ্যাট জানাচ্ছেন: কারও বাগানে বা অন্যত্র পুকুর থাকলে তিনি নামমাত্র পারিশ্রমিকে তা পরিষ্কার করে দিতে পারেন। এবং বাঙালিদের তুলনায় অল্পায়াসে। কারণ, তাঁর একটি চিনা পাম্প আছে। শুধু কি তাই? টম ফ্যাট আরও জানাচ্ছেন, তিনি চিনি তৈরি করতে পারেন। ইউরোপে তৈরি চিনির চেয়ে তা কোনও অংশেই খারাপ নয়, রুটি দিয়ে দিব্যি খাওয়া চলে। তা ছাড়া তিনি কাঠের আসবাবও তৈরি করেন। চিনা কাঠের কাজ। এককথায়, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ। বিশেষত টম ফ্যাট-এর ঠিকানা বলছে তিনি মদ তৈরিতেও দক্ষ। তাঁকে ধরতে হলে যেতে হবে সালিখায় রাম্-এর কারখানায়।

বিজ্ঞাপনটি পড়ে সেদিনের ক্যালকাটা গেজেট-এর পাঠকরা মনে মনে কী ভেবেছিলেন কে জানে! তবে কোনও পাঠক এ কথা নিশ্চয়ই ভাবেননি যে, কেউ তাঁকে ‘এপ্রিল ফুল’ বানাতে চাইছেন। কেননা, ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছেন এই নয়া-শহরে আবির্ভূত হয়েছেন পরদেশি এক বিশ্বকর্মার দল। তাদের পক্ষে এক হাতে পাঁচ রকমের কাজ মোটেই অসম্ভব কিছু নয়। সাধারণত নিঃশব্দেই কাজ করেন তাঁরা। তবে মাঝে মাঝে উঁকি দেন খবরের কাগজের পাতায়ও। তখন অবশ্য অকাজের কথাও শোনা যায়। তবে সে দৈবাৎ। যেমন ১৮২৭ সালের এপ্রিলে ‘সম্বাদ তিমিরনাশক’-এ প্রকাশিত একটি খবর। তাতে বলা হয়েছিল, কুড়ি-পঁচিশজন চিনা নাকি মত্ত অবস্থায় একদিন ভোরে শিবপুর এবং হাওড়ায় মহা অশান্তি সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত সালিখা থানার দারোগা চৌকিদার পাঠিয়ে তাদের শান্ত করেন। এরকম আগেই বলেছি, চিনাদের ক্ষেত্রে হট্টগোল নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম। সত্যি বলতে কি, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে লিংফু কিংবা ছাতাওয়ালা গলির লিং চি-কে একালেও কেউ ঝগড়া করতে দেখেছেন বলে শোনা যায় না। এমনকী লিং-গিন্নি এবং মুকসেদ আলির কন্যার মধ্যে কলপাড়ে সামান্যতম বিতণ্ডার কথাও না। কোলেপিঠে গোটা তিন চার ছেলেমেয়ে, কাঠের বালতি হাতে মিসেস লি বরাবর চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। অন্যরা কল ছেড়ে গেলে তবেই এগিয়ে দেন বালতিটা। শুধু কলপাড়েই বা বলি কেন, ট্রামে, বাসেও নিশ্চয়ই চিনা যাত্রীদের দেখা যায়। কিন্তু কথা বলতে শোনা যায় দৈবাৎ। সহযাত্রীদের সঙ্গে তো পরের কথা, এমনকী, লক্ষ করলে দেখতে পাবেন কন্ডাক্টার-এর সঙ্গেও কোনও কথাবার্তা নেই তাঁদের। গুনে পয়সা দেন, টিকিট নেন। এমনভাবে পয়সা দেন যাতে আর খুচরো ফেরত নিতে হয় না। নিতে গেলেই পাছে কথা বলতে হয় এবং কথা বললে যদি বাক্যবিনিময় ক্রমে বাক-যুদ্ধ হয়, সেই আশঙ্কাতেই বুঝি ওঁরা সর্বক্ষণ মৌনযাত্রী। এ হেন চিনারা উনিশ শতকের প্রথমে হাওড়ায় কেমন করে হাঙ্গামা বাঁধিয়েছিলেন কে জানে। তবে আগেই বলেছি, চিনাদের ক্ষেত্রে এটা নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম। খবরের কাগজে তার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় টম ফ্যাটদের বিজ্ঞাপনগুলো। ‘ক্যালকাটা গেজেট’ থেকেই পড়ে শোনাচ্ছি আর একটি বিজ্ঞপ্তি: ‘A Hoy teacher of foreign tongue, too much chin chins every stranger Gentleman, very too much late come from Europe have, and begs leave to acuaint them that he can talkee lesson everyday, in the Canton dialect, at his house in Mo. 4 Old China Street have got, from two o’clock ten minutes till four o’clock everyday…etc. etc…

দীর্ঘ বিজ্ঞাপন। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮১৭ সালে। বাবুদের ইংরেজির মতোই অ্যা হয়-এর ইংরেজি নিয়ে নিঃশব্দে রসিকতা করেছেন ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এর প্রকাশকরা। বেচারা অ্যা হয়-কে তাঁরা শোধরাবার কোনও চেষ্টাই করেননি। পাঠক তবু জানেন অ্যা হয়, কী বলতে চান। অ্যা হয়, যাকে বলে বিলাত ফেরত চিনাম্যান। কলকাতার সাহেবদের তিনি চিনা ভাষা শেখাতে চান। সেটাই কিন্তু তাঁর একমাত্র পেশা নয়। পুরো বিজ্ঞাপনটি পড়লে জানা যায়, চিনা বাজারে তাঁর একটি দোকান আছে। সেখানে কেনাকাটার সঙ্গে পড়াশোনা সবই চলতে পারে। আরও নানা কাণ্ড। এক কথায় টম ফ্যাট-এর মতো তিনিও আর এক বিশ্বকর্মা।

এঁদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল একদিন কলকাতায় রহস্যময় চায়না-টাউন। শহরের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য, সবচেয়ে আকর্ষণীয় মহল্লা। চিনা ভাষায় লেখা সাইন-বোর্ড। সী ঈপ মন্দির। পেতলের মূর্তি। কাচের মাছ। রঙিন কাগজের লণ্ঠন। ধুনোর গন্ধ। তেলের বাতি। আঁকাবাঁকা ঘিঞ্জি গলি। গলির বাঁকে চপ হাউস, চাউ-শপ। আবছা অন্ধকারে জীর্ণ অট্টালিকার তলপেটে ফ্যানটান জুয়ার আড্ডা। কোথাও বা প্রবাদের অপিয়াম ডেন, চরসের আখড়া। লম্বা লম্বা বাঁশের নল।। হেঁড়া সতরঞ্চি আর চট। স্তিমিতনেত্র খদ্দেরের দল। অগস্টাস সমরভিল-এর দুর্ধর্ষ নায়ক আবদুল। রূপসী রোজ লী। রেশমি রুমাল। রক্ত। হায়, আমাদের শুধু সমরভিল-ই ছিলেন, ছিলেন না কোনও পার্ল বাক কিংবা সমারসেট মম। থাকলে চায়না টাউন এত দ্রুত মুছে যেতে পারত না আমাদের স্মৃতি থেকে। একজন বাঙালি লেখক এই সেদিনও সেখানে পাক দিয়ে এসে লিখতে বসেছিলেন ‘আমার চিন ভ্রমণ’।

কলকাতা থেকে সে চিন আজ বলতে গেলে লুপ্তপ্রায়। এখনও আছে মন্দির, গির্জা। এখনও রয়েছে বিখ্যাত সব রেস্তোরাঁ। কিছু দোকান পসরা। কিন্তু সেই চায়নাটাউন আজ আর নেই। গলির বদলে আজ সেখানে চওড়া রাস্তা, বিবর্ণ ঘরবাড়ির ঠাঁই দখল করেছে দীঘল সব অট্টালিকা। তবে সংখ্যায় অনেক কমে গেলেও কলকাতায় এখনও রয়েছেন চিনারা। ভারতে যদি তাঁদের সংখ্যা হয় পনেরো হাজার তবে তার মধ্যে সাড়ে বারো হাজারেরই বাস নাকি কলকাতা এবং তার আশেপাশে। ১৯৬১ সালের লোকগণনায় বলা হয়েছিল কলকাতায় চিনাদের সংখ্যা ৮৮১৪ জন। কলকাতার বাইরে তাঁদের সংখ্যা: দার্জিলিং-৪৮২ জন, জলপাইগুড়ি—৪৬৬ জন, মুর্শিদাবাদ—৪ জন, ২৪ পরগনা—৩৪৭ জন, হাওড়া—২৪ জন, হুগলি—৯৯ জন, বর্ধমান—১২৯ জন, বীরভূম-১০ জন, মেদিনীপুর—৪ জন। ১৯৬২ সালের একটি সরকারি হিসাব থেকে শোনা গিয়েছিল শহরে তখন নাকি সমবেত প্রায় পনেরো হাজার চিনা। তার মধ্যে দু’ হাজার জন নয়া চিনের পাসপোর্টধারী। চারশো ভারতের নাগরিক হয়েছেন। বাকি সবাই স্টেটলেস, রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীন। আশি জন চিনাকে তখন নাথুলা দিয়ে চালান দেওয়া হয়েছিল স্বদেশে। হাজার আটেক-কে আটক করা হয়েছিল সুদূর রাজস্থানে দেউলি ক্যাম্পে। সেখান থেকে ফেরত পাঠানো হয় চিন দেশে। সত্যি বলতে কী, কলকাতার চিনাদের জীবনে এমন দুঃসময় আর কখনও আসেনি। হঠাৎ চারিদিক ঘিরে অন্ধকার। এমনকী কাপড়-ধোলাইয়ের দোকানগুলো পর্যন্ত অনিশ্চয়তায়। খদ্দেররা নিজেদের জামাকাপড় ফেরত চান। কে জানে, দোকান যদি বন্ধ হয়ে যায়!

সে দুর্যোগের রাত অবশ্য কেটে গেছে। কমপক্ষে পাঁচ হাজার চিনাকে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় নাগরিকত্ব। কলকাতার চিনারা আবার ফিরে পেয়েছেন তাঁদের স্বচ্ছন্দ জীবন। বিশ্বকর্মার দল আবার মগ্ন যে যাঁর কাজে। কেউ চামড়া-ব্যবসায়ী, কেউ জুতোর কারিগর, কেউ কাঠের, কেউ দোকানি। দোকান বলতে চিনারা প্রধানত খাবারের দোকান, চুল কাটার দোকান, কাপড় কাচার দোকানই চালান। অন্য প্রিয় পেশা তাঁদের কাঠের কাজ বা দাঁত বাঁধাই। চিনা ডেনটিস্টদের পসার যদি আজ কমতির দিকে তবে সে ঘাটতি পুষিয়ে নিচ্ছে চিনা ডাইং-ক্লিনিং এবং রেস্তোরাঁগুলো। একদিন দল বেঁধে ‘চাইনিজ’ খাওয়া আজ মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারেও পারিবারিক সাধের কথা।

জমজমাটি ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে চলছে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপও। কলকাতার চিনারা সবাই বৌদ্ধ নন। কেউ কেউ যদি কনফুসিয়াসপন্থী, কেউ তবে আবার খ্রিস্টান। মুষ্টিমেয় মুসলমানও আছেন নাকি। শহরে অন্তত সাত, আটটি ধর্মকেন্দ্র তাঁদের। সুন চার্চ। তুঙ থু চার্চ। কুয়ান তি চার্চ। বউবাজারের চায়নাটাউনের অন্যতম তোরণ ব্ল্যাকবার্ন লেনের মুখে ‘চিনাকালী’র কথাও প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য। অনেক চিনা তাঁরও ভক্ত।

প্রায় প্রত্যেক ধর্মকেন্দ্রেই রয়েছে ছোটদের জন্য স্কুল। একটি বিবরণে দেখেছিলাম, শুধু চিনা ছেলেমেয়েদের জন্য এ শহরে শিক্ষায়তন রয়েছে কমপক্ষে পাঁচটি। তিনটি বউবাজার-টেরিটি বাজার অঞ্চলে, দুটি ট্যাংরার চিনা পল্লিতে। পাঁচটির মধ্যে দুটি হাইস্কুল। তার মধ্যে একটি ট্যাংরায়, অন্যটি চিত্তরঞ্জন অ্যাভিন্যুতে। ট্যাংরাটির নাম পেই মে হাই স্কুল। মধ্য কলকাতারটি মে কোয়াঙ চার্চ হাই স্কুল। স্কুলে ওরা চিনা ভাষা ও সাহিত্য, গণিত এবং ইংরেজি পড়ে। হাই স্কুলের ছেলেমেয়েরা তদুপরি পড়ে বাংলা এবং হিন্দি।

কলকাতায় চিনারা দুটি দৈনিক খবরের কাগজও প্রকাশ করেন। একটির নাম ‘ইন তু ই পো’। বয়স তিরিশ উত্তীর্ণ। অন্যটি সে তুলনায় কিছুটা অর্বাচীন। নাম: ইন তু সঙ পো। সেসব কাগজে আধপাতা জুড়ে হিন্দি সিনেমার বিজ্ঞাপন। শহরের চিনা-সমাজ আজ আর আমাদের তত অচেনা নয়। আমাদের চোখের সামনেই উদযাপিত হয় ওদের নববর্ষ। পটকার আওয়াজ। ড্রাগনের নাচ। ড্রামের বাদ্য। আরও নানা উৎসব। হুতোম লিখেছিলেন—যেসকল মহাত্মারা কলকাতার চিনাবাজারে ‘কম স্যার। গুড শাপ স্যার, টেক টেক ন টেক ন টেক একবার তো সি’ বলে সমস্ত দিন চিৎকার করে থাকেন…তাঁরাই ‘দি স্টেশন মাস্টার’ হয়ে পড়েছেন। তিনি, বলাই বাহুল্য, দোকানের স্বদেশি সহকারীদের কথাই বলতে চেয়েছিলেন। এখন কলকাতার চিনা দোকানি কিন্তু দিব্যি বাংলা বলেন। এমনকী কখন কখনও বাঙালির ঢঙেই জিভ কেটে বলতে শোনা যায় তাঁদের ‘দোহাই লাগে, মা কালীর দিব্যি।’ চিনারা নিঃসন্দেহে আজ আমাদের অনেক কাছাকাছি। তাঁরা রসগোল্লা পানতুয়া তো বটেই, এমনকী ফুচকার পর্যন্ত ভক্ত। কেউ কেউ চিনা-খাবারের বদলে নাকি বাঙালি রান্নাকে অমৃত জ্ঞান করে উপভোগ করেন। ক’বছর আগেও আমাদের ধারণা ছিল চিনারা বুঝি চিরকাল অচেনাই রয়ে গেলেন। প্রায় দু’শ বছর কলকাতাবাস ওঁদের অথচ সেই কাঠি দিয়েই খান, তুলি দিয়ে লেখেন, স্বদেশি পোশাক পরেন। চিন -ভারত মৈত্রীতে উৎসাহের অভাব নেই তাঁদের, কিন্তু ভারতীয় নিয়ে ঘর করেন কদাচিৎ। তখনও আমাদের জানা ছিল না এসব প্রাঙ্গণের ধারে দাঁড়িয়ে দেখা দৃশ্যচিত্র মাত্র। প্রকৃত ঘটনা অন্যরকম। চিনাপল্লিতে খোঁজ নিলে যেমন দেখা যাবে মিশ সেঙ হুয়ে মিসেস চক্রবর্তী হয়েছেন, তেমনই বঙ্গললনা ‘শ্রীমতী কুসুম বিশ্বাস’ হয়েছেন ঝেমস ওয়াঙ-এর জননী। হাওয়া পাল্টাচ্ছে। অনিবার্যভাবেই গড়ে উঠেছে মিশ্র সংস্কৃতি। চিনা তরুণ-তরুণীর কানে ধ্রুপদী চিনা সঙ্গীত আজ বেসুরো ঠেকতে পারে বইকি। তার চেয়ে অনেক বেশি মধুর হয়তো হিন্দি ফিল্মের গান।

আজকের কথা থাক। টম ফ্যাটদের আমলেই ফিরি। সবাই জানেন, চিনারা কলকাতার অন্যতম আদি বাসিন্দা। পলাশির পর থেকেই শহরে তাঁরা অন্যতম বিশিষ্ট সম্প্রদায়। কলকাতা জন্ম থেকেই কসমোপলিটান পাঁচমিশেলি শহর। কিন্তু এ শহর আরও উজ্জ্বল বুঝি পীতবর্ণের এই মানুষগুলোর দৌলতেই। এমিলি ইডেন চিনা জুতা কারিগরকে তুলিতে ধরার চেষ্টা করেছেন গত শতকের চতুর্থ দশকে। অথচ বেইলি-র ১৭৯২ সালের কিংবা আপজন-এর ১৭৯২-৯৩ সালের মানচিত্রেও কিন্তু চিনারা সুপ্রতিষ্ঠিত নাগরিক। সেখানে চিনাবাজার ছাড়াও রয়েছে চিনা লেন, চিনা-বাজারে লেন। আজকের টেরিটি বাজার এলাকার এই মহল্লায় তখন গোটা শহরের গণ্যমান্য সম্পন্নদের আনাগোনা।

দোকানিরা সবাই অবশ্য চিনা ছিলেন না, ছিলেন অন্যরাও। এমনকী বাঙালিরাও। কিন্তু চিনারা নিশ্চয় ছিলেন। এবং ছিলেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। কেননা, পরবর্তী শতকের তৃতীয় দশকে (১৮২১) দেখি, শহরে যখন ১৭৯৯১৭ জন লোকের বাস তখন তার মধ্যে চিনাদের সংখ্যা ৪১৪ জন। ১৮৩৭ সালে তদানীন্তন পুলিশ সুপার বার্চ সাহেব কলকাতার মাথাগুনতি করে হিসাব দাখিল করেছিলেন—শহরে জনসংখ্যা ২২৯৭১৮ জন। তার মধ্যে ইংরেজ ৩১৩৮, ইউরেশিয়ান ৪৭৪৬, পর্তুগিজ ৩১৮১, ফরাসি ১৬০, চিনা ৩৬২ আরমেনিয়ান ৬৩৬, ইহুদি ৩০৭, মুসলমান ৫৮,৭৪৪, হিন্দু ১৩৭৬৫১, মোগল ৫২৭, পার্সি ৪০, আরব ৩৫১, মগ ৬৮৬, মাদ্রাজি ৫৫, দেশি খ্রিস্টান ৪৯, অন্ত্যজ ১৯,০৮৪। অন্যান্য পরদেশি আগন্তুকদের তুলনায় চিনাদের সংখ্যা লক্ষণীয়।

চিনারা সবাই নিশ্চয়ই একসঙ্গে এক দিনে এসে নামেননি গঙ্গার ঘাটে, তাঁরা এসেছেন ক্রমে ক্রমে। টম ফ্যাট প্রথম অভিযাত্রী নন। তাঁর সামনেও ছিল পথপ্রদর্শক। সে কাহিনী রীতিমতো রোমাঞ্চকর। কিন্তু তার আগে স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার এই অভিযানের পটভূমি। আজ তা করতে হলে একবার পিছন ফিরে উলটে দেখা দরকার ব্রিটেন এবং চিনের মধ্যে বাণিজ্যের ইতিহাসের পাতাগুলো। ঐতিহাসিকরা এই সওদাগরির নাম দিয়েছেন ব্রিটিশ এশিয়া থেকে বিদেশি এশিয়ার মধ্যে লেনদেন (‘to and from British-Asia to and from Foreign Asia’) এ বাণিজ্যে বিশেষ তৎপরতা দেখা যায় ১৭৭০-৮০ সালের মধ্যে। চিনের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য লন্ডন এবং কলকাতার সেদিন সে কী ব্যাকুলতা!

১৭৬০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতা কাউন্সিল-এর খাতায় লেখা আছে: ‘মুকসুদাবাদ’ নামে একটি দেশি বজরা ক্যান্টন থেকে সবে ফিরে এল কলকাতায়। তাতে মাত্র দুই ‘বেল’ হলুদ কাপড় এসেছে। ক্যান্টন থেকে ওঁরা জানাচ্ছেন, বিদেশে রেশম রফতানিতে চিন সম্রাটের ঘোরতর আপত্তি। এই বজরায় আখ মাড়াইয়ের জন্য একটি চিনা কলও এসেছে। সেটি পোর্ট অব মার্লবারোতে পাঠাতে হবে।…১৭৬৩ সালের ২ এপ্রিল লন্ডন থেকে কোম্পানির কর্তারা তাড়া দিচ্ছেন: চিনের সঙ্গে ব্যবসা করাটা অত্যন্ত জরুরি। সর্বশক্তি দিয়ে তোমাদের তা গড়ে তুলতে হবে। ‘হটন’ নামক জাহাজটিকে পত্রপাঠ ভাসিয়ে দাও চিনের উদ্দেশ্যে।

পলাশির পরে দেখতে দেখতে জমে ওঠে চিনের সঙ্গে কোম্পানির ব্যবসা। বাংলা থেকে মূলধন পাচার করা শুরু হয় চিনে। মূলধন মানে সোনা আর রুপো। অষ্টাদশ শতকের ষষ্ঠ দশকে বছরে গড়ে ২৪ লক্ষ টাকার সোনা পাঠানো হয় চিনে। পরের দশকেও একই ধারা। চিনের সঙ্গে বাণিজ্যে অন্যতম প্রধান পণ্য তখন আফিং। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ইংরেজরা রেশম এবং সুতি কাপড়ের কারবার নিজেদের মুঠোয় পেলেও আফিং ছিল ডাচদের হাতে। পলাশির আগে ইংরেজ এবং ফরাসিরা মিলিতভাবেও আফিংয়ের কারবারে ডাচদের অনেক পিছনে। ডাচরা আফিং পাঠাত সিংহল, মালাক্কা এবং মালয়ে। সেখান থেকে কিছু যেত চিনে। শোনা যায়, আফিং যে জ্বালিয়েও উপভোগ করা যায়, চিনাদের সেটা তারাই শিখিয়েছিল। জাভা থেকে তারাই সে বিদ্যা চালান দিয়েছিল মহাচিনে। যা হোক, পলাশির পরে দেখতে দেখতে ঘুরে গেল ভাগ্যের চাকা। আর সবকিছুর মতো আফিংয়ের কারবারেও ইংরেজেরই প্রাধান্য। ফলে ১৭৮৯ সালে শোনা যায়, ক্যান্টন-এ যে ৮৬টি বিদেশি জাহাজ নোঙর করে আছে তার মধ্যে একুশটি এসেছে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ব্রিটেন থেকে। ইংরেজি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ সেগুলো। এই ভিড়ে ভারতের ব্রিটিশ প্রজাদের, অর্থাৎ কোম্পানির ছাড়পত্রধারী ব্রিটিশ বণিকদের জাহাজ রয়েছে ৪০টি। আর বাকি পঁচিশটির মালিক আমেরিকা এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের সওদাগররা।

লাফে লাফে বেড়ে চলে এই কারবার। ১৮২৮-২৯ সালে পাটনা, বেনারস এবং মালব অঞ্চল থেকে চিনে আফিং পাঠানো হয়েছিল নাকি মোট ১৩ হাজার ১৩২টি পেটি। এক দশকের মধ্যেই ১৮৩৭ সালের একটি হিসাব বলছে, চিনে ইংরেজরা সে বছর আফিং রফতানি করে ৪০ হাজার পেটি (এক পেটিতে থাকত ১৩৩ পাউন্ড আফিং), আর ১৮৫০ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ হাজার পেটিতে। এ বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র তখন বন্দর কলকাতা। তা ছাড়া চিনে কাপড়ও যেত। বোম্বাই থেকে চিনে কাপড় রফতানি শুরু হয় ১৭৭৮ সাল নাগাত। বাংলা থেকে তার শুভ মহরত ১৮০১ সালে। স্বভাবতই সমুদ্র সেদিন তোলপাড়। নিয়মিত জাহাজের আনাগোনা। তারই কোনও একটি থেকেই নিশ্চয় একদিন এই অচেনা শহরের মাটিতে পা রেখেছিল টম ফ্যাট ও তাঁর সঙ্গীরা। তারপর ক্রমে অন্যরা। গড়ে উঠেছিল রূপকথার দেশ—চায়না টাউন।

টম ফ্যাটকে কিন্তু আমরা পলাতক নাবিক আখ্যা দিইনি, কলকাতার আদি চিনা বাসিন্দাদের যিনি এ বিশেষণে ভূষিত করেছেন তিনিও একজন চিনা। নাম তাঁর টঙ আছু। সম্ভবত কলকাতায় তিনিই প্রথম চিনা অভিযাত্রী। তাঁকে বাদ দিলে অবশ্যই অসমাপ্ত থেকে যায় কলকাতার চায়না টাউনের ইতিহাস।

১৭৮১ সালের কথা। সেদিন ৫ নভেম্বর। ‘গভর্নর’ জেনারেল এবং তাঁর পরিষদের নামে শহরে প্রচারিত হয়েছে এক জরুরি ঘোষণাপত্র। তার মর্ম: মহামান্য গভর্নর জেনারেল এবং তাঁর পরিষদ সমীপে আছু নামক একজন চিনাম্যানের অভিযোগক্রমে প্রকাশ এ শহরের দুষ্টুবুদ্ধি চিনারা তাঁর অধীন চিনা শ্রমিকদের নানাভাবে প্ররোচিত করে নিজেদের কাছে টেনে আনছে।…কোম্পানি বাহাদুর উক্ত চিনাম্যান এবং তাঁর উদ্যোগে স্থাপিত চিনা উপনগরীটিকে উৎসাহিত করতে চান। তাঁরা এজন্য সব রকম সাহায্য দিতে প্রস্তুত। সুতরাং কেউ যদি আছুর অধীন লোকদের আশ্রয় দান করে, কিংবা তাদের কোনও কাজে নিযুক্ত করে, তবে তাদেরও যথাযোগ্য শাস্তি পেতে হবে। ইত্যাদি।

প্রশ্ন উঠবে, কে এই আছু স্বয়ং কোম্পানি বাহাদুর যাঁর পৃষ্ঠপোষক। আগেই বলা হয়েছে, এই আছুই সম্ভবত সুদূর চিন থেকে কলকাতায় প্রথম আগন্তুক। অন্তত তাঁর আগে এ তল্লাটে শিকড় বিস্তারের চেষ্টা করেননি আর কোনও চিনা অভিযাত্রী। সেটা অষ্টাদশ শতকের শেষ দিককার কথা। ওয়ারেন হেস্টিংস-এর আমল। ভাসতে ভাসতে ভাগ্যান্বেষী আছু এসে নেমেছিলেন কলকাতা। ঠিক কলকাতায় নয়, বজবজে। দেখেশুনে জায়গাটা পছন্দ হয়ে গেল। তাঁর স্বপ্নের ঘোরে পড়লেন তিনি। হেস্টিংস-এর কাছে বিনীতভাবে দরখাস্ত পেশ করলেন—আমাকে কিছু জমি দিলে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। এক, দুই কাঠা নয়, হেস্টিংস তাঁকে দান করে দিলেন ৫৬০ বিঘা ফসলি জমি। খবর পেয়ে ছুটে এলেন বর্ধমান-রাজ। বললেন—প্রভু, এ জমি আমার। হেস্টিংস তাতে আপত্তি করলেন না। তিনি আছুর জন্য খাজনা ধার্য করে দিলেন বার্ষিক পঁয়তাল্লিশ টাকা। আছু সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। তিনি ভদ্রাসন পাতলেন বজবজে। ঠিক বজবজে নয়, ছ’ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে তাঁর খামার। সেখানে তিনি চাষবাস শুরু করলেন। তারপর বসালেন এক চিনির কল।

কল চালাতে লোক চাই। শিক্ষিত শ্রমিক। সুতরাং আছু লোকের সন্ধানে ফিরে গেলেন দেশে। তারপর চুক্তি করে এক-জাহাজ চিনা শ্রমিক নিয়ে আবার ফিরে এলেন বজবজে। শ্রমিকদের সঙ্গে শর্ত—নির্দিষ্টকাল তাঁর কাছেই থাকতে হবে। হুকুমমতো কাজ করতে হবে। কারও তাতে অমত নেই। ফলে, দেখতে দেখতে কলকাতার অদূরে গড়ে উঠল এক চিনা উপনিবেশ। প্রতিষ্ঠাতা টঙ আছুর নামে নাম হল তার আছিপুর।

দিন যায়। এক দিকে ফসলের জমি, অন্যদিকে চিনির কারখানা। আছু সুখী গৃহস্থ। একই সঙ্গে তিনি কৃষক এবং কল মালিক। রীতিমতো ধনপতি তিনি। হঠাৎ বিপদ। এতদিন কলকাতায় চিনা বলতে ছিল টঙ আছু আর তাঁর শ্রমিকদল। কিন্তু ইতিমধ্যে এই অচেনা শহরে আবির্ভূত হয়েছেন আরও কিছু ভাগ্যান্বেষী চিনা। জাহাজ আসা যাওয়ার পথে কলকাতায় টুপটাপ ঝরে পড়ছেন তাঁরা। তাঁরা নানাভাবে উৎপাত করতে লাগলেন টঙ আছুকে। চিনাপাড়ায় সে বুঝি আর এক গৃহযুদ্ধ। আছুর শ্রমিকদের নানাভাবে প্রলোভন দেখাতে লাগলেন কলকাতার চিনারা। বিশেষ কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীই দায়ী তার জন্য, না কোনও গ্যাং অব ফোর, আজ আর তা জানা যায় না। তবে আছুর জীবন যে তাঁরা অতিষ্ঠ করে তুলেছিলেন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কেননা, ১৭৮১ সালের ২৯ অক্টোবর বিপন্ন আছুকে আমরা দেখি, তিনি আবার দরখাস্ত লিখতে বসেছেন সপারিষদ গভর্নর জেনারেল-এর কাছে। তাঁর বিনীত বক্তব্য: আপনাদের বদান্যতায় বজবজের কাছে আমি যে ভূমিখণ্ড হাতে পেয়েছিলাম এবং যা আমি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে আবাদ করে আসছিলাম, তা নিয়ে আমি বড়ই বিপাকে পড়েছি। আপনারা জানেন, বহু কষ্ট আমি বহু দূর থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করে এনেছি। এ জন্য আমার যথেষ্ট অর্থ ব্যয়ও হয়েছে। কিন্তু আপনাদের সহযোগিতা না গেলে আর বুঝি তাদের রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আমার অভিযোগের লক্ষ্য কলকাতার চিনা সমাজ। এইসব চিনারা জাহাজ-পলাতক। তারা জীবিকাহীন ভবঘুরে। ঈর্ষাপরবশ হয়ে তারা নানাভাবে আমার কাজে বাধা সৃষ্টি করছে। আমার লোকেদের কাজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রলোভন দেখাচ্ছে। ইত্যাদি। আছু পরিষ্কার লিখছেন:

‘The persons who have thus want only endeavoured to injure me are the Chinese who have deserted from the ships and remain in Calcutta without any apparent means of substance….’

