পরিশিষ্ট-১
1 of 2

হাদীস বর্ণনায় রাসূল (ﷺ)-এর নৈকট্য

হাদীস বর্ণনায় রাসূল (ﷺ)-এর নৈকট্য

হাদীস গ্রন্হ-প্রণেতাগণ সাধারণত হাদীষ বর্ণনার এমন সব সূত্রের অনুসন্ধান করিয়াছেন, যাহার মাধ্যমে রাসূলের সহিত নিকটতর সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব। অর্থাৎ হাদীস-গ্রন্হ প্রণয়নকারী মুহাদ্দিসগণ রাসূলের নিকট হইতে যত কম সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে হাদীস লাভ করিতে পারিতেন তাহার জন্য তারা বিশেষভাবে চেষ্টা করিতেন। ফলে যে হাদীস যত কম সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে গ্রন্হকার পর্যন্ত পৌঁছিত, মুহাদ্দিসদের দৃষ্টিতে উহার গুরুত্ব ও মর্যাদা ততই বেশি হইত, ততই তাহা নির্ভরযোগ্য বিবেচিত হইত। কেননা হাদীস বর্ণনার সূত্রে মধ্যবর্তী লোক যতই কম হয়, হাদীস গ্রন্হ সংকলনকারীর পক্ষে রাসূলে করীমের ততই নৈকট্য লাভ করা সম্ভব হয়।

দ্বিতীয়ত, হাদীস বর্ণনা পরম্পরা (********************) যতই সংক্ষিপ্ত ও অপেক্ষাকৃত অল্প সংখ্যক বর্ণনাকারী সম্বলিত হয়, তাঁহাদের অবস্থান যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করা ততই সহজসাধ্য হয়। হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে ভূল-ভ্রান্তিও ততই কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই দিক দিয়া সমস্ত হাদীস গ্রন্হ প্রণেতার মধ্যে ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর স্থান সর্বোচ্চ। ইহার কারণ এই যে, তিনি অন্তত চারজন সাহাবীল সরাসরি সাক্ষাৎ পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করিয়াছিলেন।

হাদীষ বর্ণনা সূত্রে দীর্ঘতা ও স্বল্পতার দিক দিয়া কয়েকটি পরিভাষার উদ্ভব হইয়াছে। এখানে উহাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় উল্লেখ করা যাইতেছেঃ

‌১. যেসব হাদীস রাসূলে করীম (ﷺ) হইতে গ্রন্হ প্রণয়নকারী পর্যন্ত মাত্র একজন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে পৌঁছিয়াছে, সেইসব হাদীসকে বলা হয় ‘ওয়াহদানীয়াত’ (********************) ‘এক বর্ণনাকারী সম্বলিত হাদীস’।

ইমাম আবূ হানীফা সংকলিত হাদীস গ্রন্হ এই ধরণের কয়েকটি হাদীসই উদ্ধৃত হইয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ এখানে একটি হাদীস উল্লেখ করা যাইতেছেঃ

******************************************************

আবূ হানীফা বলিয়াছেন, আমি আয়েশা বিনতে আজরাদকে বলিতে শুনিয়াছিঃ নবী (ﷺ) বলিয়াছেনঃ আল্লাহর সবচেয়ে অধিক সংখ্যক সৈন্য হইতেছে জুরাদ-(বিশেষ জাতীয় ফড়িং), আমি নিজে উহা খাই না, আর উহাকে হারামও বলি না।

[এই হাদীসটি মুসনাদ আবূ হানীফা ******************** গ্রন্হে উদ্ধৃত হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীনের ইতিহাস গ্রন্হেও ইহা উদ্ধৃত হইয়াছে ।*******************

উদ্ধৃত হাদীসটি রাসূলের নিকট হইতে আবূ হানীফা পর্যন্ত মাত্র একজন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে পৌঁছিয়াছে। তিনি হইতেছেন হযরত আয়েশা বিনতে আজরাদ নামের একজন মহিলা সাহাবী। এই কারণে এই হাদীসটি ‘ওয়াহদানীয়াত’- এক ব্যক্তির মধ্যস্ততাসম্পন্ন হাদীসের পর্যায়ভুক্ত।

বহু সংখ্যক হাদীস এমন রহিয়াছে, যাহা মাত্র দুই পর্যায়ের বর্ণনাকারীর মাধ্যমেই আবূ হানীফা (র) পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে। তিনি নিজে অপর তাবেয়ীদের নিকট হইতে হাদীস শ্রবণ করিয়াছেন। তাবেয়ী উহা শ্রবণ করিয়াছেন সাহাবীদের নিকট হইতে। হাদীস গ্রন্হ সংকলনকারী পর্যন্ত রাসূলের নিকট হইতে এই হাদীসটি পৌঁছিতে মাত্র দুই স্তরের বর্ণনাকারীর মাধ্যম রহিয়াছে। অতএব পরিভাষার এই হাদীসসমূহে বলা হয় ‘সুনায়ীয়াত (********************)- দুই স্তরের বর্ণনকারী সম্বলিত হাদীস। ইমাম আবূ হানীফা সংকলিত ‘কিতাবুল আ-সা-র’ গ্রন্হে এই ধরনের বহু হাদীসই উদ্ধৃত হইয়াছে। এখানে মাত্র দুইটি হাদীসের সনদ উল্লেখ করা হইয়াছে।

(১)

******************************************************

আবূ হানীফা বলেনঃ আমার নিকট আবূয-যুবাইর, তিনি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ হইতে, তিনি রাসূলে করীম (ﷺ) হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।………….

এই সনদে বর্ণিত হাদীসটিতে ইমাম আবূ হানীফা ও রাসূলে করীমের মাঝখানে ‘আবুয-যুবাইর তাবেয়ী ও জাবির ইবনে আবদুল্লাহ সাহাবীর মধ্যস্থতা রহিয়াছে।

(২)

******************************************************

আবু হানীফা বলিয়াছেনঃ নাফে আমাদের নিকট ইবনে উমর হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলে করীম (ﷺ) নিষেধ করিয়াছেন।………..

এই সনদে ইমাম আবূ হানীফা পর্যন্ত রাসূলের হাদীস পৌঁছিতে তাবেয়ী নাফে ও সাহাবী ইবন উমর – এই দুই স্তরের বর্ণনাকারীর মাধ্যমে রহিয়াছে মাত্র।

ইমাম মালিক যেহেতু তাবেয়ী নহেন, তিনি হইতেছেন তাবেয়ীদের পরবর্তী স্তরের লোক- তাবে-তাবেয়ী, সেই কারণে তাঁহার সংকলিত হাদীসসমূহের অধিকাংশই এই ‘সুনায়িয়াত পর্যায়ভুক্ত। ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম ইবনে হাম্বল কোন তাবেয়ীরও সাক্ষাৎ লাভ করিতে পারেন নাই। এই কারণে তাঁহাদের সংকলিত হাদীস প্রায়ই সুলাসীয়াত- তিন স্তরের বর্ণনাকারী সম্বলিত হাদীসের পর্যায়ভুক্ত। সুনানে দারেমী গ্রন্হে পনেরটি হাদীস এমন রহিয়াছে, যাহা তিনি রাসূলের পর তিন স্তরের বর্ণনাকারীর মাধ্যমে শুনিতে পাইয়াছিলেন।

[********************]

সিহাহ-সিত্তা প্রণেতাগণের মধ্যে ইমাম বুখারী, ইমাম ইবনে মাজাহ, ইমাম আবূ দাউদ এবং ইমাম তিরমিযীও কোন কোন তাবেয়ীর সাক্ষাৎ পাইয়াছেন; তাঁহাদের নিকট হইতে হাদীস শিক্ষা, সংগ্রহ ও বর্ণনা করিয়াছেন। এই কারণে সনদের উচ্চতার দিক দিয়া তারাও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের সামন স্তরে রহিয়াছেন। যদিও ইমাম শাফেয়ীর ইন্তেকালের সময়ে (মৃঃ ২০৪ হিঃ) ইমাম বুখারীর বয়স হইয়াছিল মাত্র দশ বৎসর, ইমাম আবূ দাঊদের ছিল মাত্র দুই বৎসর, ইমাম ইবনে মাজাহ তো তখন পর্যন্ত জন্মগ্রহণ করেন নাই।

[********************] ইহাদের গ্রন্হাবলীতে উপরোক্ত তিন স্তরের বর্ণনাকারী সম্বলিত হাদীসের সনদের সংখ্যা নিম্নরূপঃ

১) সহীহ বুখারী শরীফে ২২টি, ২).সুনানে ইবনে মাজাহ ৫টি, ৩) সুনানে আবূ দাঊদ ১টি ৪) জামে তিরমিযী ১টি।

ইমাম মুসলিম ও ইমাম নাসায়ী সরাসরি কোন তাবেয়ী হইতে হাদীস বর্ণনা করেন নাই। এইজন্য তাঁহাদের বর্ণিত সমস্ত হাদীসই চার স্তরের বর্ণনাকারী সম্বলিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *