২০. পারাপার

২০. পারাপার 

আশির দশক। অক্টোবরের এক বিষণ্ণ অপরাহ্ণ বেলায় ভিক্টোরিয়া পার্কে কংক্রিটের বেঞ্চের উপর বসে ভাবছিলাম অনেক কথা। পার্কে তখন তেমন জনসমাগম ছিল না। বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কেউ বসে গল্প করছিল। কেউ কেউ বাদাম, চানাচুর ও এটা সেটা খাচ্ছিল। পার্কের এক গেট দিয়ে ঢুকে অন্য গেট দিয়ে কেউ কেউ হেঁটে বের হয়ে যাচ্ছিল। আমি একাকী বসে আনমনে একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছিলাম। ধূয়াগুলো উড়ে যাচ্ছিল সেদিনের ম্লান বাতাসে।

কুমু আজ চলে গেল। আজও ওকে খেয়া নৌকায় করে  বুড়িগঙ্গার ওপারে নামিয়ে দিয়ে এলাম। ওপারের ঘাট থেকে ওর কাছে থেকে যখন বিদায় নিয়ে চলে আসছিলাম, তখন কুমু আমার একটি  হাত টেনে ধরে। জল টলমল চোখে চেয়ে থেকে বলে- ‘কথা দাও, বেশি সিগারেট খাবে না। সময়মত খাবে। রাত জাগবে না। আমি চলে যাচ্ছি , তার মানে এই না- তোমার সাথে আর কখনও কোনও দিন দেখা হবে না! তুমি আমার বন্ধু। বন্ধু হয়েই থাকবে চিরকাল।’

কুমু ওয়াইজঘাটে একটি ললিতকলা একাডেমিতে গীটার বাজানো শিখত। আমিও শিখতাম। ওখানেই ওর সাথে পরিচয়। ও আসত বুড়িগঙ্গার ওপারে খেজুরবাগ থেকে। গীটারের তারে আঙুল ছোঁয়ার সময় চুপিচুপি ওকে দেখতাম। মেয়েটির গায়ের রং গৌরীয়। চন্দ্রমুখ। টিকালো নাক। মাথাভর্তি কার্ল কালো চুল। নয়নতারার মতো বিনম্র চোখ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রথম একদিন ওর সাথে কথা হলো। কথা বলতে বলতে দুজন দুজনকে জানলাম। তারপর দুজন বন্ধু হয়ে উঠি। 

গত একবছর প্রতি শুক্রবার শনিবার  ছুটির পরে ওয়াইজ ঘাট থেকে খেয়া নৌকায় কুমুর সাথে আমিও চলে যেতাম ওপারে। ওপারের ঘাটে  ওকে পৌঁছে দিয়ে আমি আবার ফিরে আসতাম এপারে। নদী পার হওয়ার সময় ওর সাথে আমার যত কথা হতো। নদী পারাপারের সময়ই ওর সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠি। নৌকায় পাটাতনের উপর  দুজন পাশাপাশি বসতাম। কথা বলতাম খুব কাছে থেকে। চুপচাপ বসে বসে দেখতাম নদীতে ভেসে যাওয়া অজস্র নৌকার সারি। দেখতাম জলের উপর আকাশের ছায়া। শুনতাম জলের কলধ্বনি।  

কত স্মৃতি মস্তিষ্কের শিরায় তোলপাড় করে। একবার নদী পার হওয়ার সময় হঠাৎ আকাশ মেঘে কালো হয়ে আসে। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামতে শুরু করে। ভিজে চুপসে যাচ্ছিলাম দুজনেই। আমার ফুসফুসে প্রদাহ ছিল। প্রায়ই খুসখুস করে কাশতাম। ওর সামনে সিগারেট খেতে পারতাম না। ঠোঁট থেকে সিগারেট কেড়ে নিয়ে ফেলে দিত। কুমু সেই বৃষ্টির সময় ওর বুকের খাঁজে আমার মাথা লুকিয়ে নিয়ে ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখে। যেন আমার ঠাণ্ডা না লাগে। কুমুকে সেই মুহূর্তে অপার্থিব সুন্দর লাগছিল। কিছু স্পর্শ একটুও পাপের মনে হয় না। কোনো অলৌকিক দেবীর পুণ্যের ছোঁয়ার মতো মনে হয়।

কুমুর একজন প্রেমিক ছিল। তারপরও ও মনে হয় আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। কেমন যেন জটিল মনে হতো অনেক কিছু। একবার সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে বুড়িগঙ্গার কূলে দাঁড়িয়ে কুমু আমাকে বলেছিল – মানুষের দেহমন কেন যে একটা হলো। দুটো কেন হলো না? দুটো হলে একটা তোমাকে দিয়ে দিতাম আর একটা আমার ভাবি স্বামীকে দিতাম।

আমি কৌতুকছলে বলেছিলাম – ‘তোমার যে একটা দেহ মন আছে সেটিই নাহয় আামাকে দিয়ে দাও।’

– তুমি এত ভালো ছেলে তোমাকে আমি ঠকাতে চাই না। কত মানুষ আছে শুধু আনন্দের জন্য মেয়েমানুষের শরীর খোঁজে। তুমি তো সেই রকম নও। শুধু আনন্দ করার জন্য যদি কখনও আমায় তোমার প্রয়োজন হয়, তবে তুমি আমাকে স্মরণ কোরো।