আবেদনপত্রে সাক্ষী হিসাবে সই করেছেন মিঃ সি. রথম্যান নামে কে একজন। তাঁর এই কাতর আবেদনে সাড়া দিয়েই শহরে জারি হয়েছিল গভর্নর জেনারেল-এর সেই হুকুমনামা। দুটি দলিলই ছিল একসময়ে ইম্পিরিয়াল রেকর্ড বিভাগে। হয়তো এখনও রয়েছে সরকারি মহাফেজখানায়।

চিনা পাড়ার সেই ঐতিহাসিক গৃহযুদ্ধের ফলাফল যা দাঁড়িয়েছিল, আমরা জানি না। তবে ১৮০৪ সালের ১৫ নভেম্বর ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন বলছে আছু পরাজিত। হার মেনেছেন তিনি স্বদেশের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে নয়, মৃত্যুর কাছে। সম্ভবত ১৮০৩ সালে, অর্থাৎ আছিপুর উপলক্ষে বিবাদের বাইশ বছরের মধ্যেই দেহরক্ষা করেন তিনি। আর তারপরই সব ছত্রখান। বিজ্ঞাপনটি থেকে জানা যাচ্ছে, আছিপুরের সম্পত্তি নিলামে উঠছে। ঘরবাড়ি, জমি, এমনকী আছুর সাধের চিনির কলটি পর্যন্ত।

সব স্মৃতি মুছে গেছে। কিন্তু এখনও রয়েছে বজবজের অদূরে আছিপুর। শুধু তা-ই নয়, এখনও নাকি সেখানে রয়েছে আছু প্রতিষ্ঠিত একটি চিনা মন্দির। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে এখনও কলকাতার চিনারা দল বেঁধে ছুটে যান সেখানে। আছিপুর এখনও তাঁদের কাছে তীর্থ। কলকাতায় চিনা উপনিবেশের বলতে গেলে তিনিই আদিপুরুষ, তিনিই প্রেরণা। ইংরেজদের কাছে জোব চার্নক যা, কলকাতার চিনাদের কাছে সম্ভবত টঙ আছুরও একই মর্যাদা। টঙ আছু এ দেশের মানুষের কাছেও নিশ্চয়ই একটি স্মরণীয় নাম। কেননা, টম ফ্যাট যদি এ দেশে প্রথম আমদানি করে থাকেন চিনা-পাম্প তবে টঙ আছুই বোধ হয় এ তল্লাটে প্রথম চালু করেন চিনা কায়দায় চিনির কল। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এ শহরে রিকশ নামক মানুষ-টানা দ্বিচক্রযানটিও কিন্তু চিনাদেরই অবদান।

প্রাচ্যবিদ্যার পীঠস্থান

এশিয়াটিক সোসাইটির ঠিকানা ১ পার্ক স্ট্রিট, কলকাতা। কিন্তু এশিয়াটিক সোসাইটির যখন জন্ম আজকের পার্ক স্ট্রিট তখন বেরিয়াল গ্রাউন্ড রোড। কবরখানায় যাতায়াতের পথ। চৌরঙ্গির এদিকে তখন রীতিমতো বন, বাগ আর দেশি-বিদেশি ডাকাতের আড্ডা। ওদিকে গোবিন্দপুরের জলা। মাঝে মাঝে ধানখেত। আরও পশ্চিমে গঙ্গার ধারে কোম্পানির নতুন কেল্লা। ফোর্ট উইলিয়ম।

এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্স। ভারতবর্ষের বিদ্বজ্জনদের ভাষায়, পুণ্যশ্লোক জোন্স সাহেব, ইউরোপিয়ানদের কথায় ‘এশিয়াটিক জোন্স’। ইনি থাকতেন গার্ডেনরিচে। প্রতিদিন তিন মাইল পথ পায়ে হেঁটে তিনি ফোর্ট উইলিয়মের সামনে এসে একবার দাঁড়ান। একটু বিশ্রাম করেন। ফোর্টের সামনে থেকেই তিনি পালকিতে চড়েন। পালকি এসে থামে কোর্ট হাউসের দরজায়। প্রতিদিনের নিয়ম। অবশ্য ছুটির মরসুমে এর ব্যতিক্রম হয়। জোন্স তখন পালিয়ে যান বাংলাদেশের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় নবদ্বীপে, কিংবা নদিয়ায়। নয়তো এই কোর্ট হাউসেই কাটে তাঁর সকাল-সন্ধ্যা। স্যার উইলিয়াম নবগঠিত সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক। অবশ্য এই সম্মানজনক আসনে বসবার আগেই কলকাতার ইংরেজরা উইলিয়াম জোন্সের নাম জানতেন। বিশেষত গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস। কারণ, অক্সফোর্ডে ছাত্রজীবনের কৃতিত্বে জোন্স তখনকার লন্ডনে রীতিমত একটা সংবাদ। ইতিমধ্যে তাঁর ‘পারসিক ভাষার ব্যাকরণ’, বিদ্বজ্জনদের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন এবং কলকাতায় আসার পূর্বক্ষণে রাজসম্মানেও সম্মানিত করা হয়েছে তাঁকে।

যা হোক, জোন্স যখন সুপ্রিম কোর্টের স্নানঘরে, চারপাশের কলকাতা তখনও মোটামুটি ঘুমে। সূর্য উঠতে তখনও এক ঘণ্টা। স্নান, পোশাক পরিবর্তন এবং প্রাতরাশে এক ঘণ্টা কেটে যায়। তারপর পণ্ডিত রামলোচন আসেন। পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে তিনি সংস্কৃত পড়েন। গ্রিক লাতিনের চেয়েও সংস্কৃত তাঁর কাছে বিস্ময়কর ভাষা। ব্রাহ্মণদের মতোই তিনিও বলতেন ‘দেবভাষা সংস্কৃতের পর আরবি। তারপর ফার্সি।’ ন’টায় আদালত। তিনটেয় সরকারি কাজে ছুটি। তারপর সন্ধে অবধি বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা। লন্ডনে জোন্স জনসনের আড্ডার সদস্য ছিলেন বার্ক, সেরিডন, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন প্রমুখ তাঁর বন্ধু। কলকাতায় আছেন হেস্টিংস, উইলকিনস, হ্যালহেড, অনেকে।

১৭৪৮ সালের ১৮ জানুয়ারি কোর্ট হাউসের এই ঘরোয়া আলোচনাসভাই নাম নিল ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’। পুরো চার মাসও হয়নি জোন্স কলকাতায় এসেছেন। কিন্তু এশিয়াটিক সোসাইটির জন্ম তার বহু আগে। তাঁর এই জীবিকার অবলম্বনটি ছিল তাঁর কাছে উপলক্ষ মাত্র। আসল লক্ষ্য—ভারতবর্ষ, এশিয়া।

‘বিয়ের মাত্র চারদিন পরে স্ত্রীকে নিয়ে ভারতবর্ষের উদ্দেশে জাহাজে চড়েছিলেন জোন্স। কিন্তু অজ্ঞাত দেশের বিষয়ে কোনও উদ্বেগে নেই তাঁর। স্পষ্টতই তিনি জানাচ্ছেন—ভারতবর্ষকে তিনি জানতে চান। পুরোপুরি জানা। এমন জানা, যা কোনও দিন কোনও ইউরোপীয় জানেননি। জাহাজে বসেই তৈরি হয়েছিল তাঁর ভারতবর্ষে নেমে কী কী পড়বেন এবং করবেন, তার তালিকা। চিঠিতে লিখছেন ‘আগামী ছ’বছর আমার পাঠ্য হবে, পারসিক ভাষা এবং আইন। আর ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষ সম্বন্ধে যত কিছু আছে সব। যা কিছু পাওয়া যাবে—সব।’

কলকাতায় নেমে ভারতবর্ষকে এশিয়ায় পরিণত করেছিলেন জোন্স। এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম সভায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন—

‘The bound of its investigations will be the Geographical limits of Asia, and within these limits its inquiries will be extended to whatever is performed by man and produced by nature.’

এশিয়ার প্রকৃতি আর মানুষ ‘এশিয়াটিক জোন্সের’ ধ্যান। এশিয়াটিক সোসাইটির আদর্শ। এগারো বছর কলকাতায় ছিলেন জোন্স। ইচ্ছে ছিল, অষ্টাদশ শতকের শেষ বছরে দেশে ফিরবেন। কিন্তু লেডি জোন্সের দেশে ফিরে যাওয়ার পর সময়ের সীমারেখাটাকে আরও কমিয়ে এনেছিলেন তিনি। মাত্র আটচল্লিশ বছরের জীবনটাকে চিরকালের মতো গঙ্গার তীরে দান করে গেলেন জোন্স। এই এগারোটি বছর ভারতবর্ষের তথা এশিয়ার সংস্কৃতির ইতিহাসে উজ্জ্বলতম বছর। কারণ, এই ক’বছরের মধ্যেই এশিয়াটিক সোসাইটি শুধু জোন্স নয়, স্বাভাবিকতার নিয়ম পেরিয়ে যৌবনেও পা দিয়েছে। এবং তা সম্ভব হয়েছে শুধু একটি মানুষের জন্যই তা তিনি স্যার উইলিয়ম জোন্স,— এশিয়াটিক জোন্স।’ রামকে বাদ দিলে রামায়ণ হয় না, এশিয়াটিক জোন্সকে বাদ দিলে এশিয়াটিক সোসাইটির কথা হয় না। ইতিহাস অপূর্ণ থেকে যায়। আজকের পার্ক স্ট্রিট আলো-ঝলমল। কলকাতার সবচেয়ে নামী রাস্তা, বনেদি পল্লি। এর ১ নম্বর বাড়িটাই এশিয়াটিক সোসাইটির। কিন্তু সে শুধু স্ট্রিট ডিরেকটরির নম্বর। চেহারায় বোধ হয় পার্ক স্ট্রিটের দীনতম বাড়িই এশিয়াটিক সোসাইটির আদি ভদ্রাসন। সামনেই একখানা ঝকঝকে পেট্রোল পাম্প এককালে ছিল ঘোড়া চড়া শিখবার স্কুল। তারপর অনেকদিন ধরে ছিল পুলিশের থানা আর দমকলের আপিস। বিপরীতের সঙ্গে সহাবস্থান এশিয়াটিক সোসাইটির অনেক দিনের ধর্ম। ইতিহাসও। ইতিহাসের আড্ডা বলেই বাড়িটার দীন চেহারাটাকে ঐতিহাসিক মনে করে সান্ত্বনা পাবার কোনও কারণ নেই। এর প্রতিষ্ঠানকাল ১৮০৬ সাল। মাঝে মাঝে সারাই হয়েছে অবশ্য। কিন্তু লর্ড কার্জনের পরে নয়। কার্জন সাহেবই বোধ হয় এ বাড়ির শেষ সক্রিয় পেট্রন, পৃষ্ঠপোষক, উল্লেখযোগ্য সংস্কারক।

দুমদাম কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে এলাম। চারপাশে পাথরের মূর্তি। বিরাট বিরাট তৈলচিত্র। পাথুরে মানুষগুলো ইতিহাসের মানুষ। সোসাইটির যেমন, এদেশেরও তেমনই জোন্স, কোলব্রুক, প্রিন্সেপ, ছবিগুলো সব সে-কালের বড় বড় চিত্রকরদের হাতে আঁকা। রবার্ট হোম, টিলি কিটল, চিনারি, ডানিয়েল, লরেন্স, রেনোন্ড, রুবেনস টাকার হিসাবে লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পত্তি। উত্তরাধিকার বিচারে অমূল্য ধন। কিন্তু অযোগ্যভাবে রক্ষিত। ছবির তুলনায় স্থান বড্ড কম।

দোতলায় সভা হচ্ছে। জনসভা। বক্তা হুইলার। বিষয়বস্তু মানবসভ্যতায় ভারতবর্ষের দান। ক’জন আগ্রহী বসে বসে শুনছেন। এককালে এই সভা বসত সেই পুরানো কোর্ট হাউসেরই ঘরে। উইলিয়ম জোন্স বক্তৃতা করতেন। তখন মাসে মাসে সভা বসত। প্রতি মাসের প্রথম বুধবারে। আজও বুধবার। এখনও এশিয়াটিক সোসাইটির সভা বসে। নিজেদের সভা ছাড়াও মাঝে মাঝে জনসভা। দেশি, বিদেশি গুণিজনেরা আসেন। বক্তৃতা দেন। আলোচনা করেন। এতকাল পরেও এশিয়াটিক সোসাইটি বজায় রেখেছে পূর্বতন ঐতিহ্য। বাড়িটাকে দেখে যে আশংকা মনে জেগেছিল, হুইলারের বক্তৃতা তা মুছে নিয়ে গেল।

দোতলায় লাইব্রেরি এবং পাঠকক্ষও। কক্ষ মানে এক ফালি ঘর। ঠাসাঠাসি করে দশ-বারোজনের জায়গা হয়। অথচ বছরে গড়ে কমপক্ষে প্রায় চার হাজার লোক ব্যবহার করেছেন এই লাইব্রেরি—এই রিডিং রুম। তার এই দোতলার ছোট ক’খানা ঘর কলকাতার, শুধু কলকাতার কেন, সারা ভারতবর্ষের একটা অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগার। এক লক্ষের ওপর ছাপানো বই আছে সোসাইটির। এশিয়ার প্রকৃতি এবং মানুষের বিষয়ে। দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্ম, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে দুর্লভ পুস্তকাদি। পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ আছে চল্লিশ হাজারের ওপর। নানা ভাষার পুঁথি। সবচেয়ে পুরানো যেটি সেটি খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের। টিপু সুলতানের লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপিগুলোও আজ সোসাইটির সম্পত্তি। কোম্পানি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে দান করেছিলেন সেগুলো। তারপর কলেজ উঠে গেলে এশিয়াটিক সোসাইটিকে। সেই সংগ্রহে আছে পারসিক কাব্য গুলিস্তানের প্রথম কপি। লেখকের হাতে লেখা নয়, মূল থেকে অনুকরণের প্রথম কপি। আর আছে শাহজাহানের হাতে সই করা ‘বাদশাহনামা’।

কিন্তু তা সত্ত্বেও এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রন্থাগার পুরো নয়। তার কারণ, অর্থাভাব। বছরে সাকুল্যে মাত্র আট হাজার টাকার বই কিনতে পারেন ওঁরা। কিন্তু তিব্বতী পাণ্ডুলিপির যে কপি জাপানে প্রকাশিত হয়েছে তার এক গ্রন্থের দামই পঁচিশ হাজার টাকা। সোসাইটি শুধু অর্থাভাবে তা কিনতে পারেনি।

পুরানো যা আছে, তাকে নিয়েও উৎসাহীদের চিন্তার অবধি নেই। এখনও বহু পাণ্ডুলিপি আছে, যা আজও বিস্তারিতভাবে তালিকাভুক্ত করা যায়নি। পুরানো বই রক্ষা করতে হলে আরও জায়গা চাই এবং শীততাপ-নিয়ন্ত্রিত জায়গা। অথচ সোসাইটি এখন যেভাবে এগুলো রক্ষা করছে, তাতে উদ্বেগের অন্ত নেই। ছাদ দিয়ে বর্ষার জল ঝরে। দেওয়ালে ফাটল। নোনা পড়ে। চারদিক ঘিরে মৃত্যু। গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহটিকে হয়তো এখনও বাঁচানো যেত যদি একটি ল্যামিনেটিং যন্ত্র এবং মাইক্রোফিল্ম রিডার থাকত। মাইক্রোফিল্ম-এর যন্ত্রপাতির সাকুল্য দাম ষোল হাজার টাকা। ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ক’খানা লাইব্রেরি কিন্তু এই শহরে।

গোড়া থেকেই স্বয়ং কোম্পানি এর পৃষ্ঠপোষক। তাদের মাসিক ৫০০ টাকা মাসোহারা নিয়েই শুরু হয়েছিল সোসাইটির বিশ্ববিখ্যাত বিবলিওথাকা ইন্ডিকার প্রকাশনমালা। সোসাইটির জার্নাল ছাপার জন্যেও অর্থ বরাদ্দ ছিল তৎকালীন ভারত সরকারের। এমনকী, স্যার উইলিয়ম জোন্সের বিখ্যাত এশিয়াটিক রিসার্চ সিরিজের প্রথম সংখ্যাটি ছাপা হয়েছিল কোম্পানিরই ছাপাখানায়। অথচ আজ আমাদের সরকারের আমলে জার্নাল নিয়মিত ছাপা হয় না। অর্থাভাবে। ‘রিসার্চ ফেলো’ পোষা যায় না অর্থাভাবে। অর্থাভাবে নতুন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ হয় না। কর্মীদের সাধারণ দাবিকে মেটানো যায় না। অধস্তন কর্মীদের দাবি রুখতে ট্রাইব্যুনালের সামনে দাঁড়াতে হয়।

এই এশিয়াটিক গবেষণা সম্পর্কে একটা কথা বলা প্রয়োজন। ভারতবর্ষে আরও বিজ্ঞানের আলোচনা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে এশিয়াটিক সোসাইটির স্থান আজ একটু নীচের দিকেই। কিন্তু বিজ্ঞানালোচনার সূত্রপাত হয়েছিল এরই কক্ষে। মনে রাখতে হবে, কলকাতায় জাদুঘর হওয়ার আগে নৃতত্ত্বের শ্রেষ্ঠতম মিউজিয়াম ছিল সোসাইটি। আজ তার সম্পত্তি জাদুঘরের ধন। ভারতে ভূতত্ত্ব, প্রাণিতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব এবং প্রকৃতিবিজ্ঞানের সূচনাও এই সোসাইটিতেই। বস্তুত অষ্টাদশ শতকে এবং উনিশ শতকের প্রথম পর্বে যাবতীয় বিজ্ঞানের সূতিকাগার ছিল এই এশিয়াটিক সোসাইটি। এখনও সোসাইটি বিজ্ঞানালোচনা করেন। এখনও ‘সায়েন্স’ ও ‘লেটার্স’ শিরোনামায় খণ্ডে খণ্ডে জার্নাল প্রকাশ করেন। কিন্তু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার ক্রম-বিস্মৃত আসন সম্পর্কে সতর্ক হয়ে। বর্তমানে সোসাইটি ধর্ম দর্শন, ইতিহাস, সমাজ ও সাহিত্য বিষয়েই অধিকতর আগ্রহী।

জোন্স আহ্বান জানিয়েছিলেন এশিয়ান পণ্ডিতসমাজকে। এশিয়াটিক সোসাইটির নামে আমরা আরও নীচে নেমেই আজ ডাকব ভারতবর্ষের সংস্কৃতি অনুরাগীদের। তিনি তাঁদের বিদ্যাকে প্রার্থনা করেছিলেন, আমরা প্রার্থনা করব তাঁদের অন্তরকেও। এই শক্তি যদি আমরা না হারাই, তবে, বিজ্ঞান এবং কলায় তথাকথিত বিরোধ থাকবে না। এবং জোন্স কোলেব্রক, উইলসন, ম্যাক্সমুলার, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রমাপ্রসাদ চন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত এই মহীয়ান প্রতিষ্ঠান ১ নম্বর পার্ক স্ট্রিটের এই পুরানো ভিত্তিতে বসেই চিরকালের মতো এশিয়ার কথা দুনিয়ার কথা ভাবতে পারবে।

রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটি রাজকীয় চিহ্ন মুছে ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ হয়েছে দীর্ঘকাল। পুরানো বাড়ি ঘেঁষে গড়ে উঠেছে সোসাইটির নতুন বাড়ি। দু’শো বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারত সরকার ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা’ বলে ঘোষণা করেছে সোসাইটিকে। সরকারি আনুকূল্যে সোসাইটির তহবিল আজ আর শূন্য নয়। অর্থাভাব বস্তুত স্মৃতিকথা। কিন্তু ভারতের প্রাচীনতম এই বিদ্বৎসভা তবু তার প্রাণ ফিরে পেয়েছে কি? সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে একমাত্র ভবিষ্যৎ।

রাইটার

‘রাইটার মানে!’

নিজেকে যত ট্যালেন্‌টেডই ভাবুন আপনি, নিশ্চিত জানবেন এর পর আর উত্তরের অপেক্ষা করবেন না প্রত্যাশিত ভাবী শ্বশুরমশাই। প্রাক্‌-সম্বন্ধ যুগে রসিকতায় যদি নৈতিক লজ্জা অনুভব না করেন, তবে মুচকি হেসে জবাব দিন, ‘লেখক, তবে ডেসপ্যাচ লেখক’। দেখবেন তিনিও হাসতে জানেন। একগাল হেসে তক্ষুনি জবাব দেবেন, ‘বাবাজি, তবে আর শুভকার্যে বিলম্ব কেন’। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

ইতিহাস বদলায়। কিন্তু নানা মাপের ডেসপ্যাচ-রাইটার, লেজার-রাইটারদের প্রজাপতি-ভাগ্যে বৃহস্পতি অনড়। অনুরূপ অপরিবর্তিত বিশুদ্ধ রাইটারদের কপালে শনির আসনটি। শুনেছি, দেশ ভেদে রুচিভেদ ঘটে, কিন্তু এ ব্যাপারে দেখি টেমস্‌ আর গঙ্গাতীরের ভদ্র-সন্তানেরা, জেন্টলম্যান আর জেন্টুরা একমত। অষ্টাদশ আর বিংশ শতক অভিন্ন। হিংসের কথা নয়, প্রসঙ্গ কথা হিসেবেই উল্লেখ করলাম ব্যাপারটি। বাঙালির গম পেষার চেয়ে লেজার-পেষায় কেন বেশি রুচি, তার ঐতিহাসিক সূত্রটি আমার মনে হয় এখানেই।

যাক সে কথা। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন ‘রাইটার’ মানে কী। কেরানি স্রেফ কেরানি। লোয়ার ডিভিসন, না আপার ডিভিসন জিজ্ঞাসা করতে পারেন, কিন্তু পদ্য কিংবা নভেল লেখেন কি না, তা দয়া করে জিজ্ঞাসা করবেন না। অবশ্য এমন কথা বলছি না যে, কেরানিদের মধ্যে সাহিত্যিক হয় না বা হতে পারে না। নিশ্চয়ই হতে পারেন। লর্ড কার্জন, লর্ড ডালহৌসি থেকে শুরু করে বহু সেক্রেটারি (সম্প্রতি দেখতে পেলাম একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারিও) তা হয়ে দেখিয়েছেন। সুতরাং প্রশ্ন সেখানে নয়। হস্তগুণে ডেসপ্যাচ অবশ্যই সাহিত্য হতে পারে, তবে আমাদের কপালগুণে সেটি কম হয়। নয়তো দেখতেন প্রতিদিন বহু রাইটার ফটাফট মারা পড়তেন রাইটার্স বিল্ডিংসে। লর্ড কার্জনকে খাতির করা হয়েছে বলেই ভাববেন না জনগণের পয়সা দিয়ে রামপ্রসাদ পোষার শখ সরকারের বাহাদুরের আছে। মনে রাখবেন কার্জন সাহেব লর্ড আর রাইটার কেরানি। বঙ্গসমাজে যাদের পরিচয়—সপ্তদশ শতকে সরকার, অষ্টাদশ শতকে মুৎসুদ্দি, ঊনবিংশ শতকে কেরানি, বিংশ শতকে করণিক। রাইটার করণিক-শ্রেষ্ঠ বা বড়বাবুও নয়, করণিক কুলপতি বা সেক্রেটারি, আন্ডার সেক্রেটারিও নয়। রাইটার কেরানি এবং লোয়ার ডিভিসন কেরানি।

এদের আবার জীবনকথা কী? সে কথা তো মনে হয় রামায়ণ কি মহাভারতের চেয়েও প্রাচীন কথা। ডেলি প্যাসেঞ্জারদের বাদ দিলে সংক্ষেপে দাঁড়ায়: ঘুম থেকে উঠে পাউডার মিল্কের চা, তারপর মাসের প্রথম সপ্তাহ হলে থলি হাতে বাজার গমন, নয়তো পাড়ার মুদির দোকান থেকেই প্রত্যাবর্তন। থলিটা বারান্দায় ফেলে রেখে পাড়ার ‘ইভনিং ইন প্যারিস রেস্তোরাঁ’য় ক্ষণেক আড্ডা। রাজনীতিক, অর্থনীতিক, সামাজিক বহুদর্শী আলোচনা। অবশ্য স্ট্রিক্টলি পাড়াগত। তৎপর স্নান। অবশেষে আপিস। কিছু কাজ, কিছু ফাঁকি। কিছু আত্মচিন্তা, কিছু পরচর্চা। তারপর আবার বাড়ি। বয়স কমতি থাকলে খেলার মাঠ কিংবা লাইব্রেরি-কাম-তাসঘর (ক্লাব নয়) হয়ে। বয়স সন্ধের দিকে হলে অতঃপর ভোজন এবং শয়ন। উৎসাহী হলে দু’চারটে ভাবী রাইটারকে তালিম দেওয়া। এর পরও নিশ্চয়ই জীবন আছে রাইটারের। এর ফাঁকে ফাঁকেও ঠিক জীবন নয়, জীবনের মতো বস্তু আছে। সিনেমায় লাইন দেয়, কবিতা পড়ে লেখে, মিছিল করে, মিছিল গড়ে, ভাঙে। কিন্তু সে জীবন রাইটার, জীবনের পরিশিষ্ট মাত্র। ইমপর্ট্যান্ট অধ্যায়গুলো তার অন্যত্র। সেগুলোর কথঞ্চিৎ সন্ধান রাখে রাইটার-ঘরণী আর অবশিষ্ট পাড়ার মুদি।

মুদি আর কেরানি কলকাতার আদিকালের দোস্ত। আজব নগরীর ইতিহাসে এদের এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান শুরু হয়েছে ‘প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। সুতরাং রাইটারের কথায় তাদের বাদ দেওয়া সংগত হবে না। বরং রাইটার-কাহিনীতে যাওয়ার আগে তাদের কথাটাই সেরে নেওয়া ভাল। কৃতজ্ঞ ব্যক্তিদের তাই পরামর্শ।

মুদির কথায় প্রথমেই মনে পড়ে স্বনামধন্য স্বর্গত চন্দ্রনাথ পাল মশাইয়ের কথা। আজও তাঁর স্মৃতিকে বুকে ধরে রয়েছে চাঁদপাল ঘাট। চাঁদপাল ঘাট তখনকার দিনে ‘গেটওয়ে টু ক্যালকাটা’, কোম্পানির জাহাজ ভিড়ত এখানে। সিভিলিয়ান মিলিটারি সাহেবরা এখানে আসার পথে কি যাওয়ার পথে জমায়েত হতেন…চন্দ্রনাথ পাল ওরফে চাঁদ পালের অঙ্গনে। কলকাতার বাল্যজীবনে হেন রাইটার বোধ হয় নেই, যে, তাঁর দাওয়ায় বসে সিগারেট না ফুঁকেছে। ভুল হল, হুঁকো না টেনেছে। এমন মনে করার কারণ নেই যে, তারা চিরকালই নগদে খেয়েছে। তা হলে রাইটার-প্রধানেরা ওঁর নামে একটা আস্ত ঘাট নাও রাখতে পারতেন।

তারপর ধরুন কান্ত মুদির কথা। কলকাতার ইতিহাসে ওয়ারেন হেস্টিংস যতদিন আছে ততদিন কান্ত মুদি আছেন। গোটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁর কাছে নুনের ঋণে দায়বদ্ধ। লজ্জার মাথা খেয়ে, মানসম্ভ্রম কোটের মতো ছুড়ে ফেলে দিয়ে হেস্টিংস তাঁকে শুধু ‘অহেতুক’ অপমান থেকে রক্ষা করেছেন তাই নয়, তাঁকে তিনি ব্ল্যাক-টাউনের সমাজপতি করে দিয়েছিলেন। কোম্পানির ওয়ারেন্ট তাঁকে ধরতে পারে না, কোম্পানির আইনে তাঁর বিচার চলে না। তিনি স্বয়ং জাস্টিস। ব্ল্যাক-টাউনের তিনি বিচারক। কৃষ্ণকান্ত নন্দী ওরফে কান্ত মুদির এই বিশেষ খাতির সম্পর্কে ব্ল্যাক টাউনের ‘নিন্দুকেরা’ ইতিহাসে একটি গল্প জুড়ে দিয়ে বসে আছে। সেটি প্রমাণাভাবে অগ্রাহ্য, ইংরেজ ঐতিহাসিকেরা এমন কথা বলেননি। কাহিনীটি এই: এক দিন ভোরবেলা নন্দীমশাই শয্যা ত্যাগ করেই দেখেন, স্বয়ং কোম্পানি বাহাদুরের প্রধান সরকার তাঁর দাওয়ায় উপবিষ্ট। কৃষ্ণকান্ত নন্দীর আদি বাস কাশিমবাজার। হঠাৎ কাশিমবাজারে হেস্টিংস সাহেবকে এমন অবস্থায় দেখে তিনি মহাসন্ত্রস্ত হয়ে বললেন, ‘হজুর, আপনি এখানে’।

‘তোমাদের সুবাদার তাড়া করেছে।’ কথা বলারও অবসর নেই হেস্টিংসের। তিনি ঘরে ঢুকে পড়লেন।

‘হুজুর কি আমাদের নবাব বাহাদুরের কথা বলছেন?’ কান্ত ভয় পেয়ে জানতে চাইলেন।

‘হ্যাঁ, সিরাজউদ্দৌলা, দ্যাট সু-বা-ডা-র!’ (ইংরেজরা সিরাজকে নবাব বলত না)।

কান্ত অভয় দিলেন। ‘কোম্পানির খাতির যা পেয়েছি, এর পর আপনার কোনও ভাবনা নেই হুজুর।’ কিন্তু ওঁর নিজেরই ভাবনা হল ক্ষুধার্ত সরকার বাহাদুরকে খেতে দেন কী!

“মুশকিলে পড়িয়া কান্ত করে হায় হায়

হেস্টিংসকে কী খেতে দিয়া প্রাণ রাখা যায়?

ঘরে ছিল পান্তা ভাত, আর চিংড়ি মাছ

কাঁচা লংকা, বড়ি-পোড়া, কাছে কলাগাছ।

কাটিয়া আনিল শীঘ্ৰ কান্ত কলাপাত

বিরাজ করিল তাহে পচা পান্তা ভাত।

পেটের জ্বালায় হায় হেস্টিংস তখন

চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয় করেন ভোজন।”

হেস্টিংস কান্তর ভবনে ডিনার খেলেন। প্রাণ বাঁচল। কোম্পানিও হেস্টিংসের মতো মহাবলীকে পেয়ে রক্ষা পেল। মনে রাখবেন গুণগ্রামের ফিরিস্তি দিয়ে তাঁকেও এক দিন দরখাস্ত করেই চাকরি জোগাড় করতে হয়েছে।

তারপর আরও অনেকে দরখাস্ত করেছেন। চাকুরি পেয়েছেন। কান্তরাও তাদের খাতির করে আসছেন ঐতিহ্যানুযায়ী। আজও করেন। কান্ত মুদিরা না থাকলে পান্তার অভাবে বহু খুদে-হেস্টিংস বোধহয় মারা যেতেন এ গলিতে ও গলিতে। রাইটাররাও নিমকহারাম নয়। তারাও মুদিদের খাতির করে। তেলের নামে চর্বি কেনে, ময়দার নামে পাথরের গুঁড়ো, তবুও পুলিশে যায় না। এ সৌহার্দ্য দীর্ঘজীবী হোক।

মুদি-দোকান থেকে এবার আসা যাক রাইটার-আলয়ে। রাইটার্স বিল্ডিংস-এ। রাইটার্স বিল্ডিংস তখন রাইটারদের নিবাসস্থান সেক্রেটারিয়েট মহাকরণ নয়। এটা হয়েছে অনেক পরে। তার আগে তরুণ সিভিলিয়ানদের বাসভূমি অথবা বিচরণভূমি রূপে রাইটার্স বিল্ডিংস-এর অর্ধ শতক কেটে গেছে। সিভিলিয়ানরা আসে। জাহাজ থেকে নেমে বাড়ি চায়। বাংলো বাড়ি। কোম্পানি দেখল এ তো মহা মুশকিল। তারা লালদিঘির এধারে তাদের এই খাস জমিটাকে পাট্টা দিয়ে দিল জনৈক টমাস লিয়নকে। ১৭৭৬ সালের ১৮ নভেম্বর লিয়ন হাতে পেলেন জমিটা। তৈরি হল রাইটার্স বিল্ডিংস। রাইটারদের বাসভূমি। কোম্পানি হাঁফ ছাড়ল। বাড়িভাড়া, পালকি-ভাড়া, খাওয়া-খরচা এটা-ওটা করে মাসে মাসে কম অ্যালাউন্স লুটেছে ছোকরাগুলো। এবার সব রহিত। নিয়ম হয়ে গেল যাদের মাসিক মাইনে তিনশ টাকার কম তাদের এখানে থাকতে হবে। চাকর-বাকর এটা-সেটার নামে আগে তারা যা পেত, এবার থেকে সে খাতে তারা পাবে মাসে সাকুল্যে একশ টাকা।

‘তথাস্তু’ বলে নব্য রাইটাররা এসে ঢুকল রাইটার্স বিল্ডিংস-এর কোঠায়। কোঠায় মানে আধুনিক ওয়ান-রুম ফ্ল্যাটে নয়। এক-একখানা ফ্ল্যাট, একখানা বাড়ি। সুতরাং আপত্তি কী। রাইটার নাচে, গায়, কফিখানা করে, পাত্রীর সন্ধান করে, বিজ্ঞাপন দেয়, শিস দেয়। কেউ কেউ বাগানবাড়িও রাখে। নরক গুলজার লালদিঘির পাড়ে। এদের বিলাসিতার বহর দেখে কোম্পানিও বিচলিত হয়ে উঠল। কড়া হুকুম হল, এক একজন রাইটার চাকর রাখতে পারবে দুই জন মাত্র। এক জন তার ফরমাশ খাটবে, অন্যজন বাইরে গেলে সঙ্গে থাকবে। আর তাকে একজন মাত্র বাবুর্চি অনুমোদন করা হবে। দুই, কোম্পানির লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনও রাইটারের বাড়ি কিংবা বাগানবাড়ি রাখা চলবে না। তিন, রাইটাররা সাধারণ সাধাসিধে পোশাক ছাড়া মহার্ঘ পোশাক পরতে পারবে না। ইত্যাদি।

রাইটাররা কিন্তু এজন্যে মোটেই ভাবিত হল না। তাঁরা মিটিং-এও বসলেন না, ধর্মঘটের নোটিসও দিলেন না। এমন তো নয় যে, লোয়ার ডিভিসন হয়েই জন্মেছি, লোয়ার ডিভিসন হয়েই বিগত হতে হবে। আজ আছি আন্ডার রাইটার, কালই হব রাইটার। তারপর ফ্যাকটার, তারপর জুনিয়র মার্চেন্ট, তারপর সিনিয়র মার্চেন্ট, তারপর যা খুশি। ক’দিনের মামলা। বারো চৌদ্দ বছর চাকরি হলেই ঢের। লিফট তখন লিফট, সিঁড়ি নয়। হু হু করে ওপরে ওঠে। সুতরাং রাইটার অপেক্ষা করে রইলেন। পরের বছরই মাইনে বেড়ে তিনশর ওপরে হল। সঙ্গে সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিংসকে ফাঁকা করে চলে এলেন বাড়িতে। বাড়িতে মানে, সাহেব পাড়ার কোনও সুরম্য প্রাসাদে।

এবার আসুন তার বাংলোয়। দেখলেই বুঝবেন বাড়িখানা যাতে যথাসম্ভব ঠাণ্ডা থাকে তেমনিভাবে তৈরি। দূর থেকেই দেখবেন রাইটার বসে আছেন। মানে, ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে আছে। তার একখানা পা এলায়িত দামি মোড়ার উপর। ১৮৩৫-এর ‘ওরিয়েন্টাল অ্যানুয়াল’ লিখছেন: দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই দেখবেন একটি লোক এসে সেলাম করে দাঁড়িয়েছে, হুজুর, কী আদেশ? উনি সরকার।

পিছনে এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে হুঁকোবরদার। ছিলিম বদল করবে। পাখাওয়ালা অন্য পাশে দাঁড়িয়ে যোগ্য সাইজের তালপত্রে ধীরে ধীরে হাওয়া করছে। পেয়াদা কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে কোথাও কোনও আদেশ বহন করে যেতে হবে কি না, তাই জানতে। বাড়ি ময় ভৃত্য-বাবুর্চি। যেদিকেই তাকান, দেখবেন ভৃত্যের মেলা। প্রতি জানালায় মানুষ, প্রতি দরজায় মানুষ।

তারপর পোশাক বদল। ত্রিশ প্রস্ত পোশাক তখনকার স্বাভাবিক রীতি। বহু জনের সহায়তায় বহু মিনিট ব্যয়ে রাইটার পোশাক পরলেন। পালকি চড়লেন। বেহারা ছাড়াও আগে-পিছে মানুষ। তাঁর ভৃত্যের দল। চার ঘণ্টা থেকে পাঁচ ঘণ্টা অফিস। টিফিন বাড়িতেই। তার ফর্দ দিয়ে আর আধুনিক রাইটারদের ক্ষুধার্ত উদরকে স্মৃতিকাতর করতে চাই না। বিকেলে বই পড়া, তাস খেলা, ঘোড়ায় চড়া কিংবা ভ্রমণ। শেষোক্তটি হলে ব্ল্যাক টাউনের বউ-ঝিরা হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখত দরজার ফাঁক দিয়ে। দীর্ঘ মিছিল চলেছে রাইটারের অগ্র-পশ্চাতে।

একালের রাইটাররা স্বভাবতই এর পর জানতে চাইতে পারেন, এইসব নবাবদের মাইনে-পত্তর কীরকম ছিল। তার চেয়ে বরং শুনুন খরচপত্র কেমন হত তার কথা। মাসে ৫০ টাকা বাড়িভাড়া দিয়ে শুধু খাওয়া-থাকা বাবত একজন রাইটারের মাসিক খরচ কত ছিল জানেন? ৩০০০ টাকা। তাও অধিকাংশই অকৃতদার। আর বিবাহিত হলেই মা-ষষ্ঠীর পুজো বড় একটা প্রচলিত ছিল না তখনকার ও-পাড়ায়। বলা বাহুল্য, বুঝতেই পারছেন, মাইনে যা-ই হোক, তা দিয়ে চাকর-বাকরের রীতিমত একটা সেক্রেটারিয়েট পোষা সম্ভব হত না। অবশ্য উপরের দিকে মাইনের পরিমাণটিও একেবারে নগণ্য ছিল না। আর উপরে ওঠাও যে খুব কষ্টসাধ্য ছিল না, সে কথা তো আগেই বলেছি। সবচেয়ে নিচু থেকে সবচেয়ে উঁচুতে ওঠা করিতকর্মাদের পক্ষে মাত্র ক’বছরের ব্যাপার। মিঃ কোচর‍্যানে ১৭৬৯ সালে কোম্পানির চাকরি নিয়ে এলেন। পদ—রাইটার। ১৭৭৬ সালে তিনি ফ্যাক্টর। ’৭৮-এ কোম্পানির জুনিয়র মার্চেন্ট, ’৮০-তে সিনিয়র মার্চেন্ট। ব্যস, চাকরি হয়ে গেল। এর পর তিনি হলেন পুরো ব্যবসায়ী। সৈন্যবাহিনীতে মদ সরবরাহ করা হল তাঁর কাজ। ১৮০৮ সালে দেশে ফিরলেন ভদ্রলোক। ট্যাঁকে করে ঘরে নিয়ে গেলেন ৪০,০০০ পাউন্ড। স্বদেশে তিনি আর সকলের কাছে একজন ‘নাবব।’

এরকম টাকা অনেকের পকেটেই থাকত। চাকুরিগত উন্নতি-অবনতির সঙ্গে তার যোগ ছিল অতি সামান্য। প্রশ্ন: তবে হত কী করে? টিউশনি কিংবা ইন্সিওরেন্সের দালালি করে নয়, ব্যবসা করে। থ্যাকারের ঠাকুরমশাই এমনি প্রাইভেট বিজনেসের দায়ে পড়েছিলেন একবার। বদলি হওয়ার সম্ভাবনা দেখে ভদ্রলোকের নিজের অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রির জন্যে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন কাগজে। সে তালিকা দেখলে হিজ হাইনেস মহারাজা অব অমুকও বসে পড়বেন।

বলা বাহুল্য, রাইটারদের এই সৌভাগ্য-সংবাদ সাগরতীরেও অবিদিত রইল না। এতদিন কেরানিগিরি ছিল মধ্যবিত্ত সন্তানদের একচেটিয়া। এবার বোর্ড অব ডিরেকটারদের দরজায় দরখাস্ত হাতে লাইন দিয়ে বড় ঘরের ছেলেটা দাঁড়াল। ব্যারন-লর্ড-পুত্ররাও। এখনকার কলকাতার মতো রাইটারি সু-দুর্লভ হয়ে উঠল ইংল্যান্ডেও। কারণ, রাইটার আর মশা-মারা কেরানি নয়, রাইটার তখন তাদের কাছে বাদশাহ।

সুতরাং চলো ক্যালকাটা।

কিন্তু যোগ্যতা? যোগ্যতা হচ্ছে দেহবর্ণ উত্তম শ্বেত কি না। এর পরের যোগ্যতা সেই সনাতন বস্তুটি, উৎকৃষ্ট ব্যাকিং আছে কি না। কমপিটিটিভ এগজামিনেশন চালু হয় ১৮৫৫ সালে। সুতরাং মামা-মেসোর বলই তখনও শ্রেষ্ঠ বল। স্বয়ং ইংল্যান্ডের তদবির করে মিসেস সিডনের ছেলেকে চাকরি জোগাড় করে দিলেন একটা। মিসেস সিডন ইংল্যান্ডের অভিনেত্রী-শ্ৰেষ্ঠা, তবু তাঁর ছেলে এ পরিচয়ে হল না। জর্জ জন সিডনের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হল স্বয়ং রাজাবাহাদুরকে। ১৮৩৩ সালের হিসেবমতো এদেশে রাইটার হিসেবে পূর্ববর্তী পাঁচ বছরে যাঁরা নিযুক্ত হয়েছেন, তাঁদের গোত্রানুযায়ী ধরলে দেখা যায় ৩ জন মাত্র মধ্যবিত্ত সন্তান। বাদবাদিকের মধ্যে ২১ জন যাজক-পুত্র, ৪৬ জন উত্তরাধিকারসূত্রে রাইটার অর্থাৎ রাইটার-পুত্র, ৭৮ জন কোম্পানির সৈন্য বিভাগীয় হেন-তেনদের সন্তান, ১৪৬ জন ব্যবসায়ী-ব্যাংকার তনয়, ইত্যাদি। এখানেই শেষ নয়। এ দেশে ৯টি ব্যারনপুত্র চাকরি করে পরে এম.পি। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য। রাইটার হিসেবেই কলম পিষে গেছেন ১১ জন এম.পি-র সন্তান। লর্ড রামসে ছিলেন অষ্টম আর্ল অব ডালহৌসির পঞ্চম পুত্র। তিনিও চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন রাইটার হিসেবে। এমনকী, তখনকার কালে পার্লামেন্টের সদস্যপদের চেয়ে কলকাতার রাইটারিও অভিপ্রেত ছিল ইংল্যান্ডের অভিজাত মহলে। এমনই দু চারটে ঘটনাও আছে কলকাতার রাইটার-পুরাণে।

বলা বাহুল্য, অর্থের দিক থেকে কিংবা ব্যবসাবুদ্ধির বিচারে সেটা মূর্খতা হত না। বিশেষ করে পার্লামেন্টের সিট যখন পয়সা খরচ করতে পারলে দুর্লভ নয়। হাউস অব কমন্স থেকে রাইটাররা তাই সোজা চলে আসত কলকাতায় কিংবা মাদ্রাজে। তারপর ক’বছর চাকরি করে আবার উঠে বসত দেশমুখী জাহাজে। সঙ্গে থাকত অর্থ, প্রতিপত্তি, অভিজ্ঞতা এবং স্বভাবতই আভিজাত্যও। মেকলে এখানকার এগজিকিউটিভ কাউন্সিলের সভ্যপদ গ্রহণ করে (১৮৩৩) বোনকে লিখেছিলেন, ‘দেখ, বছরে মাইনে পাই দশ হাজার পাউন্ড। পাঁচ হাজার খরচ করলে বাদশাহের মতন থাকতে পারি এখানে। সুতরাং বুঝতেই পারছ আর পাঁচ হাজার পকেটে থাকবে। যদি ছ’বছর কাজ করি, তবে তো হয়েই গেল। আমি আশা করি, ইংল্যান্ডে যখন ফিরব, তখন আমার বয়স হবে ৩৯ বছর, এবং পকেটে থাকবে ত্রিশ হাজার পাউন্ড। এর চেয়ে বেশি অর্থ কোনও দিন কি প্রত্যাশা করতে পারি আমি?’

মেকলের মতো বড় চাকুরে না হলেও ফেরার সময়ে অধিকাংশের পকেটে থাকত—প্রত্যাশার চেয়েও বেশি অর্থ। বলতে গেলে অস্বাভাবিক ধন-দৌলত। মানুষগুলোর পক্ষেও তাই সম্ভব হত না স্বাভাবিক থাকা।

এই হঠাৎ-বড়মানুষদের, অর্থাৎ, ইন্ডিয়া-ফেরত রাইটারদের ও দেশে বলা হত তখন নাবব (Nabob)। আজ হরিপদ কেরানি আকবর বাদশাহ হওয়ার স্বপ্ন দেখে না, দেখলেও রগড়ে রগড়ে চোখ ধুয়ে ফেলে কিন্তু সেদিন মিঃ অমুখ লর্ড তমুক হওয়া নিয়ে মোটেই ভাবতেন না। ভাবতেন অন্যতর বিষয় নিয়ে। ‘Nabob in England’ বইয়ে তাঁদের অনেক কাহিনী আছে। তার একটি:

‘রিচার্ড স্মিথ একজন নবাব। ভারত থেকে ফিরে এসে তিনি একখানা বাগানবাড়ির মালিক হয়েছেন বার্কশায়ারে। তাঁর গুটিকয় রেসের ঘোড়া আছে। নিজে তিনি জকি ক্লাবের সভ্য। জুয়াড়ি হিসেবে স্মিথ সারা শহরের আলোচ্য বস্তু। এমন দিনও গেছে, যেদিন ১ লক্ষ ৮০ হাজার পাউন্ড হেরে গিয়েও তিনি পরম বীরত্বে হেসেছেন। একদিন সেন্ট জেমস স্ট্রিটের এক হোটেলে গিয়ে দরজা বন্ধ করে সটান শুয়ে পড়লেন স্মিথ। উদ্দেশ্য, ক্ষণিক বিশ্রাম। শোওয়ার আগে বাটলারকে বলে দিলেন: দেখ, অন্তত হাজার তিন পাউন্ড নিয়ে যদি কেউ একহাত খেলতে আসে তো কাল সকালে ডেকে দিও। নয়তো ডাকাডাকি করো না বাপু।’ বুঝতেই পারছেন তা হলে এই নবাবটি কেমন বাহাদুর ছিলেন। এর পর রিচার্ড স্মিথের নজর পড়ল পার্লামেন্টের দিকে। এত কিছু তো হল। নবাব জীবনের যা কাম্য সবই পেলাম দু’হাত ভরে। প্রভাব-প্রতিপত্তি, রেসের ঘোড়া, বাগানবাড়ি, মেয়েমানুষ সব। এটুকু আর অপূর্ণ রাখি কেন? বিশেষ করে কাঞ্চনমূল্যে যখন তা লভ্য। রিচার্ড স্মিথ হাত বাড়ালেন হাউস অব কমন্সের দিকে। মুঠো মুঠো রক্ত মাখা টাকা সে হাতে। হেস্টিংসও তাই করেছিলেন। তাঁর এজেন্ট বা সাগরেদ মেজর স্কটের জন্যে তিনিও একবার (১৭৮৪) সিট কিনেছিলেন একখানা। হাউস অব কমন্সের সিট। দাম ৪ হাজার পাউন্ড।

রিচার্ড স্মিথও পেলেন। কিন্তু পুরনো অভ্যেস কাল হয়ে দাঁড়াল। ভারতবর্ষের যত্রতত্র হাত চালাতে দিলেই স্বদেশেও তা চালাতে হবে নাকি? ঘরে ইংরেজের সততা গঙ্গাতীরের সতীদের মতো। তাঁরা হাত চেপে ধরলেন স্মিথের। পরের বছরই করাপসানের দায়ে আসনচ্যুত হলেন বেচারা। শুধু তাই নয়, নগদ জরিমানা হয়ে গেল ৬৩৬ পাউন্ড। তদুপরি ছমাসের কারাদণ্ড।

এসব গোলমাল, তারপর আছে পাওনাদারের আক্রমণ। ইংল্যান্ডের মুদিরা তো আর ভারতবর্ষের মতো নয়। ওরা এসব ব্যাপারে একটু জোরে কথা বলেন। পাঁচজনকে শুনিয়েই। বাধ্য হয়ে পলায়ন করলেন স্মিথ। কোথায়, কেউ জানা দরকার মনে করল না এর পর। শেষ পর্যন্ত স্মিথের কী হল? লেখক বললেন, স্মিথ পুনর্মুষিক হলেন।

অষ্টাদশ শতকের রাইটারের এই মোটামুটি জীবন। তবে এক কুলের জীবন। মুৎসুদ্দিদের জীবন ভিন্ন। একালের কেরানি বাবুদের ভিন্নতর। নাই হলেন তাঁরা রিচার্ড স্মিথ। তবুও তো সান্ত্বনা, একযুগে তাঁদেরই স্ব-গোত্র কোনও এক হ্যারিপড কিং জর্জ হয়েছিল বার্কশায়ারে। ছিদাম মুদি লেনের হরিপদরা পুরুষানুক্রমে স্বপ্নই দেখে গেল শুধু এই যা দুঃখ। তার চেয়ে বড় দুঃখ, স্বপ্ন দেখার অধিকারটুকুও আজ নেই হরিপদর। সেই যে যুদ্ধের পর বেকার হয়েছিল, তারপর হরিপদ আর কেরানি হতে পারল না আজও। হরিপদ আজও বেকার।

ডাক্তার-বদ্যি

অষ্টাদশ শতকের কলকাতা সাক্ষাৎ যমপুরী। লোক আসে আর মরে। মরে, তবুও আসে। আসার যেমন বিরাম নেই, মরারও তেমনি শেষ নেই। দিব্যি সুস্থ-সমর্থ জোয়ান ছেলে সন্ধ্যায় নেমেছে চাঁদপাল ঘাটে। রাত্তিরটাও কাটল না। ভোরবেলাতেই দেখা গেল কলকাতা অ্যাডভেঞ্চারে দাঁড়ি পড়ে গেছে তার। ‘The travellers at eve’ were in the momig dead.’

কেউ ঠাহর করতে পারল না কী ব্যামো হয়েছিল ছেলেটার। অজানা দেশ, রোগও অজানা। নিঃশব্দে সবাই দেহটাকে বয়ে নিয়ে গেল কবরখানায়। মাটি চাপা দেওয়া হল। কিন্তু একজন তো আর নয়। নিত্যিনৈমিত্তিক ব্যাপার এই। লোক আসে, মরে। হ্যামিলটন সাহেব লিখেছেন: ‘এক বছর আমি কলকাতায় ছিলুম। ওটা ছিল আগস্ট মাস। মিলিটারি সিভিলিয়ান এবং নাবিকে মিলে শবারো লোক ছিল শহরে। জানুয়ারির প্রথমে দেখা গেল, তার মধ্যেই এ কয় মাসে মৃত্যু-রেজিস্টারে নাম উঠেছে চারশ ষাটজনের।’

কলকাতা তাই যমপুরী। ঘুম থেকে উঠে, কে বেঁচে আছে, কে বেঁচে নেই, ঠাহর করা কঠিন। ইংরেজরা তাই নিয়ম করেছিলেন, একদিন মিলতে হবে সবাইকে একসঙ্গে, এক জায়গায়। জায়গাটার কোনও ঠিক ছিল না, কিন্তু নির্দিষ্ট ছিল ১৫ নভেম্বর। গ্রীষ্ম বর্ষার ধকল কাটিয়ে যাঁরা বেঁচে থাকতেন, তাঁরা সেদিন সকলে মিলে হিসেব মেলাতেন। কে গেল, কে রইল তারই হিসেব।

লোক মরত। এখনও মরে, তখনও মরত। সাহেব-নেটিভ নির্বিশেষেই মরত। শুধু ভিন দেশের আবহাওয়ায় নয়, কেউ মরত ম্যালেরিয়ায়, কেউ পাক্কা জ্বরে, কেউ রক্ত আমাশায়। শহরের তিন ভাগের দু’ভাগ লোকই নাকি ছিল পেটের রোগী। তবে পেটের রোগী নেটিভরা মরত না-খেয়ে কিংবা কম খেয়ে, আর সাহেবরা বেশি খেয়ে। এক সাহেব লিখেছেন: ‘সে কী খাওয়া। হাড্ডিসার লিকলিকে একটা মেয়ে আড়াই পাউন্ড মুরগির রোস্টখানা কিনা তুলে ফেলল অক্লেশে।’ স্বভাবতই সাহেব মেমরা বেশি মরতেন কলেরায়। এমনকী, কখনও কখনও নেচে নেচেও মরতেন ওঁরা। ‘বল-নাচ’ ছিল তখনকার কলকাতার ইঙ্গ-সমাজের একমাত্র আনন্দ, রিক্রিয়েশান। তার আগে নেশা ছিল ঢুলতে ঢুলতে এদেশি বাইজিদের নাচ দেখা। ‘বল’ নাচ শুরু হয় পরে, মেম সাহেবদের সংখ্যা বৃদ্ধির সুবাদে। এক প্রত্যক্ষদর্শী লিখেছিলেন, ‘নাচ বটে। বিকেলে শুরু হয়েছে, এখনও বিরাম নেই। সুরার সঙ্গে অনবরত নেচে নেচে এই শীতের রাতেও ঘেমে উঠেছে মেয়েগুলো। ভোর অবধি চলবে এমনি।’

বলা বাহুল্য, এই অতিরিক্ত আনন্দে কেউ কেউ ভোরের দিকে পরমানন্দের দেশে পৌঁছে যেত। ডাকলেও আর সাড়া পাওয়া যেত না তাদের। যম তাই ওত পেতে থাকত এখানে ওখানে। খানার টেবিলের নীচে, নাচের আসরের আড়ালে, পথেঘাটে, সর্বত্র।

যমপুরী, কলকাতা ছিল তাই ডাক্তারদের কাছে ‘স্বর্গপুরী’। এ অলকায় তারা আর আইনজীবীরা ছাড়া আর কোনও পেশাদার মানুষ ছিলেন না। বাদ বাকি যাঁরা ছিলেন তাঁরা সব ব্যবসায়ী দোকানি কিংবা সরকারি চাকুরে। কথাটা আমি বানিয়ে বলছি না। শম্ভুচন্দ্র মুখার্জি তাঁর ‘Mookerjee’s Magazine’-এ লিখেছেন ‘নেপোলিয়ান ইংরেজদের ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘দোকানির জাত’ (A nation of shopkeepers)। কলকাতাকে যদি তেমনি বলা যায় দোকানির শহর, তবে মিথ্যে বলা হয় না।”

দেশি এবং বিদেশি দোকানিতে মিলেই ছিল তখনকার শহর কলকাতা। বুদ্ধিজীবী বলতে ছিলেন এই ডাক্তার বদ্যি আর আইনজীবীরা, এবং বুদ্ধিজীবী বলতে যোগ্যার্থে যা বোঝায়, তাই ছিলেন তাঁরা। পাশ-করা বিদ্যে নয়, জন্মসূত্রে পাওয়া বুদ্ধিটুকুই ছিল তাঁদের কারবারের ষোল আনা মূলধন। ওটাকে খাটিয়েই রুজি-রোজগার করতেন তাঁরা এবং পরিমাণের দিক থেকে তা যে আজকালের তুলনায় কম ছিল না, সেকথা বলাই বাহুল্য। অষ্টাদশ শতকের কলকাতার এই ডাক্তার-বদ্যিদের কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই আমার মনে পড়ছে সুকুমার রায়ের কথা। আমি হলফ করে বলতে পারি, তাঁর ‘ছায়ার ওষুধে’ অতি অল্পদিনেই নেটিভ মহলে তাঁর পসার এমনি বাড়িয়ে তুলত যে, কবিতা লেখার আর মোটেই সময় পেতেন না তিনি। চাই কি, ‘আষাঢ় মাসের বাদলা দিনে’ বাঁচবার জন্যে সাহেবরা হয়তো তাঁর দোড়গোড়ায় ‘তেঁতুল গাছের তপ্ত ছায়ার’ জন্যে লাইন দিয়ে দাঁড়াতেন। তা ছাড়া, কাগজের রোগী কেটে যেভাবে তিনি হাত মকস করেছিলেন, তাতে ‘সার্জন’, হিসাবেও ও মহলে তাঁর যথেষ্ট খাতির হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কারণ, ডাক্তারি বলতে এর চেয়ে বেশি উচ্চতর কোনও বিদ্যা তখন চালু ছিল না শহরে। না ব্ল্যাক টাউনে, না চৌরঙ্গি পাড়ায়।

ব্ল্যাক টাউনে চিকিৎসা বলতে ছিল—যা খুশি। কবরেজি, হেকিমি, ফুঁ-ঝাড়া মন্ত্র, তাবিজ-কবচ—সব। দৈব ওষুধ বা স্বপ্নাদ্য ওষুধ, ভালুকের লোম, সাপের চোখ, ধনঞ্জয় পাখির ঠোঁট এসবও চালু ছিল আজকের মতো। তবে সবচেয়ে বেশি চলত, জ্ঞানোপ্যাথি অর্থাৎ যার যার জ্ঞানমতো চিকিৎসা। স্বভাবতই সাহেবরা বাতিল করে দিয়েছেন আমাদের নেটিভ চিকিৎসকদের। সাহেব রোগীরা কী করতেন জানি না, তবে সাহেব পণ্ডিতেরা তাই করেছেন। উইলিয়ম জোন্স লিখেছেন, ‘হিন্দুরা এত শাস্ত্র লিখেছেন, যা এক জীবনে পড়ে শেষ করা যায় না। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাঁদের কেন, প্রাচ্যখণ্ডের কোনও ভাষাতেই এমন চিকিৎসাশাস্ত্র নেই, যাকে আমরা বিজ্ঞান বলে গ্রহণ করতে পারি। অধ্যাপক উইলসন লিখেছেন: In the treatment of disease, the Hindoo writers are essentially deficient.

তিনি আরও এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘এদের ওষুধ হাস্যকর।’ ওয়ার্ড সাহেবেরও তাই মত: হিন্দু-বদ্যিরা চিকিৎসা জানে না, তাও বরং কিঞ্চিৎ জানে মুসলমান হেকিমরা। একালে অবশ্য বিশ্বময় চরক-শুশ্রুত আলোচ্য। হিন্দু চিকিৎসা বিজ্ঞানের দুনিয়াজোড়া খ্যাতি এবং খাতির।

তা বেশ, না জানুক। ওঁরা নিজেরা কেমন জানতেন, এবার শুনুন তার কাহিনী। সাহেব কবিই লিখে গেছেন।

Some doctors in India would make Plato smile,

If your fracture your skull, they pronounce it bile,

And with terrific phiz and stare most sagacious,

Give a horse-ball Jalap and pills saponaceous.

A sprain in your toe or an aguish shiver,

The faculty here call a touch of liver,

And with ointment mercuri and pills calomelli

They reduce all bones in your skin to a jelly. ইত্যাদি।

এবার একটু শুনুন তাঁদের জ্বরের চিকিৎসা-বিবরণ। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ১৮৬৪ সালের একটি হাসপাতালের জনৈক রোগীর চিকিৎসার বিস্তৃত রেকর্ড। রোগীটির নাম ধরুন, মিঃ বি। মিঃ বি’র জ্বর হয়েছে। বিদেশ-বিভুঁয়ে দেখাশুনা করবে কে, তাই হাসপাতালে এসেছে। ৯ জুলাই সে ভোরে ভর্তি হল। বেলা ১টায় শুরু হল চিকিৎসা। ডাক্তাররা কেউ বিলাত ফেরত নয়, সব বিলাতজাত। সুতরাং প্রথমেই রোগীর শরীর থেকে রক্ত ফেলে দেওয়া হল এক পাউন্ড। ওই দিনই বেলা দুটোয় আর এক পাউন্ড। তারপর তেল এবং নুনের কী একটা ঘণ্ট খেতে দেওয়া হল। তারপর এ জাতীয় আরও ওষুধ। (ডাক্তারি পরিভাষা আমার জানা নেই। তাই অনুবাদ করা ক্ষান্ত দিচ্ছি।) কোনওমতে সেদিনটা চলে গেল। পরের দিন, অর্থাৎ ১০ তারিখ সকালে খেতে দেওয়া হল ক্যাস্টর অয়েল। তারপর:

‘At 7 a.m. 16 oz of blood was taken away and antimonial wine in camphor mixture was prescribed. At noon 18 leeches were applied to the right side; at 9 a.m. the patient was bathed in perspiration and a blister was applied to the epigastrain.’

‘তবুও দুঃখের বিষয়, দুপুরে মারা গেল লোকটা।’ যদি প্রেসক্রিপশানখানা পড়ে মনে হয় আপনার, রক্তপাতের ফলেই মরেছে হতভাগ্য লোকটি, তা হলে আজকের কোনও ডাক্তার হয়তো তাতে আপত্তি করবেন না। কিন্তু সেকালে হলে মানহানির মামলা দায়ের হয়ে যেতে পারত আপনার নামে। কারণ ওটাই তখন ‘বিজ্ঞান’, ওই তখনকার চিকিৎসা। কলকাতা তো কোন ছার। খোদ ইংল্যান্ডেও তখন একই অবস্থা। এখান থেকে বিচারপতি ইম্পে চিঠি লিখেছেন। ‘ক’দিন ধরে একটু জ্বর যাচ্ছে। তবে আশা করছি, এবার সেরে উঠব। কারণ, গতকাল রক্তপাত করা হয়েছে।’ ওখান থেকে তাঁর পরিবারের লোকেরা আবার লিখেছেন: ‘অমুককে অমুকদিন ব্লিডিং করানো হয়েছে, বেচারা ক্রমেই শুকিয়ে যাচ্ছিল কিনা, তাই।’

ব্লিডিং আর ব্লিডিং। শুকিয়ে যাচ্ছ? কেন জান? তোমার গায়ের রক্ত খারাপ হয়ে গেছে তাই। বিজ্ঞান তাই বলে। সের দুই রক্ত ফেলে দাও, দেখবে আবার কেমন মুটিয়ে গেছ। অতঃপর বিজ্ঞানকে আর অস্বীকার করবে কে। শোনা যায়, বায়রন পর্যন্ত তা করতে পারেননি। মুমূর্ষু কবি তাঁর শিয়রে ডাক্তারদের দেখে নাকি রেগে বলে উঠেছিলেন: There you are, I see a damned set of butchers; take away as much blood as you like and have done with it.

২০ আউন্স রক্ত নিয়েছিলেন ওঁরা সেদিন। আর নিয়েছিলেন স্বয়ং কবিকেও। তবুও রোগীর অভাব হত না। বরং অভাব ঘটে যেত কখনও কখনও ডাক্তারের। ফলে, বিজ্ঞাপন দিয়ে পর্যন্ত ডাক্তার ধরতে হত রোগীকে। ১৭৯৩ সালের একখানা বিজ্ঞাপন তুলে দিচ্ছি। ‘নব যৌবন শক্তি’ কিংবা ‘সিংহ মার্কা জোয়ান মিকশ্চারের’ বিজ্ঞাপন নয়—‘ডাক্তার চাই’ ‘ডাক্তার চাই’ আবেদন।

“A person suffering much by corns under his feet, will give one thousand sicca rupees to any person capable of extracting them, to be paid upon the performance of the cure. Enquire No.-83, Zig Zag Lane.”

যা হোক, বিজ্ঞাপন পেয়ে নিশ্চয়ই ডাক্তার এলেন। তাঁর পালকি এসে থামল ৮৩ নম্বরের দোরগোড়ায়। কন্ট্রাক্টের চিকিৎসা। ডাক্তার সেটা জানেন, ‘টাকা না হয় দেবেন কন্ট্রাক্ট শেষ হলে এখন ফি-টা দেবেন তো?’ বালিশের তলা থেকে রোগী বের করে দিলেন ফি। ৬৪টি সিক্কা টাকা, নয়তো এক সোনা-মোহর। গুনে গুনে পকেটে পুরলেন ডাক্তার। ‘তারপর, বেহারার মজুরি? বেহারাদের পয়সা দিতে হবে না বুঝি?’ ক্ষেত্রবিশেষে ওটাও দিতে হত। আজকালকার মতো গাড়ি নয়, পালকি ছিল ডাক্তারদের বাহন, ফলে আজকের গাড়ি-ফি’র মতো তখন দিতে হত ফি। এখানেই শেষ হল না। তারপর ডাক্তারবাবু বললেন, চলুন একজন আমার সঙ্গে ওষুধ আনতে হবে। বলা বাহুল্য, তার দামও দিতে হবে। মিসেস সোফিয়া গোন্ড বোর্ন তাঁর ‘Hearty House’-এ লিখেছেন:

‘The extras are enormous, such as a Bolus-one rupee, an ounce of salt, ditto; an ounce of bark,-three rupees, such a lot of these commodities have to be swallowed, that literally speaking, you may ruin your fortune to preserve your health.’

অর্থাৎ ডাক্তারের এই উপরি পাওনাও কম নয়। এক আউন্স নুন তার কাছে এক টাকা, একটুকরো গাছের ছাল—তিন টাকা। এমনি সব গাদা গাদা জিনিস গিলতে হবে তোমাকে। মোট কথা, স্বাস্থ্যটিকে বাঁচাতে হলে, বিষয় আশয়ের চিন্তা বাদ দিতে হবে।

কলকাতায় তাই রোগী মারা যেত শেষ অবধি চিকিৎসার অভাবে নয়, টাকার অভাবে। আর ওদিকে টাকায় গড়াগড়ি যেতেন ডাক্তার-বদ্যিরা। আগেই বলেছি, উকিল-মোক্তার-ব্যারিস্টার আর ডাক্তার বদ্যি অর্থভাগ্যে এ শহরে বণিক ব্যবসায়ীর পরেই। এ ব্যাপারে ভাল ডাক্তার আর মন্দ ডাক্তারের পার্থক্য শুধু পরিমাণগত। অন্তত অষ্টাদশ শতকের ইতিহাস তাই বলে।

১৭৯৫ সালের কথা। ডিন উইডিড নামে এক ডাক্তার এলেন কলকাতায়। এসেই বিজ্ঞাপন ছেড়ে দিলেন তিনি একখানা: ন্যাচারাল ফিলজফি এবং কেমিস্ট্রি সম্বন্ধে আমি বক্তৃতা দেব ক’খানা। এই গোটা পঁচিশ। যার ইচ্ছে শুনতে পারো, তবে দশ মোহর করে দক্ষিণা।

ব্যস, তাতে কী? অনেকে ডাক্তারের বক্তৃতা শুনলেন। ফেরার পথে তাদের সবাই হয়ে গেল ডাক্তার। ২৫ খানা বক্তৃতা শুনেছি, আর কী? শুরু হয়ে গেল তাদের প্র্যাকটিস। ক্রমে পসার। একজন বলেছেন: এই যে আজ যিনি নাড়ি ধরে বসে আছেন আপনার, গতকাল তিনি বসে থাকতেন এমনই জাহাজের দড়ি ধরে। আমাদের প্রিন্টার-কাম-ডাক্তার তথা সাংবাদিক হিকি তার বড় প্রমাণ।

যা হোক, অবশেষে একদিন এ সব ডাক্তারির মৃত্যু ঘোষণা করে দুমদুম করে কেল্লা থেকে গর্জে উঠল তোপ। ১৮৩৫ সালের কথা। কী ব্যাপার? না, মড়া কাটা হচ্ছে মেডিক্যাল কলেজে। সে বছরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কলকাতায় মেডিক্যাল কলেজ। বাঙালির ছেলেরা আজ মড়া কাটল সেখানে। মধুসূদন গুপ্ত আর রাজকৃষ্ণ দে মড়া কেটেছে, তাই এই তোপধ্বনি। কাগজের রোগী নয়, জ্যান্ত মড়া।

তার ক’বছর পর আবার হই-চই ব্যাপার। কী হয়েছে? না, বাঙালির ছেলে বিলেত যাচ্ছে। ডাক্তারি শিখবে। চার, চারজন বাঙালি তরুণ। শ্বশুরের পয়সায় যাচ্ছে না কেউ। খরচ জোগাচ্ছেন প্রিন্স দ্বারকানাথ, ডাঃ গুডিভ আর জনসাধারণ। তিনজনের খরচ দিচ্ছেন তাঁরা দু’জন, আর একজনের গোটা কলকাতার মানুষ। ডাক্তার চাই, বিজ্ঞান চাই।

দু’শো বছর পেরিয়ে গেল। বহু ডাক্তার দিয়েছে মেডিক্যাল কলেজে, বহু বিলেতি ডাক্তার বানিয়ে দিয়েছেন শ্বশুরকুল, কিন্তু আজও কলকাতার আনাচে কানাচে পথে-ঘাটে দেখবেন, অষ্টাদশ শতকি সেই ফকির, বদ্যিদের। সেই কবচের দোকান, সেই পাখির ঠোঁট, হাতির পা আর বাঘের চোখের গুদাম, আর স্বপ্নাদ্যের বিজ্ঞাপন। কলকাতা এখনও বলে তার কাছে বিদ্যার চেয়ে বুদ্ধি বড় এবং রোগীর চেয়ে পয়সা।

মূর্তি চোর

উড স্ট্রিট। আজকের পাঁচমিশেলি চৌরঙ্গি এলাকা নয়, তৎকালীন বিশুদ্ধ সাহেবপাড়া। ঝকঝকে তকতকে বিরাট বিরাট বাড়ি। ছায়াচ্ছন্ন আঙিনা, সুন্দর সাজানো-গোছানো বাগান। তখনও সূর্য ওঠেনি। মাত্র কাকডাকা ভোর উড স্ট্রিটে। ঘোড়সওয়ার, পদাতিক, ফিটন, টমটম, ল্যান্ডো, কিছুই বের হয়নি এখনও রাস্তায়। এমনকী, বাড়ির খিদমদগার সরকার পাইক দারোয়ানদের নিত্যকর্মের সময় পর্যন্ত হয়নি এখনও। আগে-পাছে যত দূর দেখা যায়, তেজিয়ান ঘোড়ার মতো ছিমছাম বাড়িগুলো তখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমুচ্ছে।

তা ঝিমুক, যত বেশি ইচ্ছে হয় ঘুমোক। গামছা কাঁধে গাড় হাতে নিঃশব্দে পথে নামলেন একজন। বাড়ির দারোয়ান নয়, স্বয়ং মালিক। স্বভাবতই ইওরোপিয়ান সাহেব। উড স্ট্রিটের কোনও এক বাড়ি থেকে গামছা কাঁধে কলকাতার প্রকাশ্য রাজপথে পা বাড়ালেন একজন সাহেব। গুন গুন করতে করতে হন হন করে চলেছেন তিনি। যথেষ্ট বয়স হয়েছে। নেটিভ হলে বলা যেত বৃদ্ধ, কিন্তু তাঁর হাঁটার ভঙ্গি দেখে বড়জোর বলা চলে বর্ষীয়ান কিংবা প্রবীণ। সাহেবের মুখে বিরামহীন গুন গুন। কান পাতলে শোনা যাবে, এ দেশের জল-হাওয়ার বিরুদ্ধে ‘কক্‌নি’-তে গালাগালি নয়, এমনকী, নয় গতকাল রাত্রির অপেরার কোনও গানের ভগ্নাংশ, গঙ্গা-স্তব করছেন তিনি। শুদ্ধ উচ্চারণে সংস্কৃত স্তব।

গঙ্গা-স্তব করতে করতে আপনমনে চলেছেন সাহেব। এ পাড়ার চৌহদ্দি ছাড়াতে না ছাড়াতেই সহসা দু’দিক থেকে তাঁকে ঘিরে ধরল এক ঝাঁক মানুষ। যেন সারারাত্রিই অপেক্ষায় ওঁত পেতে ছিল ওরা। চারদিক থেকে এগিয়ে এল অসংখ্য কালো কালো শীর্ণ হাত।

‘সাহেব বকশিস। সাহেব গুড মর্নিং। সাহেব বকশিস।’ আশ্চর্য, ধমকে উঠলেন না সাহেব, তেড়ে গেলেন না গাড়ু হাতে। স্মিতহাস্যে হাতে হাতে দিয়ে গেলেন পয়সা। একে পিঠ-চাপড়ে, তাকে ধমক দিয়ে, ও ছেলেটার কানটা একটা হালকা-হাতে মলে দিয়ে ‘গুড মর্নিং’ বলতে বলতেই সহসা হন হন করে বেরিয়ে গেলেন সোজা গঙ্গার দিকে। যাঃ, বড্ড দেরি হয়ে গেল বোধ হয় আজ।

ভিখারির দল তখন পয়সা গুনছে।

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে চৌরঙ্গিপাড়ার অন্য সাহেব-মেমরা তামাসা দেখছিলেন এতক্ষণ। সাহেব চোখের আড়াল হতেই একসঙ্গে ‘তোবা তোবা’ করে উঠলেন সবাই। প্রতিদিনই তাই করেন তারা। মেজর জেনারেল চার্লস স্টুয়ার্ট খাস সাহেবদের প্রতিক্ষণের লজ্জা।

‘Quite a character’—মন্তব্য করেছেন তৎকালীন প্রধান সেনাপতির স্ত্রী লেডি ন্যুজেন্ট। ‘An Idol-stealer’ লিখেছেন জনৈক ব্যাপটিস্ট মিশনারি। অবশ্য সেই সঙ্গে এও বলেছেন, মতটা তাঁর ব্যক্তিগত নয়, ভারতবর্ষের লোকেরা প্রকাশ্যেই তা বলে থাকে স্টুয়ার্টকে।

ভারতবর্ষের লোকেরা কিছু মনে করলে, বলে না, গোপনে যদিও বা বলে কাউকেও, তবুও কদাপি কাগজে কলমে লেখে না, তাই। আজ প্রায় দুশ বছর পর, তারা কী বলত না বলত প্রমাণ করা দুঃসাধ্য তবে স্টুয়ার্টের মৃত্যুর পর কলকাতার ইন্ডিয়ান গেজেটে তাঁর সম্বন্ধে অনেক প্রশংসাসূচক মন্তব্য লেখা হয়েছিল। লেখা হয়েছিল বাংলা সাময়িকপত্র ‘সমাচার দর্পণে’ও।

যাক সে কথা। মিশনারিরাই তাঁকে অবশ্য আখ্যা দিয়েছেন ‘মূর্তি-চোর’। অবশ্য ‘চোর’ ঠিক নয়। এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা’তে ডা. এল ডি বার্নেট লিখেছেন: ‘তবে এটা ঠিক, ভারতীয় রীতিপদ্ধতি এবং মূর্তি ইত্যাদির প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণবশত তিনি কুখ্যাত ছিলেন। বিশেষ করে পুরাতাত্ত্বিক বস্তু সংগ্রহের ব্যাপারে তিনি যে অশোভন পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন, তাই তাঁর এই বদনামের কারণ।’

‘বদনাম কী আর বলতে। মুখ রক্ষা দায় হয়ে উঠেছে এখন’ ভুবনেশ্বর থেকে লিখেছেন লেঃ কিটো। কতকগুলো ইনস্ক্রিপশান সংগ্রহের ব্যাপারে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল সেখানে। কিছুদিন যেতেই তিনি লিখলেন: ‘মন্দিরের পুরোহিতেরা যার-পর-নাই দুর্ব্যবহার শুরু করেছেন আমার সঙ্গে। তাঁরা বলেন, এর আগে এমনভাবেই এসব দেখতে আসার নাম করে, তথাকথিত প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অনেক জিনিস গায়েব করে ফেলেছেন ওঁদের। সম্প্রতি তাঁরা আমায় আনন্দবাসুদেবের মন্দিরের দু’খানা ইনস্ক্রিপশানের শূন্য জায়গাগুলো দেখিয়ে বলেছেন, জনৈক কর্নেল সাহেব নাকি সেগুলো সরিয়ে ফেলেছেন।’

কিটোর চিঠি পেয়ে খোঁজ পড়ল। এশিয়াটিক সোসাইটিকে যাঁরা নানা জায়গা থেকে নানা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ করে উপহার দিয়েছেন, তার মধ্য থেকে বের হল আনন্দ বাসুদেব মন্দিরের অপহৃত লিপি। দাতার নাম: জেনারেল চার্লস স্টুয়ার্ট।

প্রিন্সেপ তখন এশিয়াটিক সোসাইটির কর্তা। তাঁর আদেশে জিনিসগুলো তৎক্ষণাৎ ফেরত গেল যথাস্থানে। হাতে-নাতে ধরা পড়ার জন্য স্টুয়ার্ট অবশ্য তখন বেঁচে নেই। সুতরাং তাঁর বক্তব্যও জানবার সুযোগ হল না আমাদের।

ফলে মিশনারিরা যথারীতি ‘মূর্তি-চোর’ই সাব্যস্ত করলেন তাঁকে। যাঁরা অপেক্ষাকৃত উদার, তাঁরা বললেন: ‘চোর বলা ঠিক নয়। ধরুন, তাঁর কোনও মূর্তি পছন্দ হয়ে গেল, অথচ তাঁর কেনবার মতো পয়সা নেই। সেক্ষেত্রে তিনি জোর করেই কেড়ে আনতেন তা। অর্থাৎ, চোর নয়, ডাকাত।’ যাঁরা আরও যুক্তিবান, আরও মুক্তদৃষ্টি তাঁরা বলেন—থাক থাক, বিগত মানুষকে নিয়ে এত ঘেঁটে আর কী লাভ। স্যার ইভান কটন লিখেছেন: এ তো সবাই জানে, এদেশে দীর্ঘকাল থাকলে মাথা ঠিক থাকে না। ‘Prolonged residence in India sometimes resulted in eccentricity. জানেন তো, ছত্রিশ বছর এদেশে বাস করার পর হুগলির জন হোম ১৫,১০০ টাকা রেখে গিয়েছিলেন ভৃত্যদের হাতে, তাঁর প্রিয় ‘খুশি খাঁ’র ভরণ-পোষণের জন্য। ‘খুশি খাঁ’ ছিল সাহেবের প্রিয় খচ্চরটির নাম। কেমন করে তার খাবার তৈরি করতে হবে, কীভাবে তা পরিবেশন করতে হবে তার বিস্তারিত নির্দেশ রেখে গিয়েছিলেন তিনি তাঁর উইলে। শুধু এঁর কথাই বা বলি কেন? লখনউ-এর লেঃ কঃ চার্লস ডেনটি—তিনিও তো তাই। সহসা একদিন বলে বসলেন, কুছ খায়েগা নেহি। নেহি তো নেহি। জোর করেও এক টুকরো রুটি-মাখন দেওয়া গেল না তাঁর মুখে। না খেয়ে তিলে তিলে মরলেন বেচারা। সুতরাং স্টুয়ার্টের আর দোষ কী? বেচারা কত দিন ছিলেন এদেশে, তাও ভাবতে হয় কিনা।

অর্থাৎ মিশনারিদের প্রমাণে স্টুয়ার্ট মূর্তি-চোর, আর ইভান কটনের যুক্তিতে স্টুয়ার্ট উন্মাদ। হয় চোর, না হয় উন্মাদ। কিংবা চোর এবং উন্মাদ উভয়ই।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ভারতবর্ষে এত লোভনীয় বস্তু থাকা সত্ত্বেও স্টুয়ার্ট সাহেব পাথরের মূর্তি কিংবা তালপাতার পুঁথিকেই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য স্থির করলেন কেন। আমরা জানি, গায়ে সোনার অলংকার না থাকলেও পাথরের মূর্তিতেও পয়সা হয়। কিন্তু পয়সার জন্যে স্টুয়ার্ট তা করেননি। তিনি তো দান করেছিলেন। তবে?

দ্বিতীয়ত, স্টুয়ার্টও লখনউ-এর সেই সাহেবের মতো উন্মাদ হতে পারেন এ কথা সত্য। তেমনই এও অসত্য নয় যে, স্টুয়ার্ট উন্মাদরূপে এ দেশে আসেননি। তা হলে তাঁর চাকরি হত না। চাকরি হলেও পদোন্নতি হত না। তাই স্টুয়ার্ট সাহেব যথার্থই উন্মাদ কি না, সে কথা বিচার করার আগে আমাদের শোনা দরকার ‘সুস্থ’ স্টুয়ার্টের জীবন কাহিনী।

ভদ্রলোক পেশায় ছিলেন সৈনিক। কোম্পানির ফৌজের একজন পদস্থ অফিসার। মেজর জেনারেল। সাগরে সৈন্যবাহিনীর অধিনায়কত্ব করেছেন তিনি দীর্ঘকাল। তারপর ওখান থেকে আসেন বহরমপুরে (ওড়িশা) এবং অবশেষে কলকাতায়। শোনা যায়, সাগরে থাকাকালে তিনি বিয়ে করেন একটি হিন্দু মেয়েকে এবং ওখানে একখানা হিন্দু মন্দির গড়েন নিজ অর্থে। বহরমপুরে স্টুয়ার্ট সম্পর্কে শোনা যায়, তিনি নিত্য নিয়মিত মন্দিরে মন্দিরে পূজা দেন, নিজে গঙ্গা পূজা করেন।

এরপর সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে উঠে এলেন তিনি কলকাতায়। উড স্ট্রিটে। কলকাতায় স্টুয়ার্টকে আমরা আগেই দেখেছি। রোজ পায়ে হেঁটে তিনি যান গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গাস্নান করেন। তারপর বাড়ি এসে ঢোকেন তাঁর মিউজিয়ামে।

মিউজিয়াম মানে, স্টুয়ার্টের গোটা বাড়িটাই তখন মিউজিয়াম। ভারতীয় ছবি, মূর্তি, পুঁথিপত্র, ঢাল-তরোয়াল, পোশাক-অলংকার কোনও কিছুর কমতি নেই সেখানে। মাঝে মাঝে কৌতূহলী দর্শকেরা আসে। স্টুয়ার্ট নিজে ঘুরে ঘুরে তাদের সব দেখান। কোনটা কত মূল্যবান এবং কেন, কোনটির কী বৈশিষ্ট্য, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা দিয়ে তা বুঝিয়ে দেন। দর্শকেরা তাঁর কাণ্ড দেখে মনে মনে হাসে। তবে স্টুয়ার্টের সংগ্রহের চেয়ে স্টুয়ার্টকেই তারা দেখতে আসে। স্টুয়ার্ট তা বোঝেন না, বোঝা দরকার মনে করেন না। নিজে যদি বাড়ি না থাকেন, চাকর-বাকরদের কড়া হুকুম দিয়ে যান, দর্শকেরা যাতে ফিরে না যায়।

কিন্তু এ একদিক মাত্র। শুধু মিউজিয়ম গড়লেই লোক উন্মাদ হয় না। সংস্কৃত বললেও না। তা হলে, জোন্স উইলসন সাহেবদেরও পাগল বলত সাধারণ ইংরেজরা। স্টুয়ার্টের ‘উন্মাদ’ অপবাদের ছিল অন্য কারণ। স্টুয়ার্ট ছিলেন হিন্দু, গঙ্গাস্নান করতেন কিংবা মন্দিরে পুজো দিতেন বলে নয়, (সময়গতিকে অনেক সাহেবই তা দিয়েছেন) হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছেন বলে নয়, (কারণ, তাতে সাহেবদের অরুচি ছিল বলে শোনা যায়নি) স্টুয়ার্টের অপরাধ ছিল, তিনি বাস্তবিকই হিন্দু হয়ে গিয়েছিলেন।

অর্থাৎ তিনি এমন উৎসাহভরে এ দেশের ভাষা, রীতিনীতি চর্চা করেছিলেন এবং হিন্দুধর্মের প্রতি তিনি এমন সহানুভূতিশীল ছিলেন যে, সবাই তাঁকে বলতেন—‘হিন্দু স্টুয়ার্ট।’

অর্থাৎ হিন্দু ধর্মকে, হিন্দুস্থানের মানুষকে জানতে গিয়ে, তাদের ভালবেসে ফেলেছিলেন স্টুয়ার্ট। তাদের সংস্কার, কুসংস্কার ভাল-মন্দ কিছুকেই বাদ দিয়ে ছিল না তাঁর এই ভালবাসা। তাই নেটিভদের সঙ্গে নিঃসঙ্কোচে মিশতেন তিনি, গলাগলি ঢলাঢলি করতেন, এ দেশের গরিবদের মধ্যে দাতব্য করে বেড়াতেন।

কাজটি তথাকথিত সুস্থদের পক্ষে ভাবাও সম্ভব হত না, তাই স্টুয়ার্ট ছিলেন তাদের কাছে অসুস্থ, উন্মাদ। এমনকী নেটিভরাও হয়তো বলত তাঁকে, পাগলা সাহেব। কারণ, পাগল ছাড়া কার পক্ষে সম্ভব, সাহেব হয়েও এমনভাবে জীবন যাপন?

তাই স্টুয়ার্ট যেদিন বিগত হলেন (৩১ মার্চ, ১৮২৮) সেদিন চৌরঙ্গিপাড়া হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও, গলা ফাটিয়ে কেঁদেছিল নিশ্চয়ই কলকাতার এক শ্রেণীর মানুষ। তারা নেটিভ। কলকাতার দরিদ্র মানুষের তিনিই ছিলেন একমাত্র চৌরঙ্গিবাসী বান্ধব। প্রতিদিন শত শত লোক খেতে পেত তাঁর অর্থে। পাগলা সাহেবের বিয়োগে তাই তারা কেঁদেছিল। সেই কান্নার রেশ আজও পাওয়া যায়, ইন্ডিয়া গেজেটের (৭ এপ্রিল, ১৮২৮) পাতায়। জনৈক অজ্ঞাতনামা লেখক তাতে লিখেছেন ‘এদেশের জনসাধারণের কাছে স্টুয়ার্ট ছিলেন জনপ্রিয় মানুষ।’ “জনপ্রিয়” বললে কম বলা হবে। এ দেশের মানুষ ভালবাসত তাঁকে। কারণ, দরিদ্রের প্রতি দানে তিনি ছিলেন মুক্তহস্ত। আমরা শুনেছি, বছরের পর বছর, প্রতিদিন একশো দরিদ্রকে খাইয়েছেন তিনি নিজের খরচে।’

সোনার দেশ লুটতে এসে, পাগল ছাড়া এমন কাজ কেউ করে?

যা হোক, স্বজাতির ব্যঙ্গ এবং নেটিভের ভালবাসার মধ্যে বৃদ্ধ স্টুয়ার্ট চলে গেলেন। ইচ্ছে ছিল তাঁর, স্বদেশের মাটিতে মরবার। কিন্তু এ দেশ ধরে রাখল তাঁকে। হয়তো বিস্মৃত হয়ে যেতেন একদিন। এ দেশ এবং ও দেশ ইচ্ছায় এবং অনিচ্ছায় একদিন হয়তো বাস্তবিকই ভুলে যেত তাঁর কথা। কিন্তু তা হল না। ঘটনাচক্রে এমন হল, শুধু এ দেশ নয়, ইংল্যান্ডও ভুলতে পারল না তাঁকে। কারণ, ইংরেজের রাজভাণ্ডারে না হলেও সংস্কৃতির ভাণ্ডারে স্টুয়ার্ট রেখে গেছেন একরাশ অমূল্য সম্পদ। এ খবরটাও জানিয়েছেন একজন নেটিভ। স্বর্গত রমাপ্রসাদ চন্দ। ১৯৩৪ সালের কথা। পণ্ডিতপ্রবর চন্দ মশাই লন্ডনে গেছেন অ্যানথ্রপজিক্যাল কংগ্রেসে যোগদানের জন্য। ওখানে থাকাকালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে কতকগুলো ভাস্কর্য-নিদর্শন ঘাঁটতে গিয়ে তিনি পুনরাবিষ্কার করলেন স্টুয়ার্টকে।

সংগ্রহটি পরিচিত ‘ব্রিজ কালেকশান’ নামে। কিন্তু ক্যাটালগ ঘাঁটতে বের হল: এর আদি মালিক টি. ডব্লু. ব্রিজ নন, মেজর স্টুয়ার্ট। ১৮৩০ সালে নিলামে বিক্রি হয়েছে এগুলো। বহরমপুরে থাকাকালে (১৮২৩) স্টুয়ার্ট নিজেও এই সংগ্রহটির কথা উল্লেখ করে গেছেন তাঁর উইলে। তিনি উইলে বলে গিয়েছিলেন, তাঁর পুরাতত্ত্বের সংগ্রহটি যেন ৩০,০০০ টাকা ইনসিওর করে লন্ডনে পাঠানো হয়। তা ছাড়া আরও লিখেছেন: ‘লন্ডনের বন্ড স্ট্রিটের মি. জন নামক পুস্তক-বিক্রেতার কাছে আমার একখানা বিরাট পুঁথির লাইব্রেরি এবং অন্যান্য প্রাচ্যদেশীয় পুরাবস্তুর সংগ্রহ রয়েছে। দরকার হলে সেগুলো যেন বিক্রি করা হয়।’

বই-পত্রগুলোর ভাগ্যে কী হয়েছিল, জানা যায়নি। মি. ব্রিজ কিনেছিলেন ভাস্কর্য-নিদর্শনগুলো। ১৮৭২ সালে ব্রিজের কন্যারা আবার নিলামে তোলেন এই সংগ্রহ। খরিদ্দার এলেন মাত্র এক জন। বিক্রি করলেন না তাঁরা। দান করেছিলেন পিতার নামে ব্রিটিশ মিউজিয়ামকে। স্টুয়ার্টের মিউজিয়াম, অন্তত তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সম্পদ। তার নাম ‘ব্রিজ কালেকশন’।

ব্রিজ সাহেব অর্থের বিনিময়ে কিনেছিলেন স্টুয়ার্টের সম্পত্তি, সুতরাং এতে আপত্তির কিছু নেই। অবশ্য স্টুয়ার্ট এগুলো হাত করেছিলেন অর্থ, চাতুর্য, শক্তি, সমস্ত কিছুর বিনিময়ে। কিন্তু কেন? তিনি আমাদের চিনবেন এবং স্বদেশের মানুষদের চেনাবেন বলে?

সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরখানায় স্টুয়ার্টের সমাধিটির সামনে দাঁড়িয়ে সেই কথাটিই বার বার মনে হচ্ছিল আমার। স্টুয়ার্ট বোধ হয় তাঁর সমগ্র জীবন দিয়ে ভারতবর্ষকে পরিচিত করাতে চেয়েছিলেন তাঁর স্বজাতির কাছে। তাঁর জীবনের মতোই পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে অত্যন্ত বেখাপ্পা সমাধি-মন্দিরটি আজও দাঁড়িয়ে আছে এখানে। হিন্দু মন্দিরের গড়ন। হিন্দু দেবদেবী, পৃথ্বীদেবী, মকরবাহিনী গঙ্গার অলংকরণ। এগুলোও নাকি তাঁর চৌরঙ্গি মিউজিয়ামের ধন। তাঁর আদেশে স্থান পেয়েছে এখানে। জীবনের সত্যটাকে মরার পরও যাতে মিথ্যে করে না দিতে পারে কেউ, তারই জন্য বোধ হয় তাঁর এত চেষ্টা। কিন্তু যে চোর চুরি করা ধনেও এমন সদম্ভ ঘোষণা রেখে যেতে পারে প্রকাশ্যে, সে কি চোর, না ডাকাত।

অষ্টাদশ শতকের ইংরেজ সন্তান হিসেবে স্টুয়ার্ট যে সাহসের পরিচয় দিয়ে গেছেন এই কলকাতায়, তাতে তাঁকে ‘ডাকাত’ বললেও বোধ হয় কম বলা হয়ে গেল।

ইজ্জতের লড়াই

“পিস্তল লড়াই ॥—মোকাম কলিকাতায় শ্ৰীযুত ডাক্তার জেমেসন সাহেব ও শ্ৰীযুত মেং বাকিংহাম সাহেব, এই উভয়ে পরস্পর বিবাদ করিয়া পিস্তল লড়াই করিতে পণ করিয়াছিলেন, তাহাতে শ্ৰীযুত বাকিংহামের পক্ষে শ্ৰীযুত মেজর সুইনি সাহেব হইলেন ও শ্ৰীযুত ডাক্তার জেমেসন সাহেবের পক্ষে শ্ৰীযুত মেং গরডন সাহেব হইলেন, ৬ই জুলাই রাত্রি চার ঘণ্টার সময়ে এই দুই জনকে মধ্যস্থ করিয়া বাদী প্রতিবাদী একত্র হইয়া মোং কলিকাতার গড়ের মাঠে ঘোড়দৌড়ের স্থানে এক বড় বৃক্ষের নীচে গিয়া, ধারামত দ্বাদশ পদান্তরে উভয়ে দণ্ডায়মান হইয়া পরস্পর এককালে পিস্তল মারিলেন, তাহাতেও কিছু ক্ষতি হইল না, পরে ডাক্তার জেমেসন সাহেব তৃতীয়বার গুলি মারিতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু উভয়পক্ষীয় সাহেবরা অসম্মত হইলেন তাহাতে, সুতরাং তাঁহারা ক্ষান্ত হইলেন।”—‘সমাচার দর্পণ’, ১৭ আগস্ট ১৮২২॥

লড়িয়ে দু-জনের একজন সাংবাদিক, অন্যজন সরকারি কর্মচারী। শ্ৰীযুত মেং বাকিংহাম ‘ক্যালকাটা জার্নাল-এর বিখ্যাত সম্পাদক। আর ডাক্তার জেমসন স্বনামধন্য না হলেও বাকিংহামের কালে কোম্পানির একজন অন্যতম স্নেহধন্য ব্যক্তি। একা, একই সময়ে তিন- তিনটে সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। একাধারে তিনি ছিলেন মেডিক্যাল বোর্ডের সেক্রেটারি, সরকারি স্টেশনারি বিভাগের ক্লার্ক এবং ফ্রি স্কুলের সার্জন। সুতরাং কলকাতার তোক না চিনলেও, কোম্পানির কাছাকাছি লোকেরা ডাঃ জেমসনকে জানতেন। বাকিংহামের সঙ্গে তাঁর এই লড়াইয়ের কারণ, সহসা তাঁর চতুর্থ-পদপ্রাপ্তি। কোম্পানির কর্তৃপক্ষের মধ্যে জেমসনের মামা-মেসোর অভাব ছিল না, সেকথা বলাই বাহুল্য। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে জেমসনকে বসিয়ে দিলেন তাঁরা আরও একটি নতুন পদে। ভারতীয়দের জন্যে মেডিক্যাল স্কুলের সুপারিনটেন্ডেন্ট নিযুক্ত হলেন তিনি।

সেকালে ঘটনাটা তেমন কিছু নয়। কিন্তু বাকিংহাম ছিলেন তাঁর কালের চেয়ে কিঞ্চিৎ অগ্রবর্তী। তাঁর কলমকে এড়িয়ে যাবার মতো ঘটনা এটি নয়। ক্যালকাটা জার্নালের পাতায় তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করলেন সরকারকে, সেই সঙ্গে ডাঃ জেমসনের লজ্জাহীনতাকেও। তারই ফলে এই লড়াই। জেমসন খেপে গেলেন। ইজ্জতের নামে তিনি পিস্তল হাতে আহ্বান জানালেন বাকিংহামকে। সত্যের খাতিরে সে ডাকে এগিয়ে গেলেন সাংবাদিক বাকিংহাম। তাঁর হাতেও পিস্তল।

এটাই তখনকার কলকাতার রেওয়াজ। উপলক্ষ যাই হোক, কারও মনে একটু আঁচড় লেগেছে কী, অমনি চরমপত্র চলে গেল প্রতিপক্ষের কাছে: তোমার সঙ্গে এক হাত লড়তে চাই। হিম্মত থাকে তো চলে এসো অমুক দিন, অমুক জায়গায়। প্রতিপক্ষও হয়তো মনে মনে তাই ভাবছিলেন। তাঁরও ধারণা তলোয়ার বা পিস্তল না হলে এ অপমানটা ঠিক মোছা যাবে না। সুতরাং তিনি সম্মত হলেন। ইচ্ছে না থাকলেও অসম্মতি প্রকাশের উপায় নেই। লোকে বলবে কাওয়ার্ড, ভীরু। সুতরাং দু’জনে লেখালেখি করে দিনক্ষণ স্থির করলেন। দু’জন মধ্যস্থও ঠিক হলেন। দু’ পক্ষে দু’জন। তাঁরাই এ লড়াইয়ের বিধিসম্মত সাক্ষী, বিচারক। কে কোথায় দাঁড়াবে বলে দেওয়া, গুলি বারুদ ঠিক আছে কি না পরীক্ষা-করা কিংবা কেউ ‘ফাউল’ করছে কি না দেখা—তাঁদের কাজ। দ্বন্দ্বযুদ্ধে তাঁরা রেফারি। তাঁদের বাঁশি বাজলে গুলি ছুটবে। তাঁদের ‘হ্যান্ডস অফ’ সংকেত উদ্যত হাত গুটিয়ে দেবে।

বিধি-ব্যবস্থাদি শেষ হয়ে গেলে তারপর লড়াই। যে যাঁর কাজকর্ম আগেই চুকিয়ে নিয়েছেন। আগের দিনই আত্মীয়-বন্ধুদের ‘গুডবাই’ জানানো হয়ে গিয়েছে। ভোর রাত্তিরে সাক্ষীসহ বেরিয়ে গেলেন লড়িয়েরা। গেলেন দু’জন। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পরেই ফিরলেন হয়তো একজন, অন্যজন আহত কিংবা নিহত। ইজ্জত বাঁচানোর সামর্থ্য ছিল না, তাই বিদায় নিয়েছেন। বিজয়ী বীর একাই বসেছেন তাই ব্রেকফাস্ট টেবিলে। কথাতেই আছে: “Pistol for two and breakfast for one!” ডুয়েল লড়তে গেলে ব্রেকফাস্ট টেবিলে একজনেরই ফেরার কথা। সুতরাং বিজয়ী বীর অক্লেশে খেয়ে চললেন। তাঁর মনে আজ অপরিসীম আনন্দ। আজ কলকাতার হোটেলে হোটেলে, ট্যাভার্নে, গির্জায়, আপিসে তিনিই আলোচ্য। তিনিই আজকের মতো এ-শহরের হিরো।

অষ্টাদশ শতকের কলকাতায় সব ইংলিশম্যানই হিরো, বীর। ছোট বড় নেই, মান-অপমানের প্রশ্নে সবাই সমান। সকলেই সমান স্পর্শকাতর। প্রত্যেকেই যেন এক-একটি ছোট দুর্গ, ফোর্ট। অষ্টপ্রহর বসে আছেন ইজ্জত নামক একটা অদ্ভুত বস্তু আগলে। তার চার দেওয়ালের কাছাকাছি কেউ এসেছে কি অমনি গুড়ুম। ‘I want personal satisfaction!’ ব্যস, শুরু হয়ে গেল লড়াই।

গোরাদের মেজাজই আলাদা। কলকাতাতে তাও অনেক কম। অষ্টাদশ শতকের বিলেতে, লড়াই নিত্যকার ব্যাপার। মধ্যযুগের বীরদের ছাড়া কোট পিঠে চাপিয়ে ব্যারন বাটলার সবাই তখন লড়াইয়ে মেতেছেন। কথায় কথায় তলোয়ার নয় তো পিস্তল বেরোয়।

বন্ধুর বৈঠকখানায় তর্ক হচ্ছে দর্শন কিংবা সাহিত্য নিয়ে। হঠাৎ দু’জনের একজন কী মনে করলেন। তারপর ‘কাল ভোরে অমুক জায়গায় এর মীমাংসা হবে’ বলে উঠে পড়লেন। অন্যজন রাত্তিরে বসে সংসারের কাজকর্ম গুছোলেন। কাল কী মীমাংসা হবে কে জানে।

পার্লামেন্টে তর্ক হচ্ছে। ডিউক অব হ্যামিলটন আর লর্ড মোহান বিতর্ক করছেন। সহসা একজনের কানে যেন একটু অপমানের সুর বাজল। দু’জন অমনি চললেন হল থেকে বেরিয়ে মাঠে। লড়াই হল, লর্ড মোহান মারা গেলেন। কয় মিনিটের মধ্যেই শেষ নিশ্বাস ফেললেন আহত হ্যামিলটনও।

রাজনীতি নিয়ে এমনি লড়াই হামেশাই হত। অনারেবল উইলিয়ম পিট (১৭৯৮) ও পার্লামেন্টের একজন সদস্য জর্জ টিয়ার্নে লড়েছেন। লড়েছেন ফকস (Charles James Fox) আর অ্যাডমস্‌ও। অবশ্য সৌভাগ্যবশত এঁদের কেউই নিহত হননি। পিট আর টিয়ার্নে সাহেব নাকি গুলিবদলের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়-বদলই করেছিলেন সেদিন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে বন্ধু হয়ে ফিরেছিলেন তাঁরা।

রাজনীতির পরেই এসব লড়াইয়ের উপলক্ষ হিসেবে সেকালে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মহিলারা। নাইটের মতোই মিস লিসনেকে পৌরুষ দেখাতে তলোয়ার হাতে নেমেছিলেন বিখ্যাত নাট্যকার শেরিডন। এই মেয়েটির আর একজন স্যুটর, বা পাণিপ্রার্থী ছিলেন ম্যাথুস নামে এক ভদ্রলোক। শেরিডন তাঁকে যোগ্যতা প্রমাণ করতে বললেন—হাতে একখানা তলোয়ার তুলে দিয়ে। কলম-ধরা আনাড়ি হাতে নিজেও তুলে নিলেন আর একখানা। লড়াই শুরু হল। দু’জনের তলোয়ারই গেল ভেঙে। কিন্তু লড়াই তবু থামল না। খালি হাতে দু’জন জড়িয়ে ধরলেন দু’জনকে। তারপর মাটিতে পড়ে ধস্তাধস্তি। সাক্ষীরা বিমূঢ়। কী করবেন? তাঁরা জানেন এঁদের এখন ছাড়াবার চেষ্টা বৃথা। কারণ তাঁরা ছাড়াও আর একজন সাক্ষী আছেন—এ লড়াইয়ের অন্তরীক্ষে। তিনি মিস লিসনে। তাঁর চোখের তারায় আজ যে-ফলাফল ঘোষিত হবে, এঁদের নজর সেদিকেই। শেষে, ক্লান্ত লড়িয়েরা নিজেরাই ঠিক করলেন অন্যদিন হবে।

অষ্টাদশ শতকের কলকাতার বিখ্যাত সুন্দরী ক্লেভারিং-কন্যাকে নিয়ে লড়েছিলেন ‘নবাব’ যারওয়েল আর ক্লেভারিং সাহেবও স্বয়ং।

চিরকাল যা হয়। লর্ড, জেন্টলম্যানদের লড়াই থেকে ক্রমে সার্ফরাও বাদ রইল না। জুয়ার টেবিল থেকে তারাও চলে আসে—বর্শা, তলোয়ার, যা পায় তাই হাতে নিয়ে মাঠে। ১৭৩৫ সালের একটি বিলিতি খবরের কথা বলছি। এক হোটেলে দু’জন ‘লেস উইভার’ বা তাঁতি খেতে বসেছেন। হোটেলওয়ালা ছোট মাছের এক ডিস চচ্চড়ি এনে দিল পাতে। একজন বলল, ‘চচ্চড়ি করেছে বটে, কিন্তু আসলে এ ভাজার মাছ।’

‘কে বললে তোকে?’ অন্যজন প্রশ্ন করল, ‘এ মাছ চচ্চড়িতেই ভাল।’

‘কে বললে?’

‘আমি।’

‘আমি বলছি ভাজাতেই এ মাছের স্বাদ।’

‘আমি বলছি—’

শেষে খাওয়া ফেলে উঠে পড়ল দু’জন। স্থির হল ‘ভাজা ভাল কি চচ্চড়ি ভাল’ তা লড়াই করে ঠিক করাই সংগত। বন্ধুরা সব শুনল। তারপর চাঁদা তুলে দুটো পিস্তল জোগাড় করল। সে-পিস্তলে দুই জোলা লড়ল, তবে শান্ত হল।

কলকাতার ডাক্তার জেমসনেরা এদেরই স্বজাতি। সুতরাং সাংবাদিক-প্রবর বাকিংহাম যে কলম ছেড়ে পিস্তল ধারণ করবেন, এতে আশ্চর্য কী? বাকিংহাম ছাড়াও কলকাতার গড়ের মাঠে অনেক সাংবাদিক লড়েছেন। ‘ইংলিশম্যান’-এর প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত সাংবাদিক স্টকক্যুইলার এখানে অস্ত্রবলের পরীক্ষা দিয়েছেন। ‘জন বুল’, ‘এশিয়াটিক মিরার’, ‘হরকরা’র সম্পাদকরাও দরকার হলেই কাগজি-যুক্তির সমর্থনে পিস্তল নিয়ে নেমেছেন। কখনও তাঁদের হাত কাঁপেনি।

শুধু সম্পাদকরা নন, অষ্টাদশ শতকের কলকাতায় সবাই লড়িয়ে। চারদিকে শুধু লড়াই, আর লড়াই। লখনউ-এর মুঘলেরা এখানে কুস্তি লড়েন, নিদেনপক্ষে মুরগির লড়াই—উৎকলবাসীরা লড়েন রাম-রাবণের লড়াই (অবশ্য স্টেজে)। একমাত্র বাদ বাঙালিরা। বাবুদের লড়াইতে ক্ষতি নেই, তাঁরা লড়াই দেখতে ভালবাসেন। তাও, হয় কবির লড়াই, নয় বুলবুলির লড়াই। গোরারা সব কোম্পানির লোক, বিলেত থেকে আসা—তাঁদের বুলবুলিতে চলে না, তাঁরা তাই পিস্তলে লড়েন।

কলকাতায় এ-লড়াইয়ের উদ্বোধন হয়েছিল ভারতের প্রথম গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের নিজের হাতে। ১৭৮০ সালের ১৭ আগস্ট আজকের আলিপুরের ডুয়েল অ্যাভেন্যুতে দাঁড়িয়ে তিনিই প্রথম ইজ্জতের নামে গুলি ছুড়েছিলেন এ দেশের মাটিতে। তাঁর সেদিনের লক্ষ্য ছিলেন স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস গভর্নর-জেনারেলের পরিষদের প্রথম সদস্য, বিরোধী দলের তেজস্বী নেতা। হেস্টিংসের সঙ্গে শত্রুতা তাঁর জীবনের সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রেই ছিল। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, প্রতিষ্ঠা, নারীপ্রেম সর্বত্রই তিনি ছিলেন হেস্টিংসের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। হেস্টিংস তাঁকে ভয় করতেন, ঘৃণা করতেন। এই ঘৃণার জবাবে একদিন স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিসের কাছ থেকে এল চরমপত্র: ‘You have left me no alternative but to demand personal satisfaction from you—the affront you have offered me.’

অতঃপর এ চ্যালেঞ্জের জবাব না দিলে লাটবাহাদুরের ইজ্জত থাকে না। পিস্তল হাতে তিনি এসে দাঁড়ালেন। ফ্রান্সিস আগে থেকেই তৈরি। বিধিসম্মতভাবে দু’জনের লড়াই হল। ফ্রান্সিস আহত হলেন, হেস্টিংস জিতলেন। গভর্নর-জেনারেলের মান রক্ষা হল।

দ্বিতীয় লড়িয়ে-গভর্নর হলেন সার জন ম্যাকফারসন। এবার আর সেয়ানে সেয়ানে নয়। লাট বাহাদুরের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড়ালেন কোম্পানির একজন সামান্য মেজর। মেজর ব্রাউন। লড়াইয়ের উপলক্ষটিও তেমনই আটপৌরে। মেস-টেবিলে বসে দুজনে তর্ক করছেন, নেটিভদের মধ্যে মেয়ে বেশি না পুরুষ বেশি। সেই তর্কের মীমাংসা করতে গিয়ে, ১৭৮৮ সালের এক ভোরে স্যার জন প্রমাণ করলেন ইংরেজদের মধ্যে অন্তত পুরুষ বেশি। তাঁর পৌরুষের হাতে প্রাণ দিলেন মেজর ব্রাউন। লাটের হাতে মেজরের প্রাণ নেওয়া হঠাৎ কেমন অগৌরবের ঠেকল ম্যাকফারসনের কাছে। ফলে খবরের কাগজে বের হল—‘মেজর ব্রাউন সহসা কলেরায় মারা গেছেন’, অবশ্য গোপনে কোম্পানির ধমক খেতে হল স্যার জনকে, ‘ছিঃ, ছেলেমানুষের মতো এমনি যার-তার সঙ্গে লড়তে আছে? তুমি না লাট।’

লাট-বেলাট না হলে ডুয়েলে কোম্পানির তেমন আপত্তি নেই। অবশ্য বিলেতে তখন এই শখে ভাঁটা দেখা দিয়েছে। কড়া একখানা আইনও পাস হয়ে গিয়েছে, এই মধ্যযুগীয় খেলাটিকে নিষিদ্ধ করে। কিন্তু কলকাতা তো আর বিলেত নয়। এখানে বিলিতি আইন পৌঁছতে সময় লাগে, তা ছাড়া আইনের ব্যাখ্যাও এখানে একটু অন্যরকম। ফলে তখনকার কলকাতার কাগজগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় ডুয়েলের সংবাদ। একদিন বের হল:

Died on Saturday morning Lieut. White of an wound, which he unfortunately received in a duel the preceding evening.’ (ক্যালকাটা গেজেট, ২৯ জুলাই ১৭৮৪) ১৭৮৭ সনের ৩১ মে আরও একটি ডুয়েলের সংবাদ আছে, ‘ক্যালকাটা গেজেটে’। তাতে লড়িয়ে দু’জনের সংক্ষিপ্ত নাম দেওয়া হয়েছে মি. জি ও মি. এ। মি. জি একজন অ্যাটর্নি-অ্যাট-ল, আর মি. এ ‘one of the Proprietors of the Library.’ দু’জনেই শিক্ষিত ব্যক্তি, সন্দেহ নেই। বিশেষত, মি. জি আইন-ব্যবসায়ী। ডুয়েল যে নিষিদ্ধ ব্যাপার, তিনি জানেন। তবুও দু’জনে লড়লেন। ঘটনাটা লড়াইয়ের উপযুক্ত বটে। ‘ক্যালকাটা গেজেটের’ মতে, দু’জনে জুয়া খেলতে গিয়ে, একজন অন্যজনের কাছে কিছু দেনায় আটকে যান। তাতেই বিবাদ এবং অবশেষে তার নিষ্পত্তির কারণে এই লড়াই।

যা হোক, লড়াই হল। লাইব্রেরিয়ানের গুলিতে আইনজীবী মারা গেলেন। বিজয়ী জুয়াড়ি ঘরে ফিরলেন। কিন্তু পুলিশ এসে গ্রেফতার করে বসল তাঁকে। বোধহয় নিহত ব্যক্তিটি আদালতের লোক বলেই, কর্তাদের মনে পড়ে গেল যে, এ বিষয়ে একটি আইন আছে কোম্পানির খাতায়ও। তাতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, স্বেচ্ছায় লড়তে গিয়েও যদি মারা যায় কারও হাতে, তবে নরহত্যার দায়ে পড়বে দ্বিতীয় জন। মি. ‘এ’ নরহত্যার দায়ে পড়লেন।

মাস তিনেক বাদে একদিন কাগজে বের হল: গত মঙ্গলবার মি. এর বিচার হয়ে গিয়েছে। বিকাল পাঁচটা অবধি তাঁর বিচার চলে। শেষে কিছুক্ষণের জন্যে জুরিরা আদালত-কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। ফিরে এসে তাঁরা একসঙ্গে সবাই ঘোষণা করলেন ‘Not Guilty’ আমাদের মতে আসামি নির্দোষ।

আর দোষী হলেও মি. এ’র সাজা হত পাঁচ টাকা কি দশ টাকা জরিমানা। তার বেশি নয়।

উপসংহারে একটি প্রশ্ন থেকে যায়: বাঙালিবাবুরা ইংরেজের নকল করতে কোনও ত্রুটি করেছেন, এখন অপবাদ শত্রুতেও কোনও দিন দেয়নি। কিন্তু তবুও কেন তারা এই বিলিতি খেলাটি সযত্নে পরিহার করে চললেন? প্রাণের মায়ায়?

বোধহয় নয়। আমার মনে হয়, খেলাটা কম পয়সার বলেই তাতে ওঁদের মন ধরেনি। সাহেবদের ডুয়েল লড়াইয়ের জরিমানা পাঁচ-দশ টাকা, বাঙালিবাবু পাঁচ-দশ লাখের কম কিছুতে নামেন না। আর তাঁর লড়াইয়ের উপলক্ষও যথেষ্ট কুলীন। ছেলের বা মেয়ের বিয়ে, বাবা মায়ের শ্রাদ্ধ, বিড়ালের পরিণয়, অথবা দুর্গোৎসব। গোটা শহরকে সাক্ষী রেখে পাঁচ লাখের অপমান তিনি সাত লাখে ঘোচান। সাত লাখের ফিরতি দেন আর একজন দশ লাখ পুড়িয়ে। তাতেও যদি কেউ ঘায়েল না হয়, তবে আবার হবে আসছে পুজোয়, কিংবা এই যে বুড়ো মাতামহ আছেন, তিনি বিগত হলে তাঁর শ্রাদ্ধ। চ্যালেঞ্জ রইল।

এমনই চ্যালেঞ্জ দিতে এবং নিতে, কত বঙ্গবীর যে ধরাশায়ী হয়েছেন সেদিনের কলকাতায়, তার ইয়ত্তা নেই।

সুতরাং আমরা মিছিমিছিই সাহেবদের সুখ্যাতি করি। বিশেষত মনে রাখতে হবে, ইজ্জতের লড়াইয়ে লড়িয়ে বাঙালি একা মরেনি, অধস্তন কয় পুরুষদেরও ভস্মশয্যায় পাঠিয়েছে।

কলকাতায় প্রথম রুশ নাগরিক

মহানগরী কলকাতা। এর প্রশস্ত রাজপথে, অন্ধগলিতে এই কয়শো বছরের জীবনে কত মানুষের স্মৃতি ধুলো হয়ে মিশে আছে, আজকের আকাশ-স্পর্শী সৌধের নীচে চাপা পড়ে আছে কত সংস্কৃতির অবশেষ, কে জানে? কলকাতার জটিল জীবনে ইংরেজ, ফরাসি পর্তুগিজ, গ্রিক, আর্মেনিয়ান—এ সব জাতির স্মৃতিচিহ্ন ছাড়াও আজও খুঁজে পাওয়া যায়, তিব্বত-নেপালের অদ্ভুতদর্শন পার্বত্য মানুষ, সিংহল-ব্রহ্মচীনের বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী আর ব্যবসায়ীদের। শুধু গলিতপ্রায় গির্জা, কিংবা বিস্মৃত কবরখানায়ই নয়, খুঁজে পাওয়া যায় কলকাতার জীবনে, এমনকী রক্তে, শহরের বহুবর্ণ সংস্কৃতিতে। কিন্তু মহানগরীর বুকে বিন্দুমাত্র নিশানা খুঁজে পাওয়া যাবে না কলকাতার প্রথম রুশ নাগরিকের। বাংলার জাতীয় নাট্যশালার ইতিহাস যাঁর কাছে অজ্ঞাত, তাঁর পক্ষে অনুমান করাও কষ্টকর যে, এককালে এই কলকাতারই ২৫ ডোমতলা রোডে ছিল এক নাট্যশালা। চারশো দর্শকের উপযোগী বিরাট অট্টালিকা। আমাদের জাতীয় নাট্যশালার ইতিহাসে এটিই প্রথম বাংলা রঙ্গমঞ্চ। রুশ নাগরিক গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ ১৭৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার।

লেবেদেফ ভারতে প্রথম রুশ অভিযাত্রী নন, কিন্তু কলকাতায় তিনিই প্রথম রুশ নাগরিক। এ দেশে তাঁর প্রবাস-জীবন যেমন বিচিত্র, আমাদের সংস্কৃতির ইতিহাসে তেমনই গুরুত্বপূর্ণ।

লেবেদেফের জন্ম রাশিয়ায় ইয়োরোশ্লাভ শহরে, ১৭৪৯ সালে। বাল্যকাল থেকেই সংগীতের প্রতি তীব্র আকর্ষণ ছিল তাঁর। তা ছাড়া ছিল দেশভ্রমণের নেশা। ভিয়েনা, প্যারিস, নেপলস এবং লন্ডন হয়ে তিনি ১৭৮৫ সালের ১৫ আগস্ট ‘রডনি’ নামক এক ব্রিটিশ জাহাজে পাড়ি জমান ভারতের পথে। লেবেদেফের বয়স তখন মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর। মাদ্রাজে অবতরণ করার পর তিনি কয়েকটি সংগীতানুষ্ঠান করেন এবং প্রচুর খ্যাতির সঙ্গে লাভ করেন একটি বাঙালি ছাত্রকে। গোলকনাথ দাস নামে এই বাঙালি ভদ্রলোকই ছিলেন লেবেদেফের পরবর্তী কালীন সাফল্যের মূলে। এঁর কাছ থেকেই লেবেদেফ বাংলা, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষা শিখেছিলেন এবং এঁরই সহযোগিতায় তিনি সমর্থ হয়েছিলেন কলকাতার বাংলা রঙ্গমঞ্চ প্রতিষ্ঠায়।

যা হোক, দু’ বছর মাদ্রাজে কাটিয়ে লেবেদেফ গোলকের সঙ্গে কলকাতায় আসেন এবং এখানে এসেই শুরু করেন গভীরভাবে পূর্ব-ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের গবেষণা। কিছুকালের মধ্যেই তিনি চমৎকার বাংলা শিখে ফেললেন এবং বাংলা ভাষায় তর্জমা করলেন দু’টো ইংরেজি বইয়ের। প্রথমটি ‘ডিসগাইস’, দ্বিতীয়টি ‘লাভ ইজ দ্য বেস্ট ডক্টর’। এগুলোকে তিনি ভারতীয়দের উপযোগী করে নাট্যরূপ দেন। কিন্তু মুশকিল হয়ে দাঁড়াল মঞ্চস্থ করা নিয়ে।

তৎকালীন বাংলার গভর্নর জেনারেল স্যার জন স্টোর তাঁকে অনুমতি দিলেন। কিন্তু ইংরেজ কোম্পানির কর্তৃপক্ষের অনুমতি মিলল না। গোলকনাথ তখন প্রস্তাব করলেন নিজেরাই নাট্যশালা স্থাপন করবেন। এবং তাঁরই চেষ্টায় সংগৃহীত হয় ২৫ ডোমতলা রোডের বাড়িটি। তা ছাড়া, গোলকনাথ বাঙালি অভিনেতা ও অভিনেত্রীও সংগ্রহ করেছিলেন এই উদ্দেশ্যে।

১৭৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর এভাবেই অভিনীত হল প্রথম বাংলা নাটক, বাঙালি অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে সুদূর রুশ পরিব্রাজকের পরিচালনায়। শুধু কলকাতার ইউরোপীয় দর্শকরাই নয়, শোনা যায়, শহর ও শহরতলির অনেক দর্শকই হাজির ছিলেন প্রথম রজনীতে। লেবেদেফের প্রথম প্রচেষ্টা অতএব সফল।

অবশ্য তা হওয়ার কারণও ছিল। তিনি নাটকের ঘটনাস্থল স্পেনের স্থানে কলকাতা এবং ইউরোপীয় পাত্রপাত্রীর স্থানে ভারতীয় চরিত্র বসিয়ে অনুবাদ করেছিলেন বইখানার। তা ছাড়া, ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর থেকে কিছু কিছু অংশ ইংরেজি এবং ইউরোপীয় বাদ্য সহকারে গীত হয়েছিল অভিনয়ের মধ্যে। লেবেদেফ নাকি এক গানের দল-ই তৈরি করেছিলেন এই উদ্দেশ্যে। তাঁর দলে ছিলেন তিনজন স্ত্রীলোক, দশজন পুরুষ এবং গীতবাদ্যের জন্য অন্য দশজনের আর একটি দল—অর্কেস্ট্রা।

কিন্তু দু’ রাত্রির বেশি অভিনয় মঞ্চস্থ করতে পারেননি লেবেদেফ। তাঁর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠে ইংরেজ নাট্যশালার কর্তৃপক্ষ নানা ষড়যন্ত্র শুরু করলেন তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁরা লেবেদেফের দলে ভাঙন ধরানোর জন্যে নিজেদের মানুষ ঢুকিয়ে দিলেন তাঁর দলের ভেতরে। এমনকী শোনা যায় শেষ পর্যন্ত নাকি আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ২৫ ডোমতলা রোডের বাড়িতে। লেবেদেফ এ সম্পর্কে ইংল্যান্ডে তৎকালীন রাশিয়ান রাজদূত কাউন্ট ভোরনসভের কাছে এক দীর্ঘ চিঠিতে এই প্রসঙ্গে লেখেন:

‘এখানকার পরশ্রীকাতর নাট্যশালাধ্যক্ষগণ যদি আমাকে না ঠকাতেন, তা হলে আমি নিশ্চয়ই অর্থশালী হতে পারতাম। এখন আমি এদের চক্রান্তের ফলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছি। এ দেশের আইন ও শৃঙ্খলার রক্ষকদের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করে তা পাইনি।…আমি বিদেশি বলে আমার ভাষাচর্চার বৈজ্ঞানিক প্রণালী এখানকার অনুবাদকদের কাছে অগ্রাহ্য, বণিক সম্প্রদায়ের কাছে অপ্রীতিকর এবং এখানকার শাসকবর্গ তাঁদের স্বার্থরক্ষার জন্য বিদেশিদের কাজে নানা বাধা সৃষ্টি করতে তৎপর ইত্যাদি।’ এই চক্রান্তে পড়ে নানা মিথ্যা দেনার দায়ে শেষ পর্যন্ত লেবেদেফকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কোনওরকমে অব্যাহিত পেয়ে তিনি ১৭৯৭ সালে স্বদেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

লেবেদেফ দশ বছর কলকাতায় ছিলেন। এই দশ বছরে কলকাতার জীবনে তিনি যে বিরাট ব্যাপার সাধন করেছেন, তা যে কোনও বিদেশির পক্ষে গৌরবের বিষয়। ইংরেজি বইয়ের বাংলা অনুবাদ তথা বাংলা নাটকের প্রথম প্রযোজক তো বটেই, লেবেদেফ ছিলেন বাংলা থেকে ইউরোপীয় ভাষারও প্রথম অনুবাদক। ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’ বইটির পুরো তর্জমা করেছিলেন তিনি রুশ ভাষায়। তা ছাড়া ভারতীয় ভাষা, সমাজ-বিজ্ঞান, জ্যোতিষ, দর্শন ইত্যাদি নিয়ে তাঁর গবেষণাও তাঁকে ইউরোপীয়দের মধ্যে একজন প্রথম ভারত-বিশেষজ্ঞের সম্মান দান করেছে।

স্বদেশের পথে লেবেদেফ লন্ডনে অবতরণ করেন এবং এখান থেকেই ১৮০১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত ভাষাতত্ত্বের বই ‘এ গ্রামার অব দ্য পিওর অ্যান্ড মিক্সড ইস্ট ইন্ডিয়ান ডায়ালেকটস’ (A Grammer of the Pure and mixed East Indian Dialects.) কলকাতায় প্রচলিত হিন্দুস্থানি ভাষার এটিই প্রথম ব্যাকরণ বা ভাষাতত্ত্বের বই। তারপর রাশিয়ায় ফিরে গিয়ে তিনি নিজে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই ছাপাখানা থেকেই সারা ইউরোপের প্রথম বাংলা হরফ কাটা হয়। এই হরফে ১৮০৫ সালে লেবেদেফের দ্বিতীয় বিখ্যাত বই ‘অ্যান ইমপার্শিয়াল কনটেমপেশান অব দি ইস্ট ইন্ডিয়ান সিস্টেম অব দি ব্রাহ্‌মিনস’ বা সংক্ষেপে পূর্ব ভারতের সমাজব্যবস্থার বস্তুনিষ্ঠ পরীক্ষা-নিরীক্ষা নামে সমাজতত্ত্বের বই। হিন্দুধর্মকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা ছাড়াও লেবেদেফ এই বইয়ে ভারতীয় বর্ষপঞ্জী, ভারতীয় উৎসব ও আচারনীতি, জাতিভেদ প্রথা এবং ভারতে পশ্চিম ইউরোপের ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বইখানি তিনি লিখেছিলেন কলকাতায় অবস্থানকালেই। এবং তাঁর নাকি একান্ত ইচ্ছা ছিল কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায় সেটি প্রকাশ করেন। কিন্তু অর্থাভাব এবং অন্যান্য প্রতিকূলতায় তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি তাঁর পক্ষে।

যাই হোক, মাত্র কিছুকাল আগে রুশ পণ্ডিতেরা সন্ধান পেয়েছেন লেবেদেফের আর একখানা অনুবাদের পাণ্ডুলিপি। যে বর্ণমালায় পাণ্ডুলিপিটি রচিত, তার সঙ্গে আজকের রুশ বর্ণমালার অনেক পার্থক্য। যে ভাষায় প্রত্যেকটি শব্দের অর্থ এবং উচ্চারণ লেখা ছিল পাণ্ডুলিপিতে, তাও প্রচলিত ছিল অষ্টাদশ শতকে। সুতরাং পণ্ডিতদের কাছে এটা মোটামুটি একটা সমস্যা হয়েই দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সহসা একটা বিশেষ নোট থেকে তাঁরা জেনে গেলেন এই বইটি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সব তথ্য। পাণ্ডুলিপিতেই শুদ্ধ রুশ ভাষায় লেখা আছে: ‘এই বইটির নাম ‘বিদ্যা-সুন্দর’ (‘বিদ্যা’ ও ‘সুন্দর’ শব্দ দুটোর অর্থও দেওয়া হয়েছে এই সঙ্গে) বর্ধমানরাজ বীরসিংহের অনুরোধে ভারতচন্দ্র রায় “বিদ্যা নামে” এক রাজকন্যার সুন্দর নামে এক যুবকের সহিত বিবাহ উপলক্ষে কবিতাটি রচনা করেন। রুশ নাগরিক গেরাসিম লেবেদেফ কর্তৃক কলিকাতায় লিখিত ও অনূদিত। (সোভিয়েত দেশ, ৬ খণ্ড, ২০ সংখ্যা)

বোধহয়, এই পাণ্ডুলিপির অনুবাদ শেষ করার আগেই জীবনাবসান ঘটে এই রুশ পণ্ডিত এবং ভারতপ্রেমিকের। কারণ, শেষের দিকে অনুবাদ আর ছিল না মূল পাণ্ডুলিপির পাশে পাশে। ১৫০ বছর সেরেস্তাখানায় বস্তাবন্দি হয়ে পড়ে থাকার পর এই সাম্প্রতিক আবিষ্কার লেবেদেফের ভারত-প্রেমের অন্যতম সাক্ষ্য হয়ে রইল।

লেবেদেফের বাংলা রঙ্গমঞ্চ পরবর্তী কালে আমাদের জাতীয় রঙ্গমঞ্চের প্রেরণা কি না কিংবা তাঁর রঙ্গমঞ্চকে প্রথম বাংলা রঙ্গমঞ্চের মর্যাদা দেওয়া যায় কি না—এ নিয়ে যত বিতর্কই থাক না কেন, লেবেদেফ যে একজন অগ্রগণ্য ভারত-সন্ধানী ব্যক্তি, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তা ছাড়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ওই সুদূর রুশ দেশে তিনিই ভারতবিদ্যার প্রবর্তক। তাঁর কিছুকাল পরে, অষ্টাদশ শতকে এবং উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে, রুশ পণ্ডিতদের মধ্যে যে ভারত সম্পর্কে আগ্রহ দেখা যায়, তার প্রেরণাও লেবেদেফ। সুতরাং প্রথম রুশ পরিব্রাজক নিকিতিনের মতো স্তেপানোভিচ লেবেদেফও প্রথম ভারত-পথিক, ভৌগোলিক ভারতের নয়—ভারত আত্মার লক্ষ্যে।

সংক্ষেপে আমার স্ত্রীর কাহিনী

আমাকে আপনারা চিনবেন না। কারণ, নাম শুনে চিনবার মতো কোনও কেউকেটা আমি নই। সুতরাং আমার মা বাবার নাম কিংবা কবে কোথায় আমার জন্ম, সে ফিরিস্তি দিয়েও লাভ নেই। এমনকী যদি বলি, আমি সেই ১৭৭৫ সালেরও আগে থেকে অনারেবল কোম্পানির একজন কর্মচারী তা হলেও আপনারা আমায় চিনবেন কিনা সন্দেহ। যদিও শুনলে অবাক হয়ে যাবেন ১৭৭৬ সালের জুন মাস থেকেই আমি আপনাদের কলকাতার একজন বাসিন্দা।

মনে মনে ভাবছেন হয়তো, কলকাতায় তো কত লোকই ছিল, কত লোকই থাকে, তার মধ্যে তোমাকে চিনব কী করে সাহেব। কিন্তু বন্ধু, মিসেস গ্রান্ড একজনই ছিল তোমাদের শহরে। ওরা চিরকাল একটি দুটিই থাকে, তার বেশি নয়।

যদি বলি, আমি সেই মিসেস গ্রান্ড-এরই স্বামী মিঃ গ্রান্ড, মিঃ ফ্রান্সিস গ্রান্ড, তা হলে নিশ্চয় তোমরা চিনতে পারছ আমাকে। শুধু তোমরা কেন, লন্ডন-প্যারিসেও এমন লোক নেই, এর পরও যাঁরা চিনতে না পারবেন এই হতভাগ্যকে।

নিজেকে হতভাগ্য বলছি কেন? সাধ করে বলছি না বন্ধু। অবশ্য এটা ঠিক, আজ আর আমি সেদিনের মতো ভাগ্যহীন নই। কিন্তু তা হলেও কেন জানি না, থেকে থেকে মোচড় দিয়ে ওঠে বুকটা। তখন কি আমি জানতাম, ক্যাথারিন এমন করে চিরকাল পুড়িয়ে মারবে আমায়? ওর রূপের আগুনে একদিন এমনিভাবে ছাই হয়ে যাবে আমার ইজ্জত। এমনকী চিরদিনের জন্যে কলুষিত হয়ে যাবে আমার নামটি পর্যন্ত।

তবে হ্যাঁ, রূপ ছিল মেয়েটার। নিজের মুখে নিজের স্ত্রীর রূপ বর্ণনা করতে চাই না আমি। যারা ওকে দেখেছে, আমারই মতো যারা একদিন ওর রূপসাগরে হাবুডুবু খেয়েছে, তাদের কথাই শোনো।

তোমাদের ‘জুনিয়াস’-এর মতে ও ছিল কলকাতার সব চেয়ে সুন্দরী মেয়ে। ‘যেমনি দেহের গড়ন, তেমনি গায়ের রং। তার ওপর একমাথা সোনালি চুল ছিল মিসেস গ্রান্ড-এর। দেখে মনে হত, যেন মর্তের মানবী নয়, স্বর্গের অপ্সরা।’ রূপবিচারে প্যারিসের খুব খ্যাতি। ক্যাথারিনকে ওরা যখন দেখেছে, সে তখন অনেককাল-ফুটে-থাকা ফুল। তার বয়স ছত্রিশে পৌঁছে গেছে। তা হলেও ওদের স্বীকার করতে হল যে, এতকাল যা প্রবাদের মতো শুনে আসছে তারা, আসলে তা প্রবাদ নয়, সত্য। ‘সত্যই দেখবার মতো চেহারা মিসেস গ্রান্ড-এর। ফুটফুটে নীল চোখে টানা টানা কালো ভুরু, ঘন পল্লব’ এবং ইত্যাদি ইত্যাদি।

এত কবিতা করতে ভাল লাগে না আমার। কবিতা আমি করিওনি। প্রথম যেদিন দেখলাম ওকে, সে অনেক দিন আগের কথা। আমি তখন সদ্য এসেছি কলকাতায়। হেস্টিংস-এর ওখানে থাকি। কাজকর্ম বিশেষ কিছু নেই। মনের আনন্দে লাটবাহাদুরের সঙ্গে ঘুরে বেড়াই। প্রতি সপ্তাহেই বেড়ানোর প্রোগ্রাম হত আমাদের। কখনও ময়ূরপঙ্খী নৌকোয় চড়ে আমরা যেতাম সুখসাগরে, ওঁর বাগানবাড়িতে। কখনও ঘেরেটিতে। ঘেরেটিতে ছিল চন্দননগরের ফরাসি গভর্নরের বাড়ি। মহামান্য হেস্টিংস-এর সঙ্গে খুবই বন্ধুত্ব ছিল ভদ্রলোকের। সেই সূত্রে কিছু কিছু আমার সঙ্গেও। একদিন ওঁর ওখানেই ভোজের টেবিলে ক্যাথারিনের সঙ্গে দেখা। সেটা ১৭৭৭ সালের কথা। আগেই বলেছি, কবিতা করতে ভালবাসি না আমি। মেয়েটাকে দেখে মনে ধরে গেল আমার। টেবিলেই জানা গেল চন্দননগরের এক ফরাসি ভদ্রলোকের মেয়ে। নাম—Noel Catherine Werlee. হাইকোর্টের জজেরা পর্যন্ত হিমসিম খেয়ে গিয়েছিলেন এই নামখানা উচ্চারণ করতে। মিঃ হুইলার বলেছিলেন জাস্টিস হাইডকে—Put down a ‘we’, my Lord, put it down a ‘we’!

সে যাক। ক’পুরুষ আগে আমরাও ফরাসি দেশের লোক ছিলাম বটে, তবুও এসব ঝামেলায় না গিয়ে সোজা ক্যাথারিনই বানিয়ে নিলাম ওকে। বললাম—ক্যাথারিন, আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।

ক্যাথারিন অসম্মত হল না। অর্থাৎ, মুখ ফুটে সেদিন কিছু বলল না। পরে শুনলাম—ও চায়, বিয়ের আগে আমি একটা কিছু ভাল কাজকর্ম জুটিয়ে নিই।

মাত্র এই শর্ত? তক্ষুনি ছুটে গেলাম বারওয়েল সাহেবের কাছে। বারওয়েল কাউন্সিলের একজন সদস্য। তখনকার কলকাতায় অন্যতম ক্ষমতাবান লোক। তিনিও খুবই স্নেহ করতেন আমাকে। মনের কথা অকপটে খুলে বললাম তাঁর কাছে। সব শুনে তিনি বললেন—ভেবো না বন্ধু, আমি তোমার ব্যবস্থা করছি।

সৈন্যবাহিনীর পে-মাস্টার-এর পদটা তখন খালি হওয়ার কথা। আমার হয়ে বারওয়েল হেস্টিংসকে অনুরোধ করলেন তার জন্যে। কিন্তু হেস্টিংস তার আগেই একজনকে কথা দিয়ে ফেলেছেন। সুতরাং এটা তাকেই দিতে হল। তবে আমাকেও নিরাশ করলেন না তিনি। একজনকে বরখাস্ত করে সল্ট কমিটির সেক্রেটারির পদটিতে বসিয়ে দেওয়া হল আমাকে। সেই সঙ্গে ওঁদের আনুকূল্যে আমি নিযুক্ত হলাম বোর্ড অব ট্রেডের হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং সেক্রেটারির আপিসের এগজামিনার। একসঙ্গে তিন-তিনটে চাকরি। আমার রোজগার তখন মাসে তেরশো টাকার ওপর।

সুতরাং এবার আর ক্যাথারিনকে পেতে বাধা কী? দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল। ১৭৭৭ সালের ১০ জুলাই ক্যাথারিনের হাত ধরে আমি বেরিয়ে এলাম চন্দননগরের গির্জা থেকে। আজ থেকে ক্যাথারিন মিসেস গ্রান্ড। ওর বয়স তখন পনেরো বছরের চেয়েও তিন মাস কম। আর আমার বয়স? বলব না। তোমরা, এ কালের লোকেরা হাসবে। তখনই কতজন হাসাহাসি করেছে আমাকে নিয়ে। ক্যাথারিন নাকি আমার বাচ্চা-বউ, চাইল্ড-ওয়াইফ। মোটেই নাকি মানায়নি আমার সঙ্গে। ফুঃ। ক্যাথারিনের সঙ্গে আমি মানিয়েছিলাম কিনা সে আমিই জানি। আর জানে সুপ্রিম কোর্টে যারা সাক্ষী দিয়েছিল তারা। সে কথা এখন থাক।

দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেল। জুলাইয়ের ‘আগুনে কলকাতা’ গড়াতে গড়াতে এসে পৌঁছল ডিসেম্বরে। সে দিন ৮ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার। বরাবরই সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে একটু বেড়াতে বের হই আমি। ক্যাথারিন বাড়িতেই থাকে। ওর আয়ার সঙ্গে খেলে, নয়তো বই-পত্তর পড়ে।

সেদিনও ঠিক ন’টা বাজতেই বেরিয়ে পড়লাম। বের হবার সময়ও আমি জানি, দুনিয়ার সব চেয়ে সুখী লোক বোধ হয় আমিই। কিন্তু হায়, তখন কি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম যে, ঘণ্টাতিনেক পরে এমনি রিক্ত হয়ে ফিরতে হবে আমাকে?

না বন্ধু, সেদিন জুয়া খেলে হারিনি আমি। সত্য বটে, বারওয়েল-এর ওখানে নেমন্তন্ন ছিল আমার। তা, সবাই জানে, প্রতি পনেরো দিন অন্তর বারওয়েল বন্ধুদের নিয়ে ট্যাভার্ন-এ একটু আমোদ করে। কিন্তু সে নিছক খানাপিনা। তবুও সেই কালভোজে সর্বনাশ হয়ে গেল আমার।

ঘটনাটা খুলেই বলি। আমি তখন দিব্যি ভোজে মশগুল, এমন সময় হঠাৎ হাঁপাতে হাঁপাতে আমার এক ভৃত্য এসে হাজির। কী ব্যাপার?

লোকটা আমার কানে কানে যা বলল, তা শুনে শিউরে উঠলাম আমি। মিঃ ফ্রান্সিস নাকি ধরা পড়েছেন আমাদের বাড়িতে। জমাদার আটকে রেখেছে তাঁকে।

পায়ের নীচ থেকে যেন মাটি সরে গেল আমার। সামনে থেকে উধাও হয়ে গেল খাবার টেবিল, ভোজসভা সব। খানসামাকে বিদায় করে দিলাম। বললাম, জমাদারকে গিয়ে বলো আমি আসছি।

পরক্ষণেই কাউকে কিছু না বলে উঠে পড়লাম। একজন বন্ধু বোধ হয় লক্ষ করছিলেন আমার ভাবান্তর। পিছনে পিছনে বেরিয়ে এলেন তিনিও।

বাইরে এসে সব কথা খুলে বললাম তাঁকে। কিন্তু ফ্রান্সিসের কথা শোনামাত্র তিনি পিছু হটলেন। ফিলিপ ফ্রান্সিস কলকাতার দ্বিতীয় ক্ষমতাবান পুরুষ। গভর্নর হেস্টিংস-এর পরেই কাউন্সিলে তাঁর আসন। সুতরাং তাঁর সঙ্গে মোকাবিলা করতে যে সবাই রাজি হবে না, সে তো জানা কথা।

বাধ্য হয়েই পথে মেজর পামার-এর বাড়িতে থামতে হল একবার। পামার গভর্নর বাহাদুরের মিলিটারি সেক্রেটারি এবং আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। তাঁর কাছ থেকে একটা তলোয়ার চেয়ে নিলাম। আর নিলাম তাঁকে। মনে মনে আমার সংকল্প, বাড়ি গিয়ে আজ ফ্রান্সিসের সঙ্গে যা হোক বোঝাপড়া করব একটা। আগামী কাল থেকে এ শহরে হয় ফিলিপ ফ্রান্সিস থাকবে, না হয় থাকবে মিঃ গ্রান্ড। দু’জনের একজনকে এ দুনিয়ার মায়া ছাড়তেই হবে আজ।

কিন্তু এ কী? পামার আর আমি বাড়ি ঢুকে দেখি ফ্রান্সিস নেই। বৈঠকখানায় জমাদার আটকে রেখেছে যাঁদের, তাঁদের সবাইকে আমি চিনি। কই, ফিলিপ ফ্রান্সিস তো নেই এঁদের মধ্যে?

জমাদার বললে: হুজুর, সে সাহেব পালিয়েছে। আপনার জন্যে আমি তাঁকে আটকে রেখেছিলাম ঠিকই। কিন্তু সাহেব হঠাৎ হুইসেল বাজিয়ে উঠলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে এই তিন সাহেব এসে হাজির। তারপর সে কী ধস্তাধস্তি। ধস্তাধস্তির এক ফাঁকেই পালিয়ে গেলেন ফ্রান্সিস সাহেব। বাধ্য হয়ে তাই এঁদেরই আটকে রেখেছি হুজুরের জন্যে।

জমাদার যাঁদের আটকে রেখেছে, তাঁরাও সবাই নামজাদা লোক। জর্জ সি, শোর আর আর্কডেকিন। প্রথম দু’জন পরবর্তী কালে ‘স্যার’ খেতাবও পেয়েছিলেন।

যা হোক, একে একে তিনজনকেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঘটনা কি সত্য? তিনজনই আবোল-তাবোল কৈফিয়ত দিলেন। তাঁরা নাকি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় হঠাৎ শুনতে পেলেন যে, ফিলিপ ফ্রান্সিস খুন হয়ে যাচ্ছে আমার বাড়িতে। তাই অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে তাঁরা ঢুকে পড়েছেন। ইত্যাদি।

আমি ওঁদের ছেড়ে দিলাম। যদিও বুঝতে আমার বাকি রইল না যে, ওঁরাও সে দুবৃত্তের সহচর। রাগে অপমানে শরীর কাঁপতে লাগল আমার। ইচ্ছেও হল না একবার উঁকি দিই ভিতর-বাড়িতে। পামারের সঙ্গেই আমি বেরিয়ে এলাম বাড়ি থেকে। অবশিষ্ট রাতটুকু কাটিয়ে দিলাম একটা চেয়ারে বসেই। বসে বসে আমার শুধু এক চিন্তা, কখন ভোর হবে। কতক্ষণে শত্রুর সঙ্গে মোলাকাত হবে।

অবশেষে সেই সর্বনাশা রাত্রি ভোর হল। সঙ্গে সঙ্গে ফিলিপ ফ্রান্সিসের কাছে চিঠি পাঠালাম আমি। লিখলাম, ‘গত রাত্রে আমাকে যেভাবে তুমি অসম্মান করেছ, তাতে বাধ্য হয়েই আমাকে আজ ইজ্জতের নামে তোমাকে আহ্বান জানাতে হচ্ছে। আমার মনে হয়, তোমার এই নীতিবিগর্হিত আচরণের পরও তোমার দেহে এখনও এক-আধ ফোঁটা হলেও আত্মসম্মান অবশিষ্ট আছে। যদি সত্যিই তা থেকে থাকে, তবে নিশ্চয় আজ সকালে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অসম্মত হবে না তুমি। কখন, কোথায় বা কী অস্ত্রসহ আমাদের দেখা হবে, তা স্থির করার অধিকার তোমার ওপরই রইল।’

শুনলে অবাক হয়ে যাবে, সে কাপুরুষ এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল না। উত্তরে সে আমাকে জানালে, সে বুঝতে পারছে না আমি হঠাৎ কেন তার ওপর এমনি চটে গেছি। বোধ হয়, এটা আমার কোনও ভুল বোঝাবুঝির ফল। ইত্যাদি।

পুরুষকার কাপুরুষতাকে ক্ষমা করে শুনেছি। কিন্তু ফ্রান্সিসকে ক্ষমা করতে পারলাম না। যেমন করে হোক, প্রতিশোধ নিতে হবে আমাকে।

কিন্তু তার আগে বিদেয় করতে হবে ক্যাথারিনকে।

আমি বাড়ি ফিরে এলাম। এসেই চন্দননগরে লোক পাঠালাম ওর বোন আর ভগ্নীপতিকে নিয়ে আসবার জন্যে। ওরা না আসা অবধি নীচতলাতেই বসে রইলাম আমি। ক্যাথারিন ওপরে।

ওঁরা এলেন। ঠিক হল, আগামী রবিবার ক্যাথারিনকে নিয়ে যাবেন ওঁরা। আমিই আপাতত জুগিয়ে যাব তার মাসোহারা।

যাওয়ার আগে ক্যাথারিন বলে পাঠাল, সে একবার দেখা করতে চায় আমার সঙ্গে। কিছুতেই ‘না’ বলতে পারলাম না আমি। সত্যিই তো, ওর কী দোষ। মাত্র বছর ষোল বয়স। পাপ-পুণ্য ভাল-মন্দের কী বুঝবে এইটুকু মেয়ে।

তিন ঘণ্টা সেদিন একসঙ্গে ছিলাম আমরা। ক্যাথারিন অনেক কাঁদল। আমিও কাঁদলাম। তারপর দু’জনে বিদায় নিলাম দু’জনের কাছ থেকে।

এবার আমার প্রতিশোধের পালা। যথাসময়ে সুপ্রিম কোর্ট থেকে ডাক পড়ল ফিলিপ ফ্রান্সিসের। সাক্ষীর কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াতে হল জর্জ সি-দেরও। আমার তরফ থেকে প্রধান সাক্ষী আমার ভৃত্যকুল। রামবক্স জমাদার, মিনকি আয়া, রেজাউল্লা দারোয়ান, ভবানী হরকরা প্রভৃতি।

ওরা কে কী বলেছিল সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে, তা শুনতে হলে তোমাদের কোর্টের পুরানো কাগজপত্তর ঘাঁটতে হবে। কোর্টে সে সব নথিপত্র আজও রয়েছে। উপস্থিত সংক্ষেপে সে রাত্তিরের ঘটনাটাই আমি বলি।

রাতটা ছিল চাঁদনি রাত। আমি বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই চাকরদের হঠাৎ নজরে পড়ল আমার বাড়ির দেয়ালে একখানা মই। চাকরেরা ভাবল—তাই তো, এ সময়ে হঠাৎ এখানে মই এল কী করে?

জর্জ সি আদালতে নিজে স্বীকার করেছে যে, এই মইখানা ফ্রান্সিসের অনুরোধে সে নিজে তদারকি করে তৈরি করেছে। এবং এটি তৈরি হয়েছে তাঁর বাড়িতেই। সে আরও বলেছে যে ফ্রান্সিস যখন সেদিন রাতে এই মইখানা নিয়ে তার বাড়ি থেকে বের হয়, তখন সে বাড়িতেই ছিল। রাত তখন দশটা হবে। এমন সময় নাকি হঠাৎ ফ্রান্সিস এসে হাজির। ক’দিন আগেই তিনি একপ্রস্ত কালো পোশাক রেখে গিয়েছিলেন ওখানে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এবার তাই পরলেন। তারপর মইখানা হাতে করে চললেন রাস্তার দিকে।

সি জিজ্ঞেস করল—কোথায় যাচ্ছেন স্যার?

ফ্রান্সিস উত্তর দিলেন—মিসেস গ্রান্ড-এর সঙ্গে একটু দেখা করতে।

সি চমকে উঠল। প্রতিবেশী হিসাবে সে জানে মিঃ গ্রান্ড এখন বাইরে। তা ছাড়া এখন বলতে গেলে প্রায় মাঝরাত্তির। এমন সময়ে কোনও ভদ্রলোকের বাড়িতে গিয়ে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা। তবুও ফ্রান্সিসকে কিছু বলতে সাহস পেল না সে।

আদালত প্রশ্ন করল, কেন?

সি উত্তর দিল—মি লর্ডস, ফ্রান্সিস আমার চেয়ে অনেক বড় মানুষ—A big man.

যা হোক, এদিকে মই দেখে চাকরেরা ভাবল নিশ্চয় কোনও চোর ঢুকে পড়েছে বাড়িতে। মইখানা সরিয়ে রেখে তারা দল বেঁধে আড়ি পেতে রইল চোর কখন বের হয় তারই অপেক্ষায়।

ইতিমধ্যে নেপথ্যে অভিনীত হল আর এক নাটক। আয়ার মুখে আদালত শুনলেন সে কাহিনীও। মিনকি আয়া সে দিনও বরাবরের মতো ক্যাথারিনের কাছে বসে পান চিবুচ্ছিল। হঠাৎ ক্যাথারিন নাকি তাকে বলল—আয়া, নীচ থেকে একটা গোটা মোমবাতি নিয়ে এসো তো। মিনকি নীচে নেমে গেল। ফিরে এসে দেখে মেমসাহেবের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ‘মেমসাহেব। মেমসাহেব।’ দু’বার ডাকল সে। কিন্তু কোনও সাড়া নেই। আয়া ভাবল, মাঈজি হয়তো রাগ করেছেন তার ওপর। ক্যাথারিন চিরকালই একটু অভিমানী। অবশ্য বেশিক্ষণ রাগ থাকত না তার। আয়া সেটা জানত। তাই সে আর দরজা ধাক্কাধাক্কি না করে চলে এল নীচে।

নীচে তখন চাকরেরা ওত পেতে আছে চোর ধরার জন্যে। কিন্তু এ চোর নয়, ডাকাত। কালো পোশাকে এগিয়ে এলেন ফ্রান্সিস। কই, আমার মই কোথায়? যেন তাঁর মই এগিয়ে দেওয়ার জন্যেই আমি মাইনে দিয়ে লোক রেখেছি বাড়িতে। খপ করে জমাদার হাতটি ধরে ফেলল তাঁর। ফ্রান্সিস ধমক লাগালেন—জানো আমি কে?

জমাদার বললে—জানি হুজুর। আপ ফ্রান্সিস সাহেব। ওঁর গলা শুনেই জমাদার চিনে ফেলেছিল ওঁকে। তা ছাড়া চাঁদের আলোতে কালো পোশাকেও ফ্রান্সিসের চেহারাটা গোপন ছিল না আর। জমাদার বললে—‘সাহেব বাড়ি না-আসা অবধি আপনাকে এখানে থাকতে হবে হুজুর।’

ফ্রান্সিস বেগতিক দেখলেন। তিনি পকেট থেকে মুঠো-ভরা মোহর বের করলেন। হাম তুমলোগকো বড়া আদমি কর দে গা। হিন্দুস্থানি ঘুষ বের হল ‘জুনিয়াসে’র গলা দিয়ে। কিন্তু জমাদার নাছোড়বান্দা।

এদিকে আয়া তো ব্যাপার দেখে হতভম্ব। সে ছুটে গেল ওপরে। ‘মেমসাহেব, মেমসাহেব, নীচে যে এক সাহেবকে মেরে ফেলল ওরা।’ এবার দরজা খুলল ক্যাথারিন। উপরের বারান্দা থেকেই উঁকি দিল উঠোনে। চাকরেরা তখন ফ্রান্সিসকে নিয়ে টানতে টানতে চলেছে বৈঠকখানার দিকে। যেতে যেতে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ক্যাথারিনকে কী যেন বললেন ফ্রান্সিস সাহেব। ক্যাথারিনও কী যেন বলল ওপর থেকে। সাক্ষীরা সবাই বলেছে, ওদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছিল তখন, তার একবর্ণও বুঝতে পারেনি তারা। কারণ সে কথা ইংরেজিতে হয়নি।

বাধ্য হয়ে আমার বৈঠকখানায় বন্দি হতে হল ফ্রান্সিসকে। জমাদার একটা চেয়ার দিল তাঁকে বসতে। এমন সময় ক্যাথারিন নাকি সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল নীচে। এসে হিন্দুস্থানিতে আদেশ দিল—‘জমাদার, ছোড় দো। সাহেবকে ছোড় দো।’

কিন্তু পাপের গন্ধ পেয়েছে হিন্দুস্থানি জমাদার। সে বলল—‘মেমসাহেব, আজ আমি আপনার কথা শুনব না। সাহেবের জন্যে আদমি ভেজিয়ে দিচ্ছি। তিনি আসুন, তারপর যা হয় হবে। —আপ আভি আপকা ঘরমে যাইয়ে।’

ক্যাথারিন চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বাঁশি বাজিয়ে উঠলেন ফ্রান্সিস এবং দেখতে দেখতে এসে হাজির হল সি এবং তার অনুগতের দল।

বিচারকরা ধৈর্য ধরে আনুপূর্বিক শুনলেন সব কাহিনী। তারপর ১৯৭৯ সালের ৬ মার্চ, শনিবার বের হল তাদের সুচিন্তিত রায়। পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে ফিলিপ ফ্রান্সিসকে। ইম্পেকে শুধরে দিলেন জাস্টিস হাইড: টাকা নয়, সিক্কা টাকা বলো ভাই, সিক্কা টাকা।—’Siccas, Brother Impey, Siccas,’

বন্ধুর কাজই করলেন তিনি আমার জন্যে। সিক্কা টাকার চেয়ে চলতি টাকার দাম তখনকার বাজারে শতকরা এগারো ভাগ কম। সুতরাং পঞ্চাশ হাজার সিক্কা টাকা পাওয়া মানে—আমি পাব পাঁচ হাজার একশ নয় পাউন্ড দুই শিলিং এগারো পেন্স।

এবার আমাকে আর পায় কে? ফ্রান্সিস বাধ্য ছেলের মতো সে টাকা গুনে দিলেন আমার হাতে। খোঁজ নিলে দেখবেন, হাইকোর্টের ভাণ্ডারে আজও রক্ষিত আছে সেই পাপের খেসারতের রসিদটি।

এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। বিচারকদের একজন, মাননীয় বিচারপতি চেম্বার্স সাহেব তুলেও ছিলেন সেই প্রশ্নটা। আমি টাকা পেলাম সত্য, কিন্তু যে অপরাধের দাম হিসাবে তা পেলাম, সত্যিই কি তেমন কিছু সে রাত্তিরে ঘটেছিল আমার বাড়িতে? সত্যিই কি ফ্রান্সিস ঢুকতে সমর্থ হয়েছিল ক্যাথারিনের ঘরে? চেম্বার্স বলেছেন তিনি মনে করেন না সাক্ষীদের বিবরণে এ ধরনের কিছু প্রমাণিত হয়েছে।

কিন্তু আমাকে যে নিজে বলেছে ক্যাথারিন। আমি আগেই বলেছি বিদায় নেওয়ার আগে ক্যাথারিন ঘণ্টা তিনেক ছিল আমার কাছে। সে-সময় অকপটে সে আমার কাছে নিজের মুখে বিবৃত করেছে সেই পাপকাহিনী। আমি তখন নির্বোধ বালিকাকে ক্ষমা করেছিলাম।

কিন্তু আদালতে এসে বুঝতে পারলাম নির্বোধ আমি নিজে। চেম্বার্স বলেছেন তিনি মনে করেন না যে, সে রাত্রিতে যদি অবাঞ্ছিত কিছু ঘটেও থাকে আমার বাড়িতে, তবে আগে থেকেই তার সঙ্গে কোনও যোগসাজস ছিল মিসেস গ্রান্ড-এর।

আমিই কি সে রকম কিছু মনে করেছিলাম? কিন্তু মিঃ সি যে চোখ খুলে দিল আমার। আদালতে সে বলেছে ফ্রান্সিস যে গোড়া থেকেই মিসেস গ্রান্ড-এর অনুরক্ত, তা সে জানত। অনেকবার তাদের একসঙ্গে ভোজসভা দিতে দেখেছে সে। কখনও ওরা নিচু গলায় কথা বলেছে, কখনও হেসেছে। একবার দু’জনে একসঙ্গে নাকি নেচেছেও।

কিন্তু ক্যাথারিন তো কোনও দিন নাচেনি আমার সঙ্গে। তবে কি ওদের কথাই ঠিক? তবে কি সত্যিই ক্যাথারিনের কাছেও ‘বুড়ো’ ছিলাম আমি? ওর চোখেও কি সত্যিই অতিরিক্ত মোটা মনে হত আমাকে? সত্য বটে, ফ্রান্সিসের সঙ্গে তুলনা হয় না আমার। ও তখন মোটে আটত্রিশ বছরের ছোকরা। বড় ঘরের ছেলে। সুশ্রী চেহারা। সবাই খাতির করত ওকে। তা ছাড়া গড়গড় করে ফরাসি বলতে পারত লোকটা। ক্যাথারিনের মাতৃভাষাও ফ্রেঞ্চ। সুতরাং হতেও পারে মিঃ সি-দের অনুমানই সত্য। ক্যাথারিনই হয়তো সেই রাতে শয়তানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তার ঘরে। বিশেষ করে মনে রাখতে হবে, এ ঘটনার ক’দিন আগেই ক্যাথারিন বল-নাচ উপলক্ষে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে গিয়েছিল মিঃ ফ্রান্সিসের বাড়ি। এবং সেদিনও নাকি মিঃ সি কথা বলতে দেখেছে ওদের দু’জনকে।

ফ্রান্সিস অবশ্য কখনও স্বীকার করেনি গোপনে এই ভিন্ন মানুষের হৃদয় নিয়ে খেলার কথা। শুধু পড়ন্ত বয়সে তাঁর স্ত্রীর কাছে বরাবরই নাকি তিনি বলতেন: আমি হচ্ছি মিসেস গ্রান্ডের একজন বিফল প্রণয়ী। তাঁকে মনে মনে চেয়েছি অনেক দিন, কিন্তু পাইনি কোনও দিন।

যেমন জায়গা, তেমন কৈফিয়ত। এ ছাড়া নিজের বিবাহিত স্ত্রীর কাছে কীই বা কৈফিয়ত দিতে পারতেন বেচারা। কিন্তু ওর ডায়েরি খুলুন, দেখবেন তাতে ফরাসি ভাষায় লেখা আছে দিনের পর দিন ওঁর অভিসারের কথা।

জরিমানার টাকা নিয়ে আমি তো চলে গেলাম পাটনায়। গিয়ে কোম্পানির চাকরির সঙ্গে ধরলাম নীলের চাষ। কর্নওয়ালিস গোলমাল না করলে হয়তো একদিন বিহারের নীলরাজা হয়ে যেতাম আমি। সে সব থাক। এদিকে চলে যাওয়ার পর আমার স্ত্রীর কী হল, সে-কথাই বলি।

আমি চলে যাওয়ার পর ক্যাথারিন স্বাধীন হয়ে গেল। যাওয়ার আগে ডিভোর্স করে গেলাম না বটে, কিন্তু সে জানত, আইনে না ছাড়লেও মনে মনে আমি ওকে ছেড়ে দিয়েছি ডিসেম্বরের সেই রাতেই। লোকনিন্দার ভয়ে মাস তিনেক চুপচাপ ছিল ওরা। ইতিমধ্যে শুরু হল ইংরেজ-ফরাসিতে যুদ্ধ। তাতে তছনছ হয়ে গেল চন্দননগরের ওর বাপের বাড়ির সংসার। বাপ চলে গেলেন বালাসোরে। ভগ্নীপতি ইংরেজের বন্দি হিসেবে এলেন সদ্য-প্রতিষ্ঠিত প্রেসিডেন্সি জেলে।

সুতরাং ফ্রান্সিসের এই সুযোগ। সে ক্যাথারিনকে নিয়ে গেল হুগলিতে। তার বাগানবাড়িতে। কলকাতা থেকে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার সেখানে। বলতে গেলে ছুটির দিনগুলো সবই সে প্রায় কাটাত সেখানে। তবুও কিনা লোকটা বলে সে ক্যাথারিনের বিফল প্রণয়ী।

অবশ্য এটাও ঠিক যে ক্যাথারিন চিরকাল আটকা পড়ে থাকেনি ওর হাতে। ক্যাথারিনের মতো মেয়েরা কোনও কালে তা থাকে না।

১৭৮০ সালের ডিসেম্বরে হুগলি থেকেই একটা ডাচ জাহাজে পাড়ি দিল সে বিলেতে। লোকে বলে, জাহাজে ওর সঙ্গী ছিল ওয়াটারপ্রুফের আবিষ্কারক বিখ্যাত ম্যাকিনটস সাহেবের পুত্র—উইলিয়াম ম্যাকিনটস। কিন্তু আমি পাকা মুখে শুনেছি, তা সত্য নয়। যাঁর সঙ্গে ক্যাথারিন সাময়িকভাবে জুড়ে দিয়েছিল তার ভাগ্যকে, তিনি মাদ্রাজ সিভিল সার্ভিসের একটি তরুণ কর্মচারী। নাম তাঁর টমাস লিউন। কিছুদিন তাঁর সঙ্গে লন্ডনে কাটিয়ে, তাঁকে নিয়েই অবশেষে ক্যাথারিন এসে ঠেকল প্যারিস-এ।

অবশ্য তার পিছনে পিছনে ফ্রান্সিসও সে মাসেই এসে হাজির হয়েছিল বিলেতে। কিন্তু ক্যাথারিন নাকি আর বিশেষ পাত্তা দেয়নি ওকে। এমনকী, প্যারিস-এ চলে যাওয়ার পরও ফ্রান্সিস নাকি চিঠি লিখে জানিয়েছিল যে, সে তাকে নিয়মিত মাসোহারা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু ক্যাথারিন নাকি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে সে প্রস্তাব। করবে না? নতুন বন্দরের সন্ধান পেয়েছে যে তখন ক্যাথারিন। ফরাসি সাম্রাজ্যের অধিকর্তা নেপোলিয়নের অন্যতম সহচর মঁসিয়ে তালেরাঁ (Talleyrand) তখন তার সেবায়েত। প্যারিসে তখন সবাই জানে, মঁসিয়ে তালেরাঁ সম্রাটের পররাষ্ট্র সচিব বটে, কিন্তু তাঁর নিজের ঘরের স্বরাষ্ট্র-সচিব তথা অধীশ্বরী যিনি, তিনি মিসেস গ্রান্ড। বৈদেশিক রাষ্ট্রদূতদের আদর-আপ্যায়ন অভ্যর্থনা সব করেন তিনি। শোনা যায়, রাষ্ট্রদূতরা সেই জন্যে নাকি খুঁত খুঁত করতেন মঁসিয়ের বাড়ি যেতে। হাজার হোক, মহিলাটি তো আর ওঁর বিবাহিতা স্ত্রী নয়।

কথাটা ক্রমে সম্রাটেরও কানে গেল। তিনি তালেরাঁকে বললেন কী কথা শুনতে পাচ্ছি মঁসিয়ে। তুমি নাকি তোমার মিস্ট্রেসকে দিয়ে রাজকর্তব্য সম্পাদন করাচ্ছ আজকাল?

তালেরাঁ বললেন, আচ্ছা সম্রাট, এবার থেকে আমার স্ত্রীকে দিয়েই তা করাব। বাধ্য হয়ে তালেরাঁকে বিয়ে করতে হল ক্যাথারিনকে। সেটা ১৮০২ সালের কথা।

সে বছর আমিও প্যারিসে। মীর্জা আবু তালেব খান আপনাদের হয়তো বলেছেন, ডিভোর্সের খরচা হিসেবে আমি নাকি আশি হাজার ফ্রাঙ্ক ঘুষ পেয়েছিলাম প্যারিসে৷ তালেব সাহেব বরাবরই কুৎসা রটান আমার নামে। আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না যেন। ক্যাথারিনকে কুমারী বানাবার খরচা হিসেবে আমি যা পেয়েছিলাম সেদিন সে একটা চাকরি। নগদ ফ্রাঙ্ক নয়।

মিথ্যে বলব না, চাকরিটা দরকার ছিল আমার। কর্নওয়ালিস কিছুতেই টিকতে দিল না আমাকে পাটনায়। বাধ্য হয়ে তাই ১৭৯৯ সালেই ভারতবর্ষ ছেড়ে আমাকে চলে আসতে হল বিলেতে। বোর্ড অব ডাইরেকটারের কাছে দরবার করলাম। কিন্তু তাতেও সুবিধে হল না কিছু। শেষে প্যারিসে এসে দেখি এই ব্যাপার।

ইম্পের ছেলে লিখেছেন, প্যারিসে ক্যাথারিনের সঙ্গে আমার নাকি দেখা হয়েছিল। এটা ডাহা মিথ্যে কথা। আমার সঙ্গে তো হয়ইনি, এমনকী, ফ্রান্সিসের সঙ্গেও না। ক’বছর আগে, ১৭৮২ সালে ফ্রান্সিসও একবার এসেছিল এখানে। কিন্তু ক্যাথারিন নাকি ওকে বিশেষভাবে অনুরোধ করে এখানে আর ওর সঙ্গে দেখা না করতে। তবে পুরানো বন্ধুত্বকে অস্বীকার করেনি সে। ফ্রান্সিসের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে একগাদা বই উপহার দিয়েছিল তাঁকে। আমাকেও দিয়েছিল। বেইমানি করব না, আমার উত্তমাশা অন্তরীপের এই নতুন চাকরিটি ওরই দান। মাদাম দ্যঁ তালেরাঁর অনুরোধপত্র পেয়েই না বাতাভিয়ান রিপাবলিক এত বড় একটা পদ দিয়ে এই আফ্রিকায় পাঠিয়েছে আমাকে। নয়তো এই বুড়ো বয়সে কী যে গতি হত আমার, ভেবে পাই না।

ক্যাথারিনের কাছে সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ। কম দেয়নি মেয়েটা। কলকাতায় দিয়েছিল নগদ পঞ্চাশ হাজার সিক্কা টাকা। আজ আবার দিল এই চাকরি। মনের মতো চাকরি। খাই-দাই, ঘুমাই। মাসের শেষে হাতভরা মাইনে পাই। আজ আমি সত্যিই সুখী মানুষ। বোম্বাইয়ের সার, জেমস ম্যাকিনটস দিন কয়েক আগে নেমেছিলেন আমার এখানে। তাঁকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন, আমার দ্বিতীয় স্ত্রীটি সত্যিই খুব ভাল।

প্রশ্নমালা

ওহে বাঙালি পাঠক, তোমার কাছে এই গল্পের মর‍্যাল কী?

(উঃ—শ্রীপান্থ কৃত ‘ক্যাথারিন ভাষ্য’ দ্রষ্টব্য)

(মৃত্যুর পর ক্যাথারিনের জবানবন্দি)

বুড়োটার কথা তোমরা নিশ্চয়ই খুব মন দিয়ে পড়েছ। পড়েও যদি কিছু না বুঝে থাকো, তবে আমার কিছু করবার নেই।

ওর প্রতি আমার করুণা হয়। কেন জান? ও একটা আস্ত আহাম্মক। নয়তো বই ছাপিয়ে কেউ কি কখনও বলে যে, আমি মোটা, আমি বুড়ো, আমার জুয়া খেলার অভ্যেস ছিল, রোজ রাত্তিরে আমি বাড়ি থেকে নৈশ ভ্রমণে বের হতাম, আমার আচার ব্যবহার ভাল ছিল না, আবু তালেব আমাকে যা-তা বলেছে—ইত্যাদি। কী বলতে বাকি রেখেছে লোকটা? পঞ্চাশ হাজার সিক্কা টাকার লোভটা পর্যন্ত গোপন করতে পারল না তোমাদের কাছে। ছিঃ, অমন চাকরি তো কত জনকেই দিয়েছি আমি, কিন্তু কই, কেউ তো এমন করে আমার স্তুতি করতে বসেনি কোনও দিন। আচ্ছা, তাও না হয় করলে। কিন্তু কবরের মুখে দাঁড়িয়ে, এই আর একটা মেয়ের সর্বনাশ করার গল্পটাও কি গর্ব করে বলার মতো?

তোমরা হয়তো ভাবছ, লোকটা খুব সরল। তাই কোনও কথা পেটে রাখতে পারেনি। কিন্তু তাই কি?

কই, মহামান্য হেস্টিংস বাহাদুর সম্পর্কে তো একটি কথাও লেখেনি সে। অথচ মিসেস হেস্টিংস যখন মিসেস ইমহফ তখনও সে চিনত ওদের। কলকাতায় কে না জানে সেই কেলেংকারির কথা? ব্যারন ইমহফ সাহেব এলেন আর তার স্ত্রীকে হেস্টিংস-এর হাতে তুলে দিয়ে বাড়ি চলে গেলেন—এতই কি আটপৌরে কাহিনী সেটা? থাক ও নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না। কারণ সে পুরানো কাহিনী।

কিন্তু বারওয়েলকে ছাড়ব না আমি। গ্রান্ড ছেড়েছে। কারণ ওর দুনিয়াতে একটা চাকরি বা কিছু টাকা অথবা বড়মানুষের একমুখ হাসিই বড়। কিন্তু আমাদের, মেয়েদের এত সহজে ভুললে চলে না। বারওয়েল যখন বদান্যতা দেখিয়ে চাকরি দিয়েছিল ওঁকে, তখনই সন্দেহ হয়েছিল আমার। কারণ, আমি চন্দননগরের মেয়ে হলেও কলকাতার খবর রাখতাম কিছু কিছু। আমি জানতাম ক্লাইভের মতো মানুষও কী বলে গেছে ওঁকে।

‘The only qualification of Mr. Barwell I know of is that he is a good seducer of friend’s wives.’

এর পর যখন গ্রান্ড আমাকে নিয়ে তুলল তাঁরই বাগানবাড়িতে, তখন আমার মানসিক অবস্থা কী হওয়া সম্ভব, বুঝতেই পারো। এ বাড়িটাতে আমার বিয়ের ক’বছর আগে কী ঘটে গেছে তা যদি শোনো, তবেই বুঝতে পারবে, সেদিন কেন এমন ভেঙে পড়েছিলাম আমি।

১৭৬৯ সালের কথা। কোম্পানির নৌবহরে এক সহকারী ক্যাপ্টেন ছিলেন। নাম তার হেনরি এফ. থমসন। ভদ্রলোক ছুটিতে দেশে গিয়ে একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে গেলেন। মেয়েটির নাম সারা বোনার।

কত লোকই তো ভালবাসে। কিন্তু থমসনের মতো লোক কম। থমসন কিছুতেই সারাকে রেখে আর ইন্ডিয়ায় আসবেন না। অথচ হাতে এমন সময় নেই যে বিয়ে করেন। কলকাতায় বন্ধুদের লিখে দিলেন তোমরা শুনলে সুখী হবে যে আমি একটি মেয়েকে বিয়ে করেছি। সে পরের জাহাজে আসছে।

থমসন কলকাতায় এসে নামলেন। সে কী খাতির তাঁর। দেখতে দেখতে তাঁর পদোন্নতি হয়ে গেল। এবং তা হল বলতে গেলে শুধু এই পরহিতৈষী বারওয়েল সাহেবেরই চেষ্টায়।

‘সারা’ কলকাতায় নামবার সঙ্গে সঙ্গে বারওয়েল ওদের নিজের একখানা বাড়ি ছেড়ে দিলেন। ওরা পরমানন্দে সংসার শুরু করলে সে বাড়িতে। বারওয়েল-এর অতিথি তারা। সুতরাং খোঁজখবর নিতে নিয়মিতভাবে যাওয়া আসা করেন তিনি। তাঁর আন্তরিকতায় থমসন মুগ্ধ।

দিন যায়। হঠাৎ শোনা গেল, থমসনকে বহরমপুরে চলে যেতে হবে। বারওয়েল সেখানে একটা মস্ত চাকরির ব্যবস্থা করেছেন তাঁর। থমসন নাচতে নাচতে চলে গেলেন। বারওয়েল বললেন—তুমি ভেবো না ভাই, আমি তো রয়েছি, তোমার সংসারের দায়িত্ব আমার ওপর রইল।

এদিকে সহসা এক ওলটপালট ব্যাপার ঘটে গেল। স্বয়ং বারওয়েলই বদলি হয়ে গেলেন বহরমপুরে। ঠিক বহরমপুরে নয়, তার থেকে মাইল সাতেক দূরে মতিঝিল-এ। তিনি আবদার করলেন—থমসনকে আমার এখানেই ট্রান্সফার করা হোক। কিন্তু কেন জানি না, কর্তৃপক্ষ উলটো চাল চাললেন। তাঁরা থমসনকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এলেন কলকাতায়।

থমসন আর সারা এখন কলকাতায়। তবে থমসনের কেন যেন মনে হয়, সারা আর আগেকার মতো নেই। সারার আচার-ব্যবহার যেন এখন কেমন-কেমন। সবাই তো আর মিঃ গ্রান্ড নয়। থমসন ভাবতে বসল কী হল মেয়েটার। কেন মাত্র এই ক’বছরেই এমন হয়ে গেল সারা।

পিওন এসে সেলাম করে একটা চিঠি দিল থমসনের হাতে। ওপরে নাম লেখা কার্টারের। কার্টার পাশেই থাকেন। সেও বারওয়েল-এর আশ্রিত। কী জানি কী মনে করে চিঠিটা খুলে ফেললেন থমসন। সঙ্গে সঙ্গে জানা গেল সারার সমস্ত ব্যাধির কারণ।

বারওয়েল-এর চিঠি:-

‘You do my affections great wrong, and your own beauties great injustice; look in your glass, it will convince you, you have charms capable of warming old age, can a young man be indifferent to them? I love you, I wish you were with me and your husband at a distance.’

ইত্যাদি, চিঠির পর চিঠি। বোঝা গেল অনেকদিন বন্ধুকৃত্য করে ফেলেছেন বারওয়েল। কিন্তু তা হলেও সারাকে কিছু বললেন না থমসন। মিঃ গ্রান্ডের মতো ছুটে গেলেন না আদালতে। সারাকে ডেকে বললেন তোমাকে দেশে চলে যেতে হবে সারা। এখানে আর নয়।

সারা দেশে যাবে। সব ঠিক। এমন সময় এসে হাজির বারওয়েল। তাঁর পদোন্নতি হয়ে গেছে। এখন থেকে কলকাতাতেই থাকবেন তিনি। সুতরাং সারা দেশে যাবে কোন দুঃখে। উলটে বারওয়েল এবার দেশ ছেড়ে যেতে হুকুম দিলেন থমসনকে।

বেসরকারিভাবে একটা দলিল হল। স্থির হল, দু’টি সন্তানের খোরপোষ বাবদ বারওয়েল পাঁচ হাজার পাউন্ড দেবে, আর ডিভোর্সের খরচা বাবদ দেবে তিনশো পাউন্ড। দলিলে সই করলেন স্যান্ডারসন, হেস্টিংস এবং আরও আরও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সে দলিল হাতে নিয়ে থমসন চলে গেলেন চিনের দিকে। কিন্তু মাঝপথে বারওয়েলের চিঠি: ‘সত্বর চলে এসো কলকাতায়। তোমার নিজের স্বার্থেই আসা দরকার জানবে।’

বেচারা থমসন ফিরে এলেন। এসে শুনলেন, সারাকে দেশের জাহাজে তুলে দিয়েছে বারওয়েল। তাকেও যেতে হবে—কিন্তু টাকা? ‘দলিলের টাকাটা লন্ডনে নামবার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভাই দিয়ে দেবে তোমাকে’—বারওয়েল কথা দিলেন।

থমসনের জাহাজ ছাড়ে ছাড়ে, এমন সময় আবার হাঁপাতে হাঁপাতে বারওয়েল এসে হাজির। এই কাগজটা সই করে দাও তো ভাই। নয়তো ওরা আবার গোলমাল করবে। তোমাকে টাকাটা দিতে চাইবে না।

লন্ডনে নেমে শুনলেন তার কোনও প্রাপ্য নেই। কারণ, তিনি নিজে সই করে নাকচ করে দিয়ে এসেছেন সেই দলিল।

থমসন বোকা বনে গেলেন। তিনি আর কী করেন, বারওয়েল-এর কীর্তি কাহিনী লোকেদের গোচরে আনার জন্যে বই বের করলেন একখানা। সারার কাছে লেখা বারওয়েলের চিঠিপত্র সব ছেপে দিলেন তাতে। সে বইয়ের নাম—‘ইনট্রিগস অব এ নবাব।’

কিন্তু তাতে আর কী হয়। বারওয়েল যে কলকাতার সাদা-নবাব। নয়তো থমসনের দলিলে একজন সাক্ষী থেকেও কী করে মিঃ স্যান্ডারসন তাঁর ফুটফুটে মেয়েটাকে তুলে দিলেন ওর হাতে। তবে হ্যাঁ, লোক বটে ক্লেভারিং। বারওয়েল-এর বড় সাধ ছিল ওঁর মেয়েকে তিনি বিয়ে করেন। কিন্তু ক্লেভারিং কিছুতেই ‘জোচ্চোরের’ হাতে মেয়ে দেবেন না।

হ্যাঁ, জোচ্চোরই নাকি প্রকারান্তরে ক্লেভারিং বলেছিলেন ওকে। তাই নিয়ে শেষে দু’জনের ডুয়েল।

এ হেন বারওয়েল ছিল গ্রান্ডের অন্তরঙ্গ বন্ধু। ভাবতেও লোকটার ওপর ঘেন্না ধরে যায় আমার। বন্ধুকৃত্য করতে নিজের স্ত্রীকে আদালতে তুলতেও লজ্জা হল না ওর?

হয়তো, তোমরা ভাবছ তবে কি সবটাই সাজানো ব্যাপার? ব্যাপারটি কি তবে পলিটিক্যালই? এ কথার উত্তর আমি দেব না। হেলেন দেয়নি, তোমাদের সীতা দেয়নি। কোনও মেয়ে কোনও দিন এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তারা গোপনে কাঁদে। আমি কেঁদেছি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। আলিপুরের সেই লাল বাড়িটায়, হুগলির বাগানবাড়িতে, ম্যাকলিন-এর জাহাজে, তালেরাঁর প্রাসাদে। কার জন্যে কেঁদেছি জান? তোমাদের গ্রান্ড সাহেবের জন্যে নয়, ম্যাকলিন-ফ্রান্সিস বা তালেরাঁর জন্যেও নয়। কেঁদেছি আমার নিজের জন্যে। শুধু আমারই জন্যে।

ইতি—

মাদ্যাম দ্য তালেরাঁ

অসবর্ণে আপত্তি নাই

বর্ণ মানে যদি রং হয় এবং যদি তা গাত্রবর্ণ সম্পর্কিত হয়, তবে আলবত আপত্তি আছে। আমরা যারা কালো, স্ববর্ণে রাজি হতে তারা সব সময়েই গররাজি। এমনকী শ্যাম বা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের যারা, তাদেরও নজর ‘ফর্সা এবং সুন্দরীর’ দিকে। ‘ফর্সা’ মানেই সুন্দরী, এ বিষয়ে আমাদের পাত্রপক্ষ একমত। বোধ হয় পাত্রীপক্ষও। যে কোনও রবিবারে যে কোনও একখানা বাংলা কাগজে চোখ বুলালেই বুঝতে পারবেন এই বর্ণ-দর্শন কত সত্য। নটিংহামের ছোকরারা এই কাগজ দেখিয়েই কাগজওয়ালাদের ঘায়েল করছে আজ। ভারতবর্ষের কাগজ থেকে ‘ক্লিপিং’ নিয়ে তারা হাতে-কলমে প্রমাণ করে দিচ্ছে যে ‘ফেয়ার কমপ্লেকশানের’ দিকে কী ক্ষুধাতুর নজর নেটিভ এবং নিগারদের। পকেটে ওদের পয়সার জোর আছে। তাতেই আমাদের ফর্সা মেয়েদের ওরা নিয়ে নিচ্ছে। কেড়ে নিচ্ছে। যেমনভাবে নবাব সিরাজউদ্দৌলা নিয়েছিল মিসেস কেরিকে।

কেরির গায়ের রং ছিল ফর্সা। বয়সও কম। সিরাজ তাই নাকি তাকে হাতে পেয়ে অন্য বন্দিদের ছেড়ে দিয়েছিলেন তুষ্ট মনে। ন’ বছর ছিলেন মিসেস কেরি সিরাজের হারেমে। বহুত খাতির ছিল তাঁর। ঐতিহাসিক এবং এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা অবশ্য এটা ভুলে গিয়েছিলেন যে ন’ বছর কেন, এ ঘটনার পরে পুরো একটি বছরও বেঁচে থাকার ভাগ্য হয়নি বেচারা নবাবের। পরবর্তী কালে এটাও অবশ্য প্রমাণিত হয়েছে যে মিসেস কেরি অপহৃতা হননি। মিঃ কেরিকে তথাকথিত ‘ব্ল্যাক হোলে’ হারিয়ে তিনি অন্য একজনকে নিয়ে আঁধার ঘরে আলো জ্বালিয়ে সংসার পেতেছিলেন আবার।

নটিংহামের পাড়ার ছেলেরা এ সব তথ্যে রাজি নয়। তারা ইতিহাস পড়ে না, ইতিহাস শোনে। মিস এমিলি ইডেন নাকি তাদের জানিয়ে গেছেন যে, এ দেশের জনৈক রাজপুত্র ‘ইংরেজি রানি’র জন্যে পাগল। নটিংহামের ছেলেরা নিজেদের চোখে দেখেছে ভারতবর্ষের রাজপুত্রেরা ফি বছর একটি, দুটি করে রাজকন্যা না হলেও তাদের পাড়ার মেয়েদের তুলে নিয়ে যায় নিজেদের দেশে। টডি ছোকরারা প্লেনের সিঁড়িতে তাদের হাস্যমধুর ‘টা-টা’ মার্কা ছবিগুলো দেখে আর কোমরের বেল্ট কষে। ব্রিটেনকে সাদা রাখতে চায় তারা। অসবর্ণে তাদের ঘোরতর আপত্তি।

কিন্তু সব সময়ে নয়। আবার রবিবারের কাগজটা খুলুন একটু। দেখবেন, আমরা সব সময়ে আপত্তি করি না। শতকরা দশজন অন্তত প্রকাশ্যেই সে কথা জানিয়ে রেখেছেন। ‘অসবর্ণে আপত্তি নাই’ যাদের, সেই দশজনের একজন বিপত্নীক, দ্বিতীয়জন বিপত্নীক এবং পাঁচটি সন্তানের জনক, তৃতীয়জন পঞ্চাশোর্ধ্ব, চতুর্থজন আরও উর্ধ্বে (এর বিবাহের উদ্দেশ্য শাস্ত্রালোচনা করা, কোনও তরুণীকণ্ঠে গীতামাহাত্ম্য শ্রবণ), পঞ্চমজন বিবাহিত, তবে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত, ষষ্ঠজন মেধাবী তরুণ, উচ্চাভিলাষী যুবক, পত্নী নামক ডিঙি নৌকোর সাহায্যে ইনি সপ্তসাগর পার হয়ে বিলাত গমনে ইচ্ছুক এবং সপ্তমজন সমাজসংস্কারক ও দেশহিতৈষী। শুধু অসবর্ণে নয়, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শিষ্য হিসেবে ইনি কোনও ‘বয়স্থা বিধবার’ পাণিগ্রহণেও সম্মত। বাকি তিনজনের কথা আর বলার দরকার নেই। তাঁরাও উল্লেখিত এই সপ্ত কুলোদ্ভব কুলীন রাঢ়ী অথবা বারেন্দ্র বঙ্গসন্তান। উল্লেখিত এক বা একাধিক লক্ষণাক্রান্ত।

যে যে পরিস্থিতিতে এই বঙ্গসন্তানেরা অসবর্ণে আপত্তি করেন না, তা লক্ষণীয়। লক্ষ করলেই দেখবেন, কারণগুলো ব্যক্তিগত। খুব বড় করে ধরলেও পরিবারের সীমার বাইরে তাদের, আনা যায় না। তা ছাড়া আমরা বাঙালিরা পরিবারের সীতা-গণ্ডির বাইরে পা-ও বাড়াই বড় কম। কিন্তু ইংরেজদের আচরণ ঠিক তার উলটো। বার-ই তাদের ঘর, ঘর তাদের বার। এই সেদিন অবধিও তাই ছিল। আজ অবশ্য আবার ঘর নিয়েছে তারা। নটিংহামের ছোকরারা তাই ভুলে গিয়েছে সেদিনের ইতিহাস। তাই তারা দাঙ্গা করে। দাঙ্গা করে ইংল্যান্ডকে ফর্সা রাখতে চায়। অসবর্ণে তাদের ঘোরতর আপত্তি।

কিন্তু ইতিহাস বলে—আমাদের মতোই এককালে বর্ণ-বৈচিত্র্যে রাজি ছিল তারা ইংরেজরা এবং রাজি ছিল একটি সম্পূর্ণ নতুন কারণে। সে কারণটির নাম দিয়েছি আমি, একাদশ কারণ। ইংরেজিতে তার টিকা:

‘We are sure to find something blissful and dear

And that we are far from the lips we love

We make love to the lips that are near,’

অষ্টাদশ শতকের কলকাতায় এই নটিংহাম, ডাবলিন, ইয়র্কশায়ারের ছোকরাদেরই গান ছিল এটা। কোথায় লিসি-ডরোথি-এমেলি, খিদিরপুরের ক্ষেন্তমণির কালো কুচকুচে মেয়েটার মতো মেয়ে হয় না আর। জাহাজ থেকে লাফিয়ে ডাঙায় পড়তে ইচ্ছে করে ওকে দেখে। ও হল কিনা ‘সাইরেন’ (Siren)। ডার্ক সাইরেন। কালো মায়াবিনী। শুকনো কাঠের দাউ দাউ আগুনে কালো মেয়েটাকেই ফর্সা দেখেছিলেন নাকি কলকাতার জনক জোব চার্নক।

“Cries Charnoc—Scatter the Faggots!

Double that Brahmin in two!

The tall pale widow is mine,

Joe, the little brown girl is yours’.

বলা হয় পাটনার কাহিনী। গঙ্গার ধারে সন্ধ্যায় হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছিলেন চার্নক। সঙ্গে সহচর ইয়ং বা তরুণ জো। জো’র বয়স তখন চৌষট্টি। তাদের আগে আগে মশাল। পিছনে সিপাই। হঠাৎ নজরে এল হই-হট্টগোল। চার্নক এগিয়ে গেলেন। ‘সতী’ হচ্ছে। গঙ্গার ধারে সতীদাহ। ব্রাহ্মণ মন্ত্র পড়ছে। গৌরবর্ণা সুন্দরী সোমত্ত একটি মেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে চিতার দিকে। স্বামীর সঙ্গে পুড়ে মরবে। সতী হবে। সতীদাহ আরও হয়েছে। এ দেশে হয়ই। চার্নক তাতে বাধা দিতে যাননি কোনও দিন। কিন্তু আজ তাঁর মনে লেগে গেল ওই দীর্ঘাঙ্গী, ফ্যাকাশে (বা ফর্সা) মেয়েটিকে। কুঠিয়াল চার্নক হুংকার দিলেন অসবর্ণে আপত্তি নেই। জো, ওই বুড়ো বামুনকে কেটে দু’ খণ্ড করো। কাঠখড় হঠাও। এই মেয়েটি আমার। তোমারও চাই? বহুত আচ্ছা, ওই বাদামি রঙের ছোট মেয়েটি তোমাকে দিলাম। তুমিও তো কালো। সুতরাং আপত্তি কিসের জো? কেটির কথা ভাবছ? ও ভাবনা ছেড়ে দাও এখন। আপাতত অসবর্ণে আপত্তি কোরো না।

পাটনায় সতী-উদ্ধার পুরাণ হয়তো বানানো, কিন্তু সেখানে জোব চার্নক যে একটি দিশি মেয়েকে নিয়ে গোল বাঁধিয়ে ছিলেন সমসাময়িক বিবরণে তার উল্লেখ রয়েছে। হিন্দুস্থানিকে নিয়ে ঘর বাঁধলেন চার্নক। প্রকাশ্য সংসার। ছেলে-মেয়ে জামাইয়ের ঘর। চার্নক-গিন্নির সতী হওয়ার কথা। সুতরাং তিনি খ্রিস্টান হলেন না। সাহেবকে বলে কয়ে পঞ্চপীরের শিষ্য করলেন। বরাবর চার্নক তাই ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক অন্য একজন সাহেব লিখে গেছেন: তিনি যে খ্রিস্টান ছিলেন, তার প্রমাণ স্ত্রীকে না পুড়িয়ে তাকে কবর দিয়েছিলেন তিনি। আর তিনি যে খ্রিস্টতন্ত্র ভুলে গিয়েছিলেন তার প্রমাণ তাঁর বাৎসরিক মুরগি জবাই। প্রতিবছর একখানা করে মুরগি কাটতেন চার্নক তাঁর বিবির কবরে।

খ্রিস্টান মতে মুরগি না হলেও, কোম্পানির মতে তখনও, বিবি নিষিদ্ধ। জন লিচল্যান্ড নামে এক সাহেব দেশি বিবি নিতে গিয়ে চাকরি খুইয়ে ছিলেন কোম্পানির হাতে। পাঁচ বছর বেকার থেকে শেষে সুরাটে গিয়ে তিনি কাজ পান। চিরস্থায়ী কাজ। কেউ বলেন নরকের পাহারাদারের কাজ, কেউ বলেন স্বর্গে পারিজাত চয়নের কাজ।

উভয়বিধ কাজেই ক্ৰমে অনেক লোক হয়ে গেল। ফলে কোম্পানির কর্তাদের মনে ‘হোলি ফাদার’ নতুন মন্ত্র দিয়ে দিলেন। তাঁরা অতঃপর ঘোষণা করলেন সার্জেন্টের নিচুতে যারা, অর্থাৎ যারা সাধারণ নাবিক বা সৈনিক, তাদের পক্ষে দেশীয় বিবি গ্রহণে কোনও বাধা নেই। তবে মান্যগণ্যরা যেন এমন কাজ না করেন। তাতে মহিমান্বিত কোম্পানির পক্ষে অসম্মান, এবং ঈশ্বরের পক্ষে ক্রোধের কারণ হবে।

লেঃ কর্নেল কির্কপ্যাট্রিক খুব মজলিসি মেজাজের মানুষ ছিলেন। তিনি বলতেন—ক্রোধ না ছাই। যে আগুন দেখেছিলাম আমি, তাতে কোম্পানিই ছাই হয়ে যায়, আমি তো কোন ছার। কির্কপ্যাট্রিক ছিলেন হায়দরাবাদে কোম্পানির ‘রেসিডেন্ট’। দীর্ঘদিন (১৭৯৮-১৮০৫) এ কাজে বহাল ছিলেন তিনি। একবার নিজামের দরবারে গেছেন সরকারি কাজে। আরও অনেকবার গেছেন। নিজামের যে বিবিমহল আছে তা তিনি জানতেন না। বিবিরা যে ইচ্ছা করলে জাফরি কাটা জানালা দিয়ে দরবার দেখতে পারেন—তাও না। সেদিন দরবার সেরে মাত্র নিজের বাংলোয় এসেছেন। বারান্দায় বসে হুঁকোর নলটা হাতে নিয়েছেন, এমন সময় দেখা গেল একখানা পালকি আসছে তাঁর ঘরের দিকে। ঝালর ঘেরা সুন্দর দরবারি পালকি। প্যাট্রিক নড়েচড়ে বসলেন। পালকি এসে থামল তাঁর দোরগোড়ায়। ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে গেল। ভেতর থেকে নামলেন এক বৃদ্ধা।

বিস্মিত সাহেব তাঁর পরিচয় জানতে চাইলেন। বুড়ি হেসে বললেন, তিনি একটি অতিশয় সুখকর প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। নিজাম বাহাদুর বকশী সাহেবের একমাত্র কন্যা খয়ের-উন্নিসা তাঁর পাণিপ্রার্থী। তিনিই সাহেবের কাছে তাঁর মনোবাসনা জানবার জন্যে পাঠিয়েছেন ওঁকে। সাহেব বিশ্বাস করলেন না তাঁর কথা। কারণ, তাঁর তখনও এ জ্ঞান লোপ পায়নি যে, ঘটনাটা ঘটছে হিন্দুস্থানে এবং এই প্রণয়িনীটি হারেমবাসিনী।

ঘটকালি কাজে বৃদ্ধার প্রতিষ্ঠা ছিল। কিন্তু তাঁকে বিফল হয়ে ফিরতে হল। সাহেব ‘পাগলি’ বলে উড়িয়ে দিলেন তাঁকে।

দিন যায়। হঠাৎ আর একদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে অমনই আর এক পালকির আবির্ভাব। কির্কপ্যাট্রিক ভাবলেন আবার বুঝি এল সেই ডাকিনী বুড়ি। কিন্তু এবার আর বুড়ি নয়। পালকি থেকে নামল একটি অষ্টাদশী মেয়ে। এবার আর প্রস্তাব করতে হল না তাঁকে। সাহেবই প্রস্তাব করলেন।

বকশী সাহেব শুনে বললেন—এমন জামাই পেলে তাঁর আপত্তি নেই। কিন্তু সাহেবকে মুসলমান হতে হবে। সাহেব বলল—আলবত হব।

লেঃ কর্নেল জেমস কির্কপ্যাট্রিক হলেন ‘হাসমত জঙ্গ’। তাঁর কুঠির নাম ‘রঙ্গমহল’। ওয়েলেসলি তখন গভর্নর-জেনারেল। শুনে খেপে গেলেন তিনি। অনেকে ভাবলেন, এবার বুঝি বেচারার চাকরিটি যায়। কিন্তু কোম্পানি হল কোম্পানি। কাজ পেলে তাদেরও আপত্তি নেই অসবর্ণে। ওয়েলেসলি তার ‘সার্ভিসবুক’টা দেখলেন। দেখলেন কির্কপ্যাট্রিক এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল হওয়ার পর কোম্পানিকে যা দিয়েছেন তাতে কোম্পানি তাকে একটি বিবি অনায়াসেই দিতে পারে। তিনি সানন্দে ঘোষণা করলেন, কির্কপ্যাট্রিককে যাতে ব্যারন করা হয় তার জন্যে তিনি সুপারিশ করবেন।

ব্যারন হওয়ার আগে কির্কপ্যাট্রিক ‘নবাব’ হলেন। তিনি হিন্দুস্থানিদের মতো গোঁফ রাখলেন, হাতে মেহেদি মাখলেন। এলফিনস্টোন বলেছেন: ভয়ের কিছু নেই, গোঁফ হুঁকা এবং মেহেদি বাদ দিলে কির্কপ্যাট্রিক দিব্যি ইংরেজ আছেন এখনও।

কির্কপ্যাট্রিকের সন্তান ছিল দু’টি। একটি ছেলে একটি মেয়ে। ছেলেটি মারা গেল। ক্রমে তার বাবাও। ছুটিতে কলকাতা এসে মারা গেলেন কির্কপ্যাট্রিক। মেয়ে গেল বিলেতে। খয়ের-উন্নিসার মেয়ে। তার মাধ্যমেই চিরকালের মতো বেঁচে রইল এই অসবর্ণ কাহিনীটি। কার্লাইল প্রেমে পড়লেন তার। তাঁর ‘রেমনিসেন্সের’ নায়িকা—কিটি কির্কপ্যাট্রিকই ক্যাথারিন অরোরা। আমাদের এই কির্কপ্যাট্রিকের কন্যা।

কির্কপ্যাট্রিকের মতো রোমান্সের জীবন কর্নেল গার্ডনারেরও। তবে গার্ডনার ঠিক কোম্পানির কর্মচারী নন। তিনি ছিলেন ফ্রিলান্সার। তাঁর গল্পটা তাঁর নিজের মুখেই বলি:

‘আমি তখন জোয়ান ছোকরা। কাম্বের একজন দেশীয় রাজার সঙ্গে সন্ধিচুক্তি নিয়ে আলোচনার ভার পড়ল আমার ওপর। দিনের পর দিন চলল দরবার। প্রতিদিন আমি যাই। একদিন আমার পাশেই দেখি ধীরে ধীরে নড়ে উঠল একখানা পরদা। তাকাতেই চোখে পড়ল দু’টি আশ্চর্য চোখ। বড় বড় কালো, ডাগর দুটি চোখ। পৃথিবীতে এমন সুন্দর চোখ বুঝি আর হয় না। সন্ধিচুক্তি চুলোয় গেল। আমাকে পেয়ে বসল সেই চোখ দু’টি। I felt flattered that a creature so lovely as one of these deep black, loving eyes must be should venture the gaze upon me!

দরবার ভাঙল। জানতে পারলাম মেয়েটি যুবরাজের কন্যা। অপেক্ষায় রইলাম। আবার সেই দরবার। আবার সেই কালো চোখ। The Pardah again was gently moved and my fate was decided.

কথা হল তার অভিভাবকদের সঙ্গে। আমি বললাম, ‘মনে রাখবেন নবাব, আমাকে ঠকাতে চেষ্টা করবেন না। আমি ওই চোখের মালিককেই চাই। অন্য কাউকে নয়। সে চেষ্টা যদি করেন তবে ধরা পড়বেন। আমাকে ঠকায়, এমন সাধ্য কারও নেই।’

বিয়ের দিন আমি ধীরে ধীরে ঘোমটা ওঠালাম। আরশিতে ফুটে উঠল তার মুখ। সে হাসল। আমিও হাসলাম।

কর্নেল গার্ডনারের বাস ছিল খাসগঞ্জে। আগ্রা থেকে ষাট মাইল দূরে। বিস্তর সম্পত্তির মালিক ছিলেন তিনি। অসবর্ণ বিয়ের এমন পৃষ্ঠপোষক বোধ হয় ইংরেজদের মধ্যে দ্বিতীয় কেউ নেই। তাঁর ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন আকবর শা’র ভাইয়ের তালাক-দেওয়া স্ত্রী মুলকা বেগমের সঙ্গে। নাতনি সুসান গার্ডনারের বিয়ে দিয়েছিলেন দিল্লির এক বাদশাজাদার সঙ্গে। তাঁর নাতি-নাতকরদের আজও হয়তো পাওয়া যেতে পারে দিল্লি-আগ্রার শহরতলিতে।

কির্কপ্যাট্রিক বা গার্ডনার ঐতিহাসিক ব্যক্তি। পরিশিষ্টে হলেও ইতিহাসে তাঁরা আছেন। কিন্তু হাজার হাজার ‘গার্ডনার’ আছেন যাঁরা ইতিহাসে নেই, তবু এখনও জ্যান্ত আছেন।

এবং ছিলেনও। এসিয়াটিকাস নামে এক সাহেব ১৭৭৪ সালে কলকাতায় তাঁদের দেখেছিলেন। তাঁরা যে শুধু কালো মেয়েদের নিয়ে ঘর করতেন তা নয়, আস্তাবলের মতো কালো-মেয়েদের বা হিন্দুস্থানিদের নিয়ে হারেমও পুষতেন। এটা ছিল তাঁদের বিলাসের অন্যতম উপাদান। এসিয়াটিকাসের মতে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ ‘কালো’ বলে বদনাম থাকলেও হিন্দুস্থানি মেয়ে যারা চাক্ষুস দেখেছে, তারাই জানে এ কেমন ‘কালো।’ I have seen ladies of the Gentoo caste so exquisitely formed, with limbs so divinely turned, and such expression in their eyes, that if you can reconcile yourself to their complexions, you must acknowledge them not inferior to the most celebrated beauties of Europe. For my own part, I already begin to think of the dazzling of a copper-coloured face infinitely preferable to the pallid and sickly hue, which banishes the roses from the cheeks of a European Fair, and reminds me of the darkstruck countenance of ha-zarns races form the Grave.’ ইত্যাদি।

অর্থাৎ ফর্সার চেয়ে কালো ভাল। তামাটে হলে তো কথাই নেই। তবে ভিন দেশে। এসিয়াটিকাস শেষ অবধি কী মনস্থির করেছিলেন জানি না, তবে এটা জানি যে, দ্য বোগে (De Boigue) দ্বিধা করেননি। এই ভদ্রলোক ছিলেন একজন খ্যাতনামা ভবঘুরে। তাঁর সবিশেষ খ্যাতির কারণ হিসাবে শোনা যায়, রুশ-সম্রাজ্ঞী ‘ক্যাথারিন দি গ্রেট’ নাকি ছিলেন তাঁর একজন প্রণয়িনী। কিন্তু সম্রাজ্ঞীর প্রেমের বাঁধন আটকে রাখতে পারল না তাঁকে। দ্য বোগে ঘুরতে ঘুরতে চলে এলেন ভারতে। সিন্ধিয়ার অধীনে চাকরি মিলল একটা। ক’দিন যেতে না যেতে মিলে গেল মনের মতো একটি বিবিও। মেয়েটি পারস্য-কুমারী, জাতিতে মুসলমান। তা হোক, দ্য বোগের তাতে আপত্তি নেই। তিনি তাঁকে খ্রিস্টান করে নিলেন। নামটাও পালটে পছন্দসই করে নিতে ভুললেন না। মুসলমানি মেয়ের নাম হল এখন ক্যাথারিন। সেই রুশ-সম্রাজ্ঞীর নাম।

সদ্য-পাওয়া এই নবীনা সম্রাজ্ঞীকে নিয়ে দ্য বোগে এবার রাজধানী বসালেন। আলিগড়ে। ভবঘুরে এখন রীতিমতো সংসারী। হিন্দুস্থানি গৃহস্থ। তাঁর বাড়িতে এখন পোলাও কোরমা তো কোন ছার, দিনরাত্তির গড়গড় করে হুঁকো পর্যন্ত চলে। বন্ধুরা বলেন—দ্য বোগের সংসারে সে কী শান্তি। চিরকালের ভবঘুরে। কিন্তু এখন একবার মুখেও আনে না দেশত্যাগের কথা।

আনে না মানে, আনতে পারে না। মিসেস শেরউড-এর মতে এসব মানুষ যে দেশে ফিরতে পারে না, তার কারণ খুবই স্পষ্ট। তিনি বলেন—এ ব্যাপারে বেচারাদের প্রধান প্রতিবন্ধক ‘হিন্দু মেয়েরা এবং তাদের জলপাইরঙের ছেলেমেয়েগুলো। এদের জন্যেই প্রবাসী ইওরোপিয়ানদের হয় ঘরে ফিরবার ইচ্ছে নেই, কিংবা শক্তি নেই।’

তবে হ্যাঁ, কেউ কেউ যে একেবারে না ফিরতেন, তা নয়। এ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আভাস পাওয়া যাবে ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ (১৮০৩) প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন থেকে। বিজ্ঞাপনটির মর্ম: তালতলা বাজারের কাছে জমি সমেত একটি মস্ত বাগানবাড়ি বিক্রি হচ্ছে। বিজ্ঞাপনদাতা জানাচ্ছেন, বাড়িটি ক্রেতাদের পক্ষে খুবই ‘ডিজায়ারেবল পারচেজ’ হবে। কেন না, ওই একই দামে সেখানে তিনি একটি ‘হিন্দুস্থানি ফিমেল ফ্রেন্ড’-ও পাবেন। বলা বাহুল্য, আজ যিনি বাড়ি বিক্রি করে স্বদেশে ফিরে চলেছেন, এই হিন্দুস্থানি মেয়েটি তারই ‘বান্ধবী’।

এ ধরনের বান্ধবী নিয়ে ঘর করা কলকাতায় তখন চলতি রেওয়াজ। চার্লস ডি ওলি’র কবিতার নায়ক ‘কুই হাই’-ও (Qui Hi) তাই করে। কিন্তু তাই নিয়ে সাহেবপাড়ায় নানা কানাঘুষো। মিস ইন্ডোগো যখন খবরটা শুনলেন, তখন তিনি মূর্ছা যান আর কি।

‘Oh heaven ‘Exclaimed Miss Indigo

And could he then used me so?

And with a black one too connected-?’

‘কুই হাই’ কিন্তু বিন্দুমাত্র দমলেন না। তার সংসার সংসারের রীতিতেই জমজমাটি হয়ে উঠল। ‘কুই হাই’ পিতা হলেন।

‘A precious precedent begun

A mistress first, and then a son.’

বলা যেতে পারে, এগুলো অসামাজিক কাহিনী। গলিপথের গল্প। কিন্তু হেস্টিংস-এর বিশিষ্ট বন্ধু কর্নেল পিয়ার্স সাহেব যে আনুষ্ঠানিকভাবেই পান্না বেগমকে বিয়ে করেছিলেন, তা গল্প নয়, ঘটনা। আজীবন নিষ্ঠাবান স্বামীর মতো এই পারসিক মেয়েটিকে নিয়ে ঘর করেছিলেন পিয়ার্স। একটি ছেলেও হয়েছিল ওদের। নাম তার মিঃ টমি। মা বললেন এ নাম আমার পছন্দ নয়। ফলে ছেলে যখন ‘হ্যারো’তে গেল পড়তে, তখন খাতায় নাম লেখা হল তার মহম্মদ।

কাহিনী আর বাড়িয়ে লাভ নেই। সাহেবদের অসবর্ণে মতি ইতিহাসের ঘটনা। ইতিহাস যত্রতত্র বলে তখনকার কলকাতায় বড় মানুষদের ঘরে, ছোট মানুষদের বস্তিতে মাঝে মাঝে আবির্ভূত হতেন সাদা মানুষেরা। অসবর্ণের প্রস্তাব তাঁদের চোখে। চা-বাগানে, নীলকুঠিতে, কয়লাখনিতে সর্বত্র প্রায় দুটো শতক ধরে চলেছে তাঁদের আনাগোনা। তাঁদের কারও আপত্তি ছিল না অসবর্ণে।

অসবর্ণের এটাই একাদশ পরিস্থিতি। লন্ডনের গলিপথে দরিদ্র ব্রজেন হরিহর কিংবা আত্মারাম এই পরিস্থিতিতে পড়েই কি আজ দাঙ্গার কারণ, কিংবা রোববারের কাগজে কাগজে ‘ফর্সা এবং সুন্দরী’র সন্ধানে ব্যর্থ হয়েই তাদের এই বেপরোয়া জীবন, এ নিয়ে আমার সংশয় থাকলেও গার্ডনার-চার্নক কির্কপ্যাট্রিকের উত্তরপুরুষ নটিংহামের ‘টডিবয়দের’ তা নিয়ে দ্বন্দ্ব লাগার কোনও কারণ নেই।

কালীঘাটের বিয়ে

আমি যদি বলি আমি কালীঘাটে বিয়ে করেছি, তবে আমার স্ত্রী আপনাদের সামনে এমনভাবে হো-হো করে হেসে উঠবেন, যেন আমি একজন মস্ত গল্পবলিয়ে। কিন্তু আমি যদি বলি আমার এক বন্ধু কালীঘাটে বিয়ে করেছেন, তা হলে তিনি এমনভাবে মুখচোখ পেতে নড়েচড়ে বসবেন, যেন সে কাহিনীটা এক্ষুনি তাঁর না শুনলেই নয়।

অথচ আপনাদের মতো তিনিও নিশ্চয় জানেন, এ বিষয়ে শোনবার মতো সত্যিকারের মজাদার কোনও কাহিনী কালীঘাটের তহবিলে কিছু নেই। তা বুড়ো বর আর কনে বউ-ই হোক, কিংবা থার্ড ইয়ারের মেয়ে আর ম্যাট্রিক-ফেল ছেলেই হোক। এমনকী, ফলবতী কন্যা আর স্থিরমূর্তি সমাজসেবী হলেও কালীঘাটের পক্ষে তা কোনও কাহিনী নয়। কারণ, কাহিনী বলতে আপনারা পাঁচজনে সাধারণত যা ভাবেন, তা যদি কিছু থেকেও থাকে, তবে তা পড়ে থাকে সেই টালার গলিতে, ধর্মতলার রেস্তোরাঁয়, ঢাকুরিয়া লেনের আনাচে কানাচে কিংবা আর আর সম্ভাব্য পাঁচ জায়গায়, যেখানে চিরকাল গল্পরা সব জন্মায়, বড় হয়। কালীঘাটের ট্রাম স্টপেজ-এ তার কোনও-কোনওটা কখনও কখনও কিছুক্ষণের জন্য ছিটকে এসে দাঁড়ায় সত্য, কিন্তু সে কখনও পুরো গল্প নয়। গল্পের শেষ একটি কি দুটি লাইন মাত্র। হয়তো এটিও শেষ লাইন নয়, ছাপাখানার খাপছাড়া কপির মতো আপাতত শেষ মাত্র। তার আগে যেমন আরও ছিল, পরেও তেমনি আরও আছে। কিন্তু কালীঘাটের ম্যারেজ রেজিস্ট্রার তা শুনতে চান না, ভাবতে চান না। তার শুধু এক কথা: ‘ডালি কত’র হবে? পাঁচ আনার না পাঁচ সিকের?’

রেগে গিয়ে বললাম, ‘পাঁচ টাকার।’

লোকটা থমকে দাঁড়াল। আরশোলার দিকে ত্রস্ত পায়ে এগুতে এগুতে টিকটিকি হঠাৎ যেমনি থমকে দাঁড়ায়, তেমনি। তারপর একটা আশ্চর্য বিচক্ষণতায় আমার দিকে কানটা বাড়িয়ে দিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘পাত্রী কোথায়?’

এতটার জন্যে তৈরি ছিলাম না। ভাল করে তাকালাম লোকটির দিকে। হাড্ডিসার দেহে ব্রাহ্মণের রং। জায়গায় জায়গায় তামাটে হয়ে গেছে সত্য তবুও রংটা যে পাকা তাতে সন্দেহ নেই। গর্তে-বসা দুটি কটা চোখ। দুটি চোখই যেন নকল। তাতে কোনও জিজ্ঞাসা নেই। কোনও স্পৃহা আছে বলেও তো মনে হয় না। এ যেন পাকা মুদিওয়ালার মামুলি জিজ্ঞাসা—কত দেব? এক পো, না এক সের? যেন, পাঁচ সিকের ডালি আর পনেরো বছরের একটি পাত্রী এক জিনিস। লোকটার উপর মুহূর্তে আস্থা জন্মে গেল আমার। এ আমাদের সরকারি প্রজাপতি আপিসের সেই লোকগুলোর মতো নয়। যতবার ওদের দেখেছি, ততবারই আমার ভীষণ সন্দিগ্ধমনা মনে হয়েছে ওদের। বড্ড বেশি জানতে চান ওঁরা। এমনকী, চোখ-মুখগুলো পর্যন্ত যেন পড়তে চায়। যেন বিয়ে দেওয়া নয়, কোনওমতে বিয়েটা ভেঙে দেওয়াই ওদের কাজ, কর্তব্য। অথচ আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে যে লোকটি, সে কত সংক্ষিপ্ত, সরল।

বললাম, ‘পাত্র এবং পাত্রী’ দুই-ই আছে। ব্যবস্থা হলেই নেমে আসবে গাড়ি থেকে।

ম্যারেজ রেজিস্ট্রার কিন্তু জানতে চাইলেন না, গাড়িটা ঘোড়ার গাড়ি না মোটর। মোটর হলে নিজেদের, না ভাড়া করা। তিনি আমাকে চোখের ইশারায় ডাকলেন। তারপর নিঃশব্দে এগিয়ে চললেন। তার পিছু-পিছু একটা ঘরে এসে দাঁড়ালাম। মাটির ঘর। দেওয়াল, মেঝে, সব মাটির। দেখে মনে হয় শোবার ঘর। রাত্রে কেউ হয়তো ঘুমোয়। হয়তো কোনও যাত্রী, হয়তো আমাদের রেজিস্ট্রার নিজেই। এক কোণে একটা মাদুর এবং গোটা দুই বালিশ জড়ানো। দরজায় দাঁড়িয়ে ভাল করে চারপাশটা দেখে নিলাম একবার। এই ঘরটার পিঠোপিঠি সামনের ঘরটায় দোকান, পিছনে এবং চারপাশে আরও ঘর। এমনই ছোট ছোট, এমনই নিস্তব্ধ।

বর-কনে ঘরে এসে বসলেন। কী করে খবরাখবর হল কলকেত্তাশ্বরীই জানেন, রেজিস্ট্রার ঠাকুরের একটি সহকারিণী এসে জুটলেন। তিনিও তাঁর ওপরওয়ালার মতোই প্রায় নির্বাক। তেমনই গম্ভীর, তেমনই রহস্যময়ী। মহিলাটিই দুটো মালা নিয়ে এলেন এবং অন্যান্য উপচার। দেখলেই বোঝা যায়, আরও অনেক বিয়েতে ডিউটি দিয়েছে জিনিসগুলো। তা দিক। কিন্তু ওদের চালচলনটা হঠাৎ কেমন অতিরিক্ত ধীর ঠেকল আমার কাছে। তবে কি বর কনেকে ওঁরা বোঝাতে চান, যে এ বিয়েও বরাবরের সেই বিয়ের মতোই। আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, ‘ঠাকুর, তাড়াতাড়ি’।

রেজিস্ট্রার উত্তর দিলেন, যে আজ্ঞে।

এর পর দশ মিনিটও লাগল না বোধ হয়। ঠাকুর বললেন, ‘ডালি নিয়ে আসি, মাকে দেখে যাবেন চলুন।’ বোঝা গেল অনুষ্ঠান সমাপ্ত।

একটা দশ টাকার নোট পকেট থেকে বের করে দিয়ে পাত্র ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। নাঃ, তার আর দরকার নেই।

এবার সহকারী মেয়েটির পালা। সে হাত পেতে দাঁড়াল, ‘শুভ কাজ’ শেষ হল, আমাকে কিছু দেবে না বাবা?

আরও একটা টাকা খরচ হল। মোট এগারো টাকা। দরদাম কিছু হল না, পাঁজিপুঁথি ঘাঁটাঘাঁটি করতে হল না, কুষ্ঠি-ঠিকুজির বিচার-ব্যাখ্যান কিছু দরকার হল না—নিঃশব্দে বিয়ে হয়ে গেল একটি ছেলের এবং একটি মেয়ের। সময় লাগল মাত্র মিনিট কয়েক, টাকা এগারোটি। ইচ্ছে করলে আরও বেশি দেওয়া যেত অবশ্য। কিন্তু ইকনমিক্স-পড়া বন্ধু বললেন—সেটা অপচয় হত মাত্র।

‘ইচ্ছে করলে আরও কমেও চালাতে পারতে তুমি।’ আমি বললাম।

‘এর চেয়ে কমে বিয়ে হলেও, করা ঠিক নয়।’ হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন নববিবাহিতা বন্ধুপত্নী।

বর কনেকে একটা বাসে তুলে দিলাম। এবার ওরা স্বামী-স্ত্রী। আর কেউ মানে বা না মানে, এই মুহূর্ত থেকে ওরা অন্তত তাই জানে। অবাক লাগছিল ভাবতে। ওদের জীবনের ছোট একটা গল্প ক’ মিনিটে কেমন আশ্চর্যভাবে আমার চোখের সামনেই একটা বড় গল্পের মোড় নিয়ে হাসতে হাসতে বাসে চেপে বসল। জাগ্রত কালী, কলকাতা শহর, রাশি রাশি মানুষ, ট্রাম, বাস কেউ জানলও না। কালীঘাটকে মনে মনে বড় ভাল লাগল আমার। কালীঘাটের ইতিহাস আমি জানি। কালী-মাহাত্ম্যের নানা কাহিনীও আমার মুখস্থ। কিন্তু এ যেন এই ঐতিহাসিক পীঠটির এক নতুন পরিচয়। এখানে বিবাহিত মেয়েরা কুমারী হয় শুনেছি। নিজের চোখে দেখেছি, শিশু অশোকের ডালে রাশি রাশি মাটির ঢেলা ঝোলে এখানে। কালীঘাট বন্ধ্যা নারীকে নাকি পুষ্পবতী করে। কিন্তু কালীঘাট দুটো মানুষের বে-আইনি গোপন বাসনাকে এক মুহূর্তে খুশির আতরে চুবিয়ে এমন শাহানশা বানিয়ে ছেড়ে দিতে পারে, এ নিজের চোখে না দেখলে কোনও দিন বিশ্বাস করতে পারতাম না আমি। এই কলকাতা শহরে অন্তত এমন একটা জায়গা আছে তা হলে, যেখানে দিকে দিকে পেনালটির দাগ কাটা নেই, রেফারির শাসন নেই এবং সামাজিক নিয়মেরা মুহুর্মুহু যেখানে নিষেধের বাঁশি বাজায় না। বাজালেও, কেউ শোনে না। কালীঘাটে কড়া সরকারি আইনকে গোঁফচাড়া দিয়ে, কিছুক্ষণের জন্যে হলেও অপেক্ষা করতে হয় সেই মেটে ঘরটির দাওয়ায়। ঘরে ঢুকতে সাহস হয় না তার। অথবা, ইচ্ছে। নেহাত যদি কোনও বেপরোয়া পিতৃপক্ষ পুলিশ কাছারির হাত ধরে ঢুকেও পড়েন সেখানে, তা হলেও একবারের জন্যে হলেও নিশ্চয় থমকে দাঁড়াতে হবে তাঁকে। কেন না, স্থানটি কালীঘাট। অর্থাৎ দেবভূমি। এবং দশটি টাকা নিলেও, যে হাত সিঁদুর পরিয়েছে কুমারী মেয়ের কপালে, তিনি মাইনে করা রেজিস্ট্রার নন, পুরোহিত ব্রাহ্মণ।

সুতরাং বে-আইনি হলেও মা কালীর ভারে আর পাণ্ডা পুরোহিতদের ধারে দিব্যি আছে কালীঘাট তার ম্যারেজ আপিস নিয়ে। চিরকাল তাই ছিল। দরকার হলে চিরকাল তাই থাকবেও।

আদি গঙ্গার ধারে আজকের এই কালীঘাট তার ম্যারেজ রেজিস্ট্রারদের নিয়ে বরাবর হয়তো ছিল না। থাকলেও, এমন জমজমাটি কারবার নিশ্চয় ছিল না তাদের। কিন্তু অসামাজিকতার তীর্থ কোনও-না-কোনও কালীঘাট পৃথিবীর হেন দেশ নেই যেখানে না ছিল। এমনকী, ছিল আজকের তথাকথিত সিভিল ম্যারেজ-এর পীঠভূমি খাস বিলেতেও। তার নাম ‘গ্রেটনা গ্রিন’। ইতিহাস বলে, উনিশ শতক অবধিও এই ‘গ্রেটনা’ ছিল গোটা ইংলন্ডের কালীঘাট।

গ্রেটনা জায়গাটা ইংলন্ড আর স্কটল্যান্ডের সীমানায়। ভূগোলে এবং আইনে তখন স্কটল্যান্ডের অধিকার ছিল তার ওপর। ফলে ইংলিশ চার্চের খারিজ করা পাত্র-পাত্রীরা সব ছুটতেন ওখানে। ঠিক যেমন আজ শহরতলি এবং মফস্বল শহরের অসামাজিকেরা ছুটে আসেন এখানে, কালীঘাটে। কালীঘাটের মন্দিরের মতো গ্রেটনায় চার্চ ছিল একটা। তবে পাকা খ্রিস্টানদের মতে ঈশ্বর রাত-বেরাতে কখনও থাকতেন না সেখানে। কেন না, চাৰ্চটা ছিল নন-অফিসিয়াল। সেদিক থেকে আমাদের কালীঘাট নিশ্চয় যোগ্য ‘অথরিটি’। অবশ্য রেজিস্ট্রার পাদরি পুরোহিতেরা দুই জায়গায়ই প্রায় সমশ্রেণীর। এদের মধ্যে কুল-বিচারে কে বড় কে ছোট, সে বিচার বড় কঠিন। শোনা যায়, গ্রেটনায় যারা পাদরি সেজে সারমন ঝাড়তেন, তাদের পনেরো আনাই ছিলেন আশপাশের গাঁয়ের চাষা-ভুষো, জেলে, কামার। কালীঘাট সম্পর্কে যা শোনা যায়, তা এখানে না বলাই বোধহয় ভাল। গ্রেটনার চার্চ ছিল কালীঘাটেরই মতো। অর্থাৎ যে যেমন দেয়। লর্ড চ্যান্সেলার এরিস্কিন সাহেব নাকি দিয়েছিলেন কুড়ি পাউন্ড এবং লন্ডনের এক গরিব শ্রমিক মাত্র এক পেগ হুইস্কি। তা হলেও, কালীঘাটের মতো গ্রেটনায় গরিবদের ভিড় হত কম। কারণ জায়গাটা আর-আর জায়গা থেকে অনেক দূরে। যেতে দিনকয়েকের মামলা। এত পথ হেঁটে যাওয়ার মতো উৎসাহী পাত্রী মেলে দৈবাৎ। তার ওপর ভেগে পড়লে অভিভাবকদের খোঁজাখুঁজির সুযোগও বেশি। এ তো আর এমন নয় যে, স্কুলের টিফিন আওয়ারে সিঁদুরের টিপ লাগিয়ে ফেরা যায় অথবা ইভিনিং শো’র টিকিট নষ্ট করে। সুতরাং, বিশেষ করে তাঁরাই গ্রেটনা ছুটতেন, যাঁরা চার ঘোড়ার গাড়ি হাঁকিয়ে মাইলের পর মাইল চলতে পারতেন। এবং তৎসত্ত্বেও ট্যাঁকে যাদের বিন্দুমাত্র ঝাঁকি লাগত না কখনও। যেমন লর্ড ওয়েস্টমুরল্যান্ড। এই স্বনামধন্য লর্ডটির গ্রেটনা অভিযান এক রোমাঞ্চকর কাহিনী।

ভদ্রলোক পালিয়েছিলেন লন্ডনের এক বিখ্যাত ব্যাংকারের একমাত্র কন্যাকে নিয়ে। সেয়ানে সেয়ানে ব্যাপার। সুতরাং মাইল কয়েক পরমানন্দে গাড়ি হাঁকিয়ে চলার পরেই লর্ড সাহেবের নজরে পড়ল আরও একখানা চারঘোড়ার গাড়ি আসছে তাঁর পিছু পিছু। দূরবিনটা চোখে লাগাতেই স্পষ্ট বোঝা গেল, কোচম্যানদের যিনি হাত-পা নেড়ে আরও জোরে চালাবার হুকুম দিচ্ছেন—তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং তাঁর ভাবী শ্বশুরমশাই। সুতরাং, এবার গাড়ির বেগ আরও বাড়িয়ে দিতে হল লর্ডকে। দুই গাড়িতে শুরু হল এবার রেস। ছুটতে ছুটতে গ্রেটনা কাছে এসে গেছে। মাত্র আর ঘণ্টাকয়েকের পথ। এমন সময় হঠাৎ লর্ডের গাড়ির একটা ঘোড়া পড়ে গেল। পিছন থেকে বন্দুকের গুলিতে গাড়ি থামাতে চাইছেন বেপরোয়া ব্যাংকার। কিন্তু ওয়েস্টমুরল্যান্ডও আজ বেপরোয়া। তিনি তিন ঘোড়াতেই চললেন। শেষে ঘোড়া কমতে কমতে একটায় এসে যখন ঠেকল, তখন অবাক হয়ে ব্যাংকার দেখলেন, তিনি সীমানার এপারে দাঁড়িয়ে।

গ্রেটনায় আরও একটা ব্যবস্থা ছিল। তা বিয়ের পর হানিমুনের ব্যবস্থা। চার্চের গায়েই নাকি ছিল সারি সারি ঘর। নববিবাহিত দম্পতিরা ইচ্ছে করলেই পয়সা দিয়ে ব্যবহার করতে পারতেন সেগুলো। এই ঘরগুলোকে বলা হত ‘নেপচুয়াল চেম্বার’। ব্যবস্থাপকরা নিজেরা বলে গেছেন—এই চেম্বারগুলোর উদ্দেশ্য আর কিছু নয়, বিয়ের ভিতটাকে একটু মজবুত করা মাত্র। গ্রেটনা বে-আইনি কারবার। সুতরাং, তাকে আঁটঘাট বেঁধে চলতে হবে বইকি। কেন না, যদি বা লন্ডনবাসী কোনও পিতা অস্বীকারও করেন গ্রেটনাকে, নেপচুয়াল চেম্বারকে অস্বীকার করার মূঢ়তা তাঁদের হবে না নিশ্চয়। যুক্তিটার মধ্যে যথেষ্ট ব্যবসায়িক বুদ্ধি সুস্পষ্ট। আমার ধারণা, আমাদের কালীঘাটের রেজিস্ট্রার ঠাকুররাও একেবারে বুদ্ধিরহিত ঠনঠনে ঘট মাত্র নন। তবে কি কালীঘাটের সেই মেটে ঘরটি এবং চারপাশের আরও আরও খালি ঘরগুলোও একই উদ্দেশ্যে সাজিয়ে রেখেছেন তাঁরা?

সে খবর যাচাই করার ভার পেট্রনদের ওপর রইল। আমি বরং ততক্ষণে আর দুটো কালীঘাটের খবর বলি।

এ দুটিই আমাদের দেশি কালীঘাটের। তবে হিন্দুদের জন্যে নয়। একটি ছিল পর্তুগিজদের জন্যে, অন্যটি ইংরেজদের জন্যে। ওদেরও এদেশে এসে আমাদের মতো কালীঘাটের দরকার পড়ত কেন নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন তা। ভারতবর্ষ শুধু বিদেশ নয়, বহু দূরের দেশ। এখানে সপরিবার আসা মানে, হাত-পা সম্বল করে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়া। ইউরোপীয়রা তাই প্রথম প্রথম লোটাকম্বল নিয়ে সিঙ্গলই আসতেন। আসতেন, কিন্তু থাকতে পারতেন না। প্রথম পথ দেখাল পর্তুগিজরা। তারা পুরানো খ্রিস্টান। তাই জাতের বাছবিচার তাদের মধ্যে কম। ফলে এদেশে পা দিয়েই তারা দেশি মেয়েদের নিয়ে ঘরকন্না শুরু করে দিল। দেখাদেখি ডাচরাও হিন্দুস্থানে রুচি ফিরে পেল। কিন্তু দাঁত কিড়মিড় করে পড়ে রইল ডেনরা আর ইংরেজরা। তাদের জন্যে সাপ্লাই আসত দেশ থেকে। কিন্তু সাপ্লাই-এর চেয়ে ভারতবর্ষে ডিমান্ড তখন বেশি। সুতরাং কর্তৃপক্ষকে রীতিনীতি শিথিল করতে হল কিছু কিছু। যেমন সার্জেন্টের চেয়েও নিচু পদে যারা কাজ করে, তারা ইচ্ছে করলে পর্তুগিজ-পস্থা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সার্জেন্টের চেয়ে উঁচুতে যারা, তারা? বাধ্য হয়েই কালীঘাটের পথ ধরতে হল তাদের। অর্থাৎ, গির্জার পথ।

ডালহৌসির সেন্ট জন চার্চ কলকাতার ইংরেজদের পুরানো গির্জা। কলকাতার খ্রিস্টানদের এটিই আদি কালীঘাট। দেশ থেকে কোনও জাহাজ আসছে এবং সে জাহাজে কিছু অবিবাহিতা যাত্রী আছে শোনার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যেত, গির্জার চারপাশে বাঁশ খাটানো হয়েছে। এবার ঝাড়পোছ করে রং লাগানো হবে। এদিকে শিকারিরা সব বাক্স, তোরঙ্গে ভাল-মন্দ যা ছিল চাপিয়ে, চাঁদপাল ঘাটে আনাগোনা শুরু করে দিয়েছেন। উপস্থিত, জাহাজটা ঠিক কবে নাগাত পৌছবে, এটাই তাঁদের জ্ঞাতব্য। যদি শোনা গেল শুক্রবার তবে সবাই দম ধরে কোনওমতে পড়ে রইলেন কবে রোববার ভোর হবে তারই অপেক্ষায়। কারণ, জাহাজঘাটায় হামলা না করে চার্চের দিনটি অবধি সবুর সইতে পারলেই মেওয়া ফলবার বেশি সম্ভাবনা।

রোববার চার্চ লোকে লোকারণ্য। সিভিলিয়ান, মিলিটারি, ব্যবসায়ী, ভবঘুরে—যেখানে যত অকৃতদার ছিল সবাই এসে হাজির। কেউ মোগলাই কায়দায় গোঁফে আতর দিয়ে এসেছেন, কেউ চুলে কলপ। এক-এক করে মেয়েরা আসছেন। আসার সঙ্গে সঙ্গেই তার হাত নিয়ে কর্নেল আর সাব-অলটার্নে কাড়াকাড়ি। কে তাকে আগে হাত ধরে আসনে বসিয়ে আসবেন তাই নিয়ে বিবাদ। মেয়েদের হাত ধরে আসন অবধি পৌঁছানোটাই ছিল সেকালের কলকাতায় চলতি রেওয়াজ। আরও একটা অদ্ভুত রেওয়াজ ছিল তখন সেন্ট জন চার্চে। মেয়েদের মুখোমুখি বসতে হত পুরুষদের। ফলে, চার্চ ভাঙলেও দেখা যেত এখানে-ওখানে টুকরো ভিড় জমে গেছে। এবং রেট চড়িয়ে জোড়াপিছু পঞ্চাশটি করে মোহর গুনেও মক্কেলদের সাফ করতে পারছেন না পাদরি সাহেব। একদিনে আর ক’টা বিয়ে করাতে পারেন তিনি? সোফিয়া গোল্ডবার্ন নামে এক মহিলা একবার উপস্থিত ছিলেন সেন্ট জন চার্চে, এমনি একটি পরবের দিনে। কাণ্ড দেখে তিনি অবাক। দেশ থেকে ভবিষ্যতে যারা কলকাতায় আসতে পারে, তাদের সাবধান করে তিনি লিখছেন—‘খবরদার, কলকাতা সম্বন্ধে হুঁশিয়ার। জীবনের যে-কোনও সন্ধ্যায় এখানে সামান্য অসতর্কতায় তোমার সম্মতিটুকু লুঠ হয়ে যেতে পারে। ভাল করে ব্যাপারটা বুঝবার বা পিছু হঠবার আগেই দেখবে মহামান্য পাদরি এসে দাঁড়িয়েছেন তোমার সামনে। শুভকার্যের মজুরি হিসেবে গোটা কুড়ি মোহর চান তিনি।’ খ্রিস্টানি কালীঘাটের এই পাদরিরা কিন্তু আমাদের রেজিস্ট্রার ঠাকুরদের মতো ছিলেন না। তাদের আদবকায়দা, চালচলন সবই ছিল একটু ভিন্ন ধরনের। মানুষ হিসেবে তাঁরা যেমন মোটাসোটা ছিলেন অনেক ইংরেজ লেখকই স্বীকার করেছেন, বুদ্ধিতেও তেমনই। একটু উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারবেন সে-তুলনায় আমাদের কালীঘাটের মাথা কত পরিষ্কার।

বিশপ হিবার সবে কলকাতায় নামছেন। বামুনেরা শুনলেন, এবার একজন বাঘা পাদরি নামছেন কলকাতায়। এক গন্ডূষে হিন্দুধর্ম নাকি গিলে ফেলবেন তিনি। শুনে কালীঘাট ঘাবড়ে গেল একটু। সব বামুনেরা মিলে একজনকে চর করে পাঠিয়ে দিলেন চাঁদপাল ঘাটে। পাদরিটি সত্যি সত্যিই কেমন সরেজমিনে একটু দেখে আসতে। হাড্ডিসার সেই যজমেনে বামুন দূর থেকে তাকিয়ে দেখে নিলেন হিবার সাহেবকে। সুপুরুষ ইয়া উঁচু, রাজার মতো চেহারা। আগে না জানলে হয়তো, রাজাই ঠাওরাতে হত ওঁকে। এক নিশ্বাসে তিনি ছুটে চলে এলেন কালীঘাটে। সবাই ছেঁকে ধরলেন। কী ব্যাপার? কী দেখলে ভায়া?

বামুন ধীরে ধীরে বললেন, আর যাই কপালে থাকুক ভাই, আজ যে সাহেব এসেছেন, তাঁর থেকে অন্তত হিন্দুধর্মের কোনও অমঙ্গলের আশঙ্কা নেই।

পাদরিরা রাজার হালে থাকতেন। বছর বছর মাইনে বাড়ত তাঁদের, বাড়িতে বিয়ের দক্ষিণা, শ্রাদ্ধ শান্তির ফি ইত্যাদিও। কিন্তু তা হলেও চার্চের কাজে কিছুতেই যেন মন বসতে চাইত না ওঁদের। ম্যাকরাবি সাহেব লিখেছেন: কলকাতার একজন পাদরি শিকারে অতুলনীয়, অন্যজনের ব্যবসা সৈন্যবাহিনীতে বলদ সাপ্লাই করা এবং তৃতীয়জনের নেশা চিনা কায়দায় বাগান করা। কারও কারও নেশা ছিল জুয়া খেলা। এমনও নাকি ঘটত যে, কাউকে কবর দিতে হলে পাদরিকে ধরে আনতে হত জুয়ার আড্ডা থেকে। তা ছাড়া, তাদের কারও কারও অন্য গুণও ছিল। ব্যারিস্টার হিকি সাহেব লিখেছেন ব্রান্ট নামে সেনাবাহিনীর একজন পাদরি ছিলেন কলকাতায়। মদ খেয়ে নেচে-কুঁদে তিনি এক-একদিন দেখবার মতো দৃশ্য সৃষ্টি করতেন চার্চে। সুতরাং, এহেন পাদরিদের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার ‘ইংরেজি কালীঘাট’ যে সেদিন কেমন জমেছিল, সহজেই তা অনুমেয়।

এমনই হুবহু কারবার তখন সেখানে যে, কলকাতার বাবুদের সুপ্ত বাসনাটি পর্যন্ত দাউ দাউ করে জ্বলে উঠত তা দেখে। কেন না, আমাদের কালীঘাট তখনও ম্যারেজ আপিস খোলেনি। বাবুরা তাই সেজেগুজে চার্চের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতেন। অন্তত নীচের সমসাময়িক হিন্দুস্থানি ছড়াটির তাই রিপোর্ট।

‘কৈ গির্জায়ে যাত বাত শিখনে কে কারণ

কৈ গির্জামে যাত বাত শিখনে উচ্চারণ

কৈ গির্জামে যাত যৈ সে সুন্দর নারী

কৈ গির্জামে যাত দেখরণ সুরত প্যারি’ ইত্যাদি

সমসাময়িক রিপোর্ট অনুযায়ী ‘পর্তুগিজদের কালীঘাটটির’ খবর আরও লোমহর্ষক। শেষ করার আগে আমাদের কালীঘাট-পেট্রনদের সে খবরই পরিবেশন করছি কিছু। কারণ, এতে তাদের কলজেয় বলবৃদ্ধির সম্ভাবনা।

পর্তুগিজদের কালীঘাটটি ছিল কলকাতা থেকে মাইল কুড়ি দূরে, ব্যান্ডেলে। ব্যান্ডেলের গির্জা গোটা বাংলাদেশে একটা পুরানো গির্জা। এর প্রতিষ্ঠা ১৫৯৯ সালে। অর্থাৎ চার্নক সাহেবের সুতানুটিতে নামারও এক শো বছর আগে।

রেভারেন্ড লঙ সাহেব লিখেছেন—ব্যান্ডেলের গির্জার সঙ্গে নাকি ‘নানারি’ ছিল একটা। সুন্দরী এবং কমবয়েসী সব খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনীরা বাস করতেন সেখানে। তাঁরা সবাই হয়তো জাতে পর্তুগিজ ছিলেন না, হয়তো ইউরোপিয়ানও না। তবুও তো খ্রিস্টান। ফলে যেখানে যত খ্রিস্টান ছিলেন তাঁরা সুযোগ পেলেই ছুটে আসতেন এখানে। ক্যাপ্টেন হ্যামিলটন লিখেছেন—মেয়েদের নাকি যদৃচ্ছ পাত্রী হিসেবে কিনতে পাওয়া যেত সেখানে। (‘They have a church, where owners of such goods and merchandise are to be met with, and the buyer may be conducted to proper shops, where the commodities may be seen and felt, and a priest to be security for the soundness of the goods.’)

এসিয়াটিকাস নামে এক ছদ্মনামী সাহেব এ-সব শুনে ১৮০৩ সালে একবার গিয়েছিলেন ব্যান্ডেলে। কিন্তু হায়। তখন সব ফাঁকা। এসিয়াটিকাস খেদ করে লিখেছেন ‘Poverty now stalks over the ground where once beguiling priests led the weary stranger in the morning to the altar of God and in the evening to the chamber of riot, regardless of their Sacerdotal robes, here priests for gold were factors of pleasure! অর্থাৎ, যে ব্যান্ডেলে এককালে পাদরিরা ক্লান্ত পথিককে সকালে এনে দাঁড় করাতেন ঈশ্বরের বেদীর মুখোমুখি এবং সন্ধ্যায় যদৃচ্ছতার কক্ষে, আজ সেখানে চারদিকে দারিদ্রের পদচিহ্ন।

ইতিহাসের নিয়মে ব্যান্ডেল গরিব হয়ে গিয়েছে অনেকদিন। কিন্তু সামাজিক রীতিনীতির পিছনকার কারণগুলোর মৃত্যু হয়নি বোধহয় আজও। তাই এ যুগে আমাদের হয়ে জন্মেছে কালীঘাট। মনোমতো পাত্রীর টানাটানি আমাদের নেই, তাই কালীঘাট ব্যান্ডেল হচ্ছে না। মনের সঙ্গে রক্তের স্পিড মিলছে না, মেজাজের কড়াকড়িটুকু এখনও আছে, তাই কালীঘাটও আছে। তবে এও নিশ্চয় চিরকাল থাকবে না। গ্রেটনা গ্রিন, সেন্ট জন চার্চ বা ব্যান্ডেলের মতো কালীঘাটের রেজিস্ট্রার ঠাকুরও নিশ্চয় ইতিহাস হয়ে যাবেন একদিন। এবং সে-দিনটি যে খুব দূরবর্তী নয় সে খবরও আমি দিতে পারি আপনাদের। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না। আমার সেই কালীঘাটের বন্ধু-পত্নী আমায় বলেছেন মেটে ঘরের বিয়েটাকে হপ্তা-কয় হল রেজিষ্ট্রি করে নিয়েছেন তিনি। ‘বলা তো যায় না, আপনাদের পুরুষদের মন তো।’

বন্ধুও তাই-ই বলেন, ‘বলা যায় না, মেয়েদের মন তো।’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *