দশ
‘রাত ন’টা বেজে তেত্রিশ মিনিট।
বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তা ঘাটে তেমন একটা ট্রাফিক না থাকায় বেশ তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেলাম আমরা। সোডিয়াম বাতির আলোয় ভেজা রাস্তাগুলো জ্বলজ্বল করছে। গাড়ি থেকে নেমে সালেহীন সাহেবের বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই আমার বুকটা ধক করে উঠলো। পুরো বাড়িতে কোন আলো নেই। একটা টিমটিমে হলুদ বাতি সদোর দরজার উপর জ্বলছে। সেই আলোতে চিকচিক করছে ভেজা সাইনবোর্ডটা।
‘ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন’
আমি বাড়িটার দিকে তাকাকেই শরীর শিউরে উঠলো। মনে হলো আমার অনুভূতি ব্যক্ত করতেই মনসুর ভাই ভয় ধরা কন্ঠে বলে উঠলেন, ‘এ দেখছি পুরো ভুতুড়ে বাড়ি!’
‘বাড়িতে কেউ নেই নাকি?,’ বলে রাদিফ এমনভাবে আমার দিকে তাকালো যেন এই বাড়ির যাবতীয় খবরাখবর আমার নখদপর্ণে!
‘সালেহীন তো নেই,’ বললাম আমি, ‘তবে রবি থাকতে পারে। চল ভেতরে ঢুকে দেখি। ‘
বাইরের গেটটা খোলাই ছিলো। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। সামনের বড়সড় লনটা পেরিয়ে মূল বাড়ির গেইটের সামনে গিয়ে বেইল চাপলাম।
প্রায় চল্লিশ সেকেন্ড কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না। তারপর জানালা দিয়ে আলোর আভাস পাওয়া গেলো। কেউ একজন লিভিংরুমের বাতি জ্বেলেছে। দরজা খোলা হলো। রবি ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালো। খুব সম্ভবত চিনতে একটু সমস্যা হচ্ছে।
‘সৌধ ভাই! এতোদিন পর কি মনে করে?’
আমি হাসলাম, ‘সালেহীন ভাইয়ের সাথে দেখা করতে এসেছি।’
‘কিন্তু স্যার তো বাড়িতে নেই!’
‘ওহহো!,’ হতাশ হওয়ার কৃত্রিম ভাব করলাম আমি, ‘তাহলে পরে আসি। আমারই ভুল হয়েছে। আগে ফোন করা উচিত ছিলো!
‘না, না!.’ রবি তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো, ‘ আপনি ভেতরে আসেন। স্যার আর তিনদিন পরই এসে পড়বেন। সকালে ফোনে কথা হয়েছে,’ রবি আন্তরিক সুরে বললো, ‘আপনারা এক কাপ কফি অন্তত খেয়ে যান। সৌধ ভাই তো অনেক বছর পর এদিকে এলেন। না খাইয়ে আমি আজ ছাড়ছি না আপনাকে।’
‘বেশতো, বসলাম নাহয় কিছুক্ষণ। রবি কিন্তু চমৎকার কফি বানায়, ‘ রাদিফ আর মনসুর ভাই এর উদ্দেশ্যে বললাম, ‘না খেলে মিস করবেন।
‘তাহলে তো খেতেই হয়,’ মনসুর ভাই অমায়িক কন্ঠে বললেন।
‘আপনারা ভেতরে আসুন।’
রবি আমাদের লিভিং রুমে বসিয়ে কফি বানাতে ভেতরে গেলো। সে ঘর থেকে বের হওয়া মাত্রই ফিসফিস করে রাদিফকে বললাম, ‘কায়দা করে রহমান আলীর খোঁজ জানতে ভুল করিস না কিন্তু। আমি উপরে যাচ্ছি।’
‘বেস্ট অফ লাক ব্রো!’
আমি এক দৌড়ে উপরে চলে এলাম। উপরতলাটা একেবারে অন্ধকার। আমি ফোন বের করে টর্চ জ্বালোম। বেডরুম না স্টাডি, কোনটাতে আগে যাবো বুঝতে পারলাম না। মাথা পরিষ্কার ভাবে কাজ করছে না। সাথে ভয়টাও আবার জেঁকে বসতে শুরু করছে। মনে হতো লাগলো, আমার পেছনে হয়তো কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
কয়েকবার পেছনে ঘুরে তাকিয়ে নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
মাথা ঠান্ডা রাখো!
কোথা থেকে শুরু করা উচিত আমার? হাতে সময় খুবই কম। তেমন চিন্তা-ভাবনা না করেই স্টাডির দিকে এগোনো শুরু করলাম।
স্টাডিটা সাজানো গোছানো, একদম পরিপাটি। তারমানে সালেহীন আসলেই অনেকদিন বাড়িতে নেই। ওনার টেবিল উনি গুছিয়ে রাখতে পারে না কখনই।
কোত্থেকে শুরু করা উচিত?
এখানকার টেবিলে ড্রয়ার বলতে কিছু নেই। যদি কিছু লুকনোও থাকে তাহলে সেটা বই এর আলমারীতে থাকবে।
লুকনো কেন থাকবে? আমি কি চোরাই মাল খুঁজতে এসেছি? মনে মনে ভাবলাম আমি।
বুঝতে পারলাম, আমাকে যে কি খুঁজতে হবে সেটাই আমি এখনো জানি না। তারমানে খোঁজার পরিধি অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে।
ডায়েরি, চিঠি, ফটোগ্রাফ– শব্দগুলো মাথায় ভেসে এলো।
বুকশেলফে কোন ডায়েরি রাখা নেই, ভালো করে খুঁজে দেখলাম। বই এর ভেতরে অনেক কিছু লুকিয়ে রাখা যেতে পারে, কিন্তু সবগুলো নামিয়ে দেখার মত সময় আমার হাতে নেই।
কিছুই পাওয়া গেলো না।
দ্রুত পায়ে বেডরুমের দিকে রওনা হলাম আমি।
*
শালা এখনো আসছে না কেন!
মনে মনে ভাবলাম আমি। মনসুর ভাই শুকনো মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রাদিফ, আজ মনে হচ্ছে ধরা খাবো।’
রবি ট্রে থেকে তিন কাপ কফি আর চকোলেট কুকিস এর একটা জার এনে রাখলো টেবিলে। তারপর জিজ্ঞেস করলো, ‘সৌধ ভাইয়া কোথায়?
‘ওয়াশরুমে,’ আমি আর মনসুর ভাই একসাথে উত্তর দিকে বোকার মতন একজন আরেকজনের দিকে তাকালাম।
‘ও আচ্ছা, আপনারা তাহলে কফি শেষ করুন। আর কিছু কি লাগবে?’
‘না,’ মনসুর ভাই বললেন, ‘আচ্ছা তুমি নাকি বাগানের যত্ন নিতে পারো খুব ভালো করে? সৌধ বলেছিলো একবার।
‘মোটামুটি পারি আর কি,’ রবি হাসলো।
‘আমার বাগানের জন্য একটু দক্ষ কাউকে দরকার ছিলো। তুমি কি সময় দিতে পারবে?’
‘আসলে, এখানে আমার ফুল টাইম ডিউটি আমার পক্ষে সময় দেওয়া সম্ভব হবে না।’
‘ইমতিয়াজ অবশ্য রহমান আলী নামের একজনের কথা বলেছিলো …’ আমি নামটা নিয়ে রবির দিকে তাকালাম।
‘রহমান আলী? মানে রহমান চাচার কথা বলছেন? যিনি এ বাড়িতে আগে কাজ করতো?,’ রবি জানতে চাইলো।
‘আগে কাজ করতো কিনা জানি না, তবে ইমতিয়াজ ভাই বলেছিলেন উনিও খুব ভালো কাজ করেন।’
‘উনি সম্পর্কে আমার চাচা হন। বাগানের কাজ উনি ভালোই জানেন। কিন্তু এখন এসব করা ছেড়ে দিয়েছেন। গুলশান বাড্ডা লিংক রোডে ইমপ্রেস সুইটস নামে একটা মিষ্টির দোকান দিয়েছেন তিনি। তবে চাচার কাছে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। ওনার জানা শোনায় ভালো কাজ জানা মানুষ আছে।’
কেয়ারটেকার থেকে মিষ্টির দোকানের মালিক! বিশাল ঘাপলা আছে! মনে মনে ভাবলাম আমি।
*
বেডরুমটা ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। হৃদপিন্ড ধড়াস ধড়াস করে বাড়ি খাচ্ছে বুকের ভেতর। ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের ম্লান আলোয় কিছুই তেমন পরিষ্কার ভাবে দেখা যাচ্ছে না।
হাতের বামে তাকাতেই সালেহীনের ডিভিডি কালেকশনের আলমারিটা চোখে পড়লো। সেখানেই আমি শাহানার ছবিটা দেখেছিলাম।
ফটোগ্রাফ!
শব্দটা বিদ্যুতের ঝলকের মতো মাথায় আঘাত করলো।
শাহানা আর ইমতিয়াজ সালেহীনের ছবিটা আগের জায়গাতেই পাওয়া গেলো। কি আশ্চর্য! এই ছবিটা এখনো সরাননি তিনি! কিন্তু এটা কি কোন সূত্র? শাহানার নিখোঁজ হওয়ার সাথে এই ছবির কি আদৌ কোন সম্পর্ক আছে?
তারপরও ছবিটা পকেটে ঢোকালাম আমি। ডিভিডির আলমারিটা বন্ধ করে কি মনে করে একটা চেয়ার নিয়ে সেটার উপরের জায়গাটায় আলো ফেললাম। এক রত্তি ধুলো নেই কোথাও।
কিছুই নেই সেখানে। বেডসাইড টেবিলের পাশে একটা আইসক্রিমের বাটি দেখা গেলো। সেটা খুলতেই বেরিয়ে আলো অনেকগুলো চাবি।
কিসের চাবি এগেলো?
ভাগ্য সহায় হলো। প্রতিটা রিং এর এর সাথে স্কচটেপ দিয়ে লেবেল সাঁটানো আছে। আমি মনযোগ দিয়ে সবগুলো লেবেল দেখতে শুরু করলাম।
বেশ পুরানো একটা চাবিতে আমার নজর আটকালো। সেটার লেবেলে লেখা– এক্সট্রা– বেজমেন্ট।
বেজমেন্টের অতিরিক্ত চাবি! এ বাড়িতে পাতালঘর আছে তাহলে? কই সালেহীন ভাইতো কখনও কিছু বলেননি!
আমি চাবিটা পকেটে ঢোকানোর সাথে সাথেই ফোনটা হঠাৎ করে কেঁপে উঠলো। রাদিফের মিসকল। আর সময় নষ্ট করা উচিত হবে না।
নিঃশব্দে বেডরুম থেকে বের হলাম আমি। নিচে যেতে হবে দ্রুত!
*
লিভিংরুমে ঢুকেই দেখি তিনজন খোশগল্পে একদম মজে আছে। ভালোই সামাল দিয়েছে দু’জন মিলে।
‘সৌধ ভাই,’ রবি হেসে বললো, ‘কফি তো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।’
রবির দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম যে ও কিছু ধরতে পেরেছে নাকি। মনেহলো সব ঠিকঠাক আছে, ‘দুঃখিত রবি, এই এখনি শুরু করে দিচ্ছি। আচ্ছা আমার বাসার কিছু পুরানো ফার্নিচার রাখার জায়গা হচ্ছে না কোথাও। এই বাড়ির বেজমেন্ট কি খালি আছে?’
‘বেজমেন্ট?!,’ রবি অবাক হলো, ‘বাড়িতে তো বেজমেন্টই নেই!’
‘ওহ!,’ আমি দাঁত বের করে হাসলাম, ‘আমি ভাবলাম এতো বড় বাড়ি, বোধহয় আছে। কফি তো চমৎকার বানিয়েছো রবি!’
প্রশংসায় কাজ হলো। রবি একদম গদগদ হয়ে গেলো।
রাদিফ আর মনসুর ভাই কৌতূহলে একদম ফেটে পরছেন। মাথা হালকা নেড়ে ইশারায় বোঝালাম তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি।
রবি আমাদের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। বাড়ি ছেড়ে কিছুদূর এগোতেই রাদিফ বললো, ‘বিরাট ডিসাপয়েন্টমেন্ট। কিছুই তো হলো না। এখন কি করবো তাহলে?’
‘এই বাড়িতে যে বেজমেন্ট আছে আগে জানতাম না। বেজমেন্টে ঘাপলাও আছে একটা। ওখানে একটা চুঁ মারতে হবে। এবার অবশ্য চা-কফি খাওয়া যাবে না। চুরি করে ঢুকতে হবে।’
‘ঘাপলা আছে মানে?’ মনসুর ভাই জানতে চাইলেন।
‘সালেহীনের রুমে একটা চাবি পেয়েছি। লেবেলে লেখা বেজমেন্ট এর এক্সট্রা চাবি। আমার এদিকে রবি বললো বাড়িতে নাকি কোন বেজমেন্টই নেই। সে হয় মিথ্যা বলছে, নাহয় সে এই বিষয়ে আসলেই কিছু জানে না।
‘কিন্তু এটা তো অন্য কোন বেজমেন্টের চাবিও হতে পারে!,’ মনসুর ভাই বললেন।
‘হতে পারে। তবে আমি একবার চেক করে দেখতে চাই।’
‘তুই কি ভেবেছিস তিনি সব তথ্য প্রমাণ বেজমেন্ট লুকিয়ে রেখেছেন?, রাদিফ হতাশ হয়ে বললো।
‘না, তবুও চাবি নিয়ে এসেছি। এবার গিয়েই দেখি কি আছে সেখানে। মনসুর ভাই, আপনার কি মনে হয়?’
‘আমরা কি অযাচিত ভাবে সালেহীনকে বেশি সন্দেহ করে যাচ্ছি?’
‘আমার মতে না,’ আমি উত্তর দিলাম, ‘তাকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।’
মনসুর ভাই কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, ‘বেজমেন্টে যাওয়ার রাস্তাটা কোথায়? থাকতে পারে?’
‘জানি না। খুঁজে দেখতে হবে।’
‘যাও তাহলে। আমি এ বয়সে দেয়াল টপকে পা ভাঙতে চাইনা। ধাক্কা মারায় সাহায্য করতে পারবো শুধু।’
‘তাতেই চলবে,’ আমি বললাম, ‘রাদিফ, তুই কি আসছিস?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’
*
অনেক উঁচু পাঁচিল। টপকাতে বেশ বেগ পেতে হলো দু’জনকে।
পুরো বাড়ি অন্ধকার। দূর থেকে দেখতে একদম ভূতুড়ে বাড়ির মতো লাগছে। আমার মেরুদন্ডের উপর একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। মনে হচ্ছে অশুভ কোন একটা ছায়া আসলেই এই বাড়িটাকে ঘিরে রেখেছে।
‘আমার ভয় করছে রাদিফ,’ ফিসফিস করে বললাম।
‘আমারও!’
পাঁচিল ঘেঁসে দাঁড়িয়ে বেজমেন্টটা কোথায় থাকতে পারে অনুমান করার চেষ্টা করলাম। অন্ধকারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। টর্চও জ্বালাতে পারছি না ধরা খাওয়ার ভয়ে। অগত্যা পুরো বাড়িটা একবার চক্কর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
পুরো কম্পাউন্ডটা চক্কর দিতে পাঁচ মিনিট চলে গেলো। রাদিফ ফিসফিস করে বললো, ‘বাইরে থেকে ঢোকার কোন রাস্তাই নেই দেখছি! রাস্তাটা কি ভেতরে নাকি?!’
দু’বার চক্কর দেওয়ার পর ভুলটা বুঝতে পারলাম। সাদা দেওয়ালের সাথে সাদা কাঠের দরজাটা একদম মিশে আছে। অন্ধকারে আলাদা করে বোঝাই যায় না। বাড়ির একদম পেছনে দু’টো বুনো ঝোঁপের পাশে দরজাটা শেষ-মেষ খুঁজে পাওয়া গেলো।
বেশ ভারি একটা তালা ঝুলছে সেটার সাথে। চাবি দিয়ে খুলতে হলে টর্চ জ্বালানোর ঝুঁকিটা নিতেই হবে। আগে পিছে না ভেবে নিয়েও নিলাম। উপরওয়ালার অশেষ কৃপায় প্রথম চেষ্টাতেই তালা খুলে গেলো। বেরিয়ে এলো অন্ধকারে মোড়ানো একটা সিঁড়ি।
ভেতরে নামলাম দু’জন। জায়গাটা বেশ ছড়ানো এবং পরিষ্কার। অনেকগুলো কার্টন সারি করে রাখা হয়েছে চারদিকে। মেঝেটা শুকনো কাঁদা-পানিতে একদম মাখামাখি হয়ে আছে।
আমি এদিক সেদিক আলো ফেলে দেখতে লাগলাম চারপাশটা। উল্লেখযোগ্য কিছুই দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে বললাম, ‘এখানেও তো কিছু নেই!’
‘নেই। তবে খুঁজলে পাওয়া যাবে,’ রাদিফ বললো।
‘মানে?’
‘শালা গর্দভ নাকি তুই। জায়গাটা কেমন পরিষ্কার দেখছিস না?’
‘তো?’
‘অনেকদিন বন্ধ থাকলে এখানে ধুলোয় দমবন্ধ হয়ে মারা যেতি। যেহেতু পরিষ্কার আছে, তারমানে এখানে প্রায়ই কেউ আসে। বেজমেন্টে প্রায়ই কখন আসা হয়? যখন এখানে রেগুলার কোন কাজ থাকে।’
‘হুম,’ আমি চিন্তিত ভঙ্গিতে বললাম, ‘বাক্সগুলোয় কি আছে দেখা দরকার।’
‘দাঁড়া, আমি বোধহয় কিছু বুঝতে পারছি,’ মেঝেতে আলো ফেলে রাদিফ বললো।
‘কি?’
‘মেঝেতে জুতোর ছাপগুলো খেয়াল কর।’
আমি ফ্ল্যাশ এর আলোতে মেঝেটা ভালো মতন খেয়াল করলাম, ‘জুতোর ছাপ তো কি হয়েছে? এবার যে রকম বৃষ্টি হচ্ছে জুতোয় তো কাদা থাকবেই!’
‘কাম অন ব্রো! ‘ রাদিফ আক্ষেপের সুরে বললো, ‘গান্ডু হয়ে গেলি নাকি? মেঝেতে অন্তত দশ বারো রকমের জুতোর ছাপ আছে। খেয়াল করে দেখ।’
এবার আমার মাথায় জিনিসটা আঘাত করলো। ভালো মতো খেয়াল করে বললাম, ‘বাড়ির বেজমেন্টে এতোগুলো আলাদা আলাদা জুতোর ছাপ! এখানে তো কেউ নিশ্চই ফুটবল খেলতে আসে না। তাহলে কারা? বেজেমেন্ট এতো মানুষই বা আসবে কি করতে!
বেজমেন্টের ডান দিকের কোনায় সারি ধরে কার্টনগুলো একটার উপর একটা রেখে পুরো দেয়ালটাই একদম আড়াল করে রাখা। পায়ের ছাপগুলো ওখানে যেতে যেতে যেনো বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছে।
‘রাদিফ এদিকে হাত লাগা। এটার পেছনে একটা কিছু আছে।’
দু’জন মিলে কার্টনগুলো সরিয়ে দেখা গেলো পেছনে কার্ডবোর্ড দিয়ে বানানো আরেকটা দরজা আছে। বেশ ছোট। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে অনেকখানি উবু হয়ে ঢুকতে হবে।
উত্তেজনায় আমার হাত-পা কাঁপছে। এই দরজায় কোন তালা নেই। সামান্য ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো। প্রথমে ঢুকলাম আমি, তারপর রাদিফ।
একেবারে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। ভয়ে আমার শরীর অবশ হয়ে আসতে চাইছে। এতো ভয় কেন পাচ্ছি তাও বুঝলাম না। ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালাতে গিয়ে ভুলে ফোনই বন্ধ করে ফেললাম। কাঁপাকাপা স্বরে বললাম, ‘রাদিফ ফ্ল্যাশ অন কর!’
জায়গাটা খুব একটা বড় না। একটা মিডিয়াম সাইজের বেডরুমের সমান হবে। মেঝেতে বেশ দামি একটা কার্পেট বিছানো। পুরোটা ঘর শাদা পর্দা দিয়ে ঘেরা।
‘এখানকার ঘটনাটা কি বুঝতে পারছি না,’ রাদিফ বললো, ‘বেজমেন্টে এমন সাজানো গোছানো একটা জায়গা লুকিয়ে কেন রাখা হয়েছে?’
‘ঘটনাটা তো আমিও বুঝতে পার … ‘
আমি কথা শেষ করার আগেই রাদিফ হঠাৎ বলে উঠলো, ‘সৌধ, এদিকে আয়!’
আমি এগিয়ে দেখি রাদিফ একটা জায়গায় টর্চটা ঠায় ধরে আছে। ঘরের শেষ প্রান্তে একটা নীচু টেবিল রাখা। তবে সেটা যথেষ্ট চওড়া। পুরোটা টেবিল জুড়ে নয়টা ছোট ছোট মুর্তি শোভা পাচ্ছে। মাঝখানে একটা ছোট নারী মূর্তি। সেটার একটু পেছনে আরও আট টা মূর্তি রাখা।
‘এটা কি তার ব্যক্তিগত মূর্তি-সংগ্রহশালা নাকি!,’ আমি বিড়বিড় করে বললাম।
রাদিফ উত্তেজিত কন্ঠে বললো, ‘ফোনের ভিডিও অন কর জলদি!’
আমি ভিডিও অন করে মূর্তিগুলো ভালোভাবে দেখা শুরু করলাম। মাঝের মূর্তিটার উচ্চতা চৌদ্দ থেকে পনেরো ইঞ্চি, বাকিগুলো আরও ছোট। একেকটা দশ বারো ইঞ্চির বেশি হবে না।
মাঝের মুর্তিটা ছোট হলেও বেশ সূক্ষ কাজ করা হয়েছে সেটায়। মুর্তিটা একটা নগ্ন তরুণীর। প্রথম দর্শণে মনে হবে গাছের লতা-পাতা তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে ওটা আসলে গাছ না, সাপ। নগ্ন ডানাওয়ালা নারী মূর্তিটা একটা সাপ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সাধারণ একটা জিনিস। কিন্তু আমার মনে প্রবল একটা আতংক ধরিয়ে দিলো সেটা। আমি রাদিফকে বললাম, ‘অনেক হয়েছে। এবার এখন থেকে বের হতে হবে। চল। আমার ভালো লাগছে না।’
‘এটা আবার কি!,’ রাদিফ ওর টর্চটা দেয়ালে আরেকদিকে ধরে আছে।
আমি চমকে উঠলাম। তাকিয়ে দেখি পর্দার ফাঁক দিয়ে ওখানে আরেকটা দরজা দেখা যাচ্ছে। আমি আর রাদিফ প্রকম্পিত পায়ে সেদিকে এগোনো শুরু করলাম। দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সেটা একটানে খুলে ফেললাম।
আমার চোয়াল ঝুলে পড়লো। ফ্ল্যাশ এর আলোতে দু’টা পুরানো হসপিটাল বেড দেখা যাচ্ছে। সেগুলোর উপরে অপারেশন থিয়েটারের বড় বড় লাইট ঝুলে আছে। তবে এই জায়গাটা অনেকদিন ব্যবহার করা হয় না। ধুলো, জালে একাকার হয়ে আছে।
আমার অস্বস্তির পরিমাণ আরও বাড়লো। পা দু’টো দৌড়ে পালানোর জন্য রীতিমতন যুদ্ধ শুরু করছে আমার সাথে। বেডটার পাশে একটা ছোট টেবিল দেখা গেলো। সেটার ড্রয়ারে হাত দিতেই পেটমোটা ঢাউস সাইজের দু’টো কালো ফাইল পাওয়া গেলো। ধরেই বোঝা গেলো এগুলো বয়স অনেক তেলাপোকা, ইঁদুরে কাঁটা কয়েকটা জায়গায়। ময়লায় একেবারে মাখামাখি অবস্থা।
তারপরও ফাইলটা খুলে দু’এক পাতা পড়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু উত্তেজনায় আমার হাত এমনভাবে কাঁপছিলো যে আলোটা পর্যন্ত স্থির ভাবে ধরতে পারছিলাম না। আমি ফাইল দু’টো সাথে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে রাদিফকে তাগাদা দিয়ে বললাম, ‘এখান থেকে বের হই বাপ প্লিজ! আমার ভালো লাগছে না।’
‘পুরোটা জায়গা একবার ভিডিও করে নিয়ে যাই। কাজে লাগবে পরে,’ ও শান্ত স্বরে উত্তর দিলো।
‘জলদি কর।’
রাদিফ ঘুরে ঘুরে পুরোটা জায়গা রেকর্ড করা শুরু করলো। ওর কাজ খুব গোছানো। প্রত্যেকটা ডিটেইল ও ক্যামেরান্দী করে নিচ্ছিলো।
আমার কাছে মনে হলো অনন্তকাল পেরিয়ে যাচ্ছে। এক ঝড়বৃষ্টির রাতে একজন সাধারণ মানুষের সাথে পরিচয় থেকে এই ঘটনার শুরু … সেটা কতদুরে গড়াচ্ছে, কোথায় মোড় নিচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। বেজমেন্টে লুকিয়ে রাখা একটা ছিমছাম জায়গার মাঝে কতগুলো মুর্তি, পাশে লুকানো আরেকটা রুমে একটা হসপিটালের বেড– এসবের মানে কি? ইমতিয়াজ সালেহীন কি কোনভাবে স্মাগলিং এর সাথে জড়িত? কিন্তু স্মাগলিং এর সাথে অপারেশন থিয়েটারের সম্পর্ক কি?
যত চিন্তা করতে থাকলাম সবকিছু ততই জট পাকাতে থাকলো। আমার কাছে মনে হলো দীর্ঘ এক বছর পর রাদিফ এসে আমাকে বলছে, ‘কাজ শেষ। চল পালাই।’
পকেট থেকে রুমাল বের করে অনেকটা সময় নিয়ে আমাদের পায়ের ছাপগুলো মুছে সেখান থেকে বের হলাম। কার্টনগুলো দরজার সামনে আবার সাজিয়ে রাখলাম।
দেয়াল টপকে বের হতে পেরে নিজেকে খুব মুক্ত মনে হলো। মনসুর ভাই একটু সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। দৌড়ে এগিয়ে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘থ্যাংক গড … তোমরা আর দশ মিনিট দেরি করলে আমি নিজেই ভেতরে ঢুকে যেতাম। কিছু পেলে?’
‘হ্যাঁ,’ রাদিফ উত্তর দিলো, ‘তবে কি পেয়েছি সেটা এখনো বুঝতে পারছি না।’
এগারো
সে রাতে মনসুর ভাই এর বাড়িতে রাত কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা। বাড়িতে ঢুকেই দেখা গেলো মনসুর ভাই প্রেশার বেড়ে গিয়েছে। তাকে মেডিসিন খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বললাম। নিজেরে উপরেও কম ধকল জায়নি। আমি আর রাদিফ বেশ কিছুক্ষণ ভিডিওগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করে একটা পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ক্লান্তিতে শরীরটা একদম ভেঙে পড়ছিলো। একদিনে যথেষ্ট ধকল সহ্য করা হয়েছে।
পরদিন ঘুম ভাঙলো দুপুর দু’টায়। জেগে দেখি রাদিফ তখনও নাক ডাকাচ্ছে। আর মনসুর ভাই কিচেনে। ডিম-খিচুড়ি রান্না করছেন।
হাত-মুখ ধুয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করতে সাড়ে তিনটা বেজে গেলো। খসরু আর সৈমোর সাহেব এসে হাজির হলেন বিকেল পাঁচটায়। ওরা ফ্রেশ হয়ে খেয়ে দেয়ে আমাদের সাথে বসতে বসতে ঘড়িতে তখন বিকেল ছয়টা।
‘ঘটনার অগ্রগতি কতদূর?,’ রাদিফ খসরুকে উদ্দেশ্য করে বললো।
‘অনেক। ঘটনা বেশ চমকপ্রদ।’
‘সময় নষ্ট করিস না,’ রাদিফ বললো, ‘শুরু করে ফেল।’
‘খুলনায় গিয়ে ইমতিয়াজ সালেহীনের বাড়ি খুঁজতে আমাদের একটুও সমস্যা হয়নি। গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করা মাত্র একজন রাস্তা বলে দিলো। গিয়ে দেখি ওটা একটা এতিমখানা।’
‘এতিমখানা মানে?,’ মনসুর ভাই বিষ্মিত কণ্ঠে বললেন, ‘ইমতিয়াজ এতিম নাকি?’
‘হ্যাঁ,’ সৈমোর সাহেব শান্ত কন্ঠে উত্তর দিলেন।
‘আচ্ছা …’ মনসুর ভাইকে চিন্তিত দেখালো, ‘খসরু, বলতে থাকো তুমি।’
‘চার্চের অনুদান আর ফাদারদের তত্তাবধায়নে চলা বেশ গোছানো একটা জায়গা সেটা। ছিমছাম। ইমতিয়াজ সালেহীনের খোঁজ করতে এসেছি শুনে বেশ খাতির করলো। কারণটা অবশ্য পরে বুঝতে পেরেছি। ইমতিয়াজের সেই দূর-সম্পর্কের চাচা ওখানকার ট্রাস্টিবোর্ডের মেম্বার ছিলেন এবং প্রচুর টাকা অনুদান হিসেবে দিয়েছেন।
যিনি আমাদের সাথে কথা বলতে এসেছিলেন তার নাম সুবেদার মুন্সী। এতিমখানার হাউজ টিউটর। তাকে আমরা বলেছিলাম যে কলেজের রিইউনিয়নের জন্য সালেহীন সাহেবকে খোঁজা হচ্ছে। সুবেদার সাহেব দুঃখ করে বললেন কলেজে ভর্তি হবার পর নাকি ইমতিয়াজ আর কখনই এখানে আসেনি। উনার কোন খোঁজই তিনি জানেন না।
চা নাস্তা খেতে খেতে ইমতিয়াজকে বাড়ি লিখে দেওয়ার প্রশ্নটা তুলতেই সুবেদার সাহেব বললেন, বাড়িটা নাকি আসলে তার হক। কারণ, ইমতিয়াজের দাদা প্রচুর পয়সাঅলা মানুষ ছিলেন। এই এতিমখানাতেও নাকি প্রচুর দান করেছেন তার দাদা। কিন্তু তার দু’টো ছেলেই নাকি ছিলো কুলাংগার। তাদের বাবা মারা যাওয়ার পর দুই ভাই সম্পত্তি ভাগাভাগি করে ফেলে মদ, জুয়া, রেস এসবে টাকা ওড়ানো শুরু করে। ফতুর হতেও খুব একটা সময় লাগেনি তাদের। বাবার নতুন সম্পত্তির খোঁজ করতে গিয়ে নাকি দেখা গিয়েছিলো তিনি গোপনে আরেকটা বিয়ে করেছিলেন। সেই ঘরে একটা ছেলেও আছে তার। সেই মহিলা আর ছেলেকে নাকি তিনি প্রায় অর্ধেক সম্পত্তি লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন।
এবার দুই ভাই মিলে সেই সম্পত্তি দখল করার জন্য পাঁয়তারা শুরু করলো। দ্বিতীয় বউ বেঁকে বসাতে নাকি দুই ভাই মামলা করে দিয়েছিলো। কিন্তু মামলায় তারা শোচনীয় ভাবে হারে। প্রতিশোধ নিতে সৎ মাকে দু’জন খুন করে ফেলে।
ধরা পড়ার পর দু’জনেরই ফাঁসি হয়। বাবার মৃত্যুর সময় ইমতিয়াজের বয়স এক। এর কিছুদিন পরই ওর মাও মারা যায়। শেষমেষ যেই এতিমখানায় তার দাদা অনেক টাকা দান করতেন, ওখানেই জায়গা হয় ওর।
ইমতিয়াজকে তার সৎ চাচা গ্রহণ করলেন না। এমনকি তিনি নাকি বলে রেখেছিলেন এই ছেলে যাতে কখনওই জানতে না পারে যে তিনি ইমতিয়াজের চাচা। তার মায়ের হত্যাকারীর কোন বংশধরকে তিনি পালবেন না, এই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি।
কিন্তু স্কুল পাশ করার পর কোন একভাবে ইমতিয়াজ সেটা জেনে যায়। তখন তিনি চাচাকে বলেছিলেন তিনি কোন সম্পত্তি চান না, শুধু পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে তাদের সাথে থাকতে চান। কিন্তু লাভ হয়নি। চাচার দুই ছেলে নাকি এক অর্থে তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়।
এর কিছুদিন পর তার চাচার হার্টের অসুখ ধরা পড়ে। ডাক্তাররা জানিয়ে দিয়েছিলেন যে কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্ল্যান্ট ছাড়া তাকে কোনভাবেই বাঁচানো সম্ভব না। এই খবর পেয়ে ইমতিয়াজ সালেহীন তাকে হাসপাতালে দু’ একবার দেখতে গিয়েছিলেন। খুব সম্ভবত তখনই তার চাচা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন।
সৌভাগ্যক্রমে তার কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফল হয়েছিলো। সুবেদারের মতে অনুশোচনা থেকেই ইশফাঁক আহমেদ ইমতিয়াজকে বাড়ি লিখে দেওয়ার কাজটি করেছিলেন। সুস্থ হবার পর তাকে দেখতে গিয়েছিলেন সুবেদার। তখন নাকি তিনি তাকে বলেছেন, ইমতিয়াজ না থাকলে আমি আজ বেঁচে থাকতাম না।
কিন্তু কপাল খারাপ থাকলে যা হয়… এর পরের বছরই তিনি মারা যান।’
খসরু দীর্ঘক্ষণ একটানা কথা বলার পর থামলো। সৈমোর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর তোমাদের অগ্রগতি কতটুকু?’
‘এখনো জানি না,’ বলে টেবিলের উপর পেটমোটা দু’টো ফাইল, ল্যাপটপ আর শাহানা আর সালেহীনের যুগল ছবিটা রাখলাম।
সৈমোর সাহেব ছবিটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘আরে এ দেখছি আমাদের ফারাহ্!’
আমার মাথায় বাজ পরলেও মনে হয় আমি এতো অবাক হতাম না, মানে?’
‘আমাদের কলেজের ফারাহ্। ওই যে বলেছিলাম না ওর সাথে মেডিকেলে পড়তো? টিএসসিতে দেখেছিলাম ইমতিয়াজের সাথে …’
‘আ-আপনি ক্কি বলছেন এসব?,’ আমি তোতলানো শুরু করলাম, ‘এটা ফারাহ্ হয় কিভাবে? এটা তো শাহানা!’
আমার আচরণ দেখে সবাই অবাক হয়ে গেলো। সৈমোর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর ইউ ওকে? কি হয়েছে তোমার?’
আমি পানি খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে বললাম, ‘সে রাতে আমি ছাদে এতো বেশি ভয় কেন পেয়েছিলাম জানেন?
‘কেন?’ সৈমোর সাহেব প্রশ্ন করলেন।
কারণ যেদিন আমি সালেহীনের ডিভিডি কালেকশনের আলমারিতে এই ছবিটা পেয়েছিলাম তখন ভেবেছিলাম এটা তার স্ত্রীর ছবি। ছাদে যেদিন আমার প্রেডিকশন শুনিয়ে বলেছিলাম আমি ভুলক্রমে তার স্ত্রীর একটা ছবি দেখে ফেলেছি, তখনও তিনি কোন উচ্চবাচ্য করেননি। আমি যখন তার গল্প শুনছিলাম তখন শাহানার জায়গায় এই ছবির মানুষটার কথাই চিন্তা করছিলাম। গল্প শেষে যখন দেখলাম ছবির মানুষটা ছাদে মানে মৃত একজন মানুষ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, ভয়টাকে আর কোনভাবেই লাগাম টেনে ধরতে পারিনি। তারমানে উনি সচেতন ভাবে ফারাহ্ নামের কাউকে আমার কাছে শাহানা নামে চালিয়ে দিয়েছিলেন!’
‘কি বলছো তুমি!’ সৈমোর সাহেব হতবাক হয়ে গেলেন, ‘… তুমি ছাদে ফারাকে দেখেছিলে?’
‘হ্যাঁ,’ আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিলাম।
‘তুই শিওর?,’ খসরু জানতে চাইলো, ‘তোর মতে তো তুই তখন মানসিক ভাবে স্থির ছিলি না।’
‘হ্যাঁ। সেটা ছিলাম না। কিন্তু এই চেহারা আমি কোনভাবেই ভুল করতে পারি না। দুঃস্বপ্নে হাজারবার এই চেহারা দেখেছি আমি।’
‘তার মানে,’ মনসুর ভাই হতভম্ব কণ্ঠে বললেন, ‘এতক্ষণ যা-ও সালেহীনের মানসিক ভাবে অসুস্থ হওয়া আর গার্সিয়ান হাইপোথিসিস এর একটা সম্ভাবনা ছিলো এখন সেটাও বাদ। ইমতিয়াজ তোমাকে সচেতন ভাবেই ভয় পাইয়েছে এবং সেটা আরেকজনের সাহায্যে। কিন্তু এর মোটিভ কি?’
‘আ-আমি জানি না,’ কাঁপাকাপা স্বরে উত্তর দিলাম আমি।
‘তোমরা কাল ভেতরে কি পেয়েছো? হাতের কাছে যা আছে সেসব থেকেই উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের,’ মনসুর ভাই বললেন।
‘রাদিফ, ডেস্কটপে সব কপি করা আছে। সবাইকে দেখা। আমার স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগবে,’ বললাম আমি।
পর্দাগুলো টেনে দিয়ে ঘর অন্ধকার করে রাদিফ ল্যাপটপে ভিডিওগুলো ছাড়লো। সব মিলিয়ে ভিডিওগুলো প্রায় পনেরো মিনিটের। পুরোটা সময় মনসুর ভাই আর সৈমোর সাহেব একটা কথাও বললেন না। খসরু শুধু মাঝে একবার বিড়বিড় করে বলে উঠলো, ‘এসব কি দেখছি!’
ভিডিও আর ছবিগুলো দেখা শেষ করে মনসুর ভাই গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘কারও কাছে সিগারেট হবে?’
সৈমোর সাহেব অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘স্যার আপনি সিগারেট খান?’
‘খাই না। তবে আজ খাবো। তোমরা চাইলো তোমরাও খেতে পারো। আজ ছোট-বড়, ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবাই একত্রে বিড়ি টানবো। কারণ আমি এখন যা বলা শুরু করবো সেটা যথেষ্ট বোরিং।’
‘কি সেটা?,’ রাদিফ জানতে চাইলো।
‘ইতিহাস, মাই বয়। আমি এখন ইতিহাসের একটা ছোটখাটো ক্লাশ নেবো। কই সিগারেট দাও কেউ!’
সৈমোর সাহেব একটা সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার মনসুর ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন। তিনি সিগারেট ধরিয়ে দু’টো টান দিয়ে বললেন, ‘সৈমোর যেদিন পুরাতন ঢাকার একটা বাড়ির কথা বলেছিলো তখন আমি তোমাদের বলেছিলাম আমার কিছু একটা মনে পড়ি পড়ি করেও পরছে না, সেটা কি কারও মনে আছে?’
‘আছে,’ আমি মাথা নাড়লাম।
‘বেশ, তাহলে সিটবেল্ট বেঁধে নাও,’ বলে মনসুর ভাই নাটকীয় ভঙ্গিতে বলা শুরু করলেন, ‘সে অনেককাল আগের কথা। কত আগের একটা ধারণা দেই তোমাদের সে সময় এখানে নবাবদের শাসন চলছে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে আর্মেনীয়রা দল বেঁধে ঢাকায় আসতে শুরু করে। তাদের বেশির ভাগই তখন আলে-আবু সাইদ নামের একটা এলাকায় নিজেদের কলোনী বানিয়ে নেয়। পরে ওই এলাকাটার নামই হয়ে যায় আর্মেনীটোলা। তাদের ব্যবসাটা আসলে ছিলো লবন কেন্দ্রিক। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে তারা জমিদারিও কেনা শুরু করে।
আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন এনজো নামে এক ফ্রেঞ্চ তরুণের সাথে পরিচয় হয় আমার। একটা এনজিওতে চাকরি করতো সে। ইতিহাসে ছিলো ওর বিশাল আগ্রহ। ওর দাদা এক আমলে ঢাকায় ছিলেন। সে সময়কার ঢাকা নিয়ে তার বেশ কিছু বইও আছে।
একবার দাদার ডায়েরী ঘাটতে ঘাটতে সে আর্মেনিয়ানদের নিয়ে লেখা খুব ইন্টারেস্টিং একটা আর্টিকেল খুঁজে পায়। আর্মেনিয়ানদের সাফল্যে অনেকেই খুব ঈর্ষান্বিত ছিলেন। এই লিস্টে বেশকিছু নবাবের নামও ছিলো। নবাব’রা তাদের ভেতরের খবর জানতে গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন। তারা যে খবর এনেছিলো, সে খবর শুনে তোমাদের ভাষায় নবাবদের মাথা লক খেয়ে যায়।
অনেক প্রচলিত গুজবের মাঝে এটা ছিলো খুব আন্ডাররেটেড কিন্তু মুখরোচক। আর্মেনিয়ানদের একটা পরিবার তাদের দেশ থেকে এ দেশে আসার সময় খুব গোপন একটা জিনিস সঙ্গে করে এনেছিলো। এবং পরবর্তীতে সেই গোপন জিনিসটাই হয়ে ওঠে তাদের সাফল্যের মূলমন্ত্র।
সেটা ছিলো একটা লিলিথের মূর্তি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে লিলিথকে? লিলিথ হচ্ছে অর্থ, বিত্ত ক্ষমতা এবং নিষিদ্ধ সুখের দেবী এবং তার সাথে সে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীণ অপদেবীদের মধ্যে একজন। কতটা প্রাচীণ সেটার একটা ধারণা দিই, পৃথিবীর সবথেকে পুরাতন সাহিত্যের নিদর্শণ হিসেবে ধরা হয় সুমেরিয়ান উপাখ্যান গিলগামেশ কে। সেই উপাখ্যানে এই লিলিথ থেকে দূরে থাকার জন্য মানব সম্প্রদায়কে আদেশ করা হয়েছে।
তারপর আসা যাক বিলুপ্তপ্রায়, হাজার বছরের পুরনো কিছু ব্যাবিলনীয় ধর্মগ্রন্থের কথায়, সেখানেও লিলিথকে খুব ভয়ংকর ভাবে রিপ্রেজেন্ট করা হয়েছে। এমনকি বাইবেলের সবথেকে পুরনো সংস্করণ ডেড সি স্কুলেও লিলিথের কথা উল্লেখ আছে এবং বলা হয়েছে লিলিথের পুজারীদের স্থান হবে নরকের সর্বনিম্ন স্তরে।
সতেরোশ’ ছিয়াশি সালের দিকে হঠাৎ করেই আর্মেনিয়ানদের মাঝে লিলিথের পুজোর ট্রেন্ডটা বাড়তে থাকে। লিলিথের উপাসনা খুব সহজ ছিলো, কিন্তু এর ফল ছিলো মারাত্মক। লিলিথের কোন উপাসকেরই স্বাভাবিক মৃত্যু হতো না। অন্যভাবে বলতে গেলে লিলিথ তাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হতে দিতো না। কোন না কোন জটিল রোগে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হতো এর পূজারীদের। লিলিথের পদ্ধতিটা অনেকটা শয়তানের উপাসনার মতই ছিলো। যা দিতো, তাক্ষণিক ভাবে হাতে-নাতে দিতো।
মধ্যযুগে বেশ কিছু অঞ্চলে লিলিথের পূজারীদের প্রকোপ বেড়ে যায়। রীতিমতন মন্দির খুলে লিলিথের উপাসনা চলতে থাকে। কিন্তু খৃষ্ট ও ইহুদী ধর্মপ্রচারকরা বেশ শক্ত অবস্থান নেয় এর বিরুদ্ধে। একে একে লিলিথের মন্দির এবং মূর্তি, দু’টোই কালের বিবর্তণে হারিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু আর্মেনিয়ানদের খুব ছোট একটা দলের কাছে এর একটা চিহ্ন রয়ে যায়। খুব সম্ভবত বংশানুক্রমেই এটা ওদের হাতে এসেছিলো।
ঢাকায় এসে প্রথমে খুব গোপনে চলতে থাকে লিলিথের উপাসনা। আর্মেনিয়ানদের একটা অংশ যখন ফুলে ফেঁপে বড় হওয়া শুরু করে, তখন বাকিরাও এসে এসবে যোগ দেয়। মোদ্দাকথা, এটা তখন ভাইরাসের মতন এদিক সেদিকে ছড়ানো শুরু করে।
আর্মেনিয়ানরা তখন গোপনে দু’টো মন্দিরও বানিয়ে ফেলে তাদের এলাকায়। খুবই পুরনো, জীর্ণদশার ছোট দু’টো বাড়ি কিনে নেয় তারা। সবাইকে বলে এখন থেকে এ জায়গাগুলো তারা ব্যবসায়িক আলোচনার জন্য ব্যবহার করবে।
নবাব’রা ততদিনে গুপ্তচরের মাধ্যমে এই খবর পেয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আর্মেনিয়ানদের তখন হুলুস্থুল অবস্থা। প্রভাব, প্রতিপত্তি, সম্পদ– সবই তাদের নখদপর্ণে। নবাব’রা তাদের কিছুই বলতে পারলেন না। চড়া দামে মূর্তিটা কেনার প্রস্তাব দিলে তারা সেটা নাকচ করে দেয়। কিন্তু পরে ভাস্কর দিয়ে কয়েকটা কপি বানানোর অনুমতি অবশ্য দিয়েছিলো ওরা।
একসময় নবাবদের মাঝেও এই জিনিস প্রচলণ খুব ভালোভাবে চলতে শুরু করে। কিন্তু সেটা সংখ্যায় খুবই নগন্য। গোপনে এ ব্যাপারটা চলতে থাকলেও নবাবদের থেকে আস্তে আস্তে তাদের বন্ধু-বান্ধব পর্যন্ত চলে যায়। বন্ধু-বান্ধবের বাসা থেকে তাদের চাকর-বাকরদের চোখে পড়ে যাওয়ায় একটা পর্যায়ে বলতে গেলে তোমার আমার মতন সাধারণ মানুষও লিলিথের পূজো শুরু করে, কিন্তু সেটা সংখ্যায় খুবই কম।
এনজো’র দাদার বক্তব্য অনুসারে তখনকার পুরাতন ঢাকায়, মানে ১৯৩৫ সনের দিকে লিলিথের তিনটে মন্দির ছিলো। জিনিসটা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ায় বাইরের লিলিথ উপাসকেরা যাতে মন্দির দেখলেই চিনতে পারে সেজন্য সংকেত হিসেবে দালানের গায়ে লেখা থাকতো ask for flowers ‘
বলে মনসুর ভাই কিছুক্ষণের জন্য থামলেন। তারপর আবার শুরু করলেন, ‘বহুকাল আগে এক শীতের রাতে সৈমর আমাদের ইমতিয়াজকে এরকমই একটা বিলুপ্তপ্রায় লিলিথের মন্দিরে ঢুকতে দেখেছিলো। এটা সৈমোর না দেখলে আমি কখনও বিশ্বাসই করতাম না যে এ জিনিসের অস্তিত্ব এখনো পুরাতন ঢাকায় আছে।
খুব সম্ভবত কলেজে পড়ার সময় কোন একভাবে ইমতিয়াজ লিলিথ পূজারীদের সংস্পর্শে আসে। মানুষ হিসেবে সে বিচিত্র। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতিও ওর আকর্ষণ আছে ভালো। এসবে জড়িয়ে পড়া ওর জন্য কঠিন কিছু ছিলো না। তোমরা যে ভিডিও আর তথ্য প্রমাণ এনেছো তাতে মনে হচ্ছে সে লিলিথের বেশ ভালো একটা ভার্সন খুঁজে বের করেছে। কপি হবার সম্ভাবনা খুবই কম। ভালো মতন খেয়াল করলে দেখবে মূর্তির চোখ দু’টো বিশেষ এক রকমের পাথর দিয়ে তৈরি। আর হাতের কাজও খুব চমৎকার। প্রায় নিখুঁতই বলা চলে।
বেজমেন্ট যে লুকানো জায়গাটা সৌধ আর রাদিফ দেখে এসেছে, সেটা স্পষ্টতই লিলিথের একটা ব্যক্তিগত মন্দির। তবে ওর বাড়ির সামনের বিচিত্র সাইনবোর্ডটা কিন্তু প্রমাণ করে যে ওটা আর ব্যক্তিগত নেই। আর যেহেতু সে পত্রিকাতে বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলো, তার মানে ধরে নিতে হবে দেশের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা লিলিথ উপাসকদের সে জানিয়ে দিয়েছে যে Lilith is here. ‘
‘মাই গড! কোথাকার ঘটনা কোথায় গিয়ে গড়াচ্ছে!’ সৈমোর সাহেব বিড়বিড় করে বললেন।
‘এখন আমরা নিশ্চিত,’ খসরু বলে উঠলো, ‘যে ইমতিয়াজ সালেহীনের মানসিক কোন অসুস্থতা নেই। গার্সিয়ান হাইপোথিসিস এখানে আসার প্রশ্নই আসে না। তিনি কোন একটা উদ্দেশ্য নিয়েই সৌধকে ছাদে ভয় দেখিয়েছিলেন। তাহলে সেই উদ্দেশ্যটা আসলে কি?’
‘আচ্ছা সৈমোর সাহেব,’ রাদিফ জিজ্ঞেস করলো, ‘শাহানা ঠিক কবে নিখোঁজ হয়েছিলো?’
‘এগজ্যাক্ট ডেট’টা বলতে পারবো না। তবে আমার যতদুর মনে পরে সেটা ২০০৭ সালের এপ্রিল মাস ছিলো। চব্বিশ অথবা পঁচিশ তারিখে আমরা জানতে পেরেছিলাম যে শাহানা মিসিং। ওর বান্ধবীর মতে সে আরও তিনদিন আগে হল ছেড়েছিলো। তাহলে সেটা বিশ বা একুশ তারিখে হওয়ার কথা। তবে পত্রিকার কাটিং আছে আমার কাছে। দেখে জানাতে পারবো।’
‘আচ্ছা রাদিফকে বেশ চিন্তিত দেখালো, ‘ফারাহ্ মেয়েটাতো আপনাদের কলেজের। কোন খোঁজ খবর নিতে পারবেন ওর সম্পর্কে?’
‘কোন ধরণের খবর?’
‘সবই দরকার। কই থাকে না থাকে। কি করে। বাবা-মা কি করে। কমপ্লিট বায়োডাটা আর কি।’
‘আমি চেষ্টা করে দেখছি কতটুকু জোগাড় করা যায়। তবে যা মনে হচ্ছে ফারাহ্ ইমতিয়াজের কাজের সাথে বেশ ভালোভাবেই জড়িত।’
‘কথাটা যদিও লেইম শোনায়,’ খসরু হঠাৎ বলে উঠলো, ‘কোনভাবে কি আশে পাশের বাড়িগুলো থেকে ২০০৭ সালের এপ্রিলের বিশ একুশ তারিখে তারা সালেহীনের বাড়িতে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলো কিনা জিজ্ঞেস করা যায়?’
‘পাগল নাকি?.’ আমি বললাম, ‘এভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমাদের পক্ষে জিজ্ঞেস করা সম্ভব? আর দশ বছর আগের কথা কেউ মনে রেখেছে নাকি?’
‘চেষ্টা করতে দোষ নেই,’ মনসুর ভাই বললেন, ‘ওই গলিতেই আমার বাবার বন্ধু প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার জহির মাহমুদের বাড়ি। তাকে দিয়েই নাহয় শুরু করবো। অনুরোধ করলে তিনি হয়তো অন্যান্য অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলিয়ে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। তিনি বেশ মান্য-গন্য ব্যক্তি। সবাই তাকে সমীহ করে।’
‘তাহলে তো খুবই ভালো হয়, খসরু বললো, ‘এখন তাহলে আমাদের কাজ দু’টো। ফারাহ্ সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া আর মিষ্টির দোকানে রহমান আলীর সাথে দেখা করা।’
‘কেয়ারটেকার থেকে গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডে মিষ্টির দোকান খুব সন্দেহজনক,’ রাদিফ বললো, তাকেও গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে ওই রাতে কি হয়েছিলো বাড়িতে?’
‘আচ্ছা এটা কি?,’ কালো ফাইল দু’টো হাতে নিয়ে মনসুর ভাই বললেন।
‘ও দু’টো বেজমেন্টের মন্দিরে পেয়েছি। আরও পরিস্কার করে বলতে গেলে হসপিটাল বেডটার পাশ থেকে। হাবিজাবি কাগজপত্রে ভর্তি,’ আমি উত্তর দিলাম।
মনসুর ভাই চুপ করে মিনিট দশেক ধরে খুব মনযোগ দিয়ে ফাইল দু’টো পর্যবেক্ষণ করা শুরু করলেন। হঠাৎ তার চেহারার অভিব্যক্তি পাল্টানো শুরু করলো। তিনি ভয়ার্ত কন্ঠে বললেন, ‘মাই গড!
‘কি হয়েছে স্যার?,’ সৈমোর সাহেব জানতে চাইলেন।
‘দেরি করা চলবে না। আমাদের এখনি বের হতে হবে। জহির মাহমুদ বাড়িতে আছেন কিনা কে জানে! তার সাহায্য খুব দরকার আমাদের।’
‘মনসুর ভাই!,’ রাদিফ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো, ‘কোন সমস্যা?’
‘অনেক বড় সমস্যা,’ তিনি বললেন, ‘রাস্তায় যেতে যেতে বলছি। আর রহমান আলীকেও ধরতে হবে … সে অবশ্যই কিছু একটার সাক্ষী।’
মনসুর ভাই প্রায় দৌড়ে রুম থেকে থেকে বেরিয়ে গেলেন। হতবিহ্বল চেহারায় তাকে অনুসরণ করলাম আমরা।
বারো
তিন দিন পর।
বিকেল ঠিক পাঁচটায় আমি, মনসুর ভাই আর সৈমোর সাহেব ইমতিয়াজ সালেহীনের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম।
আমি ভেবেছিলাম আমাদের তিনজনকে একসাথে দেখে একটু ভড়কে যাবেন। কিন্তু তার চেহারা দেখে বেশ স্বাভাবিক মনে হলো তাকে। খুব আন্তরিক ভাবেই তিনি আমাদের সাথে কথা বলতে শুরু করলেন তিনি। অনেক চেষ্টা করেও তার আচরণে বিরক্তি বা মেকি কিছু খুঁজে পাওয়া গেলো না। যদি তিনি বিরক্ত হয়েও থাকেন, আমরা কেউই সেটা বুঝতে পারলাম না। সেক্ষেত্রে, তিনি খুবই বড় মাপের একজন অভিনেতা।
‘অনেকদিন পর আপনার সাথে দেখা হয়ে খুবই ভালো লাগছে স্যার, ‘ ইমতিয়াজ সালেহীন আন্তরিক কন্ঠে বললেন, ‘আর সৈমোর, তোকে যে শেষ কবে দেখেছিলাম আমার সেটাও মনে নেই।’
সৈমোর সাহেব হাসলেন, ‘তুই কোথায় ছিলি এতোদিন?’
‘একটা বই লিখছিলাম। হঠাৎ করেই আমার লেখা একেবারে আটকে গেলো। মাথায় আর কিছুই আসছিলো না। পরদিনই ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। রাঙামাটি, সাজেক ভ্যালি, তারপর বান্দরবান, বগালেক, সবশেষে সেইন্টমার্টিন ঘুরে এরপরে বাড়ি ফিরলাম। একা একা ঘুরবার মজাই আলাদা। সবকিছুই নতুন একটা অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা যায়।’
‘সৌধের কাছে তোমার বাগানের অনেক নাম শুনেছি। আমার জায়গাটা দেখার খুব ইচ্ছে। একবার নিয়ে যাবে নাকি?,’ মনসুর ভাই হেসে জিজ্ঞেস করলেন।
‘অবশ্যই! চলুন, এখনি যাওয়া যাক।’
বিকেলের সুন্দর রোদে ছাদটা পুরো ঝলমল করছে। মনসুর ভাই আর সৈমোর সাহেব একেবারে অভিভূত হয়ে গেলেন ছাদটা দেখে। ঘুরে ঘুরে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে ছাদের কোনায় রাখা টেবিলটার একটা চেয়ারে বসে মনসুর ভাই বললেন, ‘তুমি আসলেই একটা জিনিয়াস, ইমতিয়াজ!’
সালেহীন উত্তর না দিয়ে সুন্দর করে হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কফি তে কয় চামচ চিনি খান স্যার?’
‘দু-চামচ।’
‘আর তুই?,’ সৈমরের কাছে জানতে চাইলেন তিনি।
‘যা খুশি দে। এসব নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই।’
কফিতে চুমুক দিয়ে আমি বললাম, ‘কফি খুব ভালো হয়েছে সালেহীন ভাই। আচ্ছা সুইমিং পুলের সামনে যে কয়েকটা ক্যাকটাস গাছ রাখা ওগুলো কি পেয়োটি?
‘হ্যাঁ,’ সালেহীন ভাই বললেন, ‘ক্যাকটাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছো নাকি?’
‘না, কয়দিন আগে কৌতূহল বশত একটু ঘাটাঘাটি করেছিলাম। দেখলাম অ্যাজটেকরা ওদের কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই পেয়োটি দিয়ে বানানো এক ধরণের পানীয় খায়। খুব ভয়াবহ হ্যালুসিনেটিং একটা ড্রাগ এই গাছটা। আপনি জানতেন এটা?’
‘হ্যাঁ,’ সালেহীন ভাই নির্বিকার মুখে উত্তর দিলেন, ‘তবে কখনও চেখে দেখার ইচ্ছে হয়নি।
‘মানুষকে বোকা বানাতে কিন্তু এটা খুব কাজে আসবে দোস্ত!,’ সৈমোর সাহেব বললেন, ‘জিনিসটা এতো মিষ্টি যে চা কফির সাথে মিশিয়ে খাওয়ালে কেউ টেরই পাবে না। উল্টো ভুত টুত দেখেছে ভেবে অবস্থা একাকার হয়ে যাবে। কপাল বেশি খারাপ হলে মাথায় ঘুরতে থাকবে ওকে ধরো! ওকে আমার লাগবে!’
সালেহীন সাহেব হাসতে শুরু করলেন। যেন খুব মজার একটা কৌতুক শুনেছেন।
মানসিক ভাবে দেখছি খুবই শক্ত!
‘সালেহীন ভাই,’ আমি বললাম, ‘আপনার সাথে আজ আমরা তিনজন শুধু খোশগল্প করতে আসিনি। একটা বিশেষ কারণ নিয়ে এসেছি। প্রসঙ্গটা এতো জটিল যে কিভাবে শুরু করবো বুঝতেই পারছি না।’
‘গুরুত্বপূর্ণ কিছু?,’ সালেহীন ভাই চিন্তিত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন।
‘হ্যাঁ, খুব,’ মনসুর ভাই বললেন, ‘আচ্ছা এতো ভনিতা না করে একেবারে সরাসরি কথাটা বলে ফেলি … তুমি আজ থেকে চার বছর আগে এই ছাদে, ঠিক এখানে বসে সৌধকে তোমার জীবনের একটা ঘটনা শুনিয়েছিলে। গল্প শেষে মারাত্মক ভয় পেয়ে সে পালিয়ে যায়। তুমি সেদিন ওর সাথে বেশ বড় রকমের জুয়া খেলতে চেয়েছিলে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমকে সে বেঁচে যায়।’
‘আমার জীবনের ব্যক্তিগত একটা অধ্যায় বলেছিলাম আমি। সেটা বলার পর ও আসলেই ভয় পেয়ে পালিয়েছিলো। কিন্তু পরে ওর সাথে দেখা করে ঘটনার খুব উপযুক্ত একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও দিয়েছিলাম। এর সাথে জুয়া খেলার প্রসঙ্গ আসছে কেন?’
সালেহীন নির্দ্বিধায় কথাগুলো বলে গেলেন। মুখের অভিব্যক্তি একেবারেই স্বাভাবিক।
তুই নিজের জীবনের ঘটনা বলেছিস, ঘটনা শেষে একটা অতিপ্রাকৃত কিছু দেখে সৌধ সেখান থেকে ভয় পেয়ে পালিয়েছে সেটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয় হতে পারতো,’ সৈমোর সাহেব বলা শুরু করলেন, ‘স্বাভাবিক এই অর্থে, কারণ আমি তোর গল্প বলার ক্ষমতা সম্পর্কে পরিচিত। পরিবেশ বুঝে ভয়ের কোপটা তুই ভালোই মারতে পারিস। কলেজে থাকতে আমি নিজেই তোর গল্প শুনে অসংখ্যবার দৌড়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছি। কিন্তু এখানে ঘটনাটা ভিন্ন, কারণ তুই সম্পূর্ণ বানোয়াট একটা গল্প শোনালি সৌধকে, যে গল্পে শাহানা তোর স্ত্রী থাকে। তোদের একটা বাচ্চা সেখানে মারা যায় … আর গল্পের শেষে ছাদে এসে হাজির হলো ফারাহ্, তোর এককালের প্রেম, যাকে সৌধ শাহানা ভেবেছিলো তোর আলমারিতে একটা যুগল ছবি পাওয়ার পর।’
‘এসব কি বলছিস তুই সৈমোর?,’ এবার ইমতিয়াজ সালেহীন ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলেন।
‘দাঁড়ান, আমি আরও কিছু যোগ করি এখানে। তাহলে বিষয়টা খুব পরিষ্কার হয়ে যাবে,’ আমি বললাম, ‘যেদিন ডিভিডি খুঁজতে গিয়ে আপনার আর ফারাহ্ নামের জনৈক তরুণীর যুগলবন্দী ছবিটা পেয়েছিলাম, আমি প্রেডিক্ট করেছিলাম তিনি আপনার স্ত্রী। যাই হোক, আমার প্রেডিকশন ভুল ছিলো। কিন্তু যখন আমি ছাদে আমার প্রেডিকশনটা শোনালাম আমি কিন্তু বলেছিলাম আলমারিতে আপনার আর আপনার স্ত্রী’র একটা ছবি পেয়েছি। আপনি তখন কোন উচ্চবাচ্য করেননি। কারণ আপনি চাইছিলেন আমি ফারাহ্ কে শাহানা মনে করি যাতে করে ফারাকে ছাদে এনে, আমার কফিতে ভেষজ হ্যালুসিনেটিং ড্রাগ মিশিয়ে একটা ভ্রম তৈরি করে আমাকে ভয় দেখাতে সুবিধা হয় কিন্তু, এই কাজটা আপনি কেন করলেন? এর মোটিভ খুঁজতে গিয়ে আমাদের জীবন মোটামুটি দুর্বিষহ হয়ে গিয়েছিলো।’
এবার মনসুর ভাই শুরু করলেন, ‘ততদিনে সৌধ আদ্রিয়ান পেতরোভের বইটা পড়ে ফেলেছে। আমাদের যখন ওর ঘটনাটা বলেছিলো, তখন প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম তুমি আসলে মানসিকভাবে ভয়াবহ অসুস্থ, মাল্টিপাল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে ভুগছো। একটা ফেইক রিয়েলিটিতে বাস করছো। যেখানে তুমি নিজেকে একটা বইয়ের ক্যারেকটার ভেবে পুরোটা গল্প নিজের জীবনে রিক্রিয়েট করতে চাচ্ছো। কিন্তু তখন এসে খটকা লাগালো ভুলে খেয়ে বসে থাকা একটা ঘটনা। সেটা হচ্ছে তোমার বান্ধবী শাহানা’র নিখোঁজের রহস্য।’
‘গল্পটা মোটামুটি ফুলপ্রুফ হলেও সেটার লুপহোল ছিলো আপনার আশেপাশের পরিচিত মানুষের নাম ব্যবহার করা। পেতরোভের গল্পটা পড়ে শেষ করে যখন আপনি কেন আমাকে এরকম বানোয়াট একটা গল্প নিজের জীবনের বলে দাবি করে শুনিয়েছেন এসব নিয়ে ভাবছিলাম, আর নানান সম্ভাবনা তৈরি করছিলাম, তখন আমি হাজির হই মনসুর ভাইয়ের কাছে। গল্পে ব্যবহার করা নাম গুলো বলতেই আসল মানুষগুলো বের হয়ে গেলো। আপনার ছোট একটা ভুল আমাদের কাজ আরও সহজ করে দিলো,’ আমি বললাম।
–
সালেহীন সাহেব নির্বিকার। কোন উত্তর দিলেন না তিনি।
‘শাহানা’র নিখোঁজ হবার ঘটনায় তোর উপর আমাদের আগে থেকেই সন্দেহ ছিলো,’ সৈমোর সাহেব কেশে গলা পরিষ্কার করে বললেন, ‘যদিও পুলিশ কিছু প্রমাণ করতে পারেনি, তারপরও বন্ধুদের মাঝে অনেকে তোকেই দোষী ভাবতো। একটা মেয়ে তার কাছের এক বান্ধবীকে বলে গিয়েছে যে তোর বাসায় যাচ্ছে, তোরা নাকি পালিয়ে বিয়ে করবি। হল থেকে গুলশান এক আসতে আসতে কি একটা মেয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে? যাই হোক, তখন আমি, সৌধ, সৌধের দুই বন্ধু আর মনসুর ভাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম তোর বাড়িতে একটা তল্লাশী চালাবো। যদিও মনে পাওয়ার আশা বলতে কিছুই ছিলো না, তারপরও একটা সুযোগ আমরা নিতে চাইলাম।’
সালেহীন কফির মগে চুমুক দিলেন। তিনি মিটিমিটি হাসছেন। এটা কি তার ভড়কে দেওয়ার কোন কৌশল? নাকি তার অন্য কোন প্ল্যান আছে?
‘সৌধ,’ মনসুর ভাই বললেন, ‘এই অংশটা তোমারই বলা উচিত।’
‘আপনার বাড়িতে আমি মনসুর ভাই আর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাদিফ ঘুরতে এলাম। রবি আমাদের কফি খেতে অনুরোধ করলো। সে কফি বানাতে যাওয়ার সাথে সাথে আপনার স্টাডি আর বেডরুমে তল্লাশী চালালাম। কিছুই পেলাম না, শুধু বেজমেন্ট এর চাবিটা ছাড়া।
সেটা চুরি করে নিয়ে আপনার বাড়ি থেকে বের হলাম। এর এক ঘণ্টা পর দেয়াল টপকে আবার আপনার বাড়িতে ঢুকলাম বেজেমেন্টে কিছু আছে নাকি দেখার জন্য। ক্যামোফ্লজটা ধরতে আমাদের বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগেছিলো। জুতোর ছাপ খেয়াল করতে করতেই লুকানো ব্যক্তিগত লিলিথিয়ান টেম্পল টা পেয়ে যাই। চমক আরও বাকি ছিলো, ওটার ভেতর আবার পর্দা দিয়ে আড়াল করে রাখা আরেকটা দরজা পাই। যেটার ভেতর দু’টো হসপিটালের বেড়, উপরে লাইট। আর পাশের টেবিলে দু’টো পেটমোটা কালো ফাইল। যা আছে কপালে ভেবে সেগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।’
‘এর মাঝে আমি আর সৌধে’র আরেক বন্ধু খসরু মিলে তোর খুলনার ঠিকানায় যাই এই বাড়িটা তোর হাতে কিভাবে এলো সেটা নিয়ে তদন্ত করতে,’ সৈমোর সাহেব বলতে শুরু করলেন, ‘ঢাকায় আসার পর ভেবেছিলাম ওখানে গিয়ে তেমন একটা লাভ হয়নি। সুবেদার মুন্সী’র সাথে কথা বলে মনে হয়েছিলো আসলেই তোর সেই সৎ চাচা বিচিত্র কোন এক কারণেই তোকে বাড়িটা লিখে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেই পেটমোটা কালো ফাইল দু’টো নিয়ে মনসুর স্যার ঘাটাঘাটি শুরু করে। এবং আমাদের তদন্ত সবথেকে ভয়ানক এবং জ’ড্রপিং মোড় নেয়।
কি ছিলো ফাইল দু’টোতে? ভালো মতন খেয়াল না করলে কিছুই বোঝা যাবে না। অনেকগুলো সস্তা নিউজপ্রিন্ট কাগজে হিজিবিজি কিছু লেখা। কিন্তু একটু খেয়াল করে পড়লেই দেখা যাবে সেগুলো আসলে হাতে লেখা মেডিকেল রিপোর্ট।’
‘আমি প্রথমে খুবই অবাক হয়েছিলাম,’ মনসুর ভাই নাটকীয় সুরে বললেন, ‘হাতে লেখা মেডিকেল রিপোর্ট এর মানে কি? মেডিকেল টার্ম সম্পর্কে বিস্তারিত আইডিয়া না থাকলেও খুব ভালো ভাবেই বোঝা যাচ্ছিলো এগুলো খুব ডিটেইলড রিপোর্ট। পাতা উল্টাতে উল্টাতে দেখলাম কিছু পৃষ্ঠায় সৌধ ইবনে মুসা’র ব্লাড গ্রুপ থেকে শুরু করে ইউরিনের রিপোর্ট পর্যন্ত তোমার কাছে আছে এবং এর কয়েক পাতা পরে পাওয়া গেলো শাহানার রিপোর্ট এবং সব শেষে ইশফাঁক আহমেদ নামের বাষট্টি বছর বয়স্ক এক ভদ্রলোকের রিপোর্ট। যিনি বর্তমানে মৃত এবং সম্পর্কে তোমার চাচা। যদিও এসব মেডিকেল প্রোফাইল তুমি কোত্থেকে জোগাড় করেছো সেটা আমাদের কাছে যথেষ্ট অস্পষ্ট।
ইশফাঁক আহমেদের রিপোর্টের পাশে দেখলাম লাল মার্কার দিয়ে লেখা ম্যাচড উইথ নাম্বার ১১। দ্বিতীয় ফাইলটা খুলতেই সবার প্রথমে চোখে পরলো নাম্বার এগারো। বৃন্দাবন দাস নামের একজন লোকের রিপোর্ট, পেশায় ট্রাক চালক। সাথে সাথে মাথায় খেলে গেলো সুবেদার মুন্সী’র মুখে শুনে আসা তোমার চাচা’র উক্তি– ইমতিয়াজ না থাকলে আমি আজ বেঁচে থাকতাম না।
হাতে বিদ্যুত খেলে গেলো। শাহানা’র নাম্বার মিলিয়ে দেখি দু’ নাম্বার ফাইলে সেটা ম্যাচ করেছে ফারাহ্ সুহরাতের সাথে আর সৌধের টা ইফতেখারুল এনাম নামে এক যুবকের সাথে।
এসব দেখে যে সম্ভাবনাটা মাথায় আসলো সেটা গুছিয়ে বলতেও যথেষ্ট মানসিক শক্তি দরকার। সাথে সাথে আমি সবাইকে নিয়ে আমার বাবার বন্ধু প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার জহির মাহমুদের বাসায় রওনা হলাম। যিনি তোমার বাড়ির ঠিক উল্টো দিকের বাড়িটাতে থাকেন।
প্রথমে তার বাসায় আসার মূল উদ্দেশ্য ছিলো ২০০৭ সালের ২১ এপ্রিল তোমার বাড়িতে তিনি বা তার প্রতিবেশিরা সন্দেহজনক কিছু লক্ষ্য করেছিলেন কিনা, সেটা জানতে চাওয়া। যেহেতু আমাদের পক্ষে বাড়ি বাড়ি নক করে এই প্রশ্ন করা সম্ভব ছিলো না, তাই তার সাহায্য চাইবো ভেবেছিলাম। কিন্তু এখানে উপরওয়ালার অশেষ কৃপায় ভাগ্য সাহায্য করলো। তিনি নিজেই জানালেন সেই বছর ২১ এপ্রিল ভোর সাড়ে পাঁচটায় তিনি তোমার বাড়িতে গাছ, মাটি, বিশাল সব ড্রাম নিয়ে তিনটে ট্রাক ঢুকতে দেখেছিলেন। যেটা একেবারে শাহানা’র নিখোঁজ হবার দিনের সাথে মিলে যায়। তার এই তারিখটা ভালো করে মনে আছে কারণ ওইদিন দীর্ঘদিন পর তার মেয়ে, মেয়ের জামাই আর নাতি-নাতনিরা দেশে ফিরেছিলো। সেদিন ভোর রাতে তুমুল বৃষ্টিও হয়েছিলো। তিনি আর তার স্ত্রী তখন ছাদে গল্প করছিলেন। দু’জনই সেই ট্রাকগুলোকে স্পষ্টভাবে দেখেছিলেন।’
‘তখন আমাদের হাতে অনেকগুলো ছেঁড়া সুতো,’ সৈমোর সাহেব বললেন, ‘কোথাও জোড়া দিতে পারছিলাম না। একটা মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার তদন্ত করছি জানতে পেরে জহির মাহমুদ আমাদের সাহায্য করতে রাজি হলেন। তখন তার সহায়তায় মিষ্টির দোকানে গিয়ে তোর প্রাক্তন কেয়াটেকার রহমান আলীকে ধরা হলো। পুলিশের গাড়িতে উঠিয়ে দু’টো ধমক দিয়ে হাতে হাতকড়া লাগানোর সাথে সাথেই সে বললো, যা-ই জানতে চাই না কেন সে অবিলম্বে বলে দিতে রাজি আছে। তাকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়।
শাহানার কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি স্বীকার করলেন যে ২১ তারিখ দুপুরে তিনি শাহানাকে তোর বাড়িতে ঢুকতে দেখেছিলেন, তাও বেশ নাটকীয় ভাবে। সেদিন সকালে তুই তাকে একরকম জোর করেই গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলি। অপ্রত্যাশিত এই ছুটিতে সে খুশি হয় বটে, কিন্তু বাস না পেয়ে বাড়ি ফিরতে হয় এবং ফেরার সময় দেখেন শাহানা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে।
পরদিন তুই তার হাতে কয়েকটা টাকার বান্ডিল ধরিয়ে দিয়ে বললি, শাহানা বাড়িতে এসেছিলো এ তথ্য ভুলে গিয়ে যাতে এই শহর ছেড়ে সে পালায়, নাহলে তার খবর আছে।’
‘ততক্ষণে পুলিশের সহায়তায় আমরা ফারাকে ধরতে পেরেছি। বেচারী তখন বাসায় একা। একটা মেয়ের বাড়িতে রাতের বেলা একগাদা পুলিশ ঢুকলে সেটা যথেষ্ট অশোভন দেখায় বলে আমরা ওকে বাইরে ডেকে নিয়ে বার্গার হ্যাঁভেন এ বসলাম,’ মনসুর ভাই বললেন, ‘রীতিমতন হুমকি দিলাম যে ভালোয় ভালোয় সব স্বীকার না করলে জেলে পঁচতে হবে।
মেয়েটা খুব লক্ষি। গড়গড় করে সব বলে দিলো। ও যা বললো, শুনে আমাদের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিলো।
‘ইমতিয়াজ ভাই,’ আমি বললাম, ‘ফারাহ্’র সাথে আপনার পরিচয় কলেজে থাকতে। আপনি সে সময়ে বইপত্র ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে কোন এক ভাবে ভগ্নপ্রায় একটা লিলিথিয়ান মন্দিরের সন্ধান পান। হোস্টেলে থাকার সময় আপনার বন্ধু সৈমোর আর রায়হান আপনার পিছু নিয়ে একবার আপনাকে পুরাতন ঢাকার ask for flowers লিখিত একটা ভগ্নপ্রায় দালানে ঢুকতে দেখেছিলেন। ওটা যে আর্মেনিয়ানদের বানিয়ে যাওয়া লিলিথের মন্দির ছিলো, সেটা বলাই বাহুল্য। ফারাহ্’র ভাষ্যমতে আপনি সেখানে প্রায়ই যেতেন এবং একবার তাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন।
আপনি জীবনে অনেক বড় হতে চাইতেন। কিন্তু প্রভাবশালী একটা পরিবারের বংশধর হওয়ার পরও আপনার বড় হতে হয়েছিলো এতিমখানায়। আপনি চলতেন আপনার চাচার দয়ায়। ছাত্র হিসেবে আপনি যথেষ্ট ভালো হলেও খুব সম্ভবত ভবিষ্যত নিয়ে একটা ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স ভুগতেন। মানসিক ভাবে কতটা ভেঙে পড়লে আপনি অলীক একটা কিছুতে বিশ্বাস শুরু করতে পারেন, সেটা ভাবতেই আমার খারাপ লাগছে।
যাই হোক, সেই সময় আপনার বৃন্দাবন দাস নামের একজন ট্রাক ড্রাইভারের সাথে লিলিথের মন্দিরে পরিচয় হয়। তখন আপনার চাচার’র হার্টের অবস্থা খুব খারাপ আর তখনই আপনি বৃন্দাবন দাসকে প্রচুর পয়সার টোপ গিলিয়ে, তার বউ ছেলে মেয়ের সুন্দর ভবিষ্যতের কথায় ভুলিয়ে ভালিয়ে তাকে হার্ট ডোনেট করতে রাজি করান। ওদিকে আপনার মৃতপ্রায় চাচা আর দুই চাচাতো ভাইকে লিলিথ সম্পর্কিত ছোটখাটো একটা ব্রেইনওয়াশ করেন, আপনি ওদের বলেন যে একমাত্র এই পথেই তাদের বাবার জন্য হার্ট জোগাড় করা সম্ভব।
আপনার দুই চাচাতো ভাই লিলিথের মন্দিরে গিয়ে বাবার জন্য হার্ট চাইতে শুরু করে। এর দু’দিন পরই ডাক্তার তাদের জানান যে সেটা ম্যানেজ হয়ে গিয়েছে। একজন মানুষ মরণোত্তর দেহদানের উইলে বিশেষভাবে তাদের বাবার নাম লিখে দিয়ে গিয়েছেন। কারণ এককালে নাকি ইশফাঁক সাহেব তার অনেক বড় উপকার করেছিলেন।
যেহেতু জীবিত ব্যক্তির হার্ট ডোনেট করার নিয়ম নেই, আপনি যথেষ্ট পরিমাণে উৎকোচ দেবার লিখিত প্রতিজ্ঞা করে সেই ডাক্তারকে রাজি করিয়েছিলেন এবং চাচা’র বাড়ি এবং কিছু জমি হাতে আসার পর সেই জমি বিক্রি করে আপনি সেই ডাক্তারের ঋণ শোধ করেছিলেন।
ততদিনে আপনার চাচা এবং দুই চাচাতো ভাই লিলিথের ক্ষমতায় ভয়াবহ রকমের বিশ্বাসী। আপনি সেই মন্দির থেকে কোন এক ভাবে মুর্তিটা চুরি করে বেজমেন্টের আড়ালে লুকানো একটা জায়গায় সেটাকে স্থাপন করলেন। পরে আস্তে আস্তে জায়গাটাকে ছোটখাটো একটা মন্দিরের রূপ দিলেন।’
মনসুর ভাই বললেন, ‘অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকায়ে যায়– কথাটা তোমার ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য। চাচা মারা যাওয়ার পর একটা আস্ত বাড়ি পেলে, বেশ পয়সাও আসলো হাতে, ফারাকে নিয়ে সংসার করার করা চিন্তাটা মাথাতে আনার সাথে সাথেই জন্ম থেকে দূর্বল হার্ট নিয়ে জন্মানো প্রেমিকারও জীবন সংশয় দেখা দিলো।
ফারাহ্’র পরিবারের জন্য কার্ডিয়াক ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা অসম্ভব একটা ব্যাপার ছিলো। আর হার্টও তো পেতে হবে এর জন্য!
তুমি দুর্বল হৃদয় দিয়ে জন্মানো ফারাহ্’র মন ভেঙে শাহানার সাথে প্রেম শুরু করলে। ওকে পটাতে মেডিকেল কলেজ ছাড়লে। পটিয়ে পাটিয়ে বিয়ের জন্য রাজিও করালে।
রাজি করানোর কয়েক মাস আগে থেকেই তুমি তোমার বেজমেন্টে মোটামুটি আধুনিক একটা অপারেশন থিয়েটার বানানো শুরু করলে। এখানে খুব সম্ভবত তোমার সাথে প্রভাবশালী কেউ ছিলো। নাহলে এই সুক্ষ কাজ তোমার একার পক্ষে করা সম্ভব হতো না। আর তাছাড়া, এতো টাকা তুমি কোথা থেকে পেয়েছিলে সেটাও এখনো পরিষ্কার না। খুব সম্ভবত তোমার চাচাতো ভাইরা লিলিথের মন্দিরে বড় বড় ডোনেশন দেওয়া শুরু করেছিলো। আবার এমনও হতে পারে তোমার ভাইরা তাদের বন্ধু বান্ধবকেও লিলিথের মন্দিরে আনা শুরু করে ওই ঘটনার পর থেকে। এই টাকা সেখান থেকেও আসতে পারে। কিন্তু সেটাই বা কিভাবে তাদের দিতে রাজি করিয়েছো সেটা আরেক রহস্য। মানুষ হিসেবে তুমি বরাবরই জিনিয়াস!
২১ এপ্রিল তুমি ফারাকে শেষবারের মতন দেখা করার জন্য তোমার বাড়িতে ডাকলে। আর সেই সাথে শাহানাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে। পৃথিবীর ইতিহাসের সবথেকে কষ্টসাধ্য এবং মিরাকুলাস হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টটা সেদিন তোমার বাড়ির বেজমেন্টের অপারেশন থিয়েটারটায় হয়েছিলো। থার্ড ইয়ার পর্যন্ত মেডিকেলের পড়াশোনা আর অজ্ঞাত পরিচয়ের এক কার্ডিয়াক সার্জনকে নিয়ে তুমি সেরাতে অসাধ্য সাধন করেছিলে।
রাতারাতি কখনই কারও বাগানের শখ জাগতে পারে না। শিক্ষিত, ক্রিয়েটিভ এবং জিনিয়াসদের মধ্যে যদি কোন সময় ক্রিমিনাল মাইন্ড লুকানো থাকে, তারা হয় সবথেকে ভয়ানক। শাহানার লাশ গুম করতে তুমি অভিনব এক আইডিয়া বের করলে।
বিচিত্র সব গাছ, মাটি, বিশাল সব ড্রাম আর টব খুব সম্ভবত তুমি আগেই অর্ডার করে রেখেছিলে। মাঝরাতে সেগুলো ছাদে নিয়ে শাহানার লাশটাকে কয়েক টুকরো করে তুমি তোমার তথাকথিত শখের বাগানের বিশাল সব গাছের মাটিভর্তি ড্রামের নীচে চাপা দিলে।
শাহানারও কোন ট্রেস পাওয়া গেলো না। তুমি খুব সুন্দরভাবে বেঁচে গেলে। যেই ফারাহ্’র জন্য এতকিছু করলে সে-ই জ্ঞান ফেরার পর তোমাকে ভয় পাওয়া শুরু করলো। রোগীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইতিহাসে খুব সম্ভবত এটাই প্রথম।
এ ঘটনার পর ফারাহ্ তোমাকে দেখলেই ভয় পেতো। আস্তে আস্তে তোমার সাথে যোগাযোগ একেবারেই কমিয়ে দেয় এবং তুমিও আস্তে আস্তে দুরে সরে যাও।
কিন্তু আজ থেকে চার বছর আগে তুমি আবার ওর সাথে যোগাযোগ করে একটা সাহায্য চাও। আর হুমকি দাও সাহায্য না করলে ওর বড় কোন ক্ষতি করবে। রীতিমতন জোর করে ধরে এনেই কাজটা করাতে ওকে বাধ্য করো তুমি।
কাজটা ছিলো সৌধকে ভয় পাওয়ানো সম্পর্কিত। খুব সহজ একটা কাজ। একটা ছেলেকে হ্যালুসিনেটিং ড্রাগ দেওয়া হবে এবং সে ফারাহ্’র চেহারাটাকে মৃত হিসাবে জানবে। আলখেল্লা পরে চুলগুলো ছেড়ে একটু সামনে দাঁড়ালেই হবে শুধু। ড্রাগের নেশা, তোমার গল্প বর্ণনা করার ক্ষমতা আর ভয় মিলিয়ে জ্ঞান হারাতে সময় লাগবে না।’
ইমতিয়াজ সালেহীন এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি। ভাবলেশহীন একটা চেহারা নিয়ে সবকিছু শুনে গিয়েছেন। এবার একটু নড়ে চড়ে বসে মনসুর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘স্যার, কিছু মনে না করলে একটা সিগারেট ধরাতে পারি?’
মনসুর ভাই বেশ বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ধরাও। আমাকেও একটা দাও। তোমার বন্ধু সৈমোরও অনেকক্ষণ ধরে উসখুশ করছে। ওকেও একটা দাও। আজ সব মাফ।’
সালেহীন ভাই সিগারেট ধরিয়ে দীর্ঘ টান দিয়ে বললেন, ‘এ সমস্ত কথা কি ফারাহ্ আপনাদের বলেছে নাকি প্রেডিকশন? আন্দাজে ঢিল মেরে দেখছেন?’
‘ইমতিয়াজ,’ সৈমোর বললো, ‘যে মেয়েকে ডিচ করে তুই তার চোখের সামনে আরেকটা মেয়ে নিয়ে ঘুরেছিস, তারপর শেষ দেখা করার নামে বাসায় ডেকে অজ্ঞান করে অপারেশন করে নিজের বর্তমান প্রেমিকা’র হার্ট লাগিয়ে দিয়ে বলেছিস তোমাকে নতুন জীবন উপহার দিলাম সে কি তোকে কোনদিন সুস্থ ভাববে? তুই তো সাক্ষাৎ সাইকোপ্যাথ। এরপর থেকে মেয়েটার জীবনই কাটছে একটা অদ্ভুত ট্রমাতে! আর যখন সে জানবে যে তোকে খুনের দায়ে জেলে ঢোকানো হচ্ছে, যা যা জানতে চাওয়া হচ্ছে সেসব না বললে তাকেও জেলে ঢোকানো হবে, সেক্ষেত্রে সব বলে দেওয়াটা কি অপরাধ?’
‘অবশ্যই না। সবাইকে নিজের ভালোটা বুঝতে হয় সবসময়। ওই ঘটনার পর থেকে ও আমাকে যমের মতন ভয় পেতো। ইউনিভার্সিটি এরিয়াতে একবার আমার সামনে পড়ে যায়। তখন ও রাস্তার মাঝে। উল্টা পাল্টা দৌড় দিয়ে মরতে বসেছিলো।’
‘তুই এমন কেন ইমতিয়াজ?,’ সৈমোর সাহেব কন্ঠে ঘৃণা নিয়ে জানতে চাইলেন।
‘জানি না,’ সিগারেট টানতে টানতে নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন তিনি, ‘আরেক রাউন্ড কফি খাওয়া যাক, কি বলিস?’
তিনি বেশ খানিকটা সময় নিয়ে কফি বানালেন। তারপর নিজের গোলাপি মগে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আসলে তোদের ইনভেস্টিগেশনে আমি মুগ্ধ। তোদের প্রত্যেকটা পয়েন্টেই ঠিক। শাহানাকে আমি নিজের হাতে খুন করেছি।’
আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। আমি ভেবেছিলাম তিনি কিছুতেই স্বীকার করবেন না এসব। মনসুর ভাইকেও দেখলাম একটু অবাক হয়েছেন। কিন্তু সৈমোর সাহেব একেবারেই নির্বিকার।
‘আশা করি তোমার মাথা ভেজে খাওয়া ও দু’টো লাইনের ব্যাখ্যা পেয়েছো সৌধ? ওই কথাগুলো আমিই চিৎকার করে বলেছিলাম সেদিন, আর সেটাই তোমার মাথায় গেঁথে গিয়েছিলো। তোমার হৃদপিন্ডটা খুব দরকার ছিলো আমার। আসলে সেদিন যদি আমার সাথে অন্য কেউ থাকতো তাহলে তোমাকে ঠিকই আটকে ফেলতে পারতাম, সেক্ষেত্রে এতকিছু ঘটিয়ে ফেলার জন্য তুমি আর বেঁচে থাকতে না। তোমার হৃদপিন্ড টা ইফতেখারুল এনাম এর জন্য খুবই পারফেক্ট ছিলো। সে ছয় অংকের একটা ফিগার অফার করেছিলো আমার কাছে। টাকায় না, ডলারে। লিলিথের পায়ে পড়ে সে জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলো। কিন্তু তুমি ছুটে যাওয়াতে সেটা আর সম্ভব হয়নি। ইউ শুড ফিল লাকি,’ ভয়ংকর কথাগুলো হাসি-মুখে এমন ভাবে একনাগাড়ে বলে গেলেন যে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো।
তিনি আবার বলা শুরু করলেন, ‘আদ্রিয়ানের গল্পটা পড়েই আসলে আমার মাথায় প্রাইভেট লিলিথিয়ান টেম্পল করার জিনিসটা মাথায় এসেছিলো। ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন আর ask for flowers, কি অদ্ভুত মিল! শাহানা’র পছন্দ করে দেওয়া মগ আর পর্দা দেখে যেদিন সৌধ শাহানাকে আমার স্ত্রী বানিয়ে ফেললো, খুব ইমোশোনাল হয়ে গিয়েছিলাম। একবার ভেবেছিলাম আসল ঘটনাটা বলে দিই। কিন্তু মাথায় তখন টাকার লোভ কাজ করছিলো। সব কিছু প্ল্যান মতন এগোচ্ছিলো। আলমারিতে ছবিটা পেয়ে সে ফারাকে শাহানা ভেবেছিলো, ফারাহকেও হুমকি ধামকি নিয়ে ভয় দেখানোর জন্য আনা হয়ে গিয়েছে, অল্প ডোজে পেয়োটির রস খাওয়ানো হয়েছে যাতে ঘন্টা দুই পর হ্যালুসিনেশন শুরু হয়ে যায়– তখন কি আর আসল ঘটনা বলা যায়? ছেলেটার এতো আগ্রহ দেখে বই এর কাহিনিটাই সুন্দর করে শুনিয়ে দিলাম। তখন যদি জানতাম ও এভাবে পালিয়ে যেতে পারবে, সাথে অবশ্যই দু’তিনজন লোক রাখতাম। আটকাতেই পারলাম না ওকে। ভয় পেলে যে মানুষের শরীরের জোর বেড়ে যায় সেটা প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম সেদিন।
তোমাকে হয়তো আরও একটা ফাঁদে ফেলতে পারতাম। কিন্তু তুমি বেঁচে গেলে এনাম মারা যাওয়ার কারণে। তোমার মাথা থেকে ঘটনাটা তাড়ানোর জন্যই সেদিন লাইব্রেরিতে গিয়ে সুন্দর একটা ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছিলাম। তুমি যদি সেটা বিশ্বাস করে থেমে যেতে, তাও আমি আজ বেঁচে যেতাম।
এখন এমন একটা অবস্থায় আছি সবকিছু স্বীকার না করেও উপায় নেই। কপাল! রহমত আলী’র জবানবন্দি পাওয়া গেছে, ফারাহ্’র টাও। শাহানা হত্যা মামলায় এমনিতেই ফাঁসি হয়ে যাবে আমার।’
বলে কিছুক্ষণের জন্য চুপ করলেন। তারপর বললেন, ‘মনসুর স্যার, আপনি মেডিকেল রিপোর্ট কিভাবে পাই জানতে চেয়েছিলেন না? এ দেশে জায়গা মতন টাকা ফেললে সব সম্ভব। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে সৌধে’র জন্ডিসের কারণে ব্লাড টেস্ট করতে হয়েছিলো। ওটাই একটু কায়দা করে ম্যানেজ করে নিয়েছিলাম। এবার বুঝে নিন বাকিগুলো কিভাবে জোগাড় করা। আর হাতে লেখার ব্যাপারটা খুবই সিম্পল। আগের রিপোর্ট পেলে সময়ের সাথে সেখানে কি কি পাল্টাতে পারে সেটা আমি হাতেই রাফ করি সবসময়।
আসলে ছোটবেলা থেকেই আমার জীবনে খুব বড় কিছু করার ইচ্ছে ছিলো। ক্রিয়েটিভ জিনিসপত্র আমাকে সবসময়ই টানতো। লিখতে খুব ভালো লাগতো আমার। গান-বাজনাতেও ভালো ছিলাম। এক সময় বুঝলাম এ দেশে ক্রিয়েটিভ কিছু চর্চা করতে প্রথমে অনেক পয়সার মালিক হতে হবে, যাতে আরামসে ক্রিয়েটিভিটির চর্চা করা যায়। কারণ এখানে ক্রিয়েটিভ কাজে কোন পয়সা নেই। বাপ-দাদা বিশাল সম্পত্তির মালিক হওয়া স্বত্তেও বড় হয়েছি এতিমখানায়। এমনকি বাপ-দাদার পরিচয়ই জানতে পেরেছি আমি পনেরো বছর বয়েসে। এর আগে আমি জানতাম আমি একজন বেশ্যার অবৈধ সন্তান। আমার চাচা এতিমখানায় আমাকে এই পরিচয়ে বড় করতে সবাইকে বাধ্য করেছিলেন।
জন্ম পরিচয় পাবার পর মনে হলো এবার বোধহয় কপালটা খুললো আমার। কিন্তু কিসের কি! লাথি মেরে খেদানো হলো আমাকে সেখান থেকে।
একসময় বুঝলাম বাঁচতে হলে আমাকে আর সবার মত অপছন্দের কোন কাজ করেই বাঁচতে হবে। যে জীবনে কোন আনন্দ নেই, রোমাঞ্চ নেই, নতুনত্ব নেই। কিন্তু আমি এই জীবন চাইতাম না।
অনেক অনেক মাথা খাঁটিয়ে ঠিক করলাম লালসালু’র ভন্ড পীরের মতন আয় করবো। কিন্তু এখানে হবে উল্টো, আমি প্রতিষ্ঠা করবো এই পৃথিবীর সবথেকে ভয়ংকর অপদেবি’র মূর্তি। যার প্রথম শিকার ছিলো আমার চাচা আর তার দুই কুলাংগার সন্তান। আমার এই মন্দির কিন্তু অনেক পুরনো। প্রথমে গোপনে গোপনেই জিনিসটা ছড়ানো হয়েছে। ২০১২ তে, যখন সৌধের সাথে পরিচয় হয় তখন লিলিথের ফ্যান বেজ মোটামুটি শক্ত। এর কয়েকমাস আগেই আমি সাইনবোর্ড’টা বানিয়েছিলাম আসল জায়গা থেকে রেসপন্স কেমন আসে দেখার জন্য।
আমি এই জীবনে পয়সার সবথেকে উপযুক্ত ব্যবহারটা করতাম। পুরো পৃথিবী ঘুরতাম। শিল্প নিয়ে ভাবতাম। সাহিত্য নিয়ে ভাবতাম। বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতাম। নতুন কিছু দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম এই মানব সভ্যতাকে। আর আমাকে কিনা পয়সা রোজগারের জন্য এমন জঘন্য পথ বেছে নিতে হলো!
আচ্ছা, ফারাহ্ কিন্তু ইশফাঁক চাচার ঘটনার আগে পিছে কোথাও নেই। ও সবকিছু জেনেছে আমার লেখা কিছু চিঠি থেকে। ওর অপারেশনের পর ওকে বারোটা চিঠিতে সবকিছু বিস্তারিত লিখেছিলাম।
‘জানি,’ সৈমোর সাহেব বললেন, ‘চিঠিগুলো সে আমাদের দেখিয়েছে।
‘চমৎকার,’ বললেন তিনি, ‘তোমার বাকি দুই বন্ধু কোথায়? ওদের ডাকো। অভিনন্দন জানাই।’
‘ওরা আপনার বাড়ির বাইরে,’ আমি উত্তর দিলাম, ‘আপনার মতন একজন সাইকোপ্যাথের সাথে দেখা করতে এসেছি। ব্যাকআপ প্ল্যান তো রাখতেই হয়।’
‘আচ্ছা, তিনটা প্রশ্ন,’ মনসুর ভাই বললেন, ‘ফারাহ্ র সার্জারীতে থাকা অজ্ঞাত পরিচয়ের সেই ডাক্তারটা কে? অপারেশন থিয়েটারের মতন ব্যয়বহুল একটা জিনিস বানানোর পয়সা তুমি কোথায় পেয়েছিলে? আর সেখানকার বাকি যন্ত্রপাতি কোথায়? বেজমেন্টে তো তেমন কিছুই পাওয়া গেলো না।’
‘তিনি ছিলেন আমার লিলিথিয়ান টেম্পল প্রজেক্টের একমাত্র পার্টনার। অনেক টাকা ইনভেস্ট করেছিলেন এর পেছনে। আমি বলেছিলাম পাঁচ বছরে দশগুণ টাকা তাকে ফেরত দেবো। কিন্তু সেটা নেওয়ার আগেই পৃথিবীর যাবতীয় হিসেব নিকেশের উর্ধ্বে চলে গিয়েছেন।’
‘তার নামটা জানতে পারি?’
‘মরা মানুষ নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া না করাই ভালো। বাদ দিন। তবে যদি খুব ইচ্ছে হয়, তাহলে আমার চাচার কার্ডিয়াক যিনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করেছিলেন, তার নাম খুঁজে বের করুন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে নামকরা কার্ডিয়াক সার্জনের মধ্যে একজন ছিলেন। আর বেজমেন্ট থেকে অপারেশন থিয়েটারটা সরিয়ে নিয়েছি অনেক আগে। ভালো দু’টো বেড কিনেছি বলে পুরনো দু’টো ওখানেই পড়ে আছে। চারতলার সবথেকে দক্ষিণের ঘরটাকে অপারেশন থিয়েটার বানিয়েছি। দরজা খোলা আছে, চাইলে ঘুরে আসতে পারেন … এখন কি?,’ বলে তিনি হাসলেন, ‘আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেবেন? বক্তব্য রেকর্ড করেননি?
‘করেছি,’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলাম আমি, ‘ভিডিও-ও করা হয়েছে,’ বলে শার্টের নীচে বোতামের ফাঁকে কায়দা করে লাগানো গো-প্রো ক্যামেরাটা বের করে দেখালাম।
‘আসলে,’ সৈমোর সাহেব বললেন, ‘আমরা চাই তুই নিজেই পুলিশের কাছে গিয়ে ধরা দিয়ে সবকিছু স্বীকার কর আর তাছাড়া, আমার মনে হয়েছিলো সব কিছু বলার পর তুই নিজেই গিয়ে ধরা দিবি পুলিশের কাছে।
‘আর যদি না যাই?’
‘সেক্ষেত্রে জোর করে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।’
‘আমি যাবো। যাওয়ার আগে এখানে দাঁড়িয়ে একটা শেষ সিগারেট খেয়ে যেতে চাই,’ বলে সালেহীন একটা সিগারেট ধরালেন।
শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলো দেখে মনে হচ্ছে পুরো আকাশটায় আগুন ধরে গিয়েছে। স্নান একটা কমলা আলো পুরো ছাদটাতে মায়াবি আবহ সৃষ্টি করেছে। কেমন একটা শান্তি শান্তি ভাব।
শান্তিময় একটা গোরস্তান!
ধীরে ধীরে কমলা’র আভাটা চলে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিলো মেঘ। ঠান্ডা বাতাস বওয়া শুরু করলো। সালেহীন সাহেব গুনগুন করে গান ধরলেন–
বাদলা দিনে মনে পড়ে ছেলে বেলার গান-
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এলো বান।
সিগারেটের গোড়াটা ধীরে সুস্থে পায়ের নীচে পিষে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সুইমিং পুলের সামনে রাখা ক্যাকটাসের সবথেকে বড় টবটায় শাহানার মাথা পাওয়া যাবে। আর …’ বলে কফি টেবিলের পাশে রাখা কয়েকটা পাতাবাহার গাছের ঝাড় থেকে একটা সবুজ বোতল বের করে দিয়ে বললেন, ‘এটা আমার নিজস্ব রেসিপিতে বানানো পেয়োটির রস। প্রতি মাসের শেষ বুধবার লিলিথের উপাসকেরা আমার মন্দিরে একত্র হয়। উপাসনা শুরু করা আগে সবাইকে এটা ওয়াইনের সাথে মিশিয়ে খাওয়াই। নানান উল্টাপাল্টা জিনিস দেখা শুরু করে তখন… হাবিজাবি বিশ্বাস করাতে খুব সুবিধে হয় তখন।
চলো তাহলে, ধরা দেয়া যাক!
শেষকথা
সেদিন রাতেই ইমতিয়াজ সালেহীন গুলশান থানায় গিয়ে সবকিছু স্বীকার করেন। শাহানার বাবাকে খবর দিয়ে এনে মামলার ফাইল আবার খোলা হয়। শাহানার বাবা আর সালেহীনের অনুরোধে এই খবরটা নিয়ে যাতে পত্র-পত্রিকায় বেশি মাতামাতি না হয় সেজন্য পত্রিকাওয়ালাদের একটু অন্ধকারেই রাখা হয়েছিলো।
এর তিন মাস পর আদালত থেকে ইমতিয়াজ সালেহীনকে ফাঁসির দন্ডাদেশ দেওয়া হয়। মৃত্যুর পর জানা গেলো যে তিনি তার গুলশানের বাড়িটা এবং ব্যক্তিগত লাইব্রেরি’র সমস্ত বই আমার আর মনসুর ভাইয়ের নামে লিখে দিয়ে গিয়েছেন।
দু’জনের একজনও সেই বাড়ির এবং লাইব্রেরি’র কোন মালিকানা দাবি করিনি। বর্তমানে রবি এবং রহমান আলী তাদের পরিবার নিয়ে সেখানে বাস করছেন।
আর হ্যাঁ, বাড়ির সেই বিশাল ছাদটা এখন ধু-ধু মরুভূমির মতন পড়ে আছে। শাহানার লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশ বাহিনি ছাদের সব কিছু জব্দ করে নিয়ে গিয়েছিলো।
এখন বাড়ির সামনের লনে রবি আর রহমান আলী অর্কিড চাষ করেন। সদর দরজার উপর সেই সাইনবোর্ডটা এখনো অবিকৃত। সেখানে লেখা–
‘ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন’