 – না, প্রয়োজন হবে না। আমি তোমাকে অনেক  ভালোবাসি কুমু। 

একবার ক্লাস ছুটির পর, আমি আর কুমু যাব নবাববাড়ির গেটে। কুমু কিছু কেনাকাটা করবে। ফুটপাতের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিলাম ইসলামপুর রোডের দিকে। দেখি – গঙ্গাজলির  কয়েকটি মেয়ে চোলি পরে সেজেগুজে আমাদের সামনে দিয়ে খিলখিল করে হাসতে হাসতে স্টার সিনেমা হলের দিকে চলে যাচ্ছে। আমি ওদেরকে দেখিয়ে কুমুকে বলি- পয়সা দিলে ওরা দেহের আনন্দ দেয়।’ কুমু বলছিল, তুমি কখনও ওদের দেহের আনন্দ নেবে না। আমার মাথার দিব্বি রইল। 

কুমুর সাথে আমার সম্পর্ক একসময় বন্ধু ও প্রেমিকার মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে রূপ নেয়। কিন্তু  চির আক্ষেপ- স্ত্রী আর সে হলো না।

আজ ছিল শেষ পারাপার। আমাদের গীটার শেখার কোর্স শেষ হয়ে গেছে আরও দুই দিন আগে। কুমু আর আসবে না একাডেমিতে। ওকে রেখে যখন নৌকায় উঠি, নৌকা যেন মাঝ নদীতে থেমে যাচ্ছিল। মাঝির বৈঠা যেন চলছিল না । 

নৈর্ব্যক্তিক মনে হচ্ছিল নদীর জল। কেমন যেন বিধুর লাগছিল নিজেকে। নদী পার হওয়ার সময় আর কখনও নামতে দেখব না সন্ধ্যা। দেখা হবে না অস্তবেলার লাল আবীর মাখা সূর্য। বুড়িগঙ্গার জল নীরবে ছলছল করবে। ভেঁপু বাজিয়ে লঞ্চ চলাচল করবে। ঢেউ উঠবে। ঢেউ ভাঙবে। ঢেউ মিলিয়ে যাবে।

****

পার্কের লোকজন আস্তে আস্তে কখন সবাই চলে গেছে জানি না। আমি তখনও সিগারেট খেয়েই  যাচ্ছিলাম। লাইটপোস্টের বাতির চারপাশে উইপোকা ভিনভিন করছিল। আধো আঁধারে একটা মধ্যবয়সী লোক আমার দিকে এগিয়ে আসে। কাছে এসে  বলে – ছোট ভাই তুমি কেমন আছ? 

– ভালো আছি। 

– মনে হয় তুমি ভালো নেই। অনেকক্ষণ ধরে তোমাকে আমি অনুসরণ করছি। তুমি একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছ। এত অল্প বয়স তোমার , তুমি নবীন। একদম তরুণ প্রাণ। শরীর খারাপ হয়ে যাবে! 

– খারাপ হবে না। এমনই খাচ্ছিলাম। 

– নাহ্, এমনই খাচ্ছ না। তোমাকে দেখে দেবদাসের মতো লাগছে।  তা, আমার সাথে একজায়গায় তুমি যাবে? 

– কোথায়? 

– জিন্দাবাহার তৃতীয় লেন। 

– ওখানে কে আছে?  

– লখনৌর বেগমজানের বংশদ্ভূত অপূর্ব সুন্দর  নাজমুন বাঈ। ভৈরবী রাগে গান ধরে সে ‘রসিয়া তোরি আখিয়ারে, জিয়া লাল চায়’ ঠুংরী ঠাটের গানের এ কলিতে জিন্দা বাহার গলির ওর জলসা কানায় কানায় ভরে উঠে।

আমি বললাম, টাকা দিতে হবে?  

– হুম।  টাকা দিতে হয়। 

লোকটাকে বললাম, আমি ছাত্র মানুষ। আমার কাছে  টাকা নেই। 

লোকটি হতাশ হয়ে চলে গেল।

আমি আরও একটি সিগারেট ধরাই৷ কুমুর কথা মনে পড়ল আবার। ও আমায় বলেছিল– ‘তুমি কখনও যদি দেহের আনন্দ চাও তবে আমার দেহ থেকে নিও। ঐসব মেয়েদের থেকে নেবে না।’

সেই সন্ধ্যারাতে পার্ক থেকে বেরিয়ে আসছিলাম নীরব পদচিহ্ন ফেলে। পায়ের নিচে কংক্রিট না ঘাস, না মাটি- বুঝতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম কেবল, আমার দিন কাটবে কুমুরও দিন কাটবে। যতদিন জীবন আছে ততদিন এই জীবন চলবেই। একটি ক্ষীণ আশা জাগিয়ে হাঁটছিলাম নিবিড় আলো আঁধারে- আর একবার কী দেখতে পাবো না কুমুকে সাথে নিয়ে নদীতে নৌকায় ভেসে সন্ধ্যার সূর্যাস্ত! ডানা ঝাপটে কুলায় ফিরে যাবে পাখি। অস্ত দিগন্তে মিলিয়ে যেত জীবনের সব অপ্রাপ্তির বেদনা চিহ্ন।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *